📘 ফিরে এসো নীড়ে 📄 ৬. সবর ও তাওয়াক্কুল

📄 ৬. সবর ও তাওয়াক্কুল


আল্লাহ্ জন্য ধৈর্য ধারণ করা এবং সুখে দুঃখে সর্বাবস্থায় আল্লাহ্র ওপর ভরসা করা মুসলিম নারীর বড় গুণ। স্বামী যদি অভাবী হয় তা হলে সে ধৈর্যধারণ করবে। তার ধৈর্যের বদৌলতে আল্লাহ্ একসময় অবস্থার পরিবর্তন ঘটাবেন। সে জানে, আল্লাহ্ কখনোই তার মুমিন বান্দাদের ধ্বংস করেন না। সচ্ছলতা, অসচ্ছলতা আল্লাহ্র পক্ষ থেকে আসে। এগুলো সাময়িক। সম্পদ সকালে আসে, সন্ধ্যায় যায়। এটা একটা পরীক্ষা। ধৈর্যের পরীক্ষা। সে আল্লাহ্র ওপর কতটা ভরসা করতে পারে তার পরীক্ষা। সুতরাং মুসলিম নারী সেই পরীক্ষায় অধঃক্ষেপণ করে আনন্দে, আত্মহে। সে উত্তম ফল পাবে। উত্তম পুরস্কার পাবে। সে হতাশ হবে না। সে জানে, তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

لَوْ أَنَّكُمْ تَتَوَكَّلُونَ عَلَى اللهِ حَقَّ تَوَكَّلِهِ لَرَزَقَكُمْ كَمَا يَرْزُقُ الطَّيْرَ تَغْدُو خِمَاصًا وَتَرُوْحُ بِطَانًا

অর্থ : তোমরা যদি আল্লাহ্র ওপর সত্যিকার ভাবে ভরসা করতে পার, তা হলে তিনি তোমাদের রিজিক দান করবেন যেভাবে একটি পাখিকে রিজিক দান করেন। পাখি খালি পেটে সকালে বের হয়। ভরা পেটে সন্ধ্যায় নীড়ে ফেরে।১

ইমাম বুখারী রাহ্ও হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। হাদীসটি একই অর্থ ধারণ করে। যাতে পায়, হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম স্ত্রী হাজেরা ও পুত্র ইসমাইলকে নিয়ে ফিলিস্তিন থেকে মক্কায় আসেন। মক্কা তখন ধু-ধু মরুভূমি। গাছপালা নেই। লতাপাতা নেই। জনমানবশূন্য। শুধু ধু-হাওয়া, তপ্ত বালু, প্রখর রোদ। পানি নেই। প্রাণী নেই। এমন এক প্রতিকূল পরিবেশে তিনি স্ত্রীসন্তানকে রেখে গেলেন। তাদের সাথে ছিল সামান্য খেজুর ও পানি। ইবরাহিম আলাইহিস সালাম যখন ফিরে যেতে চাইলেন, তখন হাজেরা আলাইহিস সালাম শুধু জানতে চাইলেন, আল্লাহই কি এই নির্দেশ দিয়েছেন? তিনি উত্তর দিলেন, হ্যাঁ। হাজেরা আলাইহিস সালাম বললেন পরম প্রত্যয়ে, তা হলে তিনি আমাদের ধ্বংস করবেন না। হাজেরা আলাইহিস সালাম আপন প্রতিপালকের ওপর কতটা ভরসা রেখেছিলেন! কতটা কঠিন পরীক্ষা তিনি বরণ করে নিয়েছিলেন অপরিসীম বিশ্বাসে! ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ফিলিস্তিনে ফিরে এলেন। বাইতুল মাকদিসে দু হাত তুলে দুআ করলেন,

رَّبَّنَا إِنِّي أَسْكَنْتُ مِن ذُرِّيَّتِي بِوَادٍ غَيْرِ ذِي زَرْعٍ عِندَ بَيْتِكَ الْمُحَرَّمِ رَبَّنَا لِيُقِيمُوا الصَّلَاةَ فَاجْعَلْ أَفْئِدَةً مِّنَ النَّاسِ تَهْوِي إِلَيْهِمْ وَارْزُقْهُم مِّنَ الثَّمَرَاتِ لَعَلَّهُمْ يَشْكُرُونَ

অর্থ : হে আমার প্রতিপালক, তোমার পবিত্র গৃহের কাছে একটি নিষ্ফলা উপত্যকায় আমি আমার বংশধরকে রেখে গেলাম; হে আমার প্রতিপালক, এ আশায় যে, তারা সালাত কায়েম করবে। সুতরাং তুমি তাদের প্রতি মানুষের হৃদয়কে ঝুঁকিয়ে দাও। তাদেরকে দান করো ফলফলাদি থেকে। তারা যেন কৃতজ্ঞ হয়। –সূরা ইবরাহিম : ৩৭

হাজেরা আ. আপন সন্তানকে নিয়ে একাকী নির্জন মরুভূমিতে থেকে গেলেন। অচিরেই পানি ফুরিয়ে গেল। পানির খোঁজে ছুটলেন এদিক থেকে ওদিক। ওদিক থেকে এদিক। সাফা থেকে মারওয়ায়। মারওয়া থেকে সাফায়। অবশেষে আল্লাহ সাহায্য করলেন। পাখির আকৃতিতে ফেরেশতা পাঠালেন। পাখি ডানা দিয়ে মাটি খুঁড়ল। আল্লাহর হুকুমে পানি বের হলো। হাজেরা অঞ্জলি ভরে ভরে শিশু ইসমাইলকে পান করালেন।...

হাজেরার সবর ও তাওয়াক্কুলের প্রতি সম্মানার্থে মহান আল্লাহ জমজম কূপ উৎসারিত করলেন। হারাম শরীফের অতি নিকটে এই কূপ এখনও আছে। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম পানীয়। শেফা হয়। শুধু তাই নয়, তাঁর স্মরণে আল্লাহ হজ্বের গুরুত্বপূর্ণ আমল হিসেবে নির্ধারণ করে দিলেন সাফা-মারওয়ায় সাঈ করার বিধান。

প্রিয় বোন, মনে রেখো, তুমি হাজেরার উত্তরসূরী। ত্যাগ ও বিসর্জনের, ধৈর্য ও তাওয়াক্কুলের অনুপম আদর্শে ভরা তোমার ইতিহাস। তা হলে তুমি কেন এই মহৎ গুণে গুণান্বিত হবে না। হাজেরার সম্মান কি তুমি পেতে পার না? ধৈর্য ও তাওয়াক্কুল তোমাকে শুধু সুখীই করবে না; মহৎও করবে। কিন্তু এই বিশ্বাসও রেখো যে, তুমি পার হয়ে যাবে। অত্যন্ত সুন্দরভাবে। অত্যন্ত সম্মানের সাথে। তোমার আল্লাহ বলে দিয়েছেন,

وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ إِنَّ اللَّهَ بَالِغُ أَمْرِهِ قَدْ جَعَلَ اللَّهُ لِكُلِّ شَيْءٍ قَدْرًا

অর্থ : আর যে আল্লাহকে ভয় করবে, আল্লাহ তার জন্য বের করে দেবেন সমাধানের পথ। তিনি তাকে এমনভাবে রিজিক দান করবেন যে, সে ভাবতেও পারবে না। যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, আল্লাহই তার জন্য যথেষ্ট। নিশ্চয় আল্লাহ নিজের কাজ পূর্ণ করেই নেন। নিশ্চয় তিনি নির্ধারণ করেছেন সবকিছুর একটি নির্দিষ্ট সীমা। –সূরা তালাক : ২-৩

টিকাঃ
১. জামে সগীর।

📘 ফিরে এসো নীড়ে 📄 ৭. সুখে দুখে পাশে থাকে

📄 ৭. সুখে দুখে পাশে থাকে


মুসলিম নারী সুখে দুখে, হাসি কান্নায়, বিপদে আপদে, সচ্ছলতায় অসচ্ছলতায় সর্বাবস্থায় জীবনসঙ্গীর পাশে থাকে, সাথে থাকে। তাকে সাহস যোগায়। প্রেরণা যোগায়। উম্মুল মুমিনিন হযরত খাদিজা রাযি.১ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা কে না জানে? যখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওহীপ্রাপ্ত হয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত অবস্থায় ঘরে ফিরলেন, তখন হযরত খাদিজা রাযি. কত আবেগপূর্ণ ভাষায় রাসুলের হৃদয়ে সান্ত্বনার শীতল প্রলেপ বুলিয়ে দিয়েছিলেন,

كَلَّا وَاللَّهِ مَا يُخْزِيكَ اللَّهُ أَبَدًا إِنَّكَ لَتَصِلُ الرَّحِمَ، وَتَحْمِلُ الْكَلَّ، وَتَكْسِبُ الْمَعْدُومَ وَتَقْرِي الضَّيْفَ وَتُعِينُ عَلَى نَوَائِبِ الْحَقِّ

অর্থ : কখনোই নয়। কিছুতেই আল্লাহ আপনাকে অপদস্থ করতে পারেন না। আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে চলেন। অর্থবের ভারণপোষণ করেন। নিঃস্বের নিঃস্বতা দূর করেন। অতিথিকে সম্মান করেন। দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ান।২

এভাবে একের পর এক সান্ত্বনার বাণী উচ্চারণ করে করে নিজের সহায় সম্পদ সবকিছু অকাতরে বিলিয়ে দিয়ে হযরত খাদিজা রাযি. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সহায়তা করেছেন। সুখে দুখে তাঁর সাথে থেকেছেন। বিপদে আপদে পাশে থেকেছেন। হতাশা দূর করেছেন। হৃদয়ে সাহস যুগিয়েছেন。

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই প্রতিকূলতার মুখেও দাওয়াতী কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পেরেছিলেন এরকম একজন বিশ্বস্ত, ত্যাগী জীবনসঙ্গিনীর কল্যাণে। মুসলিম নারীর আদর্শ তো ইনি। ইনিই তো প্রেরণা, সুখে দুখে থাকার। যুগে যুগে একসাথ পথে চলার。

মুসলিম নারী তার পুরুষের জীবনে এমন একজন সঙ্গিনী হয়ে আবির্ভূত হবে যে, তাকে পেয়ে সে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা পাবে। জীবনের লক্ষ্য উদ্দেশ্য সার্থকতা পাবে। একটি উদ্দেশ্যে সফল হবে। তো আরেকটি উদ্দেশ্যে ধাবিত হবে। এভাবে অর্জন আর প্রাপ্তিতে ভরে উঠবে জীবন। জীবন হবে অর্থবহ সার্থক。

মুসলিম-ইতিহাসে এমন নারী একটি দুটি নয়, অসংখ্য। যাদের ছোঁয়ায় জীবনের দুর্গম পথ হয়েছে সুগম। কণ্টকাকীর্ণ পথ মনে হয়েছে কুসুমবাগী। জাতি পেয়েছে সত্যিকারের মানব মানবী। সফল মানব মানবী। যারা উন্নতির উচ্চ শিখরে। উচ্চ, অতি উচ্চ। যাদের চলা লেগে জীবন হয়েছে গতিশীল। পৃথিবী পেয়েছে মহামানব। তাই তো বলা হয়,

وَرَاءَ كُلِّ رَجُلٍ عَظِيمٍ اِمْرَأَةٌ

অর্থ : প্রত্যেক মহামানবের পেছনে আছেন কোনো না কোনো নারী。

শায়খ মুস্তফা সাদিক রাফিযী বড় সত্য কথা বলেছেন,

إِنَّ الْمَرْأَةَ الْعَظِيمَةَ هِيَ الْمَرْأَةُ الَّتِي تَسْتَطِيعُ أَنْ تَجْعَلَ مِنْ الرَّجُلِ شَخْصِيَّةً أَعْظَمَ مِنْهَا

অর্থ : সত্যিকারের মহামানবী তিনি, যিনি একজন পুরুষের মধ্য থেকে তার শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্বটি আবিষ্কার করতে পেরেছেন。

টিকাঃ
১. হযরত খাদিজা রাযি. সম্পর্কে জানতে মাকতুবাতুন নুনদুন উনলুনদুন, রাহনুমা প্রকাশনী হতে প্রকাশিত 'গড়ে ওঠো মহীয়সী খাদিজা রাযি.' বইটি পড়া যেতে পারে।
২. সহীহ বুখারী।

📘 ফিরে এসো নীড়ে 📄 ৮. কৃতজ্ঞতা ও বিশ্বস্ততা

📄 ৮. কৃতজ্ঞতা ও বিশ্বস্ততা


একজন কৃতজ্ঞ, বিশ্বস্ত নারী প্রতিটি মুসলিম পুরুষের লালিত স্বপ্ন। কোনো মুসলিম পুরুষ কখনোই চান না যে, তিনি চোখ খুলবেন তার স্ত্রী অন্য কারও বুকে। প্রতিটি মুসলিম পুরুষই কামনা করেন, সুখে দুখে সদাসর্বদা তার জীবনসঙ্গিনী আমৃত্যু তার প্রতি বিশ্বস্ত থাকুক। খেয়ে থাকুক, না খেয়ে থাকুক; তারই থাকুক। তার যা আছে, তা নিয়েই গর্ব করুক। তার যা নেই, তাতেও ধৈর্য ধরুক। এমনকি, সে কামনা করে, তার মৃত্যুর পরও তার স্ত্রী তার দাম্পত্যজীবনের স্মৃতিকে বুকে লালন করুক কৃতজ্ঞতার সাথে, কৃতার্থতার সাথে。

একক্ষেত্রে আমাদের জন্য আদর্শ রেখে গেছেন ইসলামের তৃতীয় খলিফা হযরত উসমান রাযি.-এর জীবনসঙ্গিনী নায়েলা। শত্রুরা যখন হযরত উসমান রাযি.কে হত্যা করার জন্য হামলা চালাল তখন এই নায়েলা নিজের প্রাণের মায়া ত্যাগ করে জীবনসঙ্গীকে বাঁচাতে ছুটে গেলেন। স্বামীর ওপর আঘাতকে প্রতিহত করতে হাত দিয়ে চেপে ধরলেন তরবারি। কেটে পড়ে গেল হাতের আঙুলগুলো。

শহীদ জীবনসঙ্গীর মরদেহ নিয়ে শোকে কাঠ হয়ে রইলেন তিনি। গভীর রজনী। দাঙ্গা-হাঙ্গামার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হলো দাফনকার্য。

প্রিয়তম জীবনসঙ্গীর স্মৃতিরক্ষার ধারণ করে থেকে গেলেন নায়েলা। কত নামী দামী লোক বিবাহের প্রস্তাব পাঠাল। মুআবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ানও প্রস্তাব পাঠালেন। তিনি যাকে পাঠিয়েছিলেন, নায়েলা তাকে বলেন, ‘কীসে মুআবিয়াকে আমার প্রতি আকৃষ্ট করেছে?’ লোকটি বললেন, ‘আপনার যা সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক ছিল তাঁর সামনের পাটির দাঁতগুলো। তিনি সাথে সাথে ভেতরে গেলেন এবং সজোরে আঘাত করে দাঁতগুলো উপড়ে ফেললেন। এরপর লোকটি হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘যাও, আমি উসমানের স্ত্রী; আর যেন কেউ আমার প্রতি আগ্রহবোধ না করে।’১

টিকাঃ
১. আল আলাম লিজিরিকলী : ৭/৩৮৩।

ফন্ট সাইজ
15px
17px