📄 ওযু ভঙ্গকারী বিষয়সমূহ
النواقض বা ভঙ্গকারী বলতে বুঝায় যে সমস্ত জিনিস ওযুকে বাতিল করে এবং তা নষ্ট করে এগুলো হলো মোট ছয়টি:
১. প্রস্রাব পায়খানার রাস্তা দিয়ে কোনো কিছু নির্গত হওয়া। নির্গত হওয়া জিনিসটি হতে পারে প্রস্রাব অথবা পায়খানা অথবা বীর্য, অথবা মযি, অথবা ইস্তেহাযার রক্ত অথবা বায়ু নির্গমন হওয়া, কম বা বেশি হোক। এ মর্মে আল্লাহ তা'আলা বলেন:
أَوْ جَاءَ أَحَدٌ مِنْكُمْ مِنَ الْغََابِطِ "অথবা তোমাদের কেউ প্রস্রাব-পায়খানা হতে আগমন করে।" সূরা নিসা: ৪৩
لَا يَقْبَلُ اللَّهُ صَلَاةَ أَحَدِكُمْ إِذَا أَحْدَثَ حَتَّى يَتَوَضَّأَ "বায়ু বের হলে ওযু না করা পর্যন্ত আল্লাহ তোমাদের কারো সলাত কবুল করবেন না।”৭৯
অপর হাদীসে এসছে: وَلَكِنْ مِنْ غَائِطِ وَيَوْلٍ وَنُوْمٍ “এমনকি মলত্যাগ-প্রস্রাব ও ঘুম হতে ওঠার পর ওযু করার সময়ও (মোজা না খুলি)।"৮০
বায়ু নির্গত হয়েছে কিনা এ ব্যপারে যে সন্দেহ করে, তার ব্যাপারে আল্লাহর রসূল বলেন: فَلَا يَنْصَرِفْ حَتَّى يَسْمَعَ صَوْتًا، أَوْ يَجِدَ رِيحًا “যতক্ষণ না শব্দ শোনে বা দুর্গন্ধ পায় সে যেন ফিরে না যায়।”৮১
২. শরীরে অন্যান্য অঙ্গ থেকে অপবিত্র জিনিস বের হওয়া। যদি সেটা প্রস্রাব বা পায়খানা হয় তাহলে পূর্বের হাদীসের বক্তব্যের মধ্যে প্রবেশের কারণে সাধারণভাবে ওযু ভেঙে যাবে। যদি প্রস্রাব পায়খানা ব্যতীত অন্যকিছু হয়, যেমন: রক্ত, বমি আর যদি সেটা নোংরা এবং পরিমাণে বেশি হয় তাহলে ওযু করা উত্তম, সতর্কতামূলক। আর যদি পরিমাণে কম হয় তাহলে সকলের ঐকমত্যে ওযু করতে হবে না।
৩. অজ্ঞান হওয়া, অথবা ঘুম এবং তন্দ্রার কারণে সজ্ঞাহীন হওয়া। আল্লাহর রসূল বলেন: وَلَكِنْ مِنْ غَائِطٍ وَبَوْلٍ وَنَوْمٍ “এমনকি মলত্যাগ-প্রস্রাব ও ঘুম হতে ওঠার পর ওযু করার সময়ও (মোজা না খুলে)। "৮২ তিনি অপর হাদীসে বলেন: الْعَيْنُ وِكَاءُ السَّهِ ، فَمَنْ نَامَ، فَلْيَتَوَضَّأُ "চক্ষুদ্বয় হচ্ছে পশ্চাৎদ্বারের সংরক্ষণকারী। কাজেই যে ব্যক্তি (চোখ বন্ধ করে) ঘুমায়, সে যেন ওযু করে।"৮৫
তবে পাগলামী, সংজ্ঞাহীনতা, নেশাগ্রস্থতা এবং এ জাতীয় কাজের কারণে ওযু ভঙ্গ হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে সকলে ঐকমত্য পোষণ করেছেন। ওযু ভঙ্গকারী নিদ্রা হলো: যে নিদ্রার কারণে ব্যক্তির অনুভূতি অবশিষ্ট থাকে না। সেটা যে প্রকারের নিদ্রাই হোক না কেন।
তবে যদি নিদ্রা কম হয় তাহলে তা ওযু ভঙ্গ করবে না। কেননা সাহাবীদেরকে সলাতের জন্য অপেক্ষায় রেখে তন্দ্রা পেয়ে বসতো। অতঃপর তারা দাড়াতেন, সলাত আদায় করতেন কিন্তু ওযু করতেন না। ৮৬
৪. কোনো প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই লজ্জাস্থান স্পর্শ করা। এই মর্মে বুসরা বিনতে সাফওয়ান বলেন, নাবী বলেছেন: مَنْ مَسَّ ذَكَرَهُ فَلْيَتَوَضَّا “কেউ নিজ পুরুষাঙ্গ স্পর্শ করলে যেন ওযু করে।”৮৭ অপর হাদীসে আবু আইয়ুব এবং উম্মু হাবীবা বলেন: রসূল বলেছেন: مَنْ مَسَّ فَرْجَهُ فَلْيَتَوَضَّأْ : “যে ব্যক্তি তার লজ্জাস্থান স্পর্শ করল সে যেন ওযু করে নেয়।”৮৮
৫. উটের গোশত খাওয়া: এই প্রসঙ্গে জাবির বিন সামুরা হতে হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি আল্লাহর রসূল কে জিজ্ঞেস করলেন: أَأَتَوَضَّأُ مِنْ لُحُومِ الْغَنَمِ؟ قَالَ : إِنْ شِئْتَ فَتَوَضَّأْ، وَإِنْ شِئْتَ فَلَا تَوَضَّأ، قَالَ أَتَوَضَّأُ مِنْ لُحُومِ الْإِبِلِ؟ قَالَ: نَعَمْ فَتَوَضَّأُ مِنْ لُحُومِ الْإِيلِ. "আমি কি বকরির গোশত খেয়ে ওযু করব? তিনি বললেন, তোমার ইচ্ছা ওযু করতে পারো আর নাও করতে পারো। সে বলল, আমি কি উটের গোশত খেয়ে ওযু করব? তিনি বললেন, হ্যাঁ, উটের গোশত খেয়ে তুমি ওযু করবে।"৮৯
৬. মুরতাদ হওয়া বা ইসলাম পরিত্যাগ করা: আল্লাহ তা'আলা বলেন: مَنْ يَكْفُرْ بِالْإِيمَانِ فَقَدْ حَبِطَ عَمَلُهُ﴾ “যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে কুফরী মিশ্রিত করবে তার 'আমল নিস্ফল হয়ে যাবে।” [সূরা মায়িদাহ : ৫] এ ছাড়াও যে সমস্ত কাজ গোসল ফরয করে সেগুলো ওযুও ফরয করে তবে মৃত্যু ব্যতীত।
টিকাঃ
৭৯. সহীহুল বুখারী, হা. ৬৯৫৪।
৮০. আহমাদ ২/২৩৯, নাসাঈ ১/৮৩, তিরমিযী, হা. ১৬।
৮১. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ১৩৭, সহীহ মুসলিম, হা. ফুআ. ৩৬১।
৮২. তিরমিযী, হা. ৯৬।
৮৩. যে রশি দিয়ে ম্যাপ এবং মশক বাধা হয়।
৮৪. الريد اله তথা নিতম্ব এর অর্থ হলো জাগ্রত অবস্থা, চোখন্বয় হলো ঐ রশির মত যার দ্বারা বাধা হয়। সুতরাং যখন অজ্ঞান হয়ে যায় তখন এই বন্ধনও খুলে যায়।
৮৫. সুনান আবু দাউদ, হা. ২০৩, ইবনু মাজাহ, হা. ৪৭৭, ইরওয়াউল গালীল: ১/১৪৮।
৮৬. সহীহ মুসলিম, হা. ৭১৯, ফুআ, ৩৭৬।
৮৭. সুনান আবু দাউদ, হা. ১৮১, নাসাঈ, হা. ১৬৩, তিরমিযী, হা. ৮২।
৮৮. উন্মু হাবীবার হাদীস; ইবনু মাজাহ, হা. ৪৮১।
৮৯. সহীহ মুসলিম, হা. ৬৮৮, ফুআ. ৩৬০।
📄 যে সকল কাজের জন্য ওযু করা ওয়াজিব
নিম্নোক্ত কাজগুলোর জন্য শরয়ী দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির উপরে ওযু করা ওয়াজিব:
১. সলাতের জন্য: এই প্রসঙ্গে ইবনু উমার হতে মারফু সুত্রে হাদীস বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহর রসূল বলেছেন:
لَا يَقْبَلُ اللهُ صَلَاةٌ بِغَيْرِ طُهُورٍ، وَلَا صَدَقَةٌ مِنْ غُلُولٍ
“পবিত্রতা ব্যতীত সলাত কবুল হয় না। খিয়ানতের সম্পদ থেকে সাদকা কবুল হয় না।”৯০
২. বায়তুল্লাহয় তাওয়াফ করার জন্য: চাই সেটা ফরয অথবা নফল হোক। আল্লাহর রসূল তাওয়াফের সময় ওযু করতেন। হাদীসে এসেছে:
فَإِنَّهُ تَوَضَّأَ ، ثُمَّ طَافَ بِالْبَيْتِ
"তিনি ওযু করে তাওয়াফ সম্পন্ন করেন।”৯১
অপর হাদীসে আল্লাহর রসূল বলেন:
الطَّوَافُ بِالْبَيْتِ صَلَاةٌ إلا أن الله أباح فيه الكلام
"বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করা সলাতই। তবে পার্থক্য হচ্ছে এতে আল্লাহ কথা বলার বৈধতা দিয়েছেন।”৯২
এমনকি তিনি হায়েযা মহিলাদেরকে পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করতে নিষেধ করেছেন।
৩. কোনো প্রতিবন্ধকতা ছাড়া কুরআন স্পর্শ করার জন্য। আল্লাহ তা'আলা এই মর্মে বলেন:
لَا يَمَسُّهُ إِلَّا الْمُطَهَّرُونَ
"যারা সম্পূর্ণ পবিত্র তারা ছাড়া অন্য কেউ তা স্পর্শ করে না।" [সুরা ওয়াকিয়া: ৭৯] আল্লাহর রসূল বলেছেন: لا يَمَسَّ الْقُرْآنَ إِلَّا طَاهِرُ : "পবিত্র ব্যক্তি ব্যতীত কেউ কুরআন স্পর্শ করবে না।"৯৪
টিকাঃ
৯০. সহীহ মুসলিম, হা. ৪২৩, ফুআ, ২২৪।
৯১. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ১৬১৪, সহীহ মুসলিম, হা. ১২৩৫।
৯২. ইবনু হিব্বান: ৩৮৩৬, হাকিম ১/৪৫৯ এবং তিনি সহীহ সানাদে; ইমাম যাহাবী, বায়হাকী ৫/৮৭ এবং অন্যান্যরা ঐকমত্য পোষণ করেছেন; শাইখ আলবানী সহীহ বলেছেন, ইরওয়া নং ১২১।
৯৩. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৩০৫, সহীহ মুসলিম, হা. ১২১১।
৯৪. মুয়াত্তা মালিক: ১/১৯৯, দারাকুতনী: ১/১২১।
📄 যে সকল কাজের জন্য ওযু করা মুস্তাহাব
নিম্নোক্ত অবস্থাগুলোতে ওযু করা মুস্তাহাব:
১. আল্লাহর যিক্র এবং কুরআন পাঠের সময়।
২. প্রত্যেক সলাতের সময়। আল্লাহর রসূল নিরবচ্ছন্নভাবে প্রত্যেক সলাতের জন্য ওযু করতেন। যেমন আনাস হতে হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন,
كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَتَوَضَّأُ عِنْدَ كُلِّ صَلَاةٍ “নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রত্যেক সলাতের সময় ওযু করতেন।”৯৫
৩. যে অপবিত্র ব্যক্তি পুনরায় সহবাস করতে চায় অথবা খেতে চায়, অথবা ঘুমাতে চায় অথবা পান করতে চায় তার জন্য ওযু করা মুস্তাহাব। আবু সাঈদ খুদরী হতে এই মর্মে হাদীস বর্ণিত হয়েছে।
قَالَ رَسُولُ الله صلى الله عليه وسلم إِذَا أَتَى أَحَدُكُمْ أَهْلَهُ، ثُمَّ أَرَادَ أَنْ يَعُودَ، فَلْيَتَوَضَّأْ "রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: তোমাদের কেউ যখন তার স্ত্রীর সাথে মিলিত হবে তারপর আবার মিলিত হবার ইচ্ছা করবে সে যেন ওযু করে নেয়।”৯৬ আয়িশাহ হতে বর্ণিত।
أَنَّ رَسُولَ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ إِذَا أَرَادَ أَنْ يَنَامَ، وَهُوَ جُنُبٌ ، تَوَضَّأَ وُضُوءَهُ لِلصَّلَاةِ، قَبْلَ أَنْ يَنَامَ "রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নাপাকী অবস্থায় যখন ঘুমাতে ইচ্ছা করতেন তখন ঘুমানোর আগে সলাতের জন্য যেমন ওযু করতে হয় তেমন ওযু করতেন।"৯৭ অণ্য বর্ণনায় এসেছে:
فَأَرَادَ أَنْ يَأْكُلَ أَوْ يَنَامَ "তখন কিছু খেতে অথবা ঘুমানোর ইচ্ছা করলে।”৯৮
৪. গোসলের পূর্বে ওযু করা। আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا اغْتَسَلَ مِنَ الْجَنَابَةِ يَبْدَأُ فَيَغْسِلُ يَدَيْهِ، ثُمَّ يُفْرِغُ بِيَمِينِهِ عَلَى شِمَالِهِ فَيَغْسِلُ فَرْجَهُ، ثُمَّ يَتَوَضَّأُ وُضُوءَهُ لِلصَّلَاةِ
“রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন অপবিত্রতা থেকে গোসল করতেন তখন প্রথমে দুই হাত ধুতেন। তারপর ডান হাত দিয়ে বাম হাতে পানি ঢেলে লজ্জাস্থান ধুতেন। তারপর সালাতের ওযুর মতো ওযু করতেন।”৯৯
৫. ঘুমের সময়: বারা বিন আযিব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রসূল বলেছেন:
إِذَا أَتَيْتَ مَضْجَعَكَ ، فَتَوَضَّأَ وُضُوءَكَ لِلصَّلاةِ، ثُمَّ اضْطَجِعْ عَلَى شِقَّكَ الْأَيْمَنِ
"যখন তুমি বিছানায় যাবে সালাতের ওযুর মতো ওযু করে নিবে। তারপর ডান পাশে শুয়ে পড়বে।”১০০
টিকাঃ
৯৫. সহীহুল বুখারী, হা. ২১৪।
৯৬. সহীহ মুসলিম, হা. ৫৯৪, ফুআ, ৩০৮।
৯৭. সহীহ মুসলিম, হা. ৫৮৬, ফুআ. ৩০৫।
৯৮. সহীহ মুসলিম, হা. ৫৮৭, ফুআ. ৩০৫।
৯৯. সহীহ মুসলিম, হা. ৬০৫, ফুআ. ৩১৬।
১০০. সহীহুল বুখারী, হা. ২৪৭।