📄 দায়িত্বহীনতার পরিণতি
মনে রাখবেন, আপনার এই ঘোর একদিন কেটে যাবে। আজকের উদাসীনতার কুফল আপনাকে আষ্টেপৃষ্ঠে টেনে নেবে। একদিন আপনার সন্তানেরা বড় হবে। তারা সবাই যার যার জীবনের পথ ও মত, মতি ও গতি নির্ধারণ করে নেবে। সেখানে আপনার কোনো বিচরণ থাকবে না। আপনার কোনো বক্তব্যও থাকবে না। পিতা কী, এমনকি সেটুকুও হয়তো তারা হারিয়ে ফেলবে।
আর আপনার স্ত্রী? এভাবে একা একা জীবনের পথটুকু চলতে সে ক্লান্ত-শ্রান্ত; মন-প্রাণে বার্ধক্যের ছায়া। হাজার অভিযোগ, অনুযোগ তার মনের কোণে চাপা পড়ছে। যা একটু একটু করে এক দেওয়াল তৈরি করছে আপনাদের মধ্যে। সে তার জীবনের দায়গুলো পালন করে গেছে, আর আপনাকে ছেড়ে দিয়েছে আপনার মতো করে।
যদি আপনার ভাগ্য থাকে, একদিন আপনার ঘোর কেটে যাবে। কেননা, অথবা ততদিন আপনার জীবনের দায় ও স্বপ্ন পূরণ করে ফেলবেন। অথবা সর্বস্ব আপনার প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে। আপনি চাইবেন, নতুন করে পরিবার জীবনে ফিরিয়ে আনতে। স্ত্রী, ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনি সবাইকে নিয়ে বাকি জীবনটা হাসি আনন্দে কাটিয়ে দিতে। কিন্তু আপনি চমকে যাবেন। হঠাৎ লক্ষ্য করবেন, কী একটা দুর্বোধ্যতা, কী একটা অপরিচয়বোধ আপনাকে মর্মাহত করেছে। আপনি যেভাবে তাদের পেতে চাইছেন, সেভাবে পাচ্ছেন না।
যদি আপনার বোধশক্তি থাকে, তা হলে হয়তো নিজের প্রতিই আক্ষেপ করবেন। অন্যথায় পুরো দোষটা চাপাবেন ওই অবলা সরল স্ত্রীর ঘাড়ে। অনেক মানুষই এমন করেন। সারা জীবনের সব দায় স্ত্রীর ঘাড়ে চাপানো তাদের একটা বাতিকে পরিণত হয়। অনেক মানুষ তখনো মনে করেন না যে, এক্ষেত্রে মূল ত্রুটি তারই ছিল। তার মাথায় থাকে না যে, তার কারণেই পরিবারের আজ এই দশা। তিনি ভুলে যান, সন্তানকে তিনি কতটুকু সময় দিয়েছেন, যা কারণে অতীতে তার প্রতি গভীর কোনো অনুভূতি দাগ কাটবে? কিংবা স্ত্রীকেই বা কতটুকু সময় দিয়েছেন, যে কারণে তার প্রতি স্ত্রীর সেই আবেগ অনুভূতি অক্ষত থাকবে?
অনেক পুরুষই পরিবারের প্রতি নিজের প্রতিদিনের অবজ্ঞার কথা, অবহেলার কথা, দায়িত্বহীনতার কথা ভুলে যান। হঠাৎ করেই তিনি ‘পারিবারিক’ হয়ে ওঠেন। জীবনের গভীর বোধ তাকে মর্মাহত করে। যতটা না সন্তানদের প্রতি অভিযোগ থাকে, মূল অভিযোগটা গিয়ে পড়ে স্ত্রীর ওপর। দীর্ঘ এক আঃ ধ্বনি উচ্চারণ করে বলে ওঠেন, 'স্বামীর প্রতি ধৈর্যশীলা, একনিষ্ঠা, কৃতজ্ঞ-কৃতার্থ আদর্শ স্ত্রী কই?'
অনেক সময় বলে ওঠেন, আমি কি পরিবারের জন্য কিছু করিনি? স্ত্রী-সন্তানের জন্যই তো মাথার ঘাম পায়ে ফেলেছি। যেন সমাজে আমার একটা মূল্য থাকে, যেন আমার স্ত্রী-সন্তানও সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে সেজন্যই তো এত কিছু করা।
ভাই আমার, আপনি অবশ্যই সত্য বলছেন, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, আপনি আপনার স্ত্রীর আবেগ অনুভূতির যথার্থ মূল্যায়ন করেছেন। তার চাওয়া পাওয়া আপনার কাছে কোনো অর্থবহ বিষয় ছিল। হতে পারে, আপনার স্ত্রী-সন্তান আপনার অর্জনে উপার্জনে গর্বিত, সমৃদ্ধ। এজন্য আপনি সাধুবাদও পাবেন। কিন্তু পরিবারের প্রতি আপনার আরও কিছু দায়িত্ব ছিল। আপনার প্রতি তাদের এই যে অনুভূতিশূন্যতা, এর কারণটা কিন্তু আপনিই।
লক্ষ্য করুন, আপনি আপনার লক্ষ্য অর্জনে বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন। তাই জীবনের ভারসাম্যবোধটুকু হারিয়ে ফেলেছিলেন। যার প্রতি যেই পরিমাণ গুরুত্বটা দেওয়া দরকার, সেটা রক্ষা করেননি বা করার প্রয়োজনও বোধ করেননি। আপনার ব্যর্থতা এখানেই। হতে পারে, এই ব্যর্থতার গ্লানি কখনোই আপনার সঙ্গ ছাড়বে না।
📄 প্রকৃত সফল পুরুষ
প্রকৃত সফল পুরুষ যিনি সবকিছুকে যথার্থ মূল্যায়ন করতে পারেন। সবকিছুর সাথে পিতৃত্বের অধিকারটুকুও পুরোপুরি দিতে পারেন। পিতা হিসেবে সন্তানের প্রতি প্রকৃত দায়িত্বটিও পালন করতে পারেন। যিনি জীবনের কোনো একটি দিকে ঝুঁকে গিয়ে বাকি সবকিছুকে জলাঞ্জলি দেন, তিনি আর যাই হন, সফল পুরুষ নন।
এমন কর্মপুরুষত্বে কী লাভ, যা বাণিজ্য পৃথিবীর দিগদিগন্তে ছড়িয়ে পড়েছে, যিনি অনেক অনেক লাভবানও হয়েছেন; এমনকি, সমাজে তার উল্লেখযোগ্য অবস্থানও তৈরি হয়েছে; কিন্তু নিজের পরিবারের সাথে তার সম্পর্ক নেই। তার মনে কোনো ভালোবাসা আছে কি না, তার স্ত্রী তা উপলব্ধিও করেন না। ছেলেমেয়ের অবস্থা এই যে, তাদের পিতাকে তারা চেনে; কিন্তু পিতার ভালোবাসা কী জিনিস, কেমন জিনিস, সেটা তারা বোঝে না।
এমন বাণীগর্বী বাগ্মীর সার্থকতা কীসে, যিনি হৃদয়গ্রাহী বক্তব্য হাজারও মুদ্রা দান করতে পেরেছেন, শত শত বিক্ষিপ্ত হৃদয়কে সমবেত করতে পেরেছেন; কিন্তু নিজের স্ত্রীকে, সন্তানকে নিজের পাশে জড়ো করতে পারেননি। নিজের দাওয়াতের আমলে শরিক করেননি? দাওয়াত আমলে, রিসালাতের আমানতে, ইলমের ইশারাতে তার সালেহ-কাবেল ওয়ারিশ হতে পারত।
এমন দায়ী ও সংস্কারক হয়ে কী লাভ, যিনি সমাজ-সংস্কার করতে পারেন, অন্যের আত্মশুদ্ধি ও ব্যক্তিগঠনে প্রেরণা হতে পারেন; অথচ পরিবার-পরিজনের কথাই ভুলে যান?
স্ত্রী-সন্তানের খোঁজখবর নেবে কে? তাদের সংশোধন করবে কে? তাদের ব্যক্তিগঠনের প্রয়োজন নেই? তাদের প্রতিও খেয়াল রাখা যায় না? তাদের স্বপ্ন, আশা, প্রত্যাশার কথা ভাবা যায় না? তাদের ভবিষ্যৎ কী হবে, কেমন হবে, কীভাবে হবে, সেটাও কি যোগ্য পিতার উপস্থিতিতেও নিজেদের ঠিক করতে হবে? আচ্ছা, পিতার একটু স্নেহ ভালোবাসা পাওয়া কি কোনো অধিকার নয়? যিনি অন্যের সংশোধনে এত পারঙ্গম, তার নিজের সংশোধন করবেন কবে?