📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 জামাআতে সলাত আদায়ের মর্যাদা এবং তার বিধান

📄 জামাআতে সলাত আদায়ের মর্যাদা এবং তার বিধান


১. ফযীলত: মসজিদের জামাআতের সাথে সলাত আদায় করা ইসলামের অন্যতম বড়ো একটি নিদর্শন। মুসলমানরা এ বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেছে যে, পাঁচ ওয়াক্ত সলাত মসজিদে আদায় করা বড়ো একটি ইবাদত। আল্লাহ তা'আলা এই উম্মতের জন্য নির্দিষ্ট কিছু সময়ে একত্রিত হওয়াকে শরীয়ত সম্মত করেছেন। যেমন- পাঁচ ওয়াক্ত সলাতে, জুম'আর সলাতে, ঈদের সলাতে, সূর্য গ্রহণের সলাতে। সবচেয়ে বড়ো এবং গুরুত্বপূর্ণ সমাবেশ হলো আরাফার ময়দানে একত্রিত হওয়া। যেটা মুসলিম উম্মাহর আক্বীদা, ইবাদত এবং তাদের ধর্মীয় নিদর্শনাবলী 'এক' হওয়ার দিকে ইঙ্গিত করে। ইসলামে এই মহা সম্মেলনগুলিকে শরীয়ত সম্মত করা হয়েছে মুসলমানদের উপকারের জন্য। যেমন এই সম্মেলনগুলোতে তারা একে অপরের সাথে মিলিত হয়, একে অপরের খোঁজ খবর নিতে পারে ইত্যাদি। যেগুলো মুসলিম উম্মাহর জাতি-গোষ্ঠী নির্বিশেষে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُمْ مِنْ ذَكَرٍ وَأُنْثَى وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ
“হে মানুষ! আমরা তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী হতে সৃষ্টি করেছি। আর তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা একে অন্যের সাথে পরিচিত হতে পারো। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সে ব্যক্তিই বেশি মর্যাদাবান যে তোমাদের মধ্যে বেশি তাকওয়াসম্পন্ন।"[সূরা হুজরাত: ১৩]
নাবী জামাআতে সলাত আদায়ের প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছেন এবং তার ফযীলত ও বিরাট সওয়াবের বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি এই প্রসঙ্গে বলেন: صَلَاةُ الْجَمَاعَةِ أَفْضَلُ مِنْ صَلَاةِ الْفَذَّ بِسَبْعٍ وَعِشْرِينَ دَرَجَةً "জামাআতের সাথে আদায় করা সলাত একাকী সলাতের চেয়ে সাতাশ গুণ উত্তম।”২৯০
তিনি অন্যত্র আরও বলেন: صَلاةُ الرَّجُلِ فِي الجَمَاعَةِ تُضَعَّفُ عَلَى صَلَاتِهِ فِي بَيْتِهِ، وَفِي سُوقِهِ، خَمْسًا وَعِشْرِينَ ضِعْفًا، وَذَلِكَ أَنَّهُ : إِذَا تَوَضَّأَ، فَأَحْسَنَ الوُضُوءَ، ثُمَّ خَرَجَ إِلَى الْمَسْجِدِ، لَا يُخْرِجُهُ إِلَّا الصَّلاةُ، لَمْ يَخْطُ خَطْوَةً، إِلَّا رُفِعَتْ لَهُ بِهَا دَرَجَةٌ، وَحُطَّ عَنْهُ بِهَا خَطِيئَةٌ، فَإِذَا صَلَّى، لَمْ تَزَلِ المَلائِكَةُ تُصَلِّي عَلَيْهِ، مَا دَامَ فِي مُصَلَّاهُ.. “কোনো ব্যক্তির জামাআতের সাথে সলাতের সওয়াব, তার নিজের ঘরে ও বাজারে আদায় করা সলাতের সওয়াবের চেয়ে পঁচিশ গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এর কারণ হলো, সে যখন উত্তমরূপে ওযু করে অতঃপর একমাত্র সলাতের উদ্দেশ্যে মসজিদে রওয়ানা করে, তখন তার প্রতি কদমের বিনিময়ে একটি মর্যাদা বৃদ্ধি করা হয় এবং একটি গুনাহ ক্ষমা করা হয়। সলাত আদায়ের পর সে যতক্ষণ নিজ সলাতের স্থানে থাকে, ফিরিশতাগণ তারজন্য দুআ করতে থাকেন। আর তোমাদের কেউ যতক্ষণ সলাতের অপেক্ষায় থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত সে সলাতে বলে গণ্য হয়।”২৯১
২. বিধান: পাঁচ ওয়াক্ত সলাত জামাআতের সাথে আদায় করা ওয়াজিব। কুরআন এবং সুন্নাহ এর আবশ্যকতার উপর প্রমাণ করে।
কুরআনের দলীল- ﴿وَإِذَا كُنْتَ فِيهِمْ فَأَقَمْتَ لَهُمُ الصَّلَاةَ فَلْتَقُمْ طَائِفَةٌ مِنْهُمْ مَعَكَ﴾ "যখন তুমি তাদের (সৈন্যদের) মধ্যে থাকো, অতঃপর সলাতে দন্ডায়মান হও তখন যেন তাদের একদল তোমার সাথে দন্ডায়মান হয়।"[সূরা নিসা: ১০২]
ভীতিকর অবস্থায় যখন আদেশ আবশ্যকতার জন্য তাহলে নিরাপদ অবস্থায় সেটা আরও বেশি আবশ্যকতার হকদার।
হাদীস থেকে দলীল: আবু হুরায়রা হতে বর্ণিত। আল্লাহর রসূল বলেছেন:
أَثْقَلَ الصَّلَاةِ عَلَى الْمُنَافِقِينَ صَلَاةُ الْعِشَاءِ، وَصَلَاةُ الْفَجْرِ، وَلَوْ يَعْلَمُونَ مَا فِيهِمَا لَأَتَوْهُمَا وَلَوْ حَبْوًا. وَلَقَدْ هَمَمْتُ أَنْ آمُرَ بِالصَّلَاةِ، فَتُقَامَ، ثُمَّ آمْرَ رَجُلًا فَيُصَلِّيَ بِالنَّاسِ، ثُمَّ أَنْطَلِقَ مَعِي بِرِجَالٍ مَعَهُمْ حُزَمٌ مِنْ حَطَبٍ إِلَى قَوْمِ لَا يَشْهَدُونَ الصَّلَاةَ، فَأُحَرِّقَ عَلَيْهِمْ بُيُوتَهُمْ بِالنَّارِ.
"ইশা ও ফজরের সলাত মুনাফিকদের উপর সর্বাপেক্ষা কঠিন। তারা যদি জানত যে, এ দুটি সলাতের পুরস্কার বা সওয়াব কত, তাহলে হামাগুড়ি দিয়ে বুক হেঁচড়ে হলেও তারা এ দুই ওয়াক্ত জামা'আতে উপস্থিত হতো। আমি ইচ্ছা হয় যে, সলাতের আদেশ দেই, অতঃপর সলাতের ইকামত দেওয়া হোক। এরপর কাউকে লোকদের ইমামতি করতে বলি। আর আমি কিছু লোককে নিয়ে জ্বালানী কাঠের বোঝাসহ যারা সলাতের জামাআতে আসে না, তাদের কাছে যাই এবং আগুন দিয়ে তাদের ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দেই।”২৯২
উপরিউক্ত হাদীসটি জামাআতের সাথে সলাত আদায় করার আবশ্যকতা প্রমাণ করে। এটা এজন্য যে, রসূল প্রথমতঃ জামাআত থেকে পিছিয়ে থাকা ব্যক্তিদেরকে মুনাফিক বলে আখ্যায়িত করেছেন। আর একথা সর্বজন বিদিত যে, সুন্নাতী বিষয়ে পিছনে থাকা ব্যক্তিদেরকে মুনাফিক হিসেবে গণ্য করা হয় না। সুতরাং একথা প্রমাণিত হয় যে, তারা ওয়াজিব থেকে বিরত থেকেছেন। দ্বিতীয়তঃ রসূল তাদেরকে জামাআত থেকে বিরত থাকার জন্য শাস্তি দিতে চেয়েছিলেন। আর শাস্তি তো কেবল ওয়াজিব কাজের জন্যই হয়, সুন্নাত কাজের জন্য হয় না। তবে রসূল কে আগুন দ্বারা শাস্তি প্রদানে এটাই বাধা প্রদান করেছে যে, আগুন দ্বারা কেবল আল্লাহই শাস্তি প্রদান করবেন। এ কথাও বলা হয়েছে যে, নারী এবং ছোটো শিশু, যাদের উপর জামাআত ফরয নয় তাদের বাড়িতে অবস্থান করাটাই আল্লাহর রসূল কে শাস্তি প্রদানে বাধা দিয়েছে।
সুন্নাত থেকে দলীল: একজন অন্ধ লোক, যাকে নিয়ে মাসজিদে যাওয়ার-আসার কেউ ছিল না। সে রসূল -এর নিকটে বাড়িতে সলাত পড়ার অনুমতি চাইল। অতঃপর রসূল বললেন:
أَجِبْ لَا أَجِدُ لَكَ رُخْصَةٌ
"তুমি মাসজিদে আসবে, তোমার জন্য কোনো অনুমতি নেই।”২৯৩

টিকাঃ
২৯০ সহীহ মুসলিম, হা. ৬৫০।
২৯১ সহীহুল বুখারী, হা. ৬৪৭।
২৯২ সহীহ মুসলিম, হা. ১৩৬৮, ফুআ. ৬৫১; সহীহুল বুখারী, হা. ৬৪৪।
২৯৩ সহীহ মুসলিম, হা. ১৩৭২. ফুআ. ৬৫৩; সুনান আবু দাউদ, হা. ৫৫২।

📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 কোনো ব্যক্তি ফরয সলাত আদায়ের পর মসজিদে প্রবেশ করলে আদায়কৃত সলাত পুনরায় জামাআতের সাথে আদায় করা কি তার উপর আবশ্যক?

📄 কোনো ব্যক্তি ফরয সলাত আদায়ের পর মসজিদে প্রবেশ করলে আদায়কৃত সলাত পুনরায় জামাআতের সাথে আদায় করা কি তার উপর আবশ্যক?


না, আদায়কৃত সলাত পুনরায় জামাআতের সাথে আদায় করা তার জন্য ওয়াজিব নয়। এটা তার জন্য সুন্নাত। এমতাবস্থায় প্রথম সলাত ফরয আর দ্বিতীয়টি সুন্নাত হলে বিবেচিত হবে। আবু যার এর হাদীসে এসেছে, আল্লাহর রসূল বলেছেন:
كَيْفَ أَنْتَ إِذَا كَانَتْ عَلَيْكَ أُمَرَاءُ يُؤَخِّرُونَ الصَّلَاةَ عَنْ وَقْتِهَا ، أَوْ يُمِيتُونَ الصَّلَاةَ عَنْ وَقْتِهَا؟ قَالَ : قُلْتُ : فَمَا تَأْمُرُنِي؟ قَالَ: صَلِّ الصَّلَاةَ لِوَقْتِهَا ، فَإِنْ أَدْرَكْتَهَا مَعَهُمْ فَصَلِّ، فَإِنَّهَا لَكَ نَافِلَةٌ “তোমার অবস্থা তখন কেমন হবে যখন তোমার ওপর এমন শাসক নিযুক্ত হবে, যে সলাতকে তার নির্ধারিত সময় থেকে বিলম্বে আদায় করবে অথবা সলাতকে তার নির্ধারিত সময়ে নষ্ট করবে? তিনি বলেন, আমি বললাম, আপনি আমাকে কী আদেশ করেন? তিনি বললেন: তুমি সলাতকে তার নির্ধারিত সময়ে আদায় করবে। অতঃপর যদি তাদের সাথেও সলাত পাও তাহলে তাদের সাথেও সলাত আদায় করবে। সেটা তোমার জন্য নফল হয়ে যাবে।”২৯৭
অপর এক হাদীসে আল্লাহর রসূল এক ব্যক্তিকে জামাআত শেষ হওয়ার পর মাসজিদে একাকী সলাত পড়তে দেখে বললেন:
أَلَا رَجُلٌ يَتَصَدَّقُ عَلَى هَذَا فَيُصَلِّيَ مَعَهُ
“তোমাদের মাঝে এমন কেউ কি আছে যে এই ব্যক্তিকে সাদকা করতে পারে তার সাথে সলাত আদায় করে।”২৯৮
যদি পুনরায় জামাআতে সলাত পড়া ওয়াজিব হতো, তাহলে তিনি বলতেন, “তোমাদের মাঝে কে আছে যে এই ব্যক্তির সাথে জামাআতে সলাত আদায় করতে পারে?”
অপর হাদীসে আল্লাহর রসূল বলেন:
مَنْ يَتَصَدَّقُ عَلَى هَذَا فَيُصَلِّيَ مَعَهُ؟ فَقَامَ أَحَدُ القَوْمِ، فَصَلَّى مَعَ الرَّجُلِ
“তোমাদের মধ্যে কে এই ব্যক্তির সাথে সলাত আদায় করে সাদকা করতে চায়? এক ব্যক্তি উঠে দাঁড়াল এবং তার সাথে সলাত আদায় করল।”২৯৯

টিকাঃ
২৯৪ সুনান আবু দাউদ, হা. ৫৫১, ইবনু মাজাহ, হা. ৭৯৩।
২৯৫ সহীহ মুসলিম, হা. ৬৫৪।
২৯৬ সুনান আবু দাউদ, হা. ৫৬৭; আহমাদ ২/৬৭; হাকিম ১/২০৯ এবং ইমাম হাকিম সহীহ বলেছেন।
২৯৭ সহীহ মুসলিম, হা. ১৫২৯, ফুআ. ৬৪৮।
২৯৮ সহীহ মুসলিম, হা. ১৫৩৫, ফুআ. ৬৪৯।
২৯৯ সুনান আবু দাউদ, হা. ৫৫৮।

📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 জামাআতের জন্য সর্বনিম্ন সংখ্যা

📄 জামাআতের জন্য সর্বনিম্ন সংখ্যা


ইমামসহ দুইজন ব্যক্তির মাধ্যমে জামাআত সংঘটিত হবে। আল্লাহর রসূল বলেন: الاثْنَانِ فَمَا فَوْقَهُمَا جَمَاعَةٌ “দুইজন বা তার চেয়ে বেশি হলে জামাআত সংঘটিত হয়।”

📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 কীসের দ্বারা জামাআত পাওয়া যাবে?

📄 কীসের দ্বারা জামাআত পাওয়া যাবে?


ইমামের সাথে এক রাকআত পেলে জামাআত পাওয়া যাবে। আল্লাহর রসূল বলেন:
مَنْ أَدْرَكَ رَكْعَةً مِنَ الصَّلَاةِ، فَقَدْ أَدْرَكَ الصَّلَاةَ
“যে ব্যক্তি সলাতের এক রাকআত পেল, সে সলাতই পেল।”
তবে রুকুর মাধ্যমে রাকআত পাওয়া যায়। আবু হুরায়রা এর হাদীসে এসেছে:
إِذَا جِئْتُمْ إِلَى الصَّلَاةِ وَنَحْنُ سُجُودٌ فَاسْجُدُوا، وَلَا تَعُدُّوهَا شَيْئًا، وَمَنْ أَدْرَكَ الرَّكْعَةَ، فَقَدْ أَدْرَكَ الصَّلَاةَ.
"যদি তোমরা আমাদের সাজদা অবস্থায় সলাতে আসো, তাহলে তোমরা সাজদা করো। আর এটাকে কিছুই মনে করবে না। যে ব্যক্তি রুকু পেল, সে সলাত পেয়ে গেল।”৩০০

টিকাঃ
৩০০ সুনান আবু দাউদ, হা. ৫৮০।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00