📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 সলাতের ওয়াজিবসমূহ

📄 সলাতের ওয়াজিবসমূহ


সলাতের মোট ওয়াজিব আটটি। ইচ্ছাকৃতভাবে কেউ ওয়াজিব ছেড়ে দিলে তার সলাত বাতিল হয়ে যাবে। আর যদি কেউ ভুলে যায় অথবা এই ব্যাপারে অজ্ঞ হয়, তাহলে তার সলাত অপরিপূর্ণ হবে। যদি সলাতে ভুলবশত কোনো ওয়াজিব ছুটে যায় তাহলে সাহু সাজদা দেওয়া আবশ্যক।
ওয়াজিব এবং আরকানের মাঝে পার্থক্য: যদি কেউ রুকন ভুলে যায়, তাহলে সে রুকন আদায় না করা পর্যন্ত তার সলাত হবে না। আর যদি কেউ ওয়াজিব ভুলে যায় তাহলে সাহু সাজদা দিলে তা আদায় হয়ে যাবে। সুতরাং তার আরকান ওয়াজিবের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নিম্নে ওয়াজিবের আলোচনা প্রদত্ত হলো:
১. তাকবীরে তাহরীমা ব্যতীত সকল তাকবীর: এই তাকবীর গুলোকে تكبير الانتقال বা এক পর্যায়ে স্থানান্তরের তাকবীর বলা হয়। ইবনু মাসউদ বলেন:
رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُكَبِّرُ فِي كُلِّ رَفْعٍ وَخَفْضٍ، وَقِيَامٍ وَقُعُودٍ. "আমি (সলাতরত অবস্থায়) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রত্যেকবার ওঠা, নীচু হওয়া, দাঁড়ানো ও বসার সময় 'আল্লাহু আকবার' বলতে দেখেছি।”২১৮ আল্লাহর রসূল ﷺ মৃত্যু অবধি এই কাজে অবিচল ছিলেন। আর তিনি বলেছেন: صَلُّوا كَمَا رَأَيْتُمُونِي أُصَلِّي. "তোমরা আমাকে যেভাবে সলাত আদায় করতে দেখেছ সেভাবে সলাত আদায় করবে।"
২. ইমাম এবং একক ব্যক্তির জন্য سَمِعَ اللهُ لِمَنْ حَمِدَهُ বলা: আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু এর হাদীসে এসেছে। তিনি বলেছেন, كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُكَبِّرُ حِيْنَ يَقُوْمُ إِلَى الصَّلَاةِ ثُمَّ يُكَبِّرُ حِيْنَ يَرْكَعُ ثُمَّ يَقُوْلُ: sَمِعَ اللَّهُ لَمِنْ حَمِدَهُ حِينَ يَرْفَعُ صُلْبَهُ مِنَ الرَّكْعَةِ وَهُوَ قَائِمٌ رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْدُ. "আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন সলাতে দাঁড়াতেন 'আল্লাহু আকবার' বলে সলাত শুরু করতেন। তিনি রুকু'তে যাওয়ার সময় তাকবীর বলে যেতেন। তিনি রুকু থেকে পিঠ সোজা করে দাঁড়ানোর সময় سَمِعَ اللهُ لِمَنْ حَمِدَهُ (যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রশংসা করেন আল্লাহ তার কথা শুনেন) বলতেন। অতঃপর দাঁড়ানো অবস্থায় رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْدُ (হে আল্লাহ! তোমার জন্য সকল প্রশংসা) বলতেন।”২১৯
৩. মুজতাদী رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْدُ বলা: সুন্নাত হলো ইমাম এবং একক ব্যক্তি سَمِعَ اللهُ لِمَنْ حَمِدَهُ এবং رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْدُ কে একসাথে পড়বে। যেমনটি বর্ণিত হয়েছে পূর্বের আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু এর হাদীসে। আবু মুসা রাদিয়াল্লাহু আনহু এর হাদীসে এসেছে, وَإِذَا قَالَ: سَمِعَ اللهُ لِمَنْ حَمِدَهُ، فَقُولُوا: رَبَّنَا لَكَ الْحَمْدُ “যখন سَمِعَ اللهُ لِمَنْ حَمِدَهُ বলতেন, অতঃপর رَبَّنَا لَكَ الْحَمْدُ বলতেন।” ২২০
৪. প্রত্যেক রুকুতে একবার سُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيمِ বলা।
৫. সাজদায় একবার سُبْحَانَ رَبِّيَ الأَعْلَى বলা। হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহু এর হাদীসে এসেছে:
النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، يَقُولُ فِي رُكُوعِهِ: «سُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيمِ وَفِي سُجُودِهِ: «سُبْحَانَ رَبِّيَ الْأَعْلَى» "নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রুকূ'তে سُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيمِ এবং সাজদায় سُبْحَانَ رَبِّيَ الأعلى বলতেন। "২২১ রুকু এবং সাজদায় তিন বার পর্যন্ত তাসবীহ বৃদ্ধি করা সুন্নাত।
৬. দুই সাজদার মাঝে رَبِّ اغْفِرْ لِي বলা। হুযায়ফা এর হাদীসে এসেছে: ان النبي صلى الله عليه وسلم كَانَ يَقُولُ بَيْنَ السَّجْدَتَيْنِ: «رَبِّ اغْفِرْ لِي، رَبِّ اغْفِرْ لِي “নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুই সাজদার মাঝে رَبِّ اغْفِرْ لِي، رَبِّ اغْفِرْ لِي )প্রভু আমাকে ক্ষমা করুন। প্রভু, আমাকে ক্ষমা করুন।) বলতেন।”২২২
৭. প্রথম তাশাহহুদ (তবে যে মুক্তাদীর ইমাম ভুলবশত তাশাহহুদে না বসে দাঁড়িয়ে যায়, তার জন্য এটা ওয়াজিব নয়। কেননা এমতাবস্থায় তার উপর ইমামের অনুসরণ করা ওয়াজিব)। নাবী যখন প্রথম তাশাহহুদ ভুলে যেতেন, তখন সেই তাশাহহুদকে আর ফিরাতেন না বরং দুটি সাহু২৩ সাজদা দিয়ে দিতেন। প্রথম তাশাহহুদ হলো: التَّحِيَّاتُ اللهَ وَالصَّلَوَاتُ وَالطَّيِّبَاتُ السَّلامُ عَلَيْكَ أَيُّهَا النَّبِيُّ وَرَحْمَةُ الله وَبَرَكَاتُهُ، السَّلَامُ عَلَيْنَا وَعَلَى عِبَادِ اللَّهُ الصَّالِحِينَ أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ. "যাবতীয় মৌখিক, দৈহিক ও আর্থিক ইবাদত আল্লাহরই জন্য। হে নাবী! আপনার প্রতি সালাম এবং আল্লাহর রহমত ও বরকত (বর্ষিত) হোক। সালাম আমাদের প্রতি এবং আল্লাহর সৎ বান্দাদের প্রতি। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, এক আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কোনো সত্য ইলাহ্ নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল।"
৮. প্রথম তাশাহহুদের জন্য বসা: ইবনু মাসউদ হতে মারফু সূত্রে বর্ণিত হাদীসে এসেছে: إِذَا فَعَدْتُمْ فِي كُلِّ رَكْعَتَيْنِ، فَقُولُوا : التَّحِيَّاتُ الله .... "প্রত্যেক দুই রাকআতে যখন বসবে, তোমরা বলবে ... التَّحِيَّاتُ لِله .২২৪ এ ছাড়াও রিফায়া বিন রাফেঈ এর হাদীসে এসেছে: فَإِذَا جَلَسْتَ فِي وَسَطِ الصَّلَاةِ فَاطْمَئِنَّ ، وَافْتَرِضْ فَخِذَكَ الْيُسْرَى ثُمَّ تَشَهَّدْ "তুমি সলাতের প্রথম বৈঠকে প্রশান্তির সাথে বসবে এবং এ সময় তোমার বাম পা বিছিয়ে দিবে, অতঃপর তাশাহহুদ পড়বে।”২২৫

টিকাঃ
২১৮. তিরমিযী, হা. ২৫৩, সুনান নাসাঈ ২/২০৫।
২১৯. সহীহ মুসলিম, হা. ৭৫৪, ফুআ, ৩৯২।
২২০. সহীহ মুসলিম, হা. ৭৯০, ফুআ, ৪০৪, আহমাদঃ ৪/৩৯৯।
২২১. আবু দাউদ, হা. ৮৭৪, তিরমিযী, হা. ২৬২।
২২২. ইবনু মাজাহঃ ৮৯৭।
২২৩. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ১২০২ ও সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ৫৭০।
২২৪. আহমাদ: ৪১৬০, সুনান নাসাঈ, হা. ১১৬৩।
২২৫. সুনান আবু দাউদ, হা. ৮৫৬।

📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 সুন্নাতসমূহ

📄 সুন্নাতসমূহ


সুন্নাহ দুই প্রকার: কর্মের সুন্নাহ ও বলার সুন্নাহ
কর্মের সুন্নাহ: তাকবীরে তাহরীমা, রুকুতে যাওয়া এবং রুকু থেকে ওঠার সময় দুই হাত উত্তোলন করা। কারণ মালেক বিন হুয়াইরিস যখন সলাতের জন্য তাকবীর দিতেন তখন দুই হাত উত্তোলন করতেন। অনুরূপ রুকুতে যাওয়া এবং রুকু থেকে ওঠার সময়েও তিনি রফউল ইয়াদাইন করতেন। । এ ছাড়াও তিনি হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, নাবী এমনই করতেন। ২২৬
অনুরূপভাবে কিয়াম অবস্থায় ডান হাত বাম হাতের উপর দিয়ে বুকের উপর রাখা, সাজদার স্থানে দৃষ্টি দেওয়া, দুই পায়ের মাঝে ফাঁকা রাখা, রুকুতে দুই হাতের তালু দিয়ে হাটুকে আঁকড়ে ধরা, রুকুতে পিঠকে লম্বা করা এবং মাথা সম্মুখভাগে রাখাও সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত।
পড়ার সুন্নাহ: সলাত শুরুর দুআ বা সানা পড়া, বিসমিল্লাহ বলা, আউযুবিল্লাহ বলা, আমীন বলা, সূরা ফাতিহার পর অতিরিক্ত কিছু পড়া, রুকু এবং সাজদায় তাসবীর পরে অতিরিক্ত কিছু পড়া এবং সালাম ফিরানোর পূর্বে তাশাহহুদের পরে অন্যান্য দুআ পড়া সুন্নাত।

টিকাঃ
২২৬. সহীহ মুসলিম, হা. ৭৫০, ফুআ. ৩৯১।

📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 সলাত (বাতিল) বিনষ্টকারী বিষয়াবলি

📄 সলাত (বাতিল) বিনষ্টকারী বিষয়াবলি


যে সমস্ত কারণে সলাত বিনষ্ট হয়ে যায় তার সার সংক্ষেপ নিম্নরূপ:
১. যে জিনিস পবিত্রতাকে বাতিল করে, সে জিনিস সলাতকেও বাতিল করে। কারণ পবিত্রতা হলো সলাত সঠিক হওয়ার শর্ত। যখন পবিত্রতা বাতিল হয়ে যাবে তখন সলাতও বাতিল হয়ে যাবে।
২. শব্দ করে হাসা: অর্থাৎ অট্টহাসি হাসা। অট্টহাসি সলাত বাতিল করে দেয়, এই ব্যাপারে সকলেই একমত। কারণ এটা কথা বলা বা এর চাইতেও বেশি। এর কারণে সলাত গুরুত্বহীন এবং খেলতামাশার পাত্র হয়ে যায় সেটা সলাতের উদ্দেশ্যের প্রতিবন্ধক। তবে হাসিটা যদি মুচকি হাসি হয়, তাহলে সলাত বাতিল হবে না। এমনটি ইবনু মুনযির এবং অন্যান্যরা বর্ণনা করেছেন।
৩. সলাতের ভুল সংশোধন ব্যতীত ইচ্ছাকৃতভাবে সলাত বহির্ভূত কথা বলা: যায়েদ বিন আরকাম বলেন:
كُنَّا نَتَكَلَّمُ فِي الصَّلَاةِ يُكَلِّمُ الرَّجُلُ صَاحِبَهُ وَهُوَ إِلَى جَنْبِهِ فِي الصَّلَاةِ حَتَّى نَزَلَتْ {وَقُومُوا لِلَّهِ قَانِتِينَ} [البقرة: 238] فَأُمِرْنَا بِالسُّكُوتِ، وَنُهِينَا عَنِ الْكَلَامِ.
"আমরা সলাতের মধ্যে কথা বলতাম। আমাদের কেউ তার সঙ্গীর সাথে নিজ দরকারী বিষয়ে কথা বলত। অবশেষে এ আয়াত নাযিল হলো 'তোমরা (সলাতে) আল্লাহর উদ্দেশ্যে একাগ্রচিত্ত হও।" [সুরা বাক্বারাহ্ : ২৩৮]। অতঃপর আমরা সলাতে নীরব থাকতে আদেশপ্রাপ্ত হলাম।”২২৭ যদি কেউ অজ্ঞতাবশত অথবা ভুলে কথা বলে, তাহলে তার সলাত বাতিল হবে না।
৪. মুসল্লির সম্মুখে দিয়ে সাবালিকা মেয়ে, গাধা এবং কালো কুকুর অতিক্রম করা: রসূল বলেছেন:
إِذَا قَامَ أَحَدُكُمْ يُصَلِّي، فَإِنَّهُ يَسْتُرُهُ إِذَا كَانَ بَيْنَ يَدَيْهِ مِثْلُ آخِرَةِ الرَّحْلِ، فَإِذَا لَمْ يَكُنْ بَيْنَ يَدَيْهِ مِثْلُ آخِرَةِ الرَّحْلِ، فَإِنَّهُ يَقْطَعُ صَلَاتَهُ الْحِمَارُ، وَالْمَرْأَةُ، وَالْكَلْبُ الْأَسْوَدُ.
“তোমাদের কেউ যখন সলাতে দাঁড়ায়, সে যেন হাওদার খুঁটির ন্যায় একটি কাঠি তার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। যদি সে তার সামনে হাওদার পিছনের খুঁটির ন্যায় একটি কাঠি দাঁড় না করায়, এমতাবস্থায় তার সামনে দিয়ে গাধা, মহিলা এবং কালো কুকুর চলাচল করলে তার সলাত নষ্ট হয়ে যাবে।”২২৮
الرحل হলো: উটের পিঠে যার উপর বসা হয়। এটা উটপৃষ্ঠের জীনের মতো। آخِرَةِ الرَّحْلِ এর পরিমাণ এক হাত। সুতরাং এক হাত পরিমাণ লম্বা জিনিস সুতরার জন্য যথেষ্ট।
৫. ইচ্ছাকৃতভাবে সতর উম্মোচন করা।
৬. কিবলাকে পিছনে রেখে সলাত পড়া। কারণ কিবলামুখী হওয়া সলাত শুদ্ধ হওয়ার জন্য শর্ত।
৭. জেনে শুনে অপবিত্রতা নিয়ে সলাত আদায় করা এবং সলাতে অপবিত্রতার কথা স্মরণ হলে তা সে অবস্থায় দূর না করা।
৮. ওজর ছাড়া ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো রুকন অথবা শর্ত ছেড়ে দেওয়া।
৯. জরুরি প্রয়োজন ছাড়া সলাতের অন্তর্ভুক্ত নয়, এমন কোনো কাজ বেশি বেশি করা। যেমন- ইচ্ছাকৃত খাওয়া ও পান করা।
১০. বিনা ওজরে হেলান দেওয়া। কারণ কিয়াম হলো সলাত সহীহ হওয়ার জন্য শর্ত স্বরূপ।
১১. কর্মগত কোনো রুকন ইচ্ছাকৃতভাবে বেশি করে করা। যেমন- রুকু সাজদা বেশি করে করা। কারণ অতিরিক্ত কাজ সলাতের সমস্যা করে। ফলে সকলের মতে সলাত বাতিল হয়ে যায়।
১২. স্বেচ্ছায় রুকনগুলোকে উলোটপালোট করা। কারণ রুকনগুলো ধারাবাহিকভাবে আদায় করাও একটি রুকন।
১৩. সলাত পরিপূর্ণ হওয়ার পূর্বে সালাম ফিরানো।
১৪. ইচ্ছাকৃতভাবে সূরা ফাতিহার অর্থকে পরিবর্তন করে পড়া। কারণ সূরা ফাতিহা পাঠ করাও একটা রুকন।
১৫. ইতস্ততা করার মাধ্যমে নিয়ত ভঙ্গ করা এবং নিয়ত ভঙ্গের উপর দৃঢ় সংকল্প করা। কারণ নিয়তে অবিচল থাকা সলাতের একটি শর্ত।

টিকাঃ
২২৬. সহীহ মুসলিম, হা. ৭৫০, ফুআ. ৩৯১।
২২৭. সহীহুল বুখারী, হা. ৪৫৩৪, সহীহ মুসলিম, হা. ১০৯০, ফুআ. ৫৩৯।
২২৮. সহীহ মুসলিম, হা. ১০২৪, ফুআ. ৫১০。

যে সমস্ত কারণে সলাত বিনষ্ট হয়ে যায় তার সার সংক্ষেপ নিম্নরূপ:
১. যে জিনিস পবিত্রতাকে বাতিল করে, সে জিনিস সলাতকেও বাতিল করে। কারণ পবিত্রতা হলো সলাত সঠিক হওয়ার শর্ত। যখন পবিত্রতা বাতিল হয়ে যাবে তখন সলাতও বাতিল হয়ে যাবে।
২. শব্দ করে হাসা: অর্থাৎ অট্টহাসি হাসা। অট্টহাসি সলাত বাতিল করে দেয়, এই ব্যাপারে সকলেই একমত। কারণ এটা কথা বলা বা এর চাইতেও বেশি। এর কারণে সলাত গুরুত্বহীন এবং খেলতামাশার পাত্র হয়ে যায় সেটা সলাতের উদ্দেশ্যের প্রতিবন্ধক। তবে হাসিটা যদি মুচকি হাসি হয়, তাহলে সলাত বাতিল হবে না। এমনটি ইবনু মুনযির এবং অন্যান্যরা বর্ণনা করেছেন।
৩. সলাতের ভুল সংশোধন ব্যতীত ইচ্ছাকৃতভাবে সলাত বহির্ভূত কথা বলা: যায়েদ বিন আরকাম বলেন:
كُنَّا نَتَكَلَّمُ فِي الصَّلَاةِ يُكَلِّمُ الرَّجُلُ صَاحِبَهُ وَهُوَ إِلَى جَنْبِهِ فِي الصَّلَاةِ حَتَّى نَزَلَتْ {وَقُومُوا لِلَّهِ قَانِتِينَ} [البقرة: 238] فَأُمِرْنَا بِالسُّكُوتِ، وَنُهِينَا عَنِ الْكَلَامِ.
"আমরা সলাতের মধ্যে কথা বলতাম। আমাদের কেউ তার সঙ্গীর সাথে নিজ দরকারী বিষয়ে কথা বলত। অবশেষে এ আয়াত নাযিল হলো 'তোমরা (সলাতে) আল্লাহর উদ্দেশ্যে একাগ্রচিত্ত হও।" [সুরা বাক্বারাহ্ : ২৩৮]। অতঃপর আমরা সলাতে নীরব থাকতে আদেশপ্রাপ্ত হলাম।”২২৭ যদি কেউ অজ্ঞতাবশত অথবা ভুলে কথা বলে, তাহলে তার সলাত বাতিল হবে না।
৪. মুসল্লির সম্মুখে দিয়ে সাবালিকা মেয়ে, গাধা এবং কালো কুকুর অতিক্রম করা: রসূল বলেছেন:
إِذَا قَامَ أَحَدُكُمْ يُصَلِّي، فَإِنَّهُ يَسْتُرُهُ إِذَا كَانَ بَيْنَ يَدَيْهِ مِثْلُ آخِرَةِ الرَّحْلِ، فَإِذَا لَمْ يَكُنْ بَيْنَ يَدَيْهِ مِثْلُ آخِرَةِ الرَّحْلِ، فَإِنَّهُ يَقْطَعُ صَلَاتَهُ الْحِمَارُ، وَالْمَرْأَةُ، وَالْكَلْبُ الْأَسْوَدُ.
“তোমাদের কেউ যখন সলাতে দাঁড়ায়, সে যেন হাওদার খুঁটির ন্যায় একটি কাঠি তার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। যদি সে তার সামনে হাওদার পিছনের খুঁটির ন্যায় একটি কাঠি দাঁড় না করায়, এমতাবস্থায় তার সামনে দিয়ে গাধা, মহিলা এবং কালো কুকুর চলাচল করলে তার সলাত নষ্ট হয়ে যাবে।”২২৮
الرحل হলো: উটের পিঠে যার উপর বসা হয়। এটা উটপৃষ্ঠের জীনের মতো। آخِرَةِ الرَّحْلِ এর পরিমাণ এক হাত। সুতরাং এক হাত পরিমাণ লম্বা জিনিস সুতরার জন্য যথেষ্ট।
৫. ইচ্ছাকৃতভাবে সতর উম্মোচন করা।
৬. কিবলাকে পিছনে রেখে সলাত পড়া। কারণ কিবলামুখী হওয়া সলাত শুদ্ধ হওয়ার জন্য শর্ত।
৭. জেনে শুনে অপবিত্রতা নিয়ে সলাত আদায় করা এবং সলাতে অপবিত্রতার কথা স্মরণ হলে তা সে অবস্থায় দূর না করা।
৮. ওজর ছাড়া ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো রুকন অথবা শর্ত ছেড়ে দেওয়া।
৯. জরুরি প্রয়োজন ছাড়া সলাতের অন্তর্ভুক্ত নয়, এমন কোনো কাজ বেশি বেশি করা। যেমন- ইচ্ছাকৃত খাওয়া ও পান করা।
১০. বিনা ওজরে হেলান দেওয়া। কারণ কিয়াম হলো সলাত সহীহ হওয়ার জন্য শর্ত স্বরূপ।
১১. কর্মগত কোনো রুকন ইচ্ছাকৃতভাবে বেশি করে করা। যেমন- রুকু সাজদা বেশি করে করা। কারণ অতিরিক্ত কাজ সলাতের সমস্যা করে। ফলে সকলের মতে সলাত বাতিল হয়ে যায়।
১২. স্বেচ্ছায় রুকনগুলোকে উলোটপালোট করা। কারণ রুকনগুলো ধারাবাহিকভাবে আদায় করাও একটি রুকন।
১৩. সলাত পরিপূর্ণ হওয়ার পূর্বে সালাম ফিরানো।
১৪. ইচ্ছাকৃতভাবে সূরা ফাতিহার অর্থকে পরিবর্তন করে পড়া। কারণ সূরা ফাতিহা পাঠ করাও একটা রুকন।
১৫. ইতস্ততা করার মাধ্যমে নিয়ত ভঙ্গ করা এবং নিয়ত ভঙ্গের উপর দৃঢ় সংকল্প করা। কারণ নিয়তে অবিচল থাকা সলাতের একটি শর্ত।

টিকাঃ
২২৭. সহীহুল বুখারী, হা. ৪৫৩৪, সহীহ মুসলিম, হা. ১০৯০, ফুআ. ৫৩৯।
২২৮. সহীহ মুসলিম, হা. ১০২৪, ফুআ. ৫১০।

📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 সলাতে যে কাজগুলো করা মাকরূহ

📄 সলাতে যে কাজগুলো করা মাকরূহ


সলাতের মধ্যে নিম্নের কাজগুলো করা মাকরূহ:
১. শুধুমাত্র প্রথম দুই রাকআতে সূরা ফাতিহা পাঠ করা: এটা সলাতে নাবী এর সুন্নাত ও দেখানো পথের বিপরীত।
২. সূরা ফাতিহা দুবার পাঠ করা: এটাও নাবী এর সুন্নাতের বিপরীত। তবে কেউ যদি প্রয়োজনে পড়ে, তাহলে তা বৈধ আছে। যেমন কেউ সূরা পাঠ করার সময় অন্তরের উপস্থিতি এবং একগ্রতা হারিয়ে ফেলল। ফলে সে তার অন্তরকে হাযির করার জন্য সূরা ফাতিহা আবার পড়ল, এতে কোনো সমস্যা নেই। তবে শর্ত হলো দুই বার পাঠ করা যেন তাকে কুমন্ত্রনার দিকে টেনে নিয়ে না যায়।
৩. বিনা প্রয়োজনে সলাতে সামান্য এদিক ওদিক তাকানো মাকরূহ: আল্লাহর রসূল কে সলাতে দৃষ্টিপাত করা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন:
هُوَ اخْتِلاسُ يَخْتَلِسُهُ الشَّيْطَانُ مِنْ صَلَاةِ العَبْدِ
"এটা এক ধরনের ছিনতাই। যার মাধ্যমে শয়তান বান্দার সলাত হতে অংশবিশেষ ছিনিয়ে নেয়। ২৩০ الاختلاس : চুরি করা, ছিনতাই করা।
তবে দৃষ্টিপাত করা যদি প্রয়োজন হয় তাহলে তাতে কোনো সমস্যা নেই। যেমন নামাযে কারো কুমন্ত্রনা আসার কারণে বামদিকে তিনবার থুথু ফেলার প্রয়োজন হওয়া। এই দৃষ্টিপাত হলো প্রয়োজনের দৃষ্টিপাত। এর ব্যাপরে নাবী ﷺ এর নির্দেশ রয়েছে। অনুরূপভাবে কোনো ব্যক্তি সলাত অবস্থায় তার সন্তানের ক্ষতির আশংকা করল, ফলে তার দৃষ্টিপাত হয়ে গেল, এতে তার কোনো সমস্যা নেই।
এগুলো হলো সামান্য দৃষ্টিপাতের ক্ষেত্রে। পক্ষান্তরে, যদি কোনো ব্যক্তি পুরোপুরি দৃষ্টিপাত করে (এদিক ওদিক তাকায়) অথবা কিবলাকে পেছনে করে ফেলে তাহলে তার সলাত বাতিল হয়ে যাবে, যদি সে এটা প্রচণ্ড ভয় বা এ জাতীয় কোনো ওজরের কারণে না করে থাকে।
৪. সলাতে দুচোখ বন্ধ করে রাখা: কারণ এটা অগ্নিপূজকদের অগ্নি পূজা করার সময়ের সাথে সাদৃশ্য পূর্ণ। এ কথাও বলা হয় যে, একাজ ইহুদিদের কাজের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। আর আমাদেরকে কাফেরদের সাথে সাদৃশ্য রাখতে নিষেধ করা হয়েছে।
৫. সাজদায় দুই কনুই বিছিয়ে দেওয়া: আল্লাহর রসূল ﷺ বলেন: اعْتَدِلُوا فِي السُّجُودِ وَلَا يَبْسُطُ أَحَدُكُمْ ذِرَاعَيْهِ انْبِسَاطَ الْكَلْبِ
“সাজদায় সামঞ্জস্য রক্ষা করো এবং তোমাদের মধ্যে কেউ যেন দুই হাত বিছিয়ে না দেয়, যেমন কুকুর বিছিয়ে দেয়।”২৩১
সুতরাং মুসল্লির জন্য উচিত হচ্ছে, দুই হাতের মাঝে ফাঁকা রাখা, হাতদ্বয়কে মাটি থেকে উপরে উঠিয়ে রাখা এবং প্রাণির সাথে সাদৃশ্য না রাখা।
৬. সলাতে বেশি বেশি অনর্থক কাজ করা: অনর্থক কাজে অন্তর ব্যস্ত থাকলে সলাতে উদ্দিষ্ট একাগ্রতা অর্জিত হয় না।
৭. কোমরে হাত রাখা: আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন: نَهَى أَنْ يُصَلِّيَ الرَّجُلُ مُخْتَصِرًا
"কোমরে হাত রেখে সলাত আদায় করতে লোকেদের নিষেধ করা হয়েছে।”২৩২
اختصار বা تخصر হলো মাজায় হাত রাখা। الخاصرة হলো নিতম্বের উপরে অংশ তথা মাজা বা কোমর। আয়িশাহ এর কারণ বলতে গিয়ে বলেন: ইহুদিরা এমনটি করে।২৩৩
৮. সলাতে কাপড় ঝুলিয়ে পরা এবং মুখ ঢেকে রাখা: আবু হুরায়রা বলেন:
نَهَى رَسُولُ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنِ السَّدْلِ فِي الصَّلَاةِ وَأَنْ يُغَطِّيَ الرَّجُلُ فَاهُ
“আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সলাতের সময় কাপড় উপর থেকে নিচের দিকে ঝুলিয়ে দিতে ও মুখ ঢেকে রাখতে নিষেধ করেছেন।”২৩৪
سدل হলো: কোনো মুসল্লি কর্তৃক একটি কাপড় তার দুই কাধের উপর ছড়িয়ে দেওয়া আর তার দুই প্রান্তকে না গুটানো। অথবা জমিন পর্যন্ত চলে গেল, না গুটানোর কারণে। ফলে এটা اسبال হয়ে যায়।
৯. ইমামের আগে সলাতের কার্যাবলী সম্পাদন করা: আল্লাহর রসূল বলেন:
أَلَا يَخْشَى - أَحَدُكُمْ إِذَا رَفَعَ رَأْسَهُ قبل الْإِمَامُ أَنْ يُحَوِّلَ اللَّهُ رَأْسَهُ رَأْسَ حِمَارٍ أَوْ يَجْعَلَ صُورَتَهُ صُورَةَ حِمَارٍ.
“সাবধান! তোমাদের কেউ যখন ইমামের পূর্বে মাথা উঠিয়ে ফেলে, তখন সে কি ভয় করে না যে, আল্লাহ তা'আলা তার মাথা গাধার মাথায় পরিণত করে দিবেন অথবা তার আকৃতিকে গাধার আকৃতি করে দেবেন?”২৩৫
১০. দুই হাতের আঙ্গুলগুলোকে একটার ফাঁকে অপরটি ঢুকানো (আঙ্গুল বিজড়িত করা): যে ব্যক্তি ওযু করে সলাতের জন্য মসজিদে আসে, তাকে تشبيك করতে রসূল নিষেধ করেছেন।২৩৬ সুতরাং সলাতের মধ্যে একাজ হতে বিরত থাকা আর বেশি প্রয়োজন। تشبيك হলো: হাতের আঙ্গুলগুলোর এক আঙ্গুলকে অপর আঙ্গুলের মাঝে প্রবেশ করানো। তবে সলাতের বাইরে تشبيك করা মাকরূহ নয় যদিও তা মাসজিদে হয়। যেমনটি রসূল যুলল ইয়াদাইন এর ঘটনায় করেছিলেন।
১১. চুল এবং কাপড় গুটানো: আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস বলেন:
أُمِرَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يَسْجُدَ عَلَى سَبْعَةِ أَعْظُمٍ، وَيَكُفَّ ثَوْبَهُ وَلَا شَعَرَهُ
“নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাত অঙ্গের সাহায্যে সাজদা করা এবং সলাতের মধ্যে চুল একত্র না করা এবং কাপড় না গুটাতে নির্দেশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন।”২৩৭
كف শব্দটা কখনো জমা করা অর্থে ব্যবহার হয়। তখন এর অর্থ হবে কাপড় এবং চুল জমা করা বা মিলানো মাকরূহ আবার কখনো নিষেধ হওয়া অর্থে ব্যবহার হয়। তখন এর অর্থ হবে সাজদাবস্থায় কাপড় ও চুল ঝুলে পড়াকে বাধা দেওয়া নিষেধ। এসকল কাজই হলো অনর্থক কাজ, যেগুলো সলাতের একাগ্রতাকে নষ্ট করে।
১২. খাবার উপস্থিত হওয়া অবস্থায় অথবা পায়খানা প্রস্রাবের বেগ চেপে সলাত আদায় করা। আল্লাহর রসূল বলেন:
لَا صَلَاةَ بِحَضْرَةِ الطَّعَامِ، وَلَا هُوَ يُدَافِعُهُ الْأَخْبَثَانِ
"খাবার হাজির হলে কোনো সলাত নেই এবং পায়খানা-প্রস্রাবের বেগ নিয়ে সলাত হবে না। ২৩৮ খাবার উপস্থিত হলে সলাত মাকরূহ হওয়ার কারণ হলো, খাবার সম্মুখে উপস্থিত হলে এবং তা গ্রহণের ক্ষমতা থাকলে মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি তা কামনা করে, আশা করে। তবে মুসল্লি যদি রোজাদার হয় অথবা খাবার খেয়ে তৃপ্ত হয়ে থাকে অথবা খাবার খুব গরমের কারণে খেতে সক্ষম না হয়, তাহলে সেই অবস্থায় সলাত পড়া মাকরূহ নয়।
الاخبثان : প্রস্রাব-পায়খানা। পায়খানা-প্রস্রাবের বেগ নিয়ে সলাত পড়তে নিষেধ করা হয়েছে। কারণ এ অবস্থায় মুসল্লির অন্তর বেগ নিয়ে ব্যস্ত হতে পারে এবং মন বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়, ফলে তা মাকরূহ। কারণ পায়খানা-প্রস্রাবের বেগ সলাতের একাগ্রতাকে বাধাগ্রস্থ করে। আবার কখনো কখনো পায়খানা প্রস্রাব আটকে রাখলে মানুষ ক্ষতির সম্মুখীনও হয়।
১৩. আকাশের দিকে তাকানো। আল্লাহর রসূল বলেন:
لَيَنتَهِيَنَّ أَقْوَامٌ يَرْفَعُونَ أَبْصَارَهُمْ إِلَى السَّمَاءِ فِي الصَّلَاةِ، أَوْ لَا تَرْجِعُ إِلَيْهِمْ
"লোকেদের উচিত তারা যেন সলাতের মধ্যে আকাশের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ না করে। তাদের দৃষ্টিশক্তি ছিনিয়ে নেওয়া হবে।”২৩৯

টিকাঃ
২২৯. ফকীহদের পরিভাষায় মাকরুহ হলো: যে কাজ করতে কঠোর ভাবে নিষেধ করা হয়নি। মাকরুহ এর হুকুম: পরিত্যাগ বাধ্যকতা ছাড়া এই কাজ প্রয়োজনে করা জায়েয।
২৩০. সহীহুল বুখারী, হা. ৭৫১।
২৩১. সহীহুল বুখারী, হা. ৮২২।
২৩২. সহীহুল বুখারী, হা. ১২২০।
২৩৩. সহীহুল বুখারী, হা. ৩৪৫৮।
২৩৪. সুনান আবু দাউদ, হা. ৬৪৩, তিরমিযী, হা. ৩৭৯।
২৩৫. সহীহুল বুখারী, হা. ৬৯১, সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ৪২৭।
২৩৬. মুসতাদরাক হাকীম: ১/২০৬।
২৩৭. সহীহুল বুখারী, হা. ৮১৫, সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ৪৯০।
২৩৮. সহীহ মুসলিম, হা. ১১৩৩, ফুআ. ৫৬০।
২৩৯. সহীহ মুসলিম, হা. ৮৫৩, ফুআ, ৪২৯।

সলাতের মধ্যে নিম্নের কাজগুলো করা মাকরূহ:
১. শুধুমাত্র প্রথম দুই রাকআতে সূরা ফাতিহা পাঠ করা: এটা সলাতে নাবী এর সুন্নাত ও দেখানো পথের বিপরীত।
২. সূরা ফাতিহা দুবার পাঠ করা: এটাও নাবী এর সুন্নাতের বিপরীত। তবে কেউ যদি প্রয়োজনে পড়ে, তাহলে তা বৈধ আছে। যেমন কেউ সূরা পাঠ করার সময় অন্তরের উপস্থিতি এবং একগ্রতা হারিয়ে ফেলল। ফলে সে তার অন্তরকে হাযির করার জন্য সূরা ফাতিহা আবার পড়ল, এতে কোনো সমস্যা নেই। তবে শর্ত হলো দুই বার পাঠ করা যেন তাকে কুমন্ত্রনার দিকে টেনে নিয়ে না যায়।
৩. বিনা প্রয়োজনে সলাতে সামান্য এদিক ওদিক তাকানো মাকরূহ: আল্লাহর রসূল কে সলাতে দৃষ্টিপাত করা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন:
هُوَ اخْتِلاسُ يَخْتَلِسُهُ الشَّيْطَانُ مِنْ صَلَاةِ العَبْدِ
"এটা এক ধরনের ছিনতাই। যার মাধ্যমে শয়তান বান্দার সলাত হতে অংশবিশেষ ছিনিয়ে নেয়। ২৩০ الاختلاس : চুরি করা, ছিনতাই করা।
তবে দৃষ্টিপাত করা যদি প্রয়োজন হয় তাহলে তাতে কোনো সমস্যা নেই। যেমন নামাযে কারো কুমন্ত্রনা আসার কারণে বামদিকে তিনবার থুথু ফেলার প্রয়োজন হওয়া। এই দৃষ্টিপাত হলো প্রয়োজনের দৃষ্টিপাত। এর ব্যাপরে নাবী ﷺ এর নির্দেশ রয়েছে। অনুরূপভাবে কোনো ব্যক্তি সলাত অবস্থায় তার সন্তানের ক্ষতির আশংকা করল, ফলে তার দৃষ্টিপাত হয়ে গেল, এতে তার কোনো সমস্যা নেই।
এগুলো হলো সামান্য দৃষ্টিপাতের ক্ষেত্রে। পক্ষান্তরে, যদি কোনো ব্যক্তি পুরোপুরি দৃষ্টিপাত করে (এদিক ওদিক তাকায়) অথবা কিবলাকে পেছনে করে ফেলে তাহলে তার সলাত বাতিল হয়ে যাবে, যদি সে এটা প্রচণ্ড ভয় বা এ জাতীয় কোনো ওজরের কারণে না করে থাকে।
৪. সলাতে দুচোখ বন্ধ করে রাখা: কারণ এটা অগ্নিপূজকদের অগ্নি পূজা করার সময়ের সাথে সাদৃশ্য পূর্ণ। এ কথাও বলা হয় যে, একাজ ইহুদিদের কাজের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। আর আমাদেরকে কাফেরদের সাথে সাদৃশ্য রাখতে নিষেধ করা হয়েছে।
৫. সাজদায় দুই কনুই বিছিয়ে দেওয়া: আল্লাহর রসূল ﷺ বলেন: اعْتَدِلُوا فِي السُّجُودِ وَلَا يَبْسُطُ أَحَدُكُمْ ذِرَاعَيْهِ انْبِسَاطَ الْكَلْبِ
“সাজদায় সামঞ্জস্য রক্ষা করো এবং তোমাদের মধ্যে কেউ যেন দুই হাত বিছিয়ে না দেয়, যেমন কুকুর বিছিয়ে দেয়।”২৩১
সুতরাং মুসল্লির জন্য উচিত হচ্ছে, দুই হাতের মাঝে ফাঁকা রাখা, হাতদ্বয়কে মাটি থেকে উপরে উঠিয়ে রাখা এবং প্রাণির সাথে সাদৃশ্য না রাখা।
৬. সলাতে বেশি বেশি অনর্থক কাজ করা: অনর্থক কাজে অন্তর ব্যস্ত থাকলে সলাতে উদ্দিষ্ট একাগ্রতা অর্জিত হয় না।
৭. কোমরে হাত রাখা: আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন: نَهَى أَنْ يُصَلِّيَ الرَّجُلُ مُخْتَصِرًا
"কোমরে হাত রেখে সলাত আদায় করতে লোকেদের নিষেধ করা হয়েছে।”২৩২
اختصار বা تخصر হলো মাজায় হাত রাখা। الخاصرة হলো নিতম্বের উপরে অংশ তথা মাজা বা কোমর। আয়িশাহ এর কারণ বলতে গিয়ে বলেন: ইহুদিরা এমনটি করে।২৩৩
৮. সলাতে কাপড় ঝুলিয়ে পরা এবং মুখ ঢেকে রাখা: আবু হুরায়রা বলেন:
نَهَى رَسُولُ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنِ السَّدْلِ فِي الصَّلَاةِ وَأَنْ يُغَطِّيَ الرَّجُلُ فَاهُ
“আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সলাতের সময় কাপড় উপর থেকে নিচের দিকে ঝুলিয়ে দিতে ও মুখ ঢেকে রাখতে নিষেধ করেছেন।”২৩৪
سدل হলো: কোনো মুসল্লি কর্তৃক একটি কাপড় তার দুই কাধের উপর ছড়িয়ে দেওয়া আর তার দুই প্রান্তকে না গুটানো। অথবা জমিন পর্যন্ত চলে গেল, না গুটানোর কারণে। ফলে এটা اسبال হয়ে যায়।
৯. ইমামের আগে সলাতের কার্যাবলী সম্পাদন করা: আল্লাহর রসূল বলেন:
أَلَا يَخْشَى - أَحَدُكُمْ إِذَا رَفَعَ رَأْسَهُ قبل الْإِمَامُ أَنْ يُحَوِّلَ اللَّهُ رَأْسَهُ رَأْسَ حِمَارٍ أَوْ يَجْعَلَ صُورَتَهُ صُورَةَ حِمَارٍ.
“সাবধান! তোমাদের কেউ যখন ইমামের পূর্বে মাথা উঠিয়ে ফেলে, তখন সে কি ভয় করে না যে, আল্লাহ তা'আলা তার মাথা গাধার মাথায় পরিণত করে দিবেন অথবা তার আকৃতিকে গাধার আকৃতি করে দেবেন?”২৩৫
১০. দুই হাতের আঙ্গুলগুলোকে একটার ফাঁকে অপরটি ঢুকানো (আঙ্গুল বিজড়িত করা): যে ব্যক্তি ওযু করে সলাতের জন্য মসজিদে আসে, তাকে تشبيك করতে রসূল নিষেধ করেছেন।২৩৬ সুতরাং সলাতের মধ্যে একাজ হতে বিরত থাকা আর বেশি প্রয়োজন। تشبيك হলো: হাতের আঙ্গুলগুলোর এক আঙ্গুলকে অপর আঙ্গুলের মাঝে প্রবেশ করানো। তবে সলাতের বাইরে تشبيك করা মাকরূহ নয় যদিও তা মাসজিদে হয়। যেমনটি রসূল যুলল ইয়াদাইন এর ঘটনায় করেছিলেন।
১১. চুল এবং কাপড় গুটানো: আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস বলেন:
أُمِرَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يَسْجُدَ عَلَى سَبْعَةِ أَعْظُمٍ، وَيَكُفَّ ثَوْبَهُ وَلَا شَعَرَهُ
“নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাত অঙ্গের সাহায্যে সাজদা করা এবং সলাতের মধ্যে চুল একত্র না করা এবং কাপড় না গুটাতে নির্দেশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন।”২৩৭
كف শব্দটা কখনো জমা করা অর্থে ব্যবহার হয়। তখন এর অর্থ হবে কাপড় এবং চুল জমা করা বা মিলানো মাকরূহ আবার কখনো নিষেধ হওয়া অর্থে ব্যবহার হয়। তখন এর অর্থ হবে সাজদাবস্থায় কাপড় ও চুল ঝুলে পড়াকে বাধা দেওয়া নিষেধ। এসকল কাজই হলো অনর্থক কাজ, যেগুলো সলাতের একাগ্রতাকে নষ্ট করে।
১২. খাবার উপস্থিত হওয়া অবস্থায় অথবা পায়খানা প্রস্রাবের বেগ চেপে সলাত আদায় করা। আল্লাহর রসূল বলেন:
لَا صَلَاةَ بِحَضْرَةِ الطَّعَامِ، وَلَا هُوَ يُدَافِعُهُ الْأَخْبَثَانِ
"খাবার হাজির হলে কোনো সলাত নেই এবং পায়খানা-প্রস্রাবের বেগ নিয়ে সলাত হবে না। ২৩৮ খাবার উপস্থিত হলে সলাত মাকরূহ হওয়ার কারণ হলো, খাবার সম্মুখে উপস্থিত হলে এবং তা গ্রহণের ক্ষমতা থাকলে মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি তা কামনা করে, আশা করে। তবে মুসল্লি যদি রোজাদার হয় অথবা খাবার খেয়ে তৃপ্ত হয়ে থাকে অথবা খাবার খুব গরমের কারণে খেতে সক্ষম না হয়, তাহলে সেই অবস্থায় সলাত পড়া মাকরূহ নয়।
الاخبثان : প্রস্রাব-পায়খানা। পায়খানা-প্রস্রাবের বেগ নিয়ে সলাত পড়তে নিষেধ করা হয়েছে। কারণ এ অবস্থায় মুসল্লির অন্তর বেগ নিয়ে ব্যস্ত হতে পারে এবং মন বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়, ফলে তা মাকরূহ। কারণ পায়খানা-প্রস্রাবের বেগ সলাতের একাগ্রতাকে বাধাগ্রস্থ করে। আবার কখনো কখনো পায়খানা প্রস্রাব আটকে রাখলে মানুষ ক্ষতির সম্মুখীনও হয়।
১৩. আকাশের দিকে তাকানো। আল্লাহর রসূল বলেন:
لَيَنتَهِيَنَّ أَقْوَامٌ يَرْفَعُونَ أَبْصَارَهُمْ إِلَى السَّمَاءِ فِي الصَّلَاةِ، أَوْ لَا تَرْجِعُ إِلَيْهِمْ
"লোকেদের উচিত তারা যেন সলাতের মধ্যে আকাশের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ না করে। তাদের দৃষ্টিশক্তি ছিনিয়ে নেওয়া হবে।”২৩৯

টিকাঃ
২২৯. ফকীহদের পরিভাষায় মাকরুহ হলো: যে কাজ করতে কঠোর ভাবে নিষেধ করা হয়নি। মাকরুহ এর হুকুম: পরিত্যাগ বাধ্যকতা ছাড়া এই কাজ প্রয়োজনে করা জায়েয।
২৩০. সহীহুল বুখারী, হা. ৭৫১।
২৩১. সহীহুল বুখারী, হা. ৮২২।
২৩২. সহীহুল বুখারী, হা. ১২২০।
২৩৩. সহীহুল বুখারী, হা. ৩৪৫৮।
২৩৪. সুনান আবু দাউদ, হা. ৬৪৩, তিরমিযী, হা. ৩৭৯।
২৩৫. সহীহুল বুখারী, হা. ৬৯১, সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ৪২৭।
২৩৬. মুসতাদরাক হাকীম: ১/২০৬।
২৩৭. সহীহুল বুখারী, হা. ৮১৫, সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ৪৯০।
২৩৮. সহীহ মুসলিম, হা. ১১৩৩, ফুআ. ৫৬০।
২৩৯. সহীহ মুসলিম, হা. ৮৫৩, ফুআ, ৪২৯।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00