📄 ত্রয়োদশ সংশয় : সংস্কার ও ফাহমুস সালাফ
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ يَبْعَثُ لِهَذِهِ الأُمَّةِ عَلَى رَأْسِ كُلِّ مِائَةِ سَنَةٍ مَن يُجَدِّدُ لَهَا دِينَهَا .
'প্রত্যেক শতকে মহান আল্লাহ তাআলা এই উম্মতের জন্য একজন মুজাদ্দিদ পাঠাবেন। যিনি উম্মতের সামনে এই দীনকে নবায়ন বা সংস্কার করবেন।'২১৬
এই হাদিসের আলোকে বোঝা যায়, মুসলিম উম্মাহর জন্য পূর্ববর্তীদের ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়; বরং প্রত্যেক শতকে মুসলিম উম্মাহর চিন্তাকে নবায়ন করতে হবে। আজকে মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় সংকট হলো, তারা তাজদিদকে ছেড়ে দিয়েছে। পূর্ববর্তীদের স্থবির ফিকহকে তারা বর্তমানে প্রয়োগ করতে চাচ্ছে। ইসলামকে বর্তমান যুগে বিজয়ী ও গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য সংস্কারের মনোভাব নিয়ে, নুসুসে শরিয়াহ নিয়ে যুগের আলোকে নতুন করে ভাবতে হবে।
নিরসন :
প্রথমত, যারা এই আপত্তি করেন, তারা হাদিসে বর্ণিত তাজদিদের মর্মই বোঝেননি। উল্লিখিত হাদিসে তাজদিদ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, সময়ের পরিবর্তনে মুসলিমদের ভেতর দীন ও আমল সম্পর্কে উদাসীনতা তৈরি হয়। তারা তখন এই দীনের আমল ও তাকে বাস্তবায়ন করার দায়িত্ব থেকে দূরে চলে আসতে থাকে। দীনের নামে বিভিন্ন ভ্রান্ত ব্যক্তি ও গোষ্ঠী ইসলামি শরিয়াহকে বিকৃত করতে থাকে এবং এর সাথে বিভিন্ন ভ্রান্ত বিষয়কে যুক্ত করতে থাকে। এই পরিস্থিতিতে মহান আল্লাহ তাআলা মুসলিমদের মধ্যে কোনো মুজাদ্দিদ পাঠান। যিনি এই দীনকে আবার তার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেবেন। দীনের মাঝে সৃষ্ট নতুন বিষয় ও তাহরিফকে দূর করবেন। উম্মাহকে আবার দীনের ওপর নিয়ে আসবেন। ইসলাম পালনের জন্য তাদেরকে আবার জাগিয়ে তুলবেন। এটাই হলো তাজদিদের মর্ম।
আল্লামা আলকামি রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'তাজদিদের অর্থ হলো কুরআন-সুন্নাহ ও তার চাহিদা অনুযায়ী যে আমল মানুষ থেকে হারিয়ে গেছে, সেটাকে পুনরুজ্জীবিত করা। আল্লামা মুনাভি রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'হাদিসে দীন নবায়ন করার দ্বারা বোঝানো হয়েছে মুজাদ্দিদ সুন্নাত থেকে বিদআতকে সুস্পষ্ট করে দেবেন, মানুষের ভেতর ইলম বৃদ্ধি করবেন, আহলে ইলমের সাহায্য করবেন এবং আহলে বিদআতকে পরাজিত ও অপদস্থ করবেন।'২ ১৭
মোল্লা আলি কারি রহিমাহুল্লাহও তার বিখ্যাত মিরকাতুল মাফাতিহ গ্রন্থে একই ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। সুনানে আবু দাউদের বিখ্যাত শরাহগ্রন্থ আওনুল মাবুদে আল্লামা শামসুল হক আযিমাবাদি রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'তাজদিদ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, কুরআন-সুন্নাহর যে আমল ও চাহিদা প্রায় বিলুপ্ত হয়েছে, তাকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং বিদআত ও নব্য উদ্ভাবিত ভ্রান্ত বিষয় নির্মূল করা।'
মুজাদ্দিদের প্রধান কিছু বৈশিষ্ট্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'মুজাদ্দিদকে অবশ্যই দীনের সার্বিক ইলমের অধিকারী হতে হবে। সুন্নাতের সহায়তাকারী ও বিদআত নির্মুলকারী হতে হবে এবং তার জমানার লোকদের সম্পর্কে অবগত থাকতে হবে।'২ ১৮
অন্যান্য হাদিস থেকেও তাজদিদের উল্লিখিত ব্যাখ্যার সমর্থন পাওয়া যায়। যেমন এক হাদিসে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গুরাবাদের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন, 'ইসলামের সূচনা হয়েছে অপরিচিত অবস্থায়। এটি আবার সে অবস্থায় ফিরে যাবে, যেভাবে তার সূচনা হয়েছিল। তাই অপরিচিতদের জন্য সুসংবাদ। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ! তারা. কারা? তিনি বললেন, যখন মানুষের অবস্থা মন্দ হয়ে যাবে তখন যারা তা সংশোধনের কাজ করবে।’২১৯
উল্লিখিত প্রতিটি বর্ণনা থেকেই স্পষ্ট, কুরআন-সুন্নাহর আলোকে তাজদিদ হলো, মুসলিমদের অধঃপতনের সময় তাদেরকে কুরআন-সুন্নাহর ওপর উঠিয়ে আনা এবং মুসলিমদের খুলাফায়ে রাশেদিন তথা সালাফদের প্রথম যুগের আদর্শের দিকে ফিরিয়ে নেওয়া।
সুতরাং তাজদিদ দ্বারা কখনোই এটা উদ্দেশ্য নয় যে, সালাফদের ফাহম ও মানহাজ ছেড়ে প্রত্যেক জমানার লোকেরা যার যার মতো শরিয়াহকে পরিবর্তন করবে। প্রত্যেক যুগে যুগে নুসুসে শরিয়াহর নতুন নতুন ব্যাখ্যা আবিষ্কার করবে। এইভাবে তো আল্লাহর শরিয়াহ মানুষের হাতে খেলনার পাত্রে পরিণত হবে। যে যার মতো দীনের বিধানকে ব্যাখ্যা করবে। এভাবে আল্লাহর দীন পরিবর্তন হতে হতে একপর্যায়ে হারিয়ে যাবে।
মূলত যারা তাজদিদ, সংস্কার ইত্যাদির নামে আল্লাহর দীনকে পরিবর্তন করতে চায়, তাদের হাত থেকে শরিয়াহকে রক্ষা করার জন্যই মহান আল্লাহ তাআলা যুগে যুগে মুজাদ্দিদ পাঠিয়ে থাকেন। মুজাদ্দিদের কাজ হলো, শ্রেষ্ঠ প্রজন্মের মুসলিমরা যেভাবে এই দীন বুঝেছেন এবং আমল করেছেন, উম্মাহকে সেভাবে পুনরুজ্জীবিত করা। যারা যুগের ভ্রান্ত চিন্তা ও কাফেরদের বিজয়ী সভ্যতায় প্রভাবিত হয়ে যুগকে পরিবর্তন করার পরিবর্তে ইসলামকেই পরিবর্তন করতে চায়, তাদের অপচেষ্টা রুখে দেওয়া। উম্মতকে এ ধরনের ভ্রান্ত অপচেষ্টার ব্যাপারে সচেতন করা।
সুতরাং সালাফদের ফাহম ও মানহাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করা কিংবা সেগুলো থেকে উম্মাহকে বিমুখ করা প্রকৃত মুজাদ্দিদের কাজ নয়। উমর ইবনে আবদুল আজিজ রহিমাহুল্লাহকে ফুকাহায়ে কেরাম মুজাদ্দিদ হিসেবে গণ্য করেন। তিনি কখনো সাহাবায়ে কেরাম ও তার পূর্বে গত হওয়া তাবেয়ি আলেমদ্রের ফাহম ও মানহাজের ওপর আক্রমণ করেননি; বরং তিনি তাদের পথকে হেদায়াতের জন্য জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন।
এমনিভাবে আমাদের নিকট অতীতের স্বীকৃত মুজাদ্দিদ হলেন আহমাদ সিরহিন্দি। রহিমাহুল্লাহ; যাকে আমরা মুজাদ্দিদে আলফে সানি নামে চিনি। তার তাজদিদি কর্মের দিকে দৃষ্টি দিলে আমরা দেখতে পাই, তিনি সমাজ থেকে বিদআত নির্মূল করেছেন। মুসলিমদের ভেতর যেসব শিরকি বিশ্বাস জন্ম নিয়েছিল, তিনি সেগুলো থেকে তাদেরকে ফিরিয়ে এনেছেন। বাদশা আকবারের দীনে ইলাহির প্রভাবে যখন ইসলামি শরিয়ায় বিকৃতি সাধনের আশঙ্কা দেখা দেয়, তিনি তখন দীনে ইলাহির বিরুদ্ধে বিপ্লবী দাওয়াহ পরিচালনা করেন। কিন্তু দীনে ইলাহির প্রভাবে তিনি সালাফদের ফাহম ও মানহাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করেননি; বরং সালাফদের আদর্শে উজ্জিবীত হয়েছেন। তাদের ফাহম ও মানহাজের আলোকে সমাজকে পরিবর্তন করেছেন। ইসলামি ইতিহাসে সমস্ত মুজাদ্দিদের কাজের নমুনা এর ব্যতিক্রম ছিল না।
বর্তমানে তাজদিদের নামে ইসলামি শরিয়াহর মুতাওয়ারিস উসুল ও ফুরুয়ের ওপর যে নৈরাজ্য করা হচ্ছে, তার সাথে হাদিসে বর্ণিত তাজদিদের কোনো সম্পর্ক নেই। বিকৃত এই তাজিদিদি কর্ম ইসলামকে পুনরুজ্জীবিত করার পরিবর্তে ইসলামি শরিয়াহকে ধ্বংস করবে, ফুনুনে শরিয়াহর ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দেবে। আর মুসলিমদেরকে কুরআন-সুন্নাহমুখী করার পরিবর্তে বিভ্রান্ত করবে, ইসলাম- বিরোধী সভ্যতার অনুগত বানাবে। এজন্য কথিত এই তাজদিদের দাওয়াত এক ভয়াবহ দাওয়াত। যার স্লোগান মিষ্ট হলেও এর পুরোটাই ইসলাম ধ্বংসের উপাদানে ভরপুর। ২২০
প্রকৃতপক্ষে মডার্নিস্টদের এই তাজদিদি আন্দোলন রেনেসাঁর যুগে মার্টিন লুথারের রিফরমেশন আন্দোলন দ্বারা প্রভাবিত। ইউরোপের সংস্কার আন্দোলন ছিল একই সাথে রাজনৈতিক, বংশগত ও মতাদর্শ-কেন্দ্রিক দ্বন্দ্বের ফল। এর সাথে ছিল পোপতান্ত্রিক ব্যবস্থার নানা জুলুম, আধিপত্য ও অনৈতিকতার প্রভাব। যার সাথে ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বে সালাফে সালেহিনের স্বীকৃত অথরিটির কোনো মিল নেই। আমরা ইতঃপূর্বে বিষয়টি সুস্পষ্ট করে এসেছি। সুতরাং ইউরোপের খ্রিষ্টবাদের অভিজ্ঞতাকে মুসলিম বিশ্বে ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বে প্রয়োগ করা ভ্রান্তি ছাড়া কিছুই না। কারণ দুটো প্রেক্ষাপটের মাঝে পদ্ধতিগত, উৎসগত, রাজনৈতিক ও আদর্শিক চরম বৈপরীত্য বিদ্যমান।
টিকাঃ
২১৬. সুনানে আবি দাউদ, হাদিস নং ৪২৯১, সনদ সহিহ।
২১৭. ফায়জুল কাদির, ২/২৮১; আল মাকতাবাতুত তিজারিয়্যাহ আল কুবরা。
২১৮. আওনুল মাবুদ, ১১/৩৯১
২১৯. সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ২৬৩০; মাজমাউয যাওয়ায়িদ, ৭/২৭৮
২২০. এই আলোচনা শায়খ মাহমুদ আত তাহহান হাফিজাহুল্লাহ এর মাফহুমুত তাজদিদ বাইনাস ১) সুন্নাতিন নবাউইয়্যাহ ওয়া বাইনা আদইয়াইত তাজদিদিল মুআসিরিনা নামক গ্রন্থ থেকে অনুপ্রাণিত।
📄 চতুর্দশ সংশয় : বিজ্ঞান ও ফাহমুস সালাফ
আধুনিক অনেক মুসলিমকে আমরা বলতে শুনি যে, বর্তমান বিজ্ঞান অমুক কথা বলছে, যা সালাফদের মতের বিরোধী। এজন্য আমাদের নুসুসে শরিয়াহকে সালাফদের বুঝ বাদ দিয়ে বিজ্ঞানের আলোকে বুঝতে হবে। কারণ আগেকার যুগে বর্তমানের মতো বিজ্ঞানের উৎকর্ষ সাধিত হয়নি। যার ফলে সালাফরা এসব বিষয় বুঝতে পারেনি, কিংবা তাদের কাছে বিষয়গুলো বর্তমানের মতো স্পষ্ট হয়নি। এখন বিজ্ঞান এসে অনেক বিষয়ই আমাদের সামনে স্পষ্ট করে দিয়েছে।
নিরসন :
বিজ্ঞান শব্দটা অনেক ব্যাপক। এর বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা আছে। বিজ্ঞানের প্রধান দুটি শাখা হলো—'সামাজিক বিজ্ঞান' ও 'প্রাকৃতিক বিজ্ঞান'। প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের আবার অনেক শাখা আছে। এর মধ্যে পদার্থ, রসায়ন, মহাকাশ, চিকিৎসা, জীববিজ্ঞান অন্যতম।
এবার ইসলামের আলোকে আমরা বিজ্ঞানকে দুই ভাগে ভাগ করব। আর সেটা আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি হাদিসের ভিত্তিতে। হজরত রাফি ইবনে খাদিজ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় আগমন করে মদিনাবাসীদেরকে খেজুর গাছে পরাগায়ন (পরাগধানী থেকে পরাগ রেণু স্থানান্তরিত হয়ে ফুলের গর্ভমুণ্ডে পতিত হওয়াকে পরাগায়ন বলে) করতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা এটা কী করো? উত্তরে বলা হলো, আমরা এমন করে থাকি। তিনি বললেন, এমন না করলে হয়তো ভালো হবে। অতঃপর তারা এ কাজ ছেড়ে দিল। এতে খেজুরের ফলন ভালো হলো না। তারা এ সংবাদ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পৌঁছালে তিনি বললেন, 'আমি তো একজন মানুষ। যখন তোমাদের দীন সম্পর্কীয় কোনো বিষয়ে আদেশ করি, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পালন করবে। আর যখন আমার ব্যক্তিগত অভিমত হিসেবে কোনো কিছু বলি, তখন তা মান্য করা আবশ্যক নয়। কেননা আমি তো একজন মানুষ।' ২২১ অন্য এক রেওয়ায়েতে আছে তিনি বলেন, 'তোমরা তোমাদের দুনিয়াবি বিষয়ে খুব ভালো জানো।' ২২২
যে বিষয়গুলো শরয়ি ইলমের সাথে সম্পৃক্ত নয় এবং যে বিষয়ের ব্যাপারে ইসলামের সুস্পষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই, এগুলো পার্থিব বিষয়। যেমন আমরা কীভাবে চাষ করব, কীভাবে গাছ রোপন করব, পরিচর্যা করব এই বিষয়গুলো শরয়ি ইলমের সাথে সম্পৃক্ত নয়; বরং এই বিষয়গুলো মানুষের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের ওপর নির্ভরশীল। ফলে মানুষ নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের ফলে যে পদ্ধতি উত্তম মনে করবে, সেটাই অনুসরণ করবে। ২২০
কখন আমরা হাদিসটিকে বিজ্ঞানের ওপর প্রয়োগ করব। বিজ্ঞানের যে বিষয়গুলো শরিয়ি ইলমের সাথে সম্পৃক্ত, সেগুলোর ক্ষেত্রে নুসুসে শরিয়াহকে আমরা সালাফদের ফাহমের আলোকেই গ্রহণ করব। আর যে বিষয়গুলো ইসলামের আকায়েদ বা শরয়ি ইলমের সাথে সম্পৃক্ত নয়, সেগুলোর ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের সিদ্ধান্ত অনুসরণ করতে পারি। যেমন মহান আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে বলে দিয়েছেন, তিনি প্রকৃতির সৃষ্টিকর্তা, তিনিই প্রকৃতির সকল কিছু পরিচালনা করেন। কিন্তু তিনি কোন কোন প্রক্রিয়ায় এ সৃষ্টিজগত পরিচালনা করেন, সেটার বিস্তারিত বিবরণ আমাদের জানাননি। অনুরূপ সৌরজগৎ সম্পর্কেও বিস্তারিত বর্ণনা তিনি আমাদের দেননি।
তাই এই জায়গাগুলোতে বিজ্ঞানের এমন ব্যাখ্যা গ্রহণ করার অবকাশ আছে, যেগুলো নুসুসের বিরোধী নয়। অনুরূপ পদার্থ, রসায়ন, চিকিৎসা-বিজ্ঞানের প্রায় বিষয়ই হাদিসে বর্ণিত উমুরে দুনিয়ার (পার্থিব বিষয়) অন্তর্ভুক্ত। এই বিষয়গুলো মানুষের গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের ওপর নির্ভরশীল। ফলে বিজ্ঞানের এই দিকগুলোতে ইসলামি শরিয়াহর বিশেষ কোনো নির্দেশনা নেই। সকল কিছুর মালিক আল্লাহ, সকল জ্ঞান আল্লাহপ্রদত্ত, এই বিশ্বাস রেখে মানুষ এসব বিষয়ে নিজস্ব গবেষণা ও অনুসন্ধানের ভিত্তিতে যা উত্তম ও কার্যকর মনে করবে, তাই গ্রহণ করা অনুমোদিত হবে, যতক্ষণ তা ইসলামি শরিয়াতের অন্য কোনো বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক হবে না।
পক্ষান্তরে বিজ্ঞানে যেসব বিষয় শরয়ি ইলমের সাথে সম্পৃক্ত এবং যেগুলোর ব্যাপারে নুসুসে শরিয়ায় সুস্পষ্ট বর্ণনা আছে, সেগুলো আমাদেরকে সালাফদের ফাহম ও মানহাজ অনুযায়ীই গ্রহণ করতে হবে।
সমস্যাটা হলো আমরা এই বিভাজনকে মাথায় রাখি না। যার দরুন দেখা যায়, আমাদের কেউ কেউ ইসলামি জ্ঞানশাস্ত্রের স্বীকৃত ও গ্রহণযোগ্য অনেক বিষয়কে অবৈজ্ঞানিক কিংবা বিজ্ঞানবিরোধী বলে নুসুসে শরিয়াহর বিকৃত ব্যাখ্যার দাবি তোলে। উদাহরণস্বরূপ আধুনিক সমাজবিজ্ঞান বা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কথাই ধরা যাক। সমাজব্যবস্থা বা রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে নুসুসে শরিয়াহর স্বতন্ত্র ও মৌলিক নির্দেশনা ও প্রস্তাব আছে। এগুলো নিছক মানুষের আকল বা অভিজ্ঞতানির্ভর বিষয় নয়।
কিন্তু আজকে মুসলিমদের অনেকে পশ্চিমাসমাজ বা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোকে নুসুসে শরিয়াহর এমন ব্যাখ্যা করছে, যা সালাফে সালেহিন থেকে প্রমাণিত নয়; বরং এগুলো তাদের বুঝের বিরোধী। গণতন্ত্র, সেকুলারিজম ইত্যাদি ব্যবস্থাকে পরম মনে করে সালাফদের থেকে প্রাপ্ত নুসুসে শরিয়াহর মুতাওয়ারিস ফাহম ও মানহাজকে প্রত্যাখ্যান করছে এবং নুসুসে শরিয়াহর ভ্রান্ত তাবিলের (ব্যাখ্যার) আশ্রয় নিচ্ছে। যেমন ইসলামি শুরাব্যবস্থার কথা আমরা এখানে উদাহরণ হিসেবে আনতে পারি। সালাফে সালেহিন থেকে শুরু করে ইসলামের চৌদ্দশ বছরের ইতিহাসে যে ব্যাখ্যা আমরা জেনে আসছি তা হলো, আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদি২২৪ এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত পরিষদের ভিত্তিতে শাসক নিয়োগ ও দেশ পরিচালনাকে শুরায়ি নিজাম বলে; যে পরিষদ কুরআন-সুন্নাহকে দেশ পরিচালনার ভিত্তি হিসেবে মেনে নেয়। কিন্তু কেউ কেউ পশ্চিমা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে পরম মনে করে ইসলামের শুরাব্যবস্থার গণতান্ত্রিক ব্যাখ্যা প্রদান করছে, যা সালাফে সালেহিনের কারও থেকে প্রমাণিত নয়। অনুরূপ সেকুলারিজমকে ইসলামিকরণের জন্য সালাফে সালেহিনের ফাহমকে পরিত্যাগ করে নুসুসে শরিয়াহর নতুন নতুন ব্যাখ্যা প্রদান করছে। পশ্চিমা মুক্তচিন্তাকে পরম মনে করে, সালাফে সালেহিনের মতকে উপেক্ষা করে নুসুসে শরিয়াহর উদ্ভট ব্যাখ্যা প্রদান করছে। ২২৫
অনুরূপ বিবর্তনবাদের বিষয়টিও শরয়ি ইলমের সাথে সম্পৃক্ত। মানুষের সৃষ্টি সম্পর্কে নুসুসে শরিয়ায় আমরা সুস্পষ্ট বিবরণ পাই। মানুষের সৃষ্টিকেন্দ্রিক নুসুসে শরিয়াহর ফাহমে মুতাওয়ারিস আমরা সালাফদের থেকে পেয়েছি; কিন্তু বিজ্ঞান দ্বারা প্রভাবিত অনেক মুসলিম নুসুসে শরিয়াহকে পরম মনে করার পরিবর্তে বিবর্তনবাদকে প্রমাণিত হিসেবে বিশ্বাস করে নিয়েছে। আর সে বিশ্বাসের জায়গা থেকে নুসুসে শরিয়াহকে বিবর্তনবাদের সাথে মিলানোর জন্য নুসুসে শরিয়াহর এমন এমন উদ্ভট ব্যাখ্যা আবিষ্কার করছে, যা সালাফে সালেহিন থেকে প্রমাণিত নয়।
এই ভুলগুলো হচ্ছে বিজ্ঞানের উল্লিখিত বিভাজনটি না বোঝার কারণে। নুসুসের সূত্রে সালাফদের থেকে মুতাওয়ারিস যে ফাহম ও মানহাজ আমরা লাভ করেছি, সেগুলো নিছক মানুষের আকল কিংবা অভিজ্ঞতানির্ভর নয়। এই বিষয়গুলোতে আধুনিক বিজ্ঞান নুসুসে শরিয়াহ ও সালাফদের ফাহমের বিপরীতে গেলে কোনো প্রকার তাবিল ছাড়াই আমরা নুসুসে শরিয়াহ ও সালাফদের ফাহমের ওপর বিশ্বাস রাখব। কারণ মানুষের আকল, গবেষণা ও অভিজ্ঞতা পরম কোনো সত্য নয় এবং তা বিভিন্ন ধরনের প্রবণতা ও দুর্বলতা থেকেও মুক্ত নয়। ফলে শরয়ि ইলমের সাথে সম্পৃক্ত বিষয়গুলোর সাথে বিজ্ঞান সাংঘর্ষিক হলে আমরা বিশ্বাস করব, অপূর্ণ জ্ঞান ও নানা সীমাবদ্ধতার কারণে বিজ্ঞান প্রকৃত তত্ত্ব এখনো আবিষ্কার করতে পারেনি, কিংবা সেই পর্যন্ত পৌঁছতে পারেনি।
আর যেসব বিষয় শরয়ি ইলমের সাথে সম্পৃক্ত নয়, বরং উমুরে দুনিয়া তথা পার্থিব বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত, সেসব বিষয়ে মানুষের গবেষণা, অভিজ্ঞতা ও পর্যালোচনাই ধর্তব্য হবে। কারণ এই বিষয়গুলোকে উমুরে দুনিয়া হিসেবে ইসলাম আমাদের জ্ঞানের কাছে ছেড়ে দিয়েছে। যেমনটি হাদিস শরিফ থেকে আমরা জানতে পেরেছি।
এখানে প্রাসঙ্গিকভাবে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা যেতে পারে। বর্তমান অনেক মুসলিমই নুসুসে শরিয়াহর বিষয়বস্তুকে বুঝতে ভুল করছে। যার দরুন তারা খুবই নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলভাবে নুসুসে শরিয়ায় এমন বিষয় খোঁজে বা নুসুসে শরিয়াহ থেকে জোরপূর্বক এমন বিষয় প্রমাণ করতে চায়, যা এর বিষয়বস্তু না। যেমন কেউ কেউ কুরআন থেকে সমস্ত বৈজ্ঞানিক থিওরি ও আবিষ্কারকে প্রমাণ করতে চায়। আর এমন একটা হীনম্মন্যতায় ভোগে যে, যদি কুরআন থেকে এগুলো প্রমাণ না করা যায়, তাহলে কুরআন অসম্পূর্ণ বা ছোট হয়ে যাবে। এজন্য তারা একনিষ্ঠভাবে কুরআন থেকে বৈজ্ঞানিক থিওরি প্রমাণের জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করে যান। আর এটা করতে গিয়ে অধিকাংশ সময় কুরআনের আয়াতের অর্থ ও মর্মকে বিকৃত করে ফেলেন।
অথচ কুরআনের মূল বিষয়বস্তু সাইন্স নয়। যদিও মহান আল্লাহ তাআলা কুরআনের অনেক জায়গায় তাঁর রুবুবিয়াতের প্রমাণস্বরূপ সৃষ্টিগত ও প্রাকৃতিক কিছু বাস্তবতা শিক্ষণীয় হিসেবে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। এজন্য যদি কুরআনে (নুসুসে শরিয়ায়) বৈজ্ঞানিক কোনো বাস্তবতা পাওয়া যায়, তাহলে নিঃসন্দেহে আমাদেরকে সেটার ওপরই বিশ্বাস রাখতে হবে। কিন্তু বৈজ্ঞানিক কোনো থিওরি পূর্ব থেকেই মাথায় রেখে জোরপূর্বকভাবে কুরআন (নুসুসে শরিয়াহ) থেকে সেটা প্রমাণ করতে যাওয়া—চিকিৎসাশাস্ত্রের কিতাব থেকে আইন শাস্ত্রের বিষয় বের করার মতোই অহেতুক কাজ।
পবিত্র কুরআন তার মূল বিষয়বস্তু ও অবতরণের উদ্দেশ্যে কোনো অস্পষ্টতা রাখেনি। প্রায় ২০টির মতো আয়াতে কুরআন স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তাকে কেন নাজিল করা হয়েছে? উদাহরণস্বরূপ নিম্নে বর্ণিত কিছু আয়াতের দিকে আমরা মনোনিবেশ করতে পারি। সুরা মায়েদার ১৫-১৬ নং আয়াতে ইরশাদ হয়েছে,
يَأَهْلَ الْكِتُبِ قَدْ جَاءَكُمْ رَسُولُنَا يُبَيِّنُ لَكُمْ كَثِيرًا مِّمَّا كُنْتُمْ تُخْفُونَ مِنَ الْكِتُبِ وَيَعْفُوا عَنْ كَثِيرٍ قَدْ جَاءَكُمْ مِّنَ اللَّهِ نُورٌ وَكِتَبٌ مُّبِينٌ. يَهْدِي بِهِ اللَّهُ مَنِ اتَّبَعَ رِضْوَانَهُ سُبُلَ السَّلْمِ وَيُخْرِجُهُمْ مِّنَ الظُّلُمَتِ إِلَى النُّوْرِ بِإِذْنِهِ وَيَهْدِيهِمْ إِلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ.
'হে কিতাবিগণ! তোমাদের নিকট আমার (এই) রাসুল এসেছে, যে (তাওরাত ও ইনজিল) গ্রন্থের এমন বহু কথা তোমাদের কাছে প্রকাশ করে, যা তোমরা গোপন করো এবং অনেক বিষয় (তোমাদের থেকে) এড়িয়ে যায়। আল্লাহর পক্ষ হতে তোমাদের কাছে এক জ্যোতি এবং এমন এক কিতাব এসেছে, যা সত্যকে সুস্পষ্ট করে। যার মাধ্যমে আল্লাহ তাদেরকে শান্তির পথ দেখান, যারা তাঁর সন্তুষ্টি অনুসন্ধান করে; এবং তাদেরকে অন্ধকার থেকে বের করে আলোর দিকে নিয়ে আসেন ও দিশা দেন সরল পথের।'
সুরা মায়েদারই ১৯ নং আয়াতে ইরশাদ হয়েছে,
يَأَهْلَ الْكِتُبِ قَدْ جَاءَكُمْ رَسُوْلُنَا يُبَيِّنُ لَكُمْ عَلَى فَتْرَةٍ مِّنَ الرُّسُلِ أَنْ تَقُولُوا مَا جَاءَنَا مِنْ بَشِيرٍ وَلَا نَذِيرٍ فَقَدْ جَاءَكُمْ بَشِيرٌ وَ نَذِيرٌ وَ اللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ.
'হে কিতাবিগণ! তোমাদের নিকট এমন এক সময়ে আমার রাসুল দীনের ব্যাখ্যা দানের জন্য এসেছে, যখন রাসুলগণের আগমন-ধারা বন্ধ ছিল, যাতে তোমরা বলতে না পারো, আমাদের কাছে (জান্নাতের) কোনো সুসংবাদদাতা ও (জাহান্নাম সম্পর্কে) সতর্ককারী আসেনি। এবার তোমাদের কাছে একজন সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী এসে গেছে। আল্লাহ সর্ববিষয়ে পরিপূর্ণ ক্ষমতাবান।'
একই সুরার ৪৮ নং আয়াতে ইরশাদ হয়েছে,
وَ أَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتٰبَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ الْكِتٰبِ وَ مُهَيْمِنًا عَلَيْهِ فَاحْكُمْ بَيْنَهُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ وَلَا تَتَّبِعُ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ لِكُلِّ جَعَلْنَا مِنْكُمْ شِرْعَةً وَ مِنْهَاجًا وَلَوْ شَاءَ اللَّهُ لَجَعَلَكُمْ أُمَّةً وَاحِدَةً وَ لكِنْ لِيَبْلُوَكُمْ فِي مَا اتْكُمْ فَاسْتَبِقُوا الْخَيْرَاتِ إِلَى اللَّهِ مَرْجِعُكُمْ جَمِيعًا فَيُنَبِّئُكُمْ بِمَا كُنْتُمْ فِيْهِ تَخْتَلِفُوْنَ.
'এবং (হে রাসুল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম!) আমি তোমার প্রতিও সত্য সংবলিত কিতাব নাজিল করেছি, তার পূর্বের কিতাবসমূহের সমর্থক ও সংরক্ষকরূপে। সুতরাং তাদের মধ্যে সেই বিধান অনুসারেই বিচার করো, যা আল্লাহ নাজিল করেছেন। আর তোমার নিকট যে সত্য এসেছে, তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করো না। তোমাদের মধ্যে প্রত্যেক (উম্মত)-এর জন্য আমি এক (পৃথক) শরিয়াত ও পথ নির্ধারণ করেছি। আল্লাহ চাইলে তোমাদের সকলকে একই উম্মত বানিয়ে দিতেন। কিন্তু (পৃথক শরিয়াত এজন্য দিয়েছেন) যাঁতে তিনি তোমাদেরকে যা-কিছু দিয়েছেন, তা দ্বারা তোমাদের পরীক্ষা করতে পারেন। সুতরাং তোমরা সৎকর্মে প্রতিযোগিতা করো। তোমাদের সকলকে আল্লাহরই দিকে ফিরে যেতে হবে। অতঃপর যে বিষয়ে তোমরা মতভেদ করছিলে সে সম্পর্কে তিনি তোমাদের অবিহত করবেন।'
সুরা আনআমের ৫৫ নং আয়াতে ইরশাদ হয়েছে,
وَكَذَلِكَ نُفَصِّلُ الْأُيْتِ وَلِتَسْتَبِينَ سَبِيْلُ الْمُجْرِمِينَ.
‘এভাবেই আমি নিদর্শনাবলি বিশদভাবে বর্ণনা করি (যাতে সরল পথও স্পষ্ট হয়ে যায়) এবং এতে অপরাধীদের পথও পরিষ্কার হয়ে যায়।'
সুরা সিজদাহর ১-৩ নং আয়াতে ইরশাদ হয়েছে,
اﻟﻢ . ﺗَﻨْﺰِﻳْﻞُ اﻟْﻜِﺘٰﺐِ ﻟﺎَ رَﻳْﺐَ ﻓِﻴْﻪِ ﻣِﻦْ ﺭَّﺏِّ اﻟْﻌٰﻠَﻤِﻴْﻦَ . ﺃَﻡْ ﻳَﻘُﻮْﻟُﻮْﻥَ ﺍﻓْﺘَﺮٰﻩُ ﺑَﻞْ ﻫُﻮَ اﻟْﺤَﻖُّ ﻣِﻦْ ﺭَّﺑِّﻚَ ﻟِﺘُﻨْﺬِﺭَ ﻗَﻮْﻣًﺎ ﻣَّﺎ ﺃَﺗٰﻬُﻢْ ﻣِّﻦْ ﻧَّﺬِﻳْﺮٍ ﻣِّﻦْ ﻗَﺒْﻠِﻚَ ﻟَﻌَﻠَّﻬُﻢْ ﻳَﻬْﺘَﺪُﻭْﻥَ.
'আলিফ-লাম-মীম। রাব্বুল আলামিনের পক্ষ হতে এটি এমন এক কিতাব নাজিল করা হচ্ছে, যাতে কোনো সন্দেহপূর্ণ কথা নেই। লোকে কি বলে নবি নিজে এটা রচনা করে নিয়েছে? না, (হে নবি!) এটা তো সত্য, যা তোমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে এসেছে, যাতে তুমি এর মাধ্যমে সতর্ক করো এমন এক সম্প্রদায়কে, যাদের কাছে তোমার আগে কোনো সতর্ককারী আসেনি, যাতে তারা সঠিক পথে এসে যায়।'
এখানে মাত্র কয়েকটি আয়াত আমরা তুলে ধরলাম। এরকম আরও আয়াত পবিত্র কুরআনে আছে; যেগুলো নিয়ে চিন্তা করলে বোঝা যায়, কুরআনে কারিমের মূল উদ্দেশ্য হলো, মানুষকে আল্লাহ তাআলার তাওহিদের শিক্ষা দেওয়া, পরকালের জন্য প্রস্তুত করা এবং দুনিয়ার জীবনকে আল্লাহর সন্তুষ্টি মোতাবেক পরিচালনা করার জন্য গাইডলাইন দেওয়া। এর সাথে প্রাসঙ্গিকভাবে যেসব ঐতিহাসিক ঘটনা ও প্রাকৃতিক বাস্তবতা আল্লাহ তাআলা তুলে ধরেছেন, সেগুলোও উল্লেখিত উদ্দেশ্যকে শক্তিশালী ও বাস্তবায়নের জন্যই। এজন্য কুরআনে কোনো ঘটনা কিংবা বৈজ্ঞানিক থিওরি পাওয়া না গেলে, সেটা দোষের কিছু না, হীনম্মন্যতায় ভোগারও কোনো বিষয় না। কারণ কুরআন কখনো নিজেকে বিজ্ঞানের গ্রন্থ বলে দাবি করেনি। এটা তার উদ্দেশ্যও না।
কুরআন তার বিষয়বস্তুর বিবেচনায় সামাজিক বিজ্ঞানের সাথে সম্পর্কিত। এজন্য ইসলাম আমাদেরকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মৌলিক দিকনির্দেশনা দিয়েছে। যেন আমাদের পুরো জীবন আল্লাহর সন্তুষ্টি মোতাবেক পরিচালিত হয়। কিন্তু বিষয়বস্তুর বিবেচনায় কুরআন প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের সাথে সংশ্লিষ্ট না; বরং এই দিকটিকে উমুরে দুনিয়া তথা পার্থিব বিষয় হিসেবে কুরআন মানুষের অনুসন্ধান ও গবেষণার ওপর ছেড়ে দিয়েছে। শর্ত হলো, এই গবেষণার উদ্দেশ্য হতে হবে মানুষের উপকার সাধন ও আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন। তবে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার যে বিষয়গুলো প্রাসঙ্গিকভাবে নুসুসে শরিয়ায় এসেছে, সেগুলোতে নিঃসন্দেহে আমাদের বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে, যদিও আধুনিক বিজ্ঞান সেগুলোর বিরুদ্ধে যায়।
এ ক্ষেত্রে আমরা মনে করব, বিজ্ঞান তার সীমাবদ্ধতার কারণে প্রকৃত বাস্তবতায় পৌঁছতে পারেনি, কিংবা মন্দ কোনো প্রবণতার শিকার হওয়ার ফলে তার গবেষণা পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে গেছে। আর প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের যে বিষয় সুস্পষ্টভাবে কুরআনে বর্ণিত নেই, সেগুলোকে জোর করে, আনএকাডেমিক পদ্ধতিতে, নসের অর্থ ও প্রেক্ষাপটকে ভেঙেচুরে প্রমাণ করতে যাওয়া ভ্রান্তি ছাড়া কিছুই না। এটা নিঃসন্দেহে নুসুসে শরিয়াহর বিকৃতি। আমরা এরকম ভয়াবহ একটা উদাহরণ এখানে তুলে ধরছি। যখন বিজ্ঞানের এই থিওরি সামনে এল যে, দুনিয়া স্থির নয় বরং ঘূর্ণায়মান, তখন এটাকে কুরআন থেকে প্রমাণ করার জন্য নিম্নের আয়াতটি ব্যবহার করা হলো-
وَ تَرَى الْجِبَالَ تَحْسَبُهَا جَامِدَةً وَهِيَ تَمُرُّ مَرَّ السَّحَابِ صُنْعَ اللَّهِ الَّذِي أَثْقَنَ كُلَّ شَيْءٍ إِنَّهُ خَبِيرٌ بِمَا تَفْعَلُوْنَ .
'আর যখন তোমরা পাহাড়কে দেখবে তখন মনে হবে সেটা স্থির হয়ে আছে। অথচ তা মেঘের মতো চলতে থাকবে।'
এই আয়াতে 'পাহাড় মেঘের মতো চলতে থাকবে' এর অর্থ 'পাহাড় মেঘের মতো চলে' অর্থ করে তারা দাবি করল যে, দুনিয়ার ঘূর্ণমানের থিওরি কুরআন দ্বারাও প্রমাণিত। অথচ এটা মোটেও আয়াতের বিষয়বস্তু না। আয়াতে মোটেও দুনিয়া স্থির না ঘূর্ণায়মান-এ ব্যাপারে কথা বলা হয়নি। আয়াতের কন্টেক্সট (পূর্বাপর) থেকে সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায়, এখানে কিয়ামতের অবস্থা বর্ণনা করা হচ্ছে। কিয়ামত এতই ভয়াবহ হবে যে, আমরা এতদিন যে পাহাড়গুলোকে স্থির দেখে আসছি, সেদিন এ পাহাড়গুলো আকাশে মেঘের মতো উড়তে থাকবে। এটাই উল্লিখিত আয়াতের প্রেক্ষাপট। কিন্তু কুরআন দিয়ে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের সকল থিওরি প্রমাণ করার ভূত মাথায় থাকার কারণে আয়াতের এই প্রেক্ষাপট ও প্রকৃত মর্মকে চুরমার করে দেওয়া হয়েছে। এরকম আরও অসংখ্য দৃষ্টান্ত আছে। যেখানে কুরআন থেকে বৈজ্ঞানিক থিওরি প্রমাণ করতে গিয়ে এভাবেই আয়াতের মর্মের বিকৃতি সাধন করা হয়েছে।
মোটকথা কুরআনে কারিম পদার্থ বিজ্ঞানের গ্রন্থ নয় এবং পার্থিব উন্নতি অর্জন তার বিষয়বস্তুও নয়। কারণ এই বিষয়গুলো মানুষ নিজের চিন্তাভাবনা, গবেষণা, অভিজ্ঞতার মাধ্যমে উদঘাটন করতে পারবে। এজন্য আল্লাহ তাআলা এই বিষয়গুলো মানুষের মেধা ও পরিশ্রমের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। আর যে বিষয়গুলো নিছক মানুষের আক্কলের ওপর নির্ভরশীল হতে পারে না, বরং সেখানে ওহীর কোনো বিকল্প নেই এবং ওহীর দ্বারস্থ হতে হয়, সেগুলোকে নুসুসে শরীয়াহর বিষয়বস্তু বানিয়েছেন। সুতরাং আমাদেরকে ওপরে উল্লেখিত বিভাজনটি বুঝে নুসুসে শরীয়াহ ও বিজ্ঞানের প্রতিটি দিককে স্ব স্ব স্থানে রেখে বিচার করতে হবে। লাগামহীনভাবে বিজ্ঞানকে ইসলামের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর কিংবা লাগামহীনভাবে বিজ্ঞানের সকল কিছুকে ইসলামি বানানোর প্রচেষ্টা—উভয় প্রান্তিকতা থেকেই বেঁচে থাকতে হবে। সর্বোপরি নুসুসে শরীয়াহকে বিজ্ঞানের আলোকে নয়, সালাফে সালেহিনের ফাহম ও মানহাজ অনুযায়ীই বুঝতে হবে।
টিকাঃ
২২১. সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৬০৮৩
২২২. সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২৩৬৩
২২৩. এখানে একটি বিষয় জানিয়ে রাখতে চাচ্ছি যে, পশ্চিমা চিন্তাধারায় প্রভাবিত কিছু লোক উল্লিখিত হাদিস দেখিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা, বিচারকার্য, লেনদেন, আচার-ব্যবহারকে পার্থিব বিষয় হিসেবে সাব্যস্ত করতে চায় এবং এই সংক্রান্ত যত হাদিস আছে, সেগুলোকে অপালনীয় হিসেবে দাবি করতে চায়। অর্থাৎ তারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আইনি অথরিটিকে কেবল আকায়েদ ও বক্তিগত ইবাদাতের ভেতর সীমাবদ্ধ করতে চায়। মূলত সেকুলারিজমকে যারা ইসলামি প্রমাণ করতে ব্যস্ত, তারাই এই হাদিসটিকে এভাবে সামনে আনে। কারণ রাষ্ট্র পরিচালনা, বিচারকার্য, লেনদেন ইত্যাদি থেকে সুন্নাতে নববির অথরিটিকে পৃথক করতে পারলে খুব সহজেই পশ্চিমা সেকুলারিজমের সাথে ইসলামকে মিলানো যায়। অথচ হাদিসের মর্ম মোটেও এমন নয়। হাদিসের বক্তব্য ও আগে পরের প্রেক্ষাপট থেকে সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, এটি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কোনো আদেশ বা নিষেধ ছিল না। কেবল তিনি ধারণা করে বলেছিলেন। ফলে এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে আকায়েদ ও ব্যক্তিগত ইবাদাতের বাইরে মানবজীবনের বাকি ক্ষেত্রগুলোর সাথে সংশ্লিষ্ট রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সকল হাদিসকে অপালনীয় দাবি করা বিভ্রান্তি ছাড়া কিছুই না। এই বক্তব্য সেসব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে, যে ব্যাপারে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুস্পষ্ট কোনো আদেশ বা নিষেধ দেননি। যেসব ক্ষেত্রে নুসুসে শরিয়াহ বিশেষ নির্দিষ্ট মূলনীতি প্রণয়ন করেছে, কিংবা স্পষ্ট কোনো বিধান জারি করেছে, সেগুলো হাদিসে বর্ণিত দুনিয়াবি বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত নয়। আল্লামা তাকি উসমানি হাফিজাহুল্লাহ তার হুজ্জিয়তে হাদিস গ্রন্থে এই সমস্ত লোকদেরকে ইনকারে হাদিসের একটি ক্যাটাগরিতে ফেলেছেন। আল্লামা আশরাফ আলি থানবি রহিমাহুল্লাহও তার বিখ্যাত আল ইন্তিবাহাতুল মুফিদাহ গ্রন্থে এই সমস্ত লোকদের নিন্দা করেছেন।
২২৪. আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদি হচ্ছেন, আলিম-উলামা, মর্যাদাবান ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গ, বিভিন্ন বাহিনীর প্রধানগণ, সমাজের নেতাগণ ও বড় ব্যবসায়ীগণ। নারী, চুক্তিবদ্ধ কাফের ও দাসরা যতই মহৎ গুণের অধিকারী হোক না কেন, তারা কখনো আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদির অন্তর্ভুক্ত হবে না। (ইমাম নববির মুগনিল মুহতাজ, ৪/১৩০; ইমাম বাহুতির কাশশাফুল কিনা, ৬/১৫৯)।
২২৫. এর চাক্ষুষ প্রমাণসহ সঠিক ব্যাখ্যা জানতে ইসলাম ও মুক্তচিন্তা বইটি দেখা যেতে পারে। লেখক মাওলানা আফসারুদ্দীন হাফিজাহুল্লাহ।