📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার 📄 ওযুর পরিচয় এবং হুকুম

📄 ওযুর পরিচয় এবং হুকুম


الوضوء শব্দটি الوضاءة শব্দটি থেকে নির্গত হয়েছে। এর অর্থ: সুন্দর, পরিচ্ছন্নতা।
شرعاً استعمال الماء في الأعضاء الأربعة وهي الوجه واليدان والرأس والرجلان على صفة مخصوصة في الشرع، على وجه التعبد الله تعالى.
পরিভাষায়: আল্লাহর ইবাদতের উদ্দেশ্যে শরীয়তের নির্দিষ্ট পন্থায় চারটি অঙ্গে (মুখ, দুই হাত, মাথা এবং দুই পা) পানি ব্যবহার করাকে ওযু বলা হয়।
ওযুর হুকুম: অপবিত্র ব্যক্তি যদি সলাত আদায় করতে চায় অথবা সলাতের হুকুমের অন্তর্গত কোনো ইবাদত করতে চায় (যেমন তাওয়াফ করা, কুরআন মাজীদ স্পর্শ করা) তাহলে তার উপর ওযু করা ওয়াজিব।

📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার 📄 ওয়াজিবের দলীল, কার উপর ওয়াজিব? কখন ওয়াজিব?

📄 ওয়াজিবের দলীল, কার উপর ওয়াজিব? কখন ওয়াজিব?


ওযু করা ওয়াজিব এই প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا قُمْتُمْ إِلَى الصَّلَاةِ فَاغْسِلُوا وُجُوهَكُمْ وَأَيْدِيَكُمْ إِلَى الْمَرَافِقِ وَامْسَحُوا بِرُءُوسِكُمْ وَأَرْجُلَكُمْ إِلَى الْكَعْبَيْنِ وَإِنْ كُنْتُمْ جُنُبًا فَاطَّهَّرُوا وَإِنْ كُنْتُمْ مَرْضَى أَوْ عَلَى سَفَرٍ أَوْ جَاءَ أَحَدٌ مِنْكُمْ مِنَ الْغَائِطِ أَوْ لَا مَسْتُمُ النِّسَاءَ فَلَمْ تَجِدُوا مَاءً فَتَيَمَّمُوا صَعِيدًا طَيِّبًا فَامْسَحُوا بِوُجُوهِكُمْ وَأَيْدِيكُمْ مِنْهُ مَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيَجْعَلَ عَلَيْكُمْ مِنْ حَرَجٍ وَلَكِنْ يُرِيدُ لِيُطَهِّرَكُمْ وَلِيُتِمَّ نِعْمَتَهُ عَلَيْكُمْ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ
“হে বিশ্বাসীগণ! যখন তোমরা সলাতের জন্য প্রস্তুত হবে, তখন তোমরা তোমাদের মুখমণ্ডল ও কনুই পর্যন্ত হাত ধৌত করো; তোমাদের মাথা মাসাহ করো; পা টাখনু পর্যন্ত ধৌত করো। আর যদি তোমরা অপবিত্র থাকো, তাহলে বিশেষভাবে (গোসল করে) পবিত্র হও। যদি তোমরা পীড়িত হও অথবা সফরে থাকো অথবা তোমাদের কেউ প্রস্রাব-পায়খানা হতে আগমন করে, অথবা তোমরা স্ত্রী-সহবাস করো এবং পানি না পাও, তাহলে পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করো; তা দিয়ে তোমাদের মুখমণ্ডল ও হস্তদ্বয় মাসাহ করো। আল্লাহ তোমাদেরকে কোনো প্রকার কষ্ট দিতে চান না বরং তিনি তোমাদেরকে পবিত্র করতে চান ও তোমাদের প্রতি তাঁর অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করতে চান। যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করো।" [সূরা মায়িদাহ : ৬] আল্লাহর রসূল এর বাণী:
لَا تُقْبَلُ صَلَاةٌ بِغَيْرِ طُهُورٍ وَلَا صَدَقَةٌ مِنْ غُلُولٍ
“পবিত্রতা ব্যতীত সলাত কবুল হয় না। খিয়ানতের সম্পদ থেকে সাদকাও কবুল হয় না।”৬৫ তিনি আরও বলেন: لَا تُقْبَلُ صَلَاةُ مَنْ أَحْدَثَ حَتَّى يَتَوَضَّأَ
“যে ব্যক্তি অপবিত্র (মলমূত্র বা এমন ছোটো কারণের অপবিত্রতা) হয় তার সলাত কবুল হবে না, যতক্ষণ না সে ওযু করে।”৬৬
মুসলমানদের কেউ এর বিপরীত কোনো কিছু বর্ণনা করেননি। ফলে কুরআন-সুন্নাহ এবং ইজমার দ্বারা ওযু শরীয়ত সম্মত হওয়া প্রমাণিত হয়েছে।
যার উপর ওযু করা ওয়াজিব: প্রাপ্তবয়স্ক জ্ঞানী, মুসলিম যখন নামযের ইচ্ছা করবে অথবা সলাতের নামান্তর কোনো ইবাদতে ইচ্ছা করবে তখন তার উপর ওযু করা ওয়াজিব হবে।
যখন ওয়াজিব: যখন সলাতের সময় হবে তখন ওযু করা ওয়াজিব: অথবা যে সমস্ত ইবাদতের জন্য ওযু করা শর্ত করা হয়েছে সে কাজগুলো যখন মানুষ করবে (যদিও এই ইবাদতগুলোর জন্য সময় নির্ধারিত নেই) তখন ওযু করা ওয়াজিব হবে। যেমন- তাওয়াফ করা, কুরআন মাজীদ স্পর্শ করা।

টিকাঃ
৬৫. সহীহ মুসলিম, হা, ৪৬৫, ফুআ, ২২৪; الفلول: গনিমত বা অন্য মাল থেকে চুরি করা।
৬৬. সহীহুল বুখারী, হা. ১৩৫。
'নিঃশব্দে বা সশব্দে বায়ু বের হওয়াকে হাদাস বলে।'

📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার 📄 ওযুর শর্তসমূহ

📄 ওযুর শর্তসমূহ


ক. মুসলিম, জ্ঞানী এবং ভালো মন্দের মাঝে পার্থক্যকারী হওয়া: সুতরাং কোনো কাফেরের ওযু সঠিক হবে না। অনুরূপ পাগলের ওযুও সঠিক হবে না। এমনিভাবে যে ছোটো শিশু ভালো-মন্দের পার্থক্য করার বয়সে উপনীত হয়নি তার ওযুও ধর্তব্য নয়।
খ. নিয়ত করা: আল্লাহর রসূল বলেছেন: "إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ "প্রত্যেক কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল।" নাবী হতে সাব্যস্ত না হওয়ার কারণে মুখে ওযুর নিয়ত উচ্চারণ করা শরীয়ত সম্মত নয়।
গ. পানি পবিত্র হওয়া: এর আলোচনা পূর্বে পানির অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে। অপবিত্র পানি দিয়ে ওযু শুদ্ধ হবে না।
ঘ. মোম, আটা বা এ জাতীয় জিনিস যা চামড়ায় পানি পৌঁছাতে বাধা প্রদান করে তা দূর করা: যেমন নেইল পালিশ, যা বর্তমানে মহিলাদের মাঝে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পরেছে।
ঙ. পূর্বে উল্লিখিত বিষয়গুলো পাওয়া সাপেক্ষে পানি অথবা ঢিলা কুলুখ ব্যবহার করে পবিত্রতা হওয়া।
চ. ধারাবাহিকতা রক্ষা করা (এক অঙ্গ শুকানোর পূর্বেই আরেক অঙ্গ ধৌত করা)।
ছ. পরম্পরা কাজগুলো করা। এই দুই বিষয়ে কিছু পরেই আলোচনা আসবে।
জ. সকল আবশ্যকীয় অঙ্গ-প্রতঙ্গগুলো ধৌত করা।

📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার 📄 ওযুর ফরযসমূহ (মোট ৬টি)

📄 ওযুর ফরযসমূহ (মোট ৬টি)


১. পরিপূর্ণভাবে চেহারা ধৌত করা। আল্লাহ তা'আলা বলেন: إِذَا قُمْتُمْ إِلَى الصَّلَاةِ فَاغْسِلُوا وُجُوهَكُمْ “যখন তোমরা সালাতের জন্য প্রস্তুত হবে, তোমরা তোমাদের মুখমণ্ডল ধৌত করো।” [সূরা মায়িদাহ: ৬] কুলি করা, নাকে পানি দেওয়া, চেহারার অন্তর্ভুক্ত। মুখ এবং নাক চেহারার অন্তর্ভুক্ত।
২. কনুই পর্যন্ত দুই হাত ধৌত করা। আল্লাহ তা'আলা বলেন : ﴾وَأَيْدِيَكُمْ إِلَى الْمَرَافِقِ﴿ “কনুই পর্যন্ত হাত ধৌত করো।” [সূরা মায়িদাহ: ৬]
৩. দুই কানসহ পুরো মাথা মাসাহ করা। আল্লাহ বলেন : ﴾وَامْسَحُوا بِرُءُوسِكُمْ﴿ “তোমাদের মাথা মাসাহ করো।” [সূরা মায়িদাহ: ৬] আল্লাহর রসূল বলেন: »الْأُذْنَانِ مِنَ الرَّأْسِ« “দুই কান মাথার অন্তর্ভুক্ত।”৬৮ সুতরাং মাথার কিছু অংশ বাদ দিয়ে মাসাহ করলে ওযু হবে না।
৪. টাখনু পর্যন্ত দুই পা ধৌত করা। আল্লাহ তা'আলা বলেন : ﴾وَأَرْجُلَكُمْ إِلَى الْكَعْبَيْنِ﴿ "পা টাখনু পর্যন্ত ধৌত করো।”[সূরা মায়িদাহ: ৬]
৫. ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। কারণ আল্লাহ এগুলো ধারাবাহিকভাবে বর্ণনা করেছেন। রসূল আল্লাহ তা'আলার বর্ণনা অনুপাতে ধারাবাহিকভাবে ওযু করেছেন। আব্দুল্লাহ বিন যায়েদ ও অন্যান্যদের হাদীসে রসূল-এর ওযুর পদ্ধতি এমনভাবেই বর্ণিত হয়েছে।
৬. মুওয়ালাত : কোনো প্রকার বিলম্ব ছাড়াই একটি অঙ্গ ধোয়ার পরে আরেকটি অঙ্গ ধৌত করা। এভাবেই আল্লাহর রসূল একের পর এক অঙ্গ ধৌত করে ওযু করতেন। খালিদ বিন মা'দান হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
عَنْ بَعْضٍ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَأَى رَجُلًا يُصَلِّى وَفِي ظَهْرِ قَدَمِهِ لمُعَةٌ قَدْرُ الدَّرْهَمِ ، لَمْ يُصِبْهَا المَاءُ فَأَمَرَهُ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يُعِيدَ الْوُضُوءَ وَالصَّلَاةَ
“নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কিছু সাহাবী সূত্রে বর্ণিত। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দেখলেন, এক ব্যক্তি সালাত আদায় করছে, অথচ তার পায়ের উপরিভাগে এক দিরহাম পরিমাণ স্থান শুকনো, (ওযুর সময়) তাতে পানি পৌঁছায়নি। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে পুনরায় ওযু করে সালাত আদায়ের নির্দেশ দিলেন।”৭০
যদি একের পর এক অঙ্গ বিলম্ব ছাড়াই ধৌত করা শর্ত না হতো তাহলে তিনি তাকে ছুটে যাওয়া স্থানটুকু ধোয়ার নির্দেশ দিতেন। কিন্তু তিনি তাকে এমন নির্দেশ প্রদান করেননি বরং তাকে পুনরায় ওযু করার আদেশ দিয়েছেন।
আল্লুমআতুল্লুমআহ হলো: ওযু অথবা গোসলে ছুটে যাওয়া স্থান যেখানে পানি পৌঁছায়নি।

টিকাঃ
৬৮. তিরমিযী, হা. ৩৭, ইবনু মাজাহ, হা. ৪৪১。
৬৯. সহীহ মুসলিম, হা. ৪৪৩, ফুআ. ২৩৫。
৭০. আহমাদ ৩/৪২৪, আবু দাউদ, হা. ১৭৫, ইরওয়াউল গালীল: ১/১২৭।

ফন্ট সাইজ
15px
17px
🎤 ভাষা বেছে নিন
🇧🇩
বাংলা
Bengali
🕌
আরবি
العربية