📄 নিক্ষিপ্ত কঙ্কর পুনরায় নিক্ষেপ করা যাবে?
প্রশ্ন: (৫১৮) কেউ কেউ বলেন, যে কঙ্কর একবার নিক্ষিপ্ত হয়েছে তা নাকি আবার নিক্ষেপ করা যাবে না। এ কথাটি কি ঠিক? এর কোনো দলীল আছে কী?
উত্তর: একথা সঠিক নয়। কেননা যারা নিক্ষিপ্ত কঙ্কর পুনরায় নিক্ষেপ করতে নিষেধ করেন তাদের যুক্তি হচ্ছেঃ
1) নিক্ষিপ্ত কঙ্কর (মায়ে মুস্তা'মাল) তথা ব্যবহৃত পানির মত। আর ফরয পবিত্রতায় যদি কোনো পানি ব্যবহার করা হয়, তবে সে ব্যবহৃত পানিটা পবিত্র থাকলেও সে পানি অন্যকে পবিত্র করতে পারে না।
2) বিষয়টি ক্রীতদাসের মত। কাফফারা প্রভৃতিতে যদি তাকে মুক্ত করে দেওয়া হয়, তবে তো তাকে আবার মুক্ত করা যাবে না।
3) এর দ্বারা এটা আবশ্যক হয়ে পড়ে যে, সকল হাজীর জন্য একটি মাত্র পাথর মারাই জায়েয হবে। অর্থাৎ আপনি পাথরটি মারবেন, তারপর আবার সেটা নিবেন এবং মারবেন, তারপর আবার নিবেন এবং মারবেন এভাবে সাতবার পূর্ণ করবেন। তারপর দ্বিতীয় ব্যক্তি এসে সেই পাথরটি সাতবার নিয়ে সাতবার মারবে। বস্তুত: গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, এ তিনটি যুক্তি খুবই দুর্বল:
১) ব্যবহৃত পানির যে উদাহরণ দেওয়া হয়েছে তা ঠিক নয়। কেননা কোনো ওয়াজিব পবিত্রতা অর্জনের জন্য পানি ব্যবহার করা হলে পানি নিজে পবিত্র থাকবে কিন্তু অন্যকে পবিত্র করতে পারবে না এটি দলীল বিহীন একটি কথা। বস্তুত পানির যে প্রকৃত গুণ রয়েছে অর্থাৎ পবিত্রতা, তা দলীল ছাড়া রহিত করা যাবে না। অতএব, ওয়াজিব পবিত্রতা অর্জনের জন্য ব্যবহৃত পানি নিজে পবিত্র, আর তা অন্যকেও পবিত্র করতে পারে। এর মাধ্যমে প্রথম যুক্তির খণ্ডন হয়ে গেল এবং কঙ্কর মারাকে তার সাথে তুলনা করা ভুল প্রমাণিত হল।
২) নিক্ষিপ্ত কঙ্করকে মুক্ত ক্রীতদাসের সাথে তুলনা করাও ঠিক নয়। কেননা উভয়ের মাঝে বিস্তর পার্থক্য বিদ্যমান। ক্রীতদাসকে মুক্ত করা হলে সে তো স্বাধীন হয়ে গেল। তাকে আবার মুক্ত করার সুযোগ থাকলো না। কিন্তু কঙ্কর মারা হয়ে গেলেও সেটা কঙ্করই রয়ে যায়। যে কারণে তা নিক্ষেপ করা হয়েছিল সে কারণ তাতে অবশিষ্ট রয়েছে। এ কারণে ক্রীতদাস আবার যদি কখনো শর'ঈ দলীলের ভিত্তিতে দাসে পরিণত হয়, তবে পুনরায় তাকে মুক্ত করা যাবে।
৩) তৃতীয় যুক্তির জবাবে আমরা বলব: সমস্ত হাজীকে একটি মাত্র পাথর নিক্ষেপ আবশ্যক করা- যদি সম্ভব হয় তো হোক। কিন্তু তা অসম্ভব। অসংখ্য পাথর থাকতে কোনো বুদ্ধিমান ঐ চিন্তা করতে পারে না।
সুতরাং কঙ্কর মারতে গিয়ে যদি আপনার হাত থেকে দু'একটি কঙ্কর পড়ে যায় তবে সম্মুখ থেকে সহজলভ্য কঙ্কর কুড়িয়ে নিয়ে তা মেরে দিন- চাই তা একবার মারা হয়েছে বা হয় নি তা দেখার বিষয় নয় এবং তাতে কোনো অসুবিধা নেই।
📄 কখন জামরা আকাবায় কঙ্কর মারলে আদায় হবে?
প্রশ্ন: (৫২০) কখন জামরা আক্বাবায় কঙ্কর মারলে আদায় হবে? এবং কখন মারলে কাযা মারা হবে?
উত্তর: ঈদের দিন সর্বসাধারণের জন্য কঙ্কর মারার সময় হচ্ছে, সূর্য উঠার পর থেকে শুরু হবে। আর দুর্বলদের জন্য এ সময় শুরু হবে শেষ রাত থেকে। কঙ্কর মারার শেষ সময় হচ্ছে পরবর্তী দিন ১১ তারিখ ফজর উদিত হওয়া পর্যন্ত। কিন্তু যদি উক্ত সময়ের মধ্যে মারা সম্ভব না হয়, তবে আইয়ামে তাশরীকের দিনগুলোতে (১১, ১২ ও ১৩ তারিখ) যে সময় কঙ্কর মারা শুরু হবে সে সময়ই বিগত দিনের জামরা আক্বাবার কাযা পাথর নিক্ষেপ করবে। অর্থাৎ পশ্চিমাকাশে সূর্য ঢলার পর থেকে পাথর মারা শুরু হবে। আর শেষ হবে পরবর্তী দিন ফজর উদিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত। কিন্তু আইয়্যামে তাশরীকের শেষ দিন (১৩ তারিখ) হলে রাত্রে কঙ্কর মারা যাবে না। কেননা সেদিন সূর্য অস্ত হলেই আইয়ামে তাশরীক শেষ হয়ে গেল এবং ১৪ তারিখ শুরু হয়ে গেল।
সর্বাবস্থায় দিনের বেলায় কঙ্কর নিক্ষেপ করাই উত্তম। কিন্তু এ সময়ে হাজীদের ভীড়ের প্রচণ্ডতার কারণে, হাজীদের একে অপরের প্রতি বেপরওয়া হওয়ার কারণে যদি জানের ক্ষতির আশংকা করে বা কঠিন কষ্টকর হয়ে উঠে, তবে রাত্রে মারলে কোনো অসুবিধা হবে না। অবশ্য কোনো আশংকা না থাকলেও রাতে মারলে কোনো অসুবিধা নেই। তবে এ মাসআলায় সতর্কতা অবলম্বন করা উচিৎ এবং একান্ত অসুবিধা না থাকলে রাতে কঙ্কর না মারা উচিৎ।
📄 কঙ্কর মারার সময় কী?
প্রশ্ন: (৫২৪) কঙ্কর মারার সময় কী?
উত্তর: জামরা আক্বাবায় কঙ্কর মারার সময় হচ্ছে ঈদের দিন। সামর্থ্যবান লোকদের জন্য এ সময় শুরু হবে ঈদের দিন সূর্যোদয়ের পর থেকে। আর মানুষের ভীড় সহ্য করতে পারবে না এরকম দুর্বল, নারী, শিশু, প্রভৃতির জন্য সময় হচ্ছে ঈদের দিন শেষ রাত থেকে। আসমা বিনতে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু 'আনহু ঈদের রাতে চাঁদ অস্ত যাওয়ার অপেক্ষা করতেন। চাঁদ অস্ত গেলেই মুযদালিফা ছেড়ে মিনা রওয়ানা হতেন এবং জামরা আক্বাবায় কঙ্কর মারতেন। আর এর শেষ সময় হচ্ছে ঈদের দিন সূর্যাস্ত পর্যন্ত। কিন্তু যদি ভীড় প্রচণ্ড থাকার কারণে বা জামরা থেকে দূরে অবস্থানের কারণে রাতে কঙ্কর মারে তবে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু পরবর্তী দিন ১১ তারিখের ফজর বা সুবহে সাদেক পর্যন্ত যেন বিলম্ব না করে।
আইয়্যামে তাশরীক তথা ১১, ১২ ও ১৩ তারিখে পাথর নিক্ষেপের সময় শুরু হবে মধ্য দিনে সূর্য পশ্চিমাকাশে ঢলার পর থেকে তথা যোহরের সময় থেকে এবং তা চলতে থাকবে রাত পর্যন্ত। আর কষ্ট ও ভীড়ের কারণে বিলম্ব করে ফজর উদিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তা নিক্ষেপ করা যাবে। এ তিন দিন যোহরের সময়ের পূর্বে কঙ্কর নিক্ষেপ জায়েয হবে না। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূর্য পশ্চিমাকাশে ঢলার পূর্বে নিক্ষেপ করেন নি। আর লোকদের বলেছেন, "তোমরা আমার নিকট থেকে হজ-উমরার বিধি-বিধান শিখে নাও।"³⁷ সকালের দিকে ঠাণ্ডা এবং সহজ থাকা সত্বেও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিলম্ব করে কঠিন গরমে দুপুরের সময় কঙ্কর নিক্ষেপ করেছেন- এ থেকেই প্রমাণ হয় যে, এ সময়ের পূর্বে নিক্ষেপ করা জায়েয হবে না।
এ কথার পক্ষে আরো প্রমাণ হচ্ছে যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূর্য ঢলার সাথে সাথে যোহরের সালাত আদায় না করে প্রথমে কঙ্কর নিক্ষেপ করেছেন। যদি সূর্য ঢলার পূর্বে নিক্ষেপ করা জায়েয হতো, তবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূর্য ঢলার পূর্বেই কঙ্কর মেরে প্রথম ওয়াক্তে যোহরের সালাত আদায় করতেন। কেননা প্রথম ওয়াক্তে সালাত আদায় করা উত্তম। মোটকথা, আইয়ামে তাশরীকের দিনগুলোতে সূর্য ঢলার পূর্বে কঙ্কর নিক্ষেপ করা জায়েয নয়।
টিকাঃ
³⁷ সহীহ বুখারী, অধ্যায়: ইলম বা জ্ঞান, অনুচ্ছেদ: পশুর পিঠে থাকাবস্থায় মানুষকে ফাতওয়া দেওয়া; সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: হজ, অনুচ্ছেদ: কুরবানীর পূর্বে যে মাথা মুণ্ডন করেছে。
📄 হজ্জের কার্যক্রমে ধারাবাহিকতা রক্ষা না করা
হাজী সাহেব ঈদের দিন তথা দশই জিলহজ পাঁচটি কাজ ধারাবাহিকভাবে সম্পাদন করবে:
১) জামরা আক্বাবায় কঙ্কর নিক্ষেপ করা
২) তারপর হাদঈ যবাই করা
৩) তারপর মাথা মুণ্ডন অথবা চুল ছোট করা
৪) অতঃপর কা'বা ঘরের তাওয়াফ করা
৫) সবশেষে ছাফা-মারওয়া সা'ঈ করা।
অবশ্য ইফরাদকারী ও ক্বেরাণকারী যদি তাওয়াফে কুদূমের সাথে সা'ঈ করে নিয়ে থাকে, তবে পুনরায় তাকে সা'ঈ করতে হবে না। উত্তম হচ্ছে উল্লিখিত কাজগুলো ধারাবাহিকভাবে আদায় করা। কিন্তু যদি আগ-পিছ হয়ে যায় বা করে ফেলে- বিশেষ করে প্রয়োজন দেখা দিলে তবে কোনো অসুবিধা নেই। এটা বান্দাদের প্রতি আল্লাহর করুণার একটি বড় প্রমাণ।³⁶
টিকাঃ
³⁶ দেখা যায় আমাদের দেশ থেকে অনেক হাজী তামাতু হজ করতে এসে ৮ই জিলহজে হজের ইহরাম বেঁধে বা নফল তাওয়াফ করে মীনা যাওয়ার পূর্বেই অগ্রীম সাফা-মারওয়া সাঈ করে নেয়। কিন্তু এটা বিশুদ্ধ নয়। এতে তাদের হজ হবে না। কেননা তারা সময়ের আগেই সে কর্মটি সম্পন্ন করেছে। অনুবাদক ও সম্পাদক।