📄 ইমামতির কে বেশি হকদার?
মানুষদের মধ্যে ইমামতির সবচেয়ে বেশি হকদার কে?- এর বর্ণনা আল্লাহর রসূল ﷺ দিয়ে গেছেন। এই মর্মে তিনি বলেছেন: يَؤُمُّ الْقَوْمَ أَقْرَؤُهُمْ لِكِتَابِ الله، فَإِنْ كَانُوا فِي الْقِرَاءَةِ سَوَاءٌ، فَأَعْلَمُهُمْ بِالسُّنَّةِ، فَإِنْ كَانُوا فِي السُّنَّةِ سَوَاءٌ، فَأَقْدَمُهُمْ هِجْرَةٌ، فَإِنْ كَانُوا فِي الْهِجْرَةِ سَوَاءٌ، فَأَقْدَمُهُمْ سِلْمًا.
"লোকজনের ইমামতি করবে যে কুরআনের সর্বাপেক্ষা বেশি পাঠক। সবাই যদি কুরআনের জ্ঞানের সমান হয়, সেক্ষেত্রে যে ব্যক্তি সুন্নাত সম্পর্কে অধিক পরিজ্ঞাত হবে সে-ই ইমামতি করবে। সুন্নাহর জ্ঞানেও সবাই সমান হলে হিজরতে যে অগ্রগামী সে ইমামতি করবে। হিজরতে সবাই সমান হলে, যে আগে ইসলাম গ্রহণ করেছে, সে ইমামতি করবে।"৩১১
সুতরাং যারা ইমামতির সবচেয়ে বেশি হকদার হবেন তাদের আলোচনা নিম্নে উল্লেখ করা হলো:
১. যিনি মানুষদের মাঝে সবচেয়ে সুন্দরভাবে কুরআন পাঠ করতে পারবেন এবং সলাতের বিষয়ে জ্ঞানী হবেন, তিনি হবেন ইমামতির হকদার। সুতরাং যখন একজন শ্রেষ্ঠ ক্বারী এবং আরেকজন তুলনামূলক কম পাঠ করতে পারেন তবে তিনি সলাতের বিষয়াদি এবং হুকুম আহকাম সম্পর্কে জ্ঞানী, তখন ফকীহ ক্বারী ব্যক্তি ইমামতির হকদার হবেন। কারণ সলাতে সুন্দর পাঠের চেয়ে সলাতের হুকুম আহকাম জানা বেশি প্রয়োজন।
২. ক্বারীর সাথে সাথে যিনি সুন্নাহ সম্পর্কে বেশি জ্ঞাত হবেন, তিনি হবেন ইমামতির হকদার। সুতরাং যখন কুরআন পাঠের দিক দিয়ে দুইজন ইমাম সমান হবেন, তবে উভয়ের একজন সুন্নাহ সম্পর্কে জ্ঞাত হবেন, তখন সুন্নাহ সম্পর্কে জ্ঞাত ব্যক্তি অগ্রাধিকার পাবেন। রসূল বলেছেন:
فَإِنْ كَانُوا فِي الْقِرَاءَةِ سَوَاءٌ، فَأَعْلَمُهُمْ بِالسُّنَّةِ.
"সবাই যদি কুরআনের জ্ঞানে সমান হয়, সেক্ষেত্রে যে ব্যক্তি সুন্নাত সম্পর্কে অধিক পরিজ্ঞাত হবে তিনিই ইমামতি করবেন।"
৩. যখন দুইজন ব্যক্তি ক্বিরাআত এবং সুন্নাহ সম্পর্কে জানার ব্যাপারে সমান হবেন তখন তদের হিজরতের প্রতি লক্ষ্য করতে হবে। যিনি আগে কুফুরের দেশ থেকে হিজরত করেছেন তিনি অগ্রাধিকার পাবেন।
৪. যখন দুইজন হিজরতের দিক দিয়ে সমান হবেন, তখন তাদের ইসলাম গ্রহণের দিকে লক্ষ্য করা হবে। যিনি আগে ইসলাম গ্রহণ করেছেন তিনি অগ্রাধিকার পাবেন।
৫. যখন উপরের সবগুলো বিষয় সমান হবে তখন যিনি বয়সে বড়ো হবেন তিনি অগ্রাধিকার পাবেন। আল্লাহর রসূল বলেছেন:
فَإِنْ كَانُوا فِي الهِجْرَةِ سَوَاءٌ، فَأَقْدَمُهُمْ سِلْمًا. وفي رواية: سناً
"হিজরতে সবাই সমান হলে, যে আগে ইসলাম গ্রহণ করেছে, সে ইমামতি করবে।” অন্য বর্ণনায় বয়স রয়েছে।
অপর হাদীসে এসেছে: وَلْيَؤُمَّكُمْ أَكْبَرُكُمْ “তোমাদের মধ্যে যে বড়ো, সে ইমামতি করবে।”
উপরের সববিষয় সমান হলে লটারি করা হবে। যিনি লটারিতে জয়লাভ করবেন তিনিই ইমাম হবেন।
বাড়ির মানুষ মেহমানের চেয়ে ইমামতির বেশি হকদার। আল্লাহর রসূল বলেছেন:
لا يؤمن الرجل الرجلَ فِي أَهْلِهِ وَلَا فِي سُلْطَانِهِ.
“কোনো ব্যক্তি যেন কারো বাড়িতে (বাড়ির কর্তাকে বাদ দিয়ে) কিংবা কারো ক্ষমতাসীন এলাকায় নিজে ইমামতি না করে। ৩১২
টিকাঃ
৩১১ সহীহ মুসলিম, হা. ৬৭৩, ( অর্থ ইসলাম গ্রহণ করা।
৩১২ সহীহ মুসলিম, হা. ১৪২০, ফুআ, ৬৭৩।
📄 যার ইমামতি করা হারাম
নিম্নোক্ত ব্যক্তিদের ইমামতি করা হারাম:
১. মহিলা কর্তৃক পুরুষের ইমামতি করা। আল্লাহর রসূল বলেন: لَنْ يُفْلِحَ قَوْمٌ وَلَّوْا أَمْرَهُمُ امْرَأَةً
"সে জাতি সফল হবে না, স্ত্রীলোক যাদের নেতা হয়। "৩১৩
মহিলাদের শরীয়তের বিধান হলো, তারা পর্দার সাথে সলাতের পিছনের কাতারে দাঁড়াবে। যদি তাকে ইমাম বানিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে শরীয়তের বিপরীত হয়ে যাবে।
২. অপবিত্র ব্যক্তি (যার শরীরে নাপাকী) রয়েছে, আর সে তা জানে, ঐ ব্যক্তির ইমামতি করা হারাম। যদি মুক্তাদী এই বিষয়টা না জেনে তার পিছনে সলাত পড়ে নেয় তাহলে তার সলাত হয়ে যাবে।
৩. মূর্খ ব্যক্তির ইমামতি করা হারাম। যে ব্যক্তি ভালোভাবে সূরা ফাতিহা পড়তে পারে না, যেখানে ইদগাম নেই সেখানে ইদগাম করে দেয়, কোনো অক্ষরকে অন্য অক্ষর দ্বারা পরিবর্তন করে দেয় অথবা এমন ভুল করে যার ফলে অর্থ পরিবর্তন হয়ে যায়। সলাতের রুকন পালন করতে না পারার কারণে তার ইমামতি বৈধ নয়। বরং হারাম।
৪. বিদআতী পাপীর ইমামতি করা হারাম। যখন তার পাপাচার প্রকাশ পেয়ে যাবে এবং বিদয়াতের দিকে আহবান করাটাও প্রকাশিত হয়ে যাবে, তখন তার পিছনে সলাত পড়া বৈধ হবে না। তার ইমামতি করা হারাম। আল্লাহ তায়ারা বলেন:
﴿أَفَمَنْ كَانَ مُؤْمِنًا كَمَنْ كَانَ فَاسِقًا لَا يَسْتَوُونَ﴾ “তাহলে কি যে ব্যক্তি মু'মিন হয়েছে সে পাপাচারীর মতো? তারা সমান নয়।”[সূরা সাজদাহ: ১৮]
৫. রুকু, সাজদা, কিয়াম, তাশাহহুদ করতে অপারগ ব্যক্তির ইমামতি করা হারাম। সুতরাং যে ব্যক্তি এগুলো করতে সক্ষম, তারজন্য এমন ব্যক্তির পিছনে সলাত পড়া বৈধ নয়।
টিকাঃ
৩১৩ সহীহুল বুখারী, হা. ৪৪২৫।
📄 যার ইমামতি করা মাকরূহ
প্রত্যেক ঐ ব্যক্তির ইমামতি করা মাকরূহ যে,
১. কুরআন পাঠে বেশি বেশি ভুল করে। তবে এটা সূরা ফাতিহা ব্যতীত। যদি সূরা ফাতিহাতে ভুল করে আর তার অর্থ পরিবর্তন হয়ে যায় তাহলে তার সাথে সলাত হবে না। রসূল বলেন: يَؤُمُ الْقَوْمَ أَقْرَؤُهُمْ "কওমের (লোকদের) ইমামতি করবে যে সর্বাপেক্ষা কুরআন জানে।”
২. যে ইমামের ইমামতি লোকেরা অপছন্দ করে, অথবা অধিকাংশ লোক অপছন্দ করে, তার ইমামতি করা মাকরূহ। নাবী বলেন:
ثَلَاثَةٌ لَا تُرْفَعُ صَلَاتُهُمْ فَوْقَ رُءُوسِهِمْ شِبْرًا: رَجُلٌ أَمَّ قَوْمًا وَهُمْ لَهُ كَارِهُونَ.
"তিন ব্যক্তির সলাত তাদের মাথার এক বিঘত উপরেও ওঠে না। এমন ব্যক্তি যে জনগণের অপছন্দ হওয়া সত্ত্বেও তাদের ইমামতি করে।”৩১৪
৩. যে ব্যক্তি কিছু অক্ষর গোপন করে পড়ে সেগুলোকে স্পষ্ট করে না, তার ইমামতি করা মাকরূহ। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি কোনো অক্ষরকে পুনরাবৃত্তি করে। এমনটি হলে অক্ষর বৃদ্ধি করা, যেমন فقاء। শব্দে فا কে পুনরাবৃত্তি করা হয়। এমনিভাবে التمتام শব্দে تاء কে পুনরাবৃত্তি করা হয়। এমন হলে অক্ষর বৃদ্ধি করার কারণে তার পিছনে সলাত পড়া মাকরূহ।
টিকাঃ
৩১৪ ইবনু মাজাহ, হা. ৯৭১।
📄 মুক্তাদী থেকে ইমামের অবস্থান
সুন্নাহ হলো ইমাম মুক্তাদীর সামনে থাকবে। আর মুক্তাদীরা দুই বা ততোধিক হবে তখন ইমামের পিছনে দাঁড়াবে। কারণ নাবী যখন সলাতে দাড়াতেন তখন তিনি আগে দাঁড়াতেন আর মুক্তাদীরা পিছনে দাঁড়াতেন। সহীহ মুসলিম এবং আবু দাউদে এসেছে:
أَن جَابِراً وَجَبَّاراً وقفا، أحدهما عَنْ يَمِينِهِ وَالْآخَرَ عَنْ يَسَارِهِ فَأَخَذَ بأيديهما حتى أقامهما خَلْفَهُ.
"নিশ্চয়ই জাবির ও জাব্বার (সলাতের জন্য নাবী এর সাথে) দাঁড়ালেন। একজন তাঁর ডান পাশে, অন্যজন তাঁর বাম পাশে। অতঃপর তিনি তাদের উভয়ের হাত ধরে পেছনে দাঁড় করিয়ে দিলেন।"৩১৫
আনাস নাবী এর তাদের বাড়িতে সলাতের ঘটনায় বলেন:
ثُمَّ يَؤُمُ رَسُولُ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَنَقُومُ خَلْفَهُ فَيُصَلِّي بِنَا.
"আল্লাহর রসূল ইমামতি করতেন আর আমরা তার পিছনে দাঁড়াতাম। অতঃপর তিনি আমাদের সলাত পড়াতেন।"৩১৬
মুক্তাদি একজন ব্যক্তি হলে ইমামের ডান পাশে দাঁড়াবে। হাদীসে এসেছে,
لأنه صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أدار ابن صخر وجابراً إلى يمينه لما وقفا عن يساره.
"ইবনু সাখর ও জাবির যখন বাম পাশে দাঁড়ালেন, তিনি ডান পাশে নিয়ে আসলেন।"৩১৭
মুক্তাদি দুইজন হলে ইমাম তাদের মাঝে দাঁড়াবে। ইবনু মাসউদ একবার আলকামা এবং আসওয়াদের মাঝে দাঁড়িয়ে ইমামতি করলেন এবং বললেন:
هكذا رأيت رسول الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فعل
"এভাবেই আমি আল্লাহর রসূল কে করতে দেখেছি।"৩১৮
তবে এটা জরুরি অবস্থার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। উত্তম হলো- মুক্তাদী ইমামের পিছনে দাঁড়াবে। মহিলারা পুরষদের পিছনের কাতারে দাড়াবে। আনাস বলেন,
وَصَفَفْتُ أَنَا وَالْيَتِيمُ وَرَاءَهُ وَالْعَجُوزُ مِنْ وَرَائِنَا.
"আমি ও ইয়াতীম বালক তাঁর পিছনে এবং আমাদের পিছনে বৃদ্ধা দাঁড়ালেন।”৩১৯
টিকাঃ
৩১৫ সহীহ মুসলিম, হা, ৭৪০৬, ফুআ. ৩০১০; দীর্ঘ হাদীসকে সংক্ষিপ্ত করে অর্থগত বর্ণনা নিয়ে আসা হয়েছে।
৩১৬ সহীহ মুসলিম, হা. ১৩৮৬, ফুআ, ৬৫৯।
৩১৭ সহীহ মুসলিম, হা. ৭৪০৬, ফুআ, ৩০১০; মূল বইয়ে ইবনু আব্বাস রয়েছে, তবে হাদীসে ইবনু সাখর রয়েছে; অর্থগত বর্ণনা।
৩১৮ সুনান আবু দাউদ, হা. ৬১৩।
৩১৯ সহীহ মুসলিম, হা. ১৩৮৫, ফুআ, ৬৫৮।