📄 পবিত্রতা অর্জনের ক্ষেত্রে স্বর্ণ-রৌপ্য এবং অন্যান্য জিনিস দ্বারা তৈরী পাত্রের ব্যবহার
খাবার পানাহার এবং অন্যান্য কাজে সকল প্রকার পাত্র ব্যবহার করা বৈধ, যদি সে পাত্র পবিত্র এবং অনুমোদিত হয়। যদি সেটা অনেক দামী হয় তাতেও কোনো সমস্যা নেই। তার মৌলিকত্ব অবশিষ্ট থাকার কারণে সেটা ব্যবহার করা বৈধ হবে; তবে স্বর্ণের এবং রৌপ্যের পাত্র ব্যতীত। বিশেষভাবে স্বর্ণ এবং রৌপ্যের পাত্রে খাওয়া এবং পান করা হারাম তবে অন্যান্য ক্ষেত্রে ব্যবহার করা বৈধ। এ প্রসঙ্গে আল্লাহর রসূল বলেছেন:
لَا تَشْرَبُوا فِي آنِيَةِ الذَّهَبِ وَالفِضَّةِ، ولا تأكلوا في صحافها، فَإِنَّهَا لَهُمْ فِي الدُّنْيَا وَلَكُمْ فِي الْآخِرَةِ
"তোমরা স্বর্ণ এবং রৌপ্যের পাত্রে পান করো না এবং এগুলোর পাত্রে তোমরা আহার করো না। নিশ্চয়ই এগুলো পৃথিবীতে কাফেরদের জন্য আর পরকালে তোমাদের জন্য।”২১
অপর হাদীসে আল্লাহর রসূল বলেছেন: الَّذِي يَشْرَبُ فِي آنِيَةِ الْفِضَّةِ، إِنَّمَا يُجْرْجِرُ فِي بَطْنِهِ نَارَ جَهَنَّمَ "যে ব্যক্তি রুপার পাত্রে পান করে সে যেন তার পেটের মধ্যে জাহান্নামের আগুন প্রবেশ করায়।”২২
এটি স্বর্ণ এবং রৌপ্যের পাত্রে খাওয়া, পান করা হারামের দলীল। তবে অন্যান্য কাজে ব্যবহার করা হারামের দলীল নয়। সুতরাং এটা প্রমাণিত হয় যে, পবিত্রতা অর্জনের ক্ষেত্রে স্বর্ণ এবং রৌপ্যের পাত্র ব্যবহার করা বৈধ।
হাদীসে বর্ণিত নিষেধাজ্ঞাটি (لا تشربوا) সার্বজনীন। সেটা স্বর্ণ-রৌপ্যের পাত্র, স্বর্ণ-রৌপ্যের প্রলেপ দেওয়া পাত্র এবং যে পাত্রে সামান্য স্বর্ণ-রৌপ্য রয়েছে সে পাত্রকেও অন্তর্ভুক্ত করে।
টিকাঃ
২১. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৫৪২৬, সহীহ মুসলিম, হা. ৫২৮৭, ফুআ, ২০৬৭।
২২. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৫৬৩০, সহীহ মুসলিম, হা. ৫২৭৯, ফুআ. ২০৬৫।
২৩. المموة: প্রলেপ যুক্ত পাত্র।
📄 স্বর্ণ-রৌপ্য দিয়ে জোড়া দেওয়া পাত্র ব্যবহারের বিধান
যদি স্বর্ণ দিয়ে কোনো ভাঙ্গা পাত্রকে জোড়া লাগানো হয় তাহলে (নিষেধাজ্ঞা সূচক দলীলের মধ্যে প্রবেশ করার কারণে) সে পাত্র ব্যবহার করা হারাম। তবে যদি কোনো পাত্রকে রৌপ্য দিয়ে জোড়া দেওয়া হয় আর রৌপ্যের পরিমাণ যদি সামান্য হয় তাহলে সে পাত্র ব্যবহার করা জায়েয। এই মর্মে আনাস হতে হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন:
انْكَسَرَ قَدَحَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، فَاتَّخَذَ مَكَانَ الشَّعْبِ سِلْسِلَةٌ مِنْ فِضَّةٍ
"নাবী এর পেয়ালা ভেঙ্গে গেল। অতঃপর তিনি ভাঙ্গা জায়গায় রুপার পাত দিয়ে জোড়া লাগিয়ে দিলেন। "২৫
টিকাঃ
২৪. التضبيب : ভাঙ্গা পাত্রকে লোহা বা অন্য কিছু দিয়ে জোড়া দেয়া।
২৫. সহীহুল বুখারী, হা. ৩১০৯।
📄 কাফেরদের পাত্র
কাফেরদের পাত্রের ক্ষেত্রে শরীয়তের দৃষ্টিভঙ্গি হলো, তা হালাল যতক্ষণ না তার নাপাকী সম্পর্কে জানা যায়। যদি নাপাকি জানা যায় তাহলে ধোয়া ছাড়া তাদের পাত্র ব্যবহার করা বৈধ নয়। এই প্রসঙ্গে আবু ছালাবা আল খুশানী হতে হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন,
قُلْتُ: يَا نَبِيَّ اللَّهِ، إِنَّا بِأَرْضِ قَوْمٍ مِنْ أَهْلِ الكِتَابِ، أَفَنَأْكُلُ فِي آنِيَتِهِمْ؟ قال: لا تأكلوا فيها إلا ان تجدوا غيرها فاغسلواها ثم كلوا فيها
"আমি বললাম, হে আল্লাহর নাবী! আমরা আহলে কিতাব অধ্যুষিত এলাকায় বসবাস করি। আমরা কি তাদের পাত্রে আহার করতে পারবো? তিনি বলেন: তোমরা সেগুলোতে খাবে না। তবে তোমরা যদি অন্য পাত্র না পাও তাহলে খেতে পারো, তা ধুয়ে নিয়ে খাবে।”২৬
যদি তাদের পাত্রের নাপাকি সম্পর্কে জানা না যায়, অর্থাৎ তারা এমন শ্রেণির হয় যারা সরাসরি নাপাকির সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার দিক থেকে প্রসিদ্ধ নয়, তাদের পাত্র ব্যবহার করা বৈধ। কারণ একথা প্রমাণিত যে, আল্লাহর রসূল এবং তার সাহাবীগণ একজন মুশরিক মহিলার মশক থেকে ওযু করার জন্য পানি নিয়েছিলেন। ২৭ এছাড়াও আল্লাহ তা'আলা আমাদের জন্য আহলে কিতাবদের খাবার হালাল করে দিয়েছেন। কখনো কখনো তারা আমাদেরকে তাদের পাত্রে খাবার পরিবেশন করে। যেমন : একজন ইহুদি দাস আল্লাহর রসূল কে যবের রুটি এবং গন্ধযুক্ত চর্বি খাবার খাওয়ার দাওয়াত দিলেন। অতঃপর আল্লাহর রসূল তা খেলেন। ২৮
টিকাঃ
২৬. মুত্তাফাকুন আলাইহি : সহীহুল বুখারী, হা. ৫৪৭৮, সহীহ মুসলিম, হা. ৪৮৭৭, ফুআ. ১৯৩০।
২৭. মুত্তাফাকুন আলাইহি : সহীহুল বুখারী, হা. ৩৪৪, সহীহ মুসলিম, হা. ১৪৪৯, ফুআ. ৬৮২।
* চাদ বড়ো মশক।
২৮. আহমাদ ৩/২১০, ২১১, ইরওয়াউল গালীলে আলবানী এটাকে সহীহ বলেছেন : ১/৭১।
* মাকা : চর্বি, তেল, মالسخ : গন্ধ, বাসীগন্ধ।
📄 মৃত প্রাণির চামড়া থেকে তৈরী পাত্রে পবিত্রতা অর্জন
মৃত প্রাণির চামড়া যখন পক্রিয়াজাত করা হয় তখন সেটা পবিত্র হয়ে যায় এবং তা ব্যবহার করা বৈধ। আল্লাহর রসূল এর হাদীস : أَيُّمَا إِهَابٍ دُبِغَ فَقَدْ طَهُرَ
"কাঁচা চামড়া যখন দাবাগত বা প্রক্রিয়াজাত করা হয় তখন সেটা পবিত্র হয়ে যায়।"৩০ নাবী একদিন একটি মৃত ছাগলের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। অতঃপর বললেন:
هَلَّا أَخَذُوا إِهَابَهَا فَدَبَغُوهُ، فَانْتَفَعُوا بِهِ؟ فَقَالُوا: إِنَّهَا مَيْتَةٌ. قَالَ: إِنَّمَا حُرِّمَ أَكْلُهَا
"কেন তারা এর (ছাগলের) চামড়া খুলে নিয়ে প্রক্রিয়াজাত করে তা দ্বারা উপকার গ্রহণ করল না! তারা বললেন, এটা তো মৃত। তিনি বললেন: মৃত জীব খাওয়া হারাম।"৩১ এই বিধান ঐ মৃত প্রাণির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যেটা জবাই করা জায়েয। আর যে প্রাণী জবাই করা জায়েয না তার চামড়াও নাপাক।
মৃত প্রাণির চুল ও পশম পবিত্র অর্থাৎ জীবিত অবস্থায় যে প্রাণির গোশত খাওয়া বৈধ মৃত অবস্থায় সেই প্রাণির চুল ও পশম পবিত্র। তবে জবাই ছাড়া মারা গেলে তার গোশত নাপাক, খাওয়া হারাম। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
إِلَّا أَنْ يَكُونَ مَيْتَةً أَوْ دَمًا مَسْفُوحًا أَوْ لَحْمَ خِنْزِيرٍ فَإِنَّهُ رِجْسٌ)
"মৃত প্রাণী, প্রবাহিত রক্ত ও শুকরের গোশত ব্যতীত। নিশ্চয়ই এগুলো অপবিত্র।” [সুরা আনআম : ১৪৫]
পানির সাথে মিশ্রিত দ্রব্যের মাধ্যমে চামড়ায় থাকা ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কারের মাধ্যমে চামড়া শোধন করা হয়। যেমন- লবন এবং এ জাতীয় পদার্থ অথবা পরিচিত উদ্ভিদ। যেমন: বাবলা গাছ, জুনিপার গাছ এবং অন্যান্য গাছ। তবে যে প্রাণী জবাই করা বৈধ নয় সে প্রাণির চামড়াও পবিত্র নয়। এর উপর ভিত্তি করে বলা যায়, বিড়ালের চামড়া এবং এ জাতীয় পশুর চামড়া শোধন করলে পবিত্র হবে না। যদি সে প্রাণী জীবিত অবস্থায় পবিত্র ছিল। জীবিত অবস্থায় পবিত্র অথচ তার গোশত খাওয়া হয় না এমন প্রাণির চামড়া পাকা করণের দ্বারা পবিত্র হবে না।
সারকথা: গোশত খাওয়া হয় এমন প্রত্যেক মৃত প্রাণির চামড়া পাকা করণের দ্বারা চামড়া পবিত্র হবে আর গোশত খাওয়া হয় না এমন প্রত্যেক মৃত প্রাণির চামড়া পাকা করলেও পবিত্র হবে না।
টিকাঃ
২৯. টীকা: কাঁচা চামড়া।
৩০. তিরমিযী, হা. ১৬৫০, সহীহ মুসলিম, হা. ৬৯৮, ফুআ, ৩৬৬, তার শব্দ: اذا ديغ الاهاب فقد طهر।
৩১. সহীহ মুসলিম, হা. ৬৯৬, ফুআ. ৩৬৬, ইবনু মাজাহ, হা. ৩৬১০।