📄 একাধিক স্ত্রী-গ্রহণ
ইসলামের প্রাজ্ঞ বিধি অনুসারে একজন মুসলিম পুরুষ একাধিক স্ত্রী গ্রহণ করতে পারেন। তবে শর্ত হলো, স্ত্রীদের মধ্যে সমতা রক্ষা করতে হবে এবং প্রত্যেকের ভরণপোষণের সক্ষমতা থাকতে হবে। যদি কেউ স্ত্রীদের হক আদায় করার সাহস না করে এবং তাদের মধ্যে সমতা রক্ষা করার নিশ্চয়তা দিতে না পারে এবং প্রত্যেকের ভরণপোষণের সক্ষমতা না রাখে তা হলে একাধিক স্ত্রী গ্রহণ করার অনুমতি ইসলাম তাকে দেয়নি। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন,
وَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تُقْسِطُوا فِي الْيَتَامَى فَانكِحُوا مَا طَابَ لَكُم مِّنَ النِّসَاءِ مَثْنَى وَثُلَاثَ وَرُبَاعَ ۖ فَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تَعْدِلُوا فَوَاحِدَةً أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ ۚ ذَلِكَ أَدْنَى أَلَّا تَعُولُوا
অর্থ : তোমরা যদি এই ইয়াতিম শিশুকন্যাদের প্রতি ন্যায় করতে না পার (তবে এদের বিবাহ করো না); কেননা, তোমরা ইচ্ছেমতো দুটি, তিনটি, চারটি করে নারী বিবাহ করতে পারবে। কিন্তু যদি তাদের মধ্যে সাম্য রক্ষা করতে না পার, তবে একটি নারীকেই বিবাহ করতে পারবে। কিংবা কোনো অধিকারভুক্ত দাসী। এটাই তোমাদের অন্যায় না করার নিকটতর। —সূরা নিসা : ০৩
ইসলামবিদ্বেষীরা একাধিক স্ত্রী গ্রহণের অনুমতি দেওয়া ইসলামের ওপর আপত্তি করে। তারা বলে, এতে নারীকে ছোট করা হয়েছে, তার আবেগ অনুভূতির কোনো মূল্য দেওয়া হয়নি। তারা শুধু একাধিক স্ত্রী গ্রহণের অনুমতির কথা বলে। কিন্তু এজন্য ইসলাম যেসব শর্ত আরোপ করেছে, সেগুলোর কথা বলে না। এ কি জ্ঞানপাপ নয়?
আশ্চর্যের বিষয় এই যে, স্ত্রীর যাবতীয় হক আদায়ে, আমৃত্যু ভরণপোষণ এবং প্রত্যেকের মাঝে সমতাবধানের শর্তে ইসলাম কর্তৃক একাধিক স্ত্রী গ্রহণের অনুমতিকে —নারীকে ছোট করা, নারীর আবেগ অনুভূতি নিয়ে খেলা করা ইত্যাদি স্পর্শকাতর শব্দে বিশেষায়িত করা হচ্ছে। অপর পক্ষে স্ত্রীদেরকে মর্যাদা দান করা ছাড়াই পথে ঘাটে বাজারে শরমহীন নারীকে ভোগ এবং উপভোগ করা, অথবা নামকাওয়াস্তে ঘরের বউ ধরে রেখে খালি গালি গালাজ পেতে নিয়ে আমোদপ্রমোদ, আবার বিবাহ করা; অথবা পার্টিতে বন্ধুদের সাথে স্ত্রীবিনিময়ের উন্মাদনাকে কিছুই মনে করা হয় না। কিংবা মনে করা হলেও সেগুলোকে নিয়ে কথা বলা হয় না, বা কথা বলা যায় না। কেননা, পশ্চিমাভক্তদের আধুনিক ব্যাখ্যায় এগুলো স্বাধীনতা, উদারতা। যাদের ইন্দ্রিয়ানুভূতি এতটাই বিকল, তাদের উদ্দেশে কিছু বলাই বিফল।
কিন্তু যারা দাম্পত্যজীবনকে একটি গুরুতর বিষয় মনে করেন, যাদের কাছে চারিত্রিক ও পারিবারিক মূল্যবোধ বলতে কিছু আছে, তাদের প্রতি আমাদের বক্তব্য এই যে, একাধিক স্ত্রী-গ্রহণের অনুমতি দেওয়ার অর্থ এই নয় যে, ইসলামে নারীকে খাটো করে দেখা হয়েছে বা তার আবেগ অনুভূতিকে মূল্য দেওয়া হয়নি। বরং বাস্তবে এমন কিছু ক্ষেত্র আসে, যখন অন্য স্ত্রী-গ্রহণ অনিবার্য হয়ে পড়ে। এ কারণেই মূলত একাধিক স্ত্রী-গ্রহণের পথকে একেবারে রুদ্ধ করা হয়নি। কেননা, ইসলাম একটি জীবন্ত ধর্ম। এতে না অতি বাড়াবাড়ি আছে, না অতি ছাড়াছাড়ি আছে। কিছু অনিবার্যবশতই মূলত একাধিক স্ত্রী-গ্রহণের পথ ইসলামে খোলা রাখা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ কয়েকটি ক্ষেত্র উল্লেখ করছি :
১. অসুস্থতা : অনেক সময় স্ত্রী এমন রোগে আক্রান্ত হয় যে তার আরোগ্য দুরাশামাত্র। তখন অন্য স্ত্রী গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।
২. বন্ধ্যাত্ব : অনেক সময় বছরের পর বছর চিকিৎসা করেও সন্তান আসে না। কিন্তু স্বামী সংসারে সন্তানের প্রয়োজন বোধ করে। পিতৃত্বের পিপাসা দূর করার জন্য তাকে অন্য স্ত্রী গ্রহণের অনুমতিও দেওয়া হয়।
৩. অবাধ্যতা : স্ত্রী অনেক সময় অবাধ্য ও গোঁয়ার প্রকৃতির হয়। চালচলন ভালো হয় না। স্বামীর শরীরী অভিসম্পাত হক আদায় করে না। এবং তার সংশোধনও অসম্ভব প্রমাণিত হয়েছে। এমতাবস্থায় একটি স্বাভাবিক জীবন যাপনের জন্য অন্য স্ত্রী গ্রহণের অনুমতিও অন্যায় নয়।
৪. নারীর সংখ্যাধিক্য : ইসলামী সমাজে যখন (যুদ্ধের মতো) কোনো ব্যাপক দুর্যোগ দেখা দেয় তখন দেখা যায়, নারীর সংখ্যা পুরুষের তুলনায় অনেক বেড়ে যায়। একারণেও পুরুষের একাধিক স্ত্রী-গ্রহণের বিষয়টি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।
ভাববার বিষয়, ইসলাম যে একাধিক স্ত্রী-গ্রহণের অনুমতি প্রদান করেছে, তাও ঢালাওভাবে নয়। অনেক বিধি-নিষেধও আরোপ করেছে যেগুলোর যথার্থ বাস্তবায়নে বিষয়টি জীবনমুখী ও বাস্তবসম্মত হয়ে ওঠে। সেই সাথে প্রধান দুটি শর্ত আরোপ করেছে : ভরণপোষণের সামর্থ্য এবং সমতাবধানের নিশ্চয়তা।
📄 উত্তরাধিকার
ইসলামের উত্তরাধিকার বণ্টননীতিতে দুজন কন্যাসন্তানের সমপরিমাণ অংশ পাবে একজন পুরুষসন্তান। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন,
يُوصِيكُمُ اللَّهُ فِي أَوْلَادِكُمْ ۖ لِلذَّكَرِ مِثْلُ حَظِّ الْأُنثَيَيْنِ ۚ فَإِن كُنَّ نِسَاءً فَوْقَ اثْنَتَيْنِ فَلَهُنَّ ثُلُثَا مَا تَرَكَ ...
অর্থ : আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের সন্তানদের ব্যাপারে নির্দেশ দিয়েছেন একজন পুরুষসন্তান দুজন নারীসন্তানের সমান অংশ পাবে। তবে যদি নারী দুয়ের অধিক হয়, তবে তাদের প্রাপ্য অংশ হলো দুই তৃতীয়াংশ...—সূরা নিসা : ১১
এই বণ্টননীতি অনুসারে পুরুষসন্তান তার প্রাপ্য অংশটুকু পাবে এবং তার ওপর তার পরিবারে, মায়ের এবং বোনের ভরণপোষণ ওয়াজিব হবে। পক্ষান্তরে মেয়েটি তার প্রাপ্য অংশটুকু পাবে। কিন্তু তার ওপর কারও ভরণপোষণ ওয়াজিব হবে না। এমনকি, তার নিজের ভরণপোষণও তার নিজের দায়িত্ব নয়; বরং তার পিতা, ভাই, স্বামী এবং ক্রমানুরূপক্রমে অন্যান্য মাহরাম পুরুষদের দায়িত্ব। তারা এ দায়িত্ব অবহেলা করলে ইসলামের বিধি অনুসারে দণ্ডযোগ্য হবে। নারী তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করতে পারবে। প্রশাসন তাদের তার ভরণপোষণ দিতে বাধ্য করবে।
তাহলে প্রাপ্য সম্পদ নারী কী করবে? হ্যাঁ, এই সম্পদ সে নিজের জন্য সংরক্ষণ করবে। শরীয়তের বিধান মোতাবেক ইচ্ছেমতো খরচ করবে। দান সদকা করবে। হাদিয়া তোহফা দেবে। এই সম্পদে কারও কোনো কর্তৃত্ব ও অধিকার থাকবে না। এখন স্বয়ং বিচার করুন, আদৌ কি ইসলাম নারীর প্রতি অবিচার করল?
এখন আপনি যদি কাফের-বেঈমানের সাথে সুর মিলিয়ে পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের থেকে ইসলামকে তুলে দেন, এবং সে কারণে আপনার ওপর আপনার এবং অন্যদের ভরণপোষণের দায়িত্ব এসে পড়ে, এবং আপনার দায়িত্বশীল পুরুষরাও সেই সুযোগে আপনার দায় মাথা থেকে নামিয়ে ফেলে এবং আপনার থেকে যা নেবার, নেয়; এবং যা দেবার, না দেয়; এবং তাদেরকে বাধ্য করার জন্য দেশে ইসলামী আইনের কার্যকারিতা না থাকে, তা হলে এটা কার দোষ? ইসলামের না আপনার?
এভাবে ইসলামী শাসনব্যবস্থা ও আদর্শিক চেতনায় অন্যান্য আদর্শকে গুলিয়ে ফেলে অথবা ইসলামকে পুরোপুরি তুলে দিয়ে যে জঘন্য সমাজ গড়ে উঠবে, তাতে প্রত্যেকে নিজের স্বার্থ ও প্রবৃত্তির কথা ভাববে সেটাই স্বাভাবিক। ক্ষতি প্রত্যেকেরই হলেও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে নারী। সুতরাং নারীজাতির নিরাপত্তা নির্ভেজাল ইসলামেই নিহিত। এই অনুভূতি যত দিন না আসবে, নারীজাতির অবনতি ও লাঞ্ছনা ততদিন বাড়তেই থাকবে। নাট্যমঞ্চে দাঁড়িয়ে যত চিন্তা-চরিত্রই করুন, আন্দোলন আর সংগঠনের যত স্তূপই জমা করুন, ফল কী হচ্ছে, বাস্তবতা তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। মূল থেকে সরে গিয়ে অমূল জায়গায় যততাই হাতড়ান, পাবেন না। সূত্র ভুল করলে পৃষ্ঠা পৃষ্ঠা ফুরিয়ে ফেলুন, অঙ্ক মিলবে না।
📄 বাল্যবিবাহ
বর্তমানে বাল্যবিবাহের বয়স নিয়েও ধুম্রজালের সৃষ্টি করা হচ্ছে। বিভিন্ন সংশয় ও আপত্তি উত্থাপন করা হচ্ছে। অনেক সামাজিক ও ব্যক্তিগত সমস্যাকে পুঁজি করে ছেলেমেয়েদের বিবাহের বয়সে পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু আমরা মনে করি, এই দাবিটি অনর্থক। এবং এর ফলাফল ও সামাজিক বিচারে ভালো নয়।
বাল্যবিবাহই দাম্পত্যজীবনের ব্যর্থতার কারণ নয়। যেমনটি অনেকে দাবি করেন। আমাদের আগের যুগের মানুষেরা অতি অল্প বয়সেই বিবাহ করেছেন। আগের যুগের বলতে একশো বছর আগের কথা বলছি না, ত্রিশ চল্লিশ বছর আগের কথাই বলছি। তাদের প্রত্যেকেরই দাম্পত্যজীবন যে ব্যর্থ হয়েছে, তা তো নয়। আর যাদের ব্যর্থ হয়েছে, তা যে শুধু বাল্যবিবাহের কারণেই হয়েছে, তাও তো নয়। বরং তাদের অধিকাংশের দাম্পত্যজীবনই ছিল সফল, এবং তাদের ছেলেমেয়েরাই আজকের বুদ্ধিদীপ্ত, প্রকৌশলী, শিক্ষাবিদ, বীর সৈনিক ইত্যাদি। প্রত্যেকেই বাল্যকাল থেকে ঘরসংসার করা নারী জননীরই সন্তান। তা হলে সমস্যাটা কোথায়?
সমস্যা মূলত আমাদের মাথায়। আমরা বিবাহ, তালাক, সন্তানলালন ইত্যাদি সামাজিক রীতিনীতিকে ধর্মীয় বিধি-বিধানের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অনুধাবন করতে ব্যর্থ হচ্ছি। ইসলামী শরীয়াত বিবাহের জন্য কোনো নির্দিষ্ট বয়স বেঁধে দেয়নি। বরং প্রাজ্ঞ বিবেক-বুদ্ধি ও সুস্থ রুচি-প্রকৃতির ওপর ছেড়ে দিয়েছে। যেন ছেলেমেয়ে উভয়ের পক্ষেই বিবাহের কল্যাণ ও ইতিবাচকতা সার্থকতা লাভ করে।
আজকে নানা প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে মানুষের মগজ ধোলাই করা হচ্ছে। ঘোষকরা বলে বেড়াচ্ছে, তাড়াতাড়ি বিয়ে দেওয়ার কারণে শিশু-অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। তাদের দৃষ্টিতে শিশুদের পরিধি আঠারো বছর পর্যন্ত বিস্তৃত। ছেলেমেয়েরা যখন এর আগে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়, তখন তারা শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়; মা বাবার ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয়; ফলে তাদের শারীরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পূর্ণতা আসে না, অল্প বয়সেই তাদের ওপর নানাবিধ দায়িত্ব চেপে যায়; পরিবার-পরিচালনা, সন্তান-লালনপালন, স্বামী-স্ত্রীর দায়িত্ব-কর্তব্য ইত্যাদি দায় তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। আশ্চর্যের বিষয়, অনেকের মানসিক যুক্তিগত্যা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সতেরো বছর এগারো মাস উনত্রিশতম দিনে সন্তানকে শিশু হিসেবে মূল্যায়ন করে এবং তার সাথে শিশুসুলভ আচরণ করে; কিন্তু পরের দিন থেকেই সে আর শিশু নয়— এখন তার সাথে আচরণ হবে ভিন্ন আঙ্গিকে।
কিন্তু এসব অযৌক্তিক ও ভিত্তিহীন কিছু গল্প গুজব ছাড়া কিছু নয়। শরীয়তেও এসব কথার গ্রহণযোগ্যতা নেই। আল্লাহই আমাদের স্রষ্টা। তিনিই আমাদের সামর্থ্য ও ধারণক্ষমতা সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো জানেন। তিনিই যখন প্রাপ্তবয়স্কতাকে শরীয়তের বিধিনিষেধের আরোপযোগ্যতা বলে নির্ধারণ করে দিয়েছেন, তখন এটা অনস্বীকার্য যে, প্রাপ্তবয়স্কতার পর মানুষ শরীয়তের বিধিনিষেধ বুঝতে সক্ষম হয়, আল্লাহর সম্বোধন ধারণ ও অনুধাবনে যোগ্য হয়। বিবাহসম্পর্কিত বিষয়াদি এবং দায়িত্বকর্তব্যও এর বাইরে নয়। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর মানুষ পরিবার-পরিচালনা, সন্তান-লালনপালন ইত্যাদি কাজের সক্ষমতা অর্জন করে ফেলে। এগুলো মূলত নির্ভর করে পরিবেশ ও পরিস্থিতির ওপর। মা বাবা যদি সচেতন হন, তা হলে ছেলেমেয়েদের যথাসম্ভব দায়িত্বসচেতন করে গড়ে তোলা সহজ। এভাবে শিশুরা আত্মবিশ্বাসী ও আত্মনির্ভরশীল হয়ে বেড়ে ওঠার যথার্থ সুযোগ পায়।
ইসলামের ইতিহাস এর জ্বলন্ত প্রমাণ। আমরা দেখি, ষোলো-সতেরো বছর বয়সের যুবকরা বিশাল বিশাল সেনাবাহিনী পরিচালনা করেছেন। উসামা বিন যায়েদ রাযি. মাত্র ষোলো বছর বয়সে সেনাপ্রধান হয়েছিলেন। এই যুগে অনেক বড় বড় সাহাবী তাঁর নেতৃত্বে যুদ্ধ করেছিলেন। মুহাম্মাদ বিন কাসিম মাত্র সতেরো বছর বয়সে সিন্ধু বিজয় করেছিলেন। এ বিষয়গুলো আর যাই হোক, এটা অবশ্যই প্রকাশ করছে যে, মানুষ যে পরিবেশেই বড় হয় সে অনুযায়ী নিজের ওপর নির্ভর করতে শেখে। নিজের বিষয়াদি পরিচালনা করতে শেখে।
দুঃখ এখানেই যে, আমরা শত্রুদের প্রতিনিয়ত আমাদের মাঝে চারিত্রিক রোগব্যাধি ছড়াতে দিচ্ছি, আর আমরা পরানন্দে সেগুলো হাতে-পায়ে, মাথা-মগজে মেখে নিচ্ছি; চোখে-মুখে, নাকে-বুকে চুবিয়ে নিচ্ছি। আমাদের ছেলেমেয়েরা প্রাপ্তবয়স্ক হলেও বিবাহের উপযুক্ত হচ্ছে না; কিন্তু পাশ্চাত্য ধাঁচে রাতারাতি মিষ্টি প্রেমলীলা, বেহায়াপনা-বেলেল্লাপনা, ছিনতাই-ধর্ষণ ও নেশাগ্রহণে পশ্চিমাদের সাথেও পাল্লা দিতে প্রস্তুত। বলি, সবকিছুর সাথে সাথে আমাদের চিন্তাশক্তিও যদি এমন বিকলাঙ্গ হয়ে যায়, তা হলে কী করে এ জাতি রেহাই পাবে?
রয়েছে শিক্ষার বিষয়। এটাও যুক্তিসঙ্গত নয়। আল্লাহ্ প্রত্যেকটি মানুষকে নির্দিষ্ট পরিমাণ মেধা ও যোগ্যতা দান করেছেন। অনেক মেয়ে লেখাপড়ায় তেমন আগ্রহী হয় না; কিন্তু বিভিন্ন শিল্পকর্মে আগ্রহী হয়। ছেলেদের ক্ষেত্রেও একই কথা। অনেক ছেলেই স্বাধীনভাবে কাজ করতে ভালোবাসে। তাই সে পড়াশোনা ছেড়ে দেয়। ব্যবসায়-বাণিজ্য এবং এ জাতীয় বিভিন্ন কর্মে নিয়োজিত হয় এবং অর্থ উপার্জন করতে চায়। একসময় আত্মিক প্রশান্তির জন্য বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে চায়। কিন্তু যখন আমাদের চিন্তাভাবনিক ব্যাধির কারণে সে কোনো রকম সমর্থন পায় না, তখন হতাশ হয়ে পড়ে। অর্থের অপচয়, সময়ের অপচয় এবং শরীয়তের লঙ্ঘন হওয়ার ক্ষেত্র তৈরি হয়। জীবন হয়ে পড়ে লক্ষ্যহীন, অর্থহীন, ছন্নছাড়া। সুতরাং ব্যাপকভাবে বিবাহবিলম্বের ডাক দেওয়া কতটুকু ইতিবাচক ফল দেবে? বরং আমরা মনে করি, এর নেতিবাচকতা ও মন্দ পরিণতির দিকটাই ভারি বেশি। প্রসঙ্গত সেরকম কয়েকটি মোটা মোটা বিষয়ে ইঙ্গিত করছি:
১. এর পরিণতিতে তরুণ-তরুণীর বিচ্যুতির পথই লাঘব হয়। সমাজে অনাচার ছড়িয়ে পড়ে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে চারিত্রিক মূল্যবোধের ওপর।
২. ধীরে ধীরে বিবাহ বিষয়টি অনেকের কাছেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। বিবাহ করে ঝামেলায় জড়াতে চায় না। স্বাভাবিক পারিবারিক জীবন থেকে দূরে সরে যায়। সম্পূর্ণ আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। সমাজে কোনো কার্যকর অবদান রাখার মানসিকতা থাকে না।
৩. বিলম্বে বিবাহ মেয়েদের প্রজননক্ষমতা হ্রাস করে। বিবাহ যতটা বিলম্বিত হয়, গর্ভাশয়ে ততটাই দুর্বলতা সৃষ্টি হয়। তখন আর সুস্থ, সুঠাম সন্তান প্রসব করে না।
বিষয়টির নেতিবাচকতা অনুধাবনে জন্য আমেরিকান পত্রিকা টাইমসের একটি সংবাদই যথেষ্ট। ওই সংবাদের সারকথা এই যে, এ পর্যন্ত দুই মিলিয়ন জারজ শিশু জন্ম নিয়েছে। তাদের জন্মদাত্রীরা প্রত্যেকেই টিনএজ—তেরো থেকে উনিশ বছরের অবিবাহিত ‘শিশুকন্যা’। যারা আমাদের সমাজে এসে পশ্চিমা সভ্যতার দালালি করছেন, তারা এই খবরটা কি জানেন? এর পরও কি ছোটোবড় সর্ব বিষয়ে পশ্চিমাদের অনুসরণ করতে হবে? মহান আল্লাহর এই ধমক কি তাদের জন্যই নয়,
أَفَحُكْمَ الْجَاهِلِيَّةِ يَبْغُونَ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ حُكْمًا لِقَوْمٍ يُوقِنُونَ
অর্থ : তারা কি সেই বর্বর নিয়মীতিতেই চাইছে? অথচ ইয়াকীনকারী সম্প্রদায়ের জন্য আল্লাহর চাইতো সুন্দর বিধানদাতা আর কে আছে? —সূরা মাইদাহ : ৫০
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই ভবিষ্যদ্বাণীর প্রতিফলন কি তাদের ওপরই হচ্ছে না,
لَتَتَّبِعُنَّ سَنَنَ مَنْ কَانَ قَبْلَكُمْ شِبْرًا بِشِبْرٍ وَذِرَاعًا بِذِرَاعٍ حَتَّى لَوْ دَخَلُوا جُحْرَ ضَبٍّ لَاتَّبَعْتُمُوهُمْ قُلْنَا يَا رَسُولَ اللهِ : الْيَهُودُ وَالنَّصَارَى ؟ قَالَ : فَمَنْ غَيْرُهُمْ؟
অর্থ : অচিরেই তোমরা তোমাদের আগের লোকদের অনুসরণ করা শুরু করবে—একদম বিঘতে বিঘতে, গজে গজে; এমনকি, তারা যদি 'গুঁইসাপের গর্তে ঢোকে', তবে তোমরা তাতেও তাদের অনুসরণ করবে। আমরা বললাম, হে আল্লাহ রাসুল, আপনি কি ইহুদি নাসারাদের কথা বলছেন? তিনি বললেন, তো আর কাদের কথা?’১
আমরা স্পষ্ট ভাষায় বলছি, দ্রুত বিবাহে অনধিকার চর্চা করবেন না। আল্লাহ যে বিধান দিয়েছেন, তাতেই সমাজের শান্তি ও নিরাপত্তা নিহিত। তাতেই শিশুর অধিকারের প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত। আমরা স্পষ্ট ভাষায় বলছি, যে সভ্যতা ব্যক্তিস্বাধীনতার নামে ব্যভিচারের বৈধতার সনদ দেয়, সেই সভ্যতা আমরা মানি না, মানব না। যেই সভ্যতা স্বভাবধর্মের দাবি ও চাহিদার সাথে এবং সরলপ্রাণ মুসলমানের রুচি ও প্রকৃতির সাথে স্পষ্টত সংঘর্ষরত, সেই সভ্যতা আমরা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করি।
পশ্চিমা সভ্যতায় যে ধ্বংস নেমেছে, আমরা তার স্বরূপ দেখেছি। আমরা আমাদের নিষ্কলুষ পবিত্র সমাজে নগ্নতার নোংরামিগুলো তুলে আনতে চাই না। আমরা জানি, তারা বিনিয়ে-বিনিয়ে যত কথাই বলুক, জীবনের বাস্তব সমাধান তাদের কাছে নেই। তারাই সমস্যার জন্ম দেয়। তারপর সেই সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে আরও জটিলতার সৃষ্টি করে। আমরা তাদের অনুকরণপ্রিয় তোতাপাঁখি কেন হব? আমরা তো জানি যে, আল্লাহ্ই জানেন, মানুষ জানে না। আমরা তো জানি যে, আল্লাহ্ই জ্ঞান সর্বব্যাপী, মানুষের জ্ঞান সীমিত।
পশ্চিমাদেশের দালালেরা জেনে রাখুক, প্রতিটি সমাজের আছে স্বকীয় বৈশিষ্ট্য। প্রতিটি সমাজ আলাদা আচার, আলাদা অভ্যাস, আলাদা চরিত্র, আলাদা মূল্যবোধে বিশ্বাসী। তারা কী এমন পেল যে, নিজ দেশের নিজ জাতির আলাদা বৈশিষ্ট্যকে এভাবে জলাঞ্জলি দিতে হবে? তারা যেন আর নিজ দেশ ও জাতির বিরুদ্ধে অন্য জাতি ও সভ্যতার দালালি ও গোলামি না করে। তারা যেন আর অন্তত কোনো মুসলিম সমাজে বিলম্বে বিবাহের দাবি না তোলে।
অজস্র শিশু-সমস্যার সমাধান উপায় কী হবে, সে নিয়ে শত শত সভা সেমিনার করার চাইতে আমাদের ছেলেমেয়েরা অল্প বয়সে বিবাহ করবে; বৈধ দাম্পত্যজীবনের আওতা, পরিবার-প্রতিষ্ঠানের নিরাপদ ছায়ায় কিছু বৈধ সন্তান জন্ম দেবে এবং এবং মায়া-মমতা-ভালোবাসা ও পারিবারিক বন্ধনে ওপর বেড়ে ওঠাই আমাদের কাছে অনেক ভালো।
টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী ও মুসলিম।
📄 আত্মীয় বিবাহ
বর্তমানে আমাদের সমাজে নিকটাত্মীয়দের মধ্যে বিবাহ-শাদির বিষয়ে রব উঠেছে। দাবি করা হচ্ছে, নিকটাত্মীয়দের মধ্যে বিবাহ-শাদির দ্বারা সুস্থ ও মেধাবী সন্তান জন্ম দেওয়ার সুযোগ কমে যায়।১ প্রকৃত প্রস্তাবে, এ বিষয়ে পূর্ব থেকেই মানুষ দুই ভাগে বিভক্ত। কেউ এ ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করেন, কেউ কেউ করেন অনুৎসাহিত। যারা উদ্বুদ্ধ করেন, তাদের কিছু যুক্তি হলো,
১. আত্মীয়দের মধ্যে বিবাহ-শাদি নিজেদের মধ্যকার সম্পর্ককে আরও দৃঢ় ও সংহত করে।
২. আত্মীয় ছেলে-মেয়ে পারস্পরিক দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা এবং সাংসারিক অস্বচ্ছলতা ও অপ্রশস্ততায় তুলনামূলকভাবে বেশি ধৈর্যশীল ও সহনশীল হতে পারে।
৩. নিজেদের স্থাবর, অস্থাবর অর্থসম্পদের হেফাজত হয়। অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে অন্যদের হাতে চলে যায় না।
৪. আত্মীয়দের মধ্যে বিবাহ-শাদি বংশীয় সংহতি নিশ্চিত করে। পরিবারের ছেলেমেয়েদের বিবাহ-শাদি বিষয়টি সহজ হয়। ছেলেমেয়ের আইবুড়ো থাকার পথ অনেকটা রুদ্ধ হয়।
পক্ষান্তরে, যারা নিজেদের মধ্যে বিবাহ-শাদির বিষয়ে অনুৎসাহিত করেন, তাদের চিন্তাধারা হলো আত্মীয়দের বাইরে বিবাহ-শাদিই ভালো। কেননা—
১. এতে বিভিন্ন পরিবারের মধ্যে পরিচয় ও সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
২. বিবাহের পাত্র-পাত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রেও বিষয়টি ইতিবাচক। কেননা, অনেক জায়গা দেখে মনমতো ভালো ছেলেমেয়ে নির্বাচন করা সম্ভব হয়।
৩. গোত্রীয় সংকীর্ণতা ও গোঁড়ামি থাকে না।
৪. বংশে নতুন ধারার সংযোজন হয়।
৫. নতুন প্রজন্ম হয় মেধাবী, শক্তিশালী, সুস্থ, সুঠাম।
ধর্মীয় জ্ঞানে আমরা যা পাই, তাতে আত্মীয় বিবাহ নিষিদ্ধও নয়, আবশ্যিকও নয়। সুতরাং ঢালাওভাবে আত্মীয় বিবাহের উৎসাহ কিংবা অনুৎসাহ কোনোটাই ভারসাম্যপূর্ণ নয়। তবে অভিজ্ঞতার আলোকে প্রমাণিত হয়েছে যে, আত্মীয়দের মধ্যে বিবাহ-পুনর্বিবাহ বংশধারাকে দুর্বল করে দেয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত আছে,
لَا تَنكِحُوا الْقَرَابَةَ الْقَرِيبَةَ فَإِنَّ الْوَلَدَ يُخْلَقُ ضَاوِيًا
অর্থ : তোমরা নিকটাত্মীয়দের মধ্যে বিবাহশাদি দিও না। এভাবে সন্তান দুর্বল হয়।২
হযরত উমর রাযি. থেকেও বর্ণিত আছে যে, তিনি বনু সায়েব বংশের ছেলেমেয়েদের দুর্বলতা দেখে বললেন,
مَا لِي أَرَى ابْنَ السَّائِبِ قَدْ ضَوِيَ؟ غَرِّبُوا النِّكَاحَ لَا تُضْوُوا
অর্থ : কী ব্যাপার, বনু সায়েবের লোকেরা, তোমরা দেখি দুর্বল হয়ে পড়ছ? তোমরা নিজ বংশের বাইরেও বিবাহশাদি করো, তা হলে দুর্বল হবে না।
ইবনে হাজার আসকালানী রাহ. লিখেছেন,
الْعَشِيرَةُ أَنَّ الْوَلَدَ بَيْنَ الْقَرِيبَيْنِ يَكُونُ أَخْوَقَ
অর্থ : অভিজ্ঞতা বলে, আত্মীয় দম্পতির ছেলেমেয়ে সাধারণত নির্বোধ হয়।৩
মুসলমানদের এ দৃষ্টিভঙ্গি ধর্মীয় বিধান নয়। এটা সাধারণ অভিজ্ঞতার আলোকে সাধারণ উৎসাহ-অনুৎসাহের ব্যাপার। যদি চিকিৎসাবিজ্ঞান দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, কোনো আত্মীয়যুগলের মধ্যে বিবাহশাদির দ্বারা বংশধারায় কোনো দুর্বলতা আসবে না, তা হলে অনুৎসাহের বিষয়টি তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। তারা বিবাহশাদি করতে পারে। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরীক্ষানিরীক্ষা যদি জানান দেয় যে, তাদের বংশধারায় কোনো কুপ্রভাব পড়তে পারে, তা হলে তাদের নিজেদের মধ্যে বিবাহশাদি না করাই কাম্য।
টিকাঃ
১. এখানে আত্মীয়-নিকটাত্মীয় বলতেও হারাম হওয়া ছাড়া সাধারণ আত্মীয় ও বংশীয় ছেলেমেয়েদের কথা বলা হচ্ছে। কেননা মাহরাম ছেলেমেয়েরা বিবাহশাদি ইসলামে সুস্পষ্টভাবে হারাম করা হয়েছে।
২. ইবনে হিব্বান (সনদ : সহীহ)।
৩. ফাতহুল বারী শরহে বুখারী।