📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 অপবিত্রতার পরিচয় ও প্রকারভেদ

📄 অপবিত্রতার পরিচয় ও প্রকারভেদ


النجاسة (অপবিত্রতা): প্রত্যেক ময়লা জিনিস যা থেকে শরীয়ত প্রণেতা বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন তাকে نجاسة (অপবিত্রতা) বলা হয়।
نجاسة দুই প্রকার:
১. نجاسة حقيقة বা প্রকৃত অপবিত্রতা: যে জিনিসের মূল অপবিত্র হওয়ার কারণে কোনো অবস্থাতেই তা পবিত্র হয় না তাকে نجاسة حقيقة বা প্রকৃত অপবিত্রতা বলা হয়। যেমন- গাধার গোবর, রক্ত, প্রস্রাব।
২. نجاسة حكمية বা বিধানগত অপবিত্রতা: এটা বস্তু বিষয়ক অপবিত্রতা। যা শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গের সাথে সংশ্লিষ্ট। এই অপবিত্রতা সলাত হতে বাধা প্রদান করে।
এই প্রকার অপবিত্রতা حدث أصغر (ছোটো অপবিত্রতা) কে অন্তর্ভুক্ত করে যা ওযুর মাধ্যমে দূর হয়ে যায়। যেমন পায়খানা। এবং حدت اکبر -কে ও অন্তর্ভুক্ত করে, যা গোসলের মাধ্যমে দূর হয়। যেমন-জানাবাতের অপবিত্রতা।
যে জিনিসের দ্বারা অপবিত্রতা দূরীভূত হয় তার মূল হলো পানি। এটাই হলো পবিত্রতা অর্জনের প্রধান মাধ্যম। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَيُنَزِّلُ عَلَيْكُمْ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً لِيُطَهِّرَكُمْ بِهِ
"আকাশ থেকে তোমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করেন যাতে এর মাধ্যমে তিনি তোমাদেরকে পবিত্র করেন...।" [সূরা আনফাল: ১১]
نجاسة তিন প্রকার:
نجاسة مغلظة বা কঠিন অপবিত্রতা: সেটা হলো কুকুরের অপবিত্রতা। এবং তার থেকে সৃষ্ট অপবিত্রতা।
نجاسة مخففة বা হালকা অপবিত্রতা: খাবার খেতে শেখেনি এমন বাচ্চা ছেলের প্রস্রাব।
نجاسة متوسطة বা মধ্যম অপবিত্রতা: উপরের দুটি ব্যতীত অন্যান্য অপবিত্রতা। যেমন প্রস্রাব, পায়খানা, মৃত প্রাণী ইত্যাদি।

📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 যে জিনিসগুলো অপবিত্র হওয়ার ব্যাপারে দলীল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে

📄 যে জিনিসগুলো অপবিত্র হওয়ার ব্যাপারে দলীল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে


১. মানুষের প্রস্রাব, পায়খানা এবং বমি: তবে খাবার খেতে পারে না এমন ছেলে শিশুর প্রস্রাব ব্যতীত। তার প্রস্রাবের উপর পানির ছিটা দিলে তা পবিত্র হয়ে যাবে। এই প্রসঙ্গে উন্মু ক্বাইস বিনতে মেহসান থেকে হাদীস বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন:
أَتَتْ بِابْنِ لَهَا صَغِيرٍ، لَمْ يَأْكُلِ الطَّعَامَ، إِلَى رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَأَجْلَسَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي حَجْرِهِ، فَبَالَ عَلَى ثَوْبِهِ، فَدَعَا بِمَاءٍ، فَنَضَحَهُ وَلَمْ يَغْسِلْهُ
"তিনি তাঁর এমন একটি ছোটো ছেলেকে নিয়ে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম - এর নিকট এলেন যে তখনো খাবার খেতে শেখেনি। আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিশুটিকে তাঁর কোলে বসালেন। তখন সে তাঁর কাপড়ে প্রস্রাব করে দিল। তিনি পানি আনিয়ে এর উপর ছিটিয়ে দিলেন এবং তা ধৌত করলেন না। "১৩৪
তবে যে ছেলে শিশু খাবার খায় সে এবং মেয়ে শিশুর প্রস্রাবের হুকুম হবে বড়ো মানুষের প্রস্রাবের হুকুমের ন্যায়।
২. গোশত খাওয়া হয় এমন প্রাণির প্রবাহিত রক্ত। তবে যে রক্ত গোশত এবং রগের মধ্যে অবশিষ্ট থাকে তা পবিত্র। আল্লাহ তা'আলা বলেন: ﴾أَوْ دَمًا مَسْفُوحًا﴿ ]সূরা আনআম: ১৪৫]। دَمًا مَسْفُوحًا হলো- যেটা প্রবাহিত হয়, গড়িয়ে পড়ে।
৩. গোশত খাওয়া হয় না এমন প্রাণির গোবর এবং প্রস্রাব। যেমন- বিড়াল, ইঁদুর।
৪. মৃত প্রাণী: এগুলো হলো: যে প্রাণীগুলো শরয়ী পন্থায় জবাই করা ছাড়াই স্বাভাবিক ভাবে মারা গিয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন: ﴾إِلَّا أَنْ يَكُونَ مَيْتَةً﴿ ]সূরা আনআম: ১৪৫[ তবে এর থেকে মৃত মাছ, টিড্ডি এবং যে প্রাণির দেহে রক্ত প্রবাহিত হয় না, তাকে আলাদা করে দেওয়া হয়েছে। কারণ এগুলো পবিত্র।
৫. মাযী (তরল শুক্রবস) নির্গত হওয়া। এটা হলো আঠালো পাতলা পানি যা খেলা-ধুলা বা সহবাসের চিন্তা-ভাবনার সময় নির্গত হয়। এটা উত্তেজনা সহকারে এবং সজোরে নির্গত হয় না। এটা নির্গত হলে শরীরে শিথিলতা আসে না। কখনো কখনো এটা বের হওয়ার কথা অনুভব করাও যায় না। এটা নাপাক। আল্লাহর রসূল আলীকে বলেন: تَوَضَّأَ وَاغْسِلْ ذَكَرَكَ “তোমরা মাযী হতে ওযু করো এবং পুরুষাঙ্গ ধৌত করো।”১৩৫ এই ক্ষেত্রে হালকা করণ এবং কষ্ট লাঘবের জন্য গোসল করার নির্দেশ দেওয়া হয়নি। কেননা এটা এমন জিনিস যার থেকে সতর্ক থাকা কষ্টকর।
৬. ওয়াদ'ই: এটা হলো- ঘন সাদা পানি, যা প্রস্রাবের পরে বের হয়। যে ব্যক্তির এটা নির্গত হবে, সে লজ্জাস্থান ধৌত করে ওযু করবে। গোসল করতে হবে না।
৭. হায়েযের রক্ত: আসমা বিনতে আবু বকরের হাদীসে এসেছে তিনি বলেন: جَاءَتِ امْرَأَةٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَتْ: إِحْدَانَا يُصِيبُ ثَوْبَهَا مِنْ دَمِ الْخَيْضَةِ، كَيْفَ تَصْنَعُ بِهِ، قَالَ: «تَحْتُهُ، ثُمَّ تَقْرُصُهُ بِالْمَاءِ، ثُمَّ تَنْضَحُهُ ، ثُمَّ تُصَلِّي فِيهِ "তিনি বলেন, জনৈকা মহিলা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট এসে বললেন: (হে আল্লাহর রসূল!) বলুন, আমাদের কারো কাপড়ে হায়েযের রক্ত লেগে গেলে সে কী করবে? তিনি বললেন: সে তা ঘষে ফেলবে, তারপর পানি দিয়ে রগড়াবে এবং কাপড়ে পানির ছিটা দিবে। অতঃপর সেই কাপড়ে সলাত আদায় করবে। "১৩৭

টিকাঃ
১৩৪. সহীহুল বুখারী, হা. ২২৩, نصجه: পানির ছিটা দেওয়া, পানি ঢেলে দেওয়া।
১৩৫. সহীহুল বুখারী, হা. ২৬৯।
১৩৬. تحته: পাথর অথবা পাঠ দিয়ে ঘষা দিবে। تفرصه আঙ্গুল এবং নখ দিয়ে জোরে জোরে ঘর্ষন করার এবং তার উপর পানি ঢালার যাতে نجاسة এবং তার চিন্‌হ দূর হয়ে যায়।
১৩৭. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ২২৭, সহীহ মুসলিম, হা. ২৯১।

📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 কীভাবে অপবিত্রতাকে পবিত্র করা হবে

📄 কীভাবে অপবিত্রতাকে পবিত্র করা হবে


১. অপবিত্রতা যদি মাটি অথবা কোনো জায়গায় হয়: তাহলে তাকে পবিত্র করতে একবার ধোয়া যথেষ্ট হবে। একবার ধুলেই نجاسة বা অপবিত্রতা দূরীভিত হয়ে যাবে। সুতরাং তার উপর একবার পানি ঢেলে দিতে হবে। জনৈক বেদুঈন যখন মসজিদে প্রস্রাব করে দিয়েছিল তখন আল্লাহর রসূল তার ব্যাপারে এই নির্দেশ প্রদান করেছিলেন। ১৩৮
২. অপবিত্রতা মাটি ব্যতীত অন্যকিছুতে হলে: সেটা কাপড়ে হতে পারে অথবা জুতায় হতে পারে: যদি সেটা কুকুর কোনো পাত্রে মুখ দেওয়ার কারণে হয়, তাহলে আবশ্যক হলো সেই পাত্র সাতবার ধোয়া। তার মধ্যে একবার মাটি ব্যবহার করা আবশ্যক। এই মর্মে আল্লাহর রসূল বলেছেন:
إِذَا وَلَغَ الْكَلْبُ فِي إِنَاءِ أَحَدِكُمْ فَلْيَغْسِلْهُ سَبْعَ مَرَّاتٍ أُولَاهُنَّ بِالتُّرَابِ "তোমাদের কারো পাত্রে কুকুর লেহন করলে তা সাতবার ধোও; এর একবার (প্রথমবার) মাটি দিয়ে।"১৩৯
এই বিধান পাত্র এবং অন্যান্য সকল জিনিসের ক্ষেত্রে। যেমন- কাপড়, বিছানা ইত্যাদি।
শুকরের অপবিত্রতা: সঠিক কথা শুকরের অপবিত্রতা অন্যান্য অপবিত্রতার মতো একবার ধুলেই যথেষ্ট হবে। একবার ধৌত করলেই নাপাকি দূর হয়ে যাবে। একে সাতবার ধোয়ার শর্ত করা হয়নি।
অপবিত্রতা যদি প্রস্রাব, পায়খানা বা রক্তের হয়: তাহলে তা পানি দিয়ে ধৌত করতে হবে। সাথে সাথে ঘষে পানি নিংড়াতে হবে, যাতে তা দূর হয়ে যায়, তার চিহ্নও না থাকে। এগুলো একবার ধোয়াই যথেষ্ট হবে।
যে শিশু খাবার খেতে শিখেনি তার প্রস্রাব থেকে পবিত্রতা অর্জনের জন্য পানি ছিটানোই যথেষ্ট হবে। আল্লাহর রসূল বলেন:
يُغْسَلُ مِنْ بَوْلِ الْجَارِيَةِ، وَيُنْضَحُ مِنْ بَوْلِ الْغُلَامِ "মেয়ে শিশুর প্রস্রাব ধৌত করো আর ছেলে শিশুর প্রস্রাবে পানি ছিটিয়ে দাও।”১৪০
এই প্রসঙ্গে উম্মু ক্বাইস বিনতে মিহসানের হাদীস পূর্বে অতিবাহিত হয়েছে।
যে প্রাণির গোশত খাওয়া হয় তার চামড়া: এসব প্রাণির চামড়া দাবাগত বা প্রক্রিয়াজাত করলেই পবিত্র হয়ে যাবে। আল্লাহর রসূল বলেছেন:
أَيُّمَا إِهَابٍ دُبِغَ فَقَدْ طَهُرَ
"প্রক্রিয়াজাতের পর যে-কোনো চামড়া পবিত্র হয়ে যায়।” ১৪১
হায়েযের রক্তকে মহিলা পানি দিয়ে ধৌত করবে। অতঃপর তাতে পানির ছিটা দিয়ে সলাত আদায় করবে।
সুতরাং মুসলিমের জন্য আবশ্যক হলো শরীর, স্থান, কাপড় যেগুলিতে সে সলাত আদায় করে, সেগুলিকে অপবিত্র থেকে পবিত্র করার ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করা। কারণ পবিত্রতা সলাত সহীহ হওয়ার জন্য শর্ত।

টিকাঃ
১৩৮. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ২২০, সহীহ মুসলিম, হা. ২৮৪।
১৩৯. সহীহ মুসলিম, হা. ৫৩৫, ফুআ. ২৭৯, মুসলিমের শব্দ: طَهُورُ إِنَاءِ أَحْدِكُمْ إِذَا وَلَغَ فِيهِ الْكَلْبُ، أَنْ يَفْسِلَهُ سَبْعَ مَرَّاتٍ أُولَاهُنَّ بِالتُّرَابِ
১৪০. আবু দাউদ: ৩৭৬, সুনান নাসাঈ, হা. ৩০৩, ইবনু মাজাহ, হা. ৫২৬।
১৪১. সুনান নাসাঈ, হা. ৪২৫২, তিরমিযী, হা. ১৭২৮, ইবনু মাজাহ, হা. ৩৬০৯

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00