📘 ফিরে এসো নীড়ে 📄 আমাদের প্রত্যাশা

📄 আমাদের প্রত্যাশা


আমাদের প্রত্যাশা—পূর্ণাঙ্গ ইসলামী সমাজ, পূর্ণাঙ্গ মুসলিম সমাজ। যার প্রথম ও প্রধান ভিত্তি হবে মুসলিম পরিবার। যার প্রতিটি সদস্য আল্লাহর আনুগত্যে হবে ঐক্যবদ্ধ। মা বাবার স্নেহ-ছায়া বিরাজমান তাদের মাথার ওপর। তারা পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ। মা বাবার ভালোবাসা তাদের ঘিরে থাকে সর্বক্ষণ। নতুন প্রজন্ম বেড়ে ওঠে আগামী দিনের মহৎ ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের গুণে। তারা গড়তে চায় মুসলিম কীর্তিপ্রাসাদ। যা সুউচ্চ, শানদার। তারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর ঝাণ্ডাকে বুলন্দ করার জন্য। ইসলামের হারানো গৌরব ও মর্যাদা ফিরিয়ে আনার জন্য।

আমরা একটি মুসলিম সমাজ চাই। যেখানে ভালোবাসা হয় আল্লাহর জন্য, রাসূলের জন্য এবং মুমিনদের জন্য। যেখানে মহান আল্লাহর এই বাণীর পাই সফল বাস্তবায়ন:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْكَفِرِينَ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُونِ الْمُؤْمِنِينَ أَتُرِيدُونَ أَنْ تَجْعَلُوْا لِلَّهِ عَلَيْكُمْ سُلْطَنًا مُبِينًا
অর্থ : হে ওই সব লোকেরা, যারা ঈমান এনেছ, তোমরা মুমিনদের বাদ দিয়ে কাফেরদের বন্ধুত্ব গ্রহণ করো না। তোমরা কি নিজেদের বিরুদ্ধে আল্লাহ্র কাছে প্রমাণ প্রতিষ্ঠা করতে চাও? —সূরা নিসা : ১৪৪

মহান আল্লাহ আরও ইরশাদ করেছেন,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا عَدُوِّي وَعَدُوَّكُمْ أَوْلِيَاءَ تُلْقُونَ إِلَيْهِمْ بِالْمَوَدَّةِ وَ قَدْ كَفَرُوْا بِمَا جَاءَكُمْ مِّنَ الْحَقِّ
অর্থ : হে ওই সমস্ত লোকেরা, যারা ঈমান এনেছ, তোমরা আমার শত্রু এবং তোমাদের শত্রুদের বন্ধুত্ব গ্রহণ করো না। তোমরা তাদেরকে ভালোবাসা দেখাবে? অথচ রাসূল যে সত্য নিয়ে আগমন করেছেন, তারা তা অস্বীকার করে। —সূরা মুমতাহিনা : ০১

আমরা এমন একটি সমাজ চাই যার মূল ভিত্তি হলো—আল্লাহর জন্য ভ্রাতৃত্ব এবং ভালোবাসা। যা সাম্প্রদায়িকতা ও গোঁড়ামিমুক্ত। মহান আল্লাহর বাণীর বাস্তবায়নে–
وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنْتُمْ أَعْدَاءً فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ فَأَصْبَحْتُمْ بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا وَكُنْتُمْ عَلَى شَفَا حُفْرَةٍ مِنَ النَّارِ فَأَنْقَذَكُمْ مِنْهَا كَذَلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ أَيْتِهِ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ
অর্থ : তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে আঁকড়ে ধরো। তোমরা বিচ্ছিন্ন হয়ো না। স্মরণ করো, যখন তোমরা ছিলে একে অপরের শত্রু। আল্লাহ তোমাদের মাঝে সম্প্রীতি সৃষ্টি করলেন। তার নেয়ামতে তোমরা হলে ভাই ভাই। স্মরণ করো, তোমরা ছিলে জাহান্নামের দ্বারপ্রান্তে। তিনি তোমাদের রক্ষা করলেন। এভাবেই আল্লাহ তাঁর নিদর্শনাবলি বর্ণনা করেন। হয়তো তোমরা দিশা পাবে। —সূরা আলে ইমরান : ১০৩

প্রিয় রাসূলও বলেছেন, 'ওই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ, তোমরা কিছুতেই জান্নাতে প্রবেশ করবে না যতক্ষণ না ঈমান আনবে। তোমরা কিছুতেই ঈমান আনতে পারবে না যতক্ষণ না একে অপরকে ভালোবাসবে।'১

আমরা একটি মুসলিম সমাজ চাই যা পারস্পরিক দায়িত্ববোধ, পারস্পরিক মায়াবোধ এবং পারস্পরিক সম্পর্কবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত। মহান আল্লাহর এই বাণীর আনুগত্য যেখানে জাগ্রত সদাসর্বদা—
أُولُوْا الْأَرْحَامِ بَعْضُهُمْ أَوْلَى بِبَعْضٍ فِي كِتَبِ اللَّهِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُهَجِرِينَ إِلَّا أَنْ تَفْعَلُوْا إِلَى أَوْلِيَائِكُمْ مَّعْرُوْفًا كَانَ ذَلِكَ فِي الْكِتَبِ مَسْطُوْরًا
অর্থ : যাদের মধ্যে রয়েছে আত্মার বন্ধন। আল্লাহ্র কিতাব অনুযায়ী সাধারণ মুমিন মুহাজিরদের চাইতে তারা একে অপরের প্রতি অধিক হকদার। তবে তোমরা বন্ধুবান্ধবদের প্রতি যে সদাচার করবে, তা আল্লাহর কিতাবে অবশ্যই লিপিবদ্ধ থাকবে। —সূরা আহযাব : ০৬

আমরা এমন একটি সমাজ চাই যা সুন্দর সুনির্মল চরিত্রমাধুর্য এবং সুউচ্চ সুমহান মূল্যবোধে ভাস্বর। সত্যতা, আমানতদারি, বিশ্বস্ততা, ত্যাগ ও বিসর্জন, বীরত্ব ও সাহসিকতা, ব্যক্তিত্ব ও মহানুভবতা; আন্তরিকতা-একনিষ্ঠতা, কৃতজ্ঞতা-কৃতার্থতা, ক্ষমা ও মার্জনা এবং ন্যায় ও সুন্দরের সুসজ্জিত একটি পূর্ণাঙ্গ সমাজ। এমন একটি সমাজ, যাকে গতিশীল করে মহৎ গুণাবলি, উন্নত আদর্শ। যেখানে চরিত্রের পবিত্রতায় আরোপিত কড়া প্রহরা। যেখানে চরিত্রই ধর্ম ও বিশ্বাসের প্রথম প্রহরী। কবির ভাষায় বলতে হয়,
'নিশ্চয়ই কোনো জাতি ততক্ষণ টিকে থাকে যতক্ষণ তাদের চরিত্র টিকে থাকে; যখন তাদের চরিত্র ধ্বংস হয়, তখন তাদের বিলুপ্তি অবশ্যম্ভাবী।'

আমরা একটি ইসলামী সমাজ চাই। যেখানে প্রতিটি মানুষের অধিকার নিশ্চিত। যেখানে জোর নেই, জুলুম নেই। অনিয়ম নেই, অনাচার নেই। যেখানে পারস্পরিক কর্ম ও লেনদেন সম্পাদিত হয় মহান আল্লাহর এই বাণীর সফল বাস্তবায়নে—
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَقُولُوْا قَوْلًا سَدِيدًا يُصْلِحْ لَكُمْ أَعْمَلَكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِيمًا
অর্থ : হে ওই সমস্ত লোকেরা যারা ঈমান এনেছ, তোমরা আল্লাহর জন্য ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকো। ন্যায়ের সাথে সাক্ষ্য প্রদান করো। কারো প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের অন্যায়ে প্ররোচিত না করে। তোমরা ন্যায়ের সাথে কাজ করো। সেটাই তাকওয়ার নিকটতর। তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে সম্যক অবগত। —সূরা মাইদাহ : ০৮

আমরা একটি পবিত্র ও সভ্য সমাজ প্রত্যাশা করি। যেখানে অপরাধপ্রবণতা নেই। লাঞ্ছনা ও চরিত্রহীনতা নেই। যেখানে প্রত্যেক ধর্মীয় নীতিমালা এবং উন্নত চরিত্রমাধুরীর ওপর প্রতিষ্ঠিত। যেখানে প্রত্যেকে প্রত্যেকের, প্রকারান্তরে সমাজের কল্যাণকামী। যেখানে আনন্দ, ব্যক্তিস্বার্থ ও প্রবৃত্তির অগ্রগামিতা বিসর্জিত। যেই সমাজের প্রতি আল্লাহর নুসরত ও সাহায্য অনিবার্য। যেমনটি মহান আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন :
وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْتَضَىٰ لَهُمْ وَ لَيُبَدِّلَنَّهُم مِّن بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنًا يَعْبُدُونَنِي لَا يُشْرِكُونَ بِي شَيْئًا وَمَن كَفَرَ بَعْدَ ذَٰلِكَ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
অর্থ : আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তোমাদের মধ্যে থেকে যারা ঈমান এনেছে এবং আমলে সালেহ করেছে তাদেরকে, তিনি তাদেরকে জমিনে দান করবেন খেলাফত, যেভাবে খেলাফত দান করেছিলেন তোমাদের পূর্ববর্তীদের। এবং প্রতিষ্ঠিত করে দেবেন তাদের জন্য তাঁর মনোনীত ধর্মকে। আর ভীতির পরিবর্তে তাদের দান করবেন স্বস্তি। তারা আমার ইবাদত করবে। আমার সাথে কোনো কিছুকে শরিক করবে না। কিন্তু এরপরও যারা কুফরি করবে, তারাই পাপাচারী। —সূরা নূর : ৫৫

আমরা একটি ইসলামী সমাজ প্রত্যাশা করি। যেখানে কিছু প্রাণবন্ত ও উৎসাহী কর্মপুরুষ কামনা করি। যাদের রক্তে আছে আল্লাহর ভালোবাসা এবং ধর্মীয় আবেগ। ধর্মীয় চেতনায় যারা স্বতঃস্ফূর্ত। ইসলামের সম্মানে যাদের রক্ত টগবগ করে। সাহসিকতা যাদের বৈশিষ্ট্য। অগ্রগামী যারা হকের পরিচয়ে। যারা মৃত্যুভয়ে ভীত হয় না। যারা তিরস্কারের পরোয়া করে না। কেননা, তারা এক আল্লাহতে বিশ্বাসী। তারা ভালো করে জানে, আল্লাহই রিজিকদাতা, লালনকারী; তিনিই অভিভাবক, রক্ষাকারী; তিনিই ব্যবস্থাপক, সাহায্যকারী।

আমরা এমন একটি সমাজ প্রত্যাশা করি, যার নেতৃত্ব দেবেন একজন মর্দে মুমিন। একজন সাজিদাল মর্দে মুমিন। একজন জিদাল মর্দে মুমিন। যিনি বিপদের মোকাবিলা করতে জানেন নির্ভয়ে। যার মনোবল সুউচ্চ পর্বতের মতো অটল, অবিচল। চরম উত্তাল পাওয়া হাওয়ায় যিনি ভেঙে পড়েন না। তরঙ্গবিক্ষুব্ধ উত্তাল সমুদ্রে যিনি দৃঢ় প্রত্যয়ী, চির কুশলী। রোমাঞ্চকর অগ্নিযাত্রায় যিনি সফল নাবিক। হাজার ঝড়ঝাপটায় যার হৃদয়ের প্রদীপ শিখা অবিচল। যিনি কখনো অধৈর্য হন না। আল্লাহর ফায়সালার প্রতি যার মন প্রাণ চিরসমর্পিত, সর্বাবস্থায় সন্তুষ্ট। জীবনের অগ্নিপরীক্ষাকে যিনি মনে করেন সফলতার সুবর্ণ সুযোগ। যিনি অনুভব করেন, জীবনের কষ্ট ক্লেশ যেন প্রভাতশিশিরের মতো সুনির্মল, যা তাকে পৃথিবীর মায়া মোহ থেকে পবিত্র করে নিত্যদিন; কিংবা জুঁই ও লিলি ফুলের মতো সুকোমল, যা হৃদয়ে প্রশান্তির শীতল প্রলেপ বুলিয়ে দেয় নরম ছোঁয়ায় অষ্টপ্রহর; কিংবা মৃদু মন্দ পুবালি বাতাসের মতো নরম ও ফুরফুরে, যা হৃদয় ছুঁয়ে যায় অনির্বচনীয় প্রাণবন্ততায় ক্ষণে ক্ষণে।

আমরা একটি মুসলিম সমাজ প্রত্যাশা করি। যেখানে পুরুষ একজন স্নেহশীল পিতা। করুণার আধার। মমতায় ভরা। যার হৃদয় জুড়ে সন্তানের প্রতি অগাধ ভালোবাসা। যিনি বুদ্ধিমান। চিন্তাশীল। প্রজ্ঞাবান। সন্তানের জন্য যেন আলোর মশাল। বিজ্ঞ পথপ্রদর্শক। বিচক্ষণ তত্ত্বাবধায়ক। বিপদে আপদে সন্তানের ভরসা। মাথা গোঁজার নিরাপদ আশ্রয়।

আমরা একটি ইসলামী সমাজ চাই। যেখানে পুরুষ একজন বিশ্বস্ত জীবনসঙ্গী। যার ভালোবাসা অটুট এবং স্থির। যিনি নারীর দুর্ভেদ্য দুর্গ। প্রেমময় স্বামী। স্ত্রীর প্রতি ধেয়ে আসা যেকোনো বিপদকে তিনি প্রতিহত করেন প্রাণপণে। তাকে সুরক্ষিত রাখেন যে কোনো অত্যাচার, অনাচার থেকে। তাই অগাধ আস্থা, অগাধ ভক্তি, অগাধ ভালোবাসা স্ত্রীর হৃদয়ে জন্মায় সগৌরবে। পূর্ণ অর্থ, পূর্ণ শান্তি স্ত্রীর হৃদয়কে রাখে স্থির, প্রশান্ত। যিনি সদাচারী। যার সাহচর্যে ধন্য হয় নারী। ধন্য হয় নারীর জীবন। সে সুখে পায় অনাবিল শান্তি। অপরিহার্য সুখ। দাম্পত্যজীবনের দায়ভারে যিনি স্ত্রীর প্রতি বাড়িয়ে দেন অবিরত সহযোগিতার হাত। তাকে দিতে চান সর্বোচ্চ সহজতা। যাতে মুসলিম পরিবার পায় পূর্ণতা। হয় দুর্ভেদ্য, দুর্লঙ্ঘ্য। যুগের ঝড়ঝাপটায় সুস্থির। কুচক্রীরা ফিরে যায় ব্যর্থ মনোরথে।

মুসলিম যুবসমাজের কাছে আমাদের প্রত্যাশা অপরিসীম। আমাদের প্রত্যাশা ঈমানী গুণ ও চারিত্রিক মাধুর্যে বিশিষ্ট একটি যুবসমাজ। যারা ইসলামের পরিচয় বহন করে। ইসলামের আদর্শ স্থাপন করে। এবং ইসলামকেই জীবনের সংবিধান হিসেবে গ্রহণ করে। যারা বিশ্বাস করে,
وَمَن يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَن يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُৱ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ
অর্থ : যদি কেউ ইসলাম ছাড়া অন্য কিছুকে ধর্ম হিসেবে পেতে চায় তা হলে তা কিছুতেই গ্রহণযোগ্য হবে না। আর পরকালে সে হবে ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্ভুক্ত। —সূরা আলে ইমরান : ৮৫

আমরা এমন একটি যুবসমাজ প্রত্যাশা করি, যারা ইসলাম ও ইসলামি বিশ্বাসে দৃঢ় প্রত্যয়ী। নিজের ধর্ম ও বিশ্বাসের প্রতি যারা গর্ব বোধ করে। কবির ভাষায়,
'কী মোর বর্ণ, কী মোর বংশ—না জানি। জানি, ইসলামই পিতা, ইসলামই জননী।'

আমরা এমন যুবক প্রত্যাশা করি, যে কিতাবুল্লাহকে আঁকড়ে থাকে। রাসূলের আদর্শের পূর্ণ বাস্তবায়ন কামনা করে। যার হৃদয় মসজিদের সাথে লেগে থাকে। যার সমগ্র সত্তা জুড়ে তাকওয়া, খোদভীতি, উত্তম চারিত্রমাধুর্য। যে আর্তমানবতার সেবায় নিয়োজিত। অভাবী দুস্থের সাহায্য সহযোগিতায় অবিরত। অত্যাচারীর ভয়। অত্যাচারিতের আশ্রয়। সময় সম্পর্কে সচেতন। কর্তব্যপরায়ণ। সে জানে, মানে, তার অনেক দায়; কিন্তু সময় সামান্য।

সে কঠোর পরিশ্রমে বিশ্বাসী। ঐশী বিধান অনুসারে নতুন করে ইসলামী জীবনযাপনের প্রত্যয়ী। কর্ম ও চেতনায় মুক্ত স্বাধীন। পাশ্চাত্যতার অন্ধ অনুকরণে নয়। সে আল্লাহর বাণী ও রাসূলের আদর্শ অনুসরণে চলে নিজ মতে, নিজ গতিতে; মহান আল্লাহর আলোয় আলোকপ্রাপ্ত হয়। তিনিই তো আসমানসমূহ ও জমিনের আলো। তাই তো পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে,
اللَّهُ نُورُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۚ مَثَلُ نُورِهِ كَمِشْكَاةٍ فِيهَا مِصْبَاحٌ ۖ الْمِصْبَاحُ فِي زُجَاجَةٍ ۖ الزُّجَاجَةُ كَأَنَّهَا كَوْكَبٌ دُرِّيٌّ يُوقَدُ مِن شَجَرَةٍ مُّبَارَكَةٍ زَيْتُونَةٍ لَّا شَرْقِيَّةٍ وَلَا غَرْبِيَّةٍ يَكَادُ زَيْتُهَا يُضِيءُ وَلَوْ لَمْ تَمْسَسْهُ نَارٌ ۚ نُّورٌ عَلَىٰ نُورٍ ۗ يَهْدِي اللَّهُ لِنُورِهِ مَن يَشَاءُ ۚ وَيَضْرِبُ اللَّهُ الْأَمْثَالَ لِلنَّاسِ ۗ وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ
অর্থ : আল্লাহ আসমানসমূহ ও জমিনের আলো। তাঁর এ আলোর দৃষ্টান্ত—যেন একটি দীপাধার। যাতে আছে একটি প্রদীপ। প্রদীপটি রাখা আছে স্বচ্ছ কাঁচের পাত্রে। কাঁচের পাত্রটি যেন কোনো উজ্জ্বল নক্ষত্র। জ্বালানি পবিত্র জয়তুন বৃক্ষের তেল। যা শুধু পূর্বের বা পশ্চিমের আলোকপ্রাপ্ত নয়। এ তেল এত স্বচ্ছ—যেন আগুনের স্পর্শ ছাড়াই জ্বলে উঠবে। এ তো আলোর ওপর আলো। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন তাকে এ আলোর দিশা দেন। আল্লাহ মানুষের জন্য দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞাত। —সূরা নূর : ৩৫

এমন যুবক, যে জমিনে বিচরণ করে; কিন্তু তার হৃদয় থাকে আরশে আজিমে। কেননা, সে হৃদয়ে জাগ্রত জিহাদি চেতনা। ধমনীতে নেশা শাহাদাতের। ফিরিয়ে আনতে চায় আযানের সুর। আযানের আযানখানা থেকে যার প্রতিধ্বনি অনুরণিত হয় কুদসের আকাশে বাতাসে। প্রকম্পিত করবে সারা পৃথিবীর তাগুতি শক্তির ভিত। আকসার মিম্বার, আকসার গম্বুজ আনন্দে ঝলমল করে উঠবে আবার। আবার উচ্চারিত হবে আল্লাহর নাম, প্রিয়তম মুহাম্মাদের নাম। ব্যথাতুর হৃদয়ে জ্বালাবে আশার আলো। ফিলিস্তিনের বিষয়ে, এতিমের মুখে ফোটাবে বিজয়ের হাসি।

এমন যুবক, যার হৃদয় উৎসুক হয়ে আছে হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে। যার দৃষ্টি প্রসারিত আসমানে। প্রত্যয়ে ছুঁয়ে যায় সুরাইয়া। রাতের ইবাদতগুজার। দিনের ঘোরসওয়ার।

এমন যুবক, যে বাস্তবতায় বিশ্বাসী। জ্ঞান ও যোগ্যতায় বিশ্বাসী। ভুলে যায় না যে, সে মায়ার পৃথিবীতেই আছে। সুতরাং কল্পনার ডানায় ভেসে বেড়ানো এবং দিবাস্বপ্নে বিভোর থাকার মানসিকতা তার নেই। সে শ্রমহীন ও সাধনাহীনভাবে নিছক অতীতের গুণকীর্তন করে জাতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে না। বরং নিজের মেধা ও সামর্থ্যকে ব্যয় করে কাজ করে। জ্ঞানের সাধনায় আত্মনিয়োগ করে—যোগ্য নেতৃত্বের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে, ইসলামের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে, পৃথিবীতে পুনরায় মুসলিমজাতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করতে। সে বিশ্বাস করে, পরিবেশ পরিস্থিতি সব সময় একই থাকে না। সময়ের ব্যবধানে প্রেক্ষাপট পাল্টে যায়। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন,
تِلْكَ الْأَيَّامُ نُدَاوِلُهَا بَيْنَ النَّاسِ
অর্থ : আর আমি মানুষের মাঝে উত্থান পতনের দিনগুলো অদলবদল করাতে থাকি। —সূরা আলে ইমরান : ১৪০

এমন যুবক, যে ঐক্যবদ্ধতা পছন্দ করে। আত্মকেন্দ্রিক নয়। সে বিশ্বাস করে, বিশৃঙ্খলভাবে একা একা কাজ করার চাইতেও সুশৃঙ্খলভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করা সর্ব বিচারে ভালো। সে সবাইকে সাথে নিয়ে কাজ করে। মহান আল্লাহর দরবারে ঐক্যবদ্ধ প্রার্থনা জানায়,
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ
অর্থ : হে আল্লাহ আমরা আপনারই ইবাদত করি এবং আপনারই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি। —সূরা ফাতিহা : ০৪

মুজাহিদ যুবকরা উদার আকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্র তারা। তারা সোনার হরফে লিখে দেয় ত্যাগের মহিমাগাথা। জাতিকে উপহার দেয় সুস্পষ্ট বিজয়। ইসলাম পুনপ্রতিষ্ঠিত হয় আপন মহিমায়। শত্রুরা হাসে উপহাসের হাসি। তবে, এ অসম্ভব নয়। কিয়ামত পর্যন্ত সে আশার আলো জ্বলে ঈমানদীপ্ত অকুতোভয় বীরদের হৃদয়ে।

মুসলিম সমাজে একজন মুসলিম নারীর কাছে আমাদের প্রত্যাশা— তিনি একজন আদর্শ মা হবেন। ঈমান ও বিশ্বাসে বলীয়ান। দৃঢ়চিত্ত, সুউচ্চ মনোবলসম্পন্ন। যিনি হযরত খানসা রাযিয়াল্লাহু আনহার আদর্শে উজ্জীবিত। যেই খানসা রাযি. টগবগে যুবক চার ছেলেকেই কাদিসিয়া যুদ্ধে সমবেত করে জিহাদে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন এই বলে: “তোমরা জেনে রেখো, এই দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী। আখেরাত উত্তম। আখেরাতই চিরস্থায়ী। সুতরাং ধৈর্য ধরো। ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা দেখাও। এবং শত্রুর মোকাবিলায় অবিচল থেকো।” যখন কাদিসিয়া যুদ্ধে চার সন্তানই শহীদ হওয়ার সংবাদ পেলেন তখন স্থিরচিত্তে হযরত খানসা রাযি. শুধু এ কথা বললেন, “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর। যিনি ফি সাবিলিল্লাহ আমার ছেলেদের শাহাদাতের সুধা পান করিয়ে আমাকে সম্মানিত করেছেন। আমি আশা করি, আমার আল্লাহ আমাকে এবং আমার চার সন্তানকে তাঁর রহমতের আশ্রয়ে আবার একত্রিত করবেন।”১

আমাদের প্রত্যাশা—মুসলিম নারী হবেন একজন রত্নগর্ভা। যিনি কিতাব ও সুন্নাহ অনুযায়ী সন্তানদের লালনপালন করেন। সাদ, খালিদ, তারিকের মতো মর্দে মুমিন জাতিকে উপহার দেন।

আমাদের প্রত্যাশা—মুসলিম নারী হবেন একজন ধৈর্যশীলা কঠিন প্রত্যয়িনী বোন। বিপদে ভেঙে পড়েন না। যার সাহস আকাশচুম্বী। খাওলা বিনতে আযওয়ারের মতো। আজনাবাইনের যুদ্ধে ভ্রাতা যিরারের বন্দি হওয়ার সংবাদ পেয়ে তিনি যে সাহসিকতা দেখিয়েছিলেন তা মুসলিম নারীর প্রেরণা হয়ে থাকবে চিরকাল। সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ স্বয়ং যিরারকে মুক্ত করতে গিয়েছিলেন যেখানে। দিগ্বিজয়ী বীর, মুসলিম সেনাপতি, আল্লাহর তরবারি—খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি. মুসলিমবাহিনি নিয়ে এগিয়ে চলেছেন তীরবেগে। হঠাৎ দেখা যায় অগণিত এক অশ্বারোহী। অথৈ ভীড়ে ছুটে চলেছেন ধুলোবুলরিত দূর দিগন্তে। তিনি ছুটছেন তো ছুটছেন। পেছনে ভ্রূক্ষেপ করেন না। মুসলিমবাহিনির পদাঙ্কন লক্ষ্য করেন না। মুসলিমবাহিনি রোমসেনাদের ভিড়ে ঢুকে পড়ল এবং হামলা চালাল। মুসলিম লড়াকুদের সাথে অগণিত অশ্বারোহীও কটল করে চলেছেন অগণিত রোমক যোদ্ধাকে। ...যুদ্ধ শেষ হলো। মুসলিম যোদ্ধাগণ অশ্বারোহীর পরিচয় জানতে চায়। কিন্তু তিনি চলে যাচ্ছেন। পেছনে ভ্রূক্ষেপ করছেন না। এবার সেনাপতি খালিদ রাযি. কসম দিয়ে পরিচয় ব্যক্ত করতে বলেন। এবার ফিরে তাকান অশ্বারোহী। অবগুণ্ঠনের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে তেজোদ্দীপ্ত নারী কণ্ঠ। বলেন, “হে মহামহিম সেনাপতি, আমি আপনাকে উপেক্ষা করে চলেছি শুধুমাত্র লজ্জায়। আপনি একজন মহিমান্বিত বীর সেনাপতি। আর আমি এক নগণ্য অন্তঃপুরবাসিনী। পর্দানশীন। আল্লাহর কসম, আমার দগ্ধ হৃদয়েই আমাকে যুদ্ধে অবতীর্ণ করেছে।” অবাক বিস্ময়ে সেনাপতি খালেদ রাযি. বলেন, “কে আপনি? কী আপনার বৃত্তান্ত?” তিনি বলেন, “আমি খাওলা বিনতে আযওয়ার। আমি গোত্রের অন্তঃপুরবাসিনীদের সাথে ছিলাম। কিন্তু আমার ভ্রাতা যিরারের বন্দি হওয়ার সংবাদ শুনে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। তাই অশ্বে আরোহণ করে ছুটে এসেছি এবং যা করার করেছি।” সেনাপতি খালিদ চিৎকার করে বলেন, “বোন, আপনি নিশ্চিত থাকুন। আমরা আমাদের সমগ্র শক্তি দিয়ে হামলা চালাব। ইনশাআল্লাহ, আমরা আমাদের ভ্রাতাকে মুক্ত করে আনবই।”২

মুসলিম সমাজে আমাদের প্রত্যাশিত মুসলিম তরুণী হবে ঈমান ও বিশ্বাসে গৌরবান্বিত। ধর্ম ও ধার্মিকতায় মহিমান্বিত। হবে মুক্তমনা। হবে স্বাধীনচেতা। তবে পাগলা হাওয়ায় উড়ে যাওয়া বেচারি নয়। বাতিলের সয়লাবে ভেসে যাওয়া খড়কুটো নয়। ঈমান ও হেদায়েতের বাতায়নে দেখা শার্দূলী। হাজার হাঁক-ডাক-হৈ-হুল্লোড়ে, সহস্র শোরগোল কোলাহলে—সুস্থির, সুবিবেচক, সজ্ঞান, আপন সত্তায় অটল, আপন বিশ্বাসে অবিচল। মাধুরী তার ঈমান। মূলধন তার লজ্জা ও সৎ চরিত্র। হিজাব ও পর্দায় পবিত্র। নেকাব ও জিলবাবে অপূর্ব, অনুপম।

কবির ভাষায়,
ইনহাই বিতাজিলিকা ওয়াযদাদী শিয়ারা
ইয়া লিলখিজলি মুনতখিবান বিজীহারিহি
মুতাহাযযিয়া বিসুবাল সামায়াত জিহানদান
লা তাখাফু আম্মান ওয়ালা খাওয়ারা
মর্যাদার তাজ মস্তকে ধারণ করে,
আত্মপরিচয় হৃদয়ে লালন করে,
অবগুণ্ঠিত কপালে কপোলে তুমি।
শত্রুর ভয়, দুর্বলতা দূরীভূত;
ব্যর্থ তোমাতে ষড়যন্ত্র, ব্যর্থ তোমাতে তন্ত্র-মন্ত্র।

আমাদের প্রত্যাশা—সে হবে স্বামীর অনুগতা প্রেমময়ী। হবে বিশ্বস্ত জীবনসঙ্গিনী। সুখে দুঃখে পাশে থাকে। বিপদে আপদে সাথে থাকে। ভাবে ভাবায় আনে অন্তরঙ্গতা। জীবনসাথীর হৃদয়ভূমিতে বপন করে তাকওয়ার বীজ। জীবনে হয় তার সুখের ঠিকানা। কৃতজ্ঞ, কৃতার্থ। অমায়িক, সংযমী। নিরবচ্ছিন্ন কোনো চাওয়া পাওয়া নেই। আছে স্বামীর সুখ ও সেবার প্রবল বাসনা। দাম্পত্যের উদ্যানে একটি ছায়াদার ফুলদার তরুর মতো। সুশীতল, সবুজ, প্রাণবন্ত। পত্রপুষ্পে আহ্লাদিত। যার ছায়ায় স্বামী উৎসাহ পায়। চলার প্রেরণা পায়। পায় সুখময় গতিশীল জীবনের সন্ধান। ঘুমানোর সময় চোখ বুজে নিশ্চিন্তে, নির্বিঘ্নে।

সবশেষে আমরা মুসলিম নারীকে কামনা করি একজন কর্মনিষ্ঠ দায়িয়া হিসেবে, যিনি কাজ করবেন আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। যদি শিক্ষিত হন, তা হলে শিক্ষার্থীদের হৃদয়ভূমিতে ঈমান ও আকীদার চাষবাদ করুন। বিদ্যালয়ে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ অব্যাহত রাখুন। সত্যের আওয়াজ তুলুন। যত বাধাই আসুক। যত বিপত্তিই ঘটুক। কল্যাণের বারিধারা প্রবাহিত করুন যেখানেই থাকুন। চেতনা জাগ্রত করুন নারী সমাজে। তাওহীদের কথা বলুন। রিসালাতের কথা বলুন। আখেরাতের কথা বলুন। জান্নাতের সুসংবাদ দিন। জাহান্নামের ভয় দেখান। নতুন প্রজন্মকে রক্ষা করুন ইসলাম ও মুসলিমবিদ্বেষী সকল অপশক্তির থেকে।

আমাদের প্রত্যাশা—এমন একজন মুসলিম নারী, যিনি চারপাশে ছড়িয়ে যাওয়া সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সর্ব বিষয়ে সচেতন। যিনি জীবন ও জগতের বিভিন্ন বিষয়ে দৃষ্টি প্রসারিত করতে পারেন। নানামুখী সমস্যা, উৎপত্তি, উত্তরণ উপলব্ধি করতে পারেন। প্রয়োজনীয় ধর্মীয় এবং সাধারণ উভয়বিধ জ্ঞান ও যোগ্যতায় যিনি পারদর্শিনী। যিনি মুসলিম সমাজগঠনে একটি কার্যকর উপাদান হতে, সারা পৃথিবীর সকল ধর্ম, সকল জাতির নারীদের সাথে প্রতিযোগিতা করতে—সদা প্রস্তুত। যিনি বিশ্বে যত নারী সংস্থা ও নারী-আন্দোলন গড়ে উঠেছে ধর্ম, চরিত্র ও মূল্যবোধকে ধ্বংস করার জন্য, সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে আন্তর্জাতিক নারী-আন্দোলনকে ইসলামের দিকে পরিচালিত করার প্রত্যাশী। কেননা, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক সর্ব বিষয়ের সুন্দরতম সমাধান দেয় ইসলামই। ইসলামই মানবতাকে রক্ষা করতে পারে মহাপতনের হাত থেকে। ফিরিয়ে আনতে পারে পতনোন্মুখ মানবতাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে। মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন,
وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْتَضَىٰ لَهُمْ وَلَيُبَدِّلَنَّهُم مِّن بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنًا يَعْبُدُونَنِي لَا يُشْرِكُونَ بِي شَيْئًا ۚ وَمَن كَفَرَ بَعْدَ ذَٰلِكَ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
অর্থ : আল্লাহ্ প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন তোমাদের মধ্য থেকে যারা ঈমান এনেছে এবং আমলে সালেহ্ করেছে তাদেরকে, তিনি তাদেরকে জমিনে দান করবেন খেলাফত যেভাবে খেলাফত দান করেছিলেন তোমাদের পূর্ববর্তীদের। এবং প্রতিষ্ঠিত করে দেবেন তাদের জন্য তাঁর মনোনীত ধর্মকে। আর ভীতির পরিবর্তে তাদের দান করবেন স্বস্তি। শর্ত হলো, তারা আমার ইবাদত করবে। আমার সাথে কোনো কিছুকে শরীক করবে না। কিন্তু এরপরও যারা কুফরি করবে, তারাই পাপাচারী। —সূরা নূর : ৫৫

কবি বলেন,
তুখীঝুয যালামু হাইয়্যান ওয়া ইয়াযিলু
ফজরুল মাদা মিন উফুক্বি ত্বইবাতিন ইউরসিলুল আনওয়ারা
কেটে যায় কালো ভোরের আভাসে,
দিগন্তে হাসে উষার আলো...

সমাপ্ত

টিকাঃ
১. সহীহ মুসলিম।
১. আল ইসরাহ্ কী তায়হীদিস সাহাবাহ্ : ৯৭।
২. ফুতূহুল শাম লিল ওয়াকিদী : ১/৭০-৭১।

আমাদের প্রত্যাশা—পূর্ণাঙ্গ ইসলামী সমাজ, পূর্ণাঙ্গ মুসলিম সমাজ। যার প্রথম ও প্রধান ভিত্তি হবে মুসলিম পরিবার। যার প্রতিটি সদস্য আল্লাহর আনুগত্যে হবে ঐক্যবদ্ধ। মা বাবার স্নেহ-ছায়া বিরাজমান তাদের মাথার ওপর। তারা পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ। মা বাবার ভালোবাসা তাদের ঘিরে থাকে সর্বক্ষণ। নতুন প্রজন্ম বেড়ে ওঠে আগামী দিনের মহৎ ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের গুণে। তারা গড়তে চায় মুসলিম কীর্তিপ্রাসাদ। যা সুউচ্চ, শানদার। তারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর ঝাণ্ডাকে বুলন্দ করার জন্য। ইসলামের হারানো গৌরব ও মর্যাদা ফিরিয়ে আনার জন্য।

আমরা একটি মুসলিম সমাজ চাই। যেখানে ভালোবাসা হয় আল্লাহর জন্য, রাসূলের জন্য এবং মুমিনদের জন্য। যেখানে মহান আল্লাহর এই বাণীর পাই সফল বাস্তবায়ন:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْكَفِرِينَ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُونِ الْمُؤْمِنِينَ أَتُرِيدُونَ أَنْ تَجْعَلُوْا لِلَّهِ عَلَيْكُمْ سُلْطَنًا مُبِينًا
অর্থ : হে ওই সব লোকেরা, যারা ঈমান এনেছ, তোমরা মুমিনদের বাদ দিয়ে কাফেরদের বন্ধুত্ব গ্রহণ করো না। তোমরা কি নিজেদের বিরুদ্ধে আল্লাহ্র কাছে প্রমাণ প্রতিষ্ঠা করতে চাও? —সূরা নিসা : ১৪৪

মহান আল্লাহ আরও ইরশাদ করেছেন,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا عَدُوِّي وَعَدُوَّكُمْ أَوْلِيَاءَ تُلْقُونَ إِلَيْهِمْ بِالْمَوَدَّةِ وَ قَدْ كَفَرُوْا بِمَا جَاءَكُمْ مِّنَ الْحَقِّ
অর্থ : হে ওই সমস্ত লোকেরা, যারা ঈমান এনেছ, তোমরা আমার শত্রু এবং তোমাদের শত্রুদের বন্ধুত্ব গ্রহণ করো না। তোমরা তাদেরকে ভালোবাসা দেখাবে? অথচ রাসূল যে সত্য নিয়ে আগমন করেছেন, তারা তা অস্বীকার করে। —সূরা মুমতাহিনা : ০১

আমরা এমন একটি সমাজ চাই যার মূল ভিত্তি হলো—আল্লাহর জন্য ভ্রাতৃত্ব এবং ভালোবাসা। যা সাম্প্রদায়িকতা ও গোঁড়ামিমুক্ত। মহান আল্লাহর বাণীর বাস্তবায়নে–
وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنْتُمْ أَعْدَاءً فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ فَأَصْبَحْتُمْ بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا وَكُنْتُمْ عَلَى شَفَا حُفْرَةٍ مِنَ النَّارِ فَأَنْقَذَكُمْ مِنْهَا كَذَلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ أَيْتِهِ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ
অর্থ : তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে আঁকড়ে ধরো। তোমরা বিচ্ছিন্ন হয়ো না। স্মরণ করো, যখন তোমরা ছিলে একে অপরের শত্রু। আল্লাহ তোমাদের মাঝে সম্প্রীতি সৃষ্টি করলেন। তার নেয়ামতে তোমরা হলে ভাই ভাই। স্মরণ করো, তোমরা ছিলে জাহান্নামের দ্বারপ্রান্তে। তিনি তোমাদের রক্ষা করলেন। এভাবেই আল্লাহ তাঁর নিদর্শনাবলি বর্ণনা করেন। হয়তো তোমরা দিশা পাবে। —সূরা আলে ইমরান : ১০৩

প্রিয় রাসূলও বলেছেন, 'ওই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ, তোমরা কিছুতেই জান্নাতে প্রবেশ করবে না যতক্ষণ না ঈমান আনবে। তোমরা কিছুতেই ঈমান আনতে পারবে না যতক্ষণ না একে অপরকে ভালোবাসবে।'১

আমরা একটি মুসলিম সমাজ চাই যা পারস্পরিক দায়িত্ববোধ, পারস্পরিক মায়াবোধ এবং পারস্পরিক সম্পর্কবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত। মহান আল্লাহর এই বাণীর আনুগত্য যেখানে জাগ্রত সদাসর্বদা—
أُولُوْا الْأَرْحَامِ بَعْضُهُمْ أَوْلَى بِبَعْضٍ فِي كِتَبِ اللَّهِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُهَجِرِينَ إِلَّا أَنْ تَفْعَلُوْا إِلَى أَوْلِيَائِكُمْ مَّعْرُوْفًا كَانَ ذَلِكَ فِي الْكِتَبِ مَسْطُوْরًا
অর্থ : যাদের মধ্যে রয়েছে আত্মার বন্ধন। আল্লাহ্র কিতাব অনুযায়ী সাধারণ মুমিন মুহাজিরদের চাইতে তারা একে অপরের প্রতি অধিক হকদার। তবে তোমরা বন্ধুবান্ধবদের প্রতি যে সদাচার করবে, তা আল্লাহর কিতাবে অবশ্যই লিপিবদ্ধ থাকবে। —সূরা আহযাব : ০৬

আমরা এমন একটি সমাজ চাই যা সুন্দর সুনির্মল চরিত্রমাধুর্য এবং সুউচ্চ সুমহান মূল্যবোধে ভাস্বর। সত্যতা, আমানতদারি, বিশ্বস্ততা, ত্যাগ ও বিসর্জন, বীরত্ব ও সাহসিকতা, ব্যক্তিত্ব ও মহানুভবতা; আন্তরিকতা-একনিষ্ঠতা, কৃতজ্ঞতা-কৃতার্থতা, ক্ষমা ও মার্জনা এবং ন্যায় ও সুন্দরের সুসজ্জিত একটি পূর্ণাঙ্গ সমাজ। এমন একটি সমাজ, যাকে গতিশীল করে মহৎ গুণাবলি, উন্নত আদর্শ। যেখানে চরিত্রের পবিত্রতায় আরোপিত কড়া প্রহরা। যেখানে চরিত্রই ধর্ম ও বিশ্বাসের প্রথম প্রহরী। কবির ভাষায় বলতে হয়,
'নিশ্চয়ই কোনো জাতি ততক্ষণ টিকে থাকে যতক্ষণ তাদের চরিত্র টিকে থাকে; যখন তাদের চরিত্র ধ্বংস হয়, তখন তাদের বিলুপ্তি অবশ্যম্ভাবী।'

আমরা একটি ইসলামী সমাজ চাই। যেখানে প্রতিটি মানুষের অধিকার নিশ্চিত। যেখানে জোর নেই, জুলুম নেই। অনিয়ম নেই, অনাচার নেই। যেখানে পারস্পরিক কর্ম ও লেনদেন সম্পাদিত হয় মহান আল্লাহর এই বাণীর সফল বাস্তবায়নে—
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَقُولُوْا قَوْلًا سَدِيدًا يُصْلِحْ لَكُمْ أَعْمَلَكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِيمًا
অর্থ : হে ওই সমস্ত লোকেরা যারা ঈমান এনেছ, তোমরা আল্লাহর জন্য ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকো। ন্যায়ের সাথে সাক্ষ্য প্রদান করো। কারো প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের অন্যায়ে প্ররোচিত না করে। তোমরা ন্যায়ের সাথে কাজ করো। সেটাই তাকওয়ার নিকটতর। তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে সম্যক অবগত। —সূরা মাইদাহ : ০৮

আমরা একটি পবিত্র ও সভ্য সমাজ প্রত্যাশা করি। যেখানে অপরাধপ্রবণতা নেই। লাঞ্ছনা ও চরিত্রহীনতা নেই। যেখানে প্রত্যেক ধর্মীয় নীতিমালা এবং উন্নত চরিত্রমাধুরীর ওপর প্রতিষ্ঠিত। যেখানে প্রত্যেকে প্রত্যেকের, প্রকারান্তরে সমাজের কল্যাণকামী। যেখানে আনন্দ, ব্যক্তিস্বার্থ ও প্রবৃত্তির অগ্রগামিতা বিসর্জিত। যেই সমাজের প্রতি আল্লাহর নুসরত ও সাহায্য অনিবার্য। যেমনটি মহান আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন :
وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْتَضَىٰ لَهُمْ وَ لَيُبَدِّلَنَّهُم مِّن بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنًا يَعْبُدُونَنِي لَا يُشْرِكُونَ بِي شَيْئًا وَمَن كَفَرَ بَعْدَ ذَٰلِكَ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
অর্থ : আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তোমাদের মধ্যে থেকে যারা ঈমান এনেছে এবং আমলে সালেহ করেছে তাদেরকে, তিনি তাদেরকে জমিনে দান করবেন খেলাফত, যেভাবে খেলাফত দান করেছিলেন তোমাদের পূর্ববর্তীদের। এবং প্রতিষ্ঠিত করে দেবেন তাদের জন্য তাঁর মনোনীত ধর্মকে। আর ভীতির পরিবর্তে তাদের দান করবেন স্বস্তি। তারা আমার ইবাদত করবে। আমার সাথে কোনো কিছুকে শরিক করবে না। কিন্তু এরপরও যারা কুফরি করবে, তারাই পাপাচারী। —সূরা নূর : ৫৫

আমরা একটি ইসলামী সমাজ প্রত্যাশা করি। যেখানে কিছু প্রাণবন্ত ও উৎসাহী কর্মপুরুষ কামনা করি। যাদের রক্তে আছে আল্লাহর ভালোবাসা এবং ধর্মীয় আবেগ। ধর্মীয় চেতনায় যারা স্বতঃস্ফূর্ত। ইসলামের সম্মানে যাদের রক্ত টগবগ করে। সাহসিকতা যাদের বৈশিষ্ট্য। অগ্রগামী যারা হকের পরিচয়ে। যারা মৃত্যুভয়ে ভীত হয় না। যারা তিরস্কারের পরোয়া করে না। কেননা, তারা এক আল্লাহতে বিশ্বাসী। তারা ভালো করে জানে, আল্লাহই রিজিকদাতা, লালনকারী; তিনিই অভিভাবক, রক্ষাকারী; তিনিই ব্যবস্থাপক, সাহায্যকারী।

আমরা এমন একটি সমাজ প্রত্যাশা করি, যার নেতৃত্ব দেবেন একজন মর্দে মুমিন। একজন সাজিদাল মর্দে মুমিন। একজন জিদাল মর্দে মুমিন। যিনি বিপদের মোকাবিলা করতে জানেন নির্ভয়ে। যার মনোবল সুউচ্চ পর্বতের মতো অটল, অবিচল। চরম উত্তাল পাওয়া হাওয়ায় যিনি ভেঙে পড়েন না। তরঙ্গবিক্ষুব্ধ উত্তাল সমুদ্রে যিনি দৃঢ় প্রত্যয়ী, চির কুশলী। রোমাঞ্চকর অগ্নিযাত্রায় যিনি সফল নাবিক। হাজার ঝড়ঝাপটায় যার হৃদয়ের প্রদীপ শিখা অবিচল। যিনি কখনো অধৈর্য হন না। আল্লাহর ফায়সালার প্রতি যার মন প্রাণ চিরসমর্পিত, সর্বাবস্থায় সন্তুষ্ট। জীবনের অগ্নিপরীক্ষাকে যিনি মনে করেন সফলতার সুবর্ণ সুযোগ। যিনি অনুভব করেন, জীবনের কষ্ট ক্লেশ যেন প্রভাতশিশিরের মতো সুনির্মল, যা তাকে পৃথিবীর মায়া মোহ থেকে পবিত্র করে নিত্যদিন; কিংবা জুঁই ও লিলি ফুলের মতো সুকোমল, যা হৃদয়ে প্রশান্তির শীতল প্রলেপ বুলিয়ে দেয় নরম ছোঁয়ায় অষ্টপ্রহর; কিংবা মৃদু মন্দ পুবালি বাতাসের মতো নরম ও ফুরফুরে, যা হৃদয় ছুঁয়ে যায় অনির্বচনীয় প্রাণবন্ততায় ক্ষণে ক্ষণে।

আমরা একটি মুসলিম সমাজ প্রত্যাশা করি। যেখানে পুরুষ একজন স্নেহশীল পিতা। করুণার আধার। মমতায় ভরা। যার হৃদয় জুড়ে সন্তানের প্রতি অগাধ ভালোবাসা। যিনি বুদ্ধিমান। চিন্তাশীল। প্রজ্ঞাবান। সন্তানের জন্য যেন আলোর মশাল। বিজ্ঞ পথপ্রদর্শক। বিচক্ষণ তত্ত্বাবধায়ক। বিপদে আপদে সন্তানের ভরসা। মাথা গোঁজার নিরাপদ আশ্রয়।

আমরা একটি ইসলামী সমাজ চাই। যেখানে পুরুষ একজন বিশ্বস্ত জীবনসঙ্গী। যার ভালোবাসা অটুট এবং স্থির। যিনি নারীর দুর্ভেদ্য দুর্গ। প্রেমময় স্বামী। স্ত্রীর প্রতি ধেয়ে আসা যেকোনো বিপদকে তিনি প্রতিহত করেন প্রাণপণে। তাকে সুরক্ষিত রাখেন যে কোনো অত্যাচার, অনাচার থেকে। তাই অগাধ আস্থা, অগাধ ভক্তি, অগাধ ভালোবাসা স্ত্রীর হৃদয়ে জন্মায় সগৌরবে। পূর্ণ অর্থ, পূর্ণ শান্তি স্ত্রীর হৃদয়কে রাখে স্থির, প্রশান্ত। যিনি সদাচারী। যার সাহচর্যে ধন্য হয় নারী। ধন্য হয় নারীর জীবন। সে সুখে পায় অনাবিল শান্তি। অপরিহার্য সুখ। দাম্পত্যজীবনের দায়ভারে যিনি স্ত্রীর প্রতি বাড়িয়ে দেন অবিরত সহযোগিতার হাত। তাকে দিতে চান সর্বোচ্চ সহজতা। যাতে মুসলিম পরিবার পায় পূর্ণতা। হয় দুর্ভেদ্য, দুর্লঙ্ঘ্য। যুগের ঝড়ঝাপটায় সুস্থির। কুচক্রীরা ফিরে যায় ব্যর্থ মনোরথে।

মুসলিম যুবসমাজের কাছে আমাদের প্রত্যাশা অপরিসীম। আমাদের প্রত্যাশা ঈমানী গুণ ও চারিত্রিক মাধুর্যে বিশিষ্ট একটি যুবসমাজ। যারা ইসলামের পরিচয় বহন করে। ইসলামের আদর্শ স্থাপন করে। এবং ইসলামকেই জীবনের সংবিধান হিসেবে গ্রহণ করে। যারা বিশ্বাস করে,
وَمَن يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَن يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُৱ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ
অর্থ : যদি কেউ ইসলাম ছাড়া অন্য কিছুকে ধর্ম হিসেবে পেতে চায় তা হলে তা কিছুতেই গ্রহণযোগ্য হবে না। আর পরকালে সে হবে ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্ভুক্ত। —সূরা আলে ইমরান : ৮৫

আমরা এমন একটি যুবসমাজ প্রত্যাশা করি, যারা ইসলাম ও ইসলামি বিশ্বাসে দৃঢ় প্রত্যয়ী। নিজের ধর্ম ও বিশ্বাসের প্রতি যারা গর্ব বোধ করে। কবির ভাষায়,
'কী মোর বর্ণ, কী মোর বংশ—না জানি। জানি, ইসলামই পিতা, ইসলামই জননী।'

আমরা এমন যুবক প্রত্যাশা করি, যে কিতাবুল্লাহকে আঁকড়ে থাকে। রাসূলের আদর্শের পূর্ণ বাস্তবায়ন কামনা করে। যার হৃদয় মসজিদের সাথে লেগে থাকে। যার সমগ্র সত্তা জুড়ে তাকওয়া, খোদভীতি, উত্তম চারিত্রমাধুর্য। যে আর্তমানবতার সেবায় নিয়োজিত। অভাবী দুস্থের সাহায্য সহযোগিতায় অবিরত। অত্যাচারীর ভয়। অত্যাচারিতের আশ্রয়। সময় সম্পর্কে সচেতন। কর্তব্যপরায়ণ। সে জানে, মানে, তার অনেক দায়; কিন্তু সময় সামান্য।

সে কঠোর পরিশ্রমে বিশ্বাসী। ঐশী বিধান অনুসারে নতুন করে ইসলামী জীবনযাপনের প্রত্যয়ী। কর্ম ও চেতনায় মুক্ত স্বাধীন। পাশ্চাত্যতার অন্ধ অনুকরণে নয়। সে আল্লাহর বাণী ও রাসূলের আদর্শ অনুসরণে চলে নিজ মতে, নিজ গতিতে; মহান আল্লাহর আলোয় আলোকপ্রাপ্ত হয়। তিনিই তো আসমানসমূহ ও জমিনের আলো। তাই তো পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে,
اللَّهُ نُورُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۚ مَثَلُ نُورِهِ كَمِشْكَاةٍ فِيهَا مِصْبَاحٌ ۖ الْمِصْبَاحُ فِي زُجَاجَةٍ ۖ الزُّجَاجَةُ كَأَنَّهَا كَوْكَبٌ دُرِّيٌّ يُوقَدُ مِن شَجَرَةٍ مُّبَارَكَةٍ زَيْتُونَةٍ لَّا شَرْقِيَّةٍ وَلَا غَرْبِيَّةٍ يَكَادُ زَيْتُهَا يُضِيءُ وَلَوْ لَمْ تَمْسَسْهُ نَارٌ ۚ نُّورٌ عَلَىٰ نُورٍ ۗ يَهْدِي اللَّهُ لِنُورِهِ مَن يَشَاءُ ۚ وَيَضْرِبُ اللَّهُ الْأَمْثَالَ لِلنَّاسِ ۗ وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ
অর্থ : আল্লাহ আসমানসমূহ ও জমিনের আলো। তাঁর এ আলোর দৃষ্টান্ত—যেন একটি দীপাধার। যাতে আছে একটি প্রদীপ। প্রদীপটি রাখা আছে স্বচ্ছ কাঁচের পাত্রে। কাঁচের পাত্রটি যেন কোনো উজ্জ্বল নক্ষত্র। জ্বালানি পবিত্র জয়তুন বৃক্ষের তেল। যা শুধু পূর্বের বা পশ্চিমের আলোকপ্রাপ্ত নয়। এ তেল এত স্বচ্ছ—যেন আগুনের স্পর্শ ছাড়াই জ্বলে উঠবে। এ তো আলোর ওপর আলো। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন তাকে এ আলোর দিশা দেন। আল্লাহ মানুষের জন্য দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞাত। —সূরা নূর : ৩৫

এমন যুবক, যে জমিনে বিচরণ করে; কিন্তু তার হৃদয় থাকে আরশে আজিমে। কেননা, সে হৃদয়ে জাগ্রত জিহাদি চেতনা। ধমনীতে নেশা শাহাদাতের। ফিরিয়ে আনতে চায় আযানের সুর। আযানের আযানখানা থেকে যার প্রতিধ্বনি অনুরণিত হয় কুদসের আকাশে বাতাসে। প্রকম্পিত করবে সারা পৃথিবীর তাগুতি শক্তির ভিত। আকসার মিম্বার, আকসার গম্বুজ আনন্দে ঝলমল করে উঠবে আবার। আবার উচ্চারিত হবে আল্লাহর নাম, প্রিয়তম মুহাম্মাদের নাম। ব্যথাতুর হৃদয়ে জ্বালাবে আশার আলো। ফিলিস্তিনের বিষয়ে, এতিমের মুখে ফোটাবে বিজয়ের হাসি।

এমন যুবক, যার হৃদয় উৎসুক হয়ে আছে হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে। যার দৃষ্টি প্রসারিত আসমানে। প্রত্যয়ে ছুঁয়ে যায় সুরাইয়া। রাতের ইবাদতগুজার। দিনের ঘোরসওয়ার।

এমন যুবক, যে বাস্তবতায় বিশ্বাসী। জ্ঞান ও যোগ্যতায় বিশ্বাসী। ভুলে যায় না যে, সে মায়ার পৃথিবীতেই আছে। সুতরাং কল্পনার ডানায় ভেসে বেড়ানো এবং দিবাস্বপ্নে বিভোর থাকার মানসিকতা তার নেই। সে শ্রমহীন ও সাধনাহীনভাবে নিছক অতীতের গুণকীর্তন করে জাতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে না। বরং নিজের মেধা ও সামর্থ্যকে ব্যয় করে কাজ করে। জ্ঞানের সাধনায় আত্মনিয়োগ করে—যোগ্য নেতৃত্বের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে, ইসলামের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে, পৃথিবীতে পুনরায় মুসলিমজাতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করতে। সে বিশ্বাস করে, পরিবেশ পরিস্থিতি সব সময় একই থাকে না। সময়ের ব্যবধানে প্রেক্ষাপট পাল্টে যায়। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন,
تِلْكَ الْأَيَّامُ نُدَاوِلُهَا بَيْنَ النَّاسِ
অর্থ : আর আমি মানুষের মাঝে উত্থান পতনের দিনগুলো অদলবদল করাতে থাকি। —সূরা আলে ইমরান : ১৪০

এমন যুবক, যে ঐক্যবদ্ধতা পছন্দ করে। আত্মকেন্দ্রিক নয়। সে বিশ্বাস করে, বিশৃঙ্খলভাবে একা একা কাজ করার চাইতেও সুশৃঙ্খলভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করা সর্ব বিচারে ভালো। সে সবাইকে সাথে নিয়ে কাজ করে। মহান আল্লাহর দরবারে ঐক্যবদ্ধ প্রার্থনা জানায়,
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ
অর্থ : হে আল্লাহ আমরা আপনারই ইবাদত করি এবং আপনারই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি। —সূরা ফাতিহা : ০৪

মুজাহিদ যুবকরা উদার আকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্র তারা। তারা সোনার হরফে লিখে দেয় ত্যাগের মহিমাগাথা। জাতিকে উপহার দেয় সুস্পষ্ট বিজয়। ইসলাম পুনপ্রতিষ্ঠিত হয় আপন মহিমায়। শত্রুরা হাসে উপহাসের হাসি। তবে, এ অসম্ভব নয়। কিয়ামত পর্যন্ত সে আশার আলো জ্বলে ঈমানদীপ্ত অকুতোভয় বীরদের হৃদয়ে।

মুসলিম সমাজে একজন মুসলিম নারীর কাছে আমাদের প্রত্যাশা— তিনি একজন আদর্শ মা হবেন। ঈমান ও বিশ্বাসে বলীয়ান। দৃঢ়চিত্ত, সুউচ্চ মনোবলসম্পন্ন। যিনি হযরত খানসা রাযিয়াল্লাহু আনহার আদর্শে উজ্জীবিত। যেই খানসা রাযি. টগবগে যুবক চার ছেলেকেই কাদিসিয়া যুদ্ধে সমবেত করে জিহাদে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন এই বলে: “তোমরা জেনে রেখো, এই দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী। আখেরাত উত্তম। আখেরাতই চিরস্থায়ী। সুতরাং ধৈর্য ধরো। ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা দেখাও। এবং শত্রুর মোকাবিলায় অবিচল থেকো।” যখন কাদিসিয়া যুদ্ধে চার সন্তানই শহীদ হওয়ার সংবাদ পেলেন তখন স্থিরচিত্তে হযরত খানসা রাযি. শুধু এ কথা বললেন, “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর। যিনি ফি সাবিলিল্লাহ আমার ছেলেদের শাহাদাতের সুধা পান করিয়ে আমাকে সম্মানিত করেছেন। আমি আশা করি, আমার আল্লাহ আমাকে এবং আমার চার সন্তানকে তাঁর রহমতের আশ্রয়ে আবার একত্রিত করবেন।”১

আমাদের প্রত্যাশা—মুসলিম নারী হবেন একজন রত্নগর্ভা। যিনি কিতাব ও সুন্নাহ অনুযায়ী সন্তানদের লালনপালন করেন। সাদ, খালিদ, তারিকের মতো মর্দে মুমিন জাতিকে উপহার দেন।

আমাদের প্রত্যাশা—মুসলিম নারী হবেন একজন ধৈর্যশীলা কঠিন প্রত্যয়িনী বোন। বিপদে ভেঙে পড়েন না। যার সাহস আকাশচুম্বী। খাওলা বিনতে আযওয়ারের মতো। আজনাবাইনের যুদ্ধে ভ্রাতা যিরারের বন্দি হওয়ার সংবাদ পেয়ে তিনি যে সাহসিকতা দেখিয়েছিলেন তা মুসলিম নারীর প্রেরণা হয়ে থাকবে চিরকাল। সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ স্বয়ং যিরারকে মুক্ত করতে গিয়েছিলেন যেখানে। দিগ্বিজয়ী বীর, মুসলিম সেনাপতি, আল্লাহর তরবারি—খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি. মুসলিমবাহিনি নিয়ে এগিয়ে চলেছেন তীরবেগে। হঠাৎ দেখা যায় অগণিত এক অশ্বারোহী। অথৈ ভীড়ে ছুটে চলেছেন ধুলোবুলরিত দূর দিগন্তে। তিনি ছুটছেন তো ছুটছেন। পেছনে ভ্রূক্ষেপ করেন না। মুসলিমবাহিনির পদাঙ্কন লক্ষ্য করেন না। মুসলিমবাহিনি রোমসেনাদের ভিড়ে ঢুকে পড়ল এবং হামলা চালাল। মুসলিম লড়াকুদের সাথে অগণিত অশ্বারোহীও কটল করে চলেছেন অগণিত রোমক যোদ্ধাকে। ...যুদ্ধ শেষ হলো। মুসলিম যোদ্ধাগণ অশ্বারোহীর পরিচয় জানতে চায়। কিন্তু তিনি চলে যাচ্ছেন। পেছনে ভ্রূক্ষেপ করছেন না। এবার সেনাপতি খালিদ রাযি. কসম দিয়ে পরিচয় ব্যক্ত করতে বলেন। এবার ফিরে তাকান অশ্বারোহী। অবগুণ্ঠনের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে তেজোদ্দীপ্ত নারী কণ্ঠ। বলেন, “হে মহামহিম সেনাপতি, আমি আপনাকে উপেক্ষা করে চলেছি শুধুমাত্র লজ্জায়। আপনি একজন মহিমান্বিত বীর সেনাপতি। আর আমি এক নগণ্য অন্তঃপুরবাসিনী। পর্দানশীন। আল্লাহর কসম, আমার দগ্ধ হৃদয়েই আমাকে যুদ্ধে অবতীর্ণ করেছে।” অবাক বিস্ময়ে সেনাপতি খালেদ রাযি. বলেন, “কে আপনি? কী আপনার বৃত্তান্ত?” তিনি বলেন, “আমি খাওলা বিনতে আযওয়ার। আমি গোত্রের অন্তঃপুরবাসিনীদের সাথে ছিলাম। কিন্তু আমার ভ্রাতা যিরারের বন্দি হওয়ার সংবাদ শুনে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। তাই অশ্বে আরোহণ করে ছুটে এসেছি এবং যা করার করেছি।” সেনাপতি খালিদ চিৎকার করে বলেন, “বোন, আপনি নিশ্চিত থাকুন। আমরা আমাদের সমগ্র শক্তি দিয়ে হামলা চালাব। ইনশাআল্লাহ, আমরা আমাদের ভ্রাতাকে মুক্ত করে আনবই।”২

মুসলিম সমাজে আমাদের প্রত্যাশিত মুসলিম তরুণী হবে ঈমান ও বিশ্বাসে গৌরবান্বিত। ধর্ম ও ধার্মিকতায় মহিমান্বিত। হবে মুক্তমনা। হবে স্বাধীনচেতা। তবে পাগলা হাওয়ায় উড়ে যাওয়া বেচারি নয়। বাতিলের সয়লাবে ভেসে যাওয়া খড়কুটো নয়। ঈমান ও হেদায়েতের বাতায়নে দেখা শার্দূলী। হাজার হাঁক-ডাক-হৈ-হুল্লোড়ে, সহস্র শোরগোল কোলাহলে—সুস্থির, সুবিবেচক, সজ্ঞান, আপন সত্তায় অটল, আপন বিশ্বাসে অবিচল। মাধুরী তার ঈমান। মূলধন তার লজ্জা ও সৎ চরিত্র। হিজাব ও পর্দায় পবিত্র। নেকাব ও জিলবাবে অপূর্ব, অনুপম।

কবির ভাষায়,
ইনহাই বিতাজিলিকা ওয়াযদাদী শিয়ারা
ইয়া লিলখিজলি মুনতখিবান বিজীহারিহি
মুতাহাযযিয়া বিসুবাল সামায়াত জিহানদান
লা তাখাফু আম্মান ওয়ালা খাওয়ারা
মর্যাদার তাজ মস্তকে ধারণ করে,
আত্মপরিচয় হৃদয়ে লালন করে,
অবগুণ্ঠিত কপালে কপোলে তুমি।
শত্রুর ভয়, দুর্বলতা দূরীভূত;
ব্যর্থ তোমাতে ষড়যন্ত্র, ব্যর্থ তোমাতে তন্ত্র-মন্ত্র।

আমাদের প্রত্যাশা—সে হবে স্বামীর অনুগতা প্রেমময়ী। হবে বিশ্বস্ত জীবনসঙ্গিনী। সুখে দুঃখে পাশে থাকে। বিপদে আপদে সাথে থাকে। ভাবে ভাবায় আনে অন্তরঙ্গতা। জীবনসাথীর হৃদয়ভূমিতে বপন করে তাকওয়ার বীজ। জীবনে হয় তার সুখের ঠিকানা। কৃতজ্ঞ, কৃতার্থ। অমায়িক, সংযমী। নিরবচ্ছিন্ন কোনো চাওয়া পাওয়া নেই। আছে স্বামীর সুখ ও সেবার প্রবল বাসনা। দাম্পত্যের উদ্যানে একটি ছায়াদার ফুলদার তরুর মতো। সুশীতল, সবুজ, প্রাণবন্ত। পত্রপুষ্পে আহ্লাদিত। যার ছায়ায় স্বামী উৎসাহ পায়। চলার প্রেরণা পায়। পায় সুখময় গতিশীল জীবনের সন্ধান। ঘুমানোর সময় চোখ বুজে নিশ্চিন্তে, নির্বিঘ্নে।

সবশেষে আমরা মুসলিম নারীকে কামনা করি একজন কর্মনিষ্ঠ দায়িয়া হিসেবে, যিনি কাজ করবেন আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। যদি শিক্ষিত হন, তা হলে শিক্ষার্থীদের হৃদয়ভূমিতে ঈমান ও আকীদার চাষবাদ করুন। বিদ্যালয়ে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ অব্যাহত রাখুন। সত্যের আওয়াজ তুলুন। যত বাধাই আসুক। যত বিপত্তিই ঘটুক। কল্যাণের বারিধারা প্রবাহিত করুন যেখানেই থাকুন। চেতনা জাগ্রত করুন নারী সমাজে। তাওহীদের কথা বলুন। রিসালাতের কথা বলুন। আখেরাতের কথা বলুন। জান্নাতের সুসংবাদ দিন। জাহান্নামের ভয় দেখান। নতুন প্রজন্মকে রক্ষা করুন ইসলাম ও মুসলিমবিদ্বেষী সকল অপশক্তির থেকে।

আমাদের প্রত্যাশা—এমন একজন মুসলিম নারী, যিনি চারপাশে ছড়িয়ে যাওয়া সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সর্ব বিষয়ে সচেতন। যিনি জীবন ও জগতের বিভিন্ন বিষয়ে দৃষ্টি প্রসারিত করতে পারেন। নানামুখী সমস্যা, উৎপত্তি, উত্তরণ উপলব্ধি করতে পারেন। প্রয়োজনীয় ধর্মীয় এবং সাধারণ উভয়বিধ জ্ঞান ও যোগ্যতায় যিনি পারদর্শিনী। যিনি মুসলিম সমাজগঠনে একটি কার্যকর উপাদান হতে, সারা পৃথিবীর সকল ধর্ম, সকল জাতির নারীদের সাথে প্রতিযোগিতা করতে—সদা প্রস্তুত। যিনি বিশ্বে যত নারী সংস্থা ও নারী-আন্দোলন গড়ে উঠেছে ধর্ম, চরিত্র ও মূল্যবোধকে ধ্বংস করার জন্য, সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে আন্তর্জাতিক নারী-আন্দোলনকে ইসলামের দিকে পরিচালিত করার প্রত্যাশী। কেননা, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক সর্ব বিষয়ের সুন্দরতম সমাধান দেয় ইসলামই। ইসলামই মানবতাকে রক্ষা করতে পারে মহাপতনের হাত থেকে। ফিরিয়ে আনতে পারে পতনোন্মুখ মানবতাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে। মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন,
وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْتَضَىٰ لَهُمْ وَلَيُبَدِّلَنَّهُم مِّن بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنًا يَعْبُدُونَنِي لَا يُشْرِكُونَ بِي شَيْئًا ۚ وَمَن كَفَرَ بَعْدَ ذَٰلِكَ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
অর্থ : আল্লাহ্ প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন তোমাদের মধ্য থেকে যারা ঈমান এনেছে এবং আমলে সালেহ্ করেছে তাদেরকে, তিনি তাদেরকে জমিনে দান করবেন খেলাফত যেভাবে খেলাফত দান করেছিলেন তোমাদের পূর্ববর্তীদের। এবং প্রতিষ্ঠিত করে দেবেন তাদের জন্য তাঁর মনোনীত ধর্মকে। আর ভীতির পরিবর্তে তাদের দান করবেন স্বস্তি। শর্ত হলো, তারা আমার ইবাদত করবে। আমার সাথে কোনো কিছুকে শরীক করবে না। কিন্তু এরপরও যারা কুফরি করবে, তারাই পাপাচারী। —সূরা নূর : ৫৫

কবি বলেন,
তুখীঝুয যালামু হাইয়্যান ওয়া ইয়াযিলু
ফজরুল মাদা মিন উফুক্বি ত্বইবাতিন ইউরসিলুল আনওয়ারা
কেটে যায় কালো ভোরের আভাসে,
দিগন্তে হাসে উষার আলো...

সমাপ্ত

টিকাঃ
১. সহীহ মুসলিম।
১. আল ইসরাহ্ কী তায়হীদিস সাহাবাহ্ : ৯৭।
২. ফুতূহুল শাম লিল ওয়াকিদী : ১/৭০-৭১।

আমাদের প্রত্যাশা—পূর্ণাঙ্গ ইসলামী সমাজ, পূর্ণাঙ্গ মুসলিম সমাজ। যার প্রথম ও প্রধান ভিত্তি হবে মুসলিম পরিবার। যার প্রতিটি সদস্য আল্লাহর আনুগত্যে হবে ঐক্যবদ্ধ। মা বাবার স্নেহ-ছায়া বিরাজমান তাদের মাথার ওপর। তারা পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ। মা বাবার ভালোবাসা তাদের ঘিরে থাকে সর্বক্ষণ। নতুন প্রজন্ম বেড়ে ওঠে আগামী দিনের মহৎ ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের গুণে। তারা গড়তে চায় মুসলিম কীর্তিপ্রাসাদ। যা সুউচ্চ, শানদার। তারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর ঝাণ্ডাকে বুলন্দ করার জন্য। ইসলামের হারানো গৌরব ও মর্যাদা ফিরিয়ে আনার জন্য।

আমরা একটি মুসলিম সমাজ চাই। যেখানে ভালোবাসা হয় আল্লাহর জন্য, রাসূলের জন্য এবং মুমিনদের জন্য। যেখানে মহান আল্লাহর এই বাণীর পাই সফল বাস্তবায়ন:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْكَفِرِينَ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُونِ الْمُؤْمِنِينَ أَتُرِيدُونَ أَنْ تَجْعَلُوْا لِلَّهِ عَلَيْكُمْ سُلْطَنًا مُبِينًا
অর্থ : হে ওই সব লোকেরা, যারা ঈমান এনেছ, তোমরা মুমিনদের বাদ দিয়ে কাফেরদের বন্ধুত্ব গ্রহণ করো না। তোমরা কি নিজেদের বিরুদ্ধে আল্লাহ্র কাছে প্রমাণ প্রতিষ্ঠা করতে চাও? —সূরা নিসা : ১৪৪

মহান আল্লাহ আরও ইরশাদ করেছেন,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا عَدُوِّي وَعَدُوَّكُمْ أَوْلِيَاءَ تُلْقُونَ إِلَيْهِمْ بِالْمَوَدَّةِ وَ قَدْ كَفَرُوْا بِمَا جَاءَكُمْ مِّنَ الْحَقِّ
অর্থ : হে ওই সমস্ত লোকেরা, যারা ঈমান এনেছ, তোমরা আমার শত্রু এবং তোমাদের শত্রুদের বন্ধুত্ব গ্রহণ করো না। তোমরা তাদেরকে ভালোবাসা দেখাবে? অথচ রাসূল যে সত্য নিয়ে আগমন করেছেন, তারা তা অস্বীকার করে। —সূরা মুমতাহিনা : ০১

আমরা এমন একটি সমাজ চাই যার মূল ভিত্তি হলো—আল্লাহর জন্য ভ্রাতৃত্ব এবং ভালোবাসা। যা সাম্প্রদায়িকতা ও গোঁড়ামিমুক্ত। মহান আল্লাহর বাণীর বাস্তবায়নে–
وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنْتُمْ أَعْدَاءً فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ فَأَصْبَحْتُمْ بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا وَكُنْتُمْ عَلَى شَفَا حُفْرَةٍ مِنَ النَّارِ فَأَنْقَذَكُمْ مِنْهَا كَذَلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ أَيْتِهِ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ
অর্থ : তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে আঁকড়ে ধরো। তোমরা বিচ্ছিন্ন হয়ো না। স্মরণ করো, যখন তোমরা ছিলে একে অপরের শত্রু। আল্লাহ তোমাদের মাঝে সম্প্রীতি সৃষ্টি করলেন। তার নেয়ামতে তোমরা হলে ভাই ভাই। স্মরণ করো, তোমরা ছিলে জাহান্নামের দ্বারপ্রান্তে। তিনি তোমাদের রক্ষা করলেন। এভাবেই আল্লাহ তাঁর নিদর্শনাবলি বর্ণনা করেন। হয়তো তোমরা দিশা পাবে। —সূরা আলে ইমরান : ১০৩

প্রিয় রাসূলও বলেছেন, 'ওই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ, তোমরা কিছুতেই জান্নাতে প্রবেশ করবে না যতক্ষণ না ঈমান আনবে। তোমরা কিছুতেই ঈমান আনতে পারবে না যতক্ষণ না একে অপরকে ভালোবাসবে।'১

আমরা একটি মুসলিম সমাজ চাই যা পারস্পরিক দায়িত্ববোধ, পারস্পরিক মায়াবোধ এবং পারস্পরিক সম্পর্কবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত। মহান আল্লাহর এই বাণীর আনুগত্য যেখানে জাগ্রত সদাসর্বদা—
أُولُوْا الْأَرْحَامِ بَعْضُهُمْ أَوْلَى بِبَعْضٍ فِي كِتَبِ اللَّهِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُهَجِرِينَ إِلَّا أَنْ تَفْعَلُوْا إِلَى أَوْلِيَائِكُمْ مَّعْرُوْفًا كَانَ ذَلِكَ فِي الْكِتَبِ مَسْطُوْরًا
অর্থ : যাদের মধ্যে রয়েছে আত্মার বন্ধন। আল্লাহ্র কিতাব অনুযায়ী সাধারণ মুমিন মুহাজিরদের চাইতে তারা একে অপরের প্রতি অধিক হকদার। তবে তোমরা বন্ধুবান্ধবদের প্রতি যে সদাচার করবে, তা আল্লাহর কিতাবে অবশ্যই লিপিবদ্ধ থাকবে। —সূরা আহযাব : ০৬

আমরা এমন একটি সমাজ চাই যা সুন্দর সুনির্মল চরিত্রমাধুর্য এবং সুউচ্চ সুমহান মূল্যবোধে ভাস্বর। সত্যতা, আমানতদারি, বিশ্বস্ততা, ত্যাগ ও বিসর্জন, বীরত্ব ও সাহসিকতা, ব্যক্তিত্ব ও মহানুভবতা; আন্তরিকতা-একনিষ্ঠতা, কৃতজ্ঞতা-কৃতার্থতা, ক্ষমা ও মার্জনা এবং ন্যায় ও সুন্দরের সুসজ্জিত একটি পূর্ণাঙ্গ সমাজ। এমন একটি সমাজ, যাকে গতিশীল করে মহৎ গুণাবলি, উন্নত আদর্শ। যেখানে চরিত্রের পবিত্রতায় আরোপিত কড়া প্রহরা। যেখানে চরিত্রই ধর্ম ও বিশ্বাসের প্রথম প্রহরী। কবির ভাষায় বলতে হয়,
'নিশ্চয়ই কোনো জাতি ততক্ষণ টিকে থাকে যতক্ষণ তাদের চরিত্র টিকে থাকে; যখন তাদের চরিত্র ধ্বংস হয়, তখন তাদের বিলুপ্তি অবশ্যম্ভাবী।'

আমরা একটি ইসলামী সমাজ চাই। যেখানে প্রতিটি মানুষের অধিকার নিশ্চিত। যেখানে জোর নেই, জুলুম নেই। অনিয়ম নেই, অনাচার নেই। যেখানে পারস্পরিক কর্ম ও লেনদেন সম্পাদিত হয় মহান আল্লাহর এই বাণীর সফল বাস্তবায়নে—
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَقُولُوْا قَوْلًا سَدِيدًا يُصْلِحْ لَكُمْ أَعْمَلَكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِيمًا
অর্থ : হে ওই সমস্ত লোকেরা যারা ঈমান এনেছ, তোমরা আল্লাহর জন্য ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকো। ন্যায়ের সাথে সাক্ষ্য প্রদান করো। কারো প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের অন্যায়ে প্ররোচিত না করে। তোমরা ন্যায়ের সাথে কাজ করো। সেটাই তাকওয়ার নিকটতর। তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে সম্যক অবগত। —সূরা মাইদাহ : ০৮

আমরা একটি পবিত্র ও সভ্য সমাজ প্রত্যাশা করি। যেখানে অপরাধপ্রবণতা নেই। লাঞ্ছনা ও চরিত্রহীনতা নেই। যেখানে প্রত্যেক ধর্মীয় নীতিমালা এবং উন্নত চরিত্রমাধুরীর ওপর প্রতিষ্ঠিত। যেখানে প্রত্যেকে প্রত্যেকের, প্রকারান্তরে সমাজের কল্যাণকামী। যেখানে আনন্দ, ব্যক্তিস্বার্থ ও প্রবৃত্তির অগ্রগামিতা বিসর্জিত। যেই সমাজের প্রতি আল্লাহর নুসরত ও সাহায্য অনিবার্য। যেমনটি মহান আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন :
وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْتَضَىٰ لَهُمْ وَ لَيُبَدِّلَنَّهُم مِّن بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنًا يَعْبُدُونَنِي لَا يُشْرِكُونَ بِي شَيْئًا وَمَن كَفَرَ بَعْدَ ذَٰلِكَ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
অর্থ : আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তোমাদের মধ্যে থেকে যারা ঈমান এনেছে এবং আমলে সালেহ করেছে তাদেরকে, তিনি তাদেরকে জমিনে দান করবেন খেলাফত, যেভাবে খেলাফত দান করেছিলেন তোমাদের পূর্ববর্তীদের। এবং প্রতিষ্ঠিত করে দেবেন তাদের জন্য তাঁর মনোনীত ধর্মকে। আর ভীতির পরিবর্তে তাদের দান করবেন স্বস্তি। তারা আমার ইবাদত করবে। আমার সাথে কোনো কিছুকে শরিক করবে না। কিন্তু এরপরও যারা কুফরি করবে, তারাই পাপাচারী। —সূরা নূর : ৫৫

আমরা একটি ইসলামী সমাজ প্রত্যাশা করি। যেখানে কিছু প্রাণবন্ত ও উৎসাহী কর্মপুরুষ কামনা করি। যাদের রক্তে আছে আল্লাহর ভালোবাসা এবং ধর্মীয় আবেগ। ধর্মীয় চেতনায় যারা স্বতঃস্ফূর্ত। ইসলামের সম্মানে যাদের রক্ত টগবগ করে। সাহসিকতা যাদের বৈশিষ্ট্য। অগ্রগামী যারা হকের পরিচয়ে। যারা মৃত্যুভয়ে ভীত হয় না। যারা তিরস্কারের পরোয়া করে না। কেননা, তারা এক আল্লাহতে বিশ্বাসী। তারা ভালো করে জানে, আল্লাহই রিজিকদাতা, লালনকারী; তিনিই অভিভাবক, রক্ষাকারী; তিনিই ব্যবস্থাপক, সাহায্যকারী।

আমরা এমন একটি সমাজ প্রত্যাশা করি, যার নেতৃত্ব দেবেন একজন মর্দে মুমিন। একজন সাজিদাল মর্দে মুমিন। একজন জিদাল মর্দে মুমিন। যিনি বিপদের মোকাবিলা করতে জানেন নির্ভয়ে। যার মনোবল সুউচ্চ পর্বতের মতো অটল, অবিচল। চরম উত্তাল পাওয়া হাওয়ায় যিনি ভেঙে পড়েন না। তরঙ্গবিক্ষুব্ধ উত্তাল সমুদ্রে যিনি দৃঢ় প্রত্যয়ী, চির কুশলী। রোমাঞ্চকর অগ্নিযাত্রায় যিনি সফল নাবিক। হাজার ঝড়ঝাপটায় যার হৃদয়ের প্রদীপ শিখা অবিচল। যিনি কখনো অধৈর্য হন না। আল্লাহর ফায়সালার প্রতি যার মন প্রাণ চিরসমর্পিত, সর্বাবস্থায় সন্তুষ্ট। জীবনের অগ্নিপরীক্ষাকে যিনি মনে করেন সফলতার সুবর্ণ সুযোগ। যিনি অনুভব করেন, জীবনের কষ্ট ক্লেশ যেন প্রভাতশিশিরের মতো সুনির্মল, যা তাকে পৃথিবীর মায়া মোহ থেকে পবিত্র করে নিত্যদিন; কিংবা জুঁই ও লিলি ফুলের মতো সুকোমল, যা হৃদয়ে প্রশান্তির শীতল প্রলেপ বুলিয়ে দেয় নরম ছোঁয়ায় অষ্টপ্রহর; কিংবা মৃদু মন্দ পুবালি বাতাসের মতো নরম ও ফুরফুরে, যা হৃদয় ছুঁয়ে যায় অনির্বচনীয় প্রাণবন্ততায় ক্ষণে ক্ষণে।

আমরা একটি মুসলিম সমাজ প্রত্যাশা করি। যেখানে পুরুষ একজন স্নেহশীল পিতা। করুণার আধার। মমতায় ভরা। যার হৃদয় জুড়ে সন্তানের প্রতি অগাধ ভালোবাসা। যিনি বুদ্ধিমান। চিন্তাশীল। প্রজ্ঞাবান। সন্তানের জন্য যেন আলোর মশাল। বিজ্ঞ পথপ্রদর্শক। বিচক্ষণ তত্ত্বাবধায়ক। বিপদে আপদে সন্তানের ভরসা। মাথা গোঁজার নিরাপদ আশ্রয়।

আমরা একটি ইসলামী সমাজ চাই। যেখানে পুরুষ একজন বিশ্বস্ত জীবনসঙ্গী। যার ভালোবাসা অটুট এবং স্থির। যিনি নারীর দুর্ভেদ্য দুর্গ। প্রেমময় স্বামী। স্ত্রীর প্রতি ধেয়ে আসা যেকোনো বিপদকে তিনি প্রতিহত করেন প্রাণপণে। তাকে সুরক্ষিত রাখেন যে কোনো অত্যাচার, অনাচার থেকে। তাই অগাধ আস্থা, অগাধ ভক্তি, অগাধ ভালোবাসা স্ত্রীর হৃদয়ে জন্মায় সগৌরবে। পূর্ণ অর্থ, পূর্ণ শান্তি স্ত্রীর হৃদয়কে রাখে স্থির, প্রশান্ত। যিনি সদাচারী। যার সাহচর্যে ধন্য হয় নারী। ধন্য হয় নারীর জীবন। সে সুখে পায় অনাবিল শান্তি। অপরিহার্য সুখ। দাম্পত্যজীবনের দায়ভারে যিনি স্ত্রীর প্রতি বাড়িয়ে দেন অবিরত সহযোগিতার হাত। তাকে দিতে চান সর্বোচ্চ সহজতা। যাতে মুসলিম পরিবার পায় পূর্ণতা। হয় দুর্ভেদ্য, দুর্লঙ্ঘ্য। যুগের ঝড়ঝাপটায় সুস্থির। কুচক্রীরা ফিরে যায় ব্যর্থ মনোরথে।

মুসলিম যুবসমাজের কাছে আমাদের প্রত্যাশা অপরিসীম। আমাদের প্রত্যাশা ঈমানী গুণ ও চারিত্রিক মাধুর্যে বিশিষ্ট একটি যুবসমাজ। যারা ইসলামের পরিচয় বহন করে। ইসলামের আদর্শ স্থাপন করে। এবং ইসলামকেই জীবনের সংবিধান হিসেবে গ্রহণ করে। যারা বিশ্বাস করে,
وَمَن يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَن يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُৱ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ
অর্থ : যদি কেউ ইসলাম ছাড়া অন্য কিছুকে ধর্ম হিসেবে পেতে চায় তা হলে তা কিছুতেই গ্রহণযোগ্য হবে না। আর পরকালে সে হবে ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্ভুক্ত। —সূরা আলে ইমরান : ৮৫

আমরা এমন একটি যুবসমাজ প্রত্যাশা করি, যারা ইসলাম ও ইসলামি বিশ্বাসে দৃঢ় প্রত্যয়ী। নিজের ধর্ম ও বিশ্বাসের প্রতি যারা গর্ব বোধ করে। কবির ভাষায়,
'কী মোর বর্ণ, কী মোর বংশ—না জানি। জানি, ইসলামই পিতা, ইসলামই জননী।'

আমরা এমন যুবক প্রত্যাশা করি, যে কিতাবুল্লাহকে আঁকড়ে থাকে। রাসূলের আদর্শের পূর্ণ বাস্তবায়ন কামনা করে। যার হৃদয় মসজিদের সাথে লেগে থাকে। যার সমগ্র সত্তা জুড়ে তাকওয়া, খোদভীতি, উত্তম চারিত্রমাধুর্য। যে আর্তমানবতার সেবায় নিয়োজিত। অভাবী দুস্থের সাহায্য সহযোগিতায় অবিরত। অত্যাচারীর ভয়। অত্যাচারিতের আশ্রয়। সময় সম্পর্কে সচেতন। কর্তব্যপরায়ণ। সে জানে, মানে, তার অনেক দায়; কিন্তু সময় সামান্য।

সে কঠোর পরিশ্রমে বিশ্বাসী। ঐশী বিধান অনুসারে নতুন করে ইসলামী জীবনযাপনের প্রত্যয়ী। কর্ম ও চেতনায় মুক্ত স্বাধীন। পাশ্চাত্যতার অন্ধ অনুকরণে নয়। সে আল্লাহর বাণী ও রাসূলের আদর্শ অনুসরণে চলে নিজ মতে, নিজ গতিতে; মহান আল্লাহর আলোয় আলোকপ্রাপ্ত হয়। তিনিই তো আসমানসমূহ ও জমিনের আলো। তাই তো পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে,
اللَّهُ نُورُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۚ مَثَلُ نُورِهِ كَمِشْكَاةٍ فِيهَا مِصْبَاحٌ ۖ الْمِصْبَاحُ فِي زُجَاجَةٍ ۖ الزُّجَاجَةُ كَأَنَّهَا كَوْكَبٌ دُرِّيٌّ يُوقَدُ مِن شَجَرَةٍ مُّبَارَكَةٍ زَيْتُونَةٍ لَّا شَرْقِيَّةٍ وَلَا غَرْبِيَّةٍ يَكَادُ زَيْتُهَا يُضِيءُ وَلَوْ لَمْ تَمْسَسْهُ نَارٌ ۚ نُّورٌ عَلَىٰ نُورٍ ۗ يَهْدِي اللَّهُ لِنُورِهِ مَن يَشَاءُ ۚ وَيَضْرِبُ اللَّهُ الْأَمْثَالَ لِلنَّاسِ ۗ وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ
অর্থ : আল্লাহ আসমানসমূহ ও জমিনের আলো। তাঁর এ আলোর দৃষ্টান্ত—যেন একটি দীপাধার। যাতে আছে একটি প্রদীপ। প্রদীপটি রাখা আছে স্বচ্ছ কাঁচের পাত্রে। কাঁচের পাত্রটি যেন কোনো উজ্জ্বল নক্ষত্র। জ্বালানি পবিত্র জয়তুন বৃক্ষের তেল। যা শুধু পূর্বের বা পশ্চিমের আলোকপ্রাপ্ত নয়। এ তেল এত স্বচ্ছ—যেন আগুনের স্পর্শ ছাড়াই জ্বলে উঠবে। এ তো আলোর ওপর আলো। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন তাকে এ আলোর দিশা দেন। আল্লাহ মানুষের জন্য দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞাত। —সূরা নূর : ৩৫

এমন যুবক, যে জমিনে বিচরণ করে; কিন্তু তার হৃদয় থাকে আরশে আজিমে। কেননা, সে হৃদয়ে জাগ্রত জিহাদি চেতনা। ধমনীতে নেশা শাহাদাতের। ফিরিয়ে আনতে চায় আযানের সুর। আযানের আযানখানা থেকে যার প্রতিধ্বনি অনুরণিত হয় কুদসের আকাশে বাতাসে। প্রকম্পিত করবে সারা পৃথিবীর তাগুতি শক্তির ভিত। আকসার মিম্বার, আকসার গম্বুজ আনন্দে ঝলমল করে উঠবে আবার। আবার উচ্চারিত হবে আল্লাহর নাম, প্রিয়তম মুহাম্মাদের নাম। ব্যথাতুর হৃদয়ে জ্বালাবে আশার আলো। ফিলিস্তিনের বিষয়ে, এতিমের মুখে ফোটাবে বিজয়ের হাসি।

এমন যুবক, যার হৃদয় উৎসুক হয়ে আছে হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে। যার দৃষ্টি প্রসারিত আসমানে। প্রত্যয়ে ছুঁয়ে যায় সুরাইয়া। রাতের ইবাদতগুজার। দিনের ঘোরসওয়ার।

এমন যুবক, যে বাস্তবতায় বিশ্বাসী। জ্ঞান ও যোগ্যতায় বিশ্বাসী। ভুলে যায় না যে, সে মায়ার পৃথিবীতেই আছে। সুতরাং কল্পনার ডানায় ভেসে বেড়ানো এবং দিবাস্বপ্নে বিভোর থাকার মানসিকতা তার নেই। সে শ্রমহীন ও সাধনাহীনভাবে নিছক অতীতের গুণকীর্তন করে জাতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে না। বরং নিজের মেধা ও সামর্থ্যকে ব্যয় করে কাজ করে। জ্ঞানের সাধনায় আত্মনিয়োগ করে—যোগ্য নেতৃত্বের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে, ইসলামের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে, পৃথিবীতে পুনরায় মুসলিমজাতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করতে। সে বিশ্বাস করে, পরিবেশ পরিস্থিতি সব সময় একই থাকে না। সময়ের ব্যবধানে প্রেক্ষাপট পাল্টে যায়। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন,
تِلْكَ الْأَيَّامُ نُدَاوِلُهَا بَيْنَ النَّاسِ
অর্থ : আর আমি মানুষের মাঝে উত্থান পতনের দিনগুলো অদলবদল করাতে থাকি। —সূরা আলে ইমরান : ১৪০

এমন যুবক, যে ঐক্যবদ্ধতা পছন্দ করে। আত্মকেন্দ্রিক নয়। সে বিশ্বাস করে, বিশৃঙ্খলভাবে একা একা কাজ করার চাইতেও সুশৃঙ্খলভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করা সর্ব বিচারে ভালো। সে সবাইকে সাথে নিয়ে কাজ করে। মহান আল্লাহর দরবারে ঐক্যবদ্ধ প্রার্থনা জানায়,
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ
অর্থ : হে আল্লাহ আমরা আপনারই ইবাদত করি এবং আপনারই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি। —সূরা ফাতিহা : ০৪

মুজাহিদ যুবকরা উদার আকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্র তারা। তারা সোনার হরফে লিখে দেয় ত্যাগের মহিমাগাথা। জাতিকে উপহার দেয় সুস্পষ্ট বিজয়। ইসলাম পুনপ্রতিষ্ঠিত হয় আপন মহিমায়। শত্রুরা হাসে উপহাসের হাসি। তবে, এ অসম্ভব নয়। কিয়ামত পর্যন্ত সে আশার আলো জ্বলে ঈমানদীপ্ত অকুতোভয় বীরদের হৃদয়ে।

মুসলিম সমাজে একজন মুসলিম নারীর কাছে আমাদের প্রত্যাশা— তিনি একজন আদর্শ মা হবেন। ঈমান ও বিশ্বাসে বলীয়ান। দৃঢ়চিত্ত, সুউচ্চ মনোবলসম্পন্ন। যিনি হযরত খানসা রাযিয়াল্লাহু আনহার আদর্শে উজ্জীবিত। যেই খানসা রাযি. টগবগে যুবক চার ছেলেকেই কাদিসিয়া যুদ্ধে সমবেত করে জিহাদে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন এই বলে: “তোমরা জেনে রেখো, এই দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী। আখেরাত উত্তম। আখেরাতই চিরস্থায়ী। সুতরাং ধৈর্য ধরো। ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা দেখাও। এবং শত্রুর মোকাবিলায় অবিচল থেকো।” যখন কাদিসিয়া যুদ্ধে চার সন্তানই শহীদ হওয়ার সংবাদ পেলেন তখন স্থিরচিত্তে হযরত খানসা রাযি. শুধু এ কথা বললেন, “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর। যিনি ফি সাবিলিল্লাহ আমার ছেলেদের শাহাদাতের সুধা পান করিয়ে আমাকে সম্মানিত করেছেন। আমি আশা করি, আমার আল্লাহ আমাকে এবং আমার চার সন্তানকে তাঁর রহমতের আশ্রয়ে আবার একত্রিত করবেন।”১

আমাদের প্রত্যাশা—মুসলিম নারী হবেন একজন রত্নগর্ভা। যিনি কিতাব ও সুন্নাহ অনুযায়ী সন্তানদের লালনপালন করেন। সাদ, খালিদ, তারিকের মতো মর্দে মুমিন জাতিকে উপহার দেন।

আমাদের প্রত্যাশা—মুসলিম নারী হবেন একজন ধৈর্যশীলা কঠিন প্রত্যয়িনী বোন। বিপদে ভেঙে পড়েন না। যার সাহস আকাশচুম্বী। খাওলা বিনতে আযওয়ারের মতো। আজনাবাইনের যুদ্ধে ভ্রাতা যিরারের বন্দি হওয়ার সংবাদ পেয়ে তিনি যে সাহসিকতা দেখিয়েছিলেন তা মুসলিম নারীর প্রেরণা হয়ে থাকবে চিরকাল। সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ স্বয়ং যিরারকে মুক্ত করতে গিয়েছিলেন যেখানে। দিগ্বিজয়ী বীর, মুসলিম সেনাপতি, আল্লাহর তরবারি—খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি. মুসলিমবাহিনি নিয়ে এগিয়ে চলেছেন তীরবেগে। হঠাৎ দেখা যায় অগণিত এক অশ্বারোহী। অথৈ ভীড়ে ছুটে চলেছেন ধুলোবুলরিত দূর দিগন্তে। তিনি ছুটছেন তো ছুটছেন। পেছনে ভ্রূক্ষেপ করেন না। মুসলিমবাহিনির পদাঙ্কন লক্ষ্য করেন না। মুসলিমবাহিনি রোমসেনাদের ভিড়ে ঢুকে পড়ল এবং হামলা চালাল। মুসলিম লড়াকুদের সাথে অগণিত অশ্বারোহীও কটল করে চলেছেন অগণিত রোমক যোদ্ধাকে। ...যুদ্ধ শেষ হলো। মুসলিম যোদ্ধাগণ অশ্বারোহীর পরিচয় জানতে চায়। কিন্তু তিনি চলে যাচ্ছেন। পেছনে ভ্রূক্ষেপ করছেন না। এবার সেনাপতি খালিদ রাযি. কসম দিয়ে পরিচয় ব্যক্ত করতে বলেন। এবার ফিরে তাকান অশ্বারোহী। অবগুণ্ঠনের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে তেজোদ্দীপ্ত নারী কণ্ঠ। বলেন, “হে মহামহিম সেনাপতি, আমি আপনাকে উপেক্ষা করে চলেছি শুধুমাত্র লজ্জায়। আপনি একজন মহিমান্বিত বীর সেনাপতি। আর আমি এক নগণ্য অন্তঃপুরবাসিনী। পর্দানশীন। আল্লাহর কসম, আমার দগ্ধ হৃদয়েই আমাকে যুদ্ধে অবতীর্ণ করেছে।” অবাক বিস্ময়ে সেনাপতি খালেদ রাযি. বলেন, “কে আপনি? কী আপনার বৃত্তান্ত?” তিনি বলেন, “আমি খাওলা বিনতে আযওয়ার। আমি গোত্রের অন্তঃপুরবাসিনীদের সাথে ছিলাম। কিন্তু আমার ভ্রাতা যিরারের বন্দি হওয়ার সংবাদ শুনে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। তাই অশ্বে আরোহণ করে ছুটে এসেছি এবং যা করার করেছি।” সেনাপতি খালিদ চিৎকার করে বলেন, “বোন, আপনি নিশ্চিত থাকুন। আমরা আমাদের সমগ্র শক্তি দিয়ে হামলা চালাব। ইনশাআল্লাহ, আমরা আমাদের ভ্রাতাকে মুক্ত করে আনবই।”২

মুসলিম সমাজে আমাদের প্রত্যাশিত মুসলিম তরুণী হবে ঈমান ও বিশ্বাসে গৌরবান্বিত। ধর্ম ও ধার্মিকতায় মহিমান্বিত। হবে মুক্তমনা। হবে স্বাধীনচেতা। তবে পাগলা হাওয়ায় উড়ে যাওয়া বেচারি নয়। বাতিলের সয়লাবে ভেসে যাওয়া খড়কুটো নয়। ঈমান ও হেদায়েতের বাতায়নে দেখা শার্দূলী। হাজার হাঁক-ডাক-হৈ-হুল্লোড়ে, সহস্র শোরগোল কোলাহলে—সুস্থির, সুবিবেচক, সজ্ঞান, আপন সত্তায় অটল, আপন বিশ্বাসে অবিচল। মাধুরী তার ঈমান। মূলধন তার লজ্জা ও সৎ চরিত্র। হিজাব ও পর্দায় পবিত্র। নেকাব ও জিলবাবে অপূর্ব, অনুপম।

কবির ভাষায়,
ইনহাই বিতাজিলিকা ওয়াযদাদী শিয়ারা
ইয়া লিলখিজলি মুনতখিবান বিজীহারিহি
মুতাহাযযিয়া বিসুবাল সামায়াত জিহানদান
লা তাখাফু আম্মান ওয়ালা খাওয়ারা
মর্যাদার তাজ মস্তকে ধারণ করে,
আত্মপরিচয় হৃদয়ে লালন করে,
অবগুণ্ঠিত কপালে কপোলে তুমি।
শত্রুর ভয়, দুর্বলতা দূরীভূত;
ব্যর্থ তোমাতে ষড়যন্ত্র, ব্যর্থ তোমাতে তন্ত্র-মন্ত্র।

আমাদের প্রত্যাশা—সে হবে স্বামীর অনুগতা প্রেমময়ী। হবে বিশ্বস্ত জীবনসঙ্গিনী। সুখে দুঃখে পাশে থাকে। বিপদে আপদে সাথে থাকে। ভাবে ভাবায় আনে অন্তরঙ্গতা। জীবনসাথীর হৃদয়ভূমিতে বপন করে তাকওয়ার বীজ। জীবনে হয় তার সুখের ঠিকানা। কৃতজ্ঞ, কৃতার্থ। অমায়িক, সংযমী। নিরবচ্ছিন্ন কোনো চাওয়া পাওয়া নেই। আছে স্বামীর সুখ ও সেবার প্রবল বাসনা। দাম্পত্যের উদ্যানে একটি ছায়াদার ফুলদার তরুর মতো। সুশীতল, সবুজ, প্রাণবন্ত। পত্রপুষ্পে আহ্লাদিত। যার ছায়ায় স্বামী উৎসাহ পায়। চলার প্রেরণা পায়। পায় সুখময় গতিশীল জীবনের সন্ধান। ঘুমানোর সময় চোখ বুজে নিশ্চিন্তে, নির্বিঘ্নে।

সবশেষে আমরা মুসলিম নারীকে কামনা করি একজন কর্মনিষ্ঠ দায়িয়া হিসেবে, যিনি কাজ করবেন আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। যদি শিক্ষিত হন, তা হলে শিক্ষার্থীদের হৃদয়ভূমিতে ঈমান ও আকীদার চাষবাদ করুন। বিদ্যালয়ে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ অব্যাহত রাখুন। সত্যের আওয়াজ তুলুন। যত বাধাই আসুক। যত বিপত্তিই ঘটুক। কল্যাণের বারিধারা প্রবাহিত করুন যেখানেই থাকুন। চেতনা জাগ্রত করুন নারী সমাজে। তাওহীদের কথা বলুন। রিসালাতের কথা বলুন। আখেরাতের কথা বলুন। জান্নাতের সুসংবাদ দিন। জাহান্নামের ভয় দেখান। নতুন প্রজন্মকে রক্ষা করুন ইসলাম ও মুসলিমবিদ্বেষী সকল অপশক্তির থেকে।

আমাদের প্রত্যাশা—এমন একজন মুসলিম নারী, যিনি চারপাশে ছড়িয়ে যাওয়া সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সর্ব বিষয়ে সচেতন। যিনি জীবন ও জগতের বিভিন্ন বিষয়ে দৃষ্টি প্রসারিত করতে পারেন। নানামুখী সমস্যা, উৎপত্তি, উত্তরণ উপলব্ধি করতে পারেন। প্রয়োজনীয় ধর্মীয় এবং সাধারণ উভয়বিধ জ্ঞান ও যোগ্যতায় যিনি পারদর্শিনী। যিনি মুসলিম সমাজগঠনে একটি কার্যকর উপাদান হতে, সারা পৃথিবীর সকল ধর্ম, সকল জাতির নারীদের সাথে প্রতিযোগিতা করতে—সদা প্রস্তুত। যিনি বিশ্বে যত নারী সংস্থা ও নারী-আন্দোলন গড়ে উঠেছে ধর্ম, চরিত্র ও মূল্যবোধকে ধ্বংস করার জন্য, সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে আন্তর্জাতিক নারী-আন্দোলনকে ইসলামের দিকে পরিচালিত করার প্রত্যাশী। কেননা, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক সর্ব বিষয়ের সুন্দরতম সমাধান দেয় ইসলামই। ইসলামই মানবতাকে রক্ষা করতে পারে মহাপতনের হাত থেকে। ফিরিয়ে আনতে পারে পতনোন্মুখ মানবতাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে। মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন,
وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْتَضَىٰ لَهُمْ وَلَيُبَدِّلَنَّهُم مِّن بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنًا يَعْبُدُونَنِي لَا يُشْرِكُونَ بِي شَيْئًا ۚ وَمَن كَفَرَ بَعْدَ ذَٰلِكَ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
অর্থ : আল্লাহ্ প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন তোমাদের মধ্য থেকে যারা ঈমান এনেছে এবং আমলে সালেহ্ করেছে তাদেরকে, তিনি তাদেরকে জমিনে দান করবেন খেলাফত যেভাবে খেলাফত দান করেছিলেন তোমাদের পূর্ববর্তীদের। এবং প্রতিষ্ঠিত করে দেবেন তাদের জন্য তাঁর মনোনীত ধর্মকে। আর ভীতির পরিবর্তে তাদের দান করবেন স্বস্তি। শর্ত হলো, তারা আমার ইবাদত করবে। আমার সাথে কোনো কিছুকে শরীক করবে না। কিন্তু এরপরও যারা কুফরি করবে, তারাই পাপাচারী। —সূরা নূর : ৫৫

কবি বলেন,
তুখীঝুয যালামু হাইয়্যান ওয়া ইয়াযিলু
ফজরুল মাদা মিন উফুক্বি ত্বইবাতিন ইউরসিলুল আনওয়ারা
কেটে যায় কালো ভোরের আভাসে,
দিগন্তে হাসে উষার আলো...

সমাপ্ত

টিকাঃ
১. সহীহ মুসলিম।
১. আল ইসরাহ্ কী তায়হীদিস সাহাবাহ্ : ৯৭।
২. ফুতূহুল শাম লিল ওয়াকিদী : ১/৭০-৭১।

আমাদের প্রত্যাশা—পূর্ণাঙ্গ ইসলামী সমাজ, পূর্ণাঙ্গ মুসলিম সমাজ। যার প্রথম ও প্রধান ভিত্তি হবে মুসলিম পরিবার। যার প্রতিটি সদস্য আল্লাহর আনুগত্যে হবে ঐক্যবদ্ধ। মা বাবার স্নেহ-ছায়া বিরাজমান তাদের মাথার ওপর। তারা পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ। মা বাবার ভালোবাসা তাদের ঘিরে থাকে সর্বক্ষণ। নতুন প্রজন্ম বেড়ে ওঠে আগামী দিনের মহৎ ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের গুণে। তারা গড়তে চায় মুসলিম কীর্তিপ্রাসাদ। যা সুউচ্চ, শানদার। তারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর ঝাণ্ডাকে বুলন্দ করার জন্য। ইসলামের হারানো গৌরব ও মর্যাদা ফিরিয়ে আনার জন্য।

আমরা একটি মুসলিম সমাজ চাই। যেখানে ভালোবাসা হয় আল্লাহর জন্য, রাসূলের জন্য এবং মুমিনদের জন্য। যেখানে মহান আল্লাহর এই বাণীর পাই সফল বাস্তবায়ন:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْكَفِرِينَ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُونِ الْمُؤْمِنِينَ أَتُرِيدُونَ أَنْ تَجْعَلُوْا لِلَّهِ عَلَيْكُمْ سُلْطَنًا مُبِينًا
অর্থ : হে ওই সব লোকেরা, যারা ঈমান এনেছ, তোমরা মুমিনদের বাদ দিয়ে কাফেরদের বন্ধুত্ব গ্রহণ করো না। তোমরা কি নিজেদের বিরুদ্ধে আল্লাহ্র কাছে প্রমাণ প্রতিষ্ঠা করতে চাও? —সূরা নিসা : ১৪৪

মহান আল্লাহ আরও ইরশাদ করেছেন,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا عَدُوِّي وَعَدُوَّكُمْ أَوْلِيَاءَ تُلْقُونَ إِلَيْهِمْ بِالْمَوَدَّةِ وَ قَدْ كَفَرُوْا بِمَا جَاءَكُمْ مِّنَ الْحَقِّ
অর্থ : হে ওই সমস্ত লোকেরা, যারা ঈমান এনেছ, তোমরা আমার শত্রু এবং তোমাদের শত্রুদের বন্ধুত্ব গ্রহণ করো না। তোমরা তাদেরকে ভালোবাসা দেখাবে? অথচ রাসূল যে সত্য নিয়ে আগমন করেছেন, তারা তা অস্বীকার করে। —সূরা মুমতাহিনা : ০১

আমরা এমন একটি সমাজ চাই যার মূল ভিত্তি হলো—আল্লাহর জন্য ভ্রাতৃত্ব এবং ভালোবাসা। যা সাম্প্রদায়িকতা ও গোঁড়ামিমুক্ত। মহান আল্লাহর বাণীর বাস্তবায়নে–
وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنْتُمْ أَعْدَاءً فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ فَأَصْبَحْتُمْ بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا وَكُنْتُمْ عَلَى شَفَا حُفْرَةٍ مِنَ النَّارِ فَأَنْقَذَكُمْ مِنْهَا كَذَلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ أَيْتِهِ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ
অর্থ : তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে আঁকড়ে ধরো। তোমরা বিচ্ছিন্ন হয়ো না। স্মরণ করো, যখন তোমরা ছিলে একে অপরের শত্রু। আল্লাহ তোমাদের মাঝে সম্প্রীতি সৃষ্টি করলেন। তার নেয়ামতে তোমরা হলে ভাই ভাই। স্মরণ করো, তোমরা ছিলে জাহান্নামের দ্বারপ্রান্তে। তিনি তোমাদের রক্ষা করলেন। এভাবেই আল্লাহ তাঁর নিদর্শনাবলি বর্ণনা করেন। হয়তো তোমরা দিশা পাবে। —সূরা আলে ইমরান : ১০৩

প্রিয় রাসূলও বলেছেন, 'ওই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ, তোমরা কিছুতেই জান্নাতে প্রবেশ করবে না যতক্ষণ না ঈমান আনবে। তোমরা কিছুতেই ঈমান আনতে পারবে না যতক্ষণ না একে অপরকে ভালোবাসবে।'১

আমরা একটি মুসলিম সমাজ চাই যা পারস্পরিক দায়িত্ববোধ, পারস্পরিক মায়াবোধ এবং পারস্পরিক সম্পর্কবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত। মহান আল্লাহর এই বাণীর আনুগত্য যেখানে জাগ্রত সদাসর্বদা—
أُولُوْا الْأَرْحَامِ بَعْضُهُمْ أَوْلَى بِبَعْضٍ فِي كِتَبِ اللَّهِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُهَجِرِينَ إِلَّا أَنْ تَفْعَلُوْا إِلَى أَوْلِيَائِكُمْ مَّعْرُوْفًا كَانَ ذَلِكَ فِي الْكِتَبِ مَسْطُوْরًا
অর্থ : যাদের মধ্যে রয়েছে আত্মার বন্ধন। আল্লাহ্র কিতাব অনুযায়ী সাধারণ মুমিন মুহাজিরদের চাইতে তারা একে অপরের প্রতি অধিক হকদার। তবে তোমরা বন্ধুবান্ধবদের প্রতি যে সদাচার করবে, তা আল্লাহর কিতাবে অবশ্যই লিপিবদ্ধ থাকবে। —সূরা আহযাব : ০৬

আমরা এমন একটি সমাজ চাই যা সুন্দর সুনির্মল চরিত্রমাধুর্য এবং সুউচ্চ সুমহান মূল্যবোধে ভাস্বর। সত্যতা, আমানতদারি, বিশ্বস্ততা, ত্যাগ ও বিসর্জন, বীরত্ব ও সাহসিকতা, ব্যক্তিত্ব ও মহানুভবতা; আন্তরিকতা-একনিষ্ঠতা, কৃতজ্ঞতা-কৃতার্থতা, ক্ষমা ও মার্জনা এবং ন্যায় ও সুন্দরের সুসজ্জিত একটি পূর্ণাঙ্গ সমাজ। এমন একটি সমাজ, যাকে গতিশীল করে মহৎ গুণাবলি, উন্নত আদর্শ। যেখানে চরিত্রের পবিত্রতায় আরোপিত কড়া প্রহরা। যেখানে চরিত্রই ধর্ম ও বিশ্বাসের প্রথম প্রহরী। কবির ভাষায় বলতে হয়,
'নিশ্চয়ই কোনো জাতি ততক্ষণ টিকে থাকে যতক্ষণ তাদের চরিত্র টিকে থাকে; যখন তাদের চরিত্র ধ্বংস হয়, তখন তাদের বিলুপ্তি অবশ্যম্ভাবী।'

আমরা একটি ইসলামী সমাজ চাই। যেখানে প্রতিটি মানুষের অধিকার নিশ্চিত। যেখানে জোর নেই, জুলুম নেই। অনিয়ম নেই, অনাচার নেই। যেখানে পারস্পরিক কর্ম ও লেনদেন সম্পাদিত হয় মহান আল্লাহর এই বাণীর সফল বাস্তবায়নে—
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَقُولُوْا قَوْلًا سَدِيدًا يُصْلِحْ لَكُمْ أَعْمَلَكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِيمًا
অর্থ : হে ওই সমস্ত লোকেরা যারা ঈমান এনেছ, তোমরা আল্লাহর জন্য ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকো। ন্যায়ের সাথে সাক্ষ্য প্রদান করো। কারো প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের অন্যায়ে প্ররোচিত না করে। তোমরা ন্যায়ের সাথে কাজ করো। সেটাই তাকওয়ার নিকটতর। তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে সম্যক অবগত। —সূরা মাইদাহ : ০৮

আমরা একটি পবিত্র ও সভ্য সমাজ প্রত্যাশা করি। যেখানে অপরাধপ্রবণতা নেই। লাঞ্ছনা ও চরিত্রহীনতা নেই। যেখানে প্রত্যেক ধর্মীয় নীতিমালা এবং উন্নত চরিত্রমাধুরীর ওপর প্রতিষ্ঠিত। যেখানে প্রত্যেকে প্রত্যেকের, প্রকারান্তরে সমাজের কল্যাণকামী। যেখানে আনন্দ, ব্যক্তিস্বার্থ ও প্রবৃত্তির অগ্রগামিতা বিসর্জিত। যেই সমাজের প্রতি আল্লাহর নুসরত ও সাহায্য অনিবার্য। যেমনটি মহান আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন :
وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْتَضَىٰ لَهُمْ وَ لَيُبَدِّلَنَّهُم مِّن بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنًا يَعْبُدُونَنِي لَا يُشْرِكُونَ بِي شَيْئًا وَمَن كَفَرَ بَعْدَ ذَٰلِكَ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
অর্থ : আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তোমাদের মধ্যে থেকে যারা ঈমান এনেছে এবং আমলে সালেহ করেছে তাদেরকে, তিনি তাদেরকে জমিনে দান করবেন খেলাফত, যেভাবে খেলাফত দান করেছিলেন তোমাদের পূর্ববর্তীদের। এবং প্রতিষ্ঠিত করে দেবেন তাদের জন্য তাঁর মনোনীত ধর্মকে। আর ভীতির পরিবর্তে তাদের দান করবেন স্বস্তি। তারা আমার ইবাদত করবে। আমার সাথে কোনো কিছুকে শরিক করবে না। কিন্তু এরপরও যারা কুফরি করবে, তারাই পাপাচারী। —সূরা নূর : ৫৫

আমরা একটি ইসলামী সমাজ প্রত্যাশা করি। যেখানে কিছু প্রাণবন্ত ও উৎসাহী কর্মপুরুষ কামনা করি। যাদের রক্তে আছে আল্লাহর ভালোবাসা এবং ধর্মীয় আবেগ। ধর্মীয় চেতনায় যারা স্বতঃস্ফূর্ত। ইসলামের সম্মানে যাদের রক্ত টগবগ করে। সাহসিকতা যাদের বৈশিষ্ট্য। অগ্রগামী যারা হকের পরিচয়ে। যারা মৃত্যুভয়ে ভীত হয় না। যারা তিরস্কারের পরোয়া করে না। কেননা, তারা এক আল্লাহতে বিশ্বাসী। তারা ভালো করে জানে, আল্লাহই রিজিকদাতা, লালনকারী; তিনিই অভিভাবক, রক্ষাকারী; তিনিই ব্যবস্থাপক, সাহায্যকারী।

আমরা এমন একটি সমাজ প্রত্যাশা করি, যার নেতৃত্ব দেবেন একজন মর্দে মুমিন। একজন সাজিদাল মর্দে মুমিন। একজন জিদাল মর্দে মুমিন। যিনি বিপদের মোকাবিলা করতে জানেন নির্ভয়ে। যার মনোবল সুউচ্চ পর্বতের মতো অটল, অবিচল। চরম উত্তাল পাওয়া হাওয়ায় যিনি ভেঙে পড়েন না। তরঙ্গবিক্ষুব্ধ উত্তাল সমুদ্রে যিনি দৃঢ় প্রত্যয়ী, চির কুশলী। রোমাঞ্চকর অগ্নিযাত্রায় যিনি সফল নাবিক। হাজার ঝড়ঝাপটায় যার হৃদয়ের প্রদীপ শিখা অবিচল। যিনি কখনো অধৈর্য হন না। আল্লাহর ফায়সালার প্রতি যার মন প্রাণ চিরসমর্পিত, সর্বাবস্থায় সন্তুষ্ট। জীবনের অগ্নিপরীক্ষাকে যিনি মনে করেন সফলতার সুবর্ণ সুযোগ। যিনি অনুভব করেন, জীবনের কষ্ট ক্লেশ যেন প্রভাতশিশিরের মতো সুনির্মল, যা তাকে পৃথিবীর মায়া মোহ থেকে পবিত্র করে নিত্যদিন; কিংবা জুঁই ও লিলি ফুলের মতো সুকোমল, যা হৃদয়ে প্রশান্তির শীতল প্রলেপ বুলিয়ে দেয় নরম ছোঁয়ায় অষ্টপ্রহর; কিংবা মৃদু মন্দ পুবালি বাতাসের মতো নরম ও ফুরফুরে, যা হৃদয় ছুঁয়ে যায় অনির্বচনীয় প্রাণবন্ততায় ক্ষণে ক্ষণে।

আমরা একটি মুসলিম সমাজ প্রত্যাশা করি। যেখানে পুরুষ একজন স্নেহশীল পিতা। করুণার আধার। মমতায় ভরা। যার হৃদয় জুড়ে সন্তানের প্রতি অগাধ ভালোবাসা। যিনি বুদ্ধিমান। চিন্তাশীল। প্রজ্ঞাবান। সন্তানের জন্য যেন আলোর মশাল। বিজ্ঞ পথপ্রদর্শক। বিচক্ষণ তত্ত্বাবধায়ক। বিপদে আপদে সন্তানের ভরসা। মাথা গোঁজার নিরাপদ আশ্রয়।

আমরা একটি ইসলামী সমাজ চাই। যেখানে পুরুষ একজন বিশ্বস্ত জীবনসঙ্গী। যার ভালোবাসা অটুট এবং স্থির। যিনি নারীর দুর্ভেদ্য দুর্গ। প্রেমময় স্বামী। স্ত্রীর প্রতি ধেয়ে আসা যেকোনো বিপদকে তিনি প্রতিহত করেন প্রাণপণে। তাকে সুরক্ষিত রাখেন যে কোনো অত্যাচার, অনাচার থেকে। তাই অগাধ আস্থা, অগাধ ভক্তি, অগাধ ভালোবাসা স্ত্রীর হৃদয়ে জন্মায় সগৌরবে। পূর্ণ অর্থ, পূর্ণ শান্তি স্ত্রীর হৃদয়কে রাখে স্থির, প্রশান্ত। যিনি সদাচারী। যার সাহচর্যে ধন্য হয় নারী। ধন্য হয় নারীর জীবন। সে সুখে পায় অনাবিল শান্তি। অপরিহার্য সুখ। দাম্পত্যজীবনের দায়ভারে যিনি স্ত্রীর প্রতি বাড়িয়ে দেন অবিরত সহযোগিতার হাত। তাকে দিতে চান সর্বোচ্চ সহজতা। যাতে মুসলিম পরিবার পায় পূর্ণতা। হয় দুর্ভেদ্য, দুর্লঙ্ঘ্য। যুগের ঝড়ঝাপটায় সুস্থির। কুচক্রীরা ফিরে যায় ব্যর্থ মনোরথে।

মুসলিম যুবসমাজের কাছে আমাদের প্রত্যাশা অপরিসীম। আমাদের প্রত্যাশা ঈমানী গুণ ও চারিত্রিক মাধুর্যে বিশিষ্ট একটি যুবসমাজ। যারা ইসলামের পরিচয় বহন করে। ইসলামের আদর্শ স্থাপন করে। এবং ইসলামকেই জীবনের সংবিধান হিসেবে গ্রহণ করে। যারা বিশ্বাস করে,
وَمَن يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَن يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُৱ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ
অর্থ : যদি কেউ ইসলাম ছাড়া অন্য কিছুকে ধর্ম হিসেবে পেতে চায় তা হলে তা কিছুতেই গ্রহণযোগ্য হবে না। আর পরকালে সে হবে ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্ভুক্ত। —সূরা আলে ইমরান : ৮৫

আমরা এমন একটি যুবসমাজ প্রত্যাশা করি, যারা ইসলাম ও ইসলামি বিশ্বাসে দৃঢ় প্রত্যয়ী। নিজের ধর্ম ও বিশ্বাসের প্রতি যারা গর্ব বোধ করে। কবির ভাষায়,
'কী মোর বর্ণ, কী মোর বংশ—না জানি। জানি, ইসলামই পিতা, ইসলামই জননী।'

আমরা এমন যুবক প্রত্যাশা করি, যে কিতাবুল্লাহকে আঁকড়ে থাকে। রাসূলের আদর্শের পূর্ণ বাস্তবায়ন কামনা করে। যার হৃদয় মসজিদের সাথে লেগে থাকে। যার সমগ্র সত্তা জুড়ে তাকওয়া, খোদভীতি, উত্তম চারিত্রমাধুর্য। যে আর্তমানবতার সেবায় নিয়োজিত। অভাবী দুস্থের সাহায্য সহযোগিতায় অবিরত। অত্যাচারীর ভয়। অত্যাচারিতের আশ্রয়। সময় সম্পর্কে সচেতন। কর্তব্যপরায়ণ। সে জানে, মানে, তার অনেক দায়; কিন্তু সময় সামান্য।

সে কঠোর পরিশ্রমে বিশ্বাসী। ঐশী বিধান অনুসারে নতুন করে ইসলামী জীবনযাপনের প্রত্যয়ী। কর্ম ও চেতনায় মুক্ত স্বাধীন। পাশ্চাত্যতার অন্ধ অনুকরণে নয়। সে আল্লাহর বাণী ও রাসূলের আদর্শ অনুসরণে চলে নিজ মতে, নিজ গতিতে; মহান আল্লাহর আলোয় আলোকপ্রাপ্ত হয়। তিনিই তো আসমানসমূহ ও জমিনের আলো। তাই তো পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে,
اللَّهُ نُورُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۚ مَثَلُ نُورِهِ كَمِشْكَاةٍ فِيهَا مِصْبَاحٌ ۖ الْمِصْبَاحُ فِي زُجَاجَةٍ ۖ الزُّجَاجَةُ كَأَنَّهَا كَوْكَبٌ دُرِّيٌّ يُوقَدُ مِن شَجَرَةٍ مُّبَارَكَةٍ زَيْتُونَةٍ لَّا شَرْقِيَّةٍ وَلَا غَرْبِيَّةٍ يَكَادُ زَيْتُهَا يُضِيءُ وَلَوْ لَمْ تَمْسَسْهُ نَارٌ ۚ نُّورٌ عَلَىٰ نُورٍ ۗ يَهْدِي اللَّهُ لِنُورِهِ مَن يَشَاءُ ۚ وَيَضْرِبُ اللَّهُ الْأَمْثَالَ لِلنَّاسِ ۗ وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ
অর্থ : আল্লাহ আসমানসমূহ ও জমিনের আলো। তাঁর এ আলোর দৃষ্টান্ত—যেন একটি দীপাধার। যাতে আছে একটি প্রদীপ। প্রদীপটি রাখা আছে স্বচ্ছ কাঁচের পাত্রে। কাঁচের পাত্রটি যেন কোনো উজ্জ্বল নক্ষত্র। জ্বালানি পবিত্র জয়তুন বৃক্ষের তেল। যা শুধু পূর্বের বা পশ্চিমের আলোকপ্রাপ্ত নয়। এ তেল এত স্বচ্ছ—যেন আগুনের স্পর্শ ছাড়াই জ্বলে উঠবে। এ তো আলোর ওপর আলো। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন তাকে এ আলোর দিশা দেন। আল্লাহ মানুষের জন্য দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞাত। —সূরা নূর : ৩৫

এমন যুবক, যে জমিনে বিচরণ করে; কিন্তু তার হৃদয় থাকে আরশে আজিমে। কেননা, সে হৃদয়ে জাগ্রত জিহাদি চেতনা। ধমনীতে নেশা শাহাদাতের। ফিরিয়ে আনতে চায় আযানের সুর। আযানের আযানখানা থেকে যার প্রতিধ্বনি অনুরণিত হয় কুদসের আকাশে বাতাসে। প্রকম্পিত করবে সারা পৃথিবীর তাগুতি শক্তির ভিত। আকসার মিম্বার, আকসার গম্বুজ আনন্দে ঝলমল করে উঠবে আবার। আবার উচ্চারিত হবে আল্লাহর নাম, প্রিয়তম মুহাম্মাদের নাম। ব্যথাতুর হৃদয়ে জ্বালাবে আশার আলো। ফিলিস্তিনের বিষয়ে, এতিমের মুখে ফোটাবে বিজয়ের হাসি।

এমন যুবক, যার হৃদয় উৎসুক হয়ে আছে হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে। যার দৃষ্টি প্রসারিত আসমানে। প্রত্যয়ে ছুঁয়ে যায় সুরাইয়া। রাতের ইবাদতগুজার। দিনের ঘোরসওয়ার।

এমন যুবক, যে বাস্তবতায় বিশ্বাসী। জ্ঞান ও যোগ্যতায় বিশ্বাসী। ভুলে যায় না যে, সে মায়ার পৃথিবীতেই আছে। সুতরাং কল্পনার ডানায় ভেসে বেড়ানো এবং দিবাস্বপ্নে বিভোর থাকার মানসিকতা তার নেই। সে শ্রমহীন ও সাধনাহীনভাবে নিছক অতীতের গুণকীর্তন করে জাতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে না। বরং নিজের মেধা ও সামর্থ্যকে ব্যয় করে কাজ করে। জ্ঞানের সাধনায় আত্মনিয়োগ করে—যোগ্য নেতৃত্বের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে, ইসলামের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে, পৃথিবীতে পুনরায় মুসলিমজাতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করতে। সে বিশ্বাস করে, পরিবেশ পরিস্থিতি সব সময় একই থাকে না। সময়ের ব্যবধানে প্রেক্ষাপট পাল্টে যায়। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন,
تِلْكَ الْأَيَّامُ نُدَاوِلُهَا بَيْنَ النَّاسِ
অর্থ : আর আমি মানুষের মাঝে উত্থান পতনের দিনগুলো অদলবদল করাতে থাকি। —সূরা আলে ইমরান : ১৪০

এমন যুবক, যে ঐক্যবদ্ধতা পছন্দ করে। আত্মকেন্দ্রিক নয়। সে বিশ্বাস করে, বিশৃঙ্খলভাবে একা একা কাজ করার চাইতেও সুশৃঙ্খলভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করা সর্ব বিচারে ভালো। সে সবাইকে সাথে নিয়ে কাজ করে। মহান আল্লাহর দরবারে ঐক্যবদ্ধ প্রার্থনা জানায়,
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ
অর্থ : হে আল্লাহ আমরা আপনারই ইবাদত করি এবং আপনারই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি। —সূরা ফাতিহা : ০৪

মুজাহিদ যুবকরা উদার আকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্র তারা। তারা সোনার হরফে লিখে দেয় ত্যাগের মহিমাগাথা। জাতিকে উপহার দেয় সুস্পষ্ট বিজয়। ইসলাম পুনপ্রতিষ্ঠিত হয় আপন মহিমায়। শত্রুরা হাসে উপহাসের হাসি। তবে, এ অসম্ভব নয়। কিয়ামত পর্যন্ত সে আশার আলো জ্বলে ঈমানদীপ্ত অকুতোভয় বীরদের হৃদয়ে।

মুসলিম সমাজে একজন মুসলিম নারীর কাছে আমাদের প্রত্যাশা— তিনি একজন আদর্শ মা হবেন। ঈমান ও বিশ্বাসে বলীয়ান। দৃঢ়চিত্ত, সুউচ্চ মনোবলসম্পন্ন। যিনি হযরত খানসা রাযিয়াল্লাহু আনহার আদর্শে উজ্জীবিত। যেই খানসা রাযি. টগবগে যুবক চার ছেলেকেই কাদিসিয়া যুদ্ধে সমবেত করে জিহাদে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন এই বলে: “তোমরা জেনে রেখো, এই দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী। আখেরাত উত্তম। আখেরাতই চিরস্থায়ী। সুতরাং ধৈর্য ধরো। ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা দেখাও। এবং শত্রুর মোকাবিলায় অবিচল থেকো।” যখন কাদিসিয়া যুদ্ধে চার সন্তানই শহীদ হওয়ার সংবাদ পেলেন তখন স্থিরচিত্তে হযরত খানসা রাযি. শুধু এ কথা বললেন, “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর। যিনি ফি সাবিলিল্লাহ আমার ছেলেদের শাহাদাতের সুধা পান করিয়ে আমাকে সম্মানিত করেছেন। আমি আশা করি, আমার আল্লাহ আমাকে এবং আমার চার সন্তানকে তাঁর রহমতের আশ্রয়ে আবার একত্রিত করবেন।”১

আমাদের প্রত্যাশা—মুসলিম নারী হবেন একজন রত্নগর্ভা। যিনি কিতাব ও সুন্নাহ অনুযায়ী সন্তানদের লালনপালন করেন। সাদ, খালিদ, তারিকের মতো মর্দে মুমিন জাতিকে উপহার দেন।

আমাদের প্রত্যাশা—মুসলিম নারী হবেন একজন ধৈর্যশীলা কঠিন প্রত্যয়িনী বোন। বিপদে ভেঙে পড়েন না। যার সাহস আকাশচুম্বী। খাওলা বিনতে আযওয়ারের মতো। আজনাবাইনের যুদ্ধে ভ্রাতা যিরারের বন্দি হওয়ার সংবাদ পেয়ে তিনি যে সাহসিকতা দেখিয়েছিলেন তা মুসলিম নারীর প্রেরণা হয়ে থাকবে চিরকাল। সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ স্বয়ং যিরারকে মুক্ত করতে গিয়েছিলেন যেখানে। দিগ্বিজয়ী বীর, মুসলিম সেনাপতি, আল্লাহর তরবারি—খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি. মুসলিমবাহিনি নিয়ে এগিয়ে চলেছেন তীরবেগে। হঠাৎ দেখা যায় অগণিত এক অশ্বারোহী। অথৈ ভীড়ে ছুটে চলেছেন ধুলোবুলরিত দূর দিগন্তে। তিনি ছুটছেন তো ছুটছেন। পেছনে ভ্রূক্ষেপ করেন না। মুসলিমবাহিনির পদাঙ্কন লক্ষ্য করেন না। মুসলিমবাহিনি রোমসেনাদের ভিড়ে ঢুকে পড়ল এবং হামলা চালাল। মুসলিম লড়াকুদের সাথে অগণিত অশ্বারোহীও কটল করে চলেছেন অগণিত রোমক যোদ্ধাকে। ...যুদ্ধ শেষ হলো। মুসলিম যোদ্ধাগণ অশ্বারোহীর পরিচয় জানতে চায়। কিন্তু তিনি চলে যাচ্ছেন। পেছনে ভ্রূক্ষেপ করছেন না। এবার সেনাপতি খালিদ রাযি. কসম দিয়ে পরিচয় ব্যক্ত করতে বলেন। এবার ফিরে তাকান অশ্বারোহী। অবগুণ্ঠনের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে তেজোদ্দীপ্ত নারী কণ্ঠ। বলেন, “হে মহামহিম সেনাপতি, আমি আপনাকে উপেক্ষা করে চলেছি শুধুমাত্র লজ্জায়। আপনি একজন মহিমান্বিত বীর সেনাপতি। আর আমি এক নগণ্য অন্তঃপুরবাসিনী। পর্দানশীন। আল্লাহর কসম, আমার দগ্ধ হৃদয়েই আমাকে যুদ্ধে অবতীর্ণ করেছে।” অবাক বিস্ময়ে সেনাপতি খালেদ রাযি. বলেন, “কে আপনি? কী আপনার বৃত্তান্ত?” তিনি বলেন, “আমি খাওলা বিনতে আযওয়ার। আমি গোত্রের অন্তঃপুরবাসিনীদের সাথে ছিলাম। কিন্তু আমার ভ্রাতা যিরারের বন্দি হওয়ার সংবাদ শুনে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। তাই অশ্বে আরোহণ করে ছুটে এসেছি এবং যা করার করেছি।” সেনাপতি খালিদ চিৎকার করে বলেন, “বোন, আপনি নিশ্চিত থাকুন। আমরা আমাদের সমগ্র শক্তি দিয়ে হামলা চালাব। ইনশাআল্লাহ, আমরা আমাদের ভ্রাতাকে মুক্ত করে আনবই।”২

মুসলিম সমাজে আমাদের প্রত্যাশিত মুসলিম তরুণী হবে ঈমান ও বিশ্বাসে গৌরবান্বিত। ধর্ম ও ধার্মিকতায় মহিমান্বিত। হবে মুক্তমনা। হবে স্বাধীনচেতা। তবে পাগলা হাওয়ায় উড়ে যাওয়া বেচারি নয়। বাতিলের সয়লাবে ভেসে যাওয়া খড়কুটো নয়। ঈমান ও হেদায়েতের বাতায়নে দেখা শার্দূলী। হাজার হাঁক-ডাক-হৈ-হুল্লোড়ে, সহস্র শোরগোল কোলাহলে—সুস্থির, সুবিবেচক, সজ্ঞান, আপন সত্তায় অটল, আপন বিশ্বাসে অবিচল। মাধুরী তার ঈমান। মূলধন তার লজ্জা ও সৎ চরিত্র। হিজাব ও পর্দায় পবিত্র। নেকাব ও জিলবাবে অপূর্ব, অনুপম।

কবির ভাষায়,
ইনহাই বিতাজিলিকা ওয়াযদাদী শিয়ারা
ইয়া লিলখিজলি মুনতখিবান বিজীহারিহি
মুতাহাযযিয়া বিসুবাল সামায়াত জিহানদান
লা তাখাফু আম্মান ওয়ালা খাওয়ারা
মর্যাদার তাজ মস্তকে ধারণ করে,
আত্মপরিচয় হৃদয়ে লালন করে,
অবগুণ্ঠিত কপালে কপোলে তুমি।
শত্রুর ভয়, দুর্বলতা দূরীভূত;
ব্যর্থ তোমাতে ষড়যন্ত্র, ব্যর্থ তোমাতে তন্ত্র-মন্ত্র।

আমাদের প্রত্যাশা—সে হবে স্বামীর অনুগতা প্রেমময়ী। হবে বিশ্বস্ত জীবনসঙ্গিনী। সুখে দুঃখে পাশে থাকে। বিপদে আপদে সাথে থাকে। ভাবে ভাবায় আনে অন্তরঙ্গতা। জীবনসাথীর হৃদয়ভূমিতে বপন করে তাকওয়ার বীজ। জীবনে হয় তার সুখের ঠিকানা। কৃতজ্ঞ, কৃতার্থ। অমায়িক, সংযমী। নিরবচ্ছিন্ন কোনো চাওয়া পাওয়া নেই। আছে স্বামীর সুখ ও সেবার প্রবল বাসনা। দাম্পত্যের উদ্যানে একটি ছায়াদার ফুলদার তরুর মতো। সুশীতল, সবুজ, প্রাণবন্ত। পত্রপুষ্পে আহ্লাদিত। যার ছায়ায় স্বামী উৎসাহ পায়। চলার প্রেরণা পায়। পায় সুখময় গতিশীল জীবনের সন্ধান। ঘুমানোর সময় চোখ বুজে নিশ্চিন্তে, নির্বিঘ্নে।

সবশেষে আমরা মুসলিম নারীকে কামনা করি একজন কর্মনিষ্ঠ দায়িয়া হিসেবে, যিনি কাজ করবেন আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। যদি শিক্ষিত হন, তা হলে শিক্ষার্থীদের হৃদয়ভূমিতে ঈমান ও আকীদার চাষবাদ করুন। বিদ্যালয়ে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ অব্যাহত রাখুন। সত্যের আওয়াজ তুলুন। যত বাধাই আসুক। যত বিপত্তিই ঘটুক। কল্যাণের বারিধারা প্রবাহিত করুন যেখানেই থাকুন। চেতনা জাগ্রত করুন নারী সমাজে। তাওহীদের কথা বলুন। রিসালাতের কথা বলুন। আখেরাতের কথা বলুন। জান্নাতের সুসংবাদ দিন। জাহান্নামের ভয় দেখান। নতুন প্রজন্মকে রক্ষা করুন ইসলাম ও মুসলিমবিদ্বেষী সকল অপশক্তির থেকে।

আমাদের প্রত্যাশা—এমন একজন মুসলিম নারী, যিনি চারপাশে ছড়িয়ে যাওয়া সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সর্ব বিষয়ে সচেতন। যিনি জীবন ও জগতের বিভিন্ন বিষয়ে দৃষ্টি প্রসারিত করতে পারেন। নানামুখী সমস্যা, উৎপত্তি, উত্তরণ উপলব্ধি করতে পারেন। প্রয়োজনীয় ধর্মীয় এবং সাধারণ উভয়বিধ জ্ঞান ও যোগ্যতায় যিনি পারদর্শিনী। যিনি মুসলিম সমাজগঠনে একটি কার্যকর উপাদান হতে, সারা পৃথিবীর সকল ধর্ম, সকল জাতির নারীদের সাথে প্রতিযোগিতা করতে—সদা প্রস্তুত। যিনি বিশ্বে যত নারী সংস্থা ও নারী-আন্দোলন গড়ে উঠেছে ধর্ম, চরিত্র ও মূল্যবোধকে ধ্বংস করার জন্য, সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে আন্তর্জাতিক নারী-আন্দোলনকে ইসলামের দিকে পরিচালিত করার প্রত্যাশী। কেননা, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক সর্ব বিষয়ের সুন্দরতম সমাধান দেয় ইসলামই। ইসলামই মানবতাকে রক্ষা করতে পারে মহাপতনের হাত থেকে। ফিরিয়ে আনতে পারে পতনোন্মুখ মানবতাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে। মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন,
وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْتَضَىٰ لَهُمْ وَلَيُبَدِّلَنَّهُم مِّن بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنًا يَعْبُدُونَنِي لَا يُشْرِكُونَ بِي شَيْئًا ۚ وَمَن كَفَرَ بَعْدَ ذَٰلِكَ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
অর্থ : আল্লাহ্ প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন তোমাদের মধ্য থেকে যারা ঈমান এনেছে এবং আমলে সালেহ্ করেছে তাদেরকে, তিনি তাদেরকে জমিনে দান করবেন খেলাফত যেভাবে খেলাফত দান করেছিলেন তোমাদের পূর্ববর্তীদের। এবং প্রতিষ্ঠিত করে দেবেন তাদের জন্য তাঁর মনোনীত ধর্মকে। আর ভীতির পরিবর্তে তাদের দান করবেন স্বস্তি। শর্ত হলো, তারা আমার ইবাদত করবে। আমার সাথে কোনো কিছুকে শরীক করবে না। কিন্তু এরপরও যারা কুফরি করবে, তারাই পাপাচারী। —সূরা নূর : ৫৫

কবি বলেন,
তুখীঝুয যালামু হাইয়্যান ওয়া ইয়াযিলু
ফজরুল মাদা মিন উফুক্বি ত্বইবাতিন ইউরসিলুল আনওয়ারা
কেটে যায় কালো ভোরের আভাসে,
দিগন্তে হাসে উষার আলো...

সমাপ্ত

টিকাঃ
১. সহীহ মুসলিম।
১. আল ইসরাহ্ কী তায়হীদিস সাহাবাহ্ : ৯৭।
২. ফুতূহুল শাম লিল ওয়াকিদী : ১/৭০-৭১।

ফন্ট সাইজ
15px
17px