📘 ফিরে এসো নীড়ে 📄 নারীর কর্ম

📄 নারীর কর্ম


বর্তমান প্রেক্ষাপটে নারীর কর্মজীবন একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। এক্ষেত্রে মুসলিম গবেষকগণের চিন্তাধারা মোটামুটি দু-রকম। এক পক্ষ ঘরের বাইরে নারীর কাজ করাকে সমর্থন করেন; কিন্তু শর্তসাপেক্ষে। অপর পক্ষ এটাকে প্রত্যাখ্যান করেন; কিন্তু অপারগতার অবস্থায় শর্তসাপেক্ষে অনুমোদন করেন। উভয় পক্ষেরই যুক্তি আছে, প্রমাণ আছে。

তবে মুসলিম গবেষকগণ প্রত্যেকেই এখানে একমত যে, নারীর প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হলো স্বামী-সংসার, সন্তান-লালনপালন ও পরিবার দেখাশোনা। অর্থাৎ তার মূল কর্মক্ষেত্র ও অবস্থানক্ষেত্র তার ঘর। কেননা, নারীই পরিবারের মূল ভিত্তি। আর পরিবারই সমাজের ভিত্তি। আর সমাজই একটি দেশ ও জাতির ভিত্তি। সুতরাং নারীর ঘরে অবস্থান ও পারিবারিক দায়িত্বপালনকে সাধারণভাবে দেখলে এবং তাকে সমাজের অচল অংশ ভাবার কোনো সুযোগ নেই। নারীজীবনের চরম ও পরম সার্থকতা এবং দেশ ও জাতির চূড়ান্ত সফলতা মূলত এখানেই নিহিত। পরিবারেই শিশু প্রকৃত ভালোবাসার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠে এবং তার মানে মানবীয় গুণ ও মূল্যবোধের বিকাশ ঘটে এবং তার সার্বিক নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত হয়। পরিবারে নারীর যথাযোগ্য উপস্থিতি ও দায়িত্বপালন একদিকে যেমন বর্তমান সময় ও সমাজকে রক্ষা করে, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ-প্রজন্মকেও যোগ্য করে গড়ে তোলে।

কিন্তু অনেক সময় এমন হয় যখন নারীর কাজ করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। যেমন কোনো বিধবা, কিংবা তালাকপ্রাপ্তা নারী যাদের ভরণপোষণ করার কেউ নেই। বিশেষত বর্তমান প্রেক্ষাপটে যেহেতু ইসলামী আইনের প্রয়োগ নেই, এবং ইসলামী মূল্যবোধও প্রায় অনুপস্থিত, সেহেতু যেসব দূরবর্তী মাহরামদের ওপর ভরণপোষণের আবশ্যকতা আছে তারা দায় এড়িয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। অথবা তারা দায়িত্ব পালন করলেও বিষয়টা খুব একটা সম্মানজনক হয় না। অনেক সময় নারী এমন পরিবারের সদস্য হয় যেখানে অভাব-অনটন অনেক বেশি। ছোট ভাই-বোনের খরচপাতি যোগাতে মা-বাবার পাশে দাঁড়ানো জরুরি হয়ে পড়ে। অনেক মেয়ের স্বামীর আয়-উপার্জন কম হয়। পরিবারের সব দায় মেটে না। মিটলেও সুখেই টানাটানি করে। স্বামীর কষ্ট লাঘব করার জন্য নারীরও কিছু একটা করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে অধিকাংশের চাকরিজীবী হওয়ার নেশা। আবার নারীর প্রতি সমাজেরও প্রয়োজন পড়ে। যেমন চিকিৎসার কথাই ধরি। সমাজের নারীশ্রেণি অত্যন্ত চিকিৎসায় মেয়ে ডাক্তারদের প্রতিই আস্থা বোধ করে। বিশেষত মেয়েলি বিষয়গুলোতে। যদিও ইসলাম প্রয়োজনের কারণে মেয়ে-ডাক্তার না থাকলে পুরুষ-ডাক্তার দেখানোয়, এমনকি সতর খোলারও অনুমতি দিয়েছে।

আমি যেহেতু জীবনের শুরুতে একজন কর্মজীবী নারী ছিলাম, সেহেতু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে পারি, কোনো নারী যদি ঘরে একজন স্ত্রী ও মা হিসেবে তার প্রথম ও প্রধান মৌলিক দায়িত্বটি পালন করতে পারেন, পাশাপাশি ঘরের বাইরেও কাজ করতে পারেন, তা হলে মনে হয় না কেউ আপত্তি করবে।

কিন্তু এটা আদৌ সম্ভব কি না—বাইরে কাজ করেও কি নারী স্বামী-সন্তানকে যথাযথ সময় দিতে পারবে? কাজের সময় তার অনুপস্থিতিতে তার সন্তান দেখাশোনা ও লালনপালন করবে কে? বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। কেননা, এটিই নারীর প্রথম ও প্রধান মৌলিক দায়িত্ব। যেমন তেমন যুক্তি দিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া অবশ্যই ধর্মীয় মূল্যবোধের সাথে সাংঘর্ষিক।

তবে যদি এমন কোনো কোল পেয়ে যান যাতে শিশুর অযত্ন না হয়, বরং ধর্মীয় ও সামাজিক সব দাবি ও অধিকারই রক্ষিত হবে, তা হলে তার অনুপস্থিতির সময়টুকু উপযুক্ত কোলদাত্রীকেই সে অর্পণ করে যাওয়ায় কোনো বাধা থাকার কথা নয়। কেননা, আমি মনে করি, সন্তানকে কী পরিমাণ সময় দেওয়া হলো সেটা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো, সন্তানকে যেটুকু সময় দেওয়া হলো কীভাবে দেওয়া হলো এবং তাতে তার তালিম তরবিয়ত কতটুকু হলো। অনেক নারীই আছেন, যাদের এক মুহূর্তের জন্যও বাইরে যেতে হয় না; অথচ সন্তানের তালিম তরবিয়তে এমন কিছু করেন না যা তার মানসিক বিকাশ, আচার-ব্যবহার ও ধর্মীয় বিকাশে কোনো রকম প্রশংসাযোগ্য। আবার অনেক কর্মজীবী নারী আছেন, যাদের অনেক বাইরে যেতে হয়; কিন্তু সন্তানের তালিম তরবিয়তের ব্যাপারে তিনি এমন কিছু করতে পারেন যা তাকে প্রশংসিত করে। তা হলে মূল বিষয়টি হলো মায়ের সচেতনতা এবং সন্তানের প্রতি দায়িত্বশীল ভূমিকা। বিচক্ষণ নারী তার প্রতিটি মুহূর্তকে সর্বোচ্চ মূল্যায়ন করবেন। এক একটি মিনিট হিসাব করে কাজ করবেন। খুচরা সময়গুলোকেও কাজে লাগাবেন। এভাবে তিনি যদি জীবনটাকে সাজিয়ে গুছিয়ে নেন, এবং সুপরিকল্পিত সময়সূচি অনুযায়ী নিয়মিত পরিচালিত করেন, তা হলে ইনশাআল্লাহ পরিবারের প্রতিটি সদস্যকে প্রাপ্য অধিকার প্রদান করতে পারবেন। সেই সাথে সময়সূচি অনুযায়ী সুপরিকল্পিতভাবে নিয়মিত কাজ করার অভ্যাস গঠন করার মাধ্যমে চাইলেই পরিবারের কাজের পাশাপাশি বাইরের কাজও করতে পারবেন।

কিন্তু এটা আদৌ সম্ভব কি না—একজন নারী এভাবে দ্বিমুখী দায়িত্বপালন করতে গিয়ে জীবনে বড় ক্ষতির মুখেও পড়ে। অনেকেরই তাতে দৈহিক ক্ষতির শিকার হন। তাই ভেবেচিন্তে কাজ করা উচিত। তবে এটাও ঠিক যে, প্রকৃত অর্থে কোনো কঠিন কাজও সহজে হয়ে যায়। শরীরের ক্লান্তি সে আর এমন কী! একটু বিশ্রামেই কি যথেষ্ট নয় শরীরের অবসাদ দূর করার জন্য? কিন্তু অলস মনের অবকাশ—সে তো আরামে আরামে ঘুমিয়েও পূর্ণ হয় না।

যাই হোক, আমরা নারীকে কর্মের ময়দানে নামতে উৎসাহিত করছি না। কিন্তু ভাগ্য যাদের কাজে নামিয়েছে বা নামানোর বন্দোবস্ত করে ফেলেছে, তাদেরকে তাদের মৌলিক দায়িত্বের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। যেন সময় ও সামর্থ্যের দায় মেটাতে গিয়ে নিজের মৌলিক দায়িত্বের কথা ভুলে না বসেন; বরং প্রয়োজনে মূলকেই প্রাধান্য দিয়ে সুস্থ ও সঠিক জীবনে ফিরে আসার ব্যাপারে উৎসাহী হন।

মনে রাখতে হবে, নারীর কর্মজীবন ও ধর্মজীবন যেন পরস্পর বিরোধী না হয়। কর্মজীবন অবশ্যই ধর্মজীবনের অনুগত হবে। ধর্মজীবন কখনোই কর্মজীবনের অনুগত হবে না। এই মূলনীতিকে সামনে রেখে আমরা নারীর কর্ম ও কর্মক্ষেত্র সম্পর্কিত কিছু শর্তাবলি উপস্থাপন করছি। আশা করি, আমার মুসলিম ভগ্নীগণ তাদের কর্মজীবনে এই শর্তাবলি অনুসরণ করে মুসলিম নারীসমাজের স্বকীয়তা ও বৈশিষ্ট্য অক্ষত রাখবেন:

১. স্বামীর স্বতন্ত্র কর্তৃত্বকে সম্মান জানিয়ে কাজ করতে হবে। তাঁর অনুমতি ও সমর্থন ছাড়া কাজ করা যাবে না। কেননা, তিনি আপনার অভিভাবক। সাধ্যমতো আপনার ভরণপোষণের দায়িত্ব তাঁর।

২. অবশ্যই নারীকে নারীর প্রথম ও প্রধান মৌলিক দায়িত্ব (অর্থাৎ সন্তান লালনপালন, ঘর দেখভাল, স্বামীসেবা ইত্যাদি) এবং কর্মজীবনের দায়ের মধ্যে সমন্বয় করার সক্ষমতা রাখতে হবে। তিনি যদি একজন আদর্শ মা হিসেবে সন্তান লালনপালন, একজন আদর্শ নারী হিসেবে পরিবার-পরিচালনা এবং একজন আদর্শ স্ত্রী হিসেবে স্বামীর যাবতীয় হক আদায় করতে পারেন; এবং এ সবকিছুর ঠিক রেখেও বাইরের কাজে সময় দেওয়ার সক্ষমতা রাখেন, তা হলেই কেবল কর্মক্ষেত্রে অবতীর্ণ হওয়ার অনুমতি থাকবে। নয়তো ঘরে অবস্থান করে নারীর মৌলিক দায়িত্বটি সঠিকভাবে পালন করাই হবে সুবিবেচনার পরিচায়ক। বিশ্বাস করুন, আপনার দ্বারা দেশ ও জাতি এটাই অধিক উপকৃত হবে। আপনার ইহলৌকিক ও পারলৌকিক সৌভাগ্য অনিশ্চিত হবে না।

৩. নারী যে কাজটা করবেন, তা অবশ্যই শরীয়াহ-অনুমোদিত হতে হবে—যেমন: শিক্ষকতা, ডাক্তারি ইত্যাদি। যা শরীয়াহ-অনুমোদিত নয়, তাতে কিছুতেই কখনোই জড়ানো যাবে না—যেমন: অভিনয়, নৃত্য, শরাব পান করানো ইত্যাদি।

৪. নারী যে কাজ করবেন, তা অবশ্যই এমন হতে হবে যাতে ইসলামের ব্যক্তিগত ও সামাজিক পর্দাব্যবস্থার ব্যাঘাত ঘটবে না।

৫. নারী অবশ্যই এমন কোনো কাজে নিজেকে জড়াবেন না যাতে পুরুষদের সাথে মিশতে হয়। কিংবা একান্তে পুরুষদের সাথে কাজ করতে বা কথা বলতে হয়।

৬. অবশ্যই পর্দার সাথে কাজে যেতে হবে, পর্দার সাথে কাজ করতে হবে। কখনোই নারী সহজাত লজ্জাশীলতা ও গাম্ভীর্যকে বিসর্জন দেওয়া যাবে না। মাথায় রাখতে হবে, যেন তার দ্বারা কিছুতেই তার প্রতি কোনো পুরুষের দৃষ্টি বা মনোযোগ আকর্ষণ না হয়। নয়তো আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে; সমাজে চারিত্রিক ফেতনা ও পারিবারিক ধ্বংস নামিয়ে একটি সমাজকে যারা নষ্ট করছে, সেই অপরাধীদের কাতারেই দাঁড়াতে হবে। যাদের পরিণাম হলো—'দুনিয়া ও আখেরাতে যন্ত্রণাদায়ক আজাব'।

৭. কাজ অবশ্যই নারীর প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। উদাহরণস্বরূপ নির্মাণকাজে শ্রমিক হওয়া অবশ্যই নারীর প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

৮. সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও স্বামী-সন্তানের প্রতি কার্পণ্য না করা। এ কথা না বলা যে, আমার টাকা আমি যেভাবে খুশি সেভাবে খরচ করব। কেননা, স্বামী-সন্তানের সমস্তটুকু নিয়েই আপনি কাজ করছেন। তাদের প্রতি আপনার হিতাকাঙ্ক্ষা থাকতে হবে। যথাসম্ভব উপার্জন থেকে সংসারে অবদান রাখুন। সাধ্যমতো দান-সদকা করুন। হয়তো এর উসিলায় আল্লাহ আপনার ত্রুটিগুলোর মোচন ও মার্জনা করবেন।

দম্পতিরা পারস্পরিক মতৈক্যের ভিত্তিতে যদি কর্মজীবন বেছে নেয়, পরিবার ও সন্তানের দেখাশোনায় একে অপরের সহযোগিতার মানসিকতা পোষণ করে, তা হলে স্ত্রীর কর্ম—আশা করা যায়—পরিবারের প্রতিটি সদস্যের সৌভাগ্যর কারণ হবে। দুঃখ, দুর্দশা ও ভাঙনের কারণ হবে না। যেমনটি শোনা যায় যে, অনেক পরিবারের দাম্পত্যকলহের একমাত্র কারণ হচ্ছে—নারীর কর্ম। যা একপর্যায়ে বিচ্ছেদের সৃষ্টি করে। কোনো পরিবারে যদি এমন আশঙ্কা থাকে, তা হলে তাদের সতর্ক হওয়া উচিত। যার যে বিষয়ের ধারণক্ষমতা নেই, তার সে বিষয়ে হাত দেওয়া মোটেই বিচক্ষণতার কথা নয়—নিরেট নির্বুদ্ধিতা।

📘 ফিরে এসো নীড়ে 📄 জন্মনিয়ন্ত্রণ

📄 জন্মনিয়ন্ত্রণ


আরব বিশ্বে অসংখ্য প্রচারমাধ্যম এবং অসংখ্য প্রোপাগান্ডা উক্তি মানুষকে অনেক আগে থেকেই। বিশেষত জায়নবাদের প্রচারস্রোত চলছে জোরেশোরে। বড় চিত্তাকর্ষক ভঙ্গিমায়, বাগাড়ম্বর ভাষায় চলছে অনবরত বক্তৃতা ও বিবৃতির ফুলঝুরি। দেখানো হচ্ছে স্বামী-স্ত্রী ও একটি সন্তান দ্বারা গঠিত ছোট ছোট পরিবারের নিখুঁত সুন্দর চিত্র। স্লোগান দেওয়া হচ্ছে, সন্তান একটি হলে দুটি নয়, দুটি হলে আর নয়। বোঝানো হচ্ছে, এরকম ছোট ছিমছাম পরিবারে জীবন কত সহজ হয়, সুখের হয়। দাম্পত্যজীবন কত মধুময় লাগে, সুসময় লাগে। পক্ষান্তরে যদি সন্তান বেশি হয়, যদি পরিবারের সদস্যসংখ্যা বেড়ে যায়, তা হলে জীবনে সেই স্বাচ্ছন্দ্য, সেই সুসময়তা ও মধুময়তা থাকে না। আর জন্মনিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বনকারী নারীদের স্তুতি তো মাথা হেঁট করার মতো। কিন্তু যত প্রোপাগান্ডাই হোক, চাইলেই তো প্রকৃতিকে উল্টে দেওয়া যায় না। মা ও শিশুর ভালোবাসা যে প্রকৃতিজাত বিষয়।

মূলত পশ্চিমাদের অন্ধ অনুকরণেই এইসব প্রোপাগান্ডার প্রসারণ ঘটানো হচ্ছে। জন্মনিয়ন্ত্রণকে পক্ষ বলা হয়, এভাবে যদি উদ্দাম গতিতে জনসংখ্যা বাড়তে থাকে, তা হলে অচিরেই এমন দিন আসবে, যেদিন ভূগর্ভস্থ উপায়ই মানুষের প্রয়োজন পূরণে ব্যর্থ হবে। অথচ তারা ভুলে যান যে, আল্লাহই এই পৃথিবীর স্রষ্টা। যিনি যতদিন পৃথিবীকে টিকিয়ে রাখবেন, ততদিন পৃথিবীর যাবতীয় প্রয়োজন পূরণ করবেন। রিজিক একমাত্র আল্লাহ্র হাতে। আল্লাহ্র ইচ্ছা ও নিয়ন্ত্রণে হস্তক্ষেপ করার অধিকার ও ক্ষমতা কারো নেই। তিনি এই ভূপৃষ্ঠে বিদ্যমান প্রতিটি জীবের রিজিকের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। মহান আল্লাহ্ই ইরশাদ করেছেন,

فِي السَّمَاءِ رِزْقُكُمْ وَمَا تُوعَدُونَ فَوَرَبِّ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ إِنَّهُ لَحَقٌّ مِّثْلَ مَا أَنَّكُمْ تَنطِقُونَ

অর্থ : আকাশে রয়েছে তোমাদের রিযিক, তোমাদের সাথে কৃত যাবতীয় প্রতিশ্রুতি। সুতরাং আসমান ও জমিনের রবের কসম, এই কুরআন বাস্তব সত্য —ঠিক যেমন তোমরা এখন কথা বলছ। —সূরা যারিয়াত, আয়াত : ২২-২৩

তিনি আরও ইরশাদ করেছেন,

وَمَا مِن دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللَّهِ رِزْقُهَا وَيَعْلَمُ مُسْتَقَرَّهَا وَمُسْتَوْدَعَهَا كُلٌّ فِي كِتَابٍ مُّبِينٍ

অর্থ : পৃথিবীতে এমন কোনো প্রাণী নেই যার জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহর ওপর নেই। তিনি (যেমন) তার আবাস সম্পর্কে অবগত, (তেমনি মৃত্যুর পর) তাকে যেখানে সোপর্দ করা হবে তাও তিনি জানেন। সবই লিপিবদ্ধ সুস্পষ্ট কিতাবে। —সূরা হুদ, আয়াত : ৬

কোনো মুসলিম রাষ্ট্রে সরকারের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ঢালাও জন্মনিয়ন্ত্রণের নির্দেশ জারি করা বা এর পক্ষে জনমত গঠনের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা ইসলাম ও মুসলমানদের পক্ষে মোটেই সুখবর হবে না। বরং রাষ্ট্রের উচিত হবে, এমন যৌক্তিক নীতিমালা ও বলিষ্ঠ পদক্ষেপ গ্রহণ করা যাতে জনসংখ্যা জনসমস্যা নয়, বরং জনশক্তিতে পরিণত হয়। দেশের এক একটি সন্তান যেন অন্তত এক একটি অঙ্গনের এক একটি শূন্যতা দূর করতে পারে। আমরা মনে করি, জন্মনিয়ন্ত্রণের পক্ষে ঢাকঢোল পিটিয়ে দেশ ও জাতির শক্তি খর্ব করার চাইতে এইদিকে মনোযোগী হওয়াই বেশি ভালো হবে।

জন্মনিয়ন্ত্রণের পক্ষে অনেকে যুক্তি দেন, বেশি সন্তান হলে মা বাবার ওপর চাপ হয়ে যায়। তাদের সঠিক লালনপালন না হলে সামাজিকভাবে ধস নামে। সামাজিক অবক্ষয়, অধঃপতনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যে নারীর মৌলিক দায়িত্ব হলো ঘরে বসে সন্তান লালনপালন করা, সে নারীকে যদি নানা প্রোপাগান্ডায় টেনে হেঁচড়ে রাস্তায় নামানো হয় এবং বন্দিদশা থেকে মুক্তি দেওয়ার নামে পুরুষের সাথে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করানোর ছোল পেঁচানো হয়, তা হলে একটি বা দুটি সন্তানকেও যথাযথ প্রতিপালন সম্ভব নয় যা সামাজিক ভারসাম্য ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পক্ষে ইতিবাচক। বরং একধরনের মা-বাবার জন্য দুটি কেন, একটি সন্তানও মানুষ করতে পারা কঠিন —তাই পলেফিক্সমির মতো কোনো শিশুপ্রতিপালন সংস্থায়ও সহায়তা নিতে হতে পারে।

তবে ইসলামের সরল সঠিক পথ সব সময়ই মধ্যমতা অবলম্বন করে। একদম বাড়াবাড়ি বা একেবারে ছাড়াছাড়ির মতো দুই প্রান্তিকতাকে ইসলাম কখনোই প্রশ্রয় দেয় না। সুতরাং মা যেন প্রতিটি শিশুকে যথাযথ আদর সোহাগ ও অধিকার দিতে পারে, সার্বিকভাবে প্রত্যেকের লালনপালন করতে পারে, সেজন্য ইসলাম স্বামী-স্ত্রীকে এই দুই গণ্ডিরঘরের মাঝে যৌক্তিক ব্যবধান রাখার সুযোগ দিয়েছে। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন,

وَوَصَّيْنَا الْإِنسَانَ بِوَالِدَيْهِ حَمَلَتْهُ أُمُّهُ وَهْنًا عَلَى وَهْنٍ وَفِصَالُهُ فِي عَامَيْنِ أَنِ اشْكُرْ لِي وَلِوَالِدَيْكَ إِلَيَّ الْمَصِيرُ

অর্থ : আমি মানুষকে উপদেশ দিয়েছি পিতা-মাতার প্রতি সদাচারের। কেননা, তার মা তাকে গর্ভে কষ্ট সহ্য করে গর্ভে ধারণ করেছেন। তার দুধ ছাড়ানোর সময়কাল ছিল দুই বছর। আমি মানুষকে উপদেশ দিয়েছি এই মর্মে যে, তুমি আমার প্রতি এবং তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। মনে রেখো, আমার কাছেই তোমাকে ফিরে আসতে হবে। —সূরা লুকমান : ১৪

অনুরূপভাবে যদি এমন হয় যে, মা পরপর প্রত্যেক সন্তানের প্রয়োজন পূরণ সক্ষম নন, যাতে তাদের দেখাশোনা ও লালনপালনে ঘাটতি দেখা দেয়, যা তাদের জীবনকে সুখময় শান্তিময় করতে ব্যর্থ হয়, তা হলে তো একথা সুস্পষ্ট যে, আল্লাহ্ কাউকেই তার সামর্থ্যের বাইরে কিছু চাপিয়ে দেন না। তা ছাড়া, দায়িত্বপূর্ণ দেখাশোনা ও অর্থপূর্ণ লালনপালনই ইসলামে কাম্য। নিছক সন্তানের আধিক্য কখনোই ইসলামে কাম্য নয়। আবার এই কথাটাকে আইনের ফাঁকফোকর হিসেবে গ্রহণ করাও কোনো মুসলমানের সাজে না। কেননা, আল্লাহ্ সর্বজ্ঞাত। তিনি গুপ্ত ও ব্যক্ত সবেরই অবগত। কোনো কিছুই তার কাছে গোপন থাকে না।

অনুরূপভাবে যদি এমন হয় যে, সন্তান নিতে গেলে নারীর জীবনের ঝুঁকি দেখা দেয়, তা হলেও তার জন্য সন্তানগ্রহণ থেকে বিরত থাকার বৈধতা ইসলামে আছে। কেননা, শরী'আতের মানশা হলো মায়ের জীবন রক্ষা করা। মা-ই তো আসল। মা বেঁচে থাকলেই না সন্তান জন্ম নেবে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px