📘 ফিরে এসো নীড়ে 📄 ৩. স্বামীর ভালোবাসা অর্জন

📄 ৩. স্বামীর ভালোবাসা অর্জন


স্বামীর ভালোবাসা একটি বড় গুণ। এজন্য একজন বুদ্ধিমতী নারী অনেক কিছু করতে পারেন। ভক্তি-শ্রদ্ধা করা, মন যুগিয়ে চলা, আনন্দ দেওয়া, মিষ্টি করে কথা বলা, সান্ত্বনা দেওয়া ইত্যাদি। স্বামী যখন ঘরে আসেন, তখন তার জন্য দাঁড়িয়ে থাকা, সম্মানমূলক সুন্দরতম বাক্য উচ্চারণ করা, স্বামীর অনুপস্থিতিতে তার প্রশংসা করা, তার ভালোবাসা-মমতাগাঢ় ইত্যাদি বিষয়ে খেয়াল রাখা—এগুলোও স্বামীর প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ। স্বামীর ভালোবাসা অর্জনে এগুলো খুবই কাজে আসে। বরং স্বামীর ভালোবাসা অর্জনের চেষ্টা করাটাই তাকে ভালোবাসার বড় প্রকাশ। স্বামী যদি খুব ছোট কিছুও উপহার দেন, তাতেও অনেক আনন্দ প্রকাশ করা, কৃতজ্ঞতা জানানো স্বামীকে খুবই মুগ্ধ করে। স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা বেড়ে যায়。

স্বামীর ভালোবাসা অর্জনে নারীর পরিচ্ছন্নতা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আল্লাহপ্রদত্ত ফিতরাতেরও লক্ষ্য রাখা উচিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

مِنَ الْفِطْرَةِ حَلْقُ الْعَانَةِ، وَتَقْلِيمُ الْأَظْفَارِ، وَنَتْفُ الْإِبْطِ، وَقَصُّ الشَّارِبِ

অর্থ : তলপেটের লোম ছাঁটা, নখ কাটা, বগলের লোম তোলা, গোঁফ ছাঁটা ফিতরাতের অন্তর্ভুক্ত।১

স্বামী যদি রাগ করেন, তা হলে স্ত্রীর কর্তব্য তার রাগ তাড়ানো। এভাবেই স্বামীর ভালোবাসা অর্জন করা যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِنِسَائِكُمْ مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ؟ الْوَدُودُ، الْوَلُودُ، الْعَوْدُ، الَّتِي إِذَا ظُلِمَتْ قَالَتْ هَذِهِ يَدِي فِي يَدِكَ لَا أَذُوقُ غُمْضًا حَتَّى تَرْضَى

অর্থ : আমি কি তোমাদের জানাবো জান্নাতী স্ত্রীদিগের কথা? প্রেমময়ী, সন্তানপ্রসবিনী; যদি তার প্রতি রাগ করা হয় এবং তার দোষ নাও থাকে, তবু বলে, এই আপনার হাতে হাত রেখে বলছি, আপনার রাগ না ভাঙলে একটি দানাও মুখে দেব না।২

আসলে আমরা যাবতীয়ভাবে স্বামীর ভালোবাসা অর্জনের পথ ও পন্থা ব্যাখ্যা করি না কেন, একজন মা হিসেবে উমামা বিনতে হারেস যেভাবে বুঝিয়েছিলেন, সেভাবে বোঝানো সম্ভব হবে না। তিনি তার মেয়েকে বাসর রাতে স্বামীর কাছে পাঠানোর সময় উপদেশ দিয়েছিলেন,

أَيْ بُنَيَّةُ : إِنَّكِ فَارَقْتِ الْجَوَّ الَّذِيْ مِنْهُ خَرَجْتِ، وَخَلَفْتِ الْعُشَّ الَّذِيْ فِيهِ دَرَجْتِ، وَإِلَىٰ وَكْرٍ لَّمْ تَعْرِفِيهِ، وَقَرِيْنٍ لَّمْ تَأْلَفِيْهِ فَأَصْبَحَ بِمِلْكِهِ رَقِيقًا وَمَمْلُوْكًا، فَكُوْنِيْ لَهُ أَمَةً يَكُنْ لَّكِ عَبْدًا وَشَرِيكًا. يَا بُنَيَّةُ: إِنَّ لِيْ عَنْكِ عَشْرَ خِصَالٍ تَكُوْنُ لَكِ ذُخْرًا وَذِكْرًا: الصُّحْبَةُ بِالْقِنَاعَةِ وَالْمُعَاشَرَةُ بِحُسْنِ الطَّاعَةِ، وَالتَّعَهُّدُ لِمَوْضِعِ أَنْفِهِ، فَلَا تَقَعْ عَيْنُهُ مِنْكِ عَلَىٰ قَبِيْحٍ، وَلَا يَشَمَّ مِنْكِ إِلَّا أَطْيَبَ رِيْحٍ، وَالْكَحْلُ أَحْسَنُ الْحُسْنِ، وَالْمَاءُ أَطْيَبُ الطِّيْبِ الْمَفْقُوْدِ، وَالتَّعَهُّدُ لِوَقْتِ طَعَامِهِ، وَالْهُدُوْءُ عِنْدَ مَنَامِهِ، فَإِنَّ حَرَارَةَ الْجُوْعِ مَلْهَبَةٌ، وَتَنْغِيْصُ النَّوْمِ مُنْفِضَةٌ، وَالْاِحْتِفَاظُ بَيْنَهُ وَمَالِهِ، وَالْإِرْعَاءُ عَلَىٰ نَفْسِهِ وَحَشْمِهِ، فَإِنَّ الِاحْتِفَاظَ بِالْمَالِ حُسْنُ التَّقْدِيرِ وَالْإِرْعَاءَ عَلَى الْعِيَالِ وَالْحَشْمِ حُسْنُ التَّدْبِيرِ، وَلَا تُفْشِيْ لَهُ سِرًّا وَلَا تَعْصِيْ لَهُ أَمْرًا فَإِنَّكِ إِنْ أَفْشَيْتِ سِرَّهُ لَمْ تَأْمَنِيْ غَدْرَهُ، وَإِنْ عَصَيْتِ أَمْرَهُ أَوْغَرْتِ صَدْرَهُ وَاعْلَمِيْ أَنَّكِ لَنْ تَصِلِيْ إِلَىٰ مَا تُحِبِّيْنَ حَتَّىٰ تُؤْثِرِيْ رِضَاهُ عَلَىٰ رِضَاكِ وَهَوَاهُ عَلَىٰ هَوَاكِ...

অর্থ : আমার ময়না, এই উদার আকাশ, এই উন্মুক্ত বাতাস, এই অনুকূল পরিবেশ আজ তোমার অতীত হতে চলেছে। এগুলোকে পেছনে ফেলে তুমি আজ এক অজানা জায়গায় যাচ্ছ। এক অচেনা মানুষের কাছে যাচ্ছ। আজ সে-ই তোমার সব। তুমি তার দাসী হয়ে থাকবে। দেখবে, তাকে জয় করে ফেলেছ, দেখবে, সে তোমার একটা অংশ হয়ে গেছে।

আমার মেয়ে, এই নতুন জীবনের পথে তোমাকে কিছু পাথেয় দিচ্ছি। এগুলো যত্ন করে দেখো :
সাথে থেকো, খুশি থেকো; অনুগত থেকো। চোখের নড়াচড়া, নাকের নিঃশ্বাস আমলে নেবে; চোখ যেন সুন্দর কিছু দেখে, নাক যেন সুন্দর কিছু শোঁকে; সুরমা সবচেয়ে সুন্দর, জল সবচেয়ে সুগন্ধ। খাবার সময়ের খেয়াল রাখবে, ঘুমের ঘর শান্ত রাখবে; ক্ষুধার উত্তাপ আগুন ধরায়, ঘুমের ব্যাঘাত রাগ ধরায়। ঘর দেখাশোনা করবে, সম্পদ রক্ষা করবে। তাকেও খাওয়াবে, পরিজনকেও খাওয়াবে। সম্পদ রক্ষা করলে মান বাড়বে, পরিবার-পরিজনকেও খাওয়ালে দাম বাড়বে। ঘরের কথা পরের কাছে বলবে না, কোনো কথার অবাধ্য হবে না; ঘরের কথা পরের কাছে বললে রেহাই পাবে না। অবাধ্য হলে সুখ পাবে না। মনে রেখো, তুমি যা চাও তা কখনোই পাবে না যদি তার চাওয়া-পাওয়াকে প্রাধান্য না দাও।৩

বোল আমার, তোমার দাম্পত্যজীবন হোক সুখে ভরা, সোহাগে ভরা। সারাজীবন স্বামীসংসার করে চুল পাকানো দাদিমার উপদেশগুলো হোক তোমার পাথেয়। তুমি পাও একটি শান্তি-সুখের নীড়।

টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী।
২. নাসাঈ, আস-সুনানুল কুবরা।
৩. আহকামুন নিসা লিবনিল জাওযী : ৩১৫-৩১৬।

📘 ফিরে এসো নীড়ে 📄 ৪. অল্পেতুষ্টি

📄 ৪. অল্পেতুষ্টি


মুসলিম নারী জানেন, রিজিক আল্লাহর দান। আর দাম্পত্যজীবন একটি শেয়ার। এই শেয়ারের মূলধন কিন্তু পার্থিব ধন নয়, এই শেয়ারের মূলধন হলো আল্লাহর একত্বে একে অপরকে ভালোবাসা। স্বামী যখন আল্লাহর একত্বে স্ত্রীকে ভালোবাসবে, তখন তার সবকিছুই হবে স্ত্রীর জন্য। তার সকল শ্রম সাধনা স্ত্রীর জন্য, পরিবারের জন্য। তার সকল অর্জন-উপার্জন স্ত্রীর জন্য, পরিবারের জন্য। অনুরূপ স্ত্রীও যখন আল্লাহর একত্বে স্বামীকে ভালোবাসবে, তখন সেই ভালোবাসা তাকেও স্বামীর প্রতি আন্তরিক হতে উৎসাহ যোগাবে। স্বামীর যা আছে, তা নিয়েই খুশি থাকতে উদ্বুদ্ধ করবে。

নিজের সব আল্লাহর বশবর্তী হয়ে কখনোই স্বামীর কাছে বড় বড় আবদার ও বেশি বেশি আবদার করবে না। বলবে না যে, আমার এটা লাগবে, ওটা লাগবে; ঘরে এই নেই, সেই নেই ইত্যাদি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

إِرْضَ بِمَا قَسَمَ اللّٰهُ لَكِ تَكُنْ أَسْعَدَ النَّاسِ

অর্থ : আল্লাহ্ তোমার কপালে যা রেখেছেন, তাতে সন্তুষ্ট থেকো। দেখবে, সবচে সুখী মানুষ তুমি।১

একজন যোগ্য, আদর্শ স্ত্রী যেমন রবের প্রতি কৃতজ্ঞ, তেমনই বর এর প্রতিও কৃতজ্ঞ। অভিযোগ নেই, আপত্তি নেই। আক্ষেপ নেই, অতৃপ্তি নেই। যদি কখনো কোনো কারণে একটু মনোমালিন্য হয়ও, তা হলে চুপ থাকে; তর্ক করে না, কথা ধরে না। ফলে সহজেই সবকিছু মিটে যায়。

কবি বলেন,

عَذْلِي الْمُفْتُو مَتَى تَسْتَدْمِينَ مُؤْذِي وَلَا تَذْرَبِي تَذَرُكِ الْقَوْلُ مَرَّةً وَلَا تَكْثَرِى الشَّكْوَى فَتَذْهَبَ بِالْفَوَى فَإِنِّي رَأَيْتُ الْحُبَّ فِى الْقَلْبِ وَالْأَدْوَى وَلَا تَنْطِقِي فِي صَوْرَتِي حِينَ أَغْضَبُ فَإِنَّكِ لَا تَدْرِينَ كَيْفَ الْمُثِيبُ وَبِالْكَ قَلْبِي
وَالْقُلُوبِ تَقْلِبُ إِذَا اجْتَمَعَا لَمْ يَلْبَثِ الْحُبُّ يَذْهَبُ

আমার প্রিয়তমা, আজ নয় প্রেমলাপ, নয় ইনিয়ে বিনিয়ে বলা; যদি চাও ভালোবাসা শোনো, আমার ভালো ভাষা— ধৈর্য ধরো, সহনশীল হও তোমার আমার পথ চলা রবে চিরদিন, রবে অমলিন; চোরের মতো বাজিয়ো না আমায়, কোরো না বেশি অভিযোগ; প্রেমের শক্তি মিশে যাবে হাওয়ায়, বেড়ে যাবে অভিমান, অভিরোষ। ভালোবাসা হৃদয়ে, দহনে। যদি রাগ করি, তর্ক কোরো না; নিন্দা কোরো না গোপনে। এ কত কঠিন তুমি জানো না— মন থেকে মুছে যাবে নিমিষেই; মন যে এমনই—রং বদলায় পলকেই। ভালোবাসা তলিয়ে যায় অভিমানের অতলে。

পার্থিব বিলাসিতার প্রতি মুসলিমা নারী কখনোই ঝুঁকে যেতে পারে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্মানিত স্ত্রীগণ যখন ভরণপোষণ প্রশ্নে প্রবৃত্তির আবেদন করেছিলেন, তখন পবিত্র কুরআনে নাযিল হয়েছিল,

يَأَيُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لِأَزْوَاجِكَ إِنْ كُنْتُنَّ تُرِدْنَ الْحَيَوَةَ الدُّنْيَا وَزِيْنَتَهَا فَتَعَالَيْنَ أُمَتِّعْكُنَّ وَأَسْرَحْكُنَّ سَرَاحًا جَمِيلًا وَإِنْ كُنْتُنَّ تُرِدْنَ اللهَ وَرَسُولَهُ وَالدَّارَ الْآخِرَةَ فَإِنَّ اللهَ أَعَدَّ لِلْمُحْسِنَتِ مِنْكُنَّ أَجْرًا عَظِيْمًا

অর্থ : হে নবী, আপনি আপনার স্ত্রীদের বলুন, তোমরা যদি দুনিয়ার জীবন এবং দুনিয়ার ভোগবিলাস কামনা কর, তা হলে চল তোমাদেরকে তোমাদের সাধ্যানুপাতি দিয়ে সীলজয়সকারক মুক্ত করে দিই; আর যদি তোমরা আল্লাহ্, রাসূল ও আখিরাত চাও তা হলে তো তোমাদের মতো সদাচারী নারীদের জন্য আল্লাহ্ প্রস্তুত করে রেখেছেন বিরাট প্রতিদান। –সূরা আহযাব : ২৮-২৯

এভাবে যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পবিত্র স্ত্রীগণকে তাঁকে অথবা পার্থিব সুখকে বেছে দেওয়ার ইচ্ছাধিকার দিয়েছিলেন তখন উম্মাহাতুল মুমিনিন অকুণ্ঠচিত্তে তাঁকেই বেছে নিয়েছিলেন। পার্থিব জীবনের বিলাসিতা, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়েছিলেন। নবীপরিবারের অভাব-অনটন, টানা-হেঁচড়া, টানাপোড়েনকেই বরণ করে নিয়েছিলেন। ভাবুন তো, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কত আনন্দিত হয়েছিলেন! তাঁর কত গর্ব হয়েছিল! আমাদের প্রকৃত আদর্শ এই মহীয়সী নারীগণই। তাঁদেরই অনুসারী আমরা। যে মহাত্যাগ তাঁরা পদচুম্বন করেছে, তা আমাদেরও প্রাপ্য। আমরা কেন অন্যদের কথা শুনব। কেন আলো ভেবে আলোর পেছনে ছুটব。

টিকাঃ
১. তিরমিযী।

📘 ফিরে এসো নীড়ে 📄 ৫. হতাশ না হওয়া

📄 ৫. হতাশ না হওয়া


প্রিয় বোন, দাম্পত্যজীবনের মনোমালিন্যকে কখনোই বড় করে দেখো না। কখনোই হতাশ হয়ো না। এটা খুবই স্বাভাবিক। খুবই সাময়িক। যদি এ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকা সম্ভব হতো, তা হলে নবীপরিবার অবশ্যই মুক্ত থাকত। কখনো যদি কোনো বিষয়ে মনোমালিন্য হয় তা হলে তোমার প্রথম করণীয় হলো—মনোমালিন্যের মূল জায়গাটি খুঁজে বের করা এবং সতর্ক উপায়ে তা দূর করার চেষ্টা করা。

মনে রাখবে, পূর্বে ঘটে যাওয়া ঝামেলাকে, পূর্বে মিটে যাওয়া বিষয়বস্তুকে কখনো নতুন করে তুলবে না, নতুন করে জাগাবে না। যেটা যাপিত করছে, যাপিতই থাকুক। যা মনের কবরে পুঁতে ফেলেছ, তা পোঁতাই থাকুক। তা না হলে, একটির ওপর আরেকটি সমস্যা, তার ওপর আরেক সমস্যা—এভাবে জমতে জমতে সমস্যার পাহাড় জমে যাবে। জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠবে। সবসময়ই মনোমালিন্যের মানসিকতা রাখবে। সমাধানের পথ খুঁজবে। হঠকারিতা করবে না। জেদ ধরে থাকবে না। মনোমালিন্যের আলোচনায় খুব চিন্তাভাবনা করবে। শান্ত থাকবে। যেন একটি সুন্দর সমাধান আসে। যা তোমাকে সুখী করে। তোমার প্রিয় মানুষটিকে সুখী করে। শুধু নিজের কথা ভাববে না। এটা স্বার্থপরতা। মনে রাখবে, মুমিন নারী স্বার্থপর হয় না। একে অপরের প্রতি আন্তরিকতা, একে অপরের জন্য কল্যাণকামিতাই যেন হয় আলোচনার মূল ভিত্তি。

প্রিয় বোন, মনে রাখবে, এ তোমার সম্পদ। নিজের সম্পদে ক্ষতিসাধন করতে কেউ বা কিছু তোমাকে প্ররোচিত করবে—এমন যেন না হয়। সংযম রেখো। তোমার আল্লাহ্ দেওয়া বোধ ও বিবেককে, বিবেচনাসক্তির পাথয়েককে কাজে লাগাও। একে অপরের প্রতি কৃতজ্ঞতার কথা, একে অপরের ভালো থাকার, ভালোবাসার কথা কখনো মন থেকে মুছে ফেলো না। মনে রেখো, মুমিন নারী অকৃতজ্ঞ হয় না。

নর-নারী উভয়েরই কর্তব্য হলো যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মনোমালিন্যের অবসান করানো। দুজনের মাঝে সমঝোতা আনা। বিলম্ব করলে শয়তান পথ পেয়ে যায়। একটি শান্তি-সুখের নীড় ভেঙে দেওয়ার সুযোগ পেয়ে যায়। শয়তানকে সফল হতে দেবে না। সে আমাদের দুশমন। সে সদলবলে লেগে আছে তোমাকে বিপথে নেওয়ার জন্য। বিপদে ফেলার জন্য। আল্লাহ্ আমাদের হেফাজত করুন。

প্রিয় বোন, জেনে রেখো, দাম্পত্যজীবন মানিয়ে নিতে একটু সময়ের প্রয়োজন হতে পারে। দুজন দুজনকে বুঝে উঠতে একটু সময় লাগতে পারে। ধৈর্য ধরো। ধীরতা-স্থিরতা অর্জন করো। ত্বরাপ্রবণতা বর্জন করো। দাম্পত্যের ভরীটা জীবনসমূদ্রে শান্ত ও স্থিরভাবে চুবুক। একটু পরেই পেয়ে যাবে তীর। চির সফল, চির সুন্দর, চির সুখের নীড়।

📘 ফিরে এসো নীড়ে 📄 ৬. সবর ও তাওয়াক্কুল

📄 ৬. সবর ও তাওয়াক্কুল


আল্লাহ্ জন্য ধৈর্য ধারণ করা এবং সুখে দুঃখে সর্বাবস্থায় আল্লাহ্র ওপর ভরসা করা মুসলিম নারীর বড় গুণ। স্বামী যদি অভাবী হয় তা হলে সে ধৈর্যধারণ করবে। তার ধৈর্যের বদৌলতে আল্লাহ্ একসময় অবস্থার পরিবর্তন ঘটাবেন। সে জানে, আল্লাহ্ কখনোই তার মুমিন বান্দাদের ধ্বংস করেন না। সচ্ছলতা, অসচ্ছলতা আল্লাহ্র পক্ষ থেকে আসে। এগুলো সাময়িক। সম্পদ সকালে আসে, সন্ধ্যায় যায়। এটা একটা পরীক্ষা। ধৈর্যের পরীক্ষা। সে আল্লাহ্র ওপর কতটা ভরসা করতে পারে তার পরীক্ষা। সুতরাং মুসলিম নারী সেই পরীক্ষায় অধঃক্ষেপণ করে আনন্দে, আত্মহে। সে উত্তম ফল পাবে। উত্তম পুরস্কার পাবে। সে হতাশ হবে না। সে জানে, তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

لَوْ أَنَّكُمْ تَتَوَكَّلُونَ عَلَى اللهِ حَقَّ تَوَكَّلِهِ لَرَزَقَكُمْ كَمَا يَرْزُقُ الطَّيْرَ تَغْدُو خِمَاصًا وَتَرُوْحُ بِطَانًا

অর্থ : তোমরা যদি আল্লাহ্র ওপর সত্যিকার ভাবে ভরসা করতে পার, তা হলে তিনি তোমাদের রিজিক দান করবেন যেভাবে একটি পাখিকে রিজিক দান করেন। পাখি খালি পেটে সকালে বের হয়। ভরা পেটে সন্ধ্যায় নীড়ে ফেরে।১

ইমাম বুখারী রাহ্ও হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। হাদীসটি একই অর্থ ধারণ করে। যাতে পায়, হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম স্ত্রী হাজেরা ও পুত্র ইসমাইলকে নিয়ে ফিলিস্তিন থেকে মক্কায় আসেন। মক্কা তখন ধু-ধু মরুভূমি। গাছপালা নেই। লতাপাতা নেই। জনমানবশূন্য। শুধু ধু-হাওয়া, তপ্ত বালু, প্রখর রোদ। পানি নেই। প্রাণী নেই। এমন এক প্রতিকূল পরিবেশে তিনি স্ত্রীসন্তানকে রেখে গেলেন। তাদের সাথে ছিল সামান্য খেজুর ও পানি। ইবরাহিম আলাইহিস সালাম যখন ফিরে যেতে চাইলেন, তখন হাজেরা আলাইহিস সালাম শুধু জানতে চাইলেন, আল্লাহই কি এই নির্দেশ দিয়েছেন? তিনি উত্তর দিলেন, হ্যাঁ। হাজেরা আলাইহিস সালাম বললেন পরম প্রত্যয়ে, তা হলে তিনি আমাদের ধ্বংস করবেন না। হাজেরা আলাইহিস সালাম আপন প্রতিপালকের ওপর কতটা ভরসা রেখেছিলেন! কতটা কঠিন পরীক্ষা তিনি বরণ করে নিয়েছিলেন অপরিসীম বিশ্বাসে! ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ফিলিস্তিনে ফিরে এলেন। বাইতুল মাকদিসে দু হাত তুলে দুআ করলেন,

رَّبَّنَا إِنِّي أَسْكَنْتُ مِن ذُرِّيَّتِي بِوَادٍ غَيْرِ ذِي زَرْعٍ عِندَ بَيْتِكَ الْمُحَرَّمِ رَبَّنَا لِيُقِيمُوا الصَّلَاةَ فَاجْعَلْ أَفْئِدَةً مِّنَ النَّاسِ تَهْوِي إِلَيْهِمْ وَارْزُقْهُم مِّنَ الثَّمَرَاتِ لَعَلَّهُمْ يَشْكُرُونَ

অর্থ : হে আমার প্রতিপালক, তোমার পবিত্র গৃহের কাছে একটি নিষ্ফলা উপত্যকায় আমি আমার বংশধরকে রেখে গেলাম; হে আমার প্রতিপালক, এ আশায় যে, তারা সালাত কায়েম করবে। সুতরাং তুমি তাদের প্রতি মানুষের হৃদয়কে ঝুঁকিয়ে দাও। তাদেরকে দান করো ফলফলাদি থেকে। তারা যেন কৃতজ্ঞ হয়। –সূরা ইবরাহিম : ৩৭

হাজেরা আ. আপন সন্তানকে নিয়ে একাকী নির্জন মরুভূমিতে থেকে গেলেন। অচিরেই পানি ফুরিয়ে গেল। পানির খোঁজে ছুটলেন এদিক থেকে ওদিক। ওদিক থেকে এদিক। সাফা থেকে মারওয়ায়। মারওয়া থেকে সাফায়। অবশেষে আল্লাহ সাহায্য করলেন। পাখির আকৃতিতে ফেরেশতা পাঠালেন। পাখি ডানা দিয়ে মাটি খুঁড়ল। আল্লাহর হুকুমে পানি বের হলো। হাজেরা অঞ্জলি ভরে ভরে শিশু ইসমাইলকে পান করালেন।...

হাজেরার সবর ও তাওয়াক্কুলের প্রতি সম্মানার্থে মহান আল্লাহ জমজম কূপ উৎসারিত করলেন। হারাম শরীফের অতি নিকটে এই কূপ এখনও আছে। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম পানীয়। শেফা হয়। শুধু তাই নয়, তাঁর স্মরণে আল্লাহ হজ্বের গুরুত্বপূর্ণ আমল হিসেবে নির্ধারণ করে দিলেন সাফা-মারওয়ায় সাঈ করার বিধান。

প্রিয় বোন, মনে রেখো, তুমি হাজেরার উত্তরসূরী। ত্যাগ ও বিসর্জনের, ধৈর্য ও তাওয়াক্কুলের অনুপম আদর্শে ভরা তোমার ইতিহাস। তা হলে তুমি কেন এই মহৎ গুণে গুণান্বিত হবে না। হাজেরার সম্মান কি তুমি পেতে পার না? ধৈর্য ও তাওয়াক্কুল তোমাকে শুধু সুখীই করবে না; মহৎও করবে। কিন্তু এই বিশ্বাসও রেখো যে, তুমি পার হয়ে যাবে। অত্যন্ত সুন্দরভাবে। অত্যন্ত সম্মানের সাথে। তোমার আল্লাহ বলে দিয়েছেন,

وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ إِنَّ اللَّهَ بَالِغُ أَمْرِهِ قَدْ جَعَلَ اللَّهُ لِكُلِّ شَيْءٍ قَدْرًا

অর্থ : আর যে আল্লাহকে ভয় করবে, আল্লাহ তার জন্য বের করে দেবেন সমাধানের পথ। তিনি তাকে এমনভাবে রিজিক দান করবেন যে, সে ভাবতেও পারবে না। যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, আল্লাহই তার জন্য যথেষ্ট। নিশ্চয় আল্লাহ নিজের কাজ পূর্ণ করেই নেন। নিশ্চয় তিনি নির্ধারণ করেছেন সবকিছুর একটি নির্দিষ্ট সীমা। –সূরা তালাক : ২-৩

টিকাঃ
১. জামে সগীর।

ফন্ট সাইজ
15px
17px