📘 ফাহমুস সালাফ > 📄 একাদশ সংশয় : মাকাসিদে শরিয়াহ ও ফাহমুস সালাফ

📄 একাদশ সংশয় : মাকাসিদে শরিয়াহ ও ফাহমুস সালাফ


সালাফদের মুতাওয়ারিস ফাহম ও মানহাজকে পরিত্যাগ করার ক্ষেত্রে অনেকেই ফিকহের ইজতিহাদি কিছু মূলনীতির আশ্রয় নেন। যেমন মাকাসিদে শরিয়াহ ও মাসলাহাতকে সাইনবোর্ড হিসেবে ব্যবহার করে শরিয়াতের স্বতসিদ্ধ, প্রসিদ্ধ ও প্রতিষ্ঠিত ব্যাখ্যাকে পরিবর্তন করার দাবি তোলেন। আমরা এখন এই দুটি বিষয়ের সংশয় নিয়ে আলোচনা করব।
সংশয় : এ যুগের নামধারী কিছু আলেমরা বলে বেড়ায় যে, মাকাসিদ হলো মূল। ইসলাম এসেছেই মাকাসিদে শরিয়াহ বাস্তবায়নের জন্য। সুতরাং মাকাসিদে শরিয়াহর আলোকে সালাফদের সিদ্ধান্তগুলো আমাদের পুনর্বিবেচনা করতে হবে এবং উম্মাহর কল্যাণের দিকে লক্ষ রেখে আমাদেরকে বর্তমান যুগের সাথে মানানসই ফিকহ আবিষ্কার করতে হবে।
নিরসন :
ইসলামি শরিয়াহর উসুলের দুটি দিক আছে। একটি মৌলিক দিক, অপরটি ইজতিহাদি দিক। মৌলিক উসুলগুলো হলো—কুরআন, সুন্নাহ ও উম্মাহর ইজমা। আর ইজতিহাদি দিক হলো—কিয়াস, মাকাসিদে শরিয়াহ, মাসলাহাত ইত্যাদি। যে বিধানগুলো মৌলিক উসুল দ্বারা প্রমাণিত হয়ে আছে, সেখানে ইজতিহাদি মূলনীতি দিয়ে কোনো প্রকার পরিবর্তন ও বিকৃতি সাধন করা যাবে না।
এর থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, মাকাসিদে শরিয়াহ কোথায় কার্যকর হবে। কালের আবর্তনে যখন নতুন কোনো বিষয় আমাদের সামনে আসে এবং কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমার কোনো বক্তব্য পাওয়া না যায়, তখন নতুন আপতিত বিষয়ের ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছার জন্য কিয়াস ও মাকাসিদের আলোকে গবেষণা করতে হয়। এটা হলো মাকাসিদে শরিয়াহর কর্মসীমা। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, আধুনিক কিছু স্কলার ও মুসলিম মাকাসিদে শরিয়াহর দোহাই দিয়ে ইসলামি শরিয়াহর মানসুস (নস দ্বারা প্রমাণিত), মুসতামবাত (উম্মাহর মুজতাহিদে কেরামের গবেষণা দ্বারা উন্মোচিত) ও স্বীকৃত অনেক মাসায়েলে পরিবর্তন সাধন করছে।
শরিয়াতের মাকাসিদ হলো উবুদিয়্যাত, তথা আল্লাহ তাআলার হুকুম পালনের মাধ্যমে তাঁর ইবাদত করা। যে ব্যক্তি আল্লাহর হুকুম পালনের মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদাতে নিয়োজিত থাকে, সে মাকাসিদে শরিয়াহ পুরোপুরি অর্জন করতে সক্ষম। উবুদিয়্যাত ব্যতীত কেবলই মাসলাহাত মাকাসিদের শরিয়াহর উদ্দেশ্য নয়। তথাপি আলেমগণ জাগতিক দিক থেকে ইসলামি শরিয়াহর মৌলিক পাঁচটি মাকসাদ বর্ণনা করেছেন-
১. দীনের সংরক্ষণ
২. জীবনের নিরাপত্তা
৩. মানসম্মানের হেফাজত
৪. বিবেক-বুদ্ধির সুরক্ষা
৫. সহায় সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণ
ইসলামি শরিয়াহর প্রতিটি বিধানের পেছনে এই মাকসাদগুলো সংরক্ষিত হয়। যদি শরিয়াহর বিধানগুলো বাস্তবায়িত হয়, তবে মৌলিকভাবে এই মাকসাদগুলোও পাওয়া যাবে। আর যদি শরিয়াহর বিধান বাস্তবায়িত না হয়, তাহলে এই মাকসাদগুলোও পাওয়া যাবে না। এটাই হলো মাকাসিদের পেছনে প্রকৃত দৃষ্টিভঙ্গি।
কিন্তু আমাদের আধুনিকমনা ভাইয়েরা শরিয়াহর মানসুস ও স্বীকৃত বিষয়গুলোর এদিকে মনোযোগ দেওয়ার পরিবর্তে মাকসাদগুলো সামনে রেখে ইসলামি শরিয়াহর স্বীকৃত বিধান পরিবর্তন করার জন্য উঠে পড়ে লেগে যান। আল্লামা তাকি উসমানি হাফিজাহুল্লাহর ভাষায় তাদের যুক্তি হলো, 'নসগুলো মূলত এ সকল মাকাসিদ অর্জনের জন্যেই এসেছে। ফলে যখন আহকামসমূহের আপাত ফলাফল মাকাসিদের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ হবে, তখন আমরা বাহ্যিক নসের ওপর আমল না করে উল্লিখিত মাকসাদগুলো অর্জনের চেষ্টা করব।' এ ধরনের যুক্তি-কাঠামো মূলত পুরো শরিয়াতকেই নাকচ করে দেয় এবং অনুমাননির্ভর ও আপেক্ষিক মাকাসিদের ভিত্তিতে আবদিয়্যাতের রশ্মিকেই নিভিয়ে দেয়।
সত্য কথা হচ্ছে, আল্লাহ তাআলা আমাদের জন্য দীনের যেসব বিধিবিধান দান করেছেন, তা কোনো না কোনো উপকারী লক্ষ্য-উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই দিয়েছেন। তিনি কোনো ক্ষতিকর বা উপকারহীন অপ্রয়োজনীয় বিধান আমাদের দেননি। কিন্তু মাকাসিদ ও মাসালিহ কথাগুলো খুবই আপেক্ষিক। একজন মানুষ যেটাকে মাসলাহাত (কল্যাণকর) মনে করছে, অন্যজন সেটাকে নিজের জন্য মাসলাহাত ও মাকসাদ নাও মনে করতে পারে। এজন্য ওহির সূত্র ছাড়া মানবীয় আকল এমন কোনো সার্বজনীন মানদণ্ডে পৌঁছতে পারবে না, যেটা দিয়ে মাকাসিদ ও মাসালিহ চিহ্নিত করা যাবে।
তা ছাড়া শরিয়াহর মাধ্যমে চিহ্নিত মাকসাদগুলোও চিরন্তন ও শাশ্বত না। এগুলোর কিছু নির্দিষ্ট সীমা ও নীতিমালা আছে। উদাহরণস্বরূপ প্রাণ রক্ষার কথাই ধরা যাক। নিশ্চয় এটা শরিয়াহর গুরুত্বপূর্ণ মাকাসিদের অংশ। কিন্তু একজন খুনি জীবন রক্ষার ক্ষেত্রে মাকাসিদের কথা বলে তার জীবন ভিক্ষা পাবে না। এ কথা সকল মাকাসিদে শরিয়াহর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এখন মৌলিক প্রশ্ন হচ্ছে, এ সকল মাকাসিদ নির্ধারণ কে করবে? এবং সে অনুযায়ী প্রায়োগিক শর্ত ও সীমাগুলো কে নির্ধারণ করবে?
আমরা যদি এই নির্ধারণ-ক্ষমতাকে কেবল মানবীয় আকলের ওপর ন্যস্ত করে দিই, তাহলে বড় বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। শরিয়াত অনেক ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট বিধান প্রদান করেছে, যা কেবল যৌক্তিকতা দিয়ে বোঝা সম্ভব না। যদি মানবীয় প্রজ্ঞা এ সকল বিষয় সঠিকভাবে বুঝতে সক্ষম হতো, তাহলে রাসুল ও ওহি প্রেরণের কোনো দরকার ছিল না। সত্য হচ্ছে কুরআন-সুন্নাহকে এড়িয়ে এ সকল মাকাসিদ নির্ধারণের কোনো উপায় নেই। তাই কোনোভাবেই এসব আপেক্ষিক ও এক মাকাসিদকে আমরা কোনো পরিচ্ছন্ন আহকামের ওপর প্রাধান্য দিতে পারি না, চাই সেই আহকাম কুরআন থেকে আহরিত হোক অথবা সুন্নাহ থেকে। আমাদের এই অধিকার নেই যে, আমরা এ সকল মাকাসিদ ও মাসালিহকে শরিয়াহর মৌলিক উৎস হিসেবে গ্রহণ করব এবং এগুলোর ভিত্তিতে শরিয়াহর নুসুসকে ছুঁড়ে ফেলব।১৯৫
মাকাসিদে শরিয়াহর ওপর আলোচনা ও পর্যালোনাকারী কিছু মহলের দৃশ্য হলো এমন যে, তারা যেকোনো প্রকার মুনাসাবাতের কারণেই কোনো বিষয়কে মাকাসিদ সাব্যস্ত করে বসে এবং এর বিপরীত প্রমানিত শত মাসআলা ও বিধানে সংস্কারের শোরগোল শুরু করে দেয়। উদাহরণস্বরূপ, কুরআন-সুন্নাহতে কোনো বিষয়ের হুকুম দেওয়া হয়েছে, কিংবা কোনো বিষয় থেকে নিষেধ করা হয়েছে। আর উক্ত বিষয়ে ঘটনাক্রমে কোনো বাহ্যিক কল্যাণকর অথবা ক্ষতিকর দিক রয়েছে। এখন উক্ত কল্যাণকে অর্জন কিংবা উক্ত ক্ষতি থেকে নিরাপদ থাকাকে মাকসাদ বানিয়ে এর ভিত্তিতে সমাধান ও সংস্কারের কাজ শুরু করে দেওয়া হচ্ছে।
সাধারণত দেখা যায়, মাকাসিদে শরিয়াহর নামে এখানে কেবল গাইরে মানসুস (সুস্পষ্ট নস দ্বারা প্রমাণিত নয়) মাসায়েলেই বিধান জারি করা হচ্ছে না; বরং মানসুস (সুস্পষ্ট নস দ্বারা প্রমাণিত) মাসায়েলকেও বলির পাঠা বানানো হচ্ছে। যেখানেই কোনো মাসআলা উক্ত ধারণাকৃত মাকসাদের বিপরীত মনে হচ্ছে, সেখানেই পরিবর্তন বা সংস্কারের আওয়াজ তোলা হচ্ছে। চাই সেই মাসআলা মানসুস অথবা মুত্তাফাক আলাইহি (সর্বসম্মত) হোক না কেন?
উদাহরণস্বরূপ, শান্তি, নিরাপত্তা সংক্রান্ত নুসুসগুলো দেখে ধরে নেওয়া হলো— শান্তি, নিরাপত্তা ও মানবতার মাঝে স্বাধীনতা ও সমতা বজায় রাখা মাকসাদে শরিয়াহ। এখন মুরতাদ হত্যার বিধান, জিহাদের বিধান, জিম্মির বিধান, কাফেরদের সাথে আন্তরিক ভালোবাসা ও সম্পর্কের নিষেধাজ্ঞা, পুরুষের তুলনায় মহিলাদের সাক্ষী, দিয়্যাত ও মিরাসের অংশ কম হওয়া ইত্যাদি মাসআলা যেহেতু উক্ত ধারণাপ্রসূত মাকসাদের মানদণ্ডে পরিপূর্ণ উত্তীর্ণ হয় না, এজন্য এখন উক্ত মাকসাদের সীমা নির্ধারণ ও তাতে পুনর্বিবেচনা না করার পরিবর্তে মানসুস মাসায়েলকেই পরিবর্তন করতে শুরু করে। এর জন্য তাবিল ও তাহরিফের নতুন নতুন এমন পন্থা বের করা হয়, যেন কোনোভাবেই এই মাসআলা ধারণাপ্রসূত মাকসাদের বিরুদ্ধে না যায়। ১৯৬
অথচ মাকাসিদের ইমামদের উসুল হলো, মাকাসিদের ভিত্তিতে উসুল তো দূরের বিষয়, কোনো শাখাগত বিধানকেও বাতিল বা পরিবর্তন করা যাবে না; বরং তা আলাদা মূলনীতির আলোকে নিয়ে আসতে হবে। ইমাম শাতেবি রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'যে ব্যক্তি শরিয়াতের মৌলিক বিষয় উপেক্ষা করে শাখাগত বিষয় গ্রহণ করবে, সে যেমন ভুল কাজ করবে; তেমনিভাবে যে ব্যক্তি শাখাগত বিষয় বর্জন করে কেবলই মৌলিক বিষয়গুলো আমলে নেবে, সেও ভুল কাজ করবে।'১৯৭
তিনি আরও বলেন, 'সর্বোচ্চ অনুসন্ধানের পর যখন কোনো একটি সাধারণ মূলনীতি প্রতিষ্ঠিত হয়, অতঃপর শরিয়াতের অন্য কোনো নসের বিধান কোনোভাবে সে মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক হয়, তখন উভয়টির মধ্যে সমন্বয় সাধন করা আবশ্যক। কারণ শরিয়াহ প্রবর্তক সাধারণ মূলনীতিসমূহের প্রতি সচেতন থেকেই শাখাগত এই বিধান প্রদান করেছেন।'১৯৮
শুধু তাই নয়, যদি সাধারণ মূলনীতি আর শাখাগত বিধানে সমন্বয় সাধন সম্ভব না হয়, তাহলে শাখাগত বিধানকে বাতিলকে করা যাবে না; বরং তখন সেই শাখাগত বিধানই স্বতন্ত্র মূলনীতির স্থান লাভ করবে। ১৯৯
যেমন আধুনিক কিছু স্কলার মুরতাদের হদকে অস্বীকার করেন এই যুক্তিতে যে, এই বিধান শাখাগত একটি বিধান। যা শরিয়াহর মৌলিক মাকাসিদ তথা রহমত, কারও ওপর দীনের ব্যাপারে জোরাজুরি করা যাবে না—এ ধরনের মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক হচ্ছে। সুতরাং মাকাসিদের আলোকে এই বিধান প্রত্যাখ্যান করতে হবে। এমনিভাবে কেউ কেউ সদাচারকে শরিয়াহর একটি মাকসাদ বানিয়ে অমুসলিমদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছাপ্রদান হারাম হওয়ার ইজমাকে ছুড়ে ফেলে দিচ্ছে। একই যুক্তি জিযিয়ার ক্ষেত্রেও দেখানো হচ্ছে। অথচ এই বিধানগুলো শরিয়াহর পৃথক নস ও মূলনীতি দ্বারা প্রমাণিত। আর নিয়ম হলো, প্রমাণিত কোনো বিধানকে মাকাসিদের দোহাই দিয়ে পরিবর্তন করা যাবে না।
মূলত মাসালিহ ও মাকাসিদ কিতাবুল্লাহ ও সুন্নাহ থেকেই আহরিত হবে। তাই আল্লাহ এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেটিকে কল্যাণ বলেছেন, সেটিই একমাত্র কল্যাণ হিসেবে বিবেচিত হবে। নিজেদের ইচ্ছা ও প্রবৃত্তির খাহেশ অনুযায়ী কল্যাণ নির্ধারিত হবে না। মাকাসিদুশ শরিয়াহ বিষয়ক সকল আলেম, যেমন ইমাম শাতেবি, ইমাম গাজালি, শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি রহিমাহুমুল্লাহ প্রমুখ সকলেই একমত যে, কোনো হুকুম নির্ভর করে তার নিজস্ব ইল্লতের (কারণের) ওপর, নিছক হিকমত বা প্রজ্ঞার ওপর নয়। তারা এ ব্যাপারেও একমত যে, যেসব মাকাসিদ নুসুসের সাথে সাংঘর্ষিক, সেগুলো কুরআনিক পরিভাষায় কেবল খাহেশাত ছাড়া আর কিছুই না।২০০
মাকাসিদ বর্ণনাকারীদের অগ্রদূত আল্লামা শাতেবি রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'শরিয়াহ এসেছে মানুষকে তাদের প্রবৃত্তির দাসত্ব থেকে মুক্ত করে আল্লাহর প্রকৃত গোলামে পরিণত করার জন্য। এই মূলনীতি যখন প্রতিষ্ঠিত তখন এ কথা বলা যায় না- শরিয়াহ সর্বদা মানুষের খাহেশাতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে এবং তাৎক্ষণিকভাবেই বিধানগুলি তাদের জন্য উপকারী হবে। আল্লাহ পাক সত্যিই বলেছেন, 'যদি হক তাদের খাহেশাতের অনুসরণ করত, তাহলে আকাশ ও পৃথিবী এবং তার মাঝে যা আছে সবকিছুতে নৈরাজ্য সৃষ্টি হতো।'২০১
তিনি আরও বলেন, 'যে মাকাসিদ শরিয়াহর সাধারণ কোনো মূলনীতি বা কোনো বিধানকে আঘাত করে, সেটা প্রকৃতপক্ষে গ্রহণযোগ্য কোনো মাকাসিদের পর্যায়ে পড়ে না।'২০২
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'আল্লাহ পাক যে বিধান দিয়েছেন, সেটা উপেক্ষা করে যদি কোনো ব্যক্তি নিজ খেয়াল-খুশিমতো কোনো কিছুকে ন্যায় ও সঠিক মনে করে এবং সে অনুযায়ী মানুষের মাঝে ফায়সালা করাকে বৈধ বলে বিশ্বাস করে, তাহলে সে কাফের হয়ে যাবে।২০০
অনেক আলেমই শরিয়াহর বিধানসমূহের উপকারিতা (মাসালিহ) এবং তার উদ্দেশ্য (মাকাসিদ) নিয়ে কিতাব রচনা করেছেন। তাদের এসব আলোচনার উদ্দেশ্য কখনো এটি ছিল না যে, শরিয়াহর বিধানগুলো কেবল এসব উপকারিতা ও উদ্দেশ্যের মাঝে সীমাবদ্ধ, কিংবা এসব উপকারিতা অর্জন হওয়াই শরিয়াতের মূল লক্ষ্য, শরয়ি নসের কোনো ধর্তব্য নেই। প্রকৃতপক্ষে তাদের বক্তব্যের উদ্দেশ্য ছিল এ কথা বোঝানো যে, শরিয়াহর এমন কোনো বিধান নেই, যা দীন অথবা দুনিয়ার উপকারিতা থেকে শূন্য। পাশাপাশি যেসকল ক্ষেত্রে শরয়ি নস (ট্যাক্সট) অনুপস্থিত ও যেসকল বিষয় মুবাহ পর্যায়ের, সে ক্ষেত্রে এ সকল মাসালিহ (কল্যাণ) ও মাকাসিদের প্রতি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টি রাখা। তবে কোন বিষয়টা মাসলাহাত, তা নির্ণয় করবে একমাত্র শরিয়াহ ও তার নসসমূহ। কোনো মানুষের অধিকার নেই যে, সে নিজের যৌক্তিকতাবোধ ও খেয়ালখুশির ভিত্তিতে মাসলাহাত নির্ধারণ করবে। কারণ এসব মাকাসিদ (যেমন জীবন, সম্পদ ও সম্মান রক্ষার মূলনীতি) চূড়ান্ত না বা সকল ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য না; বরং মূল কথা হলো ইমাম শাতেবি রহিমাহুল্লাহ যা বলেছেন। তিনি বলেছেন, 'উপকার ও ক্ষতি চিরন্তন না; বরং আপেক্ষিক। এ ক্ষেত্রে আপেক্ষিকতার অর্থ হচ্ছে, ভিন্ন ভিন্ন স্থান-কাল-পাত্রের জন্য উপকার ও ক্ষতি ভিন্ন ভিন্ন।'২০৪
শাহ ওয়ালিউল্লাহ রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'যেভাবে কোনো সুন্নাহর ওপর ইজমা হয়ে গেলে তাঁর ওপর আমল ওয়াজিব হয়ে যায়, ঠিক সেভাবে কোনো বিষয়ে আদেশ বা নিষেধ জারি করে এমন ওহিই সেই আদেশ-নিষেধের ওপর আনুগত্য বাধ্যতামূলক হওয়ার জন্য মহাগুরুত্বপূর্ণ কারণ হয়ে যায়। এর ভিত্তিতেই (আল্লাহর) অনুগতদের পুরস্কৃত করা হবে, অবাধ্যদের লাঞ্ছিত করা হবে। সুন্নাহ এটিও আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক করে যে, যখন কোনো হুকুম নুসুসের দ্বারা প্রমাণিত হয় এবং বর্ণনার সনদও বিশুদ্ধতার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয়ে যায়, তখন আমলের ক্ষেত্রে এ সকল মাকাসিদের ওপর নির্ভর করা আমাদের জন্য আর বৈধ থাকে না।'২০৫
আল্লামা শাহ ওয়ালি উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভি রহিমাহুল্লাহ তাঁর মূল্যবান গ্রন্থ মুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ-তে শরয়ি আহকামের যোসার ব্যাখ্যা ও কল্যাণের কথা উল্লেখ করেছেন, সেগুলোও সর্বোচ্চ রহস্য ও হিকমাত হিসেবে এনেছেন যার ওপরে কখনো শরয়ি হুকুমের ভিত্তি রাখা যায় না। ফাদেলা তারি সমাকামী আলেমরা এবং তাঁর পরবর্তী মুসতানিদ আহলে ইলমগণও এই কিতাবকে শালা উক্ত দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখেছেন এবং গ্রহণ করেছেন। এমনকি তার নিকটস্থ সন্তান, নাতি, প্রিয়জন ও ছাত্রদের কর্মপদ্ধতি এমনই ছিল। তাদের কাছে শাররি আহকামের মাকাসিদ ও নানাবিধ কল্যাণের ভাণ্ডার ছিল। কিন্তু আমল, ফতোয়া ও সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তারা সর্বদা উসুলবিদ ও ফুকাহায়ে কেরামের মূলনীতিসমূহের অনুসরণ করেছেন এবং মাকাসিদে শরিয়াহর নামে মানসুস ও মুত্তাফাক আলাইছি মাসআলায় কখনো সংস্কার ও পরিবর্তনের দুঃসাহস দেখাননি। বিশেষত শাহ ওয়ালি উল্লাহর সুযোগ্য সন্তান সিরাজুল হিন্দ শাহ আবদুল আজিজ বহিমাহুল্লাহ, যাঁকে আল্লাহ তাআলা অসংখ্য গুণাবলি আর বিশেষত্ব দিয়ে ধন্য করেছেন, তাঁর কর্মপদ্ধতিও অনুরূপ ছিল। তাঁর ফতোয়া ও লেখাসমূহ থেকে খুব সহজেই বিষয়টি বোঝা যায়।
সুতরাং মাকাসিদে শরিয়াহর আলোকে কখনোই শরিয়াহর মানসুস, ফকিহদের মুসতামবাত ও স্বীকৃত বিধানকে পরিবর্তন, পরিবর্ধন বা ছুড়ে ফেলা যায় না। মাসলাহাতের দোহাই দিয়ে আমাদের সালাফদের ফিকহের ভাণ্ডারকে পশ্চিমা সভ্যতা দ্বারা প্রভাবিত সমাজের সাথে মিলানোর জন্য কাটছাট করা শরিয়াহকে বিকৃত করার নামান্তর।
ইসলামি শরিয়াহর মাকাসিদ ও কল্যাণের ব্যাপারে সালাফদের চেয়ে বেশি কেউ অবগত ছিলেন না। যখন কেউ মাকাসিদ ও মাসালিহের দোহাই দিয়ে সালাফদের ফিকহি সিদ্ধান্তকে ছুড়ে ফেলে, কিংবা শরিয়াহর উদ্দেশ্যের সাথে সাংঘর্ষিক হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করে, তখন সে মূলত সালাফদের ওপর অজ্ঞতার অপবাদ দিচ্ছে; যা থেকে তারা মুক্ত।
সালাফদের বক্তব্যসমূহ মাকাসিদে শরিয়াহকে যথার্থভাবে অনুসরণ করার মাধ্যম। কারণ ইসলামি শরিয়াহ সম্পর্কে তারাই ছিলেন সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী। এবং শরিয়াহর বিধানসমূহের ব্যাপারে তারাই ছিলেন গভীর বুঝের অধিকারী।২০৭ নিঃসন্দেহে সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ি ও তাবে-তাবেয়িদের মতো সালাফে সালেহিনরাই কুরআন, তার ইলম ও তার ভেতর গচ্ছিত রহস্যের ব্যাপারে অধিক জ্ঞানী ছিলেন।২০৮

টিকাঃ
১৯৫. উসুলুল ইফতা লি মুহাম্মাদ তাকি উসমানি, পৃষ্ঠা ২৪৫-২৪৮, মাকতাবাতুল আফকার থেকে প্রকাশিত নুসখা।
১৯৬. মুফতি উবায়দুর রহমান পাকিস্তানিকৃত 'মাকাসিদে শরিয়ত কী আহমিয়্যাত আওর উস কে হুদুদ ওয়া জাওয়াবেত' নামক উর্দু মাকালা থেকে গৃহীত।
১৯৭. আল মুত্তাফাকাত, ৩/৮
১৯৮. আল মুওয়াফাকাত, ৯/৩
২০০. উসুলুল ইফতা লি মুহাম্মাদ তাকি উসমানি, পৃষ্ঠা ২৪৭
২০১. আল মুওয়াফাকাত, ২/৬২
২০২. আল মুওয়াফাকাত, ২/৫৫৬
২০৩. মিনহাজুস সুন্নাতিন নাবাওইয়্যাহ, ৫/১৩০
২০৪. উসুলুল ইফতা লি মুহাম্মাদ তাকি উসমানি, পৃষ্ঠা ২৪৫
২০৫. হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ, পৃষ্ঠা ৩২-৩৩
২০৬. মুফতি উবায়দুর রহমান পাকিস্তানিকৃত 'মাকাসিদে শরিয়ত কর্মী অ্যাইমিয়্যাত আওর উস কে হলুদ ওয়া জাওয়াবেত' নামক উর্দু মাকালা থেকে গৃহীত।
২০৭. মাকাসিদুশ শরিয়াতিল ইসলামিয়্যাহ ওয়া আলাকাতুহা বিল আদিল্লাতিশ শারইয়্যাহ লিল ইউবি, পৃষ্ঠা ৬০১
২০৮. আল মুওয়াফাকাত, ২/৩৮৯

📘 ফাহমুস সালাফ > 📄 দ্বাদশ সংশয় : বিচ্ছিন্ন মত ও ফাহমুস সালাফ

📄 দ্বাদশ সংশয় : বিচ্ছিন্ন মত ও ফাহমুস সালাফ


বিচ্ছিন্ন মতও তো সালাফদের কারও বক্তব্য। এটাও তো সালাফদের ফাহমেরই অন্তর্ভুক্ত। ফলে এই মতের অনুসরণের মাধ্যমে তো আমরা সালাফদেরই অনুসরণ করছি!
নিরসন :
সালাফদের ফাহম ও মানহাজ থেকে বিচ্যুত হওয়ার জনপ্রিয় একটি মাধ্যম হলো— সালাফদের কারও কারও বিচ্ছিন্ন মতসমূহের অনুসরণ করা এবং স্বীকৃত মতকে প্রত্যাখ্যান করা। এ ক্ষেত্রে তাদের সুবিধাজনক বক্তব্য হলো উল্লেখিত সংশয়।
শুজুজ বা বিচ্ছিন্ন মতের অনুসরণ এমনই একটি ভ্রান্ত পদ্ধতি, যার মাধ্যমে ব্যক্তি বুঝতেও পারে না যে, সে সালাফদের মানহাজ ও ফাহম থেকে দূরে সরে গেছে।
বর্তমান জমানায় অনেক স্বীকৃত হারাম বিষয়কে বৈধ বানানোর পেছনে এই পদ্ধতি বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। কারণ এই পদ্ধতির মাধ্যমে খুব সহজেই সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করা যায়। মানুষ নির্দিষ্ট কোনো সালাফের বিচ্ছিন্ন মত দেখে খুব সহজেই বিভ্রান্ত হয়ে যায় এবং সে ভাবতে থাকে যে, এটি ইসলামি ইতিহাসে একটি স্বীকৃত মতবিরোধপূর্ণ বিষয়, যার পেছনে বাহ্যত দলিল আছে। সুতরাং এর অনুসরণ করতে সমস্যা নেই।
ইসলামি ফিকহের সকল ইমামের বিরুদ্ধে গিয়ে শরিয়াতের প্রতিষ্ঠিত ও মীমাংসিত কোনো মাসআলার বিরুদ্ধে যে মতামত দেওয়া হয়, সেটাকেই শুজুজ বা বিচ্ছিন্ন মতামত বলে। প্রায় ইমামেরই এ ধরনের বিচ্ছিন্ন মত থাকে। ইমামরা শরিয়াহ নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে দুয়েক জায়গায় হোঁচট খেতে পারেন। এতে তারা মুজতাহিদ ও গবেষক হিসেবে সওয়াব পাবেন। কিন্তু কোনো কোনো ইমামের এমন বিচ্ছিন্ন মতকে তার সমকালীন অন্য ইমামরা চিহ্নিত করে দিয়েছেন এবং তারা উম্মতকে একটি মীমাংসায় পৌঁছে দিয়েছেন। অর্থাৎ এই মতগুলো ফিকহি তুরাসে প্রত্যাখ্যাত ও অগ্রহণযোগ্য হিসেবেই গণ্য হয়ে আসছে।
প্রত্যেক যুগেই কিছু মানুষ প্রবৃত্তির তাড়নায় কিংবা ভিন্ন কোনো সভ্যতায় প্রভাবিত হয়ে ফিকহি তুরাস থেকে বেছে বেছে শুজুজ মতসমূহের চর্চা বিস্তার করার চেষ্টা করেছে। যেন ইসলামের সাইনবোর্ডে প্রবৃত্তির অনুসরণ করা যায় কিংবা ভিন্ন সভ্যতার সাথে ইসলামের নামে তাল মিলানো যায়। এই পদ্ধতি একজন মানুষকে কোনো প্রকার সংকোচবোধ ছাড়াই পাপে লিপ্ত করে এবং তাকে ভ্রষ্টতার চরম সীমায় নিয়ে নিক্ষেপ করে। এজন্য আমাদের সালাফরা শুজুজ মতসমূহের অনুসরণ করার ব্যাপারে উম্মাহকে সতর্ক করেছেন এবং এর কঠোর নিন্দা করে গেছেন।
ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, 'আলেমদের জাল্লাত অনুসরণকারীদের জন্য দুর্ভোগ।'২০৯
সুলাইম আত তাইমি রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'তুমি যদি প্রত্যেক আলেমের রুখসতসমূহ বেছে বেছে গ্রহণ করো, তাহলে তোমার ভেতর সকল মন্দ একত্রিত হবে।'২১০
ইমাম আওযায়ি রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'যে ব্যক্তি আলেমদের বিচ্ছিন্ন মতগুলো বেছে বেছে গ্রহণ করবে, সে ইসলাম থেকে বেরিয়ে যাবে।' এজন্যই কাজি ইসমাইল বিন ইসহাক রহিমাহুল্লাহ এ ধরনের ব্যক্তিকে যিনদিক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহিমাহুল্লাহ ফাসেক বলেছেন। ২
ইবনে আবদুল বার, ইবনে হাযম, আবুল ওয়ালিদ বাজি রহিমাহুমুল্লাহ-সহ প্রমুখ ইমামরা এই ব্যাপারে ইজমার কথা উল্লেখ করেছেন।'২০
কাজি ইসমাইল বিন ইসহাক রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'আমি মুতাদিদের দরবারে প্রবেশ করলাম। সে আমাকে একটি কিতাব দিল। আমি কিতাবটিতে নজর বুলিয়ে দেখলাম যে, এটাতে আলেমদের সকল বিচ্ছিন্ন মত একত্রিত করা হয়েছে এবং সাথে সেসব দলিলও উল্লেখ করা হয়েছে, যেগুলো ইমামরা তাদের বিচ্ছিন্ন মতের পক্ষে বর্ণনা করেছেন। তখন আমি বললাম, হে আমিরুল মুমিনিন! এই গ্রন্থের লেখক একজন যিন্দিক। মুতাদিদ বলল, কেন, তার এই হাদিসগুলো কি সহিহ নয়? আমি বললাম, এই হাদিসগুলো সহিহ, কিন্তু যে আলেম নেশা সৃষ্টিকারী নাবিজের বৈধতা দিয়েছেন, তিনি মুতা বিবাহের অনুমোদন দেননি। আবার যিনি মুতা বিবাহের বৈধতা দিয়েছেন, তিনি গানবাদ্য ও নাবিজের বৈধতা দেননি। প্রত্যেক আলেমেরই কিছু জাল্লাত ও বিচ্যুতি থাকে। যে ব্যক্তি আলেমদের এই জাল্লাতগুলো একত্রিত করবে, অতঃপর সেগুলো পালন করতে থাকবে, তার দীন ধ্বংস হয়ে যাবে। এরপর মুতাদিদের নির্দেশে এই কিতাব পুড়িয়ে ফেলা হয়।'২১৪
সুতরাং ইমামদের বক্তব্য ও কোনো হাদিসের রেফারেন্স দেখেই বিভ্রান্ত হওয়ার সুযোগ নেই। বর্তমানে আমরা দেখছি, গানবাদ্য, ফ্রি-মিক্সিং ইত্যাদি বিষয়ে বিচ্ছিন্ন মতের আশ্রয় নিয়ে কেউ কেউ বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন। এগুলোর পক্ষে পূর্ববর্তী কোনো আলেমের বক্তব্য পাওয়া গেলেও ইসলামি ফিকহের তুরাসে এই মতগুলো বিচ্ছিন্ন ও প্রত্যাখ্যাত হিসেবেই বিবেচিত হয়ে আসছে। এজন্য দেখা যায়, আইম্মা ও ফুকাহায়ে কেরাম গানবাদ্য, ফ্রি-মিক্সিং ইত্যাদি বিষয়ের অবৈধতা বর্ণনা করতে গিয়ে ইজমার দাবি করেছেন। এগুলোর বৈধতার পক্ষে যে কারও মত আছে সেগুলো তারা জানতেন না-ব্যাপারটা কিন্তু এমন নয়। তারা ঠিকই জানতেন, কিন্তু এই মতগুলো গ্রহণযোগ্য ও বৈধ ইখতিলাফ বা মতবিরোধ হিসেবে গণ্য হয়নি ইসলামি ফিকহের তুরাসে। ফলে কারও কারও বৈধতার মত দেখে বিভ্রান্ত হয়ে এই কথা বলা যাবে না যে, এগুলো হারাম হওয়ার ওপর ইজমার দাবি সঠিক নয়। কারণ বিচ্ছিন্ন মত কখনো ইজমাকে বাতিল করতে পারে না। ইজমাকে বাতিল করার জন্য বৈধ ইখতিলাফ বা এমন কোনো মত প্রয়োজন, যেটা ইসলামি ফিকহের তুরাসে গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
বর্তমানে সালাফদের ফাহম ও মানহাজ থেকে সরে আসার সবচেয়ে কৌশলী ও ভয়াবহ একটি পদ্ধতি হলো, রুখসত ও জাল্লাতের অনুসরণ। বিচ্ছিন্ন মতের অনুসরণের ক্ষেত্রে বাহ্যত সালাফদের ফাহমের অনুসরণ মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে এটি সালাফদের ফাহমকে পরিত্যাগ করার নামান্তর।

টিকাঃ
২০৯. মাদখালুস সুনান লিল বাইহাকি, ৬৮৭
২১০. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৬/১৯৮
২১১. আস সুনানুল কুবরা লিল বাইহাকি, ২০৭০৭
২১২. আল ইনসাফ লিল মারদাওয়ি, ১২/৫০
২১৩. জামিউ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাদলিহি, ২/৯১, মারাতিবুল ইজমা লি ইবনি হাজম, ৮৭, আরও দেখুন : আল মুওয়াফাকাত লিশ শাতেবি, ৪/১৩৪
২১৪. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ১৩/৪৬৫; আস সুনানুল কুবরা লিল বাইহাকি, ২০৭১০
২১৫. মিউজিক অবৈধতার ব্যাপারে জানতে দেখুন: ইসলাম আওর মুসিকি, লেখক মুফতি মুহাম্মাদ শফি রহিমাহুল্লাহ। এ বিষয়ে বাংলাগ্রন্থ: পিচ্ছিল পাথর, ইজ মিউজিক হালাল?। ফ্রি-মিক্সিংয়ের অবৈধতার ব্যাপারে জানতে পড়ুন: আল ইখতিলাত তাহরির ওয়া তাকরির ও তাকিব, লেখক শায়খ আবদুল আজিজ আত তারেফি। বইটি ফ্রি-মিক্সিং ও ইসলাম নামে বাংলায় অনূদিতও হয়েছিল।

📘 ফাহমুস সালাফ > 📄 ত্রয়োদশ সংশয় : সংস্কার ও ফাহমুস সালাফ

📄 ত্রয়োদশ সংশয় : সংস্কার ও ফাহমুস সালাফ


রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ يَبْعَثُ لِهَذِهِ الأُمَّةِ عَلَى رَأْسِ كُلِّ مِائَةِ سَنَةٍ مَن يُجَدِّدُ لَهَا دِينَهَا .
'প্রত্যেক শতকে মহান আল্লাহ তাআলা এই উম্মতের জন্য একজন মুজাদ্দিদ পাঠাবেন। যিনি উম্মতের সামনে এই দীনকে নবায়ন বা সংস্কার করবেন।'২১৬
এই হাদিসের আলোকে বোঝা যায়, মুসলিম উম্মাহর জন্য পূর্ববর্তীদের ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়; বরং প্রত্যেক শতকে মুসলিম উম্মাহর চিন্তাকে নবায়ন করতে হবে। আজকে মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় সংকট হলো, তারা তাজদিদকে ছেড়ে দিয়েছে। পূর্ববর্তীদের স্থবির ফিকহকে তারা বর্তমানে প্রয়োগ করতে চাচ্ছে। ইসলামকে বর্তমান যুগে বিজয়ী ও গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য সংস্কারের মনোভাব নিয়ে, নুসুসে শরিয়াহ নিয়ে যুগের আলোকে নতুন করে ভাবতে হবে।
নিরসন :
প্রথমত, যারা এই আপত্তি করেন, তারা হাদিসে বর্ণিত তাজদিদের মর্মই বোঝেননি। উল্লিখিত হাদিসে তাজদিদ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, সময়ের পরিবর্তনে মুসলিমদের ভেতর দীন ও আমল সম্পর্কে উদাসীনতা তৈরি হয়। তারা তখন এই দীনের আমল ও তাকে বাস্তবায়ন করার দায়িত্ব থেকে দূরে চলে আসতে থাকে। দীনের নামে বিভিন্ন ভ্রান্ত ব্যক্তি ও গোষ্ঠী ইসলামি শরিয়াহকে বিকৃত করতে থাকে এবং এর সাথে বিভিন্ন ভ্রান্ত বিষয়কে যুক্ত করতে থাকে। এই পরিস্থিতিতে মহান আল্লাহ তাআলা মুসলিমদের মধ্যে কোনো মুজাদ্দিদ পাঠান। যিনি এই দীনকে আবার তার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেবেন। দীনের মাঝে সৃষ্ট নতুন বিষয় ও তাহরিফকে দূর করবেন। উম্মাহকে আবার দীনের ওপর নিয়ে আসবেন। ইসলাম পালনের জন্য তাদেরকে আবার জাগিয়ে তুলবেন। এটাই হলো তাজদিদের মর্ম।
আল্লামা আলকামি রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'তাজদিদের অর্থ হলো কুরআন-সুন্নাহ ও তার চাহিদা অনুযায়ী যে আমল মানুষ থেকে হারিয়ে গেছে, সেটাকে পুনরুজ্জীবিত করা। আল্লামা মুনাভি রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'হাদিসে দীন নবায়ন করার দ্বারা বোঝানো হয়েছে মুজাদ্দিদ সুন্নাত থেকে বিদআতকে সুস্পষ্ট করে দেবেন, মানুষের ভেতর ইলম বৃদ্ধি করবেন, আহলে ইলমের সাহায্য করবেন এবং আহলে বিদআতকে পরাজিত ও অপদস্থ করবেন।'২ ১৭
মোল্লা আলি কারি রহিমাহুল্লাহও তার বিখ্যাত মিরকাতুল মাফাতিহ গ্রন্থে একই ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। সুনানে আবু দাউদের বিখ্যাত শরাহগ্রন্থ আওনুল মাবুদে আল্লামা শামসুল হক আযিমাবাদি রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'তাজদিদ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, কুরআন-সুন্নাহর যে আমল ও চাহিদা প্রায় বিলুপ্ত হয়েছে, তাকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং বিদআত ও নব্য উদ্ভাবিত ভ্রান্ত বিষয় নির্মূল করা।'
মুজাদ্দিদের প্রধান কিছু বৈশিষ্ট্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'মুজাদ্দিদকে অবশ্যই দীনের সার্বিক ইলমের অধিকারী হতে হবে। সুন্নাতের সহায়তাকারী ও বিদআত নির্মুলকারী হতে হবে এবং তার জমানার লোকদের সম্পর্কে অবগত থাকতে হবে।'২ ১৮
অন্যান্য হাদিস থেকেও তাজদিদের উল্লিখিত ব্যাখ্যার সমর্থন পাওয়া যায়। যেমন এক হাদিসে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গুরাবাদের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন, 'ইসলামের সূচনা হয়েছে অপরিচিত অবস্থায়। এটি আবার সে অবস্থায় ফিরে যাবে, যেভাবে তার সূচনা হয়েছিল। তাই অপরিচিতদের জন্য সুসংবাদ। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ! তারা. কারা? তিনি বললেন, যখন মানুষের অবস্থা মন্দ হয়ে যাবে তখন যারা তা সংশোধনের কাজ করবে।’২১৯
উল্লিখিত প্রতিটি বর্ণনা থেকেই স্পষ্ট, কুরআন-সুন্নাহর আলোকে তাজদিদ হলো, মুসলিমদের অধঃপতনের সময় তাদেরকে কুরআন-সুন্নাহর ওপর উঠিয়ে আনা এবং মুসলিমদের খুলাফায়ে রাশেদিন তথা সালাফদের প্রথম যুগের আদর্শের দিকে ফিরিয়ে নেওয়া।
সুতরাং তাজদিদ দ্বারা কখনোই এটা উদ্দেশ্য নয় যে, সালাফদের ফাহম ও মানহাজ ছেড়ে প্রত্যেক জমানার লোকেরা যার যার মতো শরিয়াহকে পরিবর্তন করবে। প্রত্যেক যুগে যুগে নুসুসে শরিয়াহর নতুন নতুন ব্যাখ্যা আবিষ্কার করবে। এইভাবে তো আল্লাহর শরিয়াহ মানুষের হাতে খেলনার পাত্রে পরিণত হবে। যে যার মতো দীনের বিধানকে ব্যাখ্যা করবে। এভাবে আল্লাহর দীন পরিবর্তন হতে হতে একপর্যায়ে হারিয়ে যাবে।
মূলত যারা তাজদিদ, সংস্কার ইত্যাদির নামে আল্লাহর দীনকে পরিবর্তন করতে চায়, তাদের হাত থেকে শরিয়াহকে রক্ষা করার জন্যই মহান আল্লাহ তাআলা যুগে যুগে মুজাদ্দিদ পাঠিয়ে থাকেন। মুজাদ্দিদের কাজ হলো, শ্রেষ্ঠ প্রজন্মের মুসলিমরা যেভাবে এই দীন বুঝেছেন এবং আমল করেছেন, উম্মাহকে সেভাবে পুনরুজ্জীবিত করা। যারা যুগের ভ্রান্ত চিন্তা ও কাফেরদের বিজয়ী সভ্যতায় প্রভাবিত হয়ে যুগকে পরিবর্তন করার পরিবর্তে ইসলামকেই পরিবর্তন করতে চায়, তাদের অপচেষ্টা রুখে দেওয়া। উম্মতকে এ ধরনের ভ্রান্ত অপচেষ্টার ব্যাপারে সচেতন করা।
সুতরাং সালাফদের ফাহম ও মানহাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করা কিংবা সেগুলো থেকে উম্মাহকে বিমুখ করা প্রকৃত মুজাদ্দিদের কাজ নয়। উমর ইবনে আবদুল আজিজ রহিমাহুল্লাহকে ফুকাহায়ে কেরাম মুজাদ্দিদ হিসেবে গণ্য করেন। তিনি কখনো সাহাবায়ে কেরাম ও তার পূর্বে গত হওয়া তাবেয়ি আলেমদ্রের ফাহম ও মানহাজের ওপর আক্রমণ করেননি; বরং তিনি তাদের পথকে হেদায়াতের জন্য জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন।
এমনিভাবে আমাদের নিকট অতীতের স্বীকৃত মুজাদ্দিদ হলেন আহমাদ সিরহিন্দি। রহিমাহুল্লাহ; যাকে আমরা মুজাদ্দিদে আলফে সানি নামে চিনি। তার তাজদিদি কর্মের দিকে দৃষ্টি দিলে আমরা দেখতে পাই, তিনি সমাজ থেকে বিদআত নির্মূল করেছেন। মুসলিমদের ভেতর যেসব শিরকি বিশ্বাস জন্ম নিয়েছিল, তিনি সেগুলো থেকে তাদেরকে ফিরিয়ে এনেছেন। বাদশা আকবারের দীনে ইলাহির প্রভাবে যখন ইসলামি শরিয়ায় বিকৃতি সাধনের আশঙ্কা দেখা দেয়, তিনি তখন দীনে ইলাহির বিরুদ্ধে বিপ্লবী দাওয়াহ পরিচালনা করেন। কিন্তু দীনে ইলাহির প্রভাবে তিনি সালাফদের ফাহম ও মানহাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করেননি; বরং সালাফদের আদর্শে উজ্জিবীত হয়েছেন। তাদের ফাহম ও মানহাজের আলোকে সমাজকে পরিবর্তন করেছেন। ইসলামি ইতিহাসে সমস্ত মুজাদ্দিদের কাজের নমুনা এর ব্যতিক্রম ছিল না।
বর্তমানে তাজদিদের নামে ইসলামি শরিয়াহর মুতাওয়ারিস উসুল ও ফুরুয়ের ওপর যে নৈরাজ্য করা হচ্ছে, তার সাথে হাদিসে বর্ণিত তাজদিদের কোনো সম্পর্ক নেই। বিকৃত এই তাজিদিদি কর্ম ইসলামকে পুনরুজ্জীবিত করার পরিবর্তে ইসলামি শরিয়াহকে ধ্বংস করবে, ফুনুনে শরিয়াহর ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দেবে। আর মুসলিমদেরকে কুরআন-সুন্নাহমুখী করার পরিবর্তে বিভ্রান্ত করবে, ইসলাম- বিরোধী সভ্যতার অনুগত বানাবে। এজন্য কথিত এই তাজদিদের দাওয়াত এক ভয়াবহ দাওয়াত। যার স্লোগান মিষ্ট হলেও এর পুরোটাই ইসলাম ধ্বংসের উপাদানে ভরপুর। ২২০
প্রকৃতপক্ষে মডার্নিস্টদের এই তাজদিদি আন্দোলন রেনেসাঁর যুগে মার্টিন লুথারের রিফরমেশন আন্দোলন দ্বারা প্রভাবিত। ইউরোপের সংস্কার আন্দোলন ছিল একই সাথে রাজনৈতিক, বংশগত ও মতাদর্শ-কেন্দ্রিক দ্বন্দ্বের ফল। এর সাথে ছিল পোপতান্ত্রিক ব্যবস্থার নানা জুলুম, আধিপত্য ও অনৈতিকতার প্রভাব। যার সাথে ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বে সালাফে সালেহিনের স্বীকৃত অথরিটির কোনো মিল নেই। আমরা ইতঃপূর্বে বিষয়টি সুস্পষ্ট করে এসেছি। সুতরাং ইউরোপের খ্রিষ্টবাদের অভিজ্ঞতাকে মুসলিম বিশ্বে ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বে প্রয়োগ করা ভ্রান্তি ছাড়া কিছুই না। কারণ দুটো প্রেক্ষাপটের মাঝে পদ্ধতিগত, উৎসগত, রাজনৈতিক ও আদর্শিক চরম বৈপরীত্য বিদ্যমান।

টিকাঃ
২১৬. সুনানে আবি দাউদ, হাদিস নং ৪২৯১, সনদ সহিহ।
২১৭. ফায়জুল কাদির, ২/২৮১; আল মাকতাবাতুত তিজারিয়‍্যাহ আল কুবরা。
২১৮. আওনুল মাবুদ, ১১/৩৯১
২১৯. সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ২৬৩০; মাজমাউয যাওয়ায়িদ, ৭/২৭৮
২২০. এই আলোচনা শায়খ মাহমুদ আত তাহহান হাফিজাহুল্লাহ এর মাফহুমুত তাজদিদ বাইনাস ১) সুন্নাতিন নবাউইয়্যাহ ওয়া বাইনা আদইয়াইত তাজদিদিল মুআসিরিনা নামক গ্রন্থ থেকে অনুপ্রাণিত।

📘 ফাহমুস সালাফ > 📄 চতুর্দশ সংশয় : বিজ্ঞান ও ফাহমুস সালাফ

📄 চতুর্দশ সংশয় : বিজ্ঞান ও ফাহমুস সালাফ


আধুনিক অনেক মুসলিমকে আমরা বলতে শুনি যে, বর্তমান বিজ্ঞান অমুক কথা বলছে, যা সালাফদের মতের বিরোধী। এজন্য আমাদের নুসুসে শরিয়াহকে সালাফদের বুঝ বাদ দিয়ে বিজ্ঞানের আলোকে বুঝতে হবে। কারণ আগেকার যুগে বর্তমানের মতো বিজ্ঞানের উৎকর্ষ সাধিত হয়নি। যার ফলে সালাফরা এসব বিষয় বুঝতে পারেনি, কিংবা তাদের কাছে বিষয়গুলো বর্তমানের মতো স্পষ্ট হয়নি। এখন বিজ্ঞান এসে অনেক বিষয়ই আমাদের সামনে স্পষ্ট করে দিয়েছে।
নিরসন :
বিজ্ঞান শব্দটা অনেক ব্যাপক। এর বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা আছে। বিজ্ঞানের প্রধান দুটি শাখা হলো—'সামাজিক বিজ্ঞান' ও 'প্রাকৃতিক বিজ্ঞান'। প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের আবার অনেক শাখা আছে। এর মধ্যে পদার্থ, রসায়ন, মহাকাশ, চিকিৎসা, জীববিজ্ঞান অন্যতম।
এবার ইসলামের আলোকে আমরা বিজ্ঞানকে দুই ভাগে ভাগ করব। আর সেটা আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি হাদিসের ভিত্তিতে। হজরত রাফি ইবনে খাদিজ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় আগমন করে মদিনাবাসীদেরকে খেজুর গাছে পরাগায়ন (পরাগধানী থেকে পরাগ রেণু স্থানান্তরিত হয়ে ফুলের গর্ভমুণ্ডে পতিত হওয়াকে পরাগায়ন বলে) করতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা এটা কী করো? উত্তরে বলা হলো, আমরা এমন করে থাকি। তিনি বললেন, এমন না করলে হয়তো ভালো হবে। অতঃপর তারা এ কাজ ছেড়ে দিল। এতে খেজুরের ফলন ভালো হলো না। তারা এ সংবাদ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পৌঁছালে তিনি বললেন, 'আমি তো একজন মানুষ। যখন তোমাদের দীন সম্পর্কীয় কোনো বিষয়ে আদেশ করি, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পালন করবে। আর যখন আমার ব্যক্তিগত অভিমত হিসেবে কোনো কিছু বলি, তখন তা মান্য করা আবশ্যক নয়। কেননা আমি তো একজন মানুষ।' ২২১ অন্য এক রেওয়ায়েতে আছে তিনি বলেন, 'তোমরা তোমাদের দুনিয়াবি বিষয়ে খুব ভালো জানো।' ২২২
যে বিষয়গুলো শরয়ি ইলমের সাথে সম্পৃক্ত নয় এবং যে বিষয়ের ব্যাপারে ইসলামের সুস্পষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই, এগুলো পার্থিব বিষয়। যেমন আমরা কীভাবে চাষ করব, কীভাবে গাছ রোপন করব, পরিচর্যা করব এই বিষয়গুলো শরয়ি ইলমের সাথে সম্পৃক্ত নয়; বরং এই বিষয়গুলো মানুষের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের ওপর নির্ভরশীল। ফলে মানুষ নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের ফলে যে পদ্ধতি উত্তম মনে করবে, সেটাই অনুসরণ করবে। ২২০
কখন আমরা হাদিসটিকে বিজ্ঞানের ওপর প্রয়োগ করব। বিজ্ঞানের যে বিষয়গুলো শরিয়ি ইলমের সাথে সম্পৃক্ত, সেগুলোর ক্ষেত্রে নুসুসে শরিয়াহকে আমরা সালাফদের ফাহমের আলোকেই গ্রহণ করব। আর যে বিষয়গুলো ইসলামের আকায়েদ বা শরয়ি ইলমের সাথে সম্পৃক্ত নয়, সেগুলোর ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের সিদ্ধান্ত অনুসরণ করতে পারি। যেমন মহান আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে বলে দিয়েছেন, তিনি প্রকৃতির সৃষ্টিকর্তা, তিনিই প্রকৃতির সকল কিছু পরিচালনা করেন। কিন্তু তিনি কোন কোন প্রক্রিয়ায় এ সৃষ্টিজগত পরিচালনা করেন, সেটার বিস্তারিত বিবরণ আমাদের জানাননি। অনুরূপ সৌরজগৎ সম্পর্কেও বিস্তারিত বর্ণনা তিনি আমাদের দেননি।
তাই এই জায়গাগুলোতে বিজ্ঞানের এমন ব্যাখ্যা গ্রহণ করার অবকাশ আছে, যেগুলো নুসুসের বিরোধী নয়। অনুরূপ পদার্থ, রসায়ন, চিকিৎসা-বিজ্ঞানের প্রায় বিষয়ই হাদিসে বর্ণিত উমুরে দুনিয়ার (পার্থিব বিষয়) অন্তর্ভুক্ত। এই বিষয়গুলো মানুষের গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের ওপর নির্ভরশীল। ফলে বিজ্ঞানের এই দিকগুলোতে ইসলামি শরিয়াহর বিশেষ কোনো নির্দেশনা নেই। সকল কিছুর মালিক আল্লাহ, সকল জ্ঞান আল্লাহপ্রদত্ত, এই বিশ্বাস রেখে মানুষ এসব বিষয়ে নিজস্ব গবেষণা ও অনুসন্ধানের ভিত্তিতে যা উত্তম ও কার্যকর মনে করবে, তাই গ্রহণ করা অনুমোদিত হবে, যতক্ষণ তা ইসলামি শরিয়াতের অন্য কোনো বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক হবে না।
পক্ষান্তরে বিজ্ঞানে যেসব বিষয় শরয়ি ইলমের সাথে সম্পৃক্ত এবং যেগুলোর ব্যাপারে নুসুসে শরিয়ায় সুস্পষ্ট বর্ণনা আছে, সেগুলো আমাদেরকে সালাফদের ফাহম ও মানহাজ অনুযায়ীই গ্রহণ করতে হবে।
সমস্যাটা হলো আমরা এই বিভাজনকে মাথায় রাখি না। যার দরুন দেখা যায়, আমাদের কেউ কেউ ইসলামি জ্ঞানশাস্ত্রের স্বীকৃত ও গ্রহণযোগ্য অনেক বিষয়কে অবৈজ্ঞানিক কিংবা বিজ্ঞানবিরোধী বলে নুসুসে শরিয়াহর বিকৃত ব্যাখ্যার দাবি তোলে। উদাহরণস্বরূপ আধুনিক সমাজবিজ্ঞান বা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কথাই ধরা যাক। সমাজব্যবস্থা বা রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে নুসুসে শরিয়াহর স্বতন্ত্র ও মৌলিক নির্দেশনা ও প্রস্তাব আছে। এগুলো নিছক মানুষের আকল বা অভিজ্ঞতানির্ভর বিষয় নয়।
কিন্তু আজকে মুসলিমদের অনেকে পশ্চিমাসমাজ বা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোকে নুসুসে শরিয়াহর এমন ব্যাখ্যা করছে, যা সালাফে সালেহিন থেকে প্রমাণিত নয়; বরং এগুলো তাদের বুঝের বিরোধী। গণতন্ত্র, সেকুলারিজম ইত্যাদি ব্যবস্থাকে পরম মনে করে সালাফদের থেকে প্রাপ্ত নুসুসে শরিয়াহর মুতাওয়ারিস ফাহম ও মানহাজকে প্রত্যাখ্যান করছে এবং নুসুসে শরিয়াহর ভ্রান্ত তাবিলের (ব্যাখ্যার) আশ্রয় নিচ্ছে। যেমন ইসলামি শুরাব্যবস্থার কথা আমরা এখানে উদাহরণ হিসেবে আনতে পারি। সালাফে সালেহিন থেকে শুরু করে ইসলামের চৌদ্দশ বছরের ইতিহাসে যে ব্যাখ্যা আমরা জেনে আসছি তা হলো, আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদি২২৪ এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত পরিষদের ভিত্তিতে শাসক নিয়োগ ও দেশ পরিচালনাকে শুরায়ি নিজাম বলে; যে পরিষদ কুরআন-সুন্নাহকে দেশ পরিচালনার ভিত্তি হিসেবে মেনে নেয়। কিন্তু কেউ কেউ পশ্চিমা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে পরম মনে করে ইসলামের শুরাব্যবস্থার গণতান্ত্রিক ব্যাখ্যা প্রদান করছে, যা সালাফে সালেহিনের কারও থেকে প্রমাণিত নয়। অনুরূপ সেকুলারিজমকে ইসলামিকরণের জন্য সালাফে সালেহিনের ফাহমকে পরিত্যাগ করে নুসুসে শরিয়াহর নতুন নতুন ব্যাখ্যা প্রদান করছে। পশ্চিমা মুক্তচিন্তাকে পরম মনে করে, সালাফে সালেহিনের মতকে উপেক্ষা করে নুসুসে শরিয়াহর উদ্ভট ব্যাখ্যা প্রদান করছে। ২২৫
অনুরূপ বিবর্তনবাদের বিষয়টিও শরয়ি ইলমের সাথে সম্পৃক্ত। মানুষের সৃষ্টি সম্পর্কে নুসুসে শরিয়ায় আমরা সুস্পষ্ট বিবরণ পাই। মানুষের সৃষ্টিকেন্দ্রিক নুসুসে শরিয়াহর ফাহমে মুতাওয়ারিস আমরা সালাফদের থেকে পেয়েছি; কিন্তু বিজ্ঞান দ্বারা প্রভাবিত অনেক মুসলিম নুসুসে শরিয়াহকে পরম মনে করার পরিবর্তে বিবর্তনবাদকে প্রমাণিত হিসেবে বিশ্বাস করে নিয়েছে। আর সে বিশ্বাসের জায়গা থেকে নুসুসে শরিয়াহকে বিবর্তনবাদের সাথে মিলানোর জন্য নুসুসে শরিয়াহর এমন এমন উদ্ভট ব্যাখ্যা আবিষ্কার করছে, যা সালাফে সালেহিন থেকে প্রমাণিত নয়।
এই ভুলগুলো হচ্ছে বিজ্ঞানের উল্লিখিত বিভাজনটি না বোঝার কারণে। নুসুসের সূত্রে সালাফদের থেকে মুতাওয়ারিস যে ফাহম ও মানহাজ আমরা লাভ করেছি, সেগুলো নিছক মানুষের আকল কিংবা অভিজ্ঞতানির্ভর নয়। এই বিষয়গুলোতে আধুনিক বিজ্ঞান নুসুসে শরিয়াহ ও সালাফদের ফাহমের বিপরীতে গেলে কোনো প্রকার তাবিল ছাড়াই আমরা নুসুসে শরিয়াহ ও সালাফদের ফাহমের ওপর বিশ্বাস রাখব। কারণ মানুষের আকল, গবেষণা ও অভিজ্ঞতা পরম কোনো সত্য নয় এবং তা বিভিন্ন ধরনের প্রবণতা ও দুর্বলতা থেকেও মুক্ত নয়। ফলে শরয়ि ইলমের সাথে সম্পৃক্ত বিষয়গুলোর সাথে বিজ্ঞান সাংঘর্ষিক হলে আমরা বিশ্বাস করব, অপূর্ণ জ্ঞান ও নানা সীমাবদ্ধতার কারণে বিজ্ঞান প্রকৃত তত্ত্ব এখনো আবিষ্কার করতে পারেনি, কিংবা সেই পর্যন্ত পৌঁছতে পারেনি।
আর যেসব বিষয় শরয়ি ইলমের সাথে সম্পৃক্ত নয়, বরং উমুরে দুনিয়া তথা পার্থিব বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত, সেসব বিষয়ে মানুষের গবেষণা, অভিজ্ঞতা ও পর্যালোচনাই ধর্তব্য হবে। কারণ এই বিষয়গুলোকে উমুরে দুনিয়া হিসেবে ইসলাম আমাদের জ্ঞানের কাছে ছেড়ে দিয়েছে। যেমনটি হাদিস শরিফ থেকে আমরা জানতে পেরেছি।
এখানে প্রাসঙ্গিকভাবে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা যেতে পারে। বর্তমান অনেক মুসলিমই নুসুসে শরিয়াহর বিষয়বস্তুকে বুঝতে ভুল করছে। যার দরুন তারা খুবই নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলভাবে নুসুসে শরিয়ায় এমন বিষয় খোঁজে বা নুসুসে শরিয়াহ থেকে জোরপূর্বক এমন বিষয় প্রমাণ করতে চায়, যা এর বিষয়বস্তু না। যেমন কেউ কেউ কুরআন থেকে সমস্ত বৈজ্ঞানিক থিওরি ও আবিষ্কারকে প্রমাণ করতে চায়। আর এমন একটা হীনম্মন্যতায় ভোগে যে, যদি কুরআন থেকে এগুলো প্রমাণ না করা যায়, তাহলে কুরআন অসম্পূর্ণ বা ছোট হয়ে যাবে। এজন্য তারা একনিষ্ঠভাবে কুরআন থেকে বৈজ্ঞানিক থিওরি প্রমাণের জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করে যান। আর এটা করতে গিয়ে অধিকাংশ সময় কুরআনের আয়াতের অর্থ ও মর্মকে বিকৃত করে ফেলেন।
অথচ কুরআনের মূল বিষয়বস্তু সাইন্স নয়। যদিও মহান আল্লাহ তাআলা কুরআনের অনেক জায়গায় তাঁর রুবুবিয়াতের প্রমাণস্বরূপ সৃষ্টিগত ও প্রাকৃতিক কিছু বাস্তবতা শিক্ষণীয় হিসেবে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। এজন্য যদি কুরআনে (নুসুসে শরিয়ায়) বৈজ্ঞানিক কোনো বাস্তবতা পাওয়া যায়, তাহলে নিঃসন্দেহে আমাদেরকে সেটার ওপরই বিশ্বাস রাখতে হবে। কিন্তু বৈজ্ঞানিক কোনো থিওরি পূর্ব থেকেই মাথায় রেখে জোরপূর্বকভাবে কুরআন (নুসুসে শরিয়াহ) থেকে সেটা প্রমাণ করতে যাওয়া—চিকিৎসাশাস্ত্রের কিতাব থেকে আইন শাস্ত্রের বিষয় বের করার মতোই অহেতুক কাজ।
পবিত্র কুরআন তার মূল বিষয়বস্তু ও অবতরণের উদ্দেশ্যে কোনো অস্পষ্টতা রাখেনি। প্রায় ২০টির মতো আয়াতে কুরআন স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তাকে কেন নাজিল করা হয়েছে? উদাহরণস্বরূপ নিম্নে বর্ণিত কিছু আয়াতের দিকে আমরা মনোনিবেশ করতে পারি। সুরা মায়েদার ১৫-১৬ নং আয়াতে ইরশাদ হয়েছে,
يَأَهْلَ الْكِتُبِ قَدْ جَاءَكُمْ رَسُولُنَا يُبَيِّنُ لَكُمْ كَثِيرًا مِّمَّا كُنْتُمْ تُخْفُونَ مِنَ الْكِتُبِ وَيَعْفُوا عَنْ كَثِيرٍ قَدْ جَاءَكُمْ مِّنَ اللَّهِ نُورٌ وَكِتَبٌ مُّبِينٌ. يَهْدِي بِهِ اللَّهُ مَنِ اتَّبَعَ رِضْوَانَهُ سُبُلَ السَّلْمِ وَيُخْرِجُهُمْ مِّنَ الظُّلُمَتِ إِلَى النُّوْرِ بِإِذْنِهِ وَيَهْدِيهِمْ إِلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ.
'হে কিতাবিগণ! তোমাদের নিকট আমার (এই) রাসুল এসেছে, যে (তাওরাত ও ইনজিল) গ্রন্থের এমন বহু কথা তোমাদের কাছে প্রকাশ করে, যা তোমরা গোপন করো এবং অনেক বিষয় (তোমাদের থেকে) এড়িয়ে যায়। আল্লাহর পক্ষ হতে তোমাদের কাছে এক জ্যোতি এবং এমন এক কিতাব এসেছে, যা সত্যকে সুস্পষ্ট করে। যার মাধ্যমে আল্লাহ তাদেরকে শান্তির পথ দেখান, যারা তাঁর সন্তুষ্টি অনুসন্ধান করে; এবং তাদেরকে অন্ধকার থেকে বের করে আলোর দিকে নিয়ে আসেন ও দিশা দেন সরল পথের।'
সুরা মায়েদারই ১৯ নং আয়াতে ইরশাদ হয়েছে,
يَأَهْلَ الْكِتُبِ قَدْ جَاءَكُمْ رَسُوْلُنَا يُبَيِّنُ لَكُمْ عَلَى فَتْرَةٍ مِّنَ الرُّسُلِ أَنْ تَقُولُوا مَا جَاءَنَا مِنْ بَشِيرٍ وَلَا نَذِيرٍ فَقَدْ جَاءَكُمْ بَشِيرٌ وَ نَذِيرٌ وَ اللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ.
'হে কিতাবিগণ! তোমাদের নিকট এমন এক সময়ে আমার রাসুল দীনের ব্যাখ্যা দানের জন্য এসেছে, যখন রাসুলগণের আগমন-ধারা বন্ধ ছিল, যাতে তোমরা বলতে না পারো, আমাদের কাছে (জান্নাতের) কোনো সুসংবাদদাতা ও (জাহান্নাম সম্পর্কে) সতর্ককারী আসেনি। এবার তোমাদের কাছে একজন সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী এসে গেছে। আল্লাহ সর্ববিষয়ে পরিপূর্ণ ক্ষমতাবান।'
একই সুরার ৪৮ নং আয়াতে ইরশাদ হয়েছে,
وَ أَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتٰبَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ الْكِتٰبِ وَ مُهَيْمِنًا عَلَيْهِ فَاحْكُمْ بَيْنَهُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ وَلَا تَتَّبِعُ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ لِكُلِّ جَعَلْنَا مِنْكُمْ شِرْعَةً وَ مِنْهَاجًا وَلَوْ شَاءَ اللَّهُ لَجَعَلَكُمْ أُمَّةً وَاحِدَةً وَ لكِنْ لِيَبْلُوَكُمْ فِي مَا اتْكُمْ فَاسْتَبِقُوا الْخَيْرَاتِ إِلَى اللَّهِ مَرْجِعُكُمْ جَمِيعًا فَيُنَبِّئُكُمْ بِمَا كُنْتُمْ فِيْهِ تَخْتَلِفُوْنَ.
'এবং (হে রাসুল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম!) আমি তোমার প্রতিও সত্য সংবলিত কিতাব নাজিল করেছি, তার পূর্বের কিতাবসমূহের সমর্থক ও সংরক্ষকরূপে। সুতরাং তাদের মধ্যে সেই বিধান অনুসারেই বিচার করো, যা আল্লাহ নাজিল করেছেন। আর তোমার নিকট যে সত্য এসেছে, তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করো না। তোমাদের মধ্যে প্রত্যেক (উম্মত)-এর জন্য আমি এক (পৃথক) শরিয়াত ও পথ নির্ধারণ করেছি। আল্লাহ চাইলে তোমাদের সকলকে একই উম্মত বানিয়ে দিতেন। কিন্তু (পৃথক শরিয়াত এজন্য দিয়েছেন) যাঁতে তিনি তোমাদেরকে যা-কিছু দিয়েছেন, তা দ্বারা তোমাদের পরীক্ষা করতে পারেন। সুতরাং তোমরা সৎকর্মে প্রতিযোগিতা করো। তোমাদের সকলকে আল্লাহরই দিকে ফিরে যেতে হবে। অতঃপর যে বিষয়ে তোমরা মতভেদ করছিলে সে সম্পর্কে তিনি তোমাদের অবিহত করবেন।'
সুরা আনআমের ৫৫ নং আয়াতে ইরশাদ হয়েছে,
وَكَذَلِكَ نُفَصِّلُ الْأُيْتِ وَلِتَسْتَبِينَ سَبِيْلُ الْمُجْرِمِينَ.
‘এভাবেই আমি নিদর্শনাবলি বিশদভাবে বর্ণনা করি (যাতে সরল পথও স্পষ্ট হয়ে যায়) এবং এতে অপরাধীদের পথও পরিষ্কার হয়ে যায়।'
সুরা সিজদাহর ১-৩ নং আয়াতে ইরশাদ হয়েছে,
اﻟﻢ . ﺗَﻨْﺰِﻳْﻞُ اﻟْﻜِﺘٰﺐِ ﻟﺎَ رَﻳْﺐَ ﻓِﻴْﻪِ ﻣِﻦْ ﺭَّﺏِّ اﻟْﻌٰﻠَﻤِﻴْﻦَ . ﺃَﻡْ ﻳَﻘُﻮْﻟُﻮْﻥَ ﺍﻓْﺘَﺮٰﻩُ ﺑَﻞْ ﻫُﻮَ اﻟْﺤَﻖُّ ﻣِﻦْ ﺭَّﺑِّﻚَ ﻟِﺘُﻨْﺬِﺭَ ﻗَﻮْﻣًﺎ ﻣَّﺎ ﺃَﺗٰﻬُﻢْ ﻣِّﻦْ ﻧَّﺬِﻳْﺮٍ ﻣِّﻦْ ﻗَﺒْﻠِﻚَ ﻟَﻌَﻠَّﻬُﻢْ ﻳَﻬْﺘَﺪُﻭْﻥَ.
'আলিফ-লাম-মীম। রাব্বুল আলামিনের পক্ষ হতে এটি এমন এক কিতাব নাজিল করা হচ্ছে, যাতে কোনো সন্দেহপূর্ণ কথা নেই। লোকে কি বলে নবি নিজে এটা রচনা করে নিয়েছে? না, (হে নবি!) এটা তো সত্য, যা তোমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে এসেছে, যাতে তুমি এর মাধ্যমে সতর্ক করো এমন এক সম্প্রদায়কে, যাদের কাছে তোমার আগে কোনো সতর্ককারী আসেনি, যাতে তারা সঠিক পথে এসে যায়।'
এখানে মাত্র কয়েকটি আয়াত আমরা তুলে ধরলাম। এরকম আরও আয়াত পবিত্র কুরআনে আছে; যেগুলো নিয়ে চিন্তা করলে বোঝা যায়, কুরআনে কারিমের মূল উদ্দেশ্য হলো, মানুষকে আল্লাহ তাআলার তাওহিদের শিক্ষা দেওয়া, পরকালের জন্য প্রস্তুত করা এবং দুনিয়ার জীবনকে আল্লাহর সন্তুষ্টি মোতাবেক পরিচালনা করার জন্য গাইডলাইন দেওয়া। এর সাথে প্রাসঙ্গিকভাবে যেসব ঐতিহাসিক ঘটনা ও প্রাকৃতিক বাস্তবতা আল্লাহ তাআলা তুলে ধরেছেন, সেগুলোও উল্লেখিত উদ্দেশ্যকে শক্তিশালী ও বাস্তবায়নের জন্যই। এজন্য কুরআনে কোনো ঘটনা কিংবা বৈজ্ঞানিক থিওরি পাওয়া না গেলে, সেটা দোষের কিছু না, হীনম্মন্যতায় ভোগারও কোনো বিষয় না। কারণ কুরআন কখনো নিজেকে বিজ্ঞানের গ্রন্থ বলে দাবি করেনি। এটা তার উদ্দেশ্যও না।
কুরআন তার বিষয়বস্তুর বিবেচনায় সামাজিক বিজ্ঞানের সাথে সম্পর্কিত। এজন্য ইসলাম আমাদেরকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মৌলিক দিকনির্দেশনা দিয়েছে। যেন আমাদের পুরো জীবন আল্লাহর সন্তুষ্টি মোতাবেক পরিচালিত হয়। কিন্তু বিষয়বস্তুর বিবেচনায় কুরআন প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের সাথে সংশ্লিষ্ট না; বরং এই দিকটিকে উমুরে দুনিয়া তথা পার্থিব বিষয় হিসেবে কুরআন মানুষের অনুসন্ধান ও গবেষণার ওপর ছেড়ে দিয়েছে। শর্ত হলো, এই গবেষণার উদ্দেশ্য হতে হবে মানুষের উপকার সাধন ও আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন। তবে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার যে বিষয়গুলো প্রাসঙ্গিকভাবে নুসুসে শরিয়ায় এসেছে, সেগুলোতে নিঃসন্দেহে আমাদের বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে, যদিও আধুনিক বিজ্ঞান সেগুলোর বিরুদ্ধে যায়।
এ ক্ষেত্রে আমরা মনে করব, বিজ্ঞান তার সীমাবদ্ধতার কারণে প্রকৃত বাস্তবতায় পৌঁছতে পারেনি, কিংবা মন্দ কোনো প্রবণতার শিকার হওয়ার ফলে তার গবেষণা পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে গেছে। আর প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের যে বিষয় সুস্পষ্টভাবে কুরআনে বর্ণিত নেই, সেগুলোকে জোর করে, আনএকাডেমিক পদ্ধতিতে, নসের অর্থ ও প্রেক্ষাপটকে ভেঙেচুরে প্রমাণ করতে যাওয়া ভ্রান্তি ছাড়া কিছুই না। এটা নিঃসন্দেহে নুসুসে শরিয়াহর বিকৃতি। আমরা এরকম ভয়াবহ একটা উদাহরণ এখানে তুলে ধরছি। যখন বিজ্ঞানের এই থিওরি সামনে এল যে, দুনিয়া স্থির নয় বরং ঘূর্ণায়মান, তখন এটাকে কুরআন থেকে প্রমাণ করার জন্য নিম্নের আয়াতটি ব্যবহার করা হলো-
وَ تَرَى الْجِبَالَ تَحْسَبُهَا جَامِدَةً وَهِيَ تَمُرُّ مَرَّ السَّحَابِ صُنْعَ اللَّهِ الَّذِي أَثْقَنَ كُلَّ شَيْءٍ إِنَّهُ خَبِيرٌ بِمَا تَفْعَلُوْنَ .
'আর যখন তোমরা পাহাড়কে দেখবে তখন মনে হবে সেটা স্থির হয়ে আছে। অথচ তা মেঘের মতো চলতে থাকবে।'
এই আয়াতে 'পাহাড় মেঘের মতো চলতে থাকবে' এর অর্থ 'পাহাড় মেঘের মতো চলে' অর্থ করে তারা দাবি করল যে, দুনিয়ার ঘূর্ণমানের থিওরি কুরআন দ্বারাও প্রমাণিত। অথচ এটা মোটেও আয়াতের বিষয়বস্তু না। আয়াতে মোটেও দুনিয়া স্থির না ঘূর্ণায়মান-এ ব্যাপারে কথা বলা হয়নি। আয়াতের কন্টেক্সট (পূর্বাপর) থেকে সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায়, এখানে কিয়ামতের অবস্থা বর্ণনা করা হচ্ছে। কিয়ামত এতই ভয়াবহ হবে যে, আমরা এতদিন যে পাহাড়গুলোকে স্থির দেখে আসছি, সেদিন এ পাহাড়গুলো আকাশে মেঘের মতো উড়তে থাকবে। এটাই উল্লিখিত আয়াতের প্রেক্ষাপট। কিন্তু কুরআন দিয়ে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের সকল থিওরি প্রমাণ করার ভূত মাথায় থাকার কারণে আয়াতের এই প্রেক্ষাপট ও প্রকৃত মর্মকে চুরমার করে দেওয়া হয়েছে। এরকম আরও অসংখ্য দৃষ্টান্ত আছে। যেখানে কুরআন থেকে বৈজ্ঞানিক থিওরি প্রমাণ করতে গিয়ে এভাবেই আয়াতের মর্মের বিকৃতি সাধন করা হয়েছে।
মোটকথা কুরআনে কারিম পদার্থ বিজ্ঞানের গ্রন্থ নয় এবং পার্থিব উন্নতি অর্জন তার বিষয়বস্তুও নয়। কারণ এই বিষয়গুলো মানুষ নিজের চিন্তাভাবনা, গবেষণা, অভিজ্ঞতার মাধ্যমে উদঘাটন করতে পারবে। এজন্য আল্লাহ তাআলা এই বিষয়গুলো মানুষের মেধা ও পরিশ্রমের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। আর যে বিষয়গুলো নিছক মানুষের আক্কলের ওপর নির্ভরশীল হতে পারে না, বরং সেখানে ওহীর কোনো বিকল্প নেই এবং ওহীর দ্বারস্থ হতে হয়, সেগুলোকে নুসুসে শরীয়াহর বিষয়বস্তু বানিয়েছেন। সুতরাং আমাদেরকে ওপরে উল্লেখিত বিভাজনটি বুঝে নুসুসে শরীয়াহ ও বিজ্ঞানের প্রতিটি দিককে স্ব স্ব স্থানে রেখে বিচার করতে হবে। লাগামহীনভাবে বিজ্ঞানকে ইসলামের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর কিংবা লাগামহীনভাবে বিজ্ঞানের সকল কিছুকে ইসলামি বানানোর প্রচেষ্টা—উভয় প্রান্তিকতা থেকেই বেঁচে থাকতে হবে। সর্বোপরি নুসুসে শরীয়াহকে বিজ্ঞানের আলোকে নয়, সালাফে সালেহিনের ফাহম ও মানহাজ অনুযায়ীই বুঝতে হবে।

টিকাঃ
২২১. সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৬০৮৩
২২২. সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২৩৬৩
২২৩. এখানে একটি বিষয় জানিয়ে রাখতে চাচ্ছি যে, পশ্চিমা চিন্তাধারায় প্রভাবিত কিছু লোক উল্লিখিত হাদিস দেখিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা, বিচারকার্য, লেনদেন, আচার-ব্যবহারকে পার্থিব বিষয় হিসেবে সাব্যস্ত করতে চায় এবং এই সংক্রান্ত যত হাদিস আছে, সেগুলোকে অপালনীয় হিসেবে দাবি করতে চায়। অর্থাৎ তারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আইনি অথরিটিকে কেবল আকায়েদ ও বক্তিগত ইবাদাতের ভেতর সীমাবদ্ধ করতে চায়। মূলত সেকুলারিজমকে যারা ইসলামি প্রমাণ করতে ব্যস্ত, তারাই এই হাদিসটিকে এভাবে সামনে আনে। কারণ রাষ্ট্র পরিচালনা, বিচারকার্য, লেনদেন ইত্যাদি থেকে সুন্নাতে নববির অথরিটিকে পৃথক করতে পারলে খুব সহজেই পশ্চিমা সেকুলারিজমের সাথে ইসলামকে মিলানো যায়। অথচ হাদিসের মর্ম মোটেও এমন নয়। হাদিসের বক্তব্য ও আগে পরের প্রেক্ষাপট থেকে সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, এটি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কোনো আদেশ বা নিষেধ ছিল না। কেবল তিনি ধারণা করে বলেছিলেন। ফলে এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে আকায়েদ ও ব্যক্তিগত ইবাদাতের বাইরে মানবজীবনের বাকি ক্ষেত্রগুলোর সাথে সংশ্লিষ্ট রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সকল হাদিসকে অপালনীয় দাবি করা বিভ্রান্তি ছাড়া কিছুই না। এই বক্তব্য সেসব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে, যে ব্যাপারে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুস্পষ্ট কোনো আদেশ বা নিষেধ দেননি। যেসব ক্ষেত্রে নুসুসে শরিয়াহ বিশেষ নির্দিষ্ট মূলনীতি প্রণয়ন করেছে, কিংবা স্পষ্ট কোনো বিধান জারি করেছে, সেগুলো হাদিসে বর্ণিত দুনিয়াবি বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত নয়। আল্লামা তাকি উসমানি হাফিজাহুল্লাহ তার হুজ্জিয়তে হাদিস গ্রন্থে এই সমস্ত লোকদেরকে ইনকারে হাদিসের একটি ক্যাটাগরিতে ফেলেছেন। আল্লামা আশরাফ আলি থানবি রহিমাহুল্লাহও তার বিখ্যাত আল ইন্তিবাহাতুল মুফিদাহ গ্রন্থে এই সমস্ত লোকদের নিন্দা করেছেন।
২২৪. আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদি হচ্ছেন, আলিম-উলামা, মর্যাদাবান ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গ, বিভিন্ন বাহিনীর প্রধানগণ, সমাজের নেতাগণ ও বড় ব্যবসায়ীগণ। নারী, চুক্তিবদ্ধ কাফের ও দাসরা যতই মহৎ গুণের অধিকারী হোক না কেন, তারা কখনো আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদির অন্তর্ভুক্ত হবে না। (ইমাম নববির মুগনিল মুহতাজ, ৪/১৩০; ইমাম বাহুতির কাশশাফুল কিনা, ৬/১৫৯)।
২২৫. এর চাক্ষুষ প্রমাণসহ সঠিক ব্যাখ্যা জানতে ইসলাম ও মুক্তচিন্তা বইটি দেখা যেতে পারে। লেখক মাওলানা আফসারুদ্দীন হাফিজাহুল্লাহ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00