📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 পবিত্রতার পরিচয়, তার গুরুত্ব ও প্রকারসমূহ

📄 পবিত্রতার পরিচয়, তার গুরুত্ব ও প্রকারসমূহ


১. পবিত্রতার পরিচয় ও তার প্রকারসমূহঃ পবিত্রতা সলাতের চাবি ও গুরুত্বপূর্ণ একটি শর্ত। আর শর্ত সর্বদা মাশরুত (শর্তকৃত বিষয়) এর আগে আসে।
পবিত্রতা দুই প্রকার: প্রথম প্রকার: অভ্যন্তরীণ পবিত্রতা। তা হলো শিরক, পাপাচার এবং যে সকল জিনিস অন্তরে মরিচা ধরায়, তা থেকে অন্তরকে পবিত্র করা। এটা শরীরের পবিত্রতার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শিরকের অপবিত্রতা শরীরে থাকা অবধি শারীরিক পবিত্রতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। যেমন- আল্লাহ তা'আলা বলেন: إِنَّمَا الْمُشْرِكُونَ نَجَسٌ﴿ “নিশ্চয়ই মুশরিকরা অপবিত্র।” [সূরা তাওবাহ : ২৮] দ্বিতীয় প্রকার: বাহ্যিক পবিত্রতা। শীঘ্রই এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা আসবে, ইনশা-আল্লাহ।
২. পবিত্রতার পরিচয় পবিত্রতার শাব্দিক অর্থ: অপরিচ্ছন্নতা, ময়লা থেকে পবিত্রতা অর্জন।
في الاصطلاح : رفع الحدث، وزوال الخبث পারিভাষিক অর্থ: অপবিত্রতা থেকে পবিত্রতা অর্জন করা এবং ময়লা আবর্জনা দূর করা।
ارتفاع الحدث বা অপবিত্রতা দূর করা দ্বারা উদ্দেশ্য: সারা শরীরে পানি ব্যবহারের মাধ্যমে সালাতে বাধা দানকারী জিনিসকে দূর করা, যদি বড়ো অপবিত্রতা হয়। আর যদি সেটা ছোটো অপবিত্রতা হয়, তাহলে ওযুর নিয়ত করে ওযুর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোতে পানি সঞ্চালন করাই যথেষ্ট হবে। যদি পানি না পাওয়া যায় অথবা পানি ব্যবহারে অপারগ হয়, তাহলে পানির স্থলাভিষিক্ত হিসেবে মাটি ব্যবহার করবে। তবে সে মাটি অবশ্যই শরীয়তে বর্ণিত গুণাবলি অনুযায়ী হবে। অচিরেই সে আলোচনা তায়াম্মুমের অধ্যায়ে আসবে, ইনশা-আল্লাহ।
زوال الخبث দ্বারা উদ্দেশ্য: শরীর, কাপড় ও স্থান থেকে নাপাকি দূর করা।
বাহ্যিক পবিত্রতা দুই প্রকার: ১. নাপাকী থেকে পবিত্রতা অর্জন; এটা শরীরের সাথে নির্দিষ্ট। ২. ময়লা-আবর্জনা থেকে পবিত্রতা অর্জন; এটা শরীর, কাপড় এবং স্থানের সাথে নির্দিষ্ট।
حدث বা অপবিত্রতা/নাপাকি দুই প্রকার: ১. ছোটো অপবিত্রতা, যার জন্য ওযু আবশ্যক। ২. বড়ো অপবিত্রতা, যার জন্য গোসল আবশ্যক।
خبث ময়লা-আবর্জনা তিন প্রকার: ১. এমন আবর্জনা যার জন্য গোসল ওয়াজিব; ২. এমন আবর্জনা যার জন্য পানি ছিটানো আবশ্যক; ৩. এমন আবর্জনা যার জন্য মাসাহ করা আবশ্যক।

টিকাঃ
* حدث : শরীরের সাথে লেগে থাকা কোনো জিনিস যা সলাত বা এই জাতীয় ইবাদত থেকে বাধা প্রদান করে আর এই জন্য পবিত্রতা অর্জন করা শর্ত করা হয়। حدث বা অপবিত্রতা দুই প্রকার: حدث أصغر বা ছোটো অপবিত্রতা। আর সেটা হলো ওযুর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সাথে সম্পৃক্ত। যেমন- পায়খানা প্রস্রাবের রাস্তা দিয়ে কোনো কিছু নির্গত হওয়া। এই প্রকার অপবিত্রতা ওযুর দ্বারা দূর হয়ে যায়। حدث أكبر বা বড়ো অপবিত্রতা: সেটা পুরো শরীরের সাথে সম্পৃক্ত। যেমন-শারীরিকি অপবিত্রতা, এই প্রকার অপবিত্রতা গোসলের দ্বারা দূর হয়। এর উপর ভিত্তি করে বলা যায় طهارة الحدث বা অপবিত্রতার পবিত্রতা দুই প্রকার: বড়ো অপবিত্রতা; তাতে গোসল করতে হবে। এবং ছোটো অপবিত্রতা; তাতে ওযু করতে হবে। আর ওযু গোসলে অপারগ ব্যক্তির জন্য সমাধান হলো তায়াম্মুম (দেখুন আশ-শারহুল মুমতি' ১/১৯; আল ফিকহুল ইসলামী ওয়া আদিল্লাতুহু ১/২৩৮)। الخيث অর্থ নাপাকি: শীঘ্রই তার আলোচনা আসবে।

📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 যেসকল পানি দ্বারা পবিত্রতা অর্জন হয়

📄 যেসকল পানি দ্বারা পবিত্রতা অর্জন হয়


পবিত্রতা অর্জনের জন্য এমন জিনিস প্রয়োজন যার দ্বারা পবিত্রতা অর্জন, নাপাকি ও অপবিত্রতা অপসারণ করা সম্ভব। আর সেই জিনিস হলো পানি। যে পানি দ্বারা পবিত্রতা অর্জন হয় সেটি হলো, الماء الطهور বা এমন পানি যা নিজে পবিত্র এবং অন্যকে পবিত্রকারী। সেই পানিতে তার সৃষ্টির মৌলিকত্ব অবশিষ্ট থাকে অর্থাৎ যে গুণাবলী দিয়ে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে সেই গুণাবলী তার মাঝে বিদ্যমান থাকে। চাই সেটা আকাশ থেকে বর্ষিত পানি হোক; যেমন- বৃষ্টির পানি, বরফ গলা পানি, শিশিরের পানি। অথবা জমিনে প্রবাহিত পানি হোক; যেমন- নদীর পানি, ঝর্ণার পানি, পুকুরের পানি এবং সমুদ্রের পানি। মহামহিয়ান আল্লাহর বাণী:
﴿وَيُنَزِّلُ عَلَيْكُمْ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً لِيُطَهِّرَكُمْ بِهِ﴾ "তিনি তোমাদের উপর আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষন করেন তা দ্বারা তোমাদেরকে পবিত্র করার জন্য।” [সূরা আনফাল: ১১]
অন্যত্র আল্লাহ তা'আলা বলেন: ﴿وَأَنْزَلْنَا مِنَ السَّمَاءِ مَاءً طَهُورًا﴾ "আমি আকাশ হতে পবিত্র পানি বর্ষন করেছি।" [সূরা ফুরক্বান: ৪৮]
আল্লাহর রসুল এর বাণী: اللهُمَّ اغْسِلْنِي مِنْ خَطَايَايَ بِالثَّلْجِ وَالْمَاءِ وَالْبَرَدِ “হে আল্লাহ! তুমি আমার গুনাহগুলো পানি, বরফ এবং শিশির দ্বারা ধুয়ে দাও।”
অন্যত্র আল্লাহর রসূল সমুদ্রের পানি সম্পর্কে বলেন: هُوَ الطَّهُورُ مَاؤُهُ الْحِلُّ مَيْتَتُهُ "সমুদ্রের পানি পবিত্র এবং তার মৃত প্রাণী হালাল।"
উপরিউক্ত গুণসম্পন্ন পানি ছাড়া অন্য তরল পদার্থ দ্বারা পবিত্রতা অর্জন হবে না। যেমন- সিরকা, পেট্রোল, জুস, লেবু পানি এবং এগুলোর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ পানি। এই মর্মে আল্লাহ তা'আলা বলেন: ﴿فَلَمْ تَجِدُوا مَاءً فَتَيَمَّمُوا صَعِيدًا طَيِّبًا﴾ "যদি তোমরা পানি না পাও তাহলে পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করো।"[সূরা মায়িদাহ: ৬]
যদি প্রকৃত পানি ছাড়া অন্য কোনো তরল পদার্থ দ্বারা পবিত্রতা অর্জন হতো, তাহলে আয়াতটিতে সেটার প্রতি ইঙ্গিত করা হতো। (উপরিউক্ত আয়াতে) অন্য পানির দিকে ইঙ্গিত না করে মাটির দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।

টিকাঃ
মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ৭৪৪; সহীহ মুসলিম, হা. ১২৪১, ফুআ, ৫৯৮।
সুনান আবু দাউদ, হা. ৮৩, তিরমিযী, হা. ৬৯, নাসাঈ, হা. ৫৯, ইবনু মাজাহ, হা. ৩২৪৬। ইমাম তিরমিযী বলেন: হাসান সহীহ। আলবানী এটাকে সহীহ বলেছেন: সহীহ সুনান নাসাঈ ৫৮।

📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 পানির সাথে নাপাকি মিশ্রিত হওয়া

📄 পানির সাথে নাপাকি মিশ্রিত হওয়া


পানির সাথে যদি নাপাকি মিশ্রিত হয়ে তার তিনটি গুণের যে কোনো একটি (গন্ধ, স্বাদ এবং রং) পরিবর্তন হয়ে যায়, তাহলে সে পানি সকলের ঐকমত্যে নাপাক, তা ব্যবহার করা বৈধ নয়। চাই সে পানি কম বা বেশি হোক। তা অপবিত্রতা দূরীভূত করতে পারবে না।
অপরদিকে যদি পানিতে নাপাকি মিশ্রিত হয় আর পানির তিনটি গুণের কোনো একটি পরিবর্তন না হয় (তাহলে দুই অবস্থা); যদি পানি বেশি হয় তাহলে তা অপবিত্র হবে না। সে পানি দিয়ে পবিত্রতা অর্জন করা যাবে। আর যদি পানি কম হয় তাহলে তা অপবিত্র হয়ে যাবে, তার দ্বারা পবিত্রতা অর্জন করা যাবে না। বেশি পানির পরিমাণ হলো দুই কুল্লাহ বা তার চেয়ে বেশি। আর কম এর পরিমাণ হলো দুই কুল্লাহ এর চেয়ে কম পানি।
এর দলীল আবু সাঈদ খুদরী এর হাদীস। তিনি বলেন, রসূল বলেছেন:
إِنَّ الْمَاءَ طَهُورٌ لَا يُنَجِّسُهُ شَيْءٌ "নিশ্চয়ই পানি পবিত্র। তাকে কোনো জিনিস অপবিত্র করতে পারে না।"⁷
ইবনু উমার এর হাদীস; নিশ্চয়ই আল্লাহর রসূল বলেছেন:
إِذَا بَلَغَ الْمَاءُ قُلَّتَيْنِ لَمْ يُنَجِّسْهُ شَيْءٌ "পানির পরিমাণ দুই মটকা হলে তাকে কোনো কিছুতে অপবিত্র করে না।”⁸

টিকাঃ
* মাত্রাঃ কুল্লাহ হলো- কলসী, মটকা। এর বহু বচন হলো قلال। দুই কুল্লাহ এর পরিমাণ প্রায় ৯৩.০৭৫ সা = ১৬০.৫ লিটার পানি। দুই কুল্লাহ প্রায় ৫ মশক পানি।
৭. আহমাদ: ৩/১৫, সুনান আবু দাউদ, হা. ৬১, সুনান নাসাঈ, হা. ২৭৭, তিরমিযী, হা. ৬৬, ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। আলবানী ইরওয়াউল গালীলে সহীহ বলেছেন: ১/৪৫।
৮. আহমাদঃ ২/২৭, সুনান আবু দাউদ, হা. ৬৩, তিরমিযী, হা. ৬৭; সুনানুন নাসাঈ, হা. ৫২; ইবনু মাজাহ, হা. ৫১৭, ইবনু মাজাহর শব্দঃ اذا كان الماء قلتين لم ينجسه شبئ ইরওয়াউল গালীলে আলবানী এই হাদীসকে সহীহ বলেছেন ১/৪৫।

📘 ফিকহুল মুয়াসস্যার > 📄 পানিতে যদি কোনো পবিত্র জিনিস মিশ্রিত হয়

📄 পানিতে যদি কোনো পবিত্র জিনিস মিশ্রিত হয়


পানিতে যদি কোনো পবিত্র জিনিস মিশ্রিত হয়, যেমন গাছের পাতা, সাবান, ক্ষার, বরই পাতা; এছাড়া অন্য কোনো পবিত্র জিনিস, আর মিশ্রিত পবিত্র জিনিসটা যদি পানিতে প্রভাব বিস্তার না করে তাহলে সঠিক কথা হলো সে পানি পবিত্র। তার দ্বারা নাপাকি, অপবিত্রতা, আবর্জনা থেকে পবিত্রতা অর্জন করা বৈধ। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন:
﴿وَإِنْ كُنْتُمْ مَرْضَى أَوْ عَلَى سَفَرٍ أَوْ جَاءَ أَحَدٌ مِنْكُمْ مِنَ الْغَائِطِ أَوْ لَامَسْتُمُ النِّسَاءَ فَلَمْ تَجِدُوا مَاءً فَتَيَمَّمُوا صَعِيدًا طَيِّبًا فَامْسَحُوا بِوُجُوهِكُمْ وَأَيْدِيكُمْ﴾
“যদি তোমরা অসুস্থ হও অথবা সফরে থাকো অথবা তোমাদের কেউ শৌচাগার থেকে আসে অথবা তোমরা নারী সম্ভোগ করো এবং পানি না পাও, তাহলে তোমরা পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করো। সুতরাং তোমরা তেমাদের চেহারা ও হাত মাসাহ করো।” [সূরা নিসা: ৪৩]
আয়াতটিতে ماء শব্দটি نكرة (অনির্দিষ্ট), ফলে সকল প্রকার পানি এর অন্তর্ভুক্ত। বিশুদ্ধ পানি আর মিশ্রিত পানির মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। এর প্রমাণ হলো, আল্লাহর রসূল তার কন্যাকে গোসল দানকারিণী মহিলাদেরকে বললেন:
اغْسِلْنَهَا ثَلاثًا ، أَوْ خَمْسًا أَوْ أَكْثَرَ مِنْ ذَلِكَ، إِنْ رَأَيْتُنَّ بِمَاءٍ وَسِدْرٍ ، وَاجْعَلْنَ فِي الْآخِرَةِ كَافُورًا أَوْ شَيْئًا مِنْ كَافُورٍ
“তোমরা তাকে তিনবার বা পাঁচবার বা প্রয়োজন মনে করলে তার চেয়ে অধিকবার বরই পাতাসহ পানি দিয়ে গোসল দাও। শেষ বারে কপূর বা (তিনি বলেছেন) কিছু কপূর ব্যবহার করো।”

টিকাঃ
* এটা হলো এক প্রকার এসিড, যার দ্বারা হাত ধোয়া হয়, এটা আরবীতে اشنان বলা হয়। اشنان শব্দটিতে আলিফের নিচে যের দিয়েও পড়া হয়।
* মুত্তাফাকুন আলাইহি: সহীহুল বুখারী, হা. ১২৫৩, ১২৫৮, ১২৫৭; সহীহ মুসলিম, হা. ২০৫৭, ফুআ, ৯৩৯।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00