📘 ফাহমুস সালাফ > 📄 চতুর্থ সংশয় : তাদাব্বুর ও ফাহমুস সালাফ

📄 চতুর্থ সংশয় : তাদাব্বুর ও ফাহমুস সালাফ


কেউ কেউ বলে থাকেন যে, মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে তাদাব্বুর (গভীর চিন্তাভাবনা) করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। সালাফদের ফাহমের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার আবশ্যিকতা আল্লাহর এই নির্দেশের বিরুদ্ধে যায়। কারণ তাদাব্বুর একটি সামগ্রিক বিষয়। হতে পারে, বর্তমানে কোনো মুতাদাব্বিরের (চিন্তাভাবনাকারীর) সামনে কুরআনের কোনো আয়াতের এমন মর্ম ও রহস্য উন্মোচিত হয়েছে, যেটা পূর্ববর্তী সালাফদের কারও কাছে উন্মোচিত হয়নি। শরিয়াহ কিয়ামত পর্যন্ত পৃথিবীতে অবশিষ্ট থাকবে। এজন্য জরুরি হলো, শরিয়াহ নিয়ে চিন্তাভাবনা ও পর্যালোচনার দরজা বন্ধ না করে দেওয়া। যেন উম্মাহর সামনে এমন কোনো বিষয় উন্মোচিত হয়, যেটা পূর্ববর্তীদের সামনে হয়নি।
নিরসন :
প্রথমত, এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, মহান আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে কুরআন নিয়ে চিন্তাভাবনা করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন,
كِتَابٌ أَنْزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ لِيَدَّبَّرُوا آيَاتِهِ وَلِيَتَذَكَّرَ أُولُو الْأَلْبَابِ.
'(হে রাসুল!) এটি এক বরকতময় কিতাব, যা আমি তোমার প্রতি নাজিল করেছি, যাতে মানুষ এর (আয়াতের) মধ্যে চিন্তা করে এবং বোধসম্পন্ন ব্যক্তিগণ উপদেশ গ্রহণ করে।'১৫১
এমনকি যারা কুরআন নিয়ে তাদাব্বুর করে না, তাদের ব্যাপারে তিনি নিন্দা করেছেন। তিনি বলেন,
أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَى قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا. 'তারা কি কুরআন সম্পর্কে চিন্তা করে না, নাকি (তাদের) অন্তরে তালা লেগে আছে?'১৫২
وَ مِنْهُمْ أُمِّيُّونَ لَا يَعْلَمُوْنَ الْكِتُبَ إِلَّا أَمَانِي وَإِنْ هُمْ إِلَّا يَظُنُّونَ. 'তাদের মধ্যে কিছু লোক আছে নিরক্ষর, যারা কিতাব (তাওরাত)-এর কোনো জ্ঞান তো রাখে না, তবে কিছু আশা-আকাঙ্ক্ষা পুষে রেখেছে। তাদের কাজ কেবল এই যে, তারা অমূলক ধারণা করতে থাকে।'১৫৩
আয়াতসমূহের এই নির্দেশনার ফলেই সাহাবায়ে কেরাম কুরআন-সুন্নাহর বিভিন্ন মর্ম ও রহস্য বের করার প্রতি মনোনিবেশ করেছেন, যেগুলো শরিয়াতের প্রবর্তকের পক্ষ থেকে মানসুস ছিল না। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিআল্লাহু আনহু বলেন, 'কুরআন হলো মহান আল্লাহর ভোজসভা। সুতরাং যত পারো আল্লাহর ভোজসভা থেকে ইলম লাভ করে নাও।' তিনি আরও বলেন, 'কুরআনের রহস্য কখনো শেষ হওয়ার নয়।' ১৫৪
তাবেয়িরাও কুরআন থেকে এমন সব মর্ম ও রহস্য বের করে নিয়ে আসতেন, যেগুলো সাহাবায়ে কেরام সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেননি। তারা সাহাবায়ে কেরام থেকে কুরআনের মৌলিক তাফসির শিক্ষা লাভ করেছেন। আবার মৌলিক তাফসিরের বাইরেও তারা কুরআনের আয়াত নিয়ে গবেষণা করেছেন। একই কথা হাদিসের ক্ষেত্রেও। তাদাব্বরের মাধ্যমে তারা দীনের অনেক বুঝ ও রহস্য উম্মাহর সামনে নিয়ে এসেছেন।
সুতরাং এতে বোঝা যায়, সালাফদের বুঝ আঁকড়ে ধরার সাথে তাদাব্বুরের নির্দেশনার কোনো সংঘাত নেই। যদি দুটি ব্যাপার সাংঘর্ষিকই হতো, তাহলে তাবেইরাই সর্বপ্রথম তা অস্বীকার করতেন। অথচ বাস্তবতা হলো, সকল সালাফই সাহাবিদের ফাহমকে আঁকড়ে ধরার পাশাপাশি উম্মতকে অধিক পরিমাণে তাদাব্বুরের জন্য উৎসাহিত করেছেন। নুসুসে শরিয়াহ থেকে বিধান, মর্ম ও রহস্য উদঘাটন করার কথা বলেছেন। ইমাম বাগাভি রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'এক প্রকার ইলম হলো, যা কুরআন তিলাওয়াত ও তার অর্থের মাধ্যমে লাভ হয়। আরেক প্রকার ইলম হলো, যা চিন্তাভাবনা ও গবেষণার মাধ্যমে লাভ হয়। আর তা নুসুসের গভীরে গচ্ছিত মর্মের ওপর কিয়াস করার মাধ্যমে মুতাদাব্বিরের সামনে উন্মোচিত হয়। ১৫৫
(তবে এখানে খুব ভালোভাবে মনে রাখতে হবে, যেন তাদাববুরকারীর তাদাব্বুর শরিয়াতের কোনো উসুল বা মৌলিক নির্দেশনার খেলাফ না হয়। সাহাবিগণ হয়ে যে দীন আমাদের কাছে এসেছে, সে দীনের সিদ্ধান্তকৃত কোনো বিষয়ের বিরুদ্ধে না যায় এবং শরিয়াতের অন্য কোনো নসের বিপরীত না হয়।)
দ্বিতীয়ত, সালাফদের ফাহম আঁকড়ে ধরার মাধ্যমে তাদাব্বুর ও ইসতিমবাত বেশি সুশৃঙ্খল ও বিশুদ্ধ হয়। সালাফদের ফahম আমাদের তাদাব্বরকে সঠিক ও নিরাপদ পথে পরিচালিত করে। যেন কেউ তাদাব্বুর আর গবেষণার নামে আল্লাহ, তার রাসুল ও শরিয়াতের ব্যাপারে যা ইচ্ছা তা বলতে না পারে। এ বিষয়টি সুস্পষ্ট যে, যারাই কুরআন-হাদিসকে সালাফদের তাফসিরের বিপরীতে গিয়ে ব্যাখ্যা করেছে, তারাই আল্লাহর ব্যাপারে মিথ্যা বলেছে, আল্লাহর আয়াতের এমন ব্যাখ্যা আবিষ্কার করেছে, যা শরিয়াতের বিরুদ্ধে যায় এবং তারাই আল্লাহর কালামের বিকৃতি ঘটিয়েছে। আর তারাই ইলহাদ ও যানদাকার (দীন ত্যাগ ও ঈমান বিধ্বংসী বিকৃতির) দরজা উন্মোচন করেছে।১৫৬
তৃতীয়ত, সালাফরা যে ফাহমের ওপর একমত পোষণ করেছেন এবং যে ফাহমের ক্ষেত্রে তাদের মতভিন্নতা দেখা যায় না, সে ফাহমকে অবশ্যই আঁকড়ে ধরতে হবে। আর যে ফাহমের ক্ষেত্রে তাদের ভেতর মতবিরোধ হয়েছে এবং সে মতবিরোধ বর্ণিত হয়ে এসেছে, সেখানে খালাফের যোগ্য ব্যক্তিদের অবকাশ আছে চিন্তাভাবনা ও পর্যালোচনা করে সবচেয়ে সঠিক ফাহমটি গ্রহণ করার।
চতুর্থত, আমাদের তাদাব্বর ও ইসতিমবাত শুদ্ধ হওয়ার জন্য সালাফদের ফাহম আকড়ে ধরা প্রধান শর্ত। সুতরাং তাদাব্বুরের জন্য সবস্থ শরিয়াহর মৌলিক ও শুদ্ধ মর্ম জেনে নেওয়া। আর এই ক্ষেত্রে সালাফদের ফাহমই মৌলিকত্ব ও বিশুদ্ধতার দাবি রাখে। এজন্য উলামায়ে কেরাম তাদাব্বরের জন্য কিছু নিয়ম ও শর্তাবলি বেঁধে দিয়েছেন। যেগুলো লক্ষ না রাখলে তাদাব্বর ভুল পথে পরিচালিত হবে এবং ব্যক্তিকে চরম ভ্রষ্টতার দিকে নিয়ে যাবে। আমরা এখানে মৌলিক কিছু শর্ত তুলে ধরছি-
১. উদঘাটিত অর্থ বা মর্ম সালাফের ফাহমের বিরোধী হতে পারবে না। কারণ এতে করে সকল সালাফের ওপর দীন না বোঝার মতো মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হয়। তারা ভ্রান্তি ও মুর্খতার ওপর একমত হয়েছেন-এ ধরনের জঘন্য দাবি করা হয়। আর এ ধরনের দাবি সুস্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যাত।
তাদাব্বুর ও ইসতিমবাত যেহেতু আয়াতের সঠিক অর্থ জানার ওপর নির্ভরশীল, এজন্য উদঘাটিত মর্মও সালাফের মৌলিক ও শুদ্ধ ফাহমের সাথে বিরোধহীন হতে হবে। পাশাপাশি সালাফের ফাহম ও উদঘাটিত নতুন ফাহমের মাঝে পরস্পর সম্পর্ক বা যোগসূত্র থাকতে হবে। ইমাম কুরতুবি রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'তাফসির করতে গেলে প্রাথমিকভাবে নসের সাধারণ ও বাহ্যিক যে ফাহম রয়েছে, সেটা নিয়ে আসতে হবে। এর জন্য নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সালাফের কোনো বর্ণনা অবলম্বন করতে হবে। পাশাপাশি কোনো উসতাজ বা শায়খ থেকেও এ ব্যাপারে শোনার আশ্রয় নিতে হবে। এতে করে আশা করা যায়, সে প্রথমেই ভুলের ময়দান থেকে বেঁচে থাকতে পারবে। অতঃপর এর ওপর ভিত্তি করে তাফসিরের গভীরে প্রবেশ করতে পারবে। নিজস্ব ফাহম ও ইসতিমবাত আরও প্রশস্ত করতে পারবে। সুতরাং বাহ্যিক তাফসির জানার পূর্বে গভীর মর্মে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।'১৫৭
কারণ যে ব্যক্তি দাবি করে যে, মৌলিক তাফসির জানার আগেই সে কুরআনের গভীর রহস্যে পৌঁছে গেছে, সে মূলত ওই ব্যক্তির মতো, যে দরজায় প্রবেশের আগেই ঘরের ভেতরে চলে যাওয়ার দাবি করে। ১৫৮ আর নুসুসে শরিয়াহর মৌলিক, বাহ্যিক ও বিশুদ্ধ তাফসির সেটিই, যা সালাফরা বুঝেছেন।
২. উদঘাটিত মর্ম আরবি ভাষার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। কারণ আরবি ভাষা শরিয়াতের প্রধান ও মৌলিক ভাষা। ইমাম শাতেবি রহিমাহুল্লাহ এটাকে প্রথম শর্তের স্থানে রেখেছেন। তিনি বলেন, 'কুরআন থেকে উদঘাটিত যে মর্ম আরবি ভাষার প্রচলনে নেই, উলুমে কুরআনে এর কোনো স্থান নাই। সেটা এমন কোনো বিষয় হিসেবে গৃহীত হবে না, যার মাধ্যমে উপকার লাভ করা যায়, কিংবা কাউকে উপকৃত করা যায়। যে এটাকে গ্রহণযোগ্য হিসেবে দাবি করবে, সে তার দাবিতে মিথ্যাবাদী হবে।'১৫৯
৩. নতুন উদঘাটিত মর্মের পক্ষে কুরআন ও সুন্নাহর সমর্থন থাকতে হবে। এটা ইমাম শাতেবি রহিমাহুল্লাহর কাছে দ্বিতীয় শর্ত।
ওপরের শর্তসমূহের ভিত্তিতে বলা যায়, নুসুসে শরিয়াহর এমন নতুন মর্ম আবিষ্কার করা যায়, যা সালাফদের থেকে বর্ণিত নয়। তবে এই ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে-
১. যদি উদ্দেশ্য হয়ে থাকে যে সালাফদের ফাহমের সাথে বিরোধহীন মর্ম উদঘাটন, যার মাধ্যমে পূর্ববর্তীদের ওপর দীন না বোঝার অপবাদ আরোপিত হয় না, তাহলে এতে কোনো সমস্যা নেই। কারণ এই কুরআনের রহস্য শেষ হবার নয়।
অনুরূপ আমাদের রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেও মহান আল্লাহ তাআলা জামিউল কালিম দান করেছেন। কিয়ামত পর্যন্ত মুসলিমরা নুসুসে শরিয়াহ থেকে নিত্য নতুন রহস্য ও গভীর মর্ম উদঘাটন করতে থাকবে। এটি মহান আল্লাহ তাআলার বিশেষ অনুগ্রহ, যাকে ইচ্ছা তাকে দান করে থাকেন। পবিত্র কুরআন হলো প্রবাহমান নদীর মতো। এই নদী থেকে আল্লাহর নির্ধারিত অংশ অনুযায়ী প্রত্যেকেই মনিমুক্তা আহরণ করতে থাকবে।
২. আর যদি এর দ্বারা সালাফদের ফাহমের বিরোধী কোনো মর্ম উদঘাটনের দাবি করা হয়, তবে সে মর্ম গ্রহণযোগ্য হবে না; বরং প্রত্যাখ্যাত হবে। কারণ এর মাধ্যমে শ্রেষ্ঠ যুগের মানুষ সালাফদের ওপর ভ্রান্তি ও অজ্ঞতার মিথ্যা অভিযোগ আরোপ করা হয়। অথচ দীনের বুঝ, ফিকহ, আমল সবক্ষেত্রে তারা শ্রেষ্ঠত্বের সার্টিফিকেট অর্জনকারী প্রজন্ম। আবার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'আমার উম্মত ভ্রান্তির ওপর একমত হবে না।' সুতরাং সালাফদের বিরুদ্ধে গিয়ে নতুন মর্ম আবিষ্কার করতে গেলে এর অর্থ দাঁড়ায়, তারা সকলেই ভুলের ওপর একমত ছিলেন।
ওপরের আলোচনার ভিত্তিতে আমরা তাদাব্বুরের মাজালগুলো (ক্ষেত্র) চিহ্নিত করতে পারি-
১. নুসুস থেকে বিধান সংশ্লিষ্ট নয় এমন মর্ম উদঘাটন করা, যা সালাফদের ফাহমের বিরুদ্ধে যায় না।
২. আপতিত নতুন পরিস্থিতিতে ও নতুন বিষয়ে নুসুসে শরিয়াহ থেকে বিধান উদঘাটন করা।
৩. সালাফদের মাঝে মতবিরোধপূর্ণ ফাহমসমূহ থেকে তাদাব্বুর ও পর্যালোচনার মাধ্যমে সবচেয়ে যথার্থ মর্মকে উদঘাটন করা। তবে তাদাব্বুরের এই মাজাল বা ক্ষেত্র ইলমের শাস্ত্রীয় ব্যক্তিবর্গ ছাড়া আর কারও জন্য নয়।
৪. পাঠক বা মুতাদাব্বিরের নিজস্ব অবস্থা বিবেচনায় এই অনুসন্ধান চালানো যে, অমুক আয়াতের ব্যাপারে আমি কোন অবস্থানে আছি, আমার কোথায় থাকা উচিত ছিল এবং আমি কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। সামগ্রিকভাবে সকলের জন্য এবং বিশেষভাবে সাধারণ মানুষ ও তালেবুল ইলমের জন্য এটাই তাদাব্বুরের প্রধান মাজাল বা ক্ষেত্র।
সুতরাং সালাফের ফাহম আঁকড়ে ধরা কখনোই আল্লাহর নির্দেশিত তাদাব্বুরে কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক কোনো বিষয় নয়; বরং সালাফদের ফাহম ছাড়া আমাদের তাদাব্বুর সঠিক ও নিরাপদ পথে পরিচালিত হতে পারবে না। সালাফের ফাহম আমাদের তাদাব্বরকে সুশৃঙ্খল, নিরাপদ ও অধিক শক্তিশালী করে।

টিকাঃ
১৫১. সুরা সাদ, আয়াত ২৯
১৫২. সুরা মুহাম্মাদ, আয়াত ২৪
১৫৩. সুরা বাকারা, আয়াত ৭৮
১৫৪. সুমামা লাবদুর রাজ্জাক, হাদিস নং ২০৯৭; আযযুহদ, ইবনুল মুবারাক, ৮০৮
১৫৫. মাআলিমুত তানযিল, ২/২৫৫
১৫৬. মাজমুউল ফাতাওয়া, ১৩/২৪৩
১৫৭. আল জামিউ লি আহকামিল কুরআন, ১/৫৯
১৫৮. আল ইতকান লিস সুয়তি, ২/২৬৭
১৫৯. আল মুওয়াফাকাত, দারু ইবনে আফফান ০১১.০

📘 ফাহমুস সালাফ > 📄 পঞ্চম সংশয় : আকল ও ফাহমুস সালাফ

📄 পঞ্চম সংশয় : আকল ও ফাহমুস সালাফ


সালাফদের ফাহম আঁকড়ে ধরলে মানুষের আকলকে অকেজো করে রাখা হয় এবং আকলের অবমূল্যায়ন করা হয়। অথচ শরিয়াহর দলিল-আদিল্লার ক্ষেত্রে আকলই হলো মূল; বরং আকলই হলো শরিয়াহর মূল উৎস।
আবার কোনো কোনো বুদ্ধিজীবী বলে থাকেন, এর চেয়ে বড় চিন্তাগত সংকট আর কী হতে পারে যে, উম্মতের আকলকে অকেজো করে মৃত মানুষদের কাছ থেকে জীবিত মানুষদের জন্য সমাধা গ্রহণ করা লাগবে?
তাদের কারও কারও মতে, বর্তমান মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় সংকট হলো—নিজেদের আকলের ওপর পূর্ববর্তী মৃতদের নকল (বর্ণিত মতামত)-কে প্রাধান্য দেওয়া।
নিরসন :
এই ধরনের আপত্তির ধারা নতুন কিছু নয়। অনেক পুরাতন। বর্তমান মডার্নিস্টরা এই আপত্তি সামনে আনলেও পূর্বে আহলুস সুন্নাহ থেকে বহির্ভূত মুতাজিলারাও এই আপত্তি তুলেছিল। তখন তাদের আপত্তির উৎস ছিল সে সময়ের গ্রিক দর্শন। আর বর্তমানে এই আপত্তির উৎস হলো পশ্চিমা দর্শন 'হিউম্যানিটি'।
ইসলাম কখনো আকলকে অবমূল্যায়ন করেনি। ইসলামি শরিয়ায় আকলের গুরুত্ব একটি স্বীকৃত বিষয়। পবিত্র কুরআনে প্রায় ৪৯ বার আকল শব্দটি কয়েকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। ১৬০ আল্লাহকে চেনার জন্য, সত্যকে বোঝার জন্য এবং ইসলামকে গ্রহণ করার জন্য কুরআনের অসংখ্য জায়গায় মহান আল্লাহ তাআলা মানুষকে আকল ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
قُلْ إِنَّمَا اَعِظُكُمْ بِوَاحِدَةٍ أَنْ تَقُومُوا لِلَّهِ مَثْنَى وَفُرَادَى ثُمَّ تَتَفَكَّرُوا.
'(হে রাসুল!) তাদেরকে বলো, আমি তোমাদেরকে কেবল একটি বিষয়ে উপদেশ দিচ্ছি। তা এই যে, তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে দু-দুজন অথবা এক-একজন করে দাঁড়িয়ে যাও, তারপর ইনসাফের সাথে চিন্তা করো। ১৬১ অন্যত্র তিনি বলেন,
الَّذِينَ يَذْكُرُونَ اللَّهَ قِيمًا وَقُعُودًا وَ عَلَى جُنُوبِهِمْ وَ يَتَفَكَّرُونَ فِي خَلْقِ السَّمَاتِ وَالْأَرْضِ رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هُذَا بَاطِلًا سُبْحْنَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ.
'যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শুয়ে (সর্বাবস্থায়) আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা করে (এবং তা লক্ষ্য করে বলে ওঠে), হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি এসব উদ্দেশ্যহীনভাবে সৃষ্টি করেননি। আপনি এমন (অনর্থক) কাজ থেকে পবিত্র। সুতরাং আপনি আমাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন।১৬২
قُلِ انْظُرُوا مَا ذَا فِي السَّمَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا تُغْنِي الْأَيْتُ وَالنُّذُرُ عَنْ قَوْمٍ لَّا يُؤْمِنُونَ.
'(হে নবি!) তাদেরকে বলো, একটু লক্ষ করে দেখো আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীতে কী কী জিনিস আছে? কিন্তু যেসব লোক ঈমান আনার নয়, (আসমান ও জমিনে বিরাজমান) নিদর্শনাবলি ও সতর্ককারী (নবি)- গণ তাদের কোনো কাজে আসে না।'১৬৩
যারা আকল থেকে উপকৃত হয় না, পবিত্র কুরআনে তাদের নিন্দা করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
صُمٌّ بُكُمْ عُمْيٌ فَهُمْ لَا يَعْقِلُونَ.
'তারা বধির, মূক, অন্ধ। সুতরাং তারা কিছুই বোঝে না।'১৬৪
بَلْ أَكْثَرُهُمْ لَا يَعْقِلُونَ .
'কিন্তু তাদের অধিকাংশই বুদ্ধিকে কাজে লাগায় না।'১৬৫
وَقَالُوا لَوْ كُنَّا نَسْمَعُ أَوْ نَعْقِلُ مَا كُنَّا فِي أَصْحُبِ السَّعِيرِ.
'তারা আরও বলবে, যদি আমরা শুনতাম অথবা বুদ্ধি খাটাতাম, তবে আমরা জাহান্নামবাসীদের মধ্যে থাকতাম না।'১৬৬
শুধু তাই নয়, আকল হলো বান্দার ওপর শরিয়াতের বিধান কার্যকর হওয়ার পূর্বশর্ত। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'তিন ব্যক্তি থেকে হিসাবের কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে—ঘুমন্ত ব্যক্তি থেকে জাগ্রত না হওয়া পর্যন্ত, ছোট বাচ্চা থেকে প্রাপ্তবয়স্ক (বালেগ) না হওয়া পর্যন্ত এবং পাগল থেকে বুঝ ও জ্ঞান না ফেরা পর্যন্ত।'১৬৭
কিন্তু মানুষের আকল স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। এই আকল বিভিন্ন কিছু দ্বারা প্রভাবিত হয়। নিজের অভিজ্ঞতা, আবেগ অনুভূতি, প্রবৃত্তি, চারপাশের পরিবেশসহ আরও অনেক প্রবণতা মানুষের আকলে প্রভাব ফেলে। এটা সে অনুধাবন করুক কিংবা না করুক। এজন্য দেখা যায়, কোনো কোনো বিষয়ে মানুষ একবারেই তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ফেলে। কারণ তার আকল বহিরাগত বিভিন্ন প্রবণতা থেকে প্রভাবিত হয়।
ফলে আকলের এমন কিছু সূত্র দরকার, যার আলোকে আকল পরিচালিত হলে এগুলো তাকে বিভিন্ন প্রবণতা থেকে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় রেখে সঠিক দিকে নিয়ে যাবে। মৌলিকভাবে সে সূত্র হলো ‘ওহি’। এজন্য আকল স্বয়ংসম্পূর্ণ কিছু নয়; বরং আকলের শক্তি চোখের দৃষ্টিশক্তির মতো। চোখের সাথে সূর্য ও অন্য কিছুর আলো মিলিত হলে যেমন দৃষ্টিশক্তি সঠিকভাবে কাজ করে, তেমনিভাবে আকলের সাথে যখন ঈমান ও কুরআন-সুন্নাহর আলো মিলিত হবে, তখন তা সঠিকভাবে কাজ করবে।১৬৮
এই বিষয়টি আমরা পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে দেখতে পাব। যেমন মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
فَإِنْ لَّمْ يَسْتَجِيبُوا لَكَ فَاعْلَمُ أَنَّمَا يَتَّبِعُوْنَ أَهْوَاءَهُمْ وَ مَنْ أَضَلُّ مِمَّنِ اتَّبَعَ هَوْنَهُ بِغَيْرِ هُدًى مِّنَ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّلِمِينَ.
‘তারা যদি তোমার ফরমায়েশ মতো কাজ না করে, তবে বুঝবে, তারা মূলত তাদের খেয়াল-খুশিরই অনুসরণ করে। যে ব্যক্তি আল্লাহর পক্ষ হতে আগত হেদায়াত ছাড়া কেবল নিজ খেয়াল-খুশির অনুসরণ করে, তার চেয়ে বেশি পথভ্রষ্ট আর কে হতে পারে? নিশ্চয়ই আল্লাহ জালেম সম্প্রদায়কে হেদায়াত দান করেন না।’
অন্যত্র বলেছেন,
وَ أَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَبَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ الْكِتٰبِ وَ مُهَيْمِنًا عَلَيْهِ فَاحْكُمْ بَيْنَهُمْ بِمَا اَنْزَلَ اللَّهُ وَلَا تَتَّبِعُ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ لِكُلِّ جَعَلْنَا مِنْكُمْ شِرْعَةً وَ مِنْهَاجًا.
‘এবং (হে রাসুল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমি তোমার প্রতিও সত্য সংবলিত কিতাব নাজিল করেছি, তার পূর্বের কিতাবসমূহের সমর্থক ও সংরক্ষকরূপে। সুতরাং তাদের মধ্যে সে বিধান অনুসারেই বিচার করো, যা আল্লাহ নাজিল করেছেন। আর তোমার নিকট যে সত্য এসেছে, তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করো না।’
আল্লামা শাতেবি রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'যে বিষয় প্রাধান্য পাওয়ার উপযুক্ত, তাকে প্রাধান্য দেওয়া আবশ্যক। সে জিনিসটা হলো শরিয়াহ। আর যে জিনিস প্রাধান্য না পাওয়ার উপযুক্ত, সেটাকে প্রাধান্য না দেওয়াই আবশ্যক। সে জিনিসটা হলো আকল। সুতরাং অপূর্ণাঙ্গ ও মুখাপেক্ষী বিষয়কে পূর্ণাঙ্গ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ বিষয়ের ওপর বিচারক মানা মোটেও শুদ্ধ নয়। এটি যুক্তি ও দলিল উভয়টিরই পরিপন্থি।'১৭১
সুতরাং ওহির সূত্র ছাড়া মানুষ যখন আকল ব্যবহার করে, তখন মূলত সেটা আকলে সালিম থাকে না; বরং সেটি প্রবৃত্তি বা বহিরাগত কোনো প্রবণতায় প্রভাবিত আকলে ফাসেদ বা অসুস্থ বিবেক হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে বাহ্যিকভাবে মনে হতে পারে, ব্যক্তি খুবই যৌক্তিক ও জ্ঞানসম্পন্ন দলিল পেশ করছে। অথচ প্রকৃতপক্ষে তা প্রবৃত্তি ছাড়া কিছুই না।
বোঝা গেল, যেকোনো চিন্তা ও বিবেচনার ক্ষেত্রে মানুষের আকল স্বয়ংসম্পূর্ণ না। মানুষের আকল বহিরাগত নানান প্রবণতা দ্বারা প্রভাবিত হয়। ওহির বুঝের ক্ষেত্রেও সে এসব প্রবণতা থেকে মুক্ত নয়। তাই নুসুসে শরিয়াহ বোঝার ক্ষেত্রেও মানুষের আকলকে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেওয়া যাবে না। তা ছাড়া নুসুসে শরিয়াহর ক্ষেত্রে অন্যতম উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের উদ্দেশ্য পর্যন্ত পৌঁছা। আর যেহেতু মানুষের আকল নানান প্রবণতা দ্বারা প্রভাবিত হয়, ফলে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের মর্মে পৌঁছতে সে বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তার আকল তাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পরিবর্তে প্রবৃত্তি কিংবা তার অজান্তেই ভিন্ন কোনো স্বার্থের দিকে প্রবাহিত করতে পারে। তাই, নুসুসে শরিয়াহর মাধ্যমে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বুঝ পর্যন্ত পৌঁছতে আকলকে ব্যবহারের জন্য তার সামনে অবশ্যই কেন্দ্রীয় ও মানদণ্ডের মর্যাদা রাখে এমন ফাহমসমূহ বিদ্যমান থাকা জরুরি। আরও জরুরি যথার্থ কিছু মূলনীতির। সালাফদের ফাহম ও মানহাজ হলো সেই মানদণ্ড ও কেন্দ্র। সালাফদের ফাহম কখনোই আমাদের আকলকে জুমুদের (অচলাবস্থার) দিকে ঠেলে দেয় না, আকলকে অকেজো করে রাখে না; বরং তা আমাদের আকলের আলো সরবরাহ করে এবং বিভিন্ন প্রবণতা থেকে বাঁচিয়ে একে সঠিক পথে প্রবাহিত করে।
আবার বহিরাগত বিভিন্ন আঘাতে চোখের দৃষ্টিশক্তি যেমন ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, তেমনিভাবে আকলও বহিরাগত প্রভাবে ক্ষয় হতে পারে, হতে পারে অসুস্থ। এই এক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলেও আমাদের সালাফদের আকল বর্তমানের লোকদের চেয়ে শক্তিশালী, সুস্থ ও পরিচ্ছন্ন ছিল। তারা ছিলেন রাসুলের মুখে স্বীকৃত শ্রেষ্ঠ জমানার। সমাজে বিভিন্ন অপরাধের উপস্থিতি থাকলেও ইসলামি শরিয়াহ ছিল সার্বিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। আর বর্তমানে ইসলাম কোথাও প্রতিষ্ঠিত নেই। বহিরাগত বিভিন্ন সভ্যতা ও সংস্কৃতি মুসলিমদের ওপর রাজ করছে। কুফর, শিরক, পাপাচারের এত জয়জয়কার সালাফদের সময় ছিল কল্পনাতীত বিষয়।
সুতরাং সালাফদের ফাহম ও মানহাজের ওপর নির্ভরশীলতা মানে আকলকে অকেজো করে রাখা নয়; বরং মানুষের আকলকে সুস্থ ও নিরাপদ রাখতেই নুসুসে শরিয়াহ ও সালাফদের ফাহমকে সূত্র মানা হয় এবং এর মাধ্যমে আকলকে যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়, যে মূল্যায়নের সে উপযুক্ত। আকলকে অবাধ ছেড়ে দেওয়া কিংবা অকেজো করে রাখা উভয়টিই আকলকে অবমূল্যায়ন করার শামিল।

টিকাঃ
১৬০. কিমাতুল আকল ফিল ইসলাম, পৃষ্ঠা ১৩
১৬১. সুরা সাবা, আয়াত ৪৬
১৬২. সুরা আলে ইমরান, আয়াত ১৯১
১৬৩. সুরা ইউনুস, আয়াত ১০১
১৬৪. সুরা বাকারা, আয়াত ১৭১
১৬৫. সুরা আনকাবুত, আয়াত ৬৩
১৬৬. সুরা মুলক, আয়াত ১০
১৬৭. মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ২৪৬৯৪; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৪৪০০
১৬৮. মাজমুউল ফাতাওয়া, ৩/৩৩৯
জাসাস, আয়াত ৫০
Sharb, আয়াত ৪৮
১৭১. আল ইতিসাম, ৩/২২৮

📘 ফাহমুস সালাফ > 📄 ষষ্ঠ সংশয় : সৃজনশীলতা ও ফাহমুস সালাফ

📄 ষষ্ঠ সংশয় : সৃজনশীলতা ও ফাহমুস সালাফ


ফাহমুস সালাফকে আঁকড়ে ধরার অর্থ জীবিতদের ব্যাপারে মৃতকে জিজ্ঞেস করা এবং সৃজনশীলতাকে বর্জন করে (অতীতের) চর্বিতচর্চা করা।
নিরসন :
মডার্ন সংস্কারপন্থিদের মুখে এ ধরনের অনেক বক্তব্যই শোনা যায়। যেসব বক্তব্যের মাধ্যমে তারা মূলত ফাহমুস সালাফের মর্যাদাকে খাটো করে এবং ফাহমুস সালাফকে বর্তমান মুসলিম উম্মাহর উন্নতি ও উত্থানের পথে অন্যতম বাধা হিসেবে উপস্থাপন করে।
যদি কোনো মুসলিম সততা ও বস্তুনিষ্ঠতার সাথে লক্ষ করে, তাহলে সে ফাহমুস সালাফকে আঁকড়ে ধরাই বিশুদ্ধ ও প্রশংসনীয় মনে করবে।
প্রথমত, সালাফরা হলেন এই উম্মতের শ্রেষ্ঠ ও সৎ অংশ। তাদের নিয়ে আমরা গর্ব করি এবং তাদের আমরা সম্মান করি। কারণ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের প্রশংসা করেছেন এবং উম্মতের ওপর তাদের শ্রেষ্ঠত্বের সার্টিফিকেট দিয়েছেন। তাদের পথের অনুসরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। তাদের ফাহম ও মানহাজের প্রতি আমাদের আস্থাশীলতা আলস্য কিংবা গোত্রপ্রীতি থেকে তৈরি নয়; বরং এর পেছনে শরয়ি ও ইলমি কারণ আছে। যেগুলোর যৌক্তিকতা সুস্থ মস্তিষ্কের কোনো ব্যক্তি অস্বীকার করতে পারবে না।
দ্বিতীয়ত, সালাফরা হলেন সেই প্রজন্ম, যারা শরিয়াহকে তাদের জীবনে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বাস্তবায়ন করেছেন। ইসলামের দৃষ্টিতে তারা আমাদের জন্য জীবন্ত অতীত। পক্ষান্তরে দীনের বিচারে বর্তমান উম্মাহ হলো মৃত জাতি। সুতরাং দীনের ক্ষেত্রে তাদের কাছে প্রত্যাবর্তন করা প্রকৃতপক্ষে আলোর কাছে আঁধারের, জীবন্তের কাছে ঘুমন্তের প্রত্যাবর্তন।
এজন্যই ইমাম মালেক রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, 'এই উম্মতের শেষ অংশের সংস্কার সে পথেই হবে, যে পথে তার প্রথম অংশ সংশোধিত হয়েছে।’১৭২
ইমাম মালেক রহিমাহুল্লাহর বক্তব্যের উদ্দেশ্য এটা নয় যে, সালাফ বা পূর্বসূরিদের যাতায়াত-ব্যবস্থা, বাসস্থানের কাঠামো, উৎপাদন শিল্প, চিকিৎসা, শিক্ষা, সেনাবাহিনীর কাঠামো ইত্যাদিতে ফিরে যেতে হবে; বরং সালাফদের দিকে ফিরে যাওয়ার অর্থ হলো, দীন বোঝা ও মানার ক্ষেত্রে তাদের অবস্থার দিকে প্রত্যাবর্তন করা।
এর থেকে স্পষ্ট হয়, সালাফদের অতীতে প্রত্যাবর্তন এবং উন্নতি-অগ্রসরতার মাঝে কোনো বিরোধ নেই; বরং সামগ্রিকভাবে প্রকৃত উন্নতি তখনই সাধন হবে, যখন মুসলিম উম্মাহ আল্লাহর শরিয়াহকে আঁকড়ে ধরবে। শরিয়াহ ছাড়া তারা যেখানেই পৌঁছাবে, কখনোই তাদের সামগ্রিক ও প্রকৃত উন্নতি অর্জন হবে না। আল্লাহর শরিয়াহ ও মানবসভ্যতার উন্নতি—এ দুটির মাঝে আবশ্যিক সম্পর্ক বিদ্যমান।
উন্নতি ও অগ্রসরতার ক্ষেত্রে আমরা যদি পশ্চিমা বস্তুবাদী মানদণ্ডকে চূড়ান্ত আইডল হিসেবে ধরে নিই, তাহলে ইসলামের উন্নতির সূচককে আমরা অনুধাবন করতে পারব না। ইসলামে অগ্রসরতা ও উন্নতির ধারণা অনেক ব্যাপক। এখানে কেবল অর্থনীতি আর রাস্তাঘাট দিয়ে অগ্রসরতাকে পরিমাপ করা হয় না। শরয়ি আইন বাস্তবায়ন, ইনসাফ, নৈতিকতাসহ দুনিয়া ও আখিরাতমুখী এক প্রশস্ত সূচকের জায়গা থেকে ইসলাম অগ্রসরতাকে বিবেচনা করে।
সমস্যা হলো, বর্তমানে মুসলিমদের সন্তানরা মানসিকভাবে পাশ্চাত্য সংস্কৃতি ও মতাদর্শের কাছে পরাজয় বরণ করে নিয়েছে। তা ছাড়া নিজেদের দেশে ইসলামি শরিয়াহ বাস্তবায়িত না থাকার কারণে শরিয়াতের ছায়াতলে জীবনযাপনের স্বাদ ও প্রশান্তিও তারা অনুভব করতে পারছে না। তাদের চোখের সামনে উন্নতির যে দৃষ্টান্ত জলজ্যান্ত আছে, সেটা হলো পশ্চিমা সভ্যতা। ফলে পশ্চিমা মানদণ্ডই তাদের কাছে পরম ও চূড়ান্ত আইডল হিসেবে আস্থা জুগিয়ে নিয়েছে।
পশ্চিমের প্রতি এই বিশ্বাসের জায়গা থেকে যখন তারা 'মুসলিম' নামটি আঁকড়ে ধরে বস্তুবাদী উন্নতি অর্জনের পেছনে ছোটে, তখন সালাফদের বুঝ ও আমল তাদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আর তখনই শুরু হয় সালাফদের পাশ কেটে যাওয়ার জন্য নানা আপত্তি ও পথ তৈরির প্রচেষ্টা। এজন্য আমরা ফাহমুস সালাফের ওপর উত্থাপিত প্রতিটি আপত্তির গভীরেই বস্তুবাদী প্রভাব দেখতে পাব। এসব আপত্তি আদতে ইলমি ও একাডেমিক জায়গা থেকে তৈরি হয়নি; বরং এগুলোর উৎস হলো পাশ্চাত্যের কাছে আদর্শিক পরাজয়।
পূর্বসূরিদের চর্চা করার মধ্যে আরেকটি দিক হলো, তাদের ইতিবাচক দিকগুলো রপ্ত করা ও বাস্তবায়ন করা। নেতিবাচক বিষয়গুলো জানা ও পরিহার করা। তাই সালাফদের ফাহম কখনো দুনিয়াবি নিত্যনতুন সরঞ্জামের পথে অন্তরায় নয়; বরং এর আলোকেই আমরা জানতে পারব, এই চাকচিক্যময় পৃথিবীতে কোনটি পাপপূর্ণ ভোগ-বিলাসী সরঞ্জাম আর কোনটি তা নয়!
সুতরাং পূর্বসূরি সালাফদের সোনালি অতীতকে মনেপ্রাণে লালন করা মানেই অতীতকে আঁকড়ে ধরে অগ্রসরতার পথ রুদ্ধ করা নয়; বরং সালাফ তথা স্বর্ণযুগের সফল মানুষের বিশুদ্ধ ঐকমত্যপূর্ণ ফাহমের অনুসরণ তো কেবল কুরআন-সুন্নাহ কেন্দ্রিক জীবন পরিচালনার রাহনুমায়ির জন্য।
নিজের মূলকে পরিবর্তন করার নাম সৃজনশীলতা নয়। এটাকে সৃজনশীলতার পরিবর্তে আত্মবিস্মৃতি বলাই সবচেয়ে যৌক্তিক। প্রকৃত সৃজনশীলতা হলো, নিজের অতীত ও বিশুদ্ধ মূলকে বর্তমানে কার্যকর করা এবং সেটাকে অপরিবর্তনীয় ও অবিকৃতভাবে বর্তমানের সামনে তুলে ধরা ভবিষ্যৎ নিমার্ণের জন্য। আমাদের মনে রাখতে হবে, সত্য ও বিশুদ্ধের বিপরীতে অসত্য ও অশুদ্ধ কখনো সৃজনশীলতাকে ধারণ করে না। সৃজনশীলতা সমাদৃত ও উপকারকারী হওয়ার জন্য সত্য ও শুদ্ধতাকে ধারণ করা অপরিহার্য বিষয়। সুতরাং সালাফদের সত্য, বিশুদ্ধ ফাহম ও মানহাজকে পাশ কাটিয়ে কোনো সৃজনশীলতার চর্চা হতে পারেন না। যেটা হবে সেটা হলো, সত্যকে মিথ্যা দিয়ে এবং বিশুদ্ধকে অশুদ্ধ দিয়ে প্রলেপ দেওয়ার ব্যর্থ প্রচেষ্টা।

📘 ফাহমুস সালাফ > 📄 সপ্তম সংশয় : ঐতিহ্য (তুরাস) ও ফাহমুস সালাফ

📄 সপ্তম সংশয় : ঐতিহ্য (তুরাস) ও ফাহমুস সালাফ


ফাহমুস সালাফ ইসলামি তুরাসের অন্তর্ভুক্ত। আর ভুল-শুদ্ধ, হক-বাতিল মিলিয়েই তুরাস (ঐতিহ্য) হয়ে থাকে। সুতরাং ফাহমুস সালাফও হক বাতিলের সংশয় থেকে মুক্ত নয়। তাই ফাহমুস সালাফকে অনুসরণের দৃষ্টিতে না দেখে সমালোচনার দৃষ্টিতে দেখতে হবে। সমালোচনার ঊর্ধ্বে কেবল কুরআন ও সুন্নাহ।
নিরসন :
এক. 'তুরাস হক-বাতিল ভুল-শুদ্ধের সম্ভাবনা রাখে' এই দাবিতে কোনো ভুল নেই। তুরাস একটি ব্যাপক শব্দ। যার অর্থ হলো, পূর্ববর্তীদের রেখে যাওয়া ইলম, মতামত, ইজতিহাদ, তাদাব্বর, গবেষণাপদ্ধতি এই সবকিছু। আর এখানে ভুল-শুদ্ধ উভয়টারই অস্তিত্ব আছে। ফলে পরবর্তীদের জন্য দায়িত্ব হলো, এই ভুল-শুদ্ধকে পৃথক করা।
কিন্তু আরও জরুরি হলো ভুল-শুদ্ধ পার্থক্য করার জন্য যথাযথ মানদণ্ড, প্রতিষ্ঠিত কেন্দ্রস্থল ও সঠিক মানহাজের দ্বারস্থ হওয়া। প্রবৃত্তি কিংবা মানসিক ও বহিরাগত আদর্শিক চাপের ভিত্তিতে এই পৃথকীকরণ ইসলাম সমর্থিত নয়। অথচ বর্তমানে ফাহমুস সালাফের ওপর আপত্তিকারীরা দ্বিতীয় অবস্থার ভিত্তিতেই ভুল-শুদ্ধ নির্ণয় করছে।
দুই. এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, কুরআন ও সুন্নাহই একমাত্র ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে এবং হক-বাতিলের প্রধান মানদণ্ড। মতভেদ ও মতবিরোধের সময় মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের কুরআন ও সুন্নাহর দিকেই প্রত্যাবর্তন করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন,
وَمَا اخْتَلَفْتُمْ فِيْهِ مِنْ شَيْءٍ فَحُكْمُهُ إِلَى اللَّهِ ذَلِكُمُ اللَّهُ رَبِّي عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْهِ أُنِيبُ .
'তোমরা যে বিষয়েই মতভেদ করো তার মীমাংসা আল্লাহরই ওপর ন্যস্ত; তিনিই আল্লাহ, যিনি আমার প্রতিপালক। আমি তাঁরই ওপর ভরসা করেছি এবং আমি তাঁরই অভিমুখী হয়েছি।'১৭৩
ফাহমুস সালাফ এই দুই কেন্দ্রস্থলের সাথেই সংশ্লিষ্ট। কুরআন ও সুন্নাহ নিছক কিছু পুঁথিগত শব্দ নয়; বরং এগুলোর অর্থ ও মর্ম আছে। আছে আমলের রূপরেখা। আর সালাফদের ফাহম ও আমল হলো কুরআন-সুন্নাহ অনুধাবন ও বাস্তবায়ন করার কেন্দ্রস্থল।
এজন্যই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশনা হলো, উম্মতের মাঝে বিভিন্ন ফিরকার আবির্ভাব ও মানহাজগত দ্বন্দ্বের সময় যে কষ্টিপাথর দিয়ে হক- বাতিল নির্ণয় হবে, সেটা হলো কুরআন, সুন্নাহ এবং সালাফদের আমল ও বুঝ। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'বনি ইসরাইল ৭২টি দলে বিভক্ত হয়েছিল। আর আমার উম্মত ৭৩টি দলে বিভক্ত হবে। একটা দল ছাড়া তারা সকলেই জাহান্নামে যাবে।' সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! সেটি কোন দল? তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'যে দল আমার ও আমার সাহাবিদের পথের ওপর থাকবে।'১৭৪
এখানে কুরআন ও হাদিসের সাথে সাহাবিদের পথ ও পন্থার কথাও বলা হয়েছে। আর এটিই 'ফাহমুস সালাফ'। এটিই হলো মুমিনদের মানহাজ, যার অনুসরণের নির্দেশ মহান আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দিয়েছেন। তিনি বলেন,
وَمَنْ يُشَاقِقِ الرَّسُولَ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَى وَيَتَّبِعُ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِهِ مَا تَوَلَّى وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا.
“আর যে ব্যাক্তি তার সামনে হিদায়াত স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পরও রাসুলের বিরুদ্ধাচরণ করবে ও মুমিনদের পথ ছাড়া অন্য কোনো পথ অনুসরণ করবে, আমি তাকে সে পথেই ছেড়ে দেব, যে পথ সে অবলম্বন করেছে। আর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব, আর তা অতি মন্দ ঠিকানা।”১২
তিন. ওপরের আলোচনার ভিত্তিতে বলা যায়, ফাহমুস সালাফ ইসলামি তুরাসের অন্তর্ভুক্ত এবং তা হক। শরয়ি নুসুসের ক্ষেত্রে তাদের বুঝ ও আমলই উত্তম আদর্শ। তুরাস হক ও বাতিল উভয়টাই হওয়ার সম্ভাবন রাখে। ইসলামি তুরাস থেকে হক-বাতিল নির্ণয়ের জন্যও একটি মানদণ্ড থাকা আবশ্যক। সালাফদের ফাহম ও মানহাজই হলো আমাদের জন্য সেই মানদণ্ড, যার মাধ্যমে আমরা ইসলামি তুরাস থেকে আহলুস সুন্নাহর বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাতিল ফিরকাসমূহের মতামতকে পৃথক করব।

টিকাঃ
১৭৩. সুরা শুরা, আয়াত ১০
১৭৪. জামে তিরমিজি, হাদিস নং ২৬৪১, হাদিসটির সনদ হাসান। ইমাম তিরমিজি রহিমাহুল্লাহ এই হাদিসের সনদ সম্পর্কে বলেন, هذا حديث مفسر حسن غريب لا نعرف مثل هذا إلا من هذا ال AL CA

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00