📄 যেসকল পানি দ্বারা পবিত্রতা অর্জন হয়
পবিত্রতা অর্জনের জন্য এমন জিনিস প্রয়োজন যার দ্বারা পবিত্রতা অর্জন, নাপাকি ও অপবিত্রতা অপসারণ করা সম্ভব। আর সেই জিনিস হলো পানি। যে পানি দ্বারা পবিত্রতা অর্জন হয় সেটি হলো, الماء الطهور বা এমন পানি যা নিজে পবিত্র এবং অন্যকে পবিত্রকারী। সেই পানিতে তার সৃষ্টির মৌলিকত্ব অবশিষ্ট থাকে অর্থাৎ যে গুণাবলী দিয়ে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে সেই গুণাবলী তার মাঝে বিদ্যমান থাকে। চাই সেটা আকাশ থেকে বর্ষিত পানি হোক; যেমন- বৃষ্টির পানি, বরফ গলা পানি, শিশিরের পানি। অথবা জমিনে প্রবাহিত পানি হোক; যেমন- নদীর পানি, ঝর্ণার পানি, পুকুরের পানি এবং সমুদ্রের পানি। মহামহিয়ান আল্লাহর বাণী:
﴿وَيُنَزِّلُ عَلَيْكُمْ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً لِيُطَهِّرَكُمْ بِهِ﴾ "তিনি তোমাদের উপর আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষন করেন তা দ্বারা তোমাদেরকে পবিত্র করার জন্য।” [সূরা আনফাল: ১১]
অন্যত্র আল্লাহ তা'আলা বলেন: ﴿وَأَنْزَلْنَا مِنَ السَّمَاءِ مَاءً طَهُورًا﴾ "আমি আকাশ হতে পবিত্র পানি বর্ষন করেছি।" [সূরা ফুরক্বান: ৪৮]
আল্লাহর রসুল এর বাণী: اللهُمَّ اغْسِلْنِي مِنْ خَطَايَايَ بِالثَّلْجِ وَالْمَاءِ وَالْبَرَدِ “হে আল্লাহ! তুমি আমার গুনাহগুলো পানি, বরফ এবং শিশির দ্বারা ধুয়ে দাও।”
অন্যত্র আল্লাহর রসূল সমুদ্রের পানি সম্পর্কে বলেন: هُوَ الطَّهُورُ مَاؤُهُ الْحِلُّ مَيْتَتُهُ "সমুদ্রের পানি পবিত্র এবং তার মৃত প্রাণী হালাল।"
উপরিউক্ত গুণসম্পন্ন পানি ছাড়া অন্য তরল পদার্থ দ্বারা পবিত্রতা অর্জন হবে না। যেমন- সিরকা, পেট্রোল, জুস, লেবু পানি এবং এগুলোর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ পানি। এই মর্মে আল্লাহ তা'আলা বলেন: ﴿فَلَمْ تَجِدُوا مَاءً فَتَيَمَّمُوا صَعِيدًا طَيِّبًا﴾ "যদি তোমরা পানি না পাও তাহলে পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করো।"[সূরা মায়িদাহ: ৬]
যদি প্রকৃত পানি ছাড়া অন্য কোনো তরল পদার্থ দ্বারা পবিত্রতা অর্জন হতো, তাহলে আয়াতটিতে সেটার প্রতি ইঙ্গিত করা হতো। (উপরিউক্ত আয়াতে) অন্য পানির দিকে ইঙ্গিত না করে মাটির দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
টিকাঃ
মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৭৪৪; সহীহ মুসলিম, হা. ১২৪১, ফুআ, ৫৯৮।
সুনান আবু দাউদ, হা. ৮৩, তিরমিযী, হা. ৬৯, নাসাঈ, হা. ৫৯, ইবনু মাজাহ, হা. ৩২৪৬। ইমাম তিরমিযী বলেন: হাসান সহীহ। আলবানী এটাকে সহীহ বলেছেন: সহীহ সুনান নাসাঈ ৫৮।
📄 পানির সাথে নাপাকি মিশ্রিত হওয়া
পানির সাথে যদি নাপাকি মিশ্রিত হয়ে তার তিনটি গুণের যে কোনো একটি (গন্ধ, স্বাদ এবং রং) পরিবর্তন হয়ে যায়, তাহলে সে পানি সকলের ঐকমত্যে নাপাক, তা ব্যবহার করা বৈধ নয়। চাই সে পানি কম বা বেশি হোক। তা অপবিত্রতা দূরীভূত করতে পারবে না।
অপরদিকে যদি পানিতে নাপাকি মিশ্রিত হয় আর পানির তিনটি গুণের কোনো একটি পরিবর্তন না হয় (তাহলে দুই অবস্থা); যদি পানি বেশি হয় তাহলে তা অপবিত্র হবে না। সে পানি দিয়ে পবিত্রতা অর্জন করা যাবে। আর যদি পানি কম হয় তাহলে তা অপবিত্র হয়ে যাবে, তার দ্বারা পবিত্রতা অর্জন করা যাবে না। বেশি পানির পরিমাণ হলো দুই কুল্লাহ বা তার চেয়ে বেশি। আর কম এর পরিমাণ হলো দুই কুল্লাহ এর চেয়ে কম পানি।
এর দলীল আবু সাঈদ খুদরী এর হাদীস। তিনি বলেন, রসূল বলেছেন:
إِنَّ الْمَاءَ طَهُورٌ لَا يُنَجِّسُهُ شَيْءٌ "নিশ্চয়ই পানি পবিত্র। তাকে কোনো জিনিস অপবিত্র করতে পারে না।"⁷
ইবনু উমার এর হাদীস; নিশ্চয়ই আল্লাহর রসূল বলেছেন:
إِذَا بَلَغَ الْمَاءُ قُلَّتَيْنِ لَمْ يُنَجِّسْهُ شَيْءٌ "পানির পরিমাণ দুই মটকা হলে তাকে কোনো কিছুতে অপবিত্র করে না।”⁸
টিকাঃ
* মাত্রাঃ কুল্লাহ হলো- কলসী, মটকা। এর বহু বচন হলো قلال। দুই কুল্লাহ এর পরিমাণ প্রায় ৯৩.০৭৫ সা = ১৬০.৫ লিটার পানি। দুই কুল্লাহ প্রায় ৫ মশক পানি।
৭. আহমাদ: ৩/১৫, সুনান আবু দাউদ, হা. ৬১, সুনান নাসাঈ, হা. ২৭৭, তিরমিযী, হা. ৬৬, ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। আলবানী ইরওয়াউল গালীলে সহীহ বলেছেন: ১/৪৫।
৮. আহমাদঃ ২/২৭, সুনান আবু দাউদ, হা. ৬৩, তিরমিযী, হা. ৬৭; সুনানুন নাসাঈ, হা. ৫২; ইবনু মাজাহ, হা. ৫১৭, ইবনু মাজাহর শব্দঃ اذا كان الماء قلتين لم ينجسه شبئ ইরওয়াউল গালীলে আলবানী এই হাদীসকে সহীহ বলেছেন ১/৪৫।
📄 পানিতে যদি কোনো পবিত্র জিনিস মিশ্রিত হয়
পানিতে যদি কোনো পবিত্র জিনিস মিশ্রিত হয়, যেমন গাছের পাতা, সাবান, ক্ষার, বরই পাতা; এছাড়া অন্য কোনো পবিত্র জিনিস, আর মিশ্রিত পবিত্র জিনিসটা যদি পানিতে প্রভাব বিস্তার না করে তাহলে সঠিক কথা হলো সে পানি পবিত্র। তার দ্বারা নাপাকি, অপবিত্রতা, আবর্জনা থেকে পবিত্রতা অর্জন করা বৈধ। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন:
﴿وَإِنْ كُنْتُمْ مَرْضَى أَوْ عَلَى سَفَرٍ أَوْ جَاءَ أَحَدٌ مِنْكُمْ مِنَ الْغَائِطِ أَوْ لَامَسْتُمُ النِّسَاءَ فَلَمْ تَجِدُوا مَاءً فَتَيَمَّمُوا صَعِيدًا طَيِّبًا فَامْسَحُوا بِوُجُوهِكُمْ وَأَيْدِيكُمْ﴾
“যদি তোমরা অসুস্থ হও অথবা সফরে থাকো অথবা তোমাদের কেউ শৌচাগার থেকে আসে অথবা তোমরা নারী সম্ভোগ করো এবং পানি না পাও, তাহলে তোমরা পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করো। সুতরাং তোমরা তেমাদের চেহারা ও হাত মাসাহ করো।” [সূরা নিসা: ৪৩]
আয়াতটিতে ماء শব্দটি نكرة (অনির্দিষ্ট), ফলে সকল প্রকার পানি এর অন্তর্ভুক্ত। বিশুদ্ধ পানি আর মিশ্রিত পানির মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। এর প্রমাণ হলো, আল্লাহর রসূল তার কন্যাকে গোসল দানকারিণী মহিলাদেরকে বললেন:
اغْسِلْنَهَا ثَلاثًا ، أَوْ خَمْسًا أَوْ أَكْثَرَ مِنْ ذَلِكَ، إِنْ رَأَيْتُنَّ بِمَاءٍ وَسِدْرٍ ، وَاجْعَلْنَ فِي الْآخِرَةِ كَافُورًا أَوْ شَيْئًا مِنْ كَافُورٍ
“তোমরা তাকে তিনবার বা পাঁচবার বা প্রয়োজন মনে করলে তার চেয়ে অধিকবার বরই পাতাসহ পানি দিয়ে গোসল দাও। শেষ বারে কপূর বা (তিনি বলেছেন) কিছু কপূর ব্যবহার করো।”
টিকাঃ
* এটা হলো এক প্রকার এসিড, যার দ্বারা হাত ধোয়া হয়, এটা আরবীতে اشنان বলা হয়। اشنان শব্দটিতে আলিফের নিচে যের দিয়েও পড়া হয়।
* মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ১২৫৩, ১২৫৮, ১২৫৭; সহীহ মুসলিম, হা. ২০৫৭, ফুআ, ৯৩৯।
📄 পবিত্রতা অর্জনের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত পানির বিধান
ওযু এবং গোসলের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ থেকে ঝরে পড়া পানিকে ব্যবহৃত পানি বলা হয়। সঠিক মত অনুযায়ী পবিত্রতা অর্জনের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত পানি নিজে পবিত্র এবং অন্যকে পবিত্রকারী। সে পানি অপবিত্রতাকে অপসারণ করে এবং নাপাকি দূর করে যতক্ষণ না তার তিনটি গুণাবলির একটি পরিবর্তিত হয়: গন্ধ, স্বাদ, রঙ। ব্যবহৃত পানি পবিত্র হওয়ার দলীল:
أَنَّ رَسُولَ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ وَإِذَا تَوَضَّأَ كَادُوا يَقْتَتِلُونَ عَلَى وَضُونِهِ “নাবী যখন ওযু করতেন তখন তার ব্যবহৃত পানির উপর সাহাবীগণ যেন হুমড়ি খেয়ে পড়তেন।”
এ ছাড়াও জাবির যখন অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলেন তখন তিনি তাঁর ওযুর পানি তাঁর শরীরে ঢেলে দিয়েছিলেন।”
যদি ব্যবহৃত পানি নাপাক হতো তাহলে সাহাবীদের ওযুর পানি নিয়ে কাড়াকাড়ি করা, জাবির এর শরীরে ওযুর পানি ঢেলে দেওয়া বৈধ হতো না।
এছাড়াও নাবী ; তাঁর সাহাবীগণ এবং তাঁর স্ত্রীগণ পেয়ালা ও পানি পান করার পাত্রে ওযু করতেন এবং গামলায় গোসল করতেন। যে পাত্রগুলোতে তারা ওযু গোসল করতেন সে পাত্রগুলো ব্যবহৃত পানির ছিটা-ফোঁটা পড়া থেকে মুক্ত নয়।
এ ছাড়া নাবী আবু হুরায়রা কে একদিন বলেছিলেন (আবু হুরায়রা তখন অপবিত্র ছিলেন) : إِنَّ الْمُؤْمِنَ لَا يَنْجُسُ "মুমিন অপবিত্র হয় না।”১২
যেহেতু মুমিন নাপাকই হয় না, সেহেতু মানুষ শুধুমাত্র পানি স্পর্শ করার কারণেই পানি তার পবিত্রতা হারাবে না।
টিকাঃ
* সহীহুল বুখারী, হা, ১৮৯।
১১. মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৫৬৫১, সহীহ মুসলিম, হা. ৪০৩৭, ফুআ. ১৬১৬।
* এটা تور এর বহু বচন, অর্থ: পানি পান করার পাত্র।
* এর এক বচন হলো جفنة। অর্থ: গামলা।
১২. সহীহ মুসলিম, হা. ৭১০, ফুআ, ৩৭১।