📘 ফাহমুস সালাফ > 📄 পঞ্চম সংশয় : আকল ও ফাহমুস সালাফ

📄 পঞ্চম সংশয় : আকল ও ফাহমুস সালাফ


সালাফদের ফাহম আঁকড়ে ধরলে মানুষের আকলকে অকেজো করে রাখা হয় এবং আকলের অবমূল্যায়ন করা হয়। অথচ শরিয়াহর দলিল-আদিল্লার ক্ষেত্রে আকলই হলো মূল; বরং আকলই হলো শরিয়াহর মূল উৎস।
আবার কোনো কোনো বুদ্ধিজীবী বলে থাকেন, এর চেয়ে বড় চিন্তাগত সংকট আর কী হতে পারে যে, উম্মতের আকলকে অকেজো করে মৃত মানুষদের কাছ থেকে জীবিত মানুষদের জন্য সমাধা গ্রহণ করা লাগবে?
তাদের কারও কারও মতে, বর্তমান মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় সংকট হলো—নিজেদের আকলের ওপর পূর্ববর্তী মৃতদের নকল (বর্ণিত মতামত)-কে প্রাধান্য দেওয়া।
নিরসন :
এই ধরনের আপত্তির ধারা নতুন কিছু নয়। অনেক পুরাতন। বর্তমান মডার্নিস্টরা এই আপত্তি সামনে আনলেও পূর্বে আহলুস সুন্নাহ থেকে বহির্ভূত মুতাজিলারাও এই আপত্তি তুলেছিল। তখন তাদের আপত্তির উৎস ছিল সে সময়ের গ্রিক দর্শন। আর বর্তমানে এই আপত্তির উৎস হলো পশ্চিমা দর্শন 'হিউম্যানিটি'।
ইসলাম কখনো আকলকে অবমূল্যায়ন করেনি। ইসলামি শরিয়ায় আকলের গুরুত্ব একটি স্বীকৃত বিষয়। পবিত্র কুরআনে প্রায় ৪৯ বার আকল শব্দটি কয়েকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। ১৬০ আল্লাহকে চেনার জন্য, সত্যকে বোঝার জন্য এবং ইসলামকে গ্রহণ করার জন্য কুরআনের অসংখ্য জায়গায় মহান আল্লাহ তাআলা মানুষকে আকল ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
قُلْ إِنَّمَا اَعِظُكُمْ بِوَاحِدَةٍ أَنْ تَقُومُوا لِلَّهِ مَثْنَى وَفُرَادَى ثُمَّ تَتَفَكَّرُوا.
'(হে রাসুল!) তাদেরকে বলো, আমি তোমাদেরকে কেবল একটি বিষয়ে উপদেশ দিচ্ছি। তা এই যে, তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে দু-দুজন অথবা এক-একজন করে দাঁড়িয়ে যাও, তারপর ইনসাফের সাথে চিন্তা করো। ১৬১ অন্যত্র তিনি বলেন,
الَّذِينَ يَذْكُرُونَ اللَّهَ قِيمًا وَقُعُودًا وَ عَلَى جُنُوبِهِمْ وَ يَتَفَكَّرُونَ فِي خَلْقِ السَّمَاتِ وَالْأَرْضِ رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هُذَا بَاطِلًا سُبْحْنَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ.
'যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শুয়ে (সর্বাবস্থায়) আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা করে (এবং তা লক্ষ্য করে বলে ওঠে), হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি এসব উদ্দেশ্যহীনভাবে সৃষ্টি করেননি। আপনি এমন (অনর্থক) কাজ থেকে পবিত্র। সুতরাং আপনি আমাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন।১৬২
قُلِ انْظُرُوا مَا ذَا فِي السَّمَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا تُغْنِي الْأَيْتُ وَالنُّذُرُ عَنْ قَوْمٍ لَّا يُؤْمِنُونَ.
'(হে নবি!) তাদেরকে বলো, একটু লক্ষ করে দেখো আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীতে কী কী জিনিস আছে? কিন্তু যেসব লোক ঈমান আনার নয়, (আসমান ও জমিনে বিরাজমান) নিদর্শনাবলি ও সতর্ককারী (নবি)- গণ তাদের কোনো কাজে আসে না।'১৬৩
যারা আকল থেকে উপকৃত হয় না, পবিত্র কুরআনে তাদের নিন্দা করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
صُمٌّ بُكُمْ عُمْيٌ فَهُمْ لَا يَعْقِلُونَ.
'তারা বধির, মূক, অন্ধ। সুতরাং তারা কিছুই বোঝে না।'১৬৪
بَلْ أَكْثَرُهُمْ لَا يَعْقِلُونَ .
'কিন্তু তাদের অধিকাংশই বুদ্ধিকে কাজে লাগায় না।'১৬৫
وَقَالُوا لَوْ كُنَّا نَسْمَعُ أَوْ نَعْقِلُ مَا كُنَّا فِي أَصْحُبِ السَّعِيرِ.
'তারা আরও বলবে, যদি আমরা শুনতাম অথবা বুদ্ধি খাটাতাম, তবে আমরা জাহান্নামবাসীদের মধ্যে থাকতাম না।'১৬৬
শুধু তাই নয়, আকল হলো বান্দার ওপর শরিয়াতের বিধান কার্যকর হওয়ার পূর্বশর্ত। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'তিন ব্যক্তি থেকে হিসাবের কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে—ঘুমন্ত ব্যক্তি থেকে জাগ্রত না হওয়া পর্যন্ত, ছোট বাচ্চা থেকে প্রাপ্তবয়স্ক (বালেগ) না হওয়া পর্যন্ত এবং পাগল থেকে বুঝ ও জ্ঞান না ফেরা পর্যন্ত।'১৬৭
কিন্তু মানুষের আকল স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। এই আকল বিভিন্ন কিছু দ্বারা প্রভাবিত হয়। নিজের অভিজ্ঞতা, আবেগ অনুভূতি, প্রবৃত্তি, চারপাশের পরিবেশসহ আরও অনেক প্রবণতা মানুষের আকলে প্রভাব ফেলে। এটা সে অনুধাবন করুক কিংবা না করুক। এজন্য দেখা যায়, কোনো কোনো বিষয়ে মানুষ একবারেই তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ফেলে। কারণ তার আকল বহিরাগত বিভিন্ন প্রবণতা থেকে প্রভাবিত হয়।
ফলে আকলের এমন কিছু সূত্র দরকার, যার আলোকে আকল পরিচালিত হলে এগুলো তাকে বিভিন্ন প্রবণতা থেকে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় রেখে সঠিক দিকে নিয়ে যাবে। মৌলিকভাবে সে সূত্র হলো ‘ওহি’। এজন্য আকল স্বয়ংসম্পূর্ণ কিছু নয়; বরং আকলের শক্তি চোখের দৃষ্টিশক্তির মতো। চোখের সাথে সূর্য ও অন্য কিছুর আলো মিলিত হলে যেমন দৃষ্টিশক্তি সঠিকভাবে কাজ করে, তেমনিভাবে আকলের সাথে যখন ঈমান ও কুরআন-সুন্নাহর আলো মিলিত হবে, তখন তা সঠিকভাবে কাজ করবে।১৬৮
এই বিষয়টি আমরা পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে দেখতে পাব। যেমন মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
فَإِنْ لَّمْ يَسْتَجِيبُوا لَكَ فَاعْلَمُ أَنَّمَا يَتَّبِعُوْنَ أَهْوَاءَهُمْ وَ مَنْ أَضَلُّ مِمَّنِ اتَّبَعَ هَوْنَهُ بِغَيْرِ هُدًى مِّنَ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّلِمِينَ.
‘তারা যদি তোমার ফরমায়েশ মতো কাজ না করে, তবে বুঝবে, তারা মূলত তাদের খেয়াল-খুশিরই অনুসরণ করে। যে ব্যক্তি আল্লাহর পক্ষ হতে আগত হেদায়াত ছাড়া কেবল নিজ খেয়াল-খুশির অনুসরণ করে, তার চেয়ে বেশি পথভ্রষ্ট আর কে হতে পারে? নিশ্চয়ই আল্লাহ জালেম সম্প্রদায়কে হেদায়াত দান করেন না।’
অন্যত্র বলেছেন,
وَ أَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَبَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ الْكِتٰبِ وَ مُهَيْمِنًا عَلَيْهِ فَاحْكُمْ بَيْنَهُمْ بِمَا اَنْزَلَ اللَّهُ وَلَا تَتَّبِعُ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ لِكُلِّ جَعَلْنَا مِنْكُمْ شِرْعَةً وَ مِنْهَاجًا.
‘এবং (হে রাসুল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমি তোমার প্রতিও সত্য সংবলিত কিতাব নাজিল করেছি, তার পূর্বের কিতাবসমূহের সমর্থক ও সংরক্ষকরূপে। সুতরাং তাদের মধ্যে সে বিধান অনুসারেই বিচার করো, যা আল্লাহ নাজিল করেছেন। আর তোমার নিকট যে সত্য এসেছে, তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করো না।’
আল্লামা শাতেবি রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'যে বিষয় প্রাধান্য পাওয়ার উপযুক্ত, তাকে প্রাধান্য দেওয়া আবশ্যক। সে জিনিসটা হলো শরিয়াহ। আর যে জিনিস প্রাধান্য না পাওয়ার উপযুক্ত, সেটাকে প্রাধান্য না দেওয়াই আবশ্যক। সে জিনিসটা হলো আকল। সুতরাং অপূর্ণাঙ্গ ও মুখাপেক্ষী বিষয়কে পূর্ণাঙ্গ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ বিষয়ের ওপর বিচারক মানা মোটেও শুদ্ধ নয়। এটি যুক্তি ও দলিল উভয়টিরই পরিপন্থি।'১৭১
সুতরাং ওহির সূত্র ছাড়া মানুষ যখন আকল ব্যবহার করে, তখন মূলত সেটা আকলে সালিম থাকে না; বরং সেটি প্রবৃত্তি বা বহিরাগত কোনো প্রবণতায় প্রভাবিত আকলে ফাসেদ বা অসুস্থ বিবেক হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে বাহ্যিকভাবে মনে হতে পারে, ব্যক্তি খুবই যৌক্তিক ও জ্ঞানসম্পন্ন দলিল পেশ করছে। অথচ প্রকৃতপক্ষে তা প্রবৃত্তি ছাড়া কিছুই না।
বোঝা গেল, যেকোনো চিন্তা ও বিবেচনার ক্ষেত্রে মানুষের আকল স্বয়ংসম্পূর্ণ না। মানুষের আকল বহিরাগত নানান প্রবণতা দ্বারা প্রভাবিত হয়। ওহির বুঝের ক্ষেত্রেও সে এসব প্রবণতা থেকে মুক্ত নয়। তাই নুসুসে শরিয়াহ বোঝার ক্ষেত্রেও মানুষের আকলকে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেওয়া যাবে না। তা ছাড়া নুসুসে শরিয়াহর ক্ষেত্রে অন্যতম উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের উদ্দেশ্য পর্যন্ত পৌঁছা। আর যেহেতু মানুষের আকল নানান প্রবণতা দ্বারা প্রভাবিত হয়, ফলে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের মর্মে পৌঁছতে সে বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তার আকল তাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পরিবর্তে প্রবৃত্তি কিংবা তার অজান্তেই ভিন্ন কোনো স্বার্থের দিকে প্রবাহিত করতে পারে। তাই, নুসুসে শরিয়াহর মাধ্যমে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বুঝ পর্যন্ত পৌঁছতে আকলকে ব্যবহারের জন্য তার সামনে অবশ্যই কেন্দ্রীয় ও মানদণ্ডের মর্যাদা রাখে এমন ফাহমসমূহ বিদ্যমান থাকা জরুরি। আরও জরুরি যথার্থ কিছু মূলনীতির। সালাফদের ফাহম ও মানহাজ হলো সেই মানদণ্ড ও কেন্দ্র। সালাফদের ফাহম কখনোই আমাদের আকলকে জুমুদের (অচলাবস্থার) দিকে ঠেলে দেয় না, আকলকে অকেজো করে রাখে না; বরং তা আমাদের আকলের আলো সরবরাহ করে এবং বিভিন্ন প্রবণতা থেকে বাঁচিয়ে একে সঠিক পথে প্রবাহিত করে।
আবার বহিরাগত বিভিন্ন আঘাতে চোখের দৃষ্টিশক্তি যেমন ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, তেমনিভাবে আকলও বহিরাগত প্রভাবে ক্ষয় হতে পারে, হতে পারে অসুস্থ। এই এক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলেও আমাদের সালাফদের আকল বর্তমানের লোকদের চেয়ে শক্তিশালী, সুস্থ ও পরিচ্ছন্ন ছিল। তারা ছিলেন রাসুলের মুখে স্বীকৃত শ্রেষ্ঠ জমানার। সমাজে বিভিন্ন অপরাধের উপস্থিতি থাকলেও ইসলামি শরিয়াহ ছিল সার্বিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। আর বর্তমানে ইসলাম কোথাও প্রতিষ্ঠিত নেই। বহিরাগত বিভিন্ন সভ্যতা ও সংস্কৃতি মুসলিমদের ওপর রাজ করছে। কুফর, শিরক, পাপাচারের এত জয়জয়কার সালাফদের সময় ছিল কল্পনাতীত বিষয়।
সুতরাং সালাফদের ফাহম ও মানহাজের ওপর নির্ভরশীলতা মানে আকলকে অকেজো করে রাখা নয়; বরং মানুষের আকলকে সুস্থ ও নিরাপদ রাখতেই নুসুসে শরিয়াহ ও সালাফদের ফাহমকে সূত্র মানা হয় এবং এর মাধ্যমে আকলকে যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়, যে মূল্যায়নের সে উপযুক্ত। আকলকে অবাধ ছেড়ে দেওয়া কিংবা অকেজো করে রাখা উভয়টিই আকলকে অবমূল্যায়ন করার শামিল।

টিকাঃ
১৬০. কিমাতুল আকল ফিল ইসলাম, পৃষ্ঠা ১৩
১৬১. সুরা সাবা, আয়াত ৪৬
১৬২. সুরা আলে ইমরান, আয়াত ১৯১
১৬৩. সুরা ইউনুস, আয়াত ১০১
১৬৪. সুরা বাকারা, আয়াত ১৭১
১৬৫. সুরা আনকাবুত, আয়াত ৬৩
১৬৬. সুরা মুলক, আয়াত ১০
১৬৭. মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ২৪৬৯৪; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৪৪০০
১৬৮. মাজমুউল ফাতাওয়া, ৩/৩৩৯
জাসাস, আয়াত ৫০
Sharb, আয়াত ৪৮
১৭১. আল ইতিসাম, ৩/২২৮

📘 ফাহমুস সালাফ > 📄 ষষ্ঠ সংশয় : সৃজনশীলতা ও ফাহমুস সালাফ

📄 ষষ্ঠ সংশয় : সৃজনশীলতা ও ফাহমুস সালাফ


ফাহমুস সালাফকে আঁকড়ে ধরার অর্থ জীবিতদের ব্যাপারে মৃতকে জিজ্ঞেস করা এবং সৃজনশীলতাকে বর্জন করে (অতীতের) চর্বিতচর্চা করা।
নিরসন :
মডার্ন সংস্কারপন্থিদের মুখে এ ধরনের অনেক বক্তব্যই শোনা যায়। যেসব বক্তব্যের মাধ্যমে তারা মূলত ফাহমুস সালাফের মর্যাদাকে খাটো করে এবং ফাহমুস সালাফকে বর্তমান মুসলিম উম্মাহর উন্নতি ও উত্থানের পথে অন্যতম বাধা হিসেবে উপস্থাপন করে।
যদি কোনো মুসলিম সততা ও বস্তুনিষ্ঠতার সাথে লক্ষ করে, তাহলে সে ফাহমুস সালাফকে আঁকড়ে ধরাই বিশুদ্ধ ও প্রশংসনীয় মনে করবে।
প্রথমত, সালাফরা হলেন এই উম্মতের শ্রেষ্ঠ ও সৎ অংশ। তাদের নিয়ে আমরা গর্ব করি এবং তাদের আমরা সম্মান করি। কারণ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের প্রশংসা করেছেন এবং উম্মতের ওপর তাদের শ্রেষ্ঠত্বের সার্টিফিকেট দিয়েছেন। তাদের পথের অনুসরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। তাদের ফাহম ও মানহাজের প্রতি আমাদের আস্থাশীলতা আলস্য কিংবা গোত্রপ্রীতি থেকে তৈরি নয়; বরং এর পেছনে শরয়ি ও ইলমি কারণ আছে। যেগুলোর যৌক্তিকতা সুস্থ মস্তিষ্কের কোনো ব্যক্তি অস্বীকার করতে পারবে না।
দ্বিতীয়ত, সালাফরা হলেন সেই প্রজন্ম, যারা শরিয়াহকে তাদের জীবনে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বাস্তবায়ন করেছেন। ইসলামের দৃষ্টিতে তারা আমাদের জন্য জীবন্ত অতীত। পক্ষান্তরে দীনের বিচারে বর্তমান উম্মাহ হলো মৃত জাতি। সুতরাং দীনের ক্ষেত্রে তাদের কাছে প্রত্যাবর্তন করা প্রকৃতপক্ষে আলোর কাছে আঁধারের, জীবন্তের কাছে ঘুমন্তের প্রত্যাবর্তন।
এজন্যই ইমাম মালেক রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, 'এই উম্মতের শেষ অংশের সংস্কার সে পথেই হবে, যে পথে তার প্রথম অংশ সংশোধিত হয়েছে।’১৭২
ইমাম মালেক রহিমাহুল্লাহর বক্তব্যের উদ্দেশ্য এটা নয় যে, সালাফ বা পূর্বসূরিদের যাতায়াত-ব্যবস্থা, বাসস্থানের কাঠামো, উৎপাদন শিল্প, চিকিৎসা, শিক্ষা, সেনাবাহিনীর কাঠামো ইত্যাদিতে ফিরে যেতে হবে; বরং সালাফদের দিকে ফিরে যাওয়ার অর্থ হলো, দীন বোঝা ও মানার ক্ষেত্রে তাদের অবস্থার দিকে প্রত্যাবর্তন করা।
এর থেকে স্পষ্ট হয়, সালাফদের অতীতে প্রত্যাবর্তন এবং উন্নতি-অগ্রসরতার মাঝে কোনো বিরোধ নেই; বরং সামগ্রিকভাবে প্রকৃত উন্নতি তখনই সাধন হবে, যখন মুসলিম উম্মাহ আল্লাহর শরিয়াহকে আঁকড়ে ধরবে। শরিয়াহ ছাড়া তারা যেখানেই পৌঁছাবে, কখনোই তাদের সামগ্রিক ও প্রকৃত উন্নতি অর্জন হবে না। আল্লাহর শরিয়াহ ও মানবসভ্যতার উন্নতি—এ দুটির মাঝে আবশ্যিক সম্পর্ক বিদ্যমান।
উন্নতি ও অগ্রসরতার ক্ষেত্রে আমরা যদি পশ্চিমা বস্তুবাদী মানদণ্ডকে চূড়ান্ত আইডল হিসেবে ধরে নিই, তাহলে ইসলামের উন্নতির সূচককে আমরা অনুধাবন করতে পারব না। ইসলামে অগ্রসরতা ও উন্নতির ধারণা অনেক ব্যাপক। এখানে কেবল অর্থনীতি আর রাস্তাঘাট দিয়ে অগ্রসরতাকে পরিমাপ করা হয় না। শরয়ি আইন বাস্তবায়ন, ইনসাফ, নৈতিকতাসহ দুনিয়া ও আখিরাতমুখী এক প্রশস্ত সূচকের জায়গা থেকে ইসলাম অগ্রসরতাকে বিবেচনা করে।
সমস্যা হলো, বর্তমানে মুসলিমদের সন্তানরা মানসিকভাবে পাশ্চাত্য সংস্কৃতি ও মতাদর্শের কাছে পরাজয় বরণ করে নিয়েছে। তা ছাড়া নিজেদের দেশে ইসলামি শরিয়াহ বাস্তবায়িত না থাকার কারণে শরিয়াতের ছায়াতলে জীবনযাপনের স্বাদ ও প্রশান্তিও তারা অনুভব করতে পারছে না। তাদের চোখের সামনে উন্নতির যে দৃষ্টান্ত জলজ্যান্ত আছে, সেটা হলো পশ্চিমা সভ্যতা। ফলে পশ্চিমা মানদণ্ডই তাদের কাছে পরম ও চূড়ান্ত আইডল হিসেবে আস্থা জুগিয়ে নিয়েছে।
পশ্চিমের প্রতি এই বিশ্বাসের জায়গা থেকে যখন তারা 'মুসলিম' নামটি আঁকড়ে ধরে বস্তুবাদী উন্নতি অর্জনের পেছনে ছোটে, তখন সালাফদের বুঝ ও আমল তাদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আর তখনই শুরু হয় সালাফদের পাশ কেটে যাওয়ার জন্য নানা আপত্তি ও পথ তৈরির প্রচেষ্টা। এজন্য আমরা ফাহমুস সালাফের ওপর উত্থাপিত প্রতিটি আপত্তির গভীরেই বস্তুবাদী প্রভাব দেখতে পাব। এসব আপত্তি আদতে ইলমি ও একাডেমিক জায়গা থেকে তৈরি হয়নি; বরং এগুলোর উৎস হলো পাশ্চাত্যের কাছে আদর্শিক পরাজয়।
পূর্বসূরিদের চর্চা করার মধ্যে আরেকটি দিক হলো, তাদের ইতিবাচক দিকগুলো রপ্ত করা ও বাস্তবায়ন করা। নেতিবাচক বিষয়গুলো জানা ও পরিহার করা। তাই সালাফদের ফাহম কখনো দুনিয়াবি নিত্যনতুন সরঞ্জামের পথে অন্তরায় নয়; বরং এর আলোকেই আমরা জানতে পারব, এই চাকচিক্যময় পৃথিবীতে কোনটি পাপপূর্ণ ভোগ-বিলাসী সরঞ্জাম আর কোনটি তা নয়!
সুতরাং পূর্বসূরি সালাফদের সোনালি অতীতকে মনেপ্রাণে লালন করা মানেই অতীতকে আঁকড়ে ধরে অগ্রসরতার পথ রুদ্ধ করা নয়; বরং সালাফ তথা স্বর্ণযুগের সফল মানুষের বিশুদ্ধ ঐকমত্যপূর্ণ ফাহমের অনুসরণ তো কেবল কুরআন-সুন্নাহ কেন্দ্রিক জীবন পরিচালনার রাহনুমায়ির জন্য।
নিজের মূলকে পরিবর্তন করার নাম সৃজনশীলতা নয়। এটাকে সৃজনশীলতার পরিবর্তে আত্মবিস্মৃতি বলাই সবচেয়ে যৌক্তিক। প্রকৃত সৃজনশীলতা হলো, নিজের অতীত ও বিশুদ্ধ মূলকে বর্তমানে কার্যকর করা এবং সেটাকে অপরিবর্তনীয় ও অবিকৃতভাবে বর্তমানের সামনে তুলে ধরা ভবিষ্যৎ নিমার্ণের জন্য। আমাদের মনে রাখতে হবে, সত্য ও বিশুদ্ধের বিপরীতে অসত্য ও অশুদ্ধ কখনো সৃজনশীলতাকে ধারণ করে না। সৃজনশীলতা সমাদৃত ও উপকারকারী হওয়ার জন্য সত্য ও শুদ্ধতাকে ধারণ করা অপরিহার্য বিষয়। সুতরাং সালাফদের সত্য, বিশুদ্ধ ফাহম ও মানহাজকে পাশ কাটিয়ে কোনো সৃজনশীলতার চর্চা হতে পারেন না। যেটা হবে সেটা হলো, সত্যকে মিথ্যা দিয়ে এবং বিশুদ্ধকে অশুদ্ধ দিয়ে প্রলেপ দেওয়ার ব্যর্থ প্রচেষ্টা।

📘 ফাহমুস সালাফ > 📄 সপ্তম সংশয় : ঐতিহ্য (তুরাস) ও ফাহমুস সালাফ

📄 সপ্তম সংশয় : ঐতিহ্য (তুরাস) ও ফাহমুস সালাফ


ফাহমুস সালাফ ইসলামি তুরাসের অন্তর্ভুক্ত। আর ভুল-শুদ্ধ, হক-বাতিল মিলিয়েই তুরাস (ঐতিহ্য) হয়ে থাকে। সুতরাং ফাহমুস সালাফও হক বাতিলের সংশয় থেকে মুক্ত নয়। তাই ফাহমুস সালাফকে অনুসরণের দৃষ্টিতে না দেখে সমালোচনার দৃষ্টিতে দেখতে হবে। সমালোচনার ঊর্ধ্বে কেবল কুরআন ও সুন্নাহ।
নিরসন :
এক. 'তুরাস হক-বাতিল ভুল-শুদ্ধের সম্ভাবনা রাখে' এই দাবিতে কোনো ভুল নেই। তুরাস একটি ব্যাপক শব্দ। যার অর্থ হলো, পূর্ববর্তীদের রেখে যাওয়া ইলম, মতামত, ইজতিহাদ, তাদাব্বর, গবেষণাপদ্ধতি এই সবকিছু। আর এখানে ভুল-শুদ্ধ উভয়টারই অস্তিত্ব আছে। ফলে পরবর্তীদের জন্য দায়িত্ব হলো, এই ভুল-শুদ্ধকে পৃথক করা।
কিন্তু আরও জরুরি হলো ভুল-শুদ্ধ পার্থক্য করার জন্য যথাযথ মানদণ্ড, প্রতিষ্ঠিত কেন্দ্রস্থল ও সঠিক মানহাজের দ্বারস্থ হওয়া। প্রবৃত্তি কিংবা মানসিক ও বহিরাগত আদর্শিক চাপের ভিত্তিতে এই পৃথকীকরণ ইসলাম সমর্থিত নয়। অথচ বর্তমানে ফাহমুস সালাফের ওপর আপত্তিকারীরা দ্বিতীয় অবস্থার ভিত্তিতেই ভুল-শুদ্ধ নির্ণয় করছে।
দুই. এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, কুরআন ও সুন্নাহই একমাত্র ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে এবং হক-বাতিলের প্রধান মানদণ্ড। মতভেদ ও মতবিরোধের সময় মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের কুরআন ও সুন্নাহর দিকেই প্রত্যাবর্তন করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন,
وَمَا اخْتَلَفْتُمْ فِيْهِ مِنْ شَيْءٍ فَحُكْمُهُ إِلَى اللَّهِ ذَلِكُمُ اللَّهُ رَبِّي عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْهِ أُنِيبُ .
'তোমরা যে বিষয়েই মতভেদ করো তার মীমাংসা আল্লাহরই ওপর ন্যস্ত; তিনিই আল্লাহ, যিনি আমার প্রতিপালক। আমি তাঁরই ওপর ভরসা করেছি এবং আমি তাঁরই অভিমুখী হয়েছি।'১৭৩
ফাহমুস সালাফ এই দুই কেন্দ্রস্থলের সাথেই সংশ্লিষ্ট। কুরআন ও সুন্নাহ নিছক কিছু পুঁথিগত শব্দ নয়; বরং এগুলোর অর্থ ও মর্ম আছে। আছে আমলের রূপরেখা। আর সালাফদের ফাহম ও আমল হলো কুরআন-সুন্নাহ অনুধাবন ও বাস্তবায়ন করার কেন্দ্রস্থল।
এজন্যই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশনা হলো, উম্মতের মাঝে বিভিন্ন ফিরকার আবির্ভাব ও মানহাজগত দ্বন্দ্বের সময় যে কষ্টিপাথর দিয়ে হক- বাতিল নির্ণয় হবে, সেটা হলো কুরআন, সুন্নাহ এবং সালাফদের আমল ও বুঝ। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'বনি ইসরাইল ৭২টি দলে বিভক্ত হয়েছিল। আর আমার উম্মত ৭৩টি দলে বিভক্ত হবে। একটা দল ছাড়া তারা সকলেই জাহান্নামে যাবে।' সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! সেটি কোন দল? তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'যে দল আমার ও আমার সাহাবিদের পথের ওপর থাকবে।'১৭৪
এখানে কুরআন ও হাদিসের সাথে সাহাবিদের পথ ও পন্থার কথাও বলা হয়েছে। আর এটিই 'ফাহমুস সালাফ'। এটিই হলো মুমিনদের মানহাজ, যার অনুসরণের নির্দেশ মহান আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দিয়েছেন। তিনি বলেন,
وَمَنْ يُشَاقِقِ الرَّسُولَ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَى وَيَتَّبِعُ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِهِ مَا تَوَلَّى وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا.
“আর যে ব্যাক্তি তার সামনে হিদায়াত স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পরও রাসুলের বিরুদ্ধাচরণ করবে ও মুমিনদের পথ ছাড়া অন্য কোনো পথ অনুসরণ করবে, আমি তাকে সে পথেই ছেড়ে দেব, যে পথ সে অবলম্বন করেছে। আর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব, আর তা অতি মন্দ ঠিকানা।”১২
তিন. ওপরের আলোচনার ভিত্তিতে বলা যায়, ফাহমুস সালাফ ইসলামি তুরাসের অন্তর্ভুক্ত এবং তা হক। শরয়ি নুসুসের ক্ষেত্রে তাদের বুঝ ও আমলই উত্তম আদর্শ। তুরাস হক ও বাতিল উভয়টাই হওয়ার সম্ভাবন রাখে। ইসলামি তুরাস থেকে হক-বাতিল নির্ণয়ের জন্যও একটি মানদণ্ড থাকা আবশ্যক। সালাফদের ফাহম ও মানহাজই হলো আমাদের জন্য সেই মানদণ্ড, যার মাধ্যমে আমরা ইসলামি তুরাস থেকে আহলুস সুন্নাহর বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাতিল ফিরকাসমূহের মতামতকে পৃথক করব।

টিকাঃ
১৭৩. সুরা শুরা, আয়াত ১০
১৭৪. জামে তিরমিজি, হাদিস নং ২৬৪১, হাদিসটির সনদ হাসান। ইমাম তিরমিজি রহিমাহুল্লাহ এই হাদিসের সনদ সম্পর্কে বলেন, هذا حديث مفسر حسن غريب لا نعرف مثل هذا إلا من هذا ال AL CA

📘 ফাহমুস সালাফ > 📄 অষ্টম সংশয় : যুগের পরিবর্তন ও ফাহমুস সালাফ

📄 অষ্টম সংশয় : যুগের পরিবর্তন ও ফাহমুস সালাফ


সালাফদের বুঝ তাদের যুগের সাথে সংগতিপূর্ণ ও সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। যুগের পরিবর্তন ঘটেছে। সুতরাং যুগ পরিবর্তনের সাথে সাথে টেক্সটের (মূল নসের) বুঝেরও পরিবর্তন হওয়া জরুরি। কারণ কুরআন-সুন্নাহ প্রত্যেক যুগ ও স্থানের জন্য উপযোগী। সালাফদের বুঝকে আঁকড়ে ধরা নুসুসে শরিয়াহর এই গতিশীলতাকে নষ্ট করে দেয়।
নিরসন :
বর্তমান সময়ে এসে আমরা আধুনিক শিক্ষিত কিংবা পশ্চিমা সভ্যতা দ্বারা প্রভাবিত স্কলারদের মুখেও এ ধরনের বক্তব্য শুনতে পাই। এমনকি আন্তর্জাতিকভাবে প্রসিদ্ধি লাভ করা কিছু কিছু 'দুকতুর' এ বক্তব্যের মাধ্যমে নিজেদের ইজতিহাদি ও বুদ্ধিবৃত্তিক আলাপ জাহির করে থাকেন। বরাবরের মতো কোনো ব্যক্তির নাম ও বক্তব্যকে উল্লেখ করা ছাড়াই আমরা মূল আপত্তির বিষয়টি নিরসন করার চেষ্টা করব।
এক. এই বক্তব্যের মাধ্যমে শরয়ি নসসমূহের পবিত্রতা নষ্ট করে তা আপেক্ষিক বানিয়ে দেওয়া হয়। তখন প্রত্যেকের সামনে নিজের মনমতো কুরআন-সুন্নাহ ব্যাখ্যা করার পথ খুলে যায়। নুসুস বোঝার ক্ষেত্রে তখন একমাত্র কেন্দ্র হয়ে যায় মানুষের আকল ও কথিত বাস্তবতা, যা প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল এবং ত্রুটিযুক্ত।
ফলে এই দাবি মেনে নিলে শরিয়াতের বিধানসমূহ তার শ্বাশত মর্যাদা হারিয়ে ফেলে। নস বোঝার মৌলিক কোনো কেন্দ্র তখন অবশিষ্ট থাকে না।
এই চিন্তার পেছনে টেক্সট পাঠ-সংক্রান্ত একটি বিশেষ পশ্চিমা নীতি প্রভাব রেখেছে। সেই বিশেষ পদ্ধতিটির নাম হলো- 'তারিখিয়্যাহ বা ইতিহাসবাদ'। তারিখিয়্যাহর মূল কথা হলো, ওহির টেক্সট ও তার বুঝকে কেবলই একটি ঐতিহাসিক আবিষ্কার হিসেবে দেখা। ইতিহাসের নির্দিষ্ট সময় এই টেক্সটগুলো এসেছে এবং একে কেন্দ্র করে বিভিন্ন বুঝ তৈরি হয়েছে। ফলে এই বুঝগুলো নির্দিষ্ট ওই জমানার সাথেই বিশেষিত হয়ে থাকবে। ইতিহাস ও যুগের অগ্রসরের সাথে সাথে টেক্সটের এই বুঝগুলো নতুন নতুন রূপ ধারণ করবে। মানুষের জীবনযাত্রার অগ্রসরের সাথে সাথে প্রত্যেক জমানার লোক নিজেদের মতো করে নতুন নতুন বুঝ তৈরি করে নেবে। অর্থাৎ বক্তার উদ্দেশ্য কী, এই বিষয়ের চেয়ে এখানে যুগের পরিবর্তন বা বাস্তবতা বেশি গুরুত্ব পাবে।
আধুনিকপন্থি মুসলিমরা ইতিহাসবাদের মাধ্যমে চরমভাবে প্রভাবিত। এজন্য তারা মনে করে, 'সাহাবায়ে কেরাম ও সালাফদের ফাহম তাদের যুগের বাস্তবতা ও সংস্কৃতি অনুযায়ী তৈরি হয়েছিল। সেগুলো আমাদের বাস্তবতা ও সংস্কৃতির জন্য উপযোগী নয়। এজন্য আমাদেরকে বর্তমান সময়ের সাথে মিলিয়ে নুসুসে শরিয়াহ পাঠ করতে হবে। এই পাঠের ক্ষেত্রে আমাদের বাস্তবতার আলোকে নুসুসে শরিয়াহ বুঝতে হবে। নুসুসে শরিয়াহর কারও বুঝই অকাট্য না, সব বুঝই আপেক্ষিক, অকাট্য কিছু নয়।'
এ ধরনের দাবি সম্পূর্ণ ভুল। নুসুসে শরিয়াহ বোঝার ক্ষেত্রে সালাফে সালেহিনের মূল মনোযোগ কেবল তাদের যুগের সংস্কৃতির প্রতি ছিল না। আর না তাদের ফাহম নির্দিষ্ট বাস্তবতা ও সামাজিকতা নির্ভর ছিল। সাহাবায়ে কেরাম নুসুসে শরিয়াহকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আমল ও বুঝ, আরবি ভাষা, নুসুস অবতরণের প্রেক্ষাপট ইত্যাদি নুসুস সংশ্লিষ্ট বিষয় থেকে বুঝেছেন। এই বুঝ কিয়ামত পর্যন্ত আগত সময় ও বাস্তবতার সমাধান দিতে সক্ষম। তাই এর মাধ্যমে তারা উম্মতকে আপেক্ষিক নয়, বরং সার্বজনীন এক ফাহমের সিলসিলা উপহার দিয়েছেন। এরপর তাবেয়ি, তাবে-তাবেয়ি ও আইম্মায়ে কেরামের সেই ফাহমের ওপর ভিত্তি করে ইসলামি জ্ঞানশাস্ত্রের একটি বিশাল কাঠামো গঠিত হয়েছে, যেটি আমরা তাদের কিতাবাদিতে সুস্পষ্টভাবে দেখতে পাই। সুতরাং সালাফরা নির্দিষ্ট যুগ ও সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কুরআন-সুন্নাহকে বুঝেছেন এমন দাবি সম্পূর্ণ বাতিল। এই ধারণার কোনো ঐতিহাসিক বাস্তবতাও আমরা সালাফদের ইলমি কারনামায় পাব না। সালাফে সালেহিনের বুঝকে সাধারণভাবে আপেক্ষিক বানিয়ে দিয়ে, প্রত্যেকের বুঝের কাছে নুসুসে শরিয়াহ ছেড়ে দিলে দীনের কিছুই আর অবশিষ্ট থাকবে না। শরিয়াত তখন ওহির মর্যাদা হারিয়ে মানুষের অবাধ্য ও বিভ্রান্ত আকলের কাছে খেলনার পাত্রে পরিণত হবে। তখন আকলের ওপর ওহির কর্তৃত্ব থাকবে না; বরং ওহির ওপর প্রবৃত্তি প্রভাবিত মানবীয় আকল রাজ করবে, যা নির্ভুল জ্ঞানতত্ত্বকে ধ্বংস করে দেয়। কারণ মানব আকলের ওপর ওহির কর্তৃত্ব ছাড়া কোনো যথার্থ ও বিশুদ্ধ জ্ঞানতত্ত্ব অস্তিত্ব লাভ করতে পারে না।
এই দাবির আবশ্যিক ফল হলো, শরিয়াতের বিধানসমূহকে নির্দিষ্ট একটি জমানার জন্য বিশেষায়িত করে দেওয়া এবং শরয়ি নুসুসকে যুগের অনুগামী বানিয়ে নতুন ব্যাখ্যার আবিষ্কার করা। এভাবে কখনো শরিয়াতের অনুসরণ হয় না, তখন নিজের আকল কিংবা প্রবৃত্তির অনুসরণ করা হয়। ইসলামের দাবি এটা নয় যে, যুগের আলোকে কুরআন-সুন্নাহর ব্যাখ্যা পরিবর্তন করা হবে; বরং শরিয়াতের আলোকে যুগ পরিবর্তন করাই নবি-রাসুলদের কাজ ছিল।
ওহি প্রেরণ করে তার অনুসরণ ও তা আঁকড়ে ধরার নির্দেশ দেওয়া এবং বিমুখ হলে শাস্তির ভীতি প্রদর্শন, আবার একই সাথে সকল ধরনের মানুষের জন্য ইচ্ছামতো ওহির মর্ম বের করার উন্মুক্ত অনুমোদন দেওয়া পদ্ধতিগতভাবে একটি সাংঘর্ষিক বিষয়। মহান আল্লাহ তাআলা এ ধরনের সাংঘর্ষিক নির্দেশনা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।
দুই. কুরআন ও সুন্নাহ কিয়ামত পর্যন্ত প্রতিটি যুগ এবং প্রতিটি স্থানের জন্য উপযুক্ত। এই কথার অর্থ এটা নয় যে, যুগের সাথে সাথে কুরআন-সুন্নাহর ব্যাখ্যায় পরিবর্তন আসবে এবং যুগের যেকোনো পরিবর্তনকে ইসলাম গ্রহণ করে নেবে। ইসলাম মানবজাতির জন্য পূর্ণাঙ্গ এক জীবনব্যবস্থা। মানবজীবনের এমন কোনো অনুষঙ্গ নেই, যার ব্যাপারে ইসলামের বিধান নেই। ইসলামের এমন কিছু প্রিন্সিপাল (মূলনীতি) আছে, যা কিয়ামত পর্যন্ত যত পরিবেশ ও পরিস্থিতি আসবে, সবগুলোর ওপর তার বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে।
এটিই হচ্ছে ইসলামের গতিশীলতা। একজন মুজতাহিদ ফকিহের দায়িত্ব হলো, তিনি নবউদ্ভাবিত পরিস্থিতিতে শরিয়তের বক্তব্য কী, তা গবেষণা করে বের করবেন। তার গবেষণার উদ্দেশ্য থাকবে আল্লাহর বিধান পর্যন্ত পৌঁছা, নিজের প্রবৃত্তি কিংবা যুগের কাছে শরিয়াহকে বলি দেওয়া নয়।
যুগের প্রয়োজনই মানবজীবনের চূড়ান্ত প্রয়োজন নয়। অনেক সময় কৃত্রিম প্রয়োজনও তৈরি হয়। কাফের বা শত্রু পক্ষ থেকে কোনো অবস্থা চাপিয়ে দেওয়া, অথবা দীনের প্রভাব কমে যাওয়ার কারণে শরিয়াহর কিছু বিধান আমাদের জন্য কষ্টকর বা অসম্ভবপর মনে হতে পারে। এই অবস্থার জন্য আমাদের শরিয়াতের বিধান পরিবর্তন বা সংস্কার করে ফেলা কাম্য নয়; বরং যে অবস্থায় আমরা পতিত আছি, সে অবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টাই এখানে ইসলাম আমাদের থেকে কামনা করে। হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলি থানবি রহিমাহুল্লাহ শরিয়াহর বিধান পরিবর্তনের ব্যাপারে মডার্নিস্টদের জবাব দিতে গিয়ে বলেন, 'শরিয়াহর কোনো বিধান পালন করতে গিয়ে আমরা যদি কষ্টের সম্মুখীন হই তার মানে এই নয় যে, সমস্ত মানুষ এটি পালন করছে, তারপর কষ্টে পতিত হচ্ছে। এই বিষয়টি কেউ প্রমাণ করতে পারবে না। এই কাঠিন্যের বাস্তব কারণ হলো, শরিয়াহর বিধান পালনকারীর সংখ্যা পালন না করা ব্যক্তিদের তুলনায় খুবই নগণ্য। যখন অল্প সংখ্যক মানুষ শরিয়ahর বিধান পালন করতে চাচ্ছে, তখনই অধিকাংশরা তার বিরোধিতা করছে কিংবা তার সঙ্গ দিচ্ছে না। তখন সাধারণতই সংকীর্ণতা ও জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে। সুতরাং এখানে কঠোরতা এই কারণে সৃষ্টি হয়নি যে, স্বয়ং এই বিধানগুলোই জটিল; বরং এর জন্য দায়ী হলো, আমরা যে জীবনব্যবস্থায় বসবাস করছি, সেখানে অধিকাংশ অধিবাসী এই বিধানগুলোর বিরোধিতা করছে।’১৭৬
তিন. এই সংশয়ের আরেকটি মৌলিক ভিত্তি হলো, 'যুগের পরিবর্তনে ফতোয়ার পরিবর্তন' ফিকহের এই মূলনীতিটি। ফুকাহায়ে কেরামের বিভিন্ন ইবারত থেকে বোঝা যায় যে, জমানার পরিবর্তনে বিধানের পরিবর্তন হয়। তবে এই বক্তব্যটি সামগ্রিক কোনো উসুল বা মূলনীতি নয় যে, শরিয়াতের সকল বিধানই যুগের পরিবর্তনের সাথে পরিবর্তন হয়ে যাবে। যেমনটা বর্তমানের অনেক মুলহিদ ও মুক্তচিন্তার দাবীদাররা মনে করে থাকে। অথচ উল্লিখিত বক্তব্যের দ্বারা ফুকাহায়ে কেরামের উদ্দেশ্য হলো এমন সব বিধানাবলি, যেগুলো কুরআন-হাদিসে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা নেই এবং যে বিধানগুলো নির্দিষ্ট কোনো কারণ বা প্রচলনের ওপর নির্ভরশীল ছিল। ১৭৭
শরিয়াতের মৌলিক আহকামে যুগ ও অবস্থার পরিবর্তনে কোনো পরিবর্তন আসে না; পরিবর্তন আসে ফতোয়ায়। ফতোয়া হলো নির্দিষ্ট অবস্থার ওপর শরয়ি কোনো আহকামের প্রায়োগিক নির্দেশ। ফতোয়া আর শরয়ি বিধানের ভেতর পার্থক্য আছে। যেমন, 'সুদ হারাম' এটি হলো শরয়ি বিধান। আর নির্দিষ্ট কোনো লেনদেনকে সুদি লেনদেন হিসেবে চিহ্নিত করা, কিংবা নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে সুদের সাথে যুক্ত বলে মতামত দেওয়া হলো ফতোয়া। 'সুদ হারাম' এই হুকুম কিয়ামত পর্যন্ত অপরিবর্তিত থাকবে। কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো লেনদেন বা ব্যক্তি সারা জীবন সুদের ওপর অবিচল নাও থাকতে পারে। লেনদেনের অবস্থার পরিবর্তন কিংবা ব্যক্তির অবস্থান পরিবর্তন হতেই পারে। সেই পরিবর্তনের ফলে যদি উক্ত লেনদেন বা ব্যক্তি সুদের সংজ্ঞা থেকে বেরিয়ে আসে, তাহলে তাদের ব্যাপারে ফতোয়াতেও পরিবর্তন আসবে। তখন আর সেই লেনদেন সুদি অথবা সেই ব্যক্তি সুদের সাথে জড়িত হিসেবে ফতোয়া আসবে না।
সুতরাং শরিয়াতের বিধানে কোনো পরিবর্তন নেই। পরিবর্তন আসে ফতোয়ার ক্ষেত্রে। কারণ ফতোয়া প্রদান করা হয় নির্দিষ্ট অবস্থার পরিপেক্ষিতে। আবার অনেক সময় শরিয়ahর বিধান প্রয়োগ করা হয় নির্দিষ্ট প্রথা ও প্রচলনের ভিত্তিতে। এই ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট অবস্থা বা প্রচলনের পরিবর্তন হলে বিধানের প্রয়োগেও পরিবর্তন আসে। একটি দৃষ্টান্ত দিলে বিষয়টি ভালো করে বুঝে আসবে-যেমন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যক্তির করায়ত্তে (দখলে) নেই এমন জিনিস বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন।১৭৮ এই হাদিস থেকে বিধান প্রমাণিত হয় যে, করায়ত্তে আসা ছাড়া কোনো পণ্য বিক্রি বৈধ নয়। এই বিধানে কোনো পরিবর্তন আসবে না। কিয়ামত পর্যন্ত এই বিধান বহাল থাকবে। কিন্তু কোনো জিনিস কারও কাছে কীভাবে আসলে সেটা তার কবজায় বা দখলে এসেছে বলা হবে? এ বিষয়টির মাঝে যুগ ও সমাজের ভিন্নতায় পরিবর্তন এসেছে। ভিন্ন ভিন্ন প্রচলন চালু হয়েছিল। তাই মাসআলার প্রায়োগিক রূপ এবং ফাতোয়া প্রদানের ক্ষেত্রে ভিন্নতা ও পরিবর্তন এসেছে।
মহান আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, 'তোমরা স্ত্রীদের সাথে সদাচরণ করো।'১৭৯ এখন স্ত্রীদের সাথে সদাচারের নির্দেশ কিয়ামত পর্যন্ত বহাল থাকবে। কিন্তু সদাচারের মর্ম স্থান কাল পাত্রভেদে ভিন্ন হওয়ার ফলে নির্দিষ্ট কোনো ক্ষেত্রে সদাচার পালন বা লঙ্ঘন-সংক্রান্ত বিধান প্রয়োগে পরিবর্তন আসবে। যেমন কোনো এলাকায় বা পরিবারে তুই করে সম্বোধন সদাচারের পরিপন্থি হতে পারে; আবার কোনো এলাকায় বা পরিবারে এই সম্বোধন স্বাভাবিকও হতে পারে। তাই দুই অবস্থায় স্বামীর ওপর বিধানে ভিন্নতা আসবে। ১৮০
চার. আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, যুগের পরিক্রমায় মানবজাতি যেসব পরিস্থিতি ও অভ্যাস অতিক্রম করেছে, সেগুলো সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়া একটি স্বীকৃত বিষয়। এসব পরিস্থিতি ও অভ্যাস অসীম নয়; বরং সাদৃশ্যের দিক থেকে সীমাবদ্ধ বলা যায়। কারণ বুদ্ধি, আত্মা ও শরীর ইত্যাদির দিক থেকে পুরো মানবপ্রকৃতি সাদৃশ্যপূর্ণ। একমাত্র কৃত্রিমতা এসে এই জায়গায় বৈসাদৃশ্য তৈরি করতে পারে।
সুতরাং নব্য ও উদ্ভব কোনো পরিস্থিতির ওপর বিধান প্রয়োগের জন্য শরয়ি নুসুসের এমন কোনো বুঝ আবিষ্কারের প্রয়োজন নেই, যা সালাফদের বুঝ থেকে ভিন্ন হবে। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সালাফদের বুঝ ভালোভাবে অনুধাবন করে, উদ্ভব পরিস্থিতিকে পর্যবেক্ষণ করে তার ওপর সালাফদের বুঝ অনুপাতে শরয়ি বিধান প্রয়োগ করা। যা প্রত্যেক যুগের ফকিহদের দায়িত্ব ও কর্তব্য।

টিকাঃ
১৭৬ অনুম গ্রহি বাহাতুল মুফিদাহ, পৃষ্ঠা ১১৫
১৭৭. আত তাসলিম লিন নাসসিশ শরইয়্যি, পৃষ্ঠা ১৪১
১৭৮. মুজামুল আওসাত লিত তাবারানি, ৯০০৭
১৭৯. সুরা নিসা, আয়াত ১৯
১৮০. তবে উরফ তথা প্রথা গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য বেশ কিছু শর্ত আছে। যেমন: সমাজে প্রথাটি ব্যাপকভাবে প্রচলিত থাকা, প্রথাটি কুরআন-সুন্নাহ ও ইজমার বিপরীত না হওয়া, এর বিরুদ্ধে অন্য কোনো প্রথা প্রচলিত না থাকা ইত্যাদি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00