📄 মাহাত্ম্যের উৎসমূল, নেতৃত্বের লালনক্ষেত্র
সন্তান লালন-পালনের দায়িত্ব ইসলামী শরীআতে ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে নারী-পুরুষ উভয়কে দেওয়া হয়েছে। তথাপি, মায়ের সাথে শিশুর সম্পর্কের গভীরতা বেশি। মা-ই শিশুর সাথে সবসময় লেগে থাকেন। তিনিই তাকে গর্ভে ধারণ করেন, স্তন্যদান করেন; তার সবকিছু দেখাশোনা করেন। মায়ের শরীর ও স্বাস্থ্য থেকেই সন্তানের শরীর ও স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটে। মা-ই সন্তানের জন্য রাত জাগেন। মা-ই সন্তানের জন্য অধিকাংশ কাজ করেন।
এটা স্রষ্টার প্রদত্ত সুবিধান। তিনি নারী সৃষ্টি-উপাদানে এমন কিছু দিয়ে রেখেছেন, যা তাকে অবলীলায় এভাবে উদ্বুদ্ধ করে। তাই ইসলামের কর্মগঠন-নীতিও এমনই। তাই মা-ই সন্তানের উন্নত চরিত্রের দিশা দেন, তাকওয়া-তাহারাত ও পবিত্রতায় দীক্ষিত করেন। মায়ের প্রাজ্ঞ পরিচালনায় শিশু শৈশব, কৈশোর পার করে; পরিণত হয় শক্ত-সমর্থ মানুষে। তারপর তারাই সমাজের মাথা হয়, জাতির নেতা হয়। তাই তো মা মাহাত্ম্যের উৎসমূল, নেতৃত্বের লালনক্ষেত্র।
কবি হাফিজ ইব্রাহিমের ভাষায় বলতে হয়,
الْأُمُّ مَدْرَسَةٌ إِذَا أَعْدَدْتَهَا أَعْدَدْتَ شَعْبًا طَيِّبَ الْأَعْرَاقِ
অর্থ : জননী জগতের শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয়। যদি এ বিদ্যালয়টিকে ভালোভাবে গড়তে পার, তবে গড়তে পার উন্নত জাতি।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, আমরা যে সমাজে বাস করি, সেই সমাজে তো অনেক অইসলামিক বিষয়ের অনুপ্রবেশ ঘটেছে, অপসংস্কৃতিও আছে, এটা কি ইসলামী সমাজ, না অন্য কিছু। অনেকে বলেন, এটা আধা ইসলামী সমাজ। তা যাই হোক, এমন প্রতিকূল পরিবেশে শরীআতের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয়ে এমন ফলপ্রসূ লালন-পালন কী করে সম্ভব? অনেকে বলে বসেন, ভবিষ্যতে আর সাচ্চা ঈমানদার, আল্লাহ্ওয়ালা নতুন প্রজন্ম গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনাদর্শ লক্ষ করুন, আমাদের সালাফে সালিহীনের জীবনাদর্শে দৃষ্টিপাত করুন, দেখবেন, জীবন ও জগতে পূর্ণ আল্লাহ্মুখী; মন-মানসে, আচার-ব্যবহারে সিরাতে মুস্তাকীমের ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি সত্যিকার মুমিন-মুসলিম-প্রজন্ম গড়ে তোলা এখনো সম্ভব।
কিন্তু সেরকম একটি গৌরবময় প্রজন্ম যখন-তখন, যেমন-তেমন করে আসে না। এজন্য প্রয়োজন হয় অনেক দিনের নিরন্তর সাধনা, আরাধনা; বেলাগাম মেহনতের, মুজাহাদার। এজন্য আমাদের প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছু মৌল নীতি ও আদর্শ এবং ঈমানী রূপরেখা এঁকে দিয়ে গেছেন, যা আমাদের একটি ইসলামী পরিবার ও ইসলামী সমাজ গঠনে সহায়তা করবে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
أَلَا كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ، فَالْأَمِيرُ الَّذِيْ عَلَى النَّاسِ رَاعٍ وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ، وَالرَّجُلُ رَاعٍ عَلَى أَهْلِ بَيْتِهِ وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْهُمْ، وَالْمَرْأَةُ رَاعِيَةٌ عَلَى بَيْتِ زَوْجِهَا وَوَلَدِهِ وَهِيَ مَسْئُولَةٌ عَنْهُمْ، وَالْعَبْدُ رَاعٍ فِي مَالِ سَيِّدِهِ وَهُوَ مَسْؤُوْلٌ عَنْهُ أَلَا فَكُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْؤُوْلٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ
অর্থ : শোনো, তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। তোমাদের প্রত্যেককেই যার যার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। যিনি নেতা নির্বাচিত হবেন, তিনি সমাজের দায়িত্বশীল। তিনি তার প্রজাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন। পুরুষ তার পরিবারের দায়িত্বশীল। তিনি তার পরিবার সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন। নারী স্বামীর ঘর ও সন্তানের দায়িত্বশীল। তিনি তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন। সেবক তার মনিবের সম্পদের দায়িত্বশীল। তিনিও সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন। শোনো, তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। তোমরা প্রত্যেকেই জিজ্ঞাসিত হবে।১
এই হাদীসটি থেকে প্রতীয়মান হয় যে, সন্তান লালন-পালনের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে নারী-পুরুষ উভয়ই দায়িত্বশীল। সন্তান মানুষ করার বিষয়টি উভয়ের অংশগ্রহণের মাধ্যমে পূর্ণতা লাভ করবে। এক্ষেত্রে কোনো একজন যদি নিজ দায়িত্ব থেকে হাত গুটিয়ে নেয়, তা হলেই ঘাটতি থেকে যাবে।
সন্তান মানুষ করার এই নীতিটিই সুন্দর সহাবস্থান, ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতার পরিচায়ক। সন্তান লালন-পালনের বিভিন্ন স্তর ও পর্যায়ভেদ আছে। ইসলামে সবকটিই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, সবগুলোই একটি আরেকটির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কোনো একটিকে কোনো একটির উপর প্রাধান্য দেওয়ার অবকাশ নেই। এগুলোর প্রত্যেকটিই এমনভাবে সাজানো, যেন পূর্বেরটি পরেরটির ক্ষেত্রপ্রস্তুতকারী।
ব্যক্তিজীবনের মূল ভিত্তি হিসেবে নির্ধারণ করা যায় শৈশবকে। এজন্যই ইসলাম শৈশবের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে। এ সময় শিশুকে যে চিন্তাভাবনা ও অভ্যাসের ওপর গড়ে তোলা হবে, সেটাই তার মনে বসে যাবে। এটা সারা জীবন তার ওপর প্রভাব হিসেবে কাজ করবে। শৈশবে সে যে চেতনা লাভ করেছে, তা থেকে মুক্ত হওয়া তার জন্য খুবই কঠিন হবে।
এজন্য ইসলাম এ ব্যাপারে এত বেশি গুরুত্ব আরোপ করেছে যে, মানুষ যখন বিবাহের চিন্তাভাবনা শুরু করে, তখন থেকেই তাকে এ ব্যাপারে মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে হয়। যেন কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে চূড়ান্ত সফলতা লাভ করা সম্ভব হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
تُنكَحُ الْمَرأةُ لِأَرْبَعِ : لِمَالِهَا وَلِحَسَبِهَا وَلِجَمَالِهَا وَلِدِينِهَا ، فَاظْفَرْ بِذَاتِ الدِّينِ تَرِبَتْ يَدَاكَ
অর্থ : মেয়ে বিবাহ করা হয় চারটি গুণ দেখে : অর্থ দেখে, বংশ দেখে, সৌন্দর্য দেখে এবং ধার্মিকতা দেখে। তুমি কিন্তু ধার্মিক মেয়ে খুঁজে নেবে। বুঝলে, হে!২
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন,
إِذَا جَاءَكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ دِينَهُ وَخُلُقَهُ فَزَوّجُوْهُ إِلَّا تَفْعَلُوْهُ تَكُنْ فِتْنَةٌ فِي الْأَرْضِ وَفَسَادٌ عَرِيضٌ
অর্থ : যদি তোমরা এমন কাউকে পাও যার ধার্মিকতা এবং স্বভাব-চরিত্র তোমাদের কাছে সন্তোষজনক, তা হলে তার সাথে মেয়ে বিবাহ দাও। নয়তো জমিনে ফেতনা হবে। ব্যাপক গোলযোগ হবে।৩
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন,
تَخَيَّرُوا لِنِطَفِكُمْ فَاَنْكِحُوا الْاَكْفَاءَ وَانْكِحُوا إِلَيْهِمْ
অর্থ : তোমরা তোমাদের বংশধারার জন্য ভালোমন্দ যাচাই করো। যথাযোগ্য ও সমকক্ষ দেখে বিবাহ করো এবং বিবাহ দাও।৪
ইসলামের দিক-নির্দেশনা অনুযায়ী পুরুষ যখন তার জীবনসঙ্গিনী নির্বাচন করে নেবে, তখনই বলা যাবে যে, সে তার সন্তানের প্রতি সদাচার করল, ন্যায় বিচার করল। কেননা, সে তার সন্তানকে একজন ভালো মা উপহার দিল। কবি বলেন,
وَ أَوَّلُ إِحْسَانِ الْيَكُمْ لِذُرِّي لِحِدَادِ الْأَعْرَاقِ بِأَدْغَاهَا
অর্থ : তোমাদের প্রতি আমার প্রথম অনুগ্রহ এই যে, আমি তোমাদের জন্য একজন সৎ বংশজাত মা নির্বাচন করেছি, যার পবিত্রতা সূর্যের আলোর মতো স্পষ্ট।
এভাবে একজন নারীও যখন ধার্মিক জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার প্রয়াসী হন, তখনই মূলত সন্তানের প্রতি সদাচার ও ন্যায় বিচার করেন। কেননা, এভাবে তিনি তার সন্তানকে একজন ভালো পিতা উপহার দেওয়ার পূর্বশর্তটি পূর্ণ করেন।
ইসলামের বিধি মোতাবেক সম্পন্ন হওয়া এরকম একটি আদর্শ বিবাহের পরেই একটি সুস্থ, সুন্দর দাম্পত্যজীবনের নিশ্চয়তা-বিধান সম্ভব হয়। এভাবে একটি সত্যিকার ইসলামী পরিবার গঠন ও উন্নত প্রজন্ম গড়ে তোলার পথ সুগম হয়। ইনশাআল্লাহ, এরকম একটি ইসলামী পরিবারে আল্লাহর রহমত নেমে আসবে। এই পরিবারে মাতৃত্বকাল হবে আল্লাহর রহমত ও করুণায় ভরা। এই পরিবারের স্বচ্ছ সুন্দর পরিবেশ হবে আল্লাহর অনুগ্রহে আচ্ছাদিত। ভবিষ্যৎ-প্রজন্মের রক্ষণাবেক্ষণ, আল্লাহপ্রদত্ত ফিতরাতের সংরক্ষণ যদি সম্ভব হয়, তা হলে এই পরিবারেই হবে।
টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী ও মুসলিম।
২. সহীহ বুখারী ও মুসলিম।
৩. তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, হাকেম, বাইহাকী।
৪. ইবনে মাজাহ, হাকেম, বাইহাকী।
📄 ফিরে এসো নীড়ে
বিগত কয়েক শতাব্দী মুসলিম নারী আপন মহিমায় ছিল ভাস্বর। পর্দার আড়ালে সুরক্ষিতা মণি-মুক্তোর মতো দেদীপ্যমান। ঘরের সিংহাসনে সমাসীনা মহিমান্বিতা মালকিন। ঘরে বসে গড়ে মহামানব, মহাবীর, মহাজ্ঞানী। মুসলিম নারীর এই অবিচল অবস্থান নিশ্চিত করেছিল মুসলিম জাতির অপ্রতিরোধ্যতা, অপ্রতিদ্বন্দ্বিতা; নিশ্চিত করেছিল মুসলিম দুর্গের দুর্ভেদ্যতা, দুর্লঙ্ঘ্যতা।
তাই ঔপনিবেশিক গোষ্ঠী ছিল হয়রান পেরেশান। তাদের মুখখাওয়া ও গুণগাওয়া পদলেহীরাও ছিল হতবাক হতবুদ্ধি। মুসলিম দুর্গের দুর্ভেদ্যতার সামনে তাদের সকল শ্রম, সকল সাধনাই যেন পণ্ড হয়ে যায়। কিন্তু যারা ইসলামের আজন্ম শত্রু, তাদের কি আর সহ্য হয়? তারা কি আর বরদাশত করতে পারে? মুসলিম উম্মাহর শক্তি, সামর্থ্য, সহনশক্তি, আত্মিক বিপুল সমৃদ্ধি, জাগতিক বিশাল শান-শওকত তাদের কি হিংসার অনলে পোড়ায় না?
অবশেষে তারা মরণকামড় দিতে উদ্যত হলো। ষড়যন্ত্র ও শলাপরামর্শের মহড়া দিতে শুরু করল। তাদের একটাই লক্ষ্য —কী করে মুসলিম সমাজের মূলে কুঠারাঘাত করা যায়? তাদের সমগ্র শক্তি নিয়োগ করল শুধু একটি বিষয় উদ্ঘাটনে—যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী কী করে একটি জাতি এমন অপ্রতিরোধ্য থাকতে পারল? কী এমন আছে যা তাদেরকে বার্ধক্য, জরাজীর্ণতা, ঘুশেঁ ধরা ও পোকায় খাওয়া থেকে রক্ষা করছে এতকাল?
অবশেষে তারা আবিষ্কার করে ফেলল। মুসলিম জাতির শক্তির রহস্য উদ্ঘাটন করে ফেলল। তারা আবিষ্কার করল, মুসলিম জাতির শক্তির রহস্য—আর কিছু নয়, মুসলিম নারী—যে নারী বিলকুল কিছু উশৃঙ্খলতাহীন, অসাধারণ কিছু বৈশিষ্ট্যে বিশিষ্টা। যার মনোবল ইস্পাতকঠিন, অবিচলতা পর্বতপ্রমাণ। যিনি সত্যকথনে নির্ভয়, নির্মোহা। যিনি পারেন সত্যিকার মুমিন ও মুত্তাকী একটি নতুন প্রজন্ম জাতিকে উপহার দিতে প্রতিটি যুগে, প্রতিটি শতাব্দীতে; যারা আপন ঈমান ও আকীদার প্রতি গভীরভাবে শ্রদ্ধাশীল, এবং ধর্ম ও বিশ্বাসের মূলে কঠিনভাবে গ্রথিত।
তারা মুসলিম নারীকে টার্গেট করল। ছলে বলে কৌশলে তাকে নিজ ধর্ম ও বিশ্বাসের প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তুলতে লাগল। টোপ হিসেবে ব্যবহার করল তথাকথিত প্রগতি নামের আপাতমধুর স্লোগান।
গ্ল্যাডস্টোন, ব্রিটিশ (তৎকালীন) প্রধানমন্ত্রী, ব্রিটেনের গণসভায় দম্ভভরে ঘোষণা দিয়েছিলেন, “যতদিন মুসলিম নারীর হিজাব উঠিয়ে দেওয়া না যাবে এবং যতদিন মুসলমানদের কুরআন বন্ধ করা সম্ভব না হবে ততদিন প্রাচ্যের অবস্থা আমাদের অনুকূলে আসবে না।”১
আর্নেস্ট লুথার ১৯০৫ সালে কায়রোতে প্রতিষ্ঠিত খ্রিস্টান মিশনারিতে নিয়োজিত কর্মী, পরামর্শক ও তত্ত্বাবধায়ীদের মুসলিম বিশ্বে কীভাবে মিশনারির তৎপরতা চালাতে হবে তার দিক-নির্দেশনামূলক বক্তব্যে বড় রকমের মেজাজ নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন, “আপনারা কাজ চালিয়ে যান। হতাশার কিছু নেই। বরং আমরা আশার আলোই দেখতে পাচ্ছি। কেননা, বাস্তবতা এই যে, মুসলমানদের মাঝে পাশ্চাত্য সভ্যতা, ইউরোপীয় জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং নারী-স্বাধীনতার প্রতি ভীষণ উৎসাহের সৃষ্টি হয়েছে।”
আন্না মিলিগান, খ্রিস্টধর্মের জনৈকা নারী স্বেচ্ছাসেবক, খুব আনন্দের সাথে মন্তব্য করেছেন, “আমরা কায়রোর মহিলা কলেজে একসাথে অনেক মেয়েকে আমাদের সারিতে জড়ো করতে সক্ষম হয়েছি। এদের অধিকাংশের পিতা ও অভিভাবক হলো পাশা। সত্যিই খ্রিস্টান মিশনারিরা একসাথে এতগুলো মুসলিম মেয়ে পাওয়া দুষ্কর। এই বিদ্যালয় থেকে মুসলিম দুর্গে আঘাত হানার এটাই মোক্ষম সময়।”২
মুসলিম নারী পর্যন্ত পৌঁছার জন্য শুরু হলো ইসলামবিদ্বেষীদের ছক আঁকা এবং সে অনুযায়ী কাজ করা। তারা প্রথমে মিশরের মেধাবী মুসলিম তরুণ-তরুণীদের শিকার করা শুরু করল। তারপর নিজেদের উদ্যোগে পাশ্চাত্যের ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের মতো উন্নত দেশগুলোতে উচ্চ শিক্ষার জন্য পাঠাতে লাগল। আজকের রিফায়াহ তাহতাবী, কাসিম আমিন, হুদা শারাভি কিন্তু এসবেরই পরম্পরা।
এরা পশ্চিমা দেশগুলোতে থেকে পশ্চিমা সংস্কৃতি ও সভ্যতা রপ্ত করে দেশে ফেরে। তারপর নিজের দেশের তরুণ-তরুণীর মাথা খাওয়া শুরু করে। বড় নির্লজ্জভাবে নিজ দেশের সভ্যতা সংস্কৃতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করতে থাকে। সেই সাথে পশ্চিমা নোংরামির গুণগানে থাকে পঞ্চমুখ। ‘যেন বাপ-চাচা, মা-খালা সব কুয়োর ব্যাঙ; তিনি এসেছেন সাগর ঘুরে।’
এই যে রিফায়াহ তাহতাবী! তিনি কী করলেন? একদম নির্লজ্জের মতো প্রকাশ্যে ঘোষণা দিলেন, “খোলামেলা চলা আর ছেলেমেয়ে অবাধ মেলামেশা করা এতে খারাপ কী আছে? ইউরোপের রাস্তায় যদি নাচগান কর, তা হলে একে পাপ বলে না। একে বলে তারুণ্য, উচ্ছলতা।”
তারই ভাবশিষ্য কাসিম আমিন ফ্রান্স থেকে ফিরতে না ফিরতেই রাতারাতি মহামতি বনে গেলেন একটি বই লিখে—তাহরীরুল মারআহ (নারী-স্বাধীনতা)। বইটি যেন তাক লাগিয়ে দিল পুরো মিশরবাসীকে। তবুও অবাক লাগে, তিনি যে নারী-স্বাধীনতার ডাক দিলেন, তার মূল উপজীব্য নাকি এই একটি বাক্য—‘আমি সেই দিনের অপেক্ষায় আছি, যেদিন মিশরের মেয়েরাও ধর্মকথা ও পর্দাপ্রথার বলয় ভেঙে বেরিয়ে আসবে এবং আমার ‘ইউরোপিয়ান সিস্টার’দের মতো ‘মুক্ত বিহঙ্গ’ হয়ে উদার আকাশে উড়াল দেবে।’
আরও আশ্চর্যের বিষয়, নারী-স্বাধীনতার নামে মিশরের মুসলিম নারীদের সাথে যারা ফ্রড খেলা শুরু করেছিলেন, তাদের দলে যে শুধু পুরুষই আছেন তা নয়, নারীও আছেন। হুদা শারাভি। সে-সময়ের নারী আন্দোলনের অবিস্মরণীয় নাম। প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের বিভিন্ন নারী সংস্থায় ছিল তার দাপুটে বিচরণ। ১৯২৩ সালে ইতালির রাজধানী রোম নগরীতে প্রথম যে নারী-বিষয়ক আন্তর্জাতিক সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল তিনি সেই সেমিনারেও উপস্থিত হয়েছিলেন। মিশরে ফিরতি পথে সফর করেছিলেন সমুদ্রে। জাহাজে উঠে মিশরের প্রথম মুসলিম নারী হিসেবে হাজার বছরের মুসলিম ঐতিহ্যকে লাথি মেরে মুসলিম জাতির গর্ব, অহংকার ভেঙে চুরমার করে নিজের মাহাত্ম্য, নিজের আভিজাত্যের প্রতীক, যা তাকে চির সম্মানে ভূষিত করে রেখেছিল এতটা কাল, সেই হিজাবটি খুলে ফেললেন এবং সামনে ছুটে চলা জাহাজ থেকে পেছনে উড়ে ফেলে দিলেন—অগণিত পরপুরুষের সামনে লক্ষ কোটি মুসলিম নারীকে অপমানিত করে, ‘পর্দা প্রথার শৃঙ্খলা’ ভেঙে বেরিয়ে পশ্চিমা ‘মুক্ত বিহঙ্গ’ হয়ে, চৌদ্দশো বছরের রক্তমাখা মুসলিম শাহী কাফেলাকে পদদলিত করে। বিনিময়ে যা পেলেন তা কিছু ফিরিঙ্গিপনা বাহবা ও করতালি, এবং কিছু নীরব নিস্তব্ধ ব্যথিত হৃদয়ের রক্তক্ষরণ। কিন্তু তার চোখে মুখে যা ছিল তা কোনো অজানা অহংকারের স্ফূর্তি বৈ কী!
তিনি ফিরে এলেন কায়রোতে। বিশ্বজয়ের আনন্দ নিয়ে। তথাকথিত নারী-আন্দোলনের মহানায়িকা হয়ে। ইতালির সেমিনার থেকে অর্জিত শিক্ষার ফলস্বরূপ প্রতিষ্ঠা করলেন একটি সংস্থা—মিশরীয় নারী ঐক্য। সংস্থার মূল সুর যেন ইতালির সেমিনার থেকেই ভেসে আসে। নারীর অধিকার চাই। সমান অধিকার চাই। পুরুষের সাথে মিলেমিশে কাজ করলে ক্ষতি কী? পোশাক-আশাক কেমন হবে, কীভাবে হবে সেটা আমার ব্যাপার, এখানে বাঁধাবান্ধি কীসে? কীসের হিজাব, কীসের নেকাব? তালাকের অধিকার চাই। পুরুষের অভিভাবকত্ব মানি না। পুরুষ যদি চারটে বউ রাখতে পারে তা হলে আমরা...? ইত্যাদি ইত্যাদি অন্যান্য আবর্জনা সম সব কথাবার্তা। প্রবৃত্তির অনুগামী হলে যা হয়। অনেকটা শিয়ালের ছদ্মবেশের মতো। বুঝে হোক না বুঝে হোক, প্রোপাগান্ডায় সুর মেলানোই আধুনিকতা। সুর না মেলালেই সেকেলে, কূপমণ্ডূক, ধর্মযাজক, কুসংস্কারাচ্ছন্ন ইত্যাদি।
মিশরের এই নারী-আন্দোলনের প্রতি পশ্চিমা দেশগুলো উৎসুক ছিল তাক লাগানোর মতো। এক কথায় তারা মুক্ত হস্তে দান করা শুরু করে দিল। ইউরোপীয়রা নিজ মিশরে চলে এলেন মিশরের নারী-আন্দোলনের অগ্রগতি এবং কর্মতৎপরতা পর্যবেক্ষণের জন্য।
হুদা শারাভির আন্দোলনকে গতিশীল করতে এগিয়ে এলেন দুরিইয়াহ শাফিক। প্রাচ্যের নিয়মনীতিকে তিনিই সবচেয়ে বেশি দুঃসাহসিকতার সাথে আঘাত করতে লাগলেন। পশ্চিমা নারীর অনুসরণই যেন তার কাছে জীবনে সফল হওয়ার একমাত্র চাবিকাঠি। তিনি ধর্মহীন ভাষায় ঘোষণা দিলেন, ‘আমরা সত্যিই অনুসরণের যোগ্য, আমরা তাদেরই অনুসরণ করব। মিশরীয় নারীদের অনুসরণের যোগ্য একমাত্র পশ্চিমা নারীরাই। বিশেষত ব্রিটেনের মহারানী।’
দুরিইয়াহ শাফিকের দলে তাঁর পরে আরও একজন মহামতির আবির্ভাব হলো। আমিনা সায়িদ। তিনি নারীবিষয়ক একটি পত্রিকা বের করতে লাগলেন। নাম দিলেন হাওয়া (ইভ)। হাওয়া নামের ‘হাওয়া’ দিয়েই পশ্চিমা বিষ ঢুকিয়ে দিতে লাগলেন মিশরীয় নারীদের মনে। তিনি স্বামী এবং অভিভাবকের সাথে অবাধ্যতা, হঠকারিতা ও স্বেচ্ছাচারিতার উসকানি দিতে লাগলেন চিমটি কাটার মতো করে। অজুহাত—পুরুষের আধিপত্যকামিতা। দাবি—দাসীত্ব থেকে মুক্তি, আর একটু ইনিয়ে-বিনিয়ে, মানসিক দাসত্ব থেকে মুক্তি। তার বিদ্রোহের শিকার হলো ইসলামের মাহাত্ম্যপূর্ণ শৈলী—পর্দা ব্যবস্থা। বিদ্রোহের শিকার হলো মুসলিম নারীর সবচেয়ে বড় গুণ, সবচেয়ে বড় মাহাত্ম্য—সতীত্ব। তিনি পর্দাব্যবস্থা নিয়ে যে শ্লেষাত্মক উক্তিটি করেছেন, তা খুবই দুঃখজনক। তিনি বলেছেন: “মেয়েরা পুরো শরীর ঢেকে ভূতের মতো হয়ে কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসবে এটাই কি ইসলাম? একটা জীবন্ত মেয়েকে না মরতেই কফিনে পরিয়ে দেওয়া কি ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য খুবই জরুরি?”
ঔপনিবেশিক গোষ্ঠীর ভাবশিষ্যরা নারী-স্বাধীনতা ও নারীমুক্তির জোর প্রচারণা চালাতে থাকলেন। তাদের নির্লজ্জ শব্দপ্রয়োগের চাতুর্য, মনগড়া হাঁকডাকের তর্জন-গর্জন অনেক মিশরীয় মেয়েকে মোহাচ্ছন্ন করল। অনেক মেয়েই পর্দার বিষয়ে এখন স্বেচ্ছাচারী, হঠকারী। তারা প্রথমে হাত ও মুখ খোলা শুরু করে। তারপর মাথা, তারপর পায়ের গোছা, তারপর রান। শালীনতার জন্য সাধারণ ভদ্রতা বোধও বিদায় নেয় মাঝামাঝি কোনো পর্যায়ে। নামে মাত্র যা থাকে—শুধুই ফ্যাশন।
ধীরে ধীরে বিষয়টি গড়াল ধর্মীয় বিধিনিষেধ এবং সামাজিক রীতিনীতিগুলোকে উপেক্ষা করে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা পর্যন্ত। আজ রাস্তাঘাট দোকানপাট শপিংমল থেকে শুরু করে লেক পাড় বা ধর্মীয় বিদ্যাপীঠ—কোনো কিছুই অশ্লীলতামুক্ত নয়। আর বিনোদনের নামে অশ্লীলতার জন্যই সেসব জায়গার উৎপত্তি হয়েছে সেসব এখন রীতিমতো...। আল্লাহ্ মাফ করুন।
পর্দাবিদ্বেষীরা চরিত্রে বন্ধনহীন এক জাতীয় লাগামহীন পাগলা ঘোড়ায় পরিণত হলো। কর্মমুখর ব্যস্ত সড়কে, ব্যস্ত শহরে, ব্যস্ত অফিসে পুরুষের ভিড়ে নারীরাও ছুটে পড়ল। স্কুল কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়ে সহশিক্ষার প্রতিযোগিতা শুরু হলো। কলকারখানার বড় বড় যন্ত্রপাতির বিকট আওয়াজে নারী-পুরুষও ঘুরপাক খেতে লাগল একসাথে। কিছু নির্ভরতা, কিছুটা স্বাধীনতা, কিছুটা আনন্দ ভুলিয়ে দিল নিজের ঘরকে, নিজের সন্তানকে, নিজের স্বামীকে। ক্ষণিকের এই মায়ামোহে নারীরা ডুবে সরিয়ে দিল তার প্রকৃতিপ্রদত্ত দায়িত্ব ও কর্তব্য থেকে। সে যে কারও মা, সে যে কারও মেয়ে, সে যে কারও স্ত্রী, সে যে কারও বোন; তার যে একটা ঘর আছে, সে যে কোনো ঘরের মালকিন, দূর থেকে দেখা মরীচিকা সবই বিস্মৃত করল তাকে।
নারীরা অবাধ্য হলো। আগ্রহের অবাধ্য হলো। ঘর ছাড়ল। সম্মানের আসন থেকে নেমে এল। ছুঁড়ে ফেলে দিল মাহাত্ম্যের মুকুট। খুলে ফেলে দিল মাথার তাজ—হিজাব, নেকাব। মনে মনে মনগড়া পাওয়ার মতো হয়ে গেল মুক্ত স্বাধীন। পুরুষ তার পেছনে ছোটে এই তার গর্ব। ছেলেরা তার জন্য জীবন দিতে চায় এটাই সফলতা। প্রবৃত্তিকামীরা প্রশংসা করে গদগদ হয়। রুগ্ন মনেরা হাত বাড়ায়, লম্ফঝম্ফ করে। বোকা মেয়ে আনন্দে আত্মহারা। ছদ্মবেশী ছলাকলায় মনে আনন্দ ধরে না। সুখময় মেলামেশায় যেন বিশ্ব জয় জয়ে রূপ নেয়। তাই এতেও হয় না; নাচে, গায়, অভিনয় করে, ফ্যাশন করে। আরও কত কী!
কিন্তু ফল কী হয়, বোন? যখন ঘোর কেটে যায়, যখন জীবন যৌবন সব শেষ হয়ে যায়, তখন নিজেকে আবিষ্কার করে তিক্ত বাস্তবতার কোন কালো অন্ধকারে। দেখে, সে কোনো স্বার্থের বলি, কারও লালসার বলি। খুব সস্তায় অন্যের হয়ে কাজ করেছে সে। কোনো ষড়যন্ত্রের শিকার, কোনো কুচক্রীর ক্রীড়নক। যে কুচক্র, যে ষড়যন্ত্র তারই বিরুদ্ধে, তারই জাতির বিরুদ্ধে, তারই দেশের বিরুদ্ধে। এ কুচক্রের চাকা আবর্তিত হয়েছে মুসলিম পরিবারব্যবস্থাকে ভেঙে দিতে, মুসলিম সমাজব্যবস্থাকে গুঁড়িয়ে দিতে। একটু সুখের কারণে বড় চড়া মূল্য দিতে হলো তাকে। নিজের সম্মান, নিজের সম্ভ্রম, নিজের সবকিছুর সাথে সাথে নিজের দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ।
আর তার পৃষ্ঠপোষকরা, যারা বাহবা করতালি ও মিথ্যা স্তুতি দিয়ে উৎসাহ যুগিয়েছিল, অর্থ খ্যাতি ও সম্ভাবনার জগতে ডাহুক হয়ে ডাক ছেড়েছিল, কথার ফুলঝুরিতে ষোড়শী কুমারীদের মাতিয়ে রেখেছিল, তারাই প্রথম তাকে উপেক্ষা করে। তাদের কাছে তার কোনো মূল্য থাকে না। সত্যিই, ওসব লোকের কাছে চামড়া-জড়া বুড়ির কী বা মূল্য থাকতে পারে?
বলা উচিত, এমন উদাহরণ কম নয় যে, অনেকে নারী-স্বাধীনতার জোর প্রচারণা চালান; চাতুর্যের সকল শৈলী প্রয়োগ করে নারীকে ধর্ম ও বিশ্বাসের প্রতি বিতশ্রদ্ধ করে তোলেন; অথচ ব্যক্তিজীবনে নিজেই নারী-স্বাধীনতা নামের তামান্না থেকে মুক্ত। এই যে কাসিম আমিন। তিনি মিশরে নারী স্বাধীনতার নামে পর্দার প্রথাগত ভীতির কেমন বিরোধিতা করেছেন। অথচ নিজের স্ত্রীকে পর্দারপ্রথা শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করতে দেননি। এমনকি, নিজের ছড়ানো প্রোপাগান্ডার ব্যাপারে নিজের ঘরানা দের রেখেছেন সম্পূর্ণ অন্ধকারে। তাই তো তার স্ত্রী শরঈ পর্দার পূর্ণ পাবন্দি করেন। শুধু তাই নয়, প্রায়ই তার পক্ষ থেকে এমন বিবৃতি আসে যে, তার স্বামী, যেমনটা লোকে বলে যে তিনি সমাজে অনাচার ছড়াচ্ছেন, তেমন নন। তিনি কখনোই খোলামেলা চলা এবং অবাধ মেলামেশার পক্ষপাতী নন। তিনি শরঈ পর্দার প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল। এসব লোকের মিথ্যাচার ও অপব্যাখ্যা।
জনাব আবদুল কুদ্দুস সাহেবের কথা তো বলাই বাহুল্য। তিনি এ পর্যন্ত কতগুলো উপন্যাস লিখেছেন। তার রচিত অনেক উপন্যাসের চলচ্চিত্রায়নও হয়েছে। তার অধিকাংশ উপন্যাসই ধর্মীয় মূল্যবোধকে আঘাত করে রচিত। নারীদের ধর্মবিদ্বেষে প্রলুব্ধ করার প্রয়াস তার কম নয়। অথচ কাণ্ড দেখুন, ঔপন্যাসিক আবদুল কুদ্দুস এবং বাস্তবজীবনের আবদুল কুদ্দুসের মাঝে কেমন আকাশ পাতাল ফারাক। তিনি স্ত্রীকে বাইরে বের হতে দেন না। চাকরি করতে দেন না। অথচ তার স্ত্রী উচ্চশিক্ষিতা। শুধু তাই নয়, ব্যক্তি আবদুল কুদ্দুস স্ত্রীর প্রতি খুবই কঠোর। পত্রপত্রিকায়, টেলিভিশনের পর্দায় আজ পর্যন্ত একবারের জন্যও স্ত্রীকে আসতে দেননি; এমনকি, তার ছবিও প্রকাশ হতে দেননি।
প্রিয় বোন, বলুন তো, এমনটা কেন হয়? ...কারণ তিনি ওপরে ওপরে যা-ই বলুন, ভেতরে ভেতরে ভালো করেই জানেন যে, একজন নারীর প্রথম ও প্রধান মৌলিক কর্তব্য হলো একজন মমতাময়ী মা হওয়া, একজন সতীসাধ্বী স্ত্রী হওয়া।
আমরা যেই আবদুল কুদ্দুসের কথা বলছি, কে না জানে, তিনি ছিলেন একজন কর্মজীবী নারীর সন্তান। তার মা বহুল প্রচারিত 'রোয ইউসুফ' পত্রিকায় কাজ করতেন। কিন্তু পুত্র আবদুল কুদ্দুস মাকে আর কাজ করতে দেন না। তিনি চান, মা বাইরের ঝামেলা থেকে মুক্ত হয়ে ঘরে অবসর যাপন করুন।
অবশেষে এমন অনেক মুসলিম নারী আছেন, যারা একসময় তথাকথিত নারী-স্বাধীনতার ফাঁদে পা দিয়েছিলেন। কিন্তু হুঁশ হওয়ার পর, ভণ্ড-প্রচারকের মিথ্যা, প্রতারণা বুঝতে পারার পর, এখন আল্লাহর কাছে তওবা করে আবার ইসলামের সরল সঠিক পথে এসেছেন। আবার নিজে নিজে ধরা দিয়েছেন পর্দাপ্রথার ‘শৃঙ্খলে’, বরণ করে নিয়েছেন ‘চার দেয়ালের বন্দিনীর দশা’।
একসময়ের দুনিয়া কাঁপানো মডেল সাদিরা বাবেল্লি। ছোট পর্দায় ছিলেন হট কেক। আল্লাহ তাকে হেদায়াত দান করেছেন। সর্বশেষ সাক্ষাৎকারে আফসোস সহে বলেছেন, “আমি যখন অভিনয় করতাম, তখন কত চ্যানেল আমার পেছনে পড়ে ছিল। একটি সাক্ষাৎকারের জন্য কত উপহার উপঢৌকন জমে যেত। অথচ আজ আমিই যদি হিজাব পরে নারী-বিষয়ক ধর্ম ও সভ্যতার কথা বলতে চাই, তা হলে একটি চ্যানেলও আমাকে সুযোগ দিতে সম্মত হবে না।”
প্রখ্যাত চলচ্চিত্রশিল্পী শামস বারুদি বলেন, “যখন যশ খ্যাতি অর্থ বিত্তের সবকিছু আমার হাতে ধরা দিল, তখন আমার মনে প্রায়ই একটি প্রশ্ন জাগতে লাগল, এত কিছুর পরও আমি সুখী নই কেন? শামস বারুদি নিজেই নিজের প্রশ্নের উত্তর বলেন, “কারণ আমি বুঝতে পারতাম, আমি এমন একটি কর্ম বেছে নিয়েছি, যা আমার নারীত্বকে কুঁরে-কুঁরে খাচ্ছে প্রতিমুহূর্ত। এটা আমার প্রকৃতির সাথে বেমানান। এরপর থেকে আমি অনেক কাজ ছেড়ে দিতে লাগলাম। এ আশায় যে, আমি আমার নারীত্ব, আমার হারানো সম্মান ফিরে পাব। আমি আল্লাহকে খুব ডাকতাম, যেন তিনি আমাকে এই জগত থেকে দূরে সরিয়ে নেন এবং সত্য ও সুন্দরের পথে পরিচালিত করেন।” তিনি বলেন, “আমি আমার অতীতের স্মৃতিচারণ করতে চাই না। আমি চাই, যদি ওই সময় আমার জীবন থেকে একদম মুছে যেত।”
শামস বারুদি ইসলামের শীতল ছায়ায় ফিরে এসেছেন। তিনি আল্লাহর পথকেই নিজের জীবনপথ হিসেবে বেছে নিয়েছেন। কিন্তু অনিষ্টকারীরা বসে থাকেনি। তারা প্রতিনিয়ত সত্যপ্রাজ্ঞ নারীকে নিয়ে দ্বিধাজাল সৃষ্টি করেছে। কিন্তু যে আল্লাহর আশ্রয়ে নিজেকে সঁপে দেয়, আল্লাহ তার সহায় হন। আল্লাহ শামস বারুদির মনোবল অক্ষুণ্ণ রেখেছেন। তিনি নিজে খরচ করে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ও টিভি চ্যানেলে নিজের অবস্থানের কথা সুস্পষ্ট করেছেন। তিনি সুস্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি তওবা করেছেন। তিনি এই জগত থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। তিনি প্রতিটি মুসলিম তরুণীকে, প্রতিটি মুসলিম নারীকে উদাত্ত আহ্বান জানান ইসলামের পর্দার পাবন্দি করার, ইসলামের বিধিনিষেধকে আঁকড়ে ধরার।১
এমন উদাহরণ পশ্চিমা নারীদের মধ্যেও আছে। ফ্রান্সের বিখ্যাত অভিনেত্রী ব্রিজেট বারদোঁ। পুরো জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন হৈ হুল্লা আর আমোদ ফুর্তিতে। শরীর আর সৌন্দর্যই ছিল জীবনের সবকিছু। কিন্তু জীবনের পড়ন্ত বিকেলে এসে তার আক্ষেপ শুনুন— “জীবন থেকে যে শিক্ষা পেয়েছি তা এই যে, হাজার হাজার আবেগ-উচ্ছ্বসিত প্রলোভনযুক্ত চিঠি, বিমুগ্ধ বিমোহিত কোটি কোটি দর্শকচিত্তের করতালি জীবনের বাস্তবতায় একজনমাত্র বিশ্বাসী পুরুষের ভালোবাসা হতে পারে না, যা আমাকে জড়িয়ে রাখে ভালোবাসায়; যা আমার অন্তরে শান্তি আনে, অভয় দেয়। আমার বিপুল খেতাব, যশ খ্যাতি ছিল। অনেক অর্জন ছিল। কিন্তু জীবনের চরম বাস্তবতায় আমি ব্যর্থ। আমার প্রাপ্তির খাতা শূন্য। আমি তাই মানুষ থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বাকি জীবনটা নীরবে কাটিয়ে দিতে চাই। মিডিয়া থেকে অনেক দূরে।” তিনি আরও বলেন, “আমাকে চেনে এমন অনেক। কিন্তু আমার বন্ধু বলতে যারা আছে, হাতে গোনার মতো। আমার ছেলের কথাই বলি। সে যখন ছোট ছিল, তখন আমি তাকে গুরুত্ব দিইনি; সুতরাং আমি যখন বৃদ্ধা হয়েছি, তখন সে আমাকে গুরুত্ব দেবে এমনটা আমি আশা করতে পারি না।”২
বণিকমহল নারীস্বাধীনতার বিষয়টিকে সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেছে। বাণিজ্যিক প্রচারণায় তাদের কাছে সবচেয়ে কার্যকরী মাধ্যম হলো সংস্কৃতি। পণ্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য বিলাস, স্বল্প-বসনা নারী এবং নারীর উলঙ্গ অর্ধোউলঙ্গ ছবির কোনো জুড়ি নেই। ব্রিটিশ নারী-স্বাধীনতা সংস্থাও এভাবে নারী-স্বাধীনতার নামে নারী-অবমাননার পায়তারা করেছে। বামপন্থী টিমও এ ব্যাপারে প্রচুর প্রতিবাদ জানিয়েছেন। কেননা, তিনিও মনে করেন, এটা কার্যত নারীর অবমাননা।
বড় বড় বস্ত্রালয়গুলোতে নারীদের যেভাবে ব্যবহার করা হয়, তা রীতিমতো উপহাস। ফরাসি ফ্যাশনগার্ল ফাজিয়ান ‘আল মুসলিমুন’ পত্রিকার একটি একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেন, “এ পথে আসা সহজ ছিল। কিংবা আমার কাছে সহজ মনে হয়েছিল। খুব সহজেই খ্যাতির স্বাদ পাই। উপঢৌকনে আমার ঘর ভরে যায়। আমি এত সহজে এত কিছু পাব, স্বপ্নেও ভাবিনি। কিন্তু আমাকে যে মূল্য দিতে হয়েছে, তা অনেক চড়া।
প্রকৃতপক্ষে এখানে সফলতার পথ একটাই—আবেগ অনুভূতি বিসর্জন দিতে হবে, লজ্জা শরম ছেড়ে ফেলতে হবে, বেহায়াপনাকে সক্রিয় করে দিতে হবে, আত্মসম্মানকে গলা টিপে হত্যা করতে হবে; বেশি বোঝা যাবে না, বেশি ভাবা যাবে না। তোমাকে যা ধরে রাখতে হবে —তোমার দেহ, তোমার রূপ-লাবণ্য, তোমার দীপ্তিময় ভরা যৌবন; দেহের সৌন্দর্য ও সুর মূর্ছনা। আকর্ষণ ধরে রাখতে জগতের সব সুস্বাদু খাবার বর্জন করা, পাশাপাশি নিয়মিত বলবর্ধক ও উত্তেজনাকর ড্রাগ ও মেডিসিন গ্রহণ করার কথা বাদই দিলাম।
তারা আমাকে একটা জীবন্ত মূর্তি বানিয়ে রেখেছিল। আমার কাজ ছিল ক্রেতাদের মন মত্তে নিমগ্ন করে তোলা। আমি যেন কোনো জড়পদার্থ ছিলাম, যে নির্দিষ্ট হাসিতে মানুষকে হাসাতে পারে; কিন্তু সে নির্গল্প, নির্জীব; তার কোনো অনুভূতি নেই। সেখানে প্রতিদিন বস্ত্রালয়ের বস্ত্র শরীরে ধারণ করতে হয়; তার আগে দেহ থেকে নারীত্ব ও মনুষ্যত্বের বস্ত্র খুলে ফেলতে হয়। নয়তো এই নিষ্ঠুর পৃথিবী তোমাকে ছুঁড়ে ফেলে দেবে। তুমি যদি কোনো স্টেপ ভুল কর, তা হলে তোমাকে শাস্তি পেতে হবে, যা একই সাথে মানসিক ও শারিরীক!...
একজন ফ্যাশনগার্ল হিসেবে সর্বত্র বিচরণ করেছি। ফ্যাশনের পোশাকে দেহাবরণ করে, নিজের নারীত্বকে বিসর্জন দিয়ে দর্শকদের মনোরঞ্জন করেছি, কিন্তু তারা আমার কেউ নয়, তাদের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই; আমার কষ্ট হতো, যখন দেখতাম, তাদের কাছে আমার ব্যক্তিত্বের কোনো মূল্য নেই। যত মূল্য—আমার গড়নের, আমার পরনের পোশাকের।”১
এককালের স্বনামধন্য ফ্যাশনগার্ল ফজিয়ান এভাবে নিজের জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা ব্যক্ত করেছেন। আল্লাহ তাকে তওফিক দান করেছেন, তিনি সেই অভিশপ্ত জীবনের নরকভোগ থেকে পালিয়ে ইসলামের শীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেছেন।
প্রিয় বোন, একটু তো ভাবুন, পৃথিবীতে বর্বরতার আর কোনো উদাহরণ আছে কি, যা একজন নারীর নারীত্বকে বিসর্জন দেওয়ার চাইতেও নির্মম; যাকে জীবন্ত দাসী বানিয়ে রাখা হয় তার সম্মান ও সম্ভ্রম নিয়ে খেলা করার জন্য, তার নারীত্বকে নিষ্পেষিত করার জন্য, তার লজ্জাকে লালসার বাজারে বলি দেওয়ার জন্য?
পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে কী ভয়াবহ অবস্থা দাঁড়িয়েছে। ইউরোপিয়ান সামাজিক নিরীক্ষণ সংস্থার একটি জরিপ শুনলে আঁতকে উঠতে হয়। তাদের গবেষণা মতে পঁচিশ বছর বয়সী আশি ভাগ ব্রিটিশ নারী একা একা লন্ডনের রাস্তায় চলতে ভয় পান। কারণ ধর্ষণ ও অপহরণের ভয় প্রতিমুহূর্তে তাঁদেরকে তটস্থ করে রাখে। প্রকাশ থাকে যে, এ বয়সের প্রতি চারজন একজন নারী রাজধানীতে রাস্তায় বের হলে আত্মরক্ষার জন্য সাথে চাকু বা পিস্তল রাখেন।২
কানাডার তথ্যমন্ত্রাণালয়ের জনৈক কর্মকর্তা দুঃখ প্রকাশ করেছেন যে, কানাডায় বসবাসরত অর্ধেকের বেশি নারীই যৌন হয়রানি ও দৈহিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। একটি প্রতিবেদনে এসেছে, গোঁড়ামি ও লালসার শিকার হয়ে নারীরা বিভিন্ন প্রান্তে যৌননির্যাতনের শিকার হচ্ছেন অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে। তারা এটাকে কোনো অপরাধ মনে করে না। বরং এটা তাদের দৃষ্টিতে একটি সাজামাত্র। নারীকে ভয় দেখানোর, শাস্তিপ্রদানের বা তার সংশোধনের একটি সাধারণ প্রক্রিয়া। আশ্চর্যের বিষয়, নারীর প্রতি এরকম জঘন্য অপমানকর কর্মকাণ্ডের বিদ্যমানতা সত্ত্বেও ওসব দেশের বিচারব্যবস্থায় নারী উৎপীড়ন, যৌন হয়রানি বা ধর্ষণ বিশেষ কোনো শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে বিবেচিত নয়। কারণ এগুলো সেখানে এখন স্বাভাবিক ব্যাপার।১
জনৈকা আমেরিকান নারী সাংবাদিক হেলেন স্ট্যানবেরি ভ্রমণের উদ্দেশ্যে কায়রো আসেন। প্রায় কয়েক সপ্তাহ এখানে অবস্থান করেন। তিনি কায়রোর বিভিন্ন মাদরাসা, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়; বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান; নারী, পুরুষ ও শিশু-সংক্রান্ত বিভিন্ন সংস্থা ইত্যাদি পরিদর্শন করেন। তার রিসার্চের মূল বিষয় ছিল পরিবার, সমাজ ও নারী পুরুষের বিভিন্নমুখী সমস্যা, উৎপত্তি ও উত্তরণ। ভ্রমণশেষে দেশে ফেরার সময় নিজে একজন খাঁটি পশ্চিমা হয়েও নারী হিসেবে নারী জাতির প্রতি মমত্বের স্বাক্ষর রেখে গেছেন একটি সরল সত্যকে অকপটে স্বীকার করার মাধ্যমে। তিনি লিখেছেন,
“মুসলিম আরব সমাজ নিঃসন্দেহে একটি পূর্ণাঙ্গ ও সুস্থ সমাজ। এই সমাজের পক্ষে এটাই কল্যাণকর হবে যে, তারা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে আঁকড়ে থাকবে। এখানে নারী পুরুষের মাঝে যে যৌক্তিক ব্যবধান ও সীমারেখা রাখা হয়েছে তা কোনোভাবেই মন্দ নয়। এই কয়দিনে এই সমাজের প্রতি আমার অন্তরে যে মুগ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে, তা থেকেই একজন নিঃস্বার্থ হিতাকাঙ্ক্ষী হিসেবে বলছি, আপনারা আপনাদের সামাজিক রীতিনীতি, সভ্যতা সংস্কৃতি এবং চারিত্রিক মূল্যবোধকে অক্ষুণ্ণ রাখার চেষ্টা করুন। আপনারা অবাধ মেলামেশা থেকে বিরত থাকুন। মিথ্যে স্বাধীনতার নামে মেয়েদের বাধা বন্ধনহীন ঝুঁকিপূর্ণ জীবনের দিকে ঠেলে দেবেন না। সত্যি বলতে কি, আপনারা আপনাদের সেই তথাকথিত পরাধীনতাকে ফিরিয়ে আনুন। ইউরোপ আমেরিকার উদারবাদ, বাধা বন্ধনহীনতা ও আধুনিকতা থেকে এটা শত গুণ ভালো। আপনারা অবাধ মেলামেশাকে প্রতিহত করুন। এটা আমেরিকার জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। আমেরিকান সমাজ এখন একটা মৃত সমাজ। সেখানে লম্পট ও ইতরতা ছেয়ে গেছে। সেখানে শুধু অবাধ মেলামেশা ও মিথ্যে স্বাধীনতার বলি হয়ে অসংখ্য সম্ভাবনা ঝরে যায় প্রতিদিন প্রতিনিয়ত।”২
কুয়েতের 'জারিদাতুস সিয়াসিয়াতুল কুয়াইতিয়াহ' পত্রিকার উদ্যোগে জনৈকা জার্মান নারীর একটি সাক্ষাৎকার প্রচার করা হয়। সন্দেহ-নিরসনের জন্য বলছি, ওই নারী একজন অমুসলিম। সাংবাদিক তাঁকে প্রশ্ন করেছেন: 'আপনার দৃষ্টিতে নারীর সুন্দরতম অবস্থানকেন্দ্র কী হতে পারে?' উত্তরে তিনি বলেন, 'ঘর।' একজন পশ্চিমা নারীর মুখে এমন উত্তর শুনে মুসলিম নারী সাংবাদিক কিছুটা হতচকিত হন। তিনি আবার জিজ্ঞেস করেন: 'আপনি কি মনে করেন, সব সময়ই ঘর নারীর জন্য আদর্শ জায়াগা?' তিনি এবার আরও দৃঢ়তার সাথে বললেন: 'হ্যাঁ, আমি মনে করি, সব সময়ই ঘর নারীর জন্য আদর্শ জায়াগা।' এবার সাংবাদিক জানতে চাইলেন: 'ঘরের বাইরে কর্মরত হওয়ার ব্যাপারে কী বলেন?' প্রতিনিধি এবার বললেন: 'মৌলিকততে নারীর সৃষ্টি এজন্য নয়।' সাংবাদিক জিজ্ঞেস করলেন: 'তাহলে সমাজগঠনে নারী পুরুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে কী করে?' প্রতিনিধি বললেন: 'সমাজগঠনে নারী পুরুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য, আমি মনে করি না, বাইরে গিয়ে কাজ করার প্রয়োজন আছে। অন্যভাবেও সেটা হতে পারে। নারী পুরুষকে একটি সুখময় শান্তিময় পরিবার উপহার দেবেন। ঘরের বিষয়ে তাকে নিশ্চিত রাখবেন। সুখে দুঃখে পাশে থাকবেন। অর্জনে উপার্জনে সাহস ও প্রেরণা যোগাবেন। ছেলেমেয়েকে মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তুলবেন। নারী বাইরে গিয়ে কাজ করে সামাজিকভাবে যে উন্নতি সাধিত হবে, এভাবে ঘরে থেকে তার চেয়ে অনেক গুণ বেশি হবে। আমি এ কথাটি আবেগ তাড়িত হয়ে বলছি না। জীবনের তিক্ত বাস্তবতা থেকে বলছি। মূলত নারী বাইরে গিয়ে কাজ করে হয়তো আর্থিকভাবে কিছুটা স্বনির্ভরতা পাবেন; কিন্তু পুরো সমাজ এবং সার্বিকভাবে পুরো নারী জাতি নিঃসন্দেহে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যা আমরা হাতে কলমে পাচ্ছি।'৩
বিখ্যাত ব্রিটিশ লেখিকা লেডি ব্রাউন তার বিখ্যাত 'আসুলুল জিনস ওয়া তবিয়াতুহ' গ্রন্থে লিখেছেন, “পুরুষ প্রকৃতগতভাবে জীবনে সরল। আগেও ছিল। এখনো আছে। পরেও থাকবে। আমরা যতই চেষ্টা করি, এই প্রকৃতিকে বদলাতে পারব না। সমানাধিকারের ডাক দিয়ে বা সভা-সেমিনার মহড়া করে কোনো লাভ নেই। পুরুষ সবল। সবলই থাকবে। নারী দুর্বল। দুর্বলই থাকবে।” বিখ্যাত ইংরেজ নারী গল্পকার ও উপন্যাসিক আগাথা ক্রিস্টি বলেন, “সত্যি বলতে কি, এখনকার নারীরা বোকা। স্বাধিকার ও সম-অধিকার পাওয়ার জন্য সে কত কূটনীতিই না খাটল। কিন্তু ফল কী হলো? আমাদের স্বীকার করতেই হলো, পুরুষের তুলনায় আমরা দুর্বল। সাথে সাথে পুরুষর সাথে কাজ করতে হচ্ছে, ঘাম ঝরাতে হচ্ছে। অথচ এতটা কাল এটা ছিল শুধু পুরুষের কর্তব্য।... আমাদের পূর্ববর্তী নারীরা চালাক ছিল। তখন নারী পুরুষকে এই বিশ্বাসে আসক্ত রেখেছিল যে, সে দুর্বল; সে সব সময় পুরুষের স্নেহ ও ভালোবাসার পাত্রী; সে সবসময় পুরুষের আদর ও আশ্রয় চায়। তখন পুরুষই ছিল পরিবারের মাথা। পুরো পরিবারের সুখের জন্য মৌলিকভাবে দায়িত্বশীল ছিল পুরুষই। কিন্তু আজ কী হচ্ছে? নারী স্বাধীনতা চায়। পুরুষের অভিভাবকত্বকে আধিপত্য বলে অস্বীকার করে, অভিভাবকত্ব মানে না। আন্দোলন করে —দুর্বার আন্দোলন। কিন্তু পুরুষের অভিভাবকত্বকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে যে স্বাধীনতা পায়, সে আর-এক যাযাবর বিড়ম্বনা। ... নারী বাধা না মেনে সর্বক্ষেত্রে পুরুষের সাথে পাল্লা দিতে চায়। এখন তাকে সবখানে নামতে হয়। যা তার নামার মতো, তাতেও। যা তার নামার মতো নয়, তাতেও। ফল কী হয়? জীবন থেকে সুখ বিদায় নেয়, নারী ক্লান্ত হয়। ... অথচ আগের জীবনধারায় পুরুষ ছিল নারীর সুখ ও সম্মানের অতন্দ্র প্রহরী।”
প্রিয় বোন, জীবনের তিক্ততা পশ্চিমা নারীদের ঘোর কাটিয়েছে। তাদের টনক নড়েছে। তারা এখন প্রকৃতির কোলে ফিরে আসতে চান। কিন্তু পারেন না। তারা এখন অকপটে নারী ও নারীপ্রকৃতিকে স্বীকার করেছেন। সেই সাথে পশ্চিমা সভ্যতার নারীস্বাধীনতার স্বরূপ উন্মোচন করেছেন। তারা চিৎকার করে বলছেন, তারা একজন পুরুষের কর্তৃত্ব (অভিভাবকত্ব ও তত্ত্বাবধান) থেকে বাঁচতে গিয়ে—হোক তিনি স্বামী, পিতা কিংবা ভাই— অনেক পুরুষের সেবাদাসী ও যৌনদাসীতে পরিণত হয়েছেন।
সুতরাং নারীস্বাধীনতার প্রবক্তাদের বলি, মুসলিম নারী তো আপনাদের কাছে গিয়ে পরাধীনতার অভিযোগ করেনি, কখনো কোনো অনুরোধও করেনি, তা হলে এই উপযাচকতা কেন? এত দয়া আপনাদের? তা হলে শুনুন, মুসলিম নারীর কোনো কষ্ট নেই শুধু আপনাদের উড়ে এসে জুড়ে বসা ছাড়া; দয়া করে আমাদের জীবনটাকে আর সংকীর্ণ করে তুলবেন না; আপনাদের জ্বালায় আমরা অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছি; আপনাদের কারণে যেখানে সেখানে পর্দানশীন নারীকে মুখ খুলতে হয় আপনাদের পশুবৃত্তির প্রমোদনের জন্য। মুসলিম নারীর যদি কোনো অভিযোগ থেকে থাকে, তো এটাই তাদের অভিযোগ। দয়া করে আপনাদের সাহায্যের হাতটি গুটিয়ে নিন। মিষ্টি কথা বলে আমাদের সরল মেয়েদের মাথা খাওয়া বন্ধ করুন। ছলচাতুরি ছেড়ে দিন। নারী-স্বাধীনতার নামে নারীকে জীবন্ত দাসী বানানোর যে ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেন, তা থেকে বিরত থাকুন। ইসলামের পর্দাপ্রথা থেকে আমরা মুক্তি চাই না। আপনাদের ভ্রান্ত খেলা থেকে মুক্তি চাই।
প্রাচ্যের নারীদের বলি, তোমরা ঘরে ফিরে এসো। আবার সেই ঐতিহ্যের মাঝে ফিরে এসো। ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের বিরুদ্ধে পশ্চিমা পদলেহীরা মুখ থুবড়ে পড়ুক। নারী-সংস্থা, নারী-সংগঠন ও নারী-আন্দোলনের নেতা-নেত্রীদের বলি, তোমরা আওয়াজ তোলো; উচ্চ কণ্ঠে আওয়াজ তোলো—মুসলিম নারী যেন ঘরে ফিরে আসে। আবার যেন ঘরের মালকিন হয়ে সমাজের তাজ মস্তকে ধারণ করে। মুসলিম নারী আবারও স্বামীকে সুখী করাকেই জীবনের ব্রত বানিয়ে নিক। আনুগত্য ও ভালোবাসায় স্বামীর মনের সুখ ও চোখের শীতলতা হয়ে থাকুক। নারী তার সহজাত স্নেহ, মমতা ও ভালোবাসা আবার ফিরে পাক—যা মিথ্যে প্রচারণার মোহে নিখোঁজ হয়ে গেছে। যার আশায় বুক বেঁধে আছে নিষ্পাপ সন্তানরা। যার প্রেরণায় একজন মা সন্তানের সুখের জন্য যাপন করেন বিনিদ্র রজনী। অফুরন্ত ভালোবাসায় সিক্ত করেন সন্তানের জীবনকে।
স্বাধীনতার স্বাদ আস্বাদন করতে গিয়ে পশ্চিমা নারীদের যে করুণ পরিণতি হয়েছে, মুসলিম নারীরা তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করুক। নয়তো ওই দিন বেশি দূরে নয়, যেদিন এখানেও ওই একই অবস্থা বিরাজ করবে। ভাগ্যবান তো সে, যে অন্যের দেখে শিক্ষা গ্রহণ করে। কিন্তু দুর্ভাগা সে, যে নিজে পতিত হওয়া ছাড়া সতর্ক হয় না।
প্রিয় বোন, আল্লাহ আপনাকে চোখ দিয়েছেন দেখার জন্য। দয়া করে দেখুন। চর্মচোখে দেখুন, মর্মচোখে দেখুন, ইসলামী শরীয়াতের সুমহান জীবনদর্শন দেখুন। এ কোনো মানব রচিত জীবনবিধান নয়; এ প্রত্নপ্রদত্ত পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। এ সর্বময়, সর্বজনীন, সর্বকালীন। এ সুনিশ্চিত, নিখুঁত। আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করেছেন, আমাদের কর্ম ও কীর্তিকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি জানেন। আমরা জানি না।
প্রিয় বোন, এই বিশ্বাস ও মূল্যবোধ হৃদয়ে ধারণ করুন। কথাগুলো যখন বুঝে আসবে, এবং অবশ্যই বুঝে আসবে, তখনই এই ধর্মের, আপনার এই ধর্মের মাহাত্ম্য, আপনা-আপনি অনুধাবন করবেন অনায়াসে। অচিরেই আপনার হৃদয়ে অনুরণিত হবে কবির এই কথাগুলো,
ম্যাহলান ফামা হাজাল্লাযী ক্বদ গুররাকুম
ইল্লা সারাবান আওলা তারাউনাল গারবা
কাইফা গাদাল রিজালু বিহি যিআবান
আলা তারাউনা উরাল আখলাক্বি তাশতাক্বিবু
ইনশাক্বিবান ইন তারগাবু লি আমানিকুম
সাওনান ওয়া আইশান মুসতাত্বাবান
ফাদাঊস সুফূরা লি আহলিহি ওয়ারজিঊ
আলাইহিমুল বিক্বানা
এ কী করছ তুমি?
আলো ভেবে আলোয়ার মরুভূমি—
এ যে ভ্রম, এ যে ধোঁকা!
দ্যাখো, দ্যাখো!
ওখানে মানুষ অমানুষ,
ওখানে পুরুষ পশু, হায়েনা;
ওখানে চরিত্রের গিঁঠ ছেঁড়া ফাঁড়া;
ওখানে মোহ, ওখানে মরীচিকা!
চাও কি মায়ের সম্মান, বোনের সুরক্ষা,
সুন্দর সুখকর জীবন?
তবে থামো, আর ছুটো না,
আর ছুটে ছুটে ঝুঁকে ঝুঁকে মোরো না।
এ নগ্নতা বন্ধ করো
পর্দাকে আঁকড়ে ধরো।
প্রিয় বোন, আর কত ছুটবেন মরীচিকার পেছনে? এবার তো থামুন। এবার তো ফিরে আসুন। ফিরে আসুন আপনার প্রতিপালকের দিকে। ইসলামের ছায়াদার ফলদার ফুলদার বৃক্ষের নিচে। এখানে অবলোকন করুন একটি সুন্দর পৃথিবী। এখানে উপভোগ করুন একটি সুন্দর জীবন।
জেনে রাখুন, এখানে কালের গর্ব আপনি, আপনি মুসলিম নারী; এখানে সৃষ্টির অহংকার আপনি, আপনি মুমিন নারী। আপনারাই ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছেন এ উম্মাহর ভবিষ্যৎ—আমাদের নতুন প্রজন্ম। এবার অবিচল মনে আর একবার হৃদয়ে আওড়ান আমাদের প্রিয় প্রভুর মহা বাণী,
كُذٰلِكَ يَضْرِبُ اللَّهُ الْحَقَّ وَالْبাটِلَ ۚ فَأَمَّا الزَّبَدُ فَيَذْهَبُ جُفَاءً ۖ وَأَمَّا مَا يَنْفَعُ النَّاسَ فَيَمْكُثُ فِي الْأَرْضِ ۚ كَذَلِكَ يَضْرِبُ اللَّهُ الْأَمْثَالَ
অর্থ : এভাবেই আল্লাহ্ দৃষ্টান্ত দিয়ে থাকেন সত্য ও মিথ্যার। আবর্জনার ফেনা নিমেষেই শেষ হয়ে যায়। কিন্তু যা মানুষের জন্য উপকারী তা ওপরেই থেকে যায়। এভাবেই আল্লাহ্ তুলে ধরেন সুন্দর দৃষ্টান্ত। —সূরা রাদ : ১৭
টিকাঃ
১. আন্ডারউড হিওয়ার : ১/৯৯।
২. আদ্দায়তুল হিয়ার: ২/২১।
১. কিতাবুল হিয়া মিন আলামিন ওয়ালাদ ইলা রিহাবিল ঈমান: ৬৯-৬৯।
২. রিসালাতুন ইলা হাওয়া: ৩৪/২৪-২৫।
১. মিস্ আল্লামিন ওমারা ইলা রিহাবিল ঈমান: ১২-১৩।
২. সুরাতুল নিওয়া-২৫: ২৪।
১. সুরাতুল ফিতরাহ: ৬৬।
২. রিসালাতুন ইলা হাওয়া: ৪/১২০।
৩. সুরাতুল ফিতরাহ: ১৩।
বিগত কয়েক শতাব্দী মুসলিম নারী আপন মহিমায় ছিল ভাস্বর। পর্দার আড়ালে সুরক্ষিতা মণি-মুক্তোর মতো দেদীপ্যমান। ঘরের সিংহাসনে সমাসীনা মহিমান্বিতা মালকিন। ঘরে বসে গড়ে মহামানব, মহাবীর, মহাজ্ঞানী। মুসলিম নারীর এই অবিচল অবস্থান নিশ্চিত করেছিল মুসলিম জাতির অপ্রতিরোধ্যতা, অপ্রতিদ্বন্দ্বিতা; নিশ্চিত করেছিল মুসলিম দুর্গের দুর্ভেদ্যতা, দুর্লঙ্ঘ্যতা।
তাই ঔপনিবেশিক গোষ্ঠী ছিল হয়রান পেরেশান। তাদের মুখখাওয়া ও গুণগাওয়া পদলেহীরাও ছিল হতবাক হতবুদ্ধি। মুসলিম দুর্গের দুর্ভেদ্যতার সামনে তাদের সকল শ্রম, সকল সাধনাই যেন পণ্ড হয়ে যায়। কিন্তু যারা ইসলামের আজন্ম শত্রু, তাদের কি আর সহ্য হয়? তারা কি আর বরদাশত করতে পারে? মুসলিম উম্মাহর শক্তি, সামর্থ্য, সহনশক্তি, আত্মিক বিপুল সমৃদ্ধি, জাগতিক বিশাল শান-শওকত তাদের কি হিংসার অনলে পোড়ায় না?
অবশেষে তারা মরণকামড় দিতে উদ্যত হলো। ষড়যন্ত্র ও শলাপরামর্শের মহড়া দিতে শুরু করল। তাদের একটাই লক্ষ্য —কী করে মুসলিম সমাজের মূলে কুঠারাঘাত করা যায়? তাদের সমগ্র শক্তি নিয়োগ করল শুধু একটি বিষয় উদ্ঘাটনে—যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী কী করে একটি জাতি এমন অপ্রতিরোধ্য থাকতে পারল? কী এমন আছে যা তাদেরকে বার্ধক্য, জরাজীর্ণতা, ঘুশেঁ ধরা ও পোকায় খাওয়া থেকে রক্ষা করছে এতকাল?
অবশেষে তারা আবিষ্কার করে ফেলল। মুসলিম জাতির শক্তির রহস্য উদ্ঘাটন করে ফেলল। তারা আবিষ্কার করল, মুসলিম জাতির শক্তির রহস্য—আর কিছু নয়, মুসলিম নারী—যে নারী বিলকুল কিছু উশৃঙ্খলতাহীন, অসাধারণ কিছু বৈশিষ্ট্যে বিশিষ্টা। যার মনোবল ইস্পাতকঠিন, অবিচলতা পর্বতপ্রমাণ। যিনি সত্যকথনে নির্ভয়, নির্মোহা। যিনি পারেন সত্যিকার মুমিন ও মুত্তাকী একটি নতুন প্রজন্ম জাতিকে উপহার দিতে প্রতিটি যুগে, প্রতিটি শতাব্দীতে; যারা আপন ঈমান ও আকীদার প্রতি গভীরভাবে শ্রদ্ধাশীল, এবং ধর্ম ও বিশ্বাসের মূলে কঠিনভাবে গ্রথিত।
তারা মুসলিম নারীকে টার্গেট করল। ছলে বলে কৌশলে তাকে নিজ ধর্ম ও বিশ্বাসের প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তুলতে লাগল। টোপ হিসেবে ব্যবহার করল তথাকথিত প্রগতি নামের আপাতমধুর স্লোগান।
গ্ল্যাডস্টোন, ব্রিটিশ (তৎকালীন) প্রধানমন্ত্রী, ব্রিটেনের গণসভায় দম্ভভরে ঘোষণা দিয়েছিলেন, “যতদিন মুসলিম নারীর হিজাব উঠিয়ে দেওয়া না যাবে এবং যতদিন মুসলমানদের কুরআন বন্ধ করা সম্ভব না হবে ততদিন প্রাচ্যের অবস্থা আমাদের অনুকূলে আসবে না।”১
আর্নেস্ট লুথার ১৯০৫ সালে কায়রোতে প্রতিষ্ঠিত খ্রিস্টান মিশনারিতে নিয়োজিত কর্মী, পরামর্শক ও তত্ত্বাবধায়ীদের মুসলিম বিশ্বে কীভাবে মিশনারির তৎপরতা চালাতে হবে তার দিক-নির্দেশনামূলক বক্তব্যে বড় রকমের মেজাজ নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন, “আপনারা কাজ চালিয়ে যান। হতাশার কিছু নেই। বরং আমরা আশার আলোই দেখতে পাচ্ছি। কেননা, বাস্তবতা এই যে, মুসলমানদের মাঝে পাশ্চাত্য সভ্যতা, ইউরোপীয় জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং নারী-স্বাধীনতার প্রতি ভীষণ উৎসাহের সৃষ্টি হয়েছে।”
আন্না মিলিগান, খ্রিস্টধর্মের জনৈকা নারী স্বেচ্ছাসেবক, খুব আনন্দের সাথে মন্তব্য করেছেন, “আমরা কায়রোর মহিলা কলেজে একসাথে অনেক মেয়েকে আমাদের সারিতে জড়ো করতে সক্ষম হয়েছি। এদের অধিকাংশের পিতা ও অভিভাবক হলো পাশা। সত্যিই খ্রিস্টান মিশনারিরা একসাথে এতগুলো মুসলিম মেয়ে পাওয়া দুষ্কর। এই বিদ্যালয় থেকে মুসলিম দুর্গে আঘাত হানার এটাই মোক্ষম সময়।”২
মুসলিম নারী পর্যন্ত পৌঁছার জন্য শুরু হলো ইসলামবিদ্বেষীদের ছক আঁকা এবং সে অনুযায়ী কাজ করা। তারা প্রথমে মিশরের মেধাবী মুসলিম তরুণ-তরুণীদের শিকার করা শুরু করল। তারপর নিজেদের উদ্যোগে পাশ্চাত্যের ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের মতো উন্নত দেশগুলোতে উচ্চ শিক্ষার জন্য পাঠাতে লাগল। আজকের রিফায়াহ তাহতাবী, কাসিম আমিন, হুদা শারাভি কিন্তু এসবেরই পরম্পরা।
এরা পশ্চিমা দেশগুলোতে থেকে পশ্চিমা সংস্কৃতি ও সভ্যতা রপ্ত করে দেশে ফেরে। তারপর নিজের দেশের তরুণ-তরুণীর মাথা খাওয়া শুরু করে। বড় নির্লজ্জভাবে নিজ দেশের সভ্যতা সংস্কৃতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করতে থাকে। সেই সাথে পশ্চিমা নোংরামির গুণগানে থাকে পঞ্চমুখ। ‘যেন বাপ-চাচা, মা-খালা সব কুয়োর ব্যাঙ; তিনি এসেছেন সাগর ঘুরে।’
এই যে রিফায়াহ তাহতাবী! তিনি কী করলেন? একদম নির্লজ্জের মতো প্রকাশ্যে ঘোষণা দিলেন, “খোলামেলা চলা আর ছেলেমেয়ে অবাধ মেলামেশা করা এতে খারাপ কী আছে? ইউরোপের রাস্তায় যদি নাচগান কর, তা হলে একে পাপ বলে না। একে বলে তারুণ্য, উচ্ছলতা।”
তারই ভাবশিষ্য কাসিম আমিন ফ্রান্স থেকে ফিরতে না ফিরতেই রাতারাতি মহামতি বনে গেলেন একটি বই লিখে—তাহরীরুল মারআহ (নারী-স্বাধীনতা)। বইটি যেন তাক লাগিয়ে দিল পুরো মিশরবাসীকে। তবুও অবাক লাগে, তিনি যে নারী-স্বাধীনতার ডাক দিলেন, তার মূল উপজীব্য নাকি এই একটি বাক্য—‘আমি সেই দিনের অপেক্ষায় আছি, যেদিন মিশরের মেয়েরাও ধর্মকথা ও পর্দাপ্রথার বলয় ভেঙে বেরিয়ে আসবে এবং আমার ‘ইউরোপিয়ান সিস্টার’দের মতো ‘মুক্ত বিহঙ্গ’ হয়ে উদার আকাশে উড়াল দেবে।’
আরও আশ্চর্যের বিষয়, নারী-স্বাধীনতার নামে মিশরের মুসলিম নারীদের সাথে যারা ফ্রড খেলা শুরু করেছিলেন, তাদের দলে যে শুধু পুরুষই আছেন তা নয়, নারীও আছেন। হুদা শারাভি। সে-সময়ের নারী আন্দোলনের অবিস্মরণীয় নাম। প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের বিভিন্ন নারী সংস্থায় ছিল তার দাপুটে বিচরণ। ১৯২৩ সালে ইতালির রাজধানী রোম নগরীতে প্রথম যে নারী-বিষয়ক আন্তর্জাতিক সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল তিনি সেই সেমিনারেও উপস্থিত হয়েছিলেন। মিশরে ফিরতি পথে সফর করেছিলেন সমুদ্রে। জাহাজে উঠে মিশরের প্রথম মুসলিম নারী হিসেবে হাজার বছরের মুসলিম ঐতিহ্যকে লাথি মেরে মুসলিম জাতির গর্ব, অহংকার ভেঙে চুরমার করে নিজের মাহাত্ম্য, নিজের আভিজাত্যের প্রতীক, যা তাকে চির সম্মানে ভূষিত করে রেখেছিল এতটা কাল, সেই হিজাবটি খুলে ফেললেন এবং সামনে ছুটে চলা জাহাজ থেকে পেছনে উড়ে ফেলে দিলেন—অগণিত পরপুরুষের সামনে লক্ষ কোটি মুসলিম নারীকে অপমানিত করে, ‘পর্দা প্রথার শৃঙ্খলা’ ভেঙে বেরিয়ে পশ্চিমা ‘মুক্ত বিহঙ্গ’ হয়ে, চৌদ্দশো বছরের রক্তমাখা মুসলিম শাহী কাফেলাকে পদদলিত করে। বিনিময়ে যা পেলেন তা কিছু ফিরিঙ্গিপনা বাহবা ও করতালি, এবং কিছু নীরব নিস্তব্ধ ব্যথিত হৃদয়ের রক্তক্ষরণ। কিন্তু তার চোখে মুখে যা ছিল তা কোনো অজানা অহংকারের স্ফূর্তি বৈ কী!
তিনি ফিরে এলেন কায়রোতে। বিশ্বজয়ের আনন্দ নিয়ে। তথাকথিত নারী-আন্দোলনের মহানায়িকা হয়ে। ইতালির সেমিনার থেকে অর্জিত শিক্ষার ফলস্বরূপ প্রতিষ্ঠা করলেন একটি সংস্থা—মিশরীয় নারী ঐক্য। সংস্থার মূল সুর যেন ইতালির সেমিনার থেকেই ভেসে আসে। নারীর অধিকার চাই। সমান অধিকার চাই। পুরুষের সাথে মিলেমিশে কাজ করলে ক্ষতি কী? পোশাক-আশাক কেমন হবে, কীভাবে হবে সেটা আমার ব্যাপার, এখানে বাঁধাবান্ধি কীসে? কীসের হিজাব, কীসের নেকাব? তালাকের অধিকার চাই। পুরুষের অভিভাবকত্ব মানি না। পুরুষ যদি চারটে বউ রাখতে পারে তা হলে আমরা...? ইত্যাদি ইত্যাদি অন্যান্য আবর্জনা সম সব কথাবার্তা। প্রবৃত্তির অনুগামী হলে যা হয়। অনেকটা শিয়ালের ছদ্মবেশের মতো। বুঝে হোক না বুঝে হোক, প্রোপাগান্ডায় সুর মেলানোই আধুনিকতা। সুর না মেলালেই সেকেলে, কূপমণ্ডূক, ধর্মযাজক, কুসংস্কারাচ্ছন্ন ইত্যাদি।
মিশরের এই নারী-আন্দোলনের প্রতি পশ্চিমা দেশগুলো উৎসুক ছিল তাক লাগানোর মতো। এক কথায় তারা মুক্ত হস্তে দান করা শুরু করে দিল। ইউরোপীয়রা নিজ মিশরে চলে এলেন মিশরের নারী-আন্দোলনের অগ্রগতি এবং কর্মতৎপরতা পর্যবেক্ষণের জন্য।
হুদা শারাভির আন্দোলনকে গতিশীল করতে এগিয়ে এলেন দুরিইয়াহ শাফিক। প্রাচ্যের নিয়মনীতিকে তিনিই সবচেয়ে বেশি দুঃসাহসিকতার সাথে আঘাত করতে লাগলেন। পশ্চিমা নারীর অনুসরণই যেন তার কাছে জীবনে সফল হওয়ার একমাত্র চাবিকাঠি। তিনি ধর্মহীন ভাষায় ঘোষণা দিলেন, ‘আমরা সত্যিই অনুসরণের যোগ্য, আমরা তাদেরই অনুসরণ করব। মিশরীয় নারীদের অনুসরণের যোগ্য একমাত্র পশ্চিমা নারীরাই। বিশেষত ব্রিটেনের মহারানী।’
দুরিইয়াহ শাফিকের দলে তাঁর পরে আরও একজন মহামতির আবির্ভাব হলো। আমিনা সায়িদ। তিনি নারীবিষয়ক একটি পত্রিকা বের করতে লাগলেন। নাম দিলেন হাওয়া (ইভ)। হাওয়া নামের ‘হাওয়া’ দিয়েই পশ্চিমা বিষ ঢুকিয়ে দিতে লাগলেন মিশরীয় নারীদের মনে। তিনি স্বামী এবং অভিভাবকের সাথে অবাধ্যতা, হঠকারিতা ও স্বেচ্ছাচারিতার উসকানি দিতে লাগলেন চিমটি কাটার মতো করে। অজুহাত—পুরুষের আধিপত্যকামিতা। দাবি—দাসীত্ব থেকে মুক্তি, আর একটু ইনিয়ে-বিনিয়ে, মানসিক দাসত্ব থেকে মুক্তি। তার বিদ্রোহের শিকার হলো ইসলামের মাহাত্ম্যপূর্ণ শৈলী—পর্দা ব্যবস্থা। বিদ্রোহের শিকার হলো মুসলিম নারীর সবচেয়ে বড় গুণ, সবচেয়ে বড় মাহাত্ম্য—সতীত্ব। তিনি পর্দাব্যবস্থা নিয়ে যে শ্লেষাত্মক উক্তিটি করেছেন, তা খুবই দুঃখজনক। তিনি বলেছেন: “মেয়েরা পুরো শরীর ঢেকে ভূতের মতো হয়ে কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসবে এটাই কি ইসলাম? একটা জীবন্ত মেয়েকে না মরতেই কফিনে পরিয়ে দেওয়া কি ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য খুবই জরুরি?”
ঔপনিবেশিক গোষ্ঠীর ভাবশিষ্যরা নারী-স্বাধীনতা ও নারীমুক্তির জোর প্রচারণা চালাতে থাকলেন। তাদের নির্লজ্জ শব্দপ্রয়োগের চাতুর্য, মনগড়া হাঁকডাকের তর্জন-গর্জন অনেক মিশরীয় মেয়েকে মোহাচ্ছন্ন করল। অনেক মেয়েই পর্দার বিষয়ে এখন স্বেচ্ছাচারী, হঠকারী। তারা প্রথমে হাত ও মুখ খোলা শুরু করে। তারপর মাথা, তারপর পায়ের গোছা, তারপর রান। শালীনতার জন্য সাধারণ ভদ্রতা বোধও বিদায় নেয় মাঝামাঝি কোনো পর্যায়ে। নামে মাত্র যা থাকে—শুধুই ফ্যাশন।
ধীরে ধীরে বিষয়টি গড়াল ধর্মীয় বিধিনিষেধ এবং সামাজিক রীতিনীতিগুলোকে উপেক্ষা করে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা পর্যন্ত। আজ রাস্তাঘাট দোকানপাট শপিংমল থেকে শুরু করে লেক পাড় বা ধর্মীয় বিদ্যাপীঠ—কোনো কিছুই অশ্লীলতামুক্ত নয়। আর বিনোদনের নামে অশ্লীলতার জন্যই সেসব জায়গার উৎপত্তি হয়েছে সেসব এখন রীতিমতো...। আল্লাহ্ মাফ করুন।
পর্দাবিদ্বেষীরা চরিত্রে বন্ধনহীন এক জাতীয় লাগামহীন পাগলা ঘোড়ায় পরিণত হলো। কর্মমুখর ব্যস্ত সড়কে, ব্যস্ত শহরে, ব্যস্ত অফিসে পুরুষের ভিড়ে নারীরাও ছুটে পড়ল। স্কুল কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়ে সহশিক্ষার প্রতিযোগিতা শুরু হলো। কলকারখানার বড় বড় যন্ত্রপাতির বিকট আওয়াজে নারী-পুরুষও ঘুরপাক খেতে লাগল একসাথে। কিছু নির্ভরতা, কিছুটা স্বাধীনতা, কিছুটা আনন্দ ভুলিয়ে দিল নিজের ঘরকে, নিজের সন্তানকে, নিজের স্বামীকে। ক্ষণিকের এই মায়ামোহে নারীরা ডুবে সরিয়ে দিল তার প্রকৃতিপ্রদত্ত দায়িত্ব ও কর্তব্য থেকে। সে যে কারও মা, সে যে কারও মেয়ে, সে যে কারও স্ত্রী, সে যে কারও বোন; তার যে একটা ঘর আছে, সে যে কোনো ঘরের মালকিন, দূর থেকে দেখা মরীচিকা সবই বিস্মৃত করল তাকে।
নারীরা অবাধ্য হলো। আগ্রহের অবাধ্য হলো। ঘর ছাড়ল। সম্মানের আসন থেকে নেমে এল। ছুঁড়ে ফেলে দিল মাহাত্ম্যের মুকুট। খুলে ফেলে দিল মাথার তাজ—হিজাব, নেকাব। মনে মনে মনগড়া পাওয়ার মতো হয়ে গেল মুক্ত স্বাধীন। পুরুষ তার পেছনে ছোটে এই তার গর্ব। ছেলেরা তার জন্য জীবন দিতে চায় এটাই সফলতা। প্রবৃত্তিকামীরা প্রশংসা করে গদগদ হয়। রুগ্ন মনেরা হাত বাড়ায়, লম্ফঝম্ফ করে। বোকা মেয়ে আনন্দে আত্মহারা। ছদ্মবেশী ছলাকলায় মনে আনন্দ ধরে না। সুখময় মেলামেশায় যেন বিশ্ব জয় জয়ে রূপ নেয়। তাই এতেও হয় না; নাচে, গায়, অভিনয় করে, ফ্যাশন করে। আরও কত কী!
কিন্তু ফল কী হয়, বোন? যখন ঘোর কেটে যায়, যখন জীবন যৌবন সব শেষ হয়ে যায়, তখন নিজেকে আবিষ্কার করে তিক্ত বাস্তবতার কোন কালো অন্ধকারে। দেখে, সে কোনো স্বার্থের বলি, কারও লালসার বলি। খুব সস্তায় অন্যের হয়ে কাজ করেছে সে। কোনো ষড়যন্ত্রের শিকার, কোনো কুচক্রীর ক্রীড়নক। যে কুচক্র, যে ষড়যন্ত্র তারই বিরুদ্ধে, তারই জাতির বিরুদ্ধে, তারই দেশের বিরুদ্ধে। এ কুচক্রের চাকা আবর্তিত হয়েছে মুসলিম পরিবারব্যবস্থাকে ভেঙে দিতে, মুসলিম সমাজব্যবস্থাকে গুঁড়িয়ে দিতে। একটু সুখের কারণে বড় চড়া মূল্য দিতে হলো তাকে। নিজের সম্মান, নিজের সম্ভ্রম, নিজের সবকিছুর সাথে সাথে নিজের দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ।
আর তার পৃষ্ঠপোষকরা, যারা বাহবা করতালি ও মিথ্যা স্তুতি দিয়ে উৎসাহ যুগিয়েছিল, অর্থ খ্যাতি ও সম্ভাবনার জগতে ডাহুক হয়ে ডাক ছেড়েছিল, কথার ফুলঝুরিতে ষোড়শী কুমারীদের মাতিয়ে রেখেছিল, তারাই প্রথম তাকে উপেক্ষা করে। তাদের কাছে তার কোনো মূল্য থাকে না। সত্যিই, ওসব লোকের কাছে চামড়া-জড়া বুড়ির কী বা মূল্য থাকতে পারে?
বলা উচিত, এমন উদাহরণ কম নয় যে, অনেকে নারী-স্বাধীনতার জোর প্রচারণা চালান; চাতুর্যের সকল শৈলী প্রয়োগ করে নারীকে ধর্ম ও বিশ্বাসের প্রতি বিতশ্রদ্ধ করে তোলেন; অথচ ব্যক্তিজীবনে নিজেই নারী-স্বাধীনতা নামের তামান্না থেকে মুক্ত। এই যে কাসিম আমিন। তিনি মিশরে নারী স্বাধীনতার নামে পর্দার প্রথাগত ভীতির কেমন বিরোধিতা করেছেন। অথচ নিজের স্ত্রীকে পর্দারপ্রথা শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করতে দেননি। এমনকি, নিজের ছড়ানো প্রোপাগান্ডার ব্যাপারে নিজের ঘরানা দের রেখেছেন সম্পূর্ণ অন্ধকারে। তাই তো তার স্ত্রী শরঈ পর্দার পূর্ণ পাবন্দি করেন। শুধু তাই নয়, প্রায়ই তার পক্ষ থেকে এমন বিবৃতি আসে যে, তার স্বামী, যেমনটা লোকে বলে যে তিনি সমাজে অনাচার ছড়াচ্ছেন, তেমন নন। তিনি কখনোই খোলামেলা চলা এবং অবাধ মেলামেশার পক্ষপাতী নন। তিনি শরঈ পর্দার প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল। এসব লোকের মিথ্যাচার ও অপব্যাখ্যা।
জনাব আবদুল কুদ্দুস সাহেবের কথা তো বলাই বাহুল্য। তিনি এ পর্যন্ত কতগুলো উপন্যাস লিখেছেন। তার রচিত অনেক উপন্যাসের চলচ্চিত্রায়নও হয়েছে। তার অধিকাংশ উপন্যাসই ধর্মীয় মূল্যবোধকে আঘাত করে রচিত। নারীদের ধর্মবিদ্বেষে প্রলুব্ধ করার প্রয়াস তার কম নয়। অথচ কাণ্ড দেখুন, ঔপন্যাসিক আবদুল কুদ্দুস এবং বাস্তবজীবনের আবদুল কুদ্দুসের মাঝে কেমন আকাশ পাতাল ফারাক। তিনি স্ত্রীকে বাইরে বের হতে দেন না। চাকরি করতে দেন না। অথচ তার স্ত্রী উচ্চশিক্ষিতা। শুধু তাই নয়, ব্যক্তি আবদুল কুদ্দুস স্ত্রীর প্রতি খুবই কঠোর। পত্রপত্রিকায়, টেলিভিশনের পর্দায় আজ পর্যন্ত একবারের জন্যও স্ত্রীকে আসতে দেননি; এমনকি, তার ছবিও প্রকাশ হতে দেননি।
প্রিয় বোন, বলুন তো, এমনটা কেন হয়? ...কারণ তিনি ওপরে ওপরে যা-ই বলুন, ভেতরে ভেতরে ভালো করেই জানেন যে, একজন নারীর প্রথম ও প্রধান মৌলিক কর্তব্য হলো একজন মমতাময়ী মা হওয়া, একজন সতীসাধ্বী স্ত্রী হওয়া।
আমরা যেই আবদুল কুদ্দুসের কথা বলছি, কে না জানে, তিনি ছিলেন একজন কর্মজীবী নারীর সন্তান। তার মা বহুল প্রচারিত 'রোয ইউসুফ' পত্রিকায় কাজ করতেন। কিন্তু পুত্র আবদুল কুদ্দুস মাকে আর কাজ করতে দেন না। তিনি চান, মা বাইরের ঝামেলা থেকে মুক্ত হয়ে ঘরে অবসর যাপন করুন।
অবশেষে এমন অনেক মুসলিম নারী আছেন, যারা একসময় তথাকথিত নারী-স্বাধীনতার ফাঁদে পা দিয়েছিলেন। কিন্তু হুঁশ হওয়ার পর, ভণ্ড-প্রচারকের মিথ্যা, প্রতারণা বুঝতে পারার পর, এখন আল্লাহর কাছে তওবা করে আবার ইসলামের সরল সঠিক পথে এসেছেন। আবার নিজে নিজে ধরা দিয়েছেন পর্দাপ্রথার ‘শৃঙ্খলে’, বরণ করে নিয়েছেন ‘চার দেয়ালের বন্দিনীর দশা’।
একসময়ের দুনিয়া কাঁপানো মডেল সাদিরা বাবেল্লি। ছোট পর্দায় ছিলেন হট কেক। আল্লাহ তাকে হেদায়াত দান করেছেন। সর্বশেষ সাক্ষাৎকারে আফসোস সহে বলেছেন, “আমি যখন অভিনয় করতাম, তখন কত চ্যানেল আমার পেছনে পড়ে ছিল। একটি সাক্ষাৎকারের জন্য কত উপহার উপঢৌকন জমে যেত। অথচ আজ আমিই যদি হিজাব পরে নারী-বিষয়ক ধর্ম ও সভ্যতার কথা বলতে চাই, তা হলে একটি চ্যানেলও আমাকে সুযোগ দিতে সম্মত হবে না।”
প্রখ্যাত চলচ্চিত্রশিল্পী শামস বারুদি বলেন, “যখন যশ খ্যাতি অর্থ বিত্তের সবকিছু আমার হাতে ধরা দিল, তখন আমার মনে প্রায়ই একটি প্রশ্ন জাগতে লাগল, এত কিছুর পরও আমি সুখী নই কেন? শামস বারুদি নিজেই নিজের প্রশ্নের উত্তর বলেন, “কারণ আমি বুঝতে পারতাম, আমি এমন একটি কর্ম বেছে নিয়েছি, যা আমার নারীত্বকে কুঁরে-কুঁরে খাচ্ছে প্রতিমুহূর্ত। এটা আমার প্রকৃতির সাথে বেমানান। এরপর থেকে আমি অনেক কাজ ছেড়ে দিতে লাগলাম। এ আশায় যে, আমি আমার নারীত্ব, আমার হারানো সম্মান ফিরে পাব। আমি আল্লাহকে খুব ডাকতাম, যেন তিনি আমাকে এই জগত থেকে দূরে সরিয়ে নেন এবং সত্য ও সুন্দরের পথে পরিচালিত করেন।” তিনি বলেন, “আমি আমার অতীতের স্মৃতিচারণ করতে চাই না। আমি চাই, যদি ওই সময় আমার জীবন থেকে একদম মুছে যেত।”
শামস বারুদি ইসলামের শীতল ছায়ায় ফিরে এসেছেন। তিনি আল্লাহর পথকেই নিজের জীবনপথ হিসেবে বেছে নিয়েছেন। কিন্তু অনিষ্টকারীরা বসে থাকেনি। তারা প্রতিনিয়ত সত্যপ্রাজ্ঞ নারীকে নিয়ে দ্বিধাজাল সৃষ্টি করেছে। কিন্তু যে আল্লাহর আশ্রয়ে নিজেকে সঁপে দেয়, আল্লাহ তার সহায় হন। আল্লাহ শামস বারুদির মনোবল অক্ষুণ্ণ রেখেছেন। তিনি নিজে খরচ করে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ও টিভি চ্যানেলে নিজের অবস্থানের কথা সুস্পষ্ট করেছেন। তিনি সুস্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি তওবা করেছেন। তিনি এই জগত থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। তিনি প্রতিটি মুসলিম তরুণীকে, প্রতিটি মুসলিম নারীকে উদাত্ত আহ্বান জানান ইসলামের পর্দার পাবন্দি করার, ইসলামের বিধিনিষেধকে আঁকড়ে ধরার।১
এমন উদাহরণ পশ্চিমা নারীদের মধ্যেও আছে। ফ্রান্সের বিখ্যাত অভিনেত্রী ব্রিজেট বারদোঁ। পুরো জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন হৈ হুল্লা আর আমোদ ফুর্তিতে। শরীর আর সৌন্দর্যই ছিল জীবনের সবকিছু। কিন্তু জীবনের পড়ন্ত বিকেলে এসে তার আক্ষেপ শুনুন— “জীবন থেকে যে শিক্ষা পেয়েছি তা এই যে, হাজার হাজার আবেগ-উচ্ছ্বসিত প্রলোভনযুক্ত চিঠি, বিমুগ্ধ বিমোহিত কোটি কোটি দর্শকচিত্তের করতালি জীবনের বাস্তবতায় একজনমাত্র বিশ্বাসী পুরুষের ভালোবাসা হতে পারে না, যা আমাকে জড়িয়ে রাখে ভালোবাসায়; যা আমার অন্তরে শান্তি আনে, অভয় দেয়। আমার বিপুল খেতাব, যশ খ্যাতি ছিল। অনেক অর্জন ছিল। কিন্তু জীবনের চরম বাস্তবতায় আমি ব্যর্থ। আমার প্রাপ্তির খাতা শূন্য। আমি তাই মানুষ থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বাকি জীবনটা নীরবে কাটিয়ে দিতে চাই। মিডিয়া থেকে অনেক দূরে।” তিনি আরও বলেন, “আমাকে চেনে এমন অনেক। কিন্তু আমার বন্ধু বলতে যারা আছে, হাতে গোনার মতো। আমার ছেলের কথাই বলি। সে যখন ছোট ছিল, তখন আমি তাকে গুরুত্ব দিইনি; সুতরাং আমি যখন বৃদ্ধা হয়েছি, তখন সে আমাকে গুরুত্ব দেবে এমনটা আমি আশা করতে পারি না।”২
বণিকমহল নারীস্বাধীনতার বিষয়টিকে সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেছে। বাণিজ্যিক প্রচারণায় তাদের কাছে সবচেয়ে কার্যকরী মাধ্যম হলো সংস্কৃতি। পণ্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য বিলাস, স্বল্প-বসনা নারী এবং নারীর উলঙ্গ অর্ধোউলঙ্গ ছবির কোনো জুড়ি নেই। ব্রিটিশ নারী-স্বাধীনতা সংস্থাও এভাবে নারী-স্বাধীনতার নামে নারী-অবমাননার পায়তারা করেছে। বামপন্থী টিমও এ ব্যাপারে প্রচুর প্রতিবাদ জানিয়েছেন। কেননা, তিনিও মনে করেন, এটা কার্যত নারীর অবমাননা।
বড় বড় বস্ত্রালয়গুলোতে নারীদের যেভাবে ব্যবহার করা হয়, তা রীতিমতো উপহাস। ফরাসি ফ্যাশনগার্ল ফাজিয়ান ‘আল মুসলিমুন’ পত্রিকার একটি একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেন, “এ পথে আসা সহজ ছিল। কিংবা আমার কাছে সহজ মনে হয়েছিল। খুব সহজেই খ্যাতির স্বাদ পাই। উপঢৌকনে আমার ঘর ভরে যায়। আমি এত সহজে এত কিছু পাব, স্বপ্নেও ভাবিনি। কিন্তু আমাকে যে মূল্য দিতে হয়েছে, তা অনেক চড়া।
প্রকৃতপক্ষে এখানে সফলতার পথ একটাই—আবেগ অনুভূতি বিসর্জন দিতে হবে, লজ্জা শরম ছেড়ে ফেলতে হবে, বেহায়াপনাকে সক্রিয় করে দিতে হবে, আত্মসম্মানকে গলা টিপে হত্যা করতে হবে; বেশি বোঝা যাবে না, বেশি ভাবা যাবে না। তোমাকে যা ধরে রাখতে হবে —তোমার দেহ, তোমার রূপ-লাবণ্য, তোমার দীপ্তিময় ভরা যৌবন; দেহের সৌন্দর্য ও সুর মূর্ছনা। আকর্ষণ ধরে রাখতে জগতের সব সুস্বাদু খাবার বর্জন করা, পাশাপাশি নিয়মিত বলবর্ধক ও উত্তেজনাকর ড্রাগ ও মেডিসিন গ্রহণ করার কথা বাদই দিলাম।
তারা আমাকে একটা জীবন্ত মূর্তি বানিয়ে রেখেছিল। আমার কাজ ছিল ক্রেতাদের মন মত্তে নিমগ্ন করে তোলা। আমি যেন কোনো জড়পদার্থ ছিলাম, যে নির্দিষ্ট হাসিতে মানুষকে হাসাতে পারে; কিন্তু সে নির্গল্প, নির্জীব; তার কোনো অনুভূতি নেই। সেখানে প্রতিদিন বস্ত্রালয়ের বস্ত্র শরীরে ধারণ করতে হয়; তার আগে দেহ থেকে নারীত্ব ও মনুষ্যত্বের বস্ত্র খুলে ফেলতে হয়। নয়তো এই নিষ্ঠুর পৃথিবী তোমাকে ছুঁড়ে ফেলে দেবে। তুমি যদি কোনো স্টেপ ভুল কর, তা হলে তোমাকে শাস্তি পেতে হবে, যা একই সাথে মানসিক ও শারিরীক!...
একজন ফ্যাশনগার্ল হিসেবে সর্বত্র বিচরণ করেছি। ফ্যাশনের পোশাকে দেহাবরণ করে, নিজের নারীত্বকে বিসর্জন দিয়ে দর্শকদের মনোরঞ্জন করেছি, কিন্তু তারা আমার কেউ নয়, তাদের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই; আমার কষ্ট হতো, যখন দেখতাম, তাদের কাছে আমার ব্যক্তিত্বের কোনো মূল্য নেই। যত মূল্য—আমার গড়নের, আমার পরনের পোশাকের।”১
এককালের স্বনামধন্য ফ্যাশনগার্ল ফজিয়ান এভাবে নিজের জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা ব্যক্ত করেছেন। আল্লাহ তাকে তওফিক দান করেছেন, তিনি সেই অভিশপ্ত জীবনের নরকভোগ থেকে পালিয়ে ইসলামের শীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেছেন।
প্রিয় বোন, একটু তো ভাবুন, পৃথিবীতে বর্বরতার আর কোনো উদাহরণ আছে কি, যা একজন নারীর নারীত্বকে বিসর্জন দেওয়ার চাইতেও নির্মম; যাকে জীবন্ত দাসী বানিয়ে রাখা হয় তার সম্মান ও সম্ভ্রম নিয়ে খেলা করার জন্য, তার নারীত্বকে নিষ্পেষিত করার জন্য, তার লজ্জাকে লালসার বাজারে বলি দেওয়ার জন্য?
পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে কী ভয়াবহ অবস্থা দাঁড়িয়েছে। ইউরোপিয়ান সামাজিক নিরীক্ষণ সংস্থার একটি জরিপ শুনলে আঁতকে উঠতে হয়। তাদের গবেষণা মতে পঁচিশ বছর বয়সী আশি ভাগ ব্রিটিশ নারী একা একা লন্ডনের রাস্তায় চলতে ভয় পান। কারণ ধর্ষণ ও অপহরণের ভয় প্রতিমুহূর্তে তাঁদেরকে তটস্থ করে রাখে। প্রকাশ থাকে যে, এ বয়সের প্রতি চারজন একজন নারী রাজধানীতে রাস্তায় বের হলে আত্মরক্ষার জন্য সাথে চাকু বা পিস্তল রাখেন।২
কানাডার তথ্যমন্ত্রাণালয়ের জনৈক কর্মকর্তা দুঃখ প্রকাশ করেছেন যে, কানাডায় বসবাসরত অর্ধেকের বেশি নারীই যৌন হয়রানি ও দৈহিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। একটি প্রতিবেদনে এসেছে, গোঁড়ামি ও লালসার শিকার হয়ে নারীরা বিভিন্ন প্রান্তে যৌননির্যাতনের শিকার হচ্ছেন অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে। তারা এটাকে কোনো অপরাধ মনে করে না। বরং এটা তাদের দৃষ্টিতে একটি সাজামাত্র। নারীকে ভয় দেখানোর, শাস্তিপ্রদানের বা তার সংশোধনের একটি সাধারণ প্রক্রিয়া। আশ্চর্যের বিষয়, নারীর প্রতি এরকম জঘন্য অপমানকর কর্মকাণ্ডের বিদ্যমানতা সত্ত্বেও ওসব দেশের বিচারব্যবস্থায় নারী উৎপীড়ন, যৌন হয়রানি বা ধর্ষণ বিশেষ কোনো শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে বিবেচিত নয়। কারণ এগুলো সেখানে এখন স্বাভাবিক ব্যাপার।১
জনৈকা আমেরিকান নারী সাংবাদিক হেলেন স্ট্যানবেরি ভ্রমণের উদ্দেশ্যে কায়রো আসেন। প্রায় কয়েক সপ্তাহ এখানে অবস্থান করেন। তিনি কায়রোর বিভিন্ন মাদরাসা, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়; বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান; নারী, পুরুষ ও শিশু-সংক্রান্ত বিভিন্ন সংস্থা ইত্যাদি পরিদর্শন করেন। তার রিসার্চের মূল বিষয় ছিল পরিবার, সমাজ ও নারী পুরুষের বিভিন্নমুখী সমস্যা, উৎপত্তি ও উত্তরণ। ভ্রমণশেষে দেশে ফেরার সময় নিজে একজন খাঁটি পশ্চিমা হয়েও নারী হিসেবে নারী জাতির প্রতি মমত্বের স্বাক্ষর রেখে গেছেন একটি সরল সত্যকে অকপটে স্বীকার করার মাধ্যমে। তিনি লিখেছেন,
“মুসলিম আরব সমাজ নিঃসন্দেহে একটি পূর্ণাঙ্গ ও সুস্থ সমাজ। এই সমাজের পক্ষে এটাই কল্যাণকর হবে যে, তারা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে আঁকড়ে থাকবে। এখানে নারী পুরুষের মাঝে যে যৌক্তিক ব্যবধান ও সীমারেখা রাখা হয়েছে তা কোনোভাবেই মন্দ নয়। এই কয়দিনে এই সমাজের প্রতি আমার অন্তরে যে মুগ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে, তা থেকেই একজন নিঃস্বার্থ হিতাকাঙ্ক্ষী হিসেবে বলছি, আপনারা আপনাদের সামাজিক রীতিনীতি, সভ্যতা সংস্কৃতি এবং চারিত্রিক মূল্যবোধকে অক্ষুণ্ণ রাখার চেষ্টা করুন। আপনারা অবাধ মেলামেশা থেকে বিরত থাকুন। মিথ্যে স্বাধীনতার নামে মেয়েদের বাধা বন্ধনহীন ঝুঁকিপূর্ণ জীবনের দিকে ঠেলে দেবেন না। সত্যি বলতে কি, আপনারা আপনাদের সেই তথাকথিত পরাধীনতাকে ফিরিয়ে আনুন। ইউরোপ আমেরিকার উদারবাদ, বাধা বন্ধনহীনতা ও আধুনিকতা থেকে এটা শত গুণ ভালো। আপনারা অবাধ মেলামেশাকে প্রতিহত করুন। এটা আমেরিকার জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। আমেরিকান সমাজ এখন একটা মৃত সমাজ। সেখানে লম্পট ও ইতরতা ছেয়ে গেছে। সেখানে শুধু অবাধ মেলামেশা ও মিথ্যে স্বাধীনতার বলি হয়ে অসংখ্য সম্ভাবনা ঝরে যায় প্রতিদিন প্রতিনিয়ত।”২
কুয়েতের 'জারিদাতুস সিয়াসিয়াতুল কুয়াইতিয়াহ' পত্রিকার উদ্যোগে জনৈকা জার্মান নারীর একটি সাক্ষাৎকার প্রচার করা হয়। সন্দেহ-নিরসনের জন্য বলছি, ওই নারী একজন অমুসলিম। সাংবাদিক তাঁকে প্রশ্ন করেছেন: 'আপনার দৃষ্টিতে নারীর সুন্দরতম অবস্থানকেন্দ্র কী হতে পারে?' উত্তরে তিনি বলেন, 'ঘর।' একজন পশ্চিমা নারীর মুখে এমন উত্তর শুনে মুসলিম নারী সাংবাদিক কিছুটা হতচকিত হন। তিনি আবার জিজ্ঞেস করেন: 'আপনি কি মনে করেন, সব সময়ই ঘর নারীর জন্য আদর্শ জায়াগা?' তিনি এবার আরও দৃঢ়তার সাথে বললেন: 'হ্যাঁ, আমি মনে করি, সব সময়ই ঘর নারীর জন্য আদর্শ জায়াগা।' এবার সাংবাদিক জানতে চাইলেন: 'ঘরের বাইরে কর্মরত হওয়ার ব্যাপারে কী বলেন?' প্রতিনিধি এবার বললেন: 'মৌলিকততে নারীর সৃষ্টি এজন্য নয়।' সাংবাদিক জিজ্ঞেস করলেন: 'তাহলে সমাজগঠনে নারী পুরুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে কী করে?' প্রতিনিধি বললেন: 'সমাজগঠনে নারী পুরুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য, আমি মনে করি না, বাইরে গিয়ে কাজ করার প্রয়োজন আছে। অন্যভাবেও সেটা হতে পারে। নারী পুরুষকে একটি সুখময় শান্তিময় পরিবার উপহার দেবেন। ঘরের বিষয়ে তাকে নিশ্চিত রাখবেন। সুখে দুঃখে পাশে থাকবেন। অর্জনে উপার্জনে সাহস ও প্রেরণা যোগাবেন। ছেলেমেয়েকে মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তুলবেন। নারী বাইরে গিয়ে কাজ করে সামাজিকভাবে যে উন্নতি সাধিত হবে, এভাবে ঘরে থেকে তার চেয়ে অনেক গুণ বেশি হবে। আমি এ কথাটি আবেগ তাড়িত হয়ে বলছি না। জীবনের তিক্ত বাস্তবতা থেকে বলছি। মূলত নারী বাইরে গিয়ে কাজ করে হয়তো আর্থিকভাবে কিছুটা স্বনির্ভরতা পাবেন; কিন্তু পুরো সমাজ এবং সার্বিকভাবে পুরো নারী জাতি নিঃসন্দেহে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যা আমরা হাতে কলমে পাচ্ছি।'৩
বিখ্যাত ব্রিটিশ লেখিকা লেডি ব্রাউন তার বিখ্যাত 'আসুলুল জিনস ওয়া তবিয়াতুহ' গ্রন্থে লিখেছেন, “পুরুষ প্রকৃতগতভাবে জীবনে সরল। আগেও ছিল। এখনো আছে। পরেও থাকবে। আমরা যতই চেষ্টা করি, এই প্রকৃতিকে বদলাতে পারব না। সমানাধিকারের ডাক দিয়ে বা সভা-সেমিনার মহড়া করে কোনো লাভ নেই। পুরুষ সবল। সবলই থাকবে। নারী দুর্বল। দুর্বলই থাকবে।” বিখ্যাত ইংরেজ নারী গল্পকার ও উপন্যাসিক আগাথা ক্রিস্টি বলেন, “সত্যি বলতে কি, এখনকার নারীরা বোকা। স্বাধিকার ও সম-অধিকার পাওয়ার জন্য সে কত কূটনীতিই না খাটল। কিন্তু ফল কী হলো? আমাদের স্বীকার করতেই হলো, পুরুষের তুলনায় আমরা দুর্বল। সাথে সাথে পুরুষর সাথে কাজ করতে হচ্ছে, ঘাম ঝরাতে হচ্ছে। অথচ এতটা কাল এটা ছিল শুধু পুরুষের কর্তব্য।... আমাদের পূর্ববর্তী নারীরা চালাক ছিল। তখন নারী পুরুষকে এই বিশ্বাসে আসক্ত রেখেছিল যে, সে দুর্বল; সে সব সময় পুরুষের স্নেহ ও ভালোবাসার পাত্রী; সে সবসময় পুরুষের আদর ও আশ্রয় চায়। তখন পুরুষই ছিল পরিবারের মাথা। পুরো পরিবারের সুখের জন্য মৌলিকভাবে দায়িত্বশীল ছিল পুরুষই। কিন্তু আজ কী হচ্ছে? নারী স্বাধীনতা চায়। পুরুষের অভিভাবকত্বকে আধিপত্য বলে অস্বীকার করে, অভিভাবকত্ব মানে না। আন্দোলন করে —দুর্বার আন্দোলন। কিন্তু পুরুষের অভিভাবকত্বকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে যে স্বাধীনতা পায়, সে আর-এক যাযাবর বিড়ম্বনা। ... নারী বাধা না মেনে সর্বক্ষেত্রে পুরুষের সাথে পাল্লা দিতে চায়। এখন তাকে সবখানে নামতে হয়। যা তার নামার মতো, তাতেও। যা তার নামার মতো নয়, তাতেও। ফল কী হয়? জীবন থেকে সুখ বিদায় নেয়, নারী ক্লান্ত হয়। ... অথচ আগের জীবনধারায় পুরুষ ছিল নারীর সুখ ও সম্মানের অতন্দ্র প্রহরী।”
প্রিয় বোন, জীবনের তিক্ততা পশ্চিমা নারীদের ঘোর কাটিয়েছে। তাদের টনক নড়েছে। তারা এখন প্রকৃতির কোলে ফিরে আসতে চান। কিন্তু পারেন না। তারা এখন অকপটে নারী ও নারীপ্রকৃতিকে স্বীকার করেছেন। সেই সাথে পশ্চিমা সভ্যতার নারীস্বাধীনতার স্বরূপ উন্মোচন করেছেন। তারা চিৎকার করে বলছেন, তারা একজন পুরুষের কর্তৃত্ব (অভিভাবকত্ব ও তত্ত্বাবধান) থেকে বাঁচতে গিয়ে—হোক তিনি স্বামী, পিতা কিংবা ভাই— অনেক পুরুষের সেবাদাসী ও যৌনদাসীতে পরিণত হয়েছেন।
সুতরাং নারীস্বাধীনতার প্রবক্তাদের বলি, মুসলিম নারী তো আপনাদের কাছে গিয়ে পরাধীনতার অভিযোগ করেনি, কখনো কোনো অনুরোধও করেনি, তা হলে এই উপযাচকতা কেন? এত দয়া আপনাদের? তা হলে শুনুন, মুসলিম নারীর কোনো কষ্ট নেই শুধু আপনাদের উড়ে এসে জুড়ে বসা ছাড়া; দয়া করে আমাদের জীবনটাকে আর সংকীর্ণ করে তুলবেন না; আপনাদের জ্বালায় আমরা অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছি; আপনাদের কারণে যেখানে সেখানে পর্দানশীন নারীকে মুখ খুলতে হয় আপনাদের পশুবৃত্তির প্রমোদনের জন্য। মুসলিম নারীর যদি কোনো অভিযোগ থেকে থাকে, তো এটাই তাদের অভিযোগ। দয়া করে আপনাদের সাহায্যের হাতটি গুটিয়ে নিন। মিষ্টি কথা বলে আমাদের সরল মেয়েদের মাথা খাওয়া বন্ধ করুন। ছলচাতুরি ছেড়ে দিন। নারী-স্বাধীনতার নামে নারীকে জীবন্ত দাসী বানানোর যে ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেন, তা থেকে বিরত থাকুন। ইসলামের পর্দাপ্রথা থেকে আমরা মুক্তি চাই না। আপনাদের ভ্রান্ত খেলা থেকে মুক্তি চাই।
প্রাচ্যের নারীদের বলি, তোমরা ঘরে ফিরে এসো। আবার সেই ঐতিহ্যের মাঝে ফিরে এসো। ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের বিরুদ্ধে পশ্চিমা পদলেহীরা মুখ থুবড়ে পড়ুক। নারী-সংস্থা, নারী-সংগঠন ও নারী-আন্দোলনের নেতা-নেত্রীদের বলি, তোমরা আওয়াজ তোলো; উচ্চ কণ্ঠে আওয়াজ তোলো—মুসলিম নারী যেন ঘরে ফিরে আসে। আবার যেন ঘরের মালকিন হয়ে সমাজের তাজ মস্তকে ধারণ করে। মুসলিম নারী আবারও স্বামীকে সুখী করাকেই জীবনের ব্রত বানিয়ে নিক। আনুগত্য ও ভালোবাসায় স্বামীর মনের সুখ ও চোখের শীতলতা হয়ে থাকুক। নারী তার সহজাত স্নেহ, মমতা ও ভালোবাসা আবার ফিরে পাক—যা মিথ্যে প্রচারণার মোহে নিখোঁজ হয়ে গেছে। যার আশায় বুক বেঁধে আছে নিষ্পাপ সন্তানরা। যার প্রেরণায় একজন মা সন্তানের সুখের জন্য যাপন করেন বিনিদ্র রজনী। অফুরন্ত ভালোবাসায় সিক্ত করেন সন্তানের জীবনকে।
স্বাধীনতার স্বাদ আস্বাদন করতে গিয়ে পশ্চিমা নারীদের যে করুণ পরিণতি হয়েছে, মুসলিম নারীরা তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করুক। নয়তো ওই দিন বেশি দূরে নয়, যেদিন এখানেও ওই একই অবস্থা বিরাজ করবে। ভাগ্যবান তো সে, যে অন্যের দেখে শিক্ষা গ্রহণ করে। কিন্তু দুর্ভাগা সে, যে নিজে পতিত হওয়া ছাড়া সতর্ক হয় না।
প্রিয় বোন, আল্লাহ আপনাকে চোখ দিয়েছেন দেখার জন্য। দয়া করে দেখুন। চর্মচোখে দেখুন, মর্মচোখে দেখুন, ইসলামী শরীয়াতের সুমহান জীবনদর্শন দেখুন। এ কোনো মানব রচিত জীবনবিধান নয়; এ প্রত্নপ্রদত্ত পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। এ সর্বময়, সর্বজনীন, সর্বকালীন। এ সুনিশ্চিত, নিখুঁত। আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করেছেন, আমাদের কর্ম ও কীর্তিকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি জানেন। আমরা জানি না।
প্রিয় বোন, এই বিশ্বাস ও মূল্যবোধ হৃদয়ে ধারণ করুন। কথাগুলো যখন বুঝে আসবে, এবং অবশ্যই বুঝে আসবে, তখনই এই ধর্মের, আপনার এই ধর্মের মাহাত্ম্য, আপনা-আপনি অনুধাবন করবেন অনায়াসে। অচিরেই আপনার হৃদয়ে অনুরণিত হবে কবির এই কথাগুলো,
ম্যাহলান ফামা হাজাল্লাযী ক্বদ গুররাকুম
ইল্লা সারাবান আওলা তারাউনাল গারবা
কাইফা গাদাল রিজালু বিহি যিআবান
আলা তারাউনা উরাল আখলাক্বি তাশতাক্বিবু
ইনশাক্বিবান ইন তারগাবু লি আমানিকুম
সাওনান ওয়া আইশান মুসতাত্বাবান
ফাদাঊস সুফূরা লি আহলিহি ওয়ারজিঊ
আলাইহিমুল বিক্বানা
এ কী করছ তুমি?
আলো ভেবে আলোয়ার মরুভূমি—
এ যে ভ্রম, এ যে ধোঁকা!
দ্যাখো, দ্যাখো!
ওখানে মানুষ অমানুষ,
ওখানে পুরুষ পশু, হায়েনা;
ওখানে চরিত্রের গিঁঠ ছেঁড়া ফাঁড়া;
ওখানে মোহ, ওখানে মরীচিকা!
চাও কি মায়ের সম্মান, বোনের সুরক্ষা,
সুন্দর সুখকর জীবন?
তবে থামো, আর ছুটো না,
আর ছুটে ছুটে ঝুঁকে ঝুঁকে মোরো না।
এ নগ্নতা বন্ধ করো
পর্দাকে আঁকড়ে ধরো।
প্রিয় বোন, আর কত ছুটবেন মরীচিকার পেছনে? এবার তো থামুন। এবার তো ফিরে আসুন। ফিরে আসুন আপনার প্রতিপালকের দিকে। ইসলামের ছায়াদার ফলদার ফুলদার বৃক্ষের নিচে। এখানে অবলোকন করুন একটি সুন্দর পৃথিবী। এখানে উপভোগ করুন একটি সুন্দর জীবন।
জেনে রাখুন, এখানে কালের গর্ব আপনি, আপনি মুসলিম নারী; এখানে সৃষ্টির অহংকার আপনি, আপনি মুমিন নারী। আপনারাই ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছেন এ উম্মাহর ভবিষ্যৎ—আমাদের নতুন প্রজন্ম। এবার অবিচল মনে আর একবার হৃদয়ে আওড়ান আমাদের প্রিয় প্রভুর মহা বাণী,
كُذٰلِكَ يَضْرِبُ اللَّهُ الْحَقَّ وَالْبাটِلَ ۚ فَأَمَّا الزَّبَدُ فَيَذْهَبُ جُفَاءً ۖ وَأَمَّا مَا يَنْفَعُ النَّاسَ فَيَمْكُثُ فِي الْأَرْضِ ۚ كَذَلِكَ يَضْرِبُ اللَّهُ الْأَمْثَالَ
অর্থ : এভাবেই আল্লাহ্ দৃষ্টান্ত দিয়ে থাকেন সত্য ও মিথ্যার। আবর্জনার ফেনা নিমেষেই শেষ হয়ে যায়। কিন্তু যা মানুষের জন্য উপকারী তা ওপরেই থেকে যায়। এভাবেই আল্লাহ্ তুলে ধরেন সুন্দর দৃষ্টান্ত। —সূরা রাদ : ১৭
টিকাঃ
১. আন্ডারউড হিওয়ার : ১/৯৯।
২. আদ্দায়তুল হিয়ার: ২/২১।
১. কিতাবুল হিয়া মিন আলামিন ওয়ালাদ ইলা রিহাবিল ঈমান: ৬৯-৬৯।
২. রিসালাতুন ইলা হাওয়া: ৩৪/২৪-২৫।
১. মিস্ আল্লামিন ওমারা ইলা রিহাবিল ঈমান: ১২-১৩।
২. সুরাতুল নিওয়া-২৫: ২৪।
১. সুরাতুল ফিতরাহ: ৬৬।
২. রিসালাতুন ইলা হাওয়া: ৪/১২০।
৩. সুরাতুল ফিতরাহ: ১৩।
বিগত কয়েক শতাব্দী মুসলিম নারী আপন মহিমায় ছিল ভাস্বর। পর্দার আড়ালে সুরক্ষিতা মণি-মুক্তোর মতো দেদীপ্যমান। ঘরের সিংহাসনে সমাসীনা মহিমান্বিতা মালকিন। ঘরে বসে গড়ে মহামানব, মহাবীর, মহাজ্ঞানী। মুসলিম নারীর এই অবিচল অবস্থান নিশ্চিত করেছিল মুসলিম জাতির অপ্রতিরোধ্যতা, অপ্রতিদ্বন্দ্বিতা; নিশ্চিত করেছিল মুসলিম দুর্গের দুর্ভেদ্যতা, দুর্লঙ্ঘ্যতা।
তাই ঔপনিবেশিক গোষ্ঠী ছিল হয়রান পেরেশান। তাদের মুখখাওয়া ও গুণগাওয়া পদলেহীরাও ছিল হতবাক হতবুদ্ধি। মুসলিম দুর্গের দুর্ভেদ্যতার সামনে তাদের সকল শ্রম, সকল সাধনাই যেন পণ্ড হয়ে যায়। কিন্তু যারা ইসলামের আজন্ম শত্রু, তাদের কি আর সহ্য হয়? তারা কি আর বরদাশত করতে পারে? মুসলিম উম্মাহর শক্তি, সামর্থ্য, সহনশক্তি, আত্মিক বিপুল সমৃদ্ধি, জাগতিক বিশাল শান-শওকত তাদের কি হিংসার অনলে পোড়ায় না?
অবশেষে তারা মরণকামড় দিতে উদ্যত হলো। ষড়যন্ত্র ও শলাপরামর্শের মহড়া দিতে শুরু করল। তাদের একটাই লক্ষ্য —কী করে মুসলিম সমাজের মূলে কুঠারাঘাত করা যায়? তাদের সমগ্র শক্তি নিয়োগ করল শুধু একটি বিষয় উদ্ঘাটনে—যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী কী করে একটি জাতি এমন অপ্রতিরোধ্য থাকতে পারল? কী এমন আছে যা তাদেরকে বার্ধক্য, জরাজীর্ণতা, ঘুশেঁ ধরা ও পোকায় খাওয়া থেকে রক্ষা করছে এতকাল?
অবশেষে তারা আবিষ্কার করে ফেলল। মুসলিম জাতির শক্তির রহস্য উদ্ঘাটন করে ফেলল। তারা আবিষ্কার করল, মুসলিম জাতির শক্তির রহস্য—আর কিছু নয়, মুসলিম নারী—যে নারী বিলকুল কিছু উশৃঙ্খলতাহীন, অসাধারণ কিছু বৈশিষ্ট্যে বিশিষ্টা। যার মনোবল ইস্পাতকঠিন, অবিচলতা পর্বতপ্রমাণ। যিনি সত্যকথনে নির্ভয়, নির্মোহা। যিনি পারেন সত্যিকার মুমিন ও মুত্তাকী একটি নতুন প্রজন্ম জাতিকে উপহার দিতে প্রতিটি যুগে, প্রতিটি শতাব্দীতে; যারা আপন ঈমান ও আকীদার প্রতি গভীরভাবে শ্রদ্ধাশীল, এবং ধর্ম ও বিশ্বাসের মূলে কঠিনভাবে গ্রথিত।
তারা মুসলিম নারীকে টার্গেট করল। ছলে বলে কৌশলে তাকে নিজ ধর্ম ও বিশ্বাসের প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তুলতে লাগল। টোপ হিসেবে ব্যবহার করল তথাকথিত প্রগতি নামের আপাতমধুর স্লোগান।
গ্ল্যাডস্টোন, ব্রিটিশ (তৎকালীন) প্রধানমন্ত্রী, ব্রিটেনের গণসভায় দম্ভভরে ঘোষণা দিয়েছিলেন, “যতদিন মুসলিম নারীর হিজাব উঠিয়ে দেওয়া না যাবে এবং যতদিন মুসলমানদের কুরআন বন্ধ করা সম্ভব না হবে ততদিন প্রাচ্যের অবস্থা আমাদের অনুকূলে আসবে না।”১
আর্নেস্ট লুথার ১৯০৫ সালে কায়রোতে প্রতিষ্ঠিত খ্রিস্টান মিশনারিতে নিয়োজিত কর্মী, পরামর্শক ও তত্ত্বাবধায়ীদের মুসলিম বিশ্বে কীভাবে মিশনারির তৎপরতা চালাতে হবে তার দিক-নির্দেশনামূলক বক্তব্যে বড় রকমের মেজাজ নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন, “আপনারা কাজ চালিয়ে যান। হতাশার কিছু নেই। বরং আমরা আশার আলোই দেখতে পাচ্ছি। কেননা, বাস্তবতা এই যে, মুসলমানদের মাঝে পাশ্চাত্য সভ্যতা, ইউরোপীয় জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং নারী-স্বাধীনতার প্রতি ভীষণ উৎসাহের সৃষ্টি হয়েছে।”
আন্না মিলিগান, খ্রিস্টধর্মের জনৈকা নারী স্বেচ্ছাসেবক, খুব আনন্দের সাথে মন্তব্য করেছেন, “আমরা কায়রোর মহিলা কলেজে একসাথে অনেক মেয়েকে আমাদের সারিতে জড়ো করতে সক্ষম হয়েছি। এদের অধিকাংশের পিতা ও অভিভাবক হলো পাশা। সত্যিই খ্রিস্টান মিশনারিরা একসাথে এতগুলো মুসলিম মেয়ে পাওয়া দুষ্কর। এই বিদ্যালয় থেকে মুসলিম দুর্গে আঘাত হানার এটাই মোক্ষম সময়।”২
মুসলিম নারী পর্যন্ত পৌঁছার জন্য শুরু হলো ইসলামবিদ্বেষীদের ছক আঁকা এবং সে অনুযায়ী কাজ করা। তারা প্রথমে মিশরের মেধাবী মুসলিম তরুণ-তরুণীদের শিকার করা শুরু করল। তারপর নিজেদের উদ্যোগে পাশ্চাত্যের ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের মতো উন্নত দেশগুলোতে উচ্চ শিক্ষার জন্য পাঠাতে লাগল। আজকের রিফায়াহ তাহতাবী, কাসিম আমিন, হুদা শারাভি কিন্তু এসবেরই পরম্পরা।
এরা পশ্চিমা দেশগুলোতে থেকে পশ্চিমা সংস্কৃতি ও সভ্যতা রপ্ত করে দেশে ফেরে। তারপর নিজের দেশের তরুণ-তরুণীর মাথা খাওয়া শুরু করে। বড় নির্লজ্জভাবে নিজ দেশের সভ্যতা সংস্কৃতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করতে থাকে। সেই সাথে পশ্চিমা নোংরামির গুণগানে থাকে পঞ্চমুখ। ‘যেন বাপ-চাচা, মা-খালা সব কুয়োর ব্যাঙ; তিনি এসেছেন সাগর ঘুরে।’
এই যে রিফায়াহ তাহতাবী! তিনি কী করলেন? একদম নির্লজ্জের মতো প্রকাশ্যে ঘোষণা দিলেন, “খোলামেলা চলা আর ছেলেমেয়ে অবাধ মেলামেশা করা এতে খারাপ কী আছে? ইউরোপের রাস্তায় যদি নাচগান কর, তা হলে একে পাপ বলে না। একে বলে তারুণ্য, উচ্ছলতা।”
তারই ভাবশিষ্য কাসিম আমিন ফ্রান্স থেকে ফিরতে না ফিরতেই রাতারাতি মহামতি বনে গেলেন একটি বই লিখে—তাহরীরুল মারআহ (নারী-স্বাধীনতা)। বইটি যেন তাক লাগিয়ে দিল পুরো মিশরবাসীকে। তবুও অবাক লাগে, তিনি যে নারী-স্বাধীনতার ডাক দিলেন, তার মূল উপজীব্য নাকি এই একটি বাক্য—‘আমি সেই দিনের অপেক্ষায় আছি, যেদিন মিশরের মেয়েরাও ধর্মকথা ও পর্দাপ্রথার বলয় ভেঙে বেরিয়ে আসবে এবং আমার ‘ইউরোপিয়ান সিস্টার’দের মতো ‘মুক্ত বিহঙ্গ’ হয়ে উদার আকাশে উড়াল দেবে।’
আরও আশ্চর্যের বিষয়, নারী-স্বাধীনতার নামে মিশরের মুসলিম নারীদের সাথে যারা ফ্রড খেলা শুরু করেছিলেন, তাদের দলে যে শুধু পুরুষই আছেন তা নয়, নারীও আছেন। হুদা শারাভি। সে-সময়ের নারী আন্দোলনের অবিস্মরণীয় নাম। প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের বিভিন্ন নারী সংস্থায় ছিল তার দাপুটে বিচরণ। ১৯২৩ সালে ইতালির রাজধানী রোম নগরীতে প্রথম যে নারী-বিষয়ক আন্তর্জাতিক সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল তিনি সেই সেমিনারেও উপস্থিত হয়েছিলেন। মিশরে ফিরতি পথে সফর করেছিলেন সমুদ্রে। জাহাজে উঠে মিশরের প্রথম মুসলিম নারী হিসেবে হাজার বছরের মুসলিম ঐতিহ্যকে লাথি মেরে মুসলিম জাতির গর্ব, অহংকার ভেঙে চুরমার করে নিজের মাহাত্ম্য, নিজের আভিজাত্যের প্রতীক, যা তাকে চির সম্মানে ভূষিত করে রেখেছিল এতটা কাল, সেই হিজাবটি খুলে ফেললেন এবং সামনে ছুটে চলা জাহাজ থেকে পেছনে উড়ে ফেলে দিলেন—অগণিত পরপুরুষের সামনে লক্ষ কোটি মুসলিম নারীকে অপমানিত করে, ‘পর্দা প্রথার শৃঙ্খলা’ ভেঙে বেরিয়ে পশ্চিমা ‘মুক্ত বিহঙ্গ’ হয়ে, চৌদ্দশো বছরের রক্তমাখা মুসলিম শাহী কাফেলাকে পদদলিত করে। বিনিময়ে যা পেলেন তা কিছু ফিরিঙ্গিপনা বাহবা ও করতালি, এবং কিছু নীরব নিস্তব্ধ ব্যথিত হৃদয়ের রক্তক্ষরণ। কিন্তু তার চোখে মুখে যা ছিল তা কোনো অজানা অহংকারের স্ফূর্তি বৈ কী!
তিনি ফিরে এলেন কায়রোতে। বিশ্বজয়ের আনন্দ নিয়ে। তথাকথিত নারী-আন্দোলনের মহানায়িকা হয়ে। ইতালির সেমিনার থেকে অর্জিত শিক্ষার ফলস্বরূপ প্রতিষ্ঠা করলেন একটি সংস্থা—মিশরীয় নারী ঐক্য। সংস্থার মূল সুর যেন ইতালির সেমিনার থেকেই ভেসে আসে। নারীর অধিকার চাই। সমান অধিকার চাই। পুরুষের সাথে মিলেমিশে কাজ করলে ক্ষতি কী? পোশাক-আশাক কেমন হবে, কীভাবে হবে সেটা আমার ব্যাপার, এখানে বাঁধাবান্ধি কীসে? কীসের হিজাব, কীসের নেকাব? তালাকের অধিকার চাই। পুরুষের অভিভাবকত্ব মানি না। পুরুষ যদি চারটে বউ রাখতে পারে তা হলে আমরা...? ইত্যাদি ইত্যাদি অন্যান্য আবর্জনা সম সব কথাবার্তা। প্রবৃত্তির অনুগামী হলে যা হয়। অনেকটা শিয়ালের ছদ্মবেশের মতো। বুঝে হোক না বুঝে হোক, প্রোপাগান্ডায় সুর মেলানোই আধুনিকতা। সুর না মেলালেই সেকেলে, কূপমণ্ডূক, ধর্মযাজক, কুসংস্কারাচ্ছন্ন ইত্যাদি।
মিশরের এই নারী-আন্দোলনের প্রতি পশ্চিমা দেশগুলো উৎসুক ছিল তাক লাগানোর মতো। এক কথায় তারা মুক্ত হস্তে দান করা শুরু করে দিল। ইউরোপীয়রা নিজ মিশরে চলে এলেন মিশরের নারী-আন্দোলনের অগ্রগতি এবং কর্মতৎপরতা পর্যবেক্ষণের জন্য।
হুদা শারাভির আন্দোলনকে গতিশীল করতে এগিয়ে এলেন দুরিইয়াহ শাফিক। প্রাচ্যের নিয়মনীতিকে তিনিই সবচেয়ে বেশি দুঃসাহসিকতার সাথে আঘাত করতে লাগলেন। পশ্চিমা নারীর অনুসরণই যেন তার কাছে জীবনে সফল হওয়ার একমাত্র চাবিকাঠি। তিনি ধর্মহীন ভাষায় ঘোষণা দিলেন, ‘আমরা সত্যিই অনুসরণের যোগ্য, আমরা তাদেরই অনুসরণ করব। মিশরীয় নারীদের অনুসরণের যোগ্য একমাত্র পশ্চিমা নারীরাই। বিশেষত ব্রিটেনের মহারানী।’
দুরিইয়াহ শাফিকের দলে তাঁর পরে আরও একজন মহামতির আবির্ভাব হলো। আমিনা সায়িদ। তিনি নারীবিষয়ক একটি পত্রিকা বের করতে লাগলেন। নাম দিলেন হাওয়া (ইভ)। হাওয়া নামের ‘হাওয়া’ দিয়েই পশ্চিমা বিষ ঢুকিয়ে দিতে লাগলেন মিশরীয় নারীদের মনে। তিনি স্বামী এবং অভিভাবকের সাথে অবাধ্যতা, হঠকারিতা ও স্বেচ্ছাচারিতার উসকানি দিতে লাগলেন চিমটি কাটার মতো করে। অজুহাত—পুরুষের আধিপত্যকামিতা। দাবি—দাসীত্ব থেকে মুক্তি, আর একটু ইনিয়ে-বিনিয়ে, মানসিক দাসত্ব থেকে মুক্তি। তার বিদ্রোহের শিকার হলো ইসলামের মাহাত্ম্যপূর্ণ শৈলী—পর্দা ব্যবস্থা। বিদ্রোহের শিকার হলো মুসলিম নারীর সবচেয়ে বড় গুণ, সবচেয়ে বড় মাহাত্ম্য—সতীত্ব। তিনি পর্দাব্যবস্থা নিয়ে যে শ্লেষাত্মক উক্তিটি করেছেন, তা খুবই দুঃখজনক। তিনি বলেছেন: “মেয়েরা পুরো শরীর ঢেকে ভূতের মতো হয়ে কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসবে এটাই কি ইসলাম? একটা জীবন্ত মেয়েকে না মরতেই কফিনে পরিয়ে দেওয়া কি ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য খুবই জরুরি?”
ঔপনিবেশিক গোষ্ঠীর ভাবশিষ্যরা নারী-স্বাধীনতা ও নারীমুক্তির জোর প্রচারণা চালাতে থাকলেন। তাদের নির্লজ্জ শব্দপ্রয়োগের চাতুর্য, মনগড়া হাঁকডাকের তর্জন-গর্জন অনেক মিশরীয় মেয়েকে মোহাচ্ছন্ন করল। অনেক মেয়েই পর্দার বিষয়ে এখন স্বেচ্ছাচারী, হঠকারী। তারা প্রথমে হাত ও মুখ খোলা শুরু করে। তারপর মাথা, তারপর পায়ের গোছা, তারপর রান। শালীনতার জন্য সাধারণ ভদ্রতা বোধও বিদায় নেয় মাঝামাঝি কোনো পর্যায়ে। নামে মাত্র যা থাকে—শুধুই ফ্যাশন।
ধীরে ধীরে বিষয়টি গড়াল ধর্মীয় বিধিনিষেধ এবং সামাজিক রীতিনীতিগুলোকে উপেক্ষা করে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা পর্যন্ত। আজ রাস্তাঘাট দোকানপাট শপিংমল থেকে শুরু করে লেক পাড় বা ধর্মীয় বিদ্যাপীঠ—কোনো কিছুই অশ্লীলতামুক্ত নয়। আর বিনোদনের নামে অশ্লীলতার জন্যই সেসব জায়গার উৎপত্তি হয়েছে সেসব এখন রীতিমতো...। আল্লাহ্ মাফ করুন।
পর্দাবিদ্বেষীরা চরিত্রে বন্ধনহীন এক জাতীয় লাগামহীন পাগলা ঘোড়ায় পরিণত হলো। কর্মমুখর ব্যস্ত সড়কে, ব্যস্ত শহরে, ব্যস্ত অফিসে পুরুষের ভিড়ে নারীরাও ছুটে পড়ল। স্কুল কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়ে সহশিক্ষার প্রতিযোগিতা শুরু হলো। কলকারখানার বড় বড় যন্ত্রপাতির বিকট আওয়াজে নারী-পুরুষও ঘুরপাক খেতে লাগল একসাথে। কিছু নির্ভরতা, কিছুটা স্বাধীনতা, কিছুটা আনন্দ ভুলিয়ে দিল নিজের ঘরকে, নিজের সন্তানকে, নিজের স্বামীকে। ক্ষণিকের এই মায়ামোহে নারীরা ডুবে সরিয়ে দিল তার প্রকৃতিপ্রদত্ত দায়িত্ব ও কর্তব্য থেকে। সে যে কারও মা, সে যে কারও মেয়ে, সে যে কারও স্ত্রী, সে যে কারও বোন; তার যে একটা ঘর আছে, সে যে কোনো ঘরের মালকিন, দূর থেকে দেখা মরীচিকা সবই বিস্মৃত করল তাকে।
নারীরা অবাধ্য হলো। আগ্রহের অবাধ্য হলো। ঘর ছাড়ল। সম্মানের আসন থেকে নেমে এল। ছুঁড়ে ফেলে দিল মাহাত্ম্যের মুকুট। খুলে ফেলে দিল মাথার তাজ—হিজাব, নেকাব। মনে মনে মনগড়া পাওয়ার মতো হয়ে গেল মুক্ত স্বাধীন। পুরুষ তার পেছনে ছোটে এই তার গর্ব। ছেলেরা তার জন্য জীবন দিতে চায় এটাই সফলতা। প্রবৃত্তিকামীরা প্রশংসা করে গদগদ হয়। রুগ্ন মনেরা হাত বাড়ায়, লম্ফঝম্ফ করে। বোকা মেয়ে আনন্দে আত্মহারা। ছদ্মবেশী ছলাকলায় মনে আনন্দ ধরে না। সুখময় মেলামেশায় যেন বিশ্ব জয় জয়ে রূপ নেয়। তাই এতেও হয় না; নাচে, গায়, অভিনয় করে, ফ্যাশন করে। আরও কত কী!
কিন্তু ফল কী হয়, বোন? যখন ঘোর কেটে যায়, যখন জীবন যৌবন সব শেষ হয়ে যায়, তখন নিজেকে আবিষ্কার করে তিক্ত বাস্তবতার কোন কালো অন্ধকারে। দেখে, সে কোনো স্বার্থের বলি, কারও লালসার বলি। খুব সস্তায় অন্যের হয়ে কাজ করেছে সে। কোনো ষড়যন্ত্রের শিকার, কোনো কুচক্রীর ক্রীড়নক। যে কুচক্র, যে ষড়যন্ত্র তারই বিরুদ্ধে, তারই জাতির বিরুদ্ধে, তারই দেশের বিরুদ্ধে। এ কুচক্রের চাকা আবর্তিত হয়েছে মুসলিম পরিবারব্যবস্থাকে ভেঙে দিতে, মুসলিম সমাজব্যবস্থাকে গুঁড়িয়ে দিতে। একটু সুখের কারণে বড় চড়া মূল্য দিতে হলো তাকে। নিজের সম্মান, নিজের সম্ভ্রম, নিজের সবকিছুর সাথে সাথে নিজের দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ।
আর তার পৃষ্ঠপোষকরা, যারা বাহবা করতালি ও মিথ্যা স্তুতি দিয়ে উৎসাহ যুগিয়েছিল, অর্থ খ্যাতি ও সম্ভাবনার জগতে ডাহুক হয়ে ডাক ছেড়েছিল, কথার ফুলঝুরিতে ষোড়শী কুমারীদের মাতিয়ে রেখেছিল, তারাই প্রথম তাকে উপেক্ষা করে। তাদের কাছে তার কোনো মূল্য থাকে না। সত্যিই, ওসব লোকের কাছে চামড়া-জড়া বুড়ির কী বা মূল্য থাকতে পারে?
বলা উচিত, এমন উদাহরণ কম নয় যে, অনেকে নারী-স্বাধীনতার জোর প্রচারণা চালান; চাতুর্যের সকল শৈলী প্রয়োগ করে নারীকে ধর্ম ও বিশ্বাসের প্রতি বিতশ্রদ্ধ করে তোলেন; অথচ ব্যক্তিজীবনে নিজেই নারী-স্বাধীনতা নামের তামান্না থেকে মুক্ত। এই যে কাসিম আমিন। তিনি মিশরে নারী স্বাধীনতার নামে পর্দার প্রথাগত ভীতির কেমন বিরোধিতা করেছেন। অথচ নিজের স্ত্রীকে পর্দারপ্রথা শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করতে দেননি। এমনকি, নিজের ছড়ানো প্রোপাগান্ডার ব্যাপারে নিজের ঘরানা দের রেখেছেন সম্পূর্ণ অন্ধকারে। তাই তো তার স্ত্রী শরঈ পর্দার পূর্ণ পাবন্দি করেন। শুধু তাই নয়, প্রায়ই তার পক্ষ থেকে এমন বিবৃতি আসে যে, তার স্বামী, যেমনটা লোকে বলে যে তিনি সমাজে অনাচার ছড়াচ্ছেন, তেমন নন। তিনি কখনোই খোলামেলা চলা এবং অবাধ মেলামেশার পক্ষপাতী নন। তিনি শরঈ পর্দার প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল। এসব লোকের মিথ্যাচার ও অপব্যাখ্যা।
জনাব আবদুল কুদ্দুস সাহেবের কথা তো বলাই বাহুল্য। তিনি এ পর্যন্ত কতগুলো উপন্যাস লিখেছেন। তার রচিত অনেক উপন্যাসের চলচ্চিত্রায়নও হয়েছে। তার অধিকাংশ উপন্যাসই ধর্মীয় মূল্যবোধকে আঘাত করে রচিত। নারীদের ধর্মবিদ্বেষে প্রলুব্ধ করার প্রয়াস তার কম নয়। অথচ কাণ্ড দেখুন, ঔপন্যাসিক আবদুল কুদ্দুস এবং বাস্তবজীবনের আবদুল কুদ্দুসের মাঝে কেমন আকাশ পাতাল ফারাক। তিনি স্ত্রীকে বাইরে বের হতে দেন না। চাকরি করতে দেন না। অথচ তার স্ত্রী উচ্চশিক্ষিতা। শুধু তাই নয়, ব্যক্তি আবদুল কুদ্দুস স্ত্রীর প্রতি খুবই কঠোর। পত্রপত্রিকায়, টেলিভিশনের পর্দায় আজ পর্যন্ত একবারের জন্যও স্ত্রীকে আসতে দেননি; এমনকি, তার ছবিও প্রকাশ হতে দেননি।
প্রিয় বোন, বলুন তো, এমনটা কেন হয়? ...কারণ তিনি ওপরে ওপরে যা-ই বলুন, ভেতরে ভেতরে ভালো করেই জানেন যে, একজন নারীর প্রথম ও প্রধান মৌলিক কর্তব্য হলো একজন মমতাময়ী মা হওয়া, একজন সতীসাধ্বী স্ত্রী হওয়া।
আমরা যেই আবদুল কুদ্দুসের কথা বলছি, কে না জানে, তিনি ছিলেন একজন কর্মজীবী নারীর সন্তান। তার মা বহুল প্রচারিত 'রোয ইউসুফ' পত্রিকায় কাজ করতেন। কিন্তু পুত্র আবদুল কুদ্দুস মাকে আর কাজ করতে দেন না। তিনি চান, মা বাইরের ঝামেলা থেকে মুক্ত হয়ে ঘরে অবসর যাপন করুন।
অবশেষে এমন অনেক মুসলিম নারী আছেন, যারা একসময় তথাকথিত নারী-স্বাধীনতার ফাঁদে পা দিয়েছিলেন। কিন্তু হুঁশ হওয়ার পর, ভণ্ড-প্রচারকের মিথ্যা, প্রতারণা বুঝতে পারার পর, এখন আল্লাহর কাছে তওবা করে আবার ইসলামের সরল সঠিক পথে এসেছেন। আবার নিজে নিজে ধরা দিয়েছেন পর্দাপ্রথার ‘শৃঙ্খলে’, বরণ করে নিয়েছেন ‘চার দেয়ালের বন্দিনীর দশা’।
একসময়ের দুনিয়া কাঁপানো মডেল সাদিরা বাবেল্লি। ছোট পর্দায় ছিলেন হট কেক। আল্লাহ তাকে হেদায়াত দান করেছেন। সর্বশেষ সাক্ষাৎকারে আফসোস সহে বলেছেন, “আমি যখন অভিনয় করতাম, তখন কত চ্যানেল আমার পেছনে পড়ে ছিল। একটি সাক্ষাৎকারের জন্য কত উপহার উপঢৌকন জমে যেত। অথচ আজ আমিই যদি হিজাব পরে নারী-বিষয়ক ধর্ম ও সভ্যতার কথা বলতে চাই, তা হলে একটি চ্যানেলও আমাকে সুযোগ দিতে সম্মত হবে না।”
প্রখ্যাত চলচ্চিত্রশিল্পী শামস বারুদি বলেন, “যখন যশ খ্যাতি অর্থ বিত্তের সবকিছু আমার হাতে ধরা দিল, তখন আমার মনে প্রায়ই একটি প্রশ্ন জাগতে লাগল, এত কিছুর পরও আমি সুখী নই কেন? শামস বারুদি নিজেই নিজের প্রশ্নের উত্তর বলেন, “কারণ আমি বুঝতে পারতাম, আমি এমন একটি কর্ম বেছে নিয়েছি, যা আমার নারীত্বকে কুঁরে-কুঁরে খাচ্ছে প্রতিমুহূর্ত। এটা আমার প্রকৃতির সাথে বেমানান। এরপর থেকে আমি অনেক কাজ ছেড়ে দিতে লাগলাম। এ আশায় যে, আমি আমার নারীত্ব, আমার হারানো সম্মান ফিরে পাব। আমি আল্লাহকে খুব ডাকতাম, যেন তিনি আমাকে এই জগত থেকে দূরে সরিয়ে নেন এবং সত্য ও সুন্দরের পথে পরিচালিত করেন।” তিনি বলেন, “আমি আমার অতীতের স্মৃতিচারণ করতে চাই না। আমি চাই, যদি ওই সময় আমার জীবন থেকে একদম মুছে যেত।”
শামস বারুদি ইসলামের শীতল ছায়ায় ফিরে এসেছেন। তিনি আল্লাহর পথকেই নিজের জীবনপথ হিসেবে বেছে নিয়েছেন। কিন্তু অনিষ্টকারীরা বসে থাকেনি। তারা প্রতিনিয়ত সত্যপ্রাজ্ঞ নারীকে নিয়ে দ্বিধাজাল সৃষ্টি করেছে। কিন্তু যে আল্লাহর আশ্রয়ে নিজেকে সঁপে দেয়, আল্লাহ তার সহায় হন। আল্লাহ শামস বারুদির মনোবল অক্ষুণ্ণ রেখেছেন। তিনি নিজে খরচ করে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ও টিভি চ্যানেলে নিজের অবস্থানের কথা সুস্পষ্ট করেছেন। তিনি সুস্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি তওবা করেছেন। তিনি এই জগত থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। তিনি প্রতিটি মুসলিম তরুণীকে, প্রতিটি মুসলিম নারীকে উদাত্ত আহ্বান জানান ইসলামের পর্দার পাবন্দি করার, ইসলামের বিধিনিষেধকে আঁকড়ে ধরার।১
এমন উদাহরণ পশ্চিমা নারীদের মধ্যেও আছে। ফ্রান্সের বিখ্যাত অভিনেত্রী ব্রিজেট বারদোঁ। পুরো জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন হৈ হুল্লা আর আমোদ ফুর্তিতে। শরীর আর সৌন্দর্যই ছিল জীবনের সবকিছু। কিন্তু জীবনের পড়ন্ত বিকেলে এসে তার আক্ষেপ শুনুন— “জীবন থেকে যে শিক্ষা পেয়েছি তা এই যে, হাজার হাজার আবেগ-উচ্ছ্বসিত প্রলোভনযুক্ত চিঠি, বিমুগ্ধ বিমোহিত কোটি কোটি দর্শকচিত্তের করতালি জীবনের বাস্তবতায় একজনমাত্র বিশ্বাসী পুরুষের ভালোবাসা হতে পারে না, যা আমাকে জড়িয়ে রাখে ভালোবাসায়; যা আমার অন্তরে শান্তি আনে, অভয় দেয়। আমার বিপুল খেতাব, যশ খ্যাতি ছিল। অনেক অর্জন ছিল। কিন্তু জীবনের চরম বাস্তবতায় আমি ব্যর্থ। আমার প্রাপ্তির খাতা শূন্য। আমি তাই মানুষ থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বাকি জীবনটা নীরবে কাটিয়ে দিতে চাই। মিডিয়া থেকে অনেক দূরে।” তিনি আরও বলেন, “আমাকে চেনে এমন অনেক। কিন্তু আমার বন্ধু বলতে যারা আছে, হাতে গোনার মতো। আমার ছেলের কথাই বলি। সে যখন ছোট ছিল, তখন আমি তাকে গুরুত্ব দিইনি; সুতরাং আমি যখন বৃদ্ধা হয়েছি, তখন সে আমাকে গুরুত্ব দেবে এমনটা আমি আশা করতে পারি না।”২
বণিকমহল নারীস্বাধীনতার বিষয়টিকে সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেছে। বাণিজ্যিক প্রচারণায় তাদের কাছে সবচেয়ে কার্যকরী মাধ্যম হলো সংস্কৃতি। পণ্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য বিলাস, স্বল্প-বসনা নারী এবং নারীর উলঙ্গ অর্ধোউলঙ্গ ছবির কোনো জুড়ি নেই। ব্রিটিশ নারী-স্বাধীনতা সংস্থাও এভাবে নারী-স্বাধীনতার নামে নারী-অবমাননার পায়তারা করেছে। বামপন্থী টিমও এ ব্যাপারে প্রচুর প্রতিবাদ জানিয়েছেন। কেননা, তিনিও মনে করেন, এটা কার্যত নারীর অবমাননা।
বড় বড় বস্ত্রালয়গুলোতে নারীদের যেভাবে ব্যবহার করা হয়, তা রীতিমতো উপহাস। ফরাসি ফ্যাশনগার্ল ফাজিয়ান ‘আল মুসলিমুন’ পত্রিকার একটি একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেন, “এ পথে আসা সহজ ছিল। কিংবা আমার কাছে সহজ মনে হয়েছিল। খুব সহজেই খ্যাতির স্বাদ পাই। উপঢৌকনে আমার ঘর ভরে যায়। আমি এত সহজে এত কিছু পাব, স্বপ্নেও ভাবিনি। কিন্তু আমাকে যে মূল্য দিতে হয়েছে, তা অনেক চড়া।
প্রকৃতপক্ষে এখানে সফলতার পথ একটাই—আবেগ অনুভূতি বিসর্জন দিতে হবে, লজ্জা শরম ছেড়ে ফেলতে হবে, বেহায়াপনাকে সক্রিয় করে দিতে হবে, আত্মসম্মানকে গলা টিপে হত্যা করতে হবে; বেশি বোঝা যাবে না, বেশি ভাবা যাবে না। তোমাকে যা ধরে রাখতে হবে —তোমার দেহ, তোমার রূপ-লাবণ্য, তোমার দীপ্তিময় ভরা যৌবন; দেহের সৌন্দর্য ও সুর মূর্ছনা। আকর্ষণ ধরে রাখতে জগতের সব সুস্বাদু খাবার বর্জন করা, পাশাপাশি নিয়মিত বলবর্ধক ও উত্তেজনাকর ড্রাগ ও মেডিসিন গ্রহণ করার কথা বাদই দিলাম।
তারা আমাকে একটা জীবন্ত মূর্তি বানিয়ে রেখেছিল। আমার কাজ ছিল ক্রেতাদের মন মত্তে নিমগ্ন করে তোলা। আমি যেন কোনো জড়পদার্থ ছিলাম, যে নির্দিষ্ট হাসিতে মানুষকে হাসাতে পারে; কিন্তু সে নির্গল্প, নির্জীব; তার কোনো অনুভূতি নেই। সেখানে প্রতিদিন বস্ত্রালয়ের বস্ত্র শরীরে ধারণ করতে হয়; তার আগে দেহ থেকে নারীত্ব ও মনুষ্যত্বের বস্ত্র খুলে ফেলতে হয়। নয়তো এই নিষ্ঠুর পৃথিবী তোমাকে ছুঁড়ে ফেলে দেবে। তুমি যদি কোনো স্টেপ ভুল কর, তা হলে তোমাকে শাস্তি পেতে হবে, যা একই সাথে মানসিক ও শারিরীক!...
একজন ফ্যাশনগার্ল হিসেবে সর্বত্র বিচরণ করেছি। ফ্যাশনের পোশাকে দেহাবরণ করে, নিজের নারীত্বকে বিসর্জন দিয়ে দর্শকদের মনোরঞ্জন করেছি, কিন্তু তারা আমার কেউ নয়, তাদের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই; আমার কষ্ট হতো, যখন দেখতাম, তাদের কাছে আমার ব্যক্তিত্বের কোনো মূল্য নেই। যত মূল্য—আমার গড়নের, আমার পরনের পোশাকের।”১
এককালের স্বনামধন্য ফ্যাশনগার্ল ফজিয়ান এভাবে নিজের জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা ব্যক্ত করেছেন। আল্লাহ তাকে তওফিক দান করেছেন, তিনি সেই অভিশপ্ত জীবনের নরকভোগ থেকে পালিয়ে ইসলামের শীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেছেন।
প্রিয় বোন, একটু তো ভাবুন, পৃথিবীতে বর্বরতার আর কোনো উদাহরণ আছে কি, যা একজন নারীর নারীত্বকে বিসর্জন দেওয়ার চাইতেও নির্মম; যাকে জীবন্ত দাসী বানিয়ে রাখা হয় তার সম্মান ও সম্ভ্রম নিয়ে খেলা করার জন্য, তার নারীত্বকে নিষ্পেষিত করার জন্য, তার লজ্জাকে লালসার বাজারে বলি দেওয়ার জন্য?
পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে কী ভয়াবহ অবস্থা দাঁড়িয়েছে। ইউরোপিয়ান সামাজিক নিরীক্ষণ সংস্থার একটি জরিপ শুনলে আঁতকে উঠতে হয়। তাদের গবেষণা মতে পঁচিশ বছর বয়সী আশি ভাগ ব্রিটিশ নারী একা একা লন্ডনের রাস্তায় চলতে ভয় পান। কারণ ধর্ষণ ও অপহরণের ভয় প্রতিমুহূর্তে তাঁদেরকে তটস্থ করে রাখে। প্রকাশ থাকে যে, এ বয়সের প্রতি চারজন একজন নারী রাজধানীতে রাস্তায় বের হলে আত্মরক্ষার জন্য সাথে চাকু বা পিস্তল রাখেন।২
কানাডার তথ্যমন্ত্রাণালয়ের জনৈক কর্মকর্তা দুঃখ প্রকাশ করেছেন যে, কানাডায় বসবাসরত অর্ধেকের বেশি নারীই যৌন হয়রানি ও দৈহিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। একটি প্রতিবেদনে এসেছে, গোঁড়ামি ও লালসার শিকার হয়ে নারীরা বিভিন্ন প্রান্তে যৌননির্যাতনের শিকার হচ্ছেন অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে। তারা এটাকে কোনো অপরাধ মনে করে না। বরং এটা তাদের দৃষ্টিতে একটি সাজামাত্র। নারীকে ভয় দেখানোর, শাস্তিপ্রদানের বা তার সংশোধনের একটি সাধারণ প্রক্রিয়া। আশ্চর্যের বিষয়, নারীর প্রতি এরকম জঘন্য অপমানকর কর্মকাণ্ডের বিদ্যমানতা সত্ত্বেও ওসব দেশের বিচারব্যবস্থায় নারী উৎপীড়ন, যৌন হয়রানি বা ধর্ষণ বিশেষ কোনো শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে বিবেচিত নয়। কারণ এগুলো সেখানে এখন স্বাভাবিক ব্যাপার।১
জনৈকা আমেরিকান নারী সাংবাদিক হেলেন স্ট্যানবেরি ভ্রমণের উদ্দেশ্যে কায়রো আসেন। প্রায় কয়েক সপ্তাহ এখানে অবস্থান করেন। তিনি কায়রোর বিভিন্ন মাদরাসা, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়; বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান; নারী, পুরুষ ও শিশু-সংক্রান্ত বিভিন্ন সংস্থা ইত্যাদি পরিদর্শন করেন। তার রিসার্চের মূল বিষয় ছিল পরিবার, সমাজ ও নারী পুরুষের বিভিন্নমুখী সমস্যা, উৎপত্তি ও উত্তরণ। ভ্রমণশেষে দেশে ফেরার সময় নিজে একজন খাঁটি পশ্চিমা হয়েও নারী হিসেবে নারী জাতির প্রতি মমত্বের স্বাক্ষর রেখে গেছেন একটি সরল সত্যকে অকপটে স্বীকার করার মাধ্যমে। তিনি লিখেছেন,
“মুসলিম আরব সমাজ নিঃসন্দেহে একটি পূর্ণাঙ্গ ও সুস্থ সমাজ। এই সমাজের পক্ষে এটাই কল্যাণকর হবে যে, তারা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে আঁকড়ে থাকবে। এখানে নারী পুরুষের মাঝে যে যৌক্তিক ব্যবধান ও সীমারেখা রাখা হয়েছে তা কোনোভাবেই মন্দ নয়। এই কয়দিনে এই সমাজের প্রতি আমার অন্তরে যে মুগ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে, তা থেকেই একজন নিঃস্বার্থ হিতাকাঙ্ক্ষী হিসেবে বলছি, আপনারা আপনাদের সামাজিক রীতিনীতি, সভ্যতা সংস্কৃতি এবং চারিত্রিক মূল্যবোধকে অক্ষুণ্ণ রাখার চেষ্টা করুন। আপনারা অবাধ মেলামেশা থেকে বিরত থাকুন। মিথ্যে স্বাধীনতার নামে মেয়েদের বাধা বন্ধনহীন ঝুঁকিপূর্ণ জীবনের দিকে ঠেলে দেবেন না। সত্যি বলতে কি, আপনারা আপনাদের সেই তথাকথিত পরাধীনতাকে ফিরিয়ে আনুন। ইউরোপ আমেরিকার উদারবাদ, বাধা বন্ধনহীনতা ও আধুনিকতা থেকে এটা শত গুণ ভালো। আপনারা অবাধ মেলামেশাকে প্রতিহত করুন। এটা আমেরিকার জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। আমেরিকান সমাজ এখন একটা মৃত সমাজ। সেখানে লম্পট ও ইতরতা ছেয়ে গেছে। সেখানে শুধু অবাধ মেলামেশা ও মিথ্যে স্বাধীনতার বলি হয়ে অসংখ্য সম্ভাবনা ঝরে যায় প্রতিদিন প্রতিনিয়ত।”২
কুয়েতের 'জারিদাতুস সিয়াসিয়াতুল কুয়াইতিয়াহ' পত্রিকার উদ্যোগে জনৈকা জার্মান নারীর একটি সাক্ষাৎকার প্রচার করা হয়। সন্দেহ-নিরসনের জন্য বলছি, ওই নারী একজন অমুসলিম। সাংবাদিক তাঁকে প্রশ্ন করেছেন: 'আপনার দৃষ্টিতে নারীর সুন্দরতম অবস্থানকেন্দ্র কী হতে পারে?' উত্তরে তিনি বলেন, 'ঘর।' একজন পশ্চিমা নারীর মুখে এমন উত্তর শুনে মুসলিম নারী সাংবাদিক কিছুটা হতচকিত হন। তিনি আবার জিজ্ঞেস করেন: 'আপনি কি মনে করেন, সব সময়ই ঘর নারীর জন্য আদর্শ জায়াগা?' তিনি এবার আরও দৃঢ়তার সাথে বললেন: 'হ্যাঁ, আমি মনে করি, সব সময়ই ঘর নারীর জন্য আদর্শ জায়াগা।' এবার সাংবাদিক জানতে চাইলেন: 'ঘরের বাইরে কর্মরত হওয়ার ব্যাপারে কী বলেন?' প্রতিনিধি এবার বললেন: 'মৌলিকততে নারীর সৃষ্টি এজন্য নয়।' সাংবাদিক জিজ্ঞেস করলেন: 'তাহলে সমাজগঠনে নারী পুরুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে কী করে?' প্রতিনিধি বললেন: 'সমাজগঠনে নারী পুরুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য, আমি মনে করি না, বাইরে গিয়ে কাজ করার প্রয়োজন আছে। অন্যভাবেও সেটা হতে পারে। নারী পুরুষকে একটি সুখময় শান্তিময় পরিবার উপহার দেবেন। ঘরের বিষয়ে তাকে নিশ্চিত রাখবেন। সুখে দুঃখে পাশে থাকবেন। অর্জনে উপার্জনে সাহস ও প্রেরণা যোগাবেন। ছেলেমেয়েকে মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তুলবেন। নারী বাইরে গিয়ে কাজ করে সামাজিকভাবে যে উন্নতি সাধিত হবে, এভাবে ঘরে থেকে তার চেয়ে অনেক গুণ বেশি হবে। আমি এ কথাটি আবেগ তাড়িত হয়ে বলছি না। জীবনের তিক্ত বাস্তবতা থেকে বলছি। মূলত নারী বাইরে গিয়ে কাজ করে হয়তো আর্থিকভাবে কিছুটা স্বনির্ভরতা পাবেন; কিন্তু পুরো সমাজ এবং সার্বিকভাবে পুরো নারী জাতি নিঃসন্দেহে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যা আমরা হাতে কলমে পাচ্ছি।'৩
বিখ্যাত ব্রিটিশ লেখিকা লেডি ব্রাউন তার বিখ্যাত 'আসুলুল জিনস ওয়া তবিয়াতুহ' গ্রন্থে লিখেছেন, “পুরুষ প্রকৃতগতভাবে জীবনে সরল। আগেও ছিল। এখনো আছে। পরেও থাকবে। আমরা যতই চেষ্টা করি, এই প্রকৃতিকে বদলাতে পারব না। সমানাধিকারের ডাক দিয়ে বা সভা-সেমিনার মহড়া করে কোনো লাভ নেই। পুরুষ সবল। সবলই থাকবে। নারী দুর্বল। দুর্বলই থাকবে।” বিখ্যাত ইংরেজ নারী গল্পকার ও উপন্যাসিক আগাথা ক্রিস্টি বলেন, “সত্যি বলতে কি, এখনকার নারীরা বোকা। স্বাধিকার ও সম-অধিকার পাওয়ার জন্য সে কত কূটনীতিই না খাটল। কিন্তু ফল কী হলো? আমাদের স্বীকার করতেই হলো, পুরুষের তুলনায় আমরা দুর্বল। সাথে সাথে পুরুষর সাথে কাজ করতে হচ্ছে, ঘাম ঝরাতে হচ্ছে। অথচ এতটা কাল এটা ছিল শুধু পুরুষের কর্তব্য।... আমাদের পূর্ববর্তী নারীরা চালাক ছিল। তখন নারী পুরুষকে এই বিশ্বাসে আসক্ত রেখেছিল যে, সে দুর্বল; সে সব সময় পুরুষের স্নেহ ও ভালোবাসার পাত্রী; সে সবসময় পুরুষের আদর ও আশ্রয় চায়। তখন পুরুষই ছিল পরিবারের মাথা। পুরো পরিবারের সুখের জন্য মৌলিকভাবে দায়িত্বশীল ছিল পুরুষই। কিন্তু আজ কী হচ্ছে? নারী স্বাধীনতা চায়। পুরুষের অভিভাবকত্বকে আধিপত্য বলে অস্বীকার করে, অভিভাবকত্ব মানে না। আন্দোলন করে —দুর্বার আন্দোলন। কিন্তু পুরুষের অভিভাবকত্বকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে যে স্বাধীনতা পায়, সে আর-এক যাযাবর বিড়ম্বনা। ... নারী বাধা না মেনে সর্বক্ষেত্রে পুরুষের সাথে পাল্লা দিতে চায়। এখন তাকে সবখানে নামতে হয়। যা তার নামার মতো, তাতেও। যা তার নামার মতো নয়, তাতেও। ফল কী হয়? জীবন থেকে সুখ বিদায় নেয়, নারী ক্লান্ত হয়। ... অথচ আগের জীবনধারায় পুরুষ ছিল নারীর সুখ ও সম্মানের অতন্দ্র প্রহরী।”
প্রিয় বোন, জীবনের তিক্ততা পশ্চিমা নারীদের ঘোর কাটিয়েছে। তাদের টনক নড়েছে। তারা এখন প্রকৃতির কোলে ফিরে আসতে চান। কিন্তু পারেন না। তারা এখন অকপটে নারী ও নারীপ্রকৃতিকে স্বীকার করেছেন। সেই সাথে পশ্চিমা সভ্যতার নারীস্বাধীনতার স্বরূপ উন্মোচন করেছেন। তারা চিৎকার করে বলছেন, তারা একজন পুরুষের কর্তৃত্ব (অভিভাবকত্ব ও তত্ত্বাবধান) থেকে বাঁচতে গিয়ে—হোক তিনি স্বামী, পিতা কিংবা ভাই— অনেক পুরুষের সেবাদাসী ও যৌনদাসীতে পরিণত হয়েছেন।
সুতরাং নারীস্বাধীনতার প্রবক্তাদের বলি, মুসলিম নারী তো আপনাদের কাছে গিয়ে পরাধীনতার অভিযোগ করেনি, কখনো কোনো অনুরোধও করেনি, তা হলে এই উপযাচকতা কেন? এত দয়া আপনাদের? তা হলে শুনুন, মুসলিম নারীর কোনো কষ্ট নেই শুধু আপনাদের উড়ে এসে জুড়ে বসা ছাড়া; দয়া করে আমাদের জীবনটাকে আর সংকীর্ণ করে তুলবেন না; আপনাদের জ্বালায় আমরা অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছি; আপনাদের কারণে যেখানে সেখানে পর্দানশীন নারীকে মুখ খুলতে হয় আপনাদের পশুবৃত্তির প্রমোদনের জন্য। মুসলিম নারীর যদি কোনো অভিযোগ থেকে থাকে, তো এটাই তাদের অভিযোগ। দয়া করে আপনাদের সাহায্যের হাতটি গুটিয়ে নিন। মিষ্টি কথা বলে আমাদের সরল মেয়েদের মাথা খাওয়া বন্ধ করুন। ছলচাতুরি ছেড়ে দিন। নারী-স্বাধীনতার নামে নারীকে জীবন্ত দাসী বানানোর যে ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেন, তা থেকে বিরত থাকুন। ইসলামের পর্দাপ্রথা থেকে আমরা মুক্তি চাই না। আপনাদের ভ্রান্ত খেলা থেকে মুক্তি চাই।
প্রাচ্যের নারীদের বলি, তোমরা ঘরে ফিরে এসো। আবার সেই ঐতিহ্যের মাঝে ফিরে এসো। ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের বিরুদ্ধে পশ্চিমা পদলেহীরা মুখ থুবড়ে পড়ুক। নারী-সংস্থা, নারী-সংগঠন ও নারী-আন্দোলনের নেতা-নেত্রীদের বলি, তোমরা আওয়াজ তোলো; উচ্চ কণ্ঠে আওয়াজ তোলো—মুসলিম নারী যেন ঘরে ফিরে আসে। আবার যেন ঘরের মালকিন হয়ে সমাজের তাজ মস্তকে ধারণ করে। মুসলিম নারী আবারও স্বামীকে সুখী করাকেই জীবনের ব্রত বানিয়ে নিক। আনুগত্য ও ভালোবাসায় স্বামীর মনের সুখ ও চোখের শীতলতা হয়ে থাকুক। নারী তার সহজাত স্নেহ, মমতা ও ভালোবাসা আবার ফিরে পাক—যা মিথ্যে প্রচারণার মোহে নিখোঁজ হয়ে গেছে। যার আশায় বুক বেঁধে আছে নিষ্পাপ সন্তানরা। যার প্রেরণায় একজন মা সন্তানের সুখের জন্য যাপন করেন বিনিদ্র রজনী। অফুরন্ত ভালোবাসায় সিক্ত করেন সন্তানের জীবনকে।
স্বাধীনতার স্বাদ আস্বাদন করতে গিয়ে পশ্চিমা নারীদের যে করুণ পরিণতি হয়েছে, মুসলিম নারীরা তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করুক। নয়তো ওই দিন বেশি দূরে নয়, যেদিন এখানেও ওই একই অবস্থা বিরাজ করবে। ভাগ্যবান তো সে, যে অন্যের দেখে শিক্ষা গ্রহণ করে। কিন্তু দুর্ভাগা সে, যে নিজে পতিত হওয়া ছাড়া সতর্ক হয় না।
প্রিয় বোন, আল্লাহ আপনাকে চোখ দিয়েছেন দেখার জন্য। দয়া করে দেখুন। চর্মচোখে দেখুন, মর্মচোখে দেখুন, ইসলামী শরীয়াতের সুমহান জীবনদর্শন দেখুন। এ কোনো মানব রচিত জীবনবিধান নয়; এ প্রত্নপ্রদত্ত পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। এ সর্বময়, সর্বজনীন, সর্বকালীন। এ সুনিশ্চিত, নিখুঁত। আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করেছেন, আমাদের কর্ম ও কীর্তিকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি জানেন। আমরা জানি না।
প্রিয় বোন, এই বিশ্বাস ও মূল্যবোধ হৃদয়ে ধারণ করুন। কথাগুলো যখন বুঝে আসবে, এবং অবশ্যই বুঝে আসবে, তখনই এই ধর্মের, আপনার এই ধর্মের মাহাত্ম্য, আপনা-আপনি অনুধাবন করবেন অনায়াসে। অচিরেই আপনার হৃদয়ে অনুরণিত হবে কবির এই কথাগুলো,
ম্যাহলান ফামা হাজাল্লাযী ক্বদ গুররাকুম
ইল্লা সারাবান আওলা তারাউনাল গারবা
কাইফা গাদাল রিজালু বিহি যিআবান
আলা তারাউনা উরাল আখলাক্বি তাশতাক্বিবু
ইনশাক্বিবান ইন তারগাবু লি আমানিকুম
সাওনান ওয়া আইশান মুসতাত্বাবান
ফাদাঊস সুফূরা লি আহলিহি ওয়ারজিঊ
আলাইহিমুল বিক্বানা
এ কী করছ তুমি?
আলো ভেবে আলোয়ার মরুভূমি—
এ যে ভ্রম, এ যে ধোঁকা!
দ্যাখো, দ্যাখো!
ওখানে মানুষ অমানুষ,
ওখানে পুরুষ পশু, হায়েনা;
ওখানে চরিত্রের গিঁঠ ছেঁড়া ফাঁড়া;
ওখানে মোহ, ওখানে মরীচিকা!
চাও কি মায়ের সম্মান, বোনের সুরক্ষা,
সুন্দর সুখকর জীবন?
তবে থামো, আর ছুটো না,
আর ছুটে ছুটে ঝুঁকে ঝুঁকে মোরো না।
এ নগ্নতা বন্ধ করো
পর্দাকে আঁকড়ে ধরো।
প্রিয় বোন, আর কত ছুটবেন মরীচিকার পেছনে? এবার তো থামুন। এবার তো ফিরে আসুন। ফিরে আসুন আপনার প্রতিপালকের দিকে। ইসলামের ছায়াদার ফলদার ফুলদার বৃক্ষের নিচে। এখানে অবলোকন করুন একটি সুন্দর পৃথিবী। এখানে উপভোগ করুন একটি সুন্দর জীবন।
জেনে রাখুন, এখানে কালের গর্ব আপনি, আপনি মুসলিম নারী; এখানে সৃষ্টির অহংকার আপনি, আপনি মুমিন নারী। আপনারাই ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছেন এ উম্মাহর ভবিষ্যৎ—আমাদের নতুন প্রজন্ম। এবার অবিচল মনে আর একবার হৃদয়ে আওড়ান আমাদের প্রিয় প্রভুর মহা বাণী,
كُذٰلِكَ يَضْرِبُ اللَّهُ الْحَقَّ وَالْبাটِلَ ۚ فَأَمَّا الزَّبَدُ فَيَذْهَبُ جُفَاءً ۖ وَأَمَّا مَا يَنْفَعُ النَّاسَ فَيَمْكُثُ فِي الْأَرْضِ ۚ كَذَلِكَ يَضْرِبُ اللَّهُ الْأَمْثَالَ
অর্থ : এভাবেই আল্লাহ্ দৃষ্টান্ত দিয়ে থাকেন সত্য ও মিথ্যার। আবর্জনার ফেনা নিমেষেই শেষ হয়ে যায়। কিন্তু যা মানুষের জন্য উপকারী তা ওপরেই থেকে যায়। এভাবেই আল্লাহ্ তুলে ধরেন সুন্দর দৃষ্টান্ত। —সূরা রাদ : ১৭
টিকাঃ
১. আন্ডারউড হিওয়ার : ১/৯৯।
২. আদ্দায়তুল হিয়ার: ২/২১।
১. কিতাবুল হিয়া মিন আলামিন ওয়ালাদ ইলা রিহাবিল ঈমান: ৬৯-৬৯।
২. রিসালাতুন ইলা হাওয়া: ৩৪/২৪-২৫।
১. মিস্ আল্লামিন ওমারা ইলা রিহাবিল ঈমান: ১২-১৩।
২. সুরাতুল নিওয়া-২৫: ২৪।
১. সুরাতুল ফিতরাহ: ৬৬।
২. রিসালাতুন ইলা হাওয়া: ৪/১২০।
৩. সুরাতুল ফিতরাহ: ১৩।
বিগত কয়েক শতাব্দী মুসলিম নারী আপন মহিমায় ছিল ভাস্বর। পর্দার আড়ালে সুরক্ষিতা মণি-মুক্তোর মতো দেদীপ্যমান। ঘরের সিংহাসনে সমাসীনা মহিমান্বিতা মালকিন। ঘরে বসে গড়ে মহামানব, মহাবীর, মহাজ্ঞানী। মুসলিম নারীর এই অবিচল অবস্থান নিশ্চিত করেছিল মুসলিম জাতির অপ্রতিরোধ্যতা, অপ্রতিদ্বন্দ্বিতা; নিশ্চিত করেছিল মুসলিম দুর্গের দুর্ভেদ্যতা, দুর্লঙ্ঘ্যতা।
তাই ঔপনিবেশিক গোষ্ঠী ছিল হয়রান পেরেশান। তাদের মুখখাওয়া ও গুণগাওয়া পদলেহীরাও ছিল হতবাক হতবুদ্ধি। মুসলিম দুর্গের দুর্ভেদ্যতার সামনে তাদের সকল শ্রম, সকল সাধনাই যেন পণ্ড হয়ে যায়। কিন্তু যারা ইসলামের আজন্ম শত্রু, তাদের কি আর সহ্য হয়? তারা কি আর বরদাশত করতে পারে? মুসলিম উম্মাহর শক্তি, সামর্থ্য, সহনশক্তি, আত্মিক বিপুল সমৃদ্ধি, জাগতিক বিশাল শান-শওকত তাদের কি হিংসার অনলে পোড়ায় না?
অবশেষে তারা মরণকামড় দিতে উদ্যত হলো। ষড়যন্ত্র ও শলাপরামর্শের মহড়া দিতে শুরু করল। তাদের একটাই লক্ষ্য —কী করে মুসলিম সমাজের মূলে কুঠারাঘাত করা যায়? তাদের সমগ্র শক্তি নিয়োগ করল শুধু একটি বিষয় উদ্ঘাটনে—যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী কী করে একটি জাতি এমন অপ্রতিরোধ্য থাকতে পারল? কী এমন আছে যা তাদেরকে বার্ধক্য, জরাজীর্ণতা, ঘুশেঁ ধরা ও পোকায় খাওয়া থেকে রক্ষা করছে এতকাল?
অবশেষে তারা আবিষ্কার করে ফেলল। মুসলিম জাতির শক্তির রহস্য উদ্ঘাটন করে ফেলল। তারা আবিষ্কার করল, মুসলিম জাতির শক্তির রহস্য—আর কিছু নয়, মুসলিম নারী—যে নারী বিলকুল কিছু উশৃঙ্খলতাহীন, অসাধারণ কিছু বৈশিষ্ট্যে বিশিষ্টা। যার মনোবল ইস্পাতকঠিন, অবিচলতা পর্বতপ্রমাণ। যিনি সত্যকথনে নির্ভয়, নির্মোহা। যিনি পারেন সত্যিকার মুমিন ও মুত্তাকী একটি নতুন প্রজন্ম জাতিকে উপহার দিতে প্রতিটি যুগে, প্রতিটি শতাব্দীতে; যারা আপন ঈমান ও আকীদার প্রতি গভীরভাবে শ্রদ্ধাশীল, এবং ধর্ম ও বিশ্বাসের মূলে কঠিনভাবে গ্রথিত।
তারা মুসলিম নারীকে টার্গেট করল। ছলে বলে কৌশলে তাকে নিজ ধর্ম ও বিশ্বাসের প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তুলতে লাগল। টোপ হিসেবে ব্যবহার করল তথাকথিত প্রগতি নামের আপাতমধুর স্লোগান।
গ্ল্যাডস্টোন, ব্রিটিশ (তৎকালীন) প্রধানমন্ত্রী, ব্রিটেনের গণসভায় দম্ভভরে ঘোষণা দিয়েছিলেন, “যতদিন মুসলিম নারীর হিজাব উঠিয়ে দেওয়া না যাবে এবং যতদিন মুসলমানদের কুরআন বন্ধ করা সম্ভব না হবে ততদিন প্রাচ্যের অবস্থা আমাদের অনুকূলে আসবে না।”১
আর্নেস্ট লুথার ১৯০৫ সালে কায়রোতে প্রতিষ্ঠিত খ্রিস্টান মিশনারিতে নিয়োজিত কর্মী, পরামর্শক ও তত্ত্বাবধায়ীদের মুসলিম বিশ্বে কীভাবে মিশনারির তৎপরতা চালাতে হবে তার দিক-নির্দেশনামূলক বক্তব্যে বড় রকমের মেজাজ নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন, “আপনারা কাজ চালিয়ে যান। হতাশার কিছু নেই। বরং আমরা আশার আলোই দেখতে পাচ্ছি। কেননা, বাস্তবতা এই যে, মুসলমানদের মাঝে পাশ্চাত্য সভ্যতা, ইউরোপীয় জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং নারী-স্বাধীনতার প্রতি ভীষণ উৎসাহের সৃষ্টি হয়েছে।”
আন্না মিলিগান, খ্রিস্টধর্মের জনৈকা নারী স্বেচ্ছাসেবক, খুব আনন্দের সাথে মন্তব্য করেছেন, “আমরা কায়রোর মহিলা কলেজে একসাথে অনেক মেয়েকে আমাদের সারিতে জড়ো করতে সক্ষম হয়েছি। এদের অধিকাংশের পিতা ও অভিভাবক হলো পাশা। সত্যিই খ্রিস্টান মিশনারিরা একসাথে এতগুলো মুসলিম মেয়ে পাওয়া দুষ্কর। এই বিদ্যালয় থেকে মুসলিম দুর্গে আঘাত হানার এটাই মোক্ষম সময়।”২
মুসলিম নারী পর্যন্ত পৌঁছার জন্য শুরু হলো ইসলামবিদ্বেষীদের ছক আঁকা এবং সে অনুযায়ী কাজ করা। তারা প্রথমে মিশরের মেধাবী মুসলিম তরুণ-তরুণীদের শিকার করা শুরু করল। তারপর নিজেদের উদ্যোগে পাশ্চাত্যের ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের মতো উন্নত দেশগুলোতে উচ্চ শিক্ষার জন্য পাঠাতে লাগল। আজকের রিফায়াহ তাহতাবী, কাসিম আমিন, হুদা শারাভি কিন্তু এসবেরই পরম্পরা।
এরা পশ্চিমা দেশগুলোতে থেকে পশ্চিমা সংস্কৃতি ও সভ্যতা রপ্ত করে দেশে ফেরে। তারপর নিজের দেশের তরুণ-তরুণীর মাথা খাওয়া শুরু করে। বড় নির্লজ্জভাবে নিজ দেশের সভ্যতা সংস্কৃতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করতে থাকে। সেই সাথে পশ্চিমা নোংরামির গুণগানে থাকে পঞ্চমুখ। ‘যেন বাপ-চাচা, মা-খালা সব কুয়োর ব্যাঙ; তিনি এসেছেন সাগর ঘুরে।’
এই যে রিফায়াহ তাহতাবী! তিনি কী করলেন? একদম নির্লজ্জের মতো প্রকাশ্যে ঘোষণা দিলেন, “খোলামেলা চলা আর ছেলেমেয়ে অবাধ মেলামেশা করা এতে খারাপ কী আছে? ইউরোপের রাস্তায় যদি নাচগান কর, তা হলে একে পাপ বলে না। একে বলে তারুণ্য, উচ্ছলতা।”
তারই ভাবশিষ্য কাসিম আমিন ফ্রান্স থেকে ফিরতে না ফিরতেই রাতারাতি মহামতি বনে গেলেন একটি বই লিখে—তাহরীরুল মারআহ (নারী-স্বাধীনতা)। বইটি যেন তাক লাগিয়ে দিল পুরো মিশরবাসীকে। তবুও অবাক লাগে, তিনি যে নারী-স্বাধীনতার ডাক দিলেন, তার মূল উপজীব্য নাকি এই একটি বাক্য—‘আমি সেই দিনের অপেক্ষায় আছি, যেদিন মিশরের মেয়েরাও ধর্মকথা ও পর্দাপ্রথার বলয় ভেঙে বেরিয়ে আসবে এবং আমার ‘ইউরোপিয়ান সিস্টার’দের মতো ‘মুক্ত বিহঙ্গ’ হয়ে উদার আকাশে উড়াল দেবে।’
আরও আশ্চর্যের বিষয়, নারী-স্বাধীনতার নামে মিশরের মুসলিম নারীদের সাথে যারা ফ্রড খেলা শুরু করেছিলেন, তাদের দলে যে শুধু পুরুষই আছেন তা নয়, নারীও আছেন। হুদা শারাভি। সে-সময়ের নারী আন্দোলনের অবিস্মরণীয় নাম। প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের বিভিন্ন নারী সংস্থায় ছিল তার দাপুটে বিচরণ। ১৯২৩ সালে ইতালির রাজধানী রোম নগরীতে প্রথম যে নারী-বিষয়ক আন্তর্জাতিক সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল তিনি সেই সেমিনারেও উপস্থিত হয়েছিলেন। মিশরে ফিরতি পথে সফর করেছিলেন সমুদ্রে। জাহাজে উঠে মিশরের প্রথম মুসলিম নারী হিসেবে হাজার বছরের মুসলিম ঐতিহ্যকে লাথি মেরে মুসলিম জাতির গর্ব, অহংকার ভেঙে চুরমার করে নিজের মাহাত্ম্য, নিজের আভিজাত্যের প্রতীক, যা তাকে চির সম্মানে ভূষিত করে রেখেছিল এতটা কাল, সেই হিজাবটি খুলে ফেললেন এবং সামনে ছুটে চলা জাহাজ থেকে পেছনে উড়ে ফেলে দিলেন—অগণিত পরপুরুষের সামনে লক্ষ কোটি মুসলিম নারীকে অপমানিত করে, ‘পর্দা প্রথার শৃঙ্খলা’ ভেঙে বেরিয়ে পশ্চিমা ‘মুক্ত বিহঙ্গ’ হয়ে, চৌদ্দশো বছরের রক্তমাখা মুসলিম শাহী কাফেলাকে পদদলিত করে। বিনিময়ে যা পেলেন তা কিছু ফিরিঙ্গিপনা বাহবা ও করতালি, এবং কিছু নীরব নিস্তব্ধ ব্যথিত হৃদয়ের রক্তক্ষরণ। কিন্তু তার চোখে মুখে যা ছিল তা কোনো অজানা অহংকারের স্ফূর্তি বৈ কী!
তিনি ফিরে এলেন কায়রোতে। বিশ্বজয়ের আনন্দ নিয়ে। তথাকথিত নারী-আন্দোলনের মহানায়িকা হয়ে। ইতালির সেমিনার থেকে অর্জিত শিক্ষার ফলস্বরূপ প্রতিষ্ঠা করলেন একটি সংস্থা—মিশরীয় নারী ঐক্য। সংস্থার মূল সুর যেন ইতালির সেমিনার থেকেই ভেসে আসে। নারীর অধিকার চাই। সমান অধিকার চাই। পুরুষের সাথে মিলেমিশে কাজ করলে ক্ষতি কী? পোশাক-আশাক কেমন হবে, কীভাবে হবে সেটা আমার ব্যাপার, এখানে বাঁধাবান্ধি কীসে? কীসের হিজাব, কীসের নেকাব? তালাকের অধিকার চাই। পুরুষের অভিভাবকত্ব মানি না। পুরুষ যদি চারটে বউ রাখতে পারে তা হলে আমরা...? ইত্যাদি ইত্যাদি অন্যান্য আবর্জনা সম সব কথাবার্তা। প্রবৃত্তির অনুগামী হলে যা হয়। অনেকটা শিয়ালের ছদ্মবেশের মতো। বুঝে হোক না বুঝে হোক, প্রোপাগান্ডায় সুর মেলানোই আধুনিকতা। সুর না মেলালেই সেকেলে, কূপমণ্ডূক, ধর্মযাজক, কুসংস্কারাচ্ছন্ন ইত্যাদি।
মিশরের এই নারী-আন্দোলনের প্রতি পশ্চিমা দেশগুলো উৎসুক ছিল তাক লাগানোর মতো। এক কথায় তারা মুক্ত হস্তে দান করা শুরু করে দিল। ইউরোপীয়রা নিজ মিশরে চলে এলেন মিশরের নারী-আন্দোলনের অগ্রগতি এবং কর্মতৎপরতা পর্যবেক্ষণের জন্য।
হুদা শারাভির আন্দোলনকে গতিশীল করতে এগিয়ে এলেন দুরিইয়াহ শাফিক। প্রাচ্যের নিয়মনীতিকে তিনিই সবচেয়ে বেশি দুঃসাহসিকতার সাথে আঘাত করতে লাগলেন। পশ্চিমা নারীর অনুসরণই যেন তার কাছে জীবনে সফল হওয়ার একমাত্র চাবিকাঠি। তিনি ধর্মহীন ভাষায় ঘোষণা দিলেন, ‘আমরা সত্যিই অনুসরণের যোগ্য, আমরা তাদেরই অনুসরণ করব। মিশরীয় নারীদের অনুসরণের যোগ্য একমাত্র পশ্চিমা নারীরাই। বিশেষত ব্রিটেনের মহারানী।’
দুরিইয়াহ শাফিকের দলে তাঁর পরে আরও একজন মহামতির আবির্ভাব হলো। আমিনা সায়িদ। তিনি নারীবিষয়ক একটি পত্রিকা বের করতে লাগলেন। নাম দিলেন হাওয়া (ইভ)। হাওয়া নামের ‘হাওয়া’ দিয়েই পশ্চিমা বিষ ঢুকিয়ে দিতে লাগলেন মিশরীয় নারীদের মনে। তিনি স্বামী এবং অভিভাবকের সাথে অবাধ্যতা, হঠকারিতা ও স্বেচ্ছাচারিতার উসকানি দিতে লাগলেন চিমটি কাটার মতো করে। অজুহাত—পুরুষের আধিপত্যকামিতা। দাবি—দাসীত্ব থেকে মুক্তি, আর একটু ইনিয়ে-বিনিয়ে, মানসিক দাসত্ব থেকে মুক্তি। তার বিদ্রোহের শিকার হলো ইসলামের মাহাত্ম্যপূর্ণ শৈলী—পর্দা ব্যবস্থা। বিদ্রোহের শিকার হলো মুসলিম নারীর সবচেয়ে বড় গুণ, সবচেয়ে বড় মাহাত্ম্য—সতীত্ব। তিনি পর্দাব্যবস্থা নিয়ে যে শ্লেষাত্মক উক্তিটি করেছেন, তা খুবই দুঃখজনক। তিনি বলেছেন: “মেয়েরা পুরো শরীর ঢেকে ভূতের মতো হয়ে কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসবে এটাই কি ইসলাম? একটা জীবন্ত মেয়েকে না মরতেই কফিনে পরিয়ে দেওয়া কি ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য খুবই জরুরি?”
ঔপনিবেশিক গোষ্ঠীর ভাবশিষ্যরা নারী-স্বাধীনতা ও নারীমুক্তির জোর প্রচারণা চালাতে থাকলেন। তাদের নির্লজ্জ শব্দপ্রয়োগের চাতুর্য, মনগড়া হাঁকডাকের তর্জন-গর্জন অনেক মিশরীয় মেয়েকে মোহাচ্ছন্ন করল। অনেক মেয়েই পর্দার বিষয়ে এখন স্বেচ্ছাচারী, হঠকারী। তারা প্রথমে হাত ও মুখ খোলা শুরু করে। তারপর মাথা, তারপর পায়ের গোছা, তারপর রান। শালীনতার জন্য সাধারণ ভদ্রতা বোধও বিদায় নেয় মাঝামাঝি কোনো পর্যায়ে। নামে মাত্র যা থাকে—শুধুই ফ্যাশন।
ধীরে ধীরে বিষয়টি গড়াল ধর্মীয় বিধিনিষেধ এবং সামাজিক রীতিনীতিগুলোকে উপেক্ষা করে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা পর্যন্ত। আজ রাস্তাঘাট দোকানপাট শপিংমল থেকে শুরু করে লেক পাড় বা ধর্মীয় বিদ্যাপীঠ—কোনো কিছুই অশ্লীলতামুক্ত নয়। আর বিনোদনের নামে অশ্লীলতার জন্যই সেসব জায়গার উৎপত্তি হয়েছে সেসব এখন রীতিমতো...। আল্লাহ্ মাফ করুন।
পর্দাবিদ্বেষীরা চরিত্রে বন্ধনহীন এক জাতীয় লাগামহীন পাগলা ঘোড়ায় পরিণত হলো। কর্মমুখর ব্যস্ত সড়কে, ব্যস্ত শহরে, ব্যস্ত অফিসে পুরুষের ভিড়ে নারীরাও ছুটে পড়ল। স্কুল কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়ে সহশিক্ষার প্রতিযোগিতা শুরু হলো। কলকারখানার বড় বড় যন্ত্রপাতির বিকট আওয়াজে নারী-পুরুষও ঘুরপাক খেতে লাগল একসাথে। কিছু নির্ভরতা, কিছুটা স্বাধীনতা, কিছুটা আনন্দ ভুলিয়ে দিল নিজের ঘরকে, নিজের সন্তানকে, নিজের স্বামীকে। ক্ষণিকের এই মায়ামোহে নারীরা ডুবে সরিয়ে দিল তার প্রকৃতিপ্রদত্ত দায়িত্ব ও কর্তব্য থেকে। সে যে কারও মা, সে যে কারও মেয়ে, সে যে কারও স্ত্রী, সে যে কারও বোন; তার যে একটা ঘর আছে, সে যে কোনো ঘরের মালকিন, দূর থেকে দেখা মরীচিকা সবই বিস্মৃত করল তাকে।
নারীরা অবাধ্য হলো। আগ্রহের অবাধ্য হলো। ঘর ছাড়ল। সম্মানের আসন থেকে নেমে এল। ছুঁড়ে ফেলে দিল মাহাত্ম্যের মুকুট। খুলে ফেলে দিল মাথার তাজ—হিজাব, নেকাব। মনে মনে মনগড়া পাওয়ার মতো হয়ে গেল মুক্ত স্বাধীন। পুরুষ তার পেছনে ছোটে এই তার গর্ব। ছেলেরা তার জন্য জীবন দিতে চায় এটাই সফলতা। প্রবৃত্তিকামীরা প্রশংসা করে গদগদ হয়। রুগ্ন মনেরা হাত বাড়ায়, লম্ফঝম্ফ করে। বোকা মেয়ে আনন্দে আত্মহারা। ছদ্মবেশী ছলাকলায় মনে আনন্দ ধরে না। সুখময় মেলামেশায় যেন বিশ্ব জয় জয়ে রূপ নেয়। তাই এতেও হয় না; নাচে, গায়, অভিনয় করে, ফ্যাশন করে। আরও কত কী!
কিন্তু ফল কী হয়, বোন? যখন ঘোর কেটে যায়, যখন জীবন যৌবন সব শেষ হয়ে যায়, তখন নিজেকে আবিষ্কার করে তিক্ত বাস্তবতার কোন কালো অন্ধকারে। দেখে, সে কোনো স্বার্থের বলি, কারও লালসার বলি। খুব সস্তায় অন্যের হয়ে কাজ করেছে সে। কোনো ষড়যন্ত্রের শিকার, কোনো কুচক্রীর ক্রীড়নক। যে কুচক্র, যে ষড়যন্ত্র তারই বিরুদ্ধে, তারই জাতির বিরুদ্ধে, তারই দেশের বিরুদ্ধে। এ কুচক্রের চাকা আবর্তিত হয়েছে মুসলিম পরিবারব্যবস্থাকে ভেঙে দিতে, মুসলিম সমাজব্যবস্থাকে গুঁড়িয়ে দিতে। একটু সুখের কারণে বড় চড়া মূল্য দিতে হলো তাকে। নিজের সম্মান, নিজের সম্ভ্রম, নিজের সবকিছুর সাথে সাথে নিজের দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ।
আর তার পৃষ্ঠপোষকরা, যারা বাহবা করতালি ও মিথ্যা স্তুতি দিয়ে উৎসাহ যুগিয়েছিল, অর্থ খ্যাতি ও সম্ভাবনার জগতে ডাহুক হয়ে ডাক ছেড়েছিল, কথার ফুলঝুরিতে ষোড়শী কুমারীদের মাতিয়ে রেখেছিল, তারাই প্রথম তাকে উপেক্ষা করে। তাদের কাছে তার কোনো মূল্য থাকে না। সত্যিই, ওসব লোকের কাছে চামড়া-জড়া বুড়ির কী বা মূল্য থাকতে পারে?
বলা উচিত, এমন উদাহরণ কম নয় যে, অনেকে নারী-স্বাধীনতার জোর প্রচারণা চালান; চাতুর্যের সকল শৈলী প্রয়োগ করে নারীকে ধর্ম ও বিশ্বাসের প্রতি বিতশ্রদ্ধ করে তোলেন; অথচ ব্যক্তিজীবনে নিজেই নারী-স্বাধীনতা নামের তামান্না থেকে মুক্ত। এই যে কাসিম আমিন। তিনি মিশরে নারী স্বাধীনতার নামে পর্দার প্রথাগত ভীতির কেমন বিরোধিতা করেছেন। অথচ নিজের স্ত্রীকে পর্দারপ্রথা শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করতে দেননি। এমনকি, নিজের ছড়ানো প্রোপাগান্ডার ব্যাপারে নিজের ঘরানা দের রেখেছেন সম্পূর্ণ অন্ধকারে। তাই তো তার স্ত্রী শরঈ পর্দার পূর্ণ পাবন্দি করেন। শুধু তাই নয়, প্রায়ই তার পক্ষ থেকে এমন বিবৃতি আসে যে, তার স্বামী, যেমনটা লোকে বলে যে তিনি সমাজে অনাচার ছড়াচ্ছেন, তেমন নন। তিনি কখনোই খোলামেলা চলা এবং অবাধ মেলামেশার পক্ষপাতী নন। তিনি শরঈ পর্দার প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল। এসব লোকের মিথ্যাচার ও অপব্যাখ্যা।
জনাব আবদুল কুদ্দুস সাহেবের কথা তো বলাই বাহুল্য। তিনি এ পর্যন্ত কতগুলো উপন্যাস লিখেছেন। তার রচিত অনেক উপন্যাসের চলচ্চিত্রায়নও হয়েছে। তার অধিকাংশ উপন্যাসই ধর্মীয় মূল্যবোধকে আঘাত করে রচিত। নারীদের ধর্মবিদ্বেষে প্রলুব্ধ করার প্রয়াস তার কম নয়। অথচ কাণ্ড দেখুন, ঔপন্যাসিক আবদুল কুদ্দুস এবং বাস্তবজীবনের আবদুল কুদ্দুসের মাঝে কেমন আকাশ পাতাল ফারাক। তিনি স্ত্রীকে বাইরে বের হতে দেন না। চাকরি করতে দেন না। অথচ তার স্ত্রী উচ্চশিক্ষিতা। শুধু তাই নয়, ব্যক্তি আবদুল কুদ্দুস স্ত্রীর প্রতি খুবই কঠোর। পত্রপত্রিকায়, টেলিভিশনের পর্দায় আজ পর্যন্ত একবারের জন্যও স্ত্রীকে আসতে দেননি; এমনকি, তার ছবিও প্রকাশ হতে দেননি।
প্রিয় বোন, বলুন তো, এমনটা কেন হয়? ...কারণ তিনি ওপরে ওপরে যা-ই বলুন, ভেতরে ভেতরে ভালো করেই জানেন যে, একজন নারীর প্রথম ও প্রধান মৌলিক কর্তব্য হলো একজন মমতাময়ী মা হওয়া, একজন সতীসাধ্বী স্ত্রী হওয়া।
আমরা যেই আবদুল কুদ্দুসের কথা বলছি, কে না জানে, তিনি ছিলেন একজন কর্মজীবী নারীর সন্তান। তার মা বহুল প্রচারিত 'রোয ইউসুফ' পত্রিকায় কাজ করতেন। কিন্তু পুত্র আবদুল কুদ্দুস মাকে আর কাজ করতে দেন না। তিনি চান, মা বাইরের ঝামেলা থেকে মুক্ত হয়ে ঘরে অবসর যাপন করুন।
অবশেষে এমন অনেক মুসলিম নারী আছেন, যারা একসময় তথাকথিত নারী-স্বাধীনতার ফাঁদে পা দিয়েছিলেন। কিন্তু হুঁশ হওয়ার পর, ভণ্ড-প্রচারকের মিথ্যা, প্রতারণা বুঝতে পারার পর, এখন আল্লাহর কাছে তওবা করে আবার ইসলামের সরল সঠিক পথে এসেছেন। আবার নিজে নিজে ধরা দিয়েছেন পর্দাপ্রথার ‘শৃঙ্খলে’, বরণ করে নিয়েছেন ‘চার দেয়ালের বন্দিনীর দশা’।
একসময়ের দুনিয়া কাঁপানো মডেল সাদিরা বাবেল্লি। ছোট পর্দায় ছিলেন হট কেক। আল্লাহ তাকে হেদায়াত দান করেছেন। সর্বশেষ সাক্ষাৎকারে আফসোস সহে বলেছেন, “আমি যখন অভিনয় করতাম, তখন কত চ্যানেল আমার পেছনে পড়ে ছিল। একটি সাক্ষাৎকারের জন্য কত উপহার উপঢৌকন জমে যেত। অথচ আজ আমিই যদি হিজাব পরে নারী-বিষয়ক ধর্ম ও সভ্যতার কথা বলতে চাই, তা হলে একটি চ্যানেলও আমাকে সুযোগ দিতে সম্মত হবে না।”
প্রখ্যাত চলচ্চিত্রশিল্পী শামস বারুদি বলেন, “যখন যশ খ্যাতি অর্থ বিত্তের সবকিছু আমার হাতে ধরা দিল, তখন আমার মনে প্রায়ই একটি প্রশ্ন জাগতে লাগল, এত কিছুর পরও আমি সুখী নই কেন? শামস বারুদি নিজেই নিজের প্রশ্নের উত্তর বলেন, “কারণ আমি বুঝতে পারতাম, আমি এমন একটি কর্ম বেছে নিয়েছি, যা আমার নারীত্বকে কুঁরে-কুঁরে খাচ্ছে প্রতিমুহূর্ত। এটা আমার প্রকৃতির সাথে বেমানান। এরপর থেকে আমি অনেক কাজ ছেড়ে দিতে লাগলাম। এ আশায় যে, আমি আমার নারীত্ব, আমার হারানো সম্মান ফিরে পাব। আমি আল্লাহকে খুব ডাকতাম, যেন তিনি আমাকে এই জগত থেকে দূরে সরিয়ে নেন এবং সত্য ও সুন্দরের পথে পরিচালিত করেন।” তিনি বলেন, “আমি আমার অতীতের স্মৃতিচারণ করতে চাই না। আমি চাই, যদি ওই সময় আমার জীবন থেকে একদম মুছে যেত।”
শামস বারুদি ইসলামের শীতল ছায়ায় ফিরে এসেছেন। তিনি আল্লাহর পথকেই নিজের জীবনপথ হিসেবে বেছে নিয়েছেন। কিন্তু অনিষ্টকারীরা বসে থাকেনি। তারা প্রতিনিয়ত সত্যপ্রাজ্ঞ নারীকে নিয়ে দ্বিধাজাল সৃষ্টি করেছে। কিন্তু যে আল্লাহর আশ্রয়ে নিজেকে সঁপে দেয়, আল্লাহ তার সহায় হন। আল্লাহ শামস বারুদির মনোবল অক্ষুণ্ণ রেখেছেন। তিনি নিজে খরচ করে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ও টিভি চ্যানেলে নিজের অবস্থানের কথা সুস্পষ্ট করেছেন। তিনি সুস্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি তওবা করেছেন। তিনি এই জগত থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। তিনি প্রতিটি মুসলিম তরুণীকে, প্রতিটি মুসলিম নারীকে উদাত্ত আহ্বান জানান ইসলামের পর্দার পাবন্দি করার, ইসলামের বিধিনিষেধকে আঁকড়ে ধরার।১
এমন উদাহরণ পশ্চিমা নারীদের মধ্যেও আছে। ফ্রান্সের বিখ্যাত অভিনেত্রী ব্রিজেট বারদোঁ। পুরো জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন হৈ হুল্লা আর আমোদ ফুর্তিতে। শরীর আর সৌন্দর্যই ছিল জীবনের সবকিছু। কিন্তু জীবনের পড়ন্ত বিকেলে এসে তার আক্ষেপ শুনুন— “জীবন থেকে যে শিক্ষা পেয়েছি তা এই যে, হাজার হাজার আবেগ-উচ্ছ্বসিত প্রলোভনযুক্ত চিঠি, বিমুগ্ধ বিমোহিত কোটি কোটি দর্শকচিত্তের করতালি জীবনের বাস্তবতায় একজনমাত্র বিশ্বাসী পুরুষের ভালোবাসা হতে পারে না, যা আমাকে জড়িয়ে রাখে ভালোবাসায়; যা আমার অন্তরে শান্তি আনে, অভয় দেয়। আমার বিপুল খেতাব, যশ খ্যাতি ছিল। অনেক অর্জন ছিল। কিন্তু জীবনের চরম বাস্তবতায় আমি ব্যর্থ। আমার প্রাপ্তির খাতা শূন্য। আমি তাই মানুষ থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বাকি জীবনটা নীরবে কাটিয়ে দিতে চাই। মিডিয়া থেকে অনেক দূরে।” তিনি আরও বলেন, “আমাকে চেনে এমন অনেক। কিন্তু আমার বন্ধু বলতে যারা আছে, হাতে গোনার মতো। আমার ছেলের কথাই বলি। সে যখন ছোট ছিল, তখন আমি তাকে গুরুত্ব দিইনি; সুতরাং আমি যখন বৃদ্ধা হয়েছি, তখন সে আমাকে গুরুত্ব দেবে এমনটা আমি আশা করতে পারি না।”২
বণিকমহল নারীস্বাধীনতার বিষয়টিকে সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেছে। বাণিজ্যিক প্রচারণায় তাদের কাছে সবচেয়ে কার্যকরী মাধ্যম হলো সংস্কৃতি। পণ্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য বিলাস, স্বল্প-বসনা নারী এবং নারীর উলঙ্গ অর্ধোউলঙ্গ ছবির কোনো জুড়ি নেই। ব্রিটিশ নারী-স্বাধীনতা সংস্থাও এভাবে নারী-স্বাধীনতার নামে নারী-অবমাননার পায়তারা করেছে। বামপন্থী টিমও এ ব্যাপারে প্রচুর প্রতিবাদ জানিয়েছেন। কেননা, তিনিও মনে করেন, এটা কার্যত নারীর অবমাননা।
বড় বড় বস্ত্রালয়গুলোতে নারীদের যেভাবে ব্যবহার করা হয়, তা রীতিমতো উপহাস। ফরাসি ফ্যাশনগার্ল ফাজিয়ান ‘আল মুসলিমুন’ পত্রিকার একটি একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেন, “এ পথে আসা সহজ ছিল। কিংবা আমার কাছে সহজ মনে হয়েছিল। খুব সহজেই খ্যাতির স্বাদ পাই। উপঢৌকনে আমার ঘর ভরে যায়। আমি এত সহজে এত কিছু পাব, স্বপ্নেও ভাবিনি। কিন্তু আমাকে যে মূল্য দিতে হয়েছে, তা অনেক চড়া।
প্রকৃতপক্ষে এখানে সফলতার পথ একটাই—আবেগ অনুভূতি বিসর্জন দিতে হবে, লজ্জা শরম ছেড়ে ফেলতে হবে, বেহায়াপনাকে সক্রিয় করে দিতে হবে, আত্মসম্মানকে গলা টিপে হত্যা করতে হবে; বেশি বোঝা যাবে না, বেশি ভাবা যাবে না। তোমাকে যা ধরে রাখতে হবে —তোমার দেহ, তোমার রূপ-লাবণ্য, তোমার দীপ্তিময় ভরা যৌবন; দেহের সৌন্দর্য ও সুর মূর্ছনা। আকর্ষণ ধরে রাখতে জগতের সব সুস্বাদু খাবার বর্জন করা, পাশাপাশি নিয়মিত বলবর্ধক ও উত্তেজনাকর ড্রাগ ও মেডিসিন গ্রহণ করার কথা বাদই দিলাম।
তারা আমাকে একটা জীবন্ত মূর্তি বানিয়ে রেখেছিল। আমার কাজ ছিল ক্রেতাদের মন মত্তে নিমগ্ন করে তোলা। আমি যেন কোনো জড়পদার্থ ছিলাম, যে নির্দিষ্ট হাসিতে মানুষকে হাসাতে পারে; কিন্তু সে নির্গল্প, নির্জীব; তার কোনো অনুভূতি নেই। সেখানে প্রতিদিন বস্ত্রালয়ের বস্ত্র শরীরে ধারণ করতে হয়; তার আগে দেহ থেকে নারীত্ব ও মনুষ্যত্বের বস্ত্র খুলে ফেলতে হয়। নয়তো এই নিষ্ঠুর পৃথিবী তোমাকে ছুঁড়ে ফেলে দেবে। তুমি যদি কোনো স্টেপ ভুল কর, তা হলে তোমাকে শাস্তি পেতে হবে, যা একই সাথে মানসিক ও শারিরীক!...
একজন ফ্যাশনগার্ল হিসেবে সর্বত্র বিচরণ করেছি। ফ্যাশনের পোশাকে দেহাবরণ করে, নিজের নারীত্বকে বিসর্জন দিয়ে দর্শকদের মনোরঞ্জন করেছি, কিন্তু তারা আমার কেউ নয়, তাদের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই; আমার কষ্ট হতো, যখন দেখতাম, তাদের কাছে আমার ব্যক্তিত্বের কোনো মূল্য নেই। যত মূল্য—আমার গড়নের, আমার পরনের পোশাকের।”১
এককালের স্বনামধন্য ফ্যাশনগার্ল ফজিয়ান এভাবে নিজের জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা ব্যক্ত করেছেন। আল্লাহ তাকে তওফিক দান করেছেন, তিনি সেই অভিশপ্ত জীবনের নরকভোগ থেকে পালিয়ে ইসলামের শীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেছেন।
প্রিয় বোন, একটু তো ভাবুন, পৃথিবীতে বর্বরতার আর কোনো উদাহরণ আছে কি, যা একজন নারীর নারীত্বকে বিসর্জন দেওয়ার চাইতেও নির্মম; যাকে জীবন্ত দাসী বানিয়ে রাখা হয় তার সম্মান ও সম্ভ্রম নিয়ে খেলা করার জন্য, তার নারীত্বকে নিষ্পেষিত করার জন্য, তার লজ্জাকে লালসার বাজারে বলি দেওয়ার জন্য?
পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে কী ভয়াবহ অবস্থা দাঁড়িয়েছে। ইউরোপিয়ান সামাজিক নিরীক্ষণ সংস্থার একটি জরিপ শুনলে আঁতকে উঠতে হয়। তাদের গবেষণা মতে পঁচিশ বছর বয়সী আশি ভাগ ব্রিটিশ নারী একা একা লন্ডনের রাস্তায় চলতে ভয় পান। কারণ ধর্ষণ ও অপহরণের ভয় প্রতিমুহূর্তে তাঁদেরকে তটস্থ করে রাখে। প্রকাশ থাকে যে, এ বয়সের প্রতি চারজন একজন নারী রাজধানীতে রাস্তায় বের হলে আত্মরক্ষার জন্য সাথে চাকু বা পিস্তল রাখেন।২
কানাডার তথ্যমন্ত্রাণালয়ের জনৈক কর্মকর্তা দুঃখ প্রকাশ করেছেন যে, কানাডায় বসবাসরত অর্ধেকের বেশি নারীই যৌন হয়রানি ও দৈহিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। একটি প্রতিবেদনে এসেছে, গোঁড়ামি ও লালসার শিকার হয়ে নারীরা বিভিন্ন প্রান্তে যৌননির্যাতনের শিকার হচ্ছেন অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে। তারা এটাকে কোনো অপরাধ মনে করে না। বরং এটা তাদের দৃষ্টিতে একটি সাজামাত্র। নারীকে ভয় দেখানোর, শাস্তিপ্রদানের বা তার সংশোধনের একটি সাধারণ প্রক্রিয়া। আশ্চর্যের বিষয়, নারীর প্রতি এরকম জঘন্য অপমানকর কর্মকাণ্ডের বিদ্যমানতা সত্ত্বেও ওসব দেশের বিচারব্যবস্থায় নারী উৎপীড়ন, যৌন হয়রানি বা ধর্ষণ বিশেষ কোনো শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে বিবেচিত নয়। কারণ এগুলো সেখানে এখন স্বাভাবিক ব্যাপার।১
জনৈকা আমেরিকান নারী সাংবাদিক হেলেন স্ট্যানবেরি ভ্রমণের উদ্দেশ্যে কায়রো আসেন। প্রায় কয়েক সপ্তাহ এখানে অবস্থান করেন। তিনি কায়রোর বিভিন্ন মাদরাসা, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়; বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান; নারী, পুরুষ ও শিশু-সংক্রান্ত বিভিন্ন সংস্থা ইত্যাদি পরিদর্শন করেন। তার রিসার্চের মূল বিষয় ছিল পরিবার, সমাজ ও নারী পুরুষের বিভিন্নমুখী সমস্যা, উৎপত্তি ও উত্তরণ। ভ্রমণশেষে দেশে ফেরার সময় নিজে একজন খাঁটি পশ্চিমা হয়েও নারী হিসেবে নারী জাতির প্রতি মমত্বের স্বাক্ষর রেখে গেছেন একটি সরল সত্যকে অকপটে স্বীকার করার মাধ্যমে। তিনি লিখেছেন,
“মুসলিম আরব সমাজ নিঃসন্দেহে একটি পূর্ণাঙ্গ ও সুস্থ সমাজ। এই সমাজের পক্ষে এটাই কল্যাণকর হবে যে, তারা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে আঁকড়ে থাকবে। এখানে নারী পুরুষের মাঝে যে যৌক্তিক ব্যবধান ও সীমারেখা রাখা হয়েছে তা কোনোভাবেই মন্দ নয়। এই কয়দিনে এই সমাজের প্রতি আমার অন্তরে যে মুগ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে, তা থেকেই একজন নিঃস্বার্থ হিতাকাঙ্ক্ষী হিসেবে বলছি, আপনারা আপনাদের সামাজিক রীতিনীতি, সভ্যতা সংস্কৃতি এবং চারিত্রিক মূল্যবোধকে অক্ষুণ্ণ রাখার চেষ্টা করুন। আপনারা অবাধ মেলামেশা থেকে বিরত থাকুন। মিথ্যে স্বাধীনতার নামে মেয়েদের বাধা বন্ধনহীন ঝুঁকিপূর্ণ জীবনের দিকে ঠেলে দেবেন না। সত্যি বলতে কি, আপনারা আপনাদের সেই তথাকথিত পরাধীনতাকে ফিরিয়ে আনুন। ইউরোপ আমেরিকার উদারবাদ, বাধা বন্ধনহীনতা ও আধুনিকতা থেকে এটা শত গুণ ভালো। আপনারা অবাধ মেলামেশাকে প্রতিহত করুন। এটা আমেরিকার জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। আমেরিকান সমাজ এখন একটা মৃত সমাজ। সেখানে লম্পট ও ইতরতা ছেয়ে গেছে। সেখানে শুধু অবাধ মেলামেশা ও মিথ্যে স্বাধীনতার বলি হয়ে অসংখ্য সম্ভাবনা ঝরে যায় প্রতিদিন প্রতিনিয়ত।”২
কুয়েতের 'জারিদাতুস সিয়াসিয়াতুল কুয়াইতিয়াহ' পত্রিকার উদ্যোগে জনৈকা জার্মান নারীর একটি সাক্ষাৎকার প্রচার করা হয়। সন্দেহ-নিরসনের জন্য বলছি, ওই নারী একজন অমুসলিম। সাংবাদিক তাঁকে প্রশ্ন করেছেন: 'আপনার দৃষ্টিতে নারীর সুন্দরতম অবস্থানকেন্দ্র কী হতে পারে?' উত্তরে তিনি বলেন, 'ঘর।' একজন পশ্চিমা নারীর মুখে এমন উত্তর শুনে মুসলিম নারী সাংবাদিক কিছুটা হতচকিত হন। তিনি আবার জিজ্ঞেস করেন: 'আপনি কি মনে করেন, সব সময়ই ঘর নারীর জন্য আদর্শ জায়াগা?' তিনি এবার আরও দৃঢ়তার সাথে বললেন: 'হ্যাঁ, আমি মনে করি, সব সময়ই ঘর নারীর জন্য আদর্শ জায়াগা।' এবার সাংবাদিক জানতে চাইলেন: 'ঘরের বাইরে কর্মরত হওয়ার ব্যাপারে কী বলেন?' প্রতিনিধি এবার বললেন: 'মৌলিকততে নারীর সৃষ্টি এজন্য নয়।' সাংবাদিক জিজ্ঞেস করলেন: 'তাহলে সমাজগঠনে নারী পুরুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে কী করে?' প্রতিনিধি বললেন: 'সমাজগঠনে নারী পুরুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য, আমি মনে করি না, বাইরে গিয়ে কাজ করার প্রয়োজন আছে। অন্যভাবেও সেটা হতে পারে। নারী পুরুষকে একটি সুখময় শান্তিময় পরিবার উপহার দেবেন। ঘরের বিষয়ে তাকে নিশ্চিত রাখবেন। সুখে দুঃখে পাশে থাকবেন। অর্জনে উপার্জনে সাহস ও প্রেরণা যোগাবেন। ছেলেমেয়েকে মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তুলবেন। নারী বাইরে গিয়ে কাজ করে সামাজিকভাবে যে উন্নতি সাধিত হবে, এভাবে ঘরে থেকে তার চেয়ে অনেক গুণ বেশি হবে। আমি এ কথাটি আবেগ তাড়িত হয়ে বলছি না। জীবনের তিক্ত বাস্তবতা থেকে বলছি। মূলত নারী বাইরে গিয়ে কাজ করে হয়তো আর্থিকভাবে কিছুটা স্বনির্ভরতা পাবেন; কিন্তু পুরো সমাজ এবং সার্বিকভাবে পুরো নারী জাতি নিঃসন্দেহে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যা আমরা হাতে কলমে পাচ্ছি।'৩
বিখ্যাত ব্রিটিশ লেখিকা লেডি ব্রাউন তার বিখ্যাত 'আসুলুল জিনস ওয়া তবিয়াতুহ' গ্রন্থে লিখেছেন, “পুরুষ প্রকৃতগতভাবে জীবনে সরল। আগেও ছিল। এখনো আছে। পরেও থাকবে। আমরা যতই চেষ্টা করি, এই প্রকৃতিকে বদলাতে পারব না। সমানাধিকারের ডাক দিয়ে বা সভা-সেমিনার মহড়া করে কোনো লাভ নেই। পুরুষ সবল। সবলই থাকবে। নারী দুর্বল। দুর্বলই থাকবে।” বিখ্যাত ইংরেজ নারী গল্পকার ও উপন্যাসিক আগাথা ক্রিস্টি বলেন, “সত্যি বলতে কি, এখনকার নারীরা বোকা। স্বাধিকার ও সম-অধিকার পাওয়ার জন্য সে কত কূটনীতিই না খাটল। কিন্তু ফল কী হলো? আমাদের স্বীকার করতেই হলো, পুরুষের তুলনায় আমরা দুর্বল। সাথে সাথে পুরুষর সাথে কাজ করতে হচ্ছে, ঘাম ঝরাতে হচ্ছে। অথচ এতটা কাল এটা ছিল শুধু পুরুষের কর্তব্য।... আমাদের পূর্ববর্তী নারীরা চালাক ছিল। তখন নারী পুরুষকে এই বিশ্বাসে আসক্ত রেখেছিল যে, সে দুর্বল; সে সব সময় পুরুষের স্নেহ ও ভালোবাসার পাত্রী; সে সবসময় পুরুষের আদর ও আশ্রয় চায়। তখন পুরুষই ছিল পরিবারের মাথা। পুরো পরিবারের সুখের জন্য মৌলিকভাবে দায়িত্বশীল ছিল পুরুষই। কিন্তু আজ কী হচ্ছে? নারী স্বাধীনতা চায়। পুরুষের অভিভাবকত্বকে আধিপত্য বলে অস্বীকার করে, অভিভাবকত্ব মানে না। আন্দোলন করে —দুর্বার আন্দোলন। কিন্তু পুরুষের অভিভাবকত্বকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে যে স্বাধীনতা পায়, সে আর-এক যাযাবর বিড়ম্বনা। ... নারী বাধা না মেনে সর্বক্ষেত্রে পুরুষের সাথে পাল্লা দিতে চায়। এখন তাকে সবখানে নামতে হয়। যা তার নামার মতো, তাতেও। যা তার নামার মতো নয়, তাতেও। ফল কী হয়? জীবন থেকে সুখ বিদায় নেয়, নারী ক্লান্ত হয়। ... অথচ আগের জীবনধারায় পুরুষ ছিল নারীর সুখ ও সম্মানের অতন্দ্র প্রহরী।”
প্রিয় বোন, জীবনের তিক্ততা পশ্চিমা নারীদের ঘোর কাটিয়েছে। তাদের টনক নড়েছে। তারা এখন প্রকৃতির কোলে ফিরে আসতে চান। কিন্তু পারেন না। তারা এখন অকপটে নারী ও নারীপ্রকৃতিকে স্বীকার করেছেন। সেই সাথে পশ্চিমা সভ্যতার নারীস্বাধীনতার স্বরূপ উন্মোচন করেছেন। তারা চিৎকার করে বলছেন, তারা একজন পুরুষের কর্তৃত্ব (অভিভাবকত্ব ও তত্ত্বাবধান) থেকে বাঁচতে গিয়ে—হোক তিনি স্বামী, পিতা কিংবা ভাই— অনেক পুরুষের সেবাদাসী ও যৌনদাসীতে পরিণত হয়েছেন।
সুতরাং নারীস্বাধীনতার প্রবক্তাদের বলি, মুসলিম নারী তো আপনাদের কাছে গিয়ে পরাধীনতার অভিযোগ করেনি, কখনো কোনো অনুরোধও করেনি, তা হলে এই উপযাচকতা কেন? এত দয়া আপনাদের? তা হলে শুনুন, মুসলিম নারীর কোনো কষ্ট নেই শুধু আপনাদের উড়ে এসে জুড়ে বসা ছাড়া; দয়া করে আমাদের জীবনটাকে আর সংকীর্ণ করে তুলবেন না; আপনাদের জ্বালায় আমরা অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছি; আপনাদের কারণে যেখানে সেখানে পর্দানশীন নারীকে মুখ খুলতে হয় আপনাদের পশুবৃত্তির প্রমোদনের জন্য। মুসলিম নারীর যদি কোনো অভিযোগ থেকে থাকে, তো এটাই তাদের অভিযোগ। দয়া করে আপনাদের সাহায্যের হাতটি গুটিয়ে নিন। মিষ্টি কথা বলে আমাদের সরল মেয়েদের মাথা খাওয়া বন্ধ করুন। ছলচাতুরি ছেড়ে দিন। নারী-স্বাধীনতার নামে নারীকে জীবন্ত দাসী বানানোর যে ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেন, তা থেকে বিরত থাকুন। ইসলামের পর্দাপ্রথা থেকে আমরা মুক্তি চাই না। আপনাদের ভ্রান্ত খেলা থেকে মুক্তি চাই।
প্রাচ্যের নারীদের বলি, তোমরা ঘরে ফিরে এসো। আবার সেই ঐতিহ্যের মাঝে ফিরে এসো। ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের বিরুদ্ধে পশ্চিমা পদলেহীরা মুখ থুবড়ে পড়ুক। নারী-সংস্থা, নারী-সংগঠন ও নারী-আন্দোলনের নেতা-নেত্রীদের বলি, তোমরা আওয়াজ তোলো; উচ্চ কণ্ঠে আওয়াজ তোলো—মুসলিম নারী যেন ঘরে ফিরে আসে। আবার যেন ঘরের মালকিন হয়ে সমাজের তাজ মস্তকে ধারণ করে। মুসলিম নারী আবারও স্বামীকে সুখী করাকেই জীবনের ব্রত বানিয়ে নিক। আনুগত্য ও ভালোবাসায় স্বামীর মনের সুখ ও চোখের শীতলতা হয়ে থাকুক। নারী তার সহজাত স্নেহ, মমতা ও ভালোবাসা আবার ফিরে পাক—যা মিথ্যে প্রচারণার মোহে নিখোঁজ হয়ে গেছে। যার আশায় বুক বেঁধে আছে নিষ্পাপ সন্তানরা। যার প্রেরণায় একজন মা সন্তানের সুখের জন্য যাপন করেন বিনিদ্র রজনী। অফুরন্ত ভালোবাসায় সিক্ত করেন সন্তানের জীবনকে।
স্বাধীনতার স্বাদ আস্বাদন করতে গিয়ে পশ্চিমা নারীদের যে করুণ পরিণতি হয়েছে, মুসলিম নারীরা তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করুক। নয়তো ওই দিন বেশি দূরে নয়, যেদিন এখানেও ওই একই অবস্থা বিরাজ করবে। ভাগ্যবান তো সে, যে অন্যের দেখে শিক্ষা গ্রহণ করে। কিন্তু দুর্ভাগা সে, যে নিজে পতিত হওয়া ছাড়া সতর্ক হয় না।
প্রিয় বোন, আল্লাহ আপনাকে চোখ দিয়েছেন দেখার জন্য। দয়া করে দেখুন। চর্মচোখে দেখুন, মর্মচোখে দেখুন, ইসলামী শরীয়াতের সুমহান জীবনদর্শন দেখুন। এ কোনো মানব রচিত জীবনবিধান নয়; এ প্রত্নপ্রদত্ত পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। এ সর্বময়, সর্বজনীন, সর্বকালীন। এ সুনিশ্চিত, নিখুঁত। আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করেছেন, আমাদের কর্ম ও কীর্তিকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি জানেন। আমরা জানি না।
প্রিয় বোন, এই বিশ্বাস ও মূল্যবোধ হৃদয়ে ধারণ করুন। কথাগুলো যখন বুঝে আসবে, এবং অবশ্যই বুঝে আসবে, তখনই এই ধর্মের, আপনার এই ধর্মের মাহাত্ম্য, আপনা-আপনি অনুধাবন করবেন অনায়াসে। অচিরেই আপনার হৃদয়ে অনুরণিত হবে কবির এই কথাগুলো,
ম্যাহলান ফামা হাজাল্লাযী ক্বদ গুররাকুম
ইল্লা সারাবান আওলা তারাউনাল গারবা
কাইফা গাদাল রিজালু বিহি যিআবান
আলা তারাউনা উরাল আখলাক্বি তাশতাক্বিবু
ইনশাক্বিবান ইন তারগাবু লি আমানিকুম
সাওনান ওয়া আইশান মুসতাত্বাবান
ফাদাঊস সুফূরা লি আহলিহি ওয়ারজিঊ
আলাইহিমুল বিক্বানা
এ কী করছ তুমি?
আলো ভেবে আলোয়ার মরুভূমি—
এ যে ভ্রম, এ যে ধোঁকা!
দ্যাখো, দ্যাখো!
ওখানে মানুষ অমানুষ,
ওখানে পুরুষ পশু, হায়েনা;
ওখানে চরিত্রের গিঁঠ ছেঁড়া ফাঁড়া;
ওখানে মোহ, ওখানে মরীচিকা!
চাও কি মায়ের সম্মান, বোনের সুরক্ষা,
সুন্দর সুখকর জীবন?
তবে থামো, আর ছুটো না,
আর ছুটে ছুটে ঝুঁকে ঝুঁকে মোরো না।
এ নগ্নতা বন্ধ করো
পর্দাকে আঁকড়ে ধরো।
প্রিয় বোন, আর কত ছুটবেন মরীচিকার পেছনে? এবার তো থামুন। এবার তো ফিরে আসুন। ফিরে আসুন আপনার প্রতিপালকের দিকে। ইসলামের ছায়াদার ফলদার ফুলদার বৃক্ষের নিচে। এখানে অবলোকন করুন একটি সুন্দর পৃথিবী। এখানে উপভোগ করুন একটি সুন্দর জীবন।
জেনে রাখুন, এখানে কালের গর্ব আপনি, আপনি মুসলিম নারী; এখানে সৃষ্টির অহংকার আপনি, আপনি মুমিন নারী। আপনারাই ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছেন এ উম্মাহর ভবিষ্যৎ—আমাদের নতুন প্রজন্ম। এবার অবিচল মনে আর একবার হৃদয়ে আওড়ান আমাদের প্রিয় প্রভুর মহা বাণী,
كُذٰلِكَ يَضْرِبُ اللَّهُ الْحَقَّ وَالْبাটِلَ ۚ فَأَمَّا الزَّبَدُ فَيَذْهَبُ جُفَاءً ۖ وَأَمَّا مَا يَنْفَعُ النَّاسَ فَيَمْكُثُ فِي الْأَرْضِ ۚ كَذَلِكَ يَضْرِبُ اللَّهُ الْأَمْثَالَ
অর্থ : এভাবেই আল্লাহ্ দৃষ্টান্ত দিয়ে থাকেন সত্য ও মিথ্যার। আবর্জনার ফেনা নিমেষেই শেষ হয়ে যায়। কিন্তু যা মানুষের জন্য উপকারী তা ওপরেই থেকে যায়। এভাবেই আল্লাহ্ তুলে ধরেন সুন্দর দৃষ্টান্ত। —সূরা রাদ : ১৭
টিকাঃ
১. আন্ডারউড হিওয়ার : ১/৯৯।
২. আদ্দায়তুল হিয়ার: ২/২১।
১. কিতাবুল হিয়া মিন আলামিন ওয়ালাদ ইলা রিহাবিল ঈমান: ৬৯-৬৯।
২. রিসালাতুন ইলা হাওয়া: ৩৪/২৪-২৫।
১. মিস্ আল্লামিন ওমারা ইলা রিহাবিল ঈমান: ১২-১৩।
২. সুরাতুল নিওয়া-২৫: ২৪।
১. সুরাতুল ফিতরাহ: ৬৬।
২. রিসালাতুন ইলা হাওয়া: ৪/১২০।
৩. সুরাতুল ফিতরাহ: ১৩।
📄 আমাদের প্রত্যাশা
আমাদের প্রত্যাশা—পূর্ণাঙ্গ ইসলামী সমাজ, পূর্ণাঙ্গ মুসলিম সমাজ। যার প্রথম ও প্রধান ভিত্তি হবে মুসলিম পরিবার। যার প্রতিটি সদস্য আল্লাহর আনুগত্যে হবে ঐক্যবদ্ধ। মা বাবার স্নেহ-ছায়া বিরাজমান তাদের মাথার ওপর। তারা পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ। মা বাবার ভালোবাসা তাদের ঘিরে থাকে সর্বক্ষণ। নতুন প্রজন্ম বেড়ে ওঠে আগামী দিনের মহৎ ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের গুণে। তারা গড়তে চায় মুসলিম কীর্তিপ্রাসাদ। যা সুউচ্চ, শানদার। তারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর ঝাণ্ডাকে বুলন্দ করার জন্য। ইসলামের হারানো গৌরব ও মর্যাদা ফিরিয়ে আনার জন্য।
আমরা একটি মুসলিম সমাজ চাই। যেখানে ভালোবাসা হয় আল্লাহর জন্য, রাসূলের জন্য এবং মুমিনদের জন্য। যেখানে মহান আল্লাহর এই বাণীর পাই সফল বাস্তবায়ন:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْكَفِرِينَ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُونِ الْمُؤْمِنِينَ أَتُرِيدُونَ أَنْ تَجْعَلُوْا لِلَّهِ عَلَيْكُمْ سُلْطَنًا مُبِينًا
অর্থ : হে ওই সব লোকেরা, যারা ঈমান এনেছ, তোমরা মুমিনদের বাদ দিয়ে কাফেরদের বন্ধুত্ব গ্রহণ করো না। তোমরা কি নিজেদের বিরুদ্ধে আল্লাহ্র কাছে প্রমাণ প্রতিষ্ঠা করতে চাও? —সূরা নিসা : ১৪৪
মহান আল্লাহ আরও ইরশাদ করেছেন,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا عَدُوِّي وَعَدُوَّكُمْ أَوْلِيَاءَ تُلْقُونَ إِلَيْهِمْ بِالْمَوَدَّةِ وَ قَدْ كَفَرُوْا بِمَا جَاءَكُمْ مِّنَ الْحَقِّ
অর্থ : হে ওই সমস্ত লোকেরা, যারা ঈমান এনেছ, তোমরা আমার শত্রু এবং তোমাদের শত্রুদের বন্ধুত্ব গ্রহণ করো না। তোমরা তাদেরকে ভালোবাসা দেখাবে? অথচ রাসূল যে সত্য নিয়ে আগমন করেছেন, তারা তা অস্বীকার করে। —সূরা মুমতাহিনা : ০১
আমরা এমন একটি সমাজ চাই যার মূল ভিত্তি হলো—আল্লাহর জন্য ভ্রাতৃত্ব এবং ভালোবাসা। যা সাম্প্রদায়িকতা ও গোঁড়ামিমুক্ত। মহান আল্লাহর বাণীর বাস্তবায়নে–
وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنْتُمْ أَعْدَاءً فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ فَأَصْبَحْتُمْ بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا وَكُنْتُمْ عَلَى شَفَا حُفْرَةٍ مِنَ النَّارِ فَأَنْقَذَكُمْ مِنْهَا كَذَلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ أَيْتِهِ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ
অর্থ : তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে আঁকড়ে ধরো। তোমরা বিচ্ছিন্ন হয়ো না। স্মরণ করো, যখন তোমরা ছিলে একে অপরের শত্রু। আল্লাহ তোমাদের মাঝে সম্প্রীতি সৃষ্টি করলেন। তার নেয়ামতে তোমরা হলে ভাই ভাই। স্মরণ করো, তোমরা ছিলে জাহান্নামের দ্বারপ্রান্তে। তিনি তোমাদের রক্ষা করলেন। এভাবেই আল্লাহ তাঁর নিদর্শনাবলি বর্ণনা করেন। হয়তো তোমরা দিশা পাবে। —সূরা আলে ইমরান : ১০৩
প্রিয় রাসূলও বলেছেন, 'ওই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ, তোমরা কিছুতেই জান্নাতে প্রবেশ করবে না যতক্ষণ না ঈমান আনবে। তোমরা কিছুতেই ঈমান আনতে পারবে না যতক্ষণ না একে অপরকে ভালোবাসবে।'১
আমরা একটি মুসলিম সমাজ চাই যা পারস্পরিক দায়িত্ববোধ, পারস্পরিক মায়াবোধ এবং পারস্পরিক সম্পর্কবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত। মহান আল্লাহর এই বাণীর আনুগত্য যেখানে জাগ্রত সদাসর্বদা—
أُولُوْا الْأَرْحَامِ بَعْضُهُمْ أَوْلَى بِبَعْضٍ فِي كِتَبِ اللَّهِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُهَجِرِينَ إِلَّا أَنْ تَفْعَلُوْا إِلَى أَوْلِيَائِكُمْ مَّعْرُوْفًا كَانَ ذَلِكَ فِي الْكِتَبِ مَسْطُوْরًا
অর্থ : যাদের মধ্যে রয়েছে আত্মার বন্ধন। আল্লাহ্র কিতাব অনুযায়ী সাধারণ মুমিন মুহাজিরদের চাইতে তারা একে অপরের প্রতি অধিক হকদার। তবে তোমরা বন্ধুবান্ধবদের প্রতি যে সদাচার করবে, তা আল্লাহর কিতাবে অবশ্যই লিপিবদ্ধ থাকবে। —সূরা আহযাব : ০৬
আমরা এমন একটি সমাজ চাই যা সুন্দর সুনির্মল চরিত্রমাধুর্য এবং সুউচ্চ সুমহান মূল্যবোধে ভাস্বর। সত্যতা, আমানতদারি, বিশ্বস্ততা, ত্যাগ ও বিসর্জন, বীরত্ব ও সাহসিকতা, ব্যক্তিত্ব ও মহানুভবতা; আন্তরিকতা-একনিষ্ঠতা, কৃতজ্ঞতা-কৃতার্থতা, ক্ষমা ও মার্জনা এবং ন্যায় ও সুন্দরের সুসজ্জিত একটি পূর্ণাঙ্গ সমাজ। এমন একটি সমাজ, যাকে গতিশীল করে মহৎ গুণাবলি, উন্নত আদর্শ। যেখানে চরিত্রের পবিত্রতায় আরোপিত কড়া প্রহরা। যেখানে চরিত্রই ধর্ম ও বিশ্বাসের প্রথম প্রহরী। কবির ভাষায় বলতে হয়,
'নিশ্চয়ই কোনো জাতি ততক্ষণ টিকে থাকে যতক্ষণ তাদের চরিত্র টিকে থাকে; যখন তাদের চরিত্র ধ্বংস হয়, তখন তাদের বিলুপ্তি অবশ্যম্ভাবী।'
আমরা একটি ইসলামী সমাজ চাই। যেখানে প্রতিটি মানুষের অধিকার নিশ্চিত। যেখানে জোর নেই, জুলুম নেই। অনিয়ম নেই, অনাচার নেই। যেখানে পারস্পরিক কর্ম ও লেনদেন সম্পাদিত হয় মহান আল্লাহর এই বাণীর সফল বাস্তবায়নে—
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَقُولُوْا قَوْلًا سَدِيدًا يُصْلِحْ لَكُمْ أَعْمَلَكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِيمًا
অর্থ : হে ওই সমস্ত লোকেরা যারা ঈমান এনেছ, তোমরা আল্লাহর জন্য ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকো। ন্যায়ের সাথে সাক্ষ্য প্রদান করো। কারো প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের অন্যায়ে প্ররোচিত না করে। তোমরা ন্যায়ের সাথে কাজ করো। সেটাই তাকওয়ার নিকটতর। তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে সম্যক অবগত। —সূরা মাইদাহ : ০৮
আমরা একটি পবিত্র ও সভ্য সমাজ প্রত্যাশা করি। যেখানে অপরাধপ্রবণতা নেই। লাঞ্ছনা ও চরিত্রহীনতা নেই। যেখানে প্রত্যেক ধর্মীয় নীতিমালা এবং উন্নত চরিত্রমাধুরীর ওপর প্রতিষ্ঠিত। যেখানে প্রত্যেকে প্রত্যেকের, প্রকারান্তরে সমাজের কল্যাণকামী। যেখানে আনন্দ, ব্যক্তিস্বার্থ ও প্রবৃত্তির অগ্রগামিতা বিসর্জিত। যেই সমাজের প্রতি আল্লাহর নুসরত ও সাহায্য অনিবার্য। যেমনটি মহান আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন :
وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْتَضَىٰ لَهُمْ وَ لَيُبَدِّلَنَّهُم مِّن بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنًا يَعْبُدُونَنِي لَا يُشْرِكُونَ بِي شَيْئًا وَمَن كَفَرَ بَعْدَ ذَٰلِكَ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
অর্থ : আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তোমাদের মধ্যে থেকে যারা ঈমান এনেছে এবং আমলে সালেহ করেছে তাদেরকে, তিনি তাদেরকে জমিনে দান করবেন খেলাফত, যেভাবে খেলাফত দান করেছিলেন তোমাদের পূর্ববর্তীদের। এবং প্রতিষ্ঠিত করে দেবেন তাদের জন্য তাঁর মনোনীত ধর্মকে। আর ভীতির পরিবর্তে তাদের দান করবেন স্বস্তি। তারা আমার ইবাদত করবে। আমার সাথে কোনো কিছুকে শরিক করবে না। কিন্তু এরপরও যারা কুফরি করবে, তারাই পাপাচারী। —সূরা নূর : ৫৫
আমরা একটি ইসলামী সমাজ প্রত্যাশা করি। যেখানে কিছু প্রাণবন্ত ও উৎসাহী কর্মপুরুষ কামনা করি। যাদের রক্তে আছে আল্লাহর ভালোবাসা এবং ধর্মীয় আবেগ। ধর্মীয় চেতনায় যারা স্বতঃস্ফূর্ত। ইসলামের সম্মানে যাদের রক্ত টগবগ করে। সাহসিকতা যাদের বৈশিষ্ট্য। অগ্রগামী যারা হকের পরিচয়ে। যারা মৃত্যুভয়ে ভীত হয় না। যারা তিরস্কারের পরোয়া করে না। কেননা, তারা এক আল্লাহতে বিশ্বাসী। তারা ভালো করে জানে, আল্লাহই রিজিকদাতা, লালনকারী; তিনিই অভিভাবক, রক্ষাকারী; তিনিই ব্যবস্থাপক, সাহায্যকারী।
আমরা এমন একটি সমাজ প্রত্যাশা করি, যার নেতৃত্ব দেবেন একজন মর্দে মুমিন। একজন সাজিদাল মর্দে মুমিন। একজন জিদাল মর্দে মুমিন। যিনি বিপদের মোকাবিলা করতে জানেন নির্ভয়ে। যার মনোবল সুউচ্চ পর্বতের মতো অটল, অবিচল। চরম উত্তাল পাওয়া হাওয়ায় যিনি ভেঙে পড়েন না। তরঙ্গবিক্ষুব্ধ উত্তাল সমুদ্রে যিনি দৃঢ় প্রত্যয়ী, চির কুশলী। রোমাঞ্চকর অগ্নিযাত্রায় যিনি সফল নাবিক। হাজার ঝড়ঝাপটায় যার হৃদয়ের প্রদীপ শিখা অবিচল। যিনি কখনো অধৈর্য হন না। আল্লাহর ফায়সালার প্রতি যার মন প্রাণ চিরসমর্পিত, সর্বাবস্থায় সন্তুষ্ট। জীবনের অগ্নিপরীক্ষাকে যিনি মনে করেন সফলতার সুবর্ণ সুযোগ। যিনি অনুভব করেন, জীবনের কষ্ট ক্লেশ যেন প্রভাতশিশিরের মতো সুনির্মল, যা তাকে পৃথিবীর মায়া মোহ থেকে পবিত্র করে নিত্যদিন; কিংবা জুঁই ও লিলি ফুলের মতো সুকোমল, যা হৃদয়ে প্রশান্তির শীতল প্রলেপ বুলিয়ে দেয় নরম ছোঁয়ায় অষ্টপ্রহর; কিংবা মৃদু মন্দ পুবালি বাতাসের মতো নরম ও ফুরফুরে, যা হৃদয় ছুঁয়ে যায় অনির্বচনীয় প্রাণবন্ততায় ক্ষণে ক্ষণে।
আমরা একটি মুসলিম সমাজ প্রত্যাশা করি। যেখানে পুরুষ একজন স্নেহশীল পিতা। করুণার আধার। মমতায় ভরা। যার হৃদয় জুড়ে সন্তানের প্রতি অগাধ ভালোবাসা। যিনি বুদ্ধিমান। চিন্তাশীল। প্রজ্ঞাবান। সন্তানের জন্য যেন আলোর মশাল। বিজ্ঞ পথপ্রদর্শক। বিচক্ষণ তত্ত্বাবধায়ক। বিপদে আপদে সন্তানের ভরসা। মাথা গোঁজার নিরাপদ আশ্রয়।
আমরা একটি ইসলামী সমাজ চাই। যেখানে পুরুষ একজন বিশ্বস্ত জীবনসঙ্গী। যার ভালোবাসা অটুট এবং স্থির। যিনি নারীর দুর্ভেদ্য দুর্গ। প্রেমময় স্বামী। স্ত্রীর প্রতি ধেয়ে আসা যেকোনো বিপদকে তিনি প্রতিহত করেন প্রাণপণে। তাকে সুরক্ষিত রাখেন যে কোনো অত্যাচার, অনাচার থেকে। তাই অগাধ আস্থা, অগাধ ভক্তি, অগাধ ভালোবাসা স্ত্রীর হৃদয়ে জন্মায় সগৌরবে। পূর্ণ অর্থ, পূর্ণ শান্তি স্ত্রীর হৃদয়কে রাখে স্থির, প্রশান্ত। যিনি সদাচারী। যার সাহচর্যে ধন্য হয় নারী। ধন্য হয় নারীর জীবন। সে সুখে পায় অনাবিল শান্তি। অপরিহার্য সুখ। দাম্পত্যজীবনের দায়ভারে যিনি স্ত্রীর প্রতি বাড়িয়ে দেন অবিরত সহযোগিতার হাত। তাকে দিতে চান সর্বোচ্চ সহজতা। যাতে মুসলিম পরিবার পায় পূর্ণতা। হয় দুর্ভেদ্য, দুর্লঙ্ঘ্য। যুগের ঝড়ঝাপটায় সুস্থির। কুচক্রীরা ফিরে যায় ব্যর্থ মনোরথে।
মুসলিম যুবসমাজের কাছে আমাদের প্রত্যাশা অপরিসীম। আমাদের প্রত্যাশা ঈমানী গুণ ও চারিত্রিক মাধুর্যে বিশিষ্ট একটি যুবসমাজ। যারা ইসলামের পরিচয় বহন করে। ইসলামের আদর্শ স্থাপন করে। এবং ইসলামকেই জীবনের সংবিধান হিসেবে গ্রহণ করে। যারা বিশ্বাস করে,
وَمَن يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَن يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُৱ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ
অর্থ : যদি কেউ ইসলাম ছাড়া অন্য কিছুকে ধর্ম হিসেবে পেতে চায় তা হলে তা কিছুতেই গ্রহণযোগ্য হবে না। আর পরকালে সে হবে ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্ভুক্ত। —সূরা আলে ইমরান : ৮৫
আমরা এমন একটি যুবসমাজ প্রত্যাশা করি, যারা ইসলাম ও ইসলামি বিশ্বাসে দৃঢ় প্রত্যয়ী। নিজের ধর্ম ও বিশ্বাসের প্রতি যারা গর্ব বোধ করে। কবির ভাষায়,
'কী মোর বর্ণ, কী মোর বংশ—না জানি। জানি, ইসলামই পিতা, ইসলামই জননী।'
আমরা এমন যুবক প্রত্যাশা করি, যে কিতাবুল্লাহকে আঁকড়ে থাকে। রাসূলের আদর্শের পূর্ণ বাস্তবায়ন কামনা করে। যার হৃদয় মসজিদের সাথে লেগে থাকে। যার সমগ্র সত্তা জুড়ে তাকওয়া, খোদভীতি, উত্তম চারিত্রমাধুর্য। যে আর্তমানবতার সেবায় নিয়োজিত। অভাবী দুস্থের সাহায্য সহযোগিতায় অবিরত। অত্যাচারীর ভয়। অত্যাচারিতের আশ্রয়। সময় সম্পর্কে সচেতন। কর্তব্যপরায়ণ। সে জানে, মানে, তার অনেক দায়; কিন্তু সময় সামান্য।
সে কঠোর পরিশ্রমে বিশ্বাসী। ঐশী বিধান অনুসারে নতুন করে ইসলামী জীবনযাপনের প্রত্যয়ী। কর্ম ও চেতনায় মুক্ত স্বাধীন। পাশ্চাত্যতার অন্ধ অনুকরণে নয়। সে আল্লাহর বাণী ও রাসূলের আদর্শ অনুসরণে চলে নিজ মতে, নিজ গতিতে; মহান আল্লাহর আলোয় আলোকপ্রাপ্ত হয়। তিনিই তো আসমানসমূহ ও জমিনের আলো। তাই তো পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে,
اللَّهُ نُورُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۚ مَثَلُ نُورِهِ كَمِشْكَاةٍ فِيهَا مِصْبَاحٌ ۖ الْمِصْبَاحُ فِي زُجَاجَةٍ ۖ الزُّجَاجَةُ كَأَنَّهَا كَوْكَبٌ دُرِّيٌّ يُوقَدُ مِن شَجَرَةٍ مُّبَارَكَةٍ زَيْتُونَةٍ لَّا شَرْقِيَّةٍ وَلَا غَرْبِيَّةٍ يَكَادُ زَيْتُهَا يُضِيءُ وَلَوْ لَمْ تَمْسَسْهُ نَارٌ ۚ نُّورٌ عَلَىٰ نُورٍ ۗ يَهْدِي اللَّهُ لِنُورِهِ مَن يَشَاءُ ۚ وَيَضْرِبُ اللَّهُ الْأَمْثَالَ لِلنَّاسِ ۗ وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ
অর্থ : আল্লাহ আসমানসমূহ ও জমিনের আলো। তাঁর এ আলোর দৃষ্টান্ত—যেন একটি দীপাধার। যাতে আছে একটি প্রদীপ। প্রদীপটি রাখা আছে স্বচ্ছ কাঁচের পাত্রে। কাঁচের পাত্রটি যেন কোনো উজ্জ্বল নক্ষত্র। জ্বালানি পবিত্র জয়তুন বৃক্ষের তেল। যা শুধু পূর্বের বা পশ্চিমের আলোকপ্রাপ্ত নয়। এ তেল এত স্বচ্ছ—যেন আগুনের স্পর্শ ছাড়াই জ্বলে উঠবে। এ তো আলোর ওপর আলো। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন তাকে এ আলোর দিশা দেন। আল্লাহ মানুষের জন্য দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞাত। —সূরা নূর : ৩৫
এমন যুবক, যে জমিনে বিচরণ করে; কিন্তু তার হৃদয় থাকে আরশে আজিমে। কেননা, সে হৃদয়ে জাগ্রত জিহাদি চেতনা। ধমনীতে নেশা শাহাদাতের। ফিরিয়ে আনতে চায় আযানের সুর। আযানের আযানখানা থেকে যার প্রতিধ্বনি অনুরণিত হয় কুদসের আকাশে বাতাসে। প্রকম্পিত করবে সারা পৃথিবীর তাগুতি শক্তির ভিত। আকসার মিম্বার, আকসার গম্বুজ আনন্দে ঝলমল করে উঠবে আবার। আবার উচ্চারিত হবে আল্লাহর নাম, প্রিয়তম মুহাম্মাদের নাম। ব্যথাতুর হৃদয়ে জ্বালাবে আশার আলো। ফিলিস্তিনের বিষয়ে, এতিমের মুখে ফোটাবে বিজয়ের হাসি।
এমন যুবক, যার হৃদয় উৎসুক হয়ে আছে হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে। যার দৃষ্টি প্রসারিত আসমানে। প্রত্যয়ে ছুঁয়ে যায় সুরাইয়া। রাতের ইবাদতগুজার। দিনের ঘোরসওয়ার।
এমন যুবক, যে বাস্তবতায় বিশ্বাসী। জ্ঞান ও যোগ্যতায় বিশ্বাসী। ভুলে যায় না যে, সে মায়ার পৃথিবীতেই আছে। সুতরাং কল্পনার ডানায় ভেসে বেড়ানো এবং দিবাস্বপ্নে বিভোর থাকার মানসিকতা তার নেই। সে শ্রমহীন ও সাধনাহীনভাবে নিছক অতীতের গুণকীর্তন করে জাতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে না। বরং নিজের মেধা ও সামর্থ্যকে ব্যয় করে কাজ করে। জ্ঞানের সাধনায় আত্মনিয়োগ করে—যোগ্য নেতৃত্বের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে, ইসলামের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে, পৃথিবীতে পুনরায় মুসলিমজাতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করতে। সে বিশ্বাস করে, পরিবেশ পরিস্থিতি সব সময় একই থাকে না। সময়ের ব্যবধানে প্রেক্ষাপট পাল্টে যায়। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন,
تِلْكَ الْأَيَّامُ نُدَاوِلُهَا بَيْنَ النَّاسِ
অর্থ : আর আমি মানুষের মাঝে উত্থান পতনের দিনগুলো অদলবদল করাতে থাকি। —সূরা আলে ইমরান : ১৪০
এমন যুবক, যে ঐক্যবদ্ধতা পছন্দ করে। আত্মকেন্দ্রিক নয়। সে বিশ্বাস করে, বিশৃঙ্খলভাবে একা একা কাজ করার চাইতেও সুশৃঙ্খলভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করা সর্ব বিচারে ভালো। সে সবাইকে সাথে নিয়ে কাজ করে। মহান আল্লাহর দরবারে ঐক্যবদ্ধ প্রার্থনা জানায়,
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ
অর্থ : হে আল্লাহ আমরা আপনারই ইবাদত করি এবং আপনারই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি। —সূরা ফাতিহা : ০৪
মুজাহিদ যুবকরা উদার আকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্র তারা। তারা সোনার হরফে লিখে দেয় ত্যাগের মহিমাগাথা। জাতিকে উপহার দেয় সুস্পষ্ট বিজয়। ইসলাম পুনপ্রতিষ্ঠিত হয় আপন মহিমায়। শত্রুরা হাসে উপহাসের হাসি। তবে, এ অসম্ভব নয়। কিয়ামত পর্যন্ত সে আশার আলো জ্বলে ঈমানদীপ্ত অকুতোভয় বীরদের হৃদয়ে।
মুসলিম সমাজে একজন মুসলিম নারীর কাছে আমাদের প্রত্যাশা— তিনি একজন আদর্শ মা হবেন। ঈমান ও বিশ্বাসে বলীয়ান। দৃঢ়চিত্ত, সুউচ্চ মনোবলসম্পন্ন। যিনি হযরত খানসা রাযিয়াল্লাহু আনহার আদর্শে উজ্জীবিত। যেই খানসা রাযি. টগবগে যুবক চার ছেলেকেই কাদিসিয়া যুদ্ধে সমবেত করে জিহাদে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন এই বলে: “তোমরা জেনে রেখো, এই দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী। আখেরাত উত্তম। আখেরাতই চিরস্থায়ী। সুতরাং ধৈর্য ধরো। ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা দেখাও। এবং শত্রুর মোকাবিলায় অবিচল থেকো।” যখন কাদিসিয়া যুদ্ধে চার সন্তানই শহীদ হওয়ার সংবাদ পেলেন তখন স্থিরচিত্তে হযরত খানসা রাযি. শুধু এ কথা বললেন, “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর। যিনি ফি সাবিলিল্লাহ আমার ছেলেদের শাহাদাতের সুধা পান করিয়ে আমাকে সম্মানিত করেছেন। আমি আশা করি, আমার আল্লাহ আমাকে এবং আমার চার সন্তানকে তাঁর রহমতের আশ্রয়ে আবার একত্রিত করবেন।”১
আমাদের প্রত্যাশা—মুসলিম নারী হবেন একজন রত্নগর্ভা। যিনি কিতাব ও সুন্নাহ অনুযায়ী সন্তানদের লালনপালন করেন। সাদ, খালিদ, তারিকের মতো মর্দে মুমিন জাতিকে উপহার দেন।
আমাদের প্রত্যাশা—মুসলিম নারী হবেন একজন ধৈর্যশীলা কঠিন প্রত্যয়িনী বোন। বিপদে ভেঙে পড়েন না। যার সাহস আকাশচুম্বী। খাওলা বিনতে আযওয়ারের মতো। আজনাবাইনের যুদ্ধে ভ্রাতা যিরারের বন্দি হওয়ার সংবাদ পেয়ে তিনি যে সাহসিকতা দেখিয়েছিলেন তা মুসলিম নারীর প্রেরণা হয়ে থাকবে চিরকাল। সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ স্বয়ং যিরারকে মুক্ত করতে গিয়েছিলেন যেখানে। দিগ্বিজয়ী বীর, মুসলিম সেনাপতি, আল্লাহর তরবারি—খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি. মুসলিমবাহিনি নিয়ে এগিয়ে চলেছেন তীরবেগে। হঠাৎ দেখা যায় অগণিত এক অশ্বারোহী। অথৈ ভীড়ে ছুটে চলেছেন ধুলোবুলরিত দূর দিগন্তে। তিনি ছুটছেন তো ছুটছেন। পেছনে ভ্রূক্ষেপ করেন না। মুসলিমবাহিনির পদাঙ্কন লক্ষ্য করেন না। মুসলিমবাহিনি রোমসেনাদের ভিড়ে ঢুকে পড়ল এবং হামলা চালাল। মুসলিম লড়াকুদের সাথে অগণিত অশ্বারোহীও কটল করে চলেছেন অগণিত রোমক যোদ্ধাকে। ...যুদ্ধ শেষ হলো। মুসলিম যোদ্ধাগণ অশ্বারোহীর পরিচয় জানতে চায়। কিন্তু তিনি চলে যাচ্ছেন। পেছনে ভ্রূক্ষেপ করছেন না। এবার সেনাপতি খালিদ রাযি. কসম দিয়ে পরিচয় ব্যক্ত করতে বলেন। এবার ফিরে তাকান অশ্বারোহী। অবগুণ্ঠনের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে তেজোদ্দীপ্ত নারী কণ্ঠ। বলেন, “হে মহামহিম সেনাপতি, আমি আপনাকে উপেক্ষা করে চলেছি শুধুমাত্র লজ্জায়। আপনি একজন মহিমান্বিত বীর সেনাপতি। আর আমি এক নগণ্য অন্তঃপুরবাসিনী। পর্দানশীন। আল্লাহর কসম, আমার দগ্ধ হৃদয়েই আমাকে যুদ্ধে অবতীর্ণ করেছে।” অবাক বিস্ময়ে সেনাপতি খালেদ রাযি. বলেন, “কে আপনি? কী আপনার বৃত্তান্ত?” তিনি বলেন, “আমি খাওলা বিনতে আযওয়ার। আমি গোত্রের অন্তঃপুরবাসিনীদের সাথে ছিলাম। কিন্তু আমার ভ্রাতা যিরারের বন্দি হওয়ার সংবাদ শুনে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। তাই অশ্বে আরোহণ করে ছুটে এসেছি এবং যা করার করেছি।” সেনাপতি খালিদ চিৎকার করে বলেন, “বোন, আপনি নিশ্চিত থাকুন। আমরা আমাদের সমগ্র শক্তি দিয়ে হামলা চালাব। ইনশাআল্লাহ, আমরা আমাদের ভ্রাতাকে মুক্ত করে আনবই।”২
মুসলিম সমাজে আমাদের প্রত্যাশিত মুসলিম তরুণী হবে ঈমান ও বিশ্বাসে গৌরবান্বিত। ধর্ম ও ধার্মিকতায় মহিমান্বিত। হবে মুক্তমনা। হবে স্বাধীনচেতা। তবে পাগলা হাওয়ায় উড়ে যাওয়া বেচারি নয়। বাতিলের সয়লাবে ভেসে যাওয়া খড়কুটো নয়। ঈমান ও হেদায়েতের বাতায়নে দেখা শার্দূলী। হাজার হাঁক-ডাক-হৈ-হুল্লোড়ে, সহস্র শোরগোল কোলাহলে—সুস্থির, সুবিবেচক, সজ্ঞান, আপন সত্তায় অটল, আপন বিশ্বাসে অবিচল। মাধুরী তার ঈমান। মূলধন তার লজ্জা ও সৎ চরিত্র। হিজাব ও পর্দায় পবিত্র। নেকাব ও জিলবাবে অপূর্ব, অনুপম।
কবির ভাষায়,
ইনহাই বিতাজিলিকা ওয়াযদাদী শিয়ারা
ইয়া লিলখিজলি মুনতখিবান বিজীহারিহি
মুতাহাযযিয়া বিসুবাল সামায়াত জিহানদান
লা তাখাফু আম্মান ওয়ালা খাওয়ারা
মর্যাদার তাজ মস্তকে ধারণ করে,
আত্মপরিচয় হৃদয়ে লালন করে,
অবগুণ্ঠিত কপালে কপোলে তুমি।
শত্রুর ভয়, দুর্বলতা দূরীভূত;
ব্যর্থ তোমাতে ষড়যন্ত্র, ব্যর্থ তোমাতে তন্ত্র-মন্ত্র।
আমাদের প্রত্যাশা—সে হবে স্বামীর অনুগতা প্রেমময়ী। হবে বিশ্বস্ত জীবনসঙ্গিনী। সুখে দুঃখে পাশে থাকে। বিপদে আপদে সাথে থাকে। ভাবে ভাবায় আনে অন্তরঙ্গতা। জীবনসাথীর হৃদয়ভূমিতে বপন করে তাকওয়ার বীজ। জীবনে হয় তার সুখের ঠিকানা। কৃতজ্ঞ, কৃতার্থ। অমায়িক, সংযমী। নিরবচ্ছিন্ন কোনো চাওয়া পাওয়া নেই। আছে স্বামীর সুখ ও সেবার প্রবল বাসনা। দাম্পত্যের উদ্যানে একটি ছায়াদার ফুলদার তরুর মতো। সুশীতল, সবুজ, প্রাণবন্ত। পত্রপুষ্পে আহ্লাদিত। যার ছায়ায় স্বামী উৎসাহ পায়। চলার প্রেরণা পায়। পায় সুখময় গতিশীল জীবনের সন্ধান। ঘুমানোর সময় চোখ বুজে নিশ্চিন্তে, নির্বিঘ্নে।
সবশেষে আমরা মুসলিম নারীকে কামনা করি একজন কর্মনিষ্ঠ দায়িয়া হিসেবে, যিনি কাজ করবেন আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। যদি শিক্ষিত হন, তা হলে শিক্ষার্থীদের হৃদয়ভূমিতে ঈমান ও আকীদার চাষবাদ করুন। বিদ্যালয়ে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ অব্যাহত রাখুন। সত্যের আওয়াজ তুলুন। যত বাধাই আসুক। যত বিপত্তিই ঘটুক। কল্যাণের বারিধারা প্রবাহিত করুন যেখানেই থাকুন। চেতনা জাগ্রত করুন নারী সমাজে। তাওহীদের কথা বলুন। রিসালাতের কথা বলুন। আখেরাতের কথা বলুন। জান্নাতের সুসংবাদ দিন। জাহান্নামের ভয় দেখান। নতুন প্রজন্মকে রক্ষা করুন ইসলাম ও মুসলিমবিদ্বেষী সকল অপশক্তির থেকে।
আমাদের প্রত্যাশা—এমন একজন মুসলিম নারী, যিনি চারপাশে ছড়িয়ে যাওয়া সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সর্ব বিষয়ে সচেতন। যিনি জীবন ও জগতের বিভিন্ন বিষয়ে দৃষ্টি প্রসারিত করতে পারেন। নানামুখী সমস্যা, উৎপত্তি, উত্তরণ উপলব্ধি করতে পারেন। প্রয়োজনীয় ধর্মীয় এবং সাধারণ উভয়বিধ জ্ঞান ও যোগ্যতায় যিনি পারদর্শিনী। যিনি মুসলিম সমাজগঠনে একটি কার্যকর উপাদান হতে, সারা পৃথিবীর সকল ধর্ম, সকল জাতির নারীদের সাথে প্রতিযোগিতা করতে—সদা প্রস্তুত। যিনি বিশ্বে যত নারী সংস্থা ও নারী-আন্দোলন গড়ে উঠেছে ধর্ম, চরিত্র ও মূল্যবোধকে ধ্বংস করার জন্য, সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে আন্তর্জাতিক নারী-আন্দোলনকে ইসলামের দিকে পরিচালিত করার প্রত্যাশী। কেননা, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক সর্ব বিষয়ের সুন্দরতম সমাধান দেয় ইসলামই। ইসলামই মানবতাকে রক্ষা করতে পারে মহাপতনের হাত থেকে। ফিরিয়ে আনতে পারে পতনোন্মুখ মানবতাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে। মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন,
وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْتَضَىٰ لَهُمْ وَلَيُبَدِّلَنَّهُم مِّن بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنًا يَعْبُدُونَنِي لَا يُشْرِكُونَ بِي شَيْئًا ۚ وَمَن كَفَرَ بَعْدَ ذَٰلِكَ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
অর্থ : আল্লাহ্ প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন তোমাদের মধ্য থেকে যারা ঈমান এনেছে এবং আমলে সালেহ্ করেছে তাদেরকে, তিনি তাদেরকে জমিনে দান করবেন খেলাফত যেভাবে খেলাফত দান করেছিলেন তোমাদের পূর্ববর্তীদের। এবং প্রতিষ্ঠিত করে দেবেন তাদের জন্য তাঁর মনোনীত ধর্মকে। আর ভীতির পরিবর্তে তাদের দান করবেন স্বস্তি। শর্ত হলো, তারা আমার ইবাদত করবে। আমার সাথে কোনো কিছুকে শরীক করবে না। কিন্তু এরপরও যারা কুফরি করবে, তারাই পাপাচারী। —সূরা নূর : ৫৫
কবি বলেন,
তুখীঝুয যালামু হাইয়্যান ওয়া ইয়াযিলু
ফজরুল মাদা মিন উফুক্বি ত্বইবাতিন ইউরসিলুল আনওয়ারা
কেটে যায় কালো ভোরের আভাসে,
দিগন্তে হাসে উষার আলো...
সমাপ্ত
টিকাঃ
১. সহীহ মুসলিম।
১. আল ইসরাহ্ কী তায়হীদিস সাহাবাহ্ : ৯৭।
২. ফুতূহুল শাম লিল ওয়াকিদী : ১/৭০-৭১।
আমাদের প্রত্যাশা—পূর্ণাঙ্গ ইসলামী সমাজ, পূর্ণাঙ্গ মুসলিম সমাজ। যার প্রথম ও প্রধান ভিত্তি হবে মুসলিম পরিবার। যার প্রতিটি সদস্য আল্লাহর আনুগত্যে হবে ঐক্যবদ্ধ। মা বাবার স্নেহ-ছায়া বিরাজমান তাদের মাথার ওপর। তারা পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ। মা বাবার ভালোবাসা তাদের ঘিরে থাকে সর্বক্ষণ। নতুন প্রজন্ম বেড়ে ওঠে আগামী দিনের মহৎ ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের গুণে। তারা গড়তে চায় মুসলিম কীর্তিপ্রাসাদ। যা সুউচ্চ, শানদার। তারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর ঝাণ্ডাকে বুলন্দ করার জন্য। ইসলামের হারানো গৌরব ও মর্যাদা ফিরিয়ে আনার জন্য।
আমরা একটি মুসলিম সমাজ চাই। যেখানে ভালোবাসা হয় আল্লাহর জন্য, রাসূলের জন্য এবং মুমিনদের জন্য। যেখানে মহান আল্লাহর এই বাণীর পাই সফল বাস্তবায়ন:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْكَفِرِينَ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُونِ الْمُؤْمِنِينَ أَتُرِيدُونَ أَنْ تَجْعَلُوْا لِلَّهِ عَلَيْكُمْ سُلْطَنًا مُبِينًا
অর্থ : হে ওই সব লোকেরা, যারা ঈমান এনেছ, তোমরা মুমিনদের বাদ দিয়ে কাফেরদের বন্ধুত্ব গ্রহণ করো না। তোমরা কি নিজেদের বিরুদ্ধে আল্লাহ্র কাছে প্রমাণ প্রতিষ্ঠা করতে চাও? —সূরা নিসা : ১৪৪
মহান আল্লাহ আরও ইরশাদ করেছেন,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا عَدُوِّي وَعَدُوَّكُمْ أَوْلِيَاءَ تُلْقُونَ إِلَيْهِمْ بِالْمَوَدَّةِ وَ قَدْ كَفَرُوْا بِمَا جَاءَكُمْ مِّنَ الْحَقِّ
অর্থ : হে ওই সমস্ত লোকেরা, যারা ঈমান এনেছ, তোমরা আমার শত্রু এবং তোমাদের শত্রুদের বন্ধুত্ব গ্রহণ করো না। তোমরা তাদেরকে ভালোবাসা দেখাবে? অথচ রাসূল যে সত্য নিয়ে আগমন করেছেন, তারা তা অস্বীকার করে। —সূরা মুমতাহিনা : ০১
আমরা এমন একটি সমাজ চাই যার মূল ভিত্তি হলো—আল্লাহর জন্য ভ্রাতৃত্ব এবং ভালোবাসা। যা সাম্প্রদায়িকতা ও গোঁড়ামিমুক্ত। মহান আল্লাহর বাণীর বাস্তবায়নে–
وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنْتُمْ أَعْدَاءً فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ فَأَصْبَحْتُمْ بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا وَكُنْتُمْ عَلَى شَفَا حُفْرَةٍ مِنَ النَّارِ فَأَنْقَذَكُمْ مِنْهَا كَذَلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ أَيْتِهِ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ
অর্থ : তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে আঁকড়ে ধরো। তোমরা বিচ্ছিন্ন হয়ো না। স্মরণ করো, যখন তোমরা ছিলে একে অপরের শত্রু। আল্লাহ তোমাদের মাঝে সম্প্রীতি সৃষ্টি করলেন। তার নেয়ামতে তোমরা হলে ভাই ভাই। স্মরণ করো, তোমরা ছিলে জাহান্নামের দ্বারপ্রান্তে। তিনি তোমাদের রক্ষা করলেন। এভাবেই আল্লাহ তাঁর নিদর্শনাবলি বর্ণনা করেন। হয়তো তোমরা দিশা পাবে। —সূরা আলে ইমরান : ১০৩
প্রিয় রাসূলও বলেছেন, 'ওই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ, তোমরা কিছুতেই জান্নাতে প্রবেশ করবে না যতক্ষণ না ঈমান আনবে। তোমরা কিছুতেই ঈমান আনতে পারবে না যতক্ষণ না একে অপরকে ভালোবাসবে।'১
আমরা একটি মুসলিম সমাজ চাই যা পারস্পরিক দায়িত্ববোধ, পারস্পরিক মায়াবোধ এবং পারস্পরিক সম্পর্কবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত। মহান আল্লাহর এই বাণীর আনুগত্য যেখানে জাগ্রত সদাসর্বদা—
أُولُوْا الْأَرْحَامِ بَعْضُهُمْ أَوْلَى بِبَعْضٍ فِي كِتَبِ اللَّهِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُهَجِرِينَ إِلَّا أَنْ تَفْعَلُوْا إِلَى أَوْلِيَائِكُمْ مَّعْرُوْفًا كَانَ ذَلِكَ فِي الْكِتَبِ مَسْطُوْরًا
অর্থ : যাদের মধ্যে রয়েছে আত্মার বন্ধন। আল্লাহ্র কিতাব অনুযায়ী সাধারণ মুমিন মুহাজিরদের চাইতে তারা একে অপরের প্রতি অধিক হকদার। তবে তোমরা বন্ধুবান্ধবদের প্রতি যে সদাচার করবে, তা আল্লাহর কিতাবে অবশ্যই লিপিবদ্ধ থাকবে। —সূরা আহযাব : ০৬
আমরা এমন একটি সমাজ চাই যা সুন্দর সুনির্মল চরিত্রমাধুর্য এবং সুউচ্চ সুমহান মূল্যবোধে ভাস্বর। সত্যতা, আমানতদারি, বিশ্বস্ততা, ত্যাগ ও বিসর্জন, বীরত্ব ও সাহসিকতা, ব্যক্তিত্ব ও মহানুভবতা; আন্তরিকতা-একনিষ্ঠতা, কৃতজ্ঞতা-কৃতার্থতা, ক্ষমা ও মার্জনা এবং ন্যায় ও সুন্দরের সুসজ্জিত একটি পূর্ণাঙ্গ সমাজ। এমন একটি সমাজ, যাকে গতিশীল করে মহৎ গুণাবলি, উন্নত আদর্শ। যেখানে চরিত্রের পবিত্রতায় আরোপিত কড়া প্রহরা। যেখানে চরিত্রই ধর্ম ও বিশ্বাসের প্রথম প্রহরী। কবির ভাষায় বলতে হয়,
'নিশ্চয়ই কোনো জাতি ততক্ষণ টিকে থাকে যতক্ষণ তাদের চরিত্র টিকে থাকে; যখন তাদের চরিত্র ধ্বংস হয়, তখন তাদের বিলুপ্তি অবশ্যম্ভাবী।'
আমরা একটি ইসলামী সমাজ চাই। যেখানে প্রতিটি মানুষের অধিকার নিশ্চিত। যেখানে জোর নেই, জুলুম নেই। অনিয়ম নেই, অনাচার নেই। যেখানে পারস্পরিক কর্ম ও লেনদেন সম্পাদিত হয় মহান আল্লাহর এই বাণীর সফল বাস্তবায়নে—
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَقُولُوْا قَوْلًا سَدِيدًا يُصْلِحْ لَكُمْ أَعْمَلَكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِيمًا
অর্থ : হে ওই সমস্ত লোকেরা যারা ঈমান এনেছ, তোমরা আল্লাহর জন্য ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকো। ন্যায়ের সাথে সাক্ষ্য প্রদান করো। কারো প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের অন্যায়ে প্ররোচিত না করে। তোমরা ন্যায়ের সাথে কাজ করো। সেটাই তাকওয়ার নিকটতর। তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে সম্যক অবগত। —সূরা মাইদাহ : ০৮
আমরা একটি পবিত্র ও সভ্য সমাজ প্রত্যাশা করি। যেখানে অপরাধপ্রবণতা নেই। লাঞ্ছনা ও চরিত্রহীনতা নেই। যেখানে প্রত্যেক ধর্মীয় নীতিমালা এবং উন্নত চরিত্রমাধুরীর ওপর প্রতিষ্ঠিত। যেখানে প্রত্যেকে প্রত্যেকের, প্রকারান্তরে সমাজের কল্যাণকামী। যেখানে আনন্দ, ব্যক্তিস্বার্থ ও প্রবৃত্তির অগ্রগামিতা বিসর্জিত। যেই সমাজের প্রতি আল্লাহর নুসরত ও সাহায্য অনিবার্য। যেমনটি মহান আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন :
وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْتَضَىٰ لَهُمْ وَ لَيُبَدِّلَنَّهُم مِّن بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنًا يَعْبُدُونَنِي لَا يُشْرِكُونَ بِي شَيْئًا وَمَن كَفَرَ بَعْدَ ذَٰلِكَ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
অর্থ : আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তোমাদের মধ্যে থেকে যারা ঈমান এনেছে এবং আমলে সালেহ করেছে তাদেরকে, তিনি তাদেরকে জমিনে দান করবেন খেলাফত, যেভাবে খেলাফত দান করেছিলেন তোমাদের পূর্ববর্তীদের। এবং প্রতিষ্ঠিত করে দেবেন তাদের জন্য তাঁর মনোনীত ধর্মকে। আর ভীতির পরিবর্তে তাদের দান করবেন স্বস্তি। তারা আমার ইবাদত করবে। আমার সাথে কোনো কিছুকে শরিক করবে না। কিন্তু এরপরও যারা কুফরি করবে, তারাই পাপাচারী। —সূরা নূর : ৫৫
আমরা একটি ইসলামী সমাজ প্রত্যাশা করি। যেখানে কিছু প্রাণবন্ত ও উৎসাহী কর্মপুরুষ কামনা করি। যাদের রক্তে আছে আল্লাহর ভালোবাসা এবং ধর্মীয় আবেগ। ধর্মীয় চেতনায় যারা স্বতঃস্ফূর্ত। ইসলামের সম্মানে যাদের রক্ত টগবগ করে। সাহসিকতা যাদের বৈশিষ্ট্য। অগ্রগামী যারা হকের পরিচয়ে। যারা মৃত্যুভয়ে ভীত হয় না। যারা তিরস্কারের পরোয়া করে না। কেননা, তারা এক আল্লাহতে বিশ্বাসী। তারা ভালো করে জানে, আল্লাহই রিজিকদাতা, লালনকারী; তিনিই অভিভাবক, রক্ষাকারী; তিনিই ব্যবস্থাপক, সাহায্যকারী।
আমরা এমন একটি সমাজ প্রত্যাশা করি, যার নেতৃত্ব দেবেন একজন মর্দে মুমিন। একজন সাজিদাল মর্দে মুমিন। একজন জিদাল মর্দে মুমিন। যিনি বিপদের মোকাবিলা করতে জানেন নির্ভয়ে। যার মনোবল সুউচ্চ পর্বতের মতো অটল, অবিচল। চরম উত্তাল পাওয়া হাওয়ায় যিনি ভেঙে পড়েন না। তরঙ্গবিক্ষুব্ধ উত্তাল সমুদ্রে যিনি দৃঢ় প্রত্যয়ী, চির কুশলী। রোমাঞ্চকর অগ্নিযাত্রায় যিনি সফল নাবিক। হাজার ঝড়ঝাপটায় যার হৃদয়ের প্রদীপ শিখা অবিচল। যিনি কখনো অধৈর্য হন না। আল্লাহর ফায়সালার প্রতি যার মন প্রাণ চিরসমর্পিত, সর্বাবস্থায় সন্তুষ্ট। জীবনের অগ্নিপরীক্ষাকে যিনি মনে করেন সফলতার সুবর্ণ সুযোগ। যিনি অনুভব করেন, জীবনের কষ্ট ক্লেশ যেন প্রভাতশিশিরের মতো সুনির্মল, যা তাকে পৃথিবীর মায়া মোহ থেকে পবিত্র করে নিত্যদিন; কিংবা জুঁই ও লিলি ফুলের মতো সুকোমল, যা হৃদয়ে প্রশান্তির শীতল প্রলেপ বুলিয়ে দেয় নরম ছোঁয়ায় অষ্টপ্রহর; কিংবা মৃদু মন্দ পুবালি বাতাসের মতো নরম ও ফুরফুরে, যা হৃদয় ছুঁয়ে যায় অনির্বচনীয় প্রাণবন্ততায় ক্ষণে ক্ষণে।
আমরা একটি মুসলিম সমাজ প্রত্যাশা করি। যেখানে পুরুষ একজন স্নেহশীল পিতা। করুণার আধার। মমতায় ভরা। যার হৃদয় জুড়ে সন্তানের প্রতি অগাধ ভালোবাসা। যিনি বুদ্ধিমান। চিন্তাশীল। প্রজ্ঞাবান। সন্তানের জন্য যেন আলোর মশাল। বিজ্ঞ পথপ্রদর্শক। বিচক্ষণ তত্ত্বাবধায়ক। বিপদে আপদে সন্তানের ভরসা। মাথা গোঁজার নিরাপদ আশ্রয়।
আমরা একটি ইসলামী সমাজ চাই। যেখানে পুরুষ একজন বিশ্বস্ত জীবনসঙ্গী। যার ভালোবাসা অটুট এবং স্থির। যিনি নারীর দুর্ভেদ্য দুর্গ। প্রেমময় স্বামী। স্ত্রীর প্রতি ধেয়ে আসা যেকোনো বিপদকে তিনি প্রতিহত করেন প্রাণপণে। তাকে সুরক্ষিত রাখেন যে কোনো অত্যাচার, অনাচার থেকে। তাই অগাধ আস্থা, অগাধ ভক্তি, অগাধ ভালোবাসা স্ত্রীর হৃদয়ে জন্মায় সগৌরবে। পূর্ণ অর্থ, পূর্ণ শান্তি স্ত্রীর হৃদয়কে রাখে স্থির, প্রশান্ত। যিনি সদাচারী। যার সাহচর্যে ধন্য হয় নারী। ধন্য হয় নারীর জীবন। সে সুখে পায় অনাবিল শান্তি। অপরিহার্য সুখ। দাম্পত্যজীবনের দায়ভারে যিনি স্ত্রীর প্রতি বাড়িয়ে দেন অবিরত সহযোগিতার হাত। তাকে দিতে চান সর্বোচ্চ সহজতা। যাতে মুসলিম পরিবার পায় পূর্ণতা। হয় দুর্ভেদ্য, দুর্লঙ্ঘ্য। যুগের ঝড়ঝাপটায় সুস্থির। কুচক্রীরা ফিরে যায় ব্যর্থ মনোরথে।
মুসলিম যুবসমাজের কাছে আমাদের প্রত্যাশা অপরিসীম। আমাদের প্রত্যাশা ঈমানী গুণ ও চারিত্রিক মাধুর্যে বিশিষ্ট একটি যুবসমাজ। যারা ইসলামের পরিচয় বহন করে। ইসলামের আদর্শ স্থাপন করে। এবং ইসলামকেই জীবনের সংবিধান হিসেবে গ্রহণ করে। যারা বিশ্বাস করে,
وَمَن يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَن يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُৱ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ
অর্থ : যদি কেউ ইসলাম ছাড়া অন্য কিছুকে ধর্ম হিসেবে পেতে চায় তা হলে তা কিছুতেই গ্রহণযোগ্য হবে না। আর পরকালে সে হবে ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্ভুক্ত। —সূরা আলে ইমরান : ৮৫
আমরা এমন একটি যুবসমাজ প্রত্যাশা করি, যারা ইসলাম ও ইসলামি বিশ্বাসে দৃঢ় প্রত্যয়ী। নিজের ধর্ম ও বিশ্বাসের প্রতি যারা গর্ব বোধ করে। কবির ভাষায়,
'কী মোর বর্ণ, কী মোর বংশ—না জানি। জানি, ইসলামই পিতা, ইসলামই জননী।'
আমরা এমন যুবক প্রত্যাশা করি, যে কিতাবুল্লাহকে আঁকড়ে থাকে। রাসূলের আদর্শের পূর্ণ বাস্তবায়ন কামনা করে। যার হৃদয় মসজিদের সাথে লেগে থাকে। যার সমগ্র সত্তা জুড়ে তাকওয়া, খোদভীতি, উত্তম চারিত্রমাধুর্য। যে আর্তমানবতার সেবায় নিয়োজিত। অভাবী দুস্থের সাহায্য সহযোগিতায় অবিরত। অত্যাচারীর ভয়। অত্যাচারিতের আশ্রয়। সময় সম্পর্কে সচেতন। কর্তব্যপরায়ণ। সে জানে, মানে, তার অনেক দায়; কিন্তু সময় সামান্য।
সে কঠোর পরিশ্রমে বিশ্বাসী। ঐশী বিধান অনুসারে নতুন করে ইসলামী জীবনযাপনের প্রত্যয়ী। কর্ম ও চেতনায় মুক্ত স্বাধীন। পাশ্চাত্যতার অন্ধ অনুকরণে নয়। সে আল্লাহর বাণী ও রাসূলের আদর্শ অনুসরণে চলে নিজ মতে, নিজ গতিতে; মহান আল্লাহর আলোয় আলোকপ্রাপ্ত হয়। তিনিই তো আসমানসমূহ ও জমিনের আলো। তাই তো পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে,
اللَّهُ نُورُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۚ مَثَلُ نُورِهِ كَمِشْكَاةٍ فِيهَا مِصْبَاحٌ ۖ الْمِصْبَاحُ فِي زُجَاجَةٍ ۖ الزُّجَاجَةُ كَأَنَّهَا كَوْكَبٌ دُرِّيٌّ يُوقَدُ مِن شَجَرَةٍ مُّبَارَكَةٍ زَيْتُونَةٍ لَّا شَرْقِيَّةٍ وَلَا غَرْبِيَّةٍ يَكَادُ زَيْتُهَا يُضِيءُ وَلَوْ لَمْ تَمْسَسْهُ نَارٌ ۚ نُّورٌ عَلَىٰ نُورٍ ۗ يَهْدِي اللَّهُ لِنُورِهِ مَن يَشَاءُ ۚ وَيَضْرِبُ اللَّهُ الْأَمْثَالَ لِلنَّاسِ ۗ وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ
অর্থ : আল্লাহ আসমানসমূহ ও জমিনের আলো। তাঁর এ আলোর দৃষ্টান্ত—যেন একটি দীপাধার। যাতে আছে একটি প্রদীপ। প্রদীপটি রাখা আছে স্বচ্ছ কাঁচের পাত্রে। কাঁচের পাত্রটি যেন কোনো উজ্জ্বল নক্ষত্র। জ্বালানি পবিত্র জয়তুন বৃক্ষের তেল। যা শুধু পূর্বের বা পশ্চিমের আলোকপ্রাপ্ত নয়। এ তেল এত স্বচ্ছ—যেন আগুনের স্পর্শ ছাড়াই জ্বলে উঠবে। এ তো আলোর ওপর আলো। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন তাকে এ আলোর দিশা দেন। আল্লাহ মানুষের জন্য দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞাত। —সূরা নূর : ৩৫
এমন যুবক, যে জমিনে বিচরণ করে; কিন্তু তার হৃদয় থাকে আরশে আজিমে। কেননা, সে হৃদয়ে জাগ্রত জিহাদি চেতনা। ধমনীতে নেশা শাহাদাতের। ফিরিয়ে আনতে চায় আযানের সুর। আযানের আযানখানা থেকে যার প্রতিধ্বনি অনুরণিত হয় কুদসের আকাশে বাতাসে। প্রকম্পিত করবে সারা পৃথিবীর তাগুতি শক্তির ভিত। আকসার মিম্বার, আকসার গম্বুজ আনন্দে ঝলমল করে উঠবে আবার। আবার উচ্চারিত হবে আল্লাহর নাম, প্রিয়তম মুহাম্মাদের নাম। ব্যথাতুর হৃদয়ে জ্বালাবে আশার আলো। ফিলিস্তিনের বিষয়ে, এতিমের মুখে ফোটাবে বিজয়ের হাসি।
এমন যুবক, যার হৃদয় উৎসুক হয়ে আছে হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে। যার দৃষ্টি প্রসারিত আসমানে। প্রত্যয়ে ছুঁয়ে যায় সুরাইয়া। রাতের ইবাদতগুজার। দিনের ঘোরসওয়ার।
এমন যুবক, যে বাস্তবতায় বিশ্বাসী। জ্ঞান ও যোগ্যতায় বিশ্বাসী। ভুলে যায় না যে, সে মায়ার পৃথিবীতেই আছে। সুতরাং কল্পনার ডানায় ভেসে বেড়ানো এবং দিবাস্বপ্নে বিভোর থাকার মানসিকতা তার নেই। সে শ্রমহীন ও সাধনাহীনভাবে নিছক অতীতের গুণকীর্তন করে জাতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে না। বরং নিজের মেধা ও সামর্থ্যকে ব্যয় করে কাজ করে। জ্ঞানের সাধনায় আত্মনিয়োগ করে—যোগ্য নেতৃত্বের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে, ইসলামের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে, পৃথিবীতে পুনরায় মুসলিমজাতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করতে। সে বিশ্বাস করে, পরিবেশ পরিস্থিতি সব সময় একই থাকে না। সময়ের ব্যবধানে প্রেক্ষাপট পাল্টে যায়। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন,
تِلْكَ الْأَيَّامُ نُدَاوِلُهَا بَيْنَ النَّاسِ
অর্থ : আর আমি মানুষের মাঝে উত্থান পতনের দিনগুলো অদলবদল করাতে থাকি। —সূরা আলে ইমরান : ১৪০
এমন যুবক, যে ঐক্যবদ্ধতা পছন্দ করে। আত্মকেন্দ্রিক নয়। সে বিশ্বাস করে, বিশৃঙ্খলভাবে একা একা কাজ করার চাইতেও সুশৃঙ্খলভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করা সর্ব বিচারে ভালো। সে সবাইকে সাথে নিয়ে কাজ করে। মহান আল্লাহর দরবারে ঐক্যবদ্ধ প্রার্থনা জানায়,
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ
অর্থ : হে আল্লাহ আমরা আপনারই ইবাদত করি এবং আপনারই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি। —সূরা ফাতিহা : ০৪
মুজাহিদ যুবকরা উদার আকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্র তারা। তারা সোনার হরফে লিখে দেয় ত্যাগের মহিমাগাথা। জাতিকে উপহার দেয় সুস্পষ্ট বিজয়। ইসলাম পুনপ্রতিষ্ঠিত হয় আপন মহিমায়। শত্রুরা হাসে উপহাসের হাসি। তবে, এ অসম্ভব নয়। কিয়ামত পর্যন্ত সে আশার আলো জ্বলে ঈমানদীপ্ত অকুতোভয় বীরদের হৃদয়ে।
মুসলিম সমাজে একজন মুসলিম নারীর কাছে আমাদের প্রত্যাশা— তিনি একজন আদর্শ মা হবেন। ঈমান ও বিশ্বাসে বলীয়ান। দৃঢ়চিত্ত, সুউচ্চ মনোবলসম্পন্ন। যিনি হযরত খানসা রাযিয়াল্লাহু আনহার আদর্শে উজ্জীবিত। যেই খানসা রাযি. টগবগে যুবক চার ছেলেকেই কাদিসিয়া যুদ্ধে সমবেত করে জিহাদে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন এই বলে: “তোমরা জেনে রেখো, এই দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী। আখেরাত উত্তম। আখেরাতই চিরস্থায়ী। সুতরাং ধৈর্য ধরো। ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা দেখাও। এবং শত্রুর মোকাবিলায় অবিচল থেকো।” যখন কাদিসিয়া যুদ্ধে চার সন্তানই শহীদ হওয়ার সংবাদ পেলেন তখন স্থিরচিত্তে হযরত খানসা রাযি. শুধু এ কথা বললেন, “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর। যিনি ফি সাবিলিল্লাহ আমার ছেলেদের শাহাদাতের সুধা পান করিয়ে আমাকে সম্মানিত করেছেন। আমি আশা করি, আমার আল্লাহ আমাকে এবং আমার চার সন্তানকে তাঁর রহমতের আশ্রয়ে আবার একত্রিত করবেন।”১
আমাদের প্রত্যাশা—মুসলিম নারী হবেন একজন রত্নগর্ভা। যিনি কিতাব ও সুন্নাহ অনুযায়ী সন্তানদের লালনপালন করেন। সাদ, খালিদ, তারিকের মতো মর্দে মুমিন জাতিকে উপহার দেন।
আমাদের প্রত্যাশা—মুসলিম নারী হবেন একজন ধৈর্যশীলা কঠিন প্রত্যয়িনী বোন। বিপদে ভেঙে পড়েন না। যার সাহস আকাশচুম্বী। খাওলা বিনতে আযওয়ারের মতো। আজনাবাইনের যুদ্ধে ভ্রাতা যিরারের বন্দি হওয়ার সংবাদ পেয়ে তিনি যে সাহসিকতা দেখিয়েছিলেন তা মুসলিম নারীর প্রেরণা হয়ে থাকবে চিরকাল। সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ স্বয়ং যিরারকে মুক্ত করতে গিয়েছিলেন যেখানে। দিগ্বিজয়ী বীর, মুসলিম সেনাপতি, আল্লাহর তরবারি—খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি. মুসলিমবাহিনি নিয়ে এগিয়ে চলেছেন তীরবেগে। হঠাৎ দেখা যায় অগণিত এক অশ্বারোহী। অথৈ ভীড়ে ছুটে চলেছেন ধুলোবুলরিত দূর দিগন্তে। তিনি ছুটছেন তো ছুটছেন। পেছনে ভ্রূক্ষেপ করেন না। মুসলিমবাহিনির পদাঙ্কন লক্ষ্য করেন না। মুসলিমবাহিনি রোমসেনাদের ভিড়ে ঢুকে পড়ল এবং হামলা চালাল। মুসলিম লড়াকুদের সাথে অগণিত অশ্বারোহীও কটল করে চলেছেন অগণিত রোমক যোদ্ধাকে। ...যুদ্ধ শেষ হলো। মুসলিম যোদ্ধাগণ অশ্বারোহীর পরিচয় জানতে চায়। কিন্তু তিনি চলে যাচ্ছেন। পেছনে ভ্রূক্ষেপ করছেন না। এবার সেনাপতি খালিদ রাযি. কসম দিয়ে পরিচয় ব্যক্ত করতে বলেন। এবার ফিরে তাকান অশ্বারোহী। অবগুণ্ঠনের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে তেজোদ্দীপ্ত নারী কণ্ঠ। বলেন, “হে মহামহিম সেনাপতি, আমি আপনাকে উপেক্ষা করে চলেছি শুধুমাত্র লজ্জায়। আপনি একজন মহিমান্বিত বীর সেনাপতি। আর আমি এক নগণ্য অন্তঃপুরবাসিনী। পর্দানশীন। আল্লাহর কসম, আমার দগ্ধ হৃদয়েই আমাকে যুদ্ধে অবতীর্ণ করেছে।” অবাক বিস্ময়ে সেনাপতি খালেদ রাযি. বলেন, “কে আপনি? কী আপনার বৃত্তান্ত?” তিনি বলেন, “আমি খাওলা বিনতে আযওয়ার। আমি গোত্রের অন্তঃপুরবাসিনীদের সাথে ছিলাম। কিন্তু আমার ভ্রাতা যিরারের বন্দি হওয়ার সংবাদ শুনে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। তাই অশ্বে আরোহণ করে ছুটে এসেছি এবং যা করার করেছি।” সেনাপতি খালিদ চিৎকার করে বলেন, “বোন, আপনি নিশ্চিত থাকুন। আমরা আমাদের সমগ্র শক্তি দিয়ে হামলা চালাব। ইনশাআল্লাহ, আমরা আমাদের ভ্রাতাকে মুক্ত করে আনবই।”২
মুসলিম সমাজে আমাদের প্রত্যাশিত মুসলিম তরুণী হবে ঈমান ও বিশ্বাসে গৌরবান্বিত। ধর্ম ও ধার্মিকতায় মহিমান্বিত। হবে মুক্তমনা। হবে স্বাধীনচেতা। তবে পাগলা হাওয়ায় উড়ে যাওয়া বেচারি নয়। বাতিলের সয়লাবে ভেসে যাওয়া খড়কুটো নয়। ঈমান ও হেদায়েতের বাতায়নে দেখা শার্দূলী। হাজার হাঁক-ডাক-হৈ-হুল্লোড়ে, সহস্র শোরগোল কোলাহলে—সুস্থির, সুবিবেচক, সজ্ঞান, আপন সত্তায় অটল, আপন বিশ্বাসে অবিচল। মাধুরী তার ঈমান। মূলধন তার লজ্জা ও সৎ চরিত্র। হিজাব ও পর্দায় পবিত্র। নেকাব ও জিলবাবে অপূর্ব, অনুপম।
কবির ভাষায়,
ইনহাই বিতাজিলিকা ওয়াযদাদী শিয়ারা
ইয়া লিলখিজলি মুনতখিবান বিজীহারিহি
মুতাহাযযিয়া বিসুবাল সামায়াত জিহানদান
লা তাখাফু আম্মান ওয়ালা খাওয়ারা
মর্যাদার তাজ মস্তকে ধারণ করে,
আত্মপরিচয় হৃদয়ে লালন করে,
অবগুণ্ঠিত কপালে কপোলে তুমি।
শত্রুর ভয়, দুর্বলতা দূরীভূত;
ব্যর্থ তোমাতে ষড়যন্ত্র, ব্যর্থ তোমাতে তন্ত্র-মন্ত্র।
আমাদের প্রত্যাশা—সে হবে স্বামীর অনুগতা প্রেমময়ী। হবে বিশ্বস্ত জীবনসঙ্গিনী। সুখে দুঃখে পাশে থাকে। বিপদে আপদে সাথে থাকে। ভাবে ভাবায় আনে অন্তরঙ্গতা। জীবনসাথীর হৃদয়ভূমিতে বপন করে তাকওয়ার বীজ। জীবনে হয় তার সুখের ঠিকানা। কৃতজ্ঞ, কৃতার্থ। অমায়িক, সংযমী। নিরবচ্ছিন্ন কোনো চাওয়া পাওয়া নেই। আছে স্বামীর সুখ ও সেবার প্রবল বাসনা। দাম্পত্যের উদ্যানে একটি ছায়াদার ফুলদার তরুর মতো। সুশীতল, সবুজ, প্রাণবন্ত। পত্রপুষ্পে আহ্লাদিত। যার ছায়ায় স্বামী উৎসাহ পায়। চলার প্রেরণা পায়। পায় সুখময় গতিশীল জীবনের সন্ধান। ঘুমানোর সময় চোখ বুজে নিশ্চিন্তে, নির্বিঘ্নে।
সবশেষে আমরা মুসলিম নারীকে কামনা করি একজন কর্মনিষ্ঠ দায়িয়া হিসেবে, যিনি কাজ করবেন আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। যদি শিক্ষিত হন, তা হলে শিক্ষার্থীদের হৃদয়ভূমিতে ঈমান ও আকীদার চাষবাদ করুন। বিদ্যালয়ে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ অব্যাহত রাখুন। সত্যের আওয়াজ তুলুন। যত বাধাই আসুক। যত বিপত্তিই ঘটুক। কল্যাণের বারিধারা প্রবাহিত করুন যেখানেই থাকুন। চেতনা জাগ্রত করুন নারী সমাজে। তাওহীদের কথা বলুন। রিসালাতের কথা বলুন। আখেরাতের কথা বলুন। জান্নাতের সুসংবাদ দিন। জাহান্নামের ভয় দেখান। নতুন প্রজন্মকে রক্ষা করুন ইসলাম ও মুসলিমবিদ্বেষী সকল অপশক্তির থেকে।
আমাদের প্রত্যাশা—এমন একজন মুসলিম নারী, যিনি চারপাশে ছড়িয়ে যাওয়া সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সর্ব বিষয়ে সচেতন। যিনি জীবন ও জগতের বিভিন্ন বিষয়ে দৃষ্টি প্রসারিত করতে পারেন। নানামুখী সমস্যা, উৎপত্তি, উত্তরণ উপলব্ধি করতে পারেন। প্রয়োজনীয় ধর্মীয় এবং সাধারণ উভয়বিধ জ্ঞান ও যোগ্যতায় যিনি পারদর্শিনী। যিনি মুসলিম সমাজগঠনে একটি কার্যকর উপাদান হতে, সারা পৃথিবীর সকল ধর্ম, সকল জাতির নারীদের সাথে প্রতিযোগিতা করতে—সদা প্রস্তুত। যিনি বিশ্বে যত নারী সংস্থা ও নারী-আন্দোলন গড়ে উঠেছে ধর্ম, চরিত্র ও মূল্যবোধকে ধ্বংস করার জন্য, সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে আন্তর্জাতিক নারী-আন্দোলনকে ইসলামের দিকে পরিচালিত করার প্রত্যাশী। কেননা, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক সর্ব বিষয়ের সুন্দরতম সমাধান দেয় ইসলামই। ইসলামই মানবতাকে রক্ষা করতে পারে মহাপতনের হাত থেকে। ফিরিয়ে আনতে পারে পতনোন্মুখ মানবতাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে। মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন,
وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْتَضَىٰ لَهُمْ وَلَيُبَدِّلَنَّهُم مِّن بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنًا يَعْبُدُونَنِي لَا يُشْرِكُونَ بِي شَيْئًا ۚ وَمَن كَفَرَ بَعْدَ ذَٰلِكَ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
অর্থ : আল্লাহ্ প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন তোমাদের মধ্য থেকে যারা ঈমান এনেছে এবং আমলে সালেহ্ করেছে তাদেরকে, তিনি তাদেরকে জমিনে দান করবেন খেলাফত যেভাবে খেলাফত দান করেছিলেন তোমাদের পূর্ববর্তীদের। এবং প্রতিষ্ঠিত করে দেবেন তাদের জন্য তাঁর মনোনীত ধর্মকে। আর ভীতির পরিবর্তে তাদের দান করবেন স্বস্তি। শর্ত হলো, তারা আমার ইবাদত করবে। আমার সাথে কোনো কিছুকে শরীক করবে না। কিন্তু এরপরও যারা কুফরি করবে, তারাই পাপাচারী। —সূরা নূর : ৫৫
কবি বলেন,
তুখীঝুয যালামু হাইয়্যান ওয়া ইয়াযিলু
ফজরুল মাদা মিন উফুক্বি ত্বইবাতিন ইউরসিলুল আনওয়ারা
কেটে যায় কালো ভোরের আভাসে,
দিগন্তে হাসে উষার আলো...
সমাপ্ত
টিকাঃ
১. সহীহ মুসলিম।
১. আল ইসরাহ্ কী তায়হীদিস সাহাবাহ্ : ৯৭।
২. ফুতূহুল শাম লিল ওয়াকিদী : ১/৭০-৭১।
আমাদের প্রত্যাশা—পূর্ণাঙ্গ ইসলামী সমাজ, পূর্ণাঙ্গ মুসলিম সমাজ। যার প্রথম ও প্রধান ভিত্তি হবে মুসলিম পরিবার। যার প্রতিটি সদস্য আল্লাহর আনুগত্যে হবে ঐক্যবদ্ধ। মা বাবার স্নেহ-ছায়া বিরাজমান তাদের মাথার ওপর। তারা পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ। মা বাবার ভালোবাসা তাদের ঘিরে থাকে সর্বক্ষণ। নতুন প্রজন্ম বেড়ে ওঠে আগামী দিনের মহৎ ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের গুণে। তারা গড়তে চায় মুসলিম কীর্তিপ্রাসাদ। যা সুউচ্চ, শানদার। তারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর ঝাণ্ডাকে বুলন্দ করার জন্য। ইসলামের হারানো গৌরব ও মর্যাদা ফিরিয়ে আনার জন্য।
আমরা একটি মুসলিম সমাজ চাই। যেখানে ভালোবাসা হয় আল্লাহর জন্য, রাসূলের জন্য এবং মুমিনদের জন্য। যেখানে মহান আল্লাহর এই বাণীর পাই সফল বাস্তবায়ন:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْكَفِرِينَ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُونِ الْمُؤْمِنِينَ أَتُرِيدُونَ أَنْ تَجْعَلُوْا لِلَّهِ عَلَيْكُمْ سُلْطَنًا مُبِينًا
অর্থ : হে ওই সব লোকেরা, যারা ঈমান এনেছ, তোমরা মুমিনদের বাদ দিয়ে কাফেরদের বন্ধুত্ব গ্রহণ করো না। তোমরা কি নিজেদের বিরুদ্ধে আল্লাহ্র কাছে প্রমাণ প্রতিষ্ঠা করতে চাও? —সূরা নিসা : ১৪৪
মহান আল্লাহ আরও ইরশাদ করেছেন,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا عَدُوِّي وَعَدُوَّكُمْ أَوْلِيَاءَ تُلْقُونَ إِلَيْهِمْ بِالْمَوَدَّةِ وَ قَدْ كَفَرُوْا بِمَا جَاءَكُمْ مِّنَ الْحَقِّ
অর্থ : হে ওই সমস্ত লোকেরা, যারা ঈমান এনেছ, তোমরা আমার শত্রু এবং তোমাদের শত্রুদের বন্ধুত্ব গ্রহণ করো না। তোমরা তাদেরকে ভালোবাসা দেখাবে? অথচ রাসূল যে সত্য নিয়ে আগমন করেছেন, তারা তা অস্বীকার করে। —সূরা মুমতাহিনা : ০১
আমরা এমন একটি সমাজ চাই যার মূল ভিত্তি হলো—আল্লাহর জন্য ভ্রাতৃত্ব এবং ভালোবাসা। যা সাম্প্রদায়িকতা ও গোঁড়ামিমুক্ত। মহান আল্লাহর বাণীর বাস্তবায়নে–
وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنْتُمْ أَعْدَاءً فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ فَأَصْبَحْتُمْ بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا وَكُنْتُمْ عَلَى شَفَا حُفْرَةٍ مِنَ النَّارِ فَأَنْقَذَكُمْ مِنْهَا كَذَلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ أَيْتِهِ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ
অর্থ : তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে আঁকড়ে ধরো। তোমরা বিচ্ছিন্ন হয়ো না। স্মরণ করো, যখন তোমরা ছিলে একে অপরের শত্রু। আল্লাহ তোমাদের মাঝে সম্প্রীতি সৃষ্টি করলেন। তার নেয়ামতে তোমরা হলে ভাই ভাই। স্মরণ করো, তোমরা ছিলে জাহান্নামের দ্বারপ্রান্তে। তিনি তোমাদের রক্ষা করলেন। এভাবেই আল্লাহ তাঁর নিদর্শনাবলি বর্ণনা করেন। হয়তো তোমরা দিশা পাবে। —সূরা আলে ইমরান : ১০৩
প্রিয় রাসূলও বলেছেন, 'ওই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ, তোমরা কিছুতেই জান্নাতে প্রবেশ করবে না যতক্ষণ না ঈমান আনবে। তোমরা কিছুতেই ঈমান আনতে পারবে না যতক্ষণ না একে অপরকে ভালোবাসবে।'১
আমরা একটি মুসলিম সমাজ চাই যা পারস্পরিক দায়িত্ববোধ, পারস্পরিক মায়াবোধ এবং পারস্পরিক সম্পর্কবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত। মহান আল্লাহর এই বাণীর আনুগত্য যেখানে জাগ্রত সদাসর্বদা—
أُولُوْا الْأَرْحَامِ بَعْضُهُمْ أَوْلَى بِبَعْضٍ فِي كِتَبِ اللَّهِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُهَجِرِينَ إِلَّا أَنْ تَفْعَلُوْا إِلَى أَوْلِيَائِكُمْ مَّعْرُوْفًا كَانَ ذَلِكَ فِي الْكِتَبِ مَسْطُوْরًا
অর্থ : যাদের মধ্যে রয়েছে আত্মার বন্ধন। আল্লাহ্র কিতাব অনুযায়ী সাধারণ মুমিন মুহাজিরদের চাইতে তারা একে অপরের প্রতি অধিক হকদার। তবে তোমরা বন্ধুবান্ধবদের প্রতি যে সদাচার করবে, তা আল্লাহর কিতাবে অবশ্যই লিপিবদ্ধ থাকবে। —সূরা আহযাব : ০৬
আমরা এমন একটি সমাজ চাই যা সুন্দর সুনির্মল চরিত্রমাধুর্য এবং সুউচ্চ সুমহান মূল্যবোধে ভাস্বর। সত্যতা, আমানতদারি, বিশ্বস্ততা, ত্যাগ ও বিসর্জন, বীরত্ব ও সাহসিকতা, ব্যক্তিত্ব ও মহানুভবতা; আন্তরিকতা-একনিষ্ঠতা, কৃতজ্ঞতা-কৃতার্থতা, ক্ষমা ও মার্জনা এবং ন্যায় ও সুন্দরের সুসজ্জিত একটি পূর্ণাঙ্গ সমাজ। এমন একটি সমাজ, যাকে গতিশীল করে মহৎ গুণাবলি, উন্নত আদর্শ। যেখানে চরিত্রের পবিত্রতায় আরোপিত কড়া প্রহরা। যেখানে চরিত্রই ধর্ম ও বিশ্বাসের প্রথম প্রহরী। কবির ভাষায় বলতে হয়,
'নিশ্চয়ই কোনো জাতি ততক্ষণ টিকে থাকে যতক্ষণ তাদের চরিত্র টিকে থাকে; যখন তাদের চরিত্র ধ্বংস হয়, তখন তাদের বিলুপ্তি অবশ্যম্ভাবী।'
আমরা একটি ইসলামী সমাজ চাই। যেখানে প্রতিটি মানুষের অধিকার নিশ্চিত। যেখানে জোর নেই, জুলুম নেই। অনিয়ম নেই, অনাচার নেই। যেখানে পারস্পরিক কর্ম ও লেনদেন সম্পাদিত হয় মহান আল্লাহর এই বাণীর সফল বাস্তবায়নে—
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَقُولُوْا قَوْلًا سَدِيدًا يُصْلِحْ لَكُمْ أَعْمَلَكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِيمًا
অর্থ : হে ওই সমস্ত লোকেরা যারা ঈমান এনেছ, তোমরা আল্লাহর জন্য ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকো। ন্যায়ের সাথে সাক্ষ্য প্রদান করো। কারো প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের অন্যায়ে প্ররোচিত না করে। তোমরা ন্যায়ের সাথে কাজ করো। সেটাই তাকওয়ার নিকটতর। তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে সম্যক অবগত। —সূরা মাইদাহ : ০৮
আমরা একটি পবিত্র ও সভ্য সমাজ প্রত্যাশা করি। যেখানে অপরাধপ্রবণতা নেই। লাঞ্ছনা ও চরিত্রহীনতা নেই। যেখানে প্রত্যেক ধর্মীয় নীতিমালা এবং উন্নত চরিত্রমাধুরীর ওপর প্রতিষ্ঠিত। যেখানে প্রত্যেকে প্রত্যেকের, প্রকারান্তরে সমাজের কল্যাণকামী। যেখানে আনন্দ, ব্যক্তিস্বার্থ ও প্রবৃত্তির অগ্রগামিতা বিসর্জিত। যেই সমাজের প্রতি আল্লাহর নুসরত ও সাহায্য অনিবার্য। যেমনটি মহান আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন :
وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْتَضَىٰ لَهُمْ وَ لَيُبَدِّلَنَّهُم مِّن بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنًا يَعْبُدُونَنِي لَا يُشْرِكُونَ بِي شَيْئًا وَمَن كَفَرَ بَعْدَ ذَٰلِكَ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
অর্থ : আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তোমাদের মধ্যে থেকে যারা ঈমান এনেছে এবং আমলে সালেহ করেছে তাদেরকে, তিনি তাদেরকে জমিনে দান করবেন খেলাফত, যেভাবে খেলাফত দান করেছিলেন তোমাদের পূর্ববর্তীদের। এবং প্রতিষ্ঠিত করে দেবেন তাদের জন্য তাঁর মনোনীত ধর্মকে। আর ভীতির পরিবর্তে তাদের দান করবেন স্বস্তি। তারা আমার ইবাদত করবে। আমার সাথে কোনো কিছুকে শরিক করবে না। কিন্তু এরপরও যারা কুফরি করবে, তারাই পাপাচারী। —সূরা নূর : ৫৫
আমরা একটি ইসলামী সমাজ প্রত্যাশা করি। যেখানে কিছু প্রাণবন্ত ও উৎসাহী কর্মপুরুষ কামনা করি। যাদের রক্তে আছে আল্লাহর ভালোবাসা এবং ধর্মীয় আবেগ। ধর্মীয় চেতনায় যারা স্বতঃস্ফূর্ত। ইসলামের সম্মানে যাদের রক্ত টগবগ করে। সাহসিকতা যাদের বৈশিষ্ট্য। অগ্রগামী যারা হকের পরিচয়ে। যারা মৃত্যুভয়ে ভীত হয় না। যারা তিরস্কারের পরোয়া করে না। কেননা, তারা এক আল্লাহতে বিশ্বাসী। তারা ভালো করে জানে, আল্লাহই রিজিকদাতা, লালনকারী; তিনিই অভিভাবক, রক্ষাকারী; তিনিই ব্যবস্থাপক, সাহায্যকারী।
আমরা এমন একটি সমাজ প্রত্যাশা করি, যার নেতৃত্ব দেবেন একজন মর্দে মুমিন। একজন সাজিদাল মর্দে মুমিন। একজন জিদাল মর্দে মুমিন। যিনি বিপদের মোকাবিলা করতে জানেন নির্ভয়ে। যার মনোবল সুউচ্চ পর্বতের মতো অটল, অবিচল। চরম উত্তাল পাওয়া হাওয়ায় যিনি ভেঙে পড়েন না। তরঙ্গবিক্ষুব্ধ উত্তাল সমুদ্রে যিনি দৃঢ় প্রত্যয়ী, চির কুশলী। রোমাঞ্চকর অগ্নিযাত্রায় যিনি সফল নাবিক। হাজার ঝড়ঝাপটায় যার হৃদয়ের প্রদীপ শিখা অবিচল। যিনি কখনো অধৈর্য হন না। আল্লাহর ফায়সালার প্রতি যার মন প্রাণ চিরসমর্পিত, সর্বাবস্থায় সন্তুষ্ট। জীবনের অগ্নিপরীক্ষাকে যিনি মনে করেন সফলতার সুবর্ণ সুযোগ। যিনি অনুভব করেন, জীবনের কষ্ট ক্লেশ যেন প্রভাতশিশিরের মতো সুনির্মল, যা তাকে পৃথিবীর মায়া মোহ থেকে পবিত্র করে নিত্যদিন; কিংবা জুঁই ও লিলি ফুলের মতো সুকোমল, যা হৃদয়ে প্রশান্তির শীতল প্রলেপ বুলিয়ে দেয় নরম ছোঁয়ায় অষ্টপ্রহর; কিংবা মৃদু মন্দ পুবালি বাতাসের মতো নরম ও ফুরফুরে, যা হৃদয় ছুঁয়ে যায় অনির্বচনীয় প্রাণবন্ততায় ক্ষণে ক্ষণে।
আমরা একটি মুসলিম সমাজ প্রত্যাশা করি। যেখানে পুরুষ একজন স্নেহশীল পিতা। করুণার আধার। মমতায় ভরা। যার হৃদয় জুড়ে সন্তানের প্রতি অগাধ ভালোবাসা। যিনি বুদ্ধিমান। চিন্তাশীল। প্রজ্ঞাবান। সন্তানের জন্য যেন আলোর মশাল। বিজ্ঞ পথপ্রদর্শক। বিচক্ষণ তত্ত্বাবধায়ক। বিপদে আপদে সন্তানের ভরসা। মাথা গোঁজার নিরাপদ আশ্রয়।
আমরা একটি ইসলামী সমাজ চাই। যেখানে পুরুষ একজন বিশ্বস্ত জীবনসঙ্গী। যার ভালোবাসা অটুট এবং স্থির। যিনি নারীর দুর্ভেদ্য দুর্গ। প্রেমময় স্বামী। স্ত্রীর প্রতি ধেয়ে আসা যেকোনো বিপদকে তিনি প্রতিহত করেন প্রাণপণে। তাকে সুরক্ষিত রাখেন যে কোনো অত্যাচার, অনাচার থেকে। তাই অগাধ আস্থা, অগাধ ভক্তি, অগাধ ভালোবাসা স্ত্রীর হৃদয়ে জন্মায় সগৌরবে। পূর্ণ অর্থ, পূর্ণ শান্তি স্ত্রীর হৃদয়কে রাখে স্থির, প্রশান্ত। যিনি সদাচারী। যার সাহচর্যে ধন্য হয় নারী। ধন্য হয় নারীর জীবন। সে সুখে পায় অনাবিল শান্তি। অপরিহার্য সুখ। দাম্পত্যজীবনের দায়ভারে যিনি স্ত্রীর প্রতি বাড়িয়ে দেন অবিরত সহযোগিতার হাত। তাকে দিতে চান সর্বোচ্চ সহজতা। যাতে মুসলিম পরিবার পায় পূর্ণতা। হয় দুর্ভেদ্য, দুর্লঙ্ঘ্য। যুগের ঝড়ঝাপটায় সুস্থির। কুচক্রীরা ফিরে যায় ব্যর্থ মনোরথে।
মুসলিম যুবসমাজের কাছে আমাদের প্রত্যাশা অপরিসীম। আমাদের প্রত্যাশা ঈমানী গুণ ও চারিত্রিক মাধুর্যে বিশিষ্ট একটি যুবসমাজ। যারা ইসলামের পরিচয় বহন করে। ইসলামের আদর্শ স্থাপন করে। এবং ইসলামকেই জীবনের সংবিধান হিসেবে গ্রহণ করে। যারা বিশ্বাস করে,
وَمَن يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَن يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُৱ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ
অর্থ : যদি কেউ ইসলাম ছাড়া অন্য কিছুকে ধর্ম হিসেবে পেতে চায় তা হলে তা কিছুতেই গ্রহণযোগ্য হবে না। আর পরকালে সে হবে ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্ভুক্ত। —সূরা আলে ইমরান : ৮৫
আমরা এমন একটি যুবসমাজ প্রত্যাশা করি, যারা ইসলাম ও ইসলামি বিশ্বাসে দৃঢ় প্রত্যয়ী। নিজের ধর্ম ও বিশ্বাসের প্রতি যারা গর্ব বোধ করে। কবির ভাষায়,
'কী মোর বর্ণ, কী মোর বংশ—না জানি। জানি, ইসলামই পিতা, ইসলামই জননী।'
আমরা এমন যুবক প্রত্যাশা করি, যে কিতাবুল্লাহকে আঁকড়ে থাকে। রাসূলের আদর্শের পূর্ণ বাস্তবায়ন কামনা করে। যার হৃদয় মসজিদের সাথে লেগে থাকে। যার সমগ্র সত্তা জুড়ে তাকওয়া, খোদভীতি, উত্তম চারিত্রমাধুর্য। যে আর্তমানবতার সেবায় নিয়োজিত। অভাবী দুস্থের সাহায্য সহযোগিতায় অবিরত। অত্যাচারীর ভয়। অত্যাচারিতের আশ্রয়। সময় সম্পর্কে সচেতন। কর্তব্যপরায়ণ। সে জানে, মানে, তার অনেক দায়; কিন্তু সময় সামান্য।
সে কঠোর পরিশ্রমে বিশ্বাসী। ঐশী বিধান অনুসারে নতুন করে ইসলামী জীবনযাপনের প্রত্যয়ী। কর্ম ও চেতনায় মুক্ত স্বাধীন। পাশ্চাত্যতার অন্ধ অনুকরণে নয়। সে আল্লাহর বাণী ও রাসূলের আদর্শ অনুসরণে চলে নিজ মতে, নিজ গতিতে; মহান আল্লাহর আলোয় আলোকপ্রাপ্ত হয়। তিনিই তো আসমানসমূহ ও জমিনের আলো। তাই তো পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে,
اللَّهُ نُورُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۚ مَثَلُ نُورِهِ كَمِشْكَاةٍ فِيهَا مِصْبَاحٌ ۖ الْمِصْبَاحُ فِي زُجَاجَةٍ ۖ الزُّجَاجَةُ كَأَنَّهَا كَوْكَبٌ دُرِّيٌّ يُوقَدُ مِن شَجَرَةٍ مُّبَارَكَةٍ زَيْتُونَةٍ لَّا شَرْقِيَّةٍ وَلَا غَرْبِيَّةٍ يَكَادُ زَيْتُهَا يُضِيءُ وَلَوْ لَمْ تَمْسَسْهُ نَارٌ ۚ نُّورٌ عَلَىٰ نُورٍ ۗ يَهْدِي اللَّهُ لِنُورِهِ مَن يَشَاءُ ۚ وَيَضْرِبُ اللَّهُ الْأَمْثَالَ لِلنَّاسِ ۗ وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ
অর্থ : আল্লাহ আসমানসমূহ ও জমিনের আলো। তাঁর এ আলোর দৃষ্টান্ত—যেন একটি দীপাধার। যাতে আছে একটি প্রদীপ। প্রদীপটি রাখা আছে স্বচ্ছ কাঁচের পাত্রে। কাঁচের পাত্রটি যেন কোনো উজ্জ্বল নক্ষত্র। জ্বালানি পবিত্র জয়তুন বৃক্ষের তেল। যা শুধু পূর্বের বা পশ্চিমের আলোকপ্রাপ্ত নয়। এ তেল এত স্বচ্ছ—যেন আগুনের স্পর্শ ছাড়াই জ্বলে উঠবে। এ তো আলোর ওপর আলো। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন তাকে এ আলোর দিশা দেন। আল্লাহ মানুষের জন্য দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞাত। —সূরা নূর : ৩৫
এমন যুবক, যে জমিনে বিচরণ করে; কিন্তু তার হৃদয় থাকে আরশে আজিমে। কেননা, সে হৃদয়ে জাগ্রত জিহাদি চেতনা। ধমনীতে নেশা শাহাদাতের। ফিরিয়ে আনতে চায় আযানের সুর। আযানের আযানখানা থেকে যার প্রতিধ্বনি অনুরণিত হয় কুদসের আকাশে বাতাসে। প্রকম্পিত করবে সারা পৃথিবীর তাগুতি শক্তির ভিত। আকসার মিম্বার, আকসার গম্বুজ আনন্দে ঝলমল করে উঠবে আবার। আবার উচ্চারিত হবে আল্লাহর নাম, প্রিয়তম মুহাম্মাদের নাম। ব্যথাতুর হৃদয়ে জ্বালাবে আশার আলো। ফিলিস্তিনের বিষয়ে, এতিমের মুখে ফোটাবে বিজয়ের হাসি।
এমন যুবক, যার হৃদয় উৎসুক হয়ে আছে হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে। যার দৃষ্টি প্রসারিত আসমানে। প্রত্যয়ে ছুঁয়ে যায় সুরাইয়া। রাতের ইবাদতগুজার। দিনের ঘোরসওয়ার।
এমন যুবক, যে বাস্তবতায় বিশ্বাসী। জ্ঞান ও যোগ্যতায় বিশ্বাসী। ভুলে যায় না যে, সে মায়ার পৃথিবীতেই আছে। সুতরাং কল্পনার ডানায় ভেসে বেড়ানো এবং দিবাস্বপ্নে বিভোর থাকার মানসিকতা তার নেই। সে শ্রমহীন ও সাধনাহীনভাবে নিছক অতীতের গুণকীর্তন করে জাতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে না। বরং নিজের মেধা ও সামর্থ্যকে ব্যয় করে কাজ করে। জ্ঞানের সাধনায় আত্মনিয়োগ করে—যোগ্য নেতৃত্বের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে, ইসলামের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে, পৃথিবীতে পুনরায় মুসলিমজাতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করতে। সে বিশ্বাস করে, পরিবেশ পরিস্থিতি সব সময় একই থাকে না। সময়ের ব্যবধানে প্রেক্ষাপট পাল্টে যায়। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন,
تِلْكَ الْأَيَّامُ نُدَاوِلُهَا بَيْنَ النَّاسِ
অর্থ : আর আমি মানুষের মাঝে উত্থান পতনের দিনগুলো অদলবদল করাতে থাকি। —সূরা আলে ইমরান : ১৪০
এমন যুবক, যে ঐক্যবদ্ধতা পছন্দ করে। আত্মকেন্দ্রিক নয়। সে বিশ্বাস করে, বিশৃঙ্খলভাবে একা একা কাজ করার চাইতেও সুশৃঙ্খলভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করা সর্ব বিচারে ভালো। সে সবাইকে সাথে নিয়ে কাজ করে। মহান আল্লাহর দরবারে ঐক্যবদ্ধ প্রার্থনা জানায়,
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ
অর্থ : হে আল্লাহ আমরা আপনারই ইবাদত করি এবং আপনারই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি। —সূরা ফাতিহা : ০৪
মুজাহিদ যুবকরা উদার আকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্র তারা। তারা সোনার হরফে লিখে দেয় ত্যাগের মহিমাগাথা। জাতিকে উপহার দেয় সুস্পষ্ট বিজয়। ইসলাম পুনপ্রতিষ্ঠিত হয় আপন মহিমায়। শত্রুরা হাসে উপহাসের হাসি। তবে, এ অসম্ভব নয়। কিয়ামত পর্যন্ত সে আশার আলো জ্বলে ঈমানদীপ্ত অকুতোভয় বীরদের হৃদয়ে।
মুসলিম সমাজে একজন মুসলিম নারীর কাছে আমাদের প্রত্যাশা— তিনি একজন আদর্শ মা হবেন। ঈমান ও বিশ্বাসে বলীয়ান। দৃঢ়চিত্ত, সুউচ্চ মনোবলসম্পন্ন। যিনি হযরত খানসা রাযিয়াল্লাহু আনহার আদর্শে উজ্জীবিত। যেই খানসা রাযি. টগবগে যুবক চার ছেলেকেই কাদিসিয়া যুদ্ধে সমবেত করে জিহাদে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন এই বলে: “তোমরা জেনে রেখো, এই দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী। আখেরাত উত্তম। আখেরাতই চিরস্থায়ী। সুতরাং ধৈর্য ধরো। ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা দেখাও। এবং শত্রুর মোকাবিলায় অবিচল থেকো।” যখন কাদিসিয়া যুদ্ধে চার সন্তানই শহীদ হওয়ার সংবাদ পেলেন তখন স্থিরচিত্তে হযরত খানসা রাযি. শুধু এ কথা বললেন, “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর। যিনি ফি সাবিলিল্লাহ আমার ছেলেদের শাহাদাতের সুধা পান করিয়ে আমাকে সম্মানিত করেছেন। আমি আশা করি, আমার আল্লাহ আমাকে এবং আমার চার সন্তানকে তাঁর রহমতের আশ্রয়ে আবার একত্রিত করবেন।”১
আমাদের প্রত্যাশা—মুসলিম নারী হবেন একজন রত্নগর্ভা। যিনি কিতাব ও সুন্নাহ অনুযায়ী সন্তানদের লালনপালন করেন। সাদ, খালিদ, তারিকের মতো মর্দে মুমিন জাতিকে উপহার দেন।
আমাদের প্রত্যাশা—মুসলিম নারী হবেন একজন ধৈর্যশীলা কঠিন প্রত্যয়িনী বোন। বিপদে ভেঙে পড়েন না। যার সাহস আকাশচুম্বী। খাওলা বিনতে আযওয়ারের মতো। আজনাবাইনের যুদ্ধে ভ্রাতা যিরারের বন্দি হওয়ার সংবাদ পেয়ে তিনি যে সাহসিকতা দেখিয়েছিলেন তা মুসলিম নারীর প্রেরণা হয়ে থাকবে চিরকাল। সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ স্বয়ং যিরারকে মুক্ত করতে গিয়েছিলেন যেখানে। দিগ্বিজয়ী বীর, মুসলিম সেনাপতি, আল্লাহর তরবারি—খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি. মুসলিমবাহিনি নিয়ে এগিয়ে চলেছেন তীরবেগে। হঠাৎ দেখা যায় অগণিত এক অশ্বারোহী। অথৈ ভীড়ে ছুটে চলেছেন ধুলোবুলরিত দূর দিগন্তে। তিনি ছুটছেন তো ছুটছেন। পেছনে ভ্রূক্ষেপ করেন না। মুসলিমবাহিনির পদাঙ্কন লক্ষ্য করেন না। মুসলিমবাহিনি রোমসেনাদের ভিড়ে ঢুকে পড়ল এবং হামলা চালাল। মুসলিম লড়াকুদের সাথে অগণিত অশ্বারোহীও কটল করে চলেছেন অগণিত রোমক যোদ্ধাকে। ...যুদ্ধ শেষ হলো। মুসলিম যোদ্ধাগণ অশ্বারোহীর পরিচয় জানতে চায়। কিন্তু তিনি চলে যাচ্ছেন। পেছনে ভ্রূক্ষেপ করছেন না। এবার সেনাপতি খালিদ রাযি. কসম দিয়ে পরিচয় ব্যক্ত করতে বলেন। এবার ফিরে তাকান অশ্বারোহী। অবগুণ্ঠনের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে তেজোদ্দীপ্ত নারী কণ্ঠ। বলেন, “হে মহামহিম সেনাপতি, আমি আপনাকে উপেক্ষা করে চলেছি শুধুমাত্র লজ্জায়। আপনি একজন মহিমান্বিত বীর সেনাপতি। আর আমি এক নগণ্য অন্তঃপুরবাসিনী। পর্দানশীন। আল্লাহর কসম, আমার দগ্ধ হৃদয়েই আমাকে যুদ্ধে অবতীর্ণ করেছে।” অবাক বিস্ময়ে সেনাপতি খালেদ রাযি. বলেন, “কে আপনি? কী আপনার বৃত্তান্ত?” তিনি বলেন, “আমি খাওলা বিনতে আযওয়ার। আমি গোত্রের অন্তঃপুরবাসিনীদের সাথে ছিলাম। কিন্তু আমার ভ্রাতা যিরারের বন্দি হওয়ার সংবাদ শুনে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। তাই অশ্বে আরোহণ করে ছুটে এসেছি এবং যা করার করেছি।” সেনাপতি খালিদ চিৎকার করে বলেন, “বোন, আপনি নিশ্চিত থাকুন। আমরা আমাদের সমগ্র শক্তি দিয়ে হামলা চালাব। ইনশাআল্লাহ, আমরা আমাদের ভ্রাতাকে মুক্ত করে আনবই।”২
মুসলিম সমাজে আমাদের প্রত্যাশিত মুসলিম তরুণী হবে ঈমান ও বিশ্বাসে গৌরবান্বিত। ধর্ম ও ধার্মিকতায় মহিমান্বিত। হবে মুক্তমনা। হবে স্বাধীনচেতা। তবে পাগলা হাওয়ায় উড়ে যাওয়া বেচারি নয়। বাতিলের সয়লাবে ভেসে যাওয়া খড়কুটো নয়। ঈমান ও হেদায়েতের বাতায়নে দেখা শার্দূলী। হাজার হাঁক-ডাক-হৈ-হুল্লোড়ে, সহস্র শোরগোল কোলাহলে—সুস্থির, সুবিবেচক, সজ্ঞান, আপন সত্তায় অটল, আপন বিশ্বাসে অবিচল। মাধুরী তার ঈমান। মূলধন তার লজ্জা ও সৎ চরিত্র। হিজাব ও পর্দায় পবিত্র। নেকাব ও জিলবাবে অপূর্ব, অনুপম।
কবির ভাষায়,
ইনহাই বিতাজিলিকা ওয়াযদাদী শিয়ারা
ইয়া লিলখিজলি মুনতখিবান বিজীহারিহি
মুতাহাযযিয়া বিসুবাল সামায়াত জিহানদান
লা তাখাফু আম্মান ওয়ালা খাওয়ারা
মর্যাদার তাজ মস্তকে ধারণ করে,
আত্মপরিচয় হৃদয়ে লালন করে,
অবগুণ্ঠিত কপালে কপোলে তুমি।
শত্রুর ভয়, দুর্বলতা দূরীভূত;
ব্যর্থ তোমাতে ষড়যন্ত্র, ব্যর্থ তোমাতে তন্ত্র-মন্ত্র।
আমাদের প্রত্যাশা—সে হবে স্বামীর অনুগতা প্রেমময়ী। হবে বিশ্বস্ত জীবনসঙ্গিনী। সুখে দুঃখে পাশে থাকে। বিপদে আপদে সাথে থাকে। ভাবে ভাবায় আনে অন্তরঙ্গতা। জীবনসাথীর হৃদয়ভূমিতে বপন করে তাকওয়ার বীজ। জীবনে হয় তার সুখের ঠিকানা। কৃতজ্ঞ, কৃতার্থ। অমায়িক, সংযমী। নিরবচ্ছিন্ন কোনো চাওয়া পাওয়া নেই। আছে স্বামীর সুখ ও সেবার প্রবল বাসনা। দাম্পত্যের উদ্যানে একটি ছায়াদার ফুলদার তরুর মতো। সুশীতল, সবুজ, প্রাণবন্ত। পত্রপুষ্পে আহ্লাদিত। যার ছায়ায় স্বামী উৎসাহ পায়। চলার প্রেরণা পায়। পায় সুখময় গতিশীল জীবনের সন্ধান। ঘুমানোর সময় চোখ বুজে নিশ্চিন্তে, নির্বিঘ্নে।
সবশেষে আমরা মুসলিম নারীকে কামনা করি একজন কর্মনিষ্ঠ দায়িয়া হিসেবে, যিনি কাজ করবেন আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। যদি শিক্ষিত হন, তা হলে শিক্ষার্থীদের হৃদয়ভূমিতে ঈমান ও আকীদার চাষবাদ করুন। বিদ্যালয়ে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ অব্যাহত রাখুন। সত্যের আওয়াজ তুলুন। যত বাধাই আসুক। যত বিপত্তিই ঘটুক। কল্যাণের বারিধারা প্রবাহিত করুন যেখানেই থাকুন। চেতনা জাগ্রত করুন নারী সমাজে। তাওহীদের কথা বলুন। রিসালাতের কথা বলুন। আখেরাতের কথা বলুন। জান্নাতের সুসংবাদ দিন। জাহান্নামের ভয় দেখান। নতুন প্রজন্মকে রক্ষা করুন ইসলাম ও মুসলিমবিদ্বেষী সকল অপশক্তির থেকে।
আমাদের প্রত্যাশা—এমন একজন মুসলিম নারী, যিনি চারপাশে ছড়িয়ে যাওয়া সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সর্ব বিষয়ে সচেতন। যিনি জীবন ও জগতের বিভিন্ন বিষয়ে দৃষ্টি প্রসারিত করতে পারেন। নানামুখী সমস্যা, উৎপত্তি, উত্তরণ উপলব্ধি করতে পারেন। প্রয়োজনীয় ধর্মীয় এবং সাধারণ উভয়বিধ জ্ঞান ও যোগ্যতায় যিনি পারদর্শিনী। যিনি মুসলিম সমাজগঠনে একটি কার্যকর উপাদান হতে, সারা পৃথিবীর সকল ধর্ম, সকল জাতির নারীদের সাথে প্রতিযোগিতা করতে—সদা প্রস্তুত। যিনি বিশ্বে যত নারী সংস্থা ও নারী-আন্দোলন গড়ে উঠেছে ধর্ম, চরিত্র ও মূল্যবোধকে ধ্বংস করার জন্য, সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে আন্তর্জাতিক নারী-আন্দোলনকে ইসলামের দিকে পরিচালিত করার প্রত্যাশী। কেননা, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক সর্ব বিষয়ের সুন্দরতম সমাধান দেয় ইসলামই। ইসলামই মানবতাকে রক্ষা করতে পারে মহাপতনের হাত থেকে। ফিরিয়ে আনতে পারে পতনোন্মুখ মানবতাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে। মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন,
وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْتَضَىٰ لَهُمْ وَلَيُبَدِّلَنَّهُم مِّن بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنًا يَعْبُدُونَنِي لَا يُشْرِكُونَ بِي شَيْئًا ۚ وَمَن كَفَرَ بَعْدَ ذَٰلِكَ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
অর্থ : আল্লাহ্ প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন তোমাদের মধ্য থেকে যারা ঈমান এনেছে এবং আমলে সালেহ্ করেছে তাদেরকে, তিনি তাদেরকে জমিনে দান করবেন খেলাফত যেভাবে খেলাফত দান করেছিলেন তোমাদের পূর্ববর্তীদের। এবং প্রতিষ্ঠিত করে দেবেন তাদের জন্য তাঁর মনোনীত ধর্মকে। আর ভীতির পরিবর্তে তাদের দান করবেন স্বস্তি। শর্ত হলো, তারা আমার ইবাদত করবে। আমার সাথে কোনো কিছুকে শরীক করবে না। কিন্তু এরপরও যারা কুফরি করবে, তারাই পাপাচারী। —সূরা নূর : ৫৫
কবি বলেন,
তুখীঝুয যালামু হাইয়্যান ওয়া ইয়াযিলু
ফজরুল মাদা মিন উফুক্বি ত্বইবাতিন ইউরসিলুল আনওয়ারা
কেটে যায় কালো ভোরের আভাসে,
দিগন্তে হাসে উষার আলো...
সমাপ্ত
টিকাঃ
১. সহীহ মুসলিম।
১. আল ইসরাহ্ কী তায়হীদিস সাহাবাহ্ : ৯৭।
২. ফুতূহুল শাম লিল ওয়াকিদী : ১/৭০-৭১।
আমাদের প্রত্যাশা—পূর্ণাঙ্গ ইসলামী সমাজ, পূর্ণাঙ্গ মুসলিম সমাজ। যার প্রথম ও প্রধান ভিত্তি হবে মুসলিম পরিবার। যার প্রতিটি সদস্য আল্লাহর আনুগত্যে হবে ঐক্যবদ্ধ। মা বাবার স্নেহ-ছায়া বিরাজমান তাদের মাথার ওপর। তারা পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ। মা বাবার ভালোবাসা তাদের ঘিরে থাকে সর্বক্ষণ। নতুন প্রজন্ম বেড়ে ওঠে আগামী দিনের মহৎ ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের গুণে। তারা গড়তে চায় মুসলিম কীর্তিপ্রাসাদ। যা সুউচ্চ, শানদার। তারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর ঝাণ্ডাকে বুলন্দ করার জন্য। ইসলামের হারানো গৌরব ও মর্যাদা ফিরিয়ে আনার জন্য।
আমরা একটি মুসলিম সমাজ চাই। যেখানে ভালোবাসা হয় আল্লাহর জন্য, রাসূলের জন্য এবং মুমিনদের জন্য। যেখানে মহান আল্লাহর এই বাণীর পাই সফল বাস্তবায়ন:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْكَفِرِينَ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُونِ الْمُؤْمِنِينَ أَتُرِيدُونَ أَنْ تَجْعَلُوْا لِلَّهِ عَلَيْكُمْ سُلْطَنًا مُبِينًا
অর্থ : হে ওই সব লোকেরা, যারা ঈমান এনেছ, তোমরা মুমিনদের বাদ দিয়ে কাফেরদের বন্ধুত্ব গ্রহণ করো না। তোমরা কি নিজেদের বিরুদ্ধে আল্লাহ্র কাছে প্রমাণ প্রতিষ্ঠা করতে চাও? —সূরা নিসা : ১৪৪
মহান আল্লাহ আরও ইরশাদ করেছেন,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا عَدُوِّي وَعَدُوَّكُمْ أَوْلِيَاءَ تُلْقُونَ إِلَيْهِمْ بِالْمَوَدَّةِ وَ قَدْ كَفَرُوْا بِمَا جَاءَكُمْ مِّنَ الْحَقِّ
অর্থ : হে ওই সমস্ত লোকেরা, যারা ঈমান এনেছ, তোমরা আমার শত্রু এবং তোমাদের শত্রুদের বন্ধুত্ব গ্রহণ করো না। তোমরা তাদেরকে ভালোবাসা দেখাবে? অথচ রাসূল যে সত্য নিয়ে আগমন করেছেন, তারা তা অস্বীকার করে। —সূরা মুমতাহিনা : ০১
আমরা এমন একটি সমাজ চাই যার মূল ভিত্তি হলো—আল্লাহর জন্য ভ্রাতৃত্ব এবং ভালোবাসা। যা সাম্প্রদায়িকতা ও গোঁড়ামিমুক্ত। মহান আল্লাহর বাণীর বাস্তবায়নে–
وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنْتُمْ أَعْدَاءً فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ فَأَصْبَحْتُمْ بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا وَكُنْتُمْ عَلَى شَفَا حُفْرَةٍ مِنَ النَّارِ فَأَنْقَذَكُمْ مِنْهَا كَذَلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ أَيْتِهِ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ
অর্থ : তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে আঁকড়ে ধরো। তোমরা বিচ্ছিন্ন হয়ো না। স্মরণ করো, যখন তোমরা ছিলে একে অপরের শত্রু। আল্লাহ তোমাদের মাঝে সম্প্রীতি সৃষ্টি করলেন। তার নেয়ামতে তোমরা হলে ভাই ভাই। স্মরণ করো, তোমরা ছিলে জাহান্নামের দ্বারপ্রান্তে। তিনি তোমাদের রক্ষা করলেন। এভাবেই আল্লাহ তাঁর নিদর্শনাবলি বর্ণনা করেন। হয়তো তোমরা দিশা পাবে। —সূরা আলে ইমরান : ১০৩
প্রিয় রাসূলও বলেছেন, 'ওই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ, তোমরা কিছুতেই জান্নাতে প্রবেশ করবে না যতক্ষণ না ঈমান আনবে। তোমরা কিছুতেই ঈমান আনতে পারবে না যতক্ষণ না একে অপরকে ভালোবাসবে।'১
আমরা একটি মুসলিম সমাজ চাই যা পারস্পরিক দায়িত্ববোধ, পারস্পরিক মায়াবোধ এবং পারস্পরিক সম্পর্কবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত। মহান আল্লাহর এই বাণীর আনুগত্য যেখানে জাগ্রত সদাসর্বদা—
أُولُوْا الْأَرْحَامِ بَعْضُهُمْ أَوْلَى بِبَعْضٍ فِي كِتَبِ اللَّهِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُهَجِرِينَ إِلَّا أَنْ تَفْعَلُوْا إِلَى أَوْلِيَائِكُمْ مَّعْرُوْفًا كَانَ ذَلِكَ فِي الْكِتَبِ مَسْطُوْরًا
অর্থ : যাদের মধ্যে রয়েছে আত্মার বন্ধন। আল্লাহ্র কিতাব অনুযায়ী সাধারণ মুমিন মুহাজিরদের চাইতে তারা একে অপরের প্রতি অধিক হকদার। তবে তোমরা বন্ধুবান্ধবদের প্রতি যে সদাচার করবে, তা আল্লাহর কিতাবে অবশ্যই লিপিবদ্ধ থাকবে। —সূরা আহযাব : ০৬
আমরা এমন একটি সমাজ চাই যা সুন্দর সুনির্মল চরিত্রমাধুর্য এবং সুউচ্চ সুমহান মূল্যবোধে ভাস্বর। সত্যতা, আমানতদারি, বিশ্বস্ততা, ত্যাগ ও বিসর্জন, বীরত্ব ও সাহসিকতা, ব্যক্তিত্ব ও মহানুভবতা; আন্তরিকতা-একনিষ্ঠতা, কৃতজ্ঞতা-কৃতার্থতা, ক্ষমা ও মার্জনা এবং ন্যায় ও সুন্দরের সুসজ্জিত একটি পূর্ণাঙ্গ সমাজ। এমন একটি সমাজ, যাকে গতিশীল করে মহৎ গুণাবলি, উন্নত আদর্শ। যেখানে চরিত্রের পবিত্রতায় আরোপিত কড়া প্রহরা। যেখানে চরিত্রই ধর্ম ও বিশ্বাসের প্রথম প্রহরী। কবির ভাষায় বলতে হয়,
'নিশ্চয়ই কোনো জাতি ততক্ষণ টিকে থাকে যতক্ষণ তাদের চরিত্র টিকে থাকে; যখন তাদের চরিত্র ধ্বংস হয়, তখন তাদের বিলুপ্তি অবশ্যম্ভাবী।'
আমরা একটি ইসলামী সমাজ চাই। যেখানে প্রতিটি মানুষের অধিকার নিশ্চিত। যেখানে জোর নেই, জুলুম নেই। অনিয়ম নেই, অনাচার নেই। যেখানে পারস্পরিক কর্ম ও লেনদেন সম্পাদিত হয় মহান আল্লাহর এই বাণীর সফল বাস্তবায়নে—
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَقُولُوْا قَوْلًا سَدِيدًا يُصْلِحْ لَكُمْ أَعْمَلَكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِيمًا
অর্থ : হে ওই সমস্ত লোকেরা যারা ঈমান এনেছ, তোমরা আল্লাহর জন্য ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকো। ন্যায়ের সাথে সাক্ষ্য প্রদান করো। কারো প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের অন্যায়ে প্ররোচিত না করে। তোমরা ন্যায়ের সাথে কাজ করো। সেটাই তাকওয়ার নিকটতর। তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে সম্যক অবগত। —সূরা মাইদাহ : ০৮
আমরা একটি পবিত্র ও সভ্য সমাজ প্রত্যাশা করি। যেখানে অপরাধপ্রবণতা নেই। লাঞ্ছনা ও চরিত্রহীনতা নেই। যেখানে প্রত্যেক ধর্মীয় নীতিমালা এবং উন্নত চরিত্রমাধুরীর ওপর প্রতিষ্ঠিত। যেখানে প্রত্যেকে প্রত্যেকের, প্রকারান্তরে সমাজের কল্যাণকামী। যেখানে আনন্দ, ব্যক্তিস্বার্থ ও প্রবৃত্তির অগ্রগামিতা বিসর্জিত। যেই সমাজের প্রতি আল্লাহর নুসরত ও সাহায্য অনিবার্য। যেমনটি মহান আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন :
وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْتَضَىٰ لَهُمْ وَ لَيُبَدِّلَنَّهُم مِّن بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنًا يَعْبُدُونَنِي لَا يُشْرِكُونَ بِي شَيْئًا وَمَن كَفَرَ بَعْدَ ذَٰلِكَ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
অর্থ : আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তোমাদের মধ্যে থেকে যারা ঈমান এনেছে এবং আমলে সালেহ করেছে তাদেরকে, তিনি তাদেরকে জমিনে দান করবেন খেলাফত, যেভাবে খেলাফত দান করেছিলেন তোমাদের পূর্ববর্তীদের। এবং প্রতিষ্ঠিত করে দেবেন তাদের জন্য তাঁর মনোনীত ধর্মকে। আর ভীতির পরিবর্তে তাদের দান করবেন স্বস্তি। তারা আমার ইবাদত করবে। আমার সাথে কোনো কিছুকে শরিক করবে না। কিন্তু এরপরও যারা কুফরি করবে, তারাই পাপাচারী। —সূরা নূর : ৫৫
আমরা একটি ইসলামী সমাজ প্রত্যাশা করি। যেখানে কিছু প্রাণবন্ত ও উৎসাহী কর্মপুরুষ কামনা করি। যাদের রক্তে আছে আল্লাহর ভালোবাসা এবং ধর্মীয় আবেগ। ধর্মীয় চেতনায় যারা স্বতঃস্ফূর্ত। ইসলামের সম্মানে যাদের রক্ত টগবগ করে। সাহসিকতা যাদের বৈশিষ্ট্য। অগ্রগামী যারা হকের পরিচয়ে। যারা মৃত্যুভয়ে ভীত হয় না। যারা তিরস্কারের পরোয়া করে না। কেননা, তারা এক আল্লাহতে বিশ্বাসী। তারা ভালো করে জানে, আল্লাহই রিজিকদাতা, লালনকারী; তিনিই অভিভাবক, রক্ষাকারী; তিনিই ব্যবস্থাপক, সাহায্যকারী।
আমরা এমন একটি সমাজ প্রত্যাশা করি, যার নেতৃত্ব দেবেন একজন মর্দে মুমিন। একজন সাজিদাল মর্দে মুমিন। একজন জিদাল মর্দে মুমিন। যিনি বিপদের মোকাবিলা করতে জানেন নির্ভয়ে। যার মনোবল সুউচ্চ পর্বতের মতো অটল, অবিচল। চরম উত্তাল পাওয়া হাওয়ায় যিনি ভেঙে পড়েন না। তরঙ্গবিক্ষুব্ধ উত্তাল সমুদ্রে যিনি দৃঢ় প্রত্যয়ী, চির কুশলী। রোমাঞ্চকর অগ্নিযাত্রায় যিনি সফল নাবিক। হাজার ঝড়ঝাপটায় যার হৃদয়ের প্রদীপ শিখা অবিচল। যিনি কখনো অধৈর্য হন না। আল্লাহর ফায়সালার প্রতি যার মন প্রাণ চিরসমর্পিত, সর্বাবস্থায় সন্তুষ্ট। জীবনের অগ্নিপরীক্ষাকে যিনি মনে করেন সফলতার সুবর্ণ সুযোগ। যিনি অনুভব করেন, জীবনের কষ্ট ক্লেশ যেন প্রভাতশিশিরের মতো সুনির্মল, যা তাকে পৃথিবীর মায়া মোহ থেকে পবিত্র করে নিত্যদিন; কিংবা জুঁই ও লিলি ফুলের মতো সুকোমল, যা হৃদয়ে প্রশান্তির শীতল প্রলেপ বুলিয়ে দেয় নরম ছোঁয়ায় অষ্টপ্রহর; কিংবা মৃদু মন্দ পুবালি বাতাসের মতো নরম ও ফুরফুরে, যা হৃদয় ছুঁয়ে যায় অনির্বচনীয় প্রাণবন্ততায় ক্ষণে ক্ষণে।
আমরা একটি মুসলিম সমাজ প্রত্যাশা করি। যেখানে পুরুষ একজন স্নেহশীল পিতা। করুণার আধার। মমতায় ভরা। যার হৃদয় জুড়ে সন্তানের প্রতি অগাধ ভালোবাসা। যিনি বুদ্ধিমান। চিন্তাশীল। প্রজ্ঞাবান। সন্তানের জন্য যেন আলোর মশাল। বিজ্ঞ পথপ্রদর্শক। বিচক্ষণ তত্ত্বাবধায়ক। বিপদে আপদে সন্তানের ভরসা। মাথা গোঁজার নিরাপদ আশ্রয়।
আমরা একটি ইসলামী সমাজ চাই। যেখানে পুরুষ একজন বিশ্বস্ত জীবনসঙ্গী। যার ভালোবাসা অটুট এবং স্থির। যিনি নারীর দুর্ভেদ্য দুর্গ। প্রেমময় স্বামী। স্ত্রীর প্রতি ধেয়ে আসা যেকোনো বিপদকে তিনি প্রতিহত করেন প্রাণপণে। তাকে সুরক্ষিত রাখেন যে কোনো অত্যাচার, অনাচার থেকে। তাই অগাধ আস্থা, অগাধ ভক্তি, অগাধ ভালোবাসা স্ত্রীর হৃদয়ে জন্মায় সগৌরবে। পূর্ণ অর্থ, পূর্ণ শান্তি স্ত্রীর হৃদয়কে রাখে স্থির, প্রশান্ত। যিনি সদাচারী। যার সাহচর্যে ধন্য হয় নারী। ধন্য হয় নারীর জীবন। সে সুখে পায় অনাবিল শান্তি। অপরিহার্য সুখ। দাম্পত্যজীবনের দায়ভারে যিনি স্ত্রীর প্রতি বাড়িয়ে দেন অবিরত সহযোগিতার হাত। তাকে দিতে চান সর্বোচ্চ সহজতা। যাতে মুসলিম পরিবার পায় পূর্ণতা। হয় দুর্ভেদ্য, দুর্লঙ্ঘ্য। যুগের ঝড়ঝাপটায় সুস্থির। কুচক্রীরা ফিরে যায় ব্যর্থ মনোরথে।
মুসলিম যুবসমাজের কাছে আমাদের প্রত্যাশা অপরিসীম। আমাদের প্রত্যাশা ঈমানী গুণ ও চারিত্রিক মাধুর্যে বিশিষ্ট একটি যুবসমাজ। যারা ইসলামের পরিচয় বহন করে। ইসলামের আদর্শ স্থাপন করে। এবং ইসলামকেই জীবনের সংবিধান হিসেবে গ্রহণ করে। যারা বিশ্বাস করে,
وَمَن يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَن يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُৱ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ
অর্থ : যদি কেউ ইসলাম ছাড়া অন্য কিছুকে ধর্ম হিসেবে পেতে চায় তা হলে তা কিছুতেই গ্রহণযোগ্য হবে না। আর পরকালে সে হবে ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্ভুক্ত। —সূরা আলে ইমরান : ৮৫
আমরা এমন একটি যুবসমাজ প্রত্যাশা করি, যারা ইসলাম ও ইসলামি বিশ্বাসে দৃঢ় প্রত্যয়ী। নিজের ধর্ম ও বিশ্বাসের প্রতি যারা গর্ব বোধ করে। কবির ভাষায়,
'কী মোর বর্ণ, কী মোর বংশ—না জানি। জানি, ইসলামই পিতা, ইসলামই জননী।'
আমরা এমন যুবক প্রত্যাশা করি, যে কিতাবুল্লাহকে আঁকড়ে থাকে। রাসূলের আদর্শের পূর্ণ বাস্তবায়ন কামনা করে। যার হৃদয় মসজিদের সাথে লেগে থাকে। যার সমগ্র সত্তা জুড়ে তাকওয়া, খোদভীতি, উত্তম চারিত্রমাধুর্য। যে আর্তমানবতার সেবায় নিয়োজিত। অভাবী দুস্থের সাহায্য সহযোগিতায় অবিরত। অত্যাচারীর ভয়। অত্যাচারিতের আশ্রয়। সময় সম্পর্কে সচেতন। কর্তব্যপরায়ণ। সে জানে, মানে, তার অনেক দায়; কিন্তু সময় সামান্য।
সে কঠোর পরিশ্রমে বিশ্বাসী। ঐশী বিধান অনুসারে নতুন করে ইসলামী জীবনযাপনের প্রত্যয়ী। কর্ম ও চেতনায় মুক্ত স্বাধীন। পাশ্চাত্যতার অন্ধ অনুকরণে নয়। সে আল্লাহর বাণী ও রাসূলের আদর্শ অনুসরণে চলে নিজ মতে, নিজ গতিতে; মহান আল্লাহর আলোয় আলোকপ্রাপ্ত হয়। তিনিই তো আসমানসমূহ ও জমিনের আলো। তাই তো পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে,
اللَّهُ نُورُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۚ مَثَلُ نُورِهِ كَمِشْكَاةٍ فِيهَا مِصْبَاحٌ ۖ الْمِصْبَاحُ فِي زُجَاجَةٍ ۖ الزُّجَاجَةُ كَأَنَّهَا كَوْكَبٌ دُرِّيٌّ يُوقَدُ مِن شَجَرَةٍ مُّبَارَكَةٍ زَيْتُونَةٍ لَّا شَرْقِيَّةٍ وَلَا غَرْبِيَّةٍ يَكَادُ زَيْتُهَا يُضِيءُ وَلَوْ لَمْ تَمْسَسْهُ نَارٌ ۚ نُّورٌ عَلَىٰ نُورٍ ۗ يَهْدِي اللَّهُ لِنُورِهِ مَن يَشَاءُ ۚ وَيَضْرِبُ اللَّهُ الْأَمْثَالَ لِلنَّاسِ ۗ وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ
অর্থ : আল্লাহ আসমানসমূহ ও জমিনের আলো। তাঁর এ আলোর দৃষ্টান্ত—যেন একটি দীপাধার। যাতে আছে একটি প্রদীপ। প্রদীপটি রাখা আছে স্বচ্ছ কাঁচের পাত্রে। কাঁচের পাত্রটি যেন কোনো উজ্জ্বল নক্ষত্র। জ্বালানি পবিত্র জয়তুন বৃক্ষের তেল। যা শুধু পূর্বের বা পশ্চিমের আলোকপ্রাপ্ত নয়। এ তেল এত স্বচ্ছ—যেন আগুনের স্পর্শ ছাড়াই জ্বলে উঠবে। এ তো আলোর ওপর আলো। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন তাকে এ আলোর দিশা দেন। আল্লাহ মানুষের জন্য দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞাত। —সূরা নূর : ৩৫
এমন যুবক, যে জমিনে বিচরণ করে; কিন্তু তার হৃদয় থাকে আরশে আজিমে। কেননা, সে হৃদয়ে জাগ্রত জিহাদি চেতনা। ধমনীতে নেশা শাহাদাতের। ফিরিয়ে আনতে চায় আযানের সুর। আযানের আযানখানা থেকে যার প্রতিধ্বনি অনুরণিত হয় কুদসের আকাশে বাতাসে। প্রকম্পিত করবে সারা পৃথিবীর তাগুতি শক্তির ভিত। আকসার মিম্বার, আকসার গম্বুজ আনন্দে ঝলমল করে উঠবে আবার। আবার উচ্চারিত হবে আল্লাহর নাম, প্রিয়তম মুহাম্মাদের নাম। ব্যথাতুর হৃদয়ে জ্বালাবে আশার আলো। ফিলিস্তিনের বিষয়ে, এতিমের মুখে ফোটাবে বিজয়ের হাসি।
এমন যুবক, যার হৃদয় উৎসুক হয়ে আছে হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে। যার দৃষ্টি প্রসারিত আসমানে। প্রত্যয়ে ছুঁয়ে যায় সুরাইয়া। রাতের ইবাদতগুজার। দিনের ঘোরসওয়ার।
এমন যুবক, যে বাস্তবতায় বিশ্বাসী। জ্ঞান ও যোগ্যতায় বিশ্বাসী। ভুলে যায় না যে, সে মায়ার পৃথিবীতেই আছে। সুতরাং কল্পনার ডানায় ভেসে বেড়ানো এবং দিবাস্বপ্নে বিভোর থাকার মানসিকতা তার নেই। সে শ্রমহীন ও সাধনাহীনভাবে নিছক অতীতের গুণকীর্তন করে জাতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে না। বরং নিজের মেধা ও সামর্থ্যকে ব্যয় করে কাজ করে। জ্ঞানের সাধনায় আত্মনিয়োগ করে—যোগ্য নেতৃত্বের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে, ইসলামের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে, পৃথিবীতে পুনরায় মুসলিমজাতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করতে। সে বিশ্বাস করে, পরিবেশ পরিস্থিতি সব সময় একই থাকে না। সময়ের ব্যবধানে প্রেক্ষাপট পাল্টে যায়। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন,
تِلْكَ الْأَيَّامُ نُدَاوِلُهَا بَيْنَ النَّاسِ
অর্থ : আর আমি মানুষের মাঝে উত্থান পতনের দিনগুলো অদলবদল করাতে থাকি। —সূরা আলে ইমরান : ১৪০
এমন যুবক, যে ঐক্যবদ্ধতা পছন্দ করে। আত্মকেন্দ্রিক নয়। সে বিশ্বাস করে, বিশৃঙ্খলভাবে একা একা কাজ করার চাইতেও সুশৃঙ্খলভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করা সর্ব বিচারে ভালো। সে সবাইকে সাথে নিয়ে কাজ করে। মহান আল্লাহর দরবারে ঐক্যবদ্ধ প্রার্থনা জানায়,
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ
অর্থ : হে আল্লাহ আমরা আপনারই ইবাদত করি এবং আপনারই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি। —সূরা ফাতিহা : ০৪
মুজাহিদ যুবকরা উদার আকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্র তারা। তারা সোনার হরফে লিখে দেয় ত্যাগের মহিমাগাথা। জাতিকে উপহার দেয় সুস্পষ্ট বিজয়। ইসলাম পুনপ্রতিষ্ঠিত হয় আপন মহিমায়। শত্রুরা হাসে উপহাসের হাসি। তবে, এ অসম্ভব নয়। কিয়ামত পর্যন্ত সে আশার আলো জ্বলে ঈমানদীপ্ত অকুতোভয় বীরদের হৃদয়ে।
মুসলিম সমাজে একজন মুসলিম নারীর কাছে আমাদের প্রত্যাশা— তিনি একজন আদর্শ মা হবেন। ঈমান ও বিশ্বাসে বলীয়ান। দৃঢ়চিত্ত, সুউচ্চ মনোবলসম্পন্ন। যিনি হযরত খানসা রাযিয়াল্লাহু আনহার আদর্শে উজ্জীবিত। যেই খানসা রাযি. টগবগে যুবক চার ছেলেকেই কাদিসিয়া যুদ্ধে সমবেত করে জিহাদে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন এই বলে: “তোমরা জেনে রেখো, এই দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী। আখেরাত উত্তম। আখেরাতই চিরস্থায়ী। সুতরাং ধৈর্য ধরো। ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা দেখাও। এবং শত্রুর মোকাবিলায় অবিচল থেকো।” যখন কাদিসিয়া যুদ্ধে চার সন্তানই শহীদ হওয়ার সংবাদ পেলেন তখন স্থিরচিত্তে হযরত খানসা রাযি. শুধু এ কথা বললেন, “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর। যিনি ফি সাবিলিল্লাহ আমার ছেলেদের শাহাদাতের সুধা পান করিয়ে আমাকে সম্মানিত করেছেন। আমি আশা করি, আমার আল্লাহ আমাকে এবং আমার চার সন্তানকে তাঁর রহমতের আশ্রয়ে আবার একত্রিত করবেন।”১
আমাদের প্রত্যাশা—মুসলিম নারী হবেন একজন রত্নগর্ভা। যিনি কিতাব ও সুন্নাহ অনুযায়ী সন্তানদের লালনপালন করেন। সাদ, খালিদ, তারিকের মতো মর্দে মুমিন জাতিকে উপহার দেন।
আমাদের প্রত্যাশা—মুসলিম নারী হবেন একজন ধৈর্যশীলা কঠিন প্রত্যয়িনী বোন। বিপদে ভেঙে পড়েন না। যার সাহস আকাশচুম্বী। খাওলা বিনতে আযওয়ারের মতো। আজনাবাইনের যুদ্ধে ভ্রাতা যিরারের বন্দি হওয়ার সংবাদ পেয়ে তিনি যে সাহসিকতা দেখিয়েছিলেন তা মুসলিম নারীর প্রেরণা হয়ে থাকবে চিরকাল। সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ স্বয়ং যিরারকে মুক্ত করতে গিয়েছিলেন যেখানে। দিগ্বিজয়ী বীর, মুসলিম সেনাপতি, আল্লাহর তরবারি—খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি. মুসলিমবাহিনি নিয়ে এগিয়ে চলেছেন তীরবেগে। হঠাৎ দেখা যায় অগণিত এক অশ্বারোহী। অথৈ ভীড়ে ছুটে চলেছেন ধুলোবুলরিত দূর দিগন্তে। তিনি ছুটছেন তো ছুটছেন। পেছনে ভ্রূক্ষেপ করেন না। মুসলিমবাহিনির পদাঙ্কন লক্ষ্য করেন না। মুসলিমবাহিনি রোমসেনাদের ভিড়ে ঢুকে পড়ল এবং হামলা চালাল। মুসলিম লড়াকুদের সাথে অগণিত অশ্বারোহীও কটল করে চলেছেন অগণিত রোমক যোদ্ধাকে। ...যুদ্ধ শেষ হলো। মুসলিম যোদ্ধাগণ অশ্বারোহীর পরিচয় জানতে চায়। কিন্তু তিনি চলে যাচ্ছেন। পেছনে ভ্রূক্ষেপ করছেন না। এবার সেনাপতি খালিদ রাযি. কসম দিয়ে পরিচয় ব্যক্ত করতে বলেন। এবার ফিরে তাকান অশ্বারোহী। অবগুণ্ঠনের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে তেজোদ্দীপ্ত নারী কণ্ঠ। বলেন, “হে মহামহিম সেনাপতি, আমি আপনাকে উপেক্ষা করে চলেছি শুধুমাত্র লজ্জায়। আপনি একজন মহিমান্বিত বীর সেনাপতি। আর আমি এক নগণ্য অন্তঃপুরবাসিনী। পর্দানশীন। আল্লাহর কসম, আমার দগ্ধ হৃদয়েই আমাকে যুদ্ধে অবতীর্ণ করেছে।” অবাক বিস্ময়ে সেনাপতি খালেদ রাযি. বলেন, “কে আপনি? কী আপনার বৃত্তান্ত?” তিনি বলেন, “আমি খাওলা বিনতে আযওয়ার। আমি গোত্রের অন্তঃপুরবাসিনীদের সাথে ছিলাম। কিন্তু আমার ভ্রাতা যিরারের বন্দি হওয়ার সংবাদ শুনে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। তাই অশ্বে আরোহণ করে ছুটে এসেছি এবং যা করার করেছি।” সেনাপতি খালিদ চিৎকার করে বলেন, “বোন, আপনি নিশ্চিত থাকুন। আমরা আমাদের সমগ্র শক্তি দিয়ে হামলা চালাব। ইনশাআল্লাহ, আমরা আমাদের ভ্রাতাকে মুক্ত করে আনবই।”২
মুসলিম সমাজে আমাদের প্রত্যাশিত মুসলিম তরুণী হবে ঈমান ও বিশ্বাসে গৌরবান্বিত। ধর্ম ও ধার্মিকতায় মহিমান্বিত। হবে মুক্তমনা। হবে স্বাধীনচেতা। তবে পাগলা হাওয়ায় উড়ে যাওয়া বেচারি নয়। বাতিলের সয়লাবে ভেসে যাওয়া খড়কুটো নয়। ঈমান ও হেদায়েতের বাতায়নে দেখা শার্দূলী। হাজার হাঁক-ডাক-হৈ-হুল্লোড়ে, সহস্র শোরগোল কোলাহলে—সুস্থির, সুবিবেচক, সজ্ঞান, আপন সত্তায় অটল, আপন বিশ্বাসে অবিচল। মাধুরী তার ঈমান। মূলধন তার লজ্জা ও সৎ চরিত্র। হিজাব ও পর্দায় পবিত্র। নেকাব ও জিলবাবে অপূর্ব, অনুপম।
কবির ভাষায়,
ইনহাই বিতাজিলিকা ওয়াযদাদী শিয়ারা
ইয়া লিলখিজলি মুনতখিবান বিজীহারিহি
মুতাহাযযিয়া বিসুবাল সামায়াত জিহানদান
লা তাখাফু আম্মান ওয়ালা খাওয়ারা
মর্যাদার তাজ মস্তকে ধারণ করে,
আত্মপরিচয় হৃদয়ে লালন করে,
অবগুণ্ঠিত কপালে কপোলে তুমি।
শত্রুর ভয়, দুর্বলতা দূরীভূত;
ব্যর্থ তোমাতে ষড়যন্ত্র, ব্যর্থ তোমাতে তন্ত্র-মন্ত্র।
আমাদের প্রত্যাশা—সে হবে স্বামীর অনুগতা প্রেমময়ী। হবে বিশ্বস্ত জীবনসঙ্গিনী। সুখে দুঃখে পাশে থাকে। বিপদে আপদে সাথে থাকে। ভাবে ভাবায় আনে অন্তরঙ্গতা। জীবনসাথীর হৃদয়ভূমিতে বপন করে তাকওয়ার বীজ। জীবনে হয় তার সুখের ঠিকানা। কৃতজ্ঞ, কৃতার্থ। অমায়িক, সংযমী। নিরবচ্ছিন্ন কোনো চাওয়া পাওয়া নেই। আছে স্বামীর সুখ ও সেবার প্রবল বাসনা। দাম্পত্যের উদ্যানে একটি ছায়াদার ফুলদার তরুর মতো। সুশীতল, সবুজ, প্রাণবন্ত। পত্রপুষ্পে আহ্লাদিত। যার ছায়ায় স্বামী উৎসাহ পায়। চলার প্রেরণা পায়। পায় সুখময় গতিশীল জীবনের সন্ধান। ঘুমানোর সময় চোখ বুজে নিশ্চিন্তে, নির্বিঘ্নে।
সবশেষে আমরা মুসলিম নারীকে কামনা করি একজন কর্মনিষ্ঠ দায়িয়া হিসেবে, যিনি কাজ করবেন আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। যদি শিক্ষিত হন, তা হলে শিক্ষার্থীদের হৃদয়ভূমিতে ঈমান ও আকীদার চাষবাদ করুন। বিদ্যালয়ে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ অব্যাহত রাখুন। সত্যের আওয়াজ তুলুন। যত বাধাই আসুক। যত বিপত্তিই ঘটুক। কল্যাণের বারিধারা প্রবাহিত করুন যেখানেই থাকুন। চেতনা জাগ্রত করুন নারী সমাজে। তাওহীদের কথা বলুন। রিসালাতের কথা বলুন। আখেরাতের কথা বলুন। জান্নাতের সুসংবাদ দিন। জাহান্নামের ভয় দেখান। নতুন প্রজন্মকে রক্ষা করুন ইসলাম ও মুসলিমবিদ্বেষী সকল অপশক্তির থেকে।
আমাদের প্রত্যাশা—এমন একজন মুসলিম নারী, যিনি চারপাশে ছড়িয়ে যাওয়া সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সর্ব বিষয়ে সচেতন। যিনি জীবন ও জগতের বিভিন্ন বিষয়ে দৃষ্টি প্রসারিত করতে পারেন। নানামুখী সমস্যা, উৎপত্তি, উত্তরণ উপলব্ধি করতে পারেন। প্রয়োজনীয় ধর্মীয় এবং সাধারণ উভয়বিধ জ্ঞান ও যোগ্যতায় যিনি পারদর্শিনী। যিনি মুসলিম সমাজগঠনে একটি কার্যকর উপাদান হতে, সারা পৃথিবীর সকল ধর্ম, সকল জাতির নারীদের সাথে প্রতিযোগিতা করতে—সদা প্রস্তুত। যিনি বিশ্বে যত নারী সংস্থা ও নারী-আন্দোলন গড়ে উঠেছে ধর্ম, চরিত্র ও মূল্যবোধকে ধ্বংস করার জন্য, সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে আন্তর্জাতিক নারী-আন্দোলনকে ইসলামের দিকে পরিচালিত করার প্রত্যাশী। কেননা, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক সর্ব বিষয়ের সুন্দরতম সমাধান দেয় ইসলামই। ইসলামই মানবতাকে রক্ষা করতে পারে মহাপতনের হাত থেকে। ফিরিয়ে আনতে পারে পতনোন্মুখ মানবতাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে। মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন,
وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْتَضَىٰ لَهُمْ وَلَيُبَدِّلَنَّهُم مِّن بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنًا يَعْبُدُونَنِي لَا يُشْرِكُونَ بِي شَيْئًا ۚ وَمَن كَفَرَ بَعْدَ ذَٰلِكَ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
অর্থ : আল্লাহ্ প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন তোমাদের মধ্য থেকে যারা ঈমান এনেছে এবং আমলে সালেহ্ করেছে তাদেরকে, তিনি তাদেরকে জমিনে দান করবেন খেলাফত যেভাবে খেলাফত দান করেছিলেন তোমাদের পূর্ববর্তীদের। এবং প্রতিষ্ঠিত করে দেবেন তাদের জন্য তাঁর মনোনীত ধর্মকে। আর ভীতির পরিবর্তে তাদের দান করবেন স্বস্তি। শর্ত হলো, তারা আমার ইবাদত করবে। আমার সাথে কোনো কিছুকে শরীক করবে না। কিন্তু এরপরও যারা কুফরি করবে, তারাই পাপাচারী। —সূরা নূর : ৫৫
কবি বলেন,
তুখীঝুয যালামু হাইয়্যান ওয়া ইয়াযিলু
ফজরুল মাদা মিন উফুক্বি ত্বইবাতিন ইউরসিলুল আনওয়ারা
কেটে যায় কালো ভোরের আভাসে,
দিগন্তে হাসে উষার আলো...
সমাপ্ত
টিকাঃ
১. সহীহ মুসলিম।
১. আল ইসরাহ্ কী তায়হীদিস সাহাবাহ্ : ৯৭।
২. ফুতূহুল শাম লিল ওয়াকিদী : ১/৭০-৭১।