📘 ফিরে এসো নীড়ে 📄 ইতিহাসে মুসলিম নারীর অনন্য দৃষ্টান্ত

📄 ইতিহাসে মুসলিম নারীর অনন্য দৃষ্টান্ত


ইসলামের আবির্ভাবের অব্যবহিত পরও এই সুমহান শাশ্বত ধর্মের কল্যাণে মুসলিম নারীগণ অসংখ্য উত্তম গুণাবলির বিশিষ্ট হয়েছিলেন। সমাজ-জীবনে যথার্থ ভূমিকা ও যথাযথ অবদান রাখতে ব্রতী হয়েছিলেন। প্রত্যেক নারীই ছিল স্বয়ংসম্পন্ন শক্তিশালী সত্তা। তাদের বিচক্ষণতা, বিস্তৃতহৃদয়তা, গভীর জীবনবোধ ও অনুপম বাকশৈলী ছিল ঈর্ষণীয়। ধৈর্য ও অবিচলতা ছিল পর্বতপ্রমাণ。

স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই নারীদের সম্মান করতেন এবং তাদের সম্মানপ্রদর্শনের জন্য সাহাবা কেরামকে বিশেষভাবে নির্দেশ দিতেন। এরই কল্যাণে ইসলামী সমাজে নারী জাতি লাভ করে বিশেষ মর্যাদা। অবিচলিত ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী সমাজের আসনে。

এ অধ্যায়ে আমরা ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মুসলিম নারীর দু-একটি অনন্য দৃষ্টান্ত তুলে ধরার প্রয়াস পাব। আশা করি, এগুলো আমাদের প্রেরণা যোগাবে—কিছুটা অনুসরণের জন্য, কিছুটা শিক্ষাগ্ৰহণের জন্য。

মানবতার প্রথম শিক্ষক মুহাম্মাদ মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পবিত্র স্ত্রীগণের শিক্ষাদীক্ষা ও আমল আখলাকের বিষয়েও মনোযোগী হয়েছিলেন। দেখুন না, একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত জাওয়াইরিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ইবাদতগুজার এবং শোকরগোজা‌র একজন নারী। পবিত্র জীবনসঙ্গিনীর মহিমান্বিত তাজ মস্তকে ধারণ করে আবির্ভূত হয়েছিলেন উম্মুল মুমিনিনের ভূমিকায়। ইবাদতরতা অবস্থায় দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেন,

'আমি তোমাকে কয়েকটি কালিমা শিখিয়ে দিই, এগুলো জপে জপে তুমি তোমার প্রভুকে স্মরণ করো :

سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ عَدَدَ خَلْقِهِ، وَرِضَا نَفْسِهِ، وَزِنَةَ عَرْشِهِ، وَمِدَادَ كَلِمَاتِهِ
অর্থ : পবিত্রতা গাহি আল্লাহর, গাহি বন্দনা—তাঁর সন্তোষসম; আরশসম, করুণাসম।'১

এভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল নারী সাহাবীরই শিক্ষাদীক্ষা এবং আমল আখলাকের ব্যাপারে মনোযোগী হয়েছিলেন। গুরুত্বারোপ করেছিলেন তাদের ঐহিক ও পারলৌকিক সফলতা ও সৌভাগ্যের বিষয়েও। এমন অসংখ্য উদাহরণ শোভা পাচ্ছে সীরাত হাদীস ও ইতিহাসগ্রন্থের পাতায় পাতায়。

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সান্নিধ্যশোভায় যেসব মহীয়সী জ্ঞান ও প্রতিভার দ্যুতি ছড়িয়েছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা। তিনি ছিলেন অগাধ জ্ঞান ও বহুমুখী যোগ্যতার অধিকারিণী। একাধারে একজন ফকীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির। ধর্মীয় তাৎপর্যজ্ঞানে তো ছিলেনই। বহুদর্শিতা, কাব্যজ্ঞানেও ছিলেন অতুলনীয়া। সাহিত্য ও ইতিহাসেও ছিল অসাধারণ ব্যুৎপত্তি। চিকিৎসায়ও ছিল ভালো হাত-যশ। ইমাম শাফী রাহ. বলেন,

وَيُعِشَةَ رضي اللَّهُ عنها يَا أَمَّ الْمُؤْمِنِينَ هَذَا الْقُرْآنَ تَلَقَّيْتِهِ عَن رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَكَذَلِكَ الْحَلَالِ وَالْحَرَامِ. وَهَذَا الشِّعْرُ وَالنَّسَبُ وَالْأَخْبَارُ سَمِعْتِهَا عَن أَبِيكَ وَغَيْرِهِ فَمَا بَالَ الطِّبِّ ؟ قَالَتْ : كَانَ الْوُفُودُ تَأْتِي رَسُولَ الله صلى الله عليه وسلم فَلَا يَزَالُ يَشْكُو عَلَيْهِ فَيَسْأَلُ عَنْ دَوَائِهَا فَيُخْبِرُهُ بِذلِكَ فَيَحْفَظُهُ مَا كَانَ يَصِفُهُ وَيُوَّهَبُهُ
অর্থ : হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে জিজ্ঞেস করা হলো, হে উম্মুল মুমিনিন, আপনি কুরআন জ্ঞান অর্জন করেছেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে; হারাম-হালালের জ্ঞানও। কাব্য, ইতিহাস, সাহিত্য ও বংশবিদ্যা অর্জন করেছেন হযরত আবূ বকর রাদিয়াল্লাহু আনহার কাছ থেকে। কিন্তু চিকিৎসাবিদ্যা রপ্ত করলেন কার কাছ থেকে? তিনি বললেন, দিগ্বিদিক থেকে আরবের বহু প্রতিনিধিদল আসত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে। তিনি বিভিন্ন রোগের কথা বলতেন, প্রতিশোধক চাইতেন। আমি বিজ্ঞ হেকিম ও চিকিৎসকদের পরামর্শ মনোযোগ দিয়ে শুনতাম, বুঝতাম ও আত্মস্থ করতাম।২

হযরত আবু মূসা আশআরী রাযি. বলেন,

مَا أَشْكَلَ عَلَيْنَا أَصْحَابَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَدِيثٌ قَطُّ فَسَأَلْنَا عَنْهُ عَائِشَةَ إِلَّا وَجَدْنَا عِنْدَهَا مِنْهُ عِلْمًا
অর্থ : আমাদের কাছে কখনো কোনো হাদীস অস্পষ্ট লাগলে যখনই হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে জিজ্ঞেস করতাম, তাঁর কাছে অবশ্যই কোনো না কোনো জ্ঞান লাভ করতাম।৩

তবে দেখুন, হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত হাদীসসংখ্যা দুই হাজারের বেশি। ইমাম যুহরী রাহ. বলেন,

لَوْ جُمِعَ عِلْمُ النَّبِي كُلُّهُمْ وَأُمَّهَاتُ الْمُؤْمِنِينَ لَكَانَتْ عَائَشَةُ أَوْسَعَهُمْ عِلْمًا
অর্থ : যদি সকল সাহাবীর জ্ঞান, উম্মাহাতুল মুমিনীন জ্ঞান একত্রিত করা হয়, তা হলে দেখা যাবে, হযরত আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহার জ্ঞান সবার জ্ঞানকে ধারণ করে আছে।৪

বিখ্যাত ফুতুহুল বুলদান গ্রন্থে লিখেছেন, উম্মুল মুমিনীন হযরত হাফসা বিনতে উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহুমা জাহেলি যুগে শিফা আদাবিয়া নাম্নী জনৈকা নারীর কাছে আরবী লিপিশাস্ত্র আয়ত্ত করার প্রয়াস পেয়েছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বিবাহ করার পর শিফা আদাবিয়াকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন, তিনি যেন হাফসাকে সুন্দর হস্তলিপিতেও পারদর্শী করে তোলেন。

শুধু পবিত্র স্ত্রীগণ বা নারী সাহাবীই নন, সাধারণ নারীদের মাঝেও আছে অনন্য উদাহরণ। উম্মে দারদা সুগরাকেই দেখুন, (মূল নাম : হুজাইমা বিনতে ইযাহাইয়া আদাবিয়া) তিনি উম্মতের জন্য কত জ্ঞানই না সংরক্ষণ করে গেছেন। তিনি তাঁর জীবনসঙ্গী আবু দারদা রাযি.-সহ হযরত সালমান ফারসী রাযি., হযরত আয়েশা রাযি., হযরত আবু হুরায়রা রাযি. প্রমুখ থেকেও হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি সম্মানিত জীবনসঙ্গীর সামনে নিজের কুরআন উপস্থাপন করতেন। মহীয়সী এই তাবেয়ী নারী ইলমে, আমলে শহরত হাসিল করেছিলেন। তাঁর তাকওয়া-পরহেজগারী ছিল ঈর্ষণীয়। দুনিয়ার প্রতি মায়ামোহ কিছু ই ছিল না তাঁর। আল্লাহ তাঁকে দীর্ঘজীবী করেছিলেন। খলীফা আবদুল মালিক বিন মারওয়ানের শাসনামলেও তিনি জীবিত ছিলেন। খলীফা আবদুল মালিক একবার বাইতুল মাকদিসে একটি পাথরের ওপর বসা ছিলেন। উম্মে দারদাও বসা ছিলেন। মাগরিবের আজান হলো। তিনি খলীফা আবদুল মালিকের কাঁধে ভর দিয়ে নামাযগাহে প্রবেশ করলেন। তিনি অনেক বড় আলেম ও ফকীহা ছিলেন। লোকেরা তাঁর কাছে এসে দীনি ইলম হাসিল করত। তিনি দারস করাতেন। খলীফা আবদুল মালিকও তাঁর দারসে বসতেন।৫

ফাতেমা বিনতে আলাউদ্দিন সমরকান্দী রাহ. হানাফী ইতিহাসে উজ্জ্বল নাম। পিতার লেখা 'তুহফাতুল ফুকাহা' বাল্যকালেই আত্মস্থ করেছিলেন। আল্লাহ এই বিদুষী কন্যাকেও পিতার মতো ফিক্হে অগাধ পাণ্ডিত্য দান করেছিলেন। কত বড় বড় ব্যক্তি বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু কাউকেই পিতা তাঁর যোগ্য মনে করেননি। অবশেষে যখন আবু বকর আল কাসানী রাহ. 'তুহফাতুল ফুকাহা'র বিখ্যাত ব্যাখ্যাগ্রন্থ 'বাদাইউস সানায়ে' রচনা করেন এবং শ্রদ্ধেয় উস্তায সমরকান্দী রাহ.-কে দেখালেন তখন স্বেচ্ছায় নিজের পাণ্ডিত্য তাঁকে মুগ্ধ করল। তিনি যোগ্য পাত্র পেয়ে গেলেন। প্রসন্ন হয়ে বিদুষী কন্যাকে বিবাহ দিলেন তাঁর কাছে। মোহর কী ছিল? জামাইয়ের স্বরচিত গ্রন্থ 'বাদাইউস সানায়ে'। তাই উলামায়ে কেরাম বলতেন,

شَرَحَ تُحْفَتَهُ فَتَزَوَّجَهُ اللَّهُ
অর্থ : কাসানী সমরকান্দীর তুহফা শরারহ লিখলেন, তাই সমরকান্দী কাসানীকে মেয়ে বিবাহ দিলেন。

সারা দেশ থেকে অগণিত ফতোয়া চাওয়া হতো। এতদিন ফাতেমা সমরকান্দীর এসব ফতোয়ায় থাকত ফকীহ পিতার দস্তখত। যখন বাদাইউল সানায়ে-র লেখক তাঁকে বিবাহ করলেন তখন থেকে তাঁর ফতোয়ায় থাকত ফকীহ পিতা ও ফকীহ স্বামী দুজনেরই দস্তখত।৬ সুবহানাল্লাহ!

খাওলা বিনতে সা'লাবা রাযি. মহান আল্লাহ তাঁর প্রসঙ্গে কুরআন নাজিল করেছিলেন যখন তিনি জীবনসঙ্গীর ব্যাপারে অভিযোগ নিয়ে গেলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সকাশে। তিনি বললেন,

يَا رَسُولَ اللَّهِ أَكَلَ شَبَابِي، وَنَثَرْتُ لَهُ مَا فِي بَطْنِي، حَتَّى إِذَا كَبِرَتْ سِنِّي وَانْقَطَعَ وُلْدِي، ظَاهَرَ مِنِّي. اَللَّهُمَّ إِنِّي أَشْكُو إِلَيْكَ
অর্থ : হে আল্লাহর রাসূল, আমার জীবনসঙ্গী আমার জীবন-যৌবন সব শেষ করেছেন, আমার উদরে যত সন্তানসম্ভাবনা ছিল সবই তাকে উজাড় করে দিয়েছি; অথচ আজ তিনি আমার সাথে যিহার করছেন। আয় আল্লাহ, তোমার কাছেই আমার অভিযোগ, অনুগ্রহ!

হযরত খাওলা রাযি. যিহারের ব্যাপারে বিধান জানতে চাইলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,

حَرُمْتِ عَلَيْهِ
অর্থ : তুমি তার ওপর হারাম হয়ে গেছ。

কিন্তু মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে যিহারের বিধানসংবলিত সূরা মুজাদালার কয়েকটি আয়াত নাজিল করলেন,

قَدْ سَمِعَ اللَّهُ قَوْلَ الَّتِي تُجَادِلُكَ فِي زَوْجِهَا وَتَشْتَكِي إِلَى اللَّهِ وَاللَّهُ يَسْمَعُ تَحَاوُرَكُمَا إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ بَصِيرٌ
অর্থ : নিশ্চয় আল্লাহ ওই নারীর কথা শুনেছেন, যিনি তাঁর জীবনসঙ্গীর ব্যাপারে আপনার সাথে বাদানুবাদ করছেন এবং আল্লাহর কাছে তাঁর কষ্টের অভিযোগ করছেন। আল্লাহ আপনাদের কথোপকথন শুনেছেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞানী। ... সূরা মুজাদালাহ : ০১

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীদের বাইয়াত করাচ্ছিলেন। তিনি বললেন,
'আপনারা শপথ করুন যে, কখনো আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবেন না।'

আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দ বাইয়াতের মজলিসে উপস্থিত ছিলেন। তিনি পর্দার আড়ালে ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উপস্থিতি সম্পর্কে জানতে পারেননি। রাসূলের কথা শুনে হিন্দ বললেন,
'আপনি তো আমাদের থেকে এমন প্রতিশ্রুতি নিয়েছেন যা পুরুষদের থেকেও নেন না; ঠিক আছে, শপথ করছি...'

এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
'কখনো কিছুতেই চুরি করবেন না।'

হিন্দ বললেন,
'আল্লাহর কসম, আমি শুধু আবু সুফিয়ানের মাল থেকে একটু আধটু জিনিস সরাতে চাইতাম।'

আবু সুফিয়ানও মজলিসে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বললেন,
'আচ্ছা আগে যা হয়েছে, হয়েছে। ওগুলো মাফ করে দিলাম।'

তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
'আপনি কি হিন্দ বলেছেন?'

হিন্দ বললেন,
'হ্যাঁ, আমি হিন্দ। অতীতে যা হয়েছে, সব ভুলের জন্য মার্জনা চাচ্ছি। আল্লাহও মার্জনা করুন...'

এই হিন্দই উহুদের যুদ্ধে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচা হামযা'র শাহাদাতের পর তাঁর কলজে চিবিয়েছিলেন। যাই হোক, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাইয়াত করানো চালিয়ে গেলেন, বললেন,
'কখনো ব্যভিচার করবেন না।'

হিন্দ বললেন,
'মুহাম্মাদ, কী বলেন! কোনো স্বাধীন নারীও ব্যভিচার করতে পারেন?'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাইয়াতের পরবর্তী বাক্য উচ্চারণ করে বললেন,
'কখনো সন্তানদের হত্যা করবেন না।'

হিন্দ বললেন,
'আমরা আমাদের সন্তানদের ছোটবেলায় আদর-যত্ন ও লালন-পালন করে বড় করেছি। আর বড়বেলায় বদরের যুদ্ধে আপনি ও আপনার অনুসারীরা তাদের হত্যা করে পরপারে পাঠিয়ে দিয়েছেন, সুতরাং আপনি এবং আমাদের সন্তানরাই আমাদের সম্পর্কে ভালো জানেন।'

হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু হেসে ফেললেন, এমন কি হেসে শুয়ে পড়ার উপক্রম হলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাইয়াতের পরবর্তী বাক্য উচ্চারণ করলেন, বললেন,
'সামনে পেছনে কখনো কারো নামে মিথ্যা অপবাদ আরোপ করবেন না।'

এবার হিন্দ বললেন,
'অপবাদ আরোপ করা তো খুবই খারাপ; কিন্তু মুখ ফসকে দু-এক্টা কথা তো বের হতেই পারে।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
'কখনো কোনো সৎ কাজে অবাধ্য হবেন না।'

হিন্দ বললেন,
'আরে, আপনার অবাধ্যই যদি হব, তো আপনার মজলিসে বসলাম কেন?'

এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বললেন, 'আপনি নারীদের বাইয়াত করান এবং আল্লাহর কাছে তাদের জন্য ইস্তিগফার করুন।'৭

দেখুন, ইসলামের প্রথম সেনাপতি, মানবতার প্রথম শিক্ষক হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কতটা ধৈর্যের পরিচয় দিলেন। হযরত হিন্দ রাযি.-এর কথাগুলোকে কোনো বিরোধিতা প্রকাশ করলেন না, ধমকও দিলেন না।

এই ঘটনায় আর যা-ই প্রকাশ পাক, এটা তো অবশ্যই প্রকাশ পাচ্ছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীর মতামতকে কতটা সম্মান দেখাতেন। কথা বলা বা সমালোচনা করার অধিকার নারীকে কতখানি দিতেন。

সীরাতগ্রন্থগুলো মুসলিম নারীবাণিজ্যতায় ভরপুর। বর্ণিত আছে, হযরত উমর ইবনে খাত্তাব রাযি. বিবাহ-শাদিতে মেয়েদের মোহরের বিষয়ে মুসলমানদের বাড়াবাড়ি দেখে মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছিলেন। তাই মসজিদের মিম্বরে আরোহণ করে হামদ ও ছানার পর বললেন,

لَا أَعْرِفُ مَنْ زَادَ فِي الصَّدَاقِ عَلَى أَرْبَعِينَ دِرْهَمًا فَفَقَدْ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَصْحَابُهُ الصَّدَاقَ فِيمَا بَيْنَهُمْ أَرْبَعِينَ دِرْهَمًا فَمَا كَوْنُ ذَلِكَ، وَلَوْ كَانَ الْإِخْبَارُ فِي ذَلِكَ تَقْوَى عِنْدَ اللَّهِ أَوْ مَكْرُمَةً لَمَا سَبَقَتَمُونُنَّ إِلَيْهَا
অর্থ : আমি জানি না, কে মোহরের পরিমাণ চারশো দিরহামেরও বেশি করে দিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবা কেরামের মোহর চারশো দিরহাম বা এর কাছাকাছি অথবা সামান্য কমবেশি হতো। যদি মোহরের পরিমাণ বেশি করা আল্লাহর কাছে অধিক তাকওয়া ও মর্যাদার বিষয় হতো, তা হলে তোমরা তাদের ছাড়িয়ে যেতে পারতে না。

এ কথা বলে হযরত উমর রাযি. মিম্বর থেকে নেমে এলেন। অচিরেই জনৈকা কুরাইশিয়া নারী হযরত উমর রাযি.-কে জিজ্ঞেস করলেন,

হে আমীরুল মুমিনীন, আপনি কি চারশো দিরহামের বেশি মোহর ধার্য করতে অনুৎসাহিত করেছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। ওই নারী বললেন, আপনি কুরআনের আয়াত শোনেননি? তিনি বললেন, কোন আয়াতের কথা বলছেন?

তিনি বললেন, আল্লাহ তাআলা বলেছেন,

وَإِنْ أَرَدْتُمْ اسْتِبْدَالَ زَوْجٍ مَكَانَ زَوْجٍ وَآتَيْتُمْ إِحْدَاهُنَّ قِنْطَارًا فَلَا تَأْخُذُوا مِنْهُ شَيْئًا أَتَأْخُذُونَهُ بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُّبِينًا
অর্থ : আর যদি তোমরা একজন স্ত্রীকে বাদ দিয়ে আরেকজন স্ত্রী গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেল, আর সেই স্ত্রীকে বিপুল পরিমাণ সোনাদানা মোহর হিসেবে দিয়ে থাক, তা হলে তা থেকে কিছুই ফেরত নিও না। তোমরা কি মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে সুস্পষ্ট পাপাচার করে তা ফেরত নিতে চাও? –সূরা নিসা : ২০

হযরত উমর (রাযি.) বললেন, ‘হে আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা করুন, সব মানুষই দেখি উমরের চেয়ে ভালো বোঝে।' এরপরই তিনি তাঁর সেই বিখ্যাত উক্তিটি করলেন,৮

أَصَابَتْ امْرَأَةٌ وَأَخْطَأَ عُمَرُ
অর্থ : একজন নারী ঠিক বুঝেছেন; কিন্তু উমর ভুল বুঝেছেন। চিন্তা করুন, আমীরুল মুমিনীন হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কত উচ্চ পর্যায়ের মানুষ ছিলেন। মুসলিমসমাজে তাঁর কেমন সম্মান ছিল। অথচ তিনিই নির্দ্বিধায় একজন নারীর কথা শুনতে কুন্ঠাবোধ করলেন না। অবলীলায় নিজের ভুল স্বীকার করে নিলেন এবং সেই নারীর মতকেই সঠিক বলে স্বীকৃতি দিলেন। এই ঘটনায় স্পষ্টত প্রতীয়মান হয় যে, ইসলাম নারীকে কতটা সম্মান দান করেছে; ইসলামে নারীর মর্যাদা কতখানি。

সীরাত ও তারিখের গ্রন্থগুলোতে মুসলিম নারীর বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতারও অনেক ঘটনা এসেছে। হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে মদীনায় হিজরত করলেন তখন আনসারিয়া সম্পদ ছিল সবাই সাথে নিয়ে চলে গেলেন। পরিবারের জন্য কিছুই রেখে গেলেন না। হযরত আসমা বিনতে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহা বললেন,

فَأَتَانِيَ جَدُّ بِي أَبُو قُحَافَةَ وَقَدْ عَمِيَ فَقَالَ : إِنَّ هَذَا فَجَعَكُمْ بِمَالِهِ وَنَفْسِهِ . فَقُلْتُ : كَلَّا قَدْ تَرَكَ لَنَا خَيْرًا كَثِيرًا فَعَمَدْتُ إِلَى أَخْبَارِ فَجَعَلْتُهَا فِي كَوَةٍ الْغَيْبِ وَغَطَّيْتُ عَلَيْهَا بِثَوْبٍ ثُمَّ أَخَذْتُ بِيَدِهِ وَوَضَعْتُهَا عَلَى الثَّوْبِ فَقُلْتُ : هَذَا مَا تَرَكَهُ لَنَا فَقَالَ : أَمَّا إِذًا تَرَكَ لَكُمْ هَذَا فَنَعْمَ
অর্থ : তখন আমার দাদা আবু কুহাফা এলেন। তিনি অন্ধ ছিলেন। তিনি বললেন, আবু বকর নিজেদের ব্যাপারে তো তোমাদের বিপদে ফেলেছেই, অর্থসম্পদেও তোমাদের সর্বনাশ করে রেখে গেছে, তাই না? তখন আমি বললাম, না না, তিনি আমাদের জন্য অনেক কিছু রেখে গেছেন। তারপর আমি ঘরের কোণে কিছু পাথর জড়ো করে কাপড় দিয়ে ঢেকে দিলাম। দাদার হাত ধরে নিয়ে গিয়ে বললাম, এই যে দেখুন, আপনার ছেলে আমাদের জন্য কত কিছু রেখে গেছেন। তিনি বললেন, হুম... যদি এত কিছু রেখে গিয়ে থাকে তা হলে ঠিকই আছে।৯

ইসলামের ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে দেখি জিহাদের ময়দানেও নারীরা পুরুষের সাথে থেকেছেন। উম্মে আম্মারা মাযিনিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহা বললেন,

لَقَدْ رَأَيْتُنِي وَقَدْ انْكَشَفَ النَّاسُ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ وَمَا بَقِيَ إِلَّا نَفَرٌ يُقَاتِلُونَ عَشَرَةً وَأَنَا وَابْنَايَ وَزَوْجِي بَيْنَ يَدَيْهِ نَذُبُّ عَنْهُ وَالنَّاسُ يَمُرُّونَ بِهِ مُنْهَزِمِينَ وَرَأَيْتُ لَا تُرْسَ مَعِي فَرَأَى رَجُلًا مُوَلِيًا مَعَهُ تُرْسٌ ، فَقَالَ لِصَاحِبِ التَّرْسِ : أَلْقِ تُرْسَكَ لِمَنْ يُقَاتِلُ ، فَأَلْقَى تُرْسَهُ فَأَخَذْتُ أَتْتَرَسُ بِهِ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَقْبَلَ رَجُلٌ عَلَيَّ فَضَرَبَنِي ضَرْبَةً فَشَرْتُتُ لَهُ فَلَمْ يُصْنَعُ مِنْهُ شَيْئًا فَقَالَ : فَاعْرِفِي غَرْفُتُهُ فَرَجَعَ عَلَى ظَهْرِهِ فَجَعَلَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُضِيئُ : يَا أُمَّ عَمَّارَةَ أَمَامَكِ قَالَتْ : فَمَا تَوَلَّيْتُ عَلَيْهِ حَتَّى أَوْرَدْتُهُ شُعُوبَ الْمَنِيَّةِ
অর্থ : আমি দেখলাম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেকটা অরক্ষিত অবস্থায় আছেন। তাঁর আশেপাশে সর্বসাকুল্যে দশজনের মতো হবেন। আমি, আমার দুই ছেলে এবং আমার জীবনসঙ্গী সামনে থেকে তাকে সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করছিলাম। অনেকেই পরাস্ত হয়ে ফিরে যাচ্ছিল। তিনি দেখলেন, আমার সাথে কোনো ঢাল নেই। একজন আহত সৈনিকের সাথে ঢাল দেখে তিনি বললেন, যুদ্ধরত কারো হাতে তোমার ঢাল ছুঁড়ে দাও। লোকটি তার ঢাল ছুঁড়ে দিলে আমি তা তুলে নিলাম এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুরক্ষার চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম। এক অশ্বারোহী আমাকে লক্ষ্য করে এগিয়ে এল এবং তরবারি দ্বারা আঘাত করতে লাগল। আমি ঢাল দ্বারা তার আঘাতকে প্রতিহত করতে থাকলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চিৎকার করে বলে উঠলেন, উম্মে আম্মারা, সামনে দ্যাখো। তিনি বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে সহায়তা করলেন। লোকটিকে আমি মৃত্যুপুরিতে নামিয়ে দিলাম।১০

সাফিয়া বিনতে আবদুল মুত্তালিব রাযিয়াল্লাহু আনহা ছিলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্মানিতা ফুফু। তিনি পরিখার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তিনি বললেন,

أَنَّا أُوَلُ امْرَأَةٍ قُتِلَتْ رَجُلًا وَجَلَّا فَقُلْتُ مُغْنِ نَا فَمَزَّقَنَا عَبَّأَنَا بْنَا تَقْوَدُدُ بِالْبَضَمِ الْبَضَمِ فَقُلْتُ جُثْمَانَ : مِثْلُ هَذَا لَا أَمِنُهُ عَلَى أَنْ يَدُلَّ عَلَى غَزْوَتِنَا فَمُصْعَبٌ قَالَ : يَغْفِرُ اللَّهُ لَكِ لَقَدْ عَرَّيْتِ أَنَّهُ مَا يَصَاحِبُ هَذَا . فَأَحْصَرَثْ - شَدَّتْ وَسَطَهَا - وَأَخَذَتْ عَصْرَةً فَضَرَبَتْهُ حَتَّى قَتَلْتُهُ
অর্থ : পরিখার যুদ্ধে আমিই প্রথম নারী, যে কোনো কাফেরের জীবনলীলা সাঙ্গ করেছিল। হাসসান ইবনে সাবিত রাযিয়াল্লাহু আনহু আমাদের সাথে ছিলেন। আমাদের পাশ দিয়ে এক ইহুদি অতিক্রম করল। লোকটি দুর্গের প্রাচীর ঘুরঘুর করছিল। আমি হাসসানকে বললাম, আমার আশঙ্কা হচ্ছে, সে আমাদের গোপন আস্তানার সন্ধান দিয়ে দেবে। যান, ওকে হত্যা করুন। তিনি বললেন, আল্লাহ আমাকে মাফ করুন, আপনি তো জানেন যে, আমি এর যোগ্য নই। তখন আমি শক্ত করে কোমর বাঁধলাম এবং একটি কাঠফলক নিয়ে নিচে নেমে এলাম। তারপর লোকটিকে আঘাত করে মেরে ফেললাম।১১

হযরত উম্মে আতিয়্যা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন,

غَزَوْتُ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سَبْعَ غَزَوَاتٍ أَخْلُفُهُمْ فِي رِجَالِهِمْ وَأَصْنَعُ لَهُمُ الطَّعَامَ
অর্থ : আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে সাতটি গাজওয়ায় অংশগ্রহণ করেছিলাম। আমি কাফেলার পেছনে থাকতাম এবং যোদ্ধাদের জন্য খাবার তৈরি করতাম।১২

রাফীদা আনসারিয়্যা রাযিয়াল্লাহু আনহা চিকিৎসাবিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন। তিনিও যুদ্ধাভিযানে বের হতেন। তাঁর দায়িত্ব ছিল আহত সৈনিকদের সেবাযত্ন ও চিকিৎসা করা। তাঁর জন্য একটি আলাদা তাঁবু ছিল। সেখানে আহত সৈনিকদের পৌঁছে দেওয়া হতো। রাফীদা আনসারিয়্যা রাযিয়াল্লাহু আনহা আপন প্রতিপালকের কাছে এ জন্য বিনিময়ের প্রত্যাশা করতেন। পরিখার যুদ্ধে যখন সা'দ ইবনে মুআয ওয়াসাল্লাম বলছেন, আল্লাহু আনহু আহত হলেন তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি
وَعَلَّمُ إِخْلَؤُ وْ ا ِفِي جَمِيْعِ رُبِّةِ حَقِّ أَبُوهُ وَمَنْ قَرِيبِ
অর্থ : সাদকে রাফিদার তাঁবুতে নিয়ে যাও। আমি শীঘ্রই তাকে দেখতে আসব।'১৩

ইসলামের শুরুর সোনালি যুগে রাজনৈতিক বিষয়াদিতেও মুসলিম নারীর উপস্থিতি লক্ষণীয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কন্যা হযরত যায়নাব রাযিয়াল্লাহু আনহা তাঁর স্বামীর পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। ইসলাম স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ধর্মের বৈরিপত্য গ্রহণ করে না। তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে。

বদরের যুদ্ধে তাঁর স্বামী আবুল আস ইবনে রবি মুসলমানদের বিরুদ্ধে কুরায়শদের পক্ষে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি মুসলমানদের হাতে বন্দি হন। হযরত যায়নাব রাযি. জানতে পেরে আবুল আসের মুক্তিপণস্বরূপ নিজের গলার হার পাঠিয়ে দেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হারটি চিনতে পারেন। মক্কায় অবস্থানরত মেয়ের গলার হার দেখে স্নেহশীল পিতার হৃদয়ে দহন-যন্ত্রণা শুরু হয়। সাহাবা কেরামকে বলেন, তোমরা যদি যায়নাবের মুক্তিপণ নিয়ে আবুল আসকে ছেড়ে দিতে চাও, দিতে পারো। সাহাবা কেরাম আবুল আসকে ছেড়ে দিলেন。

এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত যায়নাব রাযিয়াল্লাহু আনহাকে মক্কা থেকে মদিনায় আনার জন্য লোক পাঠান। আবুল আসের পরিবার তাঁকে আটকানোর নানা ষড়যন্ত্র করলেও শেষমেশ তিনি যায়েদ ইবনে হারেসা রাযিয়াল্লাহু আনহার সাথে পিতার কাছে চলে আসতে সক্ষম হন। আবুল আস মক্কায় থেকে যান。

একবার আবুল আস বণিকদলের সাথে সিরিয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। পথিমধ্যে মুসলিম-বাহিনীর সাথে তাদের খণ্ডযুদ্ধ হয়। তিনি বাণিজ্যবহর রেখে পালিয়ে যান। আবুল আস রাতের অন্ধকারে হযরত যায়নাব রাযিয়াল্লাহু আনহার কাছে এসে নিরাাপত্তার আশ্রয় ভিক্ষা করেন। হযরত যায়নাব রাযিয়াল্লাহু আনহা তাকে নিরাপত্তা আশ্রয় দান করেন। আবুল আস মূলত অর্থসম্পদ ফিরে পাওয়ার প্রত্যাশা করছিলেন。

যাইহোক, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের নামাযের জন্য বের হলেন। তিনি তাকবীরধ্বনি দিলে মুসলমানগণও তাকবীরধ্বনি দিলেন। তখন হযরত যায়নাব রাযিয়াল্লাহু আনহা মেয়েদের কাতার থেকে উচ্চস্বরে বললেন,
হে লোকসকল, আমি আবুল আস ইবনে রবি'কে নিরাপত্তার আশ্রয় প্রদান করেছি。

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাযের সালাম ফিরিয়ে সাহাবা কেরামকে লক্ষ্য করে বললেন, আমি যা শুনতে পেলামও কি তা শুনতে পেয়েছ? সাহাবা কেরাম আরয করলেন, হ্যাঁ, ইয়া রাসূলুল্লাহ। তিনি বললেন, কসম ওই সত্তার যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ, আমি এ বিষয়ে কিছু জানতাম না। এইমাত্র তোমরা যা শুনেছ, আমিও তা-ই শুনেছি। তবে মুসলমানদের মধ্যে যে সবচেয়ে দয়াবান, সেও মুসলিম-সমাজে কাউকে নিরাপত্তার আশ্রয় প্রদান করতে পারে。

এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত যায়নাব রাযিয়াল্লাহু আনহার কাছে গেলেন এবং বললেন, মা, তুমি যাকে আশ্রয় প্রদান করেছ, তাকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করো। তবে সে যেন তোমার কাছে আসতে না পারে। তুমি তার জন্য বৈধ নও。

এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবা কেরামের কাছে গেলেন এবং বললেন, তোমরা চাইলে তার সম্পদ ফিরিয়ে দিতে পারো, চাইলে নিয়েও নিতে পারো। এটা আল্লাহর গনিমত। এর হকদার তোমরাই। সাহাবা কেরাম বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমরা তা ফিরিয়ে দেব。

আবুল আস সম্পদ ফেরত পেয়ে মক্কায় চলে এলেন। তিনি যত পাওনাদার ছিল সকলের ঋণ পরিশোধ করে দিলেন। তারপর কুরাইশ লোকদের একত্র করে বললেন,
হে কুরাইশ, তোমাদের মধ্যে এমন কেউ কি এখনো আছে, আমার কাছে যার পাওনা আছে? সকলে বললেন, না। তোমাকে আল্লাহ উত্তম বিনিময় দান করুন। আমরা তোমাকে বিশ্বস্ত ও সম্মানীরূপে পেয়েছি। আবুল আস বললেন, তা হলে শোনো, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আমি এও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। আল্লাহর কসম, তারা যখন আমাকে সমস্যায় ছেড়ে দিল, তখনই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, আমি ইসলাম গ্রহণ করব। কিন্তু তখন ইসলাম গ্রহণ করিনি। কেননা, তোমরা বলতে, তোমাদের সম্পদ আত্মসাৎ করার জন্যই এমনটা করেছি। আল্লাহর আগ্রহ হেতু তোমাদের ঋণ পরিশোধ করে দিয়েছেন, আর আমিও দয়াবান থেকে মুক্তি লাভ করেছি, সেহেতু আমার ইসলাম গ্রহণ করতে আর কোনো বাধা নেই।১৪

এরপর আবুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু মক্কা ত্যাগ করে মদিনায় চলে এলেন। তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আপন স্ত্রীকে ফিরে পেতে চাইলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত যায়নাব রাযিয়াল্লাহু আনহাকে তার কাছে ফিরিয়ে দিলেন。

মক্কা বিজয়ের বছর হযরত উম্মে হানি বিনতে আবি তালিব রাযিয়াল্লাহু আনহা একজন কাফেরকে নিরাপত্তা প্রদান করলেন। কিন্তু তার ভাই আলী ইবনে আবি তালিব রাযিয়াল্লাহু আনহা লোকটিকে হত্যা করতে চাইলেন। তখন উম্মে হানি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এলেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমার আপন ভাই একজন একজন লোককে হত্যা করতে উদ্যত, যাকে স্বয়ং আমি আশ্রয় প্রদান করেছি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,

قَدْ أَجَرْنَا مَنْ أَجَرْتِ يَا أَمَّ هَانِي
অর্থ : হে উম্মে হানি, তুমি যাকে আশ্রয় প্রদান করেছ, আমরাও তাকে আশ্রয় প্রদান করলাম。

ইসলামের ইতিহাসের মুসলিম নারীগণ অত্যাচারী শাসক-প্রশাসকের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও সহাসসে দেখাতে পিছপা হননি। অঙ্কুচিত্তো সত্য বলা থেকেও বিরত থাকেননি。

হযরত আসমা বিনতে আবু বকর রাযি.-কেই দেখুন। তাঁর কলিজার টুকরা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রাযি.-কে হত্যা করার পর কুখ্যাত জালেম শাসক হাজ্জাজ বিন ইউসুফ তাঁর ঘরে গেলেন এবং বললেন,

إِنَّ وَلَدَكَ هَذَا الْبَيْتُ وَإِنَّ اللَّهَ أَدَّا هُ مِنْ عَذَابِ الْأُثمُ وَفَعَلَ بِهِ مَا فَعَلَ
অর্থ : আপনার সন্তান স্বেচ্ছাচারিতা করেছে, তাই আল্লাহ তাকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দিয়েছেন এবং তার সাথে যে আচরণ করার করেছেন।১৫

হযরত আসমা রাযিয়াল্লাহু আনহা বললেন,

كَذَبْتَ وَاللَّهِ لَقَدْ كَانَ بَارًّا بِوَالِدَيْهِ صَوَّامًا قَوَّامًا فَلَمَّا أَخْبَرَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ سَيَخْرُجُ مِنْ ثَقِيْفِ كَدَّابَانِ الْأَخِيْرُ مِنْهُم مِّنَ الْأَوَّلِ وَهْوَ مُبِيْرٌ أَمَّا الْكَدَّابُ فَقَدْ رَأَيْنَاهُ وَأَمَّا الْمُبِيرُ فَلَا أَخَالُكَ إِلَّا إِيَّاهُ فَلَقَدْ أَفْسَدْتَ عَلَيْهِ دُنْيَاهُ وَأَفْسَدَتْ عَلَيْكَ آخِرَتَكَ
অর্থ : তুই মিথ্যা বলেছিস। আল্লাহর কসম, সে তার পিতামাতার প্রতি সদাচারী ছিল। সদাসর্বদা সিয়াম-কিয়ামে রত ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের বলেছিলেন, অচিরেই সাকিফেন একজন মহা মিথ্যাবাদী ও একজন ভয়ংকর রক্তপিপাসুর আগমন হবে। শেষজন প্রথমজন অপেক্ষা অধিক অনিষ্টকারী হবে। আমরা সেই মিথ্যাবাদীকে দেখেছি। আর রক্তপিপাসু, আমার তো মনে হচ্ছে তুই-ই সেই রক্তপিপাসু। আরে, তুই তো তার দুনিয়া গেলি; কিন্তু সে তো তোর আখেরাতও খেলো।

টিকাঃ
১. সহীহ মুসলিম।
২. সিয়ার আ’লামিন নুবালা : ২/১৮৭।
৩. তিরমিযী।
৪. হাকিম।
৫. আল বিদায়া ওয়াছছায়ান নিহায়া: ৮/৪৭১
৬. আউয়াছছুল হিলম: ২/৮৮১
৭. আল ইছাবাহ ফী তাময়ীযিস সাহাবাহ : ৪/২৫৫।
৮. ফায়াদুল মায়াশা : ৩/২৭২।
৯. সীরাত ইবনে হিশাম : ২/২৪০।
১০. আল ইসাবাহ ফী তাময়ীযিল সাহাবা : ৮/১৮৮।
১১. সীরাত ইবনে হিশাম : ৬/২১৯।
১২. সহীহ মুসলিম।
১৩. আল ইসাবাহ : ৮/৮২।
১৪. সীরাতে ইবনে হিশাম : ১/৬৫৭-৬৫৮।
১৫. সহীহ বুখারী ও মুসলিম।

📘 ফিরে এসো নীড়ে 📄 একজন আদর্শ মা

📄 একজন আদর্শ মা


এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।

📘 ফিরে এসো নীড়ে 📄 মাহাত্ম্যের উৎসমূল, নেতৃত্বের লালনক্ষেত্র

📄 মাহাত্ম্যের উৎসমূল, নেতৃত্বের লালনক্ষেত্র


সন্তান লালন-পালনের দায়িত্ব ইসলামী শরীআতে ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে নারী-পুরুষ উভয়কে দেওয়া হয়েছে। তথাপি, মায়ের সাথে শিশুর সম্পর্কের গভীরতা বেশি। মা-ই শিশুর সাথে সবসময় লেগে থাকেন। তিনিই তাকে গর্ভে ধারণ করেন, স্তন্যদান করেন; তার সবকিছু দেখাশোনা করেন। মায়ের শরীর ও স্বাস্থ্য থেকেই সন্তানের শরীর ও স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটে। মা-ই সন্তানের জন্য রাত জাগেন। মা-ই সন্তানের জন্য অধিকাংশ কাজ করেন।

এটা স্রষ্টার প্রদত্ত সুবিধান। তিনি নারী সৃষ্টি-উপাদানে এমন কিছু দিয়ে রেখেছেন, যা তাকে অবলীলায় এভাবে উদ্বুদ্ধ করে। তাই ইসলামের কর্মগঠন-নীতিও এমনই। তাই মা-ই সন্তানের উন্নত চরিত্রের দিশা দেন, তাকওয়া-তাহারাত ও পবিত্রতায় দীক্ষিত করেন। মায়ের প্রাজ্ঞ পরিচালনায় শিশু শৈশব, কৈশোর পার করে; পরিণত হয় শক্ত-সমর্থ মানুষে। তারপর তারাই সমাজের মাথা হয়, জাতির নেতা হয়। তাই তো মা মাহাত্ম্যের উৎসমূল, নেতৃত্বের লালনক্ষেত্র।

কবি হাফিজ ইব্রাহিমের ভাষায় বলতে হয়,

الْأُمُّ مَدْرَسَةٌ إِذَا أَعْدَدْتَهَا أَعْدَدْتَ شَعْبًا طَيِّبَ الْأَعْرَاقِ

অর্থ : জননী জগতের শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয়। যদি এ বিদ্যালয়টিকে ভালোভাবে গড়তে পার, তবে গড়তে পার উন্নত জাতি।

কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, আমরা যে সমাজে বাস করি, সেই সমাজে তো অনেক অইসলামিক বিষয়ের অনুপ্রবেশ ঘটেছে, অপসংস্কৃতিও আছে, এটা কি ইসলামী সমাজ, না অন্য কিছু। অনেকে বলেন, এটা আধা ইসলামী সমাজ। তা যাই হোক, এমন প্রতিকূল পরিবেশে শরীআতের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয়ে এমন ফলপ্রসূ লালন-পালন কী করে সম্ভব? অনেকে বলে বসেন, ভবিষ্যতে আর সাচ্চা ঈমানদার, আল্লাহ্ওয়ালা নতুন প্রজন্ম গড়ে তোলা সম্ভব নয়।

কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনাদর্শ লক্ষ করুন, আমাদের সালাফে সালিহীনের জীবনাদর্শে দৃষ্টিপাত করুন, দেখবেন, জীবন ও জগতে পূর্ণ আল্লাহ্মুখী; মন-মানসে, আচার-ব্যবহারে সিরাতে মুস্তাকীমের ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি সত্যিকার মুমিন-মুসলিম-প্রজন্ম গড়ে তোলা এখনো সম্ভব।

কিন্তু সেরকম একটি গৌরবময় প্রজন্ম যখন-তখন, যেমন-তেমন করে আসে না। এজন্য প্রয়োজন হয় অনেক দিনের নিরন্তর সাধনা, আরাধনা; বেলাগাম মেহনতের, মুজাহাদার। এজন্য আমাদের প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছু মৌল নীতি ও আদর্শ এবং ঈমানী রূপরেখা এঁকে দিয়ে গেছেন, যা আমাদের একটি ইসলামী পরিবার ও ইসলামী সমাজ গঠনে সহায়তা করবে।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

أَلَا كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ، فَالْأَمِيرُ الَّذِيْ عَلَى النَّاسِ رَاعٍ وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ، وَالرَّجُلُ رَاعٍ عَلَى أَهْلِ بَيْتِهِ وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْهُمْ، وَالْمَرْأَةُ رَاعِيَةٌ عَلَى بَيْتِ زَوْجِهَا وَوَلَدِهِ وَهِيَ مَسْئُولَةٌ عَنْهُمْ، وَالْعَبْدُ رَاعٍ فِي مَالِ سَيِّدِهِ وَهُوَ مَسْؤُوْلٌ عَنْهُ أَلَا فَكُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْؤُوْلٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ

অর্থ : শোনো, তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। তোমাদের প্রত্যেককেই যার যার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। যিনি নেতা নির্বাচিত হবেন, তিনি সমাজের দায়িত্বশীল। তিনি তার প্রজাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন। পুরুষ তার পরিবারের দায়িত্বশীল। তিনি তার পরিবার সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন। নারী স্বামীর ঘর ও সন্তানের দায়িত্বশীল। তিনি তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন। সেবক তার মনিবের সম্পদের দায়িত্বশীল। তিনিও সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন। শোনো, তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। তোমরা প্রত্যেকেই জিজ্ঞাসিত হবে।১

এই হাদীসটি থেকে প্রতীয়মান হয় যে, সন্তান লালন-পালনের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে নারী-পুরুষ উভয়ই দায়িত্বশীল। সন্তান মানুষ করার বিষয়টি উভয়ের অংশগ্রহণের মাধ্যমে পূর্ণতা লাভ করবে। এক্ষেত্রে কোনো একজন যদি নিজ দায়িত্ব থেকে হাত গুটিয়ে নেয়, তা হলেই ঘাটতি থেকে যাবে।

সন্তান মানুষ করার এই নীতিটিই সুন্দর সহাবস্থান, ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতার পরিচায়ক। সন্তান লালন-পালনের বিভিন্ন স্তর ও পর্যায়ভেদ আছে। ইসলামে সবকটিই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, সবগুলোই একটি আরেকটির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কোনো একটিকে কোনো একটির উপর প্রাধান্য দেওয়ার অবকাশ নেই। এগুলোর প্রত্যেকটিই এমনভাবে সাজানো, যেন পূর্বেরটি পরেরটির ক্ষেত্রপ্রস্তুতকারী।

ব্যক্তিজীবনের মূল ভিত্তি হিসেবে নির্ধারণ করা যায় শৈশবকে। এজন্যই ইসলাম শৈশবের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে। এ সময় শিশুকে যে চিন্তাভাবনা ও অভ্যাসের ওপর গড়ে তোলা হবে, সেটাই তার মনে বসে যাবে। এটা সারা জীবন তার ওপর প্রভাব হিসেবে কাজ করবে। শৈশবে সে যে চেতনা লাভ করেছে, তা থেকে মুক্ত হওয়া তার জন্য খুবই কঠিন হবে।

এজন্য ইসলাম এ ব্যাপারে এত বেশি গুরুত্ব আরোপ করেছে যে, মানুষ যখন বিবাহের চিন্তাভাবনা শুরু করে, তখন থেকেই তাকে এ ব্যাপারে মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে হয়। যেন কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে চূড়ান্ত সফলতা লাভ করা সম্ভব হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

تُنكَحُ الْمَرأةُ لِأَرْبَعِ : لِمَالِهَا وَلِحَسَبِهَا وَلِجَمَالِهَا وَلِدِينِهَا ، فَاظْفَرْ بِذَاتِ الدِّينِ تَرِبَتْ يَدَاكَ

অর্থ : মেয়ে বিবাহ করা হয় চারটি গুণ দেখে : অর্থ দেখে, বংশ দেখে, সৌন্দর্য দেখে এবং ধার্মিকতা দেখে। তুমি কিন্তু ধার্মিক মেয়ে খুঁজে নেবে। বুঝলে, হে!২

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন,

إِذَا جَاءَكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ دِينَهُ وَخُلُقَهُ فَزَوّجُوْهُ إِلَّا تَفْعَلُوْهُ تَكُنْ فِتْنَةٌ فِي الْأَرْضِ وَفَسَادٌ عَرِيضٌ

অর্থ : যদি তোমরা এমন কাউকে পাও যার ধার্মিকতা এবং স্বভাব-চরিত্র তোমাদের কাছে সন্তোষজনক, তা হলে তার সাথে মেয়ে বিবাহ দাও। নয়তো জমিনে ফেতনা হবে। ব্যাপক গোলযোগ হবে।৩

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন,

تَخَيَّرُوا لِنِطَفِكُمْ فَاَنْكِحُوا الْاَكْفَاءَ وَانْكِحُوا إِلَيْهِمْ

অর্থ : তোমরা তোমাদের বংশধারার জন্য ভালোমন্দ যাচাই করো। যথাযোগ্য ও সমকক্ষ দেখে বিবাহ করো এবং বিবাহ দাও।৪

ইসলামের দিক-নির্দেশনা অনুযায়ী পুরুষ যখন তার জীবনসঙ্গিনী নির্বাচন করে নেবে, তখনই বলা যাবে যে, সে তার সন্তানের প্রতি সদাচার করল, ন্যায় বিচার করল। কেননা, সে তার সন্তানকে একজন ভালো মা উপহার দিল। কবি বলেন,

وَ أَوَّلُ إِحْسَانِ الْيَكُمْ لِذُرِّي لِحِدَادِ الْأَعْرَاقِ بِأَدْغَاهَا

অর্থ : তোমাদের প্রতি আমার প্রথম অনুগ্রহ এই যে, আমি তোমাদের জন্য একজন সৎ বংশজাত মা নির্বাচন করেছি, যার পবিত্রতা সূর্যের আলোর মতো স্পষ্ট।

এভাবে একজন নারীও যখন ধার্মিক জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার প্রয়াসী হন, তখনই মূলত সন্তানের প্রতি সদাচার ও ন্যায় বিচার করেন। কেননা, এভাবে তিনি তার সন্তানকে একজন ভালো পিতা উপহার দেওয়ার পূর্বশর্তটি পূর্ণ করেন।

ইসলামের বিধি মোতাবেক সম্পন্ন হওয়া এরকম একটি আদর্শ বিবাহের পরেই একটি সুস্থ, সুন্দর দাম্পত্যজীবনের নিশ্চয়তা-বিধান সম্ভব হয়। এভাবে একটি সত্যিকার ইসলামী পরিবার গঠন ও উন্নত প্রজন্ম গড়ে তোলার পথ সুগম হয়। ইনশাআল্লাহ, এরকম একটি ইসলামী পরিবারে আল্লাহর রহমত নেমে আসবে। এই পরিবারে মাতৃত্বকাল হবে আল্লাহর রহমত ও করুণায় ভরা। এই পরিবারের স্বচ্ছ সুন্দর পরিবেশ হবে আল্লাহর অনুগ্রহে আচ্ছাদিত। ভবিষ্যৎ-প্রজন্মের রক্ষণাবেক্ষণ, আল্লাহপ্রদত্ত ফিতরাতের সংরক্ষণ যদি সম্ভব হয়, তা হলে এই পরিবারেই হবে।

টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী ও মুসলিম।
২. সহীহ বুখারী ও মুসলিম।
৩. তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, হাকেম, বাইহাকী।
৪. ইবনে মাজাহ, হাকেম, বাইহাকী।

📘 ফিরে এসো নীড়ে 📄 ফিরে এসো নীড়ে

📄 ফিরে এসো নীড়ে


বিগত কয়েক শতাব্দী মুসলিম নারী আপন মহিমায় ছিল ভাস্বর। পর্দার আড়ালে সুরক্ষিতা মণি-মুক্তোর মতো দেদীপ্যমান। ঘরের সিংহাসনে সমাসীনা মহিমান্বিতা মালকিন। ঘরে বসে গড়ে মহামানব, মহাবীর, মহাজ্ঞানী। মুসলিম নারীর এই অবিচল অবস্থান নিশ্চিত করেছিল মুসলিম জাতির অপ্রতিরোধ্যতা, অপ্রতিদ্বন্দ্বিতা; নিশ্চিত করেছিল মুসলিম দুর্গের দুর্ভেদ্যতা, দুর্লঙ্ঘ্যতা।

তাই ঔপনিবেশিক গোষ্ঠী ছিল হয়রান পেরেশান। তাদের মুখখাওয়া ও গুণগাওয়া পদলেহীরাও ছিল হতবাক হতবুদ্ধি। মুসলিম দুর্গের দুর্ভেদ্যতার সামনে তাদের সকল শ্রম, সকল সাধনাই যেন পণ্ড হয়ে যায়। কিন্তু যারা ইসলামের আজন্ম শত্রু, তাদের কি আর সহ্য হয়? তারা কি আর বরদাশত করতে পারে? মুসলিম উম্মাহর শক্তি, সামর্থ্য, সহনশক্তি, আত্মিক বিপুল সমৃদ্ধি, জাগতিক বিশাল শান-শওকত তাদের কি হিংসার অনলে পোড়ায় না?

অবশেষে তারা মরণকামড় দিতে উদ্যত হলো। ষড়যন্ত্র ও শলাপরামর্শের মহড়া দিতে শুরু করল। তাদের একটাই লক্ষ্য —কী করে মুসলিম সমাজের মূলে কুঠারাঘাত করা যায়? তাদের সমগ্র শক্তি নিয়োগ করল শুধু একটি বিষয় উদ্ঘাটনে—যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী কী করে একটি জাতি এমন অপ্রতিরোধ্য থাকতে পারল? কী এমন আছে যা তাদেরকে বার্ধক্য, জরাজীর্ণতা, ঘুশেঁ ধরা ও পোকায় খাওয়া থেকে রক্ষা করছে এতকাল?

অবশেষে তারা আবিষ্কার করে ফেলল। মুসলিম জাতির শক্তির রহস্য উদ্ঘাটন করে ফেলল। তারা আবিষ্কার করল, মুসলিম জাতির শক্তির রহস্য—আর কিছু নয়, মুসলিম নারী—যে নারী বিলকুল কিছু উশৃঙ্খলতাহীন, অসাধারণ কিছু বৈশিষ্ট্যে বিশিষ্টা। যার মনোবল ইস্পাতকঠিন, অবিচলতা পর্বতপ্রমাণ। যিনি সত্যকথনে নির্ভয়, নির্মোহা। যিনি পারেন সত্যিকার মুমিন ও মুত্তাকী একটি নতুন প্রজন্ম জাতিকে উপহার দিতে প্রতিটি যুগে, প্রতিটি শতাব্দীতে; যারা আপন ঈমান ও আকীদার প্রতি গভীরভাবে শ্রদ্ধাশীল, এবং ধর্ম ও বিশ্বাসের মূলে কঠিনভাবে গ্রথিত।

তারা মুসলিম নারীকে টার্গেট করল। ছলে বলে কৌশলে তাকে নিজ ধর্ম ও বিশ্বাসের প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তুলতে লাগল। টোপ হিসেবে ব্যবহার করল তথাকথিত প্রগতি নামের আপাতমধুর স্লোগান।

গ্ল্যাডস্টোন, ব্রিটিশ (তৎকালীন) প্রধানমন্ত্রী, ব্রিটেনের গণসভায় দম্ভভরে ঘোষণা দিয়েছিলেন, “যতদিন মুসলিম নারীর হিজাব উঠিয়ে দেওয়া না যাবে এবং যতদিন মুসলমানদের কুরআন বন্ধ করা সম্ভব না হবে ততদিন প্রাচ্যের অবস্থা আমাদের অনুকূলে আসবে না।”১

আর্নেস্ট লুথার ১৯০৫ সালে কায়রোতে প্রতিষ্ঠিত খ্রিস্টান মিশনারিতে নিয়োজিত কর্মী, পরামর্শক ও তত্ত্বাবধায়ীদের মুসলিম বিশ্বে কীভাবে মিশনারির তৎপরতা চালাতে হবে তার দিক-নির্দেশনামূলক বক্তব্যে বড় রকমের মেজাজ নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন, “আপনারা কাজ চালিয়ে যান। হতাশার কিছু নেই। বরং আমরা আশার আলোই দেখতে পাচ্ছি। কেননা, বাস্তবতা এই যে, মুসলমানদের মাঝে পাশ্চাত্য সভ্যতা, ইউরোপীয় জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং নারী-স্বাধীনতার প্রতি ভীষণ উৎসাহের সৃষ্টি হয়েছে।”

আন্না মিলিগান, খ্রিস্টধর্মের জনৈকা নারী স্বেচ্ছাসেবক, খুব আনন্দের সাথে মন্তব্য করেছেন, “আমরা কায়রোর মহিলা কলেজে একসাথে অনেক মেয়েকে আমাদের সারিতে জড়ো করতে সক্ষম হয়েছি। এদের অধিকাংশের পিতা ও অভিভাবক হলো পাশা। সত্যিই খ্রিস্টান মিশনারিরা একসাথে এতগুলো মুসলিম মেয়ে পাওয়া দুষ্কর। এই বিদ্যালয় থেকে মুসলিম দুর্গে আঘাত হানার এটাই মোক্ষম সময়।”২

মুসলিম নারী পর্যন্ত পৌঁছার জন্য শুরু হলো ইসলামবিদ্বেষীদের ছক আঁকা এবং সে অনুযায়ী কাজ করা। তারা প্রথমে মিশরের মেধাবী মুসলিম তরুণ-তরুণীদের শিকার করা শুরু করল। তারপর নিজেদের উদ্যোগে পাশ্চাত্যের ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের মতো উন্নত দেশগুলোতে উচ্চ শিক্ষার জন্য পাঠাতে লাগল। আজকের রিফায়াহ তাহতাবী, কাসিম আমিন, হুদা শারাভি কিন্তু এসবেরই পরম্পরা।

এরা পশ্চিমা দেশগুলোতে থেকে পশ্চিমা সংস্কৃতি ও সভ্যতা রপ্ত করে দেশে ফেরে। তারপর নিজের দেশের তরুণ-তরুণীর মাথা খাওয়া শুরু করে। বড় নির্লজ্জভাবে নিজ দেশের সভ্যতা সংস্কৃতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করতে থাকে। সেই সাথে পশ্চিমা নোংরামির গুণগানে থাকে পঞ্চমুখ। ‘যেন বাপ-চাচা, মা-খালা সব কুয়োর ব্যাঙ; তিনি এসেছেন সাগর ঘুরে।’

এই যে রিফায়াহ তাহতাবী! তিনি কী করলেন? একদম নির্লজ্জের মতো প্রকাশ্যে ঘোষণা দিলেন, “খোলামেলা চলা আর ছেলেমেয়ে অবাধ মেলামেশা করা এতে খারাপ কী আছে? ইউরোপের রাস্তায় যদি নাচগান কর, তা হলে একে পাপ বলে না। একে বলে তারুণ্য, উচ্ছলতা।”

তারই ভাবশিষ্য কাসিম আমিন ফ্রান্স থেকে ফিরতে না ফিরতেই রাতারাতি মহামতি বনে গেলেন একটি বই লিখে—তাহরীরুল মারআহ (নারী-স্বাধীনতা)। বইটি যেন তাক লাগিয়ে দিল পুরো মিশরবাসীকে। তবুও অবাক লাগে, তিনি যে নারী-স্বাধীনতার ডাক দিলেন, তার মূল উপজীব্য নাকি এই একটি বাক্য—‘আমি সেই দিনের অপেক্ষায় আছি, যেদিন মিশরের মেয়েরাও ধর্মকথা ও পর্দাপ্রথার বলয় ভেঙে বেরিয়ে আসবে এবং আমার ‘ইউরোপিয়ান সিস্টার’দের মতো ‘মুক্ত বিহঙ্গ’ হয়ে উদার আকাশে উড়াল দেবে।’

আরও আশ্চর্যের বিষয়, নারী-স্বাধীনতার নামে মিশরের মুসলিম নারীদের সাথে যারা ফ্রড খেলা শুরু করেছিলেন, তাদের দলে যে শুধু পুরুষই আছেন তা নয়, নারীও আছেন। হুদা শারাভি। সে-সময়ের নারী আন্দোলনের অবিস্মরণীয় নাম। প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের বিভিন্ন নারী সংস্থায় ছিল তার দাপুটে বিচরণ। ১৯২৩ সালে ইতালির রাজধানী রোম নগরীতে প্রথম যে নারী-বিষয়ক আন্তর্জাতিক সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল তিনি সেই সেমিনারেও উপস্থিত হয়েছিলেন। মিশরে ফিরতি পথে সফর করেছিলেন সমুদ্রে। জাহাজে উঠে মিশরের প্রথম মুসলিম নারী হিসেবে হাজার বছরের মুসলিম ঐতিহ্যকে লাথি মেরে মুসলিম জাতির গর্ব, অহংকার ভেঙে চুরমার করে নিজের মাহাত্ম্য, নিজের আভিজাত্যের প্রতীক, যা তাকে চির সম্মানে ভূষিত করে রেখেছিল এতটা কাল, সেই হিজাবটি খুলে ফেললেন এবং সামনে ছুটে চলা জাহাজ থেকে পেছনে উড়ে ফেলে দিলেন—অগণিত পরপুরুষের সামনে লক্ষ কোটি মুসলিম নারীকে অপমানিত করে, ‘পর্দা প্রথার শৃঙ্খলা’ ভেঙে বেরিয়ে পশ্চিমা ‘মুক্ত বিহঙ্গ’ হয়ে, চৌদ্দশো বছরের রক্তমাখা মুসলিম শাহী কাফেলাকে পদদলিত করে। বিনিময়ে যা পেলেন তা কিছু ফিরিঙ্গিপনা বাহবা ও করতালি, এবং কিছু নীরব নিস্তব্ধ ব্যথিত হৃদয়ের রক্তক্ষরণ। কিন্তু তার চোখে মুখে যা ছিল তা কোনো অজানা অহংকারের স্ফূর্তি বৈ কী!

তিনি ফিরে এলেন কায়রোতে। বিশ্বজয়ের আনন্দ নিয়ে। তথাকথিত নারী-আন্দোলনের মহানায়িকা হয়ে। ইতালির সেমিনার থেকে অর্জিত শিক্ষার ফলস্বরূপ প্রতিষ্ঠা করলেন একটি সংস্থা—মিশরীয় নারী ঐক্য। সংস্থার মূল সুর যেন ইতালির সেমিনার থেকেই ভেসে আসে। নারীর অধিকার চাই। সমান অধিকার চাই। পুরুষের সাথে মিলেমিশে কাজ করলে ক্ষতি কী? পোশাক-আশাক কেমন হবে, কীভাবে হবে সেটা আমার ব্যাপার, এখানে বাঁধাবান্ধি কীসে? কীসের হিজাব, কীসের নেকাব? তালাকের অধিকার চাই। পুরুষের অভিভাবকত্ব মানি না। পুরুষ যদি চারটে বউ রাখতে পারে তা হলে আমরা...? ইত্যাদি ইত্যাদি অন্যান্য আবর্জনা সম সব কথাবার্তা। প্রবৃত্তির অনুগামী হলে যা হয়। অনেকটা শিয়ালের ছদ্মবেশের মতো। বুঝে হোক না বুঝে হোক, প্রোপাগান্ডায় সুর মেলানোই আধুনিকতা। সুর না মেলালেই সেকেলে, কূপমণ্ডূক, ধর্মযাজক, কুসংস্কারাচ্ছন্ন ইত্যাদি।

মিশরের এই নারী-আন্দোলনের প্রতি পশ্চিমা দেশগুলো উৎসুক ছিল তাক লাগানোর মতো। এক কথায় তারা মুক্ত হস্তে দান করা শুরু করে দিল। ইউরোপীয়রা নিজ মিশরে চলে এলেন মিশরের নারী-আন্দোলনের অগ্রগতি এবং কর্মতৎপরতা পর্যবেক্ষণের জন্য।

হুদা শারাভির আন্দোলনকে গতিশীল করতে এগিয়ে এলেন দুরিইয়াহ শাফিক। প্রাচ্যের নিয়মনীতিকে তিনিই সবচেয়ে বেশি দুঃসাহসিকতার সাথে আঘাত করতে লাগলেন। পশ্চিমা নারীর অনুসরণই যেন তার কাছে জীবনে সফল হওয়ার একমাত্র চাবিকাঠি। তিনি ধর্মহীন ভাষায় ঘোষণা দিলেন, ‘আমরা সত্যিই অনুসরণের যোগ্য, আমরা তাদেরই অনুসরণ করব। মিশরীয় নারীদের অনুসরণের যোগ্য একমাত্র পশ্চিমা নারীরাই। বিশেষত ব্রিটেনের মহারানী।’

দুরিইয়াহ শাফিকের দলে তাঁর পরে আরও একজন মহামতির আবির্ভাব হলো। আমিনা সায়িদ। তিনি নারীবিষয়ক একটি পত্রিকা বের করতে লাগলেন। নাম দিলেন হাওয়া (ইভ)। হাওয়া নামের ‘হাওয়া’ দিয়েই পশ্চিমা বিষ ঢুকিয়ে দিতে লাগলেন মিশরীয় নারীদের মনে। তিনি স্বামী এবং অভিভাবকের সাথে অবাধ্যতা, হঠকারিতা ও স্বেচ্ছাচারিতার উসকানি দিতে লাগলেন চিমটি কাটার মতো করে। অজুহাত—পুরুষের আধিপত্যকামিতা। দাবি—দাসীত্ব থেকে মুক্তি, আর একটু ইনিয়ে-বিনিয়ে, মানসিক দাসত্ব থেকে মুক্তি। তার বিদ্রোহের শিকার হলো ইসলামের মাহাত্ম্যপূর্ণ শৈলী—পর্দা ব্যবস্থা। বিদ্রোহের শিকার হলো মুসলিম নারীর সবচেয়ে বড় গুণ, সবচেয়ে বড় মাহাত্ম্য—সতীত্ব। তিনি পর্দাব্যবস্থা নিয়ে যে শ্লেষাত্মক উক্তিটি করেছেন, তা খুবই দুঃখজনক। তিনি বলেছেন: “মেয়েরা পুরো শরীর ঢেকে ভূতের মতো হয়ে কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসবে এটাই কি ইসলাম? একটা জীবন্ত মেয়েকে না মরতেই কফিনে পরিয়ে দেওয়া কি ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য খুবই জরুরি?”

ঔপনিবেশিক গোষ্ঠীর ভাবশিষ্যরা নারী-স্বাধীনতা ও নারীমুক্তির জোর প্রচারণা চালাতে থাকলেন। তাদের নির্লজ্জ শব্দপ্রয়োগের চাতুর্য, মনগড়া হাঁকডাকের তর্জন-গর্জন অনেক মিশরীয় মেয়েকে মোহাচ্ছন্ন করল। অনেক মেয়েই পর্দার বিষয়ে এখন স্বেচ্ছাচারী, হঠকারী। তারা প্রথমে হাত ও মুখ খোলা শুরু করে। তারপর মাথা, তারপর পায়ের গোছা, তারপর রান। শালীনতার জন্য সাধারণ ভদ্রতা বোধও বিদায় নেয় মাঝামাঝি কোনো পর্যায়ে। নামে মাত্র যা থাকে—শুধুই ফ্যাশন।

ধীরে ধীরে বিষয়টি গড়াল ধর্মীয় বিধিনিষেধ এবং সামাজিক রীতিনীতিগুলোকে উপেক্ষা করে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা পর্যন্ত। আজ রাস্তাঘাট দোকানপাট শপিংমল থেকে শুরু করে লেক পাড় বা ধর্মীয় বিদ্যাপীঠ—কোনো কিছুই অশ্লীলতামুক্ত নয়। আর বিনোদনের নামে অশ্লীলতার জন্যই সেসব জায়গার উৎপত্তি হয়েছে সেসব এখন রীতিমতো...। আল্লাহ্ মাফ করুন।

পর্দাবিদ্বেষীরা চরিত্রে বন্ধনহীন এক জাতীয় লাগামহীন পাগলা ঘোড়ায় পরিণত হলো। কর্মমুখর ব্যস্ত সড়কে, ব্যস্ত শহরে, ব্যস্ত অফিসে পুরুষের ভিড়ে নারীরাও ছুটে পড়ল। স্কুল কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়ে সহশিক্ষার প্রতিযোগিতা শুরু হলো। কলকারখানার বড় বড় যন্ত্রপাতির বিকট আওয়াজে নারী-পুরুষও ঘুরপাক খেতে লাগল একসাথে। কিছু নির্ভরতা, কিছুটা স্বাধীনতা, কিছুটা আনন্দ ভুলিয়ে দিল নিজের ঘরকে, নিজের সন্তানকে, নিজের স্বামীকে। ক্ষণিকের এই মায়ামোহে নারীরা ডুবে সরিয়ে দিল তার প্রকৃতিপ্রদত্ত দায়িত্ব ও কর্তব্য থেকে। সে যে কারও মা, সে যে কারও মেয়ে, সে যে কারও স্ত্রী, সে যে কারও বোন; তার যে একটা ঘর আছে, সে যে কোনো ঘরের মালকিন, দূর থেকে দেখা মরীচিকা সবই বিস্মৃত করল তাকে।

নারীরা অবাধ্য হলো। আগ্রহের অবাধ্য হলো। ঘর ছাড়ল। সম্মানের আসন থেকে নেমে এল। ছুঁড়ে ফেলে দিল মাহাত্ম্যের মুকুট। খুলে ফেলে দিল মাথার তাজ—হিজাব, নেকাব। মনে মনে মনগড়া পাওয়ার মতো হয়ে গেল মুক্ত স্বাধীন। পুরুষ তার পেছনে ছোটে এই তার গর্ব। ছেলেরা তার জন্য জীবন দিতে চায় এটাই সফলতা। প্রবৃত্তিকামীরা প্রশংসা করে গদগদ হয়। রুগ্ন মনেরা হাত বাড়ায়, লম্ফঝম্ফ করে। বোকা মেয়ে আনন্দে আত্মহারা। ছদ্মবেশী ছলাকলায় মনে আনন্দ ধরে না। সুখময় মেলামেশায় যেন বিশ্ব জয় জয়ে রূপ নেয়। তাই এতেও হয় না; নাচে, গায়, অভিনয় করে, ফ্যাশন করে। আরও কত কী!

কিন্তু ফল কী হয়, বোন? যখন ঘোর কেটে যায়, যখন জীবন যৌবন সব শেষ হয়ে যায়, তখন নিজেকে আবিষ্কার করে তিক্ত বাস্তবতার কোন কালো অন্ধকারে। দেখে, সে কোনো স্বার্থের বলি, কারও লালসার বলি। খুব সস্তায় অন্যের হয়ে কাজ করেছে সে। কোনো ষড়যন্ত্রের শিকার, কোনো কুচক্রীর ক্রীড়নক। যে কুচক্র, যে ষড়যন্ত্র তারই বিরুদ্ধে, তারই জাতির বিরুদ্ধে, তারই দেশের বিরুদ্ধে। এ কুচক্রের চাকা আবর্তিত হয়েছে মুসলিম পরিবারব্যবস্থাকে ভেঙে দিতে, মুসলিম সমাজব্যবস্থাকে গুঁড়িয়ে দিতে। একটু সুখের কারণে বড় চড়া মূল্য দিতে হলো তাকে। নিজের সম্মান, নিজের সম্ভ্রম, নিজের সবকিছুর সাথে সাথে নিজের দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ।

আর তার পৃষ্ঠপোষকরা, যারা বাহবা করতালি ও মিথ্যা স্তুতি দিয়ে উৎসাহ যুগিয়েছিল, অর্থ খ্যাতি ও সম্ভাবনার জগতে ডাহুক হয়ে ডাক ছেড়েছিল, কথার ফুলঝুরিতে ষোড়শী কুমারীদের মাতিয়ে রেখেছিল, তারাই প্রথম তাকে উপেক্ষা করে। তাদের কাছে তার কোনো মূল্য থাকে না। সত্যিই, ওসব লোকের কাছে চামড়া-জড়া বুড়ির কী বা মূল্য থাকতে পারে?

বলা উচিত, এমন উদাহরণ কম নয় যে, অনেকে নারী-স্বাধীনতার জোর প্রচারণা চালান; চাতুর্যের সকল শৈলী প্রয়োগ করে নারীকে ধর্ম ও বিশ্বাসের প্রতি বিতশ্রদ্ধ করে তোলেন; অথচ ব্যক্তিজীবনে নিজেই নারী-স্বাধীনতা নামের তামান্না থেকে মুক্ত। এই যে কাসিম আমিন। তিনি মিশরে নারী স্বাধীনতার নামে পর্দার প্রথাগত ভীতির কেমন বিরোধিতা করেছেন। অথচ নিজের স্ত্রীকে পর্দারপ্রথা শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করতে দেননি। এমনকি, নিজের ছড়ানো প্রোপাগান্ডার ব্যাপারে নিজের ঘরানা দের রেখেছেন সম্পূর্ণ অন্ধকারে। তাই তো তার স্ত্রী শরঈ পর্দার পূর্ণ পাবন্দি করেন। শুধু তাই নয়, প্রায়ই তার পক্ষ থেকে এমন বিবৃতি আসে যে, তার স্বামী, যেমনটা লোকে বলে যে তিনি সমাজে অনাচার ছড়াচ্ছেন, তেমন নন। তিনি কখনোই খোলামেলা চলা এবং অবাধ মেলামেশার পক্ষপাতী নন। তিনি শরঈ পর্দার প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল। এসব লোকের মিথ্যাচার ও অপব্যাখ্যা।

জনাব আবদুল কুদ্দুস সাহেবের কথা তো বলাই বাহুল্য। তিনি এ পর্যন্ত কতগুলো উপন্যাস লিখেছেন। তার রচিত অনেক উপন্যাসের চলচ্চিত্রায়নও হয়েছে। তার অধিকাংশ উপন্যাসই ধর্মীয় মূল্যবোধকে আঘাত করে রচিত। নারীদের ধর্মবিদ্বেষে প্রলুব্ধ করার প্রয়াস তার কম নয়। অথচ কাণ্ড দেখুন, ঔপন্যাসিক আবদুল কুদ্দুস এবং বাস্তবজীবনের আবদুল কুদ্দুসের মাঝে কেমন আকাশ পাতাল ফারাক। তিনি স্ত্রীকে বাইরে বের হতে দেন না। চাকরি করতে দেন না। অথচ তার স্ত্রী উচ্চশিক্ষিতা। শুধু তাই নয়, ব্যক্তি আবদুল কুদ্দুস স্ত্রীর প্রতি খুবই কঠোর। পত্রপত্রিকায়, টেলিভিশনের পর্দায় আজ পর্যন্ত একবারের জন্যও স্ত্রীকে আসতে দেননি; এমনকি, তার ছবিও প্রকাশ হতে দেননি।

প্রিয় বোন, বলুন তো, এমনটা কেন হয়? ...কারণ তিনি ওপরে ওপরে যা-ই বলুন, ভেতরে ভেতরে ভালো করেই জানেন যে, একজন নারীর প্রথম ও প্রধান মৌলিক কর্তব্য হলো একজন মমতাময়ী মা হওয়া, একজন সতীসাধ্বী স্ত্রী হওয়া।

আমরা যেই আবদুল কুদ্দুসের কথা বলছি, কে না জানে, তিনি ছিলেন একজন কর্মজীবী নারীর সন্তান। তার মা বহুল প্রচারিত 'রোয ইউসুফ' পত্রিকায় কাজ করতেন। কিন্তু পুত্র আবদুল কুদ্দুস মাকে আর কাজ করতে দেন না। তিনি চান, মা বাইরের ঝামেলা থেকে মুক্ত হয়ে ঘরে অবসর যাপন করুন।

অবশেষে এমন অনেক মুসলিম নারী আছেন, যারা একসময় তথাকথিত নারী-স্বাধীনতার ফাঁদে পা দিয়েছিলেন। কিন্তু হুঁশ হওয়ার পর, ভণ্ড-প্রচারকের মিথ্যা, প্রতারণা বুঝতে পারার পর, এখন আল্লাহর কাছে তওবা করে আবার ইসলামের সরল সঠিক পথে এসেছেন। আবার নিজে নিজে ধরা দিয়েছেন পর্দাপ্রথার ‘শৃঙ্খলে’, বরণ করে নিয়েছেন ‘চার দেয়ালের বন্দিনীর দশা’।

একসময়ের দুনিয়া কাঁপানো মডেল সাদিরা বাবেল্লি। ছোট পর্দায় ছিলেন হট কেক। আল্লাহ তাকে হেদায়াত দান করেছেন। সর্বশেষ সাক্ষাৎকারে আফসোস সহে বলেছেন, “আমি যখন অভিনয় করতাম, তখন কত চ্যানেল আমার পেছনে পড়ে ছিল। একটি সাক্ষাৎকারের জন্য কত উপহার উপঢৌকন জমে যেত। অথচ আজ আমিই যদি হিজাব পরে নারী-বিষয়ক ধর্ম ও সভ্যতার কথা বলতে চাই, তা হলে একটি চ্যানেলও আমাকে সুযোগ দিতে সম্মত হবে না।”

প্রখ্যাত চলচ্চিত্রশিল্পী শামস বারুদি বলেন, “যখন যশ খ্যাতি অর্থ বিত্তের সবকিছু আমার হাতে ধরা দিল, তখন আমার মনে প্রায়ই একটি প্রশ্ন জাগতে লাগল, এত কিছুর পরও আমি সুখী নই কেন? শামস বারুদি নিজেই নিজের প্রশ্নের উত্তর বলেন, “কারণ আমি বুঝতে পারতাম, আমি এমন একটি কর্ম বেছে নিয়েছি, যা আমার নারীত্বকে কুঁরে-কুঁরে খাচ্ছে প্রতিমুহূর্ত। এটা আমার প্রকৃতির সাথে বেমানান। এরপর থেকে আমি অনেক কাজ ছেড়ে দিতে লাগলাম। এ আশায় যে, আমি আমার নারীত্ব, আমার হারানো সম্মান ফিরে পাব। আমি আল্লাহকে খুব ডাকতাম, যেন তিনি আমাকে এই জগত থেকে দূরে সরিয়ে নেন এবং সত্য ও সুন্দরের পথে পরিচালিত করেন।” তিনি বলেন, “আমি আমার অতীতের স্মৃতিচারণ করতে চাই না। আমি চাই, যদি ওই সময় আমার জীবন থেকে একদম মুছে যেত।”

শামস বারুদি ইসলামের শীতল ছায়ায় ফিরে এসেছেন। তিনি আল্লাহর পথকেই নিজের জীবনপথ হিসেবে বেছে নিয়েছেন। কিন্তু অনিষ্টকারীরা বসে থাকেনি। তারা প্রতিনিয়ত সত্যপ্রাজ্ঞ নারীকে নিয়ে দ্বিধাজাল সৃষ্টি করেছে। কিন্তু যে আল্লাহর আশ্রয়ে নিজেকে সঁপে দেয়, আল্লাহ তার সহায় হন। আল্লাহ শামস বারুদির মনোবল অক্ষুণ্ণ রেখেছেন। তিনি নিজে খরচ করে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ও টিভি চ্যানেলে নিজের অবস্থানের কথা সুস্পষ্ট করেছেন। তিনি সুস্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি তওবা করেছেন। তিনি এই জগত থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। তিনি প্রতিটি মুসলিম তরুণীকে, প্রতিটি মুসলিম নারীকে উদাত্ত আহ্বান জানান ইসলামের পর্দার পাবন্দি করার, ইসলামের বিধিনিষেধকে আঁকড়ে ধরার।১

এমন উদাহরণ পশ্চিমা নারীদের মধ্যেও আছে। ফ্রান্সের বিখ্যাত অভিনেত্রী ব্রিজেট বারদোঁ। পুরো জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন হৈ হুল্লা আর আমোদ ফুর্তিতে। শরীর আর সৌন্দর্যই ছিল জীবনের সবকিছু। কিন্তু জীবনের পড়ন্ত বিকেলে এসে তার আক্ষেপ শুনুন— “জীবন থেকে যে শিক্ষা পেয়েছি তা এই যে, হাজার হাজার আবেগ-উচ্ছ্বসিত প্রলোভনযুক্ত চিঠি, বিমুগ্ধ বিমোহিত কোটি কোটি দর্শকচিত্তের করতালি জীবনের বাস্তবতায় একজনমাত্র বিশ্বাসী পুরুষের ভালোবাসা হতে পারে না, যা আমাকে জড়িয়ে রাখে ভালোবাসায়; যা আমার অন্তরে শান্তি আনে, অভয় দেয়। আমার বিপুল খেতাব, যশ খ্যাতি ছিল। অনেক অর্জন ছিল। কিন্তু জীবনের চরম বাস্তবতায় আমি ব্যর্থ। আমার প্রাপ্তির খাতা শূন্য। আমি তাই মানুষ থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বাকি জীবনটা নীরবে কাটিয়ে দিতে চাই। মিডিয়া থেকে অনেক দূরে।” তিনি আরও বলেন, “আমাকে চেনে এমন অনেক। কিন্তু আমার বন্ধু বলতে যারা আছে, হাতে গোনার মতো। আমার ছেলের কথাই বলি। সে যখন ছোট ছিল, তখন আমি তাকে গুরুত্ব দিইনি; সুতরাং আমি যখন বৃদ্ধা হয়েছি, তখন সে আমাকে গুরুত্ব দেবে এমনটা আমি আশা করতে পারি না।”২

বণিকমহল নারীস্বাধীনতার বিষয়টিকে সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেছে। বাণিজ্যিক প্রচারণায় তাদের কাছে সবচেয়ে কার্যকরী মাধ্যম হলো সংস্কৃতি। পণ্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য বিলাস, স্বল্প-বসনা নারী এবং নারীর উলঙ্গ অর্ধোউলঙ্গ ছবির কোনো জুড়ি নেই। ব্রিটিশ নারী-স্বাধীনতা সংস্থাও এভাবে নারী-স্বাধীনতার নামে নারী-অবমাননার পায়তারা করেছে। বামপন্থী টিমও এ ব্যাপারে প্রচুর প্রতিবাদ জানিয়েছেন। কেননা, তিনিও মনে করেন, এটা কার্যত নারীর অবমাননা।

বড় বড় বস্ত্রালয়গুলোতে নারীদের যেভাবে ব্যবহার করা হয়, তা রীতিমতো উপহাস। ফরাসি ফ্যাশনগার্ল ফাজিয়ান ‘আল মুসলিমুন’ পত্রিকার একটি একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেন, “এ পথে আসা সহজ ছিল। কিংবা আমার কাছে সহজ মনে হয়েছিল। খুব সহজেই খ্যাতির স্বাদ পাই। উপঢৌকনে আমার ঘর ভরে যায়। আমি এত সহজে এত কিছু পাব, স্বপ্নেও ভাবিনি। কিন্তু আমাকে যে মূল্য দিতে হয়েছে, তা অনেক চড়া।

প্রকৃতপক্ষে এখানে সফলতার পথ একটাই—আবেগ অনুভূতি বিসর্জন দিতে হবে, লজ্জা শরম ছেড়ে ফেলতে হবে, বেহায়াপনাকে সক্রিয় করে দিতে হবে, আত্মসম্মানকে গলা টিপে হত্যা করতে হবে; বেশি বোঝা যাবে না, বেশি ভাবা যাবে না। তোমাকে যা ধরে রাখতে হবে —তোমার দেহ, তোমার রূপ-লাবণ্য, তোমার দীপ্তিময় ভরা যৌবন; দেহের সৌন্দর্য ও সুর মূর্ছনা। আকর্ষণ ধরে রাখতে জগতের সব সুস্বাদু খাবার বর্জন করা, পাশাপাশি নিয়মিত বলবর্ধক ও উত্তেজনাকর ড্রাগ ও মেডিসিন গ্রহণ করার কথা বাদই দিলাম।

তারা আমাকে একটা জীবন্ত মূর্তি বানিয়ে রেখেছিল। আমার কাজ ছিল ক্রেতাদের মন মত্তে নিমগ্ন করে তোলা। আমি যেন কোনো জড়পদার্থ ছিলাম, যে নির্দিষ্ট হাসিতে মানুষকে হাসাতে পারে; কিন্তু সে নির্গল্প, নির্জীব; তার কোনো অনুভূতি নেই। সেখানে প্রতিদিন বস্ত্রালয়ের বস্ত্র শরীরে ধারণ করতে হয়; তার আগে দেহ থেকে নারীত্ব ও মনুষ্যত্বের বস্ত্র খুলে ফেলতে হয়। নয়তো এই নিষ্ঠুর পৃথিবী তোমাকে ছুঁড়ে ফেলে দেবে। তুমি যদি কোনো স্টেপ ভুল কর, তা হলে তোমাকে শাস্তি পেতে হবে, যা একই সাথে মানসিক ও শারিরীক!...

একজন ফ্যাশনগার্ল হিসেবে সর্বত্র বিচরণ করেছি। ফ্যাশনের পোশাকে দেহাবরণ করে, নিজের নারীত্বকে বিসর্জন দিয়ে দর্শকদের মনোরঞ্জন করেছি, কিন্তু তারা আমার কেউ নয়, তাদের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই; আমার কষ্ট হতো, যখন দেখতাম, তাদের কাছে আমার ব্যক্তিত্বের কোনো মূল্য নেই। যত মূল্য—আমার গড়নের, আমার পরনের পোশাকের।”১

এককালের স্বনামধন্য ফ্যাশনগার্ল ফজিয়ান এভাবে নিজের জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা ব্যক্ত করেছেন। আল্লাহ তাকে তওফিক দান করেছেন, তিনি সেই অভিশপ্ত জীবনের নরকভোগ থেকে পালিয়ে ইসলামের শীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেছেন।

প্রিয় বোন, একটু তো ভাবুন, পৃথিবীতে বর্বরতার আর কোনো উদাহরণ আছে কি, যা একজন নারীর নারীত্বকে বিসর্জন দেওয়ার চাইতেও নির্মম; যাকে জীবন্ত দাসী বানিয়ে রাখা হয় তার সম্মান ও সম্ভ্রম নিয়ে খেলা করার জন্য, তার নারীত্বকে নিষ্পেষিত করার জন্য, তার লজ্জাকে লালসার বাজারে বলি দেওয়ার জন্য?

পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে কী ভয়াবহ অবস্থা দাঁড়িয়েছে। ইউরোপিয়ান সামাজিক নিরীক্ষণ সংস্থার একটি জরিপ শুনলে আঁতকে উঠতে হয়। তাদের গবেষণা মতে পঁচিশ বছর বয়সী আশি ভাগ ব্রিটিশ নারী একা একা লন্ডনের রাস্তায় চলতে ভয় পান। কারণ ধর্ষণ ও অপহরণের ভয় প্রতিমুহূর্তে তাঁদেরকে তটস্থ করে রাখে। প্রকাশ থাকে যে, এ বয়সের প্রতি চারজন একজন নারী রাজধানীতে রাস্তায় বের হলে আত্মরক্ষার জন্য সাথে চাকু বা পিস্তল রাখেন।২

কানাডার তথ্যমন্ত্রাণালয়ের জনৈক কর্মকর্তা দুঃখ প্রকাশ করেছেন যে, কানাডায় বসবাসরত অর্ধেকের বেশি নারীই যৌন হয়রানি ও দৈহিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। একটি প্রতিবেদনে এসেছে, গোঁড়ামি ও লালসার শিকার হয়ে নারীরা বিভিন্ন প্রান্তে যৌননির্যাতনের শিকার হচ্ছেন অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে। তারা এটাকে কোনো অপরাধ মনে করে না। বরং এটা তাদের দৃষ্টিতে একটি সাজামাত্র। নারীকে ভয় দেখানোর, শাস্তিপ্রদানের বা তার সংশোধনের একটি সাধারণ প্রক্রিয়া। আশ্চর্যের বিষয়, নারীর প্রতি এরকম জঘন্য অপমানকর কর্মকাণ্ডের বিদ্যমানতা সত্ত্বেও ওসব দেশের বিচারব্যবস্থায় নারী উৎপীড়ন, যৌন হয়রানি বা ধর্ষণ বিশেষ কোনো শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে বিবেচিত নয়। কারণ এগুলো সেখানে এখন স্বাভাবিক ব্যাপার।১

জনৈকা আমেরিকান নারী সাংবাদিক হেলেন স্ট্যানবেরি ভ্রমণের উদ্দেশ্যে কায়রো আসেন। প্রায় কয়েক সপ্তাহ এখানে অবস্থান করেন। তিনি কায়রোর বিভিন্ন মাদরাসা, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়; বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান; নারী, পুরুষ ও শিশু-সংক্রান্ত বিভিন্ন সংস্থা ইত্যাদি পরিদর্শন করেন। তার রিসার্চের মূল বিষয় ছিল পরিবার, সমাজ ও নারী পুরুষের বিভিন্নমুখী সমস্যা, উৎপত্তি ও উত্তরণ। ভ্রমণশেষে দেশে ফেরার সময় নিজে একজন খাঁটি পশ্চিমা হয়েও নারী হিসেবে নারী জাতির প্রতি মমত্বের স্বাক্ষর রেখে গেছেন একটি সরল সত্যকে অকপটে স্বীকার করার মাধ্যমে। তিনি লিখেছেন,
“মুসলিম আরব সমাজ নিঃসন্দেহে একটি পূর্ণাঙ্গ ও সুস্থ সমাজ। এই সমাজের পক্ষে এটাই কল্যাণকর হবে যে, তারা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে আঁকড়ে থাকবে। এখানে নারী পুরুষের মাঝে যে যৌক্তিক ব্যবধান ও সীমারেখা রাখা হয়েছে তা কোনোভাবেই মন্দ নয়। এই কয়দিনে এই সমাজের প্রতি আমার অন্তরে যে মুগ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে, তা থেকেই একজন নিঃস্বার্থ হিতাকাঙ্ক্ষী হিসেবে বলছি, আপনারা আপনাদের সামাজিক রীতিনীতি, সভ্যতা সংস্কৃতি এবং চারিত্রিক মূল্যবোধকে অক্ষুণ্ণ রাখার চেষ্টা করুন। আপনারা অবাধ মেলামেশা থেকে বিরত থাকুন। মিথ্যে স্বাধীনতার নামে মেয়েদের বাধা বন্ধনহীন ঝুঁকিপূর্ণ জীবনের দিকে ঠেলে দেবেন না। সত্যি বলতে কি, আপনারা আপনাদের সেই তথাকথিত পরাধীনতাকে ফিরিয়ে আনুন। ইউরোপ আমেরিকার উদারবাদ, বাধা বন্ধনহীনতা ও আধুনিকতা থেকে এটা শত গুণ ভালো। আপনারা অবাধ মেলামেশাকে প্রতিহত করুন। এটা আমেরিকার জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। আমেরিকান সমাজ এখন একটা মৃত সমাজ। সেখানে লম্পট ও ইতরতা ছেয়ে গেছে। সেখানে শুধু অবাধ মেলামেশা ও মিথ্যে স্বাধীনতার বলি হয়ে অসংখ্য সম্ভাবনা ঝরে যায় প্রতিদিন প্রতিনিয়ত।”২

কুয়েতের 'জারিদাতুস সিয়াসিয়াতুল কুয়াইতিয়াহ' পত্রিকার উদ্যোগে জনৈকা জার্মান নারীর একটি সাক্ষাৎকার প্রচার করা হয়। সন্দেহ-নিরসনের জন্য বলছি, ওই নারী একজন অমুসলিম। সাংবাদিক তাঁকে প্রশ্ন করেছেন: 'আপনার দৃষ্টিতে নারীর সুন্দরতম অবস্থানকেন্দ্র কী হতে পারে?' উত্তরে তিনি বলেন, 'ঘর।' একজন পশ্চিমা নারীর মুখে এমন উত্তর শুনে মুসলিম নারী সাংবাদিক কিছুটা হতচকিত হন। তিনি আবার জিজ্ঞেস করেন: 'আপনি কি মনে করেন, সব সময়ই ঘর নারীর জন্য আদর্শ জায়াগা?' তিনি এবার আরও দৃঢ়তার সাথে বললেন: 'হ্যাঁ, আমি মনে করি, সব সময়ই ঘর নারীর জন্য আদর্শ জায়াগা।' এবার সাংবাদিক জানতে চাইলেন: 'ঘরের বাইরে কর্মরত হওয়ার ব্যাপারে কী বলেন?' প্রতিনিধি এবার বললেন: 'মৌলিকততে নারীর সৃষ্টি এজন্য নয়।' সাংবাদিক জিজ্ঞেস করলেন: 'তাহলে সমাজগঠনে নারী পুরুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে কী করে?' প্রতিনিধি বললেন: 'সমাজগঠনে নারী পুরুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য, আমি মনে করি না, বাইরে গিয়ে কাজ করার প্রয়োজন আছে। অন্যভাবেও সেটা হতে পারে। নারী পুরুষকে একটি সুখময় শান্তিময় পরিবার উপহার দেবেন। ঘরের বিষয়ে তাকে নিশ্চিত রাখবেন। সুখে দুঃখে পাশে থাকবেন। অর্জনে উপার্জনে সাহস ও প্রেরণা যোগাবেন। ছেলেমেয়েকে মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তুলবেন। নারী বাইরে গিয়ে কাজ করে সামাজিকভাবে যে উন্নতি সাধিত হবে, এভাবে ঘরে থেকে তার চেয়ে অনেক গুণ বেশি হবে। আমি এ কথাটি আবেগ তাড়িত হয়ে বলছি না। জীবনের তিক্ত বাস্তবতা থেকে বলছি। মূলত নারী বাইরে গিয়ে কাজ করে হয়তো আর্থিকভাবে কিছুটা স্বনির্ভরতা পাবেন; কিন্তু পুরো সমাজ এবং সার্বিকভাবে পুরো নারী জাতি নিঃসন্দেহে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যা আমরা হাতে কলমে পাচ্ছি।'৩

বিখ্যাত ব্রিটিশ লেখিকা লেডি ব্রাউন তার বিখ্যাত 'আসুলুল জিনস ওয়া তবিয়াতুহ' গ্রন্থে লিখেছেন, “পুরুষ প্রকৃতগতভাবে জীবনে সরল। আগেও ছিল। এখনো আছে। পরেও থাকবে। আমরা যতই চেষ্টা করি, এই প্রকৃতিকে বদলাতে পারব না। সমানাধিকারের ডাক দিয়ে বা সভা-সেমিনার মহড়া করে কোনো লাভ নেই। পুরুষ সবল। সবলই থাকবে। নারী দুর্বল। দুর্বলই থাকবে।” বিখ্যাত ইংরেজ নারী গল্পকার ও উপন্যাসিক আগাথা ক্রিস্টি বলেন, “সত্যি বলতে কি, এখনকার নারীরা বোকা। স্বাধিকার ও সম-অধিকার পাওয়ার জন্য সে কত কূটনীতিই না খাটল। কিন্তু ফল কী হলো? আমাদের স্বীকার করতেই হলো, পুরুষের তুলনায় আমরা দুর্বল। সাথে সাথে পুরুষর সাথে কাজ করতে হচ্ছে, ঘাম ঝরাতে হচ্ছে। অথচ এতটা কাল এটা ছিল শুধু পুরুষের কর্তব্য।... আমাদের পূর্ববর্তী নারীরা চালাক ছিল। তখন নারী পুরুষকে এই বিশ্বাসে আসক্ত রেখেছিল যে, সে দুর্বল; সে সব সময় পুরুষের স্নেহ ও ভালোবাসার পাত্রী; সে সবসময় পুরুষের আদর ও আশ্রয় চায়। তখন পুরুষই ছিল পরিবারের মাথা। পুরো পরিবারের সুখের জন্য মৌলিকভাবে দায়িত্বশীল ছিল পুরুষই। কিন্তু আজ কী হচ্ছে? নারী স্বাধীনতা চায়। পুরুষের অভিভাবকত্বকে আধিপত্য বলে অস্বীকার করে, অভিভাবকত্ব মানে না। আন্দোলন করে —দুর্বার আন্দোলন। কিন্তু পুরুষের অভিভাবকত্বকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে যে স্বাধীনতা পায়, সে আর-এক যাযাবর বিড়ম্বনা। ... নারী বাধা না মেনে সর্বক্ষেত্রে পুরুষের সাথে পাল্লা দিতে চায়। এখন তাকে সবখানে নামতে হয়। যা তার নামার মতো, তাতেও। যা তার নামার মতো নয়, তাতেও। ফল কী হয়? জীবন থেকে সুখ বিদায় নেয়, নারী ক্লান্ত হয়। ... অথচ আগের জীবনধারায় পুরুষ ছিল নারীর সুখ ও সম্মানের অতন্দ্র প্রহরী।”

প্রিয় বোন, জীবনের তিক্ততা পশ্চিমা নারীদের ঘোর কাটিয়েছে। তাদের টনক নড়েছে। তারা এখন প্রকৃতির কোলে ফিরে আসতে চান। কিন্তু পারেন না। তারা এখন অকপটে নারী ও নারীপ্রকৃতিকে স্বীকার করেছেন। সেই সাথে পশ্চিমা সভ্যতার নারীস্বাধীনতার স্বরূপ উন্মোচন করেছেন। তারা চিৎকার করে বলছেন, তারা একজন পুরুষের কর্তৃত্ব (অভিভাবকত্ব ও তত্ত্বাবধান) থেকে বাঁচতে গিয়ে—হোক তিনি স্বামী, পিতা কিংবা ভাই— অনেক পুরুষের সেবাদাসী ও যৌনদাসীতে পরিণত হয়েছেন।

সুতরাং নারীস্বাধীনতার প্রবক্তাদের বলি, মুসলিম নারী তো আপনাদের কাছে গিয়ে পরাধীনতার অভিযোগ করেনি, কখনো কোনো অনুরোধও করেনি, তা হলে এই উপযাচকতা কেন? এত দয়া আপনাদের? তা হলে শুনুন, মুসলিম নারীর কোনো কষ্ট নেই শুধু আপনাদের উড়ে এসে জুড়ে বসা ছাড়া; দয়া করে আমাদের জীবনটাকে আর সংকীর্ণ করে তুলবেন না; আপনাদের জ্বালায় আমরা অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছি; আপনাদের কারণে যেখানে সেখানে পর্দানশীন নারীকে মুখ খুলতে হয় আপনাদের পশুবৃত্তির প্রমোদনের জন্য। মুসলিম নারীর যদি কোনো অভিযোগ থেকে থাকে, তো এটাই তাদের অভিযোগ। দয়া করে আপনাদের সাহায্যের হাতটি গুটিয়ে নিন। মিষ্টি কথা বলে আমাদের সরল মেয়েদের মাথা খাওয়া বন্ধ করুন। ছলচাতুরি ছেড়ে দিন। নারী-স্বাধীনতার নামে নারীকে জীবন্ত দাসী বানানোর যে ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেন, তা থেকে বিরত থাকুন। ইসলামের পর্দাপ্রথা থেকে আমরা মুক্তি চাই না। আপনাদের ভ্রান্ত খেলা থেকে মুক্তি চাই।

প্রাচ্যের নারীদের বলি, তোমরা ঘরে ফিরে এসো। আবার সেই ঐতিহ্যের মাঝে ফিরে এসো। ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের বিরুদ্ধে পশ্চিমা পদলেহীরা মুখ থুবড়ে পড়ুক। নারী-সংস্থা, নারী-সংগঠন ও নারী-আন্দোলনের নেতা-নেত্রীদের বলি, তোমরা আওয়াজ তোলো; উচ্চ কণ্ঠে আওয়াজ তোলো—মুসলিম নারী যেন ঘরে ফিরে আসে। আবার যেন ঘরের মালকিন হয়ে সমাজের তাজ মস্তকে ধারণ করে। মুসলিম নারী আবারও স্বামীকে সুখী করাকেই জীবনের ব্রত বানিয়ে নিক। আনুগত্য ও ভালোবাসায় স্বামীর মনের সুখ ও চোখের শীতলতা হয়ে থাকুক। নারী তার সহজাত স্নেহ, মমতা ও ভালোবাসা আবার ফিরে পাক—যা মিথ্যে প্রচারণার মোহে নিখোঁজ হয়ে গেছে। যার আশায় বুক বেঁধে আছে নিষ্পাপ সন্তানরা। যার প্রেরণায় একজন মা সন্তানের সুখের জন্য যাপন করেন বিনিদ্র রজনী। অফুরন্ত ভালোবাসায় সিক্ত করেন সন্তানের জীবনকে।

স্বাধীনতার স্বাদ আস্বাদন করতে গিয়ে পশ্চিমা নারীদের যে করুণ পরিণতি হয়েছে, মুসলিম নারীরা তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করুক। নয়তো ওই দিন বেশি দূরে নয়, যেদিন এখানেও ওই একই অবস্থা বিরাজ করবে। ভাগ্যবান তো সে, যে অন্যের দেখে শিক্ষা গ্রহণ করে। কিন্তু দুর্ভাগা সে, যে নিজে পতিত হওয়া ছাড়া সতর্ক হয় না।

প্রিয় বোন, আল্লাহ আপনাকে চোখ দিয়েছেন দেখার জন্য। দয়া করে দেখুন। চর্মচোখে দেখুন, মর্মচোখে দেখুন, ইসলামী শরীয়াতের সুমহান জীবনদর্শন দেখুন। এ কোনো মানব রচিত জীবনবিধান নয়; এ প্রত্নপ্রদত্ত পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। এ সর্বময়, সর্বজনীন, সর্বকালীন। এ সুনিশ্চিত, নিখুঁত। আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করেছেন, আমাদের কর্ম ও কীর্তিকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি জানেন। আমরা জানি না।

প্রিয় বোন, এই বিশ্বাস ও মূল্যবোধ হৃদয়ে ধারণ করুন। কথাগুলো যখন বুঝে আসবে, এবং অবশ্যই বুঝে আসবে, তখনই এই ধর্মের, আপনার এই ধর্মের মাহাত্ম্য, আপনা-আপনি অনুধাবন করবেন অনায়াসে। অচিরেই আপনার হৃদয়ে অনুরণিত হবে কবির এই কথাগুলো,
ম্যাহলান ফামা হাজাল্লাযী ক্বদ গুররাকুম
ইল্লা সারাবান আওলা তারাউনাল গারবা
কাইফা গাদাল রিজালু বিহি যিআবান
আলা তারাউনা উরাল আখলাক্বি তাশতাক্বিবু
ইনশাক্বিবান ইন তারগাবু লি আমানিকুম
সাওনান ওয়া আইশান মুসতাত্বাবান
ফাদাঊস সুফূরা লি আহলিহি ওয়ারজিঊ
আলাইহিমুল বিক্বানা

এ কী করছ তুমি?
আলো ভেবে আলোয়ার মরুভূমি—
এ যে ভ্রম, এ যে ধোঁকা!
দ্যাখো, দ্যাখো!
ওখানে মানুষ অমানুষ,
ওখানে পুরুষ পশু, হায়েনা;
ওখানে চরিত্রের গিঁঠ ছেঁড়া ফাঁড়া;
ওখানে মোহ, ওখানে মরীচিকা!
চাও কি মায়ের সম্মান, বোনের সুরক্ষা,
সুন্দর সুখকর জীবন?
তবে থামো, আর ছুটো না,
আর ছুটে ছুটে ঝুঁকে ঝুঁকে মোরো না।
এ নগ্নতা বন্ধ করো
পর্দাকে আঁকড়ে ধরো।

প্রিয় বোন, আর কত ছুটবেন মরীচিকার পেছনে? এবার তো থামুন। এবার তো ফিরে আসুন। ফিরে আসুন আপনার প্রতিপালকের দিকে। ইসলামের ছায়াদার ফলদার ফুলদার বৃক্ষের নিচে। এখানে অবলোকন করুন একটি সুন্দর পৃথিবী। এখানে উপভোগ করুন একটি সুন্দর জীবন।

জেনে রাখুন, এখানে কালের গর্ব আপনি, আপনি মুসলিম নারী; এখানে সৃষ্টির অহংকার আপনি, আপনি মুমিন নারী। আপনারাই ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছেন এ উম্মাহর ভবিষ্যৎ—আমাদের নতুন প্রজন্ম। এবার অবিচল মনে আর একবার হৃদয়ে আওড়ান আমাদের প্রিয় প্রভুর মহা বাণী,
كُذٰلِكَ يَضْرِبُ اللَّهُ الْحَقَّ وَالْبাটِلَ ۚ فَأَمَّا الزَّبَدُ فَيَذْهَبُ جُفَاءً ۖ وَأَمَّا مَا يَنْفَعُ النَّاسَ فَيَمْكُثُ فِي الْأَرْضِ ۚ كَذَلِكَ يَضْرِبُ اللَّهُ الْأَمْثَالَ
অর্থ : এভাবেই আল্লাহ্ দৃষ্টান্ত দিয়ে থাকেন সত্য ও মিথ্যার। আবর্জনার ফেনা নিমেষেই শেষ হয়ে যায়। কিন্তু যা মানুষের জন্য উপকারী তা ওপরেই থেকে যায়। এভাবেই আল্লাহ্ তুলে ধরেন সুন্দর দৃষ্টান্ত। —সূরা রাদ : ১৭

টিকাঃ
১. আন্ডারউড হিওয়ার : ১/৯৯।
২. আদ্দায়তুল হিয়ার: ২/২১।
১. কিতাবুল হিয়া মিন আলামিন ওয়ালাদ ইলা রিহাবিল ঈমান: ৬৯-৬৯।
২. রিসালাতুন ইলা হাওয়া: ৩৪/২৪-২৫।
১. মিস্ আল্লামিন ওমারা ইলা রিহাবিল ঈমান: ১২-১৩।
২. সুরাতুল নিওয়া-২৫: ২৪।
১. সুরাতুল ফিতরাহ: ৬৬।
২. রিসালাতুন ইলা হাওয়া: ৪/১২০।
৩. সুরাতুল ফিতরাহ: ১৩।

বিগত কয়েক শতাব্দী মুসলিম নারী আপন মহিমায় ছিল ভাস্বর। পর্দার আড়ালে সুরক্ষিতা মণি-মুক্তোর মতো দেদীপ্যমান। ঘরের সিংহাসনে সমাসীনা মহিমান্বিতা মালকিন। ঘরে বসে গড়ে মহামানব, মহাবীর, মহাজ্ঞানী। মুসলিম নারীর এই অবিচল অবস্থান নিশ্চিত করেছিল মুসলিম জাতির অপ্রতিরোধ্যতা, অপ্রতিদ্বন্দ্বিতা; নিশ্চিত করেছিল মুসলিম দুর্গের দুর্ভেদ্যতা, দুর্লঙ্ঘ্যতা।

তাই ঔপনিবেশিক গোষ্ঠী ছিল হয়রান পেরেশান। তাদের মুখখাওয়া ও গুণগাওয়া পদলেহীরাও ছিল হতবাক হতবুদ্ধি। মুসলিম দুর্গের দুর্ভেদ্যতার সামনে তাদের সকল শ্রম, সকল সাধনাই যেন পণ্ড হয়ে যায়। কিন্তু যারা ইসলামের আজন্ম শত্রু, তাদের কি আর সহ্য হয়? তারা কি আর বরদাশত করতে পারে? মুসলিম উম্মাহর শক্তি, সামর্থ্য, সহনশক্তি, আত্মিক বিপুল সমৃদ্ধি, জাগতিক বিশাল শান-শওকত তাদের কি হিংসার অনলে পোড়ায় না?

অবশেষে তারা মরণকামড় দিতে উদ্যত হলো। ষড়যন্ত্র ও শলাপরামর্শের মহড়া দিতে শুরু করল। তাদের একটাই লক্ষ্য —কী করে মুসলিম সমাজের মূলে কুঠারাঘাত করা যায়? তাদের সমগ্র শক্তি নিয়োগ করল শুধু একটি বিষয় উদ্ঘাটনে—যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী কী করে একটি জাতি এমন অপ্রতিরোধ্য থাকতে পারল? কী এমন আছে যা তাদেরকে বার্ধক্য, জরাজীর্ণতা, ঘুশেঁ ধরা ও পোকায় খাওয়া থেকে রক্ষা করছে এতকাল?

অবশেষে তারা আবিষ্কার করে ফেলল। মুসলিম জাতির শক্তির রহস্য উদ্ঘাটন করে ফেলল। তারা আবিষ্কার করল, মুসলিম জাতির শক্তির রহস্য—আর কিছু নয়, মুসলিম নারী—যে নারী বিলকুল কিছু উশৃঙ্খলতাহীন, অসাধারণ কিছু বৈশিষ্ট্যে বিশিষ্টা। যার মনোবল ইস্পাতকঠিন, অবিচলতা পর্বতপ্রমাণ। যিনি সত্যকথনে নির্ভয়, নির্মোহা। যিনি পারেন সত্যিকার মুমিন ও মুত্তাকী একটি নতুন প্রজন্ম জাতিকে উপহার দিতে প্রতিটি যুগে, প্রতিটি শতাব্দীতে; যারা আপন ঈমান ও আকীদার প্রতি গভীরভাবে শ্রদ্ধাশীল, এবং ধর্ম ও বিশ্বাসের মূলে কঠিনভাবে গ্রথিত।

তারা মুসলিম নারীকে টার্গেট করল। ছলে বলে কৌশলে তাকে নিজ ধর্ম ও বিশ্বাসের প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তুলতে লাগল। টোপ হিসেবে ব্যবহার করল তথাকথিত প্রগতি নামের আপাতমধুর স্লোগান।

গ্ল্যাডস্টোন, ব্রিটিশ (তৎকালীন) প্রধানমন্ত্রী, ব্রিটেনের গণসভায় দম্ভভরে ঘোষণা দিয়েছিলেন, “যতদিন মুসলিম নারীর হিজাব উঠিয়ে দেওয়া না যাবে এবং যতদিন মুসলমানদের কুরআন বন্ধ করা সম্ভব না হবে ততদিন প্রাচ্যের অবস্থা আমাদের অনুকূলে আসবে না।”১

আর্নেস্ট লুথার ১৯০৫ সালে কায়রোতে প্রতিষ্ঠিত খ্রিস্টান মিশনারিতে নিয়োজিত কর্মী, পরামর্শক ও তত্ত্বাবধায়ীদের মুসলিম বিশ্বে কীভাবে মিশনারির তৎপরতা চালাতে হবে তার দিক-নির্দেশনামূলক বক্তব্যে বড় রকমের মেজাজ নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন, “আপনারা কাজ চালিয়ে যান। হতাশার কিছু নেই। বরং আমরা আশার আলোই দেখতে পাচ্ছি। কেননা, বাস্তবতা এই যে, মুসলমানদের মাঝে পাশ্চাত্য সভ্যতা, ইউরোপীয় জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং নারী-স্বাধীনতার প্রতি ভীষণ উৎসাহের সৃষ্টি হয়েছে।”

আন্না মিলিগান, খ্রিস্টধর্মের জনৈকা নারী স্বেচ্ছাসেবক, খুব আনন্দের সাথে মন্তব্য করেছেন, “আমরা কায়রোর মহিলা কলেজে একসাথে অনেক মেয়েকে আমাদের সারিতে জড়ো করতে সক্ষম হয়েছি। এদের অধিকাংশের পিতা ও অভিভাবক হলো পাশা। সত্যিই খ্রিস্টান মিশনারিরা একসাথে এতগুলো মুসলিম মেয়ে পাওয়া দুষ্কর। এই বিদ্যালয় থেকে মুসলিম দুর্গে আঘাত হানার এটাই মোক্ষম সময়।”২

মুসলিম নারী পর্যন্ত পৌঁছার জন্য শুরু হলো ইসলামবিদ্বেষীদের ছক আঁকা এবং সে অনুযায়ী কাজ করা। তারা প্রথমে মিশরের মেধাবী মুসলিম তরুণ-তরুণীদের শিকার করা শুরু করল। তারপর নিজেদের উদ্যোগে পাশ্চাত্যের ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের মতো উন্নত দেশগুলোতে উচ্চ শিক্ষার জন্য পাঠাতে লাগল। আজকের রিফায়াহ তাহতাবী, কাসিম আমিন, হুদা শারাভি কিন্তু এসবেরই পরম্পরা।

এরা পশ্চিমা দেশগুলোতে থেকে পশ্চিমা সংস্কৃতি ও সভ্যতা রপ্ত করে দেশে ফেরে। তারপর নিজের দেশের তরুণ-তরুণীর মাথা খাওয়া শুরু করে। বড় নির্লজ্জভাবে নিজ দেশের সভ্যতা সংস্কৃতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করতে থাকে। সেই সাথে পশ্চিমা নোংরামির গুণগানে থাকে পঞ্চমুখ। ‘যেন বাপ-চাচা, মা-খালা সব কুয়োর ব্যাঙ; তিনি এসেছেন সাগর ঘুরে।’

এই যে রিফায়াহ তাহতাবী! তিনি কী করলেন? একদম নির্লজ্জের মতো প্রকাশ্যে ঘোষণা দিলেন, “খোলামেলা চলা আর ছেলেমেয়ে অবাধ মেলামেশা করা এতে খারাপ কী আছে? ইউরোপের রাস্তায় যদি নাচগান কর, তা হলে একে পাপ বলে না। একে বলে তারুণ্য, উচ্ছলতা।”

তারই ভাবশিষ্য কাসিম আমিন ফ্রান্স থেকে ফিরতে না ফিরতেই রাতারাতি মহামতি বনে গেলেন একটি বই লিখে—তাহরীরুল মারআহ (নারী-স্বাধীনতা)। বইটি যেন তাক লাগিয়ে দিল পুরো মিশরবাসীকে। তবুও অবাক লাগে, তিনি যে নারী-স্বাধীনতার ডাক দিলেন, তার মূল উপজীব্য নাকি এই একটি বাক্য—‘আমি সেই দিনের অপেক্ষায় আছি, যেদিন মিশরের মেয়েরাও ধর্মকথা ও পর্দাপ্রথার বলয় ভেঙে বেরিয়ে আসবে এবং আমার ‘ইউরোপিয়ান সিস্টার’দের মতো ‘মুক্ত বিহঙ্গ’ হয়ে উদার আকাশে উড়াল দেবে।’

আরও আশ্চর্যের বিষয়, নারী-স্বাধীনতার নামে মিশরের মুসলিম নারীদের সাথে যারা ফ্রড খেলা শুরু করেছিলেন, তাদের দলে যে শুধু পুরুষই আছেন তা নয়, নারীও আছেন। হুদা শারাভি। সে-সময়ের নারী আন্দোলনের অবিস্মরণীয় নাম। প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের বিভিন্ন নারী সংস্থায় ছিল তার দাপুটে বিচরণ। ১৯২৩ সালে ইতালির রাজধানী রোম নগরীতে প্রথম যে নারী-বিষয়ক আন্তর্জাতিক সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল তিনি সেই সেমিনারেও উপস্থিত হয়েছিলেন। মিশরে ফিরতি পথে সফর করেছিলেন সমুদ্রে। জাহাজে উঠে মিশরের প্রথম মুসলিম নারী হিসেবে হাজার বছরের মুসলিম ঐতিহ্যকে লাথি মেরে মুসলিম জাতির গর্ব, অহংকার ভেঙে চুরমার করে নিজের মাহাত্ম্য, নিজের আভিজাত্যের প্রতীক, যা তাকে চির সম্মানে ভূষিত করে রেখেছিল এতটা কাল, সেই হিজাবটি খুলে ফেললেন এবং সামনে ছুটে চলা জাহাজ থেকে পেছনে উড়ে ফেলে দিলেন—অগণিত পরপুরুষের সামনে লক্ষ কোটি মুসলিম নারীকে অপমানিত করে, ‘পর্দা প্রথার শৃঙ্খলা’ ভেঙে বেরিয়ে পশ্চিমা ‘মুক্ত বিহঙ্গ’ হয়ে, চৌদ্দশো বছরের রক্তমাখা মুসলিম শাহী কাফেলাকে পদদলিত করে। বিনিময়ে যা পেলেন তা কিছু ফিরিঙ্গিপনা বাহবা ও করতালি, এবং কিছু নীরব নিস্তব্ধ ব্যথিত হৃদয়ের রক্তক্ষরণ। কিন্তু তার চোখে মুখে যা ছিল তা কোনো অজানা অহংকারের স্ফূর্তি বৈ কী!

তিনি ফিরে এলেন কায়রোতে। বিশ্বজয়ের আনন্দ নিয়ে। তথাকথিত নারী-আন্দোলনের মহানায়িকা হয়ে। ইতালির সেমিনার থেকে অর্জিত শিক্ষার ফলস্বরূপ প্রতিষ্ঠা করলেন একটি সংস্থা—মিশরীয় নারী ঐক্য। সংস্থার মূল সুর যেন ইতালির সেমিনার থেকেই ভেসে আসে। নারীর অধিকার চাই। সমান অধিকার চাই। পুরুষের সাথে মিলেমিশে কাজ করলে ক্ষতি কী? পোশাক-আশাক কেমন হবে, কীভাবে হবে সেটা আমার ব্যাপার, এখানে বাঁধাবান্ধি কীসে? কীসের হিজাব, কীসের নেকাব? তালাকের অধিকার চাই। পুরুষের অভিভাবকত্ব মানি না। পুরুষ যদি চারটে বউ রাখতে পারে তা হলে আমরা...? ইত্যাদি ইত্যাদি অন্যান্য আবর্জনা সম সব কথাবার্তা। প্রবৃত্তির অনুগামী হলে যা হয়। অনেকটা শিয়ালের ছদ্মবেশের মতো। বুঝে হোক না বুঝে হোক, প্রোপাগান্ডায় সুর মেলানোই আধুনিকতা। সুর না মেলালেই সেকেলে, কূপমণ্ডূক, ধর্মযাজক, কুসংস্কারাচ্ছন্ন ইত্যাদি।

মিশরের এই নারী-আন্দোলনের প্রতি পশ্চিমা দেশগুলো উৎসুক ছিল তাক লাগানোর মতো। এক কথায় তারা মুক্ত হস্তে দান করা শুরু করে দিল। ইউরোপীয়রা নিজ মিশরে চলে এলেন মিশরের নারী-আন্দোলনের অগ্রগতি এবং কর্মতৎপরতা পর্যবেক্ষণের জন্য।

হুদা শারাভির আন্দোলনকে গতিশীল করতে এগিয়ে এলেন দুরিইয়াহ শাফিক। প্রাচ্যের নিয়মনীতিকে তিনিই সবচেয়ে বেশি দুঃসাহসিকতার সাথে আঘাত করতে লাগলেন। পশ্চিমা নারীর অনুসরণই যেন তার কাছে জীবনে সফল হওয়ার একমাত্র চাবিকাঠি। তিনি ধর্মহীন ভাষায় ঘোষণা দিলেন, ‘আমরা সত্যিই অনুসরণের যোগ্য, আমরা তাদেরই অনুসরণ করব। মিশরীয় নারীদের অনুসরণের যোগ্য একমাত্র পশ্চিমা নারীরাই। বিশেষত ব্রিটেনের মহারানী।’

দুরিইয়াহ শাফিকের দলে তাঁর পরে আরও একজন মহামতির আবির্ভাব হলো। আমিনা সায়িদ। তিনি নারীবিষয়ক একটি পত্রিকা বের করতে লাগলেন। নাম দিলেন হাওয়া (ইভ)। হাওয়া নামের ‘হাওয়া’ দিয়েই পশ্চিমা বিষ ঢুকিয়ে দিতে লাগলেন মিশরীয় নারীদের মনে। তিনি স্বামী এবং অভিভাবকের সাথে অবাধ্যতা, হঠকারিতা ও স্বেচ্ছাচারিতার উসকানি দিতে লাগলেন চিমটি কাটার মতো করে। অজুহাত—পুরুষের আধিপত্যকামিতা। দাবি—দাসীত্ব থেকে মুক্তি, আর একটু ইনিয়ে-বিনিয়ে, মানসিক দাসত্ব থেকে মুক্তি। তার বিদ্রোহের শিকার হলো ইসলামের মাহাত্ম্যপূর্ণ শৈলী—পর্দা ব্যবস্থা। বিদ্রোহের শিকার হলো মুসলিম নারীর সবচেয়ে বড় গুণ, সবচেয়ে বড় মাহাত্ম্য—সতীত্ব। তিনি পর্দাব্যবস্থা নিয়ে যে শ্লেষাত্মক উক্তিটি করেছেন, তা খুবই দুঃখজনক। তিনি বলেছেন: “মেয়েরা পুরো শরীর ঢেকে ভূতের মতো হয়ে কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসবে এটাই কি ইসলাম? একটা জীবন্ত মেয়েকে না মরতেই কফিনে পরিয়ে দেওয়া কি ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য খুবই জরুরি?”

ঔপনিবেশিক গোষ্ঠীর ভাবশিষ্যরা নারী-স্বাধীনতা ও নারীমুক্তির জোর প্রচারণা চালাতে থাকলেন। তাদের নির্লজ্জ শব্দপ্রয়োগের চাতুর্য, মনগড়া হাঁকডাকের তর্জন-গর্জন অনেক মিশরীয় মেয়েকে মোহাচ্ছন্ন করল। অনেক মেয়েই পর্দার বিষয়ে এখন স্বেচ্ছাচারী, হঠকারী। তারা প্রথমে হাত ও মুখ খোলা শুরু করে। তারপর মাথা, তারপর পায়ের গোছা, তারপর রান। শালীনতার জন্য সাধারণ ভদ্রতা বোধও বিদায় নেয় মাঝামাঝি কোনো পর্যায়ে। নামে মাত্র যা থাকে—শুধুই ফ্যাশন।

ধীরে ধীরে বিষয়টি গড়াল ধর্মীয় বিধিনিষেধ এবং সামাজিক রীতিনীতিগুলোকে উপেক্ষা করে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা পর্যন্ত। আজ রাস্তাঘাট দোকানপাট শপিংমল থেকে শুরু করে লেক পাড় বা ধর্মীয় বিদ্যাপীঠ—কোনো কিছুই অশ্লীলতামুক্ত নয়। আর বিনোদনের নামে অশ্লীলতার জন্যই সেসব জায়গার উৎপত্তি হয়েছে সেসব এখন রীতিমতো...। আল্লাহ্ মাফ করুন।

পর্দাবিদ্বেষীরা চরিত্রে বন্ধনহীন এক জাতীয় লাগামহীন পাগলা ঘোড়ায় পরিণত হলো। কর্মমুখর ব্যস্ত সড়কে, ব্যস্ত শহরে, ব্যস্ত অফিসে পুরুষের ভিড়ে নারীরাও ছুটে পড়ল। স্কুল কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়ে সহশিক্ষার প্রতিযোগিতা শুরু হলো। কলকারখানার বড় বড় যন্ত্রপাতির বিকট আওয়াজে নারী-পুরুষও ঘুরপাক খেতে লাগল একসাথে। কিছু নির্ভরতা, কিছুটা স্বাধীনতা, কিছুটা আনন্দ ভুলিয়ে দিল নিজের ঘরকে, নিজের সন্তানকে, নিজের স্বামীকে। ক্ষণিকের এই মায়ামোহে নারীরা ডুবে সরিয়ে দিল তার প্রকৃতিপ্রদত্ত দায়িত্ব ও কর্তব্য থেকে। সে যে কারও মা, সে যে কারও মেয়ে, সে যে কারও স্ত্রী, সে যে কারও বোন; তার যে একটা ঘর আছে, সে যে কোনো ঘরের মালকিন, দূর থেকে দেখা মরীচিকা সবই বিস্মৃত করল তাকে।

নারীরা অবাধ্য হলো। আগ্রহের অবাধ্য হলো। ঘর ছাড়ল। সম্মানের আসন থেকে নেমে এল। ছুঁড়ে ফেলে দিল মাহাত্ম্যের মুকুট। খুলে ফেলে দিল মাথার তাজ—হিজাব, নেকাব। মনে মনে মনগড়া পাওয়ার মতো হয়ে গেল মুক্ত স্বাধীন। পুরুষ তার পেছনে ছোটে এই তার গর্ব। ছেলেরা তার জন্য জীবন দিতে চায় এটাই সফলতা। প্রবৃত্তিকামীরা প্রশংসা করে গদগদ হয়। রুগ্ন মনেরা হাত বাড়ায়, লম্ফঝম্ফ করে। বোকা মেয়ে আনন্দে আত্মহারা। ছদ্মবেশী ছলাকলায় মনে আনন্দ ধরে না। সুখময় মেলামেশায় যেন বিশ্ব জয় জয়ে রূপ নেয়। তাই এতেও হয় না; নাচে, গায়, অভিনয় করে, ফ্যাশন করে। আরও কত কী!

কিন্তু ফল কী হয়, বোন? যখন ঘোর কেটে যায়, যখন জীবন যৌবন সব শেষ হয়ে যায়, তখন নিজেকে আবিষ্কার করে তিক্ত বাস্তবতার কোন কালো অন্ধকারে। দেখে, সে কোনো স্বার্থের বলি, কারও লালসার বলি। খুব সস্তায় অন্যের হয়ে কাজ করেছে সে। কোনো ষড়যন্ত্রের শিকার, কোনো কুচক্রীর ক্রীড়নক। যে কুচক্র, যে ষড়যন্ত্র তারই বিরুদ্ধে, তারই জাতির বিরুদ্ধে, তারই দেশের বিরুদ্ধে। এ কুচক্রের চাকা আবর্তিত হয়েছে মুসলিম পরিবারব্যবস্থাকে ভেঙে দিতে, মুসলিম সমাজব্যবস্থাকে গুঁড়িয়ে দিতে। একটু সুখের কারণে বড় চড়া মূল্য দিতে হলো তাকে। নিজের সম্মান, নিজের সম্ভ্রম, নিজের সবকিছুর সাথে সাথে নিজের দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ।

আর তার পৃষ্ঠপোষকরা, যারা বাহবা করতালি ও মিথ্যা স্তুতি দিয়ে উৎসাহ যুগিয়েছিল, অর্থ খ্যাতি ও সম্ভাবনার জগতে ডাহুক হয়ে ডাক ছেড়েছিল, কথার ফুলঝুরিতে ষোড়শী কুমারীদের মাতিয়ে রেখেছিল, তারাই প্রথম তাকে উপেক্ষা করে। তাদের কাছে তার কোনো মূল্য থাকে না। সত্যিই, ওসব লোকের কাছে চামড়া-জড়া বুড়ির কী বা মূল্য থাকতে পারে?

বলা উচিত, এমন উদাহরণ কম নয় যে, অনেকে নারী-স্বাধীনতার জোর প্রচারণা চালান; চাতুর্যের সকল শৈলী প্রয়োগ করে নারীকে ধর্ম ও বিশ্বাসের প্রতি বিতশ্রদ্ধ করে তোলেন; অথচ ব্যক্তিজীবনে নিজেই নারী-স্বাধীনতা নামের তামান্না থেকে মুক্ত। এই যে কাসিম আমিন। তিনি মিশরে নারী স্বাধীনতার নামে পর্দার প্রথাগত ভীতির কেমন বিরোধিতা করেছেন। অথচ নিজের স্ত্রীকে পর্দারপ্রথা শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করতে দেননি। এমনকি, নিজের ছড়ানো প্রোপাগান্ডার ব্যাপারে নিজের ঘরানা দের রেখেছেন সম্পূর্ণ অন্ধকারে। তাই তো তার স্ত্রী শরঈ পর্দার পূর্ণ পাবন্দি করেন। শুধু তাই নয়, প্রায়ই তার পক্ষ থেকে এমন বিবৃতি আসে যে, তার স্বামী, যেমনটা লোকে বলে যে তিনি সমাজে অনাচার ছড়াচ্ছেন, তেমন নন। তিনি কখনোই খোলামেলা চলা এবং অবাধ মেলামেশার পক্ষপাতী নন। তিনি শরঈ পর্দার প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল। এসব লোকের মিথ্যাচার ও অপব্যাখ্যা।

জনাব আবদুল কুদ্দুস সাহেবের কথা তো বলাই বাহুল্য। তিনি এ পর্যন্ত কতগুলো উপন্যাস লিখেছেন। তার রচিত অনেক উপন্যাসের চলচ্চিত্রায়নও হয়েছে। তার অধিকাংশ উপন্যাসই ধর্মীয় মূল্যবোধকে আঘাত করে রচিত। নারীদের ধর্মবিদ্বেষে প্রলুব্ধ করার প্রয়াস তার কম নয়। অথচ কাণ্ড দেখুন, ঔপন্যাসিক আবদুল কুদ্দুস এবং বাস্তবজীবনের আবদুল কুদ্দুসের মাঝে কেমন আকাশ পাতাল ফারাক। তিনি স্ত্রীকে বাইরে বের হতে দেন না। চাকরি করতে দেন না। অথচ তার স্ত্রী উচ্চশিক্ষিতা। শুধু তাই নয়, ব্যক্তি আবদুল কুদ্দুস স্ত্রীর প্রতি খুবই কঠোর। পত্রপত্রিকায়, টেলিভিশনের পর্দায় আজ পর্যন্ত একবারের জন্যও স্ত্রীকে আসতে দেননি; এমনকি, তার ছবিও প্রকাশ হতে দেননি।

প্রিয় বোন, বলুন তো, এমনটা কেন হয়? ...কারণ তিনি ওপরে ওপরে যা-ই বলুন, ভেতরে ভেতরে ভালো করেই জানেন যে, একজন নারীর প্রথম ও প্রধান মৌলিক কর্তব্য হলো একজন মমতাময়ী মা হওয়া, একজন সতীসাধ্বী স্ত্রী হওয়া।

আমরা যেই আবদুল কুদ্দুসের কথা বলছি, কে না জানে, তিনি ছিলেন একজন কর্মজীবী নারীর সন্তান। তার মা বহুল প্রচারিত 'রোয ইউসুফ' পত্রিকায় কাজ করতেন। কিন্তু পুত্র আবদুল কুদ্দুস মাকে আর কাজ করতে দেন না। তিনি চান, মা বাইরের ঝামেলা থেকে মুক্ত হয়ে ঘরে অবসর যাপন করুন।

অবশেষে এমন অনেক মুসলিম নারী আছেন, যারা একসময় তথাকথিত নারী-স্বাধীনতার ফাঁদে পা দিয়েছিলেন। কিন্তু হুঁশ হওয়ার পর, ভণ্ড-প্রচারকের মিথ্যা, প্রতারণা বুঝতে পারার পর, এখন আল্লাহর কাছে তওবা করে আবার ইসলামের সরল সঠিক পথে এসেছেন। আবার নিজে নিজে ধরা দিয়েছেন পর্দাপ্রথার ‘শৃঙ্খলে’, বরণ করে নিয়েছেন ‘চার দেয়ালের বন্দিনীর দশা’।

একসময়ের দুনিয়া কাঁপানো মডেল সাদিরা বাবেল্লি। ছোট পর্দায় ছিলেন হট কেক। আল্লাহ তাকে হেদায়াত দান করেছেন। সর্বশেষ সাক্ষাৎকারে আফসোস সহে বলেছেন, “আমি যখন অভিনয় করতাম, তখন কত চ্যানেল আমার পেছনে পড়ে ছিল। একটি সাক্ষাৎকারের জন্য কত উপহার উপঢৌকন জমে যেত। অথচ আজ আমিই যদি হিজাব পরে নারী-বিষয়ক ধর্ম ও সভ্যতার কথা বলতে চাই, তা হলে একটি চ্যানেলও আমাকে সুযোগ দিতে সম্মত হবে না।”

প্রখ্যাত চলচ্চিত্রশিল্পী শামস বারুদি বলেন, “যখন যশ খ্যাতি অর্থ বিত্তের সবকিছু আমার হাতে ধরা দিল, তখন আমার মনে প্রায়ই একটি প্রশ্ন জাগতে লাগল, এত কিছুর পরও আমি সুখী নই কেন? শামস বারুদি নিজেই নিজের প্রশ্নের উত্তর বলেন, “কারণ আমি বুঝতে পারতাম, আমি এমন একটি কর্ম বেছে নিয়েছি, যা আমার নারীত্বকে কুঁরে-কুঁরে খাচ্ছে প্রতিমুহূর্ত। এটা আমার প্রকৃতির সাথে বেমানান। এরপর থেকে আমি অনেক কাজ ছেড়ে দিতে লাগলাম। এ আশায় যে, আমি আমার নারীত্ব, আমার হারানো সম্মান ফিরে পাব। আমি আল্লাহকে খুব ডাকতাম, যেন তিনি আমাকে এই জগত থেকে দূরে সরিয়ে নেন এবং সত্য ও সুন্দরের পথে পরিচালিত করেন।” তিনি বলেন, “আমি আমার অতীতের স্মৃতিচারণ করতে চাই না। আমি চাই, যদি ওই সময় আমার জীবন থেকে একদম মুছে যেত।”

শামস বারুদি ইসলামের শীতল ছায়ায় ফিরে এসেছেন। তিনি আল্লাহর পথকেই নিজের জীবনপথ হিসেবে বেছে নিয়েছেন। কিন্তু অনিষ্টকারীরা বসে থাকেনি। তারা প্রতিনিয়ত সত্যপ্রাজ্ঞ নারীকে নিয়ে দ্বিধাজাল সৃষ্টি করেছে। কিন্তু যে আল্লাহর আশ্রয়ে নিজেকে সঁপে দেয়, আল্লাহ তার সহায় হন। আল্লাহ শামস বারুদির মনোবল অক্ষুণ্ণ রেখেছেন। তিনি নিজে খরচ করে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ও টিভি চ্যানেলে নিজের অবস্থানের কথা সুস্পষ্ট করেছেন। তিনি সুস্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি তওবা করেছেন। তিনি এই জগত থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। তিনি প্রতিটি মুসলিম তরুণীকে, প্রতিটি মুসলিম নারীকে উদাত্ত আহ্বান জানান ইসলামের পর্দার পাবন্দি করার, ইসলামের বিধিনিষেধকে আঁকড়ে ধরার।১

এমন উদাহরণ পশ্চিমা নারীদের মধ্যেও আছে। ফ্রান্সের বিখ্যাত অভিনেত্রী ব্রিজেট বারদোঁ। পুরো জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন হৈ হুল্লা আর আমোদ ফুর্তিতে। শরীর আর সৌন্দর্যই ছিল জীবনের সবকিছু। কিন্তু জীবনের পড়ন্ত বিকেলে এসে তার আক্ষেপ শুনুন— “জীবন থেকে যে শিক্ষা পেয়েছি তা এই যে, হাজার হাজার আবেগ-উচ্ছ্বসিত প্রলোভনযুক্ত চিঠি, বিমুগ্ধ বিমোহিত কোটি কোটি দর্শকচিত্তের করতালি জীবনের বাস্তবতায় একজনমাত্র বিশ্বাসী পুরুষের ভালোবাসা হতে পারে না, যা আমাকে জড়িয়ে রাখে ভালোবাসায়; যা আমার অন্তরে শান্তি আনে, অভয় দেয়। আমার বিপুল খেতাব, যশ খ্যাতি ছিল। অনেক অর্জন ছিল। কিন্তু জীবনের চরম বাস্তবতায় আমি ব্যর্থ। আমার প্রাপ্তির খাতা শূন্য। আমি তাই মানুষ থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বাকি জীবনটা নীরবে কাটিয়ে দিতে চাই। মিডিয়া থেকে অনেক দূরে।” তিনি আরও বলেন, “আমাকে চেনে এমন অনেক। কিন্তু আমার বন্ধু বলতে যারা আছে, হাতে গোনার মতো। আমার ছেলের কথাই বলি। সে যখন ছোট ছিল, তখন আমি তাকে গুরুত্ব দিইনি; সুতরাং আমি যখন বৃদ্ধা হয়েছি, তখন সে আমাকে গুরুত্ব দেবে এমনটা আমি আশা করতে পারি না।”২

বণিকমহল নারীস্বাধীনতার বিষয়টিকে সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেছে। বাণিজ্যিক প্রচারণায় তাদের কাছে সবচেয়ে কার্যকরী মাধ্যম হলো সংস্কৃতি। পণ্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য বিলাস, স্বল্প-বসনা নারী এবং নারীর উলঙ্গ অর্ধোউলঙ্গ ছবির কোনো জুড়ি নেই। ব্রিটিশ নারী-স্বাধীনতা সংস্থাও এভাবে নারী-স্বাধীনতার নামে নারী-অবমাননার পায়তারা করেছে। বামপন্থী টিমও এ ব্যাপারে প্রচুর প্রতিবাদ জানিয়েছেন। কেননা, তিনিও মনে করেন, এটা কার্যত নারীর অবমাননা।

বড় বড় বস্ত্রালয়গুলোতে নারীদের যেভাবে ব্যবহার করা হয়, তা রীতিমতো উপহাস। ফরাসি ফ্যাশনগার্ল ফাজিয়ান ‘আল মুসলিমুন’ পত্রিকার একটি একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেন, “এ পথে আসা সহজ ছিল। কিংবা আমার কাছে সহজ মনে হয়েছিল। খুব সহজেই খ্যাতির স্বাদ পাই। উপঢৌকনে আমার ঘর ভরে যায়। আমি এত সহজে এত কিছু পাব, স্বপ্নেও ভাবিনি। কিন্তু আমাকে যে মূল্য দিতে হয়েছে, তা অনেক চড়া।

প্রকৃতপক্ষে এখানে সফলতার পথ একটাই—আবেগ অনুভূতি বিসর্জন দিতে হবে, লজ্জা শরম ছেড়ে ফেলতে হবে, বেহায়াপনাকে সক্রিয় করে দিতে হবে, আত্মসম্মানকে গলা টিপে হত্যা করতে হবে; বেশি বোঝা যাবে না, বেশি ভাবা যাবে না। তোমাকে যা ধরে রাখতে হবে —তোমার দেহ, তোমার রূপ-লাবণ্য, তোমার দীপ্তিময় ভরা যৌবন; দেহের সৌন্দর্য ও সুর মূর্ছনা। আকর্ষণ ধরে রাখতে জগতের সব সুস্বাদু খাবার বর্জন করা, পাশাপাশি নিয়মিত বলবর্ধক ও উত্তেজনাকর ড্রাগ ও মেডিসিন গ্রহণ করার কথা বাদই দিলাম।

তারা আমাকে একটা জীবন্ত মূর্তি বানিয়ে রেখেছিল। আমার কাজ ছিল ক্রেতাদের মন মত্তে নিমগ্ন করে তোলা। আমি যেন কোনো জড়পদার্থ ছিলাম, যে নির্দিষ্ট হাসিতে মানুষকে হাসাতে পারে; কিন্তু সে নির্গল্প, নির্জীব; তার কোনো অনুভূতি নেই। সেখানে প্রতিদিন বস্ত্রালয়ের বস্ত্র শরীরে ধারণ করতে হয়; তার আগে দেহ থেকে নারীত্ব ও মনুষ্যত্বের বস্ত্র খুলে ফেলতে হয়। নয়তো এই নিষ্ঠুর পৃথিবী তোমাকে ছুঁড়ে ফেলে দেবে। তুমি যদি কোনো স্টেপ ভুল কর, তা হলে তোমাকে শাস্তি পেতে হবে, যা একই সাথে মানসিক ও শারিরীক!...

একজন ফ্যাশনগার্ল হিসেবে সর্বত্র বিচরণ করেছি। ফ্যাশনের পোশাকে দেহাবরণ করে, নিজের নারীত্বকে বিসর্জন দিয়ে দর্শকদের মনোরঞ্জন করেছি, কিন্তু তারা আমার কেউ নয়, তাদের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই; আমার কষ্ট হতো, যখন দেখতাম, তাদের কাছে আমার ব্যক্তিত্বের কোনো মূল্য নেই। যত মূল্য—আমার গড়নের, আমার পরনের পোশাকের।”১

এককালের স্বনামধন্য ফ্যাশনগার্ল ফজিয়ান এভাবে নিজের জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা ব্যক্ত করেছেন। আল্লাহ তাকে তওফিক দান করেছেন, তিনি সেই অভিশপ্ত জীবনের নরকভোগ থেকে পালিয়ে ইসলামের শীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেছেন।

প্রিয় বোন, একটু তো ভাবুন, পৃথিবীতে বর্বরতার আর কোনো উদাহরণ আছে কি, যা একজন নারীর নারীত্বকে বিসর্জন দেওয়ার চাইতেও নির্মম; যাকে জীবন্ত দাসী বানিয়ে রাখা হয় তার সম্মান ও সম্ভ্রম নিয়ে খেলা করার জন্য, তার নারীত্বকে নিষ্পেষিত করার জন্য, তার লজ্জাকে লালসার বাজারে বলি দেওয়ার জন্য?

পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে কী ভয়াবহ অবস্থা দাঁড়িয়েছে। ইউরোপিয়ান সামাজিক নিরীক্ষণ সংস্থার একটি জরিপ শুনলে আঁতকে উঠতে হয়। তাদের গবেষণা মতে পঁচিশ বছর বয়সী আশি ভাগ ব্রিটিশ নারী একা একা লন্ডনের রাস্তায় চলতে ভয় পান। কারণ ধর্ষণ ও অপহরণের ভয় প্রতিমুহূর্তে তাঁদেরকে তটস্থ করে রাখে। প্রকাশ থাকে যে, এ বয়সের প্রতি চারজন একজন নারী রাজধানীতে রাস্তায় বের হলে আত্মরক্ষার জন্য সাথে চাকু বা পিস্তল রাখেন।২

কানাডার তথ্যমন্ত্রাণালয়ের জনৈক কর্মকর্তা দুঃখ প্রকাশ করেছেন যে, কানাডায় বসবাসরত অর্ধেকের বেশি নারীই যৌন হয়রানি ও দৈহিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। একটি প্রতিবেদনে এসেছে, গোঁড়ামি ও লালসার শিকার হয়ে নারীরা বিভিন্ন প্রান্তে যৌননির্যাতনের শিকার হচ্ছেন অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে। তারা এটাকে কোনো অপরাধ মনে করে না। বরং এটা তাদের দৃষ্টিতে একটি সাজামাত্র। নারীকে ভয় দেখানোর, শাস্তিপ্রদানের বা তার সংশোধনের একটি সাধারণ প্রক্রিয়া। আশ্চর্যের বিষয়, নারীর প্রতি এরকম জঘন্য অপমানকর কর্মকাণ্ডের বিদ্যমানতা সত্ত্বেও ওসব দেশের বিচারব্যবস্থায় নারী উৎপীড়ন, যৌন হয়রানি বা ধর্ষণ বিশেষ কোনো শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে বিবেচিত নয়। কারণ এগুলো সেখানে এখন স্বাভাবিক ব্যাপার।১

জনৈকা আমেরিকান নারী সাংবাদিক হেলেন স্ট্যানবেরি ভ্রমণের উদ্দেশ্যে কায়রো আসেন। প্রায় কয়েক সপ্তাহ এখানে অবস্থান করেন। তিনি কায়রোর বিভিন্ন মাদরাসা, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়; বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান; নারী, পুরুষ ও শিশু-সংক্রান্ত বিভিন্ন সংস্থা ইত্যাদি পরিদর্শন করেন। তার রিসার্চের মূল বিষয় ছিল পরিবার, সমাজ ও নারী পুরুষের বিভিন্নমুখী সমস্যা, উৎপত্তি ও উত্তরণ। ভ্রমণশেষে দেশে ফেরার সময় নিজে একজন খাঁটি পশ্চিমা হয়েও নারী হিসেবে নারী জাতির প্রতি মমত্বের স্বাক্ষর রেখে গেছেন একটি সরল সত্যকে অকপটে স্বীকার করার মাধ্যমে। তিনি লিখেছেন,
“মুসলিম আরব সমাজ নিঃসন্দেহে একটি পূর্ণাঙ্গ ও সুস্থ সমাজ। এই সমাজের পক্ষে এটাই কল্যাণকর হবে যে, তারা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে আঁকড়ে থাকবে। এখানে নারী পুরুষের মাঝে যে যৌক্তিক ব্যবধান ও সীমারেখা রাখা হয়েছে তা কোনোভাবেই মন্দ নয়। এই কয়দিনে এই সমাজের প্রতি আমার অন্তরে যে মুগ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে, তা থেকেই একজন নিঃস্বার্থ হিতাকাঙ্ক্ষী হিসেবে বলছি, আপনারা আপনাদের সামাজিক রীতিনীতি, সভ্যতা সংস্কৃতি এবং চারিত্রিক মূল্যবোধকে অক্ষুণ্ণ রাখার চেষ্টা করুন। আপনারা অবাধ মেলামেশা থেকে বিরত থাকুন। মিথ্যে স্বাধীনতার নামে মেয়েদের বাধা বন্ধনহীন ঝুঁকিপূর্ণ জীবনের দিকে ঠেলে দেবেন না। সত্যি বলতে কি, আপনারা আপনাদের সেই তথাকথিত পরাধীনতাকে ফিরিয়ে আনুন। ইউরোপ আমেরিকার উদারবাদ, বাধা বন্ধনহীনতা ও আধুনিকতা থেকে এটা শত গুণ ভালো। আপনারা অবাধ মেলামেশাকে প্রতিহত করুন। এটা আমেরিকার জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। আমেরিকান সমাজ এখন একটা মৃত সমাজ। সেখানে লম্পট ও ইতরতা ছেয়ে গেছে। সেখানে শুধু অবাধ মেলামেশা ও মিথ্যে স্বাধীনতার বলি হয়ে অসংখ্য সম্ভাবনা ঝরে যায় প্রতিদিন প্রতিনিয়ত।”২

কুয়েতের 'জারিদাতুস সিয়াসিয়াতুল কুয়াইতিয়াহ' পত্রিকার উদ্যোগে জনৈকা জার্মান নারীর একটি সাক্ষাৎকার প্রচার করা হয়। সন্দেহ-নিরসনের জন্য বলছি, ওই নারী একজন অমুসলিম। সাংবাদিক তাঁকে প্রশ্ন করেছেন: 'আপনার দৃষ্টিতে নারীর সুন্দরতম অবস্থানকেন্দ্র কী হতে পারে?' উত্তরে তিনি বলেন, 'ঘর।' একজন পশ্চিমা নারীর মুখে এমন উত্তর শুনে মুসলিম নারী সাংবাদিক কিছুটা হতচকিত হন। তিনি আবার জিজ্ঞেস করেন: 'আপনি কি মনে করেন, সব সময়ই ঘর নারীর জন্য আদর্শ জায়াগা?' তিনি এবার আরও দৃঢ়তার সাথে বললেন: 'হ্যাঁ, আমি মনে করি, সব সময়ই ঘর নারীর জন্য আদর্শ জায়াগা।' এবার সাংবাদিক জানতে চাইলেন: 'ঘরের বাইরে কর্মরত হওয়ার ব্যাপারে কী বলেন?' প্রতিনিধি এবার বললেন: 'মৌলিকততে নারীর সৃষ্টি এজন্য নয়।' সাংবাদিক জিজ্ঞেস করলেন: 'তাহলে সমাজগঠনে নারী পুরুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে কী করে?' প্রতিনিধি বললেন: 'সমাজগঠনে নারী পুরুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য, আমি মনে করি না, বাইরে গিয়ে কাজ করার প্রয়োজন আছে। অন্যভাবেও সেটা হতে পারে। নারী পুরুষকে একটি সুখময় শান্তিময় পরিবার উপহার দেবেন। ঘরের বিষয়ে তাকে নিশ্চিত রাখবেন। সুখে দুঃখে পাশে থাকবেন। অর্জনে উপার্জনে সাহস ও প্রেরণা যোগাবেন। ছেলেমেয়েকে মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তুলবেন। নারী বাইরে গিয়ে কাজ করে সামাজিকভাবে যে উন্নতি সাধিত হবে, এভাবে ঘরে থেকে তার চেয়ে অনেক গুণ বেশি হবে। আমি এ কথাটি আবেগ তাড়িত হয়ে বলছি না। জীবনের তিক্ত বাস্তবতা থেকে বলছি। মূলত নারী বাইরে গিয়ে কাজ করে হয়তো আর্থিকভাবে কিছুটা স্বনির্ভরতা পাবেন; কিন্তু পুরো সমাজ এবং সার্বিকভাবে পুরো নারী জাতি নিঃসন্দেহে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যা আমরা হাতে কলমে পাচ্ছি।'৩

বিখ্যাত ব্রিটিশ লেখিকা লেডি ব্রাউন তার বিখ্যাত 'আসুলুল জিনস ওয়া তবিয়াতুহ' গ্রন্থে লিখেছেন, “পুরুষ প্রকৃতগতভাবে জীবনে সরল। আগেও ছিল। এখনো আছে। পরেও থাকবে। আমরা যতই চেষ্টা করি, এই প্রকৃতিকে বদলাতে পারব না। সমানাধিকারের ডাক দিয়ে বা সভা-সেমিনার মহড়া করে কোনো লাভ নেই। পুরুষ সবল। সবলই থাকবে। নারী দুর্বল। দুর্বলই থাকবে।” বিখ্যাত ইংরেজ নারী গল্পকার ও উপন্যাসিক আগাথা ক্রিস্টি বলেন, “সত্যি বলতে কি, এখনকার নারীরা বোকা। স্বাধিকার ও সম-অধিকার পাওয়ার জন্য সে কত কূটনীতিই না খাটল। কিন্তু ফল কী হলো? আমাদের স্বীকার করতেই হলো, পুরুষের তুলনায় আমরা দুর্বল। সাথে সাথে পুরুষর সাথে কাজ করতে হচ্ছে, ঘাম ঝরাতে হচ্ছে। অথচ এতটা কাল এটা ছিল শুধু পুরুষের কর্তব্য।... আমাদের পূর্ববর্তী নারীরা চালাক ছিল। তখন নারী পুরুষকে এই বিশ্বাসে আসক্ত রেখেছিল যে, সে দুর্বল; সে সব সময় পুরুষের স্নেহ ও ভালোবাসার পাত্রী; সে সবসময় পুরুষের আদর ও আশ্রয় চায়। তখন পুরুষই ছিল পরিবারের মাথা। পুরো পরিবারের সুখের জন্য মৌলিকভাবে দায়িত্বশীল ছিল পুরুষই। কিন্তু আজ কী হচ্ছে? নারী স্বাধীনতা চায়। পুরুষের অভিভাবকত্বকে আধিপত্য বলে অস্বীকার করে, অভিভাবকত্ব মানে না। আন্দোলন করে —দুর্বার আন্দোলন। কিন্তু পুরুষের অভিভাবকত্বকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে যে স্বাধীনতা পায়, সে আর-এক যাযাবর বিড়ম্বনা। ... নারী বাধা না মেনে সর্বক্ষেত্রে পুরুষের সাথে পাল্লা দিতে চায়। এখন তাকে সবখানে নামতে হয়। যা তার নামার মতো, তাতেও। যা তার নামার মতো নয়, তাতেও। ফল কী হয়? জীবন থেকে সুখ বিদায় নেয়, নারী ক্লান্ত হয়। ... অথচ আগের জীবনধারায় পুরুষ ছিল নারীর সুখ ও সম্মানের অতন্দ্র প্রহরী।”

প্রিয় বোন, জীবনের তিক্ততা পশ্চিমা নারীদের ঘোর কাটিয়েছে। তাদের টনক নড়েছে। তারা এখন প্রকৃতির কোলে ফিরে আসতে চান। কিন্তু পারেন না। তারা এখন অকপটে নারী ও নারীপ্রকৃতিকে স্বীকার করেছেন। সেই সাথে পশ্চিমা সভ্যতার নারীস্বাধীনতার স্বরূপ উন্মোচন করেছেন। তারা চিৎকার করে বলছেন, তারা একজন পুরুষের কর্তৃত্ব (অভিভাবকত্ব ও তত্ত্বাবধান) থেকে বাঁচতে গিয়ে—হোক তিনি স্বামী, পিতা কিংবা ভাই— অনেক পুরুষের সেবাদাসী ও যৌনদাসীতে পরিণত হয়েছেন।

সুতরাং নারীস্বাধীনতার প্রবক্তাদের বলি, মুসলিম নারী তো আপনাদের কাছে গিয়ে পরাধীনতার অভিযোগ করেনি, কখনো কোনো অনুরোধও করেনি, তা হলে এই উপযাচকতা কেন? এত দয়া আপনাদের? তা হলে শুনুন, মুসলিম নারীর কোনো কষ্ট নেই শুধু আপনাদের উড়ে এসে জুড়ে বসা ছাড়া; দয়া করে আমাদের জীবনটাকে আর সংকীর্ণ করে তুলবেন না; আপনাদের জ্বালায় আমরা অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছি; আপনাদের কারণে যেখানে সেখানে পর্দানশীন নারীকে মুখ খুলতে হয় আপনাদের পশুবৃত্তির প্রমোদনের জন্য। মুসলিম নারীর যদি কোনো অভিযোগ থেকে থাকে, তো এটাই তাদের অভিযোগ। দয়া করে আপনাদের সাহায্যের হাতটি গুটিয়ে নিন। মিষ্টি কথা বলে আমাদের সরল মেয়েদের মাথা খাওয়া বন্ধ করুন। ছলচাতুরি ছেড়ে দিন। নারী-স্বাধীনতার নামে নারীকে জীবন্ত দাসী বানানোর যে ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেন, তা থেকে বিরত থাকুন। ইসলামের পর্দাপ্রথা থেকে আমরা মুক্তি চাই না। আপনাদের ভ্রান্ত খেলা থেকে মুক্তি চাই।

প্রাচ্যের নারীদের বলি, তোমরা ঘরে ফিরে এসো। আবার সেই ঐতিহ্যের মাঝে ফিরে এসো। ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের বিরুদ্ধে পশ্চিমা পদলেহীরা মুখ থুবড়ে পড়ুক। নারী-সংস্থা, নারী-সংগঠন ও নারী-আন্দোলনের নেতা-নেত্রীদের বলি, তোমরা আওয়াজ তোলো; উচ্চ কণ্ঠে আওয়াজ তোলো—মুসলিম নারী যেন ঘরে ফিরে আসে। আবার যেন ঘরের মালকিন হয়ে সমাজের তাজ মস্তকে ধারণ করে। মুসলিম নারী আবারও স্বামীকে সুখী করাকেই জীবনের ব্রত বানিয়ে নিক। আনুগত্য ও ভালোবাসায় স্বামীর মনের সুখ ও চোখের শীতলতা হয়ে থাকুক। নারী তার সহজাত স্নেহ, মমতা ও ভালোবাসা আবার ফিরে পাক—যা মিথ্যে প্রচারণার মোহে নিখোঁজ হয়ে গেছে। যার আশায় বুক বেঁধে আছে নিষ্পাপ সন্তানরা। যার প্রেরণায় একজন মা সন্তানের সুখের জন্য যাপন করেন বিনিদ্র রজনী। অফুরন্ত ভালোবাসায় সিক্ত করেন সন্তানের জীবনকে।

স্বাধীনতার স্বাদ আস্বাদন করতে গিয়ে পশ্চিমা নারীদের যে করুণ পরিণতি হয়েছে, মুসলিম নারীরা তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করুক। নয়তো ওই দিন বেশি দূরে নয়, যেদিন এখানেও ওই একই অবস্থা বিরাজ করবে। ভাগ্যবান তো সে, যে অন্যের দেখে শিক্ষা গ্রহণ করে। কিন্তু দুর্ভাগা সে, যে নিজে পতিত হওয়া ছাড়া সতর্ক হয় না।

প্রিয় বোন, আল্লাহ আপনাকে চোখ দিয়েছেন দেখার জন্য। দয়া করে দেখুন। চর্মচোখে দেখুন, মর্মচোখে দেখুন, ইসলামী শরীয়াতের সুমহান জীবনদর্শন দেখুন। এ কোনো মানব রচিত জীবনবিধান নয়; এ প্রত্নপ্রদত্ত পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। এ সর্বময়, সর্বজনীন, সর্বকালীন। এ সুনিশ্চিত, নিখুঁত। আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করেছেন, আমাদের কর্ম ও কীর্তিকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি জানেন। আমরা জানি না।

প্রিয় বোন, এই বিশ্বাস ও মূল্যবোধ হৃদয়ে ধারণ করুন। কথাগুলো যখন বুঝে আসবে, এবং অবশ্যই বুঝে আসবে, তখনই এই ধর্মের, আপনার এই ধর্মের মাহাত্ম্য, আপনা-আপনি অনুধাবন করবেন অনায়াসে। অচিরেই আপনার হৃদয়ে অনুরণিত হবে কবির এই কথাগুলো,
ম্যাহলান ফামা হাজাল্লাযী ক্বদ গুররাকুম
ইল্লা সারাবান আওলা তারাউনাল গারবা
কাইফা গাদাল রিজালু বিহি যিআবান
আলা তারাউনা উরাল আখলাক্বি তাশতাক্বিবু
ইনশাক্বিবান ইন তারগাবু লি আমানিকুম
সাওনান ওয়া আইশান মুসতাত্বাবান
ফাদাঊস সুফূরা লি আহলিহি ওয়ারজিঊ
আলাইহিমুল বিক্বানা

এ কী করছ তুমি?
আলো ভেবে আলোয়ার মরুভূমি—
এ যে ভ্রম, এ যে ধোঁকা!
দ্যাখো, দ্যাখো!
ওখানে মানুষ অমানুষ,
ওখানে পুরুষ পশু, হায়েনা;
ওখানে চরিত্রের গিঁঠ ছেঁড়া ফাঁড়া;
ওখানে মোহ, ওখানে মরীচিকা!
চাও কি মায়ের সম্মান, বোনের সুরক্ষা,
সুন্দর সুখকর জীবন?
তবে থামো, আর ছুটো না,
আর ছুটে ছুটে ঝুঁকে ঝুঁকে মোরো না।
এ নগ্নতা বন্ধ করো
পর্দাকে আঁকড়ে ধরো।

প্রিয় বোন, আর কত ছুটবেন মরীচিকার পেছনে? এবার তো থামুন। এবার তো ফিরে আসুন। ফিরে আসুন আপনার প্রতিপালকের দিকে। ইসলামের ছায়াদার ফলদার ফুলদার বৃক্ষের নিচে। এখানে অবলোকন করুন একটি সুন্দর পৃথিবী। এখানে উপভোগ করুন একটি সুন্দর জীবন।

জেনে রাখুন, এখানে কালের গর্ব আপনি, আপনি মুসলিম নারী; এখানে সৃষ্টির অহংকার আপনি, আপনি মুমিন নারী। আপনারাই ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছেন এ উম্মাহর ভবিষ্যৎ—আমাদের নতুন প্রজন্ম। এবার অবিচল মনে আর একবার হৃদয়ে আওড়ান আমাদের প্রিয় প্রভুর মহা বাণী,
كُذٰلِكَ يَضْرِبُ اللَّهُ الْحَقَّ وَالْبাটِلَ ۚ فَأَمَّا الزَّبَدُ فَيَذْهَبُ جُفَاءً ۖ وَأَمَّا مَا يَنْفَعُ النَّاسَ فَيَمْكُثُ فِي الْأَرْضِ ۚ كَذَلِكَ يَضْرِبُ اللَّهُ الْأَمْثَالَ
অর্থ : এভাবেই আল্লাহ্ দৃষ্টান্ত দিয়ে থাকেন সত্য ও মিথ্যার। আবর্জনার ফেনা নিমেষেই শেষ হয়ে যায়। কিন্তু যা মানুষের জন্য উপকারী তা ওপরেই থেকে যায়। এভাবেই আল্লাহ্ তুলে ধরেন সুন্দর দৃষ্টান্ত। —সূরা রাদ : ১৭

টিকাঃ
১. আন্ডারউড হিওয়ার : ১/৯৯।
২. আদ্দায়তুল হিয়ার: ২/২১।
১. কিতাবুল হিয়া মিন আলামিন ওয়ালাদ ইলা রিহাবিল ঈমান: ৬৯-৬৯।
২. রিসালাতুন ইলা হাওয়া: ৩৪/২৪-২৫।
১. মিস্ আল্লামিন ওমারা ইলা রিহাবিল ঈমান: ১২-১৩।
২. সুরাতুল নিওয়া-২৫: ২৪।
১. সুরাতুল ফিতরাহ: ৬৬।
২. রিসালাতুন ইলা হাওয়া: ৪/১২০।
৩. সুরাতুল ফিতরাহ: ১৩।

বিগত কয়েক শতাব্দী মুসলিম নারী আপন মহিমায় ছিল ভাস্বর। পর্দার আড়ালে সুরক্ষিতা মণি-মুক্তোর মতো দেদীপ্যমান। ঘরের সিংহাসনে সমাসীনা মহিমান্বিতা মালকিন। ঘরে বসে গড়ে মহামানব, মহাবীর, মহাজ্ঞানী। মুসলিম নারীর এই অবিচল অবস্থান নিশ্চিত করেছিল মুসলিম জাতির অপ্রতিরোধ্যতা, অপ্রতিদ্বন্দ্বিতা; নিশ্চিত করেছিল মুসলিম দুর্গের দুর্ভেদ্যতা, দুর্লঙ্ঘ্যতা।

তাই ঔপনিবেশিক গোষ্ঠী ছিল হয়রান পেরেশান। তাদের মুখখাওয়া ও গুণগাওয়া পদলেহীরাও ছিল হতবাক হতবুদ্ধি। মুসলিম দুর্গের দুর্ভেদ্যতার সামনে তাদের সকল শ্রম, সকল সাধনাই যেন পণ্ড হয়ে যায়। কিন্তু যারা ইসলামের আজন্ম শত্রু, তাদের কি আর সহ্য হয়? তারা কি আর বরদাশত করতে পারে? মুসলিম উম্মাহর শক্তি, সামর্থ্য, সহনশক্তি, আত্মিক বিপুল সমৃদ্ধি, জাগতিক বিশাল শান-শওকত তাদের কি হিংসার অনলে পোড়ায় না?

অবশেষে তারা মরণকামড় দিতে উদ্যত হলো। ষড়যন্ত্র ও শলাপরামর্শের মহড়া দিতে শুরু করল। তাদের একটাই লক্ষ্য —কী করে মুসলিম সমাজের মূলে কুঠারাঘাত করা যায়? তাদের সমগ্র শক্তি নিয়োগ করল শুধু একটি বিষয় উদ্ঘাটনে—যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী কী করে একটি জাতি এমন অপ্রতিরোধ্য থাকতে পারল? কী এমন আছে যা তাদেরকে বার্ধক্য, জরাজীর্ণতা, ঘুশেঁ ধরা ও পোকায় খাওয়া থেকে রক্ষা করছে এতকাল?

অবশেষে তারা আবিষ্কার করে ফেলল। মুসলিম জাতির শক্তির রহস্য উদ্ঘাটন করে ফেলল। তারা আবিষ্কার করল, মুসলিম জাতির শক্তির রহস্য—আর কিছু নয়, মুসলিম নারী—যে নারী বিলকুল কিছু উশৃঙ্খলতাহীন, অসাধারণ কিছু বৈশিষ্ট্যে বিশিষ্টা। যার মনোবল ইস্পাতকঠিন, অবিচলতা পর্বতপ্রমাণ। যিনি সত্যকথনে নির্ভয়, নির্মোহা। যিনি পারেন সত্যিকার মুমিন ও মুত্তাকী একটি নতুন প্রজন্ম জাতিকে উপহার দিতে প্রতিটি যুগে, প্রতিটি শতাব্দীতে; যারা আপন ঈমান ও আকীদার প্রতি গভীরভাবে শ্রদ্ধাশীল, এবং ধর্ম ও বিশ্বাসের মূলে কঠিনভাবে গ্রথিত।

তারা মুসলিম নারীকে টার্গেট করল। ছলে বলে কৌশলে তাকে নিজ ধর্ম ও বিশ্বাসের প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তুলতে লাগল। টোপ হিসেবে ব্যবহার করল তথাকথিত প্রগতি নামের আপাতমধুর স্লোগান।

গ্ল্যাডস্টোন, ব্রিটিশ (তৎকালীন) প্রধানমন্ত্রী, ব্রিটেনের গণসভায় দম্ভভরে ঘোষণা দিয়েছিলেন, “যতদিন মুসলিম নারীর হিজাব উঠিয়ে দেওয়া না যাবে এবং যতদিন মুসলমানদের কুরআন বন্ধ করা সম্ভব না হবে ততদিন প্রাচ্যের অবস্থা আমাদের অনুকূলে আসবে না।”১

আর্নেস্ট লুথার ১৯০৫ সালে কায়রোতে প্রতিষ্ঠিত খ্রিস্টান মিশনারিতে নিয়োজিত কর্মী, পরামর্শক ও তত্ত্বাবধায়ীদের মুসলিম বিশ্বে কীভাবে মিশনারির তৎপরতা চালাতে হবে তার দিক-নির্দেশনামূলক বক্তব্যে বড় রকমের মেজাজ নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন, “আপনারা কাজ চালিয়ে যান। হতাশার কিছু নেই। বরং আমরা আশার আলোই দেখতে পাচ্ছি। কেননা, বাস্তবতা এই যে, মুসলমানদের মাঝে পাশ্চাত্য সভ্যতা, ইউরোপীয় জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং নারী-স্বাধীনতার প্রতি ভীষণ উৎসাহের সৃষ্টি হয়েছে।”

আন্না মিলিগান, খ্রিস্টধর্মের জনৈকা নারী স্বেচ্ছাসেবক, খুব আনন্দের সাথে মন্তব্য করেছেন, “আমরা কায়রোর মহিলা কলেজে একসাথে অনেক মেয়েকে আমাদের সারিতে জড়ো করতে সক্ষম হয়েছি। এদের অধিকাংশের পিতা ও অভিভাবক হলো পাশা। সত্যিই খ্রিস্টান মিশনারিরা একসাথে এতগুলো মুসলিম মেয়ে পাওয়া দুষ্কর। এই বিদ্যালয় থেকে মুসলিম দুর্গে আঘাত হানার এটাই মোক্ষম সময়।”২

মুসলিম নারী পর্যন্ত পৌঁছার জন্য শুরু হলো ইসলামবিদ্বেষীদের ছক আঁকা এবং সে অনুযায়ী কাজ করা। তারা প্রথমে মিশরের মেধাবী মুসলিম তরুণ-তরুণীদের শিকার করা শুরু করল। তারপর নিজেদের উদ্যোগে পাশ্চাত্যের ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের মতো উন্নত দেশগুলোতে উচ্চ শিক্ষার জন্য পাঠাতে লাগল। আজকের রিফায়াহ তাহতাবী, কাসিম আমিন, হুদা শারাভি কিন্তু এসবেরই পরম্পরা।

এরা পশ্চিমা দেশগুলোতে থেকে পশ্চিমা সংস্কৃতি ও সভ্যতা রপ্ত করে দেশে ফেরে। তারপর নিজের দেশের তরুণ-তরুণীর মাথা খাওয়া শুরু করে। বড় নির্লজ্জভাবে নিজ দেশের সভ্যতা সংস্কৃতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করতে থাকে। সেই সাথে পশ্চিমা নোংরামির গুণগানে থাকে পঞ্চমুখ। ‘যেন বাপ-চাচা, মা-খালা সব কুয়োর ব্যাঙ; তিনি এসেছেন সাগর ঘুরে।’

এই যে রিফায়াহ তাহতাবী! তিনি কী করলেন? একদম নির্লজ্জের মতো প্রকাশ্যে ঘোষণা দিলেন, “খোলামেলা চলা আর ছেলেমেয়ে অবাধ মেলামেশা করা এতে খারাপ কী আছে? ইউরোপের রাস্তায় যদি নাচগান কর, তা হলে একে পাপ বলে না। একে বলে তারুণ্য, উচ্ছলতা।”

তারই ভাবশিষ্য কাসিম আমিন ফ্রান্স থেকে ফিরতে না ফিরতেই রাতারাতি মহামতি বনে গেলেন একটি বই লিখে—তাহরীরুল মারআহ (নারী-স্বাধীনতা)। বইটি যেন তাক লাগিয়ে দিল পুরো মিশরবাসীকে। তবুও অবাক লাগে, তিনি যে নারী-স্বাধীনতার ডাক দিলেন, তার মূল উপজীব্য নাকি এই একটি বাক্য—‘আমি সেই দিনের অপেক্ষায় আছি, যেদিন মিশরের মেয়েরাও ধর্মকথা ও পর্দাপ্রথার বলয় ভেঙে বেরিয়ে আসবে এবং আমার ‘ইউরোপিয়ান সিস্টার’দের মতো ‘মুক্ত বিহঙ্গ’ হয়ে উদার আকাশে উড়াল দেবে।’

আরও আশ্চর্যের বিষয়, নারী-স্বাধীনতার নামে মিশরের মুসলিম নারীদের সাথে যারা ফ্রড খেলা শুরু করেছিলেন, তাদের দলে যে শুধু পুরুষই আছেন তা নয়, নারীও আছেন। হুদা শারাভি। সে-সময়ের নারী আন্দোলনের অবিস্মরণীয় নাম। প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের বিভিন্ন নারী সংস্থায় ছিল তার দাপুটে বিচরণ। ১৯২৩ সালে ইতালির রাজধানী রোম নগরীতে প্রথম যে নারী-বিষয়ক আন্তর্জাতিক সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল তিনি সেই সেমিনারেও উপস্থিত হয়েছিলেন। মিশরে ফিরতি পথে সফর করেছিলেন সমুদ্রে। জাহাজে উঠে মিশরের প্রথম মুসলিম নারী হিসেবে হাজার বছরের মুসলিম ঐতিহ্যকে লাথি মেরে মুসলিম জাতির গর্ব, অহংকার ভেঙে চুরমার করে নিজের মাহাত্ম্য, নিজের আভিজাত্যের প্রতীক, যা তাকে চির সম্মানে ভূষিত করে রেখেছিল এতটা কাল, সেই হিজাবটি খুলে ফেললেন এবং সামনে ছুটে চলা জাহাজ থেকে পেছনে উড়ে ফেলে দিলেন—অগণিত পরপুরুষের সামনে লক্ষ কোটি মুসলিম নারীকে অপমানিত করে, ‘পর্দা প্রথার শৃঙ্খলা’ ভেঙে বেরিয়ে পশ্চিমা ‘মুক্ত বিহঙ্গ’ হয়ে, চৌদ্দশো বছরের রক্তমাখা মুসলিম শাহী কাফেলাকে পদদলিত করে। বিনিময়ে যা পেলেন তা কিছু ফিরিঙ্গিপনা বাহবা ও করতালি, এবং কিছু নীরব নিস্তব্ধ ব্যথিত হৃদয়ের রক্তক্ষরণ। কিন্তু তার চোখে মুখে যা ছিল তা কোনো অজানা অহংকারের স্ফূর্তি বৈ কী!

তিনি ফিরে এলেন কায়রোতে। বিশ্বজয়ের আনন্দ নিয়ে। তথাকথিত নারী-আন্দোলনের মহানায়িকা হয়ে। ইতালির সেমিনার থেকে অর্জিত শিক্ষার ফলস্বরূপ প্রতিষ্ঠা করলেন একটি সংস্থা—মিশরীয় নারী ঐক্য। সংস্থার মূল সুর যেন ইতালির সেমিনার থেকেই ভেসে আসে। নারীর অধিকার চাই। সমান অধিকার চাই। পুরুষের সাথে মিলেমিশে কাজ করলে ক্ষতি কী? পোশাক-আশাক কেমন হবে, কীভাবে হবে সেটা আমার ব্যাপার, এখানে বাঁধাবান্ধি কীসে? কীসের হিজাব, কীসের নেকাব? তালাকের অধিকার চাই। পুরুষের অভিভাবকত্ব মানি না। পুরুষ যদি চারটে বউ রাখতে পারে তা হলে আমরা...? ইত্যাদি ইত্যাদি অন্যান্য আবর্জনা সম সব কথাবার্তা। প্রবৃত্তির অনুগামী হলে যা হয়। অনেকটা শিয়ালের ছদ্মবেশের মতো। বুঝে হোক না বুঝে হোক, প্রোপাগান্ডায় সুর মেলানোই আধুনিকতা। সুর না মেলালেই সেকেলে, কূপমণ্ডূক, ধর্মযাজক, কুসংস্কারাচ্ছন্ন ইত্যাদি।

মিশরের এই নারী-আন্দোলনের প্রতি পশ্চিমা দেশগুলো উৎসুক ছিল তাক লাগানোর মতো। এক কথায় তারা মুক্ত হস্তে দান করা শুরু করে দিল। ইউরোপীয়রা নিজ মিশরে চলে এলেন মিশরের নারী-আন্দোলনের অগ্রগতি এবং কর্মতৎপরতা পর্যবেক্ষণের জন্য।

হুদা শারাভির আন্দোলনকে গতিশীল করতে এগিয়ে এলেন দুরিইয়াহ শাফিক। প্রাচ্যের নিয়মনীতিকে তিনিই সবচেয়ে বেশি দুঃসাহসিকতার সাথে আঘাত করতে লাগলেন। পশ্চিমা নারীর অনুসরণই যেন তার কাছে জীবনে সফল হওয়ার একমাত্র চাবিকাঠি। তিনি ধর্মহীন ভাষায় ঘোষণা দিলেন, ‘আমরা সত্যিই অনুসরণের যোগ্য, আমরা তাদেরই অনুসরণ করব। মিশরীয় নারীদের অনুসরণের যোগ্য একমাত্র পশ্চিমা নারীরাই। বিশেষত ব্রিটেনের মহারানী।’

দুরিইয়াহ শাফিকের দলে তাঁর পরে আরও একজন মহামতির আবির্ভাব হলো। আমিনা সায়িদ। তিনি নারীবিষয়ক একটি পত্রিকা বের করতে লাগলেন। নাম দিলেন হাওয়া (ইভ)। হাওয়া নামের ‘হাওয়া’ দিয়েই পশ্চিমা বিষ ঢুকিয়ে দিতে লাগলেন মিশরীয় নারীদের মনে। তিনি স্বামী এবং অভিভাবকের সাথে অবাধ্যতা, হঠকারিতা ও স্বেচ্ছাচারিতার উসকানি দিতে লাগলেন চিমটি কাটার মতো করে। অজুহাত—পুরুষের আধিপত্যকামিতা। দাবি—দাসীত্ব থেকে মুক্তি, আর একটু ইনিয়ে-বিনিয়ে, মানসিক দাসত্ব থেকে মুক্তি। তার বিদ্রোহের শিকার হলো ইসলামের মাহাত্ম্যপূর্ণ শৈলী—পর্দা ব্যবস্থা। বিদ্রোহের শিকার হলো মুসলিম নারীর সবচেয়ে বড় গুণ, সবচেয়ে বড় মাহাত্ম্য—সতীত্ব। তিনি পর্দাব্যবস্থা নিয়ে যে শ্লেষাত্মক উক্তিটি করেছেন, তা খুবই দুঃখজনক। তিনি বলেছেন: “মেয়েরা পুরো শরীর ঢেকে ভূতের মতো হয়ে কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসবে এটাই কি ইসলাম? একটা জীবন্ত মেয়েকে না মরতেই কফিনে পরিয়ে দেওয়া কি ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য খুবই জরুরি?”

ঔপনিবেশিক গোষ্ঠীর ভাবশিষ্যরা নারী-স্বাধীনতা ও নারীমুক্তির জোর প্রচারণা চালাতে থাকলেন। তাদের নির্লজ্জ শব্দপ্রয়োগের চাতুর্য, মনগড়া হাঁকডাকের তর্জন-গর্জন অনেক মিশরীয় মেয়েকে মোহাচ্ছন্ন করল। অনেক মেয়েই পর্দার বিষয়ে এখন স্বেচ্ছাচারী, হঠকারী। তারা প্রথমে হাত ও মুখ খোলা শুরু করে। তারপর মাথা, তারপর পায়ের গোছা, তারপর রান। শালীনতার জন্য সাধারণ ভদ্রতা বোধও বিদায় নেয় মাঝামাঝি কোনো পর্যায়ে। নামে মাত্র যা থাকে—শুধুই ফ্যাশন।

ধীরে ধীরে বিষয়টি গড়াল ধর্মীয় বিধিনিষেধ এবং সামাজিক রীতিনীতিগুলোকে উপেক্ষা করে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা পর্যন্ত। আজ রাস্তাঘাট দোকানপাট শপিংমল থেকে শুরু করে লেক পাড় বা ধর্মীয় বিদ্যাপীঠ—কোনো কিছুই অশ্লীলতামুক্ত নয়। আর বিনোদনের নামে অশ্লীলতার জন্যই সেসব জায়গার উৎপত্তি হয়েছে সেসব এখন রীতিমতো...। আল্লাহ্ মাফ করুন।

পর্দাবিদ্বেষীরা চরিত্রে বন্ধনহীন এক জাতীয় লাগামহীন পাগলা ঘোড়ায় পরিণত হলো। কর্মমুখর ব্যস্ত সড়কে, ব্যস্ত শহরে, ব্যস্ত অফিসে পুরুষের ভিড়ে নারীরাও ছুটে পড়ল। স্কুল কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়ে সহশিক্ষার প্রতিযোগিতা শুরু হলো। কলকারখানার বড় বড় যন্ত্রপাতির বিকট আওয়াজে নারী-পুরুষও ঘুরপাক খেতে লাগল একসাথে। কিছু নির্ভরতা, কিছুটা স্বাধীনতা, কিছুটা আনন্দ ভুলিয়ে দিল নিজের ঘরকে, নিজের সন্তানকে, নিজের স্বামীকে। ক্ষণিকের এই মায়ামোহে নারীরা ডুবে সরিয়ে দিল তার প্রকৃতিপ্রদত্ত দায়িত্ব ও কর্তব্য থেকে। সে যে কারও মা, সে যে কারও মেয়ে, সে যে কারও স্ত্রী, সে যে কারও বোন; তার যে একটা ঘর আছে, সে যে কোনো ঘরের মালকিন, দূর থেকে দেখা মরীচিকা সবই বিস্মৃত করল তাকে।

নারীরা অবাধ্য হলো। আগ্রহের অবাধ্য হলো। ঘর ছাড়ল। সম্মানের আসন থেকে নেমে এল। ছুঁড়ে ফেলে দিল মাহাত্ম্যের মুকুট। খুলে ফেলে দিল মাথার তাজ—হিজাব, নেকাব। মনে মনে মনগড়া পাওয়ার মতো হয়ে গেল মুক্ত স্বাধীন। পুরুষ তার পেছনে ছোটে এই তার গর্ব। ছেলেরা তার জন্য জীবন দিতে চায় এটাই সফলতা। প্রবৃত্তিকামীরা প্রশংসা করে গদগদ হয়। রুগ্ন মনেরা হাত বাড়ায়, লম্ফঝম্ফ করে। বোকা মেয়ে আনন্দে আত্মহারা। ছদ্মবেশী ছলাকলায় মনে আনন্দ ধরে না। সুখময় মেলামেশায় যেন বিশ্ব জয় জয়ে রূপ নেয়। তাই এতেও হয় না; নাচে, গায়, অভিনয় করে, ফ্যাশন করে। আরও কত কী!

কিন্তু ফল কী হয়, বোন? যখন ঘোর কেটে যায়, যখন জীবন যৌবন সব শেষ হয়ে যায়, তখন নিজেকে আবিষ্কার করে তিক্ত বাস্তবতার কোন কালো অন্ধকারে। দেখে, সে কোনো স্বার্থের বলি, কারও লালসার বলি। খুব সস্তায় অন্যের হয়ে কাজ করেছে সে। কোনো ষড়যন্ত্রের শিকার, কোনো কুচক্রীর ক্রীড়নক। যে কুচক্র, যে ষড়যন্ত্র তারই বিরুদ্ধে, তারই জাতির বিরুদ্ধে, তারই দেশের বিরুদ্ধে। এ কুচক্রের চাকা আবর্তিত হয়েছে মুসলিম পরিবারব্যবস্থাকে ভেঙে দিতে, মুসলিম সমাজব্যবস্থাকে গুঁড়িয়ে দিতে। একটু সুখের কারণে বড় চড়া মূল্য দিতে হলো তাকে। নিজের সম্মান, নিজের সম্ভ্রম, নিজের সবকিছুর সাথে সাথে নিজের দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ।

আর তার পৃষ্ঠপোষকরা, যারা বাহবা করতালি ও মিথ্যা স্তুতি দিয়ে উৎসাহ যুগিয়েছিল, অর্থ খ্যাতি ও সম্ভাবনার জগতে ডাহুক হয়ে ডাক ছেড়েছিল, কথার ফুলঝুরিতে ষোড়শী কুমারীদের মাতিয়ে রেখেছিল, তারাই প্রথম তাকে উপেক্ষা করে। তাদের কাছে তার কোনো মূল্য থাকে না। সত্যিই, ওসব লোকের কাছে চামড়া-জড়া বুড়ির কী বা মূল্য থাকতে পারে?

বলা উচিত, এমন উদাহরণ কম নয় যে, অনেকে নারী-স্বাধীনতার জোর প্রচারণা চালান; চাতুর্যের সকল শৈলী প্রয়োগ করে নারীকে ধর্ম ও বিশ্বাসের প্রতি বিতশ্রদ্ধ করে তোলেন; অথচ ব্যক্তিজীবনে নিজেই নারী-স্বাধীনতা নামের তামান্না থেকে মুক্ত। এই যে কাসিম আমিন। তিনি মিশরে নারী স্বাধীনতার নামে পর্দার প্রথাগত ভীতির কেমন বিরোধিতা করেছেন। অথচ নিজের স্ত্রীকে পর্দারপ্রথা শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করতে দেননি। এমনকি, নিজের ছড়ানো প্রোপাগান্ডার ব্যাপারে নিজের ঘরানা দের রেখেছেন সম্পূর্ণ অন্ধকারে। তাই তো তার স্ত্রী শরঈ পর্দার পূর্ণ পাবন্দি করেন। শুধু তাই নয়, প্রায়ই তার পক্ষ থেকে এমন বিবৃতি আসে যে, তার স্বামী, যেমনটা লোকে বলে যে তিনি সমাজে অনাচার ছড়াচ্ছেন, তেমন নন। তিনি কখনোই খোলামেলা চলা এবং অবাধ মেলামেশার পক্ষপাতী নন। তিনি শরঈ পর্দার প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল। এসব লোকের মিথ্যাচার ও অপব্যাখ্যা।

জনাব আবদুল কুদ্দুস সাহেবের কথা তো বলাই বাহুল্য। তিনি এ পর্যন্ত কতগুলো উপন্যাস লিখেছেন। তার রচিত অনেক উপন্যাসের চলচ্চিত্রায়নও হয়েছে। তার অধিকাংশ উপন্যাসই ধর্মীয় মূল্যবোধকে আঘাত করে রচিত। নারীদের ধর্মবিদ্বেষে প্রলুব্ধ করার প্রয়াস তার কম নয়। অথচ কাণ্ড দেখুন, ঔপন্যাসিক আবদুল কুদ্দুস এবং বাস্তবজীবনের আবদুল কুদ্দুসের মাঝে কেমন আকাশ পাতাল ফারাক। তিনি স্ত্রীকে বাইরে বের হতে দেন না। চাকরি করতে দেন না। অথচ তার স্ত্রী উচ্চশিক্ষিতা। শুধু তাই নয়, ব্যক্তি আবদুল কুদ্দুস স্ত্রীর প্রতি খুবই কঠোর। পত্রপত্রিকায়, টেলিভিশনের পর্দায় আজ পর্যন্ত একবারের জন্যও স্ত্রীকে আসতে দেননি; এমনকি, তার ছবিও প্রকাশ হতে দেননি।

প্রিয় বোন, বলুন তো, এমনটা কেন হয়? ...কারণ তিনি ওপরে ওপরে যা-ই বলুন, ভেতরে ভেতরে ভালো করেই জানেন যে, একজন নারীর প্রথম ও প্রধান মৌলিক কর্তব্য হলো একজন মমতাময়ী মা হওয়া, একজন সতীসাধ্বী স্ত্রী হওয়া।

আমরা যেই আবদুল কুদ্দুসের কথা বলছি, কে না জানে, তিনি ছিলেন একজন কর্মজীবী নারীর সন্তান। তার মা বহুল প্রচারিত 'রোয ইউসুফ' পত্রিকায় কাজ করতেন। কিন্তু পুত্র আবদুল কুদ্দুস মাকে আর কাজ করতে দেন না। তিনি চান, মা বাইরের ঝামেলা থেকে মুক্ত হয়ে ঘরে অবসর যাপন করুন।

অবশেষে এমন অনেক মুসলিম নারী আছেন, যারা একসময় তথাকথিত নারী-স্বাধীনতার ফাঁদে পা দিয়েছিলেন। কিন্তু হুঁশ হওয়ার পর, ভণ্ড-প্রচারকের মিথ্যা, প্রতারণা বুঝতে পারার পর, এখন আল্লাহর কাছে তওবা করে আবার ইসলামের সরল সঠিক পথে এসেছেন। আবার নিজে নিজে ধরা দিয়েছেন পর্দাপ্রথার ‘শৃঙ্খলে’, বরণ করে নিয়েছেন ‘চার দেয়ালের বন্দিনীর দশা’।

একসময়ের দুনিয়া কাঁপানো মডেল সাদিরা বাবেল্লি। ছোট পর্দায় ছিলেন হট কেক। আল্লাহ তাকে হেদায়াত দান করেছেন। সর্বশেষ সাক্ষাৎকারে আফসোস সহে বলেছেন, “আমি যখন অভিনয় করতাম, তখন কত চ্যানেল আমার পেছনে পড়ে ছিল। একটি সাক্ষাৎকারের জন্য কত উপহার উপঢৌকন জমে যেত। অথচ আজ আমিই যদি হিজাব পরে নারী-বিষয়ক ধর্ম ও সভ্যতার কথা বলতে চাই, তা হলে একটি চ্যানেলও আমাকে সুযোগ দিতে সম্মত হবে না।”

প্রখ্যাত চলচ্চিত্রশিল্পী শামস বারুদি বলেন, “যখন যশ খ্যাতি অর্থ বিত্তের সবকিছু আমার হাতে ধরা দিল, তখন আমার মনে প্রায়ই একটি প্রশ্ন জাগতে লাগল, এত কিছুর পরও আমি সুখী নই কেন? শামস বারুদি নিজেই নিজের প্রশ্নের উত্তর বলেন, “কারণ আমি বুঝতে পারতাম, আমি এমন একটি কর্ম বেছে নিয়েছি, যা আমার নারীত্বকে কুঁরে-কুঁরে খাচ্ছে প্রতিমুহূর্ত। এটা আমার প্রকৃতির সাথে বেমানান। এরপর থেকে আমি অনেক কাজ ছেড়ে দিতে লাগলাম। এ আশায় যে, আমি আমার নারীত্ব, আমার হারানো সম্মান ফিরে পাব। আমি আল্লাহকে খুব ডাকতাম, যেন তিনি আমাকে এই জগত থেকে দূরে সরিয়ে নেন এবং সত্য ও সুন্দরের পথে পরিচালিত করেন।” তিনি বলেন, “আমি আমার অতীতের স্মৃতিচারণ করতে চাই না। আমি চাই, যদি ওই সময় আমার জীবন থেকে একদম মুছে যেত।”

শামস বারুদি ইসলামের শীতল ছায়ায় ফিরে এসেছেন। তিনি আল্লাহর পথকেই নিজের জীবনপথ হিসেবে বেছে নিয়েছেন। কিন্তু অনিষ্টকারীরা বসে থাকেনি। তারা প্রতিনিয়ত সত্যপ্রাজ্ঞ নারীকে নিয়ে দ্বিধাজাল সৃষ্টি করেছে। কিন্তু যে আল্লাহর আশ্রয়ে নিজেকে সঁপে দেয়, আল্লাহ তার সহায় হন। আল্লাহ শামস বারুদির মনোবল অক্ষুণ্ণ রেখেছেন। তিনি নিজে খরচ করে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ও টিভি চ্যানেলে নিজের অবস্থানের কথা সুস্পষ্ট করেছেন। তিনি সুস্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি তওবা করেছেন। তিনি এই জগত থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। তিনি প্রতিটি মুসলিম তরুণীকে, প্রতিটি মুসলিম নারীকে উদাত্ত আহ্বান জানান ইসলামের পর্দার পাবন্দি করার, ইসলামের বিধিনিষেধকে আঁকড়ে ধরার।১

এমন উদাহরণ পশ্চিমা নারীদের মধ্যেও আছে। ফ্রান্সের বিখ্যাত অভিনেত্রী ব্রিজেট বারদোঁ। পুরো জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন হৈ হুল্লা আর আমোদ ফুর্তিতে। শরীর আর সৌন্দর্যই ছিল জীবনের সবকিছু। কিন্তু জীবনের পড়ন্ত বিকেলে এসে তার আক্ষেপ শুনুন— “জীবন থেকে যে শিক্ষা পেয়েছি তা এই যে, হাজার হাজার আবেগ-উচ্ছ্বসিত প্রলোভনযুক্ত চিঠি, বিমুগ্ধ বিমোহিত কোটি কোটি দর্শকচিত্তের করতালি জীবনের বাস্তবতায় একজনমাত্র বিশ্বাসী পুরুষের ভালোবাসা হতে পারে না, যা আমাকে জড়িয়ে রাখে ভালোবাসায়; যা আমার অন্তরে শান্তি আনে, অভয় দেয়। আমার বিপুল খেতাব, যশ খ্যাতি ছিল। অনেক অর্জন ছিল। কিন্তু জীবনের চরম বাস্তবতায় আমি ব্যর্থ। আমার প্রাপ্তির খাতা শূন্য। আমি তাই মানুষ থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বাকি জীবনটা নীরবে কাটিয়ে দিতে চাই। মিডিয়া থেকে অনেক দূরে।” তিনি আরও বলেন, “আমাকে চেনে এমন অনেক। কিন্তু আমার বন্ধু বলতে যারা আছে, হাতে গোনার মতো। আমার ছেলের কথাই বলি। সে যখন ছোট ছিল, তখন আমি তাকে গুরুত্ব দিইনি; সুতরাং আমি যখন বৃদ্ধা হয়েছি, তখন সে আমাকে গুরুত্ব দেবে এমনটা আমি আশা করতে পারি না।”২

বণিকমহল নারীস্বাধীনতার বিষয়টিকে সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেছে। বাণিজ্যিক প্রচারণায় তাদের কাছে সবচেয়ে কার্যকরী মাধ্যম হলো সংস্কৃতি। পণ্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য বিলাস, স্বল্প-বসনা নারী এবং নারীর উলঙ্গ অর্ধোউলঙ্গ ছবির কোনো জুড়ি নেই। ব্রিটিশ নারী-স্বাধীনতা সংস্থাও এভাবে নারী-স্বাধীনতার নামে নারী-অবমাননার পায়তারা করেছে। বামপন্থী টিমও এ ব্যাপারে প্রচুর প্রতিবাদ জানিয়েছেন। কেননা, তিনিও মনে করেন, এটা কার্যত নারীর অবমাননা।

বড় বড় বস্ত্রালয়গুলোতে নারীদের যেভাবে ব্যবহার করা হয়, তা রীতিমতো উপহাস। ফরাসি ফ্যাশনগার্ল ফাজিয়ান ‘আল মুসলিমুন’ পত্রিকার একটি একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেন, “এ পথে আসা সহজ ছিল। কিংবা আমার কাছে সহজ মনে হয়েছিল। খুব সহজেই খ্যাতির স্বাদ পাই। উপঢৌকনে আমার ঘর ভরে যায়। আমি এত সহজে এত কিছু পাব, স্বপ্নেও ভাবিনি। কিন্তু আমাকে যে মূল্য দিতে হয়েছে, তা অনেক চড়া।

প্রকৃতপক্ষে এখানে সফলতার পথ একটাই—আবেগ অনুভূতি বিসর্জন দিতে হবে, লজ্জা শরম ছেড়ে ফেলতে হবে, বেহায়াপনাকে সক্রিয় করে দিতে হবে, আত্মসম্মানকে গলা টিপে হত্যা করতে হবে; বেশি বোঝা যাবে না, বেশি ভাবা যাবে না। তোমাকে যা ধরে রাখতে হবে —তোমার দেহ, তোমার রূপ-লাবণ্য, তোমার দীপ্তিময় ভরা যৌবন; দেহের সৌন্দর্য ও সুর মূর্ছনা। আকর্ষণ ধরে রাখতে জগতের সব সুস্বাদু খাবার বর্জন করা, পাশাপাশি নিয়মিত বলবর্ধক ও উত্তেজনাকর ড্রাগ ও মেডিসিন গ্রহণ করার কথা বাদই দিলাম।

তারা আমাকে একটা জীবন্ত মূর্তি বানিয়ে রেখেছিল। আমার কাজ ছিল ক্রেতাদের মন মত্তে নিমগ্ন করে তোলা। আমি যেন কোনো জড়পদার্থ ছিলাম, যে নির্দিষ্ট হাসিতে মানুষকে হাসাতে পারে; কিন্তু সে নির্গল্প, নির্জীব; তার কোনো অনুভূতি নেই। সেখানে প্রতিদিন বস্ত্রালয়ের বস্ত্র শরীরে ধারণ করতে হয়; তার আগে দেহ থেকে নারীত্ব ও মনুষ্যত্বের বস্ত্র খুলে ফেলতে হয়। নয়তো এই নিষ্ঠুর পৃথিবী তোমাকে ছুঁড়ে ফেলে দেবে। তুমি যদি কোনো স্টেপ ভুল কর, তা হলে তোমাকে শাস্তি পেতে হবে, যা একই সাথে মানসিক ও শারিরীক!...

একজন ফ্যাশনগার্ল হিসেবে সর্বত্র বিচরণ করেছি। ফ্যাশনের পোশাকে দেহাবরণ করে, নিজের নারীত্বকে বিসর্জন দিয়ে দর্শকদের মনোরঞ্জন করেছি, কিন্তু তারা আমার কেউ নয়, তাদের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই; আমার কষ্ট হতো, যখন দেখতাম, তাদের কাছে আমার ব্যক্তিত্বের কোনো মূল্য নেই। যত মূল্য—আমার গড়নের, আমার পরনের পোশাকের।”১

এককালের স্বনামধন্য ফ্যাশনগার্ল ফজিয়ান এভাবে নিজের জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা ব্যক্ত করেছেন। আল্লাহ তাকে তওফিক দান করেছেন, তিনি সেই অভিশপ্ত জীবনের নরকভোগ থেকে পালিয়ে ইসলামের শীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেছেন।

প্রিয় বোন, একটু তো ভাবুন, পৃথিবীতে বর্বরতার আর কোনো উদাহরণ আছে কি, যা একজন নারীর নারীত্বকে বিসর্জন দেওয়ার চাইতেও নির্মম; যাকে জীবন্ত দাসী বানিয়ে রাখা হয় তার সম্মান ও সম্ভ্রম নিয়ে খেলা করার জন্য, তার নারীত্বকে নিষ্পেষিত করার জন্য, তার লজ্জাকে লালসার বাজারে বলি দেওয়ার জন্য?

পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে কী ভয়াবহ অবস্থা দাঁড়িয়েছে। ইউরোপিয়ান সামাজিক নিরীক্ষণ সংস্থার একটি জরিপ শুনলে আঁতকে উঠতে হয়। তাদের গবেষণা মতে পঁচিশ বছর বয়সী আশি ভাগ ব্রিটিশ নারী একা একা লন্ডনের রাস্তায় চলতে ভয় পান। কারণ ধর্ষণ ও অপহরণের ভয় প্রতিমুহূর্তে তাঁদেরকে তটস্থ করে রাখে। প্রকাশ থাকে যে, এ বয়সের প্রতি চারজন একজন নারী রাজধানীতে রাস্তায় বের হলে আত্মরক্ষার জন্য সাথে চাকু বা পিস্তল রাখেন।২

কানাডার তথ্যমন্ত্রাণালয়ের জনৈক কর্মকর্তা দুঃখ প্রকাশ করেছেন যে, কানাডায় বসবাসরত অর্ধেকের বেশি নারীই যৌন হয়রানি ও দৈহিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। একটি প্রতিবেদনে এসেছে, গোঁড়ামি ও লালসার শিকার হয়ে নারীরা বিভিন্ন প্রান্তে যৌননির্যাতনের শিকার হচ্ছেন অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে। তারা এটাকে কোনো অপরাধ মনে করে না। বরং এটা তাদের দৃষ্টিতে একটি সাজামাত্র। নারীকে ভয় দেখানোর, শাস্তিপ্রদানের বা তার সংশোধনের একটি সাধারণ প্রক্রিয়া। আশ্চর্যের বিষয়, নারীর প্রতি এরকম জঘন্য অপমানকর কর্মকাণ্ডের বিদ্যমানতা সত্ত্বেও ওসব দেশের বিচারব্যবস্থায় নারী উৎপীড়ন, যৌন হয়রানি বা ধর্ষণ বিশেষ কোনো শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে বিবেচিত নয়। কারণ এগুলো সেখানে এখন স্বাভাবিক ব্যাপার।১

জনৈকা আমেরিকান নারী সাংবাদিক হেলেন স্ট্যানবেরি ভ্রমণের উদ্দেশ্যে কায়রো আসেন। প্রায় কয়েক সপ্তাহ এখানে অবস্থান করেন। তিনি কায়রোর বিভিন্ন মাদরাসা, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়; বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান; নারী, পুরুষ ও শিশু-সংক্রান্ত বিভিন্ন সংস্থা ইত্যাদি পরিদর্শন করেন। তার রিসার্চের মূল বিষয় ছিল পরিবার, সমাজ ও নারী পুরুষের বিভিন্নমুখী সমস্যা, উৎপত্তি ও উত্তরণ। ভ্রমণশেষে দেশে ফেরার সময় নিজে একজন খাঁটি পশ্চিমা হয়েও নারী হিসেবে নারী জাতির প্রতি মমত্বের স্বাক্ষর রেখে গেছেন একটি সরল সত্যকে অকপটে স্বীকার করার মাধ্যমে। তিনি লিখেছেন,
“মুসলিম আরব সমাজ নিঃসন্দেহে একটি পূর্ণাঙ্গ ও সুস্থ সমাজ। এই সমাজের পক্ষে এটাই কল্যাণকর হবে যে, তারা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে আঁকড়ে থাকবে। এখানে নারী পুরুষের মাঝে যে যৌক্তিক ব্যবধান ও সীমারেখা রাখা হয়েছে তা কোনোভাবেই মন্দ নয়। এই কয়দিনে এই সমাজের প্রতি আমার অন্তরে যে মুগ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে, তা থেকেই একজন নিঃস্বার্থ হিতাকাঙ্ক্ষী হিসেবে বলছি, আপনারা আপনাদের সামাজিক রীতিনীতি, সভ্যতা সংস্কৃতি এবং চারিত্রিক মূল্যবোধকে অক্ষুণ্ণ রাখার চেষ্টা করুন। আপনারা অবাধ মেলামেশা থেকে বিরত থাকুন। মিথ্যে স্বাধীনতার নামে মেয়েদের বাধা বন্ধনহীন ঝুঁকিপূর্ণ জীবনের দিকে ঠেলে দেবেন না। সত্যি বলতে কি, আপনারা আপনাদের সেই তথাকথিত পরাধীনতাকে ফিরিয়ে আনুন। ইউরোপ আমেরিকার উদারবাদ, বাধা বন্ধনহীনতা ও আধুনিকতা থেকে এটা শত গুণ ভালো। আপনারা অবাধ মেলামেশাকে প্রতিহত করুন। এটা আমেরিকার জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। আমেরিকান সমাজ এখন একটা মৃত সমাজ। সেখানে লম্পট ও ইতরতা ছেয়ে গেছে। সেখানে শুধু অবাধ মেলামেশা ও মিথ্যে স্বাধীনতার বলি হয়ে অসংখ্য সম্ভাবনা ঝরে যায় প্রতিদিন প্রতিনিয়ত।”২

কুয়েতের 'জারিদাতুস সিয়াসিয়াতুল কুয়াইতিয়াহ' পত্রিকার উদ্যোগে জনৈকা জার্মান নারীর একটি সাক্ষাৎকার প্রচার করা হয়। সন্দেহ-নিরসনের জন্য বলছি, ওই নারী একজন অমুসলিম। সাংবাদিক তাঁকে প্রশ্ন করেছেন: 'আপনার দৃষ্টিতে নারীর সুন্দরতম অবস্থানকেন্দ্র কী হতে পারে?' উত্তরে তিনি বলেন, 'ঘর।' একজন পশ্চিমা নারীর মুখে এমন উত্তর শুনে মুসলিম নারী সাংবাদিক কিছুটা হতচকিত হন। তিনি আবার জিজ্ঞেস করেন: 'আপনি কি মনে করেন, সব সময়ই ঘর নারীর জন্য আদর্শ জায়াগা?' তিনি এবার আরও দৃঢ়তার সাথে বললেন: 'হ্যাঁ, আমি মনে করি, সব সময়ই ঘর নারীর জন্য আদর্শ জায়াগা।' এবার সাংবাদিক জানতে চাইলেন: 'ঘরের বাইরে কর্মরত হওয়ার ব্যাপারে কী বলেন?' প্রতিনিধি এবার বললেন: 'মৌলিকততে নারীর সৃষ্টি এজন্য নয়।' সাংবাদিক জিজ্ঞেস করলেন: 'তাহলে সমাজগঠনে নারী পুরুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে কী করে?' প্রতিনিধি বললেন: 'সমাজগঠনে নারী পুরুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য, আমি মনে করি না, বাইরে গিয়ে কাজ করার প্রয়োজন আছে। অন্যভাবেও সেটা হতে পারে। নারী পুরুষকে একটি সুখময় শান্তিময় পরিবার উপহার দেবেন। ঘরের বিষয়ে তাকে নিশ্চিত রাখবেন। সুখে দুঃখে পাশে থাকবেন। অর্জনে উপার্জনে সাহস ও প্রেরণা যোগাবেন। ছেলেমেয়েকে মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তুলবেন। নারী বাইরে গিয়ে কাজ করে সামাজিকভাবে যে উন্নতি সাধিত হবে, এভাবে ঘরে থেকে তার চেয়ে অনেক গুণ বেশি হবে। আমি এ কথাটি আবেগ তাড়িত হয়ে বলছি না। জীবনের তিক্ত বাস্তবতা থেকে বলছি। মূলত নারী বাইরে গিয়ে কাজ করে হয়তো আর্থিকভাবে কিছুটা স্বনির্ভরতা পাবেন; কিন্তু পুরো সমাজ এবং সার্বিকভাবে পুরো নারী জাতি নিঃসন্দেহে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যা আমরা হাতে কলমে পাচ্ছি।'৩

বিখ্যাত ব্রিটিশ লেখিকা লেডি ব্রাউন তার বিখ্যাত 'আসুলুল জিনস ওয়া তবিয়াতুহ' গ্রন্থে লিখেছেন, “পুরুষ প্রকৃতগতভাবে জীবনে সরল। আগেও ছিল। এখনো আছে। পরেও থাকবে। আমরা যতই চেষ্টা করি, এই প্রকৃতিকে বদলাতে পারব না। সমানাধিকারের ডাক দিয়ে বা সভা-সেমিনার মহড়া করে কোনো লাভ নেই। পুরুষ সবল। সবলই থাকবে। নারী দুর্বল। দুর্বলই থাকবে।” বিখ্যাত ইংরেজ নারী গল্পকার ও উপন্যাসিক আগাথা ক্রিস্টি বলেন, “সত্যি বলতে কি, এখনকার নারীরা বোকা। স্বাধিকার ও সম-অধিকার পাওয়ার জন্য সে কত কূটনীতিই না খাটল। কিন্তু ফল কী হলো? আমাদের স্বীকার করতেই হলো, পুরুষের তুলনায় আমরা দুর্বল। সাথে সাথে পুরুষর সাথে কাজ করতে হচ্ছে, ঘাম ঝরাতে হচ্ছে। অথচ এতটা কাল এটা ছিল শুধু পুরুষের কর্তব্য।... আমাদের পূর্ববর্তী নারীরা চালাক ছিল। তখন নারী পুরুষকে এই বিশ্বাসে আসক্ত রেখেছিল যে, সে দুর্বল; সে সব সময় পুরুষের স্নেহ ও ভালোবাসার পাত্রী; সে সবসময় পুরুষের আদর ও আশ্রয় চায়। তখন পুরুষই ছিল পরিবারের মাথা। পুরো পরিবারের সুখের জন্য মৌলিকভাবে দায়িত্বশীল ছিল পুরুষই। কিন্তু আজ কী হচ্ছে? নারী স্বাধীনতা চায়। পুরুষের অভিভাবকত্বকে আধিপত্য বলে অস্বীকার করে, অভিভাবকত্ব মানে না। আন্দোলন করে —দুর্বার আন্দোলন। কিন্তু পুরুষের অভিভাবকত্বকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে যে স্বাধীনতা পায়, সে আর-এক যাযাবর বিড়ম্বনা। ... নারী বাধা না মেনে সর্বক্ষেত্রে পুরুষের সাথে পাল্লা দিতে চায়। এখন তাকে সবখানে নামতে হয়। যা তার নামার মতো, তাতেও। যা তার নামার মতো নয়, তাতেও। ফল কী হয়? জীবন থেকে সুখ বিদায় নেয়, নারী ক্লান্ত হয়। ... অথচ আগের জীবনধারায় পুরুষ ছিল নারীর সুখ ও সম্মানের অতন্দ্র প্রহরী।”

প্রিয় বোন, জীবনের তিক্ততা পশ্চিমা নারীদের ঘোর কাটিয়েছে। তাদের টনক নড়েছে। তারা এখন প্রকৃতির কোলে ফিরে আসতে চান। কিন্তু পারেন না। তারা এখন অকপটে নারী ও নারীপ্রকৃতিকে স্বীকার করেছেন। সেই সাথে পশ্চিমা সভ্যতার নারীস্বাধীনতার স্বরূপ উন্মোচন করেছেন। তারা চিৎকার করে বলছেন, তারা একজন পুরুষের কর্তৃত্ব (অভিভাবকত্ব ও তত্ত্বাবধান) থেকে বাঁচতে গিয়ে—হোক তিনি স্বামী, পিতা কিংবা ভাই— অনেক পুরুষের সেবাদাসী ও যৌনদাসীতে পরিণত হয়েছেন।

সুতরাং নারীস্বাধীনতার প্রবক্তাদের বলি, মুসলিম নারী তো আপনাদের কাছে গিয়ে পরাধীনতার অভিযোগ করেনি, কখনো কোনো অনুরোধও করেনি, তা হলে এই উপযাচকতা কেন? এত দয়া আপনাদের? তা হলে শুনুন, মুসলিম নারীর কোনো কষ্ট নেই শুধু আপনাদের উড়ে এসে জুড়ে বসা ছাড়া; দয়া করে আমাদের জীবনটাকে আর সংকীর্ণ করে তুলবেন না; আপনাদের জ্বালায় আমরা অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছি; আপনাদের কারণে যেখানে সেখানে পর্দানশীন নারীকে মুখ খুলতে হয় আপনাদের পশুবৃত্তির প্রমোদনের জন্য। মুসলিম নারীর যদি কোনো অভিযোগ থেকে থাকে, তো এটাই তাদের অভিযোগ। দয়া করে আপনাদের সাহায্যের হাতটি গুটিয়ে নিন। মিষ্টি কথা বলে আমাদের সরল মেয়েদের মাথা খাওয়া বন্ধ করুন। ছলচাতুরি ছেড়ে দিন। নারী-স্বাধীনতার নামে নারীকে জীবন্ত দাসী বানানোর যে ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেন, তা থেকে বিরত থাকুন। ইসলামের পর্দাপ্রথা থেকে আমরা মুক্তি চাই না। আপনাদের ভ্রান্ত খেলা থেকে মুক্তি চাই।

প্রাচ্যের নারীদের বলি, তোমরা ঘরে ফিরে এসো। আবার সেই ঐতিহ্যের মাঝে ফিরে এসো। ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের বিরুদ্ধে পশ্চিমা পদলেহীরা মুখ থুবড়ে পড়ুক। নারী-সংস্থা, নারী-সংগঠন ও নারী-আন্দোলনের নেতা-নেত্রীদের বলি, তোমরা আওয়াজ তোলো; উচ্চ কণ্ঠে আওয়াজ তোলো—মুসলিম নারী যেন ঘরে ফিরে আসে। আবার যেন ঘরের মালকিন হয়ে সমাজের তাজ মস্তকে ধারণ করে। মুসলিম নারী আবারও স্বামীকে সুখী করাকেই জীবনের ব্রত বানিয়ে নিক। আনুগত্য ও ভালোবাসায় স্বামীর মনের সুখ ও চোখের শীতলতা হয়ে থাকুক। নারী তার সহজাত স্নেহ, মমতা ও ভালোবাসা আবার ফিরে পাক—যা মিথ্যে প্রচারণার মোহে নিখোঁজ হয়ে গেছে। যার আশায় বুক বেঁধে আছে নিষ্পাপ সন্তানরা। যার প্রেরণায় একজন মা সন্তানের সুখের জন্য যাপন করেন বিনিদ্র রজনী। অফুরন্ত ভালোবাসায় সিক্ত করেন সন্তানের জীবনকে।

স্বাধীনতার স্বাদ আস্বাদন করতে গিয়ে পশ্চিমা নারীদের যে করুণ পরিণতি হয়েছে, মুসলিম নারীরা তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করুক। নয়তো ওই দিন বেশি দূরে নয়, যেদিন এখানেও ওই একই অবস্থা বিরাজ করবে। ভাগ্যবান তো সে, যে অন্যের দেখে শিক্ষা গ্রহণ করে। কিন্তু দুর্ভাগা সে, যে নিজে পতিত হওয়া ছাড়া সতর্ক হয় না।

প্রিয় বোন, আল্লাহ আপনাকে চোখ দিয়েছেন দেখার জন্য। দয়া করে দেখুন। চর্মচোখে দেখুন, মর্মচোখে দেখুন, ইসলামী শরীয়াতের সুমহান জীবনদর্শন দেখুন। এ কোনো মানব রচিত জীবনবিধান নয়; এ প্রত্নপ্রদত্ত পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। এ সর্বময়, সর্বজনীন, সর্বকালীন। এ সুনিশ্চিত, নিখুঁত। আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করেছেন, আমাদের কর্ম ও কীর্তিকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি জানেন। আমরা জানি না।

প্রিয় বোন, এই বিশ্বাস ও মূল্যবোধ হৃদয়ে ধারণ করুন। কথাগুলো যখন বুঝে আসবে, এবং অবশ্যই বুঝে আসবে, তখনই এই ধর্মের, আপনার এই ধর্মের মাহাত্ম্য, আপনা-আপনি অনুধাবন করবেন অনায়াসে। অচিরেই আপনার হৃদয়ে অনুরণিত হবে কবির এই কথাগুলো,
ম্যাহলান ফামা হাজাল্লাযী ক্বদ গুররাকুম
ইল্লা সারাবান আওলা তারাউনাল গারবা
কাইফা গাদাল রিজালু বিহি যিআবান
আলা তারাউনা উরাল আখলাক্বি তাশতাক্বিবু
ইনশাক্বিবান ইন তারগাবু লি আমানিকুম
সাওনান ওয়া আইশান মুসতাত্বাবান
ফাদাঊস সুফূরা লি আহলিহি ওয়ারজিঊ
আলাইহিমুল বিক্বানা

এ কী করছ তুমি?
আলো ভেবে আলোয়ার মরুভূমি—
এ যে ভ্রম, এ যে ধোঁকা!
দ্যাখো, দ্যাখো!
ওখানে মানুষ অমানুষ,
ওখানে পুরুষ পশু, হায়েনা;
ওখানে চরিত্রের গিঁঠ ছেঁড়া ফাঁড়া;
ওখানে মোহ, ওখানে মরীচিকা!
চাও কি মায়ের সম্মান, বোনের সুরক্ষা,
সুন্দর সুখকর জীবন?
তবে থামো, আর ছুটো না,
আর ছুটে ছুটে ঝুঁকে ঝুঁকে মোরো না।
এ নগ্নতা বন্ধ করো
পর্দাকে আঁকড়ে ধরো।

প্রিয় বোন, আর কত ছুটবেন মরীচিকার পেছনে? এবার তো থামুন। এবার তো ফিরে আসুন। ফিরে আসুন আপনার প্রতিপালকের দিকে। ইসলামের ছায়াদার ফলদার ফুলদার বৃক্ষের নিচে। এখানে অবলোকন করুন একটি সুন্দর পৃথিবী। এখানে উপভোগ করুন একটি সুন্দর জীবন।

জেনে রাখুন, এখানে কালের গর্ব আপনি, আপনি মুসলিম নারী; এখানে সৃষ্টির অহংকার আপনি, আপনি মুমিন নারী। আপনারাই ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছেন এ উম্মাহর ভবিষ্যৎ—আমাদের নতুন প্রজন্ম। এবার অবিচল মনে আর একবার হৃদয়ে আওড়ান আমাদের প্রিয় প্রভুর মহা বাণী,
كُذٰلِكَ يَضْرِبُ اللَّهُ الْحَقَّ وَالْبাটِلَ ۚ فَأَمَّا الزَّبَدُ فَيَذْهَبُ جُفَاءً ۖ وَأَمَّا مَا يَنْفَعُ النَّاسَ فَيَمْكُثُ فِي الْأَرْضِ ۚ كَذَلِكَ يَضْرِبُ اللَّهُ الْأَمْثَالَ
অর্থ : এভাবেই আল্লাহ্ দৃষ্টান্ত দিয়ে থাকেন সত্য ও মিথ্যার। আবর্জনার ফেনা নিমেষেই শেষ হয়ে যায়। কিন্তু যা মানুষের জন্য উপকারী তা ওপরেই থেকে যায়। এভাবেই আল্লাহ্ তুলে ধরেন সুন্দর দৃষ্টান্ত। —সূরা রাদ : ১৭

টিকাঃ
১. আন্ডারউড হিওয়ার : ১/৯৯।
২. আদ্দায়তুল হিয়ার: ২/২১।
১. কিতাবুল হিয়া মিন আলামিন ওয়ালাদ ইলা রিহাবিল ঈমান: ৬৯-৬৯।
২. রিসালাতুন ইলা হাওয়া: ৩৪/২৪-২৫।
১. মিস্ আল্লামিন ওমারা ইলা রিহাবিল ঈমান: ১২-১৩।
২. সুরাতুল নিওয়া-২৫: ২৪।
১. সুরাতুল ফিতরাহ: ৬৬।
২. রিসালাতুন ইলা হাওয়া: ৪/১২০।
৩. সুরাতুল ফিতরাহ: ১৩।

বিগত কয়েক শতাব্দী মুসলিম নারী আপন মহিমায় ছিল ভাস্বর। পর্দার আড়ালে সুরক্ষিতা মণি-মুক্তোর মতো দেদীপ্যমান। ঘরের সিংহাসনে সমাসীনা মহিমান্বিতা মালকিন। ঘরে বসে গড়ে মহামানব, মহাবীর, মহাজ্ঞানী। মুসলিম নারীর এই অবিচল অবস্থান নিশ্চিত করেছিল মুসলিম জাতির অপ্রতিরোধ্যতা, অপ্রতিদ্বন্দ্বিতা; নিশ্চিত করেছিল মুসলিম দুর্গের দুর্ভেদ্যতা, দুর্লঙ্ঘ্যতা।

তাই ঔপনিবেশিক গোষ্ঠী ছিল হয়রান পেরেশান। তাদের মুখখাওয়া ও গুণগাওয়া পদলেহীরাও ছিল হতবাক হতবুদ্ধি। মুসলিম দুর্গের দুর্ভেদ্যতার সামনে তাদের সকল শ্রম, সকল সাধনাই যেন পণ্ড হয়ে যায়। কিন্তু যারা ইসলামের আজন্ম শত্রু, তাদের কি আর সহ্য হয়? তারা কি আর বরদাশত করতে পারে? মুসলিম উম্মাহর শক্তি, সামর্থ্য, সহনশক্তি, আত্মিক বিপুল সমৃদ্ধি, জাগতিক বিশাল শান-শওকত তাদের কি হিংসার অনলে পোড়ায় না?

অবশেষে তারা মরণকামড় দিতে উদ্যত হলো। ষড়যন্ত্র ও শলাপরামর্শের মহড়া দিতে শুরু করল। তাদের একটাই লক্ষ্য —কী করে মুসলিম সমাজের মূলে কুঠারাঘাত করা যায়? তাদের সমগ্র শক্তি নিয়োগ করল শুধু একটি বিষয় উদ্ঘাটনে—যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী কী করে একটি জাতি এমন অপ্রতিরোধ্য থাকতে পারল? কী এমন আছে যা তাদেরকে বার্ধক্য, জরাজীর্ণতা, ঘুশেঁ ধরা ও পোকায় খাওয়া থেকে রক্ষা করছে এতকাল?

অবশেষে তারা আবিষ্কার করে ফেলল। মুসলিম জাতির শক্তির রহস্য উদ্ঘাটন করে ফেলল। তারা আবিষ্কার করল, মুসলিম জাতির শক্তির রহস্য—আর কিছু নয়, মুসলিম নারী—যে নারী বিলকুল কিছু উশৃঙ্খলতাহীন, অসাধারণ কিছু বৈশিষ্ট্যে বিশিষ্টা। যার মনোবল ইস্পাতকঠিন, অবিচলতা পর্বতপ্রমাণ। যিনি সত্যকথনে নির্ভয়, নির্মোহা। যিনি পারেন সত্যিকার মুমিন ও মুত্তাকী একটি নতুন প্রজন্ম জাতিকে উপহার দিতে প্রতিটি যুগে, প্রতিটি শতাব্দীতে; যারা আপন ঈমান ও আকীদার প্রতি গভীরভাবে শ্রদ্ধাশীল, এবং ধর্ম ও বিশ্বাসের মূলে কঠিনভাবে গ্রথিত।

তারা মুসলিম নারীকে টার্গেট করল। ছলে বলে কৌশলে তাকে নিজ ধর্ম ও বিশ্বাসের প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তুলতে লাগল। টোপ হিসেবে ব্যবহার করল তথাকথিত প্রগতি নামের আপাতমধুর স্লোগান।

গ্ল্যাডস্টোন, ব্রিটিশ (তৎকালীন) প্রধানমন্ত্রী, ব্রিটেনের গণসভায় দম্ভভরে ঘোষণা দিয়েছিলেন, “যতদিন মুসলিম নারীর হিজাব উঠিয়ে দেওয়া না যাবে এবং যতদিন মুসলমানদের কুরআন বন্ধ করা সম্ভব না হবে ততদিন প্রাচ্যের অবস্থা আমাদের অনুকূলে আসবে না।”১

আর্নেস্ট লুথার ১৯০৫ সালে কায়রোতে প্রতিষ্ঠিত খ্রিস্টান মিশনারিতে নিয়োজিত কর্মী, পরামর্শক ও তত্ত্বাবধায়ীদের মুসলিম বিশ্বে কীভাবে মিশনারির তৎপরতা চালাতে হবে তার দিক-নির্দেশনামূলক বক্তব্যে বড় রকমের মেজাজ নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন, “আপনারা কাজ চালিয়ে যান। হতাশার কিছু নেই। বরং আমরা আশার আলোই দেখতে পাচ্ছি। কেননা, বাস্তবতা এই যে, মুসলমানদের মাঝে পাশ্চাত্য সভ্যতা, ইউরোপীয় জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং নারী-স্বাধীনতার প্রতি ভীষণ উৎসাহের সৃষ্টি হয়েছে।”

আন্না মিলিগান, খ্রিস্টধর্মের জনৈকা নারী স্বেচ্ছাসেবক, খুব আনন্দের সাথে মন্তব্য করেছেন, “আমরা কায়রোর মহিলা কলেজে একসাথে অনেক মেয়েকে আমাদের সারিতে জড়ো করতে সক্ষম হয়েছি। এদের অধিকাংশের পিতা ও অভিভাবক হলো পাশা। সত্যিই খ্রিস্টান মিশনারিরা একসাথে এতগুলো মুসলিম মেয়ে পাওয়া দুষ্কর। এই বিদ্যালয় থেকে মুসলিম দুর্গে আঘাত হানার এটাই মোক্ষম সময়।”২

মুসলিম নারী পর্যন্ত পৌঁছার জন্য শুরু হলো ইসলামবিদ্বেষীদের ছক আঁকা এবং সে অনুযায়ী কাজ করা। তারা প্রথমে মিশরের মেধাবী মুসলিম তরুণ-তরুণীদের শিকার করা শুরু করল। তারপর নিজেদের উদ্যোগে পাশ্চাত্যের ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের মতো উন্নত দেশগুলোতে উচ্চ শিক্ষার জন্য পাঠাতে লাগল। আজকের রিফায়াহ তাহতাবী, কাসিম আমিন, হুদা শারাভি কিন্তু এসবেরই পরম্পরা।

এরা পশ্চিমা দেশগুলোতে থেকে পশ্চিমা সংস্কৃতি ও সভ্যতা রপ্ত করে দেশে ফেরে। তারপর নিজের দেশের তরুণ-তরুণীর মাথা খাওয়া শুরু করে। বড় নির্লজ্জভাবে নিজ দেশের সভ্যতা সংস্কৃতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করতে থাকে। সেই সাথে পশ্চিমা নোংরামির গুণগানে থাকে পঞ্চমুখ। ‘যেন বাপ-চাচা, মা-খালা সব কুয়োর ব্যাঙ; তিনি এসেছেন সাগর ঘুরে।’

এই যে রিফায়াহ তাহতাবী! তিনি কী করলেন? একদম নির্লজ্জের মতো প্রকাশ্যে ঘোষণা দিলেন, “খোলামেলা চলা আর ছেলেমেয়ে অবাধ মেলামেশা করা এতে খারাপ কী আছে? ইউরোপের রাস্তায় যদি নাচগান কর, তা হলে একে পাপ বলে না। একে বলে তারুণ্য, উচ্ছলতা।”

তারই ভাবশিষ্য কাসিম আমিন ফ্রান্স থেকে ফিরতে না ফিরতেই রাতারাতি মহামতি বনে গেলেন একটি বই লিখে—তাহরীরুল মারআহ (নারী-স্বাধীনতা)। বইটি যেন তাক লাগিয়ে দিল পুরো মিশরবাসীকে। তবুও অবাক লাগে, তিনি যে নারী-স্বাধীনতার ডাক দিলেন, তার মূল উপজীব্য নাকি এই একটি বাক্য—‘আমি সেই দিনের অপেক্ষায় আছি, যেদিন মিশরের মেয়েরাও ধর্মকথা ও পর্দাপ্রথার বলয় ভেঙে বেরিয়ে আসবে এবং আমার ‘ইউরোপিয়ান সিস্টার’দের মতো ‘মুক্ত বিহঙ্গ’ হয়ে উদার আকাশে উড়াল দেবে।’

আরও আশ্চর্যের বিষয়, নারী-স্বাধীনতার নামে মিশরের মুসলিম নারীদের সাথে যারা ফ্রড খেলা শুরু করেছিলেন, তাদের দলে যে শুধু পুরুষই আছেন তা নয়, নারীও আছেন। হুদা শারাভি। সে-সময়ের নারী আন্দোলনের অবিস্মরণীয় নাম। প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের বিভিন্ন নারী সংস্থায় ছিল তার দাপুটে বিচরণ। ১৯২৩ সালে ইতালির রাজধানী রোম নগরীতে প্রথম যে নারী-বিষয়ক আন্তর্জাতিক সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল তিনি সেই সেমিনারেও উপস্থিত হয়েছিলেন। মিশরে ফিরতি পথে সফর করেছিলেন সমুদ্রে। জাহাজে উঠে মিশরের প্রথম মুসলিম নারী হিসেবে হাজার বছরের মুসলিম ঐতিহ্যকে লাথি মেরে মুসলিম জাতির গর্ব, অহংকার ভেঙে চুরমার করে নিজের মাহাত্ম্য, নিজের আভিজাত্যের প্রতীক, যা তাকে চির সম্মানে ভূষিত করে রেখেছিল এতটা কাল, সেই হিজাবটি খুলে ফেললেন এবং সামনে ছুটে চলা জাহাজ থেকে পেছনে উড়ে ফেলে দিলেন—অগণিত পরপুরুষের সামনে লক্ষ কোটি মুসলিম নারীকে অপমানিত করে, ‘পর্দা প্রথার শৃঙ্খলা’ ভেঙে বেরিয়ে পশ্চিমা ‘মুক্ত বিহঙ্গ’ হয়ে, চৌদ্দশো বছরের রক্তমাখা মুসলিম শাহী কাফেলাকে পদদলিত করে। বিনিময়ে যা পেলেন তা কিছু ফিরিঙ্গিপনা বাহবা ও করতালি, এবং কিছু নীরব নিস্তব্ধ ব্যথিত হৃদয়ের রক্তক্ষরণ। কিন্তু তার চোখে মুখে যা ছিল তা কোনো অজানা অহংকারের স্ফূর্তি বৈ কী!

তিনি ফিরে এলেন কায়রোতে। বিশ্বজয়ের আনন্দ নিয়ে। তথাকথিত নারী-আন্দোলনের মহানায়িকা হয়ে। ইতালির সেমিনার থেকে অর্জিত শিক্ষার ফলস্বরূপ প্রতিষ্ঠা করলেন একটি সংস্থা—মিশরীয় নারী ঐক্য। সংস্থার মূল সুর যেন ইতালির সেমিনার থেকেই ভেসে আসে। নারীর অধিকার চাই। সমান অধিকার চাই। পুরুষের সাথে মিলেমিশে কাজ করলে ক্ষতি কী? পোশাক-আশাক কেমন হবে, কীভাবে হবে সেটা আমার ব্যাপার, এখানে বাঁধাবান্ধি কীসে? কীসের হিজাব, কীসের নেকাব? তালাকের অধিকার চাই। পুরুষের অভিভাবকত্ব মানি না। পুরুষ যদি চারটে বউ রাখতে পারে তা হলে আমরা...? ইত্যাদি ইত্যাদি অন্যান্য আবর্জনা সম সব কথাবার্তা। প্রবৃত্তির অনুগামী হলে যা হয়। অনেকটা শিয়ালের ছদ্মবেশের মতো। বুঝে হোক না বুঝে হোক, প্রোপাগান্ডায় সুর মেলানোই আধুনিকতা। সুর না মেলালেই সেকেলে, কূপমণ্ডূক, ধর্মযাজক, কুসংস্কারাচ্ছন্ন ইত্যাদি।

মিশরের এই নারী-আন্দোলনের প্রতি পশ্চিমা দেশগুলো উৎসুক ছিল তাক লাগানোর মতো। এক কথায় তারা মুক্ত হস্তে দান করা শুরু করে দিল। ইউরোপীয়রা নিজ মিশরে চলে এলেন মিশরের নারী-আন্দোলনের অগ্রগতি এবং কর্মতৎপরতা পর্যবেক্ষণের জন্য।

হুদা শারাভির আন্দোলনকে গতিশীল করতে এগিয়ে এলেন দুরিইয়াহ শাফিক। প্রাচ্যের নিয়মনীতিকে তিনিই সবচেয়ে বেশি দুঃসাহসিকতার সাথে আঘাত করতে লাগলেন। পশ্চিমা নারীর অনুসরণই যেন তার কাছে জীবনে সফল হওয়ার একমাত্র চাবিকাঠি। তিনি ধর্মহীন ভাষায় ঘোষণা দিলেন, ‘আমরা সত্যিই অনুসরণের যোগ্য, আমরা তাদেরই অনুসরণ করব। মিশরীয় নারীদের অনুসরণের যোগ্য একমাত্র পশ্চিমা নারীরাই। বিশেষত ব্রিটেনের মহারানী।’

দুরিইয়াহ শাফিকের দলে তাঁর পরে আরও একজন মহামতির আবির্ভাব হলো। আমিনা সায়িদ। তিনি নারীবিষয়ক একটি পত্রিকা বের করতে লাগলেন। নাম দিলেন হাওয়া (ইভ)। হাওয়া নামের ‘হাওয়া’ দিয়েই পশ্চিমা বিষ ঢুকিয়ে দিতে লাগলেন মিশরীয় নারীদের মনে। তিনি স্বামী এবং অভিভাবকের সাথে অবাধ্যতা, হঠকারিতা ও স্বেচ্ছাচারিতার উসকানি দিতে লাগলেন চিমটি কাটার মতো করে। অজুহাত—পুরুষের আধিপত্যকামিতা। দাবি—দাসীত্ব থেকে মুক্তি, আর একটু ইনিয়ে-বিনিয়ে, মানসিক দাসত্ব থেকে মুক্তি। তার বিদ্রোহের শিকার হলো ইসলামের মাহাত্ম্যপূর্ণ শৈলী—পর্দা ব্যবস্থা। বিদ্রোহের শিকার হলো মুসলিম নারীর সবচেয়ে বড় গুণ, সবচেয়ে বড় মাহাত্ম্য—সতীত্ব। তিনি পর্দাব্যবস্থা নিয়ে যে শ্লেষাত্মক উক্তিটি করেছেন, তা খুবই দুঃখজনক। তিনি বলেছেন: “মেয়েরা পুরো শরীর ঢেকে ভূতের মতো হয়ে কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসবে এটাই কি ইসলাম? একটা জীবন্ত মেয়েকে না মরতেই কফিনে পরিয়ে দেওয়া কি ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য খুবই জরুরি?”

ঔপনিবেশিক গোষ্ঠীর ভাবশিষ্যরা নারী-স্বাধীনতা ও নারীমুক্তির জোর প্রচারণা চালাতে থাকলেন। তাদের নির্লজ্জ শব্দপ্রয়োগের চাতুর্য, মনগড়া হাঁকডাকের তর্জন-গর্জন অনেক মিশরীয় মেয়েকে মোহাচ্ছন্ন করল। অনেক মেয়েই পর্দার বিষয়ে এখন স্বেচ্ছাচারী, হঠকারী। তারা প্রথমে হাত ও মুখ খোলা শুরু করে। তারপর মাথা, তারপর পায়ের গোছা, তারপর রান। শালীনতার জন্য সাধারণ ভদ্রতা বোধও বিদায় নেয় মাঝামাঝি কোনো পর্যায়ে। নামে মাত্র যা থাকে—শুধুই ফ্যাশন।

ধীরে ধীরে বিষয়টি গড়াল ধর্মীয় বিধিনিষেধ এবং সামাজিক রীতিনীতিগুলোকে উপেক্ষা করে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা পর্যন্ত। আজ রাস্তাঘাট দোকানপাট শপিংমল থেকে শুরু করে লেক পাড় বা ধর্মীয় বিদ্যাপীঠ—কোনো কিছুই অশ্লীলতামুক্ত নয়। আর বিনোদনের নামে অশ্লীলতার জন্যই সেসব জায়গার উৎপত্তি হয়েছে সেসব এখন রীতিমতো...। আল্লাহ্ মাফ করুন।

পর্দাবিদ্বেষীরা চরিত্রে বন্ধনহীন এক জাতীয় লাগামহীন পাগলা ঘোড়ায় পরিণত হলো। কর্মমুখর ব্যস্ত সড়কে, ব্যস্ত শহরে, ব্যস্ত অফিসে পুরুষের ভিড়ে নারীরাও ছুটে পড়ল। স্কুল কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়ে সহশিক্ষার প্রতিযোগিতা শুরু হলো। কলকারখানার বড় বড় যন্ত্রপাতির বিকট আওয়াজে নারী-পুরুষও ঘুরপাক খেতে লাগল একসাথে। কিছু নির্ভরতা, কিছুটা স্বাধীনতা, কিছুটা আনন্দ ভুলিয়ে দিল নিজের ঘরকে, নিজের সন্তানকে, নিজের স্বামীকে। ক্ষণিকের এই মায়ামোহে নারীরা ডুবে সরিয়ে দিল তার প্রকৃতিপ্রদত্ত দায়িত্ব ও কর্তব্য থেকে। সে যে কারও মা, সে যে কারও মেয়ে, সে যে কারও স্ত্রী, সে যে কারও বোন; তার যে একটা ঘর আছে, সে যে কোনো ঘরের মালকিন, দূর থেকে দেখা মরীচিকা সবই বিস্মৃত করল তাকে।

নারীরা অবাধ্য হলো। আগ্রহের অবাধ্য হলো। ঘর ছাড়ল। সম্মানের আসন থেকে নেমে এল। ছুঁড়ে ফেলে দিল মাহাত্ম্যের মুকুট। খুলে ফেলে দিল মাথার তাজ—হিজাব, নেকাব। মনে মনে মনগড়া পাওয়ার মতো হয়ে গেল মুক্ত স্বাধীন। পুরুষ তার পেছনে ছোটে এই তার গর্ব। ছেলেরা তার জন্য জীবন দিতে চায় এটাই সফলতা। প্রবৃত্তিকামীরা প্রশংসা করে গদগদ হয়। রুগ্ন মনেরা হাত বাড়ায়, লম্ফঝম্ফ করে। বোকা মেয়ে আনন্দে আত্মহারা। ছদ্মবেশী ছলাকলায় মনে আনন্দ ধরে না। সুখময় মেলামেশায় যেন বিশ্ব জয় জয়ে রূপ নেয়। তাই এতেও হয় না; নাচে, গায়, অভিনয় করে, ফ্যাশন করে। আরও কত কী!

কিন্তু ফল কী হয়, বোন? যখন ঘোর কেটে যায়, যখন জীবন যৌবন সব শেষ হয়ে যায়, তখন নিজেকে আবিষ্কার করে তিক্ত বাস্তবতার কোন কালো অন্ধকারে। দেখে, সে কোনো স্বার্থের বলি, কারও লালসার বলি। খুব সস্তায় অন্যের হয়ে কাজ করেছে সে। কোনো ষড়যন্ত্রের শিকার, কোনো কুচক্রীর ক্রীড়নক। যে কুচক্র, যে ষড়যন্ত্র তারই বিরুদ্ধে, তারই জাতির বিরুদ্ধে, তারই দেশের বিরুদ্ধে। এ কুচক্রের চাকা আবর্তিত হয়েছে মুসলিম পরিবারব্যবস্থাকে ভেঙে দিতে, মুসলিম সমাজব্যবস্থাকে গুঁড়িয়ে দিতে। একটু সুখের কারণে বড় চড়া মূল্য দিতে হলো তাকে। নিজের সম্মান, নিজের সম্ভ্রম, নিজের সবকিছুর সাথে সাথে নিজের দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ।

আর তার পৃষ্ঠপোষকরা, যারা বাহবা করতালি ও মিথ্যা স্তুতি দিয়ে উৎসাহ যুগিয়েছিল, অর্থ খ্যাতি ও সম্ভাবনার জগতে ডাহুক হয়ে ডাক ছেড়েছিল, কথার ফুলঝুরিতে ষোড়শী কুমারীদের মাতিয়ে রেখেছিল, তারাই প্রথম তাকে উপেক্ষা করে। তাদের কাছে তার কোনো মূল্য থাকে না। সত্যিই, ওসব লোকের কাছে চামড়া-জড়া বুড়ির কী বা মূল্য থাকতে পারে?

বলা উচিত, এমন উদাহরণ কম নয় যে, অনেকে নারী-স্বাধীনতার জোর প্রচারণা চালান; চাতুর্যের সকল শৈলী প্রয়োগ করে নারীকে ধর্ম ও বিশ্বাসের প্রতি বিতশ্রদ্ধ করে তোলেন; অথচ ব্যক্তিজীবনে নিজেই নারী-স্বাধীনতা নামের তামান্না থেকে মুক্ত। এই যে কাসিম আমিন। তিনি মিশরে নারী স্বাধীনতার নামে পর্দার প্রথাগত ভীতির কেমন বিরোধিতা করেছেন। অথচ নিজের স্ত্রীকে পর্দারপ্রথা শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করতে দেননি। এমনকি, নিজের ছড়ানো প্রোপাগান্ডার ব্যাপারে নিজের ঘরানা দের রেখেছেন সম্পূর্ণ অন্ধকারে। তাই তো তার স্ত্রী শরঈ পর্দার পূর্ণ পাবন্দি করেন। শুধু তাই নয়, প্রায়ই তার পক্ষ থেকে এমন বিবৃতি আসে যে, তার স্বামী, যেমনটা লোকে বলে যে তিনি সমাজে অনাচার ছড়াচ্ছেন, তেমন নন। তিনি কখনোই খোলামেলা চলা এবং অবাধ মেলামেশার পক্ষপাতী নন। তিনি শরঈ পর্দার প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল। এসব লোকের মিথ্যাচার ও অপব্যাখ্যা।

জনাব আবদুল কুদ্দুস সাহেবের কথা তো বলাই বাহুল্য। তিনি এ পর্যন্ত কতগুলো উপন্যাস লিখেছেন। তার রচিত অনেক উপন্যাসের চলচ্চিত্রায়নও হয়েছে। তার অধিকাংশ উপন্যাসই ধর্মীয় মূল্যবোধকে আঘাত করে রচিত। নারীদের ধর্মবিদ্বেষে প্রলুব্ধ করার প্রয়াস তার কম নয়। অথচ কাণ্ড দেখুন, ঔপন্যাসিক আবদুল কুদ্দুস এবং বাস্তবজীবনের আবদুল কুদ্দুসের মাঝে কেমন আকাশ পাতাল ফারাক। তিনি স্ত্রীকে বাইরে বের হতে দেন না। চাকরি করতে দেন না। অথচ তার স্ত্রী উচ্চশিক্ষিতা। শুধু তাই নয়, ব্যক্তি আবদুল কুদ্দুস স্ত্রীর প্রতি খুবই কঠোর। পত্রপত্রিকায়, টেলিভিশনের পর্দায় আজ পর্যন্ত একবারের জন্যও স্ত্রীকে আসতে দেননি; এমনকি, তার ছবিও প্রকাশ হতে দেননি।

প্রিয় বোন, বলুন তো, এমনটা কেন হয়? ...কারণ তিনি ওপরে ওপরে যা-ই বলুন, ভেতরে ভেতরে ভালো করেই জানেন যে, একজন নারীর প্রথম ও প্রধান মৌলিক কর্তব্য হলো একজন মমতাময়ী মা হওয়া, একজন সতীসাধ্বী স্ত্রী হওয়া।

আমরা যেই আবদুল কুদ্দুসের কথা বলছি, কে না জানে, তিনি ছিলেন একজন কর্মজীবী নারীর সন্তান। তার মা বহুল প্রচারিত 'রোয ইউসুফ' পত্রিকায় কাজ করতেন। কিন্তু পুত্র আবদুল কুদ্দুস মাকে আর কাজ করতে দেন না। তিনি চান, মা বাইরের ঝামেলা থেকে মুক্ত হয়ে ঘরে অবসর যাপন করুন।

অবশেষে এমন অনেক মুসলিম নারী আছেন, যারা একসময় তথাকথিত নারী-স্বাধীনতার ফাঁদে পা দিয়েছিলেন। কিন্তু হুঁশ হওয়ার পর, ভণ্ড-প্রচারকের মিথ্যা, প্রতারণা বুঝতে পারার পর, এখন আল্লাহর কাছে তওবা করে আবার ইসলামের সরল সঠিক পথে এসেছেন। আবার নিজে নিজে ধরা দিয়েছেন পর্দাপ্রথার ‘শৃঙ্খলে’, বরণ করে নিয়েছেন ‘চার দেয়ালের বন্দিনীর দশা’।

একসময়ের দুনিয়া কাঁপানো মডেল সাদিরা বাবেল্লি। ছোট পর্দায় ছিলেন হট কেক। আল্লাহ তাকে হেদায়াত দান করেছেন। সর্বশেষ সাক্ষাৎকারে আফসোস সহে বলেছেন, “আমি যখন অভিনয় করতাম, তখন কত চ্যানেল আমার পেছনে পড়ে ছিল। একটি সাক্ষাৎকারের জন্য কত উপহার উপঢৌকন জমে যেত। অথচ আজ আমিই যদি হিজাব পরে নারী-বিষয়ক ধর্ম ও সভ্যতার কথা বলতে চাই, তা হলে একটি চ্যানেলও আমাকে সুযোগ দিতে সম্মত হবে না।”

প্রখ্যাত চলচ্চিত্রশিল্পী শামস বারুদি বলেন, “যখন যশ খ্যাতি অর্থ বিত্তের সবকিছু আমার হাতে ধরা দিল, তখন আমার মনে প্রায়ই একটি প্রশ্ন জাগতে লাগল, এত কিছুর পরও আমি সুখী নই কেন? শামস বারুদি নিজেই নিজের প্রশ্নের উত্তর বলেন, “কারণ আমি বুঝতে পারতাম, আমি এমন একটি কর্ম বেছে নিয়েছি, যা আমার নারীত্বকে কুঁরে-কুঁরে খাচ্ছে প্রতিমুহূর্ত। এটা আমার প্রকৃতির সাথে বেমানান। এরপর থেকে আমি অনেক কাজ ছেড়ে দিতে লাগলাম। এ আশায় যে, আমি আমার নারীত্ব, আমার হারানো সম্মান ফিরে পাব। আমি আল্লাহকে খুব ডাকতাম, যেন তিনি আমাকে এই জগত থেকে দূরে সরিয়ে নেন এবং সত্য ও সুন্দরের পথে পরিচালিত করেন।” তিনি বলেন, “আমি আমার অতীতের স্মৃতিচারণ করতে চাই না। আমি চাই, যদি ওই সময় আমার জীবন থেকে একদম মুছে যেত।”

শামস বারুদি ইসলামের শীতল ছায়ায় ফিরে এসেছেন। তিনি আল্লাহর পথকেই নিজের জীবনপথ হিসেবে বেছে নিয়েছেন। কিন্তু অনিষ্টকারীরা বসে থাকেনি। তারা প্রতিনিয়ত সত্যপ্রাজ্ঞ নারীকে নিয়ে দ্বিধাজাল সৃষ্টি করেছে। কিন্তু যে আল্লাহর আশ্রয়ে নিজেকে সঁপে দেয়, আল্লাহ তার সহায় হন। আল্লাহ শামস বারুদির মনোবল অক্ষুণ্ণ রেখেছেন। তিনি নিজে খরচ করে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ও টিভি চ্যানেলে নিজের অবস্থানের কথা সুস্পষ্ট করেছেন। তিনি সুস্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি তওবা করেছেন। তিনি এই জগত থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। তিনি প্রতিটি মুসলিম তরুণীকে, প্রতিটি মুসলিম নারীকে উদাত্ত আহ্বান জানান ইসলামের পর্দার পাবন্দি করার, ইসলামের বিধিনিষেধকে আঁকড়ে ধরার।১

এমন উদাহরণ পশ্চিমা নারীদের মধ্যেও আছে। ফ্রান্সের বিখ্যাত অভিনেত্রী ব্রিজেট বারদোঁ। পুরো জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন হৈ হুল্লা আর আমোদ ফুর্তিতে। শরীর আর সৌন্দর্যই ছিল জীবনের সবকিছু। কিন্তু জীবনের পড়ন্ত বিকেলে এসে তার আক্ষেপ শুনুন— “জীবন থেকে যে শিক্ষা পেয়েছি তা এই যে, হাজার হাজার আবেগ-উচ্ছ্বসিত প্রলোভনযুক্ত চিঠি, বিমুগ্ধ বিমোহিত কোটি কোটি দর্শকচিত্তের করতালি জীবনের বাস্তবতায় একজনমাত্র বিশ্বাসী পুরুষের ভালোবাসা হতে পারে না, যা আমাকে জড়িয়ে রাখে ভালোবাসায়; যা আমার অন্তরে শান্তি আনে, অভয় দেয়। আমার বিপুল খেতাব, যশ খ্যাতি ছিল। অনেক অর্জন ছিল। কিন্তু জীবনের চরম বাস্তবতায় আমি ব্যর্থ। আমার প্রাপ্তির খাতা শূন্য। আমি তাই মানুষ থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বাকি জীবনটা নীরবে কাটিয়ে দিতে চাই। মিডিয়া থেকে অনেক দূরে।” তিনি আরও বলেন, “আমাকে চেনে এমন অনেক। কিন্তু আমার বন্ধু বলতে যারা আছে, হাতে গোনার মতো। আমার ছেলের কথাই বলি। সে যখন ছোট ছিল, তখন আমি তাকে গুরুত্ব দিইনি; সুতরাং আমি যখন বৃদ্ধা হয়েছি, তখন সে আমাকে গুরুত্ব দেবে এমনটা আমি আশা করতে পারি না।”২

বণিকমহল নারীস্বাধীনতার বিষয়টিকে সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেছে। বাণিজ্যিক প্রচারণায় তাদের কাছে সবচেয়ে কার্যকরী মাধ্যম হলো সংস্কৃতি। পণ্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য বিলাস, স্বল্প-বসনা নারী এবং নারীর উলঙ্গ অর্ধোউলঙ্গ ছবির কোনো জুড়ি নেই। ব্রিটিশ নারী-স্বাধীনতা সংস্থাও এভাবে নারী-স্বাধীনতার নামে নারী-অবমাননার পায়তারা করেছে। বামপন্থী টিমও এ ব্যাপারে প্রচুর প্রতিবাদ জানিয়েছেন। কেননা, তিনিও মনে করেন, এটা কার্যত নারীর অবমাননা।

বড় বড় বস্ত্রালয়গুলোতে নারীদের যেভাবে ব্যবহার করা হয়, তা রীতিমতো উপহাস। ফরাসি ফ্যাশনগার্ল ফাজিয়ান ‘আল মুসলিমুন’ পত্রিকার একটি একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেন, “এ পথে আসা সহজ ছিল। কিংবা আমার কাছে সহজ মনে হয়েছিল। খুব সহজেই খ্যাতির স্বাদ পাই। উপঢৌকনে আমার ঘর ভরে যায়। আমি এত সহজে এত কিছু পাব, স্বপ্নেও ভাবিনি। কিন্তু আমাকে যে মূল্য দিতে হয়েছে, তা অনেক চড়া।

প্রকৃতপক্ষে এখানে সফলতার পথ একটাই—আবেগ অনুভূতি বিসর্জন দিতে হবে, লজ্জা শরম ছেড়ে ফেলতে হবে, বেহায়াপনাকে সক্রিয় করে দিতে হবে, আত্মসম্মানকে গলা টিপে হত্যা করতে হবে; বেশি বোঝা যাবে না, বেশি ভাবা যাবে না। তোমাকে যা ধরে রাখতে হবে —তোমার দেহ, তোমার রূপ-লাবণ্য, তোমার দীপ্তিময় ভরা যৌবন; দেহের সৌন্দর্য ও সুর মূর্ছনা। আকর্ষণ ধরে রাখতে জগতের সব সুস্বাদু খাবার বর্জন করা, পাশাপাশি নিয়মিত বলবর্ধক ও উত্তেজনাকর ড্রাগ ও মেডিসিন গ্রহণ করার কথা বাদই দিলাম।

তারা আমাকে একটা জীবন্ত মূর্তি বানিয়ে রেখেছিল। আমার কাজ ছিল ক্রেতাদের মন মত্তে নিমগ্ন করে তোলা। আমি যেন কোনো জড়পদার্থ ছিলাম, যে নির্দিষ্ট হাসিতে মানুষকে হাসাতে পারে; কিন্তু সে নির্গল্প, নির্জীব; তার কোনো অনুভূতি নেই। সেখানে প্রতিদিন বস্ত্রালয়ের বস্ত্র শরীরে ধারণ করতে হয়; তার আগে দেহ থেকে নারীত্ব ও মনুষ্যত্বের বস্ত্র খুলে ফেলতে হয়। নয়তো এই নিষ্ঠুর পৃথিবী তোমাকে ছুঁড়ে ফেলে দেবে। তুমি যদি কোনো স্টেপ ভুল কর, তা হলে তোমাকে শাস্তি পেতে হবে, যা একই সাথে মানসিক ও শারিরীক!...

একজন ফ্যাশনগার্ল হিসেবে সর্বত্র বিচরণ করেছি। ফ্যাশনের পোশাকে দেহাবরণ করে, নিজের নারীত্বকে বিসর্জন দিয়ে দর্শকদের মনোরঞ্জন করেছি, কিন্তু তারা আমার কেউ নয়, তাদের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই; আমার কষ্ট হতো, যখন দেখতাম, তাদের কাছে আমার ব্যক্তিত্বের কোনো মূল্য নেই। যত মূল্য—আমার গড়নের, আমার পরনের পোশাকের।”১

এককালের স্বনামধন্য ফ্যাশনগার্ল ফজিয়ান এভাবে নিজের জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা ব্যক্ত করেছেন। আল্লাহ তাকে তওফিক দান করেছেন, তিনি সেই অভিশপ্ত জীবনের নরকভোগ থেকে পালিয়ে ইসলামের শীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেছেন।

প্রিয় বোন, একটু তো ভাবুন, পৃথিবীতে বর্বরতার আর কোনো উদাহরণ আছে কি, যা একজন নারীর নারীত্বকে বিসর্জন দেওয়ার চাইতেও নির্মম; যাকে জীবন্ত দাসী বানিয়ে রাখা হয় তার সম্মান ও সম্ভ্রম নিয়ে খেলা করার জন্য, তার নারীত্বকে নিষ্পেষিত করার জন্য, তার লজ্জাকে লালসার বাজারে বলি দেওয়ার জন্য?

পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে কী ভয়াবহ অবস্থা দাঁড়িয়েছে। ইউরোপিয়ান সামাজিক নিরীক্ষণ সংস্থার একটি জরিপ শুনলে আঁতকে উঠতে হয়। তাদের গবেষণা মতে পঁচিশ বছর বয়সী আশি ভাগ ব্রিটিশ নারী একা একা লন্ডনের রাস্তায় চলতে ভয় পান। কারণ ধর্ষণ ও অপহরণের ভয় প্রতিমুহূর্তে তাঁদেরকে তটস্থ করে রাখে। প্রকাশ থাকে যে, এ বয়সের প্রতি চারজন একজন নারী রাজধানীতে রাস্তায় বের হলে আত্মরক্ষার জন্য সাথে চাকু বা পিস্তল রাখেন।২

কানাডার তথ্যমন্ত্রাণালয়ের জনৈক কর্মকর্তা দুঃখ প্রকাশ করেছেন যে, কানাডায় বসবাসরত অর্ধেকের বেশি নারীই যৌন হয়রানি ও দৈহিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। একটি প্রতিবেদনে এসেছে, গোঁড়ামি ও লালসার শিকার হয়ে নারীরা বিভিন্ন প্রান্তে যৌননির্যাতনের শিকার হচ্ছেন অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে। তারা এটাকে কোনো অপরাধ মনে করে না। বরং এটা তাদের দৃষ্টিতে একটি সাজামাত্র। নারীকে ভয় দেখানোর, শাস্তিপ্রদানের বা তার সংশোধনের একটি সাধারণ প্রক্রিয়া। আশ্চর্যের বিষয়, নারীর প্রতি এরকম জঘন্য অপমানকর কর্মকাণ্ডের বিদ্যমানতা সত্ত্বেও ওসব দেশের বিচারব্যবস্থায় নারী উৎপীড়ন, যৌন হয়রানি বা ধর্ষণ বিশেষ কোনো শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে বিবেচিত নয়। কারণ এগুলো সেখানে এখন স্বাভাবিক ব্যাপার।১

জনৈকা আমেরিকান নারী সাংবাদিক হেলেন স্ট্যানবেরি ভ্রমণের উদ্দেশ্যে কায়রো আসেন। প্রায় কয়েক সপ্তাহ এখানে অবস্থান করেন। তিনি কায়রোর বিভিন্ন মাদরাসা, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়; বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান; নারী, পুরুষ ও শিশু-সংক্রান্ত বিভিন্ন সংস্থা ইত্যাদি পরিদর্শন করেন। তার রিসার্চের মূল বিষয় ছিল পরিবার, সমাজ ও নারী পুরুষের বিভিন্নমুখী সমস্যা, উৎপত্তি ও উত্তরণ। ভ্রমণশেষে দেশে ফেরার সময় নিজে একজন খাঁটি পশ্চিমা হয়েও নারী হিসেবে নারী জাতির প্রতি মমত্বের স্বাক্ষর রেখে গেছেন একটি সরল সত্যকে অকপটে স্বীকার করার মাধ্যমে। তিনি লিখেছেন,
“মুসলিম আরব সমাজ নিঃসন্দেহে একটি পূর্ণাঙ্গ ও সুস্থ সমাজ। এই সমাজের পক্ষে এটাই কল্যাণকর হবে যে, তারা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে আঁকড়ে থাকবে। এখানে নারী পুরুষের মাঝে যে যৌক্তিক ব্যবধান ও সীমারেখা রাখা হয়েছে তা কোনোভাবেই মন্দ নয়। এই কয়দিনে এই সমাজের প্রতি আমার অন্তরে যে মুগ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে, তা থেকেই একজন নিঃস্বার্থ হিতাকাঙ্ক্ষী হিসেবে বলছি, আপনারা আপনাদের সামাজিক রীতিনীতি, সভ্যতা সংস্কৃতি এবং চারিত্রিক মূল্যবোধকে অক্ষুণ্ণ রাখার চেষ্টা করুন। আপনারা অবাধ মেলামেশা থেকে বিরত থাকুন। মিথ্যে স্বাধীনতার নামে মেয়েদের বাধা বন্ধনহীন ঝুঁকিপূর্ণ জীবনের দিকে ঠেলে দেবেন না। সত্যি বলতে কি, আপনারা আপনাদের সেই তথাকথিত পরাধীনতাকে ফিরিয়ে আনুন। ইউরোপ আমেরিকার উদারবাদ, বাধা বন্ধনহীনতা ও আধুনিকতা থেকে এটা শত গুণ ভালো। আপনারা অবাধ মেলামেশাকে প্রতিহত করুন। এটা আমেরিকার জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। আমেরিকান সমাজ এখন একটা মৃত সমাজ। সেখানে লম্পট ও ইতরতা ছেয়ে গেছে। সেখানে শুধু অবাধ মেলামেশা ও মিথ্যে স্বাধীনতার বলি হয়ে অসংখ্য সম্ভাবনা ঝরে যায় প্রতিদিন প্রতিনিয়ত।”২

কুয়েতের 'জারিদাতুস সিয়াসিয়াতুল কুয়াইতিয়াহ' পত্রিকার উদ্যোগে জনৈকা জার্মান নারীর একটি সাক্ষাৎকার প্রচার করা হয়। সন্দেহ-নিরসনের জন্য বলছি, ওই নারী একজন অমুসলিম। সাংবাদিক তাঁকে প্রশ্ন করেছেন: 'আপনার দৃষ্টিতে নারীর সুন্দরতম অবস্থানকেন্দ্র কী হতে পারে?' উত্তরে তিনি বলেন, 'ঘর।' একজন পশ্চিমা নারীর মুখে এমন উত্তর শুনে মুসলিম নারী সাংবাদিক কিছুটা হতচকিত হন। তিনি আবার জিজ্ঞেস করেন: 'আপনি কি মনে করেন, সব সময়ই ঘর নারীর জন্য আদর্শ জায়াগা?' তিনি এবার আরও দৃঢ়তার সাথে বললেন: 'হ্যাঁ, আমি মনে করি, সব সময়ই ঘর নারীর জন্য আদর্শ জায়াগা।' এবার সাংবাদিক জানতে চাইলেন: 'ঘরের বাইরে কর্মরত হওয়ার ব্যাপারে কী বলেন?' প্রতিনিধি এবার বললেন: 'মৌলিকততে নারীর সৃষ্টি এজন্য নয়।' সাংবাদিক জিজ্ঞেস করলেন: 'তাহলে সমাজগঠনে নারী পুরুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে কী করে?' প্রতিনিধি বললেন: 'সমাজগঠনে নারী পুরুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য, আমি মনে করি না, বাইরে গিয়ে কাজ করার প্রয়োজন আছে। অন্যভাবেও সেটা হতে পারে। নারী পুরুষকে একটি সুখময় শান্তিময় পরিবার উপহার দেবেন। ঘরের বিষয়ে তাকে নিশ্চিত রাখবেন। সুখে দুঃখে পাশে থাকবেন। অর্জনে উপার্জনে সাহস ও প্রেরণা যোগাবেন। ছেলেমেয়েকে মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তুলবেন। নারী বাইরে গিয়ে কাজ করে সামাজিকভাবে যে উন্নতি সাধিত হবে, এভাবে ঘরে থেকে তার চেয়ে অনেক গুণ বেশি হবে। আমি এ কথাটি আবেগ তাড়িত হয়ে বলছি না। জীবনের তিক্ত বাস্তবতা থেকে বলছি। মূলত নারী বাইরে গিয়ে কাজ করে হয়তো আর্থিকভাবে কিছুটা স্বনির্ভরতা পাবেন; কিন্তু পুরো সমাজ এবং সার্বিকভাবে পুরো নারী জাতি নিঃসন্দেহে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যা আমরা হাতে কলমে পাচ্ছি।'৩

বিখ্যাত ব্রিটিশ লেখিকা লেডি ব্রাউন তার বিখ্যাত 'আসুলুল জিনস ওয়া তবিয়াতুহ' গ্রন্থে লিখেছেন, “পুরুষ প্রকৃতগতভাবে জীবনে সরল। আগেও ছিল। এখনো আছে। পরেও থাকবে। আমরা যতই চেষ্টা করি, এই প্রকৃতিকে বদলাতে পারব না। সমানাধিকারের ডাক দিয়ে বা সভা-সেমিনার মহড়া করে কোনো লাভ নেই। পুরুষ সবল। সবলই থাকবে। নারী দুর্বল। দুর্বলই থাকবে।” বিখ্যাত ইংরেজ নারী গল্পকার ও উপন্যাসিক আগাথা ক্রিস্টি বলেন, “সত্যি বলতে কি, এখনকার নারীরা বোকা। স্বাধিকার ও সম-অধিকার পাওয়ার জন্য সে কত কূটনীতিই না খাটল। কিন্তু ফল কী হলো? আমাদের স্বীকার করতেই হলো, পুরুষের তুলনায় আমরা দুর্বল। সাথে সাথে পুরুষর সাথে কাজ করতে হচ্ছে, ঘাম ঝরাতে হচ্ছে। অথচ এতটা কাল এটা ছিল শুধু পুরুষের কর্তব্য।... আমাদের পূর্ববর্তী নারীরা চালাক ছিল। তখন নারী পুরুষকে এই বিশ্বাসে আসক্ত রেখেছিল যে, সে দুর্বল; সে সব সময় পুরুষের স্নেহ ও ভালোবাসার পাত্রী; সে সবসময় পুরুষের আদর ও আশ্রয় চায়। তখন পুরুষই ছিল পরিবারের মাথা। পুরো পরিবারের সুখের জন্য মৌলিকভাবে দায়িত্বশীল ছিল পুরুষই। কিন্তু আজ কী হচ্ছে? নারী স্বাধীনতা চায়। পুরুষের অভিভাবকত্বকে আধিপত্য বলে অস্বীকার করে, অভিভাবকত্ব মানে না। আন্দোলন করে —দুর্বার আন্দোলন। কিন্তু পুরুষের অভিভাবকত্বকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে যে স্বাধীনতা পায়, সে আর-এক যাযাবর বিড়ম্বনা। ... নারী বাধা না মেনে সর্বক্ষেত্রে পুরুষের সাথে পাল্লা দিতে চায়। এখন তাকে সবখানে নামতে হয়। যা তার নামার মতো, তাতেও। যা তার নামার মতো নয়, তাতেও। ফল কী হয়? জীবন থেকে সুখ বিদায় নেয়, নারী ক্লান্ত হয়। ... অথচ আগের জীবনধারায় পুরুষ ছিল নারীর সুখ ও সম্মানের অতন্দ্র প্রহরী।”

প্রিয় বোন, জীবনের তিক্ততা পশ্চিমা নারীদের ঘোর কাটিয়েছে। তাদের টনক নড়েছে। তারা এখন প্রকৃতির কোলে ফিরে আসতে চান। কিন্তু পারেন না। তারা এখন অকপটে নারী ও নারীপ্রকৃতিকে স্বীকার করেছেন। সেই সাথে পশ্চিমা সভ্যতার নারীস্বাধীনতার স্বরূপ উন্মোচন করেছেন। তারা চিৎকার করে বলছেন, তারা একজন পুরুষের কর্তৃত্ব (অভিভাবকত্ব ও তত্ত্বাবধান) থেকে বাঁচতে গিয়ে—হোক তিনি স্বামী, পিতা কিংবা ভাই— অনেক পুরুষের সেবাদাসী ও যৌনদাসীতে পরিণত হয়েছেন।

সুতরাং নারীস্বাধীনতার প্রবক্তাদের বলি, মুসলিম নারী তো আপনাদের কাছে গিয়ে পরাধীনতার অভিযোগ করেনি, কখনো কোনো অনুরোধও করেনি, তা হলে এই উপযাচকতা কেন? এত দয়া আপনাদের? তা হলে শুনুন, মুসলিম নারীর কোনো কষ্ট নেই শুধু আপনাদের উড়ে এসে জুড়ে বসা ছাড়া; দয়া করে আমাদের জীবনটাকে আর সংকীর্ণ করে তুলবেন না; আপনাদের জ্বালায় আমরা অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছি; আপনাদের কারণে যেখানে সেখানে পর্দানশীন নারীকে মুখ খুলতে হয় আপনাদের পশুবৃত্তির প্রমোদনের জন্য। মুসলিম নারীর যদি কোনো অভিযোগ থেকে থাকে, তো এটাই তাদের অভিযোগ। দয়া করে আপনাদের সাহায্যের হাতটি গুটিয়ে নিন। মিষ্টি কথা বলে আমাদের সরল মেয়েদের মাথা খাওয়া বন্ধ করুন। ছলচাতুরি ছেড়ে দিন। নারী-স্বাধীনতার নামে নারীকে জীবন্ত দাসী বানানোর যে ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেন, তা থেকে বিরত থাকুন। ইসলামের পর্দাপ্রথা থেকে আমরা মুক্তি চাই না। আপনাদের ভ্রান্ত খেলা থেকে মুক্তি চাই।

প্রাচ্যের নারীদের বলি, তোমরা ঘরে ফিরে এসো। আবার সেই ঐতিহ্যের মাঝে ফিরে এসো। ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের বিরুদ্ধে পশ্চিমা পদলেহীরা মুখ থুবড়ে পড়ুক। নারী-সংস্থা, নারী-সংগঠন ও নারী-আন্দোলনের নেতা-নেত্রীদের বলি, তোমরা আওয়াজ তোলো; উচ্চ কণ্ঠে আওয়াজ তোলো—মুসলিম নারী যেন ঘরে ফিরে আসে। আবার যেন ঘরের মালকিন হয়ে সমাজের তাজ মস্তকে ধারণ করে। মুসলিম নারী আবারও স্বামীকে সুখী করাকেই জীবনের ব্রত বানিয়ে নিক। আনুগত্য ও ভালোবাসায় স্বামীর মনের সুখ ও চোখের শীতলতা হয়ে থাকুক। নারী তার সহজাত স্নেহ, মমতা ও ভালোবাসা আবার ফিরে পাক—যা মিথ্যে প্রচারণার মোহে নিখোঁজ হয়ে গেছে। যার আশায় বুক বেঁধে আছে নিষ্পাপ সন্তানরা। যার প্রেরণায় একজন মা সন্তানের সুখের জন্য যাপন করেন বিনিদ্র রজনী। অফুরন্ত ভালোবাসায় সিক্ত করেন সন্তানের জীবনকে।

স্বাধীনতার স্বাদ আস্বাদন করতে গিয়ে পশ্চিমা নারীদের যে করুণ পরিণতি হয়েছে, মুসলিম নারীরা তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করুক। নয়তো ওই দিন বেশি দূরে নয়, যেদিন এখানেও ওই একই অবস্থা বিরাজ করবে। ভাগ্যবান তো সে, যে অন্যের দেখে শিক্ষা গ্রহণ করে। কিন্তু দুর্ভাগা সে, যে নিজে পতিত হওয়া ছাড়া সতর্ক হয় না।

প্রিয় বোন, আল্লাহ আপনাকে চোখ দিয়েছেন দেখার জন্য। দয়া করে দেখুন। চর্মচোখে দেখুন, মর্মচোখে দেখুন, ইসলামী শরীয়াতের সুমহান জীবনদর্শন দেখুন। এ কোনো মানব রচিত জীবনবিধান নয়; এ প্রত্নপ্রদত্ত পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। এ সর্বময়, সর্বজনীন, সর্বকালীন। এ সুনিশ্চিত, নিখুঁত। আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করেছেন, আমাদের কর্ম ও কীর্তিকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি জানেন। আমরা জানি না।

প্রিয় বোন, এই বিশ্বাস ও মূল্যবোধ হৃদয়ে ধারণ করুন। কথাগুলো যখন বুঝে আসবে, এবং অবশ্যই বুঝে আসবে, তখনই এই ধর্মের, আপনার এই ধর্মের মাহাত্ম্য, আপনা-আপনি অনুধাবন করবেন অনায়াসে। অচিরেই আপনার হৃদয়ে অনুরণিত হবে কবির এই কথাগুলো,
ম্যাহলান ফামা হাজাল্লাযী ক্বদ গুররাকুম
ইল্লা সারাবান আওলা তারাউনাল গারবা
কাইফা গাদাল রিজালু বিহি যিআবান
আলা তারাউনা উরাল আখলাক্বি তাশতাক্বিবু
ইনশাক্বিবান ইন তারগাবু লি আমানিকুম
সাওনান ওয়া আইশান মুসতাত্বাবান
ফাদাঊস সুফূরা লি আহলিহি ওয়ারজিঊ
আলাইহিমুল বিক্বানা

এ কী করছ তুমি?
আলো ভেবে আলোয়ার মরুভূমি—
এ যে ভ্রম, এ যে ধোঁকা!
দ্যাখো, দ্যাখো!
ওখানে মানুষ অমানুষ,
ওখানে পুরুষ পশু, হায়েনা;
ওখানে চরিত্রের গিঁঠ ছেঁড়া ফাঁড়া;
ওখানে মোহ, ওখানে মরীচিকা!
চাও কি মায়ের সম্মান, বোনের সুরক্ষা,
সুন্দর সুখকর জীবন?
তবে থামো, আর ছুটো না,
আর ছুটে ছুটে ঝুঁকে ঝুঁকে মোরো না।
এ নগ্নতা বন্ধ করো
পর্দাকে আঁকড়ে ধরো।

প্রিয় বোন, আর কত ছুটবেন মরীচিকার পেছনে? এবার তো থামুন। এবার তো ফিরে আসুন। ফিরে আসুন আপনার প্রতিপালকের দিকে। ইসলামের ছায়াদার ফলদার ফুলদার বৃক্ষের নিচে। এখানে অবলোকন করুন একটি সুন্দর পৃথিবী। এখানে উপভোগ করুন একটি সুন্দর জীবন।

জেনে রাখুন, এখানে কালের গর্ব আপনি, আপনি মুসলিম নারী; এখানে সৃষ্টির অহংকার আপনি, আপনি মুমিন নারী। আপনারাই ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছেন এ উম্মাহর ভবিষ্যৎ—আমাদের নতুন প্রজন্ম। এবার অবিচল মনে আর একবার হৃদয়ে আওড়ান আমাদের প্রিয় প্রভুর মহা বাণী,
كُذٰلِكَ يَضْرِبُ اللَّهُ الْحَقَّ وَالْبাটِلَ ۚ فَأَمَّا الزَّبَدُ فَيَذْهَبُ جُفَاءً ۖ وَأَمَّا مَا يَنْفَعُ النَّاسَ فَيَمْكُثُ فِي الْأَرْضِ ۚ كَذَلِكَ يَضْرِبُ اللَّهُ الْأَمْثَالَ
অর্থ : এভাবেই আল্লাহ্ দৃষ্টান্ত দিয়ে থাকেন সত্য ও মিথ্যার। আবর্জনার ফেনা নিমেষেই শেষ হয়ে যায়। কিন্তু যা মানুষের জন্য উপকারী তা ওপরেই থেকে যায়। এভাবেই আল্লাহ্ তুলে ধরেন সুন্দর দৃষ্টান্ত। —সূরা রাদ : ১৭

টিকাঃ
১. আন্ডারউড হিওয়ার : ১/৯৯।
২. আদ্দায়তুল হিয়ার: ২/২১।
১. কিতাবুল হিয়া মিন আলামিন ওয়ালাদ ইলা রিহাবিল ঈমান: ৬৯-৬৯।
২. রিসালাতুন ইলা হাওয়া: ৩৪/২৪-২৫।
১. মিস্ আল্লামিন ওমারা ইলা রিহাবিল ঈমান: ১২-১৩।
২. সুরাতুল নিওয়া-২৫: ২৪।
১. সুরাতুল ফিতরাহ: ৬৬।
২. রিসালাতুন ইলা হাওয়া: ৪/১২০।
৩. সুরাতুল ফিতরাহ: ১৩।

ফন্ট সাইজ
15px
17px