📄 ২. স্বত্বাধিকার ও হস্তক্ষেপ
ইসলাম নারীকে উত্তরাধিকারও দান করেছে। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন,
يُوصِيكُمُ اللَّهُ فِي أَوْلَادِكُمْ لِلذَّكَرِ مِثْلُ حَظِّ الْأُنْثَيَيْنِ
অর্থ : আল্লাহ তোমাদের উপদেশ দান করছেন সন্তানদের ব্যাপারে। পুরুষ পাবে দুজন নারীর সমান। —সুরা নিসা : ১১
শুধু যে নামকাওয়াস্তে অধিকার দিয়ে রেখেছে তা নয়। হস্তক্ষেপের চূড়ান্ত ক্ষমতাও দান করেছে। সে তার সম্পত্তি কেনা-বেচা করতে পারে। দান-সদকা করতে পারে। এতে তার ইচ্ছাই চূড়ান্তভাবে কার্যকর হবে। সুতরাং স্বত্ব ও মালিকানায় ইসলামে সে স্বয়ংসম্পন্ন। সে চাইলে শরীআতনুযায়ী নিষ্পাপ নিজস্ব সম্পদে যে কোনো হস্তক্ষেপ করতে পারে।
📄 ৩. বিবাহপ্রস্তাব গ্রহণ ও প্রত্যাখ্যান
নারী ও পুরুষের মতো মুমিন, বিশ্বাসী, সৎ জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার অধিকার রাখে। তার অনিচ্ছা সত্ত্বেও কারও সাথে তাকে জুড়ে দেওয়া হবে এমন অধিকার কারও নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
الْأَيِّمُ أَحَقُّ بِنَفْسِهَا مِنْ وَلِيِّهَا وَالْبِكْرُ تُسْتَأْذَنُ وَإِذْنُهَا صَمْتُهَا
অর্থ : নিজের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বিধবাই অধিক হকদার। এ ব্যাপারে অভিভাবকের কোনো কর্তৃত্ব নেই। কুমারীকে জিজ্ঞেস করে নিতে হবে। তার নীরবতা সম্মতি নির্দেশ করবে।১
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন,
لَا تُنْكَحُ الْبِكْرُ حَتَّى تُسْتَأْمَرَ، فَقِيلَ لَهُ : إِنَّ الْبِكْرَ تَسْتَحْيِيْ فَقَالَ : إِذْنُهَا صَمْتُهَا
অর্থ : কুমারীকে বিবাহ দিতে হলে তার অনুমতিপ্রাপ্ত হতে হবে। আর বিধবাকে বিবাহ দিতে হলে তার নির্দেশপ্রাপ্ত হতে হবে। বলা হলো, কুমারী তো লজ্জা করবে। তিনি বললেন, তার নীরবতা তার সম্মতি নির্দেশ করবে।২
একবার হযরত খানসা রাদিয়াল্লাহু আনহা এলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে। মিনতি করলেন, তিনি একজন অকুমারী নারী; তাঁর পিতা তাঁকে তাঁর অনিচ্ছা সত্ত্বেও বিবাহ দিয়েছেন। ঘটনাটি যাচাই করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিবাহটি ভেঙে দিলেন।৩
টিকাঃ
১. সহীহ মুসলিম।
২. সহীহ বুখারী।
৩. সহীহ বুখারী ও মুসলিম।
📄 ৪. শিক্ষা অর্জনের অধিকার
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে জ্ঞান ও শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্র ছিল মসজিদ। কিন্তু এখন পরিবেশ পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। এখন জ্ঞান ও শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্র হচ্ছে বিভিন্ন বিদ্যালয়, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি। যাই হোক, জ্ঞান ও শিক্ষা অর্জনের অধিকার ইসলাম নারীকে দিয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
أَيُّمَا رَجُلٍ كَانَتْ عِنْدَهُ أَمَةٌ فَأَدَّبَهَا فَأَحْسَنَ تَأْدِيْبَهَا وَعَلَّمَهَا فَأَحْسَنَ تَعْلِيمَهَا ... إِلَى آخِرِهِ
অর্থ : যদি কারও কোনো কন্যাশিশু থাকে, আর সে তার জ্ঞান ও শিক্ষা অর্জনের ব্যবস্থা করে, (নামে নয়, বরং) উত্তমভাবে; এবং শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়, (নামে নয়, বরং) উত্তমভাবে, তার জন্য থাকছে দ্বিগুণ প্রাপ্তি।১
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারী সাহাবীদের জন্যও একটি বিশেষ দিন নির্ধারণ করেছিলেন তাদের হিতোপদেশ ও আল্লাহ্র আদেশ-নিষেধ শিক্ষা দান করার জন্য।
টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী।
📄 ৬. রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক অধিকার
ইসলাম নারীকে জনপ্রতিনিধিত্ব ও সরকার-নির্বাচনে অংশগ্রহণের অধিকার প্রদান করেছে। মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন,
وَلَا تَكْتُمُوا الشَّهَادَةَ ۚ وَمَنْ يَكْتُمْهَا فَإِنَّهُ آثِمٌ قَلْبُهُ
অর্থ : তোমরা সাক্ষ্য গোপন করো না; যে সাক্ষ্য গোপন করে, সে তো পাপীহৃদয়। -সূরা বাকারা: ২৮৩
শায়খ মাজিদ আবু হুয়ায়ার লিখেছেন,
وَالشَّهَادَةُ وَاجِبَةٌ عَلَى الرَّجُلِ وَالْمَرْأَةِ، وَالِانْتِخَابُ هُوَ شَهَادَةٌ حَقٍّ فِيهَا إِخْبَارٌ عَمَّنْ يَصْلُحُ لِقِيَادَةِ الْأُمَّةِ، وَالِانْتِخَابُ اجْتِهَادٌ لَا تُمْنَعُ مِنْهُ الْأُمَّةُ لِأَنَّهُ الْقَنَا تُحَرِّمُ مِنَ الْمَرْأَةِ، كَمَا أَنَّ عَمَلِيَّةَ الْاِنْتِخَابِ فِي عَصْرِنَا الْحَاضِرِ مُنَظَّمَةٌ وَتَجْرِي فِي فَتْرَةٍ قَصِيرَةٍ لَا تُعَطِّلُ الْمَرْأَةَ عَنْ وَظَائِفِهَا الْأَصْلِيَّةِ كَزَوْجَةٍ وَأَمٍّ وَمُرَبِّيَةٍ. وَهَذَا يَعْكِسُ مَا إِذَا أَرَادَتْ الْمَرْأَةُ أَنْ تُرَشِّحَ نَفْسَهَا نَائِبَةً فِي الْبَرْلَمَانِ فَإِنَّ الْإِسْلَامَ يَقِفُ مِنْ ذَلِكَ مَوْقِفَ النُّفُورِ لَا لِعَدَمِ أَهْلِيَّةِ الْمَرْأَةِ بَلْ لِإِضْرَارِ الْإِسْلَامِ الِاجْتِمَاعِيَّةِ الَّتِي تَنْشَأُ عَنْ ذَلِكَ وَالْمُخَالِفَةِ لِأَحْكَامِ الشَّرِيفَةِ وَآدَابِ الْإِسْلَامِ وَأَخْلَاقِهِ، وَلِلْجَانِبِ الْبِنَائِيَّةِ عَلَى سَلَامَةِ الْأُسْرَةِ وَمَمْلَكِيّهَا، وَانْصِرَافِ الْمَرْأَةِ عَنْ مَهَامِّهَا شُؤُونًا بِكُلِّ هُدُوءٍ وَطُمَأْنِينَةٍ
অর্থ : সাক্ষ্যপ্রদান নারী এবং পুরুষ উভয়ের ওপরই ওয়াজিব। নির্বাচনও একটি সাক্ষ্য। তাতে সাক্ষ্য দেওয়া হয় যে, জাতির নেতৃত্ব দানে কে যোগ্য। তা ছাড়া, নির্বাচন ইজতিহাদের মতোই। নারীরও এক্ষেত্রে অন্তরায় নয়। কেননা, নারী ফতোয়া প্রদান করতে পারেন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ভোটপ্রদান সেরকমই কিছু। এর জন্য খুব বেশি সময়ও ব্যয় হয় না, নারী মূল কর্তব্যে কোনো ব্যাঘাতও ঘটাবে না। তবে যদি নারী নিজে জনপ্রতিনিধি হিসেবে সংসদ-সদস্য হতে চায়, সেটা গ্রহণযোগ্য হবে না। কেননা, ইসলামের দৃষ্টিতে এটা ত্রুটিও নয়। নারীর যোগ্যতা নেই বিষয়টি এমন নয়। আসলে এতে সমাজ-জীবনে অনেক বিপর্যয় ঘটে ও ক্ষতি সাধিত হয়। ইসলামের অসংখ্য বিধানের, সৌজন্য-নীতির, রুচিপ্রকৃতির বিরোধিতা ও লঙ্ঘন হয়। ইসলামী সমাজের মূল ভিত্তিপ্রস্তর—ইসলামী পরিবারের মৌলিকত্ব ও সংহতি বিনষ্ট হয়। নারী তার প্রকৃত প্রকৃতিটি নিশ্চিন্তে নির্বিঘ্নে পালন করতে পারে না।১
শায়খ আবু হুয়ায়ার যথার্থই বলেছেন। কেননা, বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের শাখা-প্রশাখা ব্যাপকভাবে বিস্তৃত। রাজনৈতিক পরিষদের নিত্যনূতন মোড় নেয়। এতে জড়াতে গেলে নারীকে দীর্ঘক্ষণ বাড়ির বাইরে থাকতে হবে। দেশে বিদেশে একের পর এক সফর করতে হবে। সবই নারীপ্রকৃতির সাথে অসামঞ্জস্য। বিপরীতে তার যে গুরুদায়িত্বটি ছিল একজন বিশুদ্ধ জীবনবাদিনী হিসেবে, একজন দায়িত্বশীলা মা হিসেবে, ভবিষ্যৎ-প্রজন্মের রূপরচনা হিসেবে, সেটাও বিঘ্নিত হবে。
নারী যত বড় রাজনৈতিক পদধারীই যাওক না কেন এবং সেটায় যত যোগ্য বলেই বিবেচিত হোক, আল্লাহপ্রদত্ত স্বভাবপ্রকৃতি কিছুতেই বদলাবে না। নারীসুলভ কোমলতা, মায়া-মমতা কখনোই তার পিছু ছাড়বে না। এরকম উদাহরণ একটি-দু’টি নয়, অসংখ্য। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকেই দেখুন, বিমান-দুর্ঘটনায় পুত্রের মৃত্যোশোকে কী কান্নাই না কাঁদলেন। সারা পৃথিবীর সকল মায়ের মনে যে দহন-যন্ত্রণা হয় তা কি তিনি এড়াতে পেরেছেন? ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার আফ্রিকার মরুভূমিতে পুত্রকে হারিয়ে কেমন ভেঙে পড়েছিলেন! টেলিভিশনে সারা পৃথিবীর সামনে কেঁদে কেঁদে বললেন, যদি তারা ছেলের সন্ধান দিতে না পারেন তা হলে তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। তবে দেখুন, তিনি লৌহমানবী নামে পরিচিত।২
প্রিয় বোন, ভুলে যাবেন না, আপনি খানসা-আসমা উত্তরসূরি। আপনার পরম্পরা অনেক উন্নত। আপনার অনেক সাহসী হওয়া উচিত। শারীরিক সীমারেখা জ্ঞাত হওয়া উচিত। যে কোনো বিষয়ে অত্যন্ত চৌকশ ও সচেতন হওয়া উচিত। আল্লাহ আপনাকে যে মর্যাদা দান করেছেন, তার মূল্যায়ন করা উচিত। ভুলেও পশ্চিমা নারীদের অনুসরণ করবেন না। ঈমান ও ইসলামের স্বাভাবিক ও চারিত্রিক সীমারেখা অতিক্রম করবেন না। দীন ও শরী'আতের বিধি-নিষেধ লঙ্ঘন করবেন না। মনে রাখবেন, মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন,
وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوْفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَيُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَيُطِيعُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ أُوْلَئِكَ سَيَرْحَمُهُمُ اللَّهُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ
অর্থ : মুমিন নর ও মুমিন নারীগণ এক অপরের বন্ধু। তারা সৎ কাজের আদেশ করবে, অসৎ কাজে বাঁধা প্রদান করবে। তারা সালাত কায়েম করবে, যাকাত আদায় করবে। তারা আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করবে। অচিরেই আল্লাহ তাদের করুণা করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, মহাপ্রজ্ঞাময়। —সূরা তাওবা : ৭১
এই আয়াতটি স্পষ্টত প্রমাণ করে যে, সমাজ ও রাজনীতিতে পুরুষের সাথে নারীরও অংশগ্রহণ প্রয়োজন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও ইরশাদ করেছেন,
الْمُسْلِمُونَ تَتَكَافَا دِمَاؤُهُمْ، وَيَسْعَى بِذِمَّتِهِمْ أَدْنَاهُمْ، وَيُجِيرُ عَلَيْهِمْ أَقْصَاهُمْ، وَهُمْ يَدٌ عَلَى مَنْ سِوَاهُمْ.
অর্থ : মুসলমানরা পরস্পরের সমান। তাদের মধ্যে যে সবচেয়ে নগণ্য, সেও তাদের নিরাপত্তার বিষয়ে সচেষ্ট হবে। যে সবচেয়ে দূরবর্তী, সেও আশ্রয় প্রদান করতে পারবে। অন্যদের বিপক্ষে তারা ঐক্যবদ্ধ।৩
টিকাঃ
১. আল মারআতু ওয়াল হুকমুস সিয়াসিয়্যাহ্ ফিল ইসলাম : ৪৫০-৪৫১।
২. রিদালাতুন ইসা হাওয়া : ২/৩।
৩. আবু দাউদ ও বাইহাকী।