📄 ৭. সুখে দুখে পাশে থাকে
মুসলিম নারী সুখে দুখে, হাসি কান্নায়, বিপদে আপদে, সচ্ছলতায় অসচ্ছলতায় সর্বাবস্থায় জীবনসঙ্গীর পাশে থাকে, সাথে থাকে। তাকে সাহস যোগায়। প্রেরণা যোগায়। উম্মুল মুমিনিন হযরত খাদিজা রাযি.১ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা কে না জানে? যখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওহীপ্রাপ্ত হয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত অবস্থায় ঘরে ফিরলেন, তখন হযরত খাদিজা রাযি. কত আবেগপূর্ণ ভাষায় রাসুলের হৃদয়ে সান্ত্বনার শীতল প্রলেপ বুলিয়ে দিয়েছিলেন,
كَلَّا وَاللَّهِ مَا يُخْزِيكَ اللَّهُ أَبَدًا إِنَّكَ لَتَصِلُ الرَّحِمَ، وَتَحْمِلُ الْكَلَّ، وَتَكْسِبُ الْمَعْدُومَ وَتَقْرِي الضَّيْفَ وَتُعِينُ عَلَى نَوَائِبِ الْحَقِّ
অর্থ : কখনোই নয়। কিছুতেই আল্লাহ আপনাকে অপদস্থ করতে পারেন না। আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে চলেন। অর্থবের ভারণপোষণ করেন। নিঃস্বের নিঃস্বতা দূর করেন। অতিথিকে সম্মান করেন। দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ান।২
এভাবে একের পর এক সান্ত্বনার বাণী উচ্চারণ করে করে নিজের সহায় সম্পদ সবকিছু অকাতরে বিলিয়ে দিয়ে হযরত খাদিজা রাযি. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সহায়তা করেছেন। সুখে দুখে তাঁর সাথে থেকেছেন। বিপদে আপদে পাশে থেকেছেন। হতাশা দূর করেছেন। হৃদয়ে সাহস যুগিয়েছেন。
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই প্রতিকূলতার মুখেও দাওয়াতী কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পেরেছিলেন এরকম একজন বিশ্বস্ত, ত্যাগী জীবনসঙ্গিনীর কল্যাণে। মুসলিম নারীর আদর্শ তো ইনি। ইনিই তো প্রেরণা, সুখে দুখে থাকার। যুগে যুগে একসাথ পথে চলার。
মুসলিম নারী তার পুরুষের জীবনে এমন একজন সঙ্গিনী হয়ে আবির্ভূত হবে যে, তাকে পেয়ে সে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা পাবে। জীবনের লক্ষ্য উদ্দেশ্য সার্থকতা পাবে। একটি উদ্দেশ্যে সফল হবে। তো আরেকটি উদ্দেশ্যে ধাবিত হবে। এভাবে অর্জন আর প্রাপ্তিতে ভরে উঠবে জীবন। জীবন হবে অর্থবহ সার্থক。
মুসলিম-ইতিহাসে এমন নারী একটি দুটি নয়, অসংখ্য। যাদের ছোঁয়ায় জীবনের দুর্গম পথ হয়েছে সুগম। কণ্টকাকীর্ণ পথ মনে হয়েছে কুসুমবাগী। জাতি পেয়েছে সত্যিকারের মানব মানবী। সফল মানব মানবী। যারা উন্নতির উচ্চ শিখরে। উচ্চ, অতি উচ্চ। যাদের চলা লেগে জীবন হয়েছে গতিশীল। পৃথিবী পেয়েছে মহামানব। তাই তো বলা হয়,
وَرَاءَ كُلِّ رَجُلٍ عَظِيمٍ اِمْرَأَةٌ
অর্থ : প্রত্যেক মহামানবের পেছনে আছেন কোনো না কোনো নারী。
শায়খ মুস্তফা সাদিক রাফিযী বড় সত্য কথা বলেছেন,
إِنَّ الْمَرْأَةَ الْعَظِيمَةَ هِيَ الْمَرْأَةُ الَّتِي تَسْتَطِيعُ أَنْ تَجْعَلَ مِنْ الرَّجُلِ شَخْصِيَّةً أَعْظَمَ مِنْهَا
অর্থ : সত্যিকারের মহামানবী তিনি, যিনি একজন পুরুষের মধ্য থেকে তার শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্বটি আবিষ্কার করতে পেরেছেন。
টিকাঃ
১. হযরত খাদিজা রাযি. সম্পর্কে জানতে মাকতুবাতুন নুনদুন উনলুনদুন, রাহনুমা প্রকাশনী হতে প্রকাশিত 'গড়ে ওঠো মহীয়সী খাদিজা রাযি.' বইটি পড়া যেতে পারে।
২. সহীহ বুখারী।
📄 ৮. কৃতজ্ঞতা ও বিশ্বস্ততা
একজন কৃতজ্ঞ, বিশ্বস্ত নারী প্রতিটি মুসলিম পুরুষের লালিত স্বপ্ন। কোনো মুসলিম পুরুষ কখনোই চান না যে, তিনি চোখ খুলবেন তার স্ত্রী অন্য কারও বুকে। প্রতিটি মুসলিম পুরুষই কামনা করেন, সুখে দুখে সদাসর্বদা তার জীবনসঙ্গিনী আমৃত্যু তার প্রতি বিশ্বস্ত থাকুক। খেয়ে থাকুক, না খেয়ে থাকুক; তারই থাকুক। তার যা আছে, তা নিয়েই গর্ব করুক। তার যা নেই, তাতেও ধৈর্য ধরুক। এমনকি, সে কামনা করে, তার মৃত্যুর পরও তার স্ত্রী তার দাম্পত্যজীবনের স্মৃতিকে বুকে লালন করুক কৃতজ্ঞতার সাথে, কৃতার্থতার সাথে。
একক্ষেত্রে আমাদের জন্য আদর্শ রেখে গেছেন ইসলামের তৃতীয় খলিফা হযরত উসমান রাযি.-এর জীবনসঙ্গিনী নায়েলা। শত্রুরা যখন হযরত উসমান রাযি.কে হত্যা করার জন্য হামলা চালাল তখন এই নায়েলা নিজের প্রাণের মায়া ত্যাগ করে জীবনসঙ্গীকে বাঁচাতে ছুটে গেলেন। স্বামীর ওপর আঘাতকে প্রতিহত করতে হাত দিয়ে চেপে ধরলেন তরবারি। কেটে পড়ে গেল হাতের আঙুলগুলো。
শহীদ জীবনসঙ্গীর মরদেহ নিয়ে শোকে কাঠ হয়ে রইলেন তিনি। গভীর রজনী। দাঙ্গা-হাঙ্গামার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হলো দাফনকার্য。
প্রিয়তম জীবনসঙ্গীর স্মৃতিরক্ষার ধারণ করে থেকে গেলেন নায়েলা। কত নামী দামী লোক বিবাহের প্রস্তাব পাঠাল। মুআবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ানও প্রস্তাব পাঠালেন। তিনি যাকে পাঠিয়েছিলেন, নায়েলা তাকে বলেন, ‘কীসে মুআবিয়াকে আমার প্রতি আকৃষ্ট করেছে?’ লোকটি বললেন, ‘আপনার যা সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক ছিল তাঁর সামনের পাটির দাঁতগুলো। তিনি সাথে সাথে ভেতরে গেলেন এবং সজোরে আঘাত করে দাঁতগুলো উপড়ে ফেললেন। এরপর লোকটি হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘যাও, আমি উসমানের স্ত্রী; আর যেন কেউ আমার প্রতি আগ্রহবোধ না করে।’১
টিকাঃ
১. আল আলাম লিজিরিকলী : ৭/৩৮৩।