📄 উত্তরাধিকার
ইসলামের উত্তরাধিকার বণ্টননীতিতে দুজন কন্যাসন্তানের সমপরিমাণ অংশ পাবে একজন পুরুষসন্তান। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন,
يُوصِيكُمُ اللَّهُ فِي أَوْلَادِكُمْ ۖ لِلذَّكَرِ مِثْلُ حَظِّ الْأُنثَيَيْنِ ۚ فَإِن كُنَّ نِسَاءً فَوْقَ اثْنَتَيْنِ فَلَهُنَّ ثُلُثَا مَا تَرَكَ ...
অর্থ : আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের সন্তানদের ব্যাপারে নির্দেশ দিয়েছেন একজন পুরুষসন্তান দুজন নারীসন্তানের সমান অংশ পাবে। তবে যদি নারী দুয়ের অধিক হয়, তবে তাদের প্রাপ্য অংশ হলো দুই তৃতীয়াংশ...—সূরা নিসা : ১১
এই বণ্টননীতি অনুসারে পুরুষসন্তান তার প্রাপ্য অংশটুকু পাবে এবং তার ওপর তার পরিবারে, মায়ের এবং বোনের ভরণপোষণ ওয়াজিব হবে। পক্ষান্তরে মেয়েটি তার প্রাপ্য অংশটুকু পাবে। কিন্তু তার ওপর কারও ভরণপোষণ ওয়াজিব হবে না। এমনকি, তার নিজের ভরণপোষণও তার নিজের দায়িত্ব নয়; বরং তার পিতা, ভাই, স্বামী এবং ক্রমানুরূপক্রমে অন্যান্য মাহরাম পুরুষদের দায়িত্ব। তারা এ দায়িত্ব অবহেলা করলে ইসলামের বিধি অনুসারে দণ্ডযোগ্য হবে। নারী তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করতে পারবে। প্রশাসন তাদের তার ভরণপোষণ দিতে বাধ্য করবে।
তাহলে প্রাপ্য সম্পদ নারী কী করবে? হ্যাঁ, এই সম্পদ সে নিজের জন্য সংরক্ষণ করবে। শরীয়তের বিধান মোতাবেক ইচ্ছেমতো খরচ করবে। দান সদকা করবে। হাদিয়া তোহফা দেবে। এই সম্পদে কারও কোনো কর্তৃত্ব ও অধিকার থাকবে না। এখন স্বয়ং বিচার করুন, আদৌ কি ইসলাম নারীর প্রতি অবিচার করল?
এখন আপনি যদি কাফের-বেঈমানের সাথে সুর মিলিয়ে পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের থেকে ইসলামকে তুলে দেন, এবং সে কারণে আপনার ওপর আপনার এবং অন্যদের ভরণপোষণের দায়িত্ব এসে পড়ে, এবং আপনার দায়িত্বশীল পুরুষরাও সেই সুযোগে আপনার দায় মাথা থেকে নামিয়ে ফেলে এবং আপনার থেকে যা নেবার, নেয়; এবং যা দেবার, না দেয়; এবং তাদেরকে বাধ্য করার জন্য দেশে ইসলামী আইনের কার্যকারিতা না থাকে, তা হলে এটা কার দোষ? ইসলামের না আপনার?
এভাবে ইসলামী শাসনব্যবস্থা ও আদর্শিক চেতনায় অন্যান্য আদর্শকে গুলিয়ে ফেলে অথবা ইসলামকে পুরোপুরি তুলে দিয়ে যে জঘন্য সমাজ গড়ে উঠবে, তাতে প্রত্যেকে নিজের স্বার্থ ও প্রবৃত্তির কথা ভাববে সেটাই স্বাভাবিক। ক্ষতি প্রত্যেকেরই হলেও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে নারী। সুতরাং নারীজাতির নিরাপত্তা নির্ভেজাল ইসলামেই নিহিত। এই অনুভূতি যত দিন না আসবে, নারীজাতির অবনতি ও লাঞ্ছনা ততদিন বাড়তেই থাকবে। নাট্যমঞ্চে দাঁড়িয়ে যত চিন্তা-চরিত্রই করুন, আন্দোলন আর সংগঠনের যত স্তূপই জমা করুন, ফল কী হচ্ছে, বাস্তবতা তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। মূল থেকে সরে গিয়ে অমূল জায়গায় যততাই হাতড়ান, পাবেন না। সূত্র ভুল করলে পৃষ্ঠা পৃষ্ঠা ফুরিয়ে ফেলুন, অঙ্ক মিলবে না।
📄 বাল্যবিবাহ
বর্তমানে বাল্যবিবাহের বয়স নিয়েও ধুম্রজালের সৃষ্টি করা হচ্ছে। বিভিন্ন সংশয় ও আপত্তি উত্থাপন করা হচ্ছে। অনেক সামাজিক ও ব্যক্তিগত সমস্যাকে পুঁজি করে ছেলেমেয়েদের বিবাহের বয়সে পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু আমরা মনে করি, এই দাবিটি অনর্থক। এবং এর ফলাফল ও সামাজিক বিচারে ভালো নয়।
বাল্যবিবাহই দাম্পত্যজীবনের ব্যর্থতার কারণ নয়। যেমনটি অনেকে দাবি করেন। আমাদের আগের যুগের মানুষেরা অতি অল্প বয়সেই বিবাহ করেছেন। আগের যুগের বলতে একশো বছর আগের কথা বলছি না, ত্রিশ চল্লিশ বছর আগের কথাই বলছি। তাদের প্রত্যেকেরই দাম্পত্যজীবন যে ব্যর্থ হয়েছে, তা তো নয়। আর যাদের ব্যর্থ হয়েছে, তা যে শুধু বাল্যবিবাহের কারণেই হয়েছে, তাও তো নয়। বরং তাদের অধিকাংশের দাম্পত্যজীবনই ছিল সফল, এবং তাদের ছেলেমেয়েরাই আজকের বুদ্ধিদীপ্ত, প্রকৌশলী, শিক্ষাবিদ, বীর সৈনিক ইত্যাদি। প্রত্যেকেই বাল্যকাল থেকে ঘরসংসার করা নারী জননীরই সন্তান। তা হলে সমস্যাটা কোথায়?
সমস্যা মূলত আমাদের মাথায়। আমরা বিবাহ, তালাক, সন্তানলালন ইত্যাদি সামাজিক রীতিনীতিকে ধর্মীয় বিধি-বিধানের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অনুধাবন করতে ব্যর্থ হচ্ছি। ইসলামী শরীয়াত বিবাহের জন্য কোনো নির্দিষ্ট বয়স বেঁধে দেয়নি। বরং প্রাজ্ঞ বিবেক-বুদ্ধি ও সুস্থ রুচি-প্রকৃতির ওপর ছেড়ে দিয়েছে। যেন ছেলেমেয়ে উভয়ের পক্ষেই বিবাহের কল্যাণ ও ইতিবাচকতা সার্থকতা লাভ করে।
আজকে নানা প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে মানুষের মগজ ধোলাই করা হচ্ছে। ঘোষকরা বলে বেড়াচ্ছে, তাড়াতাড়ি বিয়ে দেওয়ার কারণে শিশু-অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। তাদের দৃষ্টিতে শিশুদের পরিধি আঠারো বছর পর্যন্ত বিস্তৃত। ছেলেমেয়েরা যখন এর আগে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়, তখন তারা শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়; মা বাবার ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয়; ফলে তাদের শারীরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পূর্ণতা আসে না, অল্প বয়সেই তাদের ওপর নানাবিধ দায়িত্ব চেপে যায়; পরিবার-পরিচালনা, সন্তান-লালনপালন, স্বামী-স্ত্রীর দায়িত্ব-কর্তব্য ইত্যাদি দায় তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। আশ্চর্যের বিষয়, অনেকের মানসিক যুক্তিগত্যা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সতেরো বছর এগারো মাস উনত্রিশতম দিনে সন্তানকে শিশু হিসেবে মূল্যায়ন করে এবং তার সাথে শিশুসুলভ আচরণ করে; কিন্তু পরের দিন থেকেই সে আর শিশু নয়— এখন তার সাথে আচরণ হবে ভিন্ন আঙ্গিকে।
কিন্তু এসব অযৌক্তিক ও ভিত্তিহীন কিছু গল্প গুজব ছাড়া কিছু নয়। শরীয়তেও এসব কথার গ্রহণযোগ্যতা নেই। আল্লাহই আমাদের স্রষ্টা। তিনিই আমাদের সামর্থ্য ও ধারণক্ষমতা সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো জানেন। তিনিই যখন প্রাপ্তবয়স্কতাকে শরীয়তের বিধিনিষেধের আরোপযোগ্যতা বলে নির্ধারণ করে দিয়েছেন, তখন এটা অনস্বীকার্য যে, প্রাপ্তবয়স্কতার পর মানুষ শরীয়তের বিধিনিষেধ বুঝতে সক্ষম হয়, আল্লাহর সম্বোধন ধারণ ও অনুধাবনে যোগ্য হয়। বিবাহসম্পর্কিত বিষয়াদি এবং দায়িত্বকর্তব্যও এর বাইরে নয়। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর মানুষ পরিবার-পরিচালনা, সন্তান-লালনপালন ইত্যাদি কাজের সক্ষমতা অর্জন করে ফেলে। এগুলো মূলত নির্ভর করে পরিবেশ ও পরিস্থিতির ওপর। মা বাবা যদি সচেতন হন, তা হলে ছেলেমেয়েদের যথাসম্ভব দায়িত্বসচেতন করে গড়ে তোলা সহজ। এভাবে শিশুরা আত্মবিশ্বাসী ও আত্মনির্ভরশীল হয়ে বেড়ে ওঠার যথার্থ সুযোগ পায়।
ইসলামের ইতিহাস এর জ্বলন্ত প্রমাণ। আমরা দেখি, ষোলো-সতেরো বছর বয়সের যুবকরা বিশাল বিশাল সেনাবাহিনী পরিচালনা করেছেন। উসামা বিন যায়েদ রাযি. মাত্র ষোলো বছর বয়সে সেনাপ্রধান হয়েছিলেন। এই যুগে অনেক বড় বড় সাহাবী তাঁর নেতৃত্বে যুদ্ধ করেছিলেন। মুহাম্মাদ বিন কাসিম মাত্র সতেরো বছর বয়সে সিন্ধু বিজয় করেছিলেন। এ বিষয়গুলো আর যাই হোক, এটা অবশ্যই প্রকাশ করছে যে, মানুষ যে পরিবেশেই বড় হয় সে অনুযায়ী নিজের ওপর নির্ভর করতে শেখে। নিজের বিষয়াদি পরিচালনা করতে শেখে।
দুঃখ এখানেই যে, আমরা শত্রুদের প্রতিনিয়ত আমাদের মাঝে চারিত্রিক রোগব্যাধি ছড়াতে দিচ্ছি, আর আমরা পরানন্দে সেগুলো হাতে-পায়ে, মাথা-মগজে মেখে নিচ্ছি; চোখে-মুখে, নাকে-বুকে চুবিয়ে নিচ্ছি। আমাদের ছেলেমেয়েরা প্রাপ্তবয়স্ক হলেও বিবাহের উপযুক্ত হচ্ছে না; কিন্তু পাশ্চাত্য ধাঁচে রাতারাতি মিষ্টি প্রেমলীলা, বেহায়াপনা-বেলেল্লাপনা, ছিনতাই-ধর্ষণ ও নেশাগ্রহণে পশ্চিমাদের সাথেও পাল্লা দিতে প্রস্তুত। বলি, সবকিছুর সাথে সাথে আমাদের চিন্তাশক্তিও যদি এমন বিকলাঙ্গ হয়ে যায়, তা হলে কী করে এ জাতি রেহাই পাবে?
রয়েছে শিক্ষার বিষয়। এটাও যুক্তিসঙ্গত নয়। আল্লাহ্ প্রত্যেকটি মানুষকে নির্দিষ্ট পরিমাণ মেধা ও যোগ্যতা দান করেছেন। অনেক মেয়ে লেখাপড়ায় তেমন আগ্রহী হয় না; কিন্তু বিভিন্ন শিল্পকর্মে আগ্রহী হয়। ছেলেদের ক্ষেত্রেও একই কথা। অনেক ছেলেই স্বাধীনভাবে কাজ করতে ভালোবাসে। তাই সে পড়াশোনা ছেড়ে দেয়। ব্যবসায়-বাণিজ্য এবং এ জাতীয় বিভিন্ন কর্মে নিয়োজিত হয় এবং অর্থ উপার্জন করতে চায়। একসময় আত্মিক প্রশান্তির জন্য বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে চায়। কিন্তু যখন আমাদের চিন্তাভাবনিক ব্যাধির কারণে সে কোনো রকম সমর্থন পায় না, তখন হতাশ হয়ে পড়ে। অর্থের অপচয়, সময়ের অপচয় এবং শরীয়তের লঙ্ঘন হওয়ার ক্ষেত্র তৈরি হয়। জীবন হয়ে পড়ে লক্ষ্যহীন, অর্থহীন, ছন্নছাড়া। সুতরাং ব্যাপকভাবে বিবাহবিলম্বের ডাক দেওয়া কতটুকু ইতিবাচক ফল দেবে? বরং আমরা মনে করি, এর নেতিবাচকতা ও মন্দ পরিণতির দিকটাই ভারি বেশি। প্রসঙ্গত সেরকম কয়েকটি মোটা মোটা বিষয়ে ইঙ্গিত করছি:
১. এর পরিণতিতে তরুণ-তরুণীর বিচ্যুতির পথই লাঘব হয়। সমাজে অনাচার ছড়িয়ে পড়ে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে চারিত্রিক মূল্যবোধের ওপর।
২. ধীরে ধীরে বিবাহ বিষয়টি অনেকের কাছেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। বিবাহ করে ঝামেলায় জড়াতে চায় না। স্বাভাবিক পারিবারিক জীবন থেকে দূরে সরে যায়। সম্পূর্ণ আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। সমাজে কোনো কার্যকর অবদান রাখার মানসিকতা থাকে না।
৩. বিলম্বে বিবাহ মেয়েদের প্রজননক্ষমতা হ্রাস করে। বিবাহ যতটা বিলম্বিত হয়, গর্ভাশয়ে ততটাই দুর্বলতা সৃষ্টি হয়। তখন আর সুস্থ, সুঠাম সন্তান প্রসব করে না।
বিষয়টির নেতিবাচকতা অনুধাবনে জন্য আমেরিকান পত্রিকা টাইমসের একটি সংবাদই যথেষ্ট। ওই সংবাদের সারকথা এই যে, এ পর্যন্ত দুই মিলিয়ন জারজ শিশু জন্ম নিয়েছে। তাদের জন্মদাত্রীরা প্রত্যেকেই টিনএজ—তেরো থেকে উনিশ বছরের অবিবাহিত ‘শিশুকন্যা’। যারা আমাদের সমাজে এসে পশ্চিমা সভ্যতার দালালি করছেন, তারা এই খবরটা কি জানেন? এর পরও কি ছোটোবড় সর্ব বিষয়ে পশ্চিমাদের অনুসরণ করতে হবে? মহান আল্লাহর এই ধমক কি তাদের জন্যই নয়,
أَفَحُكْمَ الْجَاهِلِيَّةِ يَبْغُونَ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ حُكْمًا لِقَوْمٍ يُوقِنُونَ
অর্থ : তারা কি সেই বর্বর নিয়মীতিতেই চাইছে? অথচ ইয়াকীনকারী সম্প্রদায়ের জন্য আল্লাহর চাইতো সুন্দর বিধানদাতা আর কে আছে? —সূরা মাইদাহ : ৫০
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই ভবিষ্যদ্বাণীর প্রতিফলন কি তাদের ওপরই হচ্ছে না,
لَتَتَّبِعُنَّ سَنَنَ مَنْ কَانَ قَبْلَكُمْ شِبْرًا بِشِبْرٍ وَذِرَاعًا بِذِرَاعٍ حَتَّى لَوْ دَخَلُوا جُحْرَ ضَبٍّ لَاتَّبَعْتُمُوهُمْ قُلْنَا يَا رَسُولَ اللهِ : الْيَهُودُ وَالنَّصَارَى ؟ قَالَ : فَمَنْ غَيْرُهُمْ؟
অর্থ : অচিরেই তোমরা তোমাদের আগের লোকদের অনুসরণ করা শুরু করবে—একদম বিঘতে বিঘতে, গজে গজে; এমনকি, তারা যদি 'গুঁইসাপের গর্তে ঢোকে', তবে তোমরা তাতেও তাদের অনুসরণ করবে। আমরা বললাম, হে আল্লাহ রাসুল, আপনি কি ইহুদি নাসারাদের কথা বলছেন? তিনি বললেন, তো আর কাদের কথা?’১
আমরা স্পষ্ট ভাষায় বলছি, দ্রুত বিবাহে অনধিকার চর্চা করবেন না। আল্লাহ যে বিধান দিয়েছেন, তাতেই সমাজের শান্তি ও নিরাপত্তা নিহিত। তাতেই শিশুর অধিকারের প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত। আমরা স্পষ্ট ভাষায় বলছি, যে সভ্যতা ব্যক্তিস্বাধীনতার নামে ব্যভিচারের বৈধতার সনদ দেয়, সেই সভ্যতা আমরা মানি না, মানব না। যেই সভ্যতা স্বভাবধর্মের দাবি ও চাহিদার সাথে এবং সরলপ্রাণ মুসলমানের রুচি ও প্রকৃতির সাথে স্পষ্টত সংঘর্ষরত, সেই সভ্যতা আমরা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করি।
পশ্চিমা সভ্যতায় যে ধ্বংস নেমেছে, আমরা তার স্বরূপ দেখেছি। আমরা আমাদের নিষ্কলুষ পবিত্র সমাজে নগ্নতার নোংরামিগুলো তুলে আনতে চাই না। আমরা জানি, তারা বিনিয়ে-বিনিয়ে যত কথাই বলুক, জীবনের বাস্তব সমাধান তাদের কাছে নেই। তারাই সমস্যার জন্ম দেয়। তারপর সেই সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে আরও জটিলতার সৃষ্টি করে। আমরা তাদের অনুকরণপ্রিয় তোতাপাঁখি কেন হব? আমরা তো জানি যে, আল্লাহ্ই জানেন, মানুষ জানে না। আমরা তো জানি যে, আল্লাহ্ই জ্ঞান সর্বব্যাপী, মানুষের জ্ঞান সীমিত।
পশ্চিমাদেশের দালালেরা জেনে রাখুক, প্রতিটি সমাজের আছে স্বকীয় বৈশিষ্ট্য। প্রতিটি সমাজ আলাদা আচার, আলাদা অভ্যাস, আলাদা চরিত্র, আলাদা মূল্যবোধে বিশ্বাসী। তারা কী এমন পেল যে, নিজ দেশের নিজ জাতির আলাদা বৈশিষ্ট্যকে এভাবে জলাঞ্জলি দিতে হবে? তারা যেন আর নিজ দেশ ও জাতির বিরুদ্ধে অন্য জাতি ও সভ্যতার দালালি ও গোলামি না করে। তারা যেন আর অন্তত কোনো মুসলিম সমাজে বিলম্বে বিবাহের দাবি না তোলে।
অজস্র শিশু-সমস্যার সমাধান উপায় কী হবে, সে নিয়ে শত শত সভা সেমিনার করার চাইতে আমাদের ছেলেমেয়েরা অল্প বয়সে বিবাহ করবে; বৈধ দাম্পত্যজীবনের আওতা, পরিবার-প্রতিষ্ঠানের নিরাপদ ছায়ায় কিছু বৈধ সন্তান জন্ম দেবে এবং এবং মায়া-মমতা-ভালোবাসা ও পারিবারিক বন্ধনে ওপর বেড়ে ওঠাই আমাদের কাছে অনেক ভালো।
টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী ও মুসলিম।
📄 আত্মীয় বিবাহ
বর্তমানে আমাদের সমাজে নিকটাত্মীয়দের মধ্যে বিবাহ-শাদির বিষয়ে রব উঠেছে। দাবি করা হচ্ছে, নিকটাত্মীয়দের মধ্যে বিবাহ-শাদির দ্বারা সুস্থ ও মেধাবী সন্তান জন্ম দেওয়ার সুযোগ কমে যায়।১ প্রকৃত প্রস্তাবে, এ বিষয়ে পূর্ব থেকেই মানুষ দুই ভাগে বিভক্ত। কেউ এ ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করেন, কেউ কেউ করেন অনুৎসাহিত। যারা উদ্বুদ্ধ করেন, তাদের কিছু যুক্তি হলো,
১. আত্মীয়দের মধ্যে বিবাহ-শাদি নিজেদের মধ্যকার সম্পর্ককে আরও দৃঢ় ও সংহত করে।
২. আত্মীয় ছেলে-মেয়ে পারস্পরিক দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা এবং সাংসারিক অস্বচ্ছলতা ও অপ্রশস্ততায় তুলনামূলকভাবে বেশি ধৈর্যশীল ও সহনশীল হতে পারে।
৩. নিজেদের স্থাবর, অস্থাবর অর্থসম্পদের হেফাজত হয়। অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে অন্যদের হাতে চলে যায় না।
৪. আত্মীয়দের মধ্যে বিবাহ-শাদি বংশীয় সংহতি নিশ্চিত করে। পরিবারের ছেলেমেয়েদের বিবাহ-শাদি বিষয়টি সহজ হয়। ছেলেমেয়ের আইবুড়ো থাকার পথ অনেকটা রুদ্ধ হয়।
পক্ষান্তরে, যারা নিজেদের মধ্যে বিবাহ-শাদির বিষয়ে অনুৎসাহিত করেন, তাদের চিন্তাধারা হলো আত্মীয়দের বাইরে বিবাহ-শাদিই ভালো। কেননা—
১. এতে বিভিন্ন পরিবারের মধ্যে পরিচয় ও সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
২. বিবাহের পাত্র-পাত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রেও বিষয়টি ইতিবাচক। কেননা, অনেক জায়গা দেখে মনমতো ভালো ছেলেমেয়ে নির্বাচন করা সম্ভব হয়।
৩. গোত্রীয় সংকীর্ণতা ও গোঁড়ামি থাকে না।
৪. বংশে নতুন ধারার সংযোজন হয়।
৫. নতুন প্রজন্ম হয় মেধাবী, শক্তিশালী, সুস্থ, সুঠাম।
ধর্মীয় জ্ঞানে আমরা যা পাই, তাতে আত্মীয় বিবাহ নিষিদ্ধও নয়, আবশ্যিকও নয়। সুতরাং ঢালাওভাবে আত্মীয় বিবাহের উৎসাহ কিংবা অনুৎসাহ কোনোটাই ভারসাম্যপূর্ণ নয়। তবে অভিজ্ঞতার আলোকে প্রমাণিত হয়েছে যে, আত্মীয়দের মধ্যে বিবাহ-পুনর্বিবাহ বংশধারাকে দুর্বল করে দেয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত আছে,
لَا تَنكِحُوا الْقَرَابَةَ الْقَرِيبَةَ فَإِنَّ الْوَلَدَ يُخْلَقُ ضَاوِيًا
অর্থ : তোমরা নিকটাত্মীয়দের মধ্যে বিবাহশাদি দিও না। এভাবে সন্তান দুর্বল হয়।২
হযরত উমর রাযি. থেকেও বর্ণিত আছে যে, তিনি বনু সায়েব বংশের ছেলেমেয়েদের দুর্বলতা দেখে বললেন,
مَا لِي أَرَى ابْنَ السَّائِبِ قَدْ ضَوِيَ؟ غَرِّبُوا النِّكَاحَ لَا تُضْوُوا
অর্থ : কী ব্যাপার, বনু সায়েবের লোকেরা, তোমরা দেখি দুর্বল হয়ে পড়ছ? তোমরা নিজ বংশের বাইরেও বিবাহশাদি করো, তা হলে দুর্বল হবে না।
ইবনে হাজার আসকালানী রাহ. লিখেছেন,
الْعَشِيرَةُ أَنَّ الْوَلَدَ بَيْنَ الْقَرِيبَيْنِ يَكُونُ أَخْوَقَ
অর্থ : অভিজ্ঞতা বলে, আত্মীয় দম্পতির ছেলেমেয়ে সাধারণত নির্বোধ হয়।৩
মুসলমানদের এ দৃষ্টিভঙ্গি ধর্মীয় বিধান নয়। এটা সাধারণ অভিজ্ঞতার আলোকে সাধারণ উৎসাহ-অনুৎসাহের ব্যাপার। যদি চিকিৎসাবিজ্ঞান দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, কোনো আত্মীয়যুগলের মধ্যে বিবাহশাদির দ্বারা বংশধারায় কোনো দুর্বলতা আসবে না, তা হলে অনুৎসাহের বিষয়টি তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। তারা বিবাহশাদি করতে পারে। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরীক্ষানিরীক্ষা যদি জানান দেয় যে, তাদের বংশধারায় কোনো কুপ্রভাব পড়তে পারে, তা হলে তাদের নিজেদের মধ্যে বিবাহশাদি না করাই কাম্য।
টিকাঃ
১. এখানে আত্মীয়-নিকটাত্মীয় বলতেও হারাম হওয়া ছাড়া সাধারণ আত্মীয় ও বংশীয় ছেলেমেয়েদের কথা বলা হচ্ছে। কেননা মাহরাম ছেলেমেয়েরা বিবাহশাদি ইসলামে সুস্পষ্টভাবে হারাম করা হয়েছে।
২. ইবনে হিব্বান (সনদ : সহীহ)।
৩. ফাতহুল বারী শরহে বুখারী।
📄 তালাক
যদিও কখনো এমন হয় যে, দাম্পত্যজীবনের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা অসম্ভব, কোনো প্রকারেই সমাধান হচ্ছে না, সমঝোতার সকল প্রয়াস ব্যর্থ, এমতাবস্থায় আল্লাহ তাআলা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তালাক তথা মুক্তি ও বিচ্ছেদের বিধান দিয়েছেন। তবে কিছু কারণে নারীকে নয়, তালাক প্রদানের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে পুরুষকে। কারণগুলো এই :
১. পুরুষই বিবাহে প্রস্তাবকারী। সেই প্রার্থী। নারী প্রার্থিত। পুরুষকেই মোহর পরিশোধ করতে হয়। স্ত্রী-সন্তানের ভরণপোষণ করতে হয়। এই বিষয়গুলো পুরুষকে একটু ভাবাবে। ঝট করে তালাক প্রদান করা থেকে বিরত রাখবে। সে স্ত্রীর সাথে মনোমালিন্যের বিষয়ে যৌক্তিক ছাড় দিতে পারলে, হতে পারে শেষে তালাকের মতো গুরুতর পরিস্থিতি কেটে যাবে।
২. তালাক নিস্পাদনের একটি গুরুতর বিষয়। এতে অনেক ভাবনা চিন্তার প্রয়োজন আছে। আবেগ-অনুভূতির স্পর্শকাতরতা এবং প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া গ্রহণের প্রবণতায় নারীর চাইতে পুরুষের নিয়ন্ত্রণক্ষমতা বেশি। নারীর সহজাত প্রবৃত্তি তাকে একটুতেই রাগান্বিত ও নিরাশ করে। সে হালকা আঘাতেই ভেঙে পড়ে। মনোমালিন্যের বিষয়ে স্বামীকে ছাড় দিতে ততটা উদারতা দেখাতে পারে না, যতটা পুরুষ পারে। সুতরাং নারীকে তালাক প্রদানের ক্ষমতা দিলে তালাক বেড়ে যাবে।
বাস্তবতাই এর প্রমাণ। আজকাল অনৈসলামিক আইনের আওতায় নারীকে তালাক প্রদানের ক্ষমতা দেওয়ার ফলে তালাক অনেক বেড়ে গেছে। একের পর এক ঘর ভাঙছে। হাজার হাজার শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পরিবারের ছায়া না থাকার কারণে অপরাধ প্রবণতাও বেড়ে যাচ্ছে।
তবে পুরুষকে তালাক প্রদানের ক্ষমতা দেওয়ার অর্থ এই নয় যে, সে যাচ্ছেতাইভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করবে। কোনো রকম শর্ত ও যৌক্তিক কারণ ছাড়াই তালাক প্রদান করার নৈতিক অধিকার তাকে দেওয়া হয়নি। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন,
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ ۚ فَإِن كَرِهْتُمُوهُنَّ فَعَسَىٰ أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَيَجْعَلَ اللَّهُ فِيهِ خَيْرًا كَثِيرًا
অর্থ : তোমরা তাদের সাথে ন্যায় ও উত্তমভাবে বসবাস করো। যদি তাদের অপছন্দ হয়, তবে হতে পারে, তোমরা কিছু অপছন্দ করছ অথচ আল্লাহ তাতে তোমাদের জন্য রেখেছেন প্রভূত কল্যাণ। —সূরা নিসা : ১৯
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
أَبْغَضُ الْحَلَالِ إِلَى اللَّهِ الطَّلَاقُ
অর্থ : আল্লাহর নিকট সবচেয়ে অপছন্দনীয় বৈধ বিষয় হলো তালাক।১
লক্ষ করুন, মাসিকের সময় তালাক প্রদান করতেও ইসলাম নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ইসলামের বিধান অনুসারে তালাক প্রদান করতে হবে পবিত্র অবস্থায়। এ সময় স্ত্রীর প্রতি স্বামীর পূর্ণ আকর্ষণ থাকে। কিন্তু তালাক প্রদান করতে হলেও চাইতে হবে এমন সময়ে তালাক করতে হবে এবং দূরে থাকতে হবে। আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. মাসিকের সময় স্ত্রীকে তালাক দিয়েছিলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন :
‘সে যখন পবিত্র হবে, তখন যেন তালাক দেয়।'
ইসলাম পুরুষকে এই অধিকার দেয়নি যে, সে নারীকে যত খুশি তালাক দিতে থাকবে আর ইদ্দত মতো ঘোরাতে থাকবে। যেমনি জাহেলী যুগের বর্বর জাতিদের মাঝে ছিল। আবার এত বেশি সংকীর্ণতাও করেনি যে, আত্মসংশোধন ও প্রত্যাবর্তনের সুযোগই থাকবে না। ইসলাম বিপরীতমুখী দুই প্রান্তিকতাকে প্রত্যাখ্যান করে অবলম্বন করেছে মধ্যপন্থা। ইসলাম তালাকসংখ্যা নির্ধারণ করেছে তিনটি। যেন মধ্যবর্তী সময়গুলো দম্পতিদের আত্মসংশোধন ও পারস্পরিক সমঝোতার মধ্য দিয়ে নতুন করে পূর্ব দাম্পত্যজীবনে প্রত্যাবর্তনের সুযোগ থাকে। আবার নারীকে তামাশার পুতুল বানিয়ে অমূল্য মুক্তিকে আটকে রাখার পথও রুদ্ধ হয়।
একটি হলো তালাকে রজয়ী। ইদ্দত শেষ হওয়ার পর্যন্ত স্বামীর সুযোগ থাকে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়ার। কিন্তু ইদ্দত শেষ হয়ে যাওয়ার পর এটি তালাকে বাঈনে সুগরায় রূপ লাভ করে। এখানেও নতুন চুক্তি এবং নতুন মোহর দিয়ে স্ত্রীকে ফিরে পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু এরপর ওই তালাকটি হলে, সেটি তালাক বাঈনে কুবরা বা মুগাল্লাযা। এরপরে পর পর তিন তালাক হলে বিবাহের নিগূঢ় সম্পর্ক খুলে যায়। এরপর আর এই স্ত্রীকে ফিরে পাওয়ার কোনো অধিকার স্বামীর থাকে না। তবে যদি স্ত্রীর অন্য কোথাও বিয়ে হয়, নতুন স্বামীর সাথে ঘরসংসার-সহবাস হয়, তারপর দ্বিতীয় স্বামী তাকে তালাক দেয়, তা হলেই কেবল পূর্ববর্তী-তিন-তালাককারী-স্বামী-জনার জন্য নতুন করে বিবাহ করার সুযোগ সৃষ্টি হবে। পবিত্র কুরআনে এসেছে,
الطَّلَاقُ مَرَّتَانِ ۖ فَإِمْسَاكٌ بِمَعْرُوفٍ أَوْ تَسْرِيহゅう بِإِحْسَانٍ ۗ وَلَا يَحِلُّ لَكُمْ أَن تَأْخُذُوا مِمَّا آتَيْتُمُوهُنَّ شَيْئًا إِلَّا أَن يَخَافَا أَلَّا يُقِيمَا حُدُودَ اللَّهِ ۖ فَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا يُقِيمَا حُدُودَ اللَّهِ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا فِيمَا افْتَدَتْ بِهِ ۗ تِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ فَلَا تَعْتَدُوهَا ۚ وَمَن يَتَعَدَّ حُدُودَ اللَّهِ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ ﴿٢٢٩﴾ فَإِن طَلَّقَهَا فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا أَن يَتَرَاجَعَا إِن ظَنَّا أَن يُقِيمَا حُدُودَ اللَّهِ ۗ وَتِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ يُبَيِّنُهَا لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ
অর্থ : তালাক দুবার (মুখে উচ্চারণ করা যেতে পারে); এরপর হয় ন্যায়সঙ্গতভাবে তাকে ফিরিয়ে আনতে হবে, অথবা সহৃদয়তার সাথে তাকে চলে যেতে দিতে হবে। তোমাদের জন্য এটা বৈধ নয় যে, যা কিছু তোমরা নারীদের দিয়েছ তা তাদের থেকে ফিরিয়ে নেবে।
তবে স্বামী-স্ত্রী যদি আশঙ্কা করে যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা রক্ষা করতে পারবে না এবং তোমরাও আশঙ্কা কর যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা রক্ষা করতে পারবে না, তা হলে স্ত্রী স্বামীকে যে বিনিময় দিয়ে বিচ্ছেদ গ্রহণ করবে তাতে স্বামী-স্ত্রীর অপরাধ থাকবে না। এটা হচ্ছে আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা। একে অতিক্রম করো না। যারা আল্লাহর দেওয়া সীমারেখা অতিক্রম করে, তারা সুস্পষ্ট জালেম।
এরপর যদি সে তাকে (তৃতীয়) তালাক দেয়, তা হলে এই স্ত্রী যতক্ষণ অন্য কোনো স্বামী গ্রহণ না করবে ততক্ষণ সে আর (তিন তালাক প্রদানকারী) স্বামীর জন্য বৈধ হবে না। তবে যদি (দ্বিতীয়) স্বামী নিয়মমাফিক তাকে তালাক দেয় এবং তারা (অর্থাৎ স্ত্রী এবং আগের তিন তালাক প্রদানকারী স্বামী) মনে করে যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা রক্ষা করতে পারবে তা হলে তারা পুনর্বারও করতে অসুবিধা নেই। এটাই আল্লাহর দেওয়া সীমারেখা। তিনি তা স্পষ্টাকারে ব্যক্ত করেন জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য। —সূরা বাকারা : ২২৯-২৩০
নারীবাদীতার নামে যারা আন্দোলন করেছেন, তারা তালাক প্রসঙ্গে একটি প্রশ্ন উত্থাপন করেন। তা এই যে, তালাকের বিধান তো খুবই যুক্তিপ্রসূত। কিন্তু তালাক প্রদানের ক্ষমতা তো শুধু স্বামীরই থাকছে। এভাবে আর কতটুকু স্ত্রীর অধিকার রক্ষা হয়। স্ত্রীকে তালাক প্রদানের ক্ষমতা না দেওয়াটা তো অন্যায়। কেননা, এতে সে অনেক জটিলতার মুখে পড়ে। অনেক সময় স্ত্রী না স্ত্রীর মর্যাদা পায়, না অত্যাচারী স্বামীকে ছেড়ে যাওয়ার সুযোগ পায়। যেমন, স্বামী স্বেচ্ছাচারিতা করে, নির্যাতন ও সীমালংঘন করে; কিন্তু স্ত্রীকে ছাড়ে না। অনেক স্বামী নপুংশক। অনেক স্বামী ভরণপোষণ অক্ষম। অনেক স্বামী বিভিন্ন অজুহাতে বছরের পর বছর থাকে বাইরে। এমতাবস্থায় যদি স্ত্রীর জন্য মুক্তির কোনো পথ না থাকে, তা হলে ওকে ছুঁড়ে মারা ছাড়া তার তো কোনো উপায় থাকে না। সুতরাং স্বামীর সাথে সাথে স্ত্রীকেও তালাক প্রদানের ক্ষমতা দেওয়া উচিত। যাতে তার সাথে সত্যিকারের সাম্যটুকু করা হয়।
এক্ষেত্রে আমাদের বক্তব্য এই যে, তালাকের বিধান দেওয়া হলেও তালাক ইসলামে কাম্য নয়। এ জন্যই তালাককে বলা হয়েছে, ইসলামের নিকটতম বৈধ বিষয়। সুতরাং অনিবার্য প্রয়োজন ছাড়া তালাক যেন না হয়, অন্তত তালাকের সংখ্যা যেন কিছুটা হলেও লাগামবদ্ধ হয়, সেজন্যই নারীকে না দিয়ে তালাক প্রদানের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে পুরুষকে। যা আমরা পূর্বে আলোচনা করেছি। আবার স্বামী যেন তালাকপ্রদানের ক্ষমতাকে যথেচ্ছভাবে কাজে লাগাতে না পারে, সেই জন্য ইসলামে যে পদ্ধতি অবলম্বন করেছে, তাও তুলে ধরেছি। কিন্তু ইসলামী শরীআতের প্রত্যাশা হলো, পারস্পরিক ভালোবাসা, মতৈক্য ও আন্তরিকতার ওপর পরিবারের ভিত্তিস্থাপন। অন্যায়, অত্যাচার, সীমালংঘন ইসলাম বরদাশত করে না। সুতরাং নারীকে তালাক প্রদানের ক্ষমতা না দেওয়ার অর্থ এই নয় যে, সে উপযুক্ত বিষয়গুলোর মতো বিবিধ জটিলতার মুখেও নির্যাতিত, নিষ্পেষিত, দুঃখিত, মানবেতর জীবন কাটাবে। বরং সে যদি অত্যাচারিত হয়, অথবা তার কোনো অধিকার লঙ্ঘিত হয় যার কারণে স্বামীর সাথে ঘরসংসার করা তার পক্ষে দুষ্কর, তা হলে সে মামলা দায়ের করবে এবং প্রমাণ উপস্থাপন করবে। বিচারক সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে ইসলামী বিধান মোতাবেক রায় দেবেন। মহান আল্লাহ আলোচ্য আয়াতে বলেছেন,
أَنْ يُخَافَا أَلَّا يُقِيمَا حُدُودَ اللَّهِ ۖ فَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا يُقِيمَا حُدُودَ اللَّهِ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا فِيمَا افْتَدَتْ بِهِ ۗ تِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ فَلَا تَعْتَدُوهَا ۚ وَمَنْ يَتَعَدَّ حُدُودَ اللَّهِ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
অর্থ : তবে স্বামী স্ত্রী যদি আশঙ্কা করে যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা রক্ষা করতে পারবে না এবং তোমরাও আশঙ্কা কর যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা রক্ষা করতে পারবে না, তা হলে স্ত্রী স্বামীকে যে বিনিময় দিয়ে বিচ্ছেদ গ্রহণ করলে তাতে স্বামী স্ত্রীর অপরাধ থাকবে না। এটা হচ্ছে আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা। একে অতিক্রম করো না। যারা আল্লাহর দেওয়া সীমারেখা অতিক্রম করে, তারা সুস্পষ্ট জালিম। —সূরা বাকারা : ২২৯
ইমাম বুখারী রাহ. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। লক্ষ্য করুন, হাদীসটির বক্তব্য এই,
جَاءَتِ امْرَأَةُ ثَابِتِ بْنِ قَيْسٍ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَتْ : يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنِّي مَا أَعْتِبُ عَلَيْهِ فِي خُلُقٍ وَلَا دِينٍ وَلَكِنِّي أَكْرَهُ الْكُفْرَ فِي الْإِسْلَامِ فَقَالَ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَتَرُدِّينَ عَلَيْهِ حَدِيقَتَهُ؟ قَالَتْ : نَعَمْ , فَقَالَ : اقْبَلِ الْحَدِيقَةَ وَطَلِّقْهَا تَطْلِيقَةً
অর্থ : সাবেত বিন কায়েসের স্ত্রী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে (সাবেত সম্পর্কে) আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমি না তার স্বভাব-চরিত্রের বিষয়ে আপত্তি করছি, না তার ধার্মিকতার বিষয়ে। তবে আমি ইসলামের ছায়ায় থেকে কুফরি করতে চাই না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি কি তাকে (মোহর হিসেবে গৃহীত) বাগানটি ফেরত দিতে পারবে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (সাবেতকে) বললেন, বাগান গ্রহণ করো এবং তাকে একটি তালাক প্রদান করো।
এই হলো সম্পূর্ণরূপে এমন একজন স্ত্রীর উদাহরণ যিনি স্বামীর হক আদায় করতে পারবেন না মর্মে অপারগতা প্রকাশ করলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে মোহর ফেরত দেওয়ার অনুমতি দিলেন; বিনিময়ে তার স্বামী তাকে তালাক প্রদান করলেন। ইসলামী শরীআতে একে বলা হয় খুলআ। এটাই প্রমাণ করে যে, ইসলামে ব্যক্তিস্বাধীনতা অবশ্যই সম্মানের সাথে মূল্যায়িত। সুতরাং ইসলাম নারীর জন্য উপযুক্ত ক্ষেত্রে তালাকের দাবি করার অধিকার দেয়।
তবে মনে রাখতে হবে, খুলআর বিধান দেওয়ার অর্থ এই নয় যে, সাধারণ মনোমালিন্য বা ঠুনকো অজুহাতে কথায় কথায় স্ত্রী তালাকের দাবি করবে। ইসলামের দিক নির্দেশনা অনুযায়ী নারী সাধারণ ছোটখাটো বিষয়ে ধৈর্য ধরবে। যাতে পরিবারের ভিত্তি না নড়ে। তবে যখন আপনাআপনি ব্যক্তিপর্যায়ে এগুলোর সংশোধন ও সমাধান সম্ভব হবে না, তখন মুত্তাকী পরহেজগার দায়িত্বশীলদের শরণাপন্ন হবে। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন,
وَإِنِ امْرَأَةٌ خَافَتْ مِن بَعْلِهَا نُشُوزًا أَوْ إِعْرَاضًا فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا أَن يُصْلِحَا بَيْنَهُمَا صُلْحًا ۚ وَالصُّلْحُ خَيْرٌ ۗ وَأُحْضِرَتِ الْأَنفُسُ الشُّحَّ ۗ وَإِن تُحْسِنُوا وَتَتَّقُوا فَإِنَّ اللَّهَ কَانَ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًا
অর্থ : যদি কোনো নারী স্বামীর পক্ষ থেকে দুর্ব্যবহার বা অবজ্ঞার আশঙ্কা করে তা হলে তারা নিজেদের মাঝে মীমাংসা করে নিতে পারে। এতে সমস্যা নেই। মীমাংসা উত্তম। মূলত প্রতিটি মানুষকেই নিজের স্বার্থের প্রতি আগ্রহ দান করা হয়েছে। তবে তোমরা যদি সদাচার কর এবং আল্লাহকে ভয় কর, তা হলে তোমাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে আল্লাহ নিশ্চয়ই সম্যক অবগত আছেন। —সূরা নিসা : ১২৮
সুতরাং একতরফা তালাক সংঘটিত হওয়া ইসলামী শরীআতের প্রত্যাশার পরিপন্থী। কেননা, ইসলামী শরীআত চায় পরিবার গড়তে; পরিবার ভাঙা অনিবার্যতাবশত। অথচ আজকালকার তথাকথিত উন্নত বিচারব্যবস্থায় এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, শুনলে অবাক হতে হয়। প্রকাশ্যে ভরা মজলিসে স্বামী স্ত্রী একে অপরের দোষারোপ করতে থাকে। একে অপরের কুৎসা বলতে থাকে। রায় কী আসে, কীভাবে আসে সে কথা বাদই দিলাম। কিন্তু এমন অশালীন অশোভন আচরণের পর মনের মিল কী করে সম্ভব? অথচ পবিত্র কুরআনের নির্দেশ,
وَلَا تَنَابَزُوا بِالْأَلْقَابِ ۖ بِئْسَ الِاسْمُ الْفُسُوقُ بَعْدَ الْإِيمَانِ ۚ وَمَنْ لَمْ يَتُبْ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
অর্থ : তোমরা কখনো একে অপরের প্রতি দয়া ও সহৃদয়তা দেখাতে ভুলো না, কারণ তোমরা যে কী কর, আল্লাহ তার সবই পর্যবেক্ষণ করেন। —সূরা বাকারা : ২৩৭
তবে দেখুন, যেখানে ইসলামের দাবি হলো, বিচ্ছেদের পরও একে অপরের প্রতি দয়া ও সহৃদয়তার কথা স্মরণ রাখা এবং একে অপরের প্রতি কৃতজ্ঞতা থাকা; সেখানে কী হচ্ছে? আজকে বিচ্ছেদ যেন বিরহ থাকে না, চরম বিদ্বেষে রূপ নেয়। এমনকি, মামলায় একে অপরেরকে পরাস্ত করতে দাম্পত্যজীবনের অন্তরঙ্গতা ও গোপনীয়তাও খুলে খুলে তুলে ধরে। আমাদের সমাজের কী হলো? কোন প্রাণসংহারক ব্যাধিতে পেয়ে বসল? কোথায় চলেছি আমরা?
দুঃখের ঘন তারাচ্ছন্ন হয়ে ওঠে যখন শুনি, মুসলিম নারীরা বিচ্ছেদের পর স্বামীদের কাছে পাশ্চাত্য আইন অনুসারে এমন এমন দাবি করে ইসলামী শরীআতে যার কোনো ভিত্তি নেই। আমরা দেখি, অনেক মুসলিম নারী পশ্চিমা ভাবধারায় চলা অনৈসলামিক আদালতগুলোতে মামলা করে। উদ্দেশ্য থাকে স্বামীর স্থাবর অস্থাবর অর্থের অর্ধেক সম্পত্তি এবং বিচ্ছেদ ও ইদ্দতের পরও আমৃত্যু ভরণপোষণ।
মুসলিম ভাই বোনেরা জেনে রাখুন, খোদাভীতির উপর কোনো বিধান নেই। মানবপ্রবৃত্তি-গড়া আইন কখনোই সার্বিক বিচারে নির্ভুল হবে না। তাই মামলা-মোকদ্দমা নিয়ে নারীবাদীদের দ্বারস্থ হয়ে কখনোই দাম্পত্যজীবনের প্রকৃত সফলতা পাবেন না। যদি সফলতা পেতে চান, তা হলে ভাঙ্গার নয়, গড়ার মানসিকতা অর্জন করুন। শুধু পবিত্র হৃদয়ে আন্তরিক ও একনিষ্ঠ চিত্তে রাগ অভিমান ভুলে নতুন করে দাম্পত্যজীবন শুরু করুন। হীনমন্যতা, আত্ম-অহংকার বর্জন করুন। কখনোই একগুঁয়ে ও একরোখা হবেন না। মনে রাখবেন—আপনার একটু ধৈর্য, একটু সহনশীলতা, একটু ছাড় দেওয়ার মানসিকতা একটি পরিবারকে রক্ষা করতে পারে, যা প্রকারান্তরে রক্ষা করে একটি সমাজকে। সর্বোপরি, আপনার একটু ত্যাগ, একটু বিসর্জন আপনার সন্তানের পক্ষে কতটুকু উপকারি।
টিকাঃ
১. আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ।