📄 বয়ঃসন্ধি পর্যন্ত
ক. ঈমানী তরবিয়ত
মোটামুটি তিন বছর বয়স থেকেই আমরা আমাদের সন্তানদের ঈমানী তরবিয়ত শুরু করে দেব। এবং এটা জরুরি। এক্ষেত্রে গড়িমসি করা শিশুর প্রতি খুবই অন্যায় হবে। ঈমানী তরবিয়তের মৌলিক ও প্রাথমিক বিষয়গুলোর মধ্যে আমরা যে বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেব:
১. আকীদা বিশ্বাস
এক্ষেত্রে সর্বাগ্রে আসতে পারে তাকওয়া। ক্ষুদ্র অর্থে আল্লাহর ভয় ও সেই ভয়ের প্রভাব। আমরা শিশুর অন্তরে এখন থেকেই আল্লাহর ভয় জাগ্রত করতে সচেষ্ট হব। মনে রাখব, শুধু মুখে শিশুকে এসব বুঝিয়ে লাভ হবে না। এগুলো তাকে দেখাতে হবে, বোঝাতে হবে — নিজেদের আমলের মাধ্যমে, নিজেদের আলোচনার মাধ্যমে। আমরা আমাদের সন্তানকে বাস্তবভিত্তিক অনুশীলন-পুনরুনশীলন, চর্চা-পুনচর্চা দেখাব। শিশু আমাদের দ্বারাই প্রভাবিত হবে। আমাদের আমলের মাধ্যমেই সে আল্লাহর অস্তিত্ব কল্পনা করতে শিখবে এবং আল্লাহর প্রতি ভীতি বোধ করতে সক্ষম হবে।
এই একটি বিষয়ই ব্যক্তিকে সারা জীবন পাপ বর্জন ও পুণ্য অর্জনে উৎসাহিত করে। ব্যক্তির জীবনে তাকওয়ার প্রভাব কত বেশি তা বর্ণনা করতে গিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
التَّقْوَى هَهُنَا وَأَشَارَ إِلَى صَدْرِهِ ثَلَاثًا
অর্থ: তাকওয়া এখানে। তিনি প্রায় তিনবার কথাটি বললেন এবং প্রতিবারই নিজের বুকের দিকে ইশারা করলেন।
তা হলে, তাকওয়ার সম্পর্ক মনের সঙ্গে। মন নষ্ট হয়ে গেলে সব নষ্ট। মন ঠিক থাকলে সব ঠিক। সুতরাং আমরা আমাদের কোমলমতি শিশুর মন-মানসের প্রতি যত্নশীল হব সবচেয়ে বেশি। তার কোমল হৃদয়েই আমরা তাকওয়ার বীজ বপন করব। আমরা এই বিষয়গুলোর সৌন্দর্য তার সামনে তুলে ধরব। এভাবে আল্লাহর মহত্ব-বড়ত্ব তুলে ধরব। তাকে বোঝাব, এগুলোর একমাত্র স্রষ্টা হলেন আল্লাহ। তিনিই এগুলো সৃষ্টি করেছেন। এভাবে আমরা আমাদের ধর্ম ও বিশ্বাসের সহজ সহজ ও মৌলিক বিষয়গুলোর প্রতি এখন থেকেই তাকে উৎসাহী করে তুলব। আল্লাহ আমাদের প্রতি দিক দান করুন। আমীন।
২. পিতামাতার আনুগত্য
আমাদের সন্তানদের এই কচি বয়স থেকেই পিতামাতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও অনুগত করে তোলার প্রাণান্ত চেষ্টা করব। এর ফল খুবই ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী। বিশেষ করে বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটা খুবই কঠিন মনে হচ্ছে। এজন্য খুব বেশি আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করব এবং নিজেদের সংশোধনের চেষ্টা করব। আমরা আমাদের শিশুর প্রতি এমন হব, যেন সে এখন থেকেই আমাদের কথা শোনার জন্য, মানার জন্য প্রস্তুত হয়ে ওঠে। সে যেন আমাদের সামনে গলা উঁচু করে কথা বলতেও লজ্জা বোধ করে; বরং ভীতি বোধ করে। আমাদের উপদেশে বিরক্তি প্রকাশ করার মতো মানসিকতা যেন তার না আসে। এ ব্যাপারে একটুও গড়িমসি করব না। যদি কখনো এমন হয় তা হলে খুব বেশি আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করব। কুরআনে কারীমের এই আয়াতটির মর্মবস্তু তার অন্তরে বদ্ধমূল করার চেষ্টা করব,
وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوٓا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِندَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَآ أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُل لَّهُمَآ أُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُل لَّهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا
অর্থ: তোমার আল্লাহ তোমার জন্য এই ফায়সালা করেছেন যে, তুমি শুধু তাঁরই ইবাদত করবে। পিতামাতার প্রতি সদাচারী হবে ... তাদের কারও প্রতি কখনো উফ শব্দটিও উচ্চারণ করবে না। তাদের সাথে গলা উঁচু করে কথা বলবে না। তাদের সাথে কথা বলবে বড় সম্মানের সাথে।১
সাত বছর বয়সে
এভাবে মোটামুটি সাত বছর বয়স পর্যন্ত আমরা আমাদের শিশুর ঈমানী তরবিয়তের ক্ষেত্রে মৌলিক আকীদা বিশ্বাসের পাশাপাশি আল্লাহর ভয় ও পিতামাতার আনুগত্য—এই দুটো বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেব। এগুলো আমাদের সফলতার প্রথম ধাপ। এর মধ্যেও সম্ভব হলে তাকে ইবাদাত সম্পর্কেও একটু আধটু ধারণা দেব। কিন্তু সাত বছর বয়স থেকে সে অনেক কিছুই ভালো করে বুঝতে শিখবে। ইবাদাত সম্পর্কেও ভালো করে বুঝতে শিখবে। এখন আমরা তাকে ইবাদাতের প্রতি মনোযোগী করতে সচেষ্ট হব।
১. পবিত্রতা ও নামায
সর্বাগ্রে আসবে তাহারাত ও সালাত—অর্থাৎ পবিত্রতা ও নামায। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
مُرُوا أَبْنَاءَكُم بِالصَّلَاةِ وَهُمْ أَبْنَاءُ سَبْعِ سِنِينَ وَاضْرِبُوهُم عَلَيْهَا وَهُمْ أَبْنَاءُ عَشْرٍ وَفَرِّقُوا بَيْنَهُمْ فِي الْمَضَاجِعِ
অর্থ : তোমরা তোমাদের সন্তানদের সাত বছর বয়স থেকে নামাযের নির্দেশ দিতে থাকো। আর দশ বছর বয়স হয়ে গেলে তাকে নামাযের জন্য শাসনও করো। এই বয়সে তোমরা তাদের জন্য ভিন্ন বিছানার ব্যবস্থা করে দেবে।২
২. রমযানে রোযা
এভাবে সাত বছর বয়স থেকে রমযান মাসে রোযা রাখার ব্যাপারেও উৎসাহিত করা উচিত। কেননা, সহীহ বুখারী ও মুসলিমে এসেছে, আশুরার দিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনসারী সাহাবীদের মহল্লায় লোক পাঠালেন এই মর্মে যে,
مَنْ أَصْبَحَ مُفْطِرًا فَلْيُتِمَّ بَقِيَّةَ يَوْمِهِ، وَمَنْ أَصْبَحَ صَائِمًا فَلْيَصُمْ
অর্থ : আজকে যারা রোযা রাখেনি, তারা বাকি সময়টুকু উপোস থাকুক। আর যারা রোযা রেখেছে, তারা রোযা রাখুক।
বর্ণনাকারী বলেন—
فَكُنَّا نَصُومُ وَنُصَوِّمُ صِبْيَانَنَا وَنَجْعَلُ لَهُم اللُّعْبَةَ مِن العِهْنِ – الصُّوفِ المَصْبُوغِ – فَإِذَا بَكَى أَحَدُهُم أَعْطَيْنَاهُ ذَلِكَ حَتَّى يَكُونَ عِندَ الإِفْطَارِ
অর্থ : আমরা সেদিন সারাদিন রোযা রাখলাম এবং আমাদের শিশুদেরও রোযা রাখলাম। আমরা তাদের জন্য খেলনা বানিয়ে রেখেছিলাম। তারা কান্নাকাটি করলে সেই খেলনাগুলো দিয়ে তাদের ভুলিয়ে রাখার চেষ্টা করছিলাম। তবেই আমরা ইফতার পর্যন্ত পার করলাম।৩
সাত বছর বয়সে নামাযের নির্দেশের তাৎপর্য
সাত বছর বয়সে শিশুকে নামাযের তালিম দেওয়ার মধ্যে বিশেষ তাৎপর্য এই যে, শিশুরা এভাবে আল্লাহর বিশেষ করুণা-দৃষ্টি নিয়ে বেড়ে ওঠে। একেবারে ছোটবেলা থেকেই সময়মতো নামাযে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। একজন মুসলমানের জন্য নামাযই মূল। এই নামাযের মাধ্যমেই শিশু তার প্রতিপালকের সাথে সম্পর্ক করে। নামাযই তাকে শক্তিশালী মুসলিমে পরিণত করে। নামাযই শিষ্টাচার শেখায়। উদ্যমী করে। শান্তশিষ্ট করে। নামাযই জীবনকে সুশৃঙ্খল করে। মানুষকে পূর্ণ মানুষে পরিণত করে। নামাযের প্রতি যত্নশীল হলে স্বভাবতই মানুষ সময়ের প্রতি যত্নশীল হয়ে ওঠে। এজন্যই বলা হয়ে থাকে, নামায হলো ধর্মের মূল; যে নামায ঠিক রাখল, সে তার ধর্ম ঠিক রাখল। যে নামায নষ্ট করল, সে ধর্ম নষ্ট করল। নামাযই মুসলিম, মুনাফিক আর কাফিরের পার্থক্য ভেদ করে।
৩. বিনয় ও মনোযোগিতা
শিশুকে নামাযে বিনয়ী ও মনোযোগী হতেও উদ্বুদ্ধ করব। এটা তাকে স্বতস্ফূর্তভাবে বিনয়ী ও মনোযোগী করে তুলবে। তবে মুখ্যত লক্ষ্যণীয় এই যে, এরকম নামাযই ব্যক্তিকে আল্লাহর মারেফাত ও সত্যিকারদের পরিচয় লাভে ধন্য করে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন—
قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ ¤ الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ
অর্থ : অবশ্যই প্রকৃত সফলতা লাভ করেছে মু'মিনগণ, যারা তাদের সালাতে খুবই বিনয় অবলম্বনকারী।৪
৪. একমাত্র আল্লাহর জন্য
এখানে একটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ—ইখলাস। আমরা আমাদের সন্তানদের নামায, রোযা ইত্যাদি বিভিন্ন আমলে তো উৎসাহিত করব; কিন্তু এমনভাবে করব, যেন তারা এই উপলব্ধি নিয়েই এগুলো করে যে, তারা এগুলো করছে শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য। আমরা তাদের ইখলাস ও লিল্লাহিয়াতকে, আল্লাহর প্রতি তাদের আন্তরিকতা ও একনিষ্ঠতাকে খুবই যত্নের সাথে লালন করব।
খেয়াল রাখব, আল্লাহপ্রদত্ত মূল ফিতরাত যেন আমাদের অবহেলায় নষ্ট না হয়। তারা যেন কখনোই কপটতা না শেখে। বিষয়টাকে মোটেই কঠিন মনে করব না। আমাদের নিজেদের ইখলাস আমাদের মূল পুঁজি হতে পারে। একনিষ্ঠতার জন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা আমাদের মূল শক্তি হতে পারে। মনে রাখব, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—
وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ حُنَفَاءَ وَيُقِيمُوا الصَّلَاةَ وَ يُؤْتُوا الزَّكَاةَ وَذَلِكَ دِينُ الْقَيِّمَةِ
অর্থ : আর তাদের শুধু এই আদেশই দেওয়া হয়েছে যে, তারা আল্লাহর ইবাদত করবে—দীনকে তার জন্য খালেস করে একনিষ্ঠভাবে; এবং সালাত কায়েম করবে, যাকাত আদায় করবে। এটাই প্রকৃত সরল ধর্ম।৫
৫. আল্লাহর ধ্যান ও কল্পনা
সন্তানের ঈমানী তারবিয়তের মধ্যে আমাদের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়ে গেছে—হুযুরুল মুরাকাবা। আমরা আমাদের সন্তানদের এমনভাবে গড়ে তুলতে উদ্যোগী হব, যেন তারা চলায়, বলায়, কাজে, কর্মে সর্বাবস্থায় মনের গভীর থেকে নিজে-নিজেই আল্লাহর অস্তিত্ব কল্পনা করতে পারে। আল্লাহর ধ্যান-ধারণা যেন প্রতিনিয়ত তার মধ্যে ক্রিয়াশীল থাকে। সে যেন সত্যি সত্যিই উপলব্ধি করে যে, সে কী করছে না-করছে, সবই আল্লাহ দেখছেন; বরং আরও ভালো হয় যদি সে উপলব্ধি করতে পারে যে, সে নিজেই আল্লাহকে দেখছে। মনে করব, এটাই হবে আমাদের শিশুর ঈমানী তরবিয়তের চূড়ান্ত সফলতা। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তওফিক দান করুন। আমীন।
খ. সামাজিক শিষ্টাচার
আমরা আমাদের কোমলমতি শিশুদের তিন বছর বয়স থেকেই সামাজিক শিষ্টাচার শিক্ষা দেওয়া শুরু করব। এ ক্ষেত্রে আমরা যে বিষয়গুলোকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে পারি, সেগুলো নিম্নরূপ :
১. অন্যের প্রতি ভালোবাসা
আমরা আমাদের শিশুদেরকে ভাইবোন, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন ও সতীর্থদের প্রতি ভালোবাসাতে উৎসাহিত করব। কেননা, এ থেকে তার মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ জন্ম নেবে। প্রকারান্তরে এটিই তার মাঝে সত্যিকারের মুসলমানের গুণ ও বৈশিষ্ট্যকে বিকশিত করতে সহায়তা করবে। পারস্পরিক সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি; ত্যাগ ও বিসর্জন, দয়ামায়া, পরার্থপরতা, পরমতসহিষ্ণুতা ইত্যাদি গুণ ও বৈশিষ্ট্য তাকে উজ্জীবিত করবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—
لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يُحِبَّ لِأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ
অর্থ : তোমাদের মধ্যে কেউই প্রকৃত মু'মিন হতে পারবে না যতক্ষণ না তার এমন অবস্থা হয় যে, সে নিজের জন্য যা ভালোবাসে অন্যের জন্যও তাই ভালোবাসে।৬
২. পানাহারের শিষ্টাচার
আমরা আমাদের শিশুদেরকে একেবারে ছোটবেলা থেকেই খাওয়া ও পান করার আদব ও শিষ্টাচার শিক্ষা দেওয়া শুরু করব। এ বিষয়ে যে হাদীসগুলো এসেছে, যে দু'আগুলো এসেছে, সেগুলো তাদের আত্মস্থ করাব। ডান হাতে খাওয়া, ডান হাতে পান করা; যে কোনো কাজ ডান দিক থেকে, ডান হাতে করা—এগুলো শেখাব।
আমরা এগুলো করব আমাদের প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুসরণে। যেমন তিনি বলেছেন:
يَا غُلَامُ سَمِّ اللَّهَ وَكُلْ بِيَمِينِكَ وَكُلْ مِمَّا يَلِيكَ
অর্থ : বৎস, আল্লাহর নাম নাও, ডান হাতে খাও, ডান দিক থেকে খাও।৭
এভাবে আমরা আমাদের শিশুদের শেখাব, খাওয়ার আগে বলতে হয় :
بِسْمِ اللَّهِ اللَّهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِيمَا رَزَقْتَنَا وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
অর্থ : আল্লাহর নামে শুরু করছি। হে আল্লাহ, আপনি আমাদের যে-রিজিক দান করেছেন তাতে বরকত দান করুন। হে আল্লাহ, আপনি আমাদের জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা করুন।
এভাবে আমরা তাকে শেখাব, খাওয়ার পরে বলতে হয়—
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَطْعَمَنَا وَسَقَانَا وَجَعَلَنَا مُسْلِمِينَ
অর্থ : সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদের খাওয়ালেন, পান করালেন এবং যিনি আমাদের মুসলমান বানিয়েছেন।
এভাবে আমরা তাকে শেখাব, বয়সে যারা বড় আছেন, তাদের আগে খাওয়া শুরু করতে হয় না।
পান করার ক্ষেত্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশনা মোতাবেক আমরা তাকে শেখাব-
لَا تَشْرَبُوا وَاحِدًا كَمَا يَشْرَبُ الْبَعِيرُ وَلَكِنِ اشْرَبُوا مَثْنَى وَثَلَاثَ وَسَمُّوا إِذَا أَنْتُمْ شَرِبْتُمْ
অর্থ : তোমরা এক শ্বাসে পান করো না। ওভাবে তো উট পান করে। তোমরা বরং দুই শ্বাসে অথবা তিন শ্বাসে পান করো। যখন পান কর, আল্লাহর নাম নিয়ে পান করো।৮
আমরা আমাদের শিশুকে শেখাব, সে যেন পাত্রে নিঃশ্বাস না ফেলে। আমরা তাকে বোঝাব, এটা সামাজিক শিষ্টাচারবিরুদ্ধ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাত্রে নিঃশ্বাস ফেলতে নিষেধ করেছেন।৯
৩. শোয়ার আদব
শিশু যখন ঘুমোতে যায়, তখন তাকে ঘুমানোর আদব ও শিষ্টাচার শেখাব। সম্ভব হলে, ঘুমের সময় ওযু করে উৎসাহিত করব। ডান কাতে শোয়া। ঘুমানোর সময় যে দু'আ পড়ার কথা এসেছে, তা মুখে মুখে উচ্চারণ করাব। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
إِذَا أَتَيْتَ مَضْجَعَكَ فَتَوَضَّأْ وُضُوءَكَ لِلصَّلَاةِ، ثُمَّ اضْطَجِعْ عَلَى شِقِّكَ الْأَيْمَنِ وَقُلْ
অর্থ : যখন বিছানায় যেতে চাও, তখন নামাযের মতো করে ওযু করে নাও। তারপর ডান কাতে শোও এবং বলো :
اللَّهُمَّ أَسْلَمْتُ نَفْسِي إِلَيْكَ، وَوَجَّهْتُ وَجْهِي إِلَيْكَ، وَفَوَّضْتُ أَمْرِي إِلَيْكَ، وَأَلْجَأْتُ ظَهْرِي إِلَيْكَ، رَغْبَةً وَرَهْبَةً إِلَيْكَ، لَا مَلْجَأَ وَلَا مَنْجَا إِلَّا إِلَيْكَ، آمَنْتُ بِكِتَابِكَ الَّذِي أَنْزَلْتَ، وَبِنَبِيِّكَ الَّذِي أَرْسَلْتَ
অর্থ : হে আল্লাহ, আমি নিজেকে তোমার কাছে সঁপে দিলাম, তোমার প্রতি মনোনিবেশ করলাম, আমার যাবতীয় বিষয় তোমার কাছেই সোপর্দ করলাম এবং নিজেকে তোমার আশ্রয়প্রার্থী করলাম—তোমার ভয় ও ভালোবাসা বুকে ধারণ করে। হে আল্লাহ, তুমি ছাড়া কোনো আশ্রয়স্থল নেই, মুক্তির উপায় নেই। তুমি যে কিতাব নাজিল করেছ তার প্রতি এবং যে নবীকে পাঠিয়েছ তার প্রতি ইমান আনলাম।১০
৪. পরিচ্ছন্নতা
আমরা আমাদের শিশুদের শরীর ও কাপড়চোপড়ের পরিচ্ছন্নতার প্রতিও উৎসাহিত করতে থাকব। তার জিনিসপত্র যেন অগোছালো না থাকে সে ব্যাপারেও তাকে মনোযোগী করতে চাইব। এমনকি, ঘরের আসবাবপত্র গোছগাছ থাকুক কি না, তা নিয়েও তাকে ভাবতে শেখাব। এগুলো সবই আমাদের ধর্মের সৌন্দর্য।
এভাবে আমরা আমাদের ইস্তিঞ্জার বিভিন্ন আদব এবং টয়লেটে যাওয়ার দু'আ শেখাব :
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْخُبُثِ وَالْخَبَائِثِ
অর্থ : হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে পানাহ চাইছি অনিষ্টকারী জ্বিন-শয়তানের থেকে।
টয়লেট থেকে বের হওয়ার দু'আ শেখাব :
غُفْرَانَكَ الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَذْهَبَ عَنِّي الْأَذَى وَعَافَانِي
অর্থ : হে আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা করো। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যিনি আমার কষ্ট দূর করলেন এবং আমাকে আফিয়াত নসীব করলেন।
৫. দৃষ্টির শিষ্টাচার ও অনুমতি প্রার্থনা
আমরা আমাদের শিশুদের সব ধরনের ভদ্রতা শেখাব। দৃষ্টিপাতের ক্ষেত্রে ভদ্রতা কী, কীভাবে তাকাতে হয়, কী দেখা উচিত, কী দেখা অনুচিত ইত্যাদি বিষয়েও সচেতন করব। সাথে সাথে কারও ঘরে ঢুকতে অনুমতি চেয়ে ঢোকার বিষয়েও তাদের সতর্ক করব। মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন :
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لِيَسْتَأْذِنْكُمُ الَّذِينَ مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ وَالَّذِينَ لَمْ يَبْلُغُوا الْحُلُمَ مِنْكُمْ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ مِنْ قَبْلِ صَلَاةِ الْفَجْرِ وَحِينَ تَضَعُونَ ثِيَابَكُمْ مِنَ الظَّهِيرَةِ وَمِنْ بَعْدِ صَلَاةِ الْعِشَاءِ ثَلَاثُ عَوْرَاتٍ لَكُمْ لَيْسَ عَلَيْكُمْ وَلَا عَلَيْهِمْ جُنَاحٌ بَعْدَهُنَّ طَوَّافُونَ عَلَيْكُمْ بَعْضُكُمْ عَلَى بَعْضٍ كَذَلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمُ الْآيَاتِ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ وَإِذَا بَلَغَ الْأَطْفَالُ مِنْكُمُ الْحُلُمَ فَلْيَسْتَأْذِنُوا كَمَا اسْتَأْذَنَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ
অর্থ : হে ইমানদারগণ, তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসদাসী এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক বালকবালিকা তিনটি সময় যেন অনুমতি প্রার্থনা করে ঘরে প্রবেশ করে—ফজরের পূর্ব পর্যন্ত, দুপুরে তোমরা যখন কাপড় খুলে রাখ এবং এশার পর থেকে। এই তিনটি তোমাদের গোপনীয় সময়। এর বাইরে অন্য সময়গুলোতে তোমাদের তাদের অসুবিধার কারণ হওয়ার কথা নয়। তোমরা তো এক অপরের কাছে আসা যাওয়া করোই। এভাবেই আল্লাহ্ তোমাদের জন্য নির্দেশাবলি স্পষ্ট করে ব্যক্ত করেন। আল্লাহ্ মহাজ্ঞানী, মহাপ্রজ্ঞাময়। কিন্তু শিশুরা যখন প্রাপ্তবয়স্ক হবে তখন তারা তাদের পূর্ববর্তীদের মতো সব সময় অনুমতি প্রার্থনা করবে।—সূরা নূর : ৫৮-৫৯
সুতরাং শিশুদের ছোটবেলা থেকেই এমনভাবে গড়ে তুলব যে, তারা একে অপরের লজ্জাস্থানের প্রতি দৃষ্টিপাত করবে না। আমাদেরও উচিত, একটু বুঝ-বুদ্ধি হওয়ার পরই তাদের প্রত্যেকের বিছানা আলাদা করে দেওয়া। এতে ইমানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শাখা, বরং সমাজের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান লজ্জাশীলতার দীক্ষা শিশু গঠনমূলকভাবেই লাভ করবে।
আমরা তাদের শেখাব, বাবা-মা'সহ যে কারও ঘরে ঢুকতে তারা যেন অনুমতি চেয়ে নেয়। বিষয়টিকে আমরা মোটেই অবহেলা করব না। কারণ তারা ঘরে ঢুকে যদি কাউকে কোথাও এমন অবস্থায় দেখে ফেলে, যেখানে দেখা অযোগ্য; তা হলে এটা খুবই খারাপ হবে; এর ক্ষতি বড় ব্যাপক। এজন্য আমরা সতর্ক হব। বিশেষত মা-বাবাকে খুবই সতর্ক থাকতে হবে। তা না হলে মা বাবার প্রতি তার যে শ্রদ্ধাবোধ থাকা উচিত সেটা তো ব্যাহত হবেই, পাশাপাশি চারিত্রিক অবক্ষয়েরও আশঙ্কা আছে。
গ. শিক্ষা-দীক্ষা
শিশু যখন চার বছর পূর্ণ করবে, তখন থেকে আমরা তার বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নতি-সাধনে মনোযোগী হব। তার মন ও মনের উপযোগী ধর্মীয় ও সাধারণ শিক্ষার সহজ ও উপকারী বিষয়গুলো তার সামনে তুলে ধরার প্রয়াসী হব। বিশেষত একটু একটু করে কুরআন ও হাদীস মুখস্থ করানোর চেষ্টা করব। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ )رواه ابن ماجه(
অর্থ : জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ফরজ।১১
তিনি আরও বলেছেন,
أَدِّبُوا أَوْلَادَكُمْ عَلَى ثَلَاثِ خِصَالٍ: حُبِّ نَبِيِّكُمْ، وَحُبِّ آلِ بَيْتِهِ، وَتِلَاوَةِ الْقُرْآنِ، فَإِنَّ حَمَلَةَ الْقُرْآنِ فِي ظِلِّ عَرْشِ اللَّهِ يَوْمَ لَا ظِلَّ إِلَّا ظِلُّهُ
অর্থ : তোমরা তোমাদের শিশুদের তিনটি বিষয়ের দীক্ষা দাও : তোমাদের নবীর ভালোবাসা, তাঁর পরিবারবর্গের ভালোবাসা এবং কুরআন তেলাওয়াত। যারা কুরআনের ধারক হবে, তারা আল্লাহর আরশের নিচে ছায়া পাবে। সেদিন ওই ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না।১২
আমাদের সালাফে সালেহীন শিশুদের সর্বপ্রথম কুরআন শিক্ষা দেওয়ায় উৎসাহিত করেছেন। সেজন্য আরবী ভাষা শিক্ষা করাও জরুরি। ইমান ও আকীদার মৌলিক জিনিসগুলোও মুখস্থ করতে হবে। বর্ণিত আছে, ফযল ইবনে যাযদ জনৈকা মহিলার সাথে একটি ছেলেকে দেখলেন। ছেলেটির চলন-বলন তাকে মুগ্ধ করল। তখন তিনি মহিলাটিকে তার ছেলেটি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। মহিলাটি বলল,
إِذَا أَتَمَّ خَمْسَ سَنَوَاتٍ أَسْلَمْتُهُ إِلَى الْمُؤَدِّبِ فَحَفِظَ الْقُرْآنَ كُلَّهُ وَعَلَّمَهُ الشِّعْرَ فَرَوَاهُ، وَرَغَبَ فِي مُفَاخَرَةِ قَوْمِهِ وَلِقَنِ مَآثِرَ آبَائِهِ وَأَجْدَادِهِ، فَإِذَا بَلَغَ الْحُلُمَ حَمَلْتُهُ عَلَى أَعْنَاقِ الْخَيْلِ، فَتَمَرَّسَ وَتَفَرَّسَ، وَلَبِسَ السَّلَاحَ وَمَشَى بَيْنَ بُيُوتِ الْحَيِّ وَأَضْفَى إِلَى صَوْتِ الصَّارِخِ الْمُسْتَغِيثِ ...
অর্থ : আমার ছেলের বয়স যখন মাত্র পাঁচ বছর, তখনই তাকে গুরুর হাতে তুলে দিয়েছি। গুরু তাকে কুরআন শরীফ মুখস্থ করিয়েছেন। এখন সে কুরআন তেলাওয়াত করে মানুষকে শোনায়। গুরু তাকে আরবী কাব্যভাণ্ডার মুখস্থ করিয়েছেন। সে এখন দিব্যি প্রাচীন আরবের কবিতা বর্ণনা করে। গুরু তাকে পূর্বপুরুষদের প্রতি এত শ্রদ্ধাশীল করে তুলেছেন যে, সে এখন কথায় কথায় তাদের কীর্তিগাথা তুলে ধরে। আমার ছেলে শক্ত সমর্থ হলে তবেই তাকে অশ্বপৃষ্ঠে আরোহণ করিয়েছি। সে এখন পাকা অশ্বারোহী। ধনুক-তরবারি হাতে অশ্বপৃষ্ঠে আরোহণ করে দিগ্বিদিক ছুটে বেড়ায়। কান খাড়া করে থাকে, যদি কেউ বিপদে পড়ে চিৎকার করে, তা হলে সাহায্য করতে ছুটে যাবে তাই।১৩
দেখুন বোন, এই বুদ্ধিমতি মহিলা কেমন কুশলী পরিকল্পনাকল্পে একেবারে ছোটবেলা থেকেই সন্তানের শিক্ষাদীক্ষায় ব্রতী হয়েছেন।
আমরা আমাদের শিশুদের লেখাপড়া শেখানোর জন্য পাঠশালায় পাঠাতে পারি। তবে শিশুর পাঠশালা-নির্বাচনে আমাদের দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে হবে। দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। আমাদের আগ্রহের তালিকার যেন সর্বাগ্রে এমন পাঠশালা থাকে, যেখানে আমাদের সন্তানদের ইসলামী শিক্ষা ও মূল্যবোধের ওপর গড়ে ওঠে।
নিছক আধুনিক শিক্ষা আমাদের কাম্য নয়। উন্নত শিক্ষা পাবে এমন মোহে পড়ে ভুলেও কোনো মিশনারি স্কুলের ভূত যেন আমাদের মাথায় সওয়ার না হয়। এতে তার ব্যক্তিগত ও ইসলামী মূল্যবোধকে গলা টিপে হত্যা করা হবে। এটা কেমন করে সম্ভব যে, ঘরে আমরা আমাদের সন্তানদের ইসলামী ভাবধারায় গড়ে তুলতে চাইব, আর পাঠশালায় সে সম্পূর্ণ বিপরীত জিনিস গিলবে!
একটি বিষয় আমাদের উপলব্ধি করা উচিত, তা এই যে, একটি প্রকৃত ইসলামী পরিবারের একজন সচেতন মায়ের কোলে যে শিশু বড় হবে, ইনশাআল্লাহ, পরবর্তীতে কোনো বিদ্যাই তার কাছে কঠিন হবে না। সুতরাং আগেই বিচলিত হয়ে শিশুকে বিধর্মীদের বিদ্বেষের বলি বানানো হবে নিজেই নিজের পায়ে কুড়াল মারার মতো।
আমাদের সন্তান যেন বুদ্ধিমান হয়, প্রতিভাবান হয় এবং লেখাপড়ায় মনোযোগী হয়, সে জন্য আমাদের খুবই চৌকস হতে হবে। তার সাথে গল্প করতে হবে, তাকে গল্প শোনাতে হবে। তাকে প্রচুর পরিমাণ সময় দিতে হবে। এটাকে সময়ের অপচয় বলা মোটেই ঠিক নয়। মনে রাখতে হবে, এটা আমাদের বিনিয়োগ। সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ।
আমাদের গভীর দৃষ্টিতে তার ঝোঁক ও প্রবণতা লক্ষ করতে হবে। এবং সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কোনো কিছুর সংশোধনের প্রয়োজন মনে হলে খুবই বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে হবে। তার প্রতিটি কথায় মনোযোগী হতে হবে। তার যে কোনো অবস্থায়ই মূল্যায়ন করতে হবে। হোক না তা শিশুসুলভ।
সে যখন কিছু জানতে চাইবে, অবশ্যই গুরুত্বের সাথে সেটার উত্তর দিতে হবে। বুঝে শুনে উত্তর দিতে হবে। এটাকে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। কারণ, এতে তার জানার আগ্রহ নষ্ট হতে পারে।
শিশুর খেলাধুলার প্রতিও যত্নশীল হতে হবে। বিভিন্ন খেলা ও খেলনার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। প্রয়োজনে তার সাথে খেলতেও হবে। দৌড়াদৌড়ি, ছুটোছুটি ইত্যাদি শারীরিক খেলার পাশাপাশি বুদ্ধিবৃত্তিক খেলারও ব্যবস্থা করতে হবে। এখন তো শিশুর বুদ্ধিকে শাণিত করে এমন অনেক সুন্দর সুন্দর খেলনা পাওয়া যায়; এগুলোও কাজে লাগাব। তবে শরীয়তনিষিদ্ধ খেলাধুলা থেকে শিশুকে বিরত রাখব।
সুন্দর সুন্দর গল্পের বই, ছড়া-কবিতার বই শিশুকে উপহার দেব। সেগুলো তাকে পড়াব। পড়ে পড়ে শোনাব। তাকে জীবন নিয়ে ভাববারও সুযোগ দেব। মাঝে মধ্যে জিজ্ঞেস করব, সে কী হতে চায়? বিভিন্ন উপায়ে তাকে লেখাপড়ার প্রতি উৎসাহিত করব। কখনো আদর করব। কখনো পুরস্কার করব। কখনো বিশেষ বিশেষ উপহার দেব। কখনো কোথাও বেড়াতে নিয়ে যাব। মাঝে মধ্যে বুদ্ধির পরীক্ষাও নেব। যেন সে আত্মনির্ভরশীল হতে শেখে।
শিশুর পাঠশালার প্রতি অত্যন্ত যত্নশীল থাকব। অবস্থার উন্নতি-অবনতির বিষয়ে পাঠশালার সাথে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রাখব। পাঠশালা থেকে ডাকা হলে কখনো উদাসীনতা দেখাব না। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, যোগাযোগ করব। শিক্ষিকাদের কাছে নিজেকে দায়িত্বশীল অভিভাবক প্রমাণিত করব। শিশুকে পাঠশালায় নিয়মিত ও নিয়মানুবর্তী করে তুলব।
প্রায়ই শিক্ষিকাগণ আপত্তি করেন যে, অনেক অভিভাবককে তাদের সন্তানের বিষয়ে পরামর্শ করার জন্য ডাকা হয়, কিন্তু তারা আসেন না। অনেক ছেলেমেয়ে পাঠশালায় নিয়মিত হয় না, লেখাপড়ায় মনোযোগী হয় না; এ ব্যাপারে অভিভাবকদের সাথে যোগাযোগ করাও সম্ভব হয় না। অনেক বাচ্চার অনেক রকম দুর্বলতা থাকে, সেসব কাটানোর জন্য অভিভাবকদের সহযোগিতার প্রয়োজন হয়; কিন্তু তাদের পাওয়াও যায় না।
প্রিয় বোন, আপনি যেন এমন না হন। আপনি যেন একজন সচেতন অভিভাবক হন। নইলে, অবহেলার ক্ষতি আপনার সন্তানের ওপরও পড়বে, আপনার পরিবারের ওপরও পড়বে। যে সন্তানকে দিয়ে সমাজের কোনো লাভ হবে না, এমন সন্তান জন্ম দিয়ে লাভ কী? বিশেষত আমরা যে তথ্যপ্রযুক্তি ও প্রগতির যুগে বসবাস করছি, তাতে অযোগ্য সন্তানের ভবিষ্যৎটা কী হবে, ভেবে দেখুন। এ যুগের সাথে পাঙ্গা দেওয়া কি চাট্টিখানি কথা! আমাদের অবহেলার কারণে যদি শিশুর ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়, তা হলে তার অবস্থা হলো এতিমের মতো, যার না মা আছে, না বাবা আছে। কবি বলেন,
لَيْسَ الْيَتِيمُ مَنْ انْتَهَى أَبَوَاهُ مِنْ هَمِّ الْحَيَاةِ وَخَلَّفَاهُ ذَلِيلًا إِنَّ الْيَتِيمَ هُوَ الَّذِي تَلْقَى لَهُ أُمًّا تَخَلَّتْ أَوْ أَبًا مَشْغُولًا
অর্থ: যে মা বাবাকে হারিয়েছে সে এতিম নয়। এতিম তো সে, যে মা বাবাকে পেয়েছে উদাসীন ও কর্মব্যস্ত অবস্থায়। জীবন চলার পথে সে একা, বড় একা।
আমাদের মনে রাখতে হবে, পরিবারই শিশুর প্রকৃত পাঠশালা। এখানে শিশুর ভবিষ্যৎ নির্ধারিত। পাঠশালা একটি অবলম্বনমাত্র। শুধু পাঠশালার ওপর নির্ভর করে থাকলে শিশুর প্রতি অবিচার করা হবে। পরিবার ও পাঠশালার ঐকান্তিক চেষ্টাই শিশুর সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারে।
অনেক নারীই আপত্তি করে বলেন, বিষয়গুলো খুবই কঠিন। কাজের ঝামেলা থাকে, আবার সন্তান বেশি হলে তো আরও মুশকিল। কিন্তু আমি মনে করি, মা যখন যথাযথভাবে প্রথম সন্তান লালন-পালন করেন, তখন তার অনেক অভিজ্ঞতা হয়ে যায়। পরবর্তী সন্তানদের লালন-পালন করা অনেক সহজ হয়ে যায়। একটু বুদ্ধিমত্তার সাথে ঘরের কাজগুলো আঞ্জাম দিলে তো সন্তানকে দেওয়ার মতো যথেষ্ট সময় পাওয়া যায়।
প্রথম জীবনে আমি একজন চাকরিজীবী নারী ছিলাম। তখনো আমার বড় মেয়ে পাঠশালায় যাওয়ার অনেক আগেই বেশ কিছু সূরা ও হাদীস মুখস্থ করেছিল। আমি নিজে তাকে বর্ণমালা, গণনা ও হস্তলিপি শিখিয়েছিলাম। সত্যিই আমি তখন অনেক ব্যস্ত ছিলাম। তারপরও প্রতিদিন একটু একটু করে সময় দিতে আমার মেয়ের অনেক উন্নতি হয়েছিল। আমি প্রতিদিন তার লেখা দেখতাম এবং প্রতিদিন তার মুখস্থ করা বিষয়গুলো শুনতাম।
আমার মনে হয়, একটু কুশলী হলে খুব সহজেই বাড়ির কাজগুলো সেরেও সন্তানকে অনেক সময় দেওয়া যাবে। আবার ইচ্ছা করলে ঘরের ছোটখাটো কাজগুলো করতে করতেও শিশুকে অনেক কিছু শেখানো যায়। কাজকর্ম গোছানো হলে ঘরের কাজ ও অন্যান্য দায়িত্বপালন সুচারুরূপে সম্পন্ন করা যায়। অনেক সময়ও বাঁচানো যায়।
তা ছাড়া, মা যদি মনে করেন যে, তিনি বেশি সন্তান লালন-পালন করতে পারবেন না, তা হলে তো ইসলাম সন্তান নেওয়ার ব্যাপারে সুন্দর নিয়মনীতি দান করেছে। তিনি দুই সন্তান মধ্যবর্তী সময়ে যৌক্তিক ব্যবধান রাখতে পারেন যাতে প্রতিটি সন্তানকে যথাযথভাবে গড়ে তোলা যায়।
সুতরাং কোনো অজুহাতই সন্তানের শিক্ষা-দীক্ষা, শিষ্টাচার, স্বভাব চরিত্র ও মানসগঠনের বিষয়ে অলসতা করার কারণ হতে পারে না। কোনো দায়িত্বশীল মায়ের উচিত নয়। সমস্যা থাকবেই। সবকিছুর মধ্যেও সন্তানের লালন-পালনে সর্বোচ্চ মনোযোগী হতে হবে। একটি তরুণ প্রাণকে তো অজুহাত যে দেখাবেন, কাকে? কার বিষয়ে? নিজেকে? নিজেরই সন্তানের বিষয়ে?
মনে রাখবেন, সন্তান লালন-পালন বিষয়টাই মানব-জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সন্তান লালন-পালন মানে সন্তানকে মানুষ করা। সর্বদিক থেকে মানুষ করা। ঈমানের দিক থেকে। চিন্তা ও চেতনার দিক থেকে। বিনয়ের দিক থেকে। সততার দিক থেকে। এগুলো কেন? কেননা, এগুলোই তাকে আল্লাহর সৃষ্টি হিসেবে পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধিত্বর মহান দায়িত্ব পালনে প্রস্তুত করে তুলবে。
ঘ. চারিত্রিক শিষ্টাচার
আমরা আমাদের সন্তানদের একেবারে ছোটবেলা থেকেই চারিত্রিক শিষ্টাচারে দীক্ষিত করব। এক্ষেত্রে মৌলিকভাবে যে বিষয়গুলোর প্রতি লক্ষ্য রাখব তা হলো:
১. সত্যবাদিতা
আমরা শিশুকে সৎ ও সত্যবাদী করে গড়ে তোলার চেষ্টা করব। তার অন্তরে সত্য বলার সাহস যোগাব। এটাকে তার কাছে সুন্দর ও প্রশংসনীয় করে তুলে ধরব। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
إِيَّاكُمْ وَالْكَذِبَ فَإِنَّ الْكَذِبَ يَهْدِي إِلَى النَّارِ وَمَا زَالَ الْعَبْدُ يَكْذِبُ وَيَتَحَرَّى الْكَذِبَ حَتَّى يُكْتَبَ عِنْدَ اللَّهِ كَذَّابًا
অর্থ: তোমরা মিথ্যা থেকে দূরে থাকো। মিথ্যা পাপাচারে ঠেলে দেয়। আর পাপাচার জাহান্নামে নিয়ে যায়। বান্দা মিথ্যা বলতে বলতে একসময় আল্লাহর কাছে মিথ্যাবাদীদের খাতায় লিপিবদ্ধ হয়।১৪
আব্দুল কাদির জিলানী ও ডাকাতদল
শাইখ আব্দুল কাদির জিলানী রাহ. বলেন, 'আমি একবার জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে মক্কা থেকে বাগদাদ রওয়ানা করলাম। আমার মা আমাকে চল্লিশটি দিরহাম সঙ্গে দিয়েছিলেন। তিনি আমার কাছ থেকে সদা সত্য বলার প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন। আমরা যখন হামদান শহরে পৌঁছলাম, তখন একটি ছিনতাইকারী বাহিনী আমাদের ওপর চড়াও হলো। তারা কাফেলার যার কাছ যা পেল নিয়ে নিতে লাগল।
একজন আমার কাছে এসে বলল, তোমার কাছে কী আছে? আমি বললাম, আমার কাছে চল্লিশটি দিরহাম আছে। লোকটি মনে করল, আমি মিথ্যা বলেছি। সে নাক সিঁটকে চলে গেল। এরপর আরেকজন আমার কাছে এসেও সেই একই প্রশ্ন করল। আমি ও সেই আগের উত্তরই দিলাম। তখন লোকটি আমাকে ধরে তাদের সরদারের কাছে নিয়ে গেল। সরদার যখন দেখল সত্যিই আমার কাছে চল্লিশটি দিরহাম আছে, তখন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, তোমার ভয় হলো না? কীসে তোমাকে সত্য বলতে বাধ্য করল? আমি বললাম, আমি আমার মাকে সত্য বলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। তাই আমার ভয় হলো যে, যদি মিথ্যা বলি তা হলে আমার মায়ের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে। তাই সত্য বলেছি।
কথাটি শুনে সরদারদের মনে আল্লাহর ভয় জাগ্রত হলো। সে চিৎকার করে উঠল। আবেশে গাঁয়ের জামা কাপড় ছিঁড়ে ফেলল। বলল, আরে, তোমার মতো একটা পুঁচকে বালক, মায়ের কথা রাখতে, মায়ের সাথে কৃত প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে এতোটা উদগ্রীব! আর আমি! আমার কী হলো যে, প্রতিনিয়ত আমার আল্লাহর সাথে নাফরমানি করছি? তার কথা রাখার, তার সাথে কৃত প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার কোনো মাথাব্যাথা আমার নেই।
সরদার এভাবে কিছুক্ষণ চিৎকার চেঁচামিচি করার পর যার কাছ থেকে যা নিয়েছিল, সব ফেরত দিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিল। তারপর বলল, হে বালক, আমি তোমার হাতে হাত রেখে আল্লাহর কাছে তাওবা করতে চাই। তখন অন্যেরা বলে উঠল, সরদার, ডাকাতি করতে আমরা আপনাকে সরদার মেনেছি; আজ তাওবা করতেও আপনাকে সরদার মানছি। এভাবে তারা সকলেই আল্লাহর কাছে তাওবা করল।১৫
২. বড়দের শ্রদ্ধা করা, ছোটদের স্নেহ করা
এভাবে আমাদের করণীয় হবে, তাকে এমনভাবে গড়ে তোলা, যাতে সে ছোটদের স্নেহ করতে শেখে এবং বড়দের শ্রদ্ধা করতে শেখে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَمْ يَرْحَمْ صَغِيرَنَا وَيَعْرِفْ حَقَّ كَبِيرِنَا
অর্থ : যে ছোটদের স্নেহ করে না, বড়দের সম্মান রক্ষা করে না সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।১৬
৩. বাগপটুত্ব ও কথা বলার শিষ্টাচার
আমরা আমাদের সন্তানদের সুন্দরভাবে কথা বলা শিক্ষা দেব। কথা বলতে কী কী মাথায় রাখতে হয়, কথা বলার শিষ্টাচারগুলো কী কী, সেগুলোও তাকে ধীরে ধীরে শিখিয়ে দেব, বুঝিয়ে দেব। বিশেষ করে বড়রা যখন কথা বলে তখন মনোযোগের সাথে তাদের কথা শোনা, বোঝা এবং বুদ্ধিমত্তার সাথে তার উত্তর দেওয়া—ইত্যাদি বিষয়ে তাকে সচেতন করে তুলব।
এক বালকের বাগ্মিতা
বর্ণিত আছে, হিশাম ইবনে আব্দুল মালিকের শাসনামলে গ্রামাঞ্চলে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল। লোকজন হিশাম ইবনে আব্দুল মালিকের দরবারে আসে। তাদের মধ্যে দরবেশ ইবনে হুবাইবও ছিলেন। তখন তার বয়স ছিল মাত্র তেরো-চৌদ্দ বছর।
লোকেরা হিশাম ইবনে আব্দুল মালিককে দেখে কিছুটা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে, তাই শিশু ইবনে হুবাইবও কথা বলতে শুরু করে। এমন সময় তার চোখ পড়ে যায় ইবনে হুবাইবের ওপর। তখন তিনি রক্ষীকে বলেন,
দ্যাখো কেউ, কেউ আমার কাছে ভিড়তে চাচ্ছে না; অথচ উকরিপুরকরি সবসুদ্ধ চলে এসেছে!
ইবনে হুবাইব বুঝতে পারলেন যে, খলীফা তাকে দেখেই একথা বলেছেন। তখন তিনি মুখ খুললেন। বললেন,
আমীরুল মু'মিনীন, লোকেরা বিপদে পড়ে এসেছে; কিন্তু ভয় পেয়ে নিবৃত হয়েছে। কারণ, কথা বলা মানে ঝুড়ি খুলে দেওয়া, আর চুপ করে থাকা মানে ঝুড়ির মুখ বন্ধ করে রাখা। কিন্তু ঝুড়ি না খুললে তো বোঝা যায় না কী আছে।
হিশাম বলেন,
নে রে বাপু, তুই তোর ঝুড়ি খুলে দে।
ইবনে হুবাইবের কথায় মুগ্ধ হয়ে হিশাম এভাবে উৎসাহ দেখালেন।
আমীরুল মু'মিনীন, আমরা এ পর্যন্ত তিনটি দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত হয়েছি: একটি আমাদের চর্বি খেয়েছে, একটি আমাদের গোশত খেয়েছে; আর অন্যটি আমাদের হাড় ভেঙে ঠোকরানো শুরু করেছে।
আর আপনাদের হাতে তো অনেক সম্পদ রয়েছে। যদি এগুলো আল্লাহর হয়, তা হলে আল্লাহর হকদার বান্দা যারা আছে, তাদের মধ্যে ছিঁড়িয়ে দিন। আর যদি এগুলো আল্লাহর বান্দাদেরই হয়, তা হলে তাদের সম্পদ তাদের দেওয়াতে বাধা কীসে? আর যদি আপনাদের হয়, তা হলে দান-খয়রাত করাই তো আপনাদের শান। তাতেই তো আপনাদের শরিক করবে আল্লাহর দান-ফয়যান।
আমীরুল মু'মিনীন, দেহের জন্য প্রাণ যেমন, প্রজার জন্য শাসক তেমন। প্রাণ না থাকলে দেহের কী মূল্য থাকে?
হিশাম তখন ঐ এলাকায় এক হাজার দিরহাম বিতরণ করার নির্দেশ দিলেন এবং একা ইবনে হুবাইবকেই এক হাজার দিরহাম দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। কিন্তু ইবনে হুবাইব তা গ্রহণ করল না। বললেন,
আমীরুল মু'মিনীন, এগুলোও আমার গ্রামবাসীর মাঝে বিতরণ করার নির্দেশ দিন। সাধারণ মুসলমানদের চেয়ে আমি বেশি প্রয়োজনাহত নই।১৭
খলীফা আব্দুল মালিকের দূরদৃষ্টি
ইসলামী রাষ্ট্রের শাসকগণও যুগে যুগে তাঁদের সন্তানদের উন্নত চরিত্রের ওপর গড়ে তোলার প্রয়াস পেয়েছেন। খলীফা আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ান তার সন্তানের শিক্ষাগুরুকে অনুরোধ করলেন,
عَلِّمْهُمُ الصِّدْقَ كَمَا تُعَلِّمُهُمُ الْقُرْآنَ وَأَلْزِمْهُمْ عَلَى الْأَخْلَاقِ الْحَمِيدَةِ وَالْوَجْهِ النَّيْرِ وَالْخَيْرِ وَجَالِسْ بِهِمْ أَشْرَافَ الرِّجَالِ وَأَهْلَ الْعِلْمِ مِنْهُمْ، وَجَنِّبْهُمُ السُّفْلَةَ، وَوَفِّرْهُمْ فِي الْعَلَانِيَةِ وَاسْتُرْهُمْ فِي السِّرِّ، وَاضْرِبْهُمْ عَلَى الْكَذِبِ، فَإِنَّ الْكَذِبَ يَدْعُو إِلَى الْفُجُورِ وَالْفُجُورِ يَدْعُو إِلَى النَّارِ
অর্থ : আপনি তাদেরকে কুরআন শিক্ষা দেন, সেভাবে সভ্যতা ও সত্যবাদিতার দীক্ষা দিন। আরবী কাব্যভাণ্ডার মুখস্থ করান। তাদের নিয়ে সৎ, অভিজাত ও জ্ঞানী লোকদের সাথে ওঠাবসা করবেন। নীচ লোকদের সাথে তাদের মিশতে দেবেন না। প্রকাশ্যে তাদের ব্যক্তিত্ব বজায় রাখুন; কিন্তু আড়ালে তাদের কঠিনভাবে তিরস্কার করুন। মিথ্যা বললে প্রহার করতে পিছপা হবেন না। মিথ্যা পাপাচারের দিকে ঠেলে দেয়; আর পাপাচার ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।১৮
খলীফা হারুনুর রশিদের দূরদৃষ্টি
আল্লামা ইবনে খালদুন তার বিখ্যাত মুকাদ্দিমায় লিখেছেন, খলীফা হারুনুর রশিদ তার ছেলে আমীনকে যখন গুরুর হাতে সঁপে দিলেন তখন গুরুকে বললেন,
يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ قَدْ دَفَعَ إِلَيْكَ مُهْجَةَ نَفْسِهِ وَثَمْرَةَ قَلْبِهِ فَصَيَّرْ يَدِكَ عَلَيْهِ مَبْسُوطَةٌ، وَطَاعَتُهُ لَكَ وَاجِبَةٌ، فَكُنْ لَهُ بَحَيْثُ وَصَفَكَ أَمِيرُ الْمُؤْمِنِينَ، أَقْرِئْهُ الْقُرْآنَ، وَعَرِّفْهُ الْأَخْبَارَ، وَرَوِّهِ الْأَشْعَارَ، وَعَلِّمْهُ السُّنَنَ، وَبَصِّرْهُ بِمَوَاقِعِ الْكَلَامِ، وَامْنَعْهُ مِنَ الضَّحِكِ إِلَّا فِي أَوْقَاتِهِ، وَلَا تَمُرُّنَّ بِكَ سَاعَةٌ إِلَّا وَأَنْتَ مُغْتَنِمٌ فَائِدَةً تُفِيدُهُ إِيَّاهَا، وَلَا تَمُتَنَّ فِي مِسْتَاعَتِهِ فَيَسْتَغْلِيَ فَرَاغُهُ وَبَائِهُ، وَقَوِّمْهُ مَا اسْتَطَعْتَ بِالْقُرْبِ وَالْمُلَازَمَةِ فَإِنَّ أَبَاهَا فَعَلِكَ بِالشَّدَّةِ وَالْغِلْظَةِ
অর্থ: হে আহমার, আমীরুল মু'মিনীন তার নয়নমণিকে, কলিজার টুকরাকে আপনার হাতে সঁপে দিলেন। এখন সে আপনার দাস। সে আপনার আদেশ পালন করুক। আমীরুল মু'মিনীন আপনাকে যে মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছেন, আপনি তার মর্যাদা রক্ষা করুন। আপনি একে কুরআন শিক্ষা দিন। ইতিহাস শিক্ষা দিন। কাব্যভাণ্ডার মুখস্থ করান। সুন্নাহর জ্ঞান দান করুন। বুঝে শুনে কথা বলতে পারদর্শী করে তুলুন। অনর্থক হাসা থেকে বিরত রাখুন। একটি মুহূর্তও যেন এমন না হয়, যখন সে আপনার দান থেকে বঞ্চিত হলো। আপনি এমন হোন, যেন সে আপনার কাছে থাকতে আগ্রহী হয়। এমন হবেন না যে, সে আপনার থেকে দূরে থাকতে ভালোবাসে। যতদূর সম্ভব, নম্রতা ও কোমলতায় তার সম্বোধন করুন। কিন্তু যদি কাজ না হয়, তা হলে কঠোরতা করতেও দ্বিধাবোধ করবেন না।১৯
শিশুর শিষ্টাচার কঠিন কিছু নয়
অনেকেই ঘাবড়ে যান। মনে করেন, এত কিছুর প্রতি খেয়াল রাখা কী করে সম্ভব? অনেকে মনে করেন, শিশু কি পারবে এত কিছু ধারণ করতে? কিন্তু বাস্তবতা হলো, সচেতন মানুষের পক্ষে এগুলো কোনো ব্যাপারই নয়। তারা খুব সহজেই শিশুকে শিষ্টাচার শেখাতে পারেন। কেননা, শিশু প্রকৃতিগতভাবেই সব ধরনের জ্ঞান ও গুণ অর্জনের জন্য প্রস্তুত থাকে। প্রয়োজন শুধু বুঝে শুনে তার সহজাত মন ও মানসকে কাজে লাগানো। কবি বলেন,
وَلَيْسَ تَنْفِعُهُمْ مِنْ بَعْدِهِ أَدَبٌ إِنَّ الْغُصُونَ إِذَا عَدَّلَتْهَا اعْتَدَلَتْ قَدْ يَنْفَعُ الْأَوْلَادَ فِي صِغَرٍ وَلَا تَلِينُ لَوْ اشْتَدَّتْ كَالْخُشُبِ
অর্থ: পরে আর শিষ্টাচার শেখানো যায় না। একটা শক্ত কাঠকে কি চাইলেই নরম করা যায়? শিষ্টাচার শেখাতে হবে ছোটবেলায়। কাঁচা কঞ্চি যদি সোজা করতে চাও, সোজা হবে; কিন্তু পাকা কঞ্চি কি হবে?
দৃষ্টির হেফাজত ও পর্দা
শিশু যখন বড় হবে, বয়ঃসন্ধিতে উপনীত হবে, জীবন ও জগত সম্পর্কে বুঝবে, দীন ও ধর্ম সম্পর্কে জানবে, হালাল-হারাম উপলব্ধি করবে, ইসলামেই যে তার পথ ও মত সেটা অনুধাবন করবে, তখন আমাদের করণীয় হবে, দৃষ্টির হেফাজত করার বিষয়ে তাকে সচেতন করা। এতেই তার কল্যাণ নিহিত। মাহরাম কারা, গায়রে মাহরাম কারা; কাদের দিকে তাকাতে পারবে, কাদের দিকে তাকাতে পারবে না— ইত্যাদি বিষয়ে তাকে অবহিত করা।
মনে রাখতে হবে, এ বিষয়ে শিথিলতা করলে খুবই অন্যায় হবে। ফেতনার সূচনা কিন্তু এখান থেকেই। বিশেষ করে বর্তমান যুগে। তাই তাকে প্রজ্ঞার সাথে বোঝাতে হবে যে, বিপরীত লিঙ্গের সাথে কোনো রকম মেলামেশা তার জন্য বৈধ নয়। এ ব্যাপারে সে যেন খুব সতর্ক থাকে।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তাঁর প্রতিপালক বলেছেন:
اَلنَّظْرَةُ سَهْمٌ مِنْ سِهَامِ إِبْلِيْسَ مَنْ تَرَكَهَا مِنْ مَخَافَتِي أَبْدَلْتُهُ إِيْمَانًا يَجِدُ حَلَاوَتَهُ فِي قَلْبِهِ رَوَاهُ الطَّبَرَانِيُّ وَالْحَاكِمُ
অর্থ : দৃষ্টি হলো ইবলিসের তীক্ষ্ণ তির। যে আমার ভয়ে এ থেকে বেঁচে থাকবে, আমি তাকে অন্যরকম ঈমান দান করব। এর কল্যাণে সে অন্তরে স্বাদ অনুভব করবে।২০
একইভাবে আমরা আমাদের কন্যাদের পর্দা ও হিজাব অবলম্বনের নির্দেশ দেব। ইবাদত-বন্দেগির হুকুম-আহকামের সাথে সাথে পর্দা, পোশাক ও সাজসজ্জার বিধিনিষেধ অবহিত করব, পরপুরুষের সাথে কীভাবে কথা বলতে হবে, তাদের সাথে চলাফেরা করতে হলে ইসলামের বিধান কী, তাকে কী কী জানতে হবে, কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে—সবই শিখিয়ে দেব।
মা বাবাই শিশুর সবচেয়ে অন্তরঙ্গ বন্ধু
তবে মনে রাখতে হবে, মা বাবা সন্তানের সবচেয়ে হিতাকাঙ্ক্ষী বন্ধু। সুতরাং সবই করতে হবে পূর্ণ আন্তরিকতার আলোকে। এমনটা যেন মনে না হয় যে, সবকিছুতেই তাদের সাথে কঠোরতা করব, মারধর করব, বকাবকা করব। বরং আমাদের বুঝতে হবে, আমরা যে সমাজে বড় হয়েছি, আমাদের সন্তানরা তারচেয়ে বিকৃত ও বিক্ষিপ্ত সমাজে বড় হচ্ছে। সুতরাং বিবেচনা ও বিচক্ষণতাকে কাজে লাগাতে হবে। তাদের সাথে খুবই বুদ্ধিমত্তার সাথে আচরণ করতে হবে। ধৈর্যেরও পরিচয় দিতে হবে। সবর ও সালাতের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে সাহায্যপ্রার্থনা করতে হবে। শক্তি সঞ্চয় করতে হবে। সাবধান থাকতে হবে, ফল যেন হিতে বিপরীত না হয়। সন্তান ও পিতামাতার মধ্যে যেন দূরত্ব সৃষ্টি না হয়। সন্তান যেন নিশ্চিত হয় যে, মা বাবা যা বলছে, সেটাই আমার জন্য ভালো। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাওফিক দান করুন। আমীন।
টিকাঃ
১. সুরা বনী ইসরাঈল : ২৩-২৪।
২. হাকেম, আবূ দাউদ।
৩. সহীহ বুখারী ও মুসলিম।
৪. সূরা মু'মিনূন: ০১-০২।
৫. সূরা বাইয়্যিনাহ: ০৫।
৬. সহীহ বুখারী ও মুসলিম।
৭. সহীহ মুসলিম。
৮. তিরমিযী।
৯. তিরমিযী।
১০. ইবনে মাজাহ।
১১. তাবারানী।
১২. তারবিয়াতুল আওলাদ ফিল ইসলাম : ১/২৫৫।
১৩. সহীহ বুখারী ও মুসলিম।
১৪. তারবিয়াতুল আওলাদ ফিল ইসলাম : ১/১৭৫।
১৫. আবু দাউদ, তিরমিযী।
১৬. তারবিয়াতুল আওলাদ ফিল ইসলাম : ১/১৮০।
১৭. তারবিয়াতুল আওলাদ ফিল ইসলাম : ১/১৮১。
১৮. তারবিয়াতুল আওলাদ ফিল ইসলাম : ১/১৪৪。
১৯. তাবারানী, হাকেম।