📘 ফিরে এসো নীড়ে 📄 ৫. উপযুক্ত শাসন

📄 ৫. উপযুক্ত শাসন


সন্তানের শিষ্টাচরের জন্য যদি কোনো কৌশলই কাজে না আসে তা হলে এই পদ্ধতিটিও প্রয়োগ করা যেতে পারে। শান্তি মানেই পিটুনি নয়। শাস্তি বিভিন্ন রকম হতে পারে। একটি তিরস্কার করা, হালকা বোঝানো — এগুলোও শাস্তির অন্তর্ভুক্ত। প্রয়োজনে অভিমান করে একটু দূরে থাকাও কার্যকরী পদ্ধতি। এতে সন্তান তার অপরাধ উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়। ফলে নিজেকে শুধরে নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করে। তা ছাড়া, এতে মা বাবার প্রতি সন্তানের ভক্তি-ভালোবাসাও নিষ্ক্রিয় হয়।

অনেক সময় তার ভালোলাগার, ভালোবাসার বিষয়গুলোতে প্রতিবন্ধকতা আরোপ করেও শাস্তি দেওয়া যেতে পারে। অনেক সময় তার প্রতি গুরুত্বহীনতা দেখিয়েও তার দৃষ্টি আকর্ষণ করা যেতে পারে। হয়তো কারণ সে নিজেই বুঝে বের করে নেবে, নিজেকে শুধরে নেওয়ার চেষ্টা করবে; এ বিষয়ে আর মা-বাবাকে কিছু বলতে হবে না।

কোনো কিছুতেই কাজ না হলে সর্বশেষ পদ্ধতি হিসেবে প্রহারের আশ্রয় নেওয়া যেতে পারে। তবে তা বেশি বেশি ও ঘন ঘন না হওয়া চাই। অবশ্যই এরও আগে সাধারণ ধমকমুক্তিতে কাজ হচ্ছে কিনা তা যাচাই করে নেওয়া উচিত। মনে রাখতে হবে, শাস্তি তখনই দেওয়া উচিত যখন একটা অপরাধ সে বারবার করে; এবং ততটুকুই দেওয়া উচিত যতটুকু সীমিত। সুতরাং লঘু পাপে গুরু চাপ, বিষয়টি যেন এমন না হয়। আবার এমনটা হওয়া তো মোটেই উচিত নয় যে, আমরা আমাদের সন্তানের ওপর এমন কিছু চাপাব যা তার সাধ্যের বাইরে; এরপর সে যখন অপারগ হলো তখন তাকে শাস্তি দেওয়া শুরু করলাম। অভিজ্ঞতা বলে, 'ইযা আরাদতা আন তুত্বয়া ফা মুর বিমা ইউসতাত্বয়া' অর্থাৎ 'যদি আনুগত্য চাও, তা হলে যা সাধ্য তারই নির্দেশ দাও।'

সন্তানকে শাসন করার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত — তার সংশোধন। নিছক ব্যক্তিত্বের প্রভাব খাটানো বা কর্তৃত্ব ধরে রাখার মানসিকতা নিয়ে সন্তানকে শাসন করা উপকারী নয়। কবি বলেন,

ফক্বসা লিইয়াজদাজিরু ওয়ামান ইয়াকু হাজিমান — ফাল ইয়াক্বসু আহিয়ানান আলা মান ইয়ারহামু

অর্থ : সে কঠোর হলো যেন তারা দূরে সরে যায়। অথচ যে সুবিবেচক, সে অনেক সময় স্নেহাশ্পদের প্রতিও কঠোর হয়।

গবেষকগণ—অতীত, বর্তমান—একটি বিষয়ে একমত যে, সন্তানকে শাসন করে যে সুফল পাওয়া যায় তা সাময়িক ও ক্ষীণ। পক্ষান্তরে সন্তানকে আদর করে যে সুফল পাওয়া যায় তা স্থায়ী ও ব্যাপক। সহীহ মুসলিমে আবু মূসা আশআরী রাযি. থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে ও মুয়ায রাযি.কে ইয়েমেনে শিক্ষক হিসেবে প্রেরণ করার সময় বলেছিলেন: 'ইয়াসসিরা ওয়ালা তুআসসিরা ওয়া আল্লিমা ওয়ালা তুনাফফিরা' অর্থাৎ 'তোমরা সহজতা করো, কঠিনতা করো না; শিক্ষা দিও, দূরে সরিয়ে দিও না।'১

আল্লামা ইবনে খালদুন রাহ.-ও তাঁর বিখ্যাত মুকাদ্দিমায় বলতে চেয়েছেন, শিশুর শিক্ষাদীক্ষা ও শিষ্টাচারের কঠোরতা করার পরিণতি অনেকটা ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি বলেছেন,
'যে ব্যক্তি রুক্ষ ও বদমেজাজি হয়, সে অন্যের কাছে বড় ভারী হয়ে ওঠে। সে নিজ সত্তা, সম্মান এমনকি পরিবারকেও রক্ষা করতে অপারগ হয়ে পড়ে। কেননা, রুক্ষতা ও রূক্ষ্মতায় সে প্রকৃত মহত্ত্ব ও আত্মসম্মানটুকু হারিয়ে ফেলে। তার অধীনে যারা লালিত পালিত হয়, তারাও নিরাপদ নয়; তারাও অপদস্থতা ও অপমানে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। লাঞ্ছনা তাদের কাছে খুবই স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়। ফলে তাদের প্রকৃত ব্যক্তিত্ব ও মনুষ্যত্ববোধটুকু নষ্ট হয়ে যায়।'

সন্তানকে শাসনই করুন, আর আদরই করুন; তিরস্কারই করুন, আর পুরস্কৃত করুন; উপযুক্ত সময়ে উপযুক্তটা করুন। তা হলেই আপনার দূরদর্শিতা ফলপ্রসূতা পাবে। আপনি সফলতার মুখ দেখবেন। তবে মনে রাখবেন, সন্তান লালনপালনে মা বাবার অনুভূতি ও কলাকৌশল এক ও অভিন্ন হওয়া চাই; একই সূত্র ধরে পরিপূরকতার ভিত্তিগত হওয়া চাই; নয়তো সকল শ্রম পণ্ড হওয়ার আশঙ্কা আছে। আল্লাহই উত্তম তওফিকদাতা।

সন্তানের শাসনের বিষয়ে খুবই তিক্ত হলেও আহনাফ বিন কায়সের বক্তব্যে একটি চরম সত্য উঠে এসেছে। মুআবিয়া যখন আপন সন্তানকে প্রতি বিচলিত হয়ে আহনাফের কাছে পরামর্শ চেয়েছিলেন তখন তিনি বলেছিলেন,
'এরা আমাদের হৃদয়ের লালিত বস্তু এবং আমাদের জীবনের ভরসা। আমরা এদের জন্য বিনীত জমিনের মতো এবং উদার আকাশের মতো। সুতরাং তারা যা আবদার করে তা রক্ষা করুন এবং ক্রুদ্ধ হলে তুষ্ট করুন; তবেই হয়তো তাদের ভালোবাসা পাবেন। এদের ওপর বোঝা হওয়া থেকে বেঁচে থাকুন; নয়তো এরা আপনার বেঁচে থাকাটাকেই বোঝা মনে করবে এবং আপনার মরে যাওয়াটাকেই সুখের বিষয় মনে করবে।'

টিকাঃ
১. সহীহ মুসলিম।

সন্তানের শিষ্টাচরের জন্য যদি কোনো কৌশলই কাজে না আসে তা হলে এই পদ্ধতিটিও প্রয়োগ করা যেতে পারে। শান্তি মানেই পিটুনি নয়। শাস্তি বিভিন্ন রকম হতে পারে। একটি তিরস্কার করা, হালকা বোঝানো — এগুলোও শাস্তির অন্তর্ভুক্ত। প্রয়োজনে অভিমান করে একটু দূরে থাকাও কার্যকরী পদ্ধতি। এতে সন্তান তার অপরাধ উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়। ফলে নিজেকে শুধরে নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করে। তা ছাড়া, এতে মা বাবার প্রতি সন্তানের ভক্তি-ভালোবাসাও নিষ্ক্রিয় হয়।

অনেক সময় তার ভালোলাগার, ভালোবাসার বিষয়গুলোতে প্রতিবন্ধকতা আরোপ করেও শাস্তি দেওয়া যেতে পারে। অনেক সময় তার প্রতি গুরুত্বহীনতা দেখিয়েও তার দৃষ্টি আকর্ষণ করা যেতে পারে। হয়তো কারণ সে নিজেই বুঝে বের করে নেবে, নিজেকে শুধরে নেওয়ার চেষ্টা করবে; এ বিষয়ে আর মা-বাবাকে কিছু বলতে হবে না।

কোনো কিছুতেই কাজ না হলে সর্বশেষ পদ্ধতি হিসেবে প্রহারের আশ্রয় নেওয়া যেতে পারে। তবে তা বেশি বেশি ও ঘন ঘন না হওয়া চাই। অবশ্যই এরও আগে সাধারণ ধমকমুক্তিতে কাজ হচ্ছে কিনা তা যাচাই করে নেওয়া উচিত। মনে রাখতে হবে, শাস্তি তখনই দেওয়া উচিত যখন একটা অপরাধ সে বারবার করে; এবং ততটুকুই দেওয়া উচিত যতটুকু সীমিত। সুতরাং লঘু পাপে গুরু চাপ, বিষয়টি যেন এমন না হয়। আবার এমনটা হওয়া তো মোটেই উচিত নয় যে, আমরা আমাদের সন্তানের ওপর এমন কিছু চাপাব যা তার সাধ্যের বাইরে; এরপর সে যখন অপারগ হলো তখন তাকে শাস্তি দেওয়া শুরু করলাম। অভিজ্ঞতা বলে, 'ইযা আরাদতা আন তুত্বয়া ফা মুর বিমা ইউসতাত্বয়া' অর্থাৎ 'যদি আনুগত্য চাও, তা হলে যা সাধ্য তারই নির্দেশ দাও।'

সন্তানকে শাসন করার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত — তার সংশোধন। নিছক ব্যক্তিত্বের প্রভাব খাটানো বা কর্তৃত্ব ধরে রাখার মানসিকতা নিয়ে সন্তানকে শাসন করা উপকারী নয়। কবি বলেন,

ফক্বসা লিইয়াজদাজিরু ওয়ামান ইয়াকু হাজিমান — ফাল ইয়াক্বসু আহিয়ানান আলা মান ইয়ারহামু

অর্থ : সে কঠোর হলো যেন তারা দূরে সরে যায়। অথচ যে সুবিবেচক, সে অনেক সময় স্নেহাশ্পদের প্রতিও কঠোর হয়।

গবেষকগণ—অতীত, বর্তমান—একটি বিষয়ে একমত যে, সন্তানকে শাসন করে যে সুফল পাওয়া যায় তা সাময়িক ও ক্ষীণ। পক্ষান্তরে সন্তানকে আদর করে যে সুফল পাওয়া যায় তা স্থায়ী ও ব্যাপক। সহীহ মুসলিমে আবু মূসা আশআরী রাযি. থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে ও মুয়ায রাযি.কে ইয়েমেনে শিক্ষক হিসেবে প্রেরণ করার সময় বলেছিলেন: 'ইয়াসসিরা ওয়ালা তুআসসিরা ওয়া আল্লিমা ওয়ালা তুনাফফিরা' অর্থাৎ 'তোমরা সহজতা করো, কঠিনতা করো না; শিক্ষা দিও, দূরে সরিয়ে দিও না।'১

আল্লামা ইবনে খালদুন রাহ.-ও তাঁর বিখ্যাত মুকাদ্দিমায় বলতে চেয়েছেন, শিশুর শিক্ষাদীক্ষা ও শিষ্টাচারের কঠোরতা করার পরিণতি অনেকটা ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি বলেছেন,
'যে ব্যক্তি রুক্ষ ও বদমেজাজি হয়, সে অন্যের কাছে বড় ভারী হয়ে ওঠে। সে নিজ সত্তা, সম্মান এমনকি পরিবারকেও রক্ষা করতে অপারগ হয়ে পড়ে। কেননা, রুক্ষতা ও রূক্ষ্মতায় সে প্রকৃত মহত্ত্ব ও আত্মসম্মানটুকু হারিয়ে ফেলে। তার অধীনে যারা লালিত পালিত হয়, তারাও নিরাপদ নয়; তারাও অপদস্থতা ও অপমানে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। লাঞ্ছনা তাদের কাছে খুবই স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়। ফলে তাদের প্রকৃত ব্যক্তিত্ব ও মনুষ্যত্ববোধটুকু নষ্ট হয়ে যায়।'

সন্তানকে শাসনই করুন, আর আদরই করুন; তিরস্কারই করুন, আর পুরস্কৃত করুন; উপযুক্ত সময়ে উপযুক্তটা করুন। তা হলেই আপনার দূরদর্শিতা ফলপ্রসূতা পাবে। আপনি সফলতার মুখ দেখবেন। তবে মনে রাখবেন, সন্তান লালনপালনে মা বাবার অনুভূতি ও কলাকৌশল এক ও অভিন্ন হওয়া চাই; একই সূত্র ধরে পরিপূরকতার ভিত্তিগত হওয়া চাই; নয়তো সকল শ্রম পণ্ড হওয়ার আশঙ্কা আছে। আল্লাহই উত্তম তওফিকদাতা।

সন্তানের শাসনের বিষয়ে খুবই তিক্ত হলেও আহনাফ বিন কায়সের বক্তব্যে একটি চরম সত্য উঠে এসেছে। মুআবিয়া যখন আপন সন্তানকে প্রতি বিচলিত হয়ে আহনাফের কাছে পরামর্শ চেয়েছিলেন তখন তিনি বলেছিলেন,
'এরা আমাদের হৃদয়ের লালিত বস্তু এবং আমাদের জীবনের ভরসা। আমরা এদের জন্য বিনীত জমিনের মতো এবং উদার আকাশের মতো। সুতরাং তারা যা আবদার করে তা রক্ষা করুন এবং ক্রুদ্ধ হলে তুষ্ট করুন; তবেই হয়তো তাদের ভালোবাসা পাবেন। এদের ওপর বোঝা হওয়া থেকে বেঁচে থাকুন; নয়তো এরা আপনার বেঁচে থাকাটাকেই বোঝা মনে করবে এবং আপনার মরে যাওয়াটাকেই সুখের বিষয় মনে করবে।'

টিকাঃ
১. সহীহ মুসলিম।

ফন্ট সাইজ
15px
17px