📄 ৭. ধৈর্য ও অবিচলতা
প্রিয় বোন, জেনে রাখুন, ধৈর্য হলো আল্লাহর দাসত্বের বিভিন্ন পর্যায়ের একটি। কুরআনে কারীমে অসংখ্য আয়াতে ধৈর্যের কথা এসেছে। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ
অর্থ : হে ওই সমস্ত লোকেরা, যারা ঈমান এনেছ, তোমরা সবর ও সালাতের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন। — সূরা বাকারা : ১৫৩
তিনি আরও ইরশাদ করেছেন,
وَاصْبِرْ نَفْسَكَ مَعَ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُم بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ وَلَا تَعْدُ عَيْنَاكَ عَنْهُمْ تُرِيدُ زِينَةَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَلَا تُطِعْ مَنْ أَغْفَلْنَا قَلْبَهُ عَن ذِكْرِنَا وَاتَّبَعَ هَوَهُ وَكَانَ أَمْرُهُ فُرُطًا
অর্থ : সকাল সন্ধ্যা যারা সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে তাদের প্রতিপালককে ডাকে, তুমি তাদের সাথে ধৈর্যধারণ করো। পার্থিব জীবনের চাকচিক্যের মোহে তোমার দৃষ্টি যেন তাদের থেকে সরে না যায়। আমি যার হৃদয়কে আমার স্মরণ থেকে উদাসীন রেখেছি, যে তার প্রবৃত্তির অনুসরণ করেছে, যার বিষয়টি সুস্পষ্ট সীমালঙ্ঘন তুমি তার আনুগত্য করো না। — সূরা কাহফ : ২৮
তিনি আরও ইরশাদ করেছেন,
قُلْ يَاعِبَادِ الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا رَبَّكُمْ لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا فِي هَذِهِ الدُّنْيَا حَسَنَةٌ وَ أَرْضُ اللَّهِ وَاسِعَةٌ إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُم بِغَيْرِ حِسَابٍ
অর্থ : তুমি বলে দাও, হে আমার ওই সমস্ত বান্দারা, যারা ঈমান এনেছ, তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো; এই দুনিয়ায় যারা কল্যাণ করবে, তাদের জন্য থাকবে মহাকল্যাণ। আল্লাহর জমিন তো অনেক প্রশস্ত। নিশ্চয় ধৈর্যশীলদের দেওয়া হবে অপরিমিত পুরস্কার। — সূরা যুমার : ১০
যাই হোক, ধৈর্য কয়েক প্রকার :
১. আল্লাহর আনুগত্যে ধৈর্যধারণ : অর্থাৎ ধৈর্যের সাথে আল্লাহর হুকুম আহকাম মেনে চলা।
২. বিপদাপদে ধৈর্যধারণ : অর্থাৎ বিপদাপদ ও আল্লাহর রাহে জুলুম অত্যাচারের মুখেও আপন ধর্ম ও বিশ্বাসের ওপর অবিচল থাকা।
৩. আত্মনিয়ন্ত্রণে ধৈর্যধারণ : অর্থাৎ আল্লাহর নাফরমানি ও গোনাহে লিপ্ত হওয়া থেকে আত্মনিয়ন্ত্রণ করা।
৪. দুঃখ কষ্টে ধৈর্যধারণ : জীবনে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানামুখী বিপদাপদ, কষ্ট-লেশ, জুলুম-অত্যাচারে ধৈর্যধারণ ও পূর্ণ প্রত্যয়ের সাথে যে কোনো পরিস্থিতির মোকাবিলা করা।
ধৈর্য প্রকারভেদসহ দাওয়াহ দুনিয়ার সফলতার পূর্বশর্ত। আপনার চারপাশের প্রত্যেকেই খুশিমনে আপনার কথা মেনে নেবে, আপনার কাজে সাড়া দেবে—এমনটা আশা করা ঠিক নয়। এমনিতেই মানুষকে নিয়ে কোনো কাজ করা কঠিন। দাওয়াতি কাজ করা আরও কঠিন। আর মানুষের জীবনধারায় পরিবর্তন আনা যারপরনাই কঠিন। এজন্য প্রয়োজন যোগ্য নেতৃত্ব। প্রয়োজন বিনয়, নম্র ও সহনশীল আচরণ। দাওয়াতি কাজ হলো নিরাশ না হওয়া। অবিরাম দাওয়াতও চালিয়ে যাওয়া। যতক্ষণ একটিও কান আছে শোনার মতো। একটিও হৃদয় আছে ভাবার মতো। একটিও আশা আছে সাড়া পাওয়ার মতো।
আবু উমাইয়া শাবানী বলেন, আমি আবু সালাবা খাশানীর কাছে গেলাম, বললাম, এই আয়াতটি সম্পর্কে আপনার কী মত? তিনি বললেন, কোন আয়াত? বললাম,
يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا عَلَيْكُمْ أَنفُسَكُمْ لَا يَضُرُّكُم مَّن ضَلَّ إِذَا اهْتَدَيْتُمْ
অর্থ : হে ঈমানদারগণ, তোমরা নিজেদের রক্ষা করো। তোমরা নিজেরা যদি হেদায়েতপ্রাপ্ত হতে যাও, তা হলে যে গোমরা হলো সে তোমাদের ক্ষতি করতে পারবে না। — সূরা মাইদাহ : ১০৫
তিনি বললেন, আমি এ বিষয়ে সর্বাধিক জ্ঞাত ব্যক্তিককেই জিজ্ঞেস করেছিলাম, আমি স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেই জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি উত্তরে বলেছিলেন,
বাইল ইতিমিরু বিল মারূফি ওয়ান্তাহু আনিল মুনকারি হাত্তা ইযা রয়াইতা শুহহাম মুতআও ওয়া হাওয়াম মুত্তাবাআও ওয়া দুনিয়াম মুসারাতাও ওয়া ইজবা কুল্লি যি রয়িম বি রয়িহি ওয়া রয়াইতা আমরণ লা ইয়াদানি লাকা ফীহি ফায়ালাইকা বিখুয়াইসাতিন নাফসিক ইন্নাহু মিন অরাইকুম আইয়ামাস সবরি আস সবরু ফীহিন্না মিসলু কাবযি আলাল জামরি লিলফায়িলি ফীহিন্না মিসলু আজরি খামসীনা রযুলান মিসলা আমালিহি
অর্থ : বরং তোমরা একে অপরকে সৎকাজের আদেশ করতে থাকো। অসৎ কাজ থেকে বাধা প্রদান করতে থাকো। অবশেষে যখন স্বার্থের আনুগত্য, প্রবৃত্তির অনুসরণ, পার্থিবতার ব্যাপক প্রাধান্য এবং নিজ নিজ মতে প্রত্যেকের আত্মতুষ্টির ব্যাপক চর্চা হতে দেখবে, এবং এমন কিছু হতে দেখবে যাতে তোমার করার কিছু নেই, তখনই শুধু নিজের কথা ভেবো। নিশ্চয় তোমাদের পশ্চাতে আসছে ধৈর্যের দিন। ওই দিনগুলোতে ধৈর্য ধারণ করা—হাতে জ্বলন্ত অঙ্গার চেপে ধরার মতো কঠিন হবে। তখন একজন আমেল পঞ্চাশজন আমেলের বিনিময় লাভ করবে।
অন্য একটি বর্ণনায় আছে,
ক্বীলা ইয়া রাসূলাল্লাহ আজরু খামসীনা হীনান মিন্না আও মিনহুম? ক্বলা বাল আজরু খামসীনা মিনকুম
অর্থ : বলা হলো, হে আল্লাহর রাসূল, আমাদের মধ্য থেকে পঞ্চাশজন, নাকি তাদের মধ্য থেকে পঞ্চাশজন? তিনি বললেন, বরং তোমাদের মধ্য থেকেই পঞ্চাশজন।
অন্য একটি বর্ণনায় বিনিময়ের আধিক্যের কারণ দর্শানো হয়েছে এভাবে,
ইন্নাকুম তাজিদুনা আলাল খাইরি আওয়ানান ওয়ালা ইয়াজিদুনা আলাল খাইরি আওয়ানান
অর্থ : তোমরা কল্যাণে সহযোগী পাচ্ছ, কিন্তু তারা কল্যাণে সহযোগী পাবে না। ১
আমাদের প্রিয় নবীজীর মাঝে আমাদের জন্য আছে উত্তম আদর্শ। তিনি কত বিপদের মুখে পতিত হয়েছেন! কত উপহাসের সম্মুখীন হয়েছেন! কত গালমন্দ সহ্য করেছেন! এমনকি, মহান আল্লাহ পাহাড়ের ফেরেশতাকে পাঠালেন এই মর্মে,
ইন শিতা আবতাকতু আলাইহিমুল আখশাবাইনি ফ ইয়াকুলু লা ইন্নি আসআলুল্লাহা তায়ালা আই ইউখরিজা মিন আসলাবিহিম মাই ইয়াবুদুল্লাহা ওয়ালা ইউশরিকু বিহি শাইয়া
অর্থ : হে নবী, আপনি যদি চান, তা হলে তাদের ওপর দুই পাহাড় চাপিয়ে দেব। কিন্তু তিনি বললেন, না। আমি বরং আল্লাহর কাছে এইটা চাই যে, তিনি এদের ঊরসদেশ থেকে এমন কিছু মানুষ যারা আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কোনো কিছুকে শরীক করবে না। ২
হলোও তাই। আল্লাহ ওয়ালিদ বিন মুগীরা ও আবু জেহেলের মতো কাফের ও মোশরেকদের ঊরসে জন্ম দিলেন খালিদ বিন ওয়ালিদের মতো দিগ্বিজয়ী বীর ও ইকরিমার মতো মুসলিম সাধককে। দাওয়াতে পর্যায়ক্রমতা আছে। আগে মনকে প্রস্তুত করতে হয়। তারপর নতুন কিছু তুলে ধরা। অপ্রস্তুত অবস্থায় কারও কাছে কোনো কিছু গৃহীত হওয়া অনেকটা আকস্মিকতা। তাই দাওয়াতি কাজে পর্যায়ক্রমতা বিবেচনায় রাখা আবশ্যক।
প্রথম ধাপে দাওয়াত-পরিচিতি। অর্থাৎ দাওয়াতের বিষয়, অঙ্গন, পরিধি ইত্যাদি ঠিক করা। দ্বিতীয় শ্রেণি ও পেশার মানুষের কাছে দাওয়াত পৌঁছানোর ক্ষেত্র নির্ধারণ করা। দ্বিতীয় পর্যায়ে, দাওয়াতি কাজে সহযোগী নির্বাচন করা। এমন কিছু মানুষ—যারা আপনার চিন্তাকে গ্রহণ করবে, জীবন-সফরের এই মহতী উদ্যোগে আপনার সঙ্গী হবে। তৃতীয় পর্যায়ে চিন্তা-চেতনার বাস্তবায়নে মনে রাখবেন, এখানে প্রধান ও মৌলিক প্রয়োজন তা হলো এমন আলোকিত হৃদয়—যাতে ঈমান আছে, ইখলাস আছে। এভাবে ধাপে ধাপে সফলতার সাথে এগোনোর পারলে আশা করা যায় আমাদের দাওয়াতি কাজের একটি শক্তিশালী, সুসংহত, কার্যকর ভিত্তি স্থাপিত হবে। আমাদের শ্রম সার্থকতাও পাবে, ফলপ্রসূও হবে। জীবনধারায় আমূল পরিবর্তন আনাও সম্ভব হবে। অচিরেই মানবজীবন পরিচালিত হবে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'র পতাকা তলে।
আমরা যখন কোনো নারীকে দাওয়াত দেব, তখন সে হয়তো খুব অনায়াসে সালাত আদায় শুরু করবে। কিন্তু পর্দার বেলায় অপারগতা প্রকাশ করবে। হয়তো নিজের প্রবৃত্তির কাছে পরাজিত হয়ে, কিংবা অন্য কোনো প্রতিকূলতার কারণে। তখন হতাশ হলে চলবে না। তার সাথে লেগে থাকতে হবে। দীনের দাওয়াতও দিতে থাকতে হবে। তাকে উপলব্ধি করাতে হবে যে, অচিরেই কাল কিয়ামতে তাকে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে; সেখানে মা বাবা ভাই বোন স্বামী সন্তান কেউ থাকবে না; সেখানে আল্লাহ ছোট বড় সবকিছুর হিসেব নেবেন।
আশা করা যায়, ধীরে ধীরে আমরা আমাদের এই বোনটিকে বর্বরতার পঙ্কিল থেকে মুক্ত করতে পারবো। পাশ্চাত্যপ্রিয়তা ও অন্ধ অনুকরণের বেড়াজাল থেকে বের করে আনতে পারবো। বিশেষ করে, আধুনিকতার নামে যে অপচর্চা শুরু হয়েছে, নারীরা আল্লাহবিস্মৃত হয়ে যে মরণফাঁদে পা দিতে আরম্ভ করেছে, হয়তো তা থেকে তাকে বাঁচাতে পারবো। আমাদের আন্তরিকতা ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টাকে কবুল করে হয়তো আল্লাহ তার মাঝে ধার্মিকতা সৃষ্টি করবেন। এই বোনটির মাঝেই, অচিরেই আমরা একটি সত্যিকার ধার্মিক নারীকে দেখতে পাবো। যিনি মনে প্রাণে ইসলাম ও মুসলমানকে ভালোবাসবেন। নিঃসন্দেহে এটা আল্লাহর কাছে কঠিন কিছু নয়।
প্রিয় বোন, এ পথে চলতে হয়তো অনেক বাধা আসবে। হয়তো অনেক কঠিন কঠিন পরীক্ষারও সম্মুখীন হতে হবে। নিশ্চয় এ পরীক্ষা অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু এটা যেমন সত্য, এর চেয়েও বেশি সত্য এই যে, এর বিনিময় ও প্রতিদান আল্লাহর কাছে অনেক বড়, অনেক মহৎ।
হযরত সুমাইয়া রাযি.-কেই দেখুন। তিনি ছিলেন ইসলামের পথে শাহাদতবরণকারী প্রথম নারী। কাফেররা তাকে, তার ছেলে ও স্বামীকে ধরে নিয়ে গেল। মরুভূমির উত্তপ্ত বালুতে নিয়ে গিয়ে পুরো পরিবারকে কী নির্মম অত্যাচার করল। কিন্তু হযরত সুমাইয়া রাযি. ধৈর্য ও অবিচলতার কী জীবন্ত উদাহরণই না রেখে গেলেন যুগ যুগের মুসলিম নারী সমাজের জন্য। তিনি আপন ছেলেকে স্বামীকে উৎসর্গ করলেন আল্লাহর রাহে, প্রাণ সঁপে দিলেন আপন প্রভুর সমীপে; কিন্তু নিজের ঈমানকে কাফের বেইমানের সামনে বিসর্জন দিতে রাজি হলেন না। ৩
এই যে উম্মে শারিক গাযিয়া বিনতে জাবের বিন হাকিম। ইসলাম গ্রহণ করলেন। কুরাইশ নারীদের কাছে গিয়ে গোপনে ইসলামের দাওয়াত দিতে লাগলেন। একদিন কুরাইশ কাফেররা ধরে ফেলল। তারা কঠিন কঠিন বাক্য প্রয়োগ করে ধমক দিয়ে বলল, তোমার গোত্রের লোকেরা না থাকলে আজ তোমার সাথে যা করার করতাম। কিন্তু আজকের মতো তোমাকে সম্মানে ফিরিয়ে দিচ্ছি। উম্মে শারিক বলেন, আমার কওমের লোকেরা আমাকে একটি উটের পিঠে ফেলে দিল। নিচে কিছু দিল না। এভাবে দিন দিন এক মনজিল অতিক্রম করতাম। এ দীর্ঘ সফরে তারা আমাকে না কিছু খেতে দিত, না কিছু পান করতে দিত। প্রত্যেক মনজিলে আমাকে রোদ্রে ফেলে রাখত। নিজেরা ছায়ায় বিশ্রাম করত। বিশ্রাম করে খেয়ে পান করে তৃপ্ত হয়ে আবার যাত্রা করত। এক দিন এভাবেই রোদ্রে পড়ে ছিলাম। আমার প্রাণপ্রায় বের হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। হঠাৎ মুখের ওপর শীতল কিছু অনুভব করলাম। মনে হলো, পানির বালতি ধরা হয়েছে। আমি একটু পান করলাম। বালতিটি সরিয়ে নেওয়া হলো। আবার ধরা হলো। আমি আবার পান করলাম। এভাবে কয়েক দফায় পান করে আমি পরিপূর্ণরূপে তৃপ্ত হলাম। এবার বালতিটি শক্ত করে ধরে সবগুলো পানি গায়ের ওপর ঢেলে নিলাম। আমার শরীর কাপড় ভিজা গেল। আমি তাজা হয়ে গেলাম। ইতোমধ্যে সবাই জেগে গেল। তারা পানির ছাপ দেখতে পেল। আমিও একদম তাজা হয়ে আছি। তারা চেঁচামেচি শুরু করে দিল। বলল, তুমি নিশ্চয় রশির বাঁধন খুলে আমাদের পানি খেয়ে ফেলেছ। আমি বললাম, আল্লাহর কসম, আমি এমন কিছু করিনি। আসলে এরকম এরকম ঘটেছিল। তারা বলল, যদি তুমি সত্য বল থাক, তা হলে তো তোমার ধর্ম আমাদের ধর্মের চেয়ে উত্তম। এরপর তারা পানপাত্রগুলো দেখতে লাগল। তারা হতবাক হয়ে দেখল যে, তাদের পানপাত্র ঠিকই আছে। তারা আর বিলম্ব করল না। সকলে মুসলমান হয়ে গেল। ৪
চিন্তা করুন, একজন উম্মে শারিকের ধৈর্যের বদৌলতে একটি সম্প্রদায় ইসলাম গ্রহণ করল। আমাদের জন্য তার মাঝে আছে সুন্দর আদর্শ। এই বিংশ শতাব্দীতেও পৃথিবীর বুকে নারী সাহাবীদের ঈমানদীপ্ত সংগ্রামী জীবনের জীবন্ত উদাহরণ নেই তা নয়। যায়নাব আল গাযালি। ইসলামী সংগ্রাম সাধনার এক জীবন্ত কিংবদন্তী। তিনি কল্যাণের সুবাস ছড়াচ্ছেন। পথনির্দেশের আলো ছড়াচ্ছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, অচিরেই আল্লাহ মুমিনদের সাহায্য করবেন। শত্রুরা তার বাড়িরঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে। তাকে কারাবন্দি করে রেখেছে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস। তবু তিনি ঈমান ও বিশ্বাসের পথ থেকে বিন্দুমাত্র নড়েননি। ইস্পাতকঠিন মনোবল, সীমাহীন ধৈর্য, পর্বতপ্রমাণ অবিচলতায় তিনি এখনো টিকে আছেন দাওয়াতের ময়দানে। কারাগারের বিভীষিকাময় দিনগুলোর বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, “তারা ঘর খুলে দিল। ঘর ভর্তি কুকুর। আমার বুক কেঁপে উঠল। আমি চোখ বন্ধ করলাম। লোহার দরজা বন্ধ করে দেওয়ার বিকট আওয়াজ হলো। মুহূর্তের মধ্যেই চতুর্দিক থেকে আমার শরীরের সাথে কুকুরগুলো যেন সেঁটে গেল। ওদের ঘেউ ঘেউ শব্দ ছি ভয়ানক। কুকুরগুলো আমার সারা শরীরে কামড়াতে শুরু করেছে। আমি আল্লাহ জপে লাগলাম। হতভম্ব হয়ে শুধু বলে চলেছিলাম, اللهم اشغلني بك عمن سواك، اشغلني بك في حضرتك واصبغني بالشهادة فيك والحب فيك والرضى بك والمودة لك وثبت الأقدাম يا الله أقدام الموحدين (অর্থ : আল্লাহ, আমাকে তোমাতে মগ্ন রাখো। আমার আল্লাহ, আমাকে তোমাতে ব্যস্ত রাখো। হে চির একক, হে চির নিঃস্বাপেক্ষ, তোমার অনুভূতিতে আমাকে বিভোর করে দাও। তোমার উপলব্ধিতে আমাকে ডুবিয়ে রাখো। মাবুদ, তোমারই তরে শাহাদত নসীব করো। তোমাতে প্রেম দান করো। তোমার সন্তুষ্টি জোটাও। তোমার ভালোবাসা দান করো। পদ অবিচল রাখো, আল্লাহ, তোমারও একত্বে বিশ্বাসীদের পদ...) করুক ছটা কেটে গেল। ভেবেছি, খ্যাপা কুকুরেরা আমার সাদা কাপড়কে রক্তে লাল করে ফেলেছে... দরজা খোলা হলো। আলোর আভাস পেয়ে আমি আমার কাপড়ের দিকে লক্ষ করলাম। কিন্তু, কী আশ্চর্য! কাপড় দেখতে তো কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। কারারক্ষীরা যারপরনাই চমকে গেল। কুকুরগুলো আমার কাপড় ছিঁড়তে পারেনি।” ৫
দিন যায়। বছর যায়। বাইরের আলো বাতাসে দেখেন না। জেলের সেই অন্ধকারের কাঠেই সময়। সঙ্গী কিছু নয়। শুধু আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস। সময়ের পরিবর্তন হলো। সমাজের পরিবর্তন হলো। তিনি ছাড়া পেলেন। বিশ্বাস ও প্রত্যয় হলো আরও সুদৃঢ়। তিনি এখনো পথ চলছেন। আল্লাহর একত্বের উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছেন। মানুষ তার ডাকে সাড়া দিচ্ছে। স্বেচ্ছাচারী সম্প্রদায়ের বিভেদাদার ও অগ্নি-উপাসকদের থেমে নেই। কিন্তু রাখে আল্লাহ মারে কে?
শায়খ মুরসিদ হাসান হুযাইবির স্ত্রী জেলে স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে যান। সহিষ্ণু হৃদয় জানে না ভয়, মানে না বাধা। থেকে থেকে কিছু খাবার, কিছু জামাকাপড় নিয়ে যান। কারা-কর্তৃপক্ষর লোকেরা সার্চ করতে আসে। একদিন এক যুবক অতি উৎসাহে সার্চ করছিল। মনে হচ্ছিল, সে বিশাল কোনো কুকর্ম সাধন করছে। তিনি অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে বললেন, “বেটা, এটা তোমার জায়গা নয়। এটা তোমার কাগজও নয়। তোমার জায়গা ছিল রণাঙ্গন। তোমার কাজ ছিল শত্রুদের আক্রমণ থেকে মাতৃভূমিকে রক্ষা করতে। জন্মভূমির ওপর থেকে লাঞ্ছনাকে অপসারণ করতে। দিনদুপুরে গিয়ে এক মায়ের আদরের আলু-পটোল আর রুটি-পরাটা সার্চ করে কী এমন মহৎ কর্ম করছ, শুনি!” যুবকটি হতচকিত হলো। অনায়াসেই নিজেকে সামলে নিল। অপরাধীর তিলক তাকেও ব্যথিত করলো। লজ্জিত চোখে তাকাল। বলল, ‘জনাব, আপনি যথার্থ বলেছেন।” ৬
বানান তান্তাবী। জার্মানির স্বামী সাথে দাওয়াতের কাজ করতেন। সেখানে একটি নারীসংগঠনও তৈরি করেছিলেন। তার দাওয়াতী তৎপরতায় অনেক জার্মানি নারী তওবা করে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। স্বেচ্ছাচারী শাসক তাকে ও তার স্বামীকে নির্বাসিত করেছিল। এই দম্পতি সত্য বলার সাহস সর্বস্ব ত্যাগ করে দিয়েছিল। তাই শুধু নির্বাসনকে যথেষ্ট মনে করেনি। সেই স্বেচ্ছাচারীরা তাদের তাড়া করে বেড়িয়েছে এখান থেকে সেখানে, এদেশ থেকে সেদেশে। সর্বশেষ তারা আশ্রয় নিয়েছিলেন জার্মানির আখেন শহরে। স্বেচ্ছাচারী ষড়যন্ত্রজাল সেখানেও পৌঁছে গিয়েছিল। সাড়ে তিন হাজার শরীরী এক মুসলিম পীর – ইসলাম আত্মা থেকে নিষ্কৃতি না পাওয়া পর্যন্ত যেন তাদের ঘুমই হারাম। এক প্রতিবেশিনীর কপালে অস্ত্র ঠেকিয়ে শয়তানের দোসররা ইসলামের ঘরে পৌঁছে গেল। দরজায় কড়া নাড়ল। বানান তান্তাবী দরজা খুললেন। স্বামী ঘরে ছিলেন না। তিনি হাসপাতালে। অপ্রস্তুত ছিলেন। কোনো কথা নেই। বানানকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ল। ঘাতকদের পাঁচটি গুলি নিরীহ মুসলিম দায়িকার মস্তিষ্ক ভেদ করে দিল। বানান মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। শয়তানরা তার নিথর দেহটি ফেলে রেখে গেল। তিনি প্রাণ ত্যাগ করলেন দেশ থেকে দূরে, প্রিয়জন থেকে দূরে, আপনজন থেকে দূরে। বানান দুনিয়া থেকে চলে গেলেন। কিন্তু তার অমর উক্তি আজও দুনিয়াতে কোটি কোটি মুসলিম নারীর প্রেরণা হয়ে আছে, “দুঃখ করবেন না, হে ইসাম। আমাদের কথা ভেবে চিন্তিত হবেন না। আল্লাহর পথে অবিচল থাকুন। আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রাখুন। দ্বীনকে বিজয়ী করতে আপনার সঠিক অবস্থান এবং আল্লাহর রাস্তায় একনিষ্ঠভাবে জিহাদ চালিয়ে যাওয়া ই আমাদের কাম্য। আমরা আপনার কাছে আর কিছুই চাই না।” ৭
আমার ফিলিস্তিনী বোনেরা, তোমরা ধৈর্য হারিয়েো না। শত প্রতিকূলতায়, শত ঝড়ঝঞ্ঝায় এই সব দাইয়া, মুজাহিদা, সাহেবা বোনদের মাঝে আছে আমাদের আদর্শ, আছে সান্ত্বনা। আমরা প্রতিনিয়ত পরীক্ষায় নিপতিত। আমাদের পবিত্র ভূমিতে কোনো প্রেতাত্মা আশ্রয় নিতে পারে না। আমাদের পুণ্যভূমিতে কোনো মিথ্যার উপস্থাপন ঘটাতে পারে না। চিরন্তন এ লড়াই চলবেই। সত্যই হবে বিজয়ী। বিজয় হয় সত্যেরই। আল্লাহ তার ধৈর্যশীল বান্দাদেরই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বিজয় ও প্রতিষ্ঠার।
আমরা দুআ করি, ফিলিস্তিনিদের পরোলোক ও অন্তরীন পরিবারগুলোকে আল্লাহ যেন রহম করেন। তাদের স্ত্রীদের মায়েদের মেয়েদের বোনদের ইজ্জত-আবরু, সম্মান ও সম্ভ্রমের রক্ষণাবেক্ষণ করেন। ধৈর্য ও অবিচলতা দান করেন। তারা অসহনীয় কষ্ট, বিরহ, দহন সহ্য করে চলেছেন অনেকটা কাল। আমরা আশা করি, আল্লাহ আমাদেরকে আমাদের ধৈর্যের বিনিময় ও প্রতিদান দান করবেন। ঈমান ও বিশ্বাসের মজবুতি নসীব করবেন। শেষ অবধি তাঁর ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকার তওফিক দান করবেন।
আমরা আমাদের পবিত্র ভূমির সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে গিয়ে ধ্বংসযজ্ঞের শিকার, ভূমি হরণের শিকার, অসংখ্য নির্যাতনের শিকার। আমাদের দুধের শিশুদের, অল্পবয়সীদের গুলি করে, পুড়িয়ে মারতে ওদের বাধে না। রাতের আঁধারে আমাদের নারীদের গগনবিদারি আর্তচিৎকার আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে। কিন্তু কোনো সাড়া আসে না। সাহায্য আসে না। এতিমেরা কেঁদে বুক ভাসায়। হন্য হয়ে খুঁজে ফেরে মাকে, বাবাকে। কিন্তু কোথাও কোনো সাড়া নেই। কোথাও কোনো শব্দ নেই। আমাদের পবিত্র ভূমি বিরান হয়ে চলেছে। গাছপালা, নদীনালা, পশুপাখি ওদের দৌরাত্ম্য থেকে মুক্ত নয়। আমাদের মাদরাসা, কলেজ, হাসপাতাল, ব্যাংক, শিল্পকারখানা ধ্বংস হয়েছে। বিপদগ্রস্তদের দিকে যারা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়, আমাদের প্রতি তাদের সাহায্যের হাত সংকুচিত। সারা পৃথিবীর—পুরো মুসলিম উম্মাহর—সামনে তারা আমাদের শিশুদের স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করছে, আমাদের হৃদয়কে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে। আমাদের কবিরা শোকগাথা রচনা করে। কোমলহৃদয়রা অশ্রু বিসর্জন দেয়। অত্যাচারিত মুসলিম জাতি চেয়ে থাকে আরব বিশ্বের প্রতি। ইসলামী বিশ্বের প্রতি। কিংবা কোনো মুসলিম রাষ্ট্রের প্রতি। কিন্তু কোনো সাড়া নেই। আমি চিৎকার করে ডাক দিলাম। যদি কোনো জীবন্ত মানুষ পাই। কিন্তু আছে কি কোনো জীবন্ত মানুষ? পাবো কি কোনো প্রাণের সাড়া? কবি উমর আবু রিশার কথা মনে পড়ছে,
(অর্থ- আমার জাতি, কি তোমার সম্মান আজকের মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা হাজারও জাতির মাঝে? আমি তোমাকে চেয়ে চেয়ে দেখি, আর আমার দৃষ্টি লজ্জায় অবনত। হায় কত মুতাসিম বিদায় নিল! কত আবাল বনিতার আর্তচিৎকার আকাশ বাতাস ভারি করল! কিন্তু তুমি শুনলে না! হায়, তোমার শাণিত কলম, অপ্রতিরোধ্য তরবারি কে রুখে দিল! মুতাসিম, তোমার আর্তনাদ কোথায় বিদায় নিল!)
আমাদের শহীদদের প্রতি আসমান জমিন অশ্রুপাত করে। টিলা উপকূল কেঁদে বুক ভাসায়। অত্যাচারীদের বন্দুকের গুলি আমাদের শহীদদের দেহকে ক্ষতবিক্ষত করে। তাদের শরীরের মাংসপিণ্ডগুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে পাথরে ককড়ে ছিটকে পড়ে। তাদের শোণিতধারায় রচিত হয় জলপ্রপাত। রক্তের নদীতে পবিত্র ভূমির পুণ্য মাটি হয় সিক্ত, তৃপ্ত। একবিংশ শতকের হত্যাকাণ্ডগুলোর সাক্ষী হয়ে থাকবে চিরকাল। দুঃখ, ক্ষোভ ফিলিস্তিনের আকাশ বাতাসকে ভারি করেছে। ফিলিস্তিনের মাটি ও মানুষ শোকের সাগরে মুহ্যমান। ফিলিস্তিনের প্রতিটি ধূলিকণায় প্রতিধ্বনিত হচ্ছে জিহাদের আহ্বান—ভেঙে দিতে ওদের বিষদাঁত, ফিরিয়ে দিতে ওদের কালো থাবা। এত অত্যাচার ও নির্যাতনের পরও ফিলিস্তিনিরা দমে নি। এরা দমে না। দমে না। যত কষ্টই দাও, যত অত্যাচারই কর, আমাদের ঈমান, আমাদের বিশ্বাস কেড়ে নিতে পারবে না। যত গুলি আছে, করো; যত বোমা আছে, মারো; সত্যের ওপর আমাদের অটলতা, সত্যের ওপর আমাদের অবিচলতা কমবে না। বাড়ছে; বাড়ছে।
আমরা জানি, সুবহে সাদিক হাসে শেষ হাসি; রাতের গভীরতাই দেয় দিনের আগমনী বার্তা। আমরা বিশ্বাস করি, এই অন্ধকার কাটবেই; এই অমানিশা দূর হবেই। ফিলিস্তিনিদের মায়েদের কান্নার অবসান হবেই। ফিলিস্তিনিদের মেয়েদের মুখে বিজয়ের হাসি ফুটবেই। অচিরেই আল্লাহ সাহায্য করবেন মর্দন মুজাহিদদের। বিজয়ী করবেন তাদেরকে সুস্পষ্ট বিজয়ে। নিশ্চয় আল্লাহ সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাবান। ফিলিস্তিন তার গুণী সন্তানদের হারিয়ে শোকাাহত। তারা অতি দৃঢ়ভাবে প্রাণ উৎসর্গ করেছেন আল্লাহর রাহে। বুকের তাজা রক্ত দিয়ে এক দিকে গেছেন ত্যাগ ও তিতিক্ষার চিত্র, লিখে দিে গেছেন জিহাদের আহ্বান, দেখিে দিে গেছেন বীরত্ব ও আত্মত্যাগের অপূর্ব নমুনা। তাদের এ আত্মত্যাগের কথা ইতিহাসে অম্লান হয়ে থাকবে চিরকাল। ঐ প্রজন্ম যোগাবে যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী। দুর্বার এই বীর লড়াকুদের বীরত্বগাথা স্মৃতিময় হয়ে থাকবে জাতির কাছে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম—কৃতজ্ঞতার সাথে, কৃতার্থতার সাথে। উড়ে এসে জুড়ে বসা বুনোদের অনধিকার অবরোধ, অহেতুক অনাগ্রিক বিরুদ্ধে—তাদের নির্যাতন, নিপীড়ন, নিষ্পেষণের বিরুদ্ধে— এদেশের মানুষ যে সংগ্রাম সাধনায় অবতীর্ণ হয়েছেন, তা অটল পর্বতের ন্যায় দুলর্ঙ্ঘ্য। তারা যে জিহাদি ঝাণ্ডা উত্তোলন করেছেন, তা কখনো অবদমিত হবে না, হবার নয়।
হে শহীদ-বন্দীর মা জননী, হে শহীদ-বন্দীর জীবনসঙ্গিনী, স্বয়ং আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের প্রতিদান দান করুন। তোমাদের সান্ত্বনা জানান কোন ভাষায়? পৃথিবীতে আছে কি কোনো ভাষা, যে ভাষায় তা সম্ভব? কিন্তু খাওলা, খানসা, সুমাইয়া, নাসিবা রাযিয়াল্লাহু আনহুমাদের গৌরবময় মহিমা আজও যদি পুনরাবৃত হতে পারে, সেই অনুপম কাহিনী আজও যদি মুসলিম ইতিহাসকে নতুন আবেগে আন্দোলিত করতে পারে, তবে তা—আল্লাহর কসম—তোমাদেরই মতো নারীদের কল্যাণে।
টিকাঃ
১. ইবনে মাজাহ, তিরমিযী।
২. সহীহ বুখারী ও মুসলিম।
৩. সালাহুল উম্মাহ কী উসুলুল হিম্মাহ ৫/১৬৭।
৪. আল ইসাবাহ ৮/২৮৫।
৫. আইয়ামুম মিন হায়াতি ৪৭।
৬. আল আদাওয়াতুল মুসলিমাত : ২১০।
৭. মাওয়াক্বিফ লিসাইয়াযুন মুশাক্বিকুন : ৮৩-৮৫।
প্রিয় বোন, জেনে রাখুন, ধৈর্য হলো আল্লাহর দাসত্বের বিভিন্ন পর্যায়ের একটি। কুরআনে কারীমে অসংখ্য আয়াতে ধৈর্যের কথা এসেছে। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ
অর্থ : হে ওই সমস্ত লোকেরা, যারা ঈমান এনেছ, তোমরা সবর ও সালাতের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন। — সূরা বাকারা : ১৫৩
তিনি আরও ইরশাদ করেছেন,
وَاصْبِرْ نَفْسَكَ مَعَ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُم بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ وَلَا تَعْدُ عَيْنَاكَ عَنْهُمْ تُرِيدُ زِينَةَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَلَا تُطِعْ مَنْ أَغْفَلْنَا قَلْبَهُ عَن ذِكْرِنَا وَاتَّبَعَ هَوَهُ وَكَانَ أَمْرُهُ فُرُطًا
অর্থ : সকাল সন্ধ্যা যারা সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে তাদের প্রতিপালককে ডাকে, তুমি তাদের সাথে ধৈর্যধারণ করো। পার্থিব জীবনের চাকচিক্যের মোহে তোমার দৃষ্টি যেন তাদের থেকে সরে না যায়। আমি যার হৃদয়কে আমার স্মরণ থেকে উদাসীন রেখেছি, যে তার প্রবৃত্তির অনুসরণ করেছে, যার বিষয়টি সুস্পষ্ট সীমালঙ্ঘন তুমি তার আনুগত্য করো না। — সূরা কাহফ : ২৮
তিনি আরও ইরশাদ করেছেন,
قُلْ يَاعِبَادِ الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا رَبَّكُمْ لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا فِي هَذِهِ الدُّنْيَا حَسَنَةٌ وَ أَرْضُ اللَّهِ وَاسِعَةٌ إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُم بِغَيْرِ حِسَابٍ
অর্থ : তুমি বলে দাও, হে আমার ওই সমস্ত বান্দারা, যারা ঈমান এনেছ, তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো; এই দুনিয়ায় যারা কল্যাণ করবে, তাদের জন্য থাকবে মহাকল্যাণ। আল্লাহর জমিন তো অনেক প্রশস্ত। নিশ্চয় ধৈর্যশীলদের দেওয়া হবে অপরিমিত পুরস্কার। — সূরা যুমার : ১০
যাই হোক, ধৈর্য কয়েক প্রকার :
১. আল্লাহর আনুগত্যে ধৈর্যধারণ : অর্থাৎ ধৈর্যের সাথে আল্লাহর হুকুম আহকাম মেনে চলা।
২. বিপদাপদে ধৈর্যধারণ : অর্থাৎ বিপদাপদ ও আল্লাহর রাহে জুলুম অত্যাচারের মুখেও আপন ধর্ম ও বিশ্বাসের ওপর অবিচল থাকা।
৩. আত্মনিয়ন্ত্রণে ধৈর্যধারণ : অর্থাৎ আল্লাহর নাফরমানি ও গোনাহে লিপ্ত হওয়া থেকে আত্মনিয়ন্ত্রণ করা।
৪. দুঃখ কষ্টে ধৈর্যধারণ : জীবনে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানামুখী বিপদাপদ, কষ্ট-লেশ, জুলুম-অত্যাচারে ধৈর্যধারণ ও পূর্ণ প্রত্যয়ের সাথে যে কোনো পরিস্থিতির মোকাবিলা করা।
ধৈর্য প্রকারভেদসহ দাওয়াহ দুনিয়ার সফলতার পূর্বশর্ত। আপনার চারপাশের প্রত্যেকেই খুশিমনে আপনার কথা মেনে নেবে, আপনার কাজে সাড়া দেবে—এমনটা আশা করা ঠিক নয়। এমনিতেই মানুষকে নিয়ে কোনো কাজ করা কঠিন। দাওয়াতি কাজ করা আরও কঠিন। আর মানুষের জীবনধারায় পরিবর্তন আনা যারপরনাই কঠিন। এজন্য প্রয়োজন যোগ্য নেতৃত্ব। প্রয়োজন বিনয়, নম্র ও সহনশীল আচরণ। দাওয়াতি কাজ হলো নিরাশ না হওয়া। অবিরাম দাওয়াতও চালিয়ে যাওয়া। যতক্ষণ একটিও কান আছে শোনার মতো। একটিও হৃদয় আছে ভাবার মতো। একটিও আশা আছে সাড়া পাওয়ার মতো।
আবু উমাইয়া শাবানী বলেন, আমি আবু সালাবা খাশানীর কাছে গেলাম, বললাম, এই আয়াতটি সম্পর্কে আপনার কী মত? তিনি বললেন, কোন আয়াত? বললাম,
يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا عَلَيْكُمْ أَنفُسَكُمْ لَا يَضُرُّكُم مَّن ضَلَّ إِذَا اهْتَدَيْتُمْ
অর্থ : হে ঈমানদারগণ, তোমরা নিজেদের রক্ষা করো। তোমরা নিজেরা যদি হেদায়েতপ্রাপ্ত হতে যাও, তা হলে যে গোমরা হলো সে তোমাদের ক্ষতি করতে পারবে না। — সূরা মাইদাহ : ১০৫
তিনি বললেন, আমি এ বিষয়ে সর্বাধিক জ্ঞাত ব্যক্তিককেই জিজ্ঞেস করেছিলাম, আমি স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেই জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি উত্তরে বলেছিলেন,
বাইল ইতিমিরু বিল মারূফি ওয়ান্তাহু আনিল মুনকারি হাত্তা ইযা রয়াইতা শুহহাম মুতআও ওয়া হাওয়াম মুত্তাবাআও ওয়া দুনিয়াম মুসারাতাও ওয়া ইজবা কুল্লি যি রয়িম বি রয়িহি ওয়া রয়াইতা আমরণ লা ইয়াদানি লাকা ফীহি ফায়ালাইকা বিখুয়াইসাতিন নাফসিক ইন্নাহু মিন অরাইকুম আইয়ামাস সবরি আস সবরু ফীহিন্না মিসলু কাবযি আলাল জামরি লিলফায়িলি ফীহিন্না মিসলু আজরি খামসীনা রযুলান মিসলা আমালিহি
অর্থ : বরং তোমরা একে অপরকে সৎকাজের আদেশ করতে থাকো। অসৎ কাজ থেকে বাধা প্রদান করতে থাকো। অবশেষে যখন স্বার্থের আনুগত্য, প্রবৃত্তির অনুসরণ, পার্থিবতার ব্যাপক প্রাধান্য এবং নিজ নিজ মতে প্রত্যেকের আত্মতুষ্টির ব্যাপক চর্চা হতে দেখবে, এবং এমন কিছু হতে দেখবে যাতে তোমার করার কিছু নেই, তখনই শুধু নিজের কথা ভেবো। নিশ্চয় তোমাদের পশ্চাতে আসছে ধৈর্যের দিন। ওই দিনগুলোতে ধৈর্য ধারণ করা—হাতে জ্বলন্ত অঙ্গার চেপে ধরার মতো কঠিন হবে। তখন একজন আমেল পঞ্চাশজন আমেলের বিনিময় লাভ করবে।
অন্য একটি বর্ণনায় আছে,
ক্বীলা ইয়া রাসূলাল্লাহ আজরু খামসীনা হীনান মিন্না আও মিনহুম? ক্বলা বাল আজরু খামসীনা মিনকুম
অর্থ : বলা হলো, হে আল্লাহর রাসূল, আমাদের মধ্য থেকে পঞ্চাশজন, নাকি তাদের মধ্য থেকে পঞ্চাশজন? তিনি বললেন, বরং তোমাদের মধ্য থেকেই পঞ্চাশজন।
অন্য একটি বর্ণনায় বিনিময়ের আধিক্যের কারণ দর্শানো হয়েছে এভাবে,
ইন্নাকুম তাজিদুনা আলাল খাইরি আওয়ানান ওয়ালা ইয়াজিদুনা আলাল খাইরি আওয়ানান
অর্থ : তোমরা কল্যাণে সহযোগী পাচ্ছ, কিন্তু তারা কল্যাণে সহযোগী পাবে না। ১
আমাদের প্রিয় নবীজীর মাঝে আমাদের জন্য আছে উত্তম আদর্শ। তিনি কত বিপদের মুখে পতিত হয়েছেন! কত উপহাসের সম্মুখীন হয়েছেন! কত গালমন্দ সহ্য করেছেন! এমনকি, মহান আল্লাহ পাহাড়ের ফেরেশতাকে পাঠালেন এই মর্মে,
ইন শিতা আবতাকতু আলাইহিমুল আখশাবাইনি ফ ইয়াকুলু লা ইন্নি আসআলুল্লাহা তায়ালা আই ইউখরিজা মিন আসলাবিহিম মাই ইয়াবুদুল্লাহা ওয়ালা ইউশরিকু বিহি শাইয়া
অর্থ : হে নবী, আপনি যদি চান, তা হলে তাদের ওপর দুই পাহাড় চাপিয়ে দেব। কিন্তু তিনি বললেন, না। আমি বরং আল্লাহর কাছে এইটা চাই যে, তিনি এদের ঊরসদেশ থেকে এমন কিছু মানুষ যারা আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কোনো কিছুকে শরীক করবে না। ২
হলোও তাই। আল্লাহ ওয়ালিদ বিন মুগীরা ও আবু জেহেলের মতো কাফের ও মোশরেকদের ঊরসে জন্ম দিলেন খালিদ বিন ওয়ালিদের মতো দিগ্বিজয়ী বীর ও ইকরিমার মতো মুসলিম সাধককে। দাওয়াতে পর্যায়ক্রমতা আছে। আগে মনকে প্রস্তুত করতে হয়। তারপর নতুন কিছু তুলে ধরা। অপ্রস্তুত অবস্থায় কারও কাছে কোনো কিছু গৃহীত হওয়া অনেকটা আকস্মিকতা। তাই দাওয়াতি কাজে পর্যায়ক্রমতা বিবেচনায় রাখা আবশ্যক।
প্রথম ধাপে দাওয়াত-পরিচিতি। অর্থাৎ দাওয়াতের বিষয়, অঙ্গন, পরিধি ইত্যাদি ঠিক করা। দ্বিতীয় শ্রেণি ও পেশার মানুষের কাছে দাওয়াত পৌঁছানোর ক্ষেত্র নির্ধারণ করা। দ্বিতীয় পর্যায়ে, দাওয়াতি কাজে সহযোগী নির্বাচন করা। এমন কিছু মানুষ—যারা আপনার চিন্তাকে গ্রহণ করবে, জীবন-সফরের এই মহতী উদ্যোগে আপনার সঙ্গী হবে। তৃতীয় পর্যায়ে চিন্তা-চেতনার বাস্তবায়নে মনে রাখবেন, এখানে প্রধান ও মৌলিক প্রয়োজন তা হলো এমন আলোকিত হৃদয়—যাতে ঈমান আছে, ইখলাস আছে। এভাবে ধাপে ধাপে সফলতার সাথে এগোনোর পারলে আশা করা যায় আমাদের দাওয়াতি কাজের একটি শক্তিশালী, সুসংহত, কার্যকর ভিত্তি স্থাপিত হবে। আমাদের শ্রম সার্থকতাও পাবে, ফলপ্রসূও হবে। জীবনধারায় আমূল পরিবর্তন আনাও সম্ভব হবে। অচিরেই মানবজীবন পরিচালিত হবে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'র পতাকা তলে।
আমরা যখন কোনো নারীকে দাওয়াত দেব, তখন সে হয়তো খুব অনায়াসে সালাত আদায় শুরু করবে। কিন্তু পর্দার বেলায় অপারগতা প্রকাশ করবে। হয়তো নিজের প্রবৃত্তির কাছে পরাজিত হয়ে, কিংবা অন্য কোনো প্রতিকূলতার কারণে। তখন হতাশ হলে চলবে না। তার সাথে লেগে থাকতে হবে। দীনের দাওয়াতও দিতে থাকতে হবে। তাকে উপলব্ধি করাতে হবে যে, অচিরেই কাল কিয়ামতে তাকে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে; সেখানে মা বাবা ভাই বোন স্বামী সন্তান কেউ থাকবে না; সেখানে আল্লাহ ছোট বড় সবকিছুর হিসেব নেবেন।
আশা করা যায়, ধীরে ধীরে আমরা আমাদের এই বোনটিকে বর্বরতার পঙ্কিল থেকে মুক্ত করতে পারবো। পাশ্চাত্যপ্রিয়তা ও অন্ধ অনুকরণের বেড়াজাল থেকে বের করে আনতে পারবো। বিশেষ করে, আধুনিকতার নামে যে অপচর্চা শুরু হয়েছে, নারীরা আল্লাহবিস্মৃত হয়ে যে মরণফাঁদে পা দিতে আরম্ভ করেছে, হয়তো তা থেকে তাকে বাঁচাতে পারবো। আমাদের আন্তরিকতা ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টাকে কবুল করে হয়তো আল্লাহ তার মাঝে ধার্মিকতা সৃষ্টি করবেন। এই বোনটির মাঝেই, অচিরেই আমরা একটি সত্যিকার ধার্মিক নারীকে দেখতে পাবো। যিনি মনে প্রাণে ইসলাম ও মুসলমানকে ভালোবাসবেন। নিঃসন্দেহে এটা আল্লাহর কাছে কঠিন কিছু নয়।
প্রিয় বোন, এ পথে চলতে হয়তো অনেক বাধা আসবে। হয়তো অনেক কঠিন কঠিন পরীক্ষারও সম্মুখীন হতে হবে। নিশ্চয় এ পরীক্ষা অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু এটা যেমন সত্য, এর চেয়েও বেশি সত্য এই যে, এর বিনিময় ও প্রতিদান আল্লাহর কাছে অনেক বড়, অনেক মহৎ।
হযরত সুমাইয়া রাযি.-কেই দেখুন। তিনি ছিলেন ইসলামের পথে শাহাদতবরণকারী প্রথম নারী। কাফেররা তাকে, তার ছেলে ও স্বামীকে ধরে নিয়ে গেল। মরুভূমির উত্তপ্ত বালুতে নিয়ে গিয়ে পুরো পরিবারকে কী নির্মম অত্যাচার করল। কিন্তু হযরত সুমাইয়া রাযি. ধৈর্য ও অবিচলতার কী জীবন্ত উদাহরণই না রেখে গেলেন যুগ যুগের মুসলিম নারী সমাজের জন্য। তিনি আপন ছেলেকে স্বামীকে উৎসর্গ করলেন আল্লাহর রাহে, প্রাণ সঁপে দিলেন আপন প্রভুর সমীপে; কিন্তু নিজের ঈমানকে কাফের বেইমানের সামনে বিসর্জন দিতে রাজি হলেন না। ৩
এই যে উম্মে শারিক গাযিয়া বিনতে জাবের বিন হাকিম। ইসলাম গ্রহণ করলেন। কুরাইশ নারীদের কাছে গিয়ে গোপনে ইসলামের দাওয়াত দিতে লাগলেন। একদিন কুরাইশ কাফেররা ধরে ফেলল। তারা কঠিন কঠিন বাক্য প্রয়োগ করে ধমক দিয়ে বলল, তোমার গোত্রের লোকেরা না থাকলে আজ তোমার সাথে যা করার করতাম। কিন্তু আজকের মতো তোমাকে সম্মানে ফিরিয়ে দিচ্ছি। উম্মে শারিক বলেন, আমার কওমের লোকেরা আমাকে একটি উটের পিঠে ফেলে দিল। নিচে কিছু দিল না। এভাবে দিন দিন এক মনজিল অতিক্রম করতাম। এ দীর্ঘ সফরে তারা আমাকে না কিছু খেতে দিত, না কিছু পান করতে দিত। প্রত্যেক মনজিলে আমাকে রোদ্রে ফেলে রাখত। নিজেরা ছায়ায় বিশ্রাম করত। বিশ্রাম করে খেয়ে পান করে তৃপ্ত হয়ে আবার যাত্রা করত। এক দিন এভাবেই রোদ্রে পড়ে ছিলাম। আমার প্রাণপ্রায় বের হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। হঠাৎ মুখের ওপর শীতল কিছু অনুভব করলাম। মনে হলো, পানির বালতি ধরা হয়েছে। আমি একটু পান করলাম। বালতিটি সরিয়ে নেওয়া হলো। আবার ধরা হলো। আমি আবার পান করলাম। এভাবে কয়েক দফায় পান করে আমি পরিপূর্ণরূপে তৃপ্ত হলাম। এবার বালতিটি শক্ত করে ধরে সবগুলো পানি গায়ের ওপর ঢেলে নিলাম। আমার শরীর কাপড় ভিজা গেল। আমি তাজা হয়ে গেলাম। ইতোমধ্যে সবাই জেগে গেল। তারা পানির ছাপ দেখতে পেল। আমিও একদম তাজা হয়ে আছি। তারা চেঁচামেচি শুরু করে দিল। বলল, তুমি নিশ্চয় রশির বাঁধন খুলে আমাদের পানি খেয়ে ফেলেছ। আমি বললাম, আল্লাহর কসম, আমি এমন কিছু করিনি। আসলে এরকম এরকম ঘটেছিল। তারা বলল, যদি তুমি সত্য বল থাক, তা হলে তো তোমার ধর্ম আমাদের ধর্মের চেয়ে উত্তম। এরপর তারা পানপাত্রগুলো দেখতে লাগল। তারা হতবাক হয়ে দেখল যে, তাদের পানপাত্র ঠিকই আছে। তারা আর বিলম্ব করল না। সকলে মুসলমান হয়ে গেল। ৪
চিন্তা করুন, একজন উম্মে শারিকের ধৈর্যের বদৌলতে একটি সম্প্রদায় ইসলাম গ্রহণ করল। আমাদের জন্য তার মাঝে আছে সুন্দর আদর্শ। এই বিংশ শতাব্দীতেও পৃথিবীর বুকে নারী সাহাবীদের ঈমানদীপ্ত সংগ্রামী জীবনের জীবন্ত উদাহরণ নেই তা নয়। যায়নাব আল গাযালি। ইসলামী সংগ্রাম সাধনার এক জীবন্ত কিংবদন্তী। তিনি কল্যাণের সুবাস ছড়াচ্ছেন। পথনির্দেশের আলো ছড়াচ্ছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, অচিরেই আল্লাহ মুমিনদের সাহায্য করবেন। শত্রুরা তার বাড়িরঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে। তাকে কারাবন্দি করে রেখেছে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস। তবু তিনি ঈমান ও বিশ্বাসের পথ থেকে বিন্দুমাত্র নড়েননি। ইস্পাতকঠিন মনোবল, সীমাহীন ধৈর্য, পর্বতপ্রমাণ অবিচলতায় তিনি এখনো টিকে আছেন দাওয়াতের ময়দানে। কারাগারের বিভীষিকাময় দিনগুলোর বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, “তারা ঘর খুলে দিল। ঘর ভর্তি কুকুর। আমার বুক কেঁপে উঠল। আমি চোখ বন্ধ করলাম। লোহার দরজা বন্ধ করে দেওয়ার বিকট আওয়াজ হলো। মুহূর্তের মধ্যেই চতুর্দিক থেকে আমার শরীরের সাথে কুকুরগুলো যেন সেঁটে গেল। ওদের ঘেউ ঘেউ শব্দ ছি ভয়ানক। কুকুরগুলো আমার সারা শরীরে কামড়াতে শুরু করেছে। আমি আল্লাহ জপে লাগলাম। হতভম্ব হয়ে শুধু বলে চলেছিলাম, اللهم اشغلني بك عمن سواك، اشغلني بك في حضرتك واصبغني بالشهادة فيك والحب فيك والرضى بك والمودة لك وثبت الأقدাম يا الله أقدام الموحدين (অর্থ : আল্লাহ, আমাকে তোমাতে মগ্ন রাখো। আমার আল্লাহ, আমাকে তোমাতে ব্যস্ত রাখো। হে চির একক, হে চির নিঃস্বাপেক্ষ, তোমার অনুভূতিতে আমাকে বিভোর করে দাও। তোমার উপলব্ধিতে আমাকে ডুবিয়ে রাখো। মাবুদ, তোমারই তরে শাহাদত নসীব করো। তোমাতে প্রেম দান করো। তোমার সন্তুষ্টি জোটাও। তোমার ভালোবাসা দান করো। পদ অবিচল রাখো, আল্লাহ, তোমারও একত্বে বিশ্বাসীদের পদ...) করুক ছটা কেটে গেল। ভেবেছি, খ্যাপা কুকুরেরা আমার সাদা কাপড়কে রক্তে লাল করে ফেলেছে... দরজা খোলা হলো। আলোর আভাস পেয়ে আমি আমার কাপড়ের দিকে লক্ষ করলাম। কিন্তু, কী আশ্চর্য! কাপড় দেখতে তো কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। কারারক্ষীরা যারপরনাই চমকে গেল। কুকুরগুলো আমার কাপড় ছিঁড়তে পারেনি।” ৫
দিন যায়। বছর যায়। বাইরের আলো বাতাসে দেখেন না। জেলের সেই অন্ধকারের কাঠেই সময়। সঙ্গী কিছু নয়। শুধু আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস। সময়ের পরিবর্তন হলো। সমাজের পরিবর্তন হলো। তিনি ছাড়া পেলেন। বিশ্বাস ও প্রত্যয় হলো আরও সুদৃঢ়। তিনি এখনো পথ চলছেন। আল্লাহর একত্বের উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছেন। মানুষ তার ডাকে সাড়া দিচ্ছে। স্বেচ্ছাচারী সম্প্রদায়ের বিভেদাদার ও অগ্নি-উপাসকদের থেমে নেই। কিন্তু রাখে আল্লাহ মারে কে?
শায়খ মুরসিদ হাসান হুযাইবির স্ত্রী জেলে স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে যান। সহিষ্ণু হৃদয় জানে না ভয়, মানে না বাধা। থেকে থেকে কিছু খাবার, কিছু জামাকাপড় নিয়ে যান। কারা-কর্তৃপক্ষর লোকেরা সার্চ করতে আসে। একদিন এক যুবক অতি উৎসাহে সার্চ করছিল। মনে হচ্ছিল, সে বিশাল কোনো কুকর্ম সাধন করছে। তিনি অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে বললেন, “বেটা, এটা তোমার জায়গা নয়। এটা তোমার কাগজও নয়। তোমার জায়গা ছিল রণাঙ্গন। তোমার কাজ ছিল শত্রুদের আক্রমণ থেকে মাতৃভূমিকে রক্ষা করতে। জন্মভূমির ওপর থেকে লাঞ্ছনাকে অপসারণ করতে। দিনদুপুরে গিয়ে এক মায়ের আদরের আলু-পটোল আর রুটি-পরাটা সার্চ করে কী এমন মহৎ কর্ম করছ, শুনি!” যুবকটি হতচকিত হলো। অনায়াসেই নিজেকে সামলে নিল। অপরাধীর তিলক তাকেও ব্যথিত করলো। লজ্জিত চোখে তাকাল। বলল, ‘জনাব, আপনি যথার্থ বলেছেন।” ৬
বানান তান্তাবী। জার্মানির স্বামী সাথে দাওয়াতের কাজ করতেন। সেখানে একটি নারীসংগঠনও তৈরি করেছিলেন। তার দাওয়াতী তৎপরতায় অনেক জার্মানি নারী তওবা করে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। স্বেচ্ছাচারী শাসক তাকে ও তার স্বামীকে নির্বাসিত করেছিল। এই দম্পতি সত্য বলার সাহস সর্বস্ব ত্যাগ করে দিয়েছিল। তাই শুধু নির্বাসনকে যথেষ্ট মনে করেনি। সেই স্বেচ্ছাচারীরা তাদের তাড়া করে বেড়িয়েছে এখান থেকে সেখানে, এদেশ থেকে সেদেশে। সর্বশেষ তারা আশ্রয় নিয়েছিলেন জার্মানির আখেন শহরে। স্বেচ্ছাচারী ষড়যন্ত্রজাল সেখানেও পৌঁছে গিয়েছিল। সাড়ে তিন হাজার শরীরী এক মুসলিম পীর – ইসলাম আত্মা থেকে নিষ্কৃতি না পাওয়া পর্যন্ত যেন তাদের ঘুমই হারাম। এক প্রতিবেশিনীর কপালে অস্ত্র ঠেকিয়ে শয়তানের দোসররা ইসলামের ঘরে পৌঁছে গেল। দরজায় কড়া নাড়ল। বানান তান্তাবী দরজা খুললেন। স্বামী ঘরে ছিলেন না। তিনি হাসপাতালে। অপ্রস্তুত ছিলেন। কোনো কথা নেই। বানানকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ল। ঘাতকদের পাঁচটি গুলি নিরীহ মুসলিম দায়িকার মস্তিষ্ক ভেদ করে দিল। বানান মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। শয়তানরা তার নিথর দেহটি ফেলে রেখে গেল। তিনি প্রাণ ত্যাগ করলেন দেশ থেকে দূরে, প্রিয়জন থেকে দূরে, আপনজন থেকে দূরে। বানান দুনিয়া থেকে চলে গেলেন। কিন্তু তার অমর উক্তি আজও দুনিয়াতে কোটি কোটি মুসলিম নারীর প্রেরণা হয়ে আছে, “দুঃখ করবেন না, হে ইসাম। আমাদের কথা ভেবে চিন্তিত হবেন না। আল্লাহর পথে অবিচল থাকুন। আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রাখুন। দ্বীনকে বিজয়ী করতে আপনার সঠিক অবস্থান এবং আল্লাহর রাস্তায় একনিষ্ঠভাবে জিহাদ চালিয়ে যাওয়া ই আমাদের কাম্য। আমরা আপনার কাছে আর কিছুই চাই না।” ৭
আমার ফিলিস্তিনী বোনেরা, তোমরা ধৈর্য হারিয়েো না। শত প্রতিকূলতায়, শত ঝড়ঝঞ্ঝায় এই সব দাইয়া, মুজাহিদা, সাহেবা বোনদের মাঝে আছে আমাদের আদর্শ, আছে সান্ত্বনা। আমরা প্রতিনিয়ত পরীক্ষায় নিপতিত। আমাদের পবিত্র ভূমিতে কোনো প্রেতাত্মা আশ্রয় নিতে পারে না। আমাদের পুণ্যভূমিতে কোনো মিথ্যার উপস্থাপন ঘটাতে পারে না। চিরন্তন এ লড়াই চলবেই। সত্যই হবে বিজয়ী। বিজয় হয় সত্যেরই। আল্লাহ তার ধৈর্যশীল বান্দাদেরই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বিজয় ও প্রতিষ্ঠার।
আমরা দুআ করি, ফিলিস্তিনিদের পরোলোক ও অন্তরীন পরিবারগুলোকে আল্লাহ যেন রহম করেন। তাদের স্ত্রীদের মায়েদের মেয়েদের বোনদের ইজ্জত-আবরু, সম্মান ও সম্ভ্রমের রক্ষণাবেক্ষণ করেন। ধৈর্য ও অবিচলতা দান করেন। তারা অসহনীয় কষ্ট, বিরহ, দহন সহ্য করে চলেছেন অনেকটা কাল। আমরা আশা করি, আল্লাহ আমাদেরকে আমাদের ধৈর্যের বিনিময় ও প্রতিদান দান করবেন। ঈমান ও বিশ্বাসের মজবুতি নসীব করবেন। শেষ অবধি তাঁর ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকার তওফিক দান করবেন।
আমরা আমাদের পবিত্র ভূমির সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে গিয়ে ধ্বংসযজ্ঞের শিকার, ভূমি হরণের শিকার, অসংখ্য নির্যাতনের শিকার। আমাদের দুধের শিশুদের, অল্পবয়সীদের গুলি করে, পুড়িয়ে মারতে ওদের বাধে না। রাতের আঁধারে আমাদের নারীদের গগনবিদারি আর্তচিৎকার আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে। কিন্তু কোনো সাড়া আসে না। সাহায্য আসে না। এতিমেরা কেঁদে বুক ভাসায়। হন্য হয়ে খুঁজে ফেরে মাকে, বাবাকে। কিন্তু কোথাও কোনো সাড়া নেই। কোথাও কোনো শব্দ নেই। আমাদের পবিত্র ভূমি বিরান হয়ে চলেছে। গাছপালা, নদীনালা, পশুপাখি ওদের দৌরাত্ম্য থেকে মুক্ত নয়। আমাদের মাদরাসা, কলেজ, হাসপাতাল, ব্যাংক, শিল্পকারখানা ধ্বংস হয়েছে। বিপদগ্রস্তদের দিকে যারা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়, আমাদের প্রতি তাদের সাহায্যের হাত সংকুচিত। সারা পৃথিবীর—পুরো মুসলিম উম্মাহর—সামনে তারা আমাদের শিশুদের স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করছে, আমাদের হৃদয়কে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে। আমাদের কবিরা শোকগাথা রচনা করে। কোমলহৃদয়রা অশ্রু বিসর্জন দেয়। অত্যাচারিত মুসলিম জাতি চেয়ে থাকে আরব বিশ্বের প্রতি। ইসলামী বিশ্বের প্রতি। কিংবা কোনো মুসলিম রাষ্ট্রের প্রতি। কিন্তু কোনো সাড়া নেই। আমি চিৎকার করে ডাক দিলাম। যদি কোনো জীবন্ত মানুষ পাই। কিন্তু আছে কি কোনো জীবন্ত মানুষ? পাবো কি কোনো প্রাণের সাড়া? কবি উমর আবু রিশার কথা মনে পড়ছে,
(অর্থ- আমার জাতি, কি তোমার সম্মান আজকের মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা হাজারও জাতির মাঝে? আমি তোমাকে চেয়ে চেয়ে দেখি, আর আমার দৃষ্টি লজ্জায় অবনত। হায় কত মুতাসিম বিদায় নিল! কত আবাল বনিতার আর্তচিৎকার আকাশ বাতাস ভারি করল! কিন্তু তুমি শুনলে না! হায়, তোমার শাণিত কলম, অপ্রতিরোধ্য তরবারি কে রুখে দিল! মুতাসিম, তোমার আর্তনাদ কোথায় বিদায় নিল!)
আমাদের শহীদদের প্রতি আসমান জমিন অশ্রুপাত করে। টিলা উপকূল কেঁদে বুক ভাসায়। অত্যাচারীদের বন্দুকের গুলি আমাদের শহীদদের দেহকে ক্ষতবিক্ষত করে। তাদের শরীরের মাংসপিণ্ডগুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে পাথরে ককড়ে ছিটকে পড়ে। তাদের শোণিতধারায় রচিত হয় জলপ্রপাত। রক্তের নদীতে পবিত্র ভূমির পুণ্য মাটি হয় সিক্ত, তৃপ্ত। একবিংশ শতকের হত্যাকাণ্ডগুলোর সাক্ষী হয়ে থাকবে চিরকাল। দুঃখ, ক্ষোভ ফিলিস্তিনের আকাশ বাতাসকে ভারি করেছে। ফিলিস্তিনের মাটি ও মানুষ শোকের সাগরে মুহ্যমান। ফিলিস্তিনের প্রতিটি ধূলিকণায় প্রতিধ্বনিত হচ্ছে জিহাদের আহ্বান—ভেঙে দিতে ওদের বিষদাঁত, ফিরিয়ে দিতে ওদের কালো থাবা। এত অত্যাচার ও নির্যাতনের পরও ফিলিস্তিনিরা দমে নি। এরা দমে না। দমে না। যত কষ্টই দাও, যত অত্যাচারই কর, আমাদের ঈমান, আমাদের বিশ্বাস কেড়ে নিতে পারবে না। যত গুলি আছে, করো; যত বোমা আছে, মারো; সত্যের ওপর আমাদের অটলতা, সত্যের ওপর আমাদের অবিচলতা কমবে না। বাড়ছে; বাড়ছে।
আমরা জানি, সুবহে সাদিক হাসে শেষ হাসি; রাতের গভীরতাই দেয় দিনের আগমনী বার্তা। আমরা বিশ্বাস করি, এই অন্ধকার কাটবেই; এই অমানিশা দূর হবেই। ফিলিস্তিনিদের মায়েদের কান্নার অবসান হবেই। ফিলিস্তিনিদের মেয়েদের মুখে বিজয়ের হাসি ফুটবেই। অচিরেই আল্লাহ সাহায্য করবেন মর্দন মুজাহিদদের। বিজয়ী করবেন তাদেরকে সুস্পষ্ট বিজয়ে। নিশ্চয় আল্লাহ সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাবান। ফিলিস্তিন তার গুণী সন্তানদের হারিয়ে শোকাাহত। তারা অতি দৃঢ়ভাবে প্রাণ উৎসর্গ করেছেন আল্লাহর রাহে। বুকের তাজা রক্ত দিয়ে এক দিকে গেছেন ত্যাগ ও তিতিক্ষার চিত্র, লিখে দিে গেছেন জিহাদের আহ্বান, দেখিে দিে গেছেন বীরত্ব ও আত্মত্যাগের অপূর্ব নমুনা। তাদের এ আত্মত্যাগের কথা ইতিহাসে অম্লান হয়ে থাকবে চিরকাল। ঐ প্রজন্ম যোগাবে যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী। দুর্বার এই বীর লড়াকুদের বীরত্বগাথা স্মৃতিময় হয়ে থাকবে জাতির কাছে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম—কৃতজ্ঞতার সাথে, কৃতার্থতার সাথে। উড়ে এসে জুড়ে বসা বুনোদের অনধিকার অবরোধ, অহেতুক অনাগ্রিক বিরুদ্ধে—তাদের নির্যাতন, নিপীড়ন, নিষ্পেষণের বিরুদ্ধে— এদেশের মানুষ যে সংগ্রাম সাধনায় অবতীর্ণ হয়েছেন, তা অটল পর্বতের ন্যায় দুলর্ঙ্ঘ্য। তারা যে জিহাদি ঝাণ্ডা উত্তোলন করেছেন, তা কখনো অবদমিত হবে না, হবার নয়।
হে শহীদ-বন্দীর মা জননী, হে শহীদ-বন্দীর জীবনসঙ্গিনী, স্বয়ং আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের প্রতিদান দান করুন। তোমাদের সান্ত্বনা জানান কোন ভাষায়? পৃথিবীতে আছে কি কোনো ভাষা, যে ভাষায় তা সম্ভব? কিন্তু খাওলা, খানসা, সুমাইয়া, নাসিবা রাযিয়াল্লাহু আনহুমাদের গৌরবময় মহিমা আজও যদি পুনরাবৃত হতে পারে, সেই অনুপম কাহিনী আজও যদি মুসলিম ইতিহাসকে নতুন আবেগে আন্দোলিত করতে পারে, তবে তা—আল্লাহর কসম—তোমাদেরই মতো নারীদের কল্যাণে।
টিকাঃ
১. ইবনে মাজাহ, তিরমিযী।
২. সহীহ বুখারী ও মুসলিম।
৩. সালাহুল উম্মাহ কী উসুলুল হিম্মাহ ৫/১৬৭।
৪. আল ইসাবাহ ৮/২৮৫।
৫. আইয়ামুম মিন হায়াতি ৪৭।
৬. আল আদাওয়াতুল মুসলিমাত : ২১০।
৭. মাওয়াক্বিফ লিসাইয়াযুন মুশাক্বিকুন : ৮৩-৮৫।
প্রিয় বোন, জেনে রাখুন, ধৈর্য হলো আল্লাহর দাসত্বের বিভিন্ন পর্যায়ের একটি। কুরআনে কারীমে অসংখ্য আয়াতে ধৈর্যের কথা এসেছে। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ
অর্থ : হে ওই সমস্ত লোকেরা, যারা ঈমান এনেছ, তোমরা সবর ও সালাতের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন। — সূরা বাকারা : ১৫৩
তিনি আরও ইরশাদ করেছেন,
وَاصْبِرْ نَفْسَكَ مَعَ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُم بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ وَلَا تَعْدُ عَيْنَاكَ عَنْهُمْ تُرِيدُ زِينَةَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَلَا تُطِعْ مَنْ أَغْفَلْنَا قَلْبَهُ عَن ذِكْرِنَا وَاتَّبَعَ هَوَهُ وَكَانَ أَمْرُهُ فُرُطًا
অর্থ : সকাল সন্ধ্যা যারা সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে তাদের প্রতিপালককে ডাকে, তুমি তাদের সাথে ধৈর্যধারণ করো। পার্থিব জীবনের চাকচিক্যের মোহে তোমার দৃষ্টি যেন তাদের থেকে সরে না যায়। আমি যার হৃদয়কে আমার স্মরণ থেকে উদাসীন রেখেছি, যে তার প্রবৃত্তির অনুসরণ করেছে, যার বিষয়টি সুস্পষ্ট সীমালঙ্ঘন তুমি তার আনুগত্য করো না। — সূরা কাহফ : ২৮
তিনি আরও ইরশাদ করেছেন,
قُلْ يَاعِبَادِ الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا رَبَّكُمْ لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا فِي هَذِهِ الدُّنْيَا حَسَنَةٌ وَ أَرْضُ اللَّهِ وَاسِعَةٌ إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُم بِغَيْرِ حِسَابٍ
অর্থ : তুমি বলে দাও, হে আমার ওই সমস্ত বান্দারা, যারা ঈমান এনেছ, তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো; এই দুনিয়ায় যারা কল্যাণ করবে, তাদের জন্য থাকবে মহাকল্যাণ। আল্লাহর জমিন তো অনেক প্রশস্ত। নিশ্চয় ধৈর্যশীলদের দেওয়া হবে অপরিমিত পুরস্কার। — সূরা যুমার : ১০
যাই হোক, ধৈর্য কয়েক প্রকার :
১. আল্লাহর আনুগত্যে ধৈর্যধারণ : অর্থাৎ ধৈর্যের সাথে আল্লাহর হুকুম আহকাম মেনে চলা।
২. বিপদাপদে ধৈর্যধারণ : অর্থাৎ বিপদাপদ ও আল্লাহর রাহে জুলুম অত্যাচারের মুখেও আপন ধর্ম ও বিশ্বাসের ওপর অবিচল থাকা।
৩. আত্মনিয়ন্ত্রণে ধৈর্যধারণ : অর্থাৎ আল্লাহর নাফরমানি ও গোনাহে লিপ্ত হওয়া থেকে আত্মনিয়ন্ত্রণ করা।
৪. দুঃখ কষ্টে ধৈর্যধারণ : জীবনে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানামুখী বিপদাপদ, কষ্ট-লেশ, জুলুম-অত্যাচারে ধৈর্যধারণ ও পূর্ণ প্রত্যয়ের সাথে যে কোনো পরিস্থিতির মোকাবিলা করা।
ধৈর্য প্রকারভেদসহ দাওয়াহ দুনিয়ার সফলতার পূর্বশর্ত। আপনার চারপাশের প্রত্যেকেই খুশিমনে আপনার কথা মেনে নেবে, আপনার কাজে সাড়া দেবে—এমনটা আশা করা ঠিক নয়। এমনিতেই মানুষকে নিয়ে কোনো কাজ করা কঠিন। দাওয়াতি কাজ করা আরও কঠিন। আর মানুষের জীবনধারায় পরিবর্তন আনা যারপরনাই কঠিন। এজন্য প্রয়োজন যোগ্য নেতৃত্ব। প্রয়োজন বিনয়, নম্র ও সহনশীল আচরণ। দাওয়াতি কাজ হলো নিরাশ না হওয়া। অবিরাম দাওয়াতও চালিয়ে যাওয়া। যতক্ষণ একটিও কান আছে শোনার মতো। একটিও হৃদয় আছে ভাবার মতো। একটিও আশা আছে সাড়া পাওয়ার মতো।
আবু উমাইয়া শাবানী বলেন, আমি আবু সালাবা খাশানীর কাছে গেলাম, বললাম, এই আয়াতটি সম্পর্কে আপনার কী মত? তিনি বললেন, কোন আয়াত? বললাম,
يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا عَلَيْكُمْ أَنفُسَكُمْ لَا يَضُرُّكُم مَّن ضَلَّ إِذَا اهْتَدَيْتُمْ
অর্থ : হে ঈমানদারগণ, তোমরা নিজেদের রক্ষা করো। তোমরা নিজেরা যদি হেদায়েতপ্রাপ্ত হতে যাও, তা হলে যে গোমরা হলো সে তোমাদের ক্ষতি করতে পারবে না। — সূরা মাইদাহ : ১০৫
তিনি বললেন, আমি এ বিষয়ে সর্বাধিক জ্ঞাত ব্যক্তিককেই জিজ্ঞেস করেছিলাম, আমি স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেই জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি উত্তরে বলেছিলেন,
বাইল ইতিমিরু বিল মারূফি ওয়ান্তাহু আনিল মুনকারি হাত্তা ইযা রয়াইতা শুহহাম মুতআও ওয়া হাওয়াম মুত্তাবাআও ওয়া দুনিয়াম মুসারাতাও ওয়া ইজবা কুল্লি যি রয়িম বি রয়িহি ওয়া রয়াইতা আমরণ লা ইয়াদানি লাকা ফীহি ফায়ালাইকা বিখুয়াইসাতিন নাফসিক ইন্নাহু মিন অরাইকুম আইয়ামাস সবরি আস সবরু ফীহিন্না মিসলু কাবযি আলাল জামরি লিলফায়িলি ফীহিন্না মিসলু আজরি খামসীনা রযুলান মিসলা আমালিহি
অর্থ : বরং তোমরা একে অপরকে সৎকাজের আদেশ করতে থাকো। অসৎ কাজ থেকে বাধা প্রদান করতে থাকো। অবশেষে যখন স্বার্থের আনুগত্য, প্রবৃত্তির অনুসরণ, পার্থিবতার ব্যাপক প্রাধান্য এবং নিজ নিজ মতে প্রত্যেকের আত্মতুষ্টির ব্যাপক চর্চা হতে দেখবে, এবং এমন কিছু হতে দেখবে যাতে তোমার করার কিছু নেই, তখনই শুধু নিজের কথা ভেবো। নিশ্চয় তোমাদের পশ্চাতে আসছে ধৈর্যের দিন। ওই দিনগুলোতে ধৈর্য ধারণ করা—হাতে জ্বলন্ত অঙ্গার চেপে ধরার মতো কঠিন হবে। তখন একজন আমেল পঞ্চাশজন আমেলের বিনিময় লাভ করবে।
অন্য একটি বর্ণনায় আছে,
ক্বীলা ইয়া রাসূলাল্লাহ আজরু খামসীনা হীনান মিন্না আও মিনহুম? ক্বলা বাল আজরু খামসীনা মিনকুম
অর্থ : বলা হলো, হে আল্লাহর রাসূল, আমাদের মধ্য থেকে পঞ্চাশজন, নাকি তাদের মধ্য থেকে পঞ্চাশজন? তিনি বললেন, বরং তোমাদের মধ্য থেকেই পঞ্চাশজন।
অন্য একটি বর্ণনায় বিনিময়ের আধিক্যের কারণ দর্শানো হয়েছে এভাবে,
ইন্নাকুম তাজিদুনা আলাল খাইরি আওয়ানান ওয়ালা ইয়াজিদুনা আলাল খাইরি আওয়ানান
অর্থ : তোমরা কল্যাণে সহযোগী পাচ্ছ, কিন্তু তারা কল্যাণে সহযোগী পাবে না। ১
আমাদের প্রিয় নবীজীর মাঝে আমাদের জন্য আছে উত্তম আদর্শ। তিনি কত বিপদের মুখে পতিত হয়েছেন! কত উপহাসের সম্মুখীন হয়েছেন! কত গালমন্দ সহ্য করেছেন! এমনকি, মহান আল্লাহ পাহাড়ের ফেরেশতাকে পাঠালেন এই মর্মে,
ইন শিতা আবতাকতু আলাইহিমুল আখশাবাইনি ফ ইয়াকুলু লা ইন্নি আসআলুল্লাহা তায়ালা আই ইউখরিজা মিন আসলাবিহিম মাই ইয়াবুদুল্লাহা ওয়ালা ইউশরিকু বিহি শাইয়া
অর্থ : হে নবী, আপনি যদি চান, তা হলে তাদের ওপর দুই পাহাড় চাপিয়ে দেব। কিন্তু তিনি বললেন, না। আমি বরং আল্লাহর কাছে এইটা চাই যে, তিনি এদের ঊরসদেশ থেকে এমন কিছু মানুষ যারা আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কোনো কিছুকে শরীক করবে না। ২
হলোও তাই। আল্লাহ ওয়ালিদ বিন মুগীরা ও আবু জেহেলের মতো কাফের ও মোশরেকদের ঊরসে জন্ম দিলেন খালিদ বিন ওয়ালিদের মতো দিগ্বিজয়ী বীর ও ইকরিমার মতো মুসলিম সাধককে। দাওয়াতে পর্যায়ক্রমতা আছে। আগে মনকে প্রস্তুত করতে হয়। তারপর নতুন কিছু তুলে ধরা। অপ্রস্তুত অবস্থায় কারও কাছে কোনো কিছু গৃহীত হওয়া অনেকটা আকস্মিকতা। তাই দাওয়াতি কাজে পর্যায়ক্রমতা বিবেচনায় রাখা আবশ্যক।
প্রথম ধাপে দাওয়াত-পরিচিতি। অর্থাৎ দাওয়াতের বিষয়, অঙ্গন, পরিধি ইত্যাদি ঠিক করা। দ্বিতীয় শ্রেণি ও পেশার মানুষের কাছে দাওয়াত পৌঁছানোর ক্ষেত্র নির্ধারণ করা। দ্বিতীয় পর্যায়ে, দাওয়াতি কাজে সহযোগী নির্বাচন করা। এমন কিছু মানুষ—যারা আপনার চিন্তাকে গ্রহণ করবে, জীবন-সফরের এই মহতী উদ্যোগে আপনার সঙ্গী হবে। তৃতীয় পর্যায়ে চিন্তা-চেতনার বাস্তবায়নে মনে রাখবেন, এখানে প্রধান ও মৌলিক প্রয়োজন তা হলো এমন আলোকিত হৃদয়—যাতে ঈমান আছে, ইখলাস আছে। এভাবে ধাপে ধাপে সফলতার সাথে এগোনোর পারলে আশা করা যায় আমাদের দাওয়াতি কাজের একটি শক্তিশালী, সুসংহত, কার্যকর ভিত্তি স্থাপিত হবে। আমাদের শ্রম সার্থকতাও পাবে, ফলপ্রসূও হবে। জীবনধারায় আমূল পরিবর্তন আনাও সম্ভব হবে। অচিরেই মানবজীবন পরিচালিত হবে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'র পতাকা তলে।
আমরা যখন কোনো নারীকে দাওয়াত দেব, তখন সে হয়তো খুব অনায়াসে সালাত আদায় শুরু করবে। কিন্তু পর্দার বেলায় অপারগতা প্রকাশ করবে। হয়তো নিজের প্রবৃত্তির কাছে পরাজিত হয়ে, কিংবা অন্য কোনো প্রতিকূলতার কারণে। তখন হতাশ হলে চলবে না। তার সাথে লেগে থাকতে হবে। দীনের দাওয়াতও দিতে থাকতে হবে। তাকে উপলব্ধি করাতে হবে যে, অচিরেই কাল কিয়ামতে তাকে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে; সেখানে মা বাবা ভাই বোন স্বামী সন্তান কেউ থাকবে না; সেখানে আল্লাহ ছোট বড় সবকিছুর হিসেব নেবেন।
আশা করা যায়, ধীরে ধীরে আমরা আমাদের এই বোনটিকে বর্বরতার পঙ্কিল থেকে মুক্ত করতে পারবো। পাশ্চাত্যপ্রিয়তা ও অন্ধ অনুকরণের বেড়াজাল থেকে বের করে আনতে পারবো। বিশেষ করে, আধুনিকতার নামে যে অপচর্চা শুরু হয়েছে, নারীরা আল্লাহবিস্মৃত হয়ে যে মরণফাঁদে পা দিতে আরম্ভ করেছে, হয়তো তা থেকে তাকে বাঁচাতে পারবো। আমাদের আন্তরিকতা ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টাকে কবুল করে হয়তো আল্লাহ তার মাঝে ধার্মিকতা সৃষ্টি করবেন। এই বোনটির মাঝেই, অচিরেই আমরা একটি সত্যিকার ধার্মিক নারীকে দেখতে পাবো। যিনি মনে প্রাণে ইসলাম ও মুসলমানকে ভালোবাসবেন। নিঃসন্দেহে এটা আল্লাহর কাছে কঠিন কিছু নয়।
প্রিয় বোন, এ পথে চলতে হয়তো অনেক বাধা আসবে। হয়তো অনেক কঠিন কঠিন পরীক্ষারও সম্মুখীন হতে হবে। নিশ্চয় এ পরীক্ষা অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু এটা যেমন সত্য, এর চেয়েও বেশি সত্য এই যে, এর বিনিময় ও প্রতিদান আল্লাহর কাছে অনেক বড়, অনেক মহৎ।
হযরত সুমাইয়া রাযি.-কেই দেখুন। তিনি ছিলেন ইসলামের পথে শাহাদতবরণকারী প্রথম নারী। কাফেররা তাকে, তার ছেলে ও স্বামীকে ধরে নিয়ে গেল। মরুভূমির উত্তপ্ত বালুতে নিয়ে গিয়ে পুরো পরিবারকে কী নির্মম অত্যাচার করল। কিন্তু হযরত সুমাইয়া রাযি. ধৈর্য ও অবিচলতার কী জীবন্ত উদাহরণই না রেখে গেলেন যুগ যুগের মুসলিম নারী সমাজের জন্য। তিনি আপন ছেলেকে স্বামীকে উৎসর্গ করলেন আল্লাহর রাহে, প্রাণ সঁপে দিলেন আপন প্রভুর সমীপে; কিন্তু নিজের ঈমানকে কাফের বেইমানের সামনে বিসর্জন দিতে রাজি হলেন না। ৩
এই যে উম্মে শারিক গাযিয়া বিনতে জাবের বিন হাকিম। ইসলাম গ্রহণ করলেন। কুরাইশ নারীদের কাছে গিয়ে গোপনে ইসলামের দাওয়াত দিতে লাগলেন। একদিন কুরাইশ কাফেররা ধরে ফেলল। তারা কঠিন কঠিন বাক্য প্রয়োগ করে ধমক দিয়ে বলল, তোমার গোত্রের লোকেরা না থাকলে আজ তোমার সাথে যা করার করতাম। কিন্তু আজকের মতো তোমাকে সম্মানে ফিরিয়ে দিচ্ছি। উম্মে শারিক বলেন, আমার কওমের লোকেরা আমাকে একটি উটের পিঠে ফেলে দিল। নিচে কিছু দিল না। এভাবে দিন দিন এক মনজিল অতিক্রম করতাম। এ দীর্ঘ সফরে তারা আমাকে না কিছু খেতে দিত, না কিছু পান করতে দিত। প্রত্যেক মনজিলে আমাকে রোদ্রে ফেলে রাখত। নিজেরা ছায়ায় বিশ্রাম করত। বিশ্রাম করে খেয়ে পান করে তৃপ্ত হয়ে আবার যাত্রা করত। এক দিন এভাবেই রোদ্রে পড়ে ছিলাম। আমার প্রাণপ্রায় বের হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। হঠাৎ মুখের ওপর শীতল কিছু অনুভব করলাম। মনে হলো, পানির বালতি ধরা হয়েছে। আমি একটু পান করলাম। বালতিটি সরিয়ে নেওয়া হলো। আবার ধরা হলো। আমি আবার পান করলাম। এভাবে কয়েক দফায় পান করে আমি পরিপূর্ণরূপে তৃপ্ত হলাম। এবার বালতিটি শক্ত করে ধরে সবগুলো পানি গায়ের ওপর ঢেলে নিলাম। আমার শরীর কাপড় ভিজা গেল। আমি তাজা হয়ে গেলাম। ইতোমধ্যে সবাই জেগে গেল। তারা পানির ছাপ দেখতে পেল। আমিও একদম তাজা হয়ে আছি। তারা চেঁচামেচি শুরু করে দিল। বলল, তুমি নিশ্চয় রশির বাঁধন খুলে আমাদের পানি খেয়ে ফেলেছ। আমি বললাম, আল্লাহর কসম, আমি এমন কিছু করিনি। আসলে এরকম এরকম ঘটেছিল। তারা বলল, যদি তুমি সত্য বল থাক, তা হলে তো তোমার ধর্ম আমাদের ধর্মের চেয়ে উত্তম। এরপর তারা পানপাত্রগুলো দেখতে লাগল। তারা হতবাক হয়ে দেখল যে, তাদের পানপাত্র ঠিকই আছে। তারা আর বিলম্ব করল না। সকলে মুসলমান হয়ে গেল। ৪
চিন্তা করুন, একজন উম্মে শারিকের ধৈর্যের বদৌলতে একটি সম্প্রদায় ইসলাম গ্রহণ করল। আমাদের জন্য তার মাঝে আছে সুন্দর আদর্শ। এই বিংশ শতাব্দীতেও পৃথিবীর বুকে নারী সাহাবীদের ঈমানদীপ্ত সংগ্রামী জীবনের জীবন্ত উদাহরণ নেই তা নয়। যায়নাব আল গাযালি। ইসলামী সংগ্রাম সাধনার এক জীবন্ত কিংবদন্তী। তিনি কল্যাণের সুবাস ছড়াচ্ছেন। পথনির্দেশের আলো ছড়াচ্ছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, অচিরেই আল্লাহ মুমিনদের সাহায্য করবেন। শত্রুরা তার বাড়িরঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে। তাকে কারাবন্দি করে রেখেছে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস। তবু তিনি ঈমান ও বিশ্বাসের পথ থেকে বিন্দুমাত্র নড়েননি। ইস্পাতকঠিন মনোবল, সীমাহীন ধৈর্য, পর্বতপ্রমাণ অবিচলতায় তিনি এখনো টিকে আছেন দাওয়াতের ময়দানে। কারাগারের বিভীষিকাময় দিনগুলোর বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, “তারা ঘর খুলে দিল। ঘর ভর্তি কুকুর। আমার বুক কেঁপে উঠল। আমি চোখ বন্ধ করলাম। লোহার দরজা বন্ধ করে দেওয়ার বিকট আওয়াজ হলো। মুহূর্তের মধ্যেই চতুর্দিক থেকে আমার শরীরের সাথে কুকুরগুলো যেন সেঁটে গেল। ওদের ঘেউ ঘেউ শব্দ ছি ভয়ানক। কুকুরগুলো আমার সারা শরীরে কামড়াতে শুরু করেছে। আমি আল্লাহ জপে লাগলাম। হতভম্ব হয়ে শুধু বলে চলেছিলাম, اللهم اشغلني بك عمن سواك، اشغلني بك في حضرتك واصبغني بالشهادة فيك والحب فيك والرضى بك والمودة لك وثبت الأقدাম يا الله أقدام الموحدين (অর্থ : আল্লাহ, আমাকে তোমাতে মগ্ন রাখো। আমার আল্লাহ, আমাকে তোমাতে ব্যস্ত রাখো। হে চির একক, হে চির নিঃস্বাপেক্ষ, তোমার অনুভূতিতে আমাকে বিভোর করে দাও। তোমার উপলব্ধিতে আমাকে ডুবিয়ে রাখো। মাবুদ, তোমারই তরে শাহাদত নসীব করো। তোমাতে প্রেম দান করো। তোমার সন্তুষ্টি জোটাও। তোমার ভালোবাসা দান করো। পদ অবিচল রাখো, আল্লাহ, তোমারও একত্বে বিশ্বাসীদের পদ...) করুক ছটা কেটে গেল। ভেবেছি, খ্যাপা কুকুরেরা আমার সাদা কাপড়কে রক্তে লাল করে ফেলেছে... দরজা খোলা হলো। আলোর আভাস পেয়ে আমি আমার কাপড়ের দিকে লক্ষ করলাম। কিন্তু, কী আশ্চর্য! কাপড় দেখতে তো কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। কারারক্ষীরা যারপরনাই চমকে গেল। কুকুরগুলো আমার কাপড় ছিঁড়তে পারেনি।” ৫
দিন যায়। বছর যায়। বাইরের আলো বাতাসে দেখেন না। জেলের সেই অন্ধকারের কাঠেই সময়। সঙ্গী কিছু নয়। শুধু আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস। সময়ের পরিবর্তন হলো। সমাজের পরিবর্তন হলো। তিনি ছাড়া পেলেন। বিশ্বাস ও প্রত্যয় হলো আরও সুদৃঢ়। তিনি এখনো পথ চলছেন। আল্লাহর একত্বের উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছেন। মানুষ তার ডাকে সাড়া দিচ্ছে। স্বেচ্ছাচারী সম্প্রদায়ের বিভেদাদার ও অগ্নি-উপাসকদের থেমে নেই। কিন্তু রাখে আল্লাহ মারে কে?
শায়খ মুরসিদ হাসান হুযাইবির স্ত্রী জেলে স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে যান। সহিষ্ণু হৃদয় জানে না ভয়, মানে না বাধা। থেকে থেকে কিছু খাবার, কিছু জামাকাপড় নিয়ে যান। কারা-কর্তৃপক্ষর লোকেরা সার্চ করতে আসে। একদিন এক যুবক অতি উৎসাহে সার্চ করছিল। মনে হচ্ছিল, সে বিশাল কোনো কুকর্ম সাধন করছে। তিনি অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে বললেন, “বেটা, এটা তোমার জায়গা নয়। এটা তোমার কাগজও নয়। তোমার জায়গা ছিল রণাঙ্গন। তোমার কাজ ছিল শত্রুদের আক্রমণ থেকে মাতৃভূমিকে রক্ষা করতে। জন্মভূমির ওপর থেকে লাঞ্ছনাকে অপসারণ করতে। দিনদুপুরে গিয়ে এক মায়ের আদরের আলু-পটোল আর রুটি-পরাটা সার্চ করে কী এমন মহৎ কর্ম করছ, শুনি!” যুবকটি হতচকিত হলো। অনায়াসেই নিজেকে সামলে নিল। অপরাধীর তিলক তাকেও ব্যথিত করলো। লজ্জিত চোখে তাকাল। বলল, ‘জনাব, আপনি যথার্থ বলেছেন।” ৬
বানান তান্তাবী। জার্মানির স্বামী সাথে দাওয়াতের কাজ করতেন। সেখানে একটি নারীসংগঠনও তৈরি করেছিলেন। তার দাওয়াতী তৎপরতায় অনেক জার্মানি নারী তওবা করে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। স্বেচ্ছাচারী শাসক তাকে ও তার স্বামীকে নির্বাসিত করেছিল। এই দম্পতি সত্য বলার সাহস সর্বস্ব ত্যাগ করে দিয়েছিল। তাই শুধু নির্বাসনকে যথেষ্ট মনে করেনি। সেই স্বেচ্ছাচারীরা তাদের তাড়া করে বেড়িয়েছে এখান থেকে সেখানে, এদেশ থেকে সেদেশে। সর্বশেষ তারা আশ্রয় নিয়েছিলেন জার্মানির আখেন শহরে। স্বেচ্ছাচারী ষড়যন্ত্রজাল সেখানেও পৌঁছে গিয়েছিল। সাড়ে তিন হাজার শরীরী এক মুসলিম পীর – ইসলাম আত্মা থেকে নিষ্কৃতি না পাওয়া পর্যন্ত যেন তাদের ঘুমই হারাম। এক প্রতিবেশিনীর কপালে অস্ত্র ঠেকিয়ে শয়তানের দোসররা ইসলামের ঘরে পৌঁছে গেল। দরজায় কড়া নাড়ল। বানান তান্তাবী দরজা খুললেন। স্বামী ঘরে ছিলেন না। তিনি হাসপাতালে। অপ্রস্তুত ছিলেন। কোনো কথা নেই। বানানকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ল। ঘাতকদের পাঁচটি গুলি নিরীহ মুসলিম দায়িকার মস্তিষ্ক ভেদ করে দিল। বানান মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। শয়তানরা তার নিথর দেহটি ফেলে রেখে গেল। তিনি প্রাণ ত্যাগ করলেন দেশ থেকে দূরে, প্রিয়জন থেকে দূরে, আপনজন থেকে দূরে। বানান দুনিয়া থেকে চলে গেলেন। কিন্তু তার অমর উক্তি আজও দুনিয়াতে কোটি কোটি মুসলিম নারীর প্রেরণা হয়ে আছে, “দুঃখ করবেন না, হে ইসাম। আমাদের কথা ভেবে চিন্তিত হবেন না। আল্লাহর পথে অবিচল থাকুন। আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রাখুন। দ্বীনকে বিজয়ী করতে আপনার সঠিক অবস্থান এবং আল্লাহর রাস্তায় একনিষ্ঠভাবে জিহাদ চালিয়ে যাওয়া ই আমাদের কাম্য। আমরা আপনার কাছে আর কিছুই চাই না।” ৭
আমার ফিলিস্তিনী বোনেরা, তোমরা ধৈর্য হারিয়েো না। শত প্রতিকূলতায়, শত ঝড়ঝঞ্ঝায় এই সব দাইয়া, মুজাহিদা, সাহেবা বোনদের মাঝে আছে আমাদের আদর্শ, আছে সান্ত্বনা। আমরা প্রতিনিয়ত পরীক্ষায় নিপতিত। আমাদের পবিত্র ভূমিতে কোনো প্রেতাত্মা আশ্রয় নিতে পারে না। আমাদের পুণ্যভূমিতে কোনো মিথ্যার উপস্থাপন ঘটাতে পারে না। চিরন্তন এ লড়াই চলবেই। সত্যই হবে বিজয়ী। বিজয় হয় সত্যেরই। আল্লাহ তার ধৈর্যশীল বান্দাদেরই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বিজয় ও প্রতিষ্ঠার।
আমরা দুআ করি, ফিলিস্তিনিদের পরোলোক ও অন্তরীন পরিবারগুলোকে আল্লাহ যেন রহম করেন। তাদের স্ত্রীদের মায়েদের মেয়েদের বোনদের ইজ্জত-আবরু, সম্মান ও সম্ভ্রমের রক্ষণাবেক্ষণ করেন। ধৈর্য ও অবিচলতা দান করেন। তারা অসহনীয় কষ্ট, বিরহ, দহন সহ্য করে চলেছেন অনেকটা কাল। আমরা আশা করি, আল্লাহ আমাদেরকে আমাদের ধৈর্যের বিনিময় ও প্রতিদান দান করবেন। ঈমান ও বিশ্বাসের মজবুতি নসীব করবেন। শেষ অবধি তাঁর ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকার তওফিক দান করবেন।
আমরা আমাদের পবিত্র ভূমির সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে গিয়ে ধ্বংসযজ্ঞের শিকার, ভূমি হরণের শিকার, অসংখ্য নির্যাতনের শিকার। আমাদের দুধের শিশুদের, অল্পবয়সীদের গুলি করে, পুড়িয়ে মারতে ওদের বাধে না। রাতের আঁধারে আমাদের নারীদের গগনবিদারি আর্তচিৎকার আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে। কিন্তু কোনো সাড়া আসে না। সাহায্য আসে না। এতিমেরা কেঁদে বুক ভাসায়। হন্য হয়ে খুঁজে ফেরে মাকে, বাবাকে। কিন্তু কোথাও কোনো সাড়া নেই। কোথাও কোনো শব্দ নেই। আমাদের পবিত্র ভূমি বিরান হয়ে চলেছে। গাছপালা, নদীনালা, পশুপাখি ওদের দৌরাত্ম্য থেকে মুক্ত নয়। আমাদের মাদরাসা, কলেজ, হাসপাতাল, ব্যাংক, শিল্পকারখানা ধ্বংস হয়েছে। বিপদগ্রস্তদের দিকে যারা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়, আমাদের প্রতি তাদের সাহায্যের হাত সংকুচিত। সারা পৃথিবীর—পুরো মুসলিম উম্মাহর—সামনে তারা আমাদের শিশুদের স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করছে, আমাদের হৃদয়কে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে। আমাদের কবিরা শোকগাথা রচনা করে। কোমলহৃদয়রা অশ্রু বিসর্জন দেয়। অত্যাচারিত মুসলিম জাতি চেয়ে থাকে আরব বিশ্বের প্রতি। ইসলামী বিশ্বের প্রতি। কিংবা কোনো মুসলিম রাষ্ট্রের প্রতি। কিন্তু কোনো সাড়া নেই। আমি চিৎকার করে ডাক দিলাম। যদি কোনো জীবন্ত মানুষ পাই। কিন্তু আছে কি কোনো জীবন্ত মানুষ? পাবো কি কোনো প্রাণের সাড়া? কবি উমর আবু রিশার কথা মনে পড়ছে,
(অর্থ- আমার জাতি, কি তোমার সম্মান আজকের মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা হাজারও জাতির মাঝে? আমি তোমাকে চেয়ে চেয়ে দেখি, আর আমার দৃষ্টি লজ্জায় অবনত। হায় কত মুতাসিম বিদায় নিল! কত আবাল বনিতার আর্তচিৎকার আকাশ বাতাস ভারি করল! কিন্তু তুমি শুনলে না! হায়, তোমার শাণিত কলম, অপ্রতিরোধ্য তরবারি কে রুখে দিল! মুতাসিম, তোমার আর্তনাদ কোথায় বিদায় নিল!)
আমাদের শহীদদের প্রতি আসমান জমিন অশ্রুপাত করে। টিলা উপকূল কেঁদে বুক ভাসায়। অত্যাচারীদের বন্দুকের গুলি আমাদের শহীদদের দেহকে ক্ষতবিক্ষত করে। তাদের শরীরের মাংসপিণ্ডগুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে পাথরে ককড়ে ছিটকে পড়ে। তাদের শোণিতধারায় রচিত হয় জলপ্রপাত। রক্তের নদীতে পবিত্র ভূমির পুণ্য মাটি হয় সিক্ত, তৃপ্ত। একবিংশ শতকের হত্যাকাণ্ডগুলোর সাক্ষী হয়ে থাকবে চিরকাল। দুঃখ, ক্ষোভ ফিলিস্তিনের আকাশ বাতাসকে ভারি করেছে। ফিলিস্তিনের মাটি ও মানুষ শোকের সাগরে মুহ্যমান। ফিলিস্তিনের প্রতিটি ধূলিকণায় প্রতিধ্বনিত হচ্ছে জিহাদের আহ্বান—ভেঙে দিতে ওদের বিষদাঁত, ফিরিয়ে দিতে ওদের কালো থাবা। এত অত্যাচার ও নির্যাতনের পরও ফিলিস্তিনিরা দমে নি। এরা দমে না। দমে না। যত কষ্টই দাও, যত অত্যাচারই কর, আমাদের ঈমান, আমাদের বিশ্বাস কেড়ে নিতে পারবে না। যত গুলি আছে, করো; যত বোমা আছে, মারো; সত্যের ওপর আমাদের অটলতা, সত্যের ওপর আমাদের অবিচলতা কমবে না। বাড়ছে; বাড়ছে।
আমরা জানি, সুবহে সাদিক হাসে শেষ হাসি; রাতের গভীরতাই দেয় দিনের আগমনী বার্তা। আমরা বিশ্বাস করি, এই অন্ধকার কাটবেই; এই অমানিশা দূর হবেই। ফিলিস্তিনিদের মায়েদের কান্নার অবসান হবেই। ফিলিস্তিনিদের মেয়েদের মুখে বিজয়ের হাসি ফুটবেই। অচিরেই আল্লাহ সাহায্য করবেন মর্দন মুজাহিদদের। বিজয়ী করবেন তাদেরকে সুস্পষ্ট বিজয়ে। নিশ্চয় আল্লাহ সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাবান। ফিলিস্তিন তার গুণী সন্তানদের হারিয়ে শোকাাহত। তারা অতি দৃঢ়ভাবে প্রাণ উৎসর্গ করেছেন আল্লাহর রাহে। বুকের তাজা রক্ত দিয়ে এক দিকে গেছেন ত্যাগ ও তিতিক্ষার চিত্র, লিখে দিে গেছেন জিহাদের আহ্বান, দেখিে দিে গেছেন বীরত্ব ও আত্মত্যাগের অপূর্ব নমুনা। তাদের এ আত্মত্যাগের কথা ইতিহাসে অম্লান হয়ে থাকবে চিরকাল। ঐ প্রজন্ম যোগাবে যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী। দুর্বার এই বীর লড়াকুদের বীরত্বগাথা স্মৃতিময় হয়ে থাকবে জাতির কাছে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম—কৃতজ্ঞতার সাথে, কৃতার্থতার সাথে। উড়ে এসে জুড়ে বসা বুনোদের অনধিকার অবরোধ, অহেতুক অনাগ্রিক বিরুদ্ধে—তাদের নির্যাতন, নিপীড়ন, নিষ্পেষণের বিরুদ্ধে— এদেশের মানুষ যে সংগ্রাম সাধনায় অবতীর্ণ হয়েছেন, তা অটল পর্বতের ন্যায় দুলর্ঙ্ঘ্য। তারা যে জিহাদি ঝাণ্ডা উত্তোলন করেছেন, তা কখনো অবদমিত হবে না, হবার নয়।
হে শহীদ-বন্দীর মা জননী, হে শহীদ-বন্দীর জীবনসঙ্গিনী, স্বয়ং আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের প্রতিদান দান করুন। তোমাদের সান্ত্বনা জানান কোন ভাষায়? পৃথিবীতে আছে কি কোনো ভাষা, যে ভাষায় তা সম্ভব? কিন্তু খাওলা, খানসা, সুমাইয়া, নাসিবা রাযিয়াল্লাহু আনহুমাদের গৌরবময় মহিমা আজও যদি পুনরাবৃত হতে পারে, সেই অনুপম কাহিনী আজও যদি মুসলিম ইতিহাসকে নতুন আবেগে আন্দোলিত করতে পারে, তবে তা—আল্লাহর কসম—তোমাদেরই মতো নারীদের কল্যাণে।
টিকাঃ
১. ইবনে মাজাহ, তিরমিযী।
২. সহীহ বুখারী ও মুসলিম।
৩. সালাহুল উম্মাহ কী উসুলুল হিম্মাহ ৫/১৬৭।
৪. আল ইসাবাহ ৮/২৮৫।
৫. আইয়ামুম মিন হায়াতি ৪৭।
৬. আল আদাওয়াতুল মুসলিমাত : ২১০।
৭. মাওয়াক্বিফ লিসাইয়াযুন মুশাক্বিকুন : ৮৩-৮৫।
📄 ৮. চাই প্রিয় ব্যক্তিত্ব
মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন,
أَتَأْمُرُونَ النَّاسَ بِالْبِرِّ وَتَنْسَوْنَ أَنْفُসَكُمْ وَأَنْتُمْ تَتْلُونَ الْكِتَابَ أَفَلَا تَعْقِلُونَ
অর্থ: তোমরা কি মানুষকে সৎ কর্মের আদেশ দাও, আর নিজেদেরই ভুল থাক; অথচ কিতাবও তেলাওয়াত কর? তোমাদের কি আকল নেই? —সুরা বাকারা : ৪৪
তিনি আরও ইরশাদ করেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لِمَ تَقُولُونَ مَا لَا تَفْعَلُونَ كَبُرَ مَقْتًا عِنْدَ اللَّهِ أَنْ تَقُولُوا مَا لَا تَفْعَلُونَ
অর্থ : হে ঈমানদারগণ, কেন তোমরা এমন কথা বল যা তোমরা কর না? তোমরা এমন কিছু বলবে যা তোমরা কর না—এটা আল্লাহর কাছে খুবই কঠিন শাস্তিয়োগ্য অপরাধ। —সুরা সফ : ২-৩
দায়িয়াকে অবশ্যই উত্তম ব্যক্তিত্বের অধিকারী হতে হবে। আমল আখলাকে ধর্মীয় অনুশাসনের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন থাকতে হবে। নামায রোযা হজ যাকাত ইত্যাদি ফরজ ওয়াজিব ও নফলদেরও পাবন্দি করতে হবে। পর্দা ব্যাপারে হতে হবে সুচারু। শর্ত সমূহ সতো পালন করতে হবে পূর্ণাঙ্গ পর্দা। বেপর্দা চলবে না। মাহরাম ছাড়া কারও সামনে সৌন্দর্য প্রদর্শন করবে না।
আমাদের সমাজে অনেক ধার্মিক নারীকে দেখা যায়, যারা জিলবাব হিজাব ইত্যাদি পর্দার পোশাকগুলো ব্যবহার করেন ঠিকই; কিন্তু হাত মুখ চোখে কৃত্রিম সজ্জা গ্রহণ করে পুরুষদের সামনে যান। আবার পর্দা করারও দাবি করেন। অথচ মেকাপ, লিপস্টিক কিছুই বাদ রাখেন না। এভাবে ইসলামের নামে ইসলামের ক্ষতিসাধন হয়। বরং ইসলামের অবমাননা হয়। শুধু অন্যেরা নয়, অনেক মুসলিম মেয়েরও বিভ্রাতির শিকার হয়।
যিনি সত্যিকারের দায়িয়া হবেন, অন্যের প্রতি তার আচরণ হবে অমায়রিক। আচরণে উচ্চারণে কাউকে কষ্ট দেবেন না। সবসময় হবে তৎপর। নীরববতা হবে তাফাক্কুর ও হিকমাহ। মুখের ভাষা, শরীরের ভাষা হবে আল্লাহর হামদ ও ছানায় নূরানী। তুমি মূল্যবোধগুলো যখন একজন দায়িয়ার মনে প্রাণে গেঁথে যাবে, তখনই তার দাওয়াত সার্থকতা পাবে। অটলতা ও অবিচলতা লাভ করবে। কেননা, তখন তার অবস্থা এমন হবে যে, তিনি যা করতে বলেন তা নিজেও করেন; এবং যা ছাড়তে বলেন তা নিজেও ছাড়েন।
কবি বলেন, তুমি এমন কিছু ছাড়তে বোলো না, যা নিজেই কর; এমনটা যদি কর, তো এ বড় লজ্জাজনক ব্যাপার। শায়খ আবদুল ওয়াহিদ ইবনে যায়েদ রাহ. বলতেন, হাসান বসরী যে এত উচ্চ মর্যাদায় সমাসীন হয়েছিলেন এ-একটাই কারণ ছিল—তিনি যখন কোনো কিছু করার উপদেশ দিতেন তখন নিজেই সবার আগে তা পালন করতেন। আবার যখন কোনো কিছু ছাড়ার উপদেশ দিতেন, তখনো নিজেই সবার আগে তা ছেড়ে দিতেন।
সুতরাং আপনি যদি আপনার দাওয়াতকে মানুষকে প্রভাবিত করতে চান, যদি চান আপনার দাওয়াত ক্রিয়াশীল হোক, সার্থকতা লাভ করুক; তা হলে হৃদয়াত্মার পবিত্রতা অর্জন করুন, তাকওয়া তাহারাতের গুণে গুণান্বিত হোন, চিন্তা চেতনাকে স্বচ্ছ সুনির্মল করুন। দাওয়াতের প্রেরণা অনির্বাণ শিখা হয়ে জ্বলে উঠবে আপনার অন্তরে। মানুষ আপনার দাওয়াত কবুল করবে আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্যের প্রেরণায় সম্মোহিত হয়ে। আপনার একনিষ্ঠতায় প্রতিটি হৃদয়ে জেগে উঠবে পারস্পরিক সৌহার্দ্য সম্প্রীতি।
দেখুন না, একটি সুন্দর কথার কত সুন্দর দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন আপনার আমার আল্লাহ পবিত্র কুরআনে, তুমি কি দেখনি, আল্লাহ কেমন উদাহরণ দেন একটি ভালো কথার! যেন তা একটি ভালো গাছ। যার শেকর জমিনে গাড়া। আর শাখা প্রশাখা বিস্তৃত আসমানব্যাপী। সে তার প্রতিপালকের নির্দেশে ফল দান করে প্রতিনিয়ত। আল্লাহ মানুষের জন্য উদাহরণ দেন যেন তারা উপদেশ গ্রহণ করে। —সূরা ইবরাহীম : ২৪-২৫
আত্মসমালোচনার যোগ্যতা অর্জন করুন। নিজেই নিজের পরীক্ষা নিন প্রতিনিয়ত—ঈমানের পরীক্ষা, ইখলাসের পরীক্ষা। নিজেই নিজেকে যাচাই করুন সব সময়—দোষ-গুণ, ভালো মন্দ। মনে রাখবেন, আল্লাহ যখন কোনো মুমিনের কল্যাণ চান, তখনই তাকে নিজের দোষ ত্রুটি উপলব্ধি করার সক্ষমতা দান করেন। তাই আত্মপ্রশান্তিতে ভোগা মুমিনের কাজ নয়। এ বিষয়টি হৃদয়ঙ্গম করার চেষ্টা করুন যে, আপনি মুসলিম নারীসমাজের একজন দায়িত্বশীল প্রতিনিধি। তা ছাড়া, অনেকেই আপনাকে অনুসরণ করবে। তাই নিজের ব্যক্তিত্বের ব্যাপারে উদাসীন হবেন না। আপনার ওপর আল্লাহপ্রদত্ত বিরাট দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে।
কবি বলেন, একটু বুঝতে চেষ্টা করো, তোমার ওপর অর্পিত হয়েছে বিরাট দায়িত্ব। তাই বসে রও অপ্রয়োজনীয় কাজে সময় ফুরিও না।
প্রিয় বোন, নিজেকে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করুন যেন সম্ভাব্য সবকিছুতে আপনার আদর্শ সমুজ্জ্বল হয়ে থাকে আপনার চারপাশের নারীসমাজের জন্য। আপনি যদি কারও জীবনসঙ্গিনী হয়ে থাকেন, তা হলে একজন সত্যিকার সম্পূর্ণ মুসলিম রমণীর দৃষ্টান্ত স্থাপন করুন। নিজেকে এমন একজন স্ত্রী হিসেবে উপস্থাপন করুন যিনি সতীসাধ্বী। যিনি জীবনসত্তার প্রতি কৃতজ্ঞ, कर्तव्यপরায়ণ, একনিষ্ঠ, আন্তরিক, একজন বিশ্বস্ত, অন্তরঙ্গ বন্ধু ও সহযোগী; সুখে দুঃখে পাশের সাথী; দায়িত্ব কর্তব্য পালন পানে থাকেন; জীবন ও জগতের টানা পোড়নে স্বামীর প্রশান্তি; দাওয়াত ও তাবলীগের মশালবহনে স্বামীর ঘনিষ্ঠ সহকর্মী।
আপনি যদি কোনো সন্তানের জননী হয়ে থাকেন, তা হলে আপনিও হতে পারেন একজন সচেতন দায়িত্বশীল গৃহিণী। আপনার মস্তকেও শোভা পেতে পারে সত্যিকারের রত্নগর্ভার তাজ। আপনার ঘর হোক ইলম ও আলোর মিনার। আপনার ছেলেমেয়ে হোক তাকওয়া পরহেজগারীর অনন্য উদাহরণ। ইলমের অন্বেষণে তাদের মেহনত মোজাহাদা হোক প্রশংসনীয়। তাদের জ্ঞান ঈমান হোক আগামী প্রজন্মের মর্যাদা ও মাহাত্ম্য অর্জনের প্রেরণা। তাদের সাধনা আরাধনা ফিরিয়ে আনুক ইসলামের হারানো গৌরব। ইসলাম ও মুসলমানকে পুনপ্রতিষ্ঠিত করুক জ্ঞান মহিমায়।
ভাগ্য যদি আপনাকে শিক্ষিকার আসনে সমাসীন করে, আপনি যদি হন মানুষ গড়ার কারিগর, তা হলে স্বরূপ তুলে ধরুন প্রকৃত মুমিনের। আপনার সুপ্ত একনিষ্ঠতা, নিরন্তর কর্মোদ্দীপনা, সশ্রদ্ধ নিয়মুনুবর্তিতা, সুস্থ্য সময়সচেতনতা, অগাধ কর্তব্যপরায়ণতা যেন সর্বদাই শুভ্র সমুজ্জ্বল হয়ে থাকে; আপনার প্রতিটি ছাত্রীর মনে প্রাণে। আপনি আপনার ছাত্রীদের ধর্মীয় জীবনকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করুন। ধর্মের প্রতি তাদের মনে গভীর ভক্তি ও শ্রদ্ধা বোধ সৃষ্টি করুন। আপনি যদি ধর্মশিক্ষিকা হিসেবে নিযুক্ত নাও হন, তবুও একজন দায়িয়া হিসেবে তাদের ধর্মীয় চেতনাকে রক্ষা করা আপনার কর্তব্য।
বিশেষত আজকের আধুনিক পৃথিবীতে নিত্যনতুন বিষয় অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে এবং কর্মসূচিতে। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলোর মূল্যায়ন, এগুলোর তথ্যভিত্তিক নিরূপণ এবং শিক্ষার্থীদের সেদিকে দৃষ্টি আকর্ষণের দায়িত্ব সর্ব দিক থেকে আপনার ও ওপর বর্তায়। আজকাল বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচি এবং কর্মসূচিতে এমন অনেক বিষয় ঢোকানো হচ্ছে, যে গুলো স্পষ্টত ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক। কেউ তো এমন হবেন, যিনি এগুলোর প্রতিবাদ জানাবেন, এসব বিষয়ে সোচ্চার হবেন। অন্তত মুসলিম মেয়েদের চিন্তা চেতনাকে এসব বিষক্রিয়া থেকে মুক্ত রাখার ব্যাপারে মনোযোগী হবেন। সমাজসেবা, সামাজিক সচেতনতামূলক প্রচারণা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ইত্যাদি যাবতীয় প্রোগ্রামে মেয়েদেরও মাঠে নামানো হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ইসলামী মূল্যবোধ হয় উপেক্ষিত। এমনকি, এসবে ছেলেদের অনুপ্রবেশ ও উচ্ছৃঙ্খলতাও লজ্জাজনকভাবে পায় প্রশ্রয়। আবার মেয়েরা সামাজিকভাবে যেসব সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষকদের পক্ষে সেগুলোর সমাধান দেওয়া হয় ধর্মহীন সব চিন্তার আলোকে। মনে হয়, এসব নিয়ে তারাই প্রথম ভাবতে বসেছেন। ধর্মে এ নিয়ে কোনো কথা নেই। প্রায়ই নারীসম্পর্কিত বিষয়গুলোর ব্যাখ্যা ও সমাধান ধর্মীয় মূল্যবোধ বাদ দিয়ে। মেয়েরা দিশেহারা হয়ে যাচ্ছে ধর্ম ও জীবনের মাঝে সমন্বয় খুঁজে পেতে। ধার্মিক মেয়েরা হচ্ছে হীনমন্যতার শিকার।
প্রসঙ্গত, আজকাল শরীরচর্চার অনেক শিক্ষিকাই দায়িত্বহীনতার পরিচয় দেন। মেয়েদের পর্দাব্যবস্থা নিয়ে ভাবেন না। অনেকে সময় শিক্ষিকা অবশ্যই ছাত্রীদের জিলবাব খুলতে বাধ্য করেন। পরিবেশ পরিস্থিতিও তোয়াক্কা করেন না। এমনকি, নম্বর কাটারও হুমকি দেন। এই যদি হয় আরববিশ্বের মুসলিম রাষ্ট্রগুলো অবস্থা তা হলে অন্যদের সম্পর্কে কী বলা যায়? এরকম আরও অনেক বিষয় আছে যেগুলোতে সংস্কার প্রয়োজন। প্রয়োজন একজন নিঃস্বার্থ নির্ভিক দাইয়ার। যিনি অকপটে এগুলোর গঠনমূলক সমালোচনা করবেন। মুসলিম মেয়েদের ইসলামী মূল্যবোধ ও ভাবধারার ওপর অটল থাকতে প্রেরণা ও প্রণোদনা যোগাবেন। যারা মুসলিম মেয়েদের ইসলাম থেকে বিচ্যুত করতে চায়, মেধা দিয়ে শ্রম দিয়ে তাদের সক্ষম মোকাবেলা করবেন।
এরপরে আল্লাহ যদি আপনাকে চিকিৎসা-সেবার যোগ্যতা দান করেন, তা হলে মানবতার এ মহান পেশায় হালাল হারামের বিধান মেনে চলুন। আন্তরিকভাবে রোগীদের সেবা-শুশ্রূষা দিন। মেয়েলি বিষয়গুলোতে বিশেষভাবে মনোযোগী হোন। কেননা, মহিলা-ডাক্তার তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়। মুসলিম নারীসমাজ আপনার দ্বারা উপকৃত হতে পারবেন বেশি। এভাবে চিকিৎসা-সেবার গুরুত্বপূর্ণ কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যও প্রাধান্য দিন। উদাহরণস্বরূপ:
১. হৃদয়ের গভীরে থেকে পরিপূর্ণরূপে বিশ্বাস করুন এবং রোগী কে ও বিশ্বাস করান, আরোগ্য আল্লাহর হাতে। অসুখ পথ্য বাহ্যিক উপকরণ মাত্র।
২. দায়িত্ব পালনে ব্রতী হোন। গভীরভাবে উপলব্ধি করুন যে, আল্লাহ আপনাকে মুসলিম সমাজের সীমানা পাহারায় নিয়োজিত রেখেছেন। সুতরাং মেধা শক্তি সর্বস্ব ব্যয় করে মুসলিম সমাজের শরীরের অসুস্থতা ও স্বাস্থ্যকে সংক্রামক ব্যাধি এবং সংহারক জীবাণুর ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা করতে সচেষ্ট হোন।
৩. রোগীদের সাথে অমায়িক ব্যবহার করুন। দয়াপরবশ হোন। সাধ্যমত চেষ্টা করুন তাদের অন্তরে আশার আলো জ্বালাতে। তাদেরকে আল্লাহমুখী হতেও সহায়তা করতে পারেন আপনি।
৪. আমানতদারিতার পরিচয় দিন। শুধু কর্তব্য নয়। রোগীদের গোপনীয়তার বিষয়েও। অনেকেই এখানে অসচেতনতার শিকার। ফলে রোগীদের অসম্মান হয়। নিজের ব্যক্তিত্বও হয় প্রশ্নবিদ্ধ।
৫. নিজের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার উত্তর-উত্তর উন্নয়নে সচেষ্ট হোন। ধর্মীয় ব্যাপারেও। চিকিৎসার ব্যাপারেও। এভাবে মূলে পৌঁছার চেষ্টা করুন। বিশ্বনবীর যথাযথ জ্ঞানভাণ্ডারেও হাত দিতে পারেন। কেননা, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা মুমিনের হারানো সম্পদ।
মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন,
أَتَأْمُرُونَ النَّاسَ بِالْبِرِّ وَتَنْسَوْنَ أَنْفُসَكُمْ وَأَنْتُمْ تَتْلُونَ الْكِتَابَ أَفَلَا تَعْقِلُونَ
অর্থ: তোমরা কি মানুষকে সৎ কর্মের আদেশ দাও, আর নিজেদেরই ভুল থাক; অথচ কিতাবও তেলাওয়াত কর? তোমাদের কি আকল নেই? —সুরা বাকারা : ৪৪
তিনি আরও ইরশাদ করেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لِمَ تَقُولُونَ مَا لَا تَفْعَلُونَ كَبُرَ مَقْتًا عِنْدَ اللَّهِ أَنْ تَقُولُوا مَا لَا تَفْعَلُونَ
অর্থ : হে ঈমানদারগণ, কেন তোমরা এমন কথা বল যা তোমরা কর না? তোমরা এমন কিছু বলবে যা তোমরা কর না—এটা আল্লাহর কাছে খুবই কঠিন শাস্তিয়োগ্য অপরাধ। —সুরা সফ : ২-৩
দায়িয়াকে অবশ্যই উত্তম ব্যক্তিত্বের অধিকারী হতে হবে। আমল আখলাকে ধর্মীয় অনুশাসনের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন থাকতে হবে। নামায রোযা হজ যাকাত ইত্যাদি ফরজ ওয়াজিব ও নফলদেরও পাবন্দি করতে হবে। পর্দা ব্যাপারে হতে হবে সুচারু। শর্ত সমূহ সতো পালন করতে হবে পূর্ণাঙ্গ পর্দা। বেপর্দা চলবে না। মাহরাম ছাড়া কারও সামনে সৌন্দর্য প্রদর্শন করবে না।
আমাদের সমাজে অনেক ধার্মিক নারীকে দেখা যায়, যারা জিলবাব হিজাব ইত্যাদি পর্দার পোশাকগুলো ব্যবহার করেন ঠিকই; কিন্তু হাত মুখ চোখে কৃত্রিম সজ্জা গ্রহণ করে পুরুষদের সামনে যান। আবার পর্দা করারও দাবি করেন। অথচ মেকাপ, লিপস্টিক কিছুই বাদ রাখেন না। এভাবে ইসলামের নামে ইসলামের ক্ষতিসাধন হয়। বরং ইসলামের অবমাননা হয়। শুধু অন্যেরা নয়, অনেক মুসলিম মেয়েরও বিভ্রাতির শিকার হয়।
যিনি সত্যিকারের দায়িয়া হবেন, অন্যের প্রতি তার আচরণ হবে অমায়রিক। আচরণে উচ্চারণে কাউকে কষ্ট দেবেন না। সবসময় হবে তৎপর। নীরববতা হবে তাফাক্কুর ও হিকমাহ। মুখের ভাষা, শরীরের ভাষা হবে আল্লাহর হামদ ও ছানায় নূরানী। তুমি মূল্যবোধগুলো যখন একজন দায়িয়ার মনে প্রাণে গেঁথে যাবে, তখনই তার দাওয়াত সার্থকতা পাবে। অটলতা ও অবিচলতা লাভ করবে। কেননা, তখন তার অবস্থা এমন হবে যে, তিনি যা করতে বলেন তা নিজেও করেন; এবং যা ছাড়তে বলেন তা নিজেও ছাড়েন।
কবি বলেন, তুমি এমন কিছু ছাড়তে বোলো না, যা নিজেই কর; এমনটা যদি কর, তো এ বড় লজ্জাজনক ব্যাপার। শায়খ আবদুল ওয়াহিদ ইবনে যায়েদ রাহ. বলতেন, হাসান বসরী যে এত উচ্চ মর্যাদায় সমাসীন হয়েছিলেন এ-একটাই কারণ ছিল—তিনি যখন কোনো কিছু করার উপদেশ দিতেন তখন নিজেই সবার আগে তা পালন করতেন। আবার যখন কোনো কিছু ছাড়ার উপদেশ দিতেন, তখনো নিজেই সবার আগে তা ছেড়ে দিতেন।
সুতরাং আপনি যদি আপনার দাওয়াতকে মানুষকে প্রভাবিত করতে চান, যদি চান আপনার দাওয়াত ক্রিয়াশীল হোক, সার্থকতা লাভ করুক; তা হলে হৃদয়াত্মার পবিত্রতা অর্জন করুন, তাকওয়া তাহারাতের গুণে গুণান্বিত হোন, চিন্তা চেতনাকে স্বচ্ছ সুনির্মল করুন। দাওয়াতের প্রেরণা অনির্বাণ শিখা হয়ে জ্বলে উঠবে আপনার অন্তরে। মানুষ আপনার দাওয়াত কবুল করবে আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্যের প্রেরণায় সম্মোহিত হয়ে। আপনার একনিষ্ঠতায় প্রতিটি হৃদয়ে জেগে উঠবে পারস্পরিক সৌহার্দ্য সম্প্রীতি।
দেখুন না, একটি সুন্দর কথার কত সুন্দর দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন আপনার আমার আল্লাহ পবিত্র কুরআনে, তুমি কি দেখনি, আল্লাহ কেমন উদাহরণ দেন একটি ভালো কথার! যেন তা একটি ভালো গাছ। যার শেকর জমিনে গাড়া। আর শাখা প্রশাখা বিস্তৃত আসমানব্যাপী। সে তার প্রতিপালকের নির্দেশে ফল দান করে প্রতিনিয়ত। আল্লাহ মানুষের জন্য উদাহরণ দেন যেন তারা উপদেশ গ্রহণ করে। —সূরা ইবরাহীম : ২৪-২৫
আত্মসমালোচনার যোগ্যতা অর্জন করুন। নিজেই নিজের পরীক্ষা নিন প্রতিনিয়ত—ঈমানের পরীক্ষা, ইখলাসের পরীক্ষা। নিজেই নিজেকে যাচাই করুন সব সময়—দোষ-গুণ, ভালো মন্দ। মনে রাখবেন, আল্লাহ যখন কোনো মুমিনের কল্যাণ চান, তখনই তাকে নিজের দোষ ত্রুটি উপলব্ধি করার সক্ষমতা দান করেন। তাই আত্মপ্রশান্তিতে ভোগা মুমিনের কাজ নয়। এ বিষয়টি হৃদয়ঙ্গম করার চেষ্টা করুন যে, আপনি মুসলিম নারীসমাজের একজন দায়িত্বশীল প্রতিনিধি। তা ছাড়া, অনেকেই আপনাকে অনুসরণ করবে। তাই নিজের ব্যক্তিত্বের ব্যাপারে উদাসীন হবেন না। আপনার ওপর আল্লাহপ্রদত্ত বিরাট দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে।
কবি বলেন, একটু বুঝতে চেষ্টা করো, তোমার ওপর অর্পিত হয়েছে বিরাট দায়িত্ব। তাই বসে রও অপ্রয়োজনীয় কাজে সময় ফুরিও না।
প্রিয় বোন, নিজেকে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করুন যেন সম্ভাব্য সবকিছুতে আপনার আদর্শ সমুজ্জ্বল হয়ে থাকে আপনার চারপাশের নারীসমাজের জন্য। আপনি যদি কারও জীবনসঙ্গিনী হয়ে থাকেন, তা হলে একজন সত্যিকার সম্পূর্ণ মুসলিম রমণীর দৃষ্টান্ত স্থাপন করুন। নিজেকে এমন একজন স্ত্রী হিসেবে উপস্থাপন করুন যিনি সতীসাধ্বী। যিনি জীবনসত্তার প্রতি কৃতজ্ঞ, कर्तव्यপরায়ণ, একনিষ্ঠ, আন্তরিক, একজন বিশ্বস্ত, অন্তরঙ্গ বন্ধু ও সহযোগী; সুখে দুঃখে পাশের সাথী; দায়িত্ব কর্তব্য পালন পানে থাকেন; জীবন ও জগতের টানা পোড়নে স্বামীর প্রশান্তি; দাওয়াত ও তাবলীগের মশালবহনে স্বামীর ঘনিষ্ঠ সহকর্মী।
আপনি যদি কোনো সন্তানের জননী হয়ে থাকেন, তা হলে আপনিও হতে পারেন একজন সচেতন দায়িত্বশীল গৃহিণী। আপনার মস্তকেও শোভা পেতে পারে সত্যিকারের রত্নগর্ভার তাজ। আপনার ঘর হোক ইলম ও আলোর মিনার। আপনার ছেলেমেয়ে হোক তাকওয়া পরহেজগারীর অনন্য উদাহরণ। ইলমের অন্বেষণে তাদের মেহনত মোজাহাদা হোক প্রশংসনীয়। তাদের জ্ঞান ঈমান হোক আগামী প্রজন্মের মর্যাদা ও মাহাত্ম্য অর্জনের প্রেরণা। তাদের সাধনা আরাধনা ফিরিয়ে আনুক ইসলামের হারানো গৌরব। ইসলাম ও মুসলমানকে পুনপ্রতিষ্ঠিত করুক জ্ঞান মহিমায়।
ভাগ্য যদি আপনাকে শিক্ষিকার আসনে সমাসীন করে, আপনি যদি হন মানুষ গড়ার কারিগর, তা হলে স্বরূপ তুলে ধরুন প্রকৃত মুমিনের। আপনার সুপ্ত একনিষ্ঠতা, নিরন্তর কর্মোদ্দীপনা, সশ্রদ্ধ নিয়মুনুবর্তিতা, সুস্থ্য সময়সচেতনতা, অগাধ কর্তব্যপরায়ণতা যেন সর্বদাই শুভ্র সমুজ্জ্বল হয়ে থাকে; আপনার প্রতিটি ছাত্রীর মনে প্রাণে। আপনি আপনার ছাত্রীদের ধর্মীয় জীবনকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করুন। ধর্মের প্রতি তাদের মনে গভীর ভক্তি ও শ্রদ্ধা বোধ সৃষ্টি করুন। আপনি যদি ধর্মশিক্ষিকা হিসেবে নিযুক্ত নাও হন, তবুও একজন দায়িয়া হিসেবে তাদের ধর্মীয় চেতনাকে রক্ষা করা আপনার কর্তব্য।
বিশেষত আজকের আধুনিক পৃথিবীতে নিত্যনতুন বিষয় অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে এবং কর্মসূচিতে। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলোর মূল্যায়ন, এগুলোর তথ্যভিত্তিক নিরূপণ এবং শিক্ষার্থীদের সেদিকে দৃষ্টি আকর্ষণের দায়িত্ব সর্ব দিক থেকে আপনার ও ওপর বর্তায়। আজকাল বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচি এবং কর্মসূচিতে এমন অনেক বিষয় ঢোকানো হচ্ছে, যে গুলো স্পষ্টত ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক। কেউ তো এমন হবেন, যিনি এগুলোর প্রতিবাদ জানাবেন, এসব বিষয়ে সোচ্চার হবেন। অন্তত মুসলিম মেয়েদের চিন্তা চেতনাকে এসব বিষক্রিয়া থেকে মুক্ত রাখার ব্যাপারে মনোযোগী হবেন। সমাজসেবা, সামাজিক সচেতনতামূলক প্রচারণা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ইত্যাদি যাবতীয় প্রোগ্রামে মেয়েদেরও মাঠে নামানো হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ইসলামী মূল্যবোধ হয় উপেক্ষিত। এমনকি, এসবে ছেলেদের অনুপ্রবেশ ও উচ্ছৃঙ্খলতাও লজ্জাজনকভাবে পায় প্রশ্রয়। আবার মেয়েরা সামাজিকভাবে যেসব সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষকদের পক্ষে সেগুলোর সমাধান দেওয়া হয় ধর্মহীন সব চিন্তার আলোকে। মনে হয়, এসব নিয়ে তারাই প্রথম ভাবতে বসেছেন। ধর্মে এ নিয়ে কোনো কথা নেই। প্রায়ই নারীসম্পর্কিত বিষয়গুলোর ব্যাখ্যা ও সমাধান ধর্মীয় মূল্যবোধ বাদ দিয়ে। মেয়েরা দিশেহারা হয়ে যাচ্ছে ধর্ম ও জীবনের মাঝে সমন্বয় খুঁজে পেতে। ধার্মিক মেয়েরা হচ্ছে হীনমন্যতার শিকার।
প্রসঙ্গত, আজকাল শরীরচর্চার অনেক শিক্ষিকাই দায়িত্বহীনতার পরিচয় দেন। মেয়েদের পর্দাব্যবস্থা নিয়ে ভাবেন না। অনেকে সময় শিক্ষিকা অবশ্যই ছাত্রীদের জিলবাব খুলতে বাধ্য করেন। পরিবেশ পরিস্থিতিও তোয়াক্কা করেন না। এমনকি, নম্বর কাটারও হুমকি দেন। এই যদি হয় আরববিশ্বের মুসলিম রাষ্ট্রগুলো অবস্থা তা হলে অন্যদের সম্পর্কে কী বলা যায়? এরকম আরও অনেক বিষয় আছে যেগুলোতে সংস্কার প্রয়োজন। প্রয়োজন একজন নিঃস্বার্থ নির্ভিক দাইয়ার। যিনি অকপটে এগুলোর গঠনমূলক সমালোচনা করবেন। মুসলিম মেয়েদের ইসলামী মূল্যবোধ ও ভাবধারার ওপর অটল থাকতে প্রেরণা ও প্রণোদনা যোগাবেন। যারা মুসলিম মেয়েদের ইসলাম থেকে বিচ্যুত করতে চায়, মেধা দিয়ে শ্রম দিয়ে তাদের সক্ষম মোকাবেলা করবেন।
এরপরে আল্লাহ যদি আপনাকে চিকিৎসা-সেবার যোগ্যতা দান করেন, তা হলে মানবতার এ মহান পেশায় হালাল হারামের বিধান মেনে চলুন। আন্তরিকভাবে রোগীদের সেবা-শুশ্রূষা দিন। মেয়েলি বিষয়গুলোতে বিশেষভাবে মনোযোগী হোন। কেননা, মহিলা-ডাক্তার তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়। মুসলিম নারীসমাজ আপনার দ্বারা উপকৃত হতে পারবেন বেশি। এভাবে চিকিৎসা-সেবার গুরুত্বপূর্ণ কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যও প্রাধান্য দিন। উদাহরণস্বরূপ:
১. হৃদয়ের গভীরে থেকে পরিপূর্ণরূপে বিশ্বাস করুন এবং রোগী কে ও বিশ্বাস করান, আরোগ্য আল্লাহর হাতে। অসুখ পথ্য বাহ্যিক উপকরণ মাত্র।
২. দায়িত্ব পালনে ব্রতী হোন। গভীরভাবে উপলব্ধি করুন যে, আল্লাহ আপনাকে মুসলিম সমাজের সীমানা পাহারায় নিয়োজিত রেখেছেন। সুতরাং মেধা শক্তি সর্বস্ব ব্যয় করে মুসলিম সমাজের শরীরের অসুস্থতা ও স্বাস্থ্যকে সংক্রামক ব্যাধি এবং সংহারক জীবাণুর ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা করতে সচেষ্ট হোন।
৩. রোগীদের সাথে অমায়িক ব্যবহার করুন। দয়াপরবশ হোন। সাধ্যমত চেষ্টা করুন তাদের অন্তরে আশার আলো জ্বালাতে। তাদেরকে আল্লাহমুখী হতেও সহায়তা করতে পারেন আপনি।
৪. আমানতদারিতার পরিচয় দিন। শুধু কর্তব্য নয়। রোগীদের গোপনীয়তার বিষয়েও। অনেকেই এখানে অসচেতনতার শিকার। ফলে রোগীদের অসম্মান হয়। নিজের ব্যক্তিত্বও হয় প্রশ্নবিদ্ধ।
৫. নিজের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার উত্তর-উত্তর উন্নয়নে সচেষ্ট হোন। ধর্মীয় ব্যাপারেও। চিকিৎসার ব্যাপারেও। এভাবে মূলে পৌঁছার চেষ্টা করুন। বিশ্বনবীর যথাযথ জ্ঞানভাণ্ডারেও হাত দিতে পারেন। কেননা, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা মুমিনের হারানো সম্পদ।
মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন,
أَتَأْمُرُونَ النَّاسَ بِالْبِرِّ وَتَنْسَوْنَ أَنْفُসَكُمْ وَأَنْتُمْ تَتْلُونَ الْكِتَابَ أَفَلَا تَعْقِلُونَ
অর্থ: তোমরা কি মানুষকে সৎ কর্মের আদেশ দাও, আর নিজেদেরই ভুল থাক; অথচ কিতাবও তেলাওয়াত কর? তোমাদের কি আকল নেই? —সুরা বাকারা : ৪৪
তিনি আরও ইরশাদ করেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لِمَ تَقُولُونَ مَا لَا تَفْعَلُونَ كَبُرَ مَقْتًا عِنْدَ اللَّهِ أَنْ تَقُولُوا مَا لَا تَفْعَلُونَ
অর্থ : হে ঈমানদারগণ, কেন তোমরা এমন কথা বল যা তোমরা কর না? তোমরা এমন কিছু বলবে যা তোমরা কর না—এটা আল্লাহর কাছে খুবই কঠিন শাস্তিয়োগ্য অপরাধ। —সুরা সফ : ২-৩
দায়িয়াকে অবশ্যই উত্তম ব্যক্তিত্বের অধিকারী হতে হবে। আমল আখলাকে ধর্মীয় অনুশাসনের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন থাকতে হবে। নামায রোযা হজ যাকাত ইত্যাদি ফরজ ওয়াজিব ও নফলদেরও পাবন্দি করতে হবে। পর্দা ব্যাপারে হতে হবে সুচারু। শর্ত সমূহ সতো পালন করতে হবে পূর্ণাঙ্গ পর্দা। বেপর্দা চলবে না। মাহরাম ছাড়া কারও সামনে সৌন্দর্য প্রদর্শন করবে না।
আমাদের সমাজে অনেক ধার্মিক নারীকে দেখা যায়, যারা জিলবাব হিজাব ইত্যাদি পর্দার পোশাকগুলো ব্যবহার করেন ঠিকই; কিন্তু হাত মুখ চোখে কৃত্রিম সজ্জা গ্রহণ করে পুরুষদের সামনে যান। আবার পর্দা করারও দাবি করেন। অথচ মেকাপ, লিপস্টিক কিছুই বাদ রাখেন না। এভাবে ইসলামের নামে ইসলামের ক্ষতিসাধন হয়। বরং ইসলামের অবমাননা হয়। শুধু অন্যেরা নয়, অনেক মুসলিম মেয়েরও বিভ্রাতির শিকার হয়।
যিনি সত্যিকারের দায়িয়া হবেন, অন্যের প্রতি তার আচরণ হবে অমায়রিক। আচরণে উচ্চারণে কাউকে কষ্ট দেবেন না। সবসময় হবে তৎপর। নীরববতা হবে তাফাক্কুর ও হিকমাহ। মুখের ভাষা, শরীরের ভাষা হবে আল্লাহর হামদ ও ছানায় নূরানী। তুমি মূল্যবোধগুলো যখন একজন দায়িয়ার মনে প্রাণে গেঁথে যাবে, তখনই তার দাওয়াত সার্থকতা পাবে। অটলতা ও অবিচলতা লাভ করবে। কেননা, তখন তার অবস্থা এমন হবে যে, তিনি যা করতে বলেন তা নিজেও করেন; এবং যা ছাড়তে বলেন তা নিজেও ছাড়েন।
কবি বলেন, তুমি এমন কিছু ছাড়তে বোলো না, যা নিজেই কর; এমনটা যদি কর, তো এ বড় লজ্জাজনক ব্যাপার। শায়খ আবদুল ওয়াহিদ ইবনে যায়েদ রাহ. বলতেন, হাসান বসরী যে এত উচ্চ মর্যাদায় সমাসীন হয়েছিলেন এ-একটাই কারণ ছিল—তিনি যখন কোনো কিছু করার উপদেশ দিতেন তখন নিজেই সবার আগে তা পালন করতেন। আবার যখন কোনো কিছু ছাড়ার উপদেশ দিতেন, তখনো নিজেই সবার আগে তা ছেড়ে দিতেন।
সুতরাং আপনি যদি আপনার দাওয়াতকে মানুষকে প্রভাবিত করতে চান, যদি চান আপনার দাওয়াত ক্রিয়াশীল হোক, সার্থকতা লাভ করুক; তা হলে হৃদয়াত্মার পবিত্রতা অর্জন করুন, তাকওয়া তাহারাতের গুণে গুণান্বিত হোন, চিন্তা চেতনাকে স্বচ্ছ সুনির্মল করুন। দাওয়াতের প্রেরণা অনির্বাণ শিখা হয়ে জ্বলে উঠবে আপনার অন্তরে। মানুষ আপনার দাওয়াত কবুল করবে আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্যের প্রেরণায় সম্মোহিত হয়ে। আপনার একনিষ্ঠতায় প্রতিটি হৃদয়ে জেগে উঠবে পারস্পরিক সৌহার্দ্য সম্প্রীতি।
দেখুন না, একটি সুন্দর কথার কত সুন্দর দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন আপনার আমার আল্লাহ পবিত্র কুরআনে, তুমি কি দেখনি, আল্লাহ কেমন উদাহরণ দেন একটি ভালো কথার! যেন তা একটি ভালো গাছ। যার শেকর জমিনে গাড়া। আর শাখা প্রশাখা বিস্তৃত আসমানব্যাপী। সে তার প্রতিপালকের নির্দেশে ফল দান করে প্রতিনিয়ত। আল্লাহ মানুষের জন্য উদাহরণ দেন যেন তারা উপদেশ গ্রহণ করে। —সূরা ইবরাহীম : ২৪-২৫
আত্মসমালোচনার যোগ্যতা অর্জন করুন। নিজেই নিজের পরীক্ষা নিন প্রতিনিয়ত—ঈমানের পরীক্ষা, ইখলাসের পরীক্ষা। নিজেই নিজেকে যাচাই করুন সব সময়—দোষ-গুণ, ভালো মন্দ। মনে রাখবেন, আল্লাহ যখন কোনো মুমিনের কল্যাণ চান, তখনই তাকে নিজের দোষ ত্রুটি উপলব্ধি করার সক্ষমতা দান করেন। তাই আত্মপ্রশান্তিতে ভোগা মুমিনের কাজ নয়। এ বিষয়টি হৃদয়ঙ্গম করার চেষ্টা করুন যে, আপনি মুসলিম নারীসমাজের একজন দায়িত্বশীল প্রতিনিধি। তা ছাড়া, অনেকেই আপনাকে অনুসরণ করবে। তাই নিজের ব্যক্তিত্বের ব্যাপারে উদাসীন হবেন না। আপনার ওপর আল্লাহপ্রদত্ত বিরাট দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে।
কবি বলেন, একটু বুঝতে চেষ্টা করো, তোমার ওপর অর্পিত হয়েছে বিরাট দায়িত্ব। তাই বসে রও অপ্রয়োজনীয় কাজে সময় ফুরিও না।
প্রিয় বোন, নিজেকে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করুন যেন সম্ভাব্য সবকিছুতে আপনার আদর্শ সমুজ্জ্বল হয়ে থাকে আপনার চারপাশের নারীসমাজের জন্য। আপনি যদি কারও জীবনসঙ্গিনী হয়ে থাকেন, তা হলে একজন সত্যিকার সম্পূর্ণ মুসলিম রমণীর দৃষ্টান্ত স্থাপন করুন। নিজেকে এমন একজন স্ত্রী হিসেবে উপস্থাপন করুন যিনি সতীসাধ্বী। যিনি জীবনসত্তার প্রতি কৃতজ্ঞ, कर्तव्यপরায়ণ, একনিষ্ঠ, আন্তরিক, একজন বিশ্বস্ত, অন্তরঙ্গ বন্ধু ও সহযোগী; সুখে দুঃখে পাশের সাথী; দায়িত্ব কর্তব্য পালন পানে থাকেন; জীবন ও জগতের টানা পোড়নে স্বামীর প্রশান্তি; দাওয়াত ও তাবলীগের মশালবহনে স্বামীর ঘনিষ্ঠ সহকর্মী।
আপনি যদি কোনো সন্তানের জননী হয়ে থাকেন, তা হলে আপনিও হতে পারেন একজন সচেতন দায়িত্বশীল গৃহিণী। আপনার মস্তকেও শোভা পেতে পারে সত্যিকারের রত্নগর্ভার তাজ। আপনার ঘর হোক ইলম ও আলোর মিনার। আপনার ছেলেমেয়ে হোক তাকওয়া পরহেজগারীর অনন্য উদাহরণ। ইলমের অন্বেষণে তাদের মেহনত মোজাহাদা হোক প্রশংসনীয়। তাদের জ্ঞান ঈমান হোক আগামী প্রজন্মের মর্যাদা ও মাহাত্ম্য অর্জনের প্রেরণা। তাদের সাধনা আরাধনা ফিরিয়ে আনুক ইসলামের হারানো গৌরব। ইসলাম ও মুসলমানকে পুনপ্রতিষ্ঠিত করুক জ্ঞান মহিমায়।
ভাগ্য যদি আপনাকে শিক্ষিকার আসনে সমাসীন করে, আপনি যদি হন মানুষ গড়ার কারিগর, তা হলে স্বরূপ তুলে ধরুন প্রকৃত মুমিনের। আপনার সুপ্ত একনিষ্ঠতা, নিরন্তর কর্মোদ্দীপনা, সশ্রদ্ধ নিয়মুনুবর্তিতা, সুস্থ্য সময়সচেতনতা, অগাধ কর্তব্যপরায়ণতা যেন সর্বদাই শুভ্র সমুজ্জ্বল হয়ে থাকে; আপনার প্রতিটি ছাত্রীর মনে প্রাণে। আপনি আপনার ছাত্রীদের ধর্মীয় জীবনকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করুন। ধর্মের প্রতি তাদের মনে গভীর ভক্তি ও শ্রদ্ধা বোধ সৃষ্টি করুন। আপনি যদি ধর্মশিক্ষিকা হিসেবে নিযুক্ত নাও হন, তবুও একজন দায়িয়া হিসেবে তাদের ধর্মীয় চেতনাকে রক্ষা করা আপনার কর্তব্য।
বিশেষত আজকের আধুনিক পৃথিবীতে নিত্যনতুন বিষয় অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে এবং কর্মসূচিতে। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলোর মূল্যায়ন, এগুলোর তথ্যভিত্তিক নিরূপণ এবং শিক্ষার্থীদের সেদিকে দৃষ্টি আকর্ষণের দায়িত্ব সর্ব দিক থেকে আপনার ও ওপর বর্তায়। আজকাল বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচি এবং কর্মসূচিতে এমন অনেক বিষয় ঢোকানো হচ্ছে, যে গুলো স্পষ্টত ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক। কেউ তো এমন হবেন, যিনি এগুলোর প্রতিবাদ জানাবেন, এসব বিষয়ে সোচ্চার হবেন। অন্তত মুসলিম মেয়েদের চিন্তা চেতনাকে এসব বিষক্রিয়া থেকে মুক্ত রাখার ব্যাপারে মনোযোগী হবেন। সমাজসেবা, সামাজিক সচেতনতামূলক প্রচারণা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ইত্যাদি যাবতীয় প্রোগ্রামে মেয়েদেরও মাঠে নামানো হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ইসলামী মূল্যবোধ হয় উপেক্ষিত। এমনকি, এসবে ছেলেদের অনুপ্রবেশ ও উচ্ছৃঙ্খলতাও লজ্জাজনকভাবে পায় প্রশ্রয়। আবার মেয়েরা সামাজিকভাবে যেসব সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষকদের পক্ষে সেগুলোর সমাধান দেওয়া হয় ধর্মহীন সব চিন্তার আলোকে। মনে হয়, এসব নিয়ে তারাই প্রথম ভাবতে বসেছেন। ধর্মে এ নিয়ে কোনো কথা নেই। প্রায়ই নারীসম্পর্কিত বিষয়গুলোর ব্যাখ্যা ও সমাধান ধর্মীয় মূল্যবোধ বাদ দিয়ে। মেয়েরা দিশেহারা হয়ে যাচ্ছে ধর্ম ও জীবনের মাঝে সমন্বয় খুঁজে পেতে। ধার্মিক মেয়েরা হচ্ছে হীনমন্যতার শিকার।
প্রসঙ্গত, আজকাল শরীরচর্চার অনেক শিক্ষিকাই দায়িত্বহীনতার পরিচয় দেন। মেয়েদের পর্দাব্যবস্থা নিয়ে ভাবেন না। অনেকে সময় শিক্ষিকা অবশ্যই ছাত্রীদের জিলবাব খুলতে বাধ্য করেন। পরিবেশ পরিস্থিতিও তোয়াক্কা করেন না। এমনকি, নম্বর কাটারও হুমকি দেন। এই যদি হয় আরববিশ্বের মুসলিম রাষ্ট্রগুলো অবস্থা তা হলে অন্যদের সম্পর্কে কী বলা যায়? এরকম আরও অনেক বিষয় আছে যেগুলোতে সংস্কার প্রয়োজন। প্রয়োজন একজন নিঃস্বার্থ নির্ভিক দাইয়ার। যিনি অকপটে এগুলোর গঠনমূলক সমালোচনা করবেন। মুসলিম মেয়েদের ইসলামী মূল্যবোধ ও ভাবধারার ওপর অটল থাকতে প্রেরণা ও প্রণোদনা যোগাবেন। যারা মুসলিম মেয়েদের ইসলাম থেকে বিচ্যুত করতে চায়, মেধা দিয়ে শ্রম দিয়ে তাদের সক্ষম মোকাবেলা করবেন।
এরপরে আল্লাহ যদি আপনাকে চিকিৎসা-সেবার যোগ্যতা দান করেন, তা হলে মানবতার এ মহান পেশায় হালাল হারামের বিধান মেনে চলুন। আন্তরিকভাবে রোগীদের সেবা-শুশ্রূষা দিন। মেয়েলি বিষয়গুলোতে বিশেষভাবে মনোযোগী হোন। কেননা, মহিলা-ডাক্তার তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়। মুসলিম নারীসমাজ আপনার দ্বারা উপকৃত হতে পারবেন বেশি। এভাবে চিকিৎসা-সেবার গুরুত্বপূর্ণ কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যও প্রাধান্য দিন। উদাহরণস্বরূপ:
১. হৃদয়ের গভীরে থেকে পরিপূর্ণরূপে বিশ্বাস করুন এবং রোগী কে ও বিশ্বাস করান, আরোগ্য আল্লাহর হাতে। অসুখ পথ্য বাহ্যিক উপকরণ মাত্র।
২. দায়িত্ব পালনে ব্রতী হোন। গভীরভাবে উপলব্ধি করুন যে, আল্লাহ আপনাকে মুসলিম সমাজের সীমানা পাহারায় নিয়োজিত রেখেছেন। সুতরাং মেধা শক্তি সর্বস্ব ব্যয় করে মুসলিম সমাজের শরীরের অসুস্থতা ও স্বাস্থ্যকে সংক্রামক ব্যাধি এবং সংহারক জীবাণুর ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা করতে সচেষ্ট হোন।
৩. রোগীদের সাথে অমায়িক ব্যবহার করুন। দয়াপরবশ হোন। সাধ্যমত চেষ্টা করুন তাদের অন্তরে আশার আলো জ্বালাতে। তাদেরকে আল্লাহমুখী হতেও সহায়তা করতে পারেন আপনি।
৪. আমানতদারিতার পরিচয় দিন। শুধু কর্তব্য নয়। রোগীদের গোপনীয়তার বিষয়েও। অনেকেই এখানে অসচেতনতার শিকার। ফলে রোগীদের অসম্মান হয়। নিজের ব্যক্তিত্বও হয় প্রশ্নবিদ্ধ।
৫. নিজের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার উত্তর-উত্তর উন্নয়নে সচেষ্ট হোন। ধর্মীয় ব্যাপারেও। চিকিৎসার ব্যাপারেও। এভাবে মূলে পৌঁছার চেষ্টা করুন। বিশ্বনবীর যথাযথ জ্ঞানভাণ্ডারেও হাত দিতে পারেন। কেননা, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা মুমিনের হারানো সম্পদ।
📄 ৯. হালের কথা জানুন
দায়িয়াকে অবশ্যই সমসাময়িক আলোচিত সমালোচিত বিষয় সম্পর্কে ধারণা রাখতে হবে। পত্রপত্রিকাতেও এখন ইসলাম-বিরোধী অনেক লেখালেখি চলছে। পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ ইসলাম-বিদ্বেষ অনেক লেখক ও পত্রিকারই অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য। অনেক চিন্তাকর্ষক নিরীহ শব্দের ছদ্মাবরণে এসব লেখালেখি চলে। তাদের ভুলভাল ব্যাখ্যা, মনগড়া বিশ্লেষণ, স্পষ্ট মিথ্যাচার ও প্রকাশ্য ধর্মবিদ্বেষ সরলপ্রাণ মুসলমানের ঈমান ও আকীদার জন্য একএকটা মরণফাঁদ রচনা করছে। ইসলাম সম্পর্কে যাদের তেমন ধারণা নেই, বা ধর্মীয় ব্যাপারে অনভিজ্ঞ, তারা প্রায়ই এসব দূষিত চিন্তা-চেতনার দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছেন। দায়িয়া যদি এসব বিষয়ে উদাসীন থাকেন তা হলে দাওয়াতি কার্যক্রম সফলতা লাভ করা কঠিন। বিশেষত শিক্ষিতমহলে, শিক্ষাঙ্গন-পরিবেশে এর গুরুত্ব অপরিসীম।
বিভিন্ন মাদরাসা, জামিয়া, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে সব সময় দাওয়াতের কাজ চালু রাখতে হবে। মুসলিম মেয়েদের ঈমান আকীদার হেফাজতের জন্য দায়িয়াদের অবিরাম সাধনার প্রয়োজন। ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো, কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনাগুলো সব সময় তাদের সামনে তুলে ধরতে হবে। এটাকে কোনো মৌসুমি কাজ বানানো যাবে না। এটা সব সময়ের কাজ। নির্দিষ্ট কোনো সময়ে দাওয়াতের কাজ হলো, অন্য সময় বন্ধ থাকল এমনটা হলে চলবে না। সবকাজের আদেশ, অসৎ কাজের নিষেধ সব সময় সবখানে থাকতে হবে।
বিভিন্ন মুসলিম ও আরব দেশে দেখা যায়, শুধু নির্বাচনী সময় ও এলাকাতে দাওয়াতী কাজ হয়। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দাওয়াত সরগরম হয়ে ওঠে। কিন্তু এরপর থেমে যায়। যেন দাওয়াত শুধু ওই সময় ও ওই এলাকার সাথে সীমাবদ্ধ। দাওয়াতের জন্য সার্বক্ষণিক তৎপরতা চাই। সাময়িক তৎপরতার সুফলও সাময়িক।
আপনি যদি দাওয়াতের কাজে সফল হতে চান, তা হলে অবশ্যই আপনার পূর্ববর্তী দাইয়াদের সাথে কথা বলুন, সময় দিন। তাদের অভিজ্ঞতা অবশ্যই আপনার উপকারে আসবে। বিশেষত উলামামহল ও ধর্মীয় স্কলারদের সাথে যোগাযোগ ও দিক-নির্দেশনা অবশ্যই কাম্য। সরাসরি তাদের দ্বারা পরিচালিত কোনো উদ্যোগ থাকলে তো খুবই ভালো। তা না হলে, অন্তত তাদের লিখিত দাওয়াত ও তাবলীগের উসুল ও আদাব সম্পর্কিত লেখাগুলোকে পাঠ করে শিক্ষা গ্রহণ করুন।
আপনি যেসব ছাত্রীদের ঈমান ও ইসলামের দাওয়াত দেবেন, তাদের প্রত্যেকের অন্তরে ঈমানী জাগ্রত ও সৌহার্দ্য সৃষ্টি করার চেষ্টা করুন। মনে রাখবেন, ধর্মীয় ভ্রাতৃত্ববোধের চেতনা মুসলিম উম্মাহর সফলতার অপরিহার্য উপাদান। মহান আল্লাহ ইরশাদ করছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ ﴿١٠২﴾ وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا ۚ وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنتُمْ أَعْدَاءً فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ فَأَصْبَحْتُم بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا وَكُنتُمْ عَلَىٰ شَفَا حُفْرَةٍ مِّنَ النَّارِ فَأَنقَذَكُم مِّنْهَا كَذَٰلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ آيَاتِهِ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ ﴿١٠৩﴾ وَلْتَكُن مِّنكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
অর্থ : হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো—সত্যিকারের ভয় করা। তোমরা মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না। তোমরা আল্লাহ্র রজ্জুকে আকড়ে ধরো সকলে। তোমরা বিচ্ছিন্ন হয়ো না। স্মরণ করো আল্লাহ্র অনুগ্রহের কথা, যখন তোমরা ছিলে পরস্পর শত্রু, তখন তিনিই তোমাদের মাঝে সম্প্রীতি সৃষ্টি করলেন। তোমরা আল্লাহ্র অনুগ্রহে হয়ে গেলে পরস্পর ভাই ভাই। তোমরা ছিলে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। কিন্তু তিনি তোমাদের তা থেকে রক্ষা করলেন। এভাবেই আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর নিদর্শনাবলি ব্যক্ত করেন। হয়তো তোমরা দিশা পাবে। তোমাদের মধ্য থেকে একটি দল যেন এমন থাকে যারা সৎ কাজের আদেশ করে, অসৎ কাজের নিষেধ করে। আর তারাই সফলকাম। —সূরা আলে ইমরান : ১০২-১০৪
তাহলে প্রথমে অন্তরে আল্লাহ্র প্রতি ঈমান স্থাপন করতে হবে। তারপর আল্লাহ্র সাথে হৃদয়ের সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। তারপর মুমিনদের মধ্যে ঈমানের বন্ধন গড়ে তুলতে হবে। এই তিনটি কাজ পূর্ণ হলে ন্যায় ও সত্যের ওপর এক অপরের সহযোগিতার ভিত্তিতে ঈমানী ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা পাবে। মুমিন মুমিনের জন্য মজবুত দুর্গের মতো। একে অপরকে শক্তি যোগাবে। এ বন্ধন অটুট থাকবে শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করার পরও। ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আল্লাহ্র জন্য, যারা এক অপরকে ভালোবাসে তাদের অন্তরকে প্লাবিত রাখে। তাদের জন্য সময় ও স্থানের দূরত্ব কোনো বাধা হতে পারে না।
হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
'আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, নিশ্চয় আল্লাহ্র বান্দাদের মধ্যে এমন কিছু মানুষ আছে যারা নবীও নয় শহীদও নয়; কিন্তু নবী ও শহীদগণও তাদের মর্যাদার প্রতি ঈর্ষাবোধ করবে। বলা হলো, হে আল্লাহ্র রাসূল, আমাদের বলুন, তারা কারা? আমরা যদি তাদেরকে ভালোবাসতে পারি। তিনি বললেন, এরা এমন কিছু মানুষ যারা একে অপরকে ভালোবাসে শুধু আল্লাহ্র জন্য। না আত্মীয়তার বন্ধন তাদের মধ্যে রাখে, না তাদের মধ্যে কোনো আর্থিক লেনদেন হয়। আল্লাহ্র কসম, এরা আলোর ওপর প্রতিষ্ঠিত। যখন মানুষ ভয়ে ভীত থাকবে তখনও এরা ভীত হবে না। যখন মানুষ দুশ্চিন্তায় আচ্ছন্ন থাকবে তখনও এরা চিন্তিত হবে না। অতঃপর তিনি এই এই আয়াতটি তেলাওয়াত করলেন,
أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ
অর্থ : শোনো, আল্লাহ্র বন্ধুদের না কোনো ভয় থাকবে, আর না তারা চিন্তিত হবে। —সূরা ইউনুস : ৬২' ১
টিকাঃ
১. তিরমিযী (হুসনাদ, সহীহ)।
দায়িয়াকে অবশ্যই সমসাময়িক আলোচিত সমালোচিত বিষয় সম্পর্কে ধারণা রাখতে হবে। পত্রপত্রিকাতেও এখন ইসলাম-বিরোধী অনেক লেখালেখি চলছে। পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ ইসলাম-বিদ্বেষ অনেক লেখক ও পত্রিকারই অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য। অনেক চিন্তাকর্ষক নিরীহ শব্দের ছদ্মাবরণে এসব লেখালেখি চলে। তাদের ভুলভাল ব্যাখ্যা, মনগড়া বিশ্লেষণ, স্পষ্ট মিথ্যাচার ও প্রকাশ্য ধর্মবিদ্বেষ সরলপ্রাণ মুসলমানের ঈমান ও আকীদার জন্য একএকটা মরণফাঁদ রচনা করছে। ইসলাম সম্পর্কে যাদের তেমন ধারণা নেই, বা ধর্মীয় ব্যাপারে অনভিজ্ঞ, তারা প্রায়ই এসব দূষিত চিন্তা-চেতনার দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছেন। দায়িয়া যদি এসব বিষয়ে উদাসীন থাকেন তা হলে দাওয়াতি কার্যক্রম সফলতা লাভ করা কঠিন। বিশেষত শিক্ষিতমহলে, শিক্ষাঙ্গন-পরিবেশে এর গুরুত্ব অপরিসীম।
বিভিন্ন মাদরাসা, জামিয়া, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে সব সময় দাওয়াতের কাজ চালু রাখতে হবে। মুসলিম মেয়েদের ঈমান আকীদার হেফাজতের জন্য দায়িয়াদের অবিরাম সাধনার প্রয়োজন। ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো, কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনাগুলো সব সময় তাদের সামনে তুলে ধরতে হবে। এটাকে কোনো মৌসুমি কাজ বানানো যাবে না। এটা সব সময়ের কাজ। নির্দিষ্ট কোনো সময়ে দাওয়াতের কাজ হলো, অন্য সময় বন্ধ থাকল এমনটা হলে চলবে না। সবকাজের আদেশ, অসৎ কাজের নিষেধ সব সময় সবখানে থাকতে হবে।
বিভিন্ন মুসলিম ও আরব দেশে দেখা যায়, শুধু নির্বাচনী সময় ও এলাকাতে দাওয়াতী কাজ হয়। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দাওয়াত সরগরম হয়ে ওঠে। কিন্তু এরপর থেমে যায়। যেন দাওয়াত শুধু ওই সময় ও ওই এলাকার সাথে সীমাবদ্ধ। দাওয়াতের জন্য সার্বক্ষণিক তৎপরতা চাই। সাময়িক তৎপরতার সুফলও সাময়িক।
আপনি যদি দাওয়াতের কাজে সফল হতে চান, তা হলে অবশ্যই আপনার পূর্ববর্তী দাইয়াদের সাথে কথা বলুন, সময় দিন। তাদের অভিজ্ঞতা অবশ্যই আপনার উপকারে আসবে। বিশেষত উলামামহল ও ধর্মীয় স্কলারদের সাথে যোগাযোগ ও দিক-নির্দেশনা অবশ্যই কাম্য। সরাসরি তাদের দ্বারা পরিচালিত কোনো উদ্যোগ থাকলে তো খুবই ভালো। তা না হলে, অন্তত তাদের লিখিত দাওয়াত ও তাবলীগের উসুল ও আদাব সম্পর্কিত লেখাগুলোকে পাঠ করে শিক্ষা গ্রহণ করুন।
আপনি যেসব ছাত্রীদের ঈমান ও ইসলামের দাওয়াত দেবেন, তাদের প্রত্যেকের অন্তরে ঈমানী জাগ্রত ও সৌহার্দ্য সৃষ্টি করার চেষ্টা করুন। মনে রাখবেন, ধর্মীয় ভ্রাতৃত্ববোধের চেতনা মুসলিম উম্মাহর সফলতার অপরিহার্য উপাদান। মহান আল্লাহ ইরশাদ করছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ ﴿١٠২﴾ وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا ۚ وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنتُمْ أَعْدَاءً فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ فَأَصْبَحْتُم بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا وَكُنتُمْ عَلَىٰ شَفَا حُفْرَةٍ مِّنَ النَّارِ فَأَنقَذَكُم مِّنْهَا كَذَٰلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ آيَاتِهِ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ ﴿١٠৩﴾ وَلْتَكُن مِّنكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
অর্থ : হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো—সত্যিকারের ভয় করা। তোমরা মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না। তোমরা আল্লাহ্র রজ্জুকে আকড়ে ধরো সকলে। তোমরা বিচ্ছিন্ন হয়ো না। স্মরণ করো আল্লাহ্র অনুগ্রহের কথা, যখন তোমরা ছিলে পরস্পর শত্রু, তখন তিনিই তোমাদের মাঝে সম্প্রীতি সৃষ্টি করলেন। তোমরা আল্লাহ্র অনুগ্রহে হয়ে গেলে পরস্পর ভাই ভাই। তোমরা ছিলে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। কিন্তু তিনি তোমাদের তা থেকে রক্ষা করলেন। এভাবেই আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর নিদর্শনাবলি ব্যক্ত করেন। হয়তো তোমরা দিশা পাবে। তোমাদের মধ্য থেকে একটি দল যেন এমন থাকে যারা সৎ কাজের আদেশ করে, অসৎ কাজের নিষেধ করে। আর তারাই সফলকাম। —সূরা আলে ইমরান : ১০২-১০৪
তাহলে প্রথমে অন্তরে আল্লাহ্র প্রতি ঈমান স্থাপন করতে হবে। তারপর আল্লাহ্র সাথে হৃদয়ের সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। তারপর মুমিনদের মধ্যে ঈমানের বন্ধন গড়ে তুলতে হবে। এই তিনটি কাজ পূর্ণ হলে ন্যায় ও সত্যের ওপর এক অপরের সহযোগিতার ভিত্তিতে ঈমানী ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা পাবে। মুমিন মুমিনের জন্য মজবুত দুর্গের মতো। একে অপরকে শক্তি যোগাবে। এ বন্ধন অটুট থাকবে শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করার পরও। ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আল্লাহ্র জন্য, যারা এক অপরকে ভালোবাসে তাদের অন্তরকে প্লাবিত রাখে। তাদের জন্য সময় ও স্থানের দূরত্ব কোনো বাধা হতে পারে না।
হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
'আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, নিশ্চয় আল্লাহ্র বান্দাদের মধ্যে এমন কিছু মানুষ আছে যারা নবীও নয় শহীদও নয়; কিন্তু নবী ও শহীদগণও তাদের মর্যাদার প্রতি ঈর্ষাবোধ করবে। বলা হলো, হে আল্লাহ্র রাসূল, আমাদের বলুন, তারা কারা? আমরা যদি তাদেরকে ভালোবাসতে পারি। তিনি বললেন, এরা এমন কিছু মানুষ যারা একে অপরকে ভালোবাসে শুধু আল্লাহ্র জন্য। না আত্মীয়তার বন্ধন তাদের মধ্যে রাখে, না তাদের মধ্যে কোনো আর্থিক লেনদেন হয়। আল্লাহ্র কসম, এরা আলোর ওপর প্রতিষ্ঠিত। যখন মানুষ ভয়ে ভীত থাকবে তখনও এরা ভীত হবে না। যখন মানুষ দুশ্চিন্তায় আচ্ছন্ন থাকবে তখনও এরা চিন্তিত হবে না। অতঃপর তিনি এই এই আয়াতটি তেলাওয়াত করলেন,
أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ
অর্থ : শোনো, আল্লাহ্র বন্ধুদের না কোনো ভয় থাকবে, আর না তারা চিন্তিত হবে। —সূরা ইউনুস : ৬২' ১
টিকাঃ
১. তিরমিযী (হুসনাদ, সহীহ)।
দায়িয়াকে অবশ্যই সমসাময়িক আলোচিত সমালোচিত বিষয় সম্পর্কে ধারণা রাখতে হবে। পত্রপত্রিকাতেও এখন ইসলাম-বিরোধী অনেক লেখালেখি চলছে। পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ ইসলাম-বিদ্বেষ অনেক লেখক ও পত্রিকারই অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য। অনেক চিন্তাকর্ষক নিরীহ শব্দের ছদ্মাবরণে এসব লেখালেখি চলে। তাদের ভুলভাল ব্যাখ্যা, মনগড়া বিশ্লেষণ, স্পষ্ট মিথ্যাচার ও প্রকাশ্য ধর্মবিদ্বেষ সরলপ্রাণ মুসলমানের ঈমান ও আকীদার জন্য একএকটা মরণফাঁদ রচনা করছে। ইসলাম সম্পর্কে যাদের তেমন ধারণা নেই, বা ধর্মীয় ব্যাপারে অনভিজ্ঞ, তারা প্রায়ই এসব দূষিত চিন্তা-চেতনার দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছেন। দায়িয়া যদি এসব বিষয়ে উদাসীন থাকেন তা হলে দাওয়াতি কার্যক্রম সফলতা লাভ করা কঠিন। বিশেষত শিক্ষিতমহলে, শিক্ষাঙ্গন-পরিবেশে এর গুরুত্ব অপরিসীম।
বিভিন্ন মাদরাসা, জামিয়া, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে সব সময় দাওয়াতের কাজ চালু রাখতে হবে। মুসলিম মেয়েদের ঈমান আকীদার হেফাজতের জন্য দায়িয়াদের অবিরাম সাধনার প্রয়োজন। ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো, কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনাগুলো সব সময় তাদের সামনে তুলে ধরতে হবে। এটাকে কোনো মৌসুমি কাজ বানানো যাবে না। এটা সব সময়ের কাজ। নির্দিষ্ট কোনো সময়ে দাওয়াতের কাজ হলো, অন্য সময় বন্ধ থাকল এমনটা হলে চলবে না। সবকাজের আদেশ, অসৎ কাজের নিষেধ সব সময় সবখানে থাকতে হবে।
বিভিন্ন মুসলিম ও আরব দেশে দেখা যায়, শুধু নির্বাচনী সময় ও এলাকাতে দাওয়াতী কাজ হয়। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দাওয়াত সরগরম হয়ে ওঠে। কিন্তু এরপর থেমে যায়। যেন দাওয়াত শুধু ওই সময় ও ওই এলাকার সাথে সীমাবদ্ধ। দাওয়াতের জন্য সার্বক্ষণিক তৎপরতা চাই। সাময়িক তৎপরতার সুফলও সাময়িক।
আপনি যদি দাওয়াতের কাজে সফল হতে চান, তা হলে অবশ্যই আপনার পূর্ববর্তী দাইয়াদের সাথে কথা বলুন, সময় দিন। তাদের অভিজ্ঞতা অবশ্যই আপনার উপকারে আসবে। বিশেষত উলামামহল ও ধর্মীয় স্কলারদের সাথে যোগাযোগ ও দিক-নির্দেশনা অবশ্যই কাম্য। সরাসরি তাদের দ্বারা পরিচালিত কোনো উদ্যোগ থাকলে তো খুবই ভালো। তা না হলে, অন্তত তাদের লিখিত দাওয়াত ও তাবলীগের উসুল ও আদাব সম্পর্কিত লেখাগুলোকে পাঠ করে শিক্ষা গ্রহণ করুন।
আপনি যেসব ছাত্রীদের ঈমান ও ইসলামের দাওয়াত দেবেন, তাদের প্রত্যেকের অন্তরে ঈমানী জাগ্রত ও সৌহার্দ্য সৃষ্টি করার চেষ্টা করুন। মনে রাখবেন, ধর্মীয় ভ্রাতৃত্ববোধের চেতনা মুসলিম উম্মাহর সফলতার অপরিহার্য উপাদান। মহান আল্লাহ ইরশাদ করছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ ﴿١٠২﴾ وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا ۚ وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنتُمْ أَعْدَاءً فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ فَأَصْبَحْتُم بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا وَكُنتُمْ عَلَىٰ شَفَا حُفْرَةٍ مِّنَ النَّارِ فَأَنقَذَكُم مِّنْهَا كَذَٰلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ آيَاتِهِ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ ﴿١٠৩﴾ وَلْتَكُن مِّنكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
অর্থ : হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো—সত্যিকারের ভয় করা। তোমরা মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না। তোমরা আল্লাহ্র রজ্জুকে আকড়ে ধরো সকলে। তোমরা বিচ্ছিন্ন হয়ো না। স্মরণ করো আল্লাহ্র অনুগ্রহের কথা, যখন তোমরা ছিলে পরস্পর শত্রু, তখন তিনিই তোমাদের মাঝে সম্প্রীতি সৃষ্টি করলেন। তোমরা আল্লাহ্র অনুগ্রহে হয়ে গেলে পরস্পর ভাই ভাই। তোমরা ছিলে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। কিন্তু তিনি তোমাদের তা থেকে রক্ষা করলেন। এভাবেই আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর নিদর্শনাবলি ব্যক্ত করেন। হয়তো তোমরা দিশা পাবে। তোমাদের মধ্য থেকে একটি দল যেন এমন থাকে যারা সৎ কাজের আদেশ করে, অসৎ কাজের নিষেধ করে। আর তারাই সফলকাম। —সূরা আলে ইমরান : ১০২-১০৪
তাহলে প্রথমে অন্তরে আল্লাহ্র প্রতি ঈমান স্থাপন করতে হবে। তারপর আল্লাহ্র সাথে হৃদয়ের সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। তারপর মুমিনদের মধ্যে ঈমানের বন্ধন গড়ে তুলতে হবে। এই তিনটি কাজ পূর্ণ হলে ন্যায় ও সত্যের ওপর এক অপরের সহযোগিতার ভিত্তিতে ঈমানী ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা পাবে। মুমিন মুমিনের জন্য মজবুত দুর্গের মতো। একে অপরকে শক্তি যোগাবে। এ বন্ধন অটুট থাকবে শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করার পরও। ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আল্লাহ্র জন্য, যারা এক অপরকে ভালোবাসে তাদের অন্তরকে প্লাবিত রাখে। তাদের জন্য সময় ও স্থানের দূরত্ব কোনো বাধা হতে পারে না।
হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
'আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, নিশ্চয় আল্লাহ্র বান্দাদের মধ্যে এমন কিছু মানুষ আছে যারা নবীও নয় শহীদও নয়; কিন্তু নবী ও শহীদগণও তাদের মর্যাদার প্রতি ঈর্ষাবোধ করবে। বলা হলো, হে আল্লাহ্র রাসূল, আমাদের বলুন, তারা কারা? আমরা যদি তাদেরকে ভালোবাসতে পারি। তিনি বললেন, এরা এমন কিছু মানুষ যারা একে অপরকে ভালোবাসে শুধু আল্লাহ্র জন্য। না আত্মীয়তার বন্ধন তাদের মধ্যে রাখে, না তাদের মধ্যে কোনো আর্থিক লেনদেন হয়। আল্লাহ্র কসম, এরা আলোর ওপর প্রতিষ্ঠিত। যখন মানুষ ভয়ে ভীত থাকবে তখনও এরা ভীত হবে না। যখন মানুষ দুশ্চিন্তায় আচ্ছন্ন থাকবে তখনও এরা চিন্তিত হবে না। অতঃপর তিনি এই এই আয়াতটি তেলাওয়াত করলেন,
أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ
অর্থ : শোনো, আল্লাহ্র বন্ধুদের না কোনো ভয় থাকবে, আর না তারা চিন্তিত হবে। —সূরা ইউনুস : ৬২' ১
টিকাঃ
১. তিরমিযী (হুসনাদ, সহীহ)।
📄 ১০. চাই প্রিয় নেতৃত্ব
দায়িয়াকে হতে হবে অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারিণী। সাধারণ নারীদের চাইতে আলাদা গুণ বিশিষ্ট। পরিচালনা, উদ্যম, সার্বক্ষণিক পরিশ্রম, কুরআন সুন্নাহর জ্ঞান, জাগতিক বিষয়ে সূক্ষ্ম অন্তর্দৃষ্টি, পরমতসহিষ্ণুতা ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যের ভাণ্ডার।
একজন সফল দায়িয়াকে ক্ষুদ্রতার ঊর্ধ্বে উঠতে হবে। যথাস্থানে কথোপকথন ও প্রয়োজনে শালীন বিতর্কে পারদর্শিনী হতে হবে। দান খয়রাত ও সাহায্য সহযোগিতার হাতও হতে হবে প্রসারিত। তিনি হবেন সহনশীলতা, ক্ষমা-মার্জনা ও মহত্ত্বের প্রতিবিম্ব।
দায়িয়ার চরিত্র চিন্তা চেতনা ও কাজ কর্মে হবে ভারসাম্যপূর্ণ। পর্যাক্রমতা ও গুরুত্বপূর্ণতা অনুসারে। সুতরাং তার কর্তব্যের সূচিপত্রে প্রথমেই আসবে স্বামীর আনুগত্য ও দাম্পত্যজীবনের অধিকার আদায়ের বিষয়টি। তারপর আসবে সন্তান-লালনপালন ও পারিবারিক দায়িত্বপালনের বিষয়টি। এরপর আসবে দাওয়াতি কাজ।
সফল দায়িয়াকে অনুসরণ করতে হবে একটি যৌক্তিক, সমন্বিত কর্তব্যনীতি। এজন্য তিনি তাঁর মূল্যবান সময়গুলোকে ভাগ করে নেবেন। যাতে একজন স্ত্রী হিসেবে, একজন গৃহিণী হিসেবে তাঁর ওপর যে মৌলিক দায়িত্বগুলো বর্তায় সেগুলোর মাঝে এবং দাওয়াতি কাজের মাঝে সমন্বয় করা হয় সম্ভবপর। তা না হলে, নারীর যে কোনো কাজই— চাই সেটা দাওয়াতের মতো মহৎ কর্মই হোক বা আজকালকার চাকরিবাকরিই হোক— পারিবারিক জীবন ও দাম্পত্যজীবনের মূলে গিয়ে আঘাত করে বসবে। যার অনিবার্য ফল হবে সন্তানদের অধিকার লঙ্ঘন। এমন চাকরিবাকরি কোনোভাবেই প্রশংসিত হতে পারে না।
যাই হোক, কথা বলছিলাম দায়িয়াত্বের নেতৃত্বগুণ প্রসঙ্গে। এক্ষেত্রে সাহাবী, তাবেয়ী, তাবে-তাবেয়ী এবং পরবর্তী মুসলিম নারীগণের জীবনদর্শনে আমাদের জন্য অনেক শিক্ষণীয় বিষয় আছে। প্রসঙ্গত এখানে উল্লেখ করছি হযরত আসমা বিনতে ইয়াযিদ বিন সাকান রাযি.। তাঁর সুন্দর বাগ্মিতার কারণে তাঁকে বলা হতো খতিবাতুন নিসা। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণতা বিশিষ্ট। আল্লাহ্র রাস্তার এক গর্বিত মুজাহিদা। ইয়ারমুকের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং নয়জন রোমানকে জাহান্নামে পাঠিয়ে দিয়েছেন। তিনি নারী সাহাবীগণের মধ্যে পালন করতেন নেতৃস্থানীয় ভূমিকা। তিনি নারী সাহাবীগণের পক্ষ থেকে প্রতিনিধি হয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে যেতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বক্তব্য উপস্থাপনে মুগ্ধতা প্রকাশ করতেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার অধিকারিণী।
বর্ণিত আছে, একবার তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গিয়ে বললেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন সাহাবীগণের মধ্যে বসা ছিলেন। হযরত আসমা রাযি. বললেন,
'আপনার প্রতি আমার মা বাবা কুরবান হোক, হে আল্লাহ্র রাসূল, আমি আপনার নারী সাহাবীগণের পক্ষ হতে প্রতিনিধি হিসেবে এসেছি। আমি এই মুহূর্তে আমার পেছনে থাকা মুসলিম নারীদের প্রেরিত দূত। আমি যা বলছি, প্রত্যেকে তা-ই বলছে। আমার যা মত, প্রত্যেকেরও তা-ই মত। আল্লাহ আপনাকে নারী পুরুষের উভয় জন্যেই রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছেন। আমরা আপনার প্রতি ঈমান এনেছি এবং আপনার অনুসরণ করেছি। আমরা নারীরা অন্তঃপুরবাসিনী, পর্দানশীন; গৃহিণী। স্বামীসেবা আমাদের কাজ, সন্তান-লালনপালন আমাদের কর্তব্য। পক্ষান্তরে পুরুষেরা আমাদের থেকে এগিয়ে। তারা দলবদ্ধ হয়ে কাজ করে। জামাতে নামায পড়ে। রোগীদের দেখাশোনা করে। জানাযায় অংশগ্রহণ করে। আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে। তারা যখন জিহাদে বের হয়, তখন আমরা শুধু তাদের ধনসম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ করি। কাপড় বুনি, ধুই। ছেলেমেয়ে মানুষ করি। হে আল্লাহর রাসূল, আমরা কি পুরুষদের সমান আজর ও সওয়াব অর্জন করতে পারব?'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুগ্ধ হয়ে সাহাবা কেরামের দিকে তাকালেন। অতঃপর বললেন:
'আমার সাহাবীরা, এর আগে তোমরা কি কোনো নারীর মুখে ধর্মীয় বিষয়ে এরচেয়ে সুন্দর প্রশ্ন শুনেছ?'
সাহাবীগণ আরজ করলেন:
'হে আল্লাহর রাসূল, আপনি ঠিকই বলেছেন, আমরা তো ভাবতেও পারিনি যে, কোনো নারী এভাবে ভাবতে পারে।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আসমাকে লক্ষ্য করে বললেন,
'আসমা, তুমি ফিরে যাও, তোমার পেছনে থাকা আমার নারী সাহাবীদের জানিয়ে দাও, জীবনসঙ্গীর হক আদায় করা, তার মন রক্ষা করে চলা এবং তার আনুগত্য করা—এ পর্যন্ত পুরুষদের যত মর্যাদার কথা তুমি বললে সবগুলো থেকে—(আজর, সওয়াব ও কল্যাণের দিক থেকে) কোনো অংশে কম নয়।'১
টিকাঃ
১. বানাতুস সাহাবা: ৭৭।
দায়িয়াকে হতে হবে অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারিণী। সাধারণ নারীদের চাইতে আলাদা গুণ বিশিষ্ট। পরিচালনা, উদ্যম, সার্বক্ষণিক পরিশ্রম, কুরআন সুন্নাহর জ্ঞান, জাগতিক বিষয়ে সূক্ষ্ম অন্তর্দৃষ্টি, পরমতসহিষ্ণুতা ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যের ভাণ্ডার।
একজন সফল দায়িয়াকে ক্ষুদ্রতার ঊর্ধ্বে উঠতে হবে। যথাস্থানে কথোপকথন ও প্রয়োজনে শালীন বিতর্কে পারদর্শিনী হতে হবে। দান খয়রাত ও সাহায্য সহযোগিতার হাতও হতে হবে প্রসারিত। তিনি হবেন সহনশীলতা, ক্ষমা-মার্জনা ও মহত্ত্বের প্রতিবিম্ব।
দায়িয়ার চরিত্র চিন্তা চেতনা ও কাজ কর্মে হবে ভারসাম্যপূর্ণ। পর্যাক্রমতা ও গুরুত্বপূর্ণতা অনুসারে। সুতরাং তার কর্তব্যের সূচিপত্রে প্রথমেই আসবে স্বামীর আনুগত্য ও দাম্পত্যজীবনের অধিকার আদায়ের বিষয়টি। তারপর আসবে সন্তান-লালনপালন ও পারিবারিক দায়িত্বপালনের বিষয়টি। এরপর আসবে দাওয়াতি কাজ।
সফল দায়িয়াকে অনুসরণ করতে হবে একটি যৌক্তিক, সমন্বিত কর্তব্যনীতি। এজন্য তিনি তাঁর মূল্যবান সময়গুলোকে ভাগ করে নেবেন। যাতে একজন স্ত্রী হিসেবে, একজন গৃহিণী হিসেবে তাঁর ওপর যে মৌলিক দায়িত্বগুলো বর্তায় সেগুলোর মাঝে এবং দাওয়াতি কাজের মাঝে সমন্বয় করা হয় সম্ভবপর। তা না হলে, নারীর যে কোনো কাজই— চাই সেটা দাওয়াতের মতো মহৎ কর্মই হোক বা আজকালকার চাকরিবাকরিই হোক— পারিবারিক জীবন ও দাম্পত্যজীবনের মূলে গিয়ে আঘাত করে বসবে। যার অনিবার্য ফল হবে সন্তানদের অধিকার লঙ্ঘন। এমন চাকরিবাকরি কোনোভাবেই প্রশংসিত হতে পারে না।
যাই হোক, কথা বলছিলাম দায়িয়াত্বের নেতৃত্বগুণ প্রসঙ্গে। এক্ষেত্রে সাহাবী, তাবেয়ী, তাবে-তাবেয়ী এবং পরবর্তী মুসলিম নারীগণের জীবনদর্শনে আমাদের জন্য অনেক শিক্ষণীয় বিষয় আছে। প্রসঙ্গত এখানে উল্লেখ করছি হযরত আসমা বিনতে ইয়াযিদ বিন সাকান রাযি.। তাঁর সুন্দর বাগ্মিতার কারণে তাঁকে বলা হতো খতিবাতুন নিসা। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণতা বিশিষ্ট। আল্লাহ্র রাস্তার এক গর্বিত মুজাহিদা। ইয়ারমুকের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং নয়জন রোমানকে জাহান্নামে পাঠিয়ে দিয়েছেন। তিনি নারী সাহাবীগণের মধ্যে পালন করতেন নেতৃস্থানীয় ভূমিকা। তিনি নারী সাহাবীগণের পক্ষ থেকে প্রতিনিধি হয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে যেতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বক্তব্য উপস্থাপনে মুগ্ধতা প্রকাশ করতেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার অধিকারিণী।
বর্ণিত আছে, একবার তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গিয়ে বললেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন সাহাবীগণের মধ্যে বসা ছিলেন। হযরত আসমা রাযি. বললেন,
'আপনার প্রতি আমার মা বাবা কুরবান হোক, হে আল্লাহ্র রাসূল, আমি আপনার নারী সাহাবীগণের পক্ষ হতে প্রতিনিধি হিসেবে এসেছি। আমি এই মুহূর্তে আমার পেছনে থাকা মুসলিম নারীদের প্রেরিত দূত। আমি যা বলছি, প্রত্যেকে তা-ই বলছে। আমার যা মত, প্রত্যেকেরও তা-ই মত। আল্লাহ আপনাকে নারী পুরুষের উভয় জন্যেই রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছেন। আমরা আপনার প্রতি ঈমান এনেছি এবং আপনার অনুসরণ করেছি। আমরা নারীরা অন্তঃপুরবাসিনী, পর্দানশীন; গৃহিণী। স্বামীসেবা আমাদের কাজ, সন্তান-লালনপালন আমাদের কর্তব্য। পক্ষান্তরে পুরুষেরা আমাদের থেকে এগিয়ে। তারা দলবদ্ধ হয়ে কাজ করে। জামাতে নামায পড়ে। রোগীদের দেখাশোনা করে। জানাযায় অংশগ্রহণ করে। আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে। তারা যখন জিহাদে বের হয়, তখন আমরা শুধু তাদের ধনসম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ করি। কাপড় বুনি, ধুই। ছেলেমেয়ে মানুষ করি। হে আল্লাহর রাসূল, আমরা কি পুরুষদের সমান আজর ও সওয়াব অর্জন করতে পারব?'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুগ্ধ হয়ে সাহাবা কেরামের দিকে তাকালেন। অতঃপর বললেন:
'আমার সাহাবীরা, এর আগে তোমরা কি কোনো নারীর মুখে ধর্মীয় বিষয়ে এরচেয়ে সুন্দর প্রশ্ন শুনেছ?'
সাহাবীগণ আরজ করলেন:
'হে আল্লাহর রাসূল, আপনি ঠিকই বলেছেন, আমরা তো ভাবতেও পারিনি যে, কোনো নারী এভাবে ভাবতে পারে।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আসমাকে লক্ষ্য করে বললেন,
'আসমা, তুমি ফিরে যাও, তোমার পেছনে থাকা আমার নারী সাহাবীদের জানিয়ে দাও, জীবনসঙ্গীর হক আদায় করা, তার মন রক্ষা করে চলা এবং তার আনুগত্য করা—এ পর্যন্ত পুরুষদের যত মর্যাদার কথা তুমি বললে সবগুলো থেকে—(আজর, সওয়াব ও কল্যাণের দিক থেকে) কোনো অংশে কম নয়।'১
টিকাঃ
১. বানাতুস সাহাবা: ৭৭।
দায়িয়াকে হতে হবে অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারিণী। সাধারণ নারীদের চাইতে আলাদা গুণ বিশিষ্ট। পরিচালনা, উদ্যম, সার্বক্ষণিক পরিশ্রম, কুরআন সুন্নাহর জ্ঞান, জাগতিক বিষয়ে সূক্ষ্ম অন্তর্দৃষ্টি, পরমতসহিষ্ণুতা ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যর ভাণ্ডার।
একজন সফল দায়িয়াকে ক্ষুদ্রতার ঊর্ধ্বে উঠতে হবে। যথাস্থানে কথোপকথন ও প্রয়োজনে শালীন বিতর্কে পারদর্শিণী হতে হবে। দান খয়রাত ও সাহায্য সহযোগিতার হাতও হতে হবে প্রসারিত। তিনি হবেন সহনশীলতা, ক্ষমা-মার্জনা ও মহত্ত্বের প্রতিবিম্ব। দায়িয়ার চরিত্র চিন্তা চেতনা ও কাজ কর্মে হবে ভারসাম্যপূর্ণ। পর্যাক্রমতা ও গুরুত্বপূর্ণতা অনুসারে। সুতরাং তার কর্তব্যের সুচিপ্রত্র প্রথমেই আসবে স্বামীর আনুগত্য ও দাম্পত্যজীবনের অধিকার আদায়ের বিষয়টি। তারপর আসবে সন্তান-লালনপালন ও পারিবারিক দায়িত্বপালনের বিষয়টি। এরপর আসবে দাওয়াতী কাজ।
সফল দায়িয়াকে অনুসরণ করবেন একটি যৌক্তিক, সমন্বিত কর্তব্যনীতি। এজন্য তিনি তাঁর মূল্যবান সময়গুলোকে ভাগ করে নেবেন। যাতে একজন স্ত্রী হিসেবে, একজন গৃহিণী হিসেবে তাঁর ওপর যে মৌলিক দায়িত্বগুলো বর্তায় সেগুলোর মাঝে এবং দাওয়াতী কাজের মাঝে সময়সমন্বয় হয় সম্ভবপর। তা না হলে, নারীর যে কোনো কাজই— চাই সেটা দাওয়াতের মতো মহৎ কর্মই হোক বা আজকালকার চাকরিবাকরিই হোক— পারিবারিক জীবন ও দাম্পত্যজীবনের মূলে গিয়ে আঘাত করে বসবে। যার অনিবার্য ফল হবে সন্তানদের অধিকার লাঙ্ঘন। এমন চাকরিবাকরি কোনোভাবেই প্রশংসিত হতে পারে না।
যাই হোক, কথা বলছিলাম দায়িয়াত্বের নেতৃত্বগুণ প্রসঙ্গে। এক্ষেত্রে সাহাবী, তাবেয়ী, তাবে-তাবেয়ী এবং পরবর্তী মুসলিম নারীগণের জীবনদর্শনে আমাদের জন্য অনেক শিক্ষণীয় বিষয় আছে। প্রসঙ্গত এখানে উল্লেখ করছি হযরত আসমা বিনতে ইয়াযিদ বিন সাকান রাযি.। তাঁর সুন্দর বাগ্মিতার কারণে তাঁকে বলা হতো খতিবাতুল নিসা। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণতাবিশিষ্ট। আল্লাহ্র রাস্তার এক গর্বিত মুজাহিদা। ইয়ারমুকের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং নয়জন রোমানকে জাহান্নামে পাঠিয়ে দিয়েছেন। তিনি নারী সাহাবীগণের মধ্যে পালন করতেন নেতৃস্থানীয় ভূমিকা। তিনি নারী সাহাবীগণের পক্ষ থেকে প্রতিনিধি হয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে যেতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বক্তব্য উপস্থাপনে মুগ্ধতা প্রকাশ করতেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার অধিকারিণী।
বর্ণিত আছে, একবার তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গিয়ে বললেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন সাহাবীগণের মধ্যে বসা ছিলেন। হযরত আসমা রাযি. বললেন,
'আপনার প্রতি আমার মা বাবা কুরবান হোক, হে আল্লাহ্র রাসূল, আমি আপনার নারী সাহাবীগণের পক্ষ হতে প্রতিনিধি হিসেবে এসেছি। আমি এই মুহূর্তে আমার পেছনে থাকা মুসলিম নারীদের প্রেরিত দূত। আমি যা বলছি, প্রত্যেকে তা-ই বলছে। আমার যা মত, প্রত্যেকেরও তা-ই মত। আল্লাহ আপনাকে নারী পুরুষের উভয় জন্যেই রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছেন। আমরা আপনার প্রতি ঈমান এনেছি এবং আপনার অনুসরণ করেছি। আমরা নারীরা অন্তঃপুরবাসিনী, পর্দানশীন; গৃহিণী। স্বামীসেবা আমাদের কাজ, সন্তান-লালনপালন আমাদের কর্তব্য। পক্ষান্তরে পুরুষেরা আমাদের থেকে এগিয়ে। তারা দলবদ্ধ হয়ে কাজ করে। জামাতে নামায পড়ে। রোগীদের দেখাশোনা করে। জানাযায় অংশগ্রহণ করে। আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে। তারা যখন জিহাদ বের হয়, তখন আমরা শুধু তাদের ধনসম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ করি। কাপড় বুনি, ধুই। ছেলেমেয়ে মানুষ করি। হে আল্লাহর রাসূল, আমরা কি পুরুষদের সমান আজর ও সওয়াব অর্জন করতে পারব?'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুগ্ধ হয়ে সাহাবা কেরামের দিকে তাকালেন। অতঃপর বললেন:
'আমার সাহাবীরা, এর আগে তোমরা কি কোনো নারীর মুখে ধর্মীয় বিষয়ে এরচেয়ে সুন্দর প্রশ্ন শুনেছ?'
সাহাবীগণ আরজ করলেন:
'হে আল্লাহর রাসূল, আপনি ঠিকই বলেছেন, আমরা তো ভাবতেও পারিনি যে, কোনো নারী এভাবে ভাবতে পারে।'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আসমাকে লক্ষ্য করে বললেন,
'আসমা, তুমি ফিরে যাও, তোমার পেছনে থাকা আমার নারী সাহাবীদের জানিয়ে দাও, জীবনসঙ্গীর হক আদায় করা, তার মন রক্ষা করে চলা এবং তার আনুগত্য করা—এ পর্যন্ত পুরুষদের যত মর্যাদার কথা তুমি বললে সবগুলো থেকে—(আজর, সওয়াব ও কল্যাণের দিক থেকে) কোনো অংশে কম নয়।'
দায়িয়াকে হতে হবে অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারিণী। সাধারণ নারীদের চাইতে আলাদা গুণ বিশিষ্ট। পরিচালনা, উদ্যম, সার্বক্ষণিক পরিশ্রম, কুরআন সুন্নাহর জ্ঞান, জাগতিক বিষয়ে সূক্ষ্ম অন্তর্দৃষ্টি, পরমতসহিষ্ণুতা ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যর ভাণ্ডার।
একজন সফল দায়িয়াকে ক্ষুদ্রতার ঊর্ধ্বে উঠতে হবে। যথাস্থানে কথোপকথন ও প্রয়োজনে শালীন বিতর্কে পারদর্শিণী হতে হবে। দান খয়রাত ও সাহায্য সহযোগিতার হাতও হতে হবে প্রসারিত। তিনি হবেন সহনশীলতা, ক্ষমা-মার্জনা ও মহত্ত্বের প্রতিবিম্ব। দায়িয়ার চরিত্র চিন্তা চেতনা ও কাজ কর্মে হবে ভারসাম্যপূর্ণ। পর্যাক্রমতা ও গুরুত্বপূর্ণতা অনুসারে। সুতরাং তার কর্তব্যের সুচিপ্রত্র প্রথমেই আসবে স্বামীর আনুগত্য ও দাম্পত্যজীবনের অধিকার আদায়ের বিষয়টি। তারপর আসবে সন্তান-লালনপালন ও পারিবারিক দায়িত্বপালনের বিষয়টি। এরপর আসবে দাওয়াতী কাজ।
সফল দায়িয়াকে অনুসরণ করবেন একটি যৌক্তিক, সমন্বিত কর্তব্যনীতি। এজন্য তিনি তাঁর মূল্যবান সময়গুলোকে ভাগ করে নেবেন। যাতে একজন স্ত্রী হিসেবে, একজন গৃহিণী হিসেবে তাঁর ওপর যে মৌলিক দায়িত্বগুলো বর্তায় সেগুলোর মাঝে এবং দাওয়াতী কাজের মাঝে সময়সমন্বয় হয় সম্ভবপর। তা না হলে, নারীর যে কোনো কাজই— চাই সেটা দাওয়াতের মতো মহৎ কর্মই হোক বা আজকালকার চাকরিবাকরিই হোক— পারিবারিক জীবন ও দাম্পত্যজীবনের মূলে গিয়ে আঘাত করে বসবে। যার অনিবার্য ফল হবে সন্তানদের অধিকার লাঙ্ঘন। এমন চাকরিবাকরি কোনোভাবেই প্রশংসিত হতে পারে না।
যাই হোক, কথা বলছিলাম দায়িয়াত্বের নেতৃত্বগুণ প্রসঙ্গে। এক্ষেত্রে সাহাবী, তাবেয়ী, তাবে-তাবেয়ী এবং পরবর্তী মুসলিম নারীগণের জীবনদর্শনে আমাদের জন্য অনেক শিক্ষণীয় বিষয় আছে। প্রসঙ্গত এখানে উল্লেখ করছি হযরত আসমা বিনতে ইয়াযিদ বিন সাকান রাযি.। তাঁর সুন্দর বাগ্মিতার কারণে তাঁকে বলা হতো খতিবাতুল নিসা। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণতাবিশিষ্ট। আল্লাহ্র রাস্তার এক গর্বিত মুজাহিদা। ইয়ারমুকের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং নয়জন রোমানকে জাহান্নামে পাঠিয়ে দিয়েছেন। তিনি নারী সাহাবীগণের মধ্যে পালন করতেন নেতৃস্থানীয় ভূমিকা। তিনি নারী সাহাবীগণের পক্ষ থেকে প্রতিনিধি হয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে যেতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বক্তব্য উপস্থাপনে মুগ্ধতা প্রকাশ করতেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার অধিকারিণী।
বর্ণিত আছে, একবার তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গিয়ে বললেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন সাহাবীগণের মধ্যে বসা ছিলেন। হযরত আসমা রাযি. বললেন,
'আপনার প্রতি আমার মা বাবা কুরবান হোক, হে আল্লাহ্র রাসূল, আমি আপনার নারী সাহাবীগণের পক্ষ হতে প্রতিনিধি হিসেবে এসেছি। আমি এই মুহূর্তে আমার পেছনে থাকা মুসলিম নারীদের প্রেরিত দূত। আমি যা বলছি, প্রত্যেকে তা-ই বলছে। আমার যা মত, প্রত্যেকেরও তা-ই মত। আল্লাহ আপনাকে নারী পুরুষের উভয় জন্যেই রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছেন। আমরা আপনার প্রতি ঈমান এনেছি এবং আপনার অনুসরণ করেছি। আমরা নারীরা অন্তঃপুরবাসিনী, পর্দানশীন; গৃহিণী। স্বামীসেবা আমাদের কাজ, সন্তান-লালনপালন আমাদের কর্তব্য। পক্ষান্তরে পুরুষেরা আমাদের থেকে এগিয়ে। তারা দলবদ্ধ হয়ে কাজ করে। জামাতে নামায পড়ে। রোগীদের দেখাশোনা করে। জানাযায় অংশগ্রহণ করে। আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে। তারা যখন জিহাদ বের হয়, তখন আমরা শুধু তাদের ধনসম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ করি। কাপড় বুনি, ধুই। ছেলেমেয়ে মানুষ করি। হে আল্লাহর রাসূল, আমরা কি পুরুষদের সমান আজর ও সওয়াব অর্জন করতে পারব?'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুগ্ধ হয়ে সাহাবা কেরামের দিকে তাকালেন। অতঃপর বললেন:
'আমার সাহাবীরা, এর আগে তোমরা কি কোনো নারীর মুখে ধর্মীয় বিষয়ে এরচেয়ে সুন্দর প্রশ্ন শুনেছ?'
সাহাবীগণ আরজ করলেন:
'হে আল্লাহর রাসূল, আপনি ঠিকই বলেছেন, আমরা তো ভাবতেও পারিনি যে, কোনো নারী এভাবে ভাবতে পারে।'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আসমাকে লক্ষ্য করে বললেন,
'আসমা, তুমি ফিরে যাও, তোমার পেছনে থাকা আমার নারী সাহাবীদের জানিয়ে দাও, জীবনসঙ্গীর হক আদায় করা, তার মন রক্ষা করে চলা এবং তার আনুগত্য করা—এ পর্যন্ত পুরুষদের যত মর্যাদার কথা তুমি বললে সবগুলো থেকে—(আজর, সওয়াব ও কল্যাণের দিক থেকে) কোনো অংশে কম নয়।'
দায়িয়াকে হতে হবে অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারিণী। সাধারণ নারীদের চাইতে আলাদা গুণ বিশিষ্ট। পরিচালনা, উদ্যম, সার্বক্ষণিক পরিশ্রম, কুরআন সুন্নাহর জ্ঞান, জাগতিক বিষয়ে সূক্ষ্ম অন্তর্দৃষ্টি, পরমতসহিষ্ণুতা ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যর ভাণ্ডার।
একজন সফল দায়িয়াকে ক্ষুদ্রতার ঊর্ধ্বে উঠতে হবে। যথাস্থানে কথোপকথন ও প্রয়োজনে শালীন বিতর্কে পারদর্শিণী হতে হবে। দান খয়রাত ও সাহায্য সহযোগিতার হাতও হতে হবে প্রসারিত। তিনি হবেন সহনশীলতা, ক্ষমা-মার্জনা ও মহত্ত্বের প্রতিবিম্ব। দায়িয়ার চরিত্র চিন্তা চেতনা ও কাজ কর্মে হবে ভারসাম্যপূর্ণ। পর্যাক্রমতা ও গুরুত্বপূর্ণতা অনুসারে। সুতরাং তার কর্তব্যের সুচিপ্রত্র প্রথমেই আসবে স্বামীর আনুগত্য ও দাম্পত্যজীবনের অধিকার আদায়ের বিষয়টি। তারপর আসবে সন্তান-লালনপালন ও পারিবারিক দায়িত্বপালনের বিষয়টি। এরপর আসবে দাওয়াতী কাজ।
সফল দায়িয়াকে অনুসরণ করবেন একটি যৌক্তিক, সমন্বিত কর্তব্যনীতি। এজন্য তিনি তাঁর মূল্যবান সময়গুলোকে ভাগ করে নেবেন। যাতে একজন স্ত্রী হিসেবে, একজন গৃহিণী হিসেবে তাঁর ওপর যে মৌলিক দায়িত্বগুলো বর্তায় সেগুলোর মাঝে এবং দাওয়াতী কাজের মাঝে সময়সমন্বয় হয় সম্ভবপর। তা না হলে, নারীর যে কোনো কাজই— চাই সেটা দাওয়াতের মতো মহৎ কর্মই হোক বা আজকালকার চাকরিবাকরিই হোক— পারিবারিক জীবন ও দাম্পত্যজীবনের মূলে গিয়ে আঘাত করে বসবে। যার অনিবার্য ফল হবে সন্তানদের অধিকার লাঙ্ঘন। এমন চাকরিবাকরি কোনোভাবেই প্রশংসিত হতে পারে না।
যাই হোক, কথা বলছিলাম দায়িয়াত্বের নেতৃত্বগুণ প্রসঙ্গে। এক্ষেত্রে সাহাবী, তাবেয়ী, তাবে-তাবেয়ী এবং পরবর্তী মুসলিম নারীগণের জীবনদর্শনে আমাদের জন্য অনেক শিক্ষণীয় বিষয় আছে। প্রসঙ্গত এখানে উল্লেখ করছি হযরত আসমা বিনতে ইয়াযিদ বিন সাকান রাযি.। তাঁর সুন্দর বাগ্মিতার কারণে তাঁকে বলা হতো খতিবাতুল নিসা। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণতাবিশিষ্ট। আল্লাহ্র রাস্তার এক গর্বিত মুজাহিদা। ইয়ারমুকের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং নয়জন রোমানকে জাহান্নামে পাঠিয়ে দিয়েছেন। তিনি নারী সাহাবীগণের মধ্যে পালন করতেন নেতৃস্থানীয় ভূমিকা। তিনি নারী সাহাবীগণের পক্ষ থেকে প্রতিনিধি হয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে যেতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বক্তব্য উপস্থাপনে মুগ্ধতা প্রকাশ করতেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার অধিকারিণী।
বর্ণিত আছে, একবার তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গিয়ে বললেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন সাহাবীগণের মধ্যে বসা ছিলেন। হযরত আসমা রাযি. বললেন,
'আপনার প্রতি আমার মা বাবা কুরবান হোক, হে আল্লাহ্র রাসূল, আমি আপনার নারী সাহাবীগণের পক্ষ হতে প্রতিনিধি হিসেবে এসেছি। আমি এই মুহূর্তে আমার পেছনে থাকা মুসলিম নারীদের প্রেরিত দূত। আমি যা বলছি, প্রত্যেকে তা-ই বলছে। আমার যা মত, প্রত্যেকেরও তা-ই মত। আল্লাহ আপনাকে নারী পুরুষের উভয় জন্যেই রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছেন। আমরা আপনার প্রতি ঈমান এনেছি এবং আপনার অনুসরণ করেছি। আমরা নারীরা অন্তঃপুরবাসিনী, পর্দানশীন; গৃহিণী। স্বামীসেবা আমাদের কাজ, সন্তান-লালনপালন আমাদের কর্তব্য। পক্ষান্তরে পুরুষেরা আমাদের থেকে এগিয়ে। তারা দলবদ্ধ হয়ে কাজ করে। জামাতে নামায পড়ে। রোগীদের দেখাশোনা করে। জানাযায় অংশগ্রহণ করে। আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে। তারা যখন জিহাদ বের হয়, তখন আমরা শুধু তাদের ধনসম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ করি। কাপড় বুনি, ধুই। ছেলেমেয়ে মানুষ করি। হে আল্লাহর রাসূল, আমরা কি পুরুষদের সমান আজর ও সওয়াব অর্জন করতে পারব?'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুগ্ধ হয়ে সাহাবা কেরামের দিকে তাকালেন। অতঃপর বললেন:
'আমার সাহাবীরা, এর আগে তোমরা কি কোনো নারীর মুখে ধর্মীয় বিষয়ে এরচেয়ে সুন্দর প্রশ্ন শুনেছ?'
সাহাবীগণ আরজ করলেন:
'হে আল্লাহর রাসূল, আপনি ঠিকই বলেছেন, আমরা তো ভাবতেও পারিনি যে, কোনো নারী এভাবে ভাবতে পারে।'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আসমাকে লক্ষ্য করে বললেন,
'আসমা, তুমি ফিরে যাও, তোমার পেছনে থাকা আমার নারী সাহাবীদের জানিয়ে দাও, জীবনসঙ্গীর হক আদায় করা, তার মন রক্ষা করে চলা এবং তার আনুগত্য করা—এ পর্যন্ত পুরুষদের যত মর্যাদার কথা তুমি বললে সবগুলো থেকে—(আজর, সওয়াব ও কল্যাণের দিক থেকে) কোনো অংশে কম নয়।'