📄 হজ্জের কার্যক্রমে ধারাবাহিকতা রক্ষা না করা
হাজী সাহেব ঈদের দিন তথা দশই জিলহজ পাঁচটি কাজ ধারাবাহিকভাবে সম্পাদন করবে:
১) জামরা আক্বাবায় কঙ্কর নিক্ষেপ করা
২) তারপর হাদঈ যবাই করা
৩) তারপর মাথা মুণ্ডন অথবা চুল ছোট করা
৪) অতঃপর কা'বা ঘরের তাওয়াফ করা
৫) সবশেষে ছাফা-মারওয়া সা'ঈ করা।
অবশ্য ইফরাদকারী ও ক্বেরাণকারী যদি তাওয়াফে কুদূমের সাথে সা'ঈ করে নিয়ে থাকে, তবে পুনরায় তাকে সা'ঈ করতে হবে না। উত্তম হচ্ছে উল্লিখিত কাজগুলো ধারাবাহিকভাবে আদায় করা। কিন্তু যদি আগ-পিছ হয়ে যায় বা করে ফেলে- বিশেষ করে প্রয়োজন দেখা দিলে তবে কোনো অসুবিধা নেই। এটা বান্দাদের প্রতি আল্লাহর করুণার একটি বড় প্রমাণ।³⁶
টিকাঃ
³⁶ দেখা যায় আমাদের দেশ থেকে অনেক হাজী তামাতু হজ করতে এসে ৮ই জিলহজে হজের ইহরাম বেঁধে বা নফল তাওয়াফ করে মীনা যাওয়ার পূর্বেই অগ্রীম সাফা-মারওয়া সাঈ করে নেয়। কিন্তু এটা বিশুদ্ধ নয়। এতে তাদের হজ হবে না। কেননা তারা সময়ের আগেই সে কর্মটি সম্পন্ন করেছে। অনুবাদক ও সম্পাদক।
📄 ১২ ও ১৩ যিলহজ্জ কঙ্কর নিক্ষেপের বিধান
প্রশ্ন: (৫৩১) সউদী আরবের বাইরে অবস্থান করে এমন জনৈক হাজী হজের কাজ সম্পাদন করেছে। জিলহজের ১৩ তারিখে আছর তথা বিকাল চারটার সময় তার সফরের সময় নির্দিষ্ট। কিন্তু ১২ তারিখ কঙ্কর মারার পর সে মিনা থেকে বের হয় নি। ১৩ তারিখের রাত সেখানেই অবস্থান করেছে। এখন ১৩ তারিখ সকালে কঙ্কর মেরে মিনা থেকে বের হওয়া তার জন্য জায়েয হবে কী? উল্লেখ্য যে, যোহরের পর কঙ্কর মেরে বের হলে নির্ঘাত তার সফর বাতিল হয়ে যাবে, ফলে সে বিরাট অসুবিধায় পড়বে।
এর উত্তর যদি না জায়েয হয়, তবে যোহরের পূর্বে কঙ্কর মারার ব্যাপারে কি কোনো মত পাওয়া যায় না?
উত্তর: কোনো অবস্থাতেই যোহরের পূর্বে কঙ্কর মারা জায়েয নয়। জরুরী অবস্থা হিসেবে কঙ্কর নিক্ষেপ করা রহিত হবে না। তবে তার সমাধান হচ্ছে এ অবস্থায় কঙ্কর না মেরেই সে চলে যাবে এবং তার ফিদিয়া প্রদান করবে। আর তা হচ্ছে মক্কা বা মিনায় একটি দম প্রদান করবে অথবা কাউকে এর দায়িত্ব প্রদান করবে এবং উক্ত দম (কুরবানী শুদ্ধ হয় এমন প্রাণী) এর গোস্ত সেখানকার ফকীরদের মাঝে বিতরণ করে দিবে। এরপর বিদায়ী তাওয়াফ করে মক্কা ত্যাগ করবে।
হ্যাঁ, যোহরের পূর্বে কঙ্কর মারার বৈধতার ব্যাপারে মত পাওয়া যায়, কিন্তু তা বিশুদ্ধ নয়। সঠিক কথা হচ্ছে, ঈদের পর আইয়্যামে তাশরীকের দিনগুলোতে কোনো অবস্থাতেই যোহরের সময়ের পূর্বে কঙ্কর মারা জায়েয নয়। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "তোমরা আমার নিকট থেকে ইবাদতের (হজ-উমরার) নিয়ম শিখে নাও।"³⁹ আর তিনি এ দিনগুলোতে যোহরের পূর্বে কঙ্কর মারেন নি।
কেউ যদি বলে যে, যোহরের পর নবীজির কঙ্কর নিক্ষেপ তার সাধারণ একটি কর্ম। আর সাধারণ কর্ম দ্বারা ওয়াজিব সাব্যস্ত হয় না।
জবাবে আমরা বলব, একথা সত্য যে এটি তাঁর সাধারণ কর্ম। তিনি যোহরের পর কঙ্কর নিক্ষেপ করেছেন। এরকম বাচনিক নির্দেশ প্রদান করেন নি যে, 'কঙ্কর নিক্ষেপ যোহরের পরেই হতে হবে'। তাছাড়া এ সময়ের পূর্বে নিক্ষেপের ব্যাপারে কোনো নিষেধও করেন নি। আর তাঁর কর্ম ওয়াজিবের অর্থ বহণ করে না। নির্দেশ সূচক শব্দ ছাড়া কোনো কাজ বাস্তবায়ন করা ওয়াজিব হয় না বা নিষেধ সূচক শব্দ ছাড়া পরিত্যাগ করা ওয়াজিব প্রমাণিত হয় না। কিন্তু আমি বলব, নবীজির উক্ত কর্ম যে ওয়াজিব তার পক্ষে কারণ আছে। আর তা হচ্ছে, কঙ্কর মারার ব্যাপারে যোহরের সময় পর্যন্ত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অপেক্ষা করাটাই প্রমাণ করে যে এটা ওয়াজিব। কেননা যোহরের পূর্বে কঙ্কর মারা যদি জায়েয হত, তবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেটাই করতেন। কারণ, উম্মতের জন্য এটাই সহজ। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যখন দু'টি বিষয়ের মাঝে স্বাধীনতা দেওয়া হত, তখন তিনি উভয়টির মধ্য থেকে সহজটি গ্রহণ করতেন- যদি তাতে কোনো পাপ না থাকত। সুতরাং এখানে যখন তিনি সহজ অবস্থাটি গ্রহণ করেন নি অর্থাৎ যোহরের সময় হওয়ার পূর্বে কঙ্কর নিক্ষেপ করেন নি, তখন বুঝা যায় এতে পাপ আছে। অতএব, যোহরের সময় হওয়ার পরই কঙ্কর মারা ওয়াজিব।
এ কাজটি ওয়াজিব হওয়ার দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূর্য পশ্চিমাকাশে ঢলার সাথে সাথে যোহরের সালাত আদায় করার পূর্বেই কঙ্কর মেরেছেন। যেন তিনি অধীর আগ্রহে সূর্য ঢলার অপেক্ষা করছিলেন। যাতে করে দ্রুত কঙ্কর মারতে পারেন। আর একারণেই যোহর সালাত দেরী করে আদায় করেছেন। অথচ প্রথম সময়ে অর্থাৎ সময় হওয়ার সাথে সাথেই সালাত আদায় করা উত্তম।
এথেকেই বুঝা যায় যে, যোহরের সময় হওয়ার পূর্বে কঙ্কর মারা জায়েয হবে না。
টিকাঃ
³⁹ সহীহ বুখারী, অধ্যায়: ইলম বা জ্ঞান, অনুচ্ছেদ: পশুর পিঠে থাকাবস্থায় মানুষকে ফাতওয়া দেওয়া; সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: হজ, অনুচ্ছেদ: কুরবানীর পূর্বে যে মাথা মুণ্ডন করেছে।
📄 রাতের বেলায় মিনায় স্থান না পেলে মানুষ কী করবে?
প্রশ্ন: (৫৩৩) মিনায় স্থান না পাওয়ার কারণে কোনো লোক যদি সেখানে শুধুমাত্র রাতের বেলায় আগমন করে মধ্য রাত্রি পর্যন্ত অবস্থান করে। তারপর মক্কা চলে যায় এবং রাত ও দিনের অবশিষ্ট অংশ তথায় অবস্থান করে তবে কি হবে?
উত্তর: তার এ কাজ যথেষ্ট হবে। কিন্তু এর বিপরীত করাই উত্তম। উচিৎ হচ্ছে, হাজী সাহেব রাত ও দিনের পূরা সময় মিনাতেই অতিবাহিত করবে। ভালোভাবে অনুসন্ধান করার পরও যদি কোনো মতেই মিনার অভ্যন্তরে স্থান করতে না পারে, তবে সর্বশেষ (খীমা বা) তাঁবুর সংলগ্ন স্থানে তাঁবু করে সেখানে অবস্থান করবে যদিও তা মিনার বাইরে পড়ে। বর্তমান যুগের কোনো কোনো বিদ্বান মত প্রকাশ করেছেন যে, কোনো মানুষ যদি মিনায় অবস্থান করার স্থান না পায়, তবে মিনায় রাত কাটানো রহিত হয়ে যাবে। তখন তার জন্য জায়েয হয়ে যাবে মক্কা বা অন্য কোনো স্থানে রাত কাটানো। তাদের কিয়াস হচ্ছে, কোনো মানুষের অযুর কোনো অঙ্গ যদি কাটা থাকে তখন সেটা ধৌত করা রহিত হয়ে যায়। কিন্তু তাদের এ মত যুক্তিসংগত নয়। কেননা অযুর অঙ্গের বিষয়টি ঐ ব্যক্তির পবিত্রতার সাথে সম্পর্কিত। কিন্তু মিনায় রাত কাটানোর বিষয়টির উদ্দেশ্য হচ্ছে, সমস্ত লোকের একস্থানে সমবেত থাকা। সকলে ঐক্যবদ্ধ জাতি হিসেবে প্রকাশ ঘটানো। সুতরাং ওয়াজিব হচ্ছে, মিনার শেষ তাঁবুর পাশে তাঁবু বানিয়ে থাকা, যাতে করে সে হাজীদের সাথেই রাত কাটাতে পারে। এর উদাহরণ হচ্ছে, সালাতের জামা'আতে যদি মসজিদ পূর্ণ হয়ে যায়, আর লোকেরা মসজিদের আশে-পাশে বাইরে সালাতে দাঁড়ায়, তবে আবশ্যক হচ্ছে কাতার মিলিত হওয়া। যাতে করে তারা একই জামা'আতভুক্ত একথা প্রমাণ হয়। রাত কাটানোর বিষয়টি এর সাথে সামঞ্জস্যশীল, শরীরের কর্তিত অঙ্গের সাথে এর তুলনা করা উচিৎ নয়।