📄 সলাতের শর্তসমূহ
সলাতের শর্ত নয়টি:
১. মুসলিম হওয়া: কোনো কাফেরের সলাত সহীহ হবে না। কেননা তার আমল বাতিল বলে গণ্য।
২. বোধশক্তি সম্পন্ন হওয়া: পাগলের সলাত সহীহ হবে না। কেননা সে শরীয়তের দ্বায়িত্ব প্রাপ্ত নয়।
৩. প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া। প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত শিশুদের উপর সালাত ওয়াজিব নয়। তবে সাত বছরে তাদেরকে সালাতের আদেশ করা হবে এবং দশ বছর বয়সে প্রহার করা হবে। রাসূল বলেন:
"তোমাদের সন্তানদেরকে সালাতের জন্য নির্দেশ দাও।"
৪. সাধ্যমত ছোট ও বড় নাপাকী থেকে পবিত্রতা অর্জন করা: ইবনু উমার হতে বর্ণিত হাদীসে এসেছে আল্লাহ্র রসূল বলেছেন:
"পবিত্রতা ব্যতীত সালাত কবুল হয় না।"
৫. সালাতের ওয়াক্ত হওয়া: আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"নিশ্চয়ই সালাত মুমিনদের উপর নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্ধারিত।" [সূরা নিসা: ১০৩]
জিবরীল আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসে আল্লাহ্র রসূল এর পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের ইমামতি করলেন। অতঃপর বললেন:
"এই দুই সময়ের মাঝেই সময়।"
সুতরাং ওয়াক্ত হওয়া ওয়াজিব না হলে এবং সময় অতিক্রম হয়ে গেলে সালাত শুদ্ধ হবে না।
৬. সাধ্যমতো কোনো জিনিস দ্বারা সতর ঢেকে রাখা, যাতে চামড়া না দেখা যায়: আল্লাহ তা'আলা এই মর্মে বলেন:
“হে আদম সন্তান! প্রত্যেক সালাতের সময় সুন্দর পোশাক পরিচ্ছদ গ্রহণ করো।” [সূরা আরাফ: ৩১] আল্লাহ্র রসূল বলেন:
"কোনো প্রাপ্তবয়স্ক মহিলা ওড়না ছাড়া সালাত আদায় করলে আল্লাহ তার সালাত কবুল করবেন না।"
একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ মানুষের সতর হলো নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত। আল্লাহর রসূল এই প্রসঙ্গে জাবিরকে বলেন: إِذَا صَلَّيْتَ فِي ثَوْبٍ وَاحِدٌ، فَإِنْ كَانَ وَاسِعًا فَالْتَحِفْ بِهِ، وَإِنْ كَانَ ضَيِّقًا فَاتَّزِرْ بِهِ
“যখন এক কাপড়ে সলাত পড়বে তখন কাপড় যদি বড়ো হয়, তাহলে শরীরে জড়িয়ে পরবে। আর যদি ছোটো হয় তাহলে লুঙ্গি হিসেবে ব্যবহার করবে।” ১৯৭
তবে উত্তম হলো কাঁধে কোনো কাপড় রাখা। কারণ যে কাপড়ের কিছু অংশ কাঁধে থাকে না, তা পরিধান করে সলাত আদায় করতে আল্লাহর রসূল নিষেধ করেছেন। হাত এবং মুখ ছাড়া পুরো শরীর মহিলার জন্য সতর। তবে যদি সে কোনো অপরিচিত ব্যক্তি সামনে সলাত পড়ে, তাহলে পুরো শরীর (হাত এবং মুখসহ) ঢেকে রাখবে। রসূল বলেছেন: المرأة عورة “মহিলারা আবরণীয় বস্তু। "১৯৮
لَا يَقْبَلُ اللَّهُ صَلَاةَ حَائِضِ إِلَّا بِخمار
"মহান আল্লাহ প্রাপ্তবয়স্কা নারীর সলাত ওড়না পরিধান ব্যতীত কবুল করেন না।”১৯৯
৭. সাধ্যমত সলাতের স্থান, কাপড় এবং শরীর থেকে নাপাকি দূর করা: আল্লাহ তা'আলা বলেন: وَثِيَابَكَ فَطَهِّرْ “আর আপনার পরিচ্ছদ পবিত্র করুন।" [সূরা মুদ্দাসীর: ৪]
আল্লাহর রসূল বলেছেন: تَنَزَّهُوا مِنَ الْبَوْلِ فَإِنَّ عَامَّةَ عَذَابِ الْقَبْرِ مِنْهُ “প্রস্রাবের ছিটা থেকে বেঁচে থাকো। কেনান অধিকাংশ কবরের আযাব এ থেকেই হয়।”২০০
অন্য হাদীসে আল্লাহর রসূল আসমা কে কাপড়ে লেগে থাকা রক্ত ধৌত করার পদ্ধতি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন: فَلْتَحْتُهُ ، ثُمَّ تَقْرُصُهُ بِالْمَاءِ، ثُمَّ تَنْضَحُهُ، ثُمَّ تُصَلِّى فِيهِ “তা ঘষবে, তারপর পানি দিয়ে রগড়াবে এবং পানির ছিটা দিকে। অতঃপর সেই কাপড়ে সলাত আদায় করবে।”২০১
অপর হাদীসে আল্লাহর রসূল তার সাহাবীদেরকে মসজিদের প্রস্রাব করে দেওয়া আরব বেদুঈনের প্রস্রাবের নাপাকি দূর করার জন্য বলেন:
أريقوا عَلَى بَوْلِهِ سَجْلًا مِنْ مَاءٍ "ওর প্রস্রাবের উপর এক বালতি পানি ঢেলে দাও।” ২০২
৮. সাধ্যমত কিবলামুখী হওয়া: এই প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন:
فَوَلِ وَجْهَكَ شَطْرَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ “অতএব আপনি মসজিদুল হারামের দিকে চেহারা ফিরিয়ে নিন।" [সূরা বাক্বারাহ : ১৪৪] আল্লাহর রসূল বলেছেন:
إِذَا قُمْتَ إِلَى الصَّلَاةِ فَأَسْبِغِ الْوُضُوءَ، ثُمَّ اسْتَقْبِلِ القِبْلَةَ "যখন তুমি সলাতে দাঁড়ানোর ইচ্ছে করবে, তখন প্রথমে তুমি যথানিয়মে ওযু করবে। তারপর কিবলামুখী দাঁড়াবে।” ২০৩
৯. নিয়ত করা: কোনো অবস্থাতেই নিয়ত ছাড়া চলবে না। আল্লাহর রসূল বলেছেন: إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنَّيَاتِ “প্রত্যেক কাজ নিয়ত অনুযায়ী হয়ে থাকে।”২০৪ নিয়তের স্থান হলো অন্তর। আর এর মূল হলো কোনো জিনিসের উপর দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হওয়া। মুখে নিয়ত উচ্চারণ করা শরীয়ত সম্মত নয়। কেননা নাবী মুখে নিয়ত উচ্চারণ করেননি এবং তার সাহাবীদের থেকে এমন কিছু বর্ণিত হয়নি।
টিকাঃ
১৯২. যে সকল বিষয়ের উপর সলাতের শুদ্ধতা নির্ভর করে।
১৯৩. ছোট নাপাকী এবং বড় নাপাকী।
১৯৪. সহীহ মুসলিম, হা. ৪২৩, কুফা. ২১৪।
১৯৫. তিরমিযী, হা. ৩৯৩, নাসায়ীঃ ১/৯১।
১৯৬. সুনান আবু দাউদ, হা. ৬৪১, তিরমিযী, হা. ৩৭৬, ইবনু মাজাহ, হা. ৩৫১।
১৯৭. সহীহুল বুখারী, হা. ৩৬১, সহীহ মুসলিম, হা. ৩০১০।
১৯৮. তিরমিযী, হা. ৩৯৭।
১৯৯. সুনান নাসাঈ, হা, ৬৪১।
২০০. দারাকুলী: ১/৯৭ (৪৫৩)।
২০১. সহীহুল বুখারী, হা. ২২৭, সহীহ মুসলিম, হা. ২৯১।
২০২. সহীহুল বুখারী, হা. ২২০।
২০৩. সহীহুল বুখারী, হা. ৬২৫১, সহীহ মুসলিম, হা. ৩৯৭।
২০৪. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ১; সহীহ মুসলিম, হা. ১৯০৭।
📄 সলাতের রুকনসমূহ
الأركان বা রুকনসমূহ: যে সমস্ত জিনিসের সমন্বয়ে ইবাদত গঠিত হয় এবং যেগুলো ব্যতীত ইবাদাত বিশুদ্ধ হয় না, সেগুলোর সমষ্টিকে আরকান বলা হয়।
আরকান এবং শর্তের মাঝে পার্থক্য: শর্ত ইবাদতের আগে এসে ইবাদতের সাথে চলমান থাকে। আর আরকান ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত কথা এবং কাজগুলোকে বুঝায়।
সলাতের রুকন হলো মোট ১৪ টি। এই রুকনগুলো ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় বা অজ্ঞতাবশত যদি কারো ছুটে যায় তাহলে সলাত বাতিল হয়ে যাবে।
১. কিয়াম করা (দাঁড়ানো): দাঁড়িয়ে থাকতে সক্ষম এমন ব্যক্তির জন্য ফরয সলাতে দাঁড়িয়ে সলাত পড়া একটি রুকন। আল্লাহ তা'আলা বলেন: ﴾وَقُومُوا لِلَّهِ قَانِتِينَ﴿ "আল্লাহর উদ্দেশ্যে তোমরা বিনীতভাবে দণ্ডায়মান হও।” [সূরা বাক্বারাহ: ২৩৮]
আল্লাহর রসূল ইমরান বিন হুসাইন কে বলেন: صَلِّ قَائِمًا، فَإِنْ لَمْ تَسْتَطِعْ فَقَاعِدًا، فَإِنْ لَمْ تَسْتَطِعْ فَعَلَى جَنْبِ . "দাঁড়িয়ে সলাত আদায় করা। তা সক্ষম না হলে বসে; যদি তাতেও সক্ষম না হও, তাহলে শুয়ে।”২০৫
যদি ওজরের কারণে কেউ ফরয সলাতে কিয়াম ছেড়ে দেয়, (যেমন অসুস্থতা বা এ জাতীয় কোনো সমস্যা) তাহলে তার ওজর গ্রহণযোগ্য হবে। এমতাবস্থায় সে সাধ্যানুপাতে বসে অথবা শুয়ে সলাত আদায় করবে।
তবে নফল সলাতে কিয়াম করা সুন্নাত, রুকন নয়। বসে সলাত আদায়কারীর সলাতের চেয়ে দাঁড়িয়ে সলাত আদায়কারীর সলাত বেশি ফযীলতপূর্ণ। আল্লাহর রসূল বলেন: صَلَاةَ الْقَاعِدِ عَلَى النِّصْفِ مِنْ صَلَاةِ الْقَائِمِ "কেউ বসে সলাত আদায় করলে তা দাঁড়িয়ে সলাতের অর্ধেক সমান হয়। ۲۰۶
২. সলাতের শুরুতে তাকবীরে তাহরীমা দেওয়া: অর্থাৎ সলাতের প্রারম্ভে 'আল্লাহু আকবার' বলা। তাকবীরে তাহরীমা ছাড়া সলাত হবে না। আল্লাহর রসূল সলাত ভুলকারী ব্যক্তিকে বলেন: إِذَا قُمْتَ إِلَى الصَّلَاةِ فَكَبِّرْ “যখন তুমি সলাতে দাঁড়াবে, তখন তাকবীর বলো।”২০৭
অপর হাদীসে তিনি বলেন: وَتَحْرِيمُهَا التَّكْبِيرُ، وَتَحْلِيلُهَا التَّسْلِيمُ "সলাত তাকবীর দিয়ে শুরু হয় আর সালাম ফিরানো দ্বারা শেষ হয়। ২০৮ সুতরাং তাকবীরে তাহরীমা ব্যতীত সলাত হবে না।
৩. প্রত্যেক রাকআতে সূরা ফাতিহা পাঠ করা: আল্লাহর রসূল বলেছেন : لَا صَلَاةَ لِمَنْ لَمْ يَقْرَأْ بِفَاتِحَةِ الكِتَابِ “যে ব্যক্তি সলাতে সূরা ফাতিহা পড়ল না তার সলাত হলো না।”২০৯
এই বিধান থেকে সলাতে মাসবুক ব্যক্তি (যার রাকআত ছুটে যায়) কে বাদ রাখা হয়েছে। যদি মাসবুক ব্যক্তি ইমামকে রুকু অবস্থায় অথবা কিয়ামের এমন অবস্থায় পায়, যখন তার জন্য সূরা ফাতিহা পাঠ করা সম্ভব নয়, তাহলে তাকে সূরা ফাতিহা পাঠ করতে হবে না। অনুরূপভাবে জেহরী সলাতে (যে সলাতগুলোতে জোরে তিলাওয়াত করা হয়) মুক্তাদীকে সূরা ফাতিহা পাঠ করা হতে বাদ রাখা হয়েছে। তবে মুক্তাদী যদি ইমামের চুপ থাকার সময়টাতে সূরা ফাতিহা পড়ে ফেলতে পারে, তাহলে সেটা তার জন্য উত্তম। সতর্কতা গ্রহণ করে। [উপর্যুক্ত হাদীসের আলোকে প্রত্যেক রাকআতে সূরা ফাতিহাহ পাঠ করা আবশ্যক- এই মতের পক্ষেই আলেমদের একদল।-সম্পাদক]
৪. প্রত্যেক রাকআতে রুকু করা: আল্লাহ তা'আলা বলেন: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ارْكَعُوا وَاسْجُدُوا “হে মু'মিনগণ! তোমরা রুকু করো, সাজদাহ করো।” [সুরা হাজ্জ: ৭৭] আল্লাহর রসূল সলাতে ভুলকারীকে বলেন: ثُمَّ ارْكَعْ حَتَّى تَطْمَئِنَّ رَاكِعًا "তারপর তুমি ধীরস্থিরভাবে রুকু করবে।”২১০
৫-৬. রুকু থেকে ওঠা এবং সোজা হয়ে দাঁড়ানো: আল্লাহর রসূল সলাতে ভুলকারীকে বলেন: ارْكَعْ حَتَّى تَطْمَئِنَّ رَاكِعًا، ثُمَّ ارْفَعْ حَتَّى تَعْتَدِلَ قَائِمًا. "তারপর তুমি ধীরস্থিরভাবে রুকু করবে। এরপর মাথা তুলে ঠিক সোজা হয়ে দাঁড়াবে।”২১১
৭. সাজদা করা: আল্লাহ তা'আলা বলেন: وَاسْجُدُوا "সাজদাহ করো।" [সূরা হাজ্জ : ৭৭] আল্লাহর রসূল সলাতে ভুলকারীকে বলেন: ثُمَّ اسْجُدْ حَتَّى تَطْمَئِنَّ سَاجِدًا "তারপর ধীরস্থিরভাবে সাজদাহ করবে।”২১২
প্রত্যেক রাকআতে সাতটি অঙ্গের উপরে দুটি করে সাজদা হবে। যেমনটি ইবনু আব্বাসের হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহর রসূল বলেছেন: أُمِرْتُ أَنْ أَسْجُدَ عَلَى سَبْعَةِ أَعْظُم عَلَى الْجَبْهَةِ، وَأَشَارَ بِيَدِهِ عَلَى أَنْفِهِ وَاليَدَيْنِ وَالرُّكْبَتَيْنِ، وَأَطْرَافِ القَدَمَيْنِ "আমাকে সাত অঙ্গে সাজদাহ্ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কপাল- (এ বলে তিনি হাত দিয়ে নাকের দিকে ইশারা করলেন) দুই হাত; দুই হাঁটু এবং দুই পায়ের প্রান্তদেশ (পায়ের আঙ্গুলসমূহ)।”২১৩
৮-৯. সাজদা থেকে ওঠা এবং দুই সাজদার মাঝে বসা: রসূল সলাতে ভুলকারীকে বলেন: ثُمَّ ارْفَعْ حَتَّى تَطْمَئِنَّ جَالِسًا. "অতঃপর মাথা তুলে ধীরস্থিরভাবে বসবে।”২১৪
১০. সকল রুকন পালনের সময় ধীরস্থিরতা অবলম্বন করা: অর্থাৎ সলাতে স্থিরতা অবলম্বন করা। এর পরিমাণ হবে প্রত্যেকটা রুকনে যা আবশ্যকীয় আছে তা বলার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ সময়। কারণ আল্লাহর রসূল সলাতে ভুলকারীকে সকল রুকনে স্থিরতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং সলাতে স্থিরতা না থাকার কারণে পুনরায় সলাত পড়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
১১. শেষ তাশাহহুদ: আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ বলেন: كُنَّا نَقُولُ قَبْلَ أَنْ يُفْرَضَ عليها التَّشَهُدُ : السَّلامُ عَلَى اللهِ مِنْ عِبَادِهِ، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: " لَا تَقُولُوا السَّلامُ عَلَى اللَّهُ، وَلَكِنْ قُولُوا: التَّحِيَّاتُ اللَّه "আমাদের উপর তাশাহহুদ ফরয হওয়ার আগে আমরা বলতাম : السَّلَامُ عَلَى اللَّهِ مِنْ عِبَادِهِ আল্লাহর উপর তাঁর বান্দাদের পক্ষ থেকে সালাম বর্ষিত হোক। অতঃপর নাবী বললেন: তোমরা السَّلَامُ عَلَى اللَّهِ বলো না, বরং বলো, التَّحِيَّاتُ لِلهِ।”২১৫ সুতরাং ইবনু মাসউদ এর কথা قَبْلَ أَنْ يُفْرَضَ )ফরয হওয়ার পূর্বে) প্রমাণ করে যে, তাশাহহুদ ফরয।
১২. শেষ তাশাহহুদের জন্য বসা: রসূল শেষ তাশাহহুদে বসেছেন এবং তিনি এতে অবিচল ছিলেন। আর তিনি বলেছেন: صَلُّوا كَمَا رَأَيْتُمُونِي أُصَلِّي “তোমরা আমাকে যেভাবে সলাত আদায় করতে দেখেছ, সেভাবে সলাত আদায় করবে।”২১৬
১৩. সালাম ফেরানো: আল্লাহর রসূল বলেছেন: وَتَحْلِيلُهَا التَّسْلِيمُ "আর সালামের দ্বারা (পার্থিব সকল কাজ) হালাল হয়।”২১৭ এ ছাড়াও তিনি ডান এবং বাম দিকে السَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللَّهِ বলতেন।
১৪. আরকানগুলো ধারাবাহিকভাবে আদায় করা: কারণ নাবী এগুলোকে ধারাবাহিকভাবে আদায় করতেন এবং তিনি বলেছেন: صَلُّوا كَمَا رَأَيْتُمُونِي أُصَلِّي “তোমরা আমাকে যেভাবে সলাত আদায় করতে দেখেছো সেভাবে সলাত আদায় করবে।" এ ছাড়াও তিনি সলাতে ভুলকারীকে শিক্ষা দিতে গিয়ে ثم শব্দ বলেছেন, যেটা ধারাবাহিকতার ব্যাপারে প্রমাণ করে।
টিকাঃ
২০৫. সহীহুল বুখারী, হা. ১১১৭।
২০৬. সহীহ মুসলিম, হা. ১৬০০, ফুআ, ৭৩৫; সুনান নাসাঈ, হা. ১৬৫৯।
২০৭. সহীহুল বুখারী, হা. ৭৯৩, সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ৩৯৭।
২০৮. সুনান আবু দাউদ, হা. ৬১, ইবনু মাজাহ, হা. ২৭৫, তিরমিযী, হা. ৩।
২০৯. সহীহুল বুখারী, হা. ৭৫৬, সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ, ৩৯৮।
২১০. সহীহুল বুখারী, হা. ৬২৫১, সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ৩৯৭।
২১১. সহীহুল বুখারী, হা. ৬২৫১।
২১২. সহীহুল বুখারী, হা. ৬২৫১।
২১৩. সহীহুল বুখারী, হা. ৮০৯, সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ৪৯০।
২১৪. সহীহুল বুখারী, হা. ৬২৫১।
২১৫. সুনান নাসাঈ ১/২৪০।
২১৬. সহীহুল বুখারী, হা. ৬৩১।
২১৭. আবু দাউদ: ৬১, তিরমিযী, হা. ৩, ইবন মাযাহ: ২৫৫।
📄 সলাতের ওয়াজিবসমূহ
সলাতের মোট ওয়াজিব আটটি। ইচ্ছাকৃতভাবে কেউ ওয়াজিব ছেড়ে দিলে তার সলাত বাতিল হয়ে যাবে। আর যদি কেউ ভুলে যায় অথবা এই ব্যাপারে অজ্ঞ হয়, তাহলে তার সলাত অপরিপূর্ণ হবে। যদি সলাতে ভুলবশত কোনো ওয়াজিব ছুটে যায় তাহলে সাহু সাজদা দেওয়া আবশ্যক।
ওয়াজিব এবং আরকানের মাঝে পার্থক্য: যদি কেউ রুকন ভুলে যায়, তাহলে সে রুকন আদায় না করা পর্যন্ত তার সলাত হবে না। আর যদি কেউ ওয়াজিব ভুলে যায় তাহলে সাহু সাজদা দিলে তা আদায় হয়ে যাবে। সুতরাং তার আরকান ওয়াজিবের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নিম্নে ওয়াজিবের আলোচনা প্রদত্ত হলো:
১. তাকবীরে তাহরীমা ব্যতীত সকল তাকবীর: এই তাকবীর গুলোকে تكبير الانتقال বা এক পর্যায়ে স্থানান্তরের তাকবীর বলা হয়। ইবনু মাসউদ বলেন:
رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُكَبِّرُ فِي كُلِّ رَفْعٍ وَخَفْضٍ، وَقِيَامٍ وَقُعُودٍ. "আমি (সলাতরত অবস্থায়) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রত্যেকবার ওঠা, নীচু হওয়া, দাঁড়ানো ও বসার সময় 'আল্লাহু আকবার' বলতে দেখেছি।”২১৮ আল্লাহর রসূল ﷺ মৃত্যু অবধি এই কাজে অবিচল ছিলেন। আর তিনি বলেছেন: صَلُّوا كَمَا رَأَيْتُمُونِي أُصَلِّي. "তোমরা আমাকে যেভাবে সলাত আদায় করতে দেখেছ সেভাবে সলাত আদায় করবে।"
২. ইমাম এবং একক ব্যক্তির জন্য سَمِعَ اللهُ لِمَنْ حَمِدَهُ বলা: আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু এর হাদীসে এসেছে। তিনি বলেছেন, كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُكَبِّرُ حِيْنَ يَقُوْمُ إِلَى الصَّلَاةِ ثُمَّ يُكَبِّرُ حِيْنَ يَرْكَعُ ثُمَّ يَقُوْلُ: sَمِعَ اللَّهُ لَمِنْ حَمِدَهُ حِينَ يَرْفَعُ صُلْبَهُ مِنَ الرَّكْعَةِ وَهُوَ قَائِمٌ رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْدُ. "আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন সলাতে দাঁড়াতেন 'আল্লাহু আকবার' বলে সলাত শুরু করতেন। তিনি রুকু'তে যাওয়ার সময় তাকবীর বলে যেতেন। তিনি রুকু থেকে পিঠ সোজা করে দাঁড়ানোর সময় سَمِعَ اللهُ لِمَنْ حَمِدَهُ (যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রশংসা করেন আল্লাহ তার কথা শুনেন) বলতেন। অতঃপর দাঁড়ানো অবস্থায় رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْدُ (হে আল্লাহ! তোমার জন্য সকল প্রশংসা) বলতেন।”২১৯
৩. মুজতাদী رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْدُ বলা: সুন্নাত হলো ইমাম এবং একক ব্যক্তি سَمِعَ اللهُ لِمَنْ حَمِدَهُ এবং رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْدُ কে একসাথে পড়বে। যেমনটি বর্ণিত হয়েছে পূর্বের আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু এর হাদীসে। আবু মুসা রাদিয়াল্লাহু আনহু এর হাদীসে এসেছে, وَإِذَا قَالَ: سَمِعَ اللهُ لِمَنْ حَمِدَهُ، فَقُولُوا: رَبَّنَا لَكَ الْحَمْدُ “যখন سَمِعَ اللهُ لِمَنْ حَمِدَهُ বলতেন, অতঃপর رَبَّنَا لَكَ الْحَمْدُ বলতেন।” ২২০
৪. প্রত্যেক রুকুতে একবার سُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيمِ বলা।
৫. সাজদায় একবার سُبْحَانَ رَبِّيَ الأَعْلَى বলা। হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহু এর হাদীসে এসেছে:
النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، يَقُولُ فِي رُكُوعِهِ: «سُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيمِ وَفِي سُجُودِهِ: «سُبْحَانَ رَبِّيَ الْأَعْلَى» "নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রুকূ'তে سُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيمِ এবং সাজদায় سُبْحَانَ رَبِّيَ الأعلى বলতেন। "২২১ রুকু এবং সাজদায় তিন বার পর্যন্ত তাসবীহ বৃদ্ধি করা সুন্নাত।
৬. দুই সাজদার মাঝে رَبِّ اغْفِرْ لِي বলা। হুযায়ফা এর হাদীসে এসেছে: ان النبي صلى الله عليه وسلم كَانَ يَقُولُ بَيْنَ السَّجْدَتَيْنِ: «رَبِّ اغْفِرْ لِي، رَبِّ اغْفِرْ لِي “নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুই সাজদার মাঝে رَبِّ اغْفِرْ لِي، رَبِّ اغْفِرْ لِي )প্রভু আমাকে ক্ষমা করুন। প্রভু, আমাকে ক্ষমা করুন।) বলতেন।”২২২
৭. প্রথম তাশাহহুদ (তবে যে মুক্তাদীর ইমাম ভুলবশত তাশাহহুদে না বসে দাঁড়িয়ে যায়, তার জন্য এটা ওয়াজিব নয়। কেননা এমতাবস্থায় তার উপর ইমামের অনুসরণ করা ওয়াজিব)। নাবী যখন প্রথম তাশাহহুদ ভুলে যেতেন, তখন সেই তাশাহহুদকে আর ফিরাতেন না বরং দুটি সাহু২৩ সাজদা দিয়ে দিতেন। প্রথম তাশাহহুদ হলো: التَّحِيَّاتُ اللهَ وَالصَّلَوَاتُ وَالطَّيِّبَاتُ السَّلامُ عَلَيْكَ أَيُّهَا النَّبِيُّ وَرَحْمَةُ الله وَبَرَكَاتُهُ، السَّلَامُ عَلَيْنَا وَعَلَى عِبَادِ اللَّهُ الصَّالِحِينَ أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ. "যাবতীয় মৌখিক, দৈহিক ও আর্থিক ইবাদত আল্লাহরই জন্য। হে নাবী! আপনার প্রতি সালাম এবং আল্লাহর রহমত ও বরকত (বর্ষিত) হোক। সালাম আমাদের প্রতি এবং আল্লাহর সৎ বান্দাদের প্রতি। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, এক আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কোনো সত্য ইলাহ্ নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল।"
৮. প্রথম তাশাহহুদের জন্য বসা: ইবনু মাসউদ হতে মারফু সূত্রে বর্ণিত হাদীসে এসেছে: إِذَا فَعَدْتُمْ فِي كُلِّ رَكْعَتَيْنِ، فَقُولُوا : التَّحِيَّاتُ الله .... "প্রত্যেক দুই রাকআতে যখন বসবে, তোমরা বলবে ... التَّحِيَّاتُ لِله .২২৪ এ ছাড়াও রিফায়া বিন রাফেঈ এর হাদীসে এসেছে: فَإِذَا جَلَسْتَ فِي وَسَطِ الصَّلَاةِ فَاطْمَئِنَّ ، وَافْتَرِضْ فَخِذَكَ الْيُسْرَى ثُمَّ تَشَهَّدْ "তুমি সলাতের প্রথম বৈঠকে প্রশান্তির সাথে বসবে এবং এ সময় তোমার বাম পা বিছিয়ে দিবে, অতঃপর তাশাহহুদ পড়বে।”২২৫
টিকাঃ
২১৮. তিরমিযী, হা. ২৫৩, সুনান নাসাঈ ২/২০৫।
২১৯. সহীহ মুসলিম, হা. ৭৫৪, ফুআ, ৩৯২।
২২০. সহীহ মুসলিম, হা. ৭৯০, ফুআ, ৪০৪, আহমাদঃ ৪/৩৯৯।
২২১. আবু দাউদ, হা. ৮৭৪, তিরমিযী, হা. ২৬২।
২২২. ইবনু মাজাহঃ ৮৯৭।
২২৩. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ১২০২ ও সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ৫৭০।
২২৪. আহমাদ: ৪১৬০, সুনান নাসাঈ, হা. ১১৬৩।
২২৫. সুনান আবু দাউদ, হা. ৮৫৬।
📄 সুন্নাতসমূহ
সুন্নাহ দুই প্রকার: কর্মের সুন্নাহ ও বলার সুন্নাহ
কর্মের সুন্নাহ: তাকবীরে তাহরীমা, রুকুতে যাওয়া এবং রুকু থেকে ওঠার সময় দুই হাত উত্তোলন করা। কারণ মালেক বিন হুয়াইরিস যখন সলাতের জন্য তাকবীর দিতেন তখন দুই হাত উত্তোলন করতেন। অনুরূপ রুকুতে যাওয়া এবং রুকু থেকে ওঠার সময়েও তিনি রফউল ইয়াদাইন করতেন। । এ ছাড়াও তিনি হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, নাবী এমনই করতেন। ২২৬
অনুরূপভাবে কিয়াম অবস্থায় ডান হাত বাম হাতের উপর দিয়ে বুকের উপর রাখা, সাজদার স্থানে দৃষ্টি দেওয়া, দুই পায়ের মাঝে ফাঁকা রাখা, রুকুতে দুই হাতের তালু দিয়ে হাটুকে আঁকড়ে ধরা, রুকুতে পিঠকে লম্বা করা এবং মাথা সম্মুখভাগে রাখাও সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত।
পড়ার সুন্নাহ: সলাত শুরুর দুআ বা সানা পড়া, বিসমিল্লাহ বলা, আউযুবিল্লাহ বলা, আমীন বলা, সূরা ফাতিহার পর অতিরিক্ত কিছু পড়া, রুকু এবং সাজদায় তাসবীর পরে অতিরিক্ত কিছু পড়া এবং সালাম ফিরানোর পূর্বে তাশাহহুদের পরে অন্যান্য দুআ পড়া সুন্নাত।
টিকাঃ
২২৬. সহীহ মুসলিম, হা. ৭৫০, ফুআ. ৩৯১।