📄 জন্মনিয়ন্ত্রণ
আরব বিশ্বে অসংখ্য প্রচারমাধ্যম এবং অসংখ্য প্রোপাগান্ডা উক্তি মানুষকে অনেক আগে থেকেই। বিশেষত জায়নবাদের প্রচারস্রোত চলছে জোরেশোরে। বড় চিত্তাকর্ষক ভঙ্গিমায়, বাগাড়ম্বর ভাষায় চলছে অনবরত বক্তৃতা ও বিবৃতির ফুলঝুরি। দেখানো হচ্ছে স্বামী-স্ত্রী ও একটি সন্তান দ্বারা গঠিত ছোট ছোট পরিবারের নিখুঁত সুন্দর চিত্র। স্লোগান দেওয়া হচ্ছে, সন্তান একটি হলে দুটি নয়, দুটি হলে আর নয়। বোঝানো হচ্ছে, এরকম ছোট ছিমছাম পরিবারে জীবন কত সহজ হয়, সুখের হয়। দাম্পত্যজীবন কত মধুময় লাগে, সুসময় লাগে। পক্ষান্তরে যদি সন্তান বেশি হয়, যদি পরিবারের সদস্যসংখ্যা বেড়ে যায়, তা হলে জীবনে সেই স্বাচ্ছন্দ্য, সেই সুসময়তা ও মধুময়তা থাকে না। আর জন্মনিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বনকারী নারীদের স্তুতি তো মাথা হেঁট করার মতো। কিন্তু যত প্রোপাগান্ডাই হোক, চাইলেই তো প্রকৃতিকে উল্টে দেওয়া যায় না। মা ও শিশুর ভালোবাসা যে প্রকৃতিজাত বিষয়।
মূলত পশ্চিমাদের অন্ধ অনুকরণেই এইসব প্রোপাগান্ডার প্রসারণ ঘটানো হচ্ছে। জন্মনিয়ন্ত্রণকে পক্ষ বলা হয়, এভাবে যদি উদ্দাম গতিতে জনসংখ্যা বাড়তে থাকে, তা হলে অচিরেই এমন দিন আসবে, যেদিন ভূগর্ভস্থ উপায়ই মানুষের প্রয়োজন পূরণে ব্যর্থ হবে। অথচ তারা ভুলে যান যে, আল্লাহই এই পৃথিবীর স্রষ্টা। যিনি যতদিন পৃথিবীকে টিকিয়ে রাখবেন, ততদিন পৃথিবীর যাবতীয় প্রয়োজন পূরণ করবেন। রিজিক একমাত্র আল্লাহ্র হাতে। আল্লাহ্র ইচ্ছা ও নিয়ন্ত্রণে হস্তক্ষেপ করার অধিকার ও ক্ষমতা কারো নেই। তিনি এই ভূপৃষ্ঠে বিদ্যমান প্রতিটি জীবের রিজিকের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। মহান আল্লাহ্ই ইরশাদ করেছেন,
فِي السَّمَاءِ رِزْقُكُمْ وَمَا تُوعَدُونَ فَوَرَبِّ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ إِنَّهُ لَحَقٌّ مِّثْلَ مَا أَنَّكُمْ تَنطِقُونَ
অর্থ : আকাশে রয়েছে তোমাদের রিযিক, তোমাদের সাথে কৃত যাবতীয় প্রতিশ্রুতি। সুতরাং আসমান ও জমিনের রবের কসম, এই কুরআন বাস্তব সত্য —ঠিক যেমন তোমরা এখন কথা বলছ। —সূরা যারিয়াত, আয়াত : ২২-২৩
তিনি আরও ইরশাদ করেছেন,
وَمَا مِن دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللَّهِ رِزْقُهَا وَيَعْلَمُ مُسْتَقَرَّهَا وَمُسْتَوْدَعَهَا كُلٌّ فِي كِتَابٍ مُّبِينٍ
অর্থ : পৃথিবীতে এমন কোনো প্রাণী নেই যার জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহর ওপর নেই। তিনি (যেমন) তার আবাস সম্পর্কে অবগত, (তেমনি মৃত্যুর পর) তাকে যেখানে সোপর্দ করা হবে তাও তিনি জানেন। সবই লিপিবদ্ধ সুস্পষ্ট কিতাবে। —সূরা হুদ, আয়াত : ৬
কোনো মুসলিম রাষ্ট্রে সরকারের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ঢালাও জন্মনিয়ন্ত্রণের নির্দেশ জারি করা বা এর পক্ষে জনমত গঠনের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা ইসলাম ও মুসলমানদের পক্ষে মোটেই সুখবর হবে না। বরং রাষ্ট্রের উচিত হবে, এমন যৌক্তিক নীতিমালা ও বলিষ্ঠ পদক্ষেপ গ্রহণ করা যাতে জনসংখ্যা জনসমস্যা নয়, বরং জনশক্তিতে পরিণত হয়। দেশের এক একটি সন্তান যেন অন্তত এক একটি অঙ্গনের এক একটি শূন্যতা দূর করতে পারে। আমরা মনে করি, জন্মনিয়ন্ত্রণের পক্ষে ঢাকঢোল পিটিয়ে দেশ ও জাতির শক্তি খর্ব করার চাইতে এইদিকে মনোযোগী হওয়াই বেশি ভালো হবে।
জন্মনিয়ন্ত্রণের পক্ষে অনেকে যুক্তি দেন, বেশি সন্তান হলে মা বাবার ওপর চাপ হয়ে যায়। তাদের সঠিক লালনপালন না হলে সামাজিকভাবে ধস নামে। সামাজিক অবক্ষয়, অধঃপতনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যে নারীর মৌলিক দায়িত্ব হলো ঘরে বসে সন্তান লালনপালন করা, সে নারীকে যদি নানা প্রোপাগান্ডায় টেনে হেঁচড়ে রাস্তায় নামানো হয় এবং বন্দিদশা থেকে মুক্তি দেওয়ার নামে পুরুষের সাথে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করানোর ছোল পেঁচানো হয়, তা হলে একটি বা দুটি সন্তানকেও যথাযথ প্রতিপালন সম্ভব নয় যা সামাজিক ভারসাম্য ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পক্ষে ইতিবাচক। বরং একধরনের মা-বাবার জন্য দুটি কেন, একটি সন্তানও মানুষ করতে পারা কঠিন —তাই পলেফিক্সমির মতো কোনো শিশুপ্রতিপালন সংস্থায়ও সহায়তা নিতে হতে পারে।
তবে ইসলামের সরল সঠিক পথ সব সময়ই মধ্যমতা অবলম্বন করে। একদম বাড়াবাড়ি বা একেবারে ছাড়াছাড়ির মতো দুই প্রান্তিকতাকে ইসলাম কখনোই প্রশ্রয় দেয় না। সুতরাং মা যেন প্রতিটি শিশুকে যথাযথ আদর সোহাগ ও অধিকার দিতে পারে, সার্বিকভাবে প্রত্যেকের লালনপালন করতে পারে, সেজন্য ইসলাম স্বামী-স্ত্রীকে এই দুই গণ্ডিরঘরের মাঝে যৌক্তিক ব্যবধান রাখার সুযোগ দিয়েছে। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন,
وَوَصَّيْنَا الْإِنسَانَ بِوَالِدَيْهِ حَمَلَتْهُ أُمُّهُ وَهْنًا عَلَى وَهْنٍ وَفِصَالُهُ فِي عَامَيْنِ أَنِ اشْكُرْ لِي وَلِوَالِدَيْكَ إِلَيَّ الْمَصِيرُ
অর্থ : আমি মানুষকে উপদেশ দিয়েছি পিতা-মাতার প্রতি সদাচারের। কেননা, তার মা তাকে গর্ভে কষ্ট সহ্য করে গর্ভে ধারণ করেছেন। তার দুধ ছাড়ানোর সময়কাল ছিল দুই বছর। আমি মানুষকে উপদেশ দিয়েছি এই মর্মে যে, তুমি আমার প্রতি এবং তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। মনে রেখো, আমার কাছেই তোমাকে ফিরে আসতে হবে। —সূরা লুকমান : ১৪
অনুরূপভাবে যদি এমন হয় যে, মা পরপর প্রত্যেক সন্তানের প্রয়োজন পূরণ সক্ষম নন, যাতে তাদের দেখাশোনা ও লালনপালনে ঘাটতি দেখা দেয়, যা তাদের জীবনকে সুখময় শান্তিময় করতে ব্যর্থ হয়, তা হলে তো একথা সুস্পষ্ট যে, আল্লাহ্ কাউকেই তার সামর্থ্যের বাইরে কিছু চাপিয়ে দেন না। তা ছাড়া, দায়িত্বপূর্ণ দেখাশোনা ও অর্থপূর্ণ লালনপালনই ইসলামে কাম্য। নিছক সন্তানের আধিক্য কখনোই ইসলামে কাম্য নয়। আবার এই কথাটাকে আইনের ফাঁকফোকর হিসেবে গ্রহণ করাও কোনো মুসলমানের সাজে না। কেননা, আল্লাহ্ সর্বজ্ঞাত। তিনি গুপ্ত ও ব্যক্ত সবেরই অবগত। কোনো কিছুই তার কাছে গোপন থাকে না।
অনুরূপভাবে যদি এমন হয় যে, সন্তান নিতে গেলে নারীর জীবনের ঝুঁকি দেখা দেয়, তা হলেও তার জন্য সন্তানগ্রহণ থেকে বিরত থাকার বৈধতা ইসলামে আছে। কেননা, শরী'আতের মানশা হলো মায়ের জীবন রক্ষা করা। মা-ই তো আসল। মা বেঁচে থাকলেই না সন্তান জন্ম নেবে।