📘 ফিরে এসো নীড়ে 📄 ৫. হৃদয়ের গভীরে পৌঁছে দিন আহ্বান

📄 ৫. হৃদয়ের গভীরে পৌঁছে দিন আহ্বান


নিঃসন্দেহে দাওয়াতের কাজ বড় কঠিন। একজন বিজ্ঞ চিকিৎসক যেমন মানবদেহের রোগনির্ণয় ও আক্রান্ত স্থান নির্ধারণের পর ব্যবস্থাপত্র প্রদান করেন তেমনই একজন দাই ইলাল্লাহ। তিনিও একজন চিকিৎসক। তিনি চিকিৎসা করেন উম্মাহর হৃদয়-জগতের। সময় ও সমাজের প্রভাবে, অন্যদের অন্ধ অনুকরণে উম্মাহর অস্থিমজ্জায় যে ব্যাধি সৃষ্টি হয়, যে রোগজীবাণু ছড়িয়ে যায়, তারই চিকিৎসা করেন একজন দাই ইলাল্লাহ।

তবে দাওয়াতের ক্রিয়াশীলতার জন্য দাই এর প্রয়োজন বলিষ্ঠ যুক্তিশক্তির, সক্ষম বাগ্মিতার। প্রয়োজন আল্লাহর নূরের নূরানী একটি তাজা ও সাচ্চা দিলের। যার প্রতিটি বাণী উৎসারিত হয় হৃদয়ের গভীর থেকে। তাই স্থিত হয় হৃদয়েরই গভীরে। পূর্ণ বিশ্বাসের সাথে। পূর্ণ আস্থার সাথে। যেন মানুষ আশার আলো দেখে। আভাস পায় একটি সুন্দর জীবনের, একটি সুন্দর পৃথিবীর। রোগভয়, শোকাহত মানবহৃদয়ে দাইয়ের আহ্বান যেন রোগনিরাময়কারী এক ফোঁটা প্রতিষেধক হয়েই পতিত হয়। সে যেন প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে আল্লাহর স্মরণে।

দাওয়াতের জন্য সম্বোধন করতে হবে মানবহৃদয়কে। মানুষ ও মানবতার প্রতি হিতাকাঙ্ক্ষী নিয়ে। হৃদয়গ্রাহী ভাষায়। সুন্দর আচরণে, সুন্দর উচ্চারণে। সাথে থাকবে আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠতা। সম্বোধিতের প্রতি আন্তরিকতা ও কল্যাণকামিতা। যাতে সে সর্বোত্তমরূপে মনোযোগী হয় আপনার আহ্বানের প্রতি। তা হলেই সে প্রভাবিত হবে। আপনার প্রতিটি কথা তার অন্তরে বদ্ধমূল হবে।

মনে পড়ে, সত্তরের দশকের মাঝের দিকে যখন ইসলামী পুনর্জাগরণের শুভ সূচনা হয় তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মতত্ত্ব বিভাগের ছাত্রী। নতুন প্রজন্মের মেয়েদের ধর্মীয় অনুভূতিকে জাগিয়ে তুলতে মুসলিম দাইয়াহগণ তখন কী শ্রমই না দিয়েছিলেন! কী সাধনাই না করেছিলেন!

জীবন ও জগতের নিত্যনতুন বিষয়ে আলোচনায় অবতীর্ণ হতেন তাঁরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নারীদের সাথে আলোচনা করতেন। রাস্তায় দাঁড়িয়ে, ঘরে বসে, ক্লাসরুমে গিয়ে বিভিন্ন অবস্থায় তাদের সাথে কথা বলতেন। চলত অনবরত গ্রহণ ও প্রত্যাখ্যান, চিন্তার আদানপ্রদান ও আবেগ-অনুভূতির বিনিময়। এভাবে অনেকের হৃদয়ের বদ্ধ দুয়ার খুলে যেত। মনে উঁকি দিত অজস্র প্রশ্ন। যা জন্ম দিত এক অতন্ত্যগভীর চেতনাশক্তির।

পবিত্র নগরী বাইতুল মাকদিসের একটি বিদ্যালয়ে আমি শিক্ষিকা হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলাম। ওই সময় থেকেই আমি দাওয়াতের কাজকে নিজের ব্রত বানিয়ে নিই। শিক্ষাজীবনে বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখে আসা মুসলিম দাইয়াহদের দাওয়াতের রীতি-নীতি ছিল আমার পাথেয়।

আমি যেদিন প্রথমবারে মতো শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করলাম সেদিন অবাক না হয়ে পারলাম না। আমি আমার ছাত্রীদেরকে লক্ষ্য করে ইসলামের সম্বোধন বাক্য উচ্চারণ করলাম। বললাম, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। কিন্তু একি, সবাই নিশ্চুপ! একটি ছাত্রীও আমার সালামের উত্তর দিল না।

আরও আশ্চর্যের বিষয় এই যে, আমি লক্ষ করলাম, তাদের আচরণে আমি যতটা অবাক হয়েছি, আমার সালামে তারা তারচে বেশি হতবাক হয়েছে। জানতে চাইলাম, তারা এমন হতবাক হয়ে গেল কেন? কেন সালামের উত্তর দিল না কেন?

অবশেষে একজন জানতে চাইল, কী বলতে হবে? আমি বললাম, তোমরা বলো, ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ – এটা হলো দুনিয়া ও আখিরাতে ইসলাম ও মুসলমানদের পারস্পরিক সম্বোধন বাক্য।

এরপর আমি চক হাতে নিয়ে বোর্ডের দিকে অগ্রসর হলাম। আমি বোর্ডে একটি বাক্য লিখলাম,
ماذا يعني انتمائي للإسلام
ইসলামের সাথে আমার সম্পর্কের মর্ম কী?

আমি এক এক করে আমার প্রত্যেকটি ছাত্রীকে জিজ্ঞেস করলাম। খুব কম ছাত্রীই উত্তর দিতে পারল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তোমরা কি মুসলিম? তারা উত্তর দিল, হ্যাঁ। আমি জিজ্ঞেস করলাম, অন্যদের তুলনায় একটি মুসলিম মেয়ের ভিন্নতা কী, জানো? তারা উত্তর দিল, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ বলা। আমি বললাম, আর কিছু? তারা বলল, আর কিছু জানি না।

সেই মুহূর্তেই আমার সমগ্র সত্তা যেন হিম হয়ে গেল। আমি উপলব্ধি করলাম, এ এক লক্ষ্যহীন দিশেহারা প্রজন্ম; এরা আত্মপরিচয়হীন, আত্মোপলদ্ধিহীন। কেননা, এদের বাস এমন এক পরিবেশে যা ইসলাম থেকে দূরে, অনেক দূরে।

আমি ছিলাম ধর্মশিক্ষিকা। তাই অনেকটাই সহজ হলো। ছাত্রীদের ধর্মের তালীম দিতে লাগলাম। একদম গোড়া থেকে। ইসলামের রুকন থেকে শুরু করে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক সকল স্তরের আমলী তালীম। ওযু কীভাবে করতে হবে, নামায কীভাবে পড়তে হবে ইত্যাদি।

আমি ক্লাস শেষে তাদের সাথে নিয়ে প্রতিদিন যোহরের নামায আদায় করতাম। বিদ্যালয়সংলগ্ন একটি নামাযগাহ ছিল। যদিও ছাত্রীদের পর্যাপ্ত জ্ঞান অর্জনের জন্য অনেক সময়ের প্রয়োজন ছিল; কিন্তু আল্লাহর সাহায্য হলে সবই সহজে হয়ে যায়। ছাত্রীদের মধ্যে সাড়া জাগল। নতুন শিক্ষিকার বিষয়গুলো অবগত হতে নতুন নতুন কথাবার্তা তাদের আলোচনার বিষয়ে পরিণত হলো।

অল্প দিনের মধ্যেই পুরো বিদ্যালয়ে শুরু হলো শোরগোল। ধর্মের ক্লাস চলছে এবং কী হচ্ছে? ধর্মশিক্ষিকা ক্লাস করাবেন, বই পড়াবেন। ওযু করাতে, নামায পড়াতে কে বলেছে তাকে? এ তো বিদ্যালয়। একে ধর্মীয় কেন্দ্র বানানোর অধিকার তিনি কোত্থেকে পেলেন? এরকম আরও অনেক কথা। কিন্তু আমি পিছুপা হলাম না। দৃঢ়তার সাথে আমার কাজ চালিয়ে যেতে থাকলাম।

আমি আমার ছাত্রীদেরকে পথ চলার, কথা বলার ইসলামী শিষ্টাচার শিক্ষা দিতে লাগলাম। ক্লাসরুম থেকে সুশৃঙ্খলভাবে বের হওয়া, আবার সুশৃঙ্খলভাবে ফিরে আসা, বিদ্যালয়ের আঙিনা, চলার পথ পরিচ্ছন্ন রাখা—ইত্যাদি বিষয়ে উৎসাহিত করতে থাকলাম।

অভিভাবকরা বিষয়গুলো অবগত হতে অনেক খুশি হলেন। অনেকে আপত্তিও করলেন। বিশেষ করে, ছোট ছোট মেয়েকে ওযু করিয়ে, নামায পড়িয়ে কী চাইছি আমি? তখন সেখানে নামাযের প্রচলন ছিল না তা নয়। তবে নামাযী ছিলেন শুধু বয়স্ক বুড়াবুড়ি। সেখানকার মানুষের ধারণা ছিল, নামায পড়া বয়স্কদের কাজ। তরুণদের নামায পড়া মানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় অপচয়, পেছনে ফিরে যাওয়া, প্রগতিকে ব্যাহত করা ইত্যাদি। আর আমার ওপর এটির মূল অপবাদই ছিল এটিই।

যাই হোক, আমি আমার ছাত্রীদের সামাজিক ইসলামী শিষ্টাচারের উদ্বুদ্ধ করতে লাগলাম। সালাম থেকে শুরু করে জাযাকাল্লাহু খাইরান বলা, মুসলিম বোনদের সাথে হাসিমুখে মিলিত হওয়া, সুন্দর ও শালীন ভাষায় কথা বলা ইত্যাদি।

প্রায় এক বছর অতিবাহিত হলো। আমার অনেক ছাত্রী, বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষিকা এবং অনেক অভিভাবিকা ‘ধর্মের ক্লাস’ এবং ‘ধর্মশিক্ষিকা’ দ্বারা প্রভাবিত হলেন। আমারও তামান্না ছিল, এ হৃদয়গুলো সত্যের আলো লাভ করুক। তাদের অতল গহ্বরে যে সত্য ঢেকে পড়ে থাকতে শুরু করেছে সে সত্য আবার উদ্ভাসিত হোক।

এক বছর অতিবাহিত হলো। আমি কিছু নামাযী নারী পেলাম, যারা ধর্মীয় শিষ্টাচার মেনে চলেন। বিষয়টি আর যাই হোক, এটা অবশ্যই প্রমাণ করে যে, সত্যের প্রতি প্রতিটি মানুষেরই টান বিদ্যমান; উপযুক্ত পরিবেশ পেলে অঙ্কুরিত হবে চারা, পরিচর্যা হলে উঠবে পত্রপল্লবিত, ফুলবতী, ফলবান।

আমি তখন পর্যন্ত পর্দা প্রথা তুলতে পারিনি। কেননা, পরিবেশ প্রতিকূল ছিল। তাদের কাছে পর্দাপ্রথা ছিল একদমই নতুন। এ বিষয়ে তাদের কোনো অবগতিই ছিল না। কিন্তু এক বছরের অবিরাম সাধনায় আল্লাহ কিছু হৃদয়কে আলোকিত করেছেন। তারা আর সত্যকে স্বীকার করতে কুণ্ঠিত নয়।

আমি একটু একটু করে পর্দার বিষয়েও বলতে লাগলাম। আমি আমার ছাত্রীদের বোঝাতে লাগলাম যে, পর্দা করা প্রত্যেক মুসলিম নারীর ওপর ফরজ।

কিন্তু নামাযের আহ্বানে যতটা সাড়া পেয়েছিলাম, পর্দার আহ্বানে ততটা সাড়া পাওয়া গেল না। কেননা, জিলবাব (পর্দার পোশাক) তাদের চোখে নতুন বা অদ্ভুত বিষয় ছিল। পারিবারিকভাবে আসত বাধা। সামাজিকভাবেও পড়তে হতো রোষানলে। আর ‘নারী স্বাধীনতার’ দোহাই দেওয়া কথা তো বলাই বাহুল্য। সর্বত্র চলছিল ধর্মীয় মূল্যবোধ, তাহজীব-তামাদ্দুন ছুঁড়ে ফেলার জোরদার প্রস্তুতি। এমনকি, পর্দা করা তো দূরে থাক মায়েরা ছাত্রীদের বোরকা পরতেও বারণ করতেন।

এক এক করে কয়েক বছর কেটে গেল। একটি দুটি করে অনেক মেয়ে পরিবারের বাধা, সমাজের উপহাস, সহপাঠিনীদের ঠাট্টা-বিদ্রূপ সত্ত্বেও পর্দার ফরজ বিধানকে মেনে নিল। কোনো একটি শ্রেণিতে একটি মেয়েকেও যখন জিলবাব পরতে দেখতাম, তখন আনন্দে মন ভরে যেত। আমার কাছে এটাকে মনে হতো বিরাট সফলতা। আল্লাহর শোকর, আজ সেখানে অনেক মানুষ তৈরি হয়েছেন যারা জানেন এবং বিশ্বাস করেন, পর্দা একটি ফরজ ইবাদত। প্রত্যেকটি প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে এই ইবাদত করতেই হবে।

বলতে পারেন, যারা শিক্ষিকা বা জাতীয় কোনো পেশায় নিয়োজিত, তাদের পক্ষে দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা করা সহজ। কিন্তু যারা কোনো কাজে নেই তাদের পক্ষে এসবের সুযোগ কোথায়? কিন্তু আমি বলব, মুসলিম নারীর পক্ষে দাওয়াতি কাজের কোনো সুযোগই হাতছাড়া করা উচিত নয়। কোনো কাজে না থাকলেও অপরাপর নারীর সাথে যোগাযোগের অসংখ্য সুযোগ আছে।

আমাদের দেশে তো বিভিন্ন সাপ্তাহিক মজলিস হয়। পাড়াপ্রতিবেশিনীরা, বান্ধবীরা সপ্তাহে অন্তত একদিন কোনো একজনের বাড়িতে জড়ো হয়। গল্পগুজব করে, আনন্দ-বিনোদন করে, এরপর যার যার বাসায় ফিরে যায়। তা হলে আধুনিকতার দোহাই দেওয়া এসব গল্পগুজব, আনন্দ-বিনোদন না করে আমরা কি সেখানে দ্বীনি আলোচনা করতে পারি না? কুরআন হাদীসের কথা বলতে পারি না? পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক বিভিন্ন সমস্যা ও অসঙ্গতিগুলোকে ধর্মীয় আঙ্গিকে পর্যালোচনা করতে পারি না?

মনে হতে হতে পারে, যেখানে যেটা চালু হয়ে গেছে, সেটাকে তুলে দেওয়া বা বদলানো কঠিন। কিন্তু এও সত্য যে, আপনি যদি সংকল্প করেন, তা হলে আল্লাহর সাহায্য অবশ্যই আপনাকে সঙ্গ দেবে।

একসময় আমি সৌদি আরব রিয়াদের একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতাম। প্রতি শনিবার শিক্ষিকাদের কক্ষে গেলেই ছুটির দিনে তাদের আহার-বিহার ও ঘোরাফেরার গল্পগুজব শুনতে পেতাম। ছুটির দিনে কে কার বাড়িতে গিয়েছিলেন, সেসব গল্প।

আমি জিজ্ঞেস করতাম, ছুটির দিনে বান্ধবীর বাড়িতে গিয়ে কীভাবে সময় কাটান? তারা বলতেন, 'খাই দাই, নাচি গাই, ফুর্তি করি।' আমি বলতাম, আচ্ছা, সারা সপ্তাহে মাত্র একটা দিন—মাত্র একটা দিন অন্তত—পুরো সময়টা পরিবারের সাথে কাটানো যায় না? আহার-বিহার, আনন্দ-বিনোদন যা করার স্বামী-সন্তান নিয়ে তো বেশি জমে। তারাই তো অধিক হকদার এই সময়টুকু আপনাকে কাছে পাবার।

তারা আমার কথার কোনো উত্তর দিতেন না। কেউ হেসে উড়িয়ে দিতেন। কেউ রাগও করতেন। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে, আল্লাহর শোকর, শিক্ষিকাদের কক্ষে ওসব অনর্থক গল্পগুজব আর শোনা যেত না।

আমি আমার নিজের জীবনের কথাগুলো বলছি গর্ব করার জন্য নয়; বরং এজন্য যে, এতে বাস্তবতা অনেক সহজ হয়ে দেখা দেয়—হাতে ধরার মতো, চোখে দেখার মতো মূর্ত সহজ হয়। আল্লাহই উত্তম তওফিকদাতা।

নিঃসন্দেহে দাওয়াতের কাজ বড় কঠিন। একজন বিজ্ঞ চিকিৎসক যেমন মানবদেহের রোগনির্ণয় ও আক্রান্ত স্থান নির্ধারণের পর ব্যবস্থাপত্র প্রদান করেন তেমনই একজন দাই ইলাল্লাহ। তিনিও একজন চিকিৎসক। তিনি চিকিৎসা করেন উম্মাহর হৃদয়-জগতের। সময় ও সমাজের প্রভাবে, অন্যদের অন্ধ অনুকরণে উম্মাহর অস্থিমজ্জায় যে ব্যাধি সৃষ্টি হয়, যে রোগজীবাণু ছড়িয়ে যায়, তারই চিকিৎসা করেন একজন দাই ইলাল্লাহ।

তবে দাওয়াতের ক্রিয়াশীলতার জন্য দাই এর প্রয়োজন বলিষ্ঠ যুক্তিশক্তির, সক্ষম বাগ্মিতার। প্রয়োজন আল্লাহর নূরের নূরানী একটি তাজা ও সাচ্চা দিলের। যার প্রতিটি বাণী উৎসারিত হয় হৃদয়ের গভীর থেকে। তাই স্থিত হয় হৃদয়েরই গভীরে। পূর্ণ বিশ্বাসের সাথে। পূর্ণ আস্থার সাথে। যেন মানুষ আশার আলো দেখে। আভাস পায় একটি সুন্দর জীবনের, একটি সুন্দর পৃথিবীর। রোগভয়, শোকাহত মানবহৃদয়ে দাইয়ের আহ্বান যেন রোগনিরাময়কারী এক ফোঁটা প্রতিষেধক হয়েই পতিত হয়। সে যেন প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে আল্লাহর স্মরণে।

দাওয়াতের জন্য সম্বোধন করতে হবে মানবহৃদয়কে। মানুষ ও মানবতার প্রতি হিতাকাঙ্ক্ষী নিয়ে। হৃদয়গ্রাহী ভাষায়। সুন্দর আচরণে, সুন্দর উচ্চারণে। সাথে থাকবে আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠতা। সম্বোধিতের প্রতি আন্তরিকতা ও কল্যাণকামিতা। যাতে সে সর্বোত্তমরূপে মনোযোগী হয় আপনার আহ্বানের প্রতি। তা হলেই সে প্রভাবিত হবে। আপনার প্রতিটি কথা তার অন্তরে বদ্ধমূল হবে।

মনে পড়ে, সত্তরের দশকের মাঝের দিকে যখন ইসলামী পুনর্জাগরণের শুভ সূচনা হয় তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মতত্ত্ব বিভাগের ছাত্রী। নতুন প্রজন্মের মেয়েদের ধর্মীয় অনুভূতিকে জাগিয়ে তুলতে মুসলিম দাইয়াহগণ তখন কী শ্রমই না দিয়েছিলেন! কী সাধনাই না করেছিলেন!

জীবন ও জগতের নিত্যনতুন বিষয়ে আলোচনায় অবতীর্ণ হতেন তাঁরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নারীদের সাথে আলোচনা করতেন। রাস্তায় দাঁড়িয়ে, ঘরে বসে, ক্লাসরুমে গিয়ে বিভিন্ন অবস্থায় তাদের সাথে কথা বলতেন। চলত অনবরত গ্রহণ ও প্রত্যাখ্যান, চিন্তার আদানপ্রদান ও আবেগ-অনুভূতির বিনিময়। এভাবে অনেকের হৃদয়ের বদ্ধ দুয়ার খুলে যেত। মনে উঁকি দিত অজস্র প্রশ্ন। যা জন্ম দিত এক অতন্ত্যগভীর চেতনাশক্তির।

পবিত্র নগরী বাইতুল মাকদিসের একটি বিদ্যালয়ে আমি শিক্ষিকা হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলাম। ওই সময় থেকেই আমি দাওয়াতের কাজকে নিজের ব্রত বানিয়ে নিই। শিক্ষাজীবনে বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখে আসা মুসলিম দাইয়াহদের দাওয়াতের রীতি-নীতি ছিল আমার পাথেয়।

আমি যেদিন প্রথমবারে মতো শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করলাম সেদিন অবাক না হয়ে পারলাম না। আমি আমার ছাত্রীদেরকে লক্ষ্য করে ইসলামের সম্বোধন বাক্য উচ্চারণ করলাম। বললাম, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। কিন্তু একি, সবাই নিশ্চুপ! একটি ছাত্রীও আমার সালামের উত্তর দিল না।

আরও আশ্চর্যের বিষয় এই যে, আমি লক্ষ করলাম, তাদের আচরণে আমি যতটা অবাক হয়েছি, আমার সালামে তারা তারচে বেশি হতবাক হয়েছে। জানতে চাইলাম, তারা এমন হতবাক হয়ে গেল কেন? কেন সালামের উত্তর দিল না কেন?

অবশেষে একজন জানতে চাইল, কী বলতে হবে? আমি বললাম, তোমরা বলো, ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ – এটা হলো দুনিয়া ও আখিরাতে ইসলাম ও মুসলমানদের পারস্পরিক সম্বোধন বাক্য।

এরপর আমি চক হাতে নিয়ে বোর্ডের দিকে অগ্রসর হলাম। আমি বোর্ডে একটি বাক্য লিখলাম,
ماذا يعني انتمائي للإسلام
ইসলামের সাথে আমার সম্পর্কের মর্ম কী?

আমি এক এক করে আমার প্রত্যেকটি ছাত্রীকে জিজ্ঞেস করলাম। খুব কম ছাত্রীই উত্তর দিতে পারল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তোমরা কি মুসলিম? তারা উত্তর দিল, হ্যাঁ। আমি জিজ্ঞেস করলাম, অন্যদের তুলনায় একটি মুসলিম মেয়ের ভিন্নতা কী, জানো? তারা উত্তর দিল, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ বলা। আমি বললাম, আর কিছু? তারা বলল, আর কিছু জানি না।

সেই মুহূর্তেই আমার সমগ্র সত্তা যেন হিম হয়ে গেল। আমি উপলব্ধি করলাম, এ এক লক্ষ্যহীন দিশেহারা প্রজন্ম; এরা আত্মপরিচয়হীন, আত্মোপলদ্ধিহীন। কেননা, এদের বাস এমন এক পরিবেশে যা ইসলাম থেকে দূরে, অনেক দূরে।

আমি ছিলাম ধর্মশিক্ষিকা। তাই অনেকটাই সহজ হলো। ছাত্রীদের ধর্মের তালীম দিতে লাগলাম। একদম গোড়া থেকে। ইসলামের রুকন থেকে শুরু করে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক সকল স্তরের আমলী তালীম। ওযু কীভাবে করতে হবে, নামায কীভাবে পড়তে হবে ইত্যাদি।

আমি ক্লাস শেষে তাদের সাথে নিয়ে প্রতিদিন যোহরের নামায আদায় করতাম। বিদ্যালয়সংলগ্ন একটি নামাযগাহ ছিল। যদিও ছাত্রীদের পর্যাপ্ত জ্ঞান অর্জনের জন্য অনেক সময়ের প্রয়োজন ছিল; কিন্তু আল্লাহর সাহায্য হলে সবই সহজে হয়ে যায়। ছাত্রীদের মধ্যে সাড়া জাগল। নতুন শিক্ষিকার বিষয়গুলো অবগত হতে নতুন নতুন কথাবার্তা তাদের আলোচনার বিষয়ে পরিণত হলো।

অল্প দিনের মধ্যেই পুরো বিদ্যালয়ে শুরু হলো শোরগোল। ধর্মের ক্লাস চলছে এবং কী হচ্ছে? ধর্মশিক্ষিকা ক্লাস করাবেন, বই পড়াবেন। ওযু করাতে, নামায পড়াতে কে বলেছে তাকে? এ তো বিদ্যালয়। একে ধর্মীয় কেন্দ্র বানানোর অধিকার তিনি কোত্থেকে পেলেন? এরকম আরও অনেক কথা। কিন্তু আমি পিছুপা হলাম না। দৃঢ়তার সাথে আমার কাজ চালিয়ে যেতে থাকলাম।

আমি আমার ছাত্রীদেরকে পথ চলার, কথা বলার ইসলামী শিষ্টাচার শিক্ষা দিতে লাগলাম। ক্লাসরুম থেকে সুশৃঙ্খলভাবে বের হওয়া, আবার সুশৃঙ্খলভাবে ফিরে আসা, বিদ্যালয়ের আঙিনা, চলার পথ পরিচ্ছন্ন রাখা—ইত্যাদি বিষয়ে উৎসাহিত করতে থাকলাম।

অভিভাবকরা বিষয়গুলো অবগত হতে অনেক খুশি হলেন। অনেকে আপত্তিও করলেন। বিশেষ করে, ছোট ছোট মেয়েকে ওযু করিয়ে, নামায পড়িয়ে কী চাইছি আমি? তখন সেখানে নামাযের প্রচলন ছিল না তা নয়। তবে নামাযী ছিলেন শুধু বয়স্ক বুড়াবুড়ি। সেখানকার মানুষের ধারণা ছিল, নামায পড়া বয়স্কদের কাজ। তরুণদের নামায পড়া মানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় অপচয়, পেছনে ফিরে যাওয়া, প্রগতিকে ব্যাহত করা ইত্যাদি। আর আমার ওপর এটির মূল অপবাদই ছিল এটিই।

যাই হোক, আমি আমার ছাত্রীদের সামাজিক ইসলামী শিষ্টাচারের উদ্বুদ্ধ করতে লাগলাম। সালাম থেকে শুরু করে জাযাকাল্লাহু খাইরান বলা, মুসলিম বোনদের সাথে হাসিমুখে মিলিত হওয়া, সুন্দর ও শালীন ভাষায় কথা বলা ইত্যাদি।

প্রায় এক বছর অতিবাহিত হলো। আমার অনেক ছাত্রী, বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষিকা এবং অনেক অভিভাবিকা ‘ধর্মের ক্লাস’ এবং ‘ধর্মশিক্ষিকা’ দ্বারা প্রভাবিত হলেন। আমারও তামান্না ছিল, এ হৃদয়গুলো সত্যের আলো লাভ করুক। তাদের অতল গহ্বরে যে সত্য ঢেকে পড়ে থাকতে শুরু করেছে সে সত্য আবার উদ্ভাসিত হোক।

এক বছর অতিবাহিত হলো। আমি কিছু নামাযী নারী পেলাম, যারা ধর্মীয় শিষ্টাচার মেনে চলেন। বিষয়টি আর যাই হোক, এটা অবশ্যই প্রমাণ করে যে, সত্যের প্রতি প্রতিটি মানুষেরই টান বিদ্যমান; উপযুক্ত পরিবেশ পেলে অঙ্কুরিত হবে চারা, পরিচর্যা হলে উঠবে পত্রপল্লবিত, ফুলবতী, ফলবান।

আমি তখন পর্যন্ত পর্দা প্রথা তুলতে পারিনি। কেননা, পরিবেশ প্রতিকূল ছিল। তাদের কাছে পর্দাপ্রথা ছিল একদমই নতুন। এ বিষয়ে তাদের কোনো অবগতিই ছিল না। কিন্তু এক বছরের অবিরাম সাধনায় আল্লাহ কিছু হৃদয়কে আলোকিত করেছেন। তারা আর সত্যকে স্বীকার করতে কুণ্ঠিত নয়।

আমি একটু একটু করে পর্দার বিষয়েও বলতে লাগলাম। আমি আমার ছাত্রীদের বোঝাতে লাগলাম যে, পর্দা করা প্রত্যেক মুসলিম নারীর ওপর ফরজ।

কিন্তু নামাযের আহ্বানে যতটা সাড়া পেয়েছিলাম, পর্দার আহ্বানে ততটা সাড়া পাওয়া গেল না। কেননা, জিলবাব (পর্দার পোশাক) তাদের চোখে নতুন বা অদ্ভুত বিষয় ছিল। পারিবারিকভাবে আসত বাধা। সামাজিকভাবেও পড়তে হতো রোষানলে। আর ‘নারী স্বাধীনতার’ দোহাই দেওয়া কথা তো বলাই বাহুল্য। সর্বত্র চলছিল ধর্মীয় মূল্যবোধ, তাহজীব-তামাদ্দুন ছুঁড়ে ফেলার জোরদার প্রস্তুতি। এমনকি, পর্দা করা তো দূরে থাক মায়েরা ছাত্রীদের বোরকা পরতেও বারণ করতেন।

এক এক করে কয়েক বছর কেটে গেল। একটি দুটি করে অনেক মেয়ে পরিবারের বাধা, সমাজের উপহাস, সহপাঠিনীদের ঠাট্টা-বিদ্রূপ সত্ত্বেও পর্দার ফরজ বিধানকে মেনে নিল। কোনো একটি শ্রেণিতে একটি মেয়েকেও যখন জিলবাব পরতে দেখতাম, তখন আনন্দে মন ভরে যেত। আমার কাছে এটাকে মনে হতো বিরাট সফলতা। আল্লাহর শোকর, আজ সেখানে অনেক মানুষ তৈরি হয়েছেন যারা জানেন এবং বিশ্বাস করেন, পর্দা একটি ফরজ ইবাদত। প্রত্যেকটি প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে এই ইবাদত করতেই হবে।

বলতে পারেন, যারা শিক্ষিকা বা জাতীয় কোনো পেশায় নিয়োজিত, তাদের পক্ষে দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা করা সহজ। কিন্তু যারা কোনো কাজে নেই তাদের পক্ষে এসবের সুযোগ কোথায়? কিন্তু আমি বলব, মুসলিম নারীর পক্ষে দাওয়াতি কাজের কোনো সুযোগই হাতছাড়া করা উচিত নয়। কোনো কাজে না থাকলেও অপরাপর নারীর সাথে যোগাযোগের অসংখ্য সুযোগ আছে।

আমাদের দেশে তো বিভিন্ন সাপ্তাহিক মজলিস হয়। পাড়াপ্রতিবেশিনীরা, বান্ধবীরা সপ্তাহে অন্তত একদিন কোনো একজনের বাড়িতে জড়ো হয়। গল্পগুজব করে, আনন্দ-বিনোদন করে, এরপর যার যার বাসায় ফিরে যায়। তা হলে আধুনিকতার দোহাই দেওয়া এসব গল্পগুজব, আনন্দ-বিনোদন না করে আমরা কি সেখানে দ্বীনি আলোচনা করতে পারি না? কুরআন হাদীসের কথা বলতে পারি না? পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক বিভিন্ন সমস্যা ও অসঙ্গতিগুলোকে ধর্মীয় আঙ্গিকে পর্যালোচনা করতে পারি না?

মনে হতে হতে পারে, যেখানে যেটা চালু হয়ে গেছে, সেটাকে তুলে দেওয়া বা বদলানো কঠিন। কিন্তু এও সত্য যে, আপনি যদি সংকল্প করেন, তা হলে আল্লাহর সাহায্য অবশ্যই আপনাকে সঙ্গ দেবে।

একসময় আমি সৌদি আরব রিয়াদের একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতাম। প্রতি শনিবার শিক্ষিকাদের কক্ষে গেলেই ছুটির দিনে তাদের আহার-বিহার ও ঘোরাফেরার গল্পগুজব শুনতে পেতাম। ছুটির দিনে কে কার বাড়িতে গিয়েছিলেন, সেসব গল্প।

আমি জিজ্ঞেস করতাম, ছুটির দিনে বান্ধবীর বাড়িতে গিয়ে কীভাবে সময় কাটান? তারা বলতেন, 'খাই দাই, নাচি গাই, ফুর্তি করি।' আমি বলতাম, আচ্ছা, সারা সপ্তাহে মাত্র একটা দিন—মাত্র একটা দিন অন্তত—পুরো সময়টা পরিবারের সাথে কাটানো যায় না? আহার-বিহার, আনন্দ-বিনোদন যা করার স্বামী-সন্তান নিয়ে তো বেশি জমে। তারাই তো অধিক হকদার এই সময়টুকু আপনাকে কাছে পাবার।

তারা আমার কথার কোনো উত্তর দিতেন না। কেউ হেসে উড়িয়ে দিতেন। কেউ রাগও করতেন। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে, আল্লাহর শোকর, শিক্ষিকাদের কক্ষে ওসব অনর্থক গল্পগুজব আর শোনা যেত না।

আমি আমার নিজের জীবনের কথাগুলো বলছি গর্ব করার জন্য নয়; বরং এজন্য যে, এতে বাস্তবতা অনেক সহজ হয়ে দেখা দেয়—হাতে ধরার মতো, চোখে দেখার মতো মূর্ত সহজ হয়। আল্লাহই উত্তম তওফিকদাতা।

নিঃসন্দেহে দাওয়াতের কাজ বড় কঠিন। একজন বিজ্ঞ চিকিৎসক যেমন মানবদেহের রোগনির্ণয় ও আক্রান্ত স্থান নির্ধারণের পর ব্যবস্থাপত্র প্রদান করেন তেমনই একজন দাই ইলাল্লাহ। তিনিও একজন চিকিৎসক। তিনি চিকিৎসা করেন উম্মাহর হৃদয়-জগতের। সময় ও সমাজের প্রভাবে, অন্যদের অন্ধ অনুকরণে উম্মাহর অস্থিমজ্জায় যে ব্যাধি সৃষ্টি হয়, যে রোগজীবাণু ছড়িয়ে যায়, তারই চিকিৎসা করেন একজন দাই ইলাল্লাহ।

তবে দাওয়াতের ক্রিয়াশীলতার জন্য দাই এর প্রয়োজন বলিষ্ঠ যুক্তিশক্তির, সক্ষম বাগ্মিতার। প্রয়োজন আল্লাহর নূরের নূরানী একটি তাজা ও সাচ্চা দিলের। যার প্রতিটি বাণী উৎসারিত হয় হৃদয়ের গভীর থেকে। তাই স্থিত হয় হৃদয়েরই গভীরে। পূর্ণ বিশ্বাসের সাথে। পূর্ণ আস্থার সাথে। যেন মানুষ আশার আলো দেখে। আভাস পায় একটি সুন্দর জীবনের, একটি সুন্দর পৃথিবীর। রোগভয়, শোকাহত মানবহৃদয়ে দাইয়ের আহ্বান যেন রোগনিরাময়কারী এক ফোঁটা প্রতিষেধক হয়েই পতিত হয়। সে যেন প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে আল্লাহর স্মরণে।

দাওয়াতের জন্য সম্বোধন করতে হবে মানবহৃদয়কে। মানুষ ও মানবতার প্রতি হিতাকাঙ্ক্ষী নিয়ে। হৃদয়গ্রাহী ভাষায়। সুন্দর আচরণে, সুন্দর উচ্চারণে। সাথে থাকবে আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠতা। সম্বোধিতের প্রতি আন্তরিকতা ও কল্যাণকামিতা। যাতে সে সর্বোত্তমরূপে মনোযোগী হয় আপনার আহ্বানের প্রতি। তা হলেই সে প্রভাবিত হবে। আপনার প্রতিটি কথা তার অন্তরে বদ্ধমূল হবে।

মনে পড়ে, সত্তরের দশকের মাঝের দিকে যখন ইসলামী পুনর্জাগরণের শুভ সূচনা হয় তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মতত্ত্ব বিভাগের ছাত্রী। নতুন প্রজন্মের মেয়েদের ধর্মীয় অনুভূতিকে জাগিয়ে তুলতে মুসলিম দাইয়াহগণ তখন কী শ্রমই না দিয়েছিলেন! কী সাধনাই না করেছিলেন!

জীবন ও জগতের নিত্যনতুন বিষয়ে আলোচনায় অবতীর্ণ হতেন তাঁরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নারীদের সাথে আলোচনা করতেন। রাস্তায় দাঁড়িয়ে, ঘরে বসে, ক্লাসরুমে গিয়ে বিভিন্ন অবস্থায় তাদের সাথে কথা বলতেন। চলত অনবরত গ্রহণ ও প্রত্যাখ্যান, চিন্তার আদানপ্রদান ও আবেগ-অনুভূতির বিনিময়। এভাবে অনেকের হৃদয়ের বদ্ধ দুয়ার খুলে যেত। মনে উঁকি দিত অজস্র প্রশ্ন। যা জন্ম দিত এক অতন্ত্যগভীর চেতনাশক্তির।

পবিত্র নগরী বাইতুল মাকদিসের একটি বিদ্যালয়ে আমি শিক্ষিকা হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলাম। ওই সময় থেকেই আমি দাওয়াতের কাজকে নিজের ব্রত বানিয়ে নিই। শিক্ষাজীবনে বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখে আসা মুসলিম দাইয়াহদের দাওয়াতের রীতি-নীতি ছিল আমার পাথেয়।

আমি যেদিন প্রথমবারে মতো শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করলাম সেদিন অবাক না হয়ে পারলাম না। আমি আমার ছাত্রীদেরকে লক্ষ্য করে ইসলামের সম্বোধন বাক্য উচ্চারণ করলাম। বললাম, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। কিন্তু একি, সবাই নিশ্চুপ! একটি ছাত্রীও আমার সালামের উত্তর দিল না।

আরও আশ্চর্যের বিষয় এই যে, আমি লক্ষ করলাম, তাদের আচরণে আমি যতটা অবাক হয়েছি, আমার সালামে তারা তারচে বেশি হতবাক হয়েছে। জানতে চাইলাম, তারা এমন হতবাক হয়ে গেল কেন? কেন সালামের উত্তর দিল না কেন?

অবশেষে একজন জানতে চাইল, কী বলতে হবে? আমি বললাম, তোমরা বলো, ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ – এটা হলো দুনিয়া ও আখিরাতে ইসলাম ও মুসলমানদের পারস্পরিক সম্বোধন বাক্য।

এরপর আমি চক হাতে নিয়ে বোর্ডের দিকে অগ্রসর হলাম। আমি বোর্ডে একটি বাক্য লিখলাম,
ماذا يعني انتمائي للإسلام
ইসলামের সাথে আমার সম্পর্কের মর্ম কী?

আমি এক এক করে আমার প্রত্যেকটি ছাত্রীকে জিজ্ঞেস করলাম। খুব কম ছাত্রীই উত্তর দিতে পারল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তোমরা কি মুসলিম? তারা উত্তর দিল, হ্যাঁ। আমি জিজ্ঞেস করলাম, অন্যদের তুলনায় একটি মুসলিম মেয়ের ভিন্নতা কী, জানো? তারা উত্তর দিল, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ বলা। আমি বললাম, আর কিছু? তারা বলল, আর কিছু জানি না।

সেই মুহূর্তেই আমার সমগ্র সত্তা যেন হিম হয়ে গেল। আমি উপলব্ধি করলাম, এ এক লক্ষ্যহীন দিশেহারা প্রজন্ম; এরা আত্মপরিচয়হীন, আত্মোপলদ্ধিহীন। কেননা, এদের বাস এমন এক পরিবেশে যা ইসলাম থেকে দূরে, অনেক দূরে।

আমি ছিলাম ধর্মশিক্ষিকা। তাই অনেকটাই সহজ হলো। ছাত্রীদের ধর্মের তালীম দিতে লাগলাম। একদম গোড়া থেকে। ইসলামের রুকন থেকে শুরু করে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক সকল স্তরের আমলী তালীম। ওযু কীভাবে করতে হবে, নামায কীভাবে পড়তে হবে ইত্যাদি।

আমি ক্লাস শেষে তাদের সাথে নিয়ে প্রতিদিন যোহরের নামায আদায় করতাম। বিদ্যালয়সংলগ্ন একটি নামাযগাহ ছিল। যদিও ছাত্রীদের পর্যাপ্ত জ্ঞান অর্জনের জন্য অনেক সময়ের প্রয়োজন ছিল; কিন্তু আল্লাহর সাহায্য হলে সবই সহজে হয়ে যায়। ছাত্রীদের মধ্যে সাড়া জাগল। নতুন শিক্ষিকার বিষয়গুলো অবগত হতে নতুন নতুন কথাবার্তা তাদের আলোচনার বিষয়ে পরিণত হলো।

অল্প দিনের মধ্যেই পুরো বিদ্যালয়ে শুরু হলো শোরগোল। ধর্মের ক্লাস চলছে এবং কী হচ্ছে? ধর্মশিক্ষিকা ক্লাস করাবেন, বই পড়াবেন। ওযু করাতে, নামায পড়াতে কে বলেছে তাকে? এ তো বিদ্যালয়। একে ধর্মীয় কেন্দ্র বানানোর অধিকার তিনি কোত্থেকে পেলেন? এরকম আরও অনেক কথা। কিন্তু আমি পিছুপা হলাম না। দৃঢ়তার সাথে আমার কাজ চালিয়ে যেতে থাকলাম।

আমি আমার ছাত্রীদেরকে পথ চলার, কথা বলার ইসলামী শিষ্টাচার শিক্ষা দিতে লাগলাম। ক্লাসরুম থেকে সুশৃঙ্খলভাবে বের হওয়া, আবার সুশৃঙ্খলভাবে ফিরে আসা, বিদ্যালয়ের আঙিনা, চলার পথ পরিচ্ছন্ন রাখা—ইত্যাদি বিষয়ে উৎসাহিত করতে থাকলাম।

অভিভাবকরা বিষয়গুলো অবগত হতে অনেক খুশি হলেন। অনেকে আপত্তিও করলেন। বিশেষ করে, ছোট ছোট মেয়েকে ওযু করিয়ে, নামায পড়িয়ে কী চাইছি আমি? তখন সেখানে নামাযের প্রচলন ছিল না তা নয়। তবে নামাযী ছিলেন শুধু বয়স্ক বুড়াবুড়ি। সেখানকার মানুষের ধারণা ছিল, নামায পড়া বয়স্কদের কাজ। তরুণদের নামায পড়া মানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় অপচয়, পেছনে ফিরে যাওয়া, প্রগতিকে ব্যাহত করা ইত্যাদি। আর আমার ওপর এটির মূল অপবাদই ছিল এটিই।

যাই হোক, আমি আমার ছাত্রীদের সামাজিক ইসলামী শিষ্টাচারের উদ্বুদ্ধ করতে লাগলাম। সালাম থেকে শুরু করে জাযাকাল্লাহু খাইরান বলা, মুসলিম বোনদের সাথে হাসিমুখে মিলিত হওয়া, সুন্দর ও শালীন ভাষায় কথা বলা ইত্যাদি।

প্রায় এক বছর অতিবাহিত হলো। আমার অনেক ছাত্রী, বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষিকা এবং অনেক অভিভাবিকা ‘ধর্মের ক্লাস’ এবং ‘ধর্মশিক্ষিকা’ দ্বারা প্রভাবিত হলেন। আমারও তামান্না ছিল, এ হৃদয়গুলো সত্যের আলো লাভ করুক। তাদের অতল গহ্বরে যে সত্য ঢেকে পড়ে থাকতে শুরু করেছে সে সত্য আবার উদ্ভাসিত হোক।

এক বছর অতিবাহিত হলো। আমি কিছু নামাযী নারী পেলাম, যারা ধর্মীয় শিষ্টাচার মেনে চলেন। বিষয়টি আর যাই হোক, এটা অবশ্যই প্রমাণ করে যে, সত্যের প্রতি প্রতিটি মানুষেরই টান বিদ্যমান; উপযুক্ত পরিবেশ পেলে অঙ্কুরিত হবে চারা, পরিচর্যা হলে উঠবে পত্রপল্লবিত, ফুলবতী, ফলবান।

আমি তখন পর্যন্ত পর্দা প্রথা তুলতে পারিনি। কেননা, পরিবেশ প্রতিকূল ছিল। তাদের কাছে পর্দাপ্রথা ছিল একদমই নতুন। এ বিষয়ে তাদের কোনো অবগতিই ছিল না। কিন্তু এক বছরের অবিরাম সাধনায় আল্লাহ কিছু হৃদয়কে আলোকিত করেছেন। তারা আর সত্যকে স্বীকার করতে কুণ্ঠিত নয়।

আমি একটু একটু করে পর্দার বিষয়েও বলতে লাগলাম। আমি আমার ছাত্রীদের বোঝাতে লাগলাম যে, পর্দা করা প্রত্যেক মুসলিম নারীর ওপর ফরজ।

কিন্তু নামাযের আহ্বানে যতটা সাড়া পেয়েছিলাম, পর্দার আহ্বানে ততটা সাড়া পাওয়া গেল না। কেননা, জিলবাব (পর্দার পোশাক) তাদের চোখে নতুন বা অদ্ভুত বিষয় ছিল। পারিবারিকভাবে আসত বাধা। সামাজিকভাবেও পড়তে হতো রোষানলে। আর ‘নারী স্বাধীনতার’ দোহাই দেওয়া কথা তো বলাই বাহুল্য। সর্বত্র চলছিল ধর্মীয় মূল্যবোধ, তাহজীব-তামাদ্দুন ছুঁড়ে ফেলার জোরদার প্রস্তুতি। এমনকি, পর্দা করা তো দূরে থাক মায়েরা ছাত্রীদের বোরকা পরতেও বারণ করতেন।

এক এক করে কয়েক বছর কেটে গেল। একটি দুটি করে অনেক মেয়ে পরিবারের বাধা, সমাজের উপহাস, সহপাঠিনীদের ঠাট্টা-বিদ্রূপ সত্ত্বেও পর্দার ফরজ বিধানকে মেনে নিল। কোনো একটি শ্রেণিতে একটি মেয়েকেও যখন জিলবাব পরতে দেখতাম, তখন আনন্দে মন ভরে যেত। আমার কাছে এটাকে মনে হতো বিরাট সফলতা। আল্লাহর শোকর, আজ সেখানে অনেক মানুষ তৈরি হয়েছেন যারা জানেন এবং বিশ্বাস করেন, পর্দা একটি ফরজ ইবাদত। প্রত্যেকটি প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে এই ইবাদত করতেই হবে।

বলতে পারেন, যারা শিক্ষিকা বা জাতীয় কোনো পেশায় নিয়োজিত, তাদের পক্ষে দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা করা সহজ। কিন্তু যারা কোনো কাজে নেই তাদের পক্ষে এসবের সুযোগ কোথায়? কিন্তু আমি বলব, মুসলিম নারীর পক্ষে দাওয়াতি কাজের কোনো সুযোগই হাতছাড়া করা উচিত নয়। কোনো কাজে না থাকলেও অপরাপর নারীর সাথে যোগাযোগের অসংখ্য সুযোগ আছে।

আমাদের দেশে তো বিভিন্ন সাপ্তাহিক মজলিস হয়। পাড়াপ্রতিবেশিনীরা, বান্ধবীরা সপ্তাহে অন্তত একদিন কোনো একজনের বাড়িতে জড়ো হয়। গল্পগুজব করে, আনন্দ-বিনোদন করে, এরপর যার যার বাসায় ফিরে যায়। তা হলে আধুনিকতার দোহাই দেওয়া এসব গল্পগুজব, আনন্দ-বিনোদন না করে আমরা কি সেখানে দ্বীনি আলোচনা করতে পারি না? কুরআন হাদীসের কথা বলতে পারি না? পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক বিভিন্ন সমস্যা ও অসঙ্গতিগুলোকে ধর্মীয় আঙ্গিকে পর্যালোচনা করতে পারি না?

মনে হতে হতে পারে, যেখানে যেটা চালু হয়ে গেছে, সেটাকে তুলে দেওয়া বা বদলানো কঠিন। কিন্তু এও সত্য যে, আপনি যদি সংকল্প করেন, তা হলে আল্লাহর সাহায্য অবশ্যই আপনাকে সঙ্গ দেবে।

একসময় আমি সৌদি আরব রিয়াদের একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতাম। প্রতি শনিবার শিক্ষিকাদের কক্ষে গেলেই ছুটির দিনে তাদের আহার-বিহার ও ঘোরাফেরার গল্পগুজব শুনতে পেতাম। ছুটির দিনে কে কার বাড়িতে গিয়েছিলেন, সেসব গল্প।

আমি জিজ্ঞেস করতাম, ছুটির দিনে বান্ধবীর বাড়িতে গিয়ে কীভাবে সময় কাটান? তারা বলতেন, 'খাই দাই, নাচি গাই, ফুর্তি করি।' আমি বলতাম, আচ্ছা, সারা সপ্তাহে মাত্র একটা দিন—মাত্র একটা দিন অন্তত—পুরো সময়টা পরিবারের সাথে কাটানো যায় না? আহার-বিহার, আনন্দ-বিনোদন যা করার স্বামী-সন্তান নিয়ে তো বেশি জমে। তারাই তো অধিক হকদার এই সময়টুকু আপনাকে কাছে পাবার।

তারা আমার কথার কোনো উত্তর দিতেন না। কেউ হেসে উড়িয়ে দিতেন। কেউ রাগও করতেন। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে, আল্লাহর শোকর, শিক্ষিকাদের কক্ষে ওসব অনর্থক গল্পগুজব আর শোনা যেত না।

আমি আমার নিজের জীবনের কথাগুলো বলছি গর্ব করার জন্য নয়; বরং এজন্য যে, এতে বাস্তবতা অনেক সহজ হয়ে দেখা দেয়—হাতে ধরার মতো, চোখে দেখার মতো মূর্ত সহজ হয়। আল্লাহই উত্তম তওফিকদাতা।

📘 ফিরে এসো নীড়ে 📄 ৬. প্রজ্ঞা এবং উত্তম উপদেশ

📄 ৬. প্রজ্ঞা এবং উত্তম উপদেশ


মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন,
ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنْ ضَلَّ عَنْ سَبِيلِهِ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ
অর্থ : তুমি তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান করো প্রজ্ঞার সাথে, উত্তম উপদেশে। তুমি বিতর্ক করো তাদের সাথে সুন্দরতম পদ্ধতিতে। নিশ্চয় তোমার প্রতিপালকই অধিক অবগত পথভ্রষ্টদের সম্পর্কে। তিনিই অধিক অবগত হেদায়েতপ্রাপ্তদের সম্পর্কে। —সূরা নাহল : ১২৫

সুতরাং যিনি আল্লাহর পথের দাই হবেন, তার অন্তর হতে হবে প্রশান্ত, চিন্তা-চেতনা হতে হবে মহৎ। তার আচরণ হবে দয়া ও করুণাপূর্ণ, ক্ষমা ও মার্জনাভিত্তিক। তা হলেই মানুষের অন্তরে জায়গা করে নেওয়া সহজসাধ্য। তখনই মানুষ তার দ্বারা প্রভাবিত হবে। সাদরে বরণ করে নেবে তার উপদেশ।

কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, প্রত্যেকেরই মন যোগাতে হবে বা প্রত্যেকেই তার কথা গভীর আগ্রহে গ্রহণ করে নেবে। কেননা, কারও কথা গ্রহণ করা না-করার ব্যাপারে মানুষের রুচি প্রকৃতি ভিন্ন ভিন্ন। সুতরাং যদি কেউ সাড়া না দেয়, বা কেউ প্রত্যাখ্যান করে, তা হলে হতাশ হওয়া বা রাগান্বিত হওয়ার কিছু নেই। বরং ব্যক্তিগত মাহাত্ম্য নিয়ে দাওয়াতের কাজ চালিয়ে যেতে হবে। সর্বোচ্চ চেষ্টা ব্যয় করতে হবে মানুষের কল্যাণসাধনে।

দাই হবেন কল্যাণের ধারার মতো। যেদিক দিয়ে অগ্রসর হবেন, সকলকে সিঞ্চিত করবেন কল্যাণে। সুউচ্চ মনোবল নিয়ে এগিয়ে যাবেন সম্মুখ পানে। বিরামবিহীনভাবে। ক্লান্তিহীনভাবে। ক্ষুদ্রতার ঊর্ধ্বে থেকে। কঠোরতা বা বাড়াবাড়ি ছাড়া। কেননা, যিনি মানুষকে চারপাশে সমবেত করতে চান, তাকে অবশ্যই হতে হবে বিনিত উটনীর মতো। হাজার উপেক্ষা, হাজার অত্যাচার বরণ করে নেবেন অম্লান বদনে।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের জন্য রেখে গেছেন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি ছিলেন বিনয়ী, সদাচারী। প্রতিকূলতায় সাহাবা কেরাম যখন উৎকন্ঠিত বা হতবিহ্বল, কিংবা উত্তেজিত হয়ে উঠতে চাইতেন, তখন তাঁর অমীয় বাণী তাদের উৎকণ্ঠা দূর করত, তাদের শান্ত করত। তিনি তাদের বিপদাপদ ও প্রতিকূলতার মুখে অবিচল থাকার শিক্ষা দিতেন। তিনি তাদের এই শিক্ষাই দিতেন যে, ধৈর্য ও সহনশীলতার দ্বারাই মানুষের হৃদয় জয় করা যায়। দাইর সফলতাও এখানেই নিহিত।

দেখুন না, মহান আল্লাহ হযরত মূসা ও হারুন আ. কে নির্দেশ দিলেন ফেরাঊনকে দাওয়াত দিতে। ফেরাঊন ছিলেন কওমের নেতা। বরং বিরাট সাম্রাজ্যের অধিপতি। আল্লাহ তাদের কীভাবে দাওয়াত দিতে বললেন, তা নিজেই পড়ে নিন পবিত্র কুরআন থেকে,
اذْهَبَا إِلَى فِرْعَوْنَ إِنَّهُ طَغَى فَفُولَا لَهُ قَوْلًا لَّيْنًا لَّعَلَّهُ يَتَذَكَّرُ أَوْ يَخْشَى قَالَا رَبَّنَا إِنَّنَا نَخَافُ أَنْ يَفْرُطَ عَلَيْنَا أَوْ أَنْ يَطْغَى قَالَ لَا تَخَفْ مَا سَمِعْتُمَا أَسْمَعُ وَأَرَى
অর্থ : তোমরা ফেরাঊনের কাছে যাও। নিশ্চয় সে সীমালঙ্ঘন করেছে। তোমরা তাকে বলো কোমল কথা, হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে কিংবা ভীত হবে। তারা দুজন বলল, হে আল্লাহ, আমাদের ভয় হয় যে, সে আমাদের সাথে স্বেচ্ছাচরিতা বা সীমালঙ্ঘন করবে। আল্লাহ বললেন, তোমরা ভয় পেও না। আমি তোমাদের সাথে আছি। আমি শুনব, দেখব। —সূরা ত্বাহা : ৪৩-৪৬

আল্লাহ মহিমান্বিত দুই নবীকে নির্দেশ দিলেন যেন তারা ফেরাঊনকে দাওয়াত দেন, এবং আল্লাহর একত্বের আহ্বান জানান। সাথে সাথে আল্লাহ তাদের এও নির্দেশ দিলেন যে, তাদের দাওয়াতের শৈলী হতে হবে সরল ও কোমল, যথাযথ সম্মানপ্রদর্শনপূর্বক ও যথাযোগ্য মূল্যায়নের ভিত্তিতে।

আলোচ্য বিষয় থেকে আরও একটি বিষয় বুঝে আসা উচিত যে, প্রতিটি মানুষকেই তার রুচি ও প্রকৃতি বুঝে দাওয়াত দিতে হবে। প্রতিটি মানুষের মৌলিকত্বের প্রতি পোষণ করতে হবে সুধারণা। সুতরাং আমরা ধনী-গরীব, আমীর-ফকীর, ছোটো-বড়, সবল-দুর্বল সবাইকেই দাওয়াত দেব। আমরা বিশ্বাস করি, এভাবে আমরা যদি এক হয়ে যেতে পারি, একে অপরের সহযোগী হতে পারি, তা হলে আমরা অকল্যাণ রোধ করতে পারব সার্বিকভাবে, বাতিলদের মোকাবিলা করতে পারব সক্ষমভাবে। তখনই আল্লাহ তাঁর দ্বীনকে সাহায্য করবেন। পৃথিবীর আকাশে পতপত করে উড়বে ইসলামের পতাকা।

প্রিয় বোন,
দাওয়াতের শৈলীতে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করুন। নতুন নতুন পদ্ধতি অবলম্বন করুন। নতুনত্ব একঘেয়েমি ও অবসাদ দূর করে। হযরত নূহ আ. এর জাবানি পবিত্র কুরআনে আমরা এই শিক্ষা পাই,
قَالَ رَبِّ إِنِّي دَعَوْتُ قَوْমী لَيْلًا وَنَهَارًا ثُمَّ إِنِّي كُلَّمَا دَعَوْتُهُمْ لِتَغْفِرَ لَهُمْ جَعَلُوا أَصَابِعَهُمْ فِى آذَانِهِمْ وَاسْتَغْشَوْا ثِيَابَهُمْ وَأَصَرُّوا وَاسْتَكْبَرُوا اسْتِكْبَارًا ثُمَّ إِنِّي أَعْلَنْتُ لَهُمْ وَأَسْرَرْتُ لَهُمْ إِسْرَارًا فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا
অর্থ : নূহ বললেন, হে আমার প্রতিপালক, আমি আমার কওমকে রাত দিন দাওয়াত দিয়েছি। কিন্তু আমার আহ্বান তাদের পলায়নপরতাই বাড়িয়ে দিয়েছে। আমি যখনই তাদের আহ্বান করেছি, যেন তুমি তাদের ক্ষমা কর, তখনই তারা কানে আঙুল দিয়েছে এবং কাপড় দিয়ে আত্মগোপন করেছে। তারা বাড়াবাড়ি করেছে এবং অতিরিক্ত অহংকার প্রদর্শন করেছে। আমি তাদের দাওয়াত দিয়েছি উচ্চস্বরে। আমি তাদের দাওয়াত দিয়েছি প্রকাশ্যে। আমি তাদের দাওয়াত দিয়েছি গোপনে। আমি তাদের বলেছি, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ইস্তিগফার করো। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল। —সূরা নূহ : ০৫-১০

অনেক সময় দাওয়াত দিতে হয় একজন একজন করে, আলাদা আলাদাভাবে। প্রত্যেকের প্রতিই আরোপ করতে হয় আলাদা গুরুত্ব। আবার অনেক সময় দাওয়াত দেওয়া হয় একই জায়গায় একই সাথে অনেক মানুষের সমাগমে। এগুলো মূলত নির্ভর করে মানুষের জীবনপ্রণালি, রুচি-প্রকৃতি ও স্বভাববৈশিষ্ট্যের ওপর। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে দাওয়াতী কাজ গোপনে করাই শ্রেয়। কেননা, ধর্মীয় বিপ্লবের আশঙ্কায় যে কোনো দ্বীনি কাজকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করার সমরণীতি প্রচলিত হয়ে থাকে সর্বত্র।

সভা-সেমিনার এবং বিভিন্ন কর্মানুষ্ঠানে বলিষ্ঠ যুক্তিপ্রমাণ উপস্থাপনের মাধ্যমে দাওয়াতী কাজ করুন। আয়োজন করুন নারীদের জন্য ধর্মীয় আলোচনা ও মতবিনিময়সভার। এভাবে ইসলামী জীবনদর্শনকে ব্যাপক পরিসরে এমনভাবে উপস্থাপন করুন যাতে মানুষ জীবনের সর্বক্ষেত্রে আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাহকেই শ্রেষ্ঠ পথনির্দেশ হিসেবে গ্রহণ করার অনিবার্যতা স্বীকার করে। লেখালিখিও অতি উত্তম উপায়। বিশেষত সমসাময়িক বিষয়ে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে আলোকপাত হওয়া খুবই জরুরি। কোনটি কতটুকু ধর্মানুসারে; কোনটি ধর্ম থেকে কত দূরে –এগুলো আলোচনায় আসা চাই।

দাওয়াতীকে অবশ্যই চারপাশের নারীদের ঝোঁক ও প্রবণতা এবং যোগ্যতা ও সামর্থ্য সম্পর্কে জানতে হবে। কার মধ্যে কী প্রতিভা আছে, কে কীভাবে দাওয়াতী কাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, সে বিষয়ে লক্ষ রাখতে হবে। অনেক নারী লেখালিখিতে পারদর্শী হন। অনেকে মুনশিয়ানা বিতর্কে বা উপদেশে। অনেককে দাওয়াতও দিতে পারেন মৌনভাবে। দাইয়াতকে সবকিছু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। যদি কখনো এমন হৃদয় পেয়ে যান, যা ধর্মের প্রতি অনুরাগী, দাওয়াতের প্রতি অনুরাগী, তা হলে তাতে সাহস ও প্রণোদনা যোগান। প্রায়ই এমন হয় যে, হৃদয়ে ধর্মীয় আবেগ চাপা পড়ে থাকে পার্থিব ধ্যানধারণার নিচে। অবস্থা এমন—যদি কেউ একটু ফুঁক দেয় তা হলেই জ্বলে উঠবে, জেগে উঠবে; আলো ছড়ায় অনির্বাণ শিখা হয়ে, প্রদীপ্ত প্রদীপ হয়ে।

প্রিয় বোন, যদি কখনো এরকম একটি হৃদয়ও পেয়ে যান, তা হলে এ হৃদয়টিকে জাগাতে ব্রতী হোন। একে তুচ্ছ মনে করবেন না। এটিই হতে পারে আপনার জীবনের মহত্তম কীর্তি। হয়তো আপনার উসিলায় একজন নারী সর্বান্তকরণে মনোনিবেশ করবে ধর্মের প্রতি, দাওয়াত ও তাবলীগের প্রতি। হতে পারে, তারই সার্থক নেতৃত্বে একদিন পরিচালিত হবে মুসলিম নারীসমাজ; স্বাদ পাবে ইসলামের, ঈমানের।

মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন,
ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنْ ضَلَّ عَنْ سَبِيلِهِ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ
অর্থ : তুমি তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান করো প্রজ্ঞার সাথে, উত্তম উপদেশে। তুমি বিতর্ক করো তাদের সাথে সুন্দরতম পদ্ধতিতে। নিশ্চয় তোমার প্রতিপালকই অধিক অবগত পথভ্রষ্টদের সম্পর্কে। তিনিই অধিক অবগত হেদায়েতপ্রাপ্তদের সম্পর্কে। —সূরা নাহল : ১২৫

সুতরাং যিনি আল্লাহর পথের দাই হবেন, তার অন্তর হতে হবে প্রশান্ত, চিন্তা-চেতনা হতে হবে মহৎ। তার আচরণ হবে দয়া ও করুণাপূর্ণ, ক্ষমা ও মার্জনাভিত্তিক। তা হলেই মানুষের অন্তরে জায়গা করে নেওয়া সহজসাধ্য। তখনই মানুষ তার দ্বারা প্রভাবিত হবে। সাদরে বরণ করে নেবে তার উপদেশ।

কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, প্রত্যেকেরই মন যোগাতে হবে বা প্রত্যেকেই তার কথা গভীর আগ্রহে গ্রহণ করে নেবে। কেননা, কারও কথা গ্রহণ করা না-করার ব্যাপারে মানুষের রুচি প্রকৃতি ভিন্ন ভিন্ন। সুতরাং যদি কেউ সাড়া না দেয়, বা কেউ প্রত্যাখ্যান করে, তা হলে হতাশ হওয়া বা রাগান্বিত হওয়ার কিছু নেই। বরং ব্যক্তিগত মাহাত্ম্য নিয়ে দাওয়াতের কাজ চালিয়ে যেতে হবে। সর্বোচ্চ চেষ্টা ব্যয় করতে হবে মানুষের কল্যাণসাধনে।

দাই হবেন কল্যাণের ধারার মতো। যেদিক দিয়ে অগ্রসর হবেন, সকলকে সিঞ্চিত করবেন কল্যাণে। সুউচ্চ মনোবল নিয়ে এগিয়ে যাবেন সম্মুখ পানে। বিরামবিহীনভাবে। ক্লান্তিহীনভাবে। ক্ষুদ্রতার ঊর্ধ্বে থেকে। কঠোরতা বা বাড়াবাড়ি ছাড়া। কেননা, যিনি মানুষকে চারপাশে সমবেত করতে চান, তাকে অবশ্যই হতে হবে বিনিত উটনীর মতো। হাজার উপেক্ষা, হাজার অত্যাচার বরণ করে নেবেন অম্লান বদনে।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের জন্য রেখে গেছেন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি ছিলেন বিনয়ী, সদাচারী। প্রতিকূলতায় সাহাবা কেরাম যখন উৎকন্ঠিত বা হতবিহ্বল, কিংবা উত্তেজিত হয়ে উঠতে চাইতেন, তখন তাঁর অমীয় বাণী তাদের উৎকণ্ঠা দূর করত, তাদের শান্ত করত। তিনি তাদের বিপদাপদ ও প্রতিকূলতার মুখে অবিচল থাকার শিক্ষা দিতেন। তিনি তাদের এই শিক্ষাই দিতেন যে, ধৈর্য ও সহনশীলতার দ্বারাই মানুষের হৃদয় জয় করা যায়। দাইর সফলতাও এখানেই নিহিত।

দেখুন না, মহান আল্লাহ হযরত মূসা ও হারুন আ. কে নির্দেশ দিলেন ফেরাঊনকে দাওয়াত দিতে। ফেরাঊন ছিলেন কওমের নেতা। বরং বিরাট সাম্রাজ্যের অধিপতি। আল্লাহ তাদের কীভাবে দাওয়াত দিতে বললেন, তা নিজেই পড়ে নিন পবিত্র কুরআন থেকে,
اذْهَبَا إِلَى فِرْعَوْنَ إِنَّهُ طَغَى فَفُولَا لَهُ قَوْلًا لَّيْنًا لَّعَلَّهُ يَتَذَكَّرُ أَوْ يَخْشَى قَالَا رَبَّنَا إِنَّنَا نَخَافُ أَنْ يَفْرُطَ عَلَيْنَا أَوْ أَنْ يَطْغَى قَالَ لَا تَخَفْ مَا سَمِعْتُمَا أَسْمَعُ وَأَرَى
অর্থ : তোমরা ফেরাঊনের কাছে যাও। নিশ্চয় সে সীমালঙ্ঘন করেছে। তোমরা তাকে বলো কোমল কথা, হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে কিংবা ভীত হবে। তারা দুজন বলল, হে আল্লাহ, আমাদের ভয় হয় যে, সে আমাদের সাথে স্বেচ্ছাচরিতা বা সীমালঙ্ঘন করবে। আল্লাহ বললেন, তোমরা ভয় পেও না। আমি তোমাদের সাথে আছি। আমি শুনব, দেখব। —সূরা ত্বাহা : ৪৩-৪৬

আল্লাহ মহিমান্বিত দুই নবীকে নির্দেশ দিলেন যেন তারা ফেরাঊনকে দাওয়াত দেন, এবং আল্লাহর একত্বের আহ্বান জানান। সাথে সাথে আল্লাহ তাদের এও নির্দেশ দিলেন যে, তাদের দাওয়াতের শৈলী হতে হবে সরল ও কোমল, যথাযথ সম্মানপ্রদর্শনপূর্বক ও যথাযোগ্য মূল্যায়নের ভিত্তিতে।

আলোচ্য বিষয় থেকে আরও একটি বিষয় বুঝে আসা উচিত যে, প্রতিটি মানুষকেই তার রুচি ও প্রকৃতি বুঝে দাওয়াত দিতে হবে। প্রতিটি মানুষের মৌলিকত্বের প্রতি পোষণ করতে হবে সুধারণা। সুতরাং আমরা ধনী-গরীব, আমীর-ফকীর, ছোটো-বড়, সবল-দুর্বল সবাইকেই দাওয়াত দেব। আমরা বিশ্বাস করি, এভাবে আমরা যদি এক হয়ে যেতে পারি, একে অপরের সহযোগী হতে পারি, তা হলে আমরা অকল্যাণ রোধ করতে পারব সার্বিকভাবে, বাতিলদের মোকাবিলা করতে পারব সক্ষমভাবে। তখনই আল্লাহ তাঁর দ্বীনকে সাহায্য করবেন। পৃথিবীর আকাশে পতপত করে উড়বে ইসলামের পতাকা।

প্রিয় বোন,
দাওয়াতের শৈলীতে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করুন। নতুন নতুন পদ্ধতি অবলম্বন করুন। নতুনত্ব একঘেয়েমি ও অবসাদ দূর করে। হযরত নূহ আ. এর জাবানি পবিত্র কুরআনে আমরা এই শিক্ষা পাই,
قَالَ رَبِّ إِنِّي دَعَوْتُ قَوْমী لَيْلًا وَنَهَارًا ثُمَّ إِنِّي كُلَّمَا دَعَوْتُهُمْ لِتَغْفِرَ لَهُمْ جَعَلُوا أَصَابِعَهُمْ فِى آذَانِهِمْ وَاسْتَغْشَوْا ثِيَابَهُمْ وَأَصَرُّوا وَاسْتَكْبَرُوا اسْتِكْبَارًا ثُمَّ إِنِّي أَعْلَنْتُ لَهُمْ وَأَسْرَرْتُ لَهُمْ إِسْرَارًا فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا
অর্থ : নূহ বললেন, হে আমার প্রতিপালক, আমি আমার কওমকে রাত দিন দাওয়াত দিয়েছি। কিন্তু আমার আহ্বান তাদের পলায়নপরতাই বাড়িয়ে দিয়েছে। আমি যখনই তাদের আহ্বান করেছি, যেন তুমি তাদের ক্ষমা কর, তখনই তারা কানে আঙুল দিয়েছে এবং কাপড় দিয়ে আত্মগোপন করেছে। তারা বাড়াবাড়ি করেছে এবং অতিরিক্ত অহংকার প্রদর্শন করেছে। আমি তাদের দাওয়াত দিয়েছি উচ্চস্বরে। আমি তাদের দাওয়াত দিয়েছি প্রকাশ্যে। আমি তাদের দাওয়াত দিয়েছি গোপনে। আমি তাদের বলেছি, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ইস্তিগফার করো। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল। —সূরা নূহ : ০৫-১০

অনেক সময় দাওয়াত দিতে হয় একজন একজন করে, আলাদা আলাদাভাবে। প্রত্যেকের প্রতিই আরোপ করতে হয় আলাদা গুরুত্ব। আবার অনেক সময় দাওয়াত দেওয়া হয় একই জায়গায় একই সাথে অনেক মানুষের সমাগমে। এগুলো মূলত নির্ভর করে মানুষের জীবনপ্রণালি, রুচি-প্রকৃতি ও স্বভাববৈশিষ্ট্যের ওপর। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে দাওয়াতী কাজ গোপনে করাই শ্রেয়। কেননা, ধর্মীয় বিপ্লবের আশঙ্কায় যে কোনো দ্বীনি কাজকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করার সমরণীতি প্রচলিত হয়ে থাকে সর্বত্র।

সভা-সেমিনার এবং বিভিন্ন কর্মানুষ্ঠানে বলিষ্ঠ যুক্তিপ্রমাণ উপস্থাপনের মাধ্যমে দাওয়াতী কাজ করুন। আয়োজন করুন নারীদের জন্য ধর্মীয় আলোচনা ও মতবিনিময়সভার। এভাবে ইসলামী জীবনদর্শনকে ব্যাপক পরিসরে এমনভাবে উপস্থাপন করুন যাতে মানুষ জীবনের সর্বক্ষেত্রে আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাহকেই শ্রেষ্ঠ পথনির্দেশ হিসেবে গ্রহণ করার অনিবার্যতা স্বীকার করে। লেখালিখিও অতি উত্তম উপায়। বিশেষত সমসাময়িক বিষয়ে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে আলোকপাত হওয়া খুবই জরুরি। কোনটি কতটুকু ধর্মানুসারে; কোনটি ধর্ম থেকে কত দূরে –এগুলো আলোচনায় আসা চাই।

দাওয়াতীকে অবশ্যই চারপাশের নারীদের ঝোঁক ও প্রবণতা এবং যোগ্যতা ও সামর্থ্য সম্পর্কে জানতে হবে। কার মধ্যে কী প্রতিভা আছে, কে কীভাবে দাওয়াতী কাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, সে বিষয়ে লক্ষ রাখতে হবে। অনেক নারী লেখালিখিতে পারদর্শী হন। অনেকে মুনশিয়ানা বিতর্কে বা উপদেশে। অনেককে দাওয়াতও দিতে পারেন মৌনভাবে। দাইয়াতকে সবকিছু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। যদি কখনো এমন হৃদয় পেয়ে যান, যা ধর্মের প্রতি অনুরাগী, দাওয়াতের প্রতি অনুরাগী, তা হলে তাতে সাহস ও প্রণোদনা যোগান। প্রায়ই এমন হয় যে, হৃদয়ে ধর্মীয় আবেগ চাপা পড়ে থাকে পার্থিব ধ্যানধারণার নিচে। অবস্থা এমন—যদি কেউ একটু ফুঁক দেয় তা হলেই জ্বলে উঠবে, জেগে উঠবে; আলো ছড়ায় অনির্বাণ শিখা হয়ে, প্রদীপ্ত প্রদীপ হয়ে।

প্রিয় বোন, যদি কখনো এরকম একটি হৃদয়ও পেয়ে যান, তা হলে এ হৃদয়টিকে জাগাতে ব্রতী হোন। একে তুচ্ছ মনে করবেন না। এটিই হতে পারে আপনার জীবনের মহত্তম কীর্তি। হয়তো আপনার উসিলায় একজন নারী সর্বান্তকরণে মনোনিবেশ করবে ধর্মের প্রতি, দাওয়াত ও তাবলীগের প্রতি। হতে পারে, তারই সার্থক নেতৃত্বে একদিন পরিচালিত হবে মুসলিম নারীসমাজ; স্বাদ পাবে ইসলামের, ঈমানের।

মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন,
ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنْ ضَلَّ عَنْ سَبِيلِهِ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ
অর্থ : তুমি তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান করো প্রজ্ঞার সাথে, উত্তম উপদেশে। তুমি বিতর্ক করো তাদের সাথে সুন্দরতম পদ্ধতিতে। নিশ্চয় তোমার প্রতিপালকই অধিক অবগত পথভ্রষ্টদের সম্পর্কে। তিনিই অধিক অবগত হেদায়েতপ্রাপ্তদের সম্পর্কে। —সূরা নাহল : ১২৫

সুতরাং যিনি আল্লাহর পথের দাই হবেন, তার অন্তর হতে হবে প্রশান্ত, চিন্তা-চেতনা হতে হবে মহৎ। তার আচরণ হবে দয়া ও করুণাপূর্ণ, ক্ষমা ও মার্জনাভিত্তিক। তা হলেই মানুষের অন্তরে জায়গা করে নেওয়া সহজসাধ্য। তখনই মানুষ তার দ্বারা প্রভাবিত হবে। সাদরে বরণ করে নেবে তার উপদেশ।

কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, প্রত্যেকেরই মন যোগাতে হবে বা প্রত্যেকেই তার কথা গভীর আগ্রহে গ্রহণ করে নেবে। কেননা, কারও কথা গ্রহণ করা না-করার ব্যাপারে মানুষের রুচি প্রকৃতি ভিন্ন ভিন্ন। সুতরাং যদি কেউ সাড়া না দেয়, বা কেউ প্রত্যাখ্যান করে, তা হলে হতাশ হওয়া বা রাগান্বিত হওয়ার কিছু নেই। বরং ব্যক্তিগত মাহাত্ম্য নিয়ে দাওয়াতের কাজ চালিয়ে যেতে হবে। সর্বোচ্চ চেষ্টা ব্যয় করতে হবে মানুষের কল্যাণসাধনে।

দাই হবেন কল্যাণের ধারার মতো। যেদিক দিয়ে অগ্রসর হবেন, সকলকে সিঞ্চিত করবেন কল্যাণে। সুউচ্চ মনোবল নিয়ে এগিয়ে যাবেন সম্মুখ পানে। বিরামবিহীনভাবে। ক্লান্তিহীনভাবে। ক্ষুদ্রতার ঊর্ধ্বে থেকে। কঠোরতা বা বাড়াবাড়ি ছাড়া। কেননা, যিনি মানুষকে চারপাশে সমবেত করতে চান, তাকে অবশ্যই হতে হবে বিনিত উটনীর মতো। হাজার উপেক্ষা, হাজার অত্যাচার বরণ করে নেবেন অম্লান বদনে।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের জন্য রেখে গেছেন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি ছিলেন বিনয়ী, সদাচারী। প্রতিকূলতায় সাহাবা কেরাম যখন উৎকন্ঠিত বা হতবিহ্বল, কিংবা উত্তেজিত হয়ে উঠতে চাইতেন, তখন তাঁর অমীয় বাণী তাদের উৎকণ্ঠা দূর করত, তাদের শান্ত করত। তিনি তাদের বিপদাপদ ও প্রতিকূলতার মুখে অবিচল থাকার শিক্ষা দিতেন। তিনি তাদের এই শিক্ষাই দিতেন যে, ধৈর্য ও সহনশীলতার দ্বারাই মানুষের হৃদয় জয় করা যায়। দাইর সফলতাও এখানেই নিহিত।

দেখুন না, মহান আল্লাহ হযরত মূসা ও হারুন আ. কে নির্দেশ দিলেন ফেরাঊনকে দাওয়াত দিতে। ফেরাঊন ছিলেন কওমের নেতা। বরং বিরাট সাম্রাজ্যের অধিপতি। আল্লাহ তাদের কীভাবে দাওয়াত দিতে বললেন, তা নিজেই পড়ে নিন পবিত্র কুরআন থেকে,
اذْهَبَا إِلَى فِرْعَوْنَ إِنَّهُ طَغَى فَفُولَا لَهُ قَوْلًا لَّيْنًا لَّعَلَّهُ يَتَذَكَّرُ أَوْ يَخْشَى قَالَا رَبَّنَا إِنَّنَا نَخَافُ أَنْ يَفْرُطَ عَلَيْنَا أَوْ أَنْ يَطْغَى قَالَ لَا تَخَفْ مَا سَمِعْتُمَا أَسْمَعُ وَأَرَى
অর্থ : তোমরা ফেরাঊনের কাছে যাও। নিশ্চয় সে সীমালঙ্ঘন করেছে। তোমরা তাকে বলো কোমল কথা, হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে কিংবা ভীত হবে। তারা দুজন বলল, হে আল্লাহ, আমাদের ভয় হয় যে, সে আমাদের সাথে স্বেচ্ছাচরিতা বা সীমালঙ্ঘন করবে। আল্লাহ বললেন, তোমরা ভয় পেও না। আমি তোমাদের সাথে আছি। আমি শুনব, দেখব। —সূরা ত্বাহা : ৪৩-৪৬

আল্লাহ মহিমান্বিত দুই নবীকে নির্দেশ দিলেন যেন তারা ফেরাঊনকে দাওয়াত দেন, এবং আল্লাহর একত্বের আহ্বান জানান। সাথে সাথে আল্লাহ তাদের এও নির্দেশ দিলেন যে, তাদের দাওয়াতের শৈলী হতে হবে সরল ও কোমল, যথাযথ সম্মানপ্রদর্শনপূর্বক ও যথাযোগ্য মূল্যায়নের ভিত্তিতে।

আলোচ্য বিষয় থেকে আরও একটি বিষয় বুঝে আসা উচিত যে, প্রতিটি মানুষকেই তার রুচি ও প্রকৃতি বুঝে দাওয়াত দিতে হবে। প্রতিটি মানুষের মৌলিকত্বের প্রতি পোষণ করতে হবে সুধারণা। সুতরাং আমরা ধনী-গরীব, আমীর-ফকীর, ছোটো-বড়, সবল-দুর্বল সবাইকেই দাওয়াত দেব। আমরা বিশ্বাস করি, এভাবে আমরা যদি এক হয়ে যেতে পারি, একে অপরের সহযোগী হতে পারি, তা হলে আমরা অকল্যাণ রোধ করতে পারব সার্বিকভাবে, বাতিলদের মোকাবিলা করতে পারব সক্ষমভাবে। তখনই আল্লাহ তাঁর দ্বীনকে সাহায্য করবেন। পৃথিবীর আকাশে পতপত করে উড়বে ইসলামের পতাকা।

প্রিয় বোন,
দাওয়াতের শৈলীতে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করুন। নতুন নতুন পদ্ধতি অবলম্বন করুন। নতুনত্ব একঘেয়েমি ও অবসাদ দূর করে। হযরত নূহ আ. এর জাবানি পবিত্র কুরআনে আমরা এই শিক্ষা পাই,
قَالَ رَبِّ إِنِّي دَعَوْتُ قَوْমী لَيْلًا وَنَهَارًا ثُمَّ إِنِّي كُلَّمَا دَعَوْتُهُمْ لِتَغْفِرَ لَهُمْ جَعَلُوا أَصَابِعَهُمْ فِى آذَانِهِمْ وَاسْتَغْشَوْا ثِيَابَهُمْ وَأَصَرُّوا وَاسْتَكْبَرُوا اسْتِكْبَارًا ثُمَّ إِنِّي أَعْلَنْتُ لَهُمْ وَأَسْرَرْتُ لَهُمْ إِسْرَارًا فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا
অর্থ : নূহ বললেন, হে আমার প্রতিপালক, আমি আমার কওমকে রাত দিন দাওয়াত দিয়েছি। কিন্তু আমার আহ্বান তাদের পলায়নপরতাই বাড়িয়ে দিয়েছে। আমি যখনই তাদের আহ্বান করেছি, যেন তুমি তাদের ক্ষমা কর, তখনই তারা কানে আঙুল দিয়েছে এবং কাপড় দিয়ে আত্মগোপন করেছে। তারা বাড়াবাড়ি করেছে এবং অতিরিক্ত অহংকার প্রদর্শন করেছে। আমি তাদের দাওয়াত দিয়েছি উচ্চস্বরে। আমি তাদের দাওয়াত দিয়েছি প্রকাশ্যে। আমি তাদের দাওয়াত দিয়েছি গোপনে। আমি তাদের বলেছি, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ইস্তিগফার করো। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল। —সূরা নূহ : ০৫-১০

অনেক সময় দাওয়াত দিতে হয় একজন একজন করে, আলাদা আলাদাভাবে। প্রত্যেকের প্রতিই আরোপ করতে হয় আলাদা গুরুত্ব। আবার অনেক সময় দাওয়াত দেওয়া হয় একই জায়গায় একই সাথে অনেক মানুষের সমাগমে। এগুলো মূলত নির্ভর করে মানুষের জীবনপ্রণালি, রুচি-প্রকৃতি ও স্বভাববৈশিষ্ট্যের ওপর। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে দাওয়াতী কাজ গোপনে করাই শ্রেয়। কেননা, ধর্মীয় বিপ্লবের আশঙ্কায় যে কোনো দ্বীনি কাজকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করার সমরণীতি প্রচলিত হয়ে থাকে সর্বত্র।

সভা-সেমিনার এবং বিভিন্ন কর্মানুষ্ঠানে বলিষ্ঠ যুক্তিপ্রমাণ উপস্থাপনের মাধ্যমে দাওয়াতী কাজ করুন। আয়োজন করুন নারীদের জন্য ধর্মীয় আলোচনা ও মতবিনিময়সভার। এভাবে ইসলামী জীবনদর্শনকে ব্যাপক পরিসরে এমনভাবে উপস্থাপন করুন যাতে মানুষ জীবনের সর্বক্ষেত্রে আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাহকেই শ্রেষ্ঠ পথনির্দেশ হিসেবে গ্রহণ করার অনিবার্যতা স্বীকার করে। লেখালিখিও অতি উত্তম উপায়। বিশেষত সমসাময়িক বিষয়ে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে আলোকপাত হওয়া খুবই জরুরি। কোনটি কতটুকু ধর্মানুসারে; কোনটি ধর্ম থেকে কত দূরে –এগুলো আলোচনায় আসা চাই।

দাওয়াতীকে অবশ্যই চারপাশের নারীদের ঝোঁক ও প্রবণতা এবং যোগ্যতা ও সামর্থ্য সম্পর্কে জানতে হবে। কার মধ্যে কী প্রতিভা আছে, কে কীভাবে দাওয়াতী কাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, সে বিষয়ে লক্ষ রাখতে হবে। অনেক নারী লেখালিখিতে পারদর্শী হন। অনেকে মুনশিয়ানা বিতর্কে বা উপদেশে। অনেককে দাওয়াতও দিতে পারেন মৌনভাবে। দাইয়াতকে সবকিছু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। যদি কখনো এমন হৃদয় পেয়ে যান, যা ধর্মের প্রতি অনুরাগী, দাওয়াতের প্রতি অনুরাগী, তা হলে তাতে সাহস ও প্রণোদনা যোগান। প্রায়ই এমন হয় যে, হৃদয়ে ধর্মীয় আবেগ চাপা পড়ে থাকে পার্থিব ধ্যানধারণার নিচে। অবস্থা এমন—যদি কেউ একটু ফুঁক দেয় তা হলেই জ্বলে উঠবে, জেগে উঠবে; আলো ছড়ায় অনির্বাণ শিখা হয়ে, প্রদীপ্ত প্রদীপ হয়ে।

প্রিয় বোন, যদি কখনো এরকম একটি হৃদয়ও পেয়ে যান, তা হলে এ হৃদয়টিকে জাগাতে ব্রতী হোন। একে তুচ্ছ মনে করবেন না। এটিই হতে পারে আপনার জীবনের মহত্তম কীর্তি। হয়তো আপনার উসিলায় একজন নারী সর্বান্তকরণে মনোনিবেশ করবে ধর্মের প্রতি, দাওয়াত ও তাবলীগের প্রতি। হতে পারে, তারই সার্থক নেতৃত্বে একদিন পরিচালিত হবে মুসলিম নারীসমাজ; স্বাদ পাবে ইসলামের, ঈমানের।

📘 ফিরে এসো নীড়ে 📄 ৭. ধৈর্য ও অবিচলতা

📄 ৭. ধৈর্য ও অবিচলতা


প্রিয় বোন, জেনে রাখুন, ধৈর্য হলো আল্লাহর দাসত্বের বিভিন্ন পর্যায়ের একটি। কুরআনে কারীমে অসংখ্য আয়াতে ধৈর্যের কথা এসেছে। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ
অর্থ : হে ওই সমস্ত লোকেরা, যারা ঈমান এনেছ, তোমরা সবর ও সালাতের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন। — সূরা বাকারা : ১৫৩

তিনি আরও ইরশাদ করেছেন,
وَاصْبِرْ نَفْسَكَ مَعَ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُم بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ وَلَا تَعْدُ عَيْنَاكَ عَنْهُمْ تُرِيدُ زِينَةَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَلَا تُطِعْ مَنْ أَغْفَلْنَا قَلْبَهُ عَن ذِكْرِنَا وَاتَّبَعَ هَوَهُ وَكَانَ أَمْرُهُ فُرُطًا
অর্থ : সকাল সন্ধ্যা যারা সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে তাদের প্রতিপালককে ডাকে, তুমি তাদের সাথে ধৈর্যধারণ করো। পার্থিব জীবনের চাকচিক্যের মোহে তোমার দৃষ্টি যেন তাদের থেকে সরে না যায়। আমি যার হৃদয়কে আমার স্মরণ থেকে উদাসীন রেখেছি, যে তার প্রবৃত্তির অনুসরণ করেছে, যার বিষয়টি সুস্পষ্ট সীমালঙ্ঘন তুমি তার আনুগত্য করো না। — সূরা কাহফ : ২৮

তিনি আরও ইরশাদ করেছেন,
قُلْ يَاعِبَادِ الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا رَبَّكُمْ لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا فِي هَذِهِ الدُّنْيَا حَسَنَةٌ وَ أَرْضُ اللَّهِ وَاسِعَةٌ إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُم بِغَيْرِ حِسَابٍ
অর্থ : তুমি বলে দাও, হে আমার ওই সমস্ত বান্দারা, যারা ঈমান এনেছ, তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো; এই দুনিয়ায় যারা কল্যাণ করবে, তাদের জন্য থাকবে মহাকল্যাণ। আল্লাহর জমিন তো অনেক প্রশস্ত। নিশ্চয় ধৈর্যশীলদের দেওয়া হবে অপরিমিত পুরস্কার। — সূরা যুমার : ১০

যাই হোক, ধৈর্য কয়েক প্রকার :
১. আল্লাহর আনুগত্যে ধৈর্যধারণ : অর্থাৎ ধৈর্যের সাথে আল্লাহর হুকুম আহকাম মেনে চলা।
২. বিপদাপদে ধৈর্যধারণ : অর্থাৎ বিপদাপদ ও আল্লাহর রাহে জুলুম অত্যাচারের মুখেও আপন ধর্ম ও বিশ্বাসের ওপর অবিচল থাকা।
৩. আত্মনিয়ন্ত্রণে ধৈর্যধারণ : অর্থাৎ আল্লাহর নাফরমানি ও গোনাহে লিপ্ত হওয়া থেকে আত্মনিয়ন্ত্রণ করা।
৪. দুঃখ কষ্টে ধৈর্যধারণ : জীবনে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানামুখী বিপদাপদ, কষ্ট-লেশ, জুলুম-অত্যাচারে ধৈর্যধারণ ও পূর্ণ প্রত্যয়ের সাথে যে কোনো পরিস্থিতির মোকাবিলা করা।

ধৈর্য প্রকারভেদসহ দাওয়াহ দুনিয়ার সফলতার পূর্বশর্ত। আপনার চারপাশের প্রত্যেকেই খুশিমনে আপনার কথা মেনে নেবে, আপনার কাজে সাড়া দেবে—এমনটা আশা করা ঠিক নয়। এমনিতেই মানুষকে নিয়ে কোনো কাজ করা কঠিন। দাওয়াতি কাজ করা আরও কঠিন। আর মানুষের জীবনধারায় পরিবর্তন আনা যারপরনাই কঠিন। এজন্য প্রয়োজন যোগ্য নেতৃত্ব। প্রয়োজন বিনয়, নম্র ও সহনশীল আচরণ। দাওয়াতি কাজ হলো নিরাশ না হওয়া। অবিরাম দাওয়াতও চালিয়ে যাওয়া। যতক্ষণ একটিও কান আছে শোনার মতো। একটিও হৃদয় আছে ভাবার মতো। একটিও আশা আছে সাড়া পাওয়ার মতো।

আবু উমাইয়া শাবানী বলেন, আমি আবু সালাবা খাশানীর কাছে গেলাম, বললাম, এই আয়াতটি সম্পর্কে আপনার কী মত? তিনি বললেন, কোন আয়াত? বললাম,
يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا عَلَيْكُمْ أَنفُسَكُمْ لَا يَضُرُّكُم مَّن ضَلَّ إِذَا اهْتَدَيْتُمْ
অর্থ : হে ঈমানদারগণ, তোমরা নিজেদের রক্ষা করো। তোমরা নিজেরা যদি হেদায়েতপ্রাপ্ত হতে যাও, তা হলে যে গোমরা হলো সে তোমাদের ক্ষতি করতে পারবে না। — সূরা মাইদাহ : ১০৫

তিনি বললেন, আমি এ বিষয়ে সর্বাধিক জ্ঞাত ব্যক্তিককেই জিজ্ঞেস করেছিলাম, আমি স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেই জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি উত্তরে বলেছিলেন,
বাইল ইতিমিরু বিল মারূফি ওয়ান্তাহু আনিল মুনকারি হাত্তা ইযা রয়াইতা শুহহাম মুতআও ওয়া হাওয়াম মুত্তাবাআও ওয়া দুনিয়াম মুসারাতাও ওয়া ইজবা কুল্লি যি রয়িম বি রয়িহি ওয়া রয়াইতা আমরণ লা ইয়াদানি লাকা ফীহি ফায়ালাইকা বিখুয়াইসাতিন নাফসিক ইন্নাহু মিন অরাইকুম আইয়ামাস সবরি আস সবরু ফীহিন্না মিসলু কাবযি আলাল জামরি লিলফায়িলি ফীহিন্না মিসলু আজরি খামসীনা রযুলান মিসলা আমালিহি
অর্থ : বরং তোমরা একে অপরকে সৎকাজের আদেশ করতে থাকো। অসৎ কাজ থেকে বাধা প্রদান করতে থাকো। অবশেষে যখন স্বার্থের আনুগত্য, প্রবৃত্তির অনুসরণ, পার্থিবতার ব্যাপক প্রাধান্য এবং নিজ নিজ মতে প্রত্যেকের আত্মতুষ্টির ব্যাপক চর্চা হতে দেখবে, এবং এমন কিছু হতে দেখবে যাতে তোমার করার কিছু নেই, তখনই শুধু নিজের কথা ভেবো। নিশ্চয় তোমাদের পশ্চাতে আসছে ধৈর্যের দিন। ওই দিনগুলোতে ধৈর্য ধারণ করা—হাতে জ্বলন্ত অঙ্গার চেপে ধরার মতো কঠিন হবে। তখন একজন আমেল পঞ্চাশজন আমেলের বিনিময় লাভ করবে।

অন্য একটি বর্ণনায় আছে,
ক্বীলা ইয়া রাসূলাল্লাহ আজরু খামসীনা হীনান মিন্না আও মিনহুম? ক্বলা বাল আজরু খামসীনা মিনকুম
অর্থ : বলা হলো, হে আল্লাহর রাসূল, আমাদের মধ্য থেকে পঞ্চাশজন, নাকি তাদের মধ্য থেকে পঞ্চাশজন? তিনি বললেন, বরং তোমাদের মধ্য থেকেই পঞ্চাশজন।

অন্য একটি বর্ণনায় বিনিময়ের আধিক্যের কারণ দর্শানো হয়েছে এভাবে,
ইন্নাকুম তাজিদুনা আলাল খাইরি আওয়ানান ওয়ালা ইয়াজিদুনা আলাল খাইরি আওয়ানান
অর্থ : তোমরা কল্যাণে সহযোগী পাচ্ছ, কিন্তু তারা কল্যাণে সহযোগী পাবে না। ১

আমাদের প্রিয় নবীজীর মাঝে আমাদের জন্য আছে উত্তম আদর্শ। তিনি কত বিপদের মুখে পতিত হয়েছেন! কত উপহাসের সম্মুখীন হয়েছেন! কত গালমন্দ সহ্য করেছেন! এমনকি, মহান আল্লাহ পাহাড়ের ফেরেশতাকে পাঠালেন এই মর্মে,
ইন শিতা আবতাকতু আলাইহিমুল আখশাবাইনি ফ ইয়াকুলু লা ইন্নি আসআলুল্লাহা তায়ালা আই ইউখরিজা মিন আসলাবিহিম মাই ইয়াবুদুল্লাহা ওয়ালা ইউশরিকু বিহি শাইয়া
অর্থ : হে নবী, আপনি যদি চান, তা হলে তাদের ওপর দুই পাহাড় চাপিয়ে দেব। কিন্তু তিনি বললেন, না। আমি বরং আল্লাহর কাছে এইটা চাই যে, তিনি এদের ঊরসদেশ থেকে এমন কিছু মানুষ যারা আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কোনো কিছুকে শরীক করবে না। ২

হলোও তাই। আল্লাহ ওয়ালিদ বিন মুগীরা ও আবু জেহেলের মতো কাফের ও মোশরেকদের ঊরসে জন্ম দিলেন খালিদ বিন ওয়ালিদের মতো দিগ্বিজয়ী বীর ও ইকরিমার মতো মুসলিম সাধককে। দাওয়াতে পর্যায়ক্রমতা আছে। আগে মনকে প্রস্তুত করতে হয়। তারপর নতুন কিছু তুলে ধরা। অপ্রস্তুত অবস্থায় কারও কাছে কোনো কিছু গৃহীত হওয়া অনেকটা আকস্মিকতা। তাই দাওয়াতি কাজে পর্যায়ক্রমতা বিবেচনায় রাখা আবশ্যক।

প্রথম ধাপে দাওয়াত-পরিচিতি। অর্থাৎ দাওয়াতের বিষয়, অঙ্গন, পরিধি ইত্যাদি ঠিক করা। দ্বিতীয় শ্রেণি ও পেশার মানুষের কাছে দাওয়াত পৌঁছানোর ক্ষেত্র নির্ধারণ করা। দ্বিতীয় পর্যায়ে, দাওয়াতি কাজে সহযোগী নির্বাচন করা। এমন কিছু মানুষ—যারা আপনার চিন্তাকে গ্রহণ করবে, জীবন-সফরের এই মহতী উদ্যোগে আপনার সঙ্গী হবে। তৃতীয় পর্যায়ে চিন্তা-চেতনার বাস্তবায়নে মনে রাখবেন, এখানে প্রধান ও মৌলিক প্রয়োজন তা হলো এমন আলোকিত হৃদয়—যাতে ঈমান আছে, ইখলাস আছে। এভাবে ধাপে ধাপে সফলতার সাথে এগোনোর পারলে আশা করা যায় আমাদের দাওয়াতি কাজের একটি শক্তিশালী, সুসংহত, কার্যকর ভিত্তি স্থাপিত হবে। আমাদের শ্রম সার্থকতাও পাবে, ফলপ্রসূও হবে। জীবনধারায় আমূল পরিবর্তন আনাও সম্ভব হবে। অচিরেই মানবজীবন পরিচালিত হবে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'র পতাকা তলে।

আমরা যখন কোনো নারীকে দাওয়াত দেব, তখন সে হয়তো খুব অনায়াসে সালাত আদায় শুরু করবে। কিন্তু পর্দার বেলায় অপারগতা প্রকাশ করবে। হয়তো নিজের প্রবৃত্তির কাছে পরাজিত হয়ে, কিংবা অন্য কোনো প্রতিকূলতার কারণে। তখন হতাশ হলে চলবে না। তার সাথে লেগে থাকতে হবে। দীনের দাওয়াতও দিতে থাকতে হবে। তাকে উপলব্ধি করাতে হবে যে, অচিরেই কাল কিয়ামতে তাকে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে; সেখানে মা বাবা ভাই বোন স্বামী সন্তান কেউ থাকবে না; সেখানে আল্লাহ ছোট বড় সবকিছুর হিসেব নেবেন।

আশা করা যায়, ধীরে ধীরে আমরা আমাদের এই বোনটিকে বর্বরতার পঙ্কিল থেকে মুক্ত করতে পারবো। পাশ্চাত্যপ্রিয়তা ও অন্ধ অনুকরণের বেড়াজাল থেকে বের করে আনতে পারবো। বিশেষ করে, আধুনিকতার নামে যে অপচর্চা শুরু হয়েছে, নারীরা আল্লাহবিস্মৃত হয়ে যে মরণফাঁদে পা দিতে আরম্ভ করেছে, হয়তো তা থেকে তাকে বাঁচাতে পারবো। আমাদের আন্তরিকতা ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টাকে কবুল করে হয়তো আল্লাহ তার মাঝে ধার্মিকতা সৃষ্টি করবেন। এই বোনটির মাঝেই, অচিরেই আমরা একটি সত্যিকার ধার্মিক নারীকে দেখতে পাবো। যিনি মনে প্রাণে ইসলাম ও মুসলমানকে ভালোবাসবেন। নিঃসন্দেহে এটা আল্লাহর কাছে কঠিন কিছু নয়।

প্রিয় বোন, এ পথে চলতে হয়তো অনেক বাধা আসবে। হয়তো অনেক কঠিন কঠিন পরীক্ষারও সম্মুখীন হতে হবে। নিশ্চয় এ পরীক্ষা অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু এটা যেমন সত্য, এর চেয়েও বেশি সত্য এই যে, এর বিনিময় ও প্রতিদান আল্লাহর কাছে অনেক বড়, অনেক মহৎ।

হযরত সুমাইয়া রাযি.-কেই দেখুন। তিনি ছিলেন ইসলামের পথে শাহাদতবরণকারী প্রথম নারী। কাফেররা তাকে, তার ছেলে ও স্বামীকে ধরে নিয়ে গেল। মরুভূমির উত্তপ্ত বালুতে নিয়ে গিয়ে পুরো পরিবারকে কী নির্মম অত্যাচার করল। কিন্তু হযরত সুমাইয়া রাযি. ধৈর্য ও অবিচলতার কী জীবন্ত উদাহরণই না রেখে গেলেন যুগ যুগের মুসলিম নারী সমাজের জন্য। তিনি আপন ছেলেকে স্বামীকে উৎসর্গ করলেন আল্লাহর রাহে, প্রাণ সঁপে দিলেন আপন প্রভুর সমীপে; কিন্তু নিজের ঈমানকে কাফের বেইমানের সামনে বিসর্জন দিতে রাজি হলেন না। ৩

এই যে উম্মে শারিক গাযিয়া বিনতে জাবের বিন হাকিম। ইসলাম গ্রহণ করলেন। কুরাইশ নারীদের কাছে গিয়ে গোপনে ইসলামের দাওয়াত দিতে লাগলেন। একদিন কুরাইশ কাফেররা ধরে ফেলল। তারা কঠিন কঠিন বাক্য প্রয়োগ করে ধমক দিয়ে বলল, তোমার গোত্রের লোকেরা না থাকলে আজ তোমার সাথে যা করার করতাম। কিন্তু আজকের মতো তোমাকে সম্মানে ফিরিয়ে দিচ্ছি। উম্মে শারিক বলেন, আমার কওমের লোকেরা আমাকে একটি উটের পিঠে ফেলে দিল। নিচে কিছু দিল না। এভাবে দিন দিন এক মনজিল অতিক্রম করতাম। এ দীর্ঘ সফরে তারা আমাকে না কিছু খেতে দিত, না কিছু পান করতে দিত। প্রত্যেক মনজিলে আমাকে রোদ্রে ফেলে রাখত। নিজেরা ছায়ায় বিশ্রাম করত। বিশ্রাম করে খেয়ে পান করে তৃপ্ত হয়ে আবার যাত্রা করত। এক দিন এভাবেই রোদ্রে পড়ে ছিলাম। আমার প্রাণপ্রায় বের হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। হঠাৎ মুখের ওপর শীতল কিছু অনুভব করলাম। মনে হলো, পানির বালতি ধরা হয়েছে। আমি একটু পান করলাম। বালতিটি সরিয়ে নেওয়া হলো। আবার ধরা হলো। আমি আবার পান করলাম। এভাবে কয়েক দফায় পান করে আমি পরিপূর্ণরূপে তৃপ্ত হলাম। এবার বালতিটি শক্ত করে ধরে সবগুলো পানি গায়ের ওপর ঢেলে নিলাম। আমার শরীর কাপড় ভিজা গেল। আমি তাজা হয়ে গেলাম। ইতোমধ্যে সবাই জেগে গেল। তারা পানির ছাপ দেখতে পেল। আমিও একদম তাজা হয়ে আছি। তারা চেঁচামেচি শুরু করে দিল। বলল, তুমি নিশ্চয় রশির বাঁধন খুলে আমাদের পানি খেয়ে ফেলেছ। আমি বললাম, আল্লাহর কসম, আমি এমন কিছু করিনি। আসলে এরকম এরকম ঘটেছিল। তারা বলল, যদি তুমি সত্য বল থাক, তা হলে তো তোমার ধর্ম আমাদের ধর্মের চেয়ে উত্তম। এরপর তারা পানপাত্রগুলো দেখতে লাগল। তারা হতবাক হয়ে দেখল যে, তাদের পানপাত্র ঠিকই আছে। তারা আর বিলম্ব করল না। সকলে মুসলমান হয়ে গেল। ৪

চিন্তা করুন, একজন উম্মে শারিকের ধৈর্যের বদৌলতে একটি সম্প্রদায় ইসলাম গ্রহণ করল। আমাদের জন্য তার মাঝে আছে সুন্দর আদর্শ। এই বিংশ শতাব্দীতেও পৃথিবীর বুকে নারী সাহাবীদের ঈমানদীপ্ত সংগ্রামী জীবনের জীবন্ত উদাহরণ নেই তা নয়। যায়নাব আল গাযালি। ইসলামী সংগ্রাম সাধনার এক জীবন্ত কিংবদন্তী। তিনি কল্যাণের সুবাস ছড়াচ্ছেন। পথনির্দেশের আলো ছড়াচ্ছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, অচিরেই আল্লাহ মুমিনদের সাহায্য করবেন। শত্রুরা তার বাড়িরঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে। তাকে কারাবন্দি করে রেখেছে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস। তবু তিনি ঈমান ও বিশ্বাসের পথ থেকে বিন্দুমাত্র নড়েননি। ইস্পাতকঠিন মনোবল, সীমাহীন ধৈর্য, পর্বতপ্রমাণ অবিচলতায় তিনি এখনো টিকে আছেন দাওয়াতের ময়দানে। কারাগারের বিভীষিকাময় দিনগুলোর বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, “তারা ঘর খুলে দিল। ঘর ভর্তি কুকুর। আমার বুক কেঁপে উঠল। আমি চোখ বন্ধ করলাম। লোহার দরজা বন্ধ করে দেওয়ার বিকট আওয়াজ হলো। মুহূর্তের মধ্যেই চতুর্দিক থেকে আমার শরীরের সাথে কুকুরগুলো যেন সেঁটে গেল। ওদের ঘেউ ঘেউ শব্দ ছি ভয়ানক। কুকুরগুলো আমার সারা শরীরে কামড়াতে শুরু করেছে। আমি আল্লাহ জপে লাগলাম। হতভম্ব হয়ে শুধু বলে চলেছিলাম, اللهم اشغلني بك عمن سواك، اشغلني بك في حضرتك واصبغني بالشهادة فيك والحب فيك والرضى بك والمودة لك وثبت الأقدাম يا الله أقدام الموحدين (অর্থ : আল্লাহ, আমাকে তোমাতে মগ্ন রাখো। আমার আল্লাহ, আমাকে তোমাতে ব্যস্ত রাখো। হে চির একক, হে চির নিঃস্বাপেক্ষ, তোমার অনুভূতিতে আমাকে বিভোর করে দাও। তোমার উপলব্ধিতে আমাকে ডুবিয়ে রাখো। মাবুদ, তোমারই তরে শাহাদত নসীব করো। তোমাতে প্রেম দান করো। তোমার সন্তুষ্টি জোটাও। তোমার ভালোবাসা দান করো। পদ অবিচল রাখো, আল্লাহ, তোমারও একত্বে বিশ্বাসীদের পদ...) করুক ছটা কেটে গেল। ভেবেছি, খ্যাপা কুকুরেরা আমার সাদা কাপড়কে রক্তে লাল করে ফেলেছে... দরজা খোলা হলো। আলোর আভাস পেয়ে আমি আমার কাপড়ের দিকে লক্ষ করলাম। কিন্তু, কী আশ্চর্য! কাপড় দেখতে তো কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। কারারক্ষীরা যারপরনাই চমকে গেল। কুকুরগুলো আমার কাপড় ছিঁড়তে পারেনি।” ৫

দিন যায়। বছর যায়। বাইরের আলো বাতাসে দেখেন না। জেলের সেই অন্ধকারের কাঠেই সময়। সঙ্গী কিছু নয়। শুধু আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস। সময়ের পরিবর্তন হলো। সমাজের পরিবর্তন হলো। তিনি ছাড়া পেলেন। বিশ্বাস ও প্রত্যয় হলো আরও সুদৃঢ়। তিনি এখনো পথ চলছেন। আল্লাহর একত্বের উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছেন। মানুষ তার ডাকে সাড়া দিচ্ছে। স্বেচ্ছাচারী সম্প্রদায়ের বিভেদাদার ও অগ্নি-উপাসকদের থেমে নেই। কিন্তু রাখে আল্লাহ মারে কে?

শায়খ মুরসিদ হাসান হুযাইবির স্ত্রী জেলে স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে যান। সহিষ্ণু হৃদয় জানে না ভয়, মানে না বাধা। থেকে থেকে কিছু খাবার, কিছু জামাকাপড় নিয়ে যান। কারা-কর্তৃপক্ষর লোকেরা সার্চ করতে আসে। একদিন এক যুবক অতি উৎসাহে সার্চ করছিল। মনে হচ্ছিল, সে বিশাল কোনো কুকর্ম সাধন করছে। তিনি অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে বললেন, “বেটা, এটা তোমার জায়গা নয়। এটা তোমার কাগজও নয়। তোমার জায়গা ছিল রণাঙ্গন। তোমার কাজ ছিল শত্রুদের আক্রমণ থেকে মাতৃভূমিকে রক্ষা করতে। জন্মভূমির ওপর থেকে লাঞ্ছনাকে অপসারণ করতে। দিনদুপুরে গিয়ে এক মায়ের আদরের আলু-পটোল আর রুটি-পরাটা সার্চ করে কী এমন মহৎ কর্ম করছ, শুনি!” যুবকটি হতচকিত হলো। অনায়াসেই নিজেকে সামলে নিল। অপরাধীর তিলক তাকেও ব্যথিত করলো। লজ্জিত চোখে তাকাল। বলল, ‘জনাব, আপনি যথার্থ বলেছেন।” ৬

বানান তান্তাবী। জার্মানির স্বামী সাথে দাওয়াতের কাজ করতেন। সেখানে একটি নারীসংগঠনও তৈরি করেছিলেন। তার দাওয়াতী তৎপরতায় অনেক জার্মানি নারী তওবা করে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। স্বেচ্ছাচারী শাসক তাকে ও তার স্বামীকে নির্বাসিত করেছিল। এই দম্পতি সত্য বলার সাহস সর্বস্ব ত্যাগ করে দিয়েছিল। তাই শুধু নির্বাসনকে যথেষ্ট মনে করেনি। সেই স্বেচ্ছাচারীরা তাদের তাড়া করে বেড়িয়েছে এখান থেকে সেখানে, এদেশ থেকে সেদেশে। সর্বশেষ তারা আশ্রয় নিয়েছিলেন জার্মানির আখেন শহরে। স্বেচ্ছাচারী ষড়যন্ত্রজাল সেখানেও পৌঁছে গিয়েছিল। সাড়ে তিন হাজার শরীরী এক মুসলিম পীর – ইসলাম আত্মা থেকে নিষ্কৃতি না পাওয়া পর্যন্ত যেন তাদের ঘুমই হারাম। এক প্রতিবেশিনীর কপালে অস্ত্র ঠেকিয়ে শয়তানের দোসররা ইসলামের ঘরে পৌঁছে গেল। দরজায় কড়া নাড়ল। বানান তান্তাবী দরজা খুললেন। স্বামী ঘরে ছিলেন না। তিনি হাসপাতালে। অপ্রস্তুত ছিলেন। কোনো কথা নেই। বানানকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ল। ঘাতকদের পাঁচটি গুলি নিরীহ মুসলিম দায়িকার মস্তিষ্ক ভেদ করে দিল। বানান মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। শয়তানরা তার নিথর দেহটি ফেলে রেখে গেল। তিনি প্রাণ ত্যাগ করলেন দেশ থেকে দূরে, প্রিয়জন থেকে দূরে, আপনজন থেকে দূরে। বানান দুনিয়া থেকে চলে গেলেন। কিন্তু তার অমর উক্তি আজও দুনিয়াতে কোটি কোটি মুসলিম নারীর প্রেরণা হয়ে আছে, “দুঃখ করবেন না, হে ইসাম। আমাদের কথা ভেবে চিন্তিত হবেন না। আল্লাহর পথে অবিচল থাকুন। আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রাখুন। দ্বীনকে বিজয়ী করতে আপনার সঠিক অবস্থান এবং আল্লাহর রাস্তায় একনিষ্ঠভাবে জিহাদ চালিয়ে যাওয়া ই আমাদের কাম্য। আমরা আপনার কাছে আর কিছুই চাই না।” ৭

আমার ফিলিস্তিনী বোনেরা, তোমরা ধৈর্য হারিয়েো না। শত প্রতিকূলতায়, শত ঝড়ঝঞ্ঝায় এই সব দাইয়া, মুজাহিদা, সাহেবা বোনদের মাঝে আছে আমাদের আদর্শ, আছে সান্ত্বনা। আমরা প্রতিনিয়ত পরীক্ষায় নিপতিত। আমাদের পবিত্র ভূমিতে কোনো প্রেতাত্মা আশ্রয় নিতে পারে না। আমাদের পুণ্যভূমিতে কোনো মিথ্যার উপস্থাপন ঘটাতে পারে না। চিরন্তন এ লড়াই চলবেই। সত্যই হবে বিজয়ী। বিজয় হয় সত্যেরই। আল্লাহ তার ধৈর্যশীল বান্দাদেরই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বিজয় ও প্রতিষ্ঠার।

আমরা দুআ করি, ফিলিস্তিনিদের পরোলোক ও অন্তরীন পরিবারগুলোকে আল্লাহ যেন রহম করেন। তাদের স্ত্রীদের মায়েদের মেয়েদের বোনদের ইজ্জত-আবরু, সম্মান ও সম্ভ্রমের রক্ষণাবেক্ষণ করেন। ধৈর্য ও অবিচলতা দান করেন। তারা অসহনীয় কষ্ট, বিরহ, দহন সহ্য করে চলেছেন অনেকটা কাল। আমরা আশা করি, আল্লাহ আমাদেরকে আমাদের ধৈর্যের বিনিময় ও প্রতিদান দান করবেন। ঈমান ও বিশ্বাসের মজবুতি নসীব করবেন। শেষ অবধি তাঁর ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকার তওফিক দান করবেন।

আমরা আমাদের পবিত্র ভূমির সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে গিয়ে ধ্বংসযজ্ঞের শিকার, ভূমি হরণের শিকার, অসংখ্য নির্যাতনের শিকার। আমাদের দুধের শিশুদের, অল্পবয়সীদের গুলি করে, পুড়িয়ে মারতে ওদের বাধে না। রাতের আঁধারে আমাদের নারীদের গগনবিদারি আর্তচিৎকার আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে। কিন্তু কোনো সাড়া আসে না। সাহায্য আসে না। এতিমেরা কেঁদে বুক ভাসায়। হন্য হয়ে খুঁজে ফেরে মাকে, বাবাকে। কিন্তু কোথাও কোনো সাড়া নেই। কোথাও কোনো শব্দ নেই। আমাদের পবিত্র ভূমি বিরান হয়ে চলেছে। গাছপালা, নদীনালা, পশুপাখি ওদের দৌরাত্ম্য থেকে মুক্ত নয়। আমাদের মাদরাসা, কলেজ, হাসপাতাল, ব্যাংক, শিল্পকারখানা ধ্বংস হয়েছে। বিপদগ্রস্তদের দিকে যারা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়, আমাদের প্রতি তাদের সাহায্যের হাত সংকুচিত। সারা পৃথিবীর—পুরো মুসলিম উম্মাহর—সামনে তারা আমাদের শিশুদের স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করছে, আমাদের হৃদয়কে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে। আমাদের কবিরা শোকগাথা রচনা করে। কোমলহৃদয়রা অশ্রু বিসর্জন দেয়। অত্যাচারিত মুসলিম জাতি চেয়ে থাকে আরব বিশ্বের প্রতি। ইসলামী বিশ্বের প্রতি। কিংবা কোনো মুসলিম রাষ্ট্রের প্রতি। কিন্তু কোনো সাড়া নেই। আমি চিৎকার করে ডাক দিলাম। যদি কোনো জীবন্ত মানুষ পাই। কিন্তু আছে কি কোনো জীবন্ত মানুষ? পাবো কি কোনো প্রাণের সাড়া? কবি উমর আবু রিশার কথা মনে পড়ছে,
(অর্থ- আমার জাতি, কি তোমার সম্মান আজকের মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা হাজারও জাতির মাঝে? আমি তোমাকে চেয়ে চেয়ে দেখি, আর আমার দৃষ্টি লজ্জায় অবনত। হায় কত মুতাসিম বিদায় নিল! কত আবাল বনিতার আর্তচিৎকার আকাশ বাতাস ভারি করল! কিন্তু তুমি শুনলে না! হায়, তোমার শাণিত কলম, অপ্রতিরোধ্য তরবারি কে রুখে দিল! মুতাসিম, তোমার আর্তনাদ কোথায় বিদায় নিল!)

আমাদের শহীদদের প্রতি আসমান জমিন অশ্রুপাত করে। টিলা উপকূল কেঁদে বুক ভাসায়। অত্যাচারীদের বন্দুকের গুলি আমাদের শহীদদের দেহকে ক্ষতবিক্ষত করে। তাদের শরীরের মাংসপিণ্ডগুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে পাথরে ককড়ে ছিটকে পড়ে। তাদের শোণিতধারায় রচিত হয় জলপ্রপাত। রক্তের নদীতে পবিত্র ভূমির পুণ্য মাটি হয় সিক্ত, তৃপ্ত। একবিংশ শতকের হত্যাকাণ্ডগুলোর সাক্ষী হয়ে থাকবে চিরকাল। দুঃখ, ক্ষোভ ফিলিস্তিনের আকাশ বাতাসকে ভারি করেছে। ফিলিস্তিনের মাটি ও মানুষ শোকের সাগরে মুহ্যমান। ফিলিস্তিনের প্রতিটি ধূলিকণায় প্রতিধ্বনিত হচ্ছে জিহাদের আহ্বান—ভেঙে দিতে ওদের বিষদাঁত, ফিরিয়ে দিতে ওদের কালো থাবা। এত অত্যাচার ও নির্যাতনের পরও ফিলিস্তিনিরা দমে নি। এরা দমে না। দমে না। যত কষ্টই দাও, যত অত্যাচারই কর, আমাদের ঈমান, আমাদের বিশ্বাস কেড়ে নিতে পারবে না। যত গুলি আছে, করো; যত বোমা আছে, মারো; সত্যের ওপর আমাদের অটলতা, সত্যের ওপর আমাদের অবিচলতা কমবে না। বাড়ছে; বাড়ছে।

আমরা জানি, সুবহে সাদিক হাসে শেষ হাসি; রাতের গভীরতাই দেয় দিনের আগমনী বার্তা। আমরা বিশ্বাস করি, এই অন্ধকার কাটবেই; এই অমানিশা দূর হবেই। ফিলিস্তিনিদের মায়েদের কান্নার অবসান হবেই। ফিলিস্তিনিদের মেয়েদের মুখে বিজয়ের হাসি ফুটবেই। অচিরেই আল্লাহ সাহায্য করবেন মর্দন মুজাহিদদের। বিজয়ী করবেন তাদেরকে সুস্পষ্ট বিজয়ে। নিশ্চয় আল্লাহ সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাবান। ফিলিস্তিন তার গুণী সন্তানদের হারিয়ে শোকাাহত। তারা অতি দৃঢ়ভাবে প্রাণ উৎসর্গ করেছেন আল্লাহর রাহে। বুকের তাজা রক্ত দিয়ে এক দিকে গেছেন ত্যাগ ও তিতিক্ষার চিত্র, লিখে দিে গেছেন জিহাদের আহ্বান, দেখিে দিে গেছেন বীরত্ব ও আত্মত্যাগের অপূর্ব নমুনা। তাদের এ আত্মত্যাগের কথা ইতিহাসে অম্লান হয়ে থাকবে চিরকাল। ঐ প্রজন্ম যোগাবে যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী। দুর্বার এই বীর লড়াকুদের বীরত্বগাথা স্মৃতিময় হয়ে থাকবে জাতির কাছে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম—কৃতজ্ঞতার সাথে, কৃতার্থতার সাথে। উড়ে এসে জুড়ে বসা বুনোদের অনধিকার অবরোধ, অহেতুক অনাগ্রিক বিরুদ্ধে—তাদের নির্যাতন, নিপীড়ন, নিষ্পেষণের বিরুদ্ধে— এদেশের মানুষ যে সংগ্রাম সাধনায় অবতীর্ণ হয়েছেন, তা অটল পর্বতের ন্যায় দুলর্ঙ্ঘ্য। তারা যে জিহাদি ঝাণ্ডা উত্তোলন করেছেন, তা কখনো অবদমিত হবে না, হবার নয়।

হে শহীদ-বন্দীর মা জননী, হে শহীদ-বন্দীর জীবনসঙ্গিনী, স্বয়ং আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের প্রতিদান দান করুন। তোমাদের সান্ত্বনা জানান কোন ভাষায়? পৃথিবীতে আছে কি কোনো ভাষা, যে ভাষায় তা সম্ভব? কিন্তু খাওলা, খানসা, সুমাইয়া, নাসিবা রাযিয়াল্লাহু আনহুমাদের গৌরবময় মহিমা আজও যদি পুনরাবৃত হতে পারে, সেই অনুপম কাহিনী আজও যদি মুসলিম ইতিহাসকে নতুন আবেগে আন্দোলিত করতে পারে, তবে তা—আল্লাহর কসম—তোমাদেরই মতো নারীদের কল্যাণে।

টিকাঃ
১. ইবনে মাজাহ, তিরমিযী।
২. সহীহ বুখারী ও মুসলিম।
৩. সালাহুল উম্মাহ কী উসুলুল হিম্মাহ ৫/১৬৭।
৪. আল ইসাবাহ ৮/২৮৫।
৫. আইয়ামুম মিন হায়াতি ৪৭।
৬. আল আদাওয়াতুল মুসলিমাত : ২১০।
৭. মাওয়াক্বিফ লিসাইয়াযুন মুশাক্বিকুন : ৮৩-৮৫।

প্রিয় বোন, জেনে রাখুন, ধৈর্য হলো আল্লাহর দাসত্বের বিভিন্ন পর্যায়ের একটি। কুরআনে কারীমে অসংখ্য আয়াতে ধৈর্যের কথা এসেছে। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ
অর্থ : হে ওই সমস্ত লোকেরা, যারা ঈমান এনেছ, তোমরা সবর ও সালাতের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন। — সূরা বাকারা : ১৫৩

তিনি আরও ইরশাদ করেছেন,
وَاصْبِرْ نَفْسَكَ مَعَ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُم بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ وَلَا تَعْدُ عَيْنَاكَ عَنْهُمْ تُرِيدُ زِينَةَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَلَا تُطِعْ مَنْ أَغْفَلْنَا قَلْبَهُ عَن ذِكْرِنَا وَاتَّبَعَ هَوَهُ وَكَانَ أَمْرُهُ فُرُطًا
অর্থ : সকাল সন্ধ্যা যারা সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে তাদের প্রতিপালককে ডাকে, তুমি তাদের সাথে ধৈর্যধারণ করো। পার্থিব জীবনের চাকচিক্যের মোহে তোমার দৃষ্টি যেন তাদের থেকে সরে না যায়। আমি যার হৃদয়কে আমার স্মরণ থেকে উদাসীন রেখেছি, যে তার প্রবৃত্তির অনুসরণ করেছে, যার বিষয়টি সুস্পষ্ট সীমালঙ্ঘন তুমি তার আনুগত্য করো না। — সূরা কাহফ : ২৮

তিনি আরও ইরশাদ করেছেন,
قُلْ يَاعِبَادِ الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا رَبَّكُمْ لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا فِي هَذِهِ الدُّنْيَا حَسَنَةٌ وَ أَرْضُ اللَّهِ وَاسِعَةٌ إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُم بِغَيْرِ حِسَابٍ
অর্থ : তুমি বলে দাও, হে আমার ওই সমস্ত বান্দারা, যারা ঈমান এনেছ, তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো; এই দুনিয়ায় যারা কল্যাণ করবে, তাদের জন্য থাকবে মহাকল্যাণ। আল্লাহর জমিন তো অনেক প্রশস্ত। নিশ্চয় ধৈর্যশীলদের দেওয়া হবে অপরিমিত পুরস্কার। — সূরা যুমার : ১০

যাই হোক, ধৈর্য কয়েক প্রকার :
১. আল্লাহর আনুগত্যে ধৈর্যধারণ : অর্থাৎ ধৈর্যের সাথে আল্লাহর হুকুম আহকাম মেনে চলা।
২. বিপদাপদে ধৈর্যধারণ : অর্থাৎ বিপদাপদ ও আল্লাহর রাহে জুলুম অত্যাচারের মুখেও আপন ধর্ম ও বিশ্বাসের ওপর অবিচল থাকা।
৩. আত্মনিয়ন্ত্রণে ধৈর্যধারণ : অর্থাৎ আল্লাহর নাফরমানি ও গোনাহে লিপ্ত হওয়া থেকে আত্মনিয়ন্ত্রণ করা।
৪. দুঃখ কষ্টে ধৈর্যধারণ : জীবনে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানামুখী বিপদাপদ, কষ্ট-লেশ, জুলুম-অত্যাচারে ধৈর্যধারণ ও পূর্ণ প্রত্যয়ের সাথে যে কোনো পরিস্থিতির মোকাবিলা করা।

ধৈর্য প্রকারভেদসহ দাওয়াহ দুনিয়ার সফলতার পূর্বশর্ত। আপনার চারপাশের প্রত্যেকেই খুশিমনে আপনার কথা মেনে নেবে, আপনার কাজে সাড়া দেবে—এমনটা আশা করা ঠিক নয়। এমনিতেই মানুষকে নিয়ে কোনো কাজ করা কঠিন। দাওয়াতি কাজ করা আরও কঠিন। আর মানুষের জীবনধারায় পরিবর্তন আনা যারপরনাই কঠিন। এজন্য প্রয়োজন যোগ্য নেতৃত্ব। প্রয়োজন বিনয়, নম্র ও সহনশীল আচরণ। দাওয়াতি কাজ হলো নিরাশ না হওয়া। অবিরাম দাওয়াতও চালিয়ে যাওয়া। যতক্ষণ একটিও কান আছে শোনার মতো। একটিও হৃদয় আছে ভাবার মতো। একটিও আশা আছে সাড়া পাওয়ার মতো।

আবু উমাইয়া শাবানী বলেন, আমি আবু সালাবা খাশানীর কাছে গেলাম, বললাম, এই আয়াতটি সম্পর্কে আপনার কী মত? তিনি বললেন, কোন আয়াত? বললাম,
يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا عَلَيْكُمْ أَنفُسَكُمْ لَا يَضُرُّكُم مَّن ضَلَّ إِذَا اهْتَدَيْتُمْ
অর্থ : হে ঈমানদারগণ, তোমরা নিজেদের রক্ষা করো। তোমরা নিজেরা যদি হেদায়েতপ্রাপ্ত হতে যাও, তা হলে যে গোমরা হলো সে তোমাদের ক্ষতি করতে পারবে না। — সূরা মাইদাহ : ১০৫

তিনি বললেন, আমি এ বিষয়ে সর্বাধিক জ্ঞাত ব্যক্তিককেই জিজ্ঞেস করেছিলাম, আমি স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেই জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি উত্তরে বলেছিলেন,
বাইল ইতিমিরু বিল মারূফি ওয়ান্তাহু আনিল মুনকারি হাত্তা ইযা রয়াইতা শুহহাম মুতআও ওয়া হাওয়াম মুত্তাবাআও ওয়া দুনিয়াম মুসারাতাও ওয়া ইজবা কুল্লি যি রয়িম বি রয়িহি ওয়া রয়াইতা আমরণ লা ইয়াদানি লাকা ফীহি ফায়ালাইকা বিখুয়াইসাতিন নাফসিক ইন্নাহু মিন অরাইকুম আইয়ামাস সবরি আস সবরু ফীহিন্না মিসলু কাবযি আলাল জামরি লিলফায়িলি ফীহিন্না মিসলু আজরি খামসীনা রযুলান মিসলা আমালিহি
অর্থ : বরং তোমরা একে অপরকে সৎকাজের আদেশ করতে থাকো। অসৎ কাজ থেকে বাধা প্রদান করতে থাকো। অবশেষে যখন স্বার্থের আনুগত্য, প্রবৃত্তির অনুসরণ, পার্থিবতার ব্যাপক প্রাধান্য এবং নিজ নিজ মতে প্রত্যেকের আত্মতুষ্টির ব্যাপক চর্চা হতে দেখবে, এবং এমন কিছু হতে দেখবে যাতে তোমার করার কিছু নেই, তখনই শুধু নিজের কথা ভেবো। নিশ্চয় তোমাদের পশ্চাতে আসছে ধৈর্যের দিন। ওই দিনগুলোতে ধৈর্য ধারণ করা—হাতে জ্বলন্ত অঙ্গার চেপে ধরার মতো কঠিন হবে। তখন একজন আমেল পঞ্চাশজন আমেলের বিনিময় লাভ করবে।

অন্য একটি বর্ণনায় আছে,
ক্বীলা ইয়া রাসূলাল্লাহ আজরু খামসীনা হীনান মিন্না আও মিনহুম? ক্বলা বাল আজরু খামসীনা মিনকুম
অর্থ : বলা হলো, হে আল্লাহর রাসূল, আমাদের মধ্য থেকে পঞ্চাশজন, নাকি তাদের মধ্য থেকে পঞ্চাশজন? তিনি বললেন, বরং তোমাদের মধ্য থেকেই পঞ্চাশজন।

অন্য একটি বর্ণনায় বিনিময়ের আধিক্যের কারণ দর্শানো হয়েছে এভাবে,
ইন্নাকুম তাজিদুনা আলাল খাইরি আওয়ানান ওয়ালা ইয়াজিদুনা আলাল খাইরি আওয়ানান
অর্থ : তোমরা কল্যাণে সহযোগী পাচ্ছ, কিন্তু তারা কল্যাণে সহযোগী পাবে না। ১

আমাদের প্রিয় নবীজীর মাঝে আমাদের জন্য আছে উত্তম আদর্শ। তিনি কত বিপদের মুখে পতিত হয়েছেন! কত উপহাসের সম্মুখীন হয়েছেন! কত গালমন্দ সহ্য করেছেন! এমনকি, মহান আল্লাহ পাহাড়ের ফেরেশতাকে পাঠালেন এই মর্মে,
ইন শিতা আবতাকতু আলাইহিমুল আখশাবাইনি ফ ইয়াকুলু লা ইন্নি আসআলুল্লাহা তায়ালা আই ইউখরিজা মিন আসলাবিহিম মাই ইয়াবুদুল্লাহা ওয়ালা ইউশরিকু বিহি শাইয়া
অর্থ : হে নবী, আপনি যদি চান, তা হলে তাদের ওপর দুই পাহাড় চাপিয়ে দেব। কিন্তু তিনি বললেন, না। আমি বরং আল্লাহর কাছে এইটা চাই যে, তিনি এদের ঊরসদেশ থেকে এমন কিছু মানুষ যারা আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কোনো কিছুকে শরীক করবে না। ২

হলোও তাই। আল্লাহ ওয়ালিদ বিন মুগীরা ও আবু জেহেলের মতো কাফের ও মোশরেকদের ঊরসে জন্ম দিলেন খালিদ বিন ওয়ালিদের মতো দিগ্বিজয়ী বীর ও ইকরিমার মতো মুসলিম সাধককে। দাওয়াতে পর্যায়ক্রমতা আছে। আগে মনকে প্রস্তুত করতে হয়। তারপর নতুন কিছু তুলে ধরা। অপ্রস্তুত অবস্থায় কারও কাছে কোনো কিছু গৃহীত হওয়া অনেকটা আকস্মিকতা। তাই দাওয়াতি কাজে পর্যায়ক্রমতা বিবেচনায় রাখা আবশ্যক।

প্রথম ধাপে দাওয়াত-পরিচিতি। অর্থাৎ দাওয়াতের বিষয়, অঙ্গন, পরিধি ইত্যাদি ঠিক করা। দ্বিতীয় শ্রেণি ও পেশার মানুষের কাছে দাওয়াত পৌঁছানোর ক্ষেত্র নির্ধারণ করা। দ্বিতীয় পর্যায়ে, দাওয়াতি কাজে সহযোগী নির্বাচন করা। এমন কিছু মানুষ—যারা আপনার চিন্তাকে গ্রহণ করবে, জীবন-সফরের এই মহতী উদ্যোগে আপনার সঙ্গী হবে। তৃতীয় পর্যায়ে চিন্তা-চেতনার বাস্তবায়নে মনে রাখবেন, এখানে প্রধান ও মৌলিক প্রয়োজন তা হলো এমন আলোকিত হৃদয়—যাতে ঈমান আছে, ইখলাস আছে। এভাবে ধাপে ধাপে সফলতার সাথে এগোনোর পারলে আশা করা যায় আমাদের দাওয়াতি কাজের একটি শক্তিশালী, সুসংহত, কার্যকর ভিত্তি স্থাপিত হবে। আমাদের শ্রম সার্থকতাও পাবে, ফলপ্রসূও হবে। জীবনধারায় আমূল পরিবর্তন আনাও সম্ভব হবে। অচিরেই মানবজীবন পরিচালিত হবে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'র পতাকা তলে।

আমরা যখন কোনো নারীকে দাওয়াত দেব, তখন সে হয়তো খুব অনায়াসে সালাত আদায় শুরু করবে। কিন্তু পর্দার বেলায় অপারগতা প্রকাশ করবে। হয়তো নিজের প্রবৃত্তির কাছে পরাজিত হয়ে, কিংবা অন্য কোনো প্রতিকূলতার কারণে। তখন হতাশ হলে চলবে না। তার সাথে লেগে থাকতে হবে। দীনের দাওয়াতও দিতে থাকতে হবে। তাকে উপলব্ধি করাতে হবে যে, অচিরেই কাল কিয়ামতে তাকে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে; সেখানে মা বাবা ভাই বোন স্বামী সন্তান কেউ থাকবে না; সেখানে আল্লাহ ছোট বড় সবকিছুর হিসেব নেবেন।

আশা করা যায়, ধীরে ধীরে আমরা আমাদের এই বোনটিকে বর্বরতার পঙ্কিল থেকে মুক্ত করতে পারবো। পাশ্চাত্যপ্রিয়তা ও অন্ধ অনুকরণের বেড়াজাল থেকে বের করে আনতে পারবো। বিশেষ করে, আধুনিকতার নামে যে অপচর্চা শুরু হয়েছে, নারীরা আল্লাহবিস্মৃত হয়ে যে মরণফাঁদে পা দিতে আরম্ভ করেছে, হয়তো তা থেকে তাকে বাঁচাতে পারবো। আমাদের আন্তরিকতা ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টাকে কবুল করে হয়তো আল্লাহ তার মাঝে ধার্মিকতা সৃষ্টি করবেন। এই বোনটির মাঝেই, অচিরেই আমরা একটি সত্যিকার ধার্মিক নারীকে দেখতে পাবো। যিনি মনে প্রাণে ইসলাম ও মুসলমানকে ভালোবাসবেন। নিঃসন্দেহে এটা আল্লাহর কাছে কঠিন কিছু নয়।

প্রিয় বোন, এ পথে চলতে হয়তো অনেক বাধা আসবে। হয়তো অনেক কঠিন কঠিন পরীক্ষারও সম্মুখীন হতে হবে। নিশ্চয় এ পরীক্ষা অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু এটা যেমন সত্য, এর চেয়েও বেশি সত্য এই যে, এর বিনিময় ও প্রতিদান আল্লাহর কাছে অনেক বড়, অনেক মহৎ।

হযরত সুমাইয়া রাযি.-কেই দেখুন। তিনি ছিলেন ইসলামের পথে শাহাদতবরণকারী প্রথম নারী। কাফেররা তাকে, তার ছেলে ও স্বামীকে ধরে নিয়ে গেল। মরুভূমির উত্তপ্ত বালুতে নিয়ে গিয়ে পুরো পরিবারকে কী নির্মম অত্যাচার করল। কিন্তু হযরত সুমাইয়া রাযি. ধৈর্য ও অবিচলতার কী জীবন্ত উদাহরণই না রেখে গেলেন যুগ যুগের মুসলিম নারী সমাজের জন্য। তিনি আপন ছেলেকে স্বামীকে উৎসর্গ করলেন আল্লাহর রাহে, প্রাণ সঁপে দিলেন আপন প্রভুর সমীপে; কিন্তু নিজের ঈমানকে কাফের বেইমানের সামনে বিসর্জন দিতে রাজি হলেন না। ৩

এই যে উম্মে শারিক গাযিয়া বিনতে জাবের বিন হাকিম। ইসলাম গ্রহণ করলেন। কুরাইশ নারীদের কাছে গিয়ে গোপনে ইসলামের দাওয়াত দিতে লাগলেন। একদিন কুরাইশ কাফেররা ধরে ফেলল। তারা কঠিন কঠিন বাক্য প্রয়োগ করে ধমক দিয়ে বলল, তোমার গোত্রের লোকেরা না থাকলে আজ তোমার সাথে যা করার করতাম। কিন্তু আজকের মতো তোমাকে সম্মানে ফিরিয়ে দিচ্ছি। উম্মে শারিক বলেন, আমার কওমের লোকেরা আমাকে একটি উটের পিঠে ফেলে দিল। নিচে কিছু দিল না। এভাবে দিন দিন এক মনজিল অতিক্রম করতাম। এ দীর্ঘ সফরে তারা আমাকে না কিছু খেতে দিত, না কিছু পান করতে দিত। প্রত্যেক মনজিলে আমাকে রোদ্রে ফেলে রাখত। নিজেরা ছায়ায় বিশ্রাম করত। বিশ্রাম করে খেয়ে পান করে তৃপ্ত হয়ে আবার যাত্রা করত। এক দিন এভাবেই রোদ্রে পড়ে ছিলাম। আমার প্রাণপ্রায় বের হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। হঠাৎ মুখের ওপর শীতল কিছু অনুভব করলাম। মনে হলো, পানির বালতি ধরা হয়েছে। আমি একটু পান করলাম। বালতিটি সরিয়ে নেওয়া হলো। আবার ধরা হলো। আমি আবার পান করলাম। এভাবে কয়েক দফায় পান করে আমি পরিপূর্ণরূপে তৃপ্ত হলাম। এবার বালতিটি শক্ত করে ধরে সবগুলো পানি গায়ের ওপর ঢেলে নিলাম। আমার শরীর কাপড় ভিজা গেল। আমি তাজা হয়ে গেলাম। ইতোমধ্যে সবাই জেগে গেল। তারা পানির ছাপ দেখতে পেল। আমিও একদম তাজা হয়ে আছি। তারা চেঁচামেচি শুরু করে দিল। বলল, তুমি নিশ্চয় রশির বাঁধন খুলে আমাদের পানি খেয়ে ফেলেছ। আমি বললাম, আল্লাহর কসম, আমি এমন কিছু করিনি। আসলে এরকম এরকম ঘটেছিল। তারা বলল, যদি তুমি সত্য বল থাক, তা হলে তো তোমার ধর্ম আমাদের ধর্মের চেয়ে উত্তম। এরপর তারা পানপাত্রগুলো দেখতে লাগল। তারা হতবাক হয়ে দেখল যে, তাদের পানপাত্র ঠিকই আছে। তারা আর বিলম্ব করল না। সকলে মুসলমান হয়ে গেল। ৪

চিন্তা করুন, একজন উম্মে শারিকের ধৈর্যের বদৌলতে একটি সম্প্রদায় ইসলাম গ্রহণ করল। আমাদের জন্য তার মাঝে আছে সুন্দর আদর্শ। এই বিংশ শতাব্দীতেও পৃথিবীর বুকে নারী সাহাবীদের ঈমানদীপ্ত সংগ্রামী জীবনের জীবন্ত উদাহরণ নেই তা নয়। যায়নাব আল গাযালি। ইসলামী সংগ্রাম সাধনার এক জীবন্ত কিংবদন্তী। তিনি কল্যাণের সুবাস ছড়াচ্ছেন। পথনির্দেশের আলো ছড়াচ্ছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, অচিরেই আল্লাহ মুমিনদের সাহায্য করবেন। শত্রুরা তার বাড়িরঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে। তাকে কারাবন্দি করে রেখেছে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস। তবু তিনি ঈমান ও বিশ্বাসের পথ থেকে বিন্দুমাত্র নড়েননি। ইস্পাতকঠিন মনোবল, সীমাহীন ধৈর্য, পর্বতপ্রমাণ অবিচলতায় তিনি এখনো টিকে আছেন দাওয়াতের ময়দানে। কারাগারের বিভীষিকাময় দিনগুলোর বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, “তারা ঘর খুলে দিল। ঘর ভর্তি কুকুর। আমার বুক কেঁপে উঠল। আমি চোখ বন্ধ করলাম। লোহার দরজা বন্ধ করে দেওয়ার বিকট আওয়াজ হলো। মুহূর্তের মধ্যেই চতুর্দিক থেকে আমার শরীরের সাথে কুকুরগুলো যেন সেঁটে গেল। ওদের ঘেউ ঘেউ শব্দ ছি ভয়ানক। কুকুরগুলো আমার সারা শরীরে কামড়াতে শুরু করেছে। আমি আল্লাহ জপে লাগলাম। হতভম্ব হয়ে শুধু বলে চলেছিলাম, اللهم اشغلني بك عمن سواك، اشغلني بك في حضرتك واصبغني بالشهادة فيك والحب فيك والرضى بك والمودة لك وثبت الأقدাম يا الله أقدام الموحدين (অর্থ : আল্লাহ, আমাকে তোমাতে মগ্ন রাখো। আমার আল্লাহ, আমাকে তোমাতে ব্যস্ত রাখো। হে চির একক, হে চির নিঃস্বাপেক্ষ, তোমার অনুভূতিতে আমাকে বিভোর করে দাও। তোমার উপলব্ধিতে আমাকে ডুবিয়ে রাখো। মাবুদ, তোমারই তরে শাহাদত নসীব করো। তোমাতে প্রেম দান করো। তোমার সন্তুষ্টি জোটাও। তোমার ভালোবাসা দান করো। পদ অবিচল রাখো, আল্লাহ, তোমারও একত্বে বিশ্বাসীদের পদ...) করুক ছটা কেটে গেল। ভেবেছি, খ্যাপা কুকুরেরা আমার সাদা কাপড়কে রক্তে লাল করে ফেলেছে... দরজা খোলা হলো। আলোর আভাস পেয়ে আমি আমার কাপড়ের দিকে লক্ষ করলাম। কিন্তু, কী আশ্চর্য! কাপড় দেখতে তো কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। কারারক্ষীরা যারপরনাই চমকে গেল। কুকুরগুলো আমার কাপড় ছিঁড়তে পারেনি।” ৫

দিন যায়। বছর যায়। বাইরের আলো বাতাসে দেখেন না। জেলের সেই অন্ধকারের কাঠেই সময়। সঙ্গী কিছু নয়। শুধু আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস। সময়ের পরিবর্তন হলো। সমাজের পরিবর্তন হলো। তিনি ছাড়া পেলেন। বিশ্বাস ও প্রত্যয় হলো আরও সুদৃঢ়। তিনি এখনো পথ চলছেন। আল্লাহর একত্বের উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছেন। মানুষ তার ডাকে সাড়া দিচ্ছে। স্বেচ্ছাচারী সম্প্রদায়ের বিভেদাদার ও অগ্নি-উপাসকদের থেমে নেই। কিন্তু রাখে আল্লাহ মারে কে?

শায়খ মুরসিদ হাসান হুযাইবির স্ত্রী জেলে স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে যান। সহিষ্ণু হৃদয় জানে না ভয়, মানে না বাধা। থেকে থেকে কিছু খাবার, কিছু জামাকাপড় নিয়ে যান। কারা-কর্তৃপক্ষর লোকেরা সার্চ করতে আসে। একদিন এক যুবক অতি উৎসাহে সার্চ করছিল। মনে হচ্ছিল, সে বিশাল কোনো কুকর্ম সাধন করছে। তিনি অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে বললেন, “বেটা, এটা তোমার জায়গা নয়। এটা তোমার কাগজও নয়। তোমার জায়গা ছিল রণাঙ্গন। তোমার কাজ ছিল শত্রুদের আক্রমণ থেকে মাতৃভূমিকে রক্ষা করতে। জন্মভূমির ওপর থেকে লাঞ্ছনাকে অপসারণ করতে। দিনদুপুরে গিয়ে এক মায়ের আদরের আলু-পটোল আর রুটি-পরাটা সার্চ করে কী এমন মহৎ কর্ম করছ, শুনি!” যুবকটি হতচকিত হলো। অনায়াসেই নিজেকে সামলে নিল। অপরাধীর তিলক তাকেও ব্যথিত করলো। লজ্জিত চোখে তাকাল। বলল, ‘জনাব, আপনি যথার্থ বলেছেন।” ৬

বানান তান্তাবী। জার্মানির স্বামী সাথে দাওয়াতের কাজ করতেন। সেখানে একটি নারীসংগঠনও তৈরি করেছিলেন। তার দাওয়াতী তৎপরতায় অনেক জার্মানি নারী তওবা করে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। স্বেচ্ছাচারী শাসক তাকে ও তার স্বামীকে নির্বাসিত করেছিল। এই দম্পতি সত্য বলার সাহস সর্বস্ব ত্যাগ করে দিয়েছিল। তাই শুধু নির্বাসনকে যথেষ্ট মনে করেনি। সেই স্বেচ্ছাচারীরা তাদের তাড়া করে বেড়িয়েছে এখান থেকে সেখানে, এদেশ থেকে সেদেশে। সর্বশেষ তারা আশ্রয় নিয়েছিলেন জার্মানির আখেন শহরে। স্বেচ্ছাচারী ষড়যন্ত্রজাল সেখানেও পৌঁছে গিয়েছিল। সাড়ে তিন হাজার শরীরী এক মুসলিম পীর – ইসলাম আত্মা থেকে নিষ্কৃতি না পাওয়া পর্যন্ত যেন তাদের ঘুমই হারাম। এক প্রতিবেশিনীর কপালে অস্ত্র ঠেকিয়ে শয়তানের দোসররা ইসলামের ঘরে পৌঁছে গেল। দরজায় কড়া নাড়ল। বানান তান্তাবী দরজা খুললেন। স্বামী ঘরে ছিলেন না। তিনি হাসপাতালে। অপ্রস্তুত ছিলেন। কোনো কথা নেই। বানানকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ল। ঘাতকদের পাঁচটি গুলি নিরীহ মুসলিম দায়িকার মস্তিষ্ক ভেদ করে দিল। বানান মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। শয়তানরা তার নিথর দেহটি ফেলে রেখে গেল। তিনি প্রাণ ত্যাগ করলেন দেশ থেকে দূরে, প্রিয়জন থেকে দূরে, আপনজন থেকে দূরে। বানান দুনিয়া থেকে চলে গেলেন। কিন্তু তার অমর উক্তি আজও দুনিয়াতে কোটি কোটি মুসলিম নারীর প্রেরণা হয়ে আছে, “দুঃখ করবেন না, হে ইসাম। আমাদের কথা ভেবে চিন্তিত হবেন না। আল্লাহর পথে অবিচল থাকুন। আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রাখুন। দ্বীনকে বিজয়ী করতে আপনার সঠিক অবস্থান এবং আল্লাহর রাস্তায় একনিষ্ঠভাবে জিহাদ চালিয়ে যাওয়া ই আমাদের কাম্য। আমরা আপনার কাছে আর কিছুই চাই না।” ৭

আমার ফিলিস্তিনী বোনেরা, তোমরা ধৈর্য হারিয়েো না। শত প্রতিকূলতায়, শত ঝড়ঝঞ্ঝায় এই সব দাইয়া, মুজাহিদা, সাহেবা বোনদের মাঝে আছে আমাদের আদর্শ, আছে সান্ত্বনা। আমরা প্রতিনিয়ত পরীক্ষায় নিপতিত। আমাদের পবিত্র ভূমিতে কোনো প্রেতাত্মা আশ্রয় নিতে পারে না। আমাদের পুণ্যভূমিতে কোনো মিথ্যার উপস্থাপন ঘটাতে পারে না। চিরন্তন এ লড়াই চলবেই। সত্যই হবে বিজয়ী। বিজয় হয় সত্যেরই। আল্লাহ তার ধৈর্যশীল বান্দাদেরই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বিজয় ও প্রতিষ্ঠার।

আমরা দুআ করি, ফিলিস্তিনিদের পরোলোক ও অন্তরীন পরিবারগুলোকে আল্লাহ যেন রহম করেন। তাদের স্ত্রীদের মায়েদের মেয়েদের বোনদের ইজ্জত-আবরু, সম্মান ও সম্ভ্রমের রক্ষণাবেক্ষণ করেন। ধৈর্য ও অবিচলতা দান করেন। তারা অসহনীয় কষ্ট, বিরহ, দহন সহ্য করে চলেছেন অনেকটা কাল। আমরা আশা করি, আল্লাহ আমাদেরকে আমাদের ধৈর্যের বিনিময় ও প্রতিদান দান করবেন। ঈমান ও বিশ্বাসের মজবুতি নসীব করবেন। শেষ অবধি তাঁর ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকার তওফিক দান করবেন।

আমরা আমাদের পবিত্র ভূমির সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে গিয়ে ধ্বংসযজ্ঞের শিকার, ভূমি হরণের শিকার, অসংখ্য নির্যাতনের শিকার। আমাদের দুধের শিশুদের, অল্পবয়সীদের গুলি করে, পুড়িয়ে মারতে ওদের বাধে না। রাতের আঁধারে আমাদের নারীদের গগনবিদারি আর্তচিৎকার আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে। কিন্তু কোনো সাড়া আসে না। সাহায্য আসে না। এতিমেরা কেঁদে বুক ভাসায়। হন্য হয়ে খুঁজে ফেরে মাকে, বাবাকে। কিন্তু কোথাও কোনো সাড়া নেই। কোথাও কোনো শব্দ নেই। আমাদের পবিত্র ভূমি বিরান হয়ে চলেছে। গাছপালা, নদীনালা, পশুপাখি ওদের দৌরাত্ম্য থেকে মুক্ত নয়। আমাদের মাদরাসা, কলেজ, হাসপাতাল, ব্যাংক, শিল্পকারখানা ধ্বংস হয়েছে। বিপদগ্রস্তদের দিকে যারা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়, আমাদের প্রতি তাদের সাহায্যের হাত সংকুচিত। সারা পৃথিবীর—পুরো মুসলিম উম্মাহর—সামনে তারা আমাদের শিশুদের স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করছে, আমাদের হৃদয়কে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে। আমাদের কবিরা শোকগাথা রচনা করে। কোমলহৃদয়রা অশ্রু বিসর্জন দেয়। অত্যাচারিত মুসলিম জাতি চেয়ে থাকে আরব বিশ্বের প্রতি। ইসলামী বিশ্বের প্রতি। কিংবা কোনো মুসলিম রাষ্ট্রের প্রতি। কিন্তু কোনো সাড়া নেই। আমি চিৎকার করে ডাক দিলাম। যদি কোনো জীবন্ত মানুষ পাই। কিন্তু আছে কি কোনো জীবন্ত মানুষ? পাবো কি কোনো প্রাণের সাড়া? কবি উমর আবু রিশার কথা মনে পড়ছে,
(অর্থ- আমার জাতি, কি তোমার সম্মান আজকের মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা হাজারও জাতির মাঝে? আমি তোমাকে চেয়ে চেয়ে দেখি, আর আমার দৃষ্টি লজ্জায় অবনত। হায় কত মুতাসিম বিদায় নিল! কত আবাল বনিতার আর্তচিৎকার আকাশ বাতাস ভারি করল! কিন্তু তুমি শুনলে না! হায়, তোমার শাণিত কলম, অপ্রতিরোধ্য তরবারি কে রুখে দিল! মুতাসিম, তোমার আর্তনাদ কোথায় বিদায় নিল!)

আমাদের শহীদদের প্রতি আসমান জমিন অশ্রুপাত করে। টিলা উপকূল কেঁদে বুক ভাসায়। অত্যাচারীদের বন্দুকের গুলি আমাদের শহীদদের দেহকে ক্ষতবিক্ষত করে। তাদের শরীরের মাংসপিণ্ডগুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে পাথরে ককড়ে ছিটকে পড়ে। তাদের শোণিতধারায় রচিত হয় জলপ্রপাত। রক্তের নদীতে পবিত্র ভূমির পুণ্য মাটি হয় সিক্ত, তৃপ্ত। একবিংশ শতকের হত্যাকাণ্ডগুলোর সাক্ষী হয়ে থাকবে চিরকাল। দুঃখ, ক্ষোভ ফিলিস্তিনের আকাশ বাতাসকে ভারি করেছে। ফিলিস্তিনের মাটি ও মানুষ শোকের সাগরে মুহ্যমান। ফিলিস্তিনের প্রতিটি ধূলিকণায় প্রতিধ্বনিত হচ্ছে জিহাদের আহ্বান—ভেঙে দিতে ওদের বিষদাঁত, ফিরিয়ে দিতে ওদের কালো থাবা। এত অত্যাচার ও নির্যাতনের পরও ফিলিস্তিনিরা দমে নি। এরা দমে না। দমে না। যত কষ্টই দাও, যত অত্যাচারই কর, আমাদের ঈমান, আমাদের বিশ্বাস কেড়ে নিতে পারবে না। যত গুলি আছে, করো; যত বোমা আছে, মারো; সত্যের ওপর আমাদের অটলতা, সত্যের ওপর আমাদের অবিচলতা কমবে না। বাড়ছে; বাড়ছে।

আমরা জানি, সুবহে সাদিক হাসে শেষ হাসি; রাতের গভীরতাই দেয় দিনের আগমনী বার্তা। আমরা বিশ্বাস করি, এই অন্ধকার কাটবেই; এই অমানিশা দূর হবেই। ফিলিস্তিনিদের মায়েদের কান্নার অবসান হবেই। ফিলিস্তিনিদের মেয়েদের মুখে বিজয়ের হাসি ফুটবেই। অচিরেই আল্লাহ সাহায্য করবেন মর্দন মুজাহিদদের। বিজয়ী করবেন তাদেরকে সুস্পষ্ট বিজয়ে। নিশ্চয় আল্লাহ সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাবান। ফিলিস্তিন তার গুণী সন্তানদের হারিয়ে শোকাাহত। তারা অতি দৃঢ়ভাবে প্রাণ উৎসর্গ করেছেন আল্লাহর রাহে। বুকের তাজা রক্ত দিয়ে এক দিকে গেছেন ত্যাগ ও তিতিক্ষার চিত্র, লিখে দিে গেছেন জিহাদের আহ্বান, দেখিে দিে গেছেন বীরত্ব ও আত্মত্যাগের অপূর্ব নমুনা। তাদের এ আত্মত্যাগের কথা ইতিহাসে অম্লান হয়ে থাকবে চিরকাল। ঐ প্রজন্ম যোগাবে যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী। দুর্বার এই বীর লড়াকুদের বীরত্বগাথা স্মৃতিময় হয়ে থাকবে জাতির কাছে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম—কৃতজ্ঞতার সাথে, কৃতার্থতার সাথে। উড়ে এসে জুড়ে বসা বুনোদের অনধিকার অবরোধ, অহেতুক অনাগ্রিক বিরুদ্ধে—তাদের নির্যাতন, নিপীড়ন, নিষ্পেষণের বিরুদ্ধে— এদেশের মানুষ যে সংগ্রাম সাধনায় অবতীর্ণ হয়েছেন, তা অটল পর্বতের ন্যায় দুলর্ঙ্ঘ্য। তারা যে জিহাদি ঝাণ্ডা উত্তোলন করেছেন, তা কখনো অবদমিত হবে না, হবার নয়।

হে শহীদ-বন্দীর মা জননী, হে শহীদ-বন্দীর জীবনসঙ্গিনী, স্বয়ং আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের প্রতিদান দান করুন। তোমাদের সান্ত্বনা জানান কোন ভাষায়? পৃথিবীতে আছে কি কোনো ভাষা, যে ভাষায় তা সম্ভব? কিন্তু খাওলা, খানসা, সুমাইয়া, নাসিবা রাযিয়াল্লাহু আনহুমাদের গৌরবময় মহিমা আজও যদি পুনরাবৃত হতে পারে, সেই অনুপম কাহিনী আজও যদি মুসলিম ইতিহাসকে নতুন আবেগে আন্দোলিত করতে পারে, তবে তা—আল্লাহর কসম—তোমাদেরই মতো নারীদের কল্যাণে।

টিকাঃ
১. ইবনে মাজাহ, তিরমিযী।
২. সহীহ বুখারী ও মুসলিম।
৩. সালাহুল উম্মাহ কী উসুলুল হিম্মাহ ৫/১৬৭।
৪. আল ইসাবাহ ৮/২৮৫।
৫. আইয়ামুম মিন হায়াতি ৪৭।
৬. আল আদাওয়াতুল মুসলিমাত : ২১০।
৭. মাওয়াক্বিফ লিসাইয়াযুন মুশাক্বিকুন : ৮৩-৮৫।

প্রিয় বোন, জেনে রাখুন, ধৈর্য হলো আল্লাহর দাসত্বের বিভিন্ন পর্যায়ের একটি। কুরআনে কারীমে অসংখ্য আয়াতে ধৈর্যের কথা এসেছে। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ
অর্থ : হে ওই সমস্ত লোকেরা, যারা ঈমান এনেছ, তোমরা সবর ও সালাতের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন। — সূরা বাকারা : ১৫৩

তিনি আরও ইরশাদ করেছেন,
وَاصْبِرْ نَفْسَكَ مَعَ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُم بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ وَلَا تَعْدُ عَيْنَاكَ عَنْهُمْ تُرِيدُ زِينَةَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَلَا تُطِعْ مَنْ أَغْفَلْنَا قَلْبَهُ عَن ذِكْرِنَا وَاتَّبَعَ هَوَهُ وَكَانَ أَمْرُهُ فُرُطًا
অর্থ : সকাল সন্ধ্যা যারা সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে তাদের প্রতিপালককে ডাকে, তুমি তাদের সাথে ধৈর্যধারণ করো। পার্থিব জীবনের চাকচিক্যের মোহে তোমার দৃষ্টি যেন তাদের থেকে সরে না যায়। আমি যার হৃদয়কে আমার স্মরণ থেকে উদাসীন রেখেছি, যে তার প্রবৃত্তির অনুসরণ করেছে, যার বিষয়টি সুস্পষ্ট সীমালঙ্ঘন তুমি তার আনুগত্য করো না। — সূরা কাহফ : ২৮

তিনি আরও ইরশাদ করেছেন,
قُلْ يَاعِبَادِ الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا رَبَّكُمْ لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا فِي هَذِهِ الدُّنْيَا حَسَنَةٌ وَ أَرْضُ اللَّهِ وَاسِعَةٌ إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُم بِغَيْرِ حِسَابٍ
অর্থ : তুমি বলে দাও, হে আমার ওই সমস্ত বান্দারা, যারা ঈমান এনেছ, তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো; এই দুনিয়ায় যারা কল্যাণ করবে, তাদের জন্য থাকবে মহাকল্যাণ। আল্লাহর জমিন তো অনেক প্রশস্ত। নিশ্চয় ধৈর্যশীলদের দেওয়া হবে অপরিমিত পুরস্কার। — সূরা যুমার : ১০

যাই হোক, ধৈর্য কয়েক প্রকার :
১. আল্লাহর আনুগত্যে ধৈর্যধারণ : অর্থাৎ ধৈর্যের সাথে আল্লাহর হুকুম আহকাম মেনে চলা।
২. বিপদাপদে ধৈর্যধারণ : অর্থাৎ বিপদাপদ ও আল্লাহর রাহে জুলুম অত্যাচারের মুখেও আপন ধর্ম ও বিশ্বাসের ওপর অবিচল থাকা।
৩. আত্মনিয়ন্ত্রণে ধৈর্যধারণ : অর্থাৎ আল্লাহর নাফরমানি ও গোনাহে লিপ্ত হওয়া থেকে আত্মনিয়ন্ত্রণ করা।
৪. দুঃখ কষ্টে ধৈর্যধারণ : জীবনে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানামুখী বিপদাপদ, কষ্ট-লেশ, জুলুম-অত্যাচারে ধৈর্যধারণ ও পূর্ণ প্রত্যয়ের সাথে যে কোনো পরিস্থিতির মোকাবিলা করা।

ধৈর্য প্রকারভেদসহ দাওয়াহ দুনিয়ার সফলতার পূর্বশর্ত। আপনার চারপাশের প্রত্যেকেই খুশিমনে আপনার কথা মেনে নেবে, আপনার কাজে সাড়া দেবে—এমনটা আশা করা ঠিক নয়। এমনিতেই মানুষকে নিয়ে কোনো কাজ করা কঠিন। দাওয়াতি কাজ করা আরও কঠিন। আর মানুষের জীবনধারায় পরিবর্তন আনা যারপরনাই কঠিন। এজন্য প্রয়োজন যোগ্য নেতৃত্ব। প্রয়োজন বিনয়, নম্র ও সহনশীল আচরণ। দাওয়াতি কাজ হলো নিরাশ না হওয়া। অবিরাম দাওয়াতও চালিয়ে যাওয়া। যতক্ষণ একটিও কান আছে শোনার মতো। একটিও হৃদয় আছে ভাবার মতো। একটিও আশা আছে সাড়া পাওয়ার মতো।

আবু উমাইয়া শাবানী বলেন, আমি আবু সালাবা খাশানীর কাছে গেলাম, বললাম, এই আয়াতটি সম্পর্কে আপনার কী মত? তিনি বললেন, কোন আয়াত? বললাম,
يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا عَلَيْكُمْ أَنفُسَكُمْ لَا يَضُرُّكُم مَّن ضَلَّ إِذَا اهْتَدَيْتُمْ
অর্থ : হে ঈমানদারগণ, তোমরা নিজেদের রক্ষা করো। তোমরা নিজেরা যদি হেদায়েতপ্রাপ্ত হতে যাও, তা হলে যে গোমরা হলো সে তোমাদের ক্ষতি করতে পারবে না। — সূরা মাইদাহ : ১০৫

তিনি বললেন, আমি এ বিষয়ে সর্বাধিক জ্ঞাত ব্যক্তিককেই জিজ্ঞেস করেছিলাম, আমি স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেই জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি উত্তরে বলেছিলেন,
বাইল ইতিমিরু বিল মারূফি ওয়ান্তাহু আনিল মুনকারি হাত্তা ইযা রয়াইতা শুহহাম মুতআও ওয়া হাওয়াম মুত্তাবাআও ওয়া দুনিয়াম মুসারাতাও ওয়া ইজবা কুল্লি যি রয়িম বি রয়িহি ওয়া রয়াইতা আমরণ লা ইয়াদানি লাকা ফীহি ফায়ালাইকা বিখুয়াইসাতিন নাফসিক ইন্নাহু মিন অরাইকুম আইয়ামাস সবরি আস সবরু ফীহিন্না মিসলু কাবযি আলাল জামরি লিলফায়িলি ফীহিন্না মিসলু আজরি খামসীনা রযুলান মিসলা আমালিহি
অর্থ : বরং তোমরা একে অপরকে সৎকাজের আদেশ করতে থাকো। অসৎ কাজ থেকে বাধা প্রদান করতে থাকো। অবশেষে যখন স্বার্থের আনুগত্য, প্রবৃত্তির অনুসরণ, পার্থিবতার ব্যাপক প্রাধান্য এবং নিজ নিজ মতে প্রত্যেকের আত্মতুষ্টির ব্যাপক চর্চা হতে দেখবে, এবং এমন কিছু হতে দেখবে যাতে তোমার করার কিছু নেই, তখনই শুধু নিজের কথা ভেবো। নিশ্চয় তোমাদের পশ্চাতে আসছে ধৈর্যের দিন। ওই দিনগুলোতে ধৈর্য ধারণ করা—হাতে জ্বলন্ত অঙ্গার চেপে ধরার মতো কঠিন হবে। তখন একজন আমেল পঞ্চাশজন আমেলের বিনিময় লাভ করবে।

অন্য একটি বর্ণনায় আছে,
ক্বীলা ইয়া রাসূলাল্লাহ আজরু খামসীনা হীনান মিন্না আও মিনহুম? ক্বলা বাল আজরু খামসীনা মিনকুম
অর্থ : বলা হলো, হে আল্লাহর রাসূল, আমাদের মধ্য থেকে পঞ্চাশজন, নাকি তাদের মধ্য থেকে পঞ্চাশজন? তিনি বললেন, বরং তোমাদের মধ্য থেকেই পঞ্চাশজন।

অন্য একটি বর্ণনায় বিনিময়ের আধিক্যের কারণ দর্শানো হয়েছে এভাবে,
ইন্নাকুম তাজিদুনা আলাল খাইরি আওয়ানান ওয়ালা ইয়াজিদুনা আলাল খাইরি আওয়ানান
অর্থ : তোমরা কল্যাণে সহযোগী পাচ্ছ, কিন্তু তারা কল্যাণে সহযোগী পাবে না। ১

আমাদের প্রিয় নবীজীর মাঝে আমাদের জন্য আছে উত্তম আদর্শ। তিনি কত বিপদের মুখে পতিত হয়েছেন! কত উপহাসের সম্মুখীন হয়েছেন! কত গালমন্দ সহ্য করেছেন! এমনকি, মহান আল্লাহ পাহাড়ের ফেরেশতাকে পাঠালেন এই মর্মে,
ইন শিতা আবতাকতু আলাইহিমুল আখশাবাইনি ফ ইয়াকুলু লা ইন্নি আসআলুল্লাহা তায়ালা আই ইউখরিজা মিন আসলাবিহিম মাই ইয়াবুদুল্লাহা ওয়ালা ইউশরিকু বিহি শাইয়া
অর্থ : হে নবী, আপনি যদি চান, তা হলে তাদের ওপর দুই পাহাড় চাপিয়ে দেব। কিন্তু তিনি বললেন, না। আমি বরং আল্লাহর কাছে এইটা চাই যে, তিনি এদের ঊরসদেশ থেকে এমন কিছু মানুষ যারা আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কোনো কিছুকে শরীক করবে না। ২

হলোও তাই। আল্লাহ ওয়ালিদ বিন মুগীরা ও আবু জেহেলের মতো কাফের ও মোশরেকদের ঊরসে জন্ম দিলেন খালিদ বিন ওয়ালিদের মতো দিগ্বিজয়ী বীর ও ইকরিমার মতো মুসলিম সাধককে। দাওয়াতে পর্যায়ক্রমতা আছে। আগে মনকে প্রস্তুত করতে হয়। তারপর নতুন কিছু তুলে ধরা। অপ্রস্তুত অবস্থায় কারও কাছে কোনো কিছু গৃহীত হওয়া অনেকটা আকস্মিকতা। তাই দাওয়াতি কাজে পর্যায়ক্রমতা বিবেচনায় রাখা আবশ্যক।

প্রথম ধাপে দাওয়াত-পরিচিতি। অর্থাৎ দাওয়াতের বিষয়, অঙ্গন, পরিধি ইত্যাদি ঠিক করা। দ্বিতীয় শ্রেণি ও পেশার মানুষের কাছে দাওয়াত পৌঁছানোর ক্ষেত্র নির্ধারণ করা। দ্বিতীয় পর্যায়ে, দাওয়াতি কাজে সহযোগী নির্বাচন করা। এমন কিছু মানুষ—যারা আপনার চিন্তাকে গ্রহণ করবে, জীবন-সফরের এই মহতী উদ্যোগে আপনার সঙ্গী হবে। তৃতীয় পর্যায়ে চিন্তা-চেতনার বাস্তবায়নে মনে রাখবেন, এখানে প্রধান ও মৌলিক প্রয়োজন তা হলো এমন আলোকিত হৃদয়—যাতে ঈমান আছে, ইখলাস আছে। এভাবে ধাপে ধাপে সফলতার সাথে এগোনোর পারলে আশা করা যায় আমাদের দাওয়াতি কাজের একটি শক্তিশালী, সুসংহত, কার্যকর ভিত্তি স্থাপিত হবে। আমাদের শ্রম সার্থকতাও পাবে, ফলপ্রসূও হবে। জীবনধারায় আমূল পরিবর্তন আনাও সম্ভব হবে। অচিরেই মানবজীবন পরিচালিত হবে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'র পতাকা তলে।

আমরা যখন কোনো নারীকে দাওয়াত দেব, তখন সে হয়তো খুব অনায়াসে সালাত আদায় শুরু করবে। কিন্তু পর্দার বেলায় অপারগতা প্রকাশ করবে। হয়তো নিজের প্রবৃত্তির কাছে পরাজিত হয়ে, কিংবা অন্য কোনো প্রতিকূলতার কারণে। তখন হতাশ হলে চলবে না। তার সাথে লেগে থাকতে হবে। দীনের দাওয়াতও দিতে থাকতে হবে। তাকে উপলব্ধি করাতে হবে যে, অচিরেই কাল কিয়ামতে তাকে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে; সেখানে মা বাবা ভাই বোন স্বামী সন্তান কেউ থাকবে না; সেখানে আল্লাহ ছোট বড় সবকিছুর হিসেব নেবেন।

আশা করা যায়, ধীরে ধীরে আমরা আমাদের এই বোনটিকে বর্বরতার পঙ্কিল থেকে মুক্ত করতে পারবো। পাশ্চাত্যপ্রিয়তা ও অন্ধ অনুকরণের বেড়াজাল থেকে বের করে আনতে পারবো। বিশেষ করে, আধুনিকতার নামে যে অপচর্চা শুরু হয়েছে, নারীরা আল্লাহবিস্মৃত হয়ে যে মরণফাঁদে পা দিতে আরম্ভ করেছে, হয়তো তা থেকে তাকে বাঁচাতে পারবো। আমাদের আন্তরিকতা ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টাকে কবুল করে হয়তো আল্লাহ তার মাঝে ধার্মিকতা সৃষ্টি করবেন। এই বোনটির মাঝেই, অচিরেই আমরা একটি সত্যিকার ধার্মিক নারীকে দেখতে পাবো। যিনি মনে প্রাণে ইসলাম ও মুসলমানকে ভালোবাসবেন। নিঃসন্দেহে এটা আল্লাহর কাছে কঠিন কিছু নয়।

প্রিয় বোন, এ পথে চলতে হয়তো অনেক বাধা আসবে। হয়তো অনেক কঠিন কঠিন পরীক্ষারও সম্মুখীন হতে হবে। নিশ্চয় এ পরীক্ষা অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু এটা যেমন সত্য, এর চেয়েও বেশি সত্য এই যে, এর বিনিময় ও প্রতিদান আল্লাহর কাছে অনেক বড়, অনেক মহৎ।

হযরত সুমাইয়া রাযি.-কেই দেখুন। তিনি ছিলেন ইসলামের পথে শাহাদতবরণকারী প্রথম নারী। কাফেররা তাকে, তার ছেলে ও স্বামীকে ধরে নিয়ে গেল। মরুভূমির উত্তপ্ত বালুতে নিয়ে গিয়ে পুরো পরিবারকে কী নির্মম অত্যাচার করল। কিন্তু হযরত সুমাইয়া রাযি. ধৈর্য ও অবিচলতার কী জীবন্ত উদাহরণই না রেখে গেলেন যুগ যুগের মুসলিম নারী সমাজের জন্য। তিনি আপন ছেলেকে স্বামীকে উৎসর্গ করলেন আল্লাহর রাহে, প্রাণ সঁপে দিলেন আপন প্রভুর সমীপে; কিন্তু নিজের ঈমানকে কাফের বেইমানের সামনে বিসর্জন দিতে রাজি হলেন না। ৩

এই যে উম্মে শারিক গাযিয়া বিনতে জাবের বিন হাকিম। ইসলাম গ্রহণ করলেন। কুরাইশ নারীদের কাছে গিয়ে গোপনে ইসলামের দাওয়াত দিতে লাগলেন। একদিন কুরাইশ কাফেররা ধরে ফেলল। তারা কঠিন কঠিন বাক্য প্রয়োগ করে ধমক দিয়ে বলল, তোমার গোত্রের লোকেরা না থাকলে আজ তোমার সাথে যা করার করতাম। কিন্তু আজকের মতো তোমাকে সম্মানে ফিরিয়ে দিচ্ছি। উম্মে শারিক বলেন, আমার কওমের লোকেরা আমাকে একটি উটের পিঠে ফেলে দিল। নিচে কিছু দিল না। এভাবে দিন দিন এক মনজিল অতিক্রম করতাম। এ দীর্ঘ সফরে তারা আমাকে না কিছু খেতে দিত, না কিছু পান করতে দিত। প্রত্যেক মনজিলে আমাকে রোদ্রে ফেলে রাখত। নিজেরা ছায়ায় বিশ্রাম করত। বিশ্রাম করে খেয়ে পান করে তৃপ্ত হয়ে আবার যাত্রা করত। এক দিন এভাবেই রোদ্রে পড়ে ছিলাম। আমার প্রাণপ্রায় বের হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। হঠাৎ মুখের ওপর শীতল কিছু অনুভব করলাম। মনে হলো, পানির বালতি ধরা হয়েছে। আমি একটু পান করলাম। বালতিটি সরিয়ে নেওয়া হলো। আবার ধরা হলো। আমি আবার পান করলাম। এভাবে কয়েক দফায় পান করে আমি পরিপূর্ণরূপে তৃপ্ত হলাম। এবার বালতিটি শক্ত করে ধরে সবগুলো পানি গায়ের ওপর ঢেলে নিলাম। আমার শরীর কাপড় ভিজা গেল। আমি তাজা হয়ে গেলাম। ইতোমধ্যে সবাই জেগে গেল। তারা পানির ছাপ দেখতে পেল। আমিও একদম তাজা হয়ে আছি। তারা চেঁচামেচি শুরু করে দিল। বলল, তুমি নিশ্চয় রশির বাঁধন খুলে আমাদের পানি খেয়ে ফেলেছ। আমি বললাম, আল্লাহর কসম, আমি এমন কিছু করিনি। আসলে এরকম এরকম ঘটেছিল। তারা বলল, যদি তুমি সত্য বল থাক, তা হলে তো তোমার ধর্ম আমাদের ধর্মের চেয়ে উত্তম। এরপর তারা পানপাত্রগুলো দেখতে লাগল। তারা হতবাক হয়ে দেখল যে, তাদের পানপাত্র ঠিকই আছে। তারা আর বিলম্ব করল না। সকলে মুসলমান হয়ে গেল। ৪

চিন্তা করুন, একজন উম্মে শারিকের ধৈর্যের বদৌলতে একটি সম্প্রদায় ইসলাম গ্রহণ করল। আমাদের জন্য তার মাঝে আছে সুন্দর আদর্শ। এই বিংশ শতাব্দীতেও পৃথিবীর বুকে নারী সাহাবীদের ঈমানদীপ্ত সংগ্রামী জীবনের জীবন্ত উদাহরণ নেই তা নয়। যায়নাব আল গাযালি। ইসলামী সংগ্রাম সাধনার এক জীবন্ত কিংবদন্তী। তিনি কল্যাণের সুবাস ছড়াচ্ছেন। পথনির্দেশের আলো ছড়াচ্ছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, অচিরেই আল্লাহ মুমিনদের সাহায্য করবেন। শত্রুরা তার বাড়িরঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে। তাকে কারাবন্দি করে রেখেছে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস। তবু তিনি ঈমান ও বিশ্বাসের পথ থেকে বিন্দুমাত্র নড়েননি। ইস্পাতকঠিন মনোবল, সীমাহীন ধৈর্য, পর্বতপ্রমাণ অবিচলতায় তিনি এখনো টিকে আছেন দাওয়াতের ময়দানে। কারাগারের বিভীষিকাময় দিনগুলোর বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, “তারা ঘর খুলে দিল। ঘর ভর্তি কুকুর। আমার বুক কেঁপে উঠল। আমি চোখ বন্ধ করলাম। লোহার দরজা বন্ধ করে দেওয়ার বিকট আওয়াজ হলো। মুহূর্তের মধ্যেই চতুর্দিক থেকে আমার শরীরের সাথে কুকুরগুলো যেন সেঁটে গেল। ওদের ঘেউ ঘেউ শব্দ ছি ভয়ানক। কুকুরগুলো আমার সারা শরীরে কামড়াতে শুরু করেছে। আমি আল্লাহ জপে লাগলাম। হতভম্ব হয়ে শুধু বলে চলেছিলাম, اللهم اشغلني بك عمن سواك، اشغلني بك في حضرتك واصبغني بالشهادة فيك والحب فيك والرضى بك والمودة لك وثبت الأقدাম يا الله أقدام الموحدين (অর্থ : আল্লাহ, আমাকে তোমাতে মগ্ন রাখো। আমার আল্লাহ, আমাকে তোমাতে ব্যস্ত রাখো। হে চির একক, হে চির নিঃস্বাপেক্ষ, তোমার অনুভূতিতে আমাকে বিভোর করে দাও। তোমার উপলব্ধিতে আমাকে ডুবিয়ে রাখো। মাবুদ, তোমারই তরে শাহাদত নসীব করো। তোমাতে প্রেম দান করো। তোমার সন্তুষ্টি জোটাও। তোমার ভালোবাসা দান করো। পদ অবিচল রাখো, আল্লাহ, তোমারও একত্বে বিশ্বাসীদের পদ...) করুক ছটা কেটে গেল। ভেবেছি, খ্যাপা কুকুরেরা আমার সাদা কাপড়কে রক্তে লাল করে ফেলেছে... দরজা খোলা হলো। আলোর আভাস পেয়ে আমি আমার কাপড়ের দিকে লক্ষ করলাম। কিন্তু, কী আশ্চর্য! কাপড় দেখতে তো কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। কারারক্ষীরা যারপরনাই চমকে গেল। কুকুরগুলো আমার কাপড় ছিঁড়তে পারেনি।” ৫

দিন যায়। বছর যায়। বাইরের আলো বাতাসে দেখেন না। জেলের সেই অন্ধকারের কাঠেই সময়। সঙ্গী কিছু নয়। শুধু আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস। সময়ের পরিবর্তন হলো। সমাজের পরিবর্তন হলো। তিনি ছাড়া পেলেন। বিশ্বাস ও প্রত্যয় হলো আরও সুদৃঢ়। তিনি এখনো পথ চলছেন। আল্লাহর একত্বের উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছেন। মানুষ তার ডাকে সাড়া দিচ্ছে। স্বেচ্ছাচারী সম্প্রদায়ের বিভেদাদার ও অগ্নি-উপাসকদের থেমে নেই। কিন্তু রাখে আল্লাহ মারে কে?

শায়খ মুরসিদ হাসান হুযাইবির স্ত্রী জেলে স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে যান। সহিষ্ণু হৃদয় জানে না ভয়, মানে না বাধা। থেকে থেকে কিছু খাবার, কিছু জামাকাপড় নিয়ে যান। কারা-কর্তৃপক্ষর লোকেরা সার্চ করতে আসে। একদিন এক যুবক অতি উৎসাহে সার্চ করছিল। মনে হচ্ছিল, সে বিশাল কোনো কুকর্ম সাধন করছে। তিনি অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে বললেন, “বেটা, এটা তোমার জায়গা নয়। এটা তোমার কাগজও নয়। তোমার জায়গা ছিল রণাঙ্গন। তোমার কাজ ছিল শত্রুদের আক্রমণ থেকে মাতৃভূমিকে রক্ষা করতে। জন্মভূমির ওপর থেকে লাঞ্ছনাকে অপসারণ করতে। দিনদুপুরে গিয়ে এক মায়ের আদরের আলু-পটোল আর রুটি-পরাটা সার্চ করে কী এমন মহৎ কর্ম করছ, শুনি!” যুবকটি হতচকিত হলো। অনায়াসেই নিজেকে সামলে নিল। অপরাধীর তিলক তাকেও ব্যথিত করলো। লজ্জিত চোখে তাকাল। বলল, ‘জনাব, আপনি যথার্থ বলেছেন।” ৬

বানান তান্তাবী। জার্মানির স্বামী সাথে দাওয়াতের কাজ করতেন। সেখানে একটি নারীসংগঠনও তৈরি করেছিলেন। তার দাওয়াতী তৎপরতায় অনেক জার্মানি নারী তওবা করে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। স্বেচ্ছাচারী শাসক তাকে ও তার স্বামীকে নির্বাসিত করেছিল। এই দম্পতি সত্য বলার সাহস সর্বস্ব ত্যাগ করে দিয়েছিল। তাই শুধু নির্বাসনকে যথেষ্ট মনে করেনি। সেই স্বেচ্ছাচারীরা তাদের তাড়া করে বেড়িয়েছে এখান থেকে সেখানে, এদেশ থেকে সেদেশে। সর্বশেষ তারা আশ্রয় নিয়েছিলেন জার্মানির আখেন শহরে। স্বেচ্ছাচারী ষড়যন্ত্রজাল সেখানেও পৌঁছে গিয়েছিল। সাড়ে তিন হাজার শরীরী এক মুসলিম পীর – ইসলাম আত্মা থেকে নিষ্কৃতি না পাওয়া পর্যন্ত যেন তাদের ঘুমই হারাম। এক প্রতিবেশিনীর কপালে অস্ত্র ঠেকিয়ে শয়তানের দোসররা ইসলামের ঘরে পৌঁছে গেল। দরজায় কড়া নাড়ল। বানান তান্তাবী দরজা খুললেন। স্বামী ঘরে ছিলেন না। তিনি হাসপাতালে। অপ্রস্তুত ছিলেন। কোনো কথা নেই। বানানকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ল। ঘাতকদের পাঁচটি গুলি নিরীহ মুসলিম দায়িকার মস্তিষ্ক ভেদ করে দিল। বানান মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। শয়তানরা তার নিথর দেহটি ফেলে রেখে গেল। তিনি প্রাণ ত্যাগ করলেন দেশ থেকে দূরে, প্রিয়জন থেকে দূরে, আপনজন থেকে দূরে। বানান দুনিয়া থেকে চলে গেলেন। কিন্তু তার অমর উক্তি আজও দুনিয়াতে কোটি কোটি মুসলিম নারীর প্রেরণা হয়ে আছে, “দুঃখ করবেন না, হে ইসাম। আমাদের কথা ভেবে চিন্তিত হবেন না। আল্লাহর পথে অবিচল থাকুন। আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রাখুন। দ্বীনকে বিজয়ী করতে আপনার সঠিক অবস্থান এবং আল্লাহর রাস্তায় একনিষ্ঠভাবে জিহাদ চালিয়ে যাওয়া ই আমাদের কাম্য। আমরা আপনার কাছে আর কিছুই চাই না।” ৭

আমার ফিলিস্তিনী বোনেরা, তোমরা ধৈর্য হারিয়েো না। শত প্রতিকূলতায়, শত ঝড়ঝঞ্ঝায় এই সব দাইয়া, মুজাহিদা, সাহেবা বোনদের মাঝে আছে আমাদের আদর্শ, আছে সান্ত্বনা। আমরা প্রতিনিয়ত পরীক্ষায় নিপতিত। আমাদের পবিত্র ভূমিতে কোনো প্রেতাত্মা আশ্রয় নিতে পারে না। আমাদের পুণ্যভূমিতে কোনো মিথ্যার উপস্থাপন ঘটাতে পারে না। চিরন্তন এ লড়াই চলবেই। সত্যই হবে বিজয়ী। বিজয় হয় সত্যেরই। আল্লাহ তার ধৈর্যশীল বান্দাদেরই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বিজয় ও প্রতিষ্ঠার।

আমরা দুআ করি, ফিলিস্তিনিদের পরোলোক ও অন্তরীন পরিবারগুলোকে আল্লাহ যেন রহম করেন। তাদের স্ত্রীদের মায়েদের মেয়েদের বোনদের ইজ্জত-আবরু, সম্মান ও সম্ভ্রমের রক্ষণাবেক্ষণ করেন। ধৈর্য ও অবিচলতা দান করেন। তারা অসহনীয় কষ্ট, বিরহ, দহন সহ্য করে চলেছেন অনেকটা কাল। আমরা আশা করি, আল্লাহ আমাদেরকে আমাদের ধৈর্যের বিনিময় ও প্রতিদান দান করবেন। ঈমান ও বিশ্বাসের মজবুতি নসীব করবেন। শেষ অবধি তাঁর ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকার তওফিক দান করবেন।

আমরা আমাদের পবিত্র ভূমির সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে গিয়ে ধ্বংসযজ্ঞের শিকার, ভূমি হরণের শিকার, অসংখ্য নির্যাতনের শিকার। আমাদের দুধের শিশুদের, অল্পবয়সীদের গুলি করে, পুড়িয়ে মারতে ওদের বাধে না। রাতের আঁধারে আমাদের নারীদের গগনবিদারি আর্তচিৎকার আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে। কিন্তু কোনো সাড়া আসে না। সাহায্য আসে না। এতিমেরা কেঁদে বুক ভাসায়। হন্য হয়ে খুঁজে ফেরে মাকে, বাবাকে। কিন্তু কোথাও কোনো সাড়া নেই। কোথাও কোনো শব্দ নেই। আমাদের পবিত্র ভূমি বিরান হয়ে চলেছে। গাছপালা, নদীনালা, পশুপাখি ওদের দৌরাত্ম্য থেকে মুক্ত নয়। আমাদের মাদরাসা, কলেজ, হাসপাতাল, ব্যাংক, শিল্পকারখানা ধ্বংস হয়েছে। বিপদগ্রস্তদের দিকে যারা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়, আমাদের প্রতি তাদের সাহায্যের হাত সংকুচিত। সারা পৃথিবীর—পুরো মুসলিম উম্মাহর—সামনে তারা আমাদের শিশুদের স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করছে, আমাদের হৃদয়কে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে। আমাদের কবিরা শোকগাথা রচনা করে। কোমলহৃদয়রা অশ্রু বিসর্জন দেয়। অত্যাচারিত মুসলিম জাতি চেয়ে থাকে আরব বিশ্বের প্রতি। ইসলামী বিশ্বের প্রতি। কিংবা কোনো মুসলিম রাষ্ট্রের প্রতি। কিন্তু কোনো সাড়া নেই। আমি চিৎকার করে ডাক দিলাম। যদি কোনো জীবন্ত মানুষ পাই। কিন্তু আছে কি কোনো জীবন্ত মানুষ? পাবো কি কোনো প্রাণের সাড়া? কবি উমর আবু রিশার কথা মনে পড়ছে,
(অর্থ- আমার জাতি, কি তোমার সম্মান আজকের মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা হাজারও জাতির মাঝে? আমি তোমাকে চেয়ে চেয়ে দেখি, আর আমার দৃষ্টি লজ্জায় অবনত। হায় কত মুতাসিম বিদায় নিল! কত আবাল বনিতার আর্তচিৎকার আকাশ বাতাস ভারি করল! কিন্তু তুমি শুনলে না! হায়, তোমার শাণিত কলম, অপ্রতিরোধ্য তরবারি কে রুখে দিল! মুতাসিম, তোমার আর্তনাদ কোথায় বিদায় নিল!)

আমাদের শহীদদের প্রতি আসমান জমিন অশ্রুপাত করে। টিলা উপকূল কেঁদে বুক ভাসায়। অত্যাচারীদের বন্দুকের গুলি আমাদের শহীদদের দেহকে ক্ষতবিক্ষত করে। তাদের শরীরের মাংসপিণ্ডগুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে পাথরে ককড়ে ছিটকে পড়ে। তাদের শোণিতধারায় রচিত হয় জলপ্রপাত। রক্তের নদীতে পবিত্র ভূমির পুণ্য মাটি হয় সিক্ত, তৃপ্ত। একবিংশ শতকের হত্যাকাণ্ডগুলোর সাক্ষী হয়ে থাকবে চিরকাল। দুঃখ, ক্ষোভ ফিলিস্তিনের আকাশ বাতাসকে ভারি করেছে। ফিলিস্তিনের মাটি ও মানুষ শোকের সাগরে মুহ্যমান। ফিলিস্তিনের প্রতিটি ধূলিকণায় প্রতিধ্বনিত হচ্ছে জিহাদের আহ্বান—ভেঙে দিতে ওদের বিষদাঁত, ফিরিয়ে দিতে ওদের কালো থাবা। এত অত্যাচার ও নির্যাতনের পরও ফিলিস্তিনিরা দমে নি। এরা দমে না। দমে না। যত কষ্টই দাও, যত অত্যাচারই কর, আমাদের ঈমান, আমাদের বিশ্বাস কেড়ে নিতে পারবে না। যত গুলি আছে, করো; যত বোমা আছে, মারো; সত্যের ওপর আমাদের অটলতা, সত্যের ওপর আমাদের অবিচলতা কমবে না। বাড়ছে; বাড়ছে।

আমরা জানি, সুবহে সাদিক হাসে শেষ হাসি; রাতের গভীরতাই দেয় দিনের আগমনী বার্তা। আমরা বিশ্বাস করি, এই অন্ধকার কাটবেই; এই অমানিশা দূর হবেই। ফিলিস্তিনিদের মায়েদের কান্নার অবসান হবেই। ফিলিস্তিনিদের মেয়েদের মুখে বিজয়ের হাসি ফুটবেই। অচিরেই আল্লাহ সাহায্য করবেন মর্দন মুজাহিদদের। বিজয়ী করবেন তাদেরকে সুস্পষ্ট বিজয়ে। নিশ্চয় আল্লাহ সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাবান। ফিলিস্তিন তার গুণী সন্তানদের হারিয়ে শোকাাহত। তারা অতি দৃঢ়ভাবে প্রাণ উৎসর্গ করেছেন আল্লাহর রাহে। বুকের তাজা রক্ত দিয়ে এক দিকে গেছেন ত্যাগ ও তিতিক্ষার চিত্র, লিখে দিে গেছেন জিহাদের আহ্বান, দেখিে দিে গেছেন বীরত্ব ও আত্মত্যাগের অপূর্ব নমুনা। তাদের এ আত্মত্যাগের কথা ইতিহাসে অম্লান হয়ে থাকবে চিরকাল। ঐ প্রজন্ম যোগাবে যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী। দুর্বার এই বীর লড়াকুদের বীরত্বগাথা স্মৃতিময় হয়ে থাকবে জাতির কাছে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম—কৃতজ্ঞতার সাথে, কৃতার্থতার সাথে। উড়ে এসে জুড়ে বসা বুনোদের অনধিকার অবরোধ, অহেতুক অনাগ্রিক বিরুদ্ধে—তাদের নির্যাতন, নিপীড়ন, নিষ্পেষণের বিরুদ্ধে— এদেশের মানুষ যে সংগ্রাম সাধনায় অবতীর্ণ হয়েছেন, তা অটল পর্বতের ন্যায় দুলর্ঙ্ঘ্য। তারা যে জিহাদি ঝাণ্ডা উত্তোলন করেছেন, তা কখনো অবদমিত হবে না, হবার নয়।

হে শহীদ-বন্দীর মা জননী, হে শহীদ-বন্দীর জীবনসঙ্গিনী, স্বয়ং আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের প্রতিদান দান করুন। তোমাদের সান্ত্বনা জানান কোন ভাষায়? পৃথিবীতে আছে কি কোনো ভাষা, যে ভাষায় তা সম্ভব? কিন্তু খাওলা, খানসা, সুমাইয়া, নাসিবা রাযিয়াল্লাহু আনহুমাদের গৌরবময় মহিমা আজও যদি পুনরাবৃত হতে পারে, সেই অনুপম কাহিনী আজও যদি মুসলিম ইতিহাসকে নতুন আবেগে আন্দোলিত করতে পারে, তবে তা—আল্লাহর কসম—তোমাদেরই মতো নারীদের কল্যাণে।

টিকাঃ
১. ইবনে মাজাহ, তিরমিযী।
২. সহীহ বুখারী ও মুসলিম।
৩. সালাহুল উম্মাহ কী উসুলুল হিম্মাহ ৫/১৬৭।
৪. আল ইসাবাহ ৮/২৮৫।
৫. আইয়ামুম মিন হায়াতি ৪৭।
৬. আল আদাওয়াতুল মুসলিমাত : ২১০।
৭. মাওয়াক্বিফ লিসাইয়াযুন মুশাক্বিকুন : ৮৩-৮৫।

📘 ফিরে এসো নীড়ে 📄 ৮. চাই প্রিয় ব্যক্তিত্ব

📄 ৮. চাই প্রিয় ব্যক্তিত্ব


মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন,
أَتَأْمُرُونَ النَّاسَ بِالْبِرِّ وَتَنْسَوْنَ أَنْفُসَكُمْ وَأَنْتُمْ تَتْلُونَ الْكِتَابَ أَفَلَا تَعْقِلُونَ
অর্থ: তোমরা কি মানুষকে সৎ কর্মের আদেশ দাও, আর নিজেদেরই ভুল থাক; অথচ কিতাবও তেলাওয়াত কর? তোমাদের কি আকল নেই? —সুরা বাকারা : ৪৪

তিনি আরও ইরশাদ করেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لِمَ تَقُولُونَ مَا لَا تَفْعَلُونَ كَبُرَ مَقْتًا عِنْدَ اللَّهِ أَنْ تَقُولُوا مَا لَا تَفْعَلُونَ
অর্থ : হে ঈমানদারগণ, কেন তোমরা এমন কথা বল যা তোমরা কর না? তোমরা এমন কিছু বলবে যা তোমরা কর না—এটা আল্লাহর কাছে খুবই কঠিন শাস্তিয়োগ্য অপরাধ। —সুরা সফ : ২-৩

দায়িয়াকে অবশ্যই উত্তম ব্যক্তিত্বের অধিকারী হতে হবে। আমল আখলাকে ধর্মীয় অনুশাসনের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন থাকতে হবে। নামায রোযা হজ যাকাত ইত্যাদি ফরজ ওয়াজিব ও নফলদেরও পাবন্দি করতে হবে। পর্দা ব্যাপারে হতে হবে সুচারু। শর্ত সমূহ সতো পালন করতে হবে পূর্ণাঙ্গ পর্দা। বেপর্দা চলবে না। মাহরাম ছাড়া কারও সামনে সৌন্দর্য প্রদর্শন করবে না।

আমাদের সমাজে অনেক ধার্মিক নারীকে দেখা যায়, যারা জিলবাব হিজাব ইত্যাদি পর্দার পোশাকগুলো ব্যবহার করেন ঠিকই; কিন্তু হাত মুখ চোখে কৃত্রিম সজ্জা গ্রহণ করে পুরুষদের সামনে যান। আবার পর্দা করারও দাবি করেন। অথচ মেকাপ, লিপস্টিক কিছুই বাদ রাখেন না। এভাবে ইসলামের নামে ইসলামের ক্ষতিসাধন হয়। বরং ইসলামের অবমাননা হয়। শুধু অন্যেরা নয়, অনেক মুসলিম মেয়েরও বিভ্রাতির শিকার হয়।

যিনি সত্যিকারের দায়িয়া হবেন, অন্যের প্রতি তার আচরণ হবে অমায়রিক। আচরণে উচ্চারণে কাউকে কষ্ট দেবেন না। সবসময় হবে তৎপর। নীরববতা হবে তাফাক্কুর ও হিকমাহ। মুখের ভাষা, শরীরের ভাষা হবে আল্লাহর হামদ ও ছানায় নূরানী। তুমি মূল্যবোধগুলো যখন একজন দায়িয়ার মনে প্রাণে গেঁথে যাবে, তখনই তার দাওয়াত সার্থকতা পাবে। অটলতা ও অবিচলতা লাভ করবে। কেননা, তখন তার অবস্থা এমন হবে যে, তিনি যা করতে বলেন তা নিজেও করেন; এবং যা ছাড়তে বলেন তা নিজেও ছাড়েন।

কবি বলেন, তুমি এমন কিছু ছাড়তে বোলো না, যা নিজেই কর; এমনটা যদি কর, তো এ বড় লজ্জাজনক ব্যাপার। শায়খ আবদুল ওয়াহিদ ইবনে যায়েদ রাহ. বলতেন, হাসান বসরী যে এত উচ্চ মর্যাদায় সমাসীন হয়েছিলেন এ-একটাই কারণ ছিল—তিনি যখন কোনো কিছু করার উপদেশ দিতেন তখন নিজেই সবার আগে তা পালন করতেন। আবার যখন কোনো কিছু ছাড়ার উপদেশ দিতেন, তখনো নিজেই সবার আগে তা ছেড়ে দিতেন।

সুতরাং আপনি যদি আপনার দাওয়াতকে মানুষকে প্রভাবিত করতে চান, যদি চান আপনার দাওয়াত ক্রিয়াশীল হোক, সার্থকতা লাভ করুক; তা হলে হৃদয়াত্মার পবিত্রতা অর্জন করুন, তাকওয়া তাহারাতের গুণে গুণান্বিত হোন, চিন্তা চেতনাকে স্বচ্ছ সুনির্মল করুন। দাওয়াতের প্রেরণা অনির্বাণ শিখা হয়ে জ্বলে উঠবে আপনার অন্তরে। মানুষ আপনার দাওয়াত কবুল করবে আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্যের প্রেরণায় সম্মোহিত হয়ে। আপনার একনিষ্ঠতায় প্রতিটি হৃদয়ে জেগে উঠবে পারস্পরিক সৌহার্দ্য সম্প্রীতি।

দেখুন না, একটি সুন্দর কথার কত সুন্দর দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন আপনার আমার আল্লাহ পবিত্র কুরআনে, তুমি কি দেখনি, আল্লাহ কেমন উদাহরণ দেন একটি ভালো কথার! যেন তা একটি ভালো গাছ। যার শেকর জমিনে গাড়া। আর শাখা প্রশাখা বিস্তৃত আসমানব্যাপী। সে তার প্রতিপালকের নির্দেশে ফল দান করে প্রতিনিয়ত। আল্লাহ মানুষের জন্য উদাহরণ দেন যেন তারা উপদেশ গ্রহণ করে। —সূরা ইবরাহীম : ২৪-২৫

আত্মসমালোচনার যোগ্যতা অর্জন করুন। নিজেই নিজের পরীক্ষা নিন প্রতিনিয়ত—ঈমানের পরীক্ষা, ইখলাসের পরীক্ষা। নিজেই নিজেকে যাচাই করুন সব সময়—দোষ-গুণ, ভালো মন্দ। মনে রাখবেন, আল্লাহ যখন কোনো মুমিনের কল্যাণ চান, তখনই তাকে নিজের দোষ ত্রুটি উপলব্ধি করার সক্ষমতা দান করেন। তাই আত্মপ্রশান্তিতে ভোগা মুমিনের কাজ নয়। এ বিষয়টি হৃদয়ঙ্গম করার চেষ্টা করুন যে, আপনি মুসলিম নারীসমাজের একজন দায়িত্বশীল প্রতিনিধি। তা ছাড়া, অনেকেই আপনাকে অনুসরণ করবে। তাই নিজের ব্যক্তিত্বের ব্যাপারে উদাসীন হবেন না। আপনার ওপর আল্লাহপ্রদত্ত বিরাট দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে।

কবি বলেন, একটু বুঝতে চেষ্টা করো, তোমার ওপর অর্পিত হয়েছে বিরাট দায়িত্ব। তাই বসে রও অপ্রয়োজনীয় কাজে সময় ফুরিও না।

প্রিয় বোন, নিজেকে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করুন যেন সম্ভাব্য সবকিছুতে আপনার আদর্শ সমুজ্জ্বল হয়ে থাকে আপনার চারপাশের নারীসমাজের জন্য। আপনি যদি কারও জীবনসঙ্গিনী হয়ে থাকেন, তা হলে একজন সত্যিকার সম্পূর্ণ মুসলিম রমণীর দৃষ্টান্ত স্থাপন করুন। নিজেকে এমন একজন স্ত্রী হিসেবে উপস্থাপন করুন যিনি সতীসাধ্বী। যিনি জীবনসত্তার প্রতি কৃতজ্ঞ, कर्तव्यপরায়ণ, একনিষ্ঠ, আন্তরিক, একজন বিশ্বস্ত, অন্তরঙ্গ বন্ধু ও সহযোগী; সুখে দুঃখে পাশের সাথী; দায়িত্ব কর্তব্য পালন পানে থাকেন; জীবন ও জগতের টানা পোড়নে স্বামীর প্রশান্তি; দাওয়াত ও তাবলীগের মশালবহনে স্বামীর ঘনিষ্ঠ সহকর্মী।

আপনি যদি কোনো সন্তানের জননী হয়ে থাকেন, তা হলে আপনিও হতে পারেন একজন সচেতন দায়িত্বশীল গৃহিণী। আপনার মস্তকেও শোভা পেতে পারে সত্যিকারের রত্নগর্ভার তাজ। আপনার ঘর হোক ইলম ও আলোর মিনার। আপনার ছেলেমেয়ে হোক তাকওয়া পরহেজগারীর অনন্য উদাহরণ। ইলমের অন্বেষণে তাদের মেহনত মোজাহাদা হোক প্রশংসনীয়। তাদের জ্ঞান ঈমান হোক আগামী প্রজন্মের মর্যাদা ও মাহাত্ম্য অর্জনের প্রেরণা। তাদের সাধনা আরাধনা ফিরিয়ে আনুক ইসলামের হারানো গৌরব। ইসলাম ও মুসলমানকে পুনপ্রতিষ্ঠিত করুক জ্ঞান মহিমায়।

ভাগ্য যদি আপনাকে শিক্ষিকার আসনে সমাসীন করে, আপনি যদি হন মানুষ গড়ার কারিগর, তা হলে স্বরূপ তুলে ধরুন প্রকৃত মুমিনের। আপনার সুপ্ত একনিষ্ঠতা, নিরন্তর কর্মোদ্দীপনা, সশ্রদ্ধ নিয়মুনুবর্তিতা, সুস্থ্য সময়সচেতনতা, অগাধ কর্তব্যপরায়ণতা যেন সর্বদাই শুভ্র সমুজ্জ্বল হয়ে থাকে; আপনার প্রতিটি ছাত্রীর মনে প্রাণে। আপনি আপনার ছাত্রীদের ধর্মীয় জীবনকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করুন। ধর্মের প্রতি তাদের মনে গভীর ভক্তি ও শ্রদ্ধা বোধ সৃষ্টি করুন। আপনি যদি ধর্মশিক্ষিকা হিসেবে নিযুক্ত নাও হন, তবুও একজন দায়িয়া হিসেবে তাদের ধর্মীয় চেতনাকে রক্ষা করা আপনার কর্তব্য।

বিশেষত আজকের আধুনিক পৃথিবীতে নিত্যনতুন বিষয় অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে এবং কর্মসূচিতে। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলোর মূল্যায়ন, এগুলোর তথ্যভিত্তিক নিরূপণ এবং শিক্ষার্থীদের সেদিকে দৃষ্টি আকর্ষণের দায়িত্ব সর্ব দিক থেকে আপনার ও ওপর বর্তায়। আজকাল বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচি এবং কর্মসূচিতে এমন অনেক বিষয় ঢোকানো হচ্ছে, যে গুলো স্পষ্টত ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক। কেউ তো এমন হবেন, যিনি এগুলোর প্রতিবাদ জানাবেন, এসব বিষয়ে সোচ্চার হবেন। অন্তত মুসলিম মেয়েদের চিন্তা চেতনাকে এসব বিষক্রিয়া থেকে মুক্ত রাখার ব্যাপারে মনোযোগী হবেন। সমাজসেবা, সামাজিক সচেতনতামূলক প্রচারণা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ইত্যাদি যাবতীয় প্রোগ্রামে মেয়েদেরও মাঠে নামানো হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ইসলামী মূল্যবোধ হয় উপেক্ষিত। এমনকি, এসবে ছেলেদের অনুপ্রবেশ ও উচ্ছৃঙ্খলতাও লজ্জাজনকভাবে পায় প্রশ্রয়। আবার মেয়েরা সামাজিকভাবে যেসব সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষকদের পক্ষে সেগুলোর সমাধান দেওয়া হয় ধর্মহীন সব চিন্তার আলোকে। মনে হয়, এসব নিয়ে তারাই প্রথম ভাবতে বসেছেন। ধর্মে এ নিয়ে কোনো কথা নেই। প্রায়ই নারীসম্পর্কিত বিষয়গুলোর ব্যাখ্যা ও সমাধান ধর্মীয় মূল্যবোধ বাদ দিয়ে। মেয়েরা দিশেহারা হয়ে যাচ্ছে ধর্ম ও জীবনের মাঝে সমন্বয় খুঁজে পেতে। ধার্মিক মেয়েরা হচ্ছে হীনমন্যতার শিকার।

প্রসঙ্গত, আজকাল শরীরচর্চার অনেক শিক্ষিকাই দায়িত্বহীনতার পরিচয় দেন। মেয়েদের পর্দাব্যবস্থা নিয়ে ভাবেন না। অনেকে সময় শিক্ষিকা অবশ্যই ছাত্রীদের জিলবাব খুলতে বাধ্য করেন। পরিবেশ পরিস্থিতিও তোয়াক্কা করেন না। এমনকি, নম্বর কাটারও হুমকি দেন। এই যদি হয় আরববিশ্বের মুসলিম রাষ্ট্রগুলো অবস্থা তা হলে অন্যদের সম্পর্কে কী বলা যায়? এরকম আরও অনেক বিষয় আছে যেগুলোতে সংস্কার প্রয়োজন। প্রয়োজন একজন নিঃস্বার্থ নির্ভিক দাইয়ার। যিনি অকপটে এগুলোর গঠনমূলক সমালোচনা করবেন। মুসলিম মেয়েদের ইসলামী মূল্যবোধ ও ভাবধারার ওপর অটল থাকতে প্রেরণা ও প্রণোদনা যোগাবেন। যারা মুসলিম মেয়েদের ইসলাম থেকে বিচ্যুত করতে চায়, মেধা দিয়ে শ্রম দিয়ে তাদের সক্ষম মোকাবেলা করবেন।

এরপরে আল্লাহ যদি আপনাকে চিকিৎসা-সেবার যোগ্যতা দান করেন, তা হলে মানবতার এ মহান পেশায় হালাল হারামের বিধান মেনে চলুন। আন্তরিকভাবে রোগীদের সেবা-শুশ্রূষা দিন। মেয়েলি বিষয়গুলোতে বিশেষভাবে মনোযোগী হোন। কেননা, মহিলা-ডাক্তার তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়। মুসলিম নারীসমাজ আপনার দ্বারা উপকৃত হতে পারবেন বেশি। এভাবে চিকিৎসা-সেবার গুরুত্বপূর্ণ কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যও প্রাধান্য দিন। উদাহরণস্বরূপ:
১. হৃদয়ের গভীরে থেকে পরিপূর্ণরূপে বিশ্বাস করুন এবং রোগী কে ও বিশ্বাস করান, আরোগ্য আল্লাহর হাতে। অসুখ পথ্য বাহ্যিক উপকরণ মাত্র।
২. দায়িত্ব পালনে ব্রতী হোন। গভীরভাবে উপলব্ধি করুন যে, আল্লাহ আপনাকে মুসলিম সমাজের সীমানা পাহারায় নিয়োজিত রেখেছেন। সুতরাং মেধা শক্তি সর্বস্ব ব্যয় করে মুসলিম সমাজের শরীরের অসুস্থতা ও স্বাস্থ্যকে সংক্রামক ব্যাধি এবং সংহারক জীবাণুর ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা করতে সচেষ্ট হোন।
৩. রোগীদের সাথে অমায়িক ব্যবহার করুন। দয়াপরবশ হোন। সাধ্যমত চেষ্টা করুন তাদের অন্তরে আশার আলো জ্বালাতে। তাদেরকে আল্লাহমুখী হতেও সহায়তা করতে পারেন আপনি।
৪. আমানতদারিতার পরিচয় দিন। শুধু কর্তব্য নয়। রোগীদের গোপনীয়তার বিষয়েও। অনেকেই এখানে অসচেতনতার শিকার। ফলে রোগীদের অসম্মান হয়। নিজের ব্যক্তিত্বও হয় প্রশ্নবিদ্ধ।
৫. নিজের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার উত্তর-উত্তর উন্নয়নে সচেষ্ট হোন। ধর্মীয় ব্যাপারেও। চিকিৎসার ব্যাপারেও। এভাবে মূলে পৌঁছার চেষ্টা করুন। বিশ্বনবীর যথাযথ জ্ঞানভাণ্ডারেও হাত দিতে পারেন। কেননা, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা মুমিনের হারানো সম্পদ।

মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন,
أَتَأْمُرُونَ النَّاسَ بِالْبِرِّ وَتَنْسَوْنَ أَنْفُসَكُمْ وَأَنْتُمْ تَتْلُونَ الْكِتَابَ أَفَلَا تَعْقِلُونَ
অর্থ: তোমরা কি মানুষকে সৎ কর্মের আদেশ দাও, আর নিজেদেরই ভুল থাক; অথচ কিতাবও তেলাওয়াত কর? তোমাদের কি আকল নেই? —সুরা বাকারা : ৪৪

তিনি আরও ইরশাদ করেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لِمَ تَقُولُونَ مَا لَا تَفْعَلُونَ كَبُرَ مَقْتًا عِنْدَ اللَّهِ أَنْ تَقُولُوا مَا لَا تَفْعَلُونَ
অর্থ : হে ঈমানদারগণ, কেন তোমরা এমন কথা বল যা তোমরা কর না? তোমরা এমন কিছু বলবে যা তোমরা কর না—এটা আল্লাহর কাছে খুবই কঠিন শাস্তিয়োগ্য অপরাধ। —সুরা সফ : ২-৩

দায়িয়াকে অবশ্যই উত্তম ব্যক্তিত্বের অধিকারী হতে হবে। আমল আখলাকে ধর্মীয় অনুশাসনের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন থাকতে হবে। নামায রোযা হজ যাকাত ইত্যাদি ফরজ ওয়াজিব ও নফলদেরও পাবন্দি করতে হবে। পর্দা ব্যাপারে হতে হবে সুচারু। শর্ত সমূহ সতো পালন করতে হবে পূর্ণাঙ্গ পর্দা। বেপর্দা চলবে না। মাহরাম ছাড়া কারও সামনে সৌন্দর্য প্রদর্শন করবে না।

আমাদের সমাজে অনেক ধার্মিক নারীকে দেখা যায়, যারা জিলবাব হিজাব ইত্যাদি পর্দার পোশাকগুলো ব্যবহার করেন ঠিকই; কিন্তু হাত মুখ চোখে কৃত্রিম সজ্জা গ্রহণ করে পুরুষদের সামনে যান। আবার পর্দা করারও দাবি করেন। অথচ মেকাপ, লিপস্টিক কিছুই বাদ রাখেন না। এভাবে ইসলামের নামে ইসলামের ক্ষতিসাধন হয়। বরং ইসলামের অবমাননা হয়। শুধু অন্যেরা নয়, অনেক মুসলিম মেয়েরও বিভ্রাতির শিকার হয়।

যিনি সত্যিকারের দায়িয়া হবেন, অন্যের প্রতি তার আচরণ হবে অমায়রিক। আচরণে উচ্চারণে কাউকে কষ্ট দেবেন না। সবসময় হবে তৎপর। নীরববতা হবে তাফাক্কুর ও হিকমাহ। মুখের ভাষা, শরীরের ভাষা হবে আল্লাহর হামদ ও ছানায় নূরানী। তুমি মূল্যবোধগুলো যখন একজন দায়িয়ার মনে প্রাণে গেঁথে যাবে, তখনই তার দাওয়াত সার্থকতা পাবে। অটলতা ও অবিচলতা লাভ করবে। কেননা, তখন তার অবস্থা এমন হবে যে, তিনি যা করতে বলেন তা নিজেও করেন; এবং যা ছাড়তে বলেন তা নিজেও ছাড়েন।

কবি বলেন, তুমি এমন কিছু ছাড়তে বোলো না, যা নিজেই কর; এমনটা যদি কর, তো এ বড় লজ্জাজনক ব্যাপার। শায়খ আবদুল ওয়াহিদ ইবনে যায়েদ রাহ. বলতেন, হাসান বসরী যে এত উচ্চ মর্যাদায় সমাসীন হয়েছিলেন এ-একটাই কারণ ছিল—তিনি যখন কোনো কিছু করার উপদেশ দিতেন তখন নিজেই সবার আগে তা পালন করতেন। আবার যখন কোনো কিছু ছাড়ার উপদেশ দিতেন, তখনো নিজেই সবার আগে তা ছেড়ে দিতেন।

সুতরাং আপনি যদি আপনার দাওয়াতকে মানুষকে প্রভাবিত করতে চান, যদি চান আপনার দাওয়াত ক্রিয়াশীল হোক, সার্থকতা লাভ করুক; তা হলে হৃদয়াত্মার পবিত্রতা অর্জন করুন, তাকওয়া তাহারাতের গুণে গুণান্বিত হোন, চিন্তা চেতনাকে স্বচ্ছ সুনির্মল করুন। দাওয়াতের প্রেরণা অনির্বাণ শিখা হয়ে জ্বলে উঠবে আপনার অন্তরে। মানুষ আপনার দাওয়াত কবুল করবে আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্যের প্রেরণায় সম্মোহিত হয়ে। আপনার একনিষ্ঠতায় প্রতিটি হৃদয়ে জেগে উঠবে পারস্পরিক সৌহার্দ্য সম্প্রীতি।

দেখুন না, একটি সুন্দর কথার কত সুন্দর দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন আপনার আমার আল্লাহ পবিত্র কুরআনে, তুমি কি দেখনি, আল্লাহ কেমন উদাহরণ দেন একটি ভালো কথার! যেন তা একটি ভালো গাছ। যার শেকর জমিনে গাড়া। আর শাখা প্রশাখা বিস্তৃত আসমানব্যাপী। সে তার প্রতিপালকের নির্দেশে ফল দান করে প্রতিনিয়ত। আল্লাহ মানুষের জন্য উদাহরণ দেন যেন তারা উপদেশ গ্রহণ করে। —সূরা ইবরাহীম : ২৪-২৫

আত্মসমালোচনার যোগ্যতা অর্জন করুন। নিজেই নিজের পরীক্ষা নিন প্রতিনিয়ত—ঈমানের পরীক্ষা, ইখলাসের পরীক্ষা। নিজেই নিজেকে যাচাই করুন সব সময়—দোষ-গুণ, ভালো মন্দ। মনে রাখবেন, আল্লাহ যখন কোনো মুমিনের কল্যাণ চান, তখনই তাকে নিজের দোষ ত্রুটি উপলব্ধি করার সক্ষমতা দান করেন। তাই আত্মপ্রশান্তিতে ভোগা মুমিনের কাজ নয়। এ বিষয়টি হৃদয়ঙ্গম করার চেষ্টা করুন যে, আপনি মুসলিম নারীসমাজের একজন দায়িত্বশীল প্রতিনিধি। তা ছাড়া, অনেকেই আপনাকে অনুসরণ করবে। তাই নিজের ব্যক্তিত্বের ব্যাপারে উদাসীন হবেন না। আপনার ওপর আল্লাহপ্রদত্ত বিরাট দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে।

কবি বলেন, একটু বুঝতে চেষ্টা করো, তোমার ওপর অর্পিত হয়েছে বিরাট দায়িত্ব। তাই বসে রও অপ্রয়োজনীয় কাজে সময় ফুরিও না।

প্রিয় বোন, নিজেকে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করুন যেন সম্ভাব্য সবকিছুতে আপনার আদর্শ সমুজ্জ্বল হয়ে থাকে আপনার চারপাশের নারীসমাজের জন্য। আপনি যদি কারও জীবনসঙ্গিনী হয়ে থাকেন, তা হলে একজন সত্যিকার সম্পূর্ণ মুসলিম রমণীর দৃষ্টান্ত স্থাপন করুন। নিজেকে এমন একজন স্ত্রী হিসেবে উপস্থাপন করুন যিনি সতীসাধ্বী। যিনি জীবনসত্তার প্রতি কৃতজ্ঞ, कर्तव्यপরায়ণ, একনিষ্ঠ, আন্তরিক, একজন বিশ্বস্ত, অন্তরঙ্গ বন্ধু ও সহযোগী; সুখে দুঃখে পাশের সাথী; দায়িত্ব কর্তব্য পালন পানে থাকেন; জীবন ও জগতের টানা পোড়নে স্বামীর প্রশান্তি; দাওয়াত ও তাবলীগের মশালবহনে স্বামীর ঘনিষ্ঠ সহকর্মী।

আপনি যদি কোনো সন্তানের জননী হয়ে থাকেন, তা হলে আপনিও হতে পারেন একজন সচেতন দায়িত্বশীল গৃহিণী। আপনার মস্তকেও শোভা পেতে পারে সত্যিকারের রত্নগর্ভার তাজ। আপনার ঘর হোক ইলম ও আলোর মিনার। আপনার ছেলেমেয়ে হোক তাকওয়া পরহেজগারীর অনন্য উদাহরণ। ইলমের অন্বেষণে তাদের মেহনত মোজাহাদা হোক প্রশংসনীয়। তাদের জ্ঞান ঈমান হোক আগামী প্রজন্মের মর্যাদা ও মাহাত্ম্য অর্জনের প্রেরণা। তাদের সাধনা আরাধনা ফিরিয়ে আনুক ইসলামের হারানো গৌরব। ইসলাম ও মুসলমানকে পুনপ্রতিষ্ঠিত করুক জ্ঞান মহিমায়।

ভাগ্য যদি আপনাকে শিক্ষিকার আসনে সমাসীন করে, আপনি যদি হন মানুষ গড়ার কারিগর, তা হলে স্বরূপ তুলে ধরুন প্রকৃত মুমিনের। আপনার সুপ্ত একনিষ্ঠতা, নিরন্তর কর্মোদ্দীপনা, সশ্রদ্ধ নিয়মুনুবর্তিতা, সুস্থ্য সময়সচেতনতা, অগাধ কর্তব্যপরায়ণতা যেন সর্বদাই শুভ্র সমুজ্জ্বল হয়ে থাকে; আপনার প্রতিটি ছাত্রীর মনে প্রাণে। আপনি আপনার ছাত্রীদের ধর্মীয় জীবনকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করুন। ধর্মের প্রতি তাদের মনে গভীর ভক্তি ও শ্রদ্ধা বোধ সৃষ্টি করুন। আপনি যদি ধর্মশিক্ষিকা হিসেবে নিযুক্ত নাও হন, তবুও একজন দায়িয়া হিসেবে তাদের ধর্মীয় চেতনাকে রক্ষা করা আপনার কর্তব্য।

বিশেষত আজকের আধুনিক পৃথিবীতে নিত্যনতুন বিষয় অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে এবং কর্মসূচিতে। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলোর মূল্যায়ন, এগুলোর তথ্যভিত্তিক নিরূপণ এবং শিক্ষার্থীদের সেদিকে দৃষ্টি আকর্ষণের দায়িত্ব সর্ব দিক থেকে আপনার ও ওপর বর্তায়। আজকাল বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচি এবং কর্মসূচিতে এমন অনেক বিষয় ঢোকানো হচ্ছে, যে গুলো স্পষ্টত ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক। কেউ তো এমন হবেন, যিনি এগুলোর প্রতিবাদ জানাবেন, এসব বিষয়ে সোচ্চার হবেন। অন্তত মুসলিম মেয়েদের চিন্তা চেতনাকে এসব বিষক্রিয়া থেকে মুক্ত রাখার ব্যাপারে মনোযোগী হবেন। সমাজসেবা, সামাজিক সচেতনতামূলক প্রচারণা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ইত্যাদি যাবতীয় প্রোগ্রামে মেয়েদেরও মাঠে নামানো হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ইসলামী মূল্যবোধ হয় উপেক্ষিত। এমনকি, এসবে ছেলেদের অনুপ্রবেশ ও উচ্ছৃঙ্খলতাও লজ্জাজনকভাবে পায় প্রশ্রয়। আবার মেয়েরা সামাজিকভাবে যেসব সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষকদের পক্ষে সেগুলোর সমাধান দেওয়া হয় ধর্মহীন সব চিন্তার আলোকে। মনে হয়, এসব নিয়ে তারাই প্রথম ভাবতে বসেছেন। ধর্মে এ নিয়ে কোনো কথা নেই। প্রায়ই নারীসম্পর্কিত বিষয়গুলোর ব্যাখ্যা ও সমাধান ধর্মীয় মূল্যবোধ বাদ দিয়ে। মেয়েরা দিশেহারা হয়ে যাচ্ছে ধর্ম ও জীবনের মাঝে সমন্বয় খুঁজে পেতে। ধার্মিক মেয়েরা হচ্ছে হীনমন্যতার শিকার।

প্রসঙ্গত, আজকাল শরীরচর্চার অনেক শিক্ষিকাই দায়িত্বহীনতার পরিচয় দেন। মেয়েদের পর্দাব্যবস্থা নিয়ে ভাবেন না। অনেকে সময় শিক্ষিকা অবশ্যই ছাত্রীদের জিলবাব খুলতে বাধ্য করেন। পরিবেশ পরিস্থিতিও তোয়াক্কা করেন না। এমনকি, নম্বর কাটারও হুমকি দেন। এই যদি হয় আরববিশ্বের মুসলিম রাষ্ট্রগুলো অবস্থা তা হলে অন্যদের সম্পর্কে কী বলা যায়? এরকম আরও অনেক বিষয় আছে যেগুলোতে সংস্কার প্রয়োজন। প্রয়োজন একজন নিঃস্বার্থ নির্ভিক দাইয়ার। যিনি অকপটে এগুলোর গঠনমূলক সমালোচনা করবেন। মুসলিম মেয়েদের ইসলামী মূল্যবোধ ও ভাবধারার ওপর অটল থাকতে প্রেরণা ও প্রণোদনা যোগাবেন। যারা মুসলিম মেয়েদের ইসলাম থেকে বিচ্যুত করতে চায়, মেধা দিয়ে শ্রম দিয়ে তাদের সক্ষম মোকাবেলা করবেন।

এরপরে আল্লাহ যদি আপনাকে চিকিৎসা-সেবার যোগ্যতা দান করেন, তা হলে মানবতার এ মহান পেশায় হালাল হারামের বিধান মেনে চলুন। আন্তরিকভাবে রোগীদের সেবা-শুশ্রূষা দিন। মেয়েলি বিষয়গুলোতে বিশেষভাবে মনোযোগী হোন। কেননা, মহিলা-ডাক্তার তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়। মুসলিম নারীসমাজ আপনার দ্বারা উপকৃত হতে পারবেন বেশি। এভাবে চিকিৎসা-সেবার গুরুত্বপূর্ণ কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যও প্রাধান্য দিন। উদাহরণস্বরূপ:
১. হৃদয়ের গভীরে থেকে পরিপূর্ণরূপে বিশ্বাস করুন এবং রোগী কে ও বিশ্বাস করান, আরোগ্য আল্লাহর হাতে। অসুখ পথ্য বাহ্যিক উপকরণ মাত্র।
২. দায়িত্ব পালনে ব্রতী হোন। গভীরভাবে উপলব্ধি করুন যে, আল্লাহ আপনাকে মুসলিম সমাজের সীমানা পাহারায় নিয়োজিত রেখেছেন। সুতরাং মেধা শক্তি সর্বস্ব ব্যয় করে মুসলিম সমাজের শরীরের অসুস্থতা ও স্বাস্থ্যকে সংক্রামক ব্যাধি এবং সংহারক জীবাণুর ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা করতে সচেষ্ট হোন।
৩. রোগীদের সাথে অমায়িক ব্যবহার করুন। দয়াপরবশ হোন। সাধ্যমত চেষ্টা করুন তাদের অন্তরে আশার আলো জ্বালাতে। তাদেরকে আল্লাহমুখী হতেও সহায়তা করতে পারেন আপনি।
৪. আমানতদারিতার পরিচয় দিন। শুধু কর্তব্য নয়। রোগীদের গোপনীয়তার বিষয়েও। অনেকেই এখানে অসচেতনতার শিকার। ফলে রোগীদের অসম্মান হয়। নিজের ব্যক্তিত্বও হয় প্রশ্নবিদ্ধ।
৫. নিজের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার উত্তর-উত্তর উন্নয়নে সচেষ্ট হোন। ধর্মীয় ব্যাপারেও। চিকিৎসার ব্যাপারেও। এভাবে মূলে পৌঁছার চেষ্টা করুন। বিশ্বনবীর যথাযথ জ্ঞানভাণ্ডারেও হাত দিতে পারেন। কেননা, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা মুমিনের হারানো সম্পদ।

মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন,
أَتَأْمُرُونَ النَّاسَ بِالْبِرِّ وَتَنْسَوْنَ أَنْفُসَكُمْ وَأَنْتُمْ تَتْلُونَ الْكِتَابَ أَفَلَا تَعْقِلُونَ
অর্থ: তোমরা কি মানুষকে সৎ কর্মের আদেশ দাও, আর নিজেদেরই ভুল থাক; অথচ কিতাবও তেলাওয়াত কর? তোমাদের কি আকল নেই? —সুরা বাকারা : ৪৪

তিনি আরও ইরশাদ করেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لِمَ تَقُولُونَ مَا لَا تَفْعَلُونَ كَبُرَ مَقْتًا عِنْدَ اللَّهِ أَنْ تَقُولُوا مَا لَا تَفْعَلُونَ
অর্থ : হে ঈমানদারগণ, কেন তোমরা এমন কথা বল যা তোমরা কর না? তোমরা এমন কিছু বলবে যা তোমরা কর না—এটা আল্লাহর কাছে খুবই কঠিন শাস্তিয়োগ্য অপরাধ। —সুরা সফ : ২-৩

দায়িয়াকে অবশ্যই উত্তম ব্যক্তিত্বের অধিকারী হতে হবে। আমল আখলাকে ধর্মীয় অনুশাসনের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন থাকতে হবে। নামায রোযা হজ যাকাত ইত্যাদি ফরজ ওয়াজিব ও নফলদেরও পাবন্দি করতে হবে। পর্দা ব্যাপারে হতে হবে সুচারু। শর্ত সমূহ সতো পালন করতে হবে পূর্ণাঙ্গ পর্দা। বেপর্দা চলবে না। মাহরাম ছাড়া কারও সামনে সৌন্দর্য প্রদর্শন করবে না।

আমাদের সমাজে অনেক ধার্মিক নারীকে দেখা যায়, যারা জিলবাব হিজাব ইত্যাদি পর্দার পোশাকগুলো ব্যবহার করেন ঠিকই; কিন্তু হাত মুখ চোখে কৃত্রিম সজ্জা গ্রহণ করে পুরুষদের সামনে যান। আবার পর্দা করারও দাবি করেন। অথচ মেকাপ, লিপস্টিক কিছুই বাদ রাখেন না। এভাবে ইসলামের নামে ইসলামের ক্ষতিসাধন হয়। বরং ইসলামের অবমাননা হয়। শুধু অন্যেরা নয়, অনেক মুসলিম মেয়েরও বিভ্রাতির শিকার হয়।

যিনি সত্যিকারের দায়িয়া হবেন, অন্যের প্রতি তার আচরণ হবে অমায়রিক। আচরণে উচ্চারণে কাউকে কষ্ট দেবেন না। সবসময় হবে তৎপর। নীরববতা হবে তাফাক্কুর ও হিকমাহ। মুখের ভাষা, শরীরের ভাষা হবে আল্লাহর হামদ ও ছানায় নূরানী। তুমি মূল্যবোধগুলো যখন একজন দায়িয়ার মনে প্রাণে গেঁথে যাবে, তখনই তার দাওয়াত সার্থকতা পাবে। অটলতা ও অবিচলতা লাভ করবে। কেননা, তখন তার অবস্থা এমন হবে যে, তিনি যা করতে বলেন তা নিজেও করেন; এবং যা ছাড়তে বলেন তা নিজেও ছাড়েন।

কবি বলেন, তুমি এমন কিছু ছাড়তে বোলো না, যা নিজেই কর; এমনটা যদি কর, তো এ বড় লজ্জাজনক ব্যাপার। শায়খ আবদুল ওয়াহিদ ইবনে যায়েদ রাহ. বলতেন, হাসান বসরী যে এত উচ্চ মর্যাদায় সমাসীন হয়েছিলেন এ-একটাই কারণ ছিল—তিনি যখন কোনো কিছু করার উপদেশ দিতেন তখন নিজেই সবার আগে তা পালন করতেন। আবার যখন কোনো কিছু ছাড়ার উপদেশ দিতেন, তখনো নিজেই সবার আগে তা ছেড়ে দিতেন।

সুতরাং আপনি যদি আপনার দাওয়াতকে মানুষকে প্রভাবিত করতে চান, যদি চান আপনার দাওয়াত ক্রিয়াশীল হোক, সার্থকতা লাভ করুক; তা হলে হৃদয়াত্মার পবিত্রতা অর্জন করুন, তাকওয়া তাহারাতের গুণে গুণান্বিত হোন, চিন্তা চেতনাকে স্বচ্ছ সুনির্মল করুন। দাওয়াতের প্রেরণা অনির্বাণ শিখা হয়ে জ্বলে উঠবে আপনার অন্তরে। মানুষ আপনার দাওয়াত কবুল করবে আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্যের প্রেরণায় সম্মোহিত হয়ে। আপনার একনিষ্ঠতায় প্রতিটি হৃদয়ে জেগে উঠবে পারস্পরিক সৌহার্দ্য সম্প্রীতি।

দেখুন না, একটি সুন্দর কথার কত সুন্দর দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন আপনার আমার আল্লাহ পবিত্র কুরআনে, তুমি কি দেখনি, আল্লাহ কেমন উদাহরণ দেন একটি ভালো কথার! যেন তা একটি ভালো গাছ। যার শেকর জমিনে গাড়া। আর শাখা প্রশাখা বিস্তৃত আসমানব্যাপী। সে তার প্রতিপালকের নির্দেশে ফল দান করে প্রতিনিয়ত। আল্লাহ মানুষের জন্য উদাহরণ দেন যেন তারা উপদেশ গ্রহণ করে। —সূরা ইবরাহীম : ২৪-২৫

আত্মসমালোচনার যোগ্যতা অর্জন করুন। নিজেই নিজের পরীক্ষা নিন প্রতিনিয়ত—ঈমানের পরীক্ষা, ইখলাসের পরীক্ষা। নিজেই নিজেকে যাচাই করুন সব সময়—দোষ-গুণ, ভালো মন্দ। মনে রাখবেন, আল্লাহ যখন কোনো মুমিনের কল্যাণ চান, তখনই তাকে নিজের দোষ ত্রুটি উপলব্ধি করার সক্ষমতা দান করেন। তাই আত্মপ্রশান্তিতে ভোগা মুমিনের কাজ নয়। এ বিষয়টি হৃদয়ঙ্গম করার চেষ্টা করুন যে, আপনি মুসলিম নারীসমাজের একজন দায়িত্বশীল প্রতিনিধি। তা ছাড়া, অনেকেই আপনাকে অনুসরণ করবে। তাই নিজের ব্যক্তিত্বের ব্যাপারে উদাসীন হবেন না। আপনার ওপর আল্লাহপ্রদত্ত বিরাট দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে।

কবি বলেন, একটু বুঝতে চেষ্টা করো, তোমার ওপর অর্পিত হয়েছে বিরাট দায়িত্ব। তাই বসে রও অপ্রয়োজনীয় কাজে সময় ফুরিও না।

প্রিয় বোন, নিজেকে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করুন যেন সম্ভাব্য সবকিছুতে আপনার আদর্শ সমুজ্জ্বল হয়ে থাকে আপনার চারপাশের নারীসমাজের জন্য। আপনি যদি কারও জীবনসঙ্গিনী হয়ে থাকেন, তা হলে একজন সত্যিকার সম্পূর্ণ মুসলিম রমণীর দৃষ্টান্ত স্থাপন করুন। নিজেকে এমন একজন স্ত্রী হিসেবে উপস্থাপন করুন যিনি সতীসাধ্বী। যিনি জীবনসত্তার প্রতি কৃতজ্ঞ, कर्तव्यপরায়ণ, একনিষ্ঠ, আন্তরিক, একজন বিশ্বস্ত, অন্তরঙ্গ বন্ধু ও সহযোগী; সুখে দুঃখে পাশের সাথী; দায়িত্ব কর্তব্য পালন পানে থাকেন; জীবন ও জগতের টানা পোড়নে স্বামীর প্রশান্তি; দাওয়াত ও তাবলীগের মশালবহনে স্বামীর ঘনিষ্ঠ সহকর্মী।

আপনি যদি কোনো সন্তানের জননী হয়ে থাকেন, তা হলে আপনিও হতে পারেন একজন সচেতন দায়িত্বশীল গৃহিণী। আপনার মস্তকেও শোভা পেতে পারে সত্যিকারের রত্নগর্ভার তাজ। আপনার ঘর হোক ইলম ও আলোর মিনার। আপনার ছেলেমেয়ে হোক তাকওয়া পরহেজগারীর অনন্য উদাহরণ। ইলমের অন্বেষণে তাদের মেহনত মোজাহাদা হোক প্রশংসনীয়। তাদের জ্ঞান ঈমান হোক আগামী প্রজন্মের মর্যাদা ও মাহাত্ম্য অর্জনের প্রেরণা। তাদের সাধনা আরাধনা ফিরিয়ে আনুক ইসলামের হারানো গৌরব। ইসলাম ও মুসলমানকে পুনপ্রতিষ্ঠিত করুক জ্ঞান মহিমায়।

ভাগ্য যদি আপনাকে শিক্ষিকার আসনে সমাসীন করে, আপনি যদি হন মানুষ গড়ার কারিগর, তা হলে স্বরূপ তুলে ধরুন প্রকৃত মুমিনের। আপনার সুপ্ত একনিষ্ঠতা, নিরন্তর কর্মোদ্দীপনা, সশ্রদ্ধ নিয়মুনুবর্তিতা, সুস্থ্য সময়সচেতনতা, অগাধ কর্তব্যপরায়ণতা যেন সর্বদাই শুভ্র সমুজ্জ্বল হয়ে থাকে; আপনার প্রতিটি ছাত্রীর মনে প্রাণে। আপনি আপনার ছাত্রীদের ধর্মীয় জীবনকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করুন। ধর্মের প্রতি তাদের মনে গভীর ভক্তি ও শ্রদ্ধা বোধ সৃষ্টি করুন। আপনি যদি ধর্মশিক্ষিকা হিসেবে নিযুক্ত নাও হন, তবুও একজন দায়িয়া হিসেবে তাদের ধর্মীয় চেতনাকে রক্ষা করা আপনার কর্তব্য।

বিশেষত আজকের আধুনিক পৃথিবীতে নিত্যনতুন বিষয় অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে এবং কর্মসূচিতে। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলোর মূল্যায়ন, এগুলোর তথ্যভিত্তিক নিরূপণ এবং শিক্ষার্থীদের সেদিকে দৃষ্টি আকর্ষণের দায়িত্ব সর্ব দিক থেকে আপনার ও ওপর বর্তায়। আজকাল বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচি এবং কর্মসূচিতে এমন অনেক বিষয় ঢোকানো হচ্ছে, যে গুলো স্পষ্টত ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক। কেউ তো এমন হবেন, যিনি এগুলোর প্রতিবাদ জানাবেন, এসব বিষয়ে সোচ্চার হবেন। অন্তত মুসলিম মেয়েদের চিন্তা চেতনাকে এসব বিষক্রিয়া থেকে মুক্ত রাখার ব্যাপারে মনোযোগী হবেন। সমাজসেবা, সামাজিক সচেতনতামূলক প্রচারণা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ইত্যাদি যাবতীয় প্রোগ্রামে মেয়েদেরও মাঠে নামানো হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ইসলামী মূল্যবোধ হয় উপেক্ষিত। এমনকি, এসবে ছেলেদের অনুপ্রবেশ ও উচ্ছৃঙ্খলতাও লজ্জাজনকভাবে পায় প্রশ্রয়। আবার মেয়েরা সামাজিকভাবে যেসব সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষকদের পক্ষে সেগুলোর সমাধান দেওয়া হয় ধর্মহীন সব চিন্তার আলোকে। মনে হয়, এসব নিয়ে তারাই প্রথম ভাবতে বসেছেন। ধর্মে এ নিয়ে কোনো কথা নেই। প্রায়ই নারীসম্পর্কিত বিষয়গুলোর ব্যাখ্যা ও সমাধান ধর্মীয় মূল্যবোধ বাদ দিয়ে। মেয়েরা দিশেহারা হয়ে যাচ্ছে ধর্ম ও জীবনের মাঝে সমন্বয় খুঁজে পেতে। ধার্মিক মেয়েরা হচ্ছে হীনমন্যতার শিকার।

প্রসঙ্গত, আজকাল শরীরচর্চার অনেক শিক্ষিকাই দায়িত্বহীনতার পরিচয় দেন। মেয়েদের পর্দাব্যবস্থা নিয়ে ভাবেন না। অনেকে সময় শিক্ষিকা অবশ্যই ছাত্রীদের জিলবাব খুলতে বাধ্য করেন। পরিবেশ পরিস্থিতিও তোয়াক্কা করেন না। এমনকি, নম্বর কাটারও হুমকি দেন। এই যদি হয় আরববিশ্বের মুসলিম রাষ্ট্রগুলো অবস্থা তা হলে অন্যদের সম্পর্কে কী বলা যায়? এরকম আরও অনেক বিষয় আছে যেগুলোতে সংস্কার প্রয়োজন। প্রয়োজন একজন নিঃস্বার্থ নির্ভিক দাইয়ার। যিনি অকপটে এগুলোর গঠনমূলক সমালোচনা করবেন। মুসলিম মেয়েদের ইসলামী মূল্যবোধ ও ভাবধারার ওপর অটল থাকতে প্রেরণা ও প্রণোদনা যোগাবেন। যারা মুসলিম মেয়েদের ইসলাম থেকে বিচ্যুত করতে চায়, মেধা দিয়ে শ্রম দিয়ে তাদের সক্ষম মোকাবেলা করবেন।

এরপরে আল্লাহ যদি আপনাকে চিকিৎসা-সেবার যোগ্যতা দান করেন, তা হলে মানবতার এ মহান পেশায় হালাল হারামের বিধান মেনে চলুন। আন্তরিকভাবে রোগীদের সেবা-শুশ্রূষা দিন। মেয়েলি বিষয়গুলোতে বিশেষভাবে মনোযোগী হোন। কেননা, মহিলা-ডাক্তার তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়। মুসলিম নারীসমাজ আপনার দ্বারা উপকৃত হতে পারবেন বেশি। এভাবে চিকিৎসা-সেবার গুরুত্বপূর্ণ কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যও প্রাধান্য দিন। উদাহরণস্বরূপ:
১. হৃদয়ের গভীরে থেকে পরিপূর্ণরূপে বিশ্বাস করুন এবং রোগী কে ও বিশ্বাস করান, আরোগ্য আল্লাহর হাতে। অসুখ পথ্য বাহ্যিক উপকরণ মাত্র।
২. দায়িত্ব পালনে ব্রতী হোন। গভীরভাবে উপলব্ধি করুন যে, আল্লাহ আপনাকে মুসলিম সমাজের সীমানা পাহারায় নিয়োজিত রেখেছেন। সুতরাং মেধা শক্তি সর্বস্ব ব্যয় করে মুসলিম সমাজের শরীরের অসুস্থতা ও স্বাস্থ্যকে সংক্রামক ব্যাধি এবং সংহারক জীবাণুর ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা করতে সচেষ্ট হোন।
৩. রোগীদের সাথে অমায়িক ব্যবহার করুন। দয়াপরবশ হোন। সাধ্যমত চেষ্টা করুন তাদের অন্তরে আশার আলো জ্বালাতে। তাদেরকে আল্লাহমুখী হতেও সহায়তা করতে পারেন আপনি।
৪. আমানতদারিতার পরিচয় দিন। শুধু কর্তব্য নয়। রোগীদের গোপনীয়তার বিষয়েও। অনেকেই এখানে অসচেতনতার শিকার। ফলে রোগীদের অসম্মান হয়। নিজের ব্যক্তিত্বও হয় প্রশ্নবিদ্ধ।
৫. নিজের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার উত্তর-উত্তর উন্নয়নে সচেষ্ট হোন। ধর্মীয় ব্যাপারেও। চিকিৎসার ব্যাপারেও। এভাবে মূলে পৌঁছার চেষ্টা করুন। বিশ্বনবীর যথাযথ জ্ঞানভাণ্ডারেও হাত দিতে পারেন। কেননা, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা মুমিনের হারানো সম্পদ।

ফন্ট সাইজ
15px
17px