📄 ঘ. অভিভাবকের উপস্থিতি ও একাত্মতা
বিবাহে অভিভাবকের উপস্থিতি ও সম্মতি বা একাগ্রতাও কর্তব্য। এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
أَيُّمَا امْرَأَةٍ نَكَحَتْ بِغَيْرِ إِذْنِ وَلِيِّهَا فَنِكَاحُهَا بَاطِلٌ فَنِكَاحُهَا بَاطِلٌ فَنِكَاحُهَا بَاطِلٌ...
অর্থ : অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া যে নারী বিবাহ বসে, তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল।১
তিনি আরও বলেছেন,
لَا يُنْكَاحُ إِلَّا بِوَلِيِّ
অর্থ : অভিভাবক ছাড়া বিবাহ হতে পারে না।২
বিবাহচুক্তিতে অভিভাবকের শর্ত আরোপ করার কল্যাণটি বলাই বাহুল্য। এতে মেয়ের অবস্থানগত বিচার-বিবেচনা ও সার্বিক কল্যাণের দিকটি রক্ষিত হয়। তার সম্মান ও সম্ভ্রমের অধিক নিশ্চয়তা-বিধান হয়। যে কেউ তাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে যে প্রতারণা করবে সেই আশঙ্কা কম থাকে। দাম্পত্যজীবনে সংহতি ও বিবেচনা পায়। কেননা, পুরুষরাই পুরুষদের চলাচল ভালোবাসেন। পক্ষান্তরে মেয়েরা অনেক সময়ই আবেগে তাড়িত হয়। প্রস্তাবকারী পুরুষের অনুমতিও সঠিকভাবে উপলব্ধি করার সক্ষমতা তার খুব কম থাকে। বাহ্যিক বেশভূষা ও মিষ্টি কথাবার্তায় প্রতারিত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। একজন বিজ্ঞ-অভিজ্ঞ, স্নেহশীল অভিভাবক বুঝতে পারেন, তার মেয়ের জন্য লোকটি ভালো হবে কি না। তবে অভিভাবকের শর্ত আরোপ করার অর্থ এই নয় যে, শরীআতের নির্দেশিত কোনো কল্যাণ-অপেক্ষা বিবেচনায় ছাড়া শুধু শুধু মেয়ের বিবাহে বাধা সৃষ্টি করবেন। যদি যোগ্য পাত্র পাওয়া যায় এবং তিনি ধার্মিক, চরিত্রবান হন তা হলে শুধু শুধু অভিভাবকের বাধা হওয়া উচিত নয়। এতে তিনি গোনাহগার হবেন।
টিকাঃ
১. আবু দাউদ।
২. আবু দাউদ।
📄 ঙ. মোহর পরিশোধ করা
বিবাহে মোহর নারীর শরীআতের নির্দেশিত অধিকার। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন,
وَآتُوا النِّسَاءَ صَدُقَاتِهِنَّ نِحْلَةً ۚ فَإِن طِبْنَ لَكُمْ عَن شَيْءٍ مِّنْهُ نَفْسًا فَكُلُوهُ هَنِيئًا مَّرِيئًا
অর্থ : নারীদেরকে তাদের মোহর ভালোভাবে দিয়ে দাও। এরপর তারা যদি খুশিমনে তোমাদের কিছু দেয় তা হলে তা আরাম আয়েশে ভোগ করো। -সূরা নিসা : ০৪
মোহর নারীর একান্ত অধিকার। সে বৈধ পথে ইচ্ছেমতো খরচ করতে পারে। তার সম্মতি ছাড়া অভিভাবক সেখান এক চুল পরিমাণও নিতে পারবে না।
দয়া করে এমন ভুল বুঝবেন না যে, মোহর নারীর মূল্য; বরং এটা তাকে সম্মানপ্রদর্শনের একটা সাধারণ প্রতীকমাত্র। ইসলাম মোহরের জন্য কোনো পরিমাণ নির্ধারণ করে দেয়নি। বরং মেয়ের সম্মানে মোহর নির্ধারণের দায়িত্ব দিয়েছে অভিভাবকদের। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন,
وَإِنْ أَرَدتُّمُ اسْتِبْدَالَ زَوْجٍ مَّكَانَ زَوْجٍ وَآتَيْتُمْ إِحْدَاهُنَّ قِنْطَارًا فَلَا تَأْخُذُوا مِنْهُ شَيْئًا أَتَأْخُذُونَهُ بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُّبِينًا وَكَيْفَ تَأْخُذُونَهُ وَقَدْ أَفْضَىٰ بَعْضُكُمْ إِلَىٰ بَعْضٍ وَأَخَذْنَ مِنكُم مِّيثَاقًا غَلِيظًا
অর্থ : আর তোমরা যা এক স্ত্রীকে বাদ দিয়ে আর এক স্ত্রী গ্রহণ করতে চাও, আর সেই স্ত্রীকে বিপুল পরিমাণ সম্পদ দিয়ে থাক, তা হলে তা থেকে কিছুই ফেরত নিয়ো না। তোমরা তা ফিরিয়ে নেবে কি মিথ্যাকে আশ্রয় করে, সুস্পষ্ট পাপাচর করে? কীভাবে বা ফেরত নেবে, অথচ তোমরা একে অপরের কাছে গিয়েছিলে, আর তারা তোমাদের থেকে গ্রহণ করেছিল কঠিন প্রতিশ্রুতি? -সূরা নিসা : ২০-২১
স্ত্রীধন আও মেহের কোনো সীমা নির্ধারণ করে দেয়নি, যেহেতু কম হোক, বেশি হোক সেটা যুগ ও সমাজের চাহিদা অনুযায়ী হবে, জীবনপ্রবাহের ধারা অনুযায়ী হবে। এটা প্রমাণ করে যে, ইসলামি বিধান যে কোনো সময় ও সমাজের জন্য প্রযোজ্য। নর-নারীর সম্মিলিত যে মোহর ধার্য হবে, কম হোক বেশি হোক, সমস্যা নেই। আবু সালামা ইবনে আবদুর রহমান থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হযরত আয়েশা রাযি.-কে জিজ্ঞেস করলাম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেমন মোহর ধার্য করতেন? তিনি বললেন,
كَانَ صَدَاقُهُ لِأَزْوَاجِهِ ثِنْتَيْ عَشْرَةَ أُوْقِيَّةً وَنِشًا قَالَتْ : أَتَدْرِي مَا النَّشُّ ؟ قُلْتُ : لَا قَالَتْ : نِصْفُ أَوْقِيَّةٍ, فَتِلْكَ خَمْسُمِائَةِ دِرْهَمٍ فَهَذَا صَدَاقُ رَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم لِأَزْوَاجِهِ
অর্থ : তাঁর স্ত্রীদের মোহর হতো বারো উকিয়া এক নশ। নশ কী জানো? আমি বললাম, জি না। তিনি বললেন, এক উকিয়ার অর্ধেক। অর্থাৎ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রীগণের মোহর ছিল পাঁচশো দিরহাম।১
সুতরাং কেউই মোহরের সর্বোচ্চ সীমানা নির্ধারণ করে দিতে পারেন না। কেননা, আল্লাহ তাআলা কুরআন কারীমে এর বৈধতা দান করেছেন। তবে আমরা বলতে পারি যে, বিবাহের বিষয়টি সহজ করা উচিত। মধ্যমতাই এক্ষেত্রে মূল ভিত্তি হতে পারে। কেননা, সর্ব বিষয়ে মধ্যমতাই শ্রেয়। তা ছাড়া, বিবাহ বিষয়টিকে সহজভাবে নেওয়াই সুন্নাহ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
خَيْرُ الصِّدَاقِ أَيْسَرُهُ.
অর্থ : শ্রেষ্ঠ মোহর হলো যা সবচেয়ে সহজ হয়।২
টিকাঃ
১. সহীহ মুসলিম。
২. হাকেম।
📄 চ. প্রকাশ্যে বিবাহের ঘোষণা
প্রকাশ্যে বিবাহের ঘোষণা দেওয়াটাই কাম্য। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
أَعْلِنُوا هَذَا النِّكَاحَ, وَاجْعَلُوهُ فِي الْمَسَاجِدِ وَاضْرِبُوا عَلَيْهِ بِالدُّفُوفِ
অর্থ : তোমরা প্রকাশ্যে বিবাহ সম্পন্ন করো। মসজিদে বিবাহ সম্পন্ন করো। (প্রয়োজনে) ঢোল পিটিয়ে প্রকাশ্যে ঘোষণা দাও।১
টিকাঃ
১. আহমদ, তিরমিযী।
📄 ছ. বিবাহ অনুষ্ঠান বা ওলিমা
বিবাহ অনুষ্ঠানে অপচয় করা মাকরুহ। পুরুষকে এত বেশি খরচ করতে বাধ্য করা যাবে না যে, পরবর্তীতে তার দাম্পত্যজীবনে ব্যাহত হয়। সব বিষয়ে মধ্যমতা কাম্য। এখানেও মাঝামাঝি থাকা চাই। খরচপাতিও একদম বাড়াবাড়ি করা, অথবা একেবারেই কিছু না করা—কোনোটাাই ভালো নয়।