📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 তায়াম্মুমের শর্তসমূহ এবং তার বৈধ কারণসমূহ

📄 তায়াম্মুমের শর্তসমূহ এবং তার বৈধ কারণসমূহ


পানি ব্যবহারে অপারগতার সময় তায়াম্মুম করা বৈধ। এই অপারগতাটা হতে পারে পানি না থাকার কারণে অথবা শারীরিক অসুস্থতার দরুন পানি ব্যবহার করলে ক্ষতি হতে পারে এই আশংকায় অথবা কঠিন ঠাণ্ডার কারণে। এই মর্মে ইমরান বিন হুসাইন হতে হাদীস বর্ণিত হয়েছে। রসূল বলেছেন:
عَلَيْكَ بِالصَّعِيدِ الطيب، فَإِنَّهُ يَكْفِيكَ
"পবিত্র মাটি নাও (তায়াম্মুম করো), এটাই তোমার জন্য যথেষ্ট। ১২৮
একটু পরে এর বিস্তারিত আলোচনা আসবে ইনশাআল্লাহ। নিম্নোক্ত শর্তের মাধ্যমে তায়াম্মুম সহীহ হবে:
১. النية (নিয়ত করা) এটা হলো সলাতকে বৈধ করার নিয়ত। নিয়ত সকল ইবাদতের পূর্বশর্ত। আর তায়াম্মুম হলো একটি ইবাদত।
২. الاسلام (মুসলিম হওয়া) কাফেরের তায়াম্মুম সহীহ হবে না। কেননা এটা একটি ইবাদত।
৩. العقل (জ্ঞানসম্পন্ন হওয়া) সুতরাং কোনো জ্ঞানহীন ব্যক্তির তায়াম্মুম বৈধ হবে না। যেমন- পাগল, অজ্ঞান ব্যক্তি।
৪. التمييز (ভালো মন্দের পার্থক্যকারী): সুতরাং যে ভালো মন্দের পার্থক্য করতে সক্ষম নয়, তার জন্য তায়াম্মুম করা সহীহ হবে না। আর এটা সাত বছরের কম বয়সের ক্ষেত্রে হয়।
৫. تعذر استعمال الماء (পানি ব্যবহারে অপারগতা): এটা হতে পারে পানি না থাকার কারণে। আল্লাহ তা'আলা এই মর্মে বলেন: فَلَمْ تَجِدُوا مَاءً فَتَيَمَّمُوا صَعِيدًا طَيِّبًا “অতঃপর যদি পানি না পাও, তাহলে পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করো।” [সূরা মায়িদাহ: ৬] আল্লাহর রসূল বলেন:
إِنَّ الصَّعِيدَ الطَّيِّبَ طَهُورُ الْمُسْلِمِ، وَإِنْ لَمْ يَجِدِ الْمَاءَ عَشْرَ سِنِينَ، فَإِذَا وَجَدَ الْمَاءَ فَلْيُمِسَّهُ بَشَرَتَهُ، فَإِنَّ ذَلِكَ خَيْرٌ.
“পবিত্র মাটি মুসলিমদের জন্য পবিত্রতাকারী, যদিও সে দশ বছর ধরে পানি না পায়। যখন সে পানি পাবে নিজের শরীরে যেন পানি পৌঁছায় (গোসল করে)। এটাই উত্তম।”১২৯ অথবা পানি ব্যবহারে ক্ষতির ভয়ে। হয়তো পানি ব্যবহারের কারণে অসুস্থতা বৃদ্ধি পাবে অথবা সুস্থ হতে বেশি সময় লাগবে। এই মর্মে আল্লাহ তা'আলা বলেন: ﴿وَإِنْ كُنْتُمْ مَرْضَى (যদি তোমরা পীড়িত হও)
আল্লাহর রসূল মাথা ফাটা ব্যক্তির ক্ষেত্রে বলেন: قَتَلُوهُ قَتَلَهُمُ اللَّهُ أَلَا سَأَلُوا إِذْ لَمْ يَعْلَمُوا فَإِنَّمَا شِفَاءُ الْعِيِّ السُّؤَالُ،
"এরা লোকটিকে হত্যা করেছে। আল্লাহ এদের ধ্বংস করুন! না জানলে কেন জিজ্ঞেস করল না? নিশ্চয়ই অজ্ঞতার প্রতিষেধক হলো জিজ্ঞেস করা।"১৩০
অথবা খুব ঠান্ডার কারণে ক্ষতি হতে পারে। অথবা পানি ব্যবহারের কারণে মারা যেতে পারে এই ভয়ে। আমর বিন আস হতে বর্ণিত:
أنه لما بعث في غزوة ذات السلاسل قال: احتلمت في ليلة باردة شديدة البرد، فأشفقت إن اغتسلت أن أَهْلَكَ فَتَيَمَّمْتُ وصلَّيْتُ بأصحابي صلاة الصبح ...
"তিনি যাতুস-সালাসিল যুদ্ধে প্রেরিত হন। তিনি বলেন, এ সময় খুব শীতের রাতে আমার স্বপ্নদোষ হয়। আমার ভয় হলো, আমি যদি গোসল করি তাহলে ক্ষতিগ্রস্থ হবো। তাই আমি তায়াম্মুম করে লোকদের সাথে সলাত আদায় করলাম।..."১৩১
৬. পবিত্র মাটি দিয়ে তায়াম্মুম করতে হবে। অপবিত্র মাটি (যেমন- এমন মাটি যাতে প্রস্রাব লেগেছে আর সেটা পবিত্র করা হয়নি।) এগুলো দিয়ে তায়াম্মুম সহীহ হবে না। যদি ধুলা যুক্ত মাটি পাওয়া যায় তাহলে তা নিতে হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
فَتَيَمَّمُوا صَعِيدًا طَيِّبًا فَامْسَحُوا بِوُجُوهِكُمْ وَأَيْدِيكُمْ مِنْهُ)
"তাহলে পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করো; তা দিয়ে তোমাদের মুখমণ্ডল ও হস্তদ্বয় মাসাহ করো।" [সূরা মায়িদাহ: ৬]
ইবনু আববাস বলেন, الصعيد-চাষের মাটি, الطيب-পবিত্র। যদি মাটি না পায় তাহলে বালু যুক্ত পাথর দিয়ে তায়াম্মুম করা যাবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ﴾
“সাধ্যানুযায়ী আল্লাহকে ভয় করো।"[সূরা তাগাবুন: ১৬]
আওযায়ী বলেন: الرمل من الصعيد তথা ধুলো মাটি থেকে।

টিকাঃ
১২৮. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৩৪৪, সহীহ মুসলিম, হা. ৬৮২ )الطيب শব্দটি সহীহুল বুখারিতে নেই। সুনানুস সাগীর, বায়হাকী, হা. ২৪৬)।
১২৯. তিরমিযী, হা. ১২৪।
১৩০. সুনান আবু দাউদ, হা. ৩৩৭, ইবনু মাজাহ, হা. ৫৭২।
১৩১. আহমাদ: ৪/২০৩, সুনান আবু দাউদ, হা. ৩৩৪।

📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 তায়াম্মুম ভঙ্গকারী বিষয়াদি

📄 তায়াম্মুম ভঙ্গকারী বিষয়াদি


যে বিষয়গুলো তায়াম্মুম ভঙ্গ করে সেগুলো তিনটি:
১. ওযু ভঙ্গকারী ছোটো অপবিত্রতা এবং গোসল আবশ্যককারী বড়ো অপবিত্রতা যেমন সহবাস, হায়েয, নিফাস দ্বারা তায়াম্মুম ভঙ্গ হয়ে যাবে। যদি কেউ ছোটো অপবিত্রতা হতে তায়াম্মুম করে অতঃপর প্রস্রাব করে অথবা পায়খানা করে তাহলে তার তায়াম্মুম বতিল হয়ে যাবে। কারণ তায়াম্মুম হলো ওযুর পরিবর্তে। আর পরিবর্তিত বিষয়ের বিধান যার সাথে পরিবর্তন করা হয়েছে তার মতোই। অনুরূপভাবে বড়ো অপবিত্রতার কারণেও তায়াম্মুম বাতিল হয়ে যাবে।
২. পানি পাওয়া গেলে: যদি পানি না থাকার কারণে তায়াম্মুম করা হয় তাহলে পানি পাওয়ার সাথে সাথে তায়াম্মুম ভঙ্গ হয়ে যাবে। আল্লাহর রসূল বলেন: فَإِذَا وَجَدْتَ الْمَاءَ فَأَمِسَّهُ بشرتك “যখন সে পানি পাবে নিজের শরীরে যেন পানি পৌঁছায়।”
৩. যে অপারগতার কারণে তায়াম্মুম করা শরীয়ত সম্মত হয়েছে, সে অপারগতা দূর হয়ে গেলে তায়াম্মুম ভেঙ্গে যাবে। যেমন- অসুস্থতা।

📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 তায়াম্মুমের পদ্ধতি

📄 তায়াম্মুমের পদ্ধতি


পদ্ধতি: প্রথমে নিয়ত করবে অতঃপর বিসমিল্লাহ বলে দুই হাত মাটিতে একবার মারবে। অতঃপর দুই হাতে ফুঁ-দিয়ে দুই হাত দ্বারা চেহারা এবং দুই হাতের কব্জি পর্যন্ত মাসাহ করবে। আম্মার এর হাদীসে এসেছে:
التَّيَمُّمُ ضَرْبَةً لِلْوَجْهِ وَ الكفين
“তায়াম্মুমে মুখমণ্ডল ও উভয় হাতের জন্য একবার (তায়াম্মুমের বস্তুর উপর হাত) মারতে হবে।” ১৩২
আম্মারের অপর হাদীসে এসেছে। আল্লাহর রসূল বলেছেন:
إِنَّمَا كَانَ يَكْفِيكَ أَنْ تَصْنَعَ هَكَذَا، فَضَرَبَ بِكَفِّهِ ضَرْبَةً عَلَى الأَرْضِ، ثُمَّ نَفَضَهَا، ثُمَّ مَسَحَ بِهِمَا ظَهَرَ كَفِّهِ بِشِمَالِهِ أَوْ ظَهْرَ شِمَالِهِ بِكَفِّهِ، ثُمَّ مَسَحَ بِهِمَا وَجْهَهُ.
“তোমার জন্য তো এটুকুই যথেষ্ট ছিল- এই বলে- তিনি দুই হাত মাটিতে মারলেন, তারপর তা ঝেড়ে নিলেন এবং তা দিয়ে তিনি বাম হাতে ডান হাতের পিঠ মাসাহ করলেন। (কিংবা রাবী বলেছেন) বাম হাতের পিঠ ডান হাতে মাসাহ করলেন। তারপর হাত দুটো দিয়ে তাঁর মুখমণ্ডল মাসাহ করলেন।” ১৩৩

টিকাঃ
১৩২. আহমাদ: ৪/২৬, সুনান আবু দাউদ, হা. ৩২৭।
১৩৩. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৩৪৭, সহীহ মুসলিম, হা. ৩৬৮।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00