📘 ফিরে এসো নীড়ে 📄 ৩. আমলি ও আখেরাতমুখী জিন্দেগি

📄 ৩. আমলি ও আখেরাতমুখী জিন্দেগি


যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে, তাকে দুনিয়ার মায়া মোহ ত্যাগ করতে হবে। দুনিয়ার সম্পদ, সম্মান, শ্রম—সবই মুমিনের জন্য কারাগারস্বরূপ। দুনিয়া মুমিনের পথ, বাড়ি নয়। মুমিনের বাড়ি তো আখেরাত।

সুতরাং হে দীনের দায়িয়া বোন, রাতের প্রতিটি মুহূর্তকে সর্বোচ্চ মূল্য দিন। দয়াময়ের সামনে দাঁড়িয়ে বিনীত, বিনম্র চিত্তে তাঁকে ডাকতে থাকুন; জপতে থাকুন। অচিরেই ঈমানের স্বাদ, ইবাদতের মিষ্টতা আঘ্রাণ করবেন। দেখবেন, তখন নেক আমল করতে ভালো লাগবে। অবসাদ ও উদাসীনতা এড়াতে সার্বক্ষণিক জিকির জারি রাখুন। দুআ, ইসতিগফার, নফল নামায ও রোযা জারি রাখুন। তা হলে শীঘ্রই উপনীত হবেন পরকালীন উচ্চাভিলাষ ও আত্মিক চেতনার পর্বতচূড়ায়।

মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন,
إِنَّ الْمُسْلِمِينَ وَالْمُسْلِمَاتِ وَالْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ وَالْقَانِتِينَ وَالْقَانِتَاتِ وَالصَّادِقِينَ وَالصَّادِقَاتِ وَالصَّابِرِينَ وَالصَّابِرَاتِ وَالْخَاشِعِينَ وَالْখَاشِعَاتِ وَالْمُتَصَدِّقِينَ وَالْمُتَصَدِّقَاتِ وَالصَّائِمِينَ وَالصَّائِمَاتِ وَالْحَافِظِينَ فُرُوجَهُمْ وَالْحَافِظَاتِ وَالذَّاكِرِينَ اللَّهَ كَثِيرًا وَالذَّاكِرَاتِ أَعَدَّ اللَّهُ لَهُمْ مَغْفِرَةً وَأَجْرًا عَظِيمًا
অর্থ : মুসলিম, মুমিন, অনুগত, সত্যবাদী, ধৈর্যশীল, বিনীত, দানশীল, রোযাদার, সচ্চরিত্র ও অধিক পরিমাণে আল্লাহর জিকিরকারী নর ও নারীর জন্য নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রস্তুত করে রেখেছেন ক্ষমা ও বিরাট প্রতিদান। —সূরা আহযাব : ৩৫

আমাদের পূর্বসূরীদের জীবনী ইবাদতগোজার নারীর অনন্য দৃষ্টান্তে ভরপুর। বিখ্যাত তাবেয়ি কাসিম বর্ণনা করে বলেন, আমি সকালে বেলা করে প্রথমে হযরত আয়েশা রাযি.-এর বাড়িতে যেতাম এবং তাঁকে সালাম দিতাম। একদিন সকালে গিয়ে দেখলাম, তিনি নামাযে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি (এই আয়াতটি) বারবার তেলাওয়াত করছেন, দুআ করছেন এবং কাঁদছেন,
فَمَنَّ اللَّهُ عَلَيْنَا وَقَنَا عَذَابَ السَّمُومِ
অর্থ : কিন্তু আল্লাহ আমাদের করুণা করেছেন এবং লু হাওয়ার আজাব থেকে রক্ষা করেছেন। —সূরা তূর : ২৭
(কাসিম বলেন) আমি দাঁড়িয়ে থাকলাম। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে একসময় বিরক্ত হয়ে আমার কাজে বাজারে চলে গেলাম। তারপর যখন ফিরে এলাম, দেখলাম তিনি একইভাবে দাঁড়িয়ে নামায পড়ছেন এবং কাঁদছেন।১

মনে রাখবেন, অধিক জিকির ও অধিক ইবাদত বান্দাকে আল্লাহর নৈকট্য লাভে ধন্য করে। হাদীসে কুদসীতে এসেছে,
إِذَا تَقَرَّبَ إِلَيَّ عَبْدِي شِبْرًا تَقَرَّبْتُ إِلَيْهِ ذِرَاعًا ، وَإِذَا تَقَرَّبَ إِلَيْهِ ذِرَاعًا تَقَرَّبْتُ مِنْهُ بَاعًا وَإِذَا أَتَانِي مَشْيًا أَتَيْتُهُ هَرْوَلَةً
অর্থ : আমার বান্দা যখন এক বিঘত পরিমাণ আমার নিকটবর্তী হয়, তখন আমি এক হাত পরিমাণ তার নিকটবর্তী হই। সে যখন এক হাত পরিমাণ আমার নিকটবর্তী হয়, তখন আমি দুই হাত পরিমাণ তার নিকটবর্তী হই। সে যদি আমার কাছে হেঁটে হেঁটে আসে, আমি তার কাছে যাই দৌড়ে দৌড়ে।২

হযরত আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে প্রবেশ করে দেখলেন, দুটি খুঁটিতে লম্বা একটি রশি টানা আছে। তিনি বললেন, এখানে এই রশি কেন? সাহাবা কেরাম বললেন, এটা যায়নাবের। তিনি ইবাদত করতে করতে যখন ক্লান্ত হয়ে পড়েন, তখন হেলান দেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, না না, এটা খুলে ফেলো। কেউ নামায পড়লে যতক্ষণ উদ্যম থাকে ততক্ষণই পড়বে। ক্লান্ত হয়ে গেলে বসে যাবে।৩

আল্লামা ইবনে তাইমিয়া রাহ.-এর উক্তিও প্রণিধানযোগ্য, আল্লাহর যেমন মেঘ ও বৃষ্টির জন্য নিয়োজিত কিছু ফেরেশতা আছেন, তেমনই হেদায়েত ও ইলমের জন্যও নিয়োজিত কিছু ফেরেশতা আছেন। এটি শরীরের আত্মার খোরাক এবং শক্তি।

টিকাঃ
১. উসওয়াতুল হাসনাহ কী সালাহিল উম্মাহ : ৭/১৬০১
২. জামে' সগীর।
৩. সহীহ বুখারী।

যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে, তাকে দুনিয়ার মায়া মোহ ত্যাগ করতে হবে। দুনিয়ার সম্পদ, সম্মান, শ্রম—সবই মুমিনের জন্য কারাগারস্বরূপ। দুনিয়া মুমিনের পথ, বাড়ি নয়। মুমিনের বাড়ি তো আখেরাত।

সুতরাং হে দীনের দায়িয়া বোন, রাতের প্রতিটি মুহূর্তকে সর্বোচ্চ মূল্য দিন। দয়াময়ের সামনে দাঁড়িয়ে বিনীত, বিনম্র চিত্তে তাঁকে ডাকতে থাকুন; জপতে থাকুন। অচিরেই ঈমানের স্বাদ, ইবাদতের মিষ্টতা আঘ্রাণ করবেন। দেখবেন, তখন নেক আমল করতে ভালো লাগবে। অবসাদ ও উদাসীনতা এড়াতে সার্বক্ষণিক জিকির জারি রাখুন। দুআ, ইসতিগফার, নফল নামায ও রোযা জারি রাখুন। তা হলে শীঘ্রই উপনীত হবেন পরকালীন উচ্চাভিলাষ ও আত্মিক চেতনার পর্বতচূড়ায়।

মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন,
إِنَّ الْمُسْلِمِينَ وَالْمُسْلِمَاتِ وَالْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ وَالْقَانِتِينَ وَالْقَانِتَاتِ وَالصَّادِقِينَ وَالصَّادِقَاتِ وَالصَّابِرِينَ وَالصَّابِرَاتِ وَالْخَاشِعِينَ وَالْখَاشِعَاتِ وَالْمُتَصَدِّقِينَ وَالْمُتَصَدِّقَاتِ وَالصَّائِمِينَ وَالصَّائِمَاتِ وَالْحَافِظِينَ فُرُوجَهُمْ وَالْحَافِظَاتِ وَالذَّاكِرِينَ اللَّهَ كَثِيرًا وَالذَّاكِرَاتِ أَعَدَّ اللَّهُ لَهُمْ مَغْفِرَةً وَأَجْرًا عَظِيمًا
অর্থ : মুসলিম, মুমিন, অনুগত, সত্যবাদী, ধৈর্যশীল, বিনীত, দানশীল, রোযাদার, সচ্চরিত্র ও অধিক পরিমাণে আল্লাহর জিকিরকারী নর ও নারীর জন্য নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রস্তুত করে রেখেছেন ক্ষমা ও বিরাট প্রতিদান। —সূরা আহযাব : ৩৫

আমাদের পূর্বসূরীদের জীবনী ইবাদতগোজার নারীর অনন্য দৃষ্টান্তে ভরপুর। বিখ্যাত তাবেয়ি কাসিম বর্ণনা করে বলেন, আমি সকালে বেলা করে প্রথমে হযরত আয়েশা রাযি.-এর বাড়িতে যেতাম এবং তাঁকে সালাম দিতাম। একদিন সকালে গিয়ে দেখলাম, তিনি নামাযে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি (এই আয়াতটি) বারবার তেলাওয়াত করছেন, দুআ করছেন এবং কাঁদছেন,
فَمَنَّ اللَّهُ عَلَيْنَا وَقَنَا عَذَابَ السَّمُومِ
অর্থ : কিন্তু আল্লাহ আমাদের করুণা করেছেন এবং লু হাওয়ার আজাব থেকে রক্ষা করেছেন। —সূরা তূর : ২৭
(কাসিম বলেন) আমি দাঁড়িয়ে থাকলাম। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে একসময় বিরক্ত হয়ে আমার কাজে বাজারে চলে গেলাম। তারপর যখন ফিরে এলাম, দেখলাম তিনি একইভাবে দাঁড়িয়ে নামায পড়ছেন এবং কাঁদছেন।১

মনে রাখবেন, অধিক জিকির ও অধিক ইবাদত বান্দাকে আল্লাহর নৈকট্য লাভে ধন্য করে। হাদীসে কুদসীতে এসেছে,
إِذَا تَقَرَّبَ إِلَيَّ عَبْدِي شِبْرًا تَقَرَّبْتُ إِلَيْهِ ذِرَاعًا ، وَإِذَا تَقَرَّبَ إِلَيْهِ ذِرَاعًا تَقَرَّبْتُ مِنْهُ بَاعًا وَإِذَا أَتَانِي مَشْيًا أَتَيْتُهُ هَرْوَلَةً
অর্থ : আমার বান্দা যখন এক বিঘত পরিমাণ আমার নিকটবর্তী হয়, তখন আমি এক হাত পরিমাণ তার নিকটবর্তী হই। সে যখন এক হাত পরিমাণ আমার নিকটবর্তী হয়, তখন আমি দুই হাত পরিমাণ তার নিকটবর্তী হই। সে যদি আমার কাছে হেঁটে হেঁটে আসে, আমি তার কাছে যাই দৌড়ে দৌড়ে।২

হযরত আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে প্রবেশ করে দেখলেন, দুটি খুঁটিতে লম্বা একটি রশি টানা আছে। তিনি বললেন, এখানে এই রশি কেন? সাহাবা কেরাম বললেন, এটা যায়নাবের। তিনি ইবাদত করতে করতে যখন ক্লান্ত হয়ে পড়েন, তখন হেলান দেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, না না, এটা খুলে ফেলো। কেউ নামায পড়লে যতক্ষণ উদ্যম থাকে ততক্ষণই পড়বে। ক্লান্ত হয়ে গেলে বসে যাবে।৩

আল্লামা ইবনে তাইমিয়া রাহ.-এর উক্তিও প্রণিধানযোগ্য, আল্লাহর যেমন মেঘ ও বৃষ্টির জন্য নিয়োজিত কিছু ফেরেশতা আছেন, তেমনই হেদায়েত ও ইলমের জন্যও নিয়োজিত কিছু ফেরেশতা আছেন। এটি শরীরের আত্মার খোরাক এবং শক্তি।

টিকাঃ
১. উসওয়াতুল হাসনাহ কী সালাহিল উম্মাহ : ৭/১৬০১
২. জামে' সগীর।
৩. সহীহ বুখারী।

যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে, তাকে দুনিয়ার মায়া মোহ ত্যাগ করতে হবে। দুনিয়ার সম্পদ, সম্মান, শ্রম—সবই মুমিনের জন্য কারাগারস্বরূপ। দুনিয়া মুমিনের পথ, বাড়ি নয়। মুমিনের বাড়ি তো আখেরাত।

সুতরাং হে দীনের দায়িয়া বোন, রাতের প্রতিটি মুহূর্তকে সর্বোচ্চ মূল্য দিন। দয়াময়ের সামনে দাঁড়িয়ে বিনীত, বিনম্র চিত্তে তাঁকে ডাকতে থাকুন; জপতে থাকুন। অচিরেই ঈমানের স্বাদ, ইবাদতের মিষ্টতা আঘ্রাণ করবেন। দেখবেন, তখন নেক আমল করতে ভালো লাগবে। অবসাদ ও উদাসীনতা এড়াতে সার্বক্ষণিক জিকির জারি রাখুন। দুআ, ইসতিগফার, নফল নামায ও রোযা জারি রাখুন। তা হলে শীঘ্রই উপনীত হবেন পরকালীন উচ্চাভিলাষ ও আত্মিক চেতনার পর্বতচূড়ায়।

মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন,
إِنَّ الْمُسْلِمِينَ وَالْمُسْلِمَاتِ وَالْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ وَالْقَانِتِينَ وَالْقَانِتَاتِ وَالصَّادِقِينَ وَالصَّادِقَاتِ وَالصَّابِرِينَ وَالصَّابِرَاتِ وَالْخَاشِعِينَ وَالْখَاشِعَاتِ وَالْمُتَصَدِّقِينَ وَالْمُتَصَدِّقَاتِ وَالصَّائِمِينَ وَالصَّائِمَاتِ وَالْحَافِظِينَ فُرُوجَهُمْ وَالْحَافِظَاتِ وَالذَّاكِرِينَ اللَّهَ كَثِيرًا وَالذَّاكِرَاتِ أَعَدَّ اللَّهُ لَهُمْ مَغْفِرَةً وَأَجْرًا عَظِيمًا
অর্থ : মুসলিম, মুমিন, অনুগত, সত্যবাদী, ধৈর্যশীল, বিনীত, দানশীল, রোযাদার, সচ্চরিত্র ও অধিক পরিমাণে আল্লাহর জিকিরকারী নর ও নারীর জন্য নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রস্তুত করে রেখেছেন ক্ষমা ও বিরাট প্রতিদান। —সূরা আহযাব : ৩৫

আমাদের পূর্বসূরীদের জীবনী ইবাদতগোজার নারীর অনন্য দৃষ্টান্তে ভরপুর। বিখ্যাত তাবেয়ি কাসিম বর্ণনা করে বলেন, আমি সকালে বেলা করে প্রথমে হযরত আয়েশা রাযি.-এর বাড়িতে যেতাম এবং তাঁকে সালাম দিতাম। একদিন সকালে গিয়ে দেখলাম, তিনি নামাযে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি (এই আয়াতটি) বারবার তেলাওয়াত করছেন, দুআ করছেন এবং কাঁদছেন,
فَمَنَّ اللَّهُ عَلَيْنَا وَقَنَا عَذَابَ السَّمُومِ
অর্থ : কিন্তু আল্লাহ আমাদের করুণা করেছেন এবং লু হাওয়ার আজাব থেকে রক্ষা করেছেন। —সূরা তূর : ২৭
(কাসিম বলেন) আমি দাঁড়িয়ে থাকলাম। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে একসময় বিরক্ত হয়ে আমার কাজে বাজারে চলে গেলাম। তারপর যখন ফিরে এলাম, দেখলাম তিনি একইভাবে দাঁড়িয়ে নামায পড়ছেন এবং কাঁদছেন।১

মনে রাখবেন, অধিক জিকির ও অধিক ইবাদত বান্দাকে আল্লাহর নৈকট্য লাভে ধন্য করে। হাদীসে কুদসীতে এসেছে,
إِذَا تَقَرَّبَ إِلَيَّ عَبْدِي شِبْرًا تَقَرَّبْتُ إِلَيْهِ ذِرَاعًا ، وَإِذَا تَقَرَّبَ إِلَيْهِ ذِرَاعًا تَقَرَّبْتُ مِنْهُ بَاعًا وَإِذَا أَتَانِي مَشْيًا أَتَيْتُهُ هَرْوَلَةً
অর্থ : আমার বান্দা যখন এক বিঘত পরিমাণ আমার নিকটবর্তী হয়, তখন আমি এক হাত পরিমাণ তার নিকটবর্তী হই। সে যখন এক হাত পরিমাণ আমার নিকটবর্তী হয়, তখন আমি দুই হাত পরিমাণ তার নিকটবর্তী হই। সে যদি আমার কাছে হেঁটে হেঁটে আসে, আমি তার কাছে যাই দৌড়ে দৌড়ে।২

হযরত আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে প্রবেশ করে দেখলেন, দুটি খুঁটিতে লম্বা একটি রশি টানা আছে। তিনি বললেন, এখানে এই রশি কেন? সাহাবা কেরাম বললেন, এটা যায়নাবের। তিনি ইবাদত করতে করতে যখন ক্লান্ত হয়ে পড়েন, তখন হেলান দেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, না না, এটা খুলে ফেলো। কেউ নামায পড়লে যতক্ষণ উদ্যম থাকে ততক্ষণই পড়বে। ক্লান্ত হয়ে গেলে বসে যাবে।৩

আল্লামা ইবনে তাইমিয়া রাহ.-এর উক্তিও প্রণিধানযোগ্য, আল্লাহর যেমন মেঘ ও বৃষ্টির জন্য নিয়োজিত কিছু ফেরেশতা আছেন, তেমনই হেদায়েত ও ইলমের জন্যও নিয়োজিত কিছু ফেরেশতা আছেন। এটি শরীরের আত্মার খোরাক এবং শক্তি।

টিকাঃ
১. উসওয়াতুল হাসনাহ কী সালাহিল উম্মাহ : ৭/১৬০১
২. জামে' সগীর।
৩. সহীহ বুখারী।

📘 ফিরে এসো নীড়ে 📄 ৪. সময়ের মূল্যায়ন

📄 ৪. সময়ের মূল্যায়ন


মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে সময়ের শপথ করেছেন। কেননা, সময়ের হাত ধরেই ঘটে অহরহ সব ঘটনা। সুস্থতা, অসুস্থতা; সচ্ছলতা, অসচ্ছলতা; সুখ, দুঃখ ইত্যাদি সবই সময়ের সাথে আবদ্ধ। আল্লাহ তাআলা সূরা আসরের মধ্যে সময়ের শপথ করে বলেছেন,
وَالْعَصْرِ
অর্থ : শপথ সময়ের।

ইসলামে সময়ের এই যে মূল্যায়ন, এটা মুসলিম নারীর কাছ থেকে কী দাবি করে? নিঃসন্দেহে, এই মূল্যায়নের অনিবার্য দাবি এই যে, সে তার সময়ের হেফাজত করবে। জীবনের মহামূল্যবান সময় সম্পর্কে সচেতন থাকবে। প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগাবে নেক আমলের পাল্লা ভারী করার সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে। সময় থেকে সর্বোচ্চ সুফলটুকু লুফে নেবে। যথাসময়ে যথাসম্ভব কাজে মনোনিবেশ করবে।

মুসলিম নারী তার সময়গুলোকে ভাগ করে নেবে। কিছু সময় তা প্রতিপালকের হক আদায় করার জন্য, কিছু সময় নিজের হক আদায় করার জন্য, কিছু সময় অন্যের হক আদায় করার জন্য। হযরত মূসা আ.-এর সহীফাসমূহে এসেছে,
يَنْبَغِي لِلْعَاقِلِ أَنْ يَكُونَ لَهُ أَرْبَعُ سَاعَاتٍ. سَاعَةٌ يُنَاجِي فِيهَا رَبَّهُ، وَسَاعَةٌ يُحَاسِبُ فِيهَا نَفْسَهُ، وَسَاعَةٌ يَتَفَكَّرُ فِي صُنْعِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ، وَسَاعَةٌ يَخْلُو فِيهَا لِحَاجَتِهِ مِنَ الْمَطْعَمِ وَالْمَشْرَبِ
অর্থ : বুদ্ধিমানের পক্ষে এটাই উচিত হবে যে, তার চারটি সময় থাকবে—একটি সময়ে তিনি আপন প্রতিপালকের সঙ্গে চুপিসারে প্রেমালাপ করবেন, একটি সময়ে নিজের হিসাব গ্রহণ করবেন, একটি সময়ে আল্লাহর সৃষ্টিকুশলতা নিয়ে ফিকির করবেন এবং একটি সময়ে নিজের পানাহারের জন্য কাজ করবেন।

আমাদের প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও নেক আমলের জন্য সময়ের সদ্ব্যবহার করার উৎসাহ প্রদান করেছেন। তিনি বলেছেন,
اغْتَنِمْ خَمْسًا قَبْلَ خَمْسٍ، حَيَاتَكَ قَبْلَ مَوْতِكَ، وَصِحَّتَكَ قَبْلَ مَرَضِكَ، وَفَرَاغَكَ قَبْلَ شُغْلِكَ، وَشَبَابَكَ قَبْلَ هَرَمِكَ، وَغِنَاكَ قَبْلَ ফَقْرِكَ
অর্থ : পাঁচটি বিষয় আছে পাঁচটি বিষয়ের সদ্ব্যবহার কর—মৃত্যুর আগে জীবনের, রোগের আগে সুস্থতার, ব্যস্ততার আগে অবসরের, বার্ধক্যের আগে যৌবনের এবং অভাবের আগে সচ্ছলতার। ১

আরবী প্রবাদ আছে, সময় সোনার চেয়েও দামি। যা চলে যাবে তা আর আসবে না। সুতরাং যে ব্যক্তি সময়ের যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারল, সেই জীবনের প্রকৃত মর্ম ও মূল্য অনুধাবন করতে পারল।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের জন্য জীবন ও জগতে মুসলমানদের আয়ুষ্কালের গুরুত্ব বোঝানোর প্রয়াস পেয়েছেন। তিনি তাদের এটাও বোঝাতে চেয়েছেন যে, রোজ হাশরে কত কঠিনভাবে এই আয়ুষ্কালের হিসাব নেওয়া হবে। তিনি বলেছেন,
لَا تَزُولُ قَدَمَا عَبْدٍ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حَتَّى يُسْأَلَ عَنْ عُمْরِهِ فِيمَ أَفْنَاهُ، وَعَنْ عِلْمِهِ فِيمَ فَعَلَ، وَعَنْ مَالِهِ مِنْ أَيْنَ اکْتَسَبَهُ وَفِيمَ أَنْفَقَهُ، وَعَنْ جِسْمِهِ فِيمَ أَبْلَاهُ
অর্থ : কিয়ামতের দিন বান্দা এক পা-ও নড়তে পারবে না, যতক্ষণ না তাকে জিজ্ঞেস করা হবে—আয়ুষ্কাল সম্পর্কে, কীসে তা ফুরিয়েছে? জ্ঞান সম্পর্কে, কীসে তা কাজে লাগিয়েছে? সম্পদ সম্পর্কে, কীভাবে উপার্জন করেছে এবং কীসে ব্যয় করেছে? শরীর সম্পর্কে, কীসে তা শীর্ণ করেছে? ১

কবি বড় চমৎকার কথা বলেছেন, হৃদয়ের স্পন্দন বলে বারেবারে, নিজের স্মরণে কিছু করো। মৃত্যুর পরও, যা তোমাকে করবে অমর। এ জীবন তো ক্ষণিকের মেলা। কিছু সুন্দর স্মৃতি ও অমর কীর্তি, সে তো আরেক জীবনের মেলা।

একজন দায়িত্ববান দায়িয়ার জন্য আবশ্যক হলো সময়ের ব্যাপারে সচেতন হওয়া। চিন্তা-চেতনায় এবং আচার-ব্যবহারে তাকে যাবতীয় ক্ষুদ্রতার ঊর্ধ্বে উঠতে হবে। অনর্থক কথাবার্তা, ক্রিয়াকলাপ থেকে বেঁচে থাকতে হবে। সত্যিকার সম্পূর্ণা মুসলিম রমণীর জীবনপ্রকৃতির আদলে আঁকতে হবে জীবনের ছক। মেনে চলতে হবে সুচিন্তিত সময়সূচি। হিসেব রাখতে হবে প্রতিটি মুহূর্তের। গড়তে হবে পরিকল্পনামাফিক জীবনযাপন। প্রয়োজন আছে আত্মসমালোচনারও। সারাদিনে মানুষের সাথে আচরণ-উচ্চারণ কেমন হলো, সেটা নিয়ে ভাবুন। কোনো অযোগ্য বা অমার্জিত আচরণ হয়নি তো? নিজের হিসেব গ্রহণ করুন। আত্মসমালোচনা করুন। আত্মসমালোচনায় নব প্রাণের সঞ্চার হয়। সাধিত হয় ব্যক্তির উত্তর-উত্তর উন্নতি। তা ছাড়া, মুমিনহৃদয় তো প্রতিনিয়ত আল্লাহর ভয়ে ভীত, পুণ্যের আশায় উদগ্রীব।

ফজরের নামাজের পর কুরআন তেলাওয়াত, তাসবীহ-তাহলীল, জিকির-আজকার, দুআ-ইসতিগফার ইত্যাদিতে সময় দেওয়া; তারপর ঘরের সাধারণ কাজ, স্বামী-সন্তানদের প্রতি করণীয়, ঘরবাড়ি এবং নিজের ও পরিবারের পারিপাট্য ও পরিচ্ছন্নতা ইত্যাদিতে সময় দেওয়া; এভাবে যোহরের পর ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া, হোম-ওয়ার্ক ইত্যাদিতে মনোযোগ দেওয়া; তাদের লেখাপড়া ও জ্ঞানগত অবস্থার তদারকি করা; এভাবে আসরের পর সম্ভব হলে জীবন ও জগতের সঙ্গে জড়িত সাধারণ বিষয়াদিতে অংশগ্রহণ করা যেমন : পাড়াপ্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনদের খোঁজখবর নেওয়া, তাদের সুখে দুঃখে শরিক হওয়া, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিভিন্ন সংস্থা বা সংগঠনের সভা-সেমিনার ইত্যাদিতে অংশগ্রহণ করা; সময় ও সুযোগ বুঝে বিভিন্ন কল্যাণমূলক কাজে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া—অর্থ দিয়ে হোক, মেধা দিয়ে হোক, শ্রম দিয়ে হোক—গরিব, দুঃখী, রোগগ্রস্ত, শোকাতুর বিভিন্ন অবস্থা ও অবস্থানের মানুষের পাশে দাঁড়ানো; তাদের কল্যাণার্থে সভা প্রতিষ্ঠা করা; গরিব ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া ব্যবস্থা করা; প্রয়োজনে তাদের জন্য ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা—সবই একজন মুমিন ও মুসলিম নারীর জীবনের সাধারণ হালচিত্র।

কল্যাণকর ও সেবামূলক কাজে অংশগ্রহণ করা মুমিন হিসেবে প্রত্যেকের কর্তব্য। কেননা, ইসলাম ধর্ম পারস্পরিক সহমর্মিতা ও সৌহার্দের ধর্ম, প্রীতি ও সম্প্রীতির ধর্ম, প্রত্যেকে প্রত্যেকের প্রতি দায়িত্বশীলতার ধর্ম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
অর্থ : পারস্পরিক ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও সৌহার্দ্যবোধে মুমিনদের দৃষ্টান্ত হলো একটি দেহের মতো। যখন দেহের একটি অঙ্গ কষ্ট পায়, তখন পুরো শরীরই তাতে সাড়া দেয়। ১

মুসলিম নারী কুরআন কারীম মুখস্থ করার মতো মহৎ কাজে ব্রতী হতে পারেন। এ তো পরম সৌভাগ্যের ব্যাপার। আল্লাহর কালাম বুকে ধারণ করার যে কী তৃপ্তি তা তো যে কোনো মুমিনই উপলব্ধি করতে পারেন। কত না ভাগ্যবান হবে সব ভাই ও বোন, যাদের সিনায় আল্লাহর কালামের নূর নসিব করেছেন! এ ক্ষেত্রে বয়স কিছু নয়। আমি অনেককে জানি, যারা বার্ধক্য বা প্রৌঢ়ত্বে উপনীত হয়েও কুরআন মুখস্থ করার সংকল্প করেছেন। পুরোটুকু না পারুন, অনেকটুকুও না পারুন, কিছুটুকু তো পারবেন। যদি কালামে পাকের সান্নিধ্যে আপনার জীবনের ইতি হয়, এও কি কম সৌভাগ্যের।

মুসলিম নারী সেলাই-ফোঁড়া, সূচিশিল্পসহ বিভিন্ন হাতের কাজ শিখতে পারেন। কম্পিউটারের কাজ শিখতে পারেন। নার্সিংয়ের কাজ শিখতে পারেন। এ জাতীয় আরও অসংখ্য কাজ আছে যেগুলো মুসলিম নারী অনায়াসে করতে পারেন। যেসব কাজ শরীআত নিষেধ করে না, এবং সেগুলো করতে করতে শরীআতবিরোধী কিছু ঘটে না, সেগুলো করতে বাধা কোথায়?

ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়, সমাজজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে মুসলিম নারীদের অংশগ্রহণ ও অবদান রয়েছে। স্বয়ং উম্মুল মুমিনীন হযরত যায়নাব রাযি. হাতের কাজ করতেন এবং উপার্জিত অর্থ আল্লাহর রাস্তায় দান খয়রাত ও সদকা করতেন। হযরত আয়েশা রাযি. তাঁর সম্পর্কে বলেছেন,
'আমি যায়নাব রাযি.-এর চেয়ে অধিক ধার্মিক, মুত্তাকী, সত্যবাদী, আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপনকারী, দান খয়রাত ও সদকারী নারী দেখিনি। তিনি সবচেয়ে বেশি নিজেকে কাজে খাটাতেন, যা দিয়ে তিনি সদকা করতেন এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতেন। যায়নাব রাযি. হাতের কাজ করতেন। তিনি চামড়া পাকা করা এবং সেলাইফোঁড়ার কাজ করতেন এবং উপার্জিত অর্থ আল্লাহর রাস্তায় সদকা করতেন।' ১

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পবিত্র স্ত্রীদেরকে লক্ষ্য করে বলতেন, 'তোমাদের সেই সবার আগে আমার সাথে মিলিত হবে, যার হাত সবচেয়ে লম্বা। (অর্থাৎ যে সবচেয়ে বেশি দানশীল)' ২

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পর পবিত্র স্ত্রীগণের মধ্যে হযরত যায়নাব রাযি.-ই সবার আগে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। বর্তমান যুগেও এমন এমন মুসলিম নারী পাবেন যারা ঘরসংসার ও দাওয়াতী কার্যক্রমের পাশাপাশি সমাজসেবা ও কল্যাণমূলক কাজেও নিজেকে জড়িয়েছেন। শায়খ মাহমূদ জাওহারীর সহধর্মিনী সাইয়েদা আমীনা আলী ইয়াতীম শিশুদের লালনপালন ও শিক্ষার্থীদের জন্য একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন। মাদরাসা পরিচালনার পাশাপাশি তিনি হাতের কাজের বেশ কয়েকটি দোকানও পরিচালনা করেছেন। লভ্যাংশ যা পান, তা দিয়ে শহীদ, বন্দি ও অবরুদ্ধ ব্যক্তিবর্গের পরিবার-পরিজনদের ভরণপোষণ করছেন।

একজন দায়ীয়াকে ঈমান ও বিশ্বাসে হতে হবে অটল অবিচল। অনুসরণ করতে হবে আল্লাহর দেওয়া জীবনবিধান পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে। নারীমনের সমগ্র শক্তিকে কর্মতৎপর করতে হবে আল্লাহর রাহে। তবেই মানবজাতিকে আল্লাহপ্রদত্ত সুমহান দায়িত্বটি আঞ্জাম পাবে; বিপথগামী নতুন প্রজন্ম দিশা পাবে সরল সঠিক পথের, ফিরে পাবে ইসলামের হারানো সেই সুনির্মল স্বর্গোদ্যান।

টিকাঃ
১. আহমদ।
১. তিরমিযী।
১. সহীহ বুখারী ও মুসলিম।
১. সহীহ বুখারী।
২. সহীহ মুসলিম।

মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে সময়ের শপথ করেছেন। কেননা, সময়ের হাত ধরেই ঘটে অহরহ সব ঘটনা। সুস্থতা, অসুস্থতা; সচ্ছলতা, অসচ্ছলতা; সুখ, দুঃখ ইত্যাদি সবই সময়ের সাথে আবদ্ধ। আল্লাহ তাআলা সূরা আসরের মধ্যে সময়ের শপথ করে বলেছেন,
وَالْعَصْرِ
অর্থ : শপথ সময়ের।

ইসলামে সময়ের এই যে মূল্যায়ন, এটা মুসলিম নারীর কাছ থেকে কী দাবি করে? নিঃসন্দেহে, এই মূল্যায়নের অনিবার্য দাবি এই যে, সে তার সময়ের হেফাজত করবে। জীবনের মহামূল্যবান সময় সম্পর্কে সচেতন থাকবে। প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগাবে নেক আমলের পাল্লা ভারী করার সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে। সময় থেকে সর্বোচ্চ সুফলটুকু লুফে নেবে। যথাসময়ে যথাসম্ভব কাজে মনোনিবেশ করবে।

মুসলিম নারী তার সময়গুলোকে ভাগ করে নেবে। কিছু সময় তা প্রতিপালকের হক আদায় করার জন্য, কিছু সময় নিজের হক আদায় করার জন্য, কিছু সময় অন্যের হক আদায় করার জন্য। হযরত মূসা আ.-এর সহীফাসমূহে এসেছে,
يَنْبَغِي لِلْعَاقِلِ أَنْ يَكُونَ لَهُ أَرْبَعُ سَاعَاتٍ. سَاعَةٌ يُنَاجِي فِيهَا رَبَّهُ، وَسَاعَةٌ يُحَاسِبُ فِيهَا نَفْسَهُ، وَسَاعَةٌ يَتَفَكَّرُ فِي صُنْعِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ، وَسَاعَةٌ يَخْلُو فِيهَا لِحَاجَتِهِ مِنَ الْمَطْعَمِ وَالْمَشْرَبِ
অর্থ : বুদ্ধিমানের পক্ষে এটাই উচিত হবে যে, তার চারটি সময় থাকবে—একটি সময়ে তিনি আপন প্রতিপালকের সঙ্গে চুপিসারে প্রেমালাপ করবেন, একটি সময়ে নিজের হিসাব গ্রহণ করবেন, একটি সময়ে আল্লাহর সৃষ্টিকুশলতা নিয়ে ফিকির করবেন এবং একটি সময়ে নিজের পানাহারের জন্য কাজ করবেন।

আমাদের প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও নেক আমলের জন্য সময়ের সদ্ব্যবহার করার উৎসাহ প্রদান করেছেন। তিনি বলেছেন,
اغْتَنِمْ خَمْسًا قَبْلَ خَمْسٍ، حَيَاتَكَ قَبْلَ مَوْতِكَ، وَصِحَّتَكَ قَبْلَ مَرَضِكَ، وَفَرَاغَكَ قَبْلَ شُغْلِكَ، وَشَبَابَكَ قَبْلَ هَرَمِكَ، وَغِنَاكَ قَبْلَ ফَقْرِكَ
অর্থ : পাঁচটি বিষয় আছে পাঁচটি বিষয়ের সদ্ব্যবহার কর—মৃত্যুর আগে জীবনের, রোগের আগে সুস্থতার, ব্যস্ততার আগে অবসরের, বার্ধক্যের আগে যৌবনের এবং অভাবের আগে সচ্ছলতার। ১

আরবী প্রবাদ আছে, সময় সোনার চেয়েও দামি। যা চলে যাবে তা আর আসবে না। সুতরাং যে ব্যক্তি সময়ের যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারল, সেই জীবনের প্রকৃত মর্ম ও মূল্য অনুধাবন করতে পারল।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের জন্য জীবন ও জগতে মুসলমানদের আয়ুষ্কালের গুরুত্ব বোঝানোর প্রয়াস পেয়েছেন। তিনি তাদের এটাও বোঝাতে চেয়েছেন যে, রোজ হাশরে কত কঠিনভাবে এই আয়ুষ্কালের হিসাব নেওয়া হবে। তিনি বলেছেন,
لَا تَزُولُ قَدَمَا عَبْدٍ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حَتَّى يُسْأَلَ عَنْ عُمْরِهِ فِيمَ أَفْنَاهُ، وَعَنْ عِلْمِهِ فِيمَ فَعَلَ، وَعَنْ مَالِهِ مِنْ أَيْنَ اکْتَسَبَهُ وَفِيمَ أَنْفَقَهُ، وَعَنْ جِسْمِهِ فِيمَ أَبْلَاهُ
অর্থ : কিয়ামতের দিন বান্দা এক পা-ও নড়তে পারবে না, যতক্ষণ না তাকে জিজ্ঞেস করা হবে—আয়ুষ্কাল সম্পর্কে, কীসে তা ফুরিয়েছে? জ্ঞান সম্পর্কে, কীসে তা কাজে লাগিয়েছে? সম্পদ সম্পর্কে, কীভাবে উপার্জন করেছে এবং কীসে ব্যয় করেছে? শরীর সম্পর্কে, কীসে তা শীর্ণ করেছে? ১

কবি বড় চমৎকার কথা বলেছেন, হৃদয়ের স্পন্দন বলে বারেবারে, নিজের স্মরণে কিছু করো। মৃত্যুর পরও, যা তোমাকে করবে অমর। এ জীবন তো ক্ষণিকের মেলা। কিছু সুন্দর স্মৃতি ও অমর কীর্তি, সে তো আরেক জীবনের মেলা।

একজন দায়িত্ববান দায়িয়ার জন্য আবশ্যক হলো সময়ের ব্যাপারে সচেতন হওয়া। চিন্তা-চেতনায় এবং আচার-ব্যবহারে তাকে যাবতীয় ক্ষুদ্রতার ঊর্ধ্বে উঠতে হবে। অনর্থক কথাবার্তা, ক্রিয়াকলাপ থেকে বেঁচে থাকতে হবে। সত্যিকার সম্পূর্ণা মুসলিম রমণীর জীবনপ্রকৃতির আদলে আঁকতে হবে জীবনের ছক। মেনে চলতে হবে সুচিন্তিত সময়সূচি। হিসেব রাখতে হবে প্রতিটি মুহূর্তের। গড়তে হবে পরিকল্পনামাফিক জীবনযাপন। প্রয়োজন আছে আত্মসমালোচনারও। সারাদিনে মানুষের সাথে আচরণ-উচ্চারণ কেমন হলো, সেটা নিয়ে ভাবুন। কোনো অযোগ্য বা অমার্জিত আচরণ হয়নি তো? নিজের হিসেব গ্রহণ করুন। আত্মসমালোচনা করুন। আত্মসমালোচনায় নব প্রাণের সঞ্চার হয়। সাধিত হয় ব্যক্তির উত্তর-উত্তর উন্নতি। তা ছাড়া, মুমিনহৃদয় তো প্রতিনিয়ত আল্লাহর ভয়ে ভীত, পুণ্যের আশায় উদগ্রীব।

ফজরের নামাজের পর কুরআন তেলাওয়াত, তাসবীহ-তাহলীল, জিকির-আজকার, দুআ-ইসতিগফার ইত্যাদিতে সময় দেওয়া; তারপর ঘরের সাধারণ কাজ, স্বামী-সন্তানদের প্রতি করণীয়, ঘরবাড়ি এবং নিজের ও পরিবারের পারিপাট্য ও পরিচ্ছন্নতা ইত্যাদিতে সময় দেওয়া; এভাবে যোহরের পর ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া, হোম-ওয়ার্ক ইত্যাদিতে মনোযোগ দেওয়া; তাদের লেখাপড়া ও জ্ঞানগত অবস্থার তদারকি করা; এভাবে আসরের পর সম্ভব হলে জীবন ও জগতের সঙ্গে জড়িত সাধারণ বিষয়াদিতে অংশগ্রহণ করা যেমন : পাড়াপ্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনদের খোঁজখবর নেওয়া, তাদের সুখে দুঃখে শরিক হওয়া, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিভিন্ন সংস্থা বা সংগঠনের সভা-সেমিনার ইত্যাদিতে অংশগ্রহণ করা; সময় ও সুযোগ বুঝে বিভিন্ন কল্যাণমূলক কাজে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া—অর্থ দিয়ে হোক, মেধা দিয়ে হোক, শ্রম দিয়ে হোক—গরিব, দুঃখী, রোগগ্রস্ত, শোকাতুর বিভিন্ন অবস্থা ও অবস্থানের মানুষের পাশে দাঁড়ানো; তাদের কল্যাণার্থে সভা প্রতিষ্ঠা করা; গরিব ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া ব্যবস্থা করা; প্রয়োজনে তাদের জন্য ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা—সবই একজন মুমিন ও মুসলিম নারীর জীবনের সাধারণ হালচিত্র।

কল্যাণকর ও সেবামূলক কাজে অংশগ্রহণ করা মুমিন হিসেবে প্রত্যেকের কর্তব্য। কেননা, ইসলাম ধর্ম পারস্পরিক সহমর্মিতা ও সৌহার্দের ধর্ম, প্রীতি ও সম্প্রীতির ধর্ম, প্রত্যেকে প্রত্যেকের প্রতি দায়িত্বশীলতার ধর্ম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
অর্থ : পারস্পরিক ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও সৌহার্দ্যবোধে মুমিনদের দৃষ্টান্ত হলো একটি দেহের মতো। যখন দেহের একটি অঙ্গ কষ্ট পায়, তখন পুরো শরীরই তাতে সাড়া দেয়। ১

মুসলিম নারী কুরআন কারীম মুখস্থ করার মতো মহৎ কাজে ব্রতী হতে পারেন। এ তো পরম সৌভাগ্যের ব্যাপার। আল্লাহর কালাম বুকে ধারণ করার যে কী তৃপ্তি তা তো যে কোনো মুমিনই উপলব্ধি করতে পারেন। কত না ভাগ্যবান হবে সব ভাই ও বোন, যাদের সিনায় আল্লাহর কালামের নূর নসিব করেছেন! এ ক্ষেত্রে বয়স কিছু নয়। আমি অনেককে জানি, যারা বার্ধক্য বা প্রৌঢ়ত্বে উপনীত হয়েও কুরআন মুখস্থ করার সংকল্প করেছেন। পুরোটুকু না পারুন, অনেকটুকুও না পারুন, কিছুটুকু তো পারবেন। যদি কালামে পাকের সান্নিধ্যে আপনার জীবনের ইতি হয়, এও কি কম সৌভাগ্যের।

মুসলিম নারী সেলাই-ফোঁড়া, সূচিশিল্পসহ বিভিন্ন হাতের কাজ শিখতে পারেন। কম্পিউটারের কাজ শিখতে পারেন। নার্সিংয়ের কাজ শিখতে পারেন। এ জাতীয় আরও অসংখ্য কাজ আছে যেগুলো মুসলিম নারী অনায়াসে করতে পারেন। যেসব কাজ শরীআত নিষেধ করে না, এবং সেগুলো করতে করতে শরীআতবিরোধী কিছু ঘটে না, সেগুলো করতে বাধা কোথায়?

ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়, সমাজজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে মুসলিম নারীদের অংশগ্রহণ ও অবদান রয়েছে। স্বয়ং উম্মুল মুমিনীন হযরত যায়নাব রাযি. হাতের কাজ করতেন এবং উপার্জিত অর্থ আল্লাহর রাস্তায় দান খয়রাত ও সদকা করতেন। হযরত আয়েশা রাযি. তাঁর সম্পর্কে বলেছেন,
'আমি যায়নাব রাযি.-এর চেয়ে অধিক ধার্মিক, মুত্তাকী, সত্যবাদী, আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপনকারী, দান খয়রাত ও সদকারী নারী দেখিনি। তিনি সবচেয়ে বেশি নিজেকে কাজে খাটাতেন, যা দিয়ে তিনি সদকা করতেন এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতেন। যায়নাব রাযি. হাতের কাজ করতেন। তিনি চামড়া পাকা করা এবং সেলাইফোঁড়ার কাজ করতেন এবং উপার্জিত অর্থ আল্লাহর রাস্তায় সদকা করতেন।' ১

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পবিত্র স্ত্রীদেরকে লক্ষ্য করে বলতেন, 'তোমাদের সেই সবার আগে আমার সাথে মিলিত হবে, যার হাত সবচেয়ে লম্বা। (অর্থাৎ যে সবচেয়ে বেশি দানশীল)' ২

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পর পবিত্র স্ত্রীগণের মধ্যে হযরত যায়নাব রাযি.-ই সবার আগে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। বর্তমান যুগেও এমন এমন মুসলিম নারী পাবেন যারা ঘরসংসার ও দাওয়াতী কার্যক্রমের পাশাপাশি সমাজসেবা ও কল্যাণমূলক কাজেও নিজেকে জড়িয়েছেন। শায়খ মাহমূদ জাওহারীর সহধর্মিনী সাইয়েদা আমীনা আলী ইয়াতীম শিশুদের লালনপালন ও শিক্ষার্থীদের জন্য একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন। মাদরাসা পরিচালনার পাশাপাশি তিনি হাতের কাজের বেশ কয়েকটি দোকানও পরিচালনা করেছেন। লভ্যাংশ যা পান, তা দিয়ে শহীদ, বন্দি ও অবরুদ্ধ ব্যক্তিবর্গের পরিবার-পরিজনদের ভরণপোষণ করছেন।

একজন দায়ীয়াকে ঈমান ও বিশ্বাসে হতে হবে অটল অবিচল। অনুসরণ করতে হবে আল্লাহর দেওয়া জীবনবিধান পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে। নারীমনের সমগ্র শক্তিকে কর্মতৎপর করতে হবে আল্লাহর রাহে। তবেই মানবজাতিকে আল্লাহপ্রদত্ত সুমহান দায়িত্বটি আঞ্জাম পাবে; বিপথগামী নতুন প্রজন্ম দিশা পাবে সরল সঠিক পথের, ফিরে পাবে ইসলামের হারানো সেই সুনির্মল স্বর্গোদ্যান।

টিকাঃ
১. আহমদ।
১. তিরমিযী।
১. সহীহ বুখারী ও মুসলিম।
১. সহীহ বুখারী।
২. সহীহ মুসলিম।

মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে সময়ের শপথ করেছেন। কেননা, সময়ের হাত ধরেই ঘটে অহরহ সব ঘটনা। সুস্থতা, অসুস্থতা; সচ্ছলতা, অসচ্ছলতা; সুখ, দুঃখ ইত্যাদি সবই সময়ের সাথে আবদ্ধ। আল্লাহ তাআলা সূরা আসরের মধ্যে সময়ের শপথ করে বলেছেন,
وَالْعَصْرِ
অর্থ : শপথ সময়ের।

ইসলামে সময়ের এই যে মূল্যায়ন, এটা মুসলিম নারীর কাছ থেকে কী দাবি করে? নিঃসন্দেহে, এই মূল্যায়নের অনিবার্য দাবি এই যে, সে তার সময়ের হেফাজত করবে। জীবনের মহামূল্যবান সময় সম্পর্কে সচেতন থাকবে। প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগাবে নেক আমলের পাল্লা ভারী করার সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে। সময় থেকে সর্বোচ্চ সুফলটুকু লুফে নেবে। যথাসময়ে যথাসম্ভব কাজে মনোনিবেশ করবে।

মুসলিম নারী তার সময়গুলোকে ভাগ করে নেবে। কিছু সময় তা প্রতিপালকের হক আদায় করার জন্য, কিছু সময় নিজের হক আদায় করার জন্য, কিছু সময় অন্যের হক আদায় করার জন্য। হযরত মূসা আ.-এর সহীফাসমূহে এসেছে,
يَنْبَغِي لِلْعَاقِلِ أَنْ يَكُونَ لَهُ أَرْبَعُ سَاعَاتٍ. سَاعَةٌ يُنَاجِي فِيهَا رَبَّهُ، وَسَاعَةٌ يُحَاسِبُ فِيهَا نَفْسَهُ، وَسَاعَةٌ يَتَفَكَّرُ فِي صُنْعِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ، وَسَاعَةٌ يَخْلُو فِيهَا لِحَاجَتِهِ مِنَ الْمَطْعَمِ وَالْمَشْرَبِ
অর্থ : বুদ্ধিমানের পক্ষে এটাই উচিত হবে যে, তার চারটি সময় থাকবে—একটি সময়ে তিনি আপন প্রতিপালকের সঙ্গে চুপিসারে প্রেমালাপ করবেন, একটি সময়ে নিজের হিসাব গ্রহণ করবেন, একটি সময়ে আল্লাহর সৃষ্টিকুশলতা নিয়ে ফিকির করবেন এবং একটি সময়ে নিজের পানাহারের জন্য কাজ করবেন।

আমাদের প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও নেক আমলের জন্য সময়ের সদ্ব্যবহার করার উৎসাহ প্রদান করেছেন। তিনি বলেছেন,
اغْتَنِمْ خَمْسًا قَبْلَ خَمْسٍ، حَيَاتَكَ قَبْلَ مَوْতِكَ، وَصِحَّتَكَ قَبْلَ مَرَضِكَ، وَفَرَاغَكَ قَبْلَ شُغْلِكَ، وَشَبَابَكَ قَبْلَ هَرَمِكَ، وَغِنَاكَ قَبْلَ ফَقْرِكَ
অর্থ : পাঁচটি বিষয় আছে পাঁচটি বিষয়ের সদ্ব্যবহার কর—মৃত্যুর আগে জীবনের, রোগের আগে সুস্থতার, ব্যস্ততার আগে অবসরের, বার্ধক্যের আগে যৌবনের এবং অভাবের আগে সচ্ছলতার। ১

আরবী প্রবাদ আছে, সময় সোনার চেয়েও দামি। যা চলে যাবে তা আর আসবে না। সুতরাং যে ব্যক্তি সময়ের যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারল, সেই জীবনের প্রকৃত মর্ম ও মূল্য অনুধাবন করতে পারল।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের জন্য জীবন ও জগতে মুসলমানদের আয়ুষ্কালের গুরুত্ব বোঝানোর প্রয়াস পেয়েছেন। তিনি তাদের এটাও বোঝাতে চেয়েছেন যে, রোজ হাশরে কত কঠিনভাবে এই আয়ুষ্কালের হিসাব নেওয়া হবে। তিনি বলেছেন,
لَا تَزُولُ قَدَمَا عَبْدٍ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حَتَّى يُسْأَلَ عَنْ عُمْরِهِ فِيمَ أَفْنَاهُ، وَعَنْ عِلْمِهِ فِيمَ فَعَلَ، وَعَنْ مَالِهِ مِنْ أَيْنَ اکْتَسَبَهُ وَفِيمَ أَنْفَقَهُ، وَعَنْ جِسْمِهِ فِيمَ أَبْلَاهُ
অর্থ : কিয়ামতের দিন বান্দা এক পা-ও নড়তে পারবে না, যতক্ষণ না তাকে জিজ্ঞেস করা হবে—আয়ুষ্কাল সম্পর্কে, কীসে তা ফুরিয়েছে? জ্ঞান সম্পর্কে, কীসে তা কাজে লাগিয়েছে? সম্পদ সম্পর্কে, কীভাবে উপার্জন করেছে এবং কীসে ব্যয় করেছে? শরীর সম্পর্কে, কীসে তা শীর্ণ করেছে? ১

কবি বড় চমৎকার কথা বলেছেন, হৃদয়ের স্পন্দন বলে বারেবারে, নিজের স্মরণে কিছু করো। মৃত্যুর পরও, যা তোমাকে করবে অমর। এ জীবন তো ক্ষণিকের মেলা। কিছু সুন্দর স্মৃতি ও অমর কীর্তি, সে তো আরেক জীবনের মেলা।

একজন দায়িত্ববান দায়িয়ার জন্য আবশ্যক হলো সময়ের ব্যাপারে সচেতন হওয়া। চিন্তা-চেতনায় এবং আচার-ব্যবহারে তাকে যাবতীয় ক্ষুদ্রতার ঊর্ধ্বে উঠতে হবে। অনর্থক কথাবার্তা, ক্রিয়াকলাপ থেকে বেঁচে থাকতে হবে। সত্যিকার সম্পূর্ণা মুসলিম রমণীর জীবনপ্রকৃতির আদলে আঁকতে হবে জীবনের ছক। মেনে চলতে হবে সুচিন্তিত সময়সূচি। হিসেব রাখতে হবে প্রতিটি মুহূর্তের। গড়তে হবে পরিকল্পনামাফিক জীবনযাপন। প্রয়োজন আছে আত্মসমালোচনারও। সারাদিনে মানুষের সাথে আচরণ-উচ্চারণ কেমন হলো, সেটা নিয়ে ভাবুন। কোনো অযোগ্য বা অমার্জিত আচরণ হয়নি তো? নিজের হিসেব গ্রহণ করুন। আত্মসমালোচনা করুন। আত্মসমালোচনায় নব প্রাণের সঞ্চার হয়। সাধিত হয় ব্যক্তির উত্তর-উত্তর উন্নতি। তা ছাড়া, মুমিনহৃদয় তো প্রতিনিয়ত আল্লাহর ভয়ে ভীত, পুণ্যের আশায় উদগ্রীব।

ফজরের নামাজের পর কুরআন তেলাওয়াত, তাসবীহ-তাহলীল, জিকির-আজকার, দুআ-ইসতিগফার ইত্যাদিতে সময় দেওয়া; তারপর ঘরের সাধারণ কাজ, স্বামী-সন্তানদের প্রতি করণীয়, ঘরবাড়ি এবং নিজের ও পরিবারের পারিপাট্য ও পরিচ্ছন্নতা ইত্যাদিতে সময় দেওয়া; এভাবে যোহরের পর ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া, হোম-ওয়ার্ক ইত্যাদিতে মনোযোগ দেওয়া; তাদের লেখাপড়া ও জ্ঞানগত অবস্থার তদারকি করা; এভাবে আসরের পর সম্ভব হলে জীবন ও জগতের সঙ্গে জড়িত সাধারণ বিষয়াদিতে অংশগ্রহণ করা যেমন : পাড়াপ্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনদের খোঁজখবর নেওয়া, তাদের সুখে দুঃখে শরিক হওয়া, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিভিন্ন সংস্থা বা সংগঠনের সভা-সেমিনার ইত্যাদিতে অংশগ্রহণ করা; সময় ও সুযোগ বুঝে বিভিন্ন কল্যাণমূলক কাজে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া—অর্থ দিয়ে হোক, মেধা দিয়ে হোক, শ্রম দিয়ে হোক—গরিব, দুঃখী, রোগগ্রস্ত, শোকাতুর বিভিন্ন অবস্থা ও অবস্থানের মানুষের পাশে দাঁড়ানো; তাদের কল্যাণার্থে সভা প্রতিষ্ঠা করা; গরিব ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া ব্যবস্থা করা; প্রয়োজনে তাদের জন্য ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা—সবই একজন মুমিন ও মুসলিম নারীর জীবনের সাধারণ হালচিত্র।

কল্যাণকর ও সেবামূলক কাজে অংশগ্রহণ করা মুমিন হিসেবে প্রত্যেকের কর্তব্য। কেননা, ইসলাম ধর্ম পারস্পরিক সহমর্মিতা ও সৌহার্দের ধর্ম, প্রীতি ও সম্প্রীতির ধর্ম, প্রত্যেকে প্রত্যেকের প্রতি দায়িত্বশীলতার ধর্ম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
অর্থ : পারস্পরিক ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও সৌহার্দ্যবোধে মুমিনদের দৃষ্টান্ত হলো একটি দেহের মতো। যখন দেহের একটি অঙ্গ কষ্ট পায়, তখন পুরো শরীরই তাতে সাড়া দেয়। ১

মুসলিম নারী কুরআন কারীম মুখস্থ করার মতো মহৎ কাজে ব্রতী হতে পারেন। এ তো পরম সৌভাগ্যের ব্যাপার। আল্লাহর কালাম বুকে ধারণ করার যে কী তৃপ্তি তা তো যে কোনো মুমিনই উপলব্ধি করতে পারেন। কত না ভাগ্যবান হবে সব ভাই ও বোন, যাদের সিনায় আল্লাহর কালামের নূর নসিব করেছেন! এ ক্ষেত্রে বয়স কিছু নয়। আমি অনেককে জানি, যারা বার্ধক্য বা প্রৌঢ়ত্বে উপনীত হয়েও কুরআন মুখস্থ করার সংকল্প করেছেন। পুরোটুকু না পারুন, অনেকটুকুও না পারুন, কিছুটুকু তো পারবেন। যদি কালামে পাকের সান্নিধ্যে আপনার জীবনের ইতি হয়, এও কি কম সৌভাগ্যের।

মুসলিম নারী সেলাই-ফোঁড়া, সূচিশিল্পসহ বিভিন্ন হাতের কাজ শিখতে পারেন। কম্পিউটারের কাজ শিখতে পারেন। নার্সিংয়ের কাজ শিখতে পারেন। এ জাতীয় আরও অসংখ্য কাজ আছে যেগুলো মুসলিম নারী অনায়াসে করতে পারেন। যেসব কাজ শরীআত নিষেধ করে না, এবং সেগুলো করতে করতে শরীআতবিরোধী কিছু ঘটে না, সেগুলো করতে বাধা কোথায়?

ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়, সমাজজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে মুসলিম নারীদের অংশগ্রহণ ও অবদান রয়েছে। স্বয়ং উম্মুল মুমিনীন হযরত যায়নাব রাযি. হাতের কাজ করতেন এবং উপার্জিত অর্থ আল্লাহর রাস্তায় দান খয়রাত ও সদকা করতেন। হযরত আয়েশা রাযি. তাঁর সম্পর্কে বলেছেন,
'আমি যায়নাব রাযি.-এর চেয়ে অধিক ধার্মিক, মুত্তাকী, সত্যবাদী, আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপনকারী, দান খয়রাত ও সদকারী নারী দেখিনি। তিনি সবচেয়ে বেশি নিজেকে কাজে খাটাতেন, যা দিয়ে তিনি সদকা করতেন এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতেন। যায়নাব রাযি. হাতের কাজ করতেন। তিনি চামড়া পাকা করা এবং সেলাইফোঁড়ার কাজ করতেন এবং উপার্জিত অর্থ আল্লাহর রাস্তায় সদকা করতেন।' ১

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পবিত্র স্ত্রীদেরকে লক্ষ্য করে বলতেন, 'তোমাদের সেই সবার আগে আমার সাথে মিলিত হবে, যার হাত সবচেয়ে লম্বা। (অর্থাৎ যে সবচেয়ে বেশি দানশীল)' ২

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পর পবিত্র স্ত্রীগণের মধ্যে হযরত যায়নাব রাযি.-ই সবার আগে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। বর্তমান যুগেও এমন এমন মুসলিম নারী পাবেন যারা ঘরসংসার ও দাওয়াতী কার্যক্রমের পাশাপাশি সমাজসেবা ও কল্যাণমূলক কাজেও নিজেকে জড়িয়েছেন। শায়খ মাহমূদ জাওহারীর সহধর্মিনী সাইয়েদা আমীনা আলী ইয়াতীম শিশুদের লালনপালন ও শিক্ষার্থীদের জন্য একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন। মাদরাসা পরিচালনার পাশাপাশি তিনি হাতের কাজের বেশ কয়েকটি দোকানও পরিচালনা করেছেন। লভ্যাংশ যা পান, তা দিয়ে শহীদ, বন্দি ও অবরুদ্ধ ব্যক্তিবর্গের পরিবার-পরিজনদের ভরণপোষণ করছেন।

একজন দায়ীয়াকে ঈমান ও বিশ্বাসে হতে হবে অটল অবিচল। অনুসরণ করতে হবে আল্লাহর দেওয়া জীবনবিধান পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে। নারীমনের সমগ্র শক্তিকে কর্মতৎপর করতে হবে আল্লাহর রাহে। তবেই মানবজাতিকে আল্লাহপ্রদত্ত সুমহান দায়িত্বটি আঞ্জাম পাবে; বিপথগামী নতুন প্রজন্ম দিশা পাবে সরল সঠিক পথের, ফিরে পাবে ইসলামের হারানো সেই সুনির্মল স্বর্গোদ্যান।

টিকাঃ
১. আহমদ।
১. তিরমিযী।
১. সহীহ বুখারী ও মুসলিম।
১. সহীহ বুখারী।
২. সহীহ মুসলিম।

📘 ফিরে এসো নীড়ে 📄 ৫. হৃদয়ের গভীরে পৌঁছে দিন আহ্বান

📄 ৫. হৃদয়ের গভীরে পৌঁছে দিন আহ্বান


নিঃসন্দেহে দাওয়াতের কাজ বড় কঠিন। একজন বিজ্ঞ চিকিৎসক যেমন মানবদেহের রোগনির্ণয় ও আক্রান্ত স্থান নির্ধারণের পর ব্যবস্থাপত্র প্রদান করেন তেমনই একজন দাই ইলাল্লাহ। তিনিও একজন চিকিৎসক। তিনি চিকিৎসা করেন উম্মাহর হৃদয়-জগতের। সময় ও সমাজের প্রভাবে, অন্যদের অন্ধ অনুকরণে উম্মাহর অস্থিমজ্জায় যে ব্যাধি সৃষ্টি হয়, যে রোগজীবাণু ছড়িয়ে যায়, তারই চিকিৎসা করেন একজন দাই ইলাল্লাহ।

তবে দাওয়াতের ক্রিয়াশীলতার জন্য দাই এর প্রয়োজন বলিষ্ঠ যুক্তিশক্তির, সক্ষম বাগ্মিতার। প্রয়োজন আল্লাহর নূরের নূরানী একটি তাজা ও সাচ্চা দিলের। যার প্রতিটি বাণী উৎসারিত হয় হৃদয়ের গভীর থেকে। তাই স্থিত হয় হৃদয়েরই গভীরে। পূর্ণ বিশ্বাসের সাথে। পূর্ণ আস্থার সাথে। যেন মানুষ আশার আলো দেখে। আভাস পায় একটি সুন্দর জীবনের, একটি সুন্দর পৃথিবীর। রোগভয়, শোকাহত মানবহৃদয়ে দাইয়ের আহ্বান যেন রোগনিরাময়কারী এক ফোঁটা প্রতিষেধক হয়েই পতিত হয়। সে যেন প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে আল্লাহর স্মরণে।

দাওয়াতের জন্য সম্বোধন করতে হবে মানবহৃদয়কে। মানুষ ও মানবতার প্রতি হিতাকাঙ্ক্ষী নিয়ে। হৃদয়গ্রাহী ভাষায়। সুন্দর আচরণে, সুন্দর উচ্চারণে। সাথে থাকবে আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠতা। সম্বোধিতের প্রতি আন্তরিকতা ও কল্যাণকামিতা। যাতে সে সর্বোত্তমরূপে মনোযোগী হয় আপনার আহ্বানের প্রতি। তা হলেই সে প্রভাবিত হবে। আপনার প্রতিটি কথা তার অন্তরে বদ্ধমূল হবে।

মনে পড়ে, সত্তরের দশকের মাঝের দিকে যখন ইসলামী পুনর্জাগরণের শুভ সূচনা হয় তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মতত্ত্ব বিভাগের ছাত্রী। নতুন প্রজন্মের মেয়েদের ধর্মীয় অনুভূতিকে জাগিয়ে তুলতে মুসলিম দাইয়াহগণ তখন কী শ্রমই না দিয়েছিলেন! কী সাধনাই না করেছিলেন!

জীবন ও জগতের নিত্যনতুন বিষয়ে আলোচনায় অবতীর্ণ হতেন তাঁরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নারীদের সাথে আলোচনা করতেন। রাস্তায় দাঁড়িয়ে, ঘরে বসে, ক্লাসরুমে গিয়ে বিভিন্ন অবস্থায় তাদের সাথে কথা বলতেন। চলত অনবরত গ্রহণ ও প্রত্যাখ্যান, চিন্তার আদানপ্রদান ও আবেগ-অনুভূতির বিনিময়। এভাবে অনেকের হৃদয়ের বদ্ধ দুয়ার খুলে যেত। মনে উঁকি দিত অজস্র প্রশ্ন। যা জন্ম দিত এক অতন্ত্যগভীর চেতনাশক্তির।

পবিত্র নগরী বাইতুল মাকদিসের একটি বিদ্যালয়ে আমি শিক্ষিকা হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলাম। ওই সময় থেকেই আমি দাওয়াতের কাজকে নিজের ব্রত বানিয়ে নিই। শিক্ষাজীবনে বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখে আসা মুসলিম দাইয়াহদের দাওয়াতের রীতি-নীতি ছিল আমার পাথেয়।

আমি যেদিন প্রথমবারে মতো শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করলাম সেদিন অবাক না হয়ে পারলাম না। আমি আমার ছাত্রীদেরকে লক্ষ্য করে ইসলামের সম্বোধন বাক্য উচ্চারণ করলাম। বললাম, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। কিন্তু একি, সবাই নিশ্চুপ! একটি ছাত্রীও আমার সালামের উত্তর দিল না।

আরও আশ্চর্যের বিষয় এই যে, আমি লক্ষ করলাম, তাদের আচরণে আমি যতটা অবাক হয়েছি, আমার সালামে তারা তারচে বেশি হতবাক হয়েছে। জানতে চাইলাম, তারা এমন হতবাক হয়ে গেল কেন? কেন সালামের উত্তর দিল না কেন?

অবশেষে একজন জানতে চাইল, কী বলতে হবে? আমি বললাম, তোমরা বলো, ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ – এটা হলো দুনিয়া ও আখিরাতে ইসলাম ও মুসলমানদের পারস্পরিক সম্বোধন বাক্য।

এরপর আমি চক হাতে নিয়ে বোর্ডের দিকে অগ্রসর হলাম। আমি বোর্ডে একটি বাক্য লিখলাম,
ماذا يعني انتمائي للإسلام
ইসলামের সাথে আমার সম্পর্কের মর্ম কী?

আমি এক এক করে আমার প্রত্যেকটি ছাত্রীকে জিজ্ঞেস করলাম। খুব কম ছাত্রীই উত্তর দিতে পারল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তোমরা কি মুসলিম? তারা উত্তর দিল, হ্যাঁ। আমি জিজ্ঞেস করলাম, অন্যদের তুলনায় একটি মুসলিম মেয়ের ভিন্নতা কী, জানো? তারা উত্তর দিল, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ বলা। আমি বললাম, আর কিছু? তারা বলল, আর কিছু জানি না।

সেই মুহূর্তেই আমার সমগ্র সত্তা যেন হিম হয়ে গেল। আমি উপলব্ধি করলাম, এ এক লক্ষ্যহীন দিশেহারা প্রজন্ম; এরা আত্মপরিচয়হীন, আত্মোপলদ্ধিহীন। কেননা, এদের বাস এমন এক পরিবেশে যা ইসলাম থেকে দূরে, অনেক দূরে।

আমি ছিলাম ধর্মশিক্ষিকা। তাই অনেকটাই সহজ হলো। ছাত্রীদের ধর্মের তালীম দিতে লাগলাম। একদম গোড়া থেকে। ইসলামের রুকন থেকে শুরু করে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক সকল স্তরের আমলী তালীম। ওযু কীভাবে করতে হবে, নামায কীভাবে পড়তে হবে ইত্যাদি।

আমি ক্লাস শেষে তাদের সাথে নিয়ে প্রতিদিন যোহরের নামায আদায় করতাম। বিদ্যালয়সংলগ্ন একটি নামাযগাহ ছিল। যদিও ছাত্রীদের পর্যাপ্ত জ্ঞান অর্জনের জন্য অনেক সময়ের প্রয়োজন ছিল; কিন্তু আল্লাহর সাহায্য হলে সবই সহজে হয়ে যায়। ছাত্রীদের মধ্যে সাড়া জাগল। নতুন শিক্ষিকার বিষয়গুলো অবগত হতে নতুন নতুন কথাবার্তা তাদের আলোচনার বিষয়ে পরিণত হলো।

অল্প দিনের মধ্যেই পুরো বিদ্যালয়ে শুরু হলো শোরগোল। ধর্মের ক্লাস চলছে এবং কী হচ্ছে? ধর্মশিক্ষিকা ক্লাস করাবেন, বই পড়াবেন। ওযু করাতে, নামায পড়াতে কে বলেছে তাকে? এ তো বিদ্যালয়। একে ধর্মীয় কেন্দ্র বানানোর অধিকার তিনি কোত্থেকে পেলেন? এরকম আরও অনেক কথা। কিন্তু আমি পিছুপা হলাম না। দৃঢ়তার সাথে আমার কাজ চালিয়ে যেতে থাকলাম।

আমি আমার ছাত্রীদেরকে পথ চলার, কথা বলার ইসলামী শিষ্টাচার শিক্ষা দিতে লাগলাম। ক্লাসরুম থেকে সুশৃঙ্খলভাবে বের হওয়া, আবার সুশৃঙ্খলভাবে ফিরে আসা, বিদ্যালয়ের আঙিনা, চলার পথ পরিচ্ছন্ন রাখা—ইত্যাদি বিষয়ে উৎসাহিত করতে থাকলাম।

অভিভাবকরা বিষয়গুলো অবগত হতে অনেক খুশি হলেন। অনেকে আপত্তিও করলেন। বিশেষ করে, ছোট ছোট মেয়েকে ওযু করিয়ে, নামায পড়িয়ে কী চাইছি আমি? তখন সেখানে নামাযের প্রচলন ছিল না তা নয়। তবে নামাযী ছিলেন শুধু বয়স্ক বুড়াবুড়ি। সেখানকার মানুষের ধারণা ছিল, নামায পড়া বয়স্কদের কাজ। তরুণদের নামায পড়া মানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় অপচয়, পেছনে ফিরে যাওয়া, প্রগতিকে ব্যাহত করা ইত্যাদি। আর আমার ওপর এটির মূল অপবাদই ছিল এটিই।

যাই হোক, আমি আমার ছাত্রীদের সামাজিক ইসলামী শিষ্টাচারের উদ্বুদ্ধ করতে লাগলাম। সালাম থেকে শুরু করে জাযাকাল্লাহু খাইরান বলা, মুসলিম বোনদের সাথে হাসিমুখে মিলিত হওয়া, সুন্দর ও শালীন ভাষায় কথা বলা ইত্যাদি।

প্রায় এক বছর অতিবাহিত হলো। আমার অনেক ছাত্রী, বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষিকা এবং অনেক অভিভাবিকা ‘ধর্মের ক্লাস’ এবং ‘ধর্মশিক্ষিকা’ দ্বারা প্রভাবিত হলেন। আমারও তামান্না ছিল, এ হৃদয়গুলো সত্যের আলো লাভ করুক। তাদের অতল গহ্বরে যে সত্য ঢেকে পড়ে থাকতে শুরু করেছে সে সত্য আবার উদ্ভাসিত হোক।

এক বছর অতিবাহিত হলো। আমি কিছু নামাযী নারী পেলাম, যারা ধর্মীয় শিষ্টাচার মেনে চলেন। বিষয়টি আর যাই হোক, এটা অবশ্যই প্রমাণ করে যে, সত্যের প্রতি প্রতিটি মানুষেরই টান বিদ্যমান; উপযুক্ত পরিবেশ পেলে অঙ্কুরিত হবে চারা, পরিচর্যা হলে উঠবে পত্রপল্লবিত, ফুলবতী, ফলবান।

আমি তখন পর্যন্ত পর্দা প্রথা তুলতে পারিনি। কেননা, পরিবেশ প্রতিকূল ছিল। তাদের কাছে পর্দাপ্রথা ছিল একদমই নতুন। এ বিষয়ে তাদের কোনো অবগতিই ছিল না। কিন্তু এক বছরের অবিরাম সাধনায় আল্লাহ কিছু হৃদয়কে আলোকিত করেছেন। তারা আর সত্যকে স্বীকার করতে কুণ্ঠিত নয়।

আমি একটু একটু করে পর্দার বিষয়েও বলতে লাগলাম। আমি আমার ছাত্রীদের বোঝাতে লাগলাম যে, পর্দা করা প্রত্যেক মুসলিম নারীর ওপর ফরজ।

কিন্তু নামাযের আহ্বানে যতটা সাড়া পেয়েছিলাম, পর্দার আহ্বানে ততটা সাড়া পাওয়া গেল না। কেননা, জিলবাব (পর্দার পোশাক) তাদের চোখে নতুন বা অদ্ভুত বিষয় ছিল। পারিবারিকভাবে আসত বাধা। সামাজিকভাবেও পড়তে হতো রোষানলে। আর ‘নারী স্বাধীনতার’ দোহাই দেওয়া কথা তো বলাই বাহুল্য। সর্বত্র চলছিল ধর্মীয় মূল্যবোধ, তাহজীব-তামাদ্দুন ছুঁড়ে ফেলার জোরদার প্রস্তুতি। এমনকি, পর্দা করা তো দূরে থাক মায়েরা ছাত্রীদের বোরকা পরতেও বারণ করতেন।

এক এক করে কয়েক বছর কেটে গেল। একটি দুটি করে অনেক মেয়ে পরিবারের বাধা, সমাজের উপহাস, সহপাঠিনীদের ঠাট্টা-বিদ্রূপ সত্ত্বেও পর্দার ফরজ বিধানকে মেনে নিল। কোনো একটি শ্রেণিতে একটি মেয়েকেও যখন জিলবাব পরতে দেখতাম, তখন আনন্দে মন ভরে যেত। আমার কাছে এটাকে মনে হতো বিরাট সফলতা। আল্লাহর শোকর, আজ সেখানে অনেক মানুষ তৈরি হয়েছেন যারা জানেন এবং বিশ্বাস করেন, পর্দা একটি ফরজ ইবাদত। প্রত্যেকটি প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে এই ইবাদত করতেই হবে।

বলতে পারেন, যারা শিক্ষিকা বা জাতীয় কোনো পেশায় নিয়োজিত, তাদের পক্ষে দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা করা সহজ। কিন্তু যারা কোনো কাজে নেই তাদের পক্ষে এসবের সুযোগ কোথায়? কিন্তু আমি বলব, মুসলিম নারীর পক্ষে দাওয়াতি কাজের কোনো সুযোগই হাতছাড়া করা উচিত নয়। কোনো কাজে না থাকলেও অপরাপর নারীর সাথে যোগাযোগের অসংখ্য সুযোগ আছে।

আমাদের দেশে তো বিভিন্ন সাপ্তাহিক মজলিস হয়। পাড়াপ্রতিবেশিনীরা, বান্ধবীরা সপ্তাহে অন্তত একদিন কোনো একজনের বাড়িতে জড়ো হয়। গল্পগুজব করে, আনন্দ-বিনোদন করে, এরপর যার যার বাসায় ফিরে যায়। তা হলে আধুনিকতার দোহাই দেওয়া এসব গল্পগুজব, আনন্দ-বিনোদন না করে আমরা কি সেখানে দ্বীনি আলোচনা করতে পারি না? কুরআন হাদীসের কথা বলতে পারি না? পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক বিভিন্ন সমস্যা ও অসঙ্গতিগুলোকে ধর্মীয় আঙ্গিকে পর্যালোচনা করতে পারি না?

মনে হতে হতে পারে, যেখানে যেটা চালু হয়ে গেছে, সেটাকে তুলে দেওয়া বা বদলানো কঠিন। কিন্তু এও সত্য যে, আপনি যদি সংকল্প করেন, তা হলে আল্লাহর সাহায্য অবশ্যই আপনাকে সঙ্গ দেবে।

একসময় আমি সৌদি আরব রিয়াদের একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতাম। প্রতি শনিবার শিক্ষিকাদের কক্ষে গেলেই ছুটির দিনে তাদের আহার-বিহার ও ঘোরাফেরার গল্পগুজব শুনতে পেতাম। ছুটির দিনে কে কার বাড়িতে গিয়েছিলেন, সেসব গল্প।

আমি জিজ্ঞেস করতাম, ছুটির দিনে বান্ধবীর বাড়িতে গিয়ে কীভাবে সময় কাটান? তারা বলতেন, 'খাই দাই, নাচি গাই, ফুর্তি করি।' আমি বলতাম, আচ্ছা, সারা সপ্তাহে মাত্র একটা দিন—মাত্র একটা দিন অন্তত—পুরো সময়টা পরিবারের সাথে কাটানো যায় না? আহার-বিহার, আনন্দ-বিনোদন যা করার স্বামী-সন্তান নিয়ে তো বেশি জমে। তারাই তো অধিক হকদার এই সময়টুকু আপনাকে কাছে পাবার।

তারা আমার কথার কোনো উত্তর দিতেন না। কেউ হেসে উড়িয়ে দিতেন। কেউ রাগও করতেন। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে, আল্লাহর শোকর, শিক্ষিকাদের কক্ষে ওসব অনর্থক গল্পগুজব আর শোনা যেত না।

আমি আমার নিজের জীবনের কথাগুলো বলছি গর্ব করার জন্য নয়; বরং এজন্য যে, এতে বাস্তবতা অনেক সহজ হয়ে দেখা দেয়—হাতে ধরার মতো, চোখে দেখার মতো মূর্ত সহজ হয়। আল্লাহই উত্তম তওফিকদাতা।

নিঃসন্দেহে দাওয়াতের কাজ বড় কঠিন। একজন বিজ্ঞ চিকিৎসক যেমন মানবদেহের রোগনির্ণয় ও আক্রান্ত স্থান নির্ধারণের পর ব্যবস্থাপত্র প্রদান করেন তেমনই একজন দাই ইলাল্লাহ। তিনিও একজন চিকিৎসক। তিনি চিকিৎসা করেন উম্মাহর হৃদয়-জগতের। সময় ও সমাজের প্রভাবে, অন্যদের অন্ধ অনুকরণে উম্মাহর অস্থিমজ্জায় যে ব্যাধি সৃষ্টি হয়, যে রোগজীবাণু ছড়িয়ে যায়, তারই চিকিৎসা করেন একজন দাই ইলাল্লাহ।

তবে দাওয়াতের ক্রিয়াশীলতার জন্য দাই এর প্রয়োজন বলিষ্ঠ যুক্তিশক্তির, সক্ষম বাগ্মিতার। প্রয়োজন আল্লাহর নূরের নূরানী একটি তাজা ও সাচ্চা দিলের। যার প্রতিটি বাণী উৎসারিত হয় হৃদয়ের গভীর থেকে। তাই স্থিত হয় হৃদয়েরই গভীরে। পূর্ণ বিশ্বাসের সাথে। পূর্ণ আস্থার সাথে। যেন মানুষ আশার আলো দেখে। আভাস পায় একটি সুন্দর জীবনের, একটি সুন্দর পৃথিবীর। রোগভয়, শোকাহত মানবহৃদয়ে দাইয়ের আহ্বান যেন রোগনিরাময়কারী এক ফোঁটা প্রতিষেধক হয়েই পতিত হয়। সে যেন প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে আল্লাহর স্মরণে।

দাওয়াতের জন্য সম্বোধন করতে হবে মানবহৃদয়কে। মানুষ ও মানবতার প্রতি হিতাকাঙ্ক্ষী নিয়ে। হৃদয়গ্রাহী ভাষায়। সুন্দর আচরণে, সুন্দর উচ্চারণে। সাথে থাকবে আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠতা। সম্বোধিতের প্রতি আন্তরিকতা ও কল্যাণকামিতা। যাতে সে সর্বোত্তমরূপে মনোযোগী হয় আপনার আহ্বানের প্রতি। তা হলেই সে প্রভাবিত হবে। আপনার প্রতিটি কথা তার অন্তরে বদ্ধমূল হবে।

মনে পড়ে, সত্তরের দশকের মাঝের দিকে যখন ইসলামী পুনর্জাগরণের শুভ সূচনা হয় তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মতত্ত্ব বিভাগের ছাত্রী। নতুন প্রজন্মের মেয়েদের ধর্মীয় অনুভূতিকে জাগিয়ে তুলতে মুসলিম দাইয়াহগণ তখন কী শ্রমই না দিয়েছিলেন! কী সাধনাই না করেছিলেন!

জীবন ও জগতের নিত্যনতুন বিষয়ে আলোচনায় অবতীর্ণ হতেন তাঁরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নারীদের সাথে আলোচনা করতেন। রাস্তায় দাঁড়িয়ে, ঘরে বসে, ক্লাসরুমে গিয়ে বিভিন্ন অবস্থায় তাদের সাথে কথা বলতেন। চলত অনবরত গ্রহণ ও প্রত্যাখ্যান, চিন্তার আদানপ্রদান ও আবেগ-অনুভূতির বিনিময়। এভাবে অনেকের হৃদয়ের বদ্ধ দুয়ার খুলে যেত। মনে উঁকি দিত অজস্র প্রশ্ন। যা জন্ম দিত এক অতন্ত্যগভীর চেতনাশক্তির।

পবিত্র নগরী বাইতুল মাকদিসের একটি বিদ্যালয়ে আমি শিক্ষিকা হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলাম। ওই সময় থেকেই আমি দাওয়াতের কাজকে নিজের ব্রত বানিয়ে নিই। শিক্ষাজীবনে বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখে আসা মুসলিম দাইয়াহদের দাওয়াতের রীতি-নীতি ছিল আমার পাথেয়।

আমি যেদিন প্রথমবারে মতো শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করলাম সেদিন অবাক না হয়ে পারলাম না। আমি আমার ছাত্রীদেরকে লক্ষ্য করে ইসলামের সম্বোধন বাক্য উচ্চারণ করলাম। বললাম, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। কিন্তু একি, সবাই নিশ্চুপ! একটি ছাত্রীও আমার সালামের উত্তর দিল না।

আরও আশ্চর্যের বিষয় এই যে, আমি লক্ষ করলাম, তাদের আচরণে আমি যতটা অবাক হয়েছি, আমার সালামে তারা তারচে বেশি হতবাক হয়েছে। জানতে চাইলাম, তারা এমন হতবাক হয়ে গেল কেন? কেন সালামের উত্তর দিল না কেন?

অবশেষে একজন জানতে চাইল, কী বলতে হবে? আমি বললাম, তোমরা বলো, ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ – এটা হলো দুনিয়া ও আখিরাতে ইসলাম ও মুসলমানদের পারস্পরিক সম্বোধন বাক্য।

এরপর আমি চক হাতে নিয়ে বোর্ডের দিকে অগ্রসর হলাম। আমি বোর্ডে একটি বাক্য লিখলাম,
ماذا يعني انتمائي للإسلام
ইসলামের সাথে আমার সম্পর্কের মর্ম কী?

আমি এক এক করে আমার প্রত্যেকটি ছাত্রীকে জিজ্ঞেস করলাম। খুব কম ছাত্রীই উত্তর দিতে পারল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তোমরা কি মুসলিম? তারা উত্তর দিল, হ্যাঁ। আমি জিজ্ঞেস করলাম, অন্যদের তুলনায় একটি মুসলিম মেয়ের ভিন্নতা কী, জানো? তারা উত্তর দিল, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ বলা। আমি বললাম, আর কিছু? তারা বলল, আর কিছু জানি না।

সেই মুহূর্তেই আমার সমগ্র সত্তা যেন হিম হয়ে গেল। আমি উপলব্ধি করলাম, এ এক লক্ষ্যহীন দিশেহারা প্রজন্ম; এরা আত্মপরিচয়হীন, আত্মোপলদ্ধিহীন। কেননা, এদের বাস এমন এক পরিবেশে যা ইসলাম থেকে দূরে, অনেক দূরে।

আমি ছিলাম ধর্মশিক্ষিকা। তাই অনেকটাই সহজ হলো। ছাত্রীদের ধর্মের তালীম দিতে লাগলাম। একদম গোড়া থেকে। ইসলামের রুকন থেকে শুরু করে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক সকল স্তরের আমলী তালীম। ওযু কীভাবে করতে হবে, নামায কীভাবে পড়তে হবে ইত্যাদি।

আমি ক্লাস শেষে তাদের সাথে নিয়ে প্রতিদিন যোহরের নামায আদায় করতাম। বিদ্যালয়সংলগ্ন একটি নামাযগাহ ছিল। যদিও ছাত্রীদের পর্যাপ্ত জ্ঞান অর্জনের জন্য অনেক সময়ের প্রয়োজন ছিল; কিন্তু আল্লাহর সাহায্য হলে সবই সহজে হয়ে যায়। ছাত্রীদের মধ্যে সাড়া জাগল। নতুন শিক্ষিকার বিষয়গুলো অবগত হতে নতুন নতুন কথাবার্তা তাদের আলোচনার বিষয়ে পরিণত হলো।

অল্প দিনের মধ্যেই পুরো বিদ্যালয়ে শুরু হলো শোরগোল। ধর্মের ক্লাস চলছে এবং কী হচ্ছে? ধর্মশিক্ষিকা ক্লাস করাবেন, বই পড়াবেন। ওযু করাতে, নামায পড়াতে কে বলেছে তাকে? এ তো বিদ্যালয়। একে ধর্মীয় কেন্দ্র বানানোর অধিকার তিনি কোত্থেকে পেলেন? এরকম আরও অনেক কথা। কিন্তু আমি পিছুপা হলাম না। দৃঢ়তার সাথে আমার কাজ চালিয়ে যেতে থাকলাম।

আমি আমার ছাত্রীদেরকে পথ চলার, কথা বলার ইসলামী শিষ্টাচার শিক্ষা দিতে লাগলাম। ক্লাসরুম থেকে সুশৃঙ্খলভাবে বের হওয়া, আবার সুশৃঙ্খলভাবে ফিরে আসা, বিদ্যালয়ের আঙিনা, চলার পথ পরিচ্ছন্ন রাখা—ইত্যাদি বিষয়ে উৎসাহিত করতে থাকলাম।

অভিভাবকরা বিষয়গুলো অবগত হতে অনেক খুশি হলেন। অনেকে আপত্তিও করলেন। বিশেষ করে, ছোট ছোট মেয়েকে ওযু করিয়ে, নামায পড়িয়ে কী চাইছি আমি? তখন সেখানে নামাযের প্রচলন ছিল না তা নয়। তবে নামাযী ছিলেন শুধু বয়স্ক বুড়াবুড়ি। সেখানকার মানুষের ধারণা ছিল, নামায পড়া বয়স্কদের কাজ। তরুণদের নামায পড়া মানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় অপচয়, পেছনে ফিরে যাওয়া, প্রগতিকে ব্যাহত করা ইত্যাদি। আর আমার ওপর এটির মূল অপবাদই ছিল এটিই।

যাই হোক, আমি আমার ছাত্রীদের সামাজিক ইসলামী শিষ্টাচারের উদ্বুদ্ধ করতে লাগলাম। সালাম থেকে শুরু করে জাযাকাল্লাহু খাইরান বলা, মুসলিম বোনদের সাথে হাসিমুখে মিলিত হওয়া, সুন্দর ও শালীন ভাষায় কথা বলা ইত্যাদি।

প্রায় এক বছর অতিবাহিত হলো। আমার অনেক ছাত্রী, বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষিকা এবং অনেক অভিভাবিকা ‘ধর্মের ক্লাস’ এবং ‘ধর্মশিক্ষিকা’ দ্বারা প্রভাবিত হলেন। আমারও তামান্না ছিল, এ হৃদয়গুলো সত্যের আলো লাভ করুক। তাদের অতল গহ্বরে যে সত্য ঢেকে পড়ে থাকতে শুরু করেছে সে সত্য আবার উদ্ভাসিত হোক।

এক বছর অতিবাহিত হলো। আমি কিছু নামাযী নারী পেলাম, যারা ধর্মীয় শিষ্টাচার মেনে চলেন। বিষয়টি আর যাই হোক, এটা অবশ্যই প্রমাণ করে যে, সত্যের প্রতি প্রতিটি মানুষেরই টান বিদ্যমান; উপযুক্ত পরিবেশ পেলে অঙ্কুরিত হবে চারা, পরিচর্যা হলে উঠবে পত্রপল্লবিত, ফুলবতী, ফলবান।

আমি তখন পর্যন্ত পর্দা প্রথা তুলতে পারিনি। কেননা, পরিবেশ প্রতিকূল ছিল। তাদের কাছে পর্দাপ্রথা ছিল একদমই নতুন। এ বিষয়ে তাদের কোনো অবগতিই ছিল না। কিন্তু এক বছরের অবিরাম সাধনায় আল্লাহ কিছু হৃদয়কে আলোকিত করেছেন। তারা আর সত্যকে স্বীকার করতে কুণ্ঠিত নয়।

আমি একটু একটু করে পর্দার বিষয়েও বলতে লাগলাম। আমি আমার ছাত্রীদের বোঝাতে লাগলাম যে, পর্দা করা প্রত্যেক মুসলিম নারীর ওপর ফরজ।

কিন্তু নামাযের আহ্বানে যতটা সাড়া পেয়েছিলাম, পর্দার আহ্বানে ততটা সাড়া পাওয়া গেল না। কেননা, জিলবাব (পর্দার পোশাক) তাদের চোখে নতুন বা অদ্ভুত বিষয় ছিল। পারিবারিকভাবে আসত বাধা। সামাজিকভাবেও পড়তে হতো রোষানলে। আর ‘নারী স্বাধীনতার’ দোহাই দেওয়া কথা তো বলাই বাহুল্য। সর্বত্র চলছিল ধর্মীয় মূল্যবোধ, তাহজীব-তামাদ্দুন ছুঁড়ে ফেলার জোরদার প্রস্তুতি। এমনকি, পর্দা করা তো দূরে থাক মায়েরা ছাত্রীদের বোরকা পরতেও বারণ করতেন।

এক এক করে কয়েক বছর কেটে গেল। একটি দুটি করে অনেক মেয়ে পরিবারের বাধা, সমাজের উপহাস, সহপাঠিনীদের ঠাট্টা-বিদ্রূপ সত্ত্বেও পর্দার ফরজ বিধানকে মেনে নিল। কোনো একটি শ্রেণিতে একটি মেয়েকেও যখন জিলবাব পরতে দেখতাম, তখন আনন্দে মন ভরে যেত। আমার কাছে এটাকে মনে হতো বিরাট সফলতা। আল্লাহর শোকর, আজ সেখানে অনেক মানুষ তৈরি হয়েছেন যারা জানেন এবং বিশ্বাস করেন, পর্দা একটি ফরজ ইবাদত। প্রত্যেকটি প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে এই ইবাদত করতেই হবে।

বলতে পারেন, যারা শিক্ষিকা বা জাতীয় কোনো পেশায় নিয়োজিত, তাদের পক্ষে দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা করা সহজ। কিন্তু যারা কোনো কাজে নেই তাদের পক্ষে এসবের সুযোগ কোথায়? কিন্তু আমি বলব, মুসলিম নারীর পক্ষে দাওয়াতি কাজের কোনো সুযোগই হাতছাড়া করা উচিত নয়। কোনো কাজে না থাকলেও অপরাপর নারীর সাথে যোগাযোগের অসংখ্য সুযোগ আছে।

আমাদের দেশে তো বিভিন্ন সাপ্তাহিক মজলিস হয়। পাড়াপ্রতিবেশিনীরা, বান্ধবীরা সপ্তাহে অন্তত একদিন কোনো একজনের বাড়িতে জড়ো হয়। গল্পগুজব করে, আনন্দ-বিনোদন করে, এরপর যার যার বাসায় ফিরে যায়। তা হলে আধুনিকতার দোহাই দেওয়া এসব গল্পগুজব, আনন্দ-বিনোদন না করে আমরা কি সেখানে দ্বীনি আলোচনা করতে পারি না? কুরআন হাদীসের কথা বলতে পারি না? পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক বিভিন্ন সমস্যা ও অসঙ্গতিগুলোকে ধর্মীয় আঙ্গিকে পর্যালোচনা করতে পারি না?

মনে হতে হতে পারে, যেখানে যেটা চালু হয়ে গেছে, সেটাকে তুলে দেওয়া বা বদলানো কঠিন। কিন্তু এও সত্য যে, আপনি যদি সংকল্প করেন, তা হলে আল্লাহর সাহায্য অবশ্যই আপনাকে সঙ্গ দেবে।

একসময় আমি সৌদি আরব রিয়াদের একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতাম। প্রতি শনিবার শিক্ষিকাদের কক্ষে গেলেই ছুটির দিনে তাদের আহার-বিহার ও ঘোরাফেরার গল্পগুজব শুনতে পেতাম। ছুটির দিনে কে কার বাড়িতে গিয়েছিলেন, সেসব গল্প।

আমি জিজ্ঞেস করতাম, ছুটির দিনে বান্ধবীর বাড়িতে গিয়ে কীভাবে সময় কাটান? তারা বলতেন, 'খাই দাই, নাচি গাই, ফুর্তি করি।' আমি বলতাম, আচ্ছা, সারা সপ্তাহে মাত্র একটা দিন—মাত্র একটা দিন অন্তত—পুরো সময়টা পরিবারের সাথে কাটানো যায় না? আহার-বিহার, আনন্দ-বিনোদন যা করার স্বামী-সন্তান নিয়ে তো বেশি জমে। তারাই তো অধিক হকদার এই সময়টুকু আপনাকে কাছে পাবার।

তারা আমার কথার কোনো উত্তর দিতেন না। কেউ হেসে উড়িয়ে দিতেন। কেউ রাগও করতেন। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে, আল্লাহর শোকর, শিক্ষিকাদের কক্ষে ওসব অনর্থক গল্পগুজব আর শোনা যেত না।

আমি আমার নিজের জীবনের কথাগুলো বলছি গর্ব করার জন্য নয়; বরং এজন্য যে, এতে বাস্তবতা অনেক সহজ হয়ে দেখা দেয়—হাতে ধরার মতো, চোখে দেখার মতো মূর্ত সহজ হয়। আল্লাহই উত্তম তওফিকদাতা।

নিঃসন্দেহে দাওয়াতের কাজ বড় কঠিন। একজন বিজ্ঞ চিকিৎসক যেমন মানবদেহের রোগনির্ণয় ও আক্রান্ত স্থান নির্ধারণের পর ব্যবস্থাপত্র প্রদান করেন তেমনই একজন দাই ইলাল্লাহ। তিনিও একজন চিকিৎসক। তিনি চিকিৎসা করেন উম্মাহর হৃদয়-জগতের। সময় ও সমাজের প্রভাবে, অন্যদের অন্ধ অনুকরণে উম্মাহর অস্থিমজ্জায় যে ব্যাধি সৃষ্টি হয়, যে রোগজীবাণু ছড়িয়ে যায়, তারই চিকিৎসা করেন একজন দাই ইলাল্লাহ।

তবে দাওয়াতের ক্রিয়াশীলতার জন্য দাই এর প্রয়োজন বলিষ্ঠ যুক্তিশক্তির, সক্ষম বাগ্মিতার। প্রয়োজন আল্লাহর নূরের নূরানী একটি তাজা ও সাচ্চা দিলের। যার প্রতিটি বাণী উৎসারিত হয় হৃদয়ের গভীর থেকে। তাই স্থিত হয় হৃদয়েরই গভীরে। পূর্ণ বিশ্বাসের সাথে। পূর্ণ আস্থার সাথে। যেন মানুষ আশার আলো দেখে। আভাস পায় একটি সুন্দর জীবনের, একটি সুন্দর পৃথিবীর। রোগভয়, শোকাহত মানবহৃদয়ে দাইয়ের আহ্বান যেন রোগনিরাময়কারী এক ফোঁটা প্রতিষেধক হয়েই পতিত হয়। সে যেন প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে আল্লাহর স্মরণে।

দাওয়াতের জন্য সম্বোধন করতে হবে মানবহৃদয়কে। মানুষ ও মানবতার প্রতি হিতাকাঙ্ক্ষী নিয়ে। হৃদয়গ্রাহী ভাষায়। সুন্দর আচরণে, সুন্দর উচ্চারণে। সাথে থাকবে আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠতা। সম্বোধিতের প্রতি আন্তরিকতা ও কল্যাণকামিতা। যাতে সে সর্বোত্তমরূপে মনোযোগী হয় আপনার আহ্বানের প্রতি। তা হলেই সে প্রভাবিত হবে। আপনার প্রতিটি কথা তার অন্তরে বদ্ধমূল হবে।

মনে পড়ে, সত্তরের দশকের মাঝের দিকে যখন ইসলামী পুনর্জাগরণের শুভ সূচনা হয় তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মতত্ত্ব বিভাগের ছাত্রী। নতুন প্রজন্মের মেয়েদের ধর্মীয় অনুভূতিকে জাগিয়ে তুলতে মুসলিম দাইয়াহগণ তখন কী শ্রমই না দিয়েছিলেন! কী সাধনাই না করেছিলেন!

জীবন ও জগতের নিত্যনতুন বিষয়ে আলোচনায় অবতীর্ণ হতেন তাঁরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নারীদের সাথে আলোচনা করতেন। রাস্তায় দাঁড়িয়ে, ঘরে বসে, ক্লাসরুমে গিয়ে বিভিন্ন অবস্থায় তাদের সাথে কথা বলতেন। চলত অনবরত গ্রহণ ও প্রত্যাখ্যান, চিন্তার আদানপ্রদান ও আবেগ-অনুভূতির বিনিময়। এভাবে অনেকের হৃদয়ের বদ্ধ দুয়ার খুলে যেত। মনে উঁকি দিত অজস্র প্রশ্ন। যা জন্ম দিত এক অতন্ত্যগভীর চেতনাশক্তির।

পবিত্র নগরী বাইতুল মাকদিসের একটি বিদ্যালয়ে আমি শিক্ষিকা হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলাম। ওই সময় থেকেই আমি দাওয়াতের কাজকে নিজের ব্রত বানিয়ে নিই। শিক্ষাজীবনে বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখে আসা মুসলিম দাইয়াহদের দাওয়াতের রীতি-নীতি ছিল আমার পাথেয়।

আমি যেদিন প্রথমবারে মতো শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করলাম সেদিন অবাক না হয়ে পারলাম না। আমি আমার ছাত্রীদেরকে লক্ষ্য করে ইসলামের সম্বোধন বাক্য উচ্চারণ করলাম। বললাম, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। কিন্তু একি, সবাই নিশ্চুপ! একটি ছাত্রীও আমার সালামের উত্তর দিল না।

আরও আশ্চর্যের বিষয় এই যে, আমি লক্ষ করলাম, তাদের আচরণে আমি যতটা অবাক হয়েছি, আমার সালামে তারা তারচে বেশি হতবাক হয়েছে। জানতে চাইলাম, তারা এমন হতবাক হয়ে গেল কেন? কেন সালামের উত্তর দিল না কেন?

অবশেষে একজন জানতে চাইল, কী বলতে হবে? আমি বললাম, তোমরা বলো, ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ – এটা হলো দুনিয়া ও আখিরাতে ইসলাম ও মুসলমানদের পারস্পরিক সম্বোধন বাক্য।

এরপর আমি চক হাতে নিয়ে বোর্ডের দিকে অগ্রসর হলাম। আমি বোর্ডে একটি বাক্য লিখলাম,
ماذا يعني انتمائي للإسلام
ইসলামের সাথে আমার সম্পর্কের মর্ম কী?

আমি এক এক করে আমার প্রত্যেকটি ছাত্রীকে জিজ্ঞেস করলাম। খুব কম ছাত্রীই উত্তর দিতে পারল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তোমরা কি মুসলিম? তারা উত্তর দিল, হ্যাঁ। আমি জিজ্ঞেস করলাম, অন্যদের তুলনায় একটি মুসলিম মেয়ের ভিন্নতা কী, জানো? তারা উত্তর দিল, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ বলা। আমি বললাম, আর কিছু? তারা বলল, আর কিছু জানি না।

সেই মুহূর্তেই আমার সমগ্র সত্তা যেন হিম হয়ে গেল। আমি উপলব্ধি করলাম, এ এক লক্ষ্যহীন দিশেহারা প্রজন্ম; এরা আত্মপরিচয়হীন, আত্মোপলদ্ধিহীন। কেননা, এদের বাস এমন এক পরিবেশে যা ইসলাম থেকে দূরে, অনেক দূরে।

আমি ছিলাম ধর্মশিক্ষিকা। তাই অনেকটাই সহজ হলো। ছাত্রীদের ধর্মের তালীম দিতে লাগলাম। একদম গোড়া থেকে। ইসলামের রুকন থেকে শুরু করে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক সকল স্তরের আমলী তালীম। ওযু কীভাবে করতে হবে, নামায কীভাবে পড়তে হবে ইত্যাদি।

আমি ক্লাস শেষে তাদের সাথে নিয়ে প্রতিদিন যোহরের নামায আদায় করতাম। বিদ্যালয়সংলগ্ন একটি নামাযগাহ ছিল। যদিও ছাত্রীদের পর্যাপ্ত জ্ঞান অর্জনের জন্য অনেক সময়ের প্রয়োজন ছিল; কিন্তু আল্লাহর সাহায্য হলে সবই সহজে হয়ে যায়। ছাত্রীদের মধ্যে সাড়া জাগল। নতুন শিক্ষিকার বিষয়গুলো অবগত হতে নতুন নতুন কথাবার্তা তাদের আলোচনার বিষয়ে পরিণত হলো।

অল্প দিনের মধ্যেই পুরো বিদ্যালয়ে শুরু হলো শোরগোল। ধর্মের ক্লাস চলছে এবং কী হচ্ছে? ধর্মশিক্ষিকা ক্লাস করাবেন, বই পড়াবেন। ওযু করাতে, নামায পড়াতে কে বলেছে তাকে? এ তো বিদ্যালয়। একে ধর্মীয় কেন্দ্র বানানোর অধিকার তিনি কোত্থেকে পেলেন? এরকম আরও অনেক কথা। কিন্তু আমি পিছুপা হলাম না। দৃঢ়তার সাথে আমার কাজ চালিয়ে যেতে থাকলাম।

আমি আমার ছাত্রীদেরকে পথ চলার, কথা বলার ইসলামী শিষ্টাচার শিক্ষা দিতে লাগলাম। ক্লাসরুম থেকে সুশৃঙ্খলভাবে বের হওয়া, আবার সুশৃঙ্খলভাবে ফিরে আসা, বিদ্যালয়ের আঙিনা, চলার পথ পরিচ্ছন্ন রাখা—ইত্যাদি বিষয়ে উৎসাহিত করতে থাকলাম।

অভিভাবকরা বিষয়গুলো অবগত হতে অনেক খুশি হলেন। অনেকে আপত্তিও করলেন। বিশেষ করে, ছোট ছোট মেয়েকে ওযু করিয়ে, নামায পড়িয়ে কী চাইছি আমি? তখন সেখানে নামাযের প্রচলন ছিল না তা নয়। তবে নামাযী ছিলেন শুধু বয়স্ক বুড়াবুড়ি। সেখানকার মানুষের ধারণা ছিল, নামায পড়া বয়স্কদের কাজ। তরুণদের নামায পড়া মানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় অপচয়, পেছনে ফিরে যাওয়া, প্রগতিকে ব্যাহত করা ইত্যাদি। আর আমার ওপর এটির মূল অপবাদই ছিল এটিই।

যাই হোক, আমি আমার ছাত্রীদের সামাজিক ইসলামী শিষ্টাচারের উদ্বুদ্ধ করতে লাগলাম। সালাম থেকে শুরু করে জাযাকাল্লাহু খাইরান বলা, মুসলিম বোনদের সাথে হাসিমুখে মিলিত হওয়া, সুন্দর ও শালীন ভাষায় কথা বলা ইত্যাদি।

প্রায় এক বছর অতিবাহিত হলো। আমার অনেক ছাত্রী, বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষিকা এবং অনেক অভিভাবিকা ‘ধর্মের ক্লাস’ এবং ‘ধর্মশিক্ষিকা’ দ্বারা প্রভাবিত হলেন। আমারও তামান্না ছিল, এ হৃদয়গুলো সত্যের আলো লাভ করুক। তাদের অতল গহ্বরে যে সত্য ঢেকে পড়ে থাকতে শুরু করেছে সে সত্য আবার উদ্ভাসিত হোক।

এক বছর অতিবাহিত হলো। আমি কিছু নামাযী নারী পেলাম, যারা ধর্মীয় শিষ্টাচার মেনে চলেন। বিষয়টি আর যাই হোক, এটা অবশ্যই প্রমাণ করে যে, সত্যের প্রতি প্রতিটি মানুষেরই টান বিদ্যমান; উপযুক্ত পরিবেশ পেলে অঙ্কুরিত হবে চারা, পরিচর্যা হলে উঠবে পত্রপল্লবিত, ফুলবতী, ফলবান।

আমি তখন পর্যন্ত পর্দা প্রথা তুলতে পারিনি। কেননা, পরিবেশ প্রতিকূল ছিল। তাদের কাছে পর্দাপ্রথা ছিল একদমই নতুন। এ বিষয়ে তাদের কোনো অবগতিই ছিল না। কিন্তু এক বছরের অবিরাম সাধনায় আল্লাহ কিছু হৃদয়কে আলোকিত করেছেন। তারা আর সত্যকে স্বীকার করতে কুণ্ঠিত নয়।

আমি একটু একটু করে পর্দার বিষয়েও বলতে লাগলাম। আমি আমার ছাত্রীদের বোঝাতে লাগলাম যে, পর্দা করা প্রত্যেক মুসলিম নারীর ওপর ফরজ।

কিন্তু নামাযের আহ্বানে যতটা সাড়া পেয়েছিলাম, পর্দার আহ্বানে ততটা সাড়া পাওয়া গেল না। কেননা, জিলবাব (পর্দার পোশাক) তাদের চোখে নতুন বা অদ্ভুত বিষয় ছিল। পারিবারিকভাবে আসত বাধা। সামাজিকভাবেও পড়তে হতো রোষানলে। আর ‘নারী স্বাধীনতার’ দোহাই দেওয়া কথা তো বলাই বাহুল্য। সর্বত্র চলছিল ধর্মীয় মূল্যবোধ, তাহজীব-তামাদ্দুন ছুঁড়ে ফেলার জোরদার প্রস্তুতি। এমনকি, পর্দা করা তো দূরে থাক মায়েরা ছাত্রীদের বোরকা পরতেও বারণ করতেন।

এক এক করে কয়েক বছর কেটে গেল। একটি দুটি করে অনেক মেয়ে পরিবারের বাধা, সমাজের উপহাস, সহপাঠিনীদের ঠাট্টা-বিদ্রূপ সত্ত্বেও পর্দার ফরজ বিধানকে মেনে নিল। কোনো একটি শ্রেণিতে একটি মেয়েকেও যখন জিলবাব পরতে দেখতাম, তখন আনন্দে মন ভরে যেত। আমার কাছে এটাকে মনে হতো বিরাট সফলতা। আল্লাহর শোকর, আজ সেখানে অনেক মানুষ তৈরি হয়েছেন যারা জানেন এবং বিশ্বাস করেন, পর্দা একটি ফরজ ইবাদত। প্রত্যেকটি প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে এই ইবাদত করতেই হবে।

বলতে পারেন, যারা শিক্ষিকা বা জাতীয় কোনো পেশায় নিয়োজিত, তাদের পক্ষে দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা করা সহজ। কিন্তু যারা কোনো কাজে নেই তাদের পক্ষে এসবের সুযোগ কোথায়? কিন্তু আমি বলব, মুসলিম নারীর পক্ষে দাওয়াতি কাজের কোনো সুযোগই হাতছাড়া করা উচিত নয়। কোনো কাজে না থাকলেও অপরাপর নারীর সাথে যোগাযোগের অসংখ্য সুযোগ আছে।

আমাদের দেশে তো বিভিন্ন সাপ্তাহিক মজলিস হয়। পাড়াপ্রতিবেশিনীরা, বান্ধবীরা সপ্তাহে অন্তত একদিন কোনো একজনের বাড়িতে জড়ো হয়। গল্পগুজব করে, আনন্দ-বিনোদন করে, এরপর যার যার বাসায় ফিরে যায়। তা হলে আধুনিকতার দোহাই দেওয়া এসব গল্পগুজব, আনন্দ-বিনোদন না করে আমরা কি সেখানে দ্বীনি আলোচনা করতে পারি না? কুরআন হাদীসের কথা বলতে পারি না? পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক বিভিন্ন সমস্যা ও অসঙ্গতিগুলোকে ধর্মীয় আঙ্গিকে পর্যালোচনা করতে পারি না?

মনে হতে হতে পারে, যেখানে যেটা চালু হয়ে গেছে, সেটাকে তুলে দেওয়া বা বদলানো কঠিন। কিন্তু এও সত্য যে, আপনি যদি সংকল্প করেন, তা হলে আল্লাহর সাহায্য অবশ্যই আপনাকে সঙ্গ দেবে।

একসময় আমি সৌদি আরব রিয়াদের একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতাম। প্রতি শনিবার শিক্ষিকাদের কক্ষে গেলেই ছুটির দিনে তাদের আহার-বিহার ও ঘোরাফেরার গল্পগুজব শুনতে পেতাম। ছুটির দিনে কে কার বাড়িতে গিয়েছিলেন, সেসব গল্প।

আমি জিজ্ঞেস করতাম, ছুটির দিনে বান্ধবীর বাড়িতে গিয়ে কীভাবে সময় কাটান? তারা বলতেন, 'খাই দাই, নাচি গাই, ফুর্তি করি।' আমি বলতাম, আচ্ছা, সারা সপ্তাহে মাত্র একটা দিন—মাত্র একটা দিন অন্তত—পুরো সময়টা পরিবারের সাথে কাটানো যায় না? আহার-বিহার, আনন্দ-বিনোদন যা করার স্বামী-সন্তান নিয়ে তো বেশি জমে। তারাই তো অধিক হকদার এই সময়টুকু আপনাকে কাছে পাবার।

তারা আমার কথার কোনো উত্তর দিতেন না। কেউ হেসে উড়িয়ে দিতেন। কেউ রাগও করতেন। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে, আল্লাহর শোকর, শিক্ষিকাদের কক্ষে ওসব অনর্থক গল্পগুজব আর শোনা যেত না।

আমি আমার নিজের জীবনের কথাগুলো বলছি গর্ব করার জন্য নয়; বরং এজন্য যে, এতে বাস্তবতা অনেক সহজ হয়ে দেখা দেয়—হাতে ধরার মতো, চোখে দেখার মতো মূর্ত সহজ হয়। আল্লাহই উত্তম তওফিকদাতা।

📘 ফিরে এসো নীড়ে 📄 ৬. প্রজ্ঞা এবং উত্তম উপদেশ

📄 ৬. প্রজ্ঞা এবং উত্তম উপদেশ


মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন,
ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنْ ضَلَّ عَنْ سَبِيلِهِ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ
অর্থ : তুমি তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান করো প্রজ্ঞার সাথে, উত্তম উপদেশে। তুমি বিতর্ক করো তাদের সাথে সুন্দরতম পদ্ধতিতে। নিশ্চয় তোমার প্রতিপালকই অধিক অবগত পথভ্রষ্টদের সম্পর্কে। তিনিই অধিক অবগত হেদায়েতপ্রাপ্তদের সম্পর্কে। —সূরা নাহল : ১২৫

সুতরাং যিনি আল্লাহর পথের দাই হবেন, তার অন্তর হতে হবে প্রশান্ত, চিন্তা-চেতনা হতে হবে মহৎ। তার আচরণ হবে দয়া ও করুণাপূর্ণ, ক্ষমা ও মার্জনাভিত্তিক। তা হলেই মানুষের অন্তরে জায়গা করে নেওয়া সহজসাধ্য। তখনই মানুষ তার দ্বারা প্রভাবিত হবে। সাদরে বরণ করে নেবে তার উপদেশ।

কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, প্রত্যেকেরই মন যোগাতে হবে বা প্রত্যেকেই তার কথা গভীর আগ্রহে গ্রহণ করে নেবে। কেননা, কারও কথা গ্রহণ করা না-করার ব্যাপারে মানুষের রুচি প্রকৃতি ভিন্ন ভিন্ন। সুতরাং যদি কেউ সাড়া না দেয়, বা কেউ প্রত্যাখ্যান করে, তা হলে হতাশ হওয়া বা রাগান্বিত হওয়ার কিছু নেই। বরং ব্যক্তিগত মাহাত্ম্য নিয়ে দাওয়াতের কাজ চালিয়ে যেতে হবে। সর্বোচ্চ চেষ্টা ব্যয় করতে হবে মানুষের কল্যাণসাধনে।

দাই হবেন কল্যাণের ধারার মতো। যেদিক দিয়ে অগ্রসর হবেন, সকলকে সিঞ্চিত করবেন কল্যাণে। সুউচ্চ মনোবল নিয়ে এগিয়ে যাবেন সম্মুখ পানে। বিরামবিহীনভাবে। ক্লান্তিহীনভাবে। ক্ষুদ্রতার ঊর্ধ্বে থেকে। কঠোরতা বা বাড়াবাড়ি ছাড়া। কেননা, যিনি মানুষকে চারপাশে সমবেত করতে চান, তাকে অবশ্যই হতে হবে বিনিত উটনীর মতো। হাজার উপেক্ষা, হাজার অত্যাচার বরণ করে নেবেন অম্লান বদনে।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের জন্য রেখে গেছেন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি ছিলেন বিনয়ী, সদাচারী। প্রতিকূলতায় সাহাবা কেরাম যখন উৎকন্ঠিত বা হতবিহ্বল, কিংবা উত্তেজিত হয়ে উঠতে চাইতেন, তখন তাঁর অমীয় বাণী তাদের উৎকণ্ঠা দূর করত, তাদের শান্ত করত। তিনি তাদের বিপদাপদ ও প্রতিকূলতার মুখে অবিচল থাকার শিক্ষা দিতেন। তিনি তাদের এই শিক্ষাই দিতেন যে, ধৈর্য ও সহনশীলতার দ্বারাই মানুষের হৃদয় জয় করা যায়। দাইর সফলতাও এখানেই নিহিত।

দেখুন না, মহান আল্লাহ হযরত মূসা ও হারুন আ. কে নির্দেশ দিলেন ফেরাঊনকে দাওয়াত দিতে। ফেরাঊন ছিলেন কওমের নেতা। বরং বিরাট সাম্রাজ্যের অধিপতি। আল্লাহ তাদের কীভাবে দাওয়াত দিতে বললেন, তা নিজেই পড়ে নিন পবিত্র কুরআন থেকে,
اذْهَبَا إِلَى فِرْعَوْنَ إِنَّهُ طَغَى فَفُولَا لَهُ قَوْلًا لَّيْنًا لَّعَلَّهُ يَتَذَكَّرُ أَوْ يَخْشَى قَالَا رَبَّنَا إِنَّنَا نَخَافُ أَنْ يَفْرُطَ عَلَيْنَا أَوْ أَنْ يَطْغَى قَالَ لَا تَخَفْ مَا سَمِعْتُمَا أَسْمَعُ وَأَرَى
অর্থ : তোমরা ফেরাঊনের কাছে যাও। নিশ্চয় সে সীমালঙ্ঘন করেছে। তোমরা তাকে বলো কোমল কথা, হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে কিংবা ভীত হবে। তারা দুজন বলল, হে আল্লাহ, আমাদের ভয় হয় যে, সে আমাদের সাথে স্বেচ্ছাচরিতা বা সীমালঙ্ঘন করবে। আল্লাহ বললেন, তোমরা ভয় পেও না। আমি তোমাদের সাথে আছি। আমি শুনব, দেখব। —সূরা ত্বাহা : ৪৩-৪৬

আল্লাহ মহিমান্বিত দুই নবীকে নির্দেশ দিলেন যেন তারা ফেরাঊনকে দাওয়াত দেন, এবং আল্লাহর একত্বের আহ্বান জানান। সাথে সাথে আল্লাহ তাদের এও নির্দেশ দিলেন যে, তাদের দাওয়াতের শৈলী হতে হবে সরল ও কোমল, যথাযথ সম্মানপ্রদর্শনপূর্বক ও যথাযোগ্য মূল্যায়নের ভিত্তিতে।

আলোচ্য বিষয় থেকে আরও একটি বিষয় বুঝে আসা উচিত যে, প্রতিটি মানুষকেই তার রুচি ও প্রকৃতি বুঝে দাওয়াত দিতে হবে। প্রতিটি মানুষের মৌলিকত্বের প্রতি পোষণ করতে হবে সুধারণা। সুতরাং আমরা ধনী-গরীব, আমীর-ফকীর, ছোটো-বড়, সবল-দুর্বল সবাইকেই দাওয়াত দেব। আমরা বিশ্বাস করি, এভাবে আমরা যদি এক হয়ে যেতে পারি, একে অপরের সহযোগী হতে পারি, তা হলে আমরা অকল্যাণ রোধ করতে পারব সার্বিকভাবে, বাতিলদের মোকাবিলা করতে পারব সক্ষমভাবে। তখনই আল্লাহ তাঁর দ্বীনকে সাহায্য করবেন। পৃথিবীর আকাশে পতপত করে উড়বে ইসলামের পতাকা।

প্রিয় বোন,
দাওয়াতের শৈলীতে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করুন। নতুন নতুন পদ্ধতি অবলম্বন করুন। নতুনত্ব একঘেয়েমি ও অবসাদ দূর করে। হযরত নূহ আ. এর জাবানি পবিত্র কুরআনে আমরা এই শিক্ষা পাই,
قَالَ رَبِّ إِنِّي دَعَوْتُ قَوْমী لَيْلًا وَنَهَارًا ثُمَّ إِنِّي كُلَّمَا دَعَوْتُهُمْ لِتَغْفِرَ لَهُمْ جَعَلُوا أَصَابِعَهُمْ فِى آذَانِهِمْ وَاسْتَغْشَوْا ثِيَابَهُمْ وَأَصَرُّوا وَاسْتَكْبَرُوا اسْتِكْبَارًا ثُمَّ إِنِّي أَعْلَنْتُ لَهُمْ وَأَسْرَرْتُ لَهُمْ إِسْرَارًا فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا
অর্থ : নূহ বললেন, হে আমার প্রতিপালক, আমি আমার কওমকে রাত দিন দাওয়াত দিয়েছি। কিন্তু আমার আহ্বান তাদের পলায়নপরতাই বাড়িয়ে দিয়েছে। আমি যখনই তাদের আহ্বান করেছি, যেন তুমি তাদের ক্ষমা কর, তখনই তারা কানে আঙুল দিয়েছে এবং কাপড় দিয়ে আত্মগোপন করেছে। তারা বাড়াবাড়ি করেছে এবং অতিরিক্ত অহংকার প্রদর্শন করেছে। আমি তাদের দাওয়াত দিয়েছি উচ্চস্বরে। আমি তাদের দাওয়াত দিয়েছি প্রকাশ্যে। আমি তাদের দাওয়াত দিয়েছি গোপনে। আমি তাদের বলেছি, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ইস্তিগফার করো। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল। —সূরা নূহ : ০৫-১০

অনেক সময় দাওয়াত দিতে হয় একজন একজন করে, আলাদা আলাদাভাবে। প্রত্যেকের প্রতিই আরোপ করতে হয় আলাদা গুরুত্ব। আবার অনেক সময় দাওয়াত দেওয়া হয় একই জায়গায় একই সাথে অনেক মানুষের সমাগমে। এগুলো মূলত নির্ভর করে মানুষের জীবনপ্রণালি, রুচি-প্রকৃতি ও স্বভাববৈশিষ্ট্যের ওপর। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে দাওয়াতী কাজ গোপনে করাই শ্রেয়। কেননা, ধর্মীয় বিপ্লবের আশঙ্কায় যে কোনো দ্বীনি কাজকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করার সমরণীতি প্রচলিত হয়ে থাকে সর্বত্র।

সভা-সেমিনার এবং বিভিন্ন কর্মানুষ্ঠানে বলিষ্ঠ যুক্তিপ্রমাণ উপস্থাপনের মাধ্যমে দাওয়াতী কাজ করুন। আয়োজন করুন নারীদের জন্য ধর্মীয় আলোচনা ও মতবিনিময়সভার। এভাবে ইসলামী জীবনদর্শনকে ব্যাপক পরিসরে এমনভাবে উপস্থাপন করুন যাতে মানুষ জীবনের সর্বক্ষেত্রে আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাহকেই শ্রেষ্ঠ পথনির্দেশ হিসেবে গ্রহণ করার অনিবার্যতা স্বীকার করে। লেখালিখিও অতি উত্তম উপায়। বিশেষত সমসাময়িক বিষয়ে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে আলোকপাত হওয়া খুবই জরুরি। কোনটি কতটুকু ধর্মানুসারে; কোনটি ধর্ম থেকে কত দূরে –এগুলো আলোচনায় আসা চাই।

দাওয়াতীকে অবশ্যই চারপাশের নারীদের ঝোঁক ও প্রবণতা এবং যোগ্যতা ও সামর্থ্য সম্পর্কে জানতে হবে। কার মধ্যে কী প্রতিভা আছে, কে কীভাবে দাওয়াতী কাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, সে বিষয়ে লক্ষ রাখতে হবে। অনেক নারী লেখালিখিতে পারদর্শী হন। অনেকে মুনশিয়ানা বিতর্কে বা উপদেশে। অনেককে দাওয়াতও দিতে পারেন মৌনভাবে। দাইয়াতকে সবকিছু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। যদি কখনো এমন হৃদয় পেয়ে যান, যা ধর্মের প্রতি অনুরাগী, দাওয়াতের প্রতি অনুরাগী, তা হলে তাতে সাহস ও প্রণোদনা যোগান। প্রায়ই এমন হয় যে, হৃদয়ে ধর্মীয় আবেগ চাপা পড়ে থাকে পার্থিব ধ্যানধারণার নিচে। অবস্থা এমন—যদি কেউ একটু ফুঁক দেয় তা হলেই জ্বলে উঠবে, জেগে উঠবে; আলো ছড়ায় অনির্বাণ শিখা হয়ে, প্রদীপ্ত প্রদীপ হয়ে।

প্রিয় বোন, যদি কখনো এরকম একটি হৃদয়ও পেয়ে যান, তা হলে এ হৃদয়টিকে জাগাতে ব্রতী হোন। একে তুচ্ছ মনে করবেন না। এটিই হতে পারে আপনার জীবনের মহত্তম কীর্তি। হয়তো আপনার উসিলায় একজন নারী সর্বান্তকরণে মনোনিবেশ করবে ধর্মের প্রতি, দাওয়াত ও তাবলীগের প্রতি। হতে পারে, তারই সার্থক নেতৃত্বে একদিন পরিচালিত হবে মুসলিম নারীসমাজ; স্বাদ পাবে ইসলামের, ঈমানের।

মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন,
ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنْ ضَلَّ عَنْ سَبِيلِهِ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ
অর্থ : তুমি তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান করো প্রজ্ঞার সাথে, উত্তম উপদেশে। তুমি বিতর্ক করো তাদের সাথে সুন্দরতম পদ্ধতিতে। নিশ্চয় তোমার প্রতিপালকই অধিক অবগত পথভ্রষ্টদের সম্পর্কে। তিনিই অধিক অবগত হেদায়েতপ্রাপ্তদের সম্পর্কে। —সূরা নাহল : ১২৫

সুতরাং যিনি আল্লাহর পথের দাই হবেন, তার অন্তর হতে হবে প্রশান্ত, চিন্তা-চেতনা হতে হবে মহৎ। তার আচরণ হবে দয়া ও করুণাপূর্ণ, ক্ষমা ও মার্জনাভিত্তিক। তা হলেই মানুষের অন্তরে জায়গা করে নেওয়া সহজসাধ্য। তখনই মানুষ তার দ্বারা প্রভাবিত হবে। সাদরে বরণ করে নেবে তার উপদেশ।

কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, প্রত্যেকেরই মন যোগাতে হবে বা প্রত্যেকেই তার কথা গভীর আগ্রহে গ্রহণ করে নেবে। কেননা, কারও কথা গ্রহণ করা না-করার ব্যাপারে মানুষের রুচি প্রকৃতি ভিন্ন ভিন্ন। সুতরাং যদি কেউ সাড়া না দেয়, বা কেউ প্রত্যাখ্যান করে, তা হলে হতাশ হওয়া বা রাগান্বিত হওয়ার কিছু নেই। বরং ব্যক্তিগত মাহাত্ম্য নিয়ে দাওয়াতের কাজ চালিয়ে যেতে হবে। সর্বোচ্চ চেষ্টা ব্যয় করতে হবে মানুষের কল্যাণসাধনে।

দাই হবেন কল্যাণের ধারার মতো। যেদিক দিয়ে অগ্রসর হবেন, সকলকে সিঞ্চিত করবেন কল্যাণে। সুউচ্চ মনোবল নিয়ে এগিয়ে যাবেন সম্মুখ পানে। বিরামবিহীনভাবে। ক্লান্তিহীনভাবে। ক্ষুদ্রতার ঊর্ধ্বে থেকে। কঠোরতা বা বাড়াবাড়ি ছাড়া। কেননা, যিনি মানুষকে চারপাশে সমবেত করতে চান, তাকে অবশ্যই হতে হবে বিনিত উটনীর মতো। হাজার উপেক্ষা, হাজার অত্যাচার বরণ করে নেবেন অম্লান বদনে।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের জন্য রেখে গেছেন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি ছিলেন বিনয়ী, সদাচারী। প্রতিকূলতায় সাহাবা কেরাম যখন উৎকন্ঠিত বা হতবিহ্বল, কিংবা উত্তেজিত হয়ে উঠতে চাইতেন, তখন তাঁর অমীয় বাণী তাদের উৎকণ্ঠা দূর করত, তাদের শান্ত করত। তিনি তাদের বিপদাপদ ও প্রতিকূলতার মুখে অবিচল থাকার শিক্ষা দিতেন। তিনি তাদের এই শিক্ষাই দিতেন যে, ধৈর্য ও সহনশীলতার দ্বারাই মানুষের হৃদয় জয় করা যায়। দাইর সফলতাও এখানেই নিহিত।

দেখুন না, মহান আল্লাহ হযরত মূসা ও হারুন আ. কে নির্দেশ দিলেন ফেরাঊনকে দাওয়াত দিতে। ফেরাঊন ছিলেন কওমের নেতা। বরং বিরাট সাম্রাজ্যের অধিপতি। আল্লাহ তাদের কীভাবে দাওয়াত দিতে বললেন, তা নিজেই পড়ে নিন পবিত্র কুরআন থেকে,
اذْهَبَا إِلَى فِرْعَوْنَ إِنَّهُ طَغَى فَفُولَا لَهُ قَوْلًا لَّيْنًا لَّعَلَّهُ يَتَذَكَّرُ أَوْ يَخْشَى قَالَا رَبَّنَا إِنَّنَا نَخَافُ أَنْ يَفْرُطَ عَلَيْنَا أَوْ أَنْ يَطْغَى قَالَ لَا تَخَفْ مَا سَمِعْتُمَا أَسْمَعُ وَأَرَى
অর্থ : তোমরা ফেরাঊনের কাছে যাও। নিশ্চয় সে সীমালঙ্ঘন করেছে। তোমরা তাকে বলো কোমল কথা, হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে কিংবা ভীত হবে। তারা দুজন বলল, হে আল্লাহ, আমাদের ভয় হয় যে, সে আমাদের সাথে স্বেচ্ছাচরিতা বা সীমালঙ্ঘন করবে। আল্লাহ বললেন, তোমরা ভয় পেও না। আমি তোমাদের সাথে আছি। আমি শুনব, দেখব। —সূরা ত্বাহা : ৪৩-৪৬

আল্লাহ মহিমান্বিত দুই নবীকে নির্দেশ দিলেন যেন তারা ফেরাঊনকে দাওয়াত দেন, এবং আল্লাহর একত্বের আহ্বান জানান। সাথে সাথে আল্লাহ তাদের এও নির্দেশ দিলেন যে, তাদের দাওয়াতের শৈলী হতে হবে সরল ও কোমল, যথাযথ সম্মানপ্রদর্শনপূর্বক ও যথাযোগ্য মূল্যায়নের ভিত্তিতে।

আলোচ্য বিষয় থেকে আরও একটি বিষয় বুঝে আসা উচিত যে, প্রতিটি মানুষকেই তার রুচি ও প্রকৃতি বুঝে দাওয়াত দিতে হবে। প্রতিটি মানুষের মৌলিকত্বের প্রতি পোষণ করতে হবে সুধারণা। সুতরাং আমরা ধনী-গরীব, আমীর-ফকীর, ছোটো-বড়, সবল-দুর্বল সবাইকেই দাওয়াত দেব। আমরা বিশ্বাস করি, এভাবে আমরা যদি এক হয়ে যেতে পারি, একে অপরের সহযোগী হতে পারি, তা হলে আমরা অকল্যাণ রোধ করতে পারব সার্বিকভাবে, বাতিলদের মোকাবিলা করতে পারব সক্ষমভাবে। তখনই আল্লাহ তাঁর দ্বীনকে সাহায্য করবেন। পৃথিবীর আকাশে পতপত করে উড়বে ইসলামের পতাকা।

প্রিয় বোন,
দাওয়াতের শৈলীতে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করুন। নতুন নতুন পদ্ধতি অবলম্বন করুন। নতুনত্ব একঘেয়েমি ও অবসাদ দূর করে। হযরত নূহ আ. এর জাবানি পবিত্র কুরআনে আমরা এই শিক্ষা পাই,
قَالَ رَبِّ إِنِّي دَعَوْتُ قَوْমী لَيْلًا وَنَهَارًا ثُمَّ إِنِّي كُلَّمَا دَعَوْتُهُمْ لِتَغْفِرَ لَهُمْ جَعَلُوا أَصَابِعَهُمْ فِى آذَانِهِمْ وَاسْتَغْشَوْا ثِيَابَهُمْ وَأَصَرُّوا وَاسْتَكْبَرُوا اسْتِكْبَارًا ثُمَّ إِنِّي أَعْلَنْتُ لَهُمْ وَأَسْرَرْتُ لَهُمْ إِسْرَارًا فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا
অর্থ : নূহ বললেন, হে আমার প্রতিপালক, আমি আমার কওমকে রাত দিন দাওয়াত দিয়েছি। কিন্তু আমার আহ্বান তাদের পলায়নপরতাই বাড়িয়ে দিয়েছে। আমি যখনই তাদের আহ্বান করেছি, যেন তুমি তাদের ক্ষমা কর, তখনই তারা কানে আঙুল দিয়েছে এবং কাপড় দিয়ে আত্মগোপন করেছে। তারা বাড়াবাড়ি করেছে এবং অতিরিক্ত অহংকার প্রদর্শন করেছে। আমি তাদের দাওয়াত দিয়েছি উচ্চস্বরে। আমি তাদের দাওয়াত দিয়েছি প্রকাশ্যে। আমি তাদের দাওয়াত দিয়েছি গোপনে। আমি তাদের বলেছি, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ইস্তিগফার করো। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল। —সূরা নূহ : ০৫-১০

অনেক সময় দাওয়াত দিতে হয় একজন একজন করে, আলাদা আলাদাভাবে। প্রত্যেকের প্রতিই আরোপ করতে হয় আলাদা গুরুত্ব। আবার অনেক সময় দাওয়াত দেওয়া হয় একই জায়গায় একই সাথে অনেক মানুষের সমাগমে। এগুলো মূলত নির্ভর করে মানুষের জীবনপ্রণালি, রুচি-প্রকৃতি ও স্বভাববৈশিষ্ট্যের ওপর। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে দাওয়াতী কাজ গোপনে করাই শ্রেয়। কেননা, ধর্মীয় বিপ্লবের আশঙ্কায় যে কোনো দ্বীনি কাজকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করার সমরণীতি প্রচলিত হয়ে থাকে সর্বত্র।

সভা-সেমিনার এবং বিভিন্ন কর্মানুষ্ঠানে বলিষ্ঠ যুক্তিপ্রমাণ উপস্থাপনের মাধ্যমে দাওয়াতী কাজ করুন। আয়োজন করুন নারীদের জন্য ধর্মীয় আলোচনা ও মতবিনিময়সভার। এভাবে ইসলামী জীবনদর্শনকে ব্যাপক পরিসরে এমনভাবে উপস্থাপন করুন যাতে মানুষ জীবনের সর্বক্ষেত্রে আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাহকেই শ্রেষ্ঠ পথনির্দেশ হিসেবে গ্রহণ করার অনিবার্যতা স্বীকার করে। লেখালিখিও অতি উত্তম উপায়। বিশেষত সমসাময়িক বিষয়ে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে আলোকপাত হওয়া খুবই জরুরি। কোনটি কতটুকু ধর্মানুসারে; কোনটি ধর্ম থেকে কত দূরে –এগুলো আলোচনায় আসা চাই।

দাওয়াতীকে অবশ্যই চারপাশের নারীদের ঝোঁক ও প্রবণতা এবং যোগ্যতা ও সামর্থ্য সম্পর্কে জানতে হবে। কার মধ্যে কী প্রতিভা আছে, কে কীভাবে দাওয়াতী কাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, সে বিষয়ে লক্ষ রাখতে হবে। অনেক নারী লেখালিখিতে পারদর্শী হন। অনেকে মুনশিয়ানা বিতর্কে বা উপদেশে। অনেককে দাওয়াতও দিতে পারেন মৌনভাবে। দাইয়াতকে সবকিছু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। যদি কখনো এমন হৃদয় পেয়ে যান, যা ধর্মের প্রতি অনুরাগী, দাওয়াতের প্রতি অনুরাগী, তা হলে তাতে সাহস ও প্রণোদনা যোগান। প্রায়ই এমন হয় যে, হৃদয়ে ধর্মীয় আবেগ চাপা পড়ে থাকে পার্থিব ধ্যানধারণার নিচে। অবস্থা এমন—যদি কেউ একটু ফুঁক দেয় তা হলেই জ্বলে উঠবে, জেগে উঠবে; আলো ছড়ায় অনির্বাণ শিখা হয়ে, প্রদীপ্ত প্রদীপ হয়ে।

প্রিয় বোন, যদি কখনো এরকম একটি হৃদয়ও পেয়ে যান, তা হলে এ হৃদয়টিকে জাগাতে ব্রতী হোন। একে তুচ্ছ মনে করবেন না। এটিই হতে পারে আপনার জীবনের মহত্তম কীর্তি। হয়তো আপনার উসিলায় একজন নারী সর্বান্তকরণে মনোনিবেশ করবে ধর্মের প্রতি, দাওয়াত ও তাবলীগের প্রতি। হতে পারে, তারই সার্থক নেতৃত্বে একদিন পরিচালিত হবে মুসলিম নারীসমাজ; স্বাদ পাবে ইসলামের, ঈমানের।

মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন,
ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنْ ضَلَّ عَنْ سَبِيلِهِ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ
অর্থ : তুমি তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান করো প্রজ্ঞার সাথে, উত্তম উপদেশে। তুমি বিতর্ক করো তাদের সাথে সুন্দরতম পদ্ধতিতে। নিশ্চয় তোমার প্রতিপালকই অধিক অবগত পথভ্রষ্টদের সম্পর্কে। তিনিই অধিক অবগত হেদায়েতপ্রাপ্তদের সম্পর্কে। —সূরা নাহল : ১২৫

সুতরাং যিনি আল্লাহর পথের দাই হবেন, তার অন্তর হতে হবে প্রশান্ত, চিন্তা-চেতনা হতে হবে মহৎ। তার আচরণ হবে দয়া ও করুণাপূর্ণ, ক্ষমা ও মার্জনাভিত্তিক। তা হলেই মানুষের অন্তরে জায়গা করে নেওয়া সহজসাধ্য। তখনই মানুষ তার দ্বারা প্রভাবিত হবে। সাদরে বরণ করে নেবে তার উপদেশ।

কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, প্রত্যেকেরই মন যোগাতে হবে বা প্রত্যেকেই তার কথা গভীর আগ্রহে গ্রহণ করে নেবে। কেননা, কারও কথা গ্রহণ করা না-করার ব্যাপারে মানুষের রুচি প্রকৃতি ভিন্ন ভিন্ন। সুতরাং যদি কেউ সাড়া না দেয়, বা কেউ প্রত্যাখ্যান করে, তা হলে হতাশ হওয়া বা রাগান্বিত হওয়ার কিছু নেই। বরং ব্যক্তিগত মাহাত্ম্য নিয়ে দাওয়াতের কাজ চালিয়ে যেতে হবে। সর্বোচ্চ চেষ্টা ব্যয় করতে হবে মানুষের কল্যাণসাধনে।

দাই হবেন কল্যাণের ধারার মতো। যেদিক দিয়ে অগ্রসর হবেন, সকলকে সিঞ্চিত করবেন কল্যাণে। সুউচ্চ মনোবল নিয়ে এগিয়ে যাবেন সম্মুখ পানে। বিরামবিহীনভাবে। ক্লান্তিহীনভাবে। ক্ষুদ্রতার ঊর্ধ্বে থেকে। কঠোরতা বা বাড়াবাড়ি ছাড়া। কেননা, যিনি মানুষকে চারপাশে সমবেত করতে চান, তাকে অবশ্যই হতে হবে বিনিত উটনীর মতো। হাজার উপেক্ষা, হাজার অত্যাচার বরণ করে নেবেন অম্লান বদনে।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের জন্য রেখে গেছেন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি ছিলেন বিনয়ী, সদাচারী। প্রতিকূলতায় সাহাবা কেরাম যখন উৎকন্ঠিত বা হতবিহ্বল, কিংবা উত্তেজিত হয়ে উঠতে চাইতেন, তখন তাঁর অমীয় বাণী তাদের উৎকণ্ঠা দূর করত, তাদের শান্ত করত। তিনি তাদের বিপদাপদ ও প্রতিকূলতার মুখে অবিচল থাকার শিক্ষা দিতেন। তিনি তাদের এই শিক্ষাই দিতেন যে, ধৈর্য ও সহনশীলতার দ্বারাই মানুষের হৃদয় জয় করা যায়। দাইর সফলতাও এখানেই নিহিত।

দেখুন না, মহান আল্লাহ হযরত মূসা ও হারুন আ. কে নির্দেশ দিলেন ফেরাঊনকে দাওয়াত দিতে। ফেরাঊন ছিলেন কওমের নেতা। বরং বিরাট সাম্রাজ্যের অধিপতি। আল্লাহ তাদের কীভাবে দাওয়াত দিতে বললেন, তা নিজেই পড়ে নিন পবিত্র কুরআন থেকে,
اذْهَبَا إِلَى فِرْعَوْنَ إِنَّهُ طَغَى فَفُولَا لَهُ قَوْلًا لَّيْنًا لَّعَلَّهُ يَتَذَكَّرُ أَوْ يَخْشَى قَالَا رَبَّنَا إِنَّنَا نَخَافُ أَنْ يَفْرُطَ عَلَيْنَا أَوْ أَنْ يَطْغَى قَالَ لَا تَخَفْ مَا سَمِعْتُمَا أَسْمَعُ وَأَرَى
অর্থ : তোমরা ফেরাঊনের কাছে যাও। নিশ্চয় সে সীমালঙ্ঘন করেছে। তোমরা তাকে বলো কোমল কথা, হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে কিংবা ভীত হবে। তারা দুজন বলল, হে আল্লাহ, আমাদের ভয় হয় যে, সে আমাদের সাথে স্বেচ্ছাচরিতা বা সীমালঙ্ঘন করবে। আল্লাহ বললেন, তোমরা ভয় পেও না। আমি তোমাদের সাথে আছি। আমি শুনব, দেখব। —সূরা ত্বাহা : ৪৩-৪৬

আল্লাহ মহিমান্বিত দুই নবীকে নির্দেশ দিলেন যেন তারা ফেরাঊনকে দাওয়াত দেন, এবং আল্লাহর একত্বের আহ্বান জানান। সাথে সাথে আল্লাহ তাদের এও নির্দেশ দিলেন যে, তাদের দাওয়াতের শৈলী হতে হবে সরল ও কোমল, যথাযথ সম্মানপ্রদর্শনপূর্বক ও যথাযোগ্য মূল্যায়নের ভিত্তিতে।

আলোচ্য বিষয় থেকে আরও একটি বিষয় বুঝে আসা উচিত যে, প্রতিটি মানুষকেই তার রুচি ও প্রকৃতি বুঝে দাওয়াত দিতে হবে। প্রতিটি মানুষের মৌলিকত্বের প্রতি পোষণ করতে হবে সুধারণা। সুতরাং আমরা ধনী-গরীব, আমীর-ফকীর, ছোটো-বড়, সবল-দুর্বল সবাইকেই দাওয়াত দেব। আমরা বিশ্বাস করি, এভাবে আমরা যদি এক হয়ে যেতে পারি, একে অপরের সহযোগী হতে পারি, তা হলে আমরা অকল্যাণ রোধ করতে পারব সার্বিকভাবে, বাতিলদের মোকাবিলা করতে পারব সক্ষমভাবে। তখনই আল্লাহ তাঁর দ্বীনকে সাহায্য করবেন। পৃথিবীর আকাশে পতপত করে উড়বে ইসলামের পতাকা।

প্রিয় বোন,
দাওয়াতের শৈলীতে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করুন। নতুন নতুন পদ্ধতি অবলম্বন করুন। নতুনত্ব একঘেয়েমি ও অবসাদ দূর করে। হযরত নূহ আ. এর জাবানি পবিত্র কুরআনে আমরা এই শিক্ষা পাই,
قَالَ رَبِّ إِنِّي دَعَوْتُ قَوْমী لَيْلًا وَنَهَارًا ثُمَّ إِنِّي كُلَّمَا دَعَوْتُهُمْ لِتَغْفِرَ لَهُمْ جَعَلُوا أَصَابِعَهُمْ فِى آذَانِهِمْ وَاسْتَغْشَوْا ثِيَابَهُمْ وَأَصَرُّوا وَاسْتَكْبَرُوا اسْتِكْبَارًا ثُمَّ إِنِّي أَعْلَنْتُ لَهُمْ وَأَسْرَرْتُ لَهُمْ إِسْرَارًا فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا
অর্থ : নূহ বললেন, হে আমার প্রতিপালক, আমি আমার কওমকে রাত দিন দাওয়াত দিয়েছি। কিন্তু আমার আহ্বান তাদের পলায়নপরতাই বাড়িয়ে দিয়েছে। আমি যখনই তাদের আহ্বান করেছি, যেন তুমি তাদের ক্ষমা কর, তখনই তারা কানে আঙুল দিয়েছে এবং কাপড় দিয়ে আত্মগোপন করেছে। তারা বাড়াবাড়ি করেছে এবং অতিরিক্ত অহংকার প্রদর্শন করেছে। আমি তাদের দাওয়াত দিয়েছি উচ্চস্বরে। আমি তাদের দাওয়াত দিয়েছি প্রকাশ্যে। আমি তাদের দাওয়াত দিয়েছি গোপনে। আমি তাদের বলেছি, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ইস্তিগফার করো। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল। —সূরা নূহ : ০৫-১০

অনেক সময় দাওয়াত দিতে হয় একজন একজন করে, আলাদা আলাদাভাবে। প্রত্যেকের প্রতিই আরোপ করতে হয় আলাদা গুরুত্ব। আবার অনেক সময় দাওয়াত দেওয়া হয় একই জায়গায় একই সাথে অনেক মানুষের সমাগমে। এগুলো মূলত নির্ভর করে মানুষের জীবনপ্রণালি, রুচি-প্রকৃতি ও স্বভাববৈশিষ্ট্যের ওপর। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে দাওয়াতী কাজ গোপনে করাই শ্রেয়। কেননা, ধর্মীয় বিপ্লবের আশঙ্কায় যে কোনো দ্বীনি কাজকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করার সমরণীতি প্রচলিত হয়ে থাকে সর্বত্র।

সভা-সেমিনার এবং বিভিন্ন কর্মানুষ্ঠানে বলিষ্ঠ যুক্তিপ্রমাণ উপস্থাপনের মাধ্যমে দাওয়াতী কাজ করুন। আয়োজন করুন নারীদের জন্য ধর্মীয় আলোচনা ও মতবিনিময়সভার। এভাবে ইসলামী জীবনদর্শনকে ব্যাপক পরিসরে এমনভাবে উপস্থাপন করুন যাতে মানুষ জীবনের সর্বক্ষেত্রে আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাহকেই শ্রেষ্ঠ পথনির্দেশ হিসেবে গ্রহণ করার অনিবার্যতা স্বীকার করে। লেখালিখিও অতি উত্তম উপায়। বিশেষত সমসাময়িক বিষয়ে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে আলোকপাত হওয়া খুবই জরুরি। কোনটি কতটুকু ধর্মানুসারে; কোনটি ধর্ম থেকে কত দূরে –এগুলো আলোচনায় আসা চাই।

দাওয়াতীকে অবশ্যই চারপাশের নারীদের ঝোঁক ও প্রবণতা এবং যোগ্যতা ও সামর্থ্য সম্পর্কে জানতে হবে। কার মধ্যে কী প্রতিভা আছে, কে কীভাবে দাওয়াতী কাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, সে বিষয়ে লক্ষ রাখতে হবে। অনেক নারী লেখালিখিতে পারদর্শী হন। অনেকে মুনশিয়ানা বিতর্কে বা উপদেশে। অনেককে দাওয়াতও দিতে পারেন মৌনভাবে। দাইয়াতকে সবকিছু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। যদি কখনো এমন হৃদয় পেয়ে যান, যা ধর্মের প্রতি অনুরাগী, দাওয়াতের প্রতি অনুরাগী, তা হলে তাতে সাহস ও প্রণোদনা যোগান। প্রায়ই এমন হয় যে, হৃদয়ে ধর্মীয় আবেগ চাপা পড়ে থাকে পার্থিব ধ্যানধারণার নিচে। অবস্থা এমন—যদি কেউ একটু ফুঁক দেয় তা হলেই জ্বলে উঠবে, জেগে উঠবে; আলো ছড়ায় অনির্বাণ শিখা হয়ে, প্রদীপ্ত প্রদীপ হয়ে।

প্রিয় বোন, যদি কখনো এরকম একটি হৃদয়ও পেয়ে যান, তা হলে এ হৃদয়টিকে জাগাতে ব্রতী হোন। একে তুচ্ছ মনে করবেন না। এটিই হতে পারে আপনার জীবনের মহত্তম কীর্তি। হয়তো আপনার উসিলায় একজন নারী সর্বান্তকরণে মনোনিবেশ করবে ধর্মের প্রতি, দাওয়াত ও তাবলীগের প্রতি। হতে পারে, তারই সার্থক নেতৃত্বে একদিন পরিচালিত হবে মুসলিম নারীসমাজ; স্বাদ পাবে ইসলামের, ঈমানের।

ফন্ট সাইজ
15px
17px