📄 স্ত্রীর সাথে পরামর্শ
খুব ভালোবাসাই নয়, স্ত্রীর মতামতকেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন। সুলহে হুদায়বিয়া কাফেরদের সব দাবি-দাওয়া মেনে নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে বছর উমরা না করেই মক্কা থেকে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিলেন। সাহাবা কেরামকে কথাটি হৃদয়ে স্থান না পাওয়ায় নির্দেশ দিয়ে বললেন,
'তোমরা নহর করে নাও, তারপর হলক করে ফেলো।'
তিনি প্রায় তিনবার কথাটি বললেন। কিন্তু সাহাবা কেরাম তখন মনঃকষ্টে আচ্ছন্ন। সবাই স্তব্ধ, বাকরুদ্ধ। কারো কোনো সাড়া না পেয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছুটা স্তম্ভিত হয়ে পড়লেন। তখন উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মে সালামা রাযি.-এর ঘরে গেলেন এবং দুঃখের সাথে মুসলমানদের অবস্থা তুলে ধরলেন। হযরত উম্মে সালামা রাযি. বললেন,
হে আল্লাহর রাসূল, আপনি বিচলিত হবেন না; তারা আসলে এখনো মেনে নিতে পারছেন না যে, আপনি সত্যি সত্যিই তাদের এমনটি করার নির্দেশ দিয়েছেন। আপনি বরং যান এবং কারও সাথে কোনো কথা না বলে আপনার উট নহর করুন, এরপর হলককারীকে ডেকে হলক করিয়ে নিন। দেখবেন, তারা আপনাকে অনুসরণ করবে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বের হলেন এবং কারো সাথে কোনো কথা না বলে নিজের উট নহর করলেন এবং হলককারীকে ডেকে হলক করিয়ে নিলেন। সাহাবা কেরাম যখন দেখলেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সত্যিই এমনটি করলেন, তখন তারাও উঠে যার যার উট নহর করলেন এবং একে অপরকে হলক করিয়ে দিলেন।৩
টিকাঃ
৩. সহীহ বুখারী।
📄 এখনো কি সম্ভব?
অনেক ভাবতে পারেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও ওহীপ্রাপ্ত ছিলেন। জীবনের সর্বক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখা তার পক্ষে সম্ভব ছিল। কিন্তু বর্তমান যুগে আমাদের মতো মানুষের পক্ষে এসব কী করে সম্ভব? জীবনের এত সংক্ষিপ্ত পরিসরে কখন স্ত্রী-সন্তান, পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়স্বজনের হক আদায় করব, আর কখন অন্যান্য কাজগুলো করব? আমাদের মতো সাধারণ মানুষের পক্ষে একই সাথে জীবনের বিভিন্নমুখী দায়িত্বগুলো সমানভাবে পালন করা এখনো কি সম্ভব?
📄 ড. সাইফ আল বান্নার বক্তব্য
যারা এমন একটা অজুহাতকে বড় করে দেখাতে চান, তাদের জন্য অধ্যাপক সাইফ আল বান্নার বক্তব্যটি তুলে ধরা সমীচীন মনে করছি,
لَقَدْ كَانَ وَالِدِي يَحْرِصُ عَلَى تَطْبِيقِ السُّنَنِ تَطْبِيقًا مُتَنَاهِيًا وَعِنْدَمَا تَزَوَّجَ حَرَصَ أَنْ يَعْرِفَ أَقَارِبَ زَوْجَتِهِ فَرْدًا فَرْدًا وَأَحْصَاهُمْ عَدًّا وَزَارَهُمْ جَمِيعًا رَغْمَ بُعْدِ أَمَاكِنِهِمْ وَكَانَ رَحِمَهُ اللَّهُ يُنَاجِي وَالِدَتِي بِأَنَّهُ الْيَوْمَ قَدْ زَارَ فُلَانًا لِأَنَّهُ لَمْ يَبْقَ لِصِلَةِ الْقَرَابَةِ كَذَلِكَ كَانَ دَقِيقًا فِي رِعَايَةِ لِشُؤُونِ بَيْتِهِ رِعَايَةً كَامِلَةً غَيْرَ مَنْقُوصَةٍ وَكَانَ يَكْتُبُ بِنَفْسِهِ بِنَفْسِهِ الْمُتَطَلَّبَاتِ وَكُلَّ أَنْوَاعِ الْمَوَادِ الاسْتِهْلاكِيَّةِ الَّتِي يَحْتَاجُهَا الْمَنْزِلُ شَهْرِيًّا وَيَدْفَعُهَا إِلَى أَحَدٍ أَصْحَابِ الْبَقَالَةِ لِيُوَزِّعَهَا كُلَّ شَهْرٍ
وَكَانَ رَحِمَهُ اللّٰهُ يَشْمُرُ فِيْ بَعْثِ الْبَعَاثِ الْمُلِقَاةِ عَلَى رُوحِيَّةِ فُعُولٍ عَلَى أَنْ يَكُوْنَ جُيُوْارَهَا دَائِمًا خَادِمَةً مُسَاعِدَةً فِيْ اَعْمَالِ الْمَنْزِلِ
অর্থ : আমার পিতা হাসান আল বান্না রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহকে খুবই মজবুতভাবে আকড়ে ধরেছিলেন। তিনি বিবাহের সময় আমার মাতার যত আত্মীয়স্বজন আছে, সকলের সাথে আলাদা আলাদাভাবে পরিচিত হয়েছিলেন এবং তাদের প্রত্যেকের হিসাব মাথায় রেখেছিলেন। মনে হতো যেন নিয়ম করে তিনি তাদের সাথে দেখা করতেন এবং খোঁজ খবর নিতেন। স্থানিক দূরত্বকে কিছু মনেই করতেন না। তিনি হঠাৎ আমার মাতাকে চমকে দিয়ে বলতেন, আজ অমুকের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। মাতা বলতেন, কেন? তিনি বলতেন, সে তোমার আত্মীয় না? তিনি পরিবারের বিষয়ে খুবই সতর্ক ছিলেন। পরিবারের প্রয়োজনের ব্যাপারেও পূর্ণ মনোযোগী ছিলেন। কখন কী লাগবে না-লাগবে, কোনটা কত দিন চলবে না-চলবে, সবই হিসাব থাকত তার। তিনি নিজ হাতে মাসিক বাজার-সদাইয়ের তালিকা তৈরি করে দোকানদারের দিয়ে দিতেন। তিনি এ ব্যাপারে এতটাই গুরুত্ব দিতেন যে, দোকানীরা সবই ঠিকমতো পৌঁছে দিত, কখনো বিলম্ব করার সুযোগ পেত না। তিনি আমার মাতার কষ্ট গভীরভাবে উপলব্ধি করতেন, তাই নিজেও তাকে সহযোগিতা করতেন। সাথে সাথে প্রায় সবসময়ই ঘরের কাজে মাতাকে সহযোগিতা করার জন্য কোনো না কোনো সেবিকা রাখার চেষ্টা করতেন।
📄 ড. সানা আল বান্নার বক্তব্য
এ হলো একজন পিতার প্রতি পুত্রের মূল্যায়ন। এবার দেখা যাক, মেয়ে কী বলেন। হ্যাঁ, তাঁরই বিদুষী কন্যা ডক্টর সানা আল বান্না বলেন,
لَقَدْ كَانَ رَحِمَهُ اللّٰهُ هَادِيَ الطَّبْعِ وَاسِعَ الصَّدْرِ هَيِّنًا لَيِّنًا لَمْ أَذْكُرْ أَنَّ صَوْتَهُ اِرْتَفَعَ عَلَى أَحَدٍ فِي الْبَيْتِ لِأَيِّ سَبَبٍ مِنَ الْأَسْبَابِ ... كَانَ يُعَاوِنُ وَالِدَتِيْ فِيْ بَعْضِ أَعْبَاءِ الْبَيْتِ رَغْمَ اِنْشِغَالِهِ فِيْ أَعْبَاءِ الدَّعْوَةِ لَقَدْ كَانَ مُلِمًا بِكُلِّ صَغِيْرَةٍ وَكَبِيْرَةٍ فِي الْبَيْتِ فَكَانَ يَعْرِفُ كُلَّ شَيْءٍ بِخَصَّ الْبَيْتِ لِدَرَجَةِ أَنَّهُ كَانَ يَعْرِفُ مَوْعِدَ تَخْزِيْنِ الْأَشْيَاءِ كَالْبَصَلِ وَالثَّوْمِ ...
অর্থ : আমার পিতা হাসান আল বান্না রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মতো সদালাপী ও কোমলহৃদয় ছিলেন। তিনি কখনো কোনো কারণে পরিবারের কারও সাথে গলা উঁচু করে কথা বলেছেন আমার মনে পড়ে না। দাওয়াতি কাজে এত ব্যস্ততা সত্ত্বেও তিনি আমার মাতাকে খুবই সহযোগিতা করতেন। ঘরের ছোট বড় সব কাজেই হাত দিতেন। একদম যেগুলো ঘরের কাজ সেগুলোতেও পটু ছিলেন। এমনকি রান্নাঘরের জিনিসপাতি—যেমন: পেঁয়াজ, রসুন, তেল, ঘি—কোথায় কী, তাও তার জানা থাকত।
ড. সানা আরও বলেন,
لَقَدْ كَانَ عَطُوْفًا رَحِيْمًا بِنَا كُنَّا لَا نُحِسُّ فِيْهِ الْغِلَظَةَ أَبَدًا بَلْ كَانَ يَغْمُرُنَا بِالْمَوَدَّةِ وَالْعَطَفِ وَكَانَ يَدْخُلُ الْبَيْتِ مُتَأَخِّرًا فِي اللَّيْلِ وَيَكِلُّ لِمْدَوْعٍ حَتَّى لَا يُزْعِجَ أَحَدًا مِنَ النَّائِمِيْنَ وَكَانَ يَدْخُلُ فَيَطْمَئِنُّ عَلَى غِطَاءِ كُلِّ الْأَبْنَاءِ
অর্থ : তিনি আমাদের প্রতি খুবই স্নেহশীল ছিলেন। তার মাঝে কখনোই রূঢ়তা অনুভব করিনি। তার ভালোবাসা সবসময়ই আমাদের ঘিরে থাকত। মাঝে মধ্যে রাতে ঘরে ফিরতে বিলম্ব হতো তাঁর। কিন্তু এত সতর্কভাবে আসতেন যে, ঘুমন্ত কারও ঘুমে ব্যাঘাত ঘটত না। তিনি ঘরে ঢুকে প্রথমে ছেলেমেয়েদের ঘরে যেতেন এবং তাদের গায়ে কম্বল-কাঁথা ঠিকমতো আছে কি না দেখে নিতেন।১
এ হলো ইমাম হাসান আল বান্নার জীবনগাথা। যিনি কোনো অতিপ্রাকৃত মানুষ ছিলেন না। তিনি ওহির দ্বার বন্ধ হওয়ার এক দিন দু দিন নয়, দেড় হাজার বছর পর পৃথিবীতে এসেছিলেন। যার দ্বীন দাওয়াতের ব্যাপকতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, তাকে বিশ শতকের দাওয়াতী মুজাদ্দিদ ও সংস্কারক মনে করা হয়। নিশ্চয় বুঝতে পারছেন, এমন একজন মানুষের কর্মব্যস্ততা কতটা ব্যাপক হতে পারে। তারপরও দেখলেন তো, তিনি পরিবারের প্রতি কতটা দায়িত্বশীল ছিলেন।
আমার মুসলিম ভাইয়েরা, ইমাম হাসান আল বান্নাকে জানুন, নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ খুঁজে পাবেন তাঁর মাঝে। বর্তমান প্রেক্ষাপটেও যে নববী আদর্শে উজ্জীবিত হওয়া যায়, তার বাস্তব প্রমাণ এরকম অসংখ্য মানুষ দেখিয়ে গেছেন, দেখিয়ে যাচ্ছেন। তাদেরকে জানুন, আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করুন।
আরও ভাববার বিষয়, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানব। তিনি ছিলেন আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রত্যাদেশপ্রাপ্ত। তিনিই যখন নারীর মর্যাদা ও অবস্থানকে উচ্চে তুলে ধরেছেন, তাদের প্রতি সদাচারের নির্দেশ দিয়েছেন, মুসলমানদের বিষয়ে স্ত্রীর সাথেও পরামর্শ করেছেন; তখন তাঁর অনুসারী হলে মুসলিম পুরুষদের উচিত নারীর যথার্থ মূল্যায়ন করা এবং তাদের প্রাপ্য অধিকারটুকু প্রদান করা। তিক্ত হলেও সত্য, এ ব্যাপারে জাতিগতভাবে আমাদের অনেক শিথিলতা হয়ে গেছে। এখনই সময় সঠিক পথে ফিরে আসার।
টিকাঃ
১. আল জাওয়াহেরুল মুসলিমাও ওয়া দিনাউল উসরাতিস ফুরকানিয়্যাহ : ২৯৩-২৯৭।