📄 প্রথম সংশয় : মানবস্বভাব ও ফাহমুস সালাফ
সালাফরা মানুষ, তারা কেউই নিষ্পাপ নন। তাদের বুঝও মানবিক সত্তা থেকে নির্গত। ফলে তাদের বুঝ কখনোই ওহির মতো শরয়ি মর্যাদা রাখে না এবং তা উম্মতের জন্য ওহির মতো মানা আবশ্যকও নয়। এর মাধ্যমেই শরিয়াহ ও ফিকহের মাঝে পার্থক্য সুস্পষ্ট হয়ে যায়। শরিয়াহ আল্লাহপ্রদত্ত উৎস, যা সর্বাবস্থায় অনুসরণ করা আবশ্যক। পক্ষান্তরে ফিকহ বা সালাফদের ফাহম হলো মানবীয় উৎস, যা ওহির মতো মানা জরুরি নয় এবং তা শরয়ি মর্যাদাও রাখে না। ফলে সর্বক্ষেত্রে উম্মত তা সবসময় মানতে বাধ্য নয়।
নিরসন :
কোনো সন্দেহ নেই যে, সালাফরা কেউ নিষ্পাপ নন। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকিদা হলো, নবি-রাসুলগণ ছাড়া আর কোনো মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। এমনকি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ ছাড়া আর কারও নির্দেশ নিঃশর্তভাবে পালনযোগ্য নয়-এই কথাতে কেউ দ্বিমত রাখতে পারে না।
কিন্তু যে বুঝের ওপর সালাফরা একমত হয়েছেন সে বুঝ নির্ভুল এবং শরিয়াতের দলিল। কারণ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'আমার উম্মাত কখনোই ভ্রান্তির ওপর একমত হবে না।'১২৫ এজন্য তাদের বুঝ নির্ভুল। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'সালাফদের ইজমা ভুল থেকে মুক্ত। এমনকি মতবিরোধপূর্ণ বিষয়েও হক তাদের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে। তাদের বক্তব্যের ভেতরই হককে তালাশ করা যাবে, অন্য কোথাও নয়। কুরআন-সুন্নাহর সুস্পষ্ট প্রমাণ ছাড়া তাদের কওল তথা কথা ও বুঝকে ভুল বলা যাবে না।'১২৬
যেহেতু তারা ভুলের ঊর্ধ্বে নয়, তাদের থেকেও ভুল হওয়া স্বাভাবিক ব্যাপার, তাই মাঝে মাঝে যদি সাহাবিদের কারও থেকে যদি কোনা ভুল হয়ে যেত, তখন অবশ্যই অবশ্যই অন্যান্য সাহাবিরা এ বিষয়ে তাকে সতর্ক করতেন। অর্থাৎ কেউ ভুল করলে অন্যরা এ ব্যাপারে কোনো রকম সতর্ক করা ব্যতীত চুপ ছিলেন—এটা অসম্ভব। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সাহাবিদেরকে এমন কল্যাণের জামাআত বানিয়েছেন যে, তাদের মাঝে কোনো ভুলকে স্থায়ী হতে দেননি। তাদেরকে এমন ঈমানি শক্তি দিয়েছেন যে, শরিয়তের বিষয়ে কোনো ভুল প্রকাশ পাবে, আর তারা মুখ বন্ধ করে থাকবেন—তা হতে পারে না। তাই এখানে মূলনীতি এটা যে, সাহাবিদের জামাআতের মাঝে কেউ কেউ ভুল করতে পারেন, কিন্তু পুরো জামাআতের মাঝে সত্য ও হকের অধিকারী কেউ থাকবে না, তা হতে পারে না। আর যিনি সত্য ও হকের অধিকারী হবেন, তিনি মানুষদের সতর্ক করা ছাড়া চুপ থাকবেন, তাও অসম্ভব।১২৭
এজন্য সালাফরা যদি কোনো ফাহম বা মতের ওপর একমত হন, তাহলে নিঃসন্দেহে সেটা আমাদের জন্য দলিল এবং তা নির্ভুল। তাদের এই ঐকমত্যপূর্ণ ফাহমকে মূল ধরে আমরা নিজেদের ফাহমকে অগ্রসর করতে পারি। আর যদি কোনো নুসুসে শরিয়াহর ফাহম নিয়ে তাদের ভেতর আমরা গ্রহণযোগ্য ইখতিলাফ পাই, তাহলে সে ক্ষেত্রে আমাদের অধিকার আছে যেকোনো একটিকে বেছে নেওয়ার।১২৮
এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, ইখতিলাফ গ্রহণে অবশ্যই আমাদের ইসলামি ফিকহে গ্রহণযোগ্য ইখতিলাফকে বেছে নিতে হবে। যে ইখতিলাফের পেছনে বিশুদ্ধ দলিল থাকে না, যে ইখতিলাফ পূর্ববর্তী সালাফদের বিরুদ্ধে যায় এবং যে ইখতিলাফ ফিকহি তুরাসে স্বীকৃতি লাভ করেনি (অর্থাৎ ফকিহরা যেটা মতবিরোধ হিসেবে নয়, বিচ্ছিন্ন মত হিসেবে বিবেচনা করেছেন), সে ইখতিলাফ কখনো অনুসরণযোগ্য নয়। এ ইখতিলাফ বিচ্ছিন্ন মত হিসেবে পরিচিত। এ ধরনের ইখতিলাফ দিয়ে উলামায়ে কেরামের ইজমাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা যাবে না। বিচ্ছিন্ন মত দিয়ে জমহুরের মত এবং স্বীকৃত কোনো মতকে প্রত্যাখ্যান করা যাবে না।
কেউ কেউ ইজমার প্রামাণ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে এই যুক্তিতে যে, ইজমা একটি অসম্ভব ব্যাপার। তারা অধিকন্তু এই দাবির পেছনে ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহিমাহুল্লাহর একটি আংশিক বক্তব্যকে উপস্থাপন করে। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'যে ব্যক্তি ইজমার দাবি করল, সে মিথ্যাবাদী।'১২৯
মূলত ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহিমাহুল্লাহ মৌলিকভাবে ইজমাকে প্রত্যাখ্যান করেননি। তিনি নির্দিষ্ট একটি প্রেক্ষাপটে এই কথা বলেছিলেন। নির্দিষ্ট একটি বিষয়ে মুতাজিলা ফিরকার ইজমার দাবির বিরুদ্ধে ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহিমাহুল্লাহ এই কথাটি বলেছিলেন। পুরো বক্তব্য থেকে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তার বক্তব্যের মর্ম ছিল এরকম যে, উক্ত বিষয়ে যে ব্যক্তি ইজমার দাবি করবে, সে মিথ্যাবাদী। কারণ এই বিষয়টিতে মানুষের মাঝে ইখতিলাফ আছে। এই বিষয়ে ইজমার দাবি ছিল বিশর আল মুরাইসি ও আসমের।১৩০ আর বিশর ও আসম ছিল ইমাম আহমাদের যুগে মুতাজিলা ও বিদআতিদের নেতা।
ইমাম ইবনে রজব হাম্বলি রহিমাহুল্লাহ শরহে তিরমিজির শেষে বলেন, 'যে ব্যক্তি ইজমার দাবি করবে, সে মিথ্যাবাদী।' ইমাম আহমাদের এই বক্তব্য মুতাজিলা ফকিহদের বিরুদ্ধে ছিল। তারা নিজেদের মতের ওপর ইজমার দাবি করত।
অথচ তারা সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়িদের আকওয়ালের ব্যাপারে সবচেয়ো কম জ্ঞান রাখত।১৩১
ইবনুল কায়্যিম রহিমাহুল্লাহও এ ধরনের মত পেশ করেছেন।১৩২
অর্থাৎ ইজমা সাহাবায়ে কেরামের আমল থেকে প্রমাণিত দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। ইজমার প্রামাণ্যতা এবং তা সংগঠিত সম্ভব হওয়ার ওপরও সব যুগের আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের ইমামরা একমত। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আলেমরা যে বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেছেন, সে ব্যাপারে কোনো সাধারণ মানুষ, শুদ্ধ দলিলবিহীন ভিন্ন দলিল প্রদানকারী আলেম এবং বাতিল ফিরকার আলেমদের মতবিরোধ ইজমার প্রামাণিক অবস্থানকে নষ্ট করবে না। কোনো বিষয় মুখতালাফ ফিহি (মতবিরোধপূর্ণ) হওয়ার জন্য অবশ্যই যোগ্য ও আহলুস সুন্নাহর কারও মতবিরোধ এবং তার পেছনে বিশুদ্ধ দলিল লাগবে।১৩৩
টিকাঃ
১২৫. সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ২৬১৭, শায়খ আলবানি রহ. সহিহ বলেছেন। (সহিহুল জামে, হাদিস নং ১৮৪৮)
১২৬. মাজমুউল ফাতাওয়া, ৪/১৫৫
১২৭. দেখা যেতে পারে: ইলামুল মুয়াক্কিয়িন ৪/১৫৫
১২৮. তবে সাহাবিদের মাঝে হওয়া ফিকহি ইখতিলাফ বা মতভিন্নতা থেকে যে-কেউ চাইলেই নিজের জন্য কোনো মত বাছাই করে নিতে পারবে বা প্রত্যেকে যার যার মতো করে কোনো মত গ্রহণ করে নিতে পারবে—বিষয়টি এমন নয়। এর জন্য ইলমের কোন স্তরে যাওয়া প্রয়োজন, তা উম্মাহর আলেমগণ আলোচনা করেছেন। এ ক্ষেত্রে একজন সাধারণ মানুষ ও একজন কুরআন-সুন্নাহর শাস্ত্রীয় জ্ঞান অর্জনকারী ফকিহ বা মুজতাহিদ কখনোই সমান নয়।"
১২৯. মাসায়েলে আহমাদ বিন হাম্বল, আল মাকতাবুল ইসলামিয়্য, পৃষ্ঠা ৪৩৮"
১৩০. আল উদ্দাহ ফি উসুলিল ফিকহি, ৪/১০৫৯
১৩১. আত তাহবির শরহুত তাহরির ফি উসুলিল ফিকহ লিল মারদাওয়ি, মাকতাবাতুর রুশদ, ৪/১৫২৮
১৩২. মুখতাসারু সাওয়ায়িকিল মুরসালাহ, পৃষ্ঠা ৫৮৩
১৩৩. এজন্য জমহুর উসুলবিদরা ইজমার জন্য সকল মুজতাহিদ আলেম একমত হওয়া ও ইজমার পেছনে মুসতানিদ দলিল তথা বিশুদ্ধ দলিল থাকাকে শর্ত করেছেন। সুতরাং যে শর্তের মাধ্যমে ইজমা সংগঠিত হয়, বিপরীতে সে শর্তের অনুপস্থিতিতে (অর্থাৎ মুজতাহিদ না হওয়া এবং বিশুদ্ধ দলিল না থাকা) কারও অবস্থান ইজমাকে প্রশ্নবিদ্ধকারীও হতে পারবে না। ফলে ইজমা সংগঠিত হওয়ার সময় কারও বুঝের ভুল কিংবা গ্রহণযোগ্য দলিলহীন বিচ্ছিন্ন অবস্থান ইজমাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে না। ইজমার মধ্যে বাধা সৃষ্টি হওয়ার জন্য ব্যক্তি একই সাথে মুসলিমদের মাঝে গ্রহণযোগ্য মুজতাহিদ ও বিশুদ্ধ দলিলের অধিকারী হতে হবে।
📄 তৃতীয় সংশয় : ইজতিহাদ ও ফাহমুস সালাফ
সালাফদের ফাহম আঁকড়ে ধরা জুমুদের (স্থবিরতা ও অনাগ্রসতার) দিকে ঠেলে দেয়, ইজতিহাদের দরজা বন্ধ করে দেয় এবং নাওয়াজেলের (নতুন নতুন পরিস্থিতির) বিধান বের করার পথকে রুদ্ধ করে দেয়।
নিরসন :
প্রথমত, ফাহমুস সালাফকে অক্ষুণ্ণ রাখলে মুসলিমদের চিন্তায় স্থবিরতা চলে আসে, ইজতিহাদের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, নতুন পরিস্থিতিতে শরিয়াহর বিধান ইসতিমবাত (উদঘাটন) করা যায় না ইত্যাদি ধারণা ও দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা। এই আপত্তি যারা করে, তারা সালাফদের ফাহম ও মানহাজ সম্পর্কে হয়তো অজ্ঞ নতুবা অজ্ঞতার ভান ধরা কেউ। ইজতিহাদ আমাদের সালাফদের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য। তারা উম্মাহকে নুসুসে শরিয়াহ নিয়ে চিন্তাভাবনা করে নিজেদের জীবনে শরিয়াহ বাস্তবায়নের জন্য তাগিদ দিয়েছেন। যেকোনো ব্যক্তির অন্ধ অনুসরণ পরিত্যাগ করে দলিল ও মূলনীতির আলোকে আলেমদের অনুসরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
দ্বিতীয়ত, মানসুস আলাইহি নয় (নসবিহীন) এমন বিষয়ে সুশৃঙ্খল ইজতিহাদ ইসলামি শরিয়াহর একটি অপরিহার্য বিষয়। ১৪২ বান্দার ওপর থেকে তাকলিফ (আহকামে শরিয়াহর বাধ্যবাধকতা) উঠে যাওয়ার আগ পর্যন্ত উম্মাহর জন্য ইজতিহাদ ওয়াজিব। আর কিয়ামত ছাড়া বান্দার ওপর থেকে তাকলিফ উঠিয়ে নেওয়া হবে না। শরিয়াহ আমাদেরকে পর্যাপ্ত শরয়ি প্রিন্সিপাল বা মৌলিক বিধান ও উসুল প্রদান করেছে, তবে সেগুলো সীমাবদ্ধ। আর কিয়ামত পর্যন্ত চলমান ঘটনাপ্রবাহ সীমাহীন। সুতরাং শরিয়াতের সীমাবদ্ধ জাওয়াবেত (মূলনীতি) ও মৌলিক বিধান অনুযায়ী সীমাহীন এই ঘটনাগুলোতে ইজতিহাদ আবশ্যক। এই ক্ষেত্রে ইজতিহাদ ছাড়া বান্দার ওপর শরিয়াতের যে তাকলিফ রয়েছে, তা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। অথচ মৃত্যু বা কিয়ামত সংগঠিত হওয়া ছাড়া বান্দার ওপর থেকে তাকলিফও (আহকামে শরিয়াহর বাধ্যবাধকতা) বাতিল হবে না। আল্লামা শাতেবি রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'বাস্তবে নবউদ্ভাবিত মাসায়েল সীমাহীন। সুতরাং সীমাবদ্ধ দলিলের ভেতর সীমাহীন ঘটনাপ্রবাহকে সীমাবদ্ধ করে দেওয়া সঠিক নয়। এজন্য ইজতিহাদ ও কিয়াসের দরজা খোলা রাখা প্রয়োজন।'১৪৩
শরিয়াতের যাবতীয় বিধান পালনের ক্ষেত্রে আমাদের জন্য মহান রহস্য হলো পরীক্ষা। বান্দাকে পরীক্ষার জন্য মহান আল্লাহ তাআলা শরিয়াতের বিধিবিধান দিয়ে দুনিয়াতে প্রেরণ করেছেন। ইজতিহাদের ক্ষেত্রেও একটি রহস্য হলো বান্দার ওপর পরীক্ষার এই ধারা বহাল রাখা। যেমন ইমাম শাফেয়ি রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'ইজতিহাদের ক্ষেত্রে বান্দাদের আনুগত্য পরীক্ষা করা হয়, যেমন শরিয়াতের অন্যান্য ফরজ বিধানের আনুগত্যে তাদের পরীক্ষা করা হয়। '১৪৪
যদি ইজতিহাদ বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে নতুন আপতিত পরিস্থিতিতে ইসলামের বিধান বের করার পথও বন্ধ হয়ে যাবে। অন্যদিকে বান্দা প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামি শরিয়াহর দিকনির্দেশনা মেনে চলতে বাধ্য। শরিয়াহ মানার এই বাধ্যবাধকতাকেই তাকলিফ বলে। এখন নতুন এই পরিস্থিতিতে শরিয়াতের বিধান জানতে না পারার কারণে বান্দার ওপর তাকলিফের বাস্তবায়ন সম্ভব না। যা ইসলামি শরিয়াহর গতিশীলতা এবং কিয়ামত পর্যন্ত এর উপযোগিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। সুতরাং ইজতিহাদ বন্ধের দাবি তোলার কোনো সুযোগই নেই। আমাদের সালাফরাও কখনো ইজতিহাদের দরজা বন্ধের কথা বলেননি। তা ছাড়া সালাফদের ফাহম ও মানহাজ আঁকড়ে ধরাও কখনো ইজতিহাদের পথকে রুদ্ধ করে না; বরং তারা খালাফদের জন্য ইজতিহাদের পথকে সুগম ও নিরাপদ করে গেছেন।
তৃতীয়ত, ইজতিহাদ একটি দুধারি তরবারি। ইজতিহাদকে তার সীমার ভেতর সঠিক পথে সঠিকভাবে ব্যবহার করা হলে, তা আমাদের ফিকহি ভাণ্ডারে এমন কিছু বিষয় সংযোজন করতে পারে, যা উম্মাহর জন্য কল্যাণকর ও গর্বের বিষয় হবে। কিন্তু ইজতিহাদের হাতিয়ারকে ভুল পথে ব্যবহার করলে, কিংবা অযোগ্য ব্যক্তির হাতে ব্যবহৃত হলে, তা দীন বিকৃতির এক আন্দোলনে রূপ নেবে। যেমন বর্তমানে অনেকেই ইজতিহাদের নামে আমাদের ঐতিহ্যবাহী ফিকহি ভাণ্ডারের অনেক ঐকমত্যপূর্ণ, স্বীকৃত কিংবা ফায়সালাকৃত মাসআলাকে ক্ষতবিক্ষত করছে। সুদ, মদ, গানবাদ্য হারাম নয়, ফ্রি-মিক্সিং বৈধ, হুদুদ পরিবর্তনযোগ্য, ইকদামি জিহাদ বাতিল ইত্যাদি ভ্রান্ত মতামত কথিত ইজতিহাদের নামেই তৈরি হচ্ছে। ইজতিহাদের ওপর সওয়ার হয়ে পাশ্চাত্য সভ্যতার সকল মহামারি ও অভিশাপকে হালালকরণের প্রচেষ্টা চলছে। দীনকে বিকৃত করার অসংখ্য কর্মকাণ্ড চলে আসছে এই ইজতিহাদকে ভিত্তি করেই।
এ কারণেই ইজতিহাদ দুধারি তরবারির মতো। সঠিক ব্যবহার হলে উম্মাহর ব্যাপক কল্যাণ সাধিত হবে। আর ভুল ব্যবহার হলে উম্মাহর সামনে বিভ্রান্তির হাজারো দুয়ার উন্মোচন হবে।
কেউ কেউ মনে করেন, ইজতিহাদ মানে হলো নিজের আকল ও বুঝের ওপর নির্ভর করে নুসুসে শরিয়াহর ওপর যেকোনো সিদ্ধান্ত প্রদান করা। এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। নিজের আকল ও বুঝের ভিত্তিতে ইসলামি শরিয়াহ সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের নাম ইজতিহাদ নয়। যে হাদিসের মাধ্যমে ইজতিহাদের দরজা উন্মোচন করা হয়েছে, সে হাদিসের প্রতি আমরা লক্ষ করলে বিষয়টা ভালো করে বুঝে আসবে। হজরত মুয়াজ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রশ্ন করলেন, কোনো বিষয় কুরআনে না থাকলে কীভাবে সিদ্ধান্ত নেবে? হজরত মুয়াজ রাদিআল্লাহু আনহু বললেন, সুন্নাতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করব। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রশ্ন করলেন, যদি সুন্নাতেও না পাও তাহলে কী করবে? তিনি বললেন, আপন বিবেক খাটিয়ে ইজতিহাদ করব এবং এ ব্যাপারে কোনো কমতি করব না।১৪৫ এই হাদিসে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কুরআন ও সুন্নাহতে যে ব্যাপারে নির্দেশনা রয়েছে, সে ব্যাপারে ইজতিহাদের কোনো সুযোগ নেই। কুরআন-সুন্নাহয় বর্ণিত নির্দেশনার পরও কেউ যদি ইজতিহাদ করে, তবে সেটা ইজতিহাদ হবে না, তাহরিফ (বিকৃতি) বা তাবদিল (পরিবর্তন) হবে।
কুরআন-হাদিসে সুস্পষ্ট নির্দেশনার ব্যাপারেও ইজতিহাদের অনুমোদন দেওয়া হলে নবি-রাসুল প্রেরণের কোনো দরকার ছিল না। নবি-রাসুল এসেছেনই মানুষকে ওহির মাধ্যমে সঠিক পথ দেখাতে। কারণ সার্বিকভাবে মানুষের আকল সবসময় ও সবকিছুতে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছতে সক্ষম নয়। যদি কিয়ামত পর্যন্ত কুরআন-সুন্নাহর ওপর আমল করার বাধ্যবাধকতাই না থাকত, তাহলে মহান আল্লাহ তাআলা সবকিছুতে এত সুস্পষ্টভাবে ইসলামের নির্দেশনা প্রদান করতেন না; বরং বলে দিতেন, প্রত্যেক যুগের মানুষ নিজের বিবেক দিয়ে যা ভালো ও কল্যাণকর মনে করবে, সেটাই শরিয়াহর বিধান, সে অনুযায়ীই তারা জীবন পরিচালনা করবে।
ইজতিহাদের ক্ষেত্রে আরেকটি প্রবণতা হলো, কেউ কেউ প্রথমোক্ত শ্রেণির মতো নিজের বিবেক-প্রসূত সিদ্ধান্তকে ইজতিহাদের নামে চালিয়ে দেওয়ার পক্ষপাতী নয়। কিন্তু ইজতিহাদের নামে তাদের আচরণ দেখলে মনে হবে, কুরআন-সুন্নাহ যেন কেবল আজই অবতীর্ণ হলো। বিগত চৌদ্দশ বছর কুরআন-সুন্নাহর ওপর কোনো কাজ হয়নি। তাই মেধা-বুদ্ধি খাটিয়ে আমাদের এখন একদম নতুন করে নুসুসে শরিয়াহর ব্যাখ্যার কাজে লেগে পড়তে হবে!
অথচ আমরা এমন এক যুগ পার করে এসেছি, যে সময়ের মাঝে সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ি, তাবে-তাবেয়ি এবং উম্মাহর আইম্মারা অতিবাহিত হয়েছেন। যারা নিজের পুরো জীবন ব্যয় করেছেন এই দীনের ইলমের জন্য। কুরআন-সুন্নাহ বোঝা ও তার ওপর আমল করার জন্য তারা এমন ত্যাগ স্বীকার করে গেছেন, যার কল্পনাও আমরা করতে পারি না। তারা সারা জীবন ত্যাগ ও সাধনার মধ্য দিয়ে আমাদের জন্য রেখে গেছেন ইসলামি শাস্ত্রসমূহের বিশাল জ্ঞানভাণ্ডার।
তাদের এই ইলমের ভাণ্ডারকে ছুড়ে ফেলে আমরা যদি নতুন করে ইজতিহাদ ও ইসতিমবাতের দাবি করি, সেটা আমাদেরকে কুরআন-সুন্নাহ থেকে বহু দূরে নিক্ষেপ করবে। এই দাবির অর্থ দাঁড়ায়, চৌদ্দশ বছর ধরে কুরআন-সুন্নাহর ওপর কোনো আমল হয়নি। দীর্ঘ এই সময়ে পুরো উম্মত কুরআন-সুন্নাহর বুঝ থেকে বঞ্চিত ছিল। মাআজাল্লাহ। এমন দাবি ইসলামকে অবমাননা করার শামিল। মহান আল্লাহ তাআলা কুরআন-সুন্নাহকে প্রেরণ করেছেন কিয়ামত পর্যন্ত তা চলমান থাকার জন্য। এখন মাঝখানে দীর্ঘ চৌদ্দশ বছর কি কুরআন-সুন্নাহ বিলুপ্ত ছিল? এমন দাবি কি আল্লাহর বক্তব্যকে প্রত্যাখ্যান করে না?
আবার কেউ কেউ আছেন ফিকহের অধিকাংশ সিদ্ধান্তকেই ইজতিহাদের মাধ্যমে পরবির্তনযোগ্য মনে করেন। ইসলামি বিধানসমূহের দুটি স্তর আছে। একটি স্তর হলো, তাওয়াতুর সূত্রে প্রমাণিত আহকাম, যেগুলোকে কতইয়্যাত (তথা অকাট্যভাবে প্রমাণিত) বলে। আরেকটি স্তর হলো, জন্নিসূত্রে প্রমাণিত আহকাম, যাকে জন্নিয়্যাত বলা হয়। ১৪৬ আমলের দিক থেকে উভয় প্রকার বিধানই এক। বিশ্বাসের দিক থেকে সামান্য পার্থক্য আছে। একটা দৃঢ় বিশ্বাস, আরেকটা প্রবল বিশ্বাস।
উভয় প্রকার বিধানই শরয়ি নস দ্বারা প্রমাণিত। এখানে সন্দেহ কিংবা ইজতিহাদের সুযোগ নেই। কতইয়্যাতের মতো জন্নিয়্যাতও প্রতিষ্ঠিত শরয়ি বিধান, যা মানা ও অনুসরণ করা আবশ্যক। এটাকে জন্নি হিসেবে নামকরণ কেবল পারিভাষিক ব্যাপার। জন্নি নামকরণের মানে এই নয় যে, বিষয়টি শরিয়াহর বাইরের অনাবশ্যক বিষয় কিংবা সন্দেহযুক্ত।১৪৭
কিন্তু মুতাজিলাদের মতো মডার্নিস্ট মুসলিমরা ইজতিহাদের নামে সকল জন্নি আহকাম পরিবর্তনযোগ্য মনে করে। ইসলামি শরিয়াহর অধিকাংশ বিধান খবরে ওয়াহিদ সূত্রে প্রমাণিত। যদি এই সকল বিধানকে ইজতিহাদি বলে পরিবর্তন করা শুরু হয়, তবে শরিয়াহর কিছুই থাকবে না। অথচ কিতাবুল্লাহ ও মুতাওয়াতির হাদিস দ্বারা প্রমাণিত এবং শরিয়াহর যেসব খবরে ওয়াহিদ ফুকাহায়ে কেরাম ও মুহাদ্দিসিনে কেরামের ঐকমত্যে গ্রহণযোগ্য হয়েছে, সেগুলো দীনের প্রতিষ্ঠিত বিধানের অন্তর্ভুক্ত। এসব বিধানে পরিবর্তন সাধনের কোনো সুযোগ নেই।১৪৮
পরিতাপের বিষয় হলো, বর্তমানে কেউ কেউ এমন সব বিধান পরিবর্তনের কথা বলে, যা দীনের সাওয়াবেত (ثَوَابِت) তথা সুপ্রমাণিত বিধানের অন্তর্ভুক্ত। যেগুলোতে পরিবর্তন সাধনের কোনো সুযোগ নেই। যেমন: যিনার হদ রজমকে অস্বীকার করা, মুরতাদের হদকে অস্বীকার করা। এ ধরনের আরও অনেক বিধান আছে, যেগুলো সুস্পষ্ট নস এবং উম্মাহর ইজমার ভিত্তিতে প্রমাণিত। কিন্তু কিছু মানুষ এই বিধানগুলোকে পরিবর্তনযোগ্য বলে দাবি করছে। এটি নিঃসন্দেহে আহকামে শরিয়াহর তাহরিফ ও শরিয়াহ থেকে পলায়নের নামান্তর।১৪৯
ওপরে উল্লেখিত ইজতিহাদের প্রতিটি ধারণা ও রূপই বাতিল। যা দীনে ইসলামকে বিকৃত করে যাচ্ছে এবং উম্মাহর জন্য নতুন নতুন ফিতনা তৈরি করছে।
ইজতিহাদের সঠিক অর্থ হলো, কুরআন-সুন্নাহ থেকে তাওয়ারুস সূত্রে আমরা যেসব মূলনীতি ও ফাহম লাভ করেছি, সেগুলোর আলোকে নতুন বিষয় ও উদ্ভূত পরিস্থিতির সমাধান খুঁজে বের করা। কারণ প্রত্যেক যুগেই এমন কিছু মাসআলা সৃষ্টি হয়, যার সুস্পষ্ট সমাধান আমরা কুরআন-সুন্নাতে পাব না এবং পূর্ববর্তী ফকিহদের ফিকহি ভাণ্ডারেও আমরা সেগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাব না। এ ক্ষেত্রগুলোতে নুসুসে শরিয়াহ ও মাকাসিদে শরিয়াহর আলোকে সমাধান বের করার নামই ইজতিহাদ। এ ইজতিহাদের দরজা কেউ বন্ধ করেনি এবং সালাফদের ফাহম ও মানহাজ এ ধরনের বিশুদ্ধ ইজতিহাদের বিরোধী তো নয়ই; বরং এর প্রতি উৎসাহপ্রদানকারী।
সুতরাং ইজতিহাদের বৈধতা দেখিয়ে সালাফদের ফাহম ও মানহাজের ওপর প্রশ্ন তোলার আগে দেখতে হবে, আমাদের ইজতিহাদের পদ্ধতি ও সীমা ঠিক আছে কিনা। মূলত সালাফদের ফাহম ও মানহাজকে আঁকড়ে ধরার প্রয়োজনীয়তার একটি কারণ এটিও যে, কেউ যেন ইজতিহাদ বা গবেষণার নামে এই দীনের ব্যাপারে যা খুশি তা বলতে না পারে। শরিয়াহকে প্রত্যেক যুগের প্রবৃত্তি পূজারিরা যেন খেলনার পাত্রে পরিণত করতে না পারে। সারকথা হলো, সালাফদের ফাহম ও মানহাজ ইজতিহাদের পথকে বন্ধ করে না; বরং ইজতিহাদকে সঠিক ও নিরাপদ পথে পরিচালিত করে।১৫০
টিকাঃ
১৪২, যে বিষয়ে কুরআন ও সুন্নাহতে কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায় না এবং যে বিষয়ে পূর্ববর্তী ইমাম ও ফকিহদের সুস্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায় না, এমন নতুন বিষয়ে দীনি বিধান বের করার জন্য শরয়ি নীতিমালার আলোকে যোগ্য ব্যক্তির গবেষণাকে 'ইজতিহাদ' বলে। এজন্য যেকোনো ক্ষেত্রে যে-কেউ ইজতিহাদ করার অধিকার রাখে না। ইজিতিহাদযোগ্য বিষয় হতে হলে অবশ্যই সেটা কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত নয় এবং পূর্ববর্তী ফুকাহায়ে কেরামের সুস্পষ্ট নির্দেশনামুক্ত নব্য বিষয় হতে হবে। সাথে সাথে যিনি ইজতিহাদ করবেন তাকেও বিশেষ যোগ্যতার অধিকারী হতে হবে। যেমন বিধিবিধান সংবলিত আয়াত ও হাদিস সম্পর্কে জ্ঞান থাকা, ফুকাহায়ে কেরামের ইজমা সম্পর্কে জ্ঞান থাকা, কিয়াসের নীতি সম্পর্কে অভিজ্ঞ হওয়া, নাসেখ মানসুখের ব্যাপারে পাণ্ডিত্যের অধিকারী হওয়া, আরবি ভাষায় পারদর্শী হওয়া, উলুমে হাদিসের ইলম থাকা, গবেষণা চিন্তাভাবনার যোগ্যতা থাকা, আদালাত তথা ন্যায়বান হওয়া। এ ছাড়াও ইজতিহাদের বিভিন্ন প্রকার আছে। যেগুলো উসুলে ফিকহের গ্রন্থগুলোতে আলোচিত হয়েছে。
১৪৩. আল মুওয়াফাকাত, ১/১০৪
১৪৪. জার রিসালাহ, পৃষ্ঠা ২২
১৪৫. সুনানে আবি দাউদ, হাদিস নং ৩৫৯২; সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ১৩২৭
১৪৬. হাদিসে মুতাওয়াতির বা খবরে ওয়াহেদ এগুলো ইলমি পরিভাষা। এসব পরিভাষার ভাষান্তর করার সময় দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে এর পরিপূর্ণতা থাকে না। তবে মূল বক্তব্য বোঝার স্বার্থে এতটুকু বলা যায় যে, মুতাওয়াতির হলো এমন হাদিস বা খবর, যা সনদের প্রতি স্তরেই এমন সংখ্যক রাবি কর্তৃক বর্ণিত, স্বাভাবিকভাবে যাদের মিথ্যার ওপর একমত হওয়া অসম্ভব। অপরদিকে যে হাদিসের বর্ণনা মুতাওয়াতিরের শর্তে উন্নীত নয়, সেগুলো খবরে ওয়াহেদ। মুতাওয়াতির হাদিস কতইয়্যাত বা দৃঢ়তার ফায়দা দেয়। আর খবরে ওয়াহেদ জন্নিয়্যাত তথা প্রবল বিশ্বাসের ফায়দা দেয়। তবে শরিয়াতের বিধান দুই প্রকার হাদিস থেকেই প্রমাণিত ও আবশ্যক হয়।
১৪৭. মারেকাতুস নাস, পৃষ্ঠা ১৩২
১৪৮. মুহাযারাতে উসুলে ফিকহ, পৃষ্ঠা ৪১৩
১৪৯. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৪১৪
১৫০. এই প্রবন্ধটি ইসলাম আওর জিদ্দাত পছন্দি গ্রন্থের ইজতিহাদ নামক প্রবন্ধের আলোকে তৈরি করা হয়েছে।
📄 চতুর্থ সংশয় : তাদাব্বুর ও ফাহমুস সালাফ
কেউ কেউ বলে থাকেন যে, মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে তাদাব্বুর (গভীর চিন্তাভাবনা) করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। সালাফদের ফাহমের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার আবশ্যিকতা আল্লাহর এই নির্দেশের বিরুদ্ধে যায়। কারণ তাদাব্বুর একটি সামগ্রিক বিষয়। হতে পারে, বর্তমানে কোনো মুতাদাব্বিরের (চিন্তাভাবনাকারীর) সামনে কুরআনের কোনো আয়াতের এমন মর্ম ও রহস্য উন্মোচিত হয়েছে, যেটা পূর্ববর্তী সালাফদের কারও কাছে উন্মোচিত হয়নি। শরিয়াহ কিয়ামত পর্যন্ত পৃথিবীতে অবশিষ্ট থাকবে। এজন্য জরুরি হলো, শরিয়াহ নিয়ে চিন্তাভাবনা ও পর্যালোচনার দরজা বন্ধ না করে দেওয়া। যেন উম্মাহর সামনে এমন কোনো বিষয় উন্মোচিত হয়, যেটা পূর্ববর্তীদের সামনে হয়নি।
নিরসন :
প্রথমত, এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, মহান আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে কুরআন নিয়ে চিন্তাভাবনা করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন,
كِتَابٌ أَنْزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ لِيَدَّبَّرُوا آيَاتِهِ وَلِيَتَذَكَّرَ أُولُو الْأَلْبَابِ.
'(হে রাসুল!) এটি এক বরকতময় কিতাব, যা আমি তোমার প্রতি নাজিল করেছি, যাতে মানুষ এর (আয়াতের) মধ্যে চিন্তা করে এবং বোধসম্পন্ন ব্যক্তিগণ উপদেশ গ্রহণ করে।'১৫১
এমনকি যারা কুরআন নিয়ে তাদাব্বুর করে না, তাদের ব্যাপারে তিনি নিন্দা করেছেন। তিনি বলেন,
أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَى قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا. 'তারা কি কুরআন সম্পর্কে চিন্তা করে না, নাকি (তাদের) অন্তরে তালা লেগে আছে?'১৫২
وَ مِنْهُمْ أُمِّيُّونَ لَا يَعْلَمُوْنَ الْكِتُبَ إِلَّا أَمَانِي وَإِنْ هُمْ إِلَّا يَظُنُّونَ. 'তাদের মধ্যে কিছু লোক আছে নিরক্ষর, যারা কিতাব (তাওরাত)-এর কোনো জ্ঞান তো রাখে না, তবে কিছু আশা-আকাঙ্ক্ষা পুষে রেখেছে। তাদের কাজ কেবল এই যে, তারা অমূলক ধারণা করতে থাকে।'১৫৩
আয়াতসমূহের এই নির্দেশনার ফলেই সাহাবায়ে কেরাম কুরআন-সুন্নাহর বিভিন্ন মর্ম ও রহস্য বের করার প্রতি মনোনিবেশ করেছেন, যেগুলো শরিয়াতের প্রবর্তকের পক্ষ থেকে মানসুস ছিল না। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিআল্লাহু আনহু বলেন, 'কুরআন হলো মহান আল্লাহর ভোজসভা। সুতরাং যত পারো আল্লাহর ভোজসভা থেকে ইলম লাভ করে নাও।' তিনি আরও বলেন, 'কুরআনের রহস্য কখনো শেষ হওয়ার নয়।' ১৫৪
তাবেয়িরাও কুরআন থেকে এমন সব মর্ম ও রহস্য বের করে নিয়ে আসতেন, যেগুলো সাহাবায়ে কেরام সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেননি। তারা সাহাবায়ে কেরام থেকে কুরআনের মৌলিক তাফসির শিক্ষা লাভ করেছেন। আবার মৌলিক তাফসিরের বাইরেও তারা কুরআনের আয়াত নিয়ে গবেষণা করেছেন। একই কথা হাদিসের ক্ষেত্রেও। তাদাব্বরের মাধ্যমে তারা দীনের অনেক বুঝ ও রহস্য উম্মাহর সামনে নিয়ে এসেছেন।
সুতরাং এতে বোঝা যায়, সালাফদের বুঝ আঁকড়ে ধরার সাথে তাদাব্বুরের নির্দেশনার কোনো সংঘাত নেই। যদি দুটি ব্যাপার সাংঘর্ষিকই হতো, তাহলে তাবেইরাই সর্বপ্রথম তা অস্বীকার করতেন। অথচ বাস্তবতা হলো, সকল সালাফই সাহাবিদের ফাহমকে আঁকড়ে ধরার পাশাপাশি উম্মতকে অধিক পরিমাণে তাদাব্বুরের জন্য উৎসাহিত করেছেন। নুসুসে শরিয়াহ থেকে বিধান, মর্ম ও রহস্য উদঘাটন করার কথা বলেছেন। ইমাম বাগাভি রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'এক প্রকার ইলম হলো, যা কুরআন তিলাওয়াত ও তার অর্থের মাধ্যমে লাভ হয়। আরেক প্রকার ইলম হলো, যা চিন্তাভাবনা ও গবেষণার মাধ্যমে লাভ হয়। আর তা নুসুসের গভীরে গচ্ছিত মর্মের ওপর কিয়াস করার মাধ্যমে মুতাদাব্বিরের সামনে উন্মোচিত হয়। ১৫৫
(তবে এখানে খুব ভালোভাবে মনে রাখতে হবে, যেন তাদাববুরকারীর তাদাব্বুর শরিয়াতের কোনো উসুল বা মৌলিক নির্দেশনার খেলাফ না হয়। সাহাবিগণ হয়ে যে দীন আমাদের কাছে এসেছে, সে দীনের সিদ্ধান্তকৃত কোনো বিষয়ের বিরুদ্ধে না যায় এবং শরিয়াতের অন্য কোনো নসের বিপরীত না হয়।)
দ্বিতীয়ত, সালাফদের ফাহম আঁকড়ে ধরার মাধ্যমে তাদাব্বুর ও ইসতিমবাত বেশি সুশৃঙ্খল ও বিশুদ্ধ হয়। সালাফদের ফahম আমাদের তাদাব্বরকে সঠিক ও নিরাপদ পথে পরিচালিত করে। যেন কেউ তাদাব্বুর আর গবেষণার নামে আল্লাহ, তার রাসুল ও শরিয়াতের ব্যাপারে যা ইচ্ছা তা বলতে না পারে। এ বিষয়টি সুস্পষ্ট যে, যারাই কুরআন-হাদিসকে সালাফদের তাফসিরের বিপরীতে গিয়ে ব্যাখ্যা করেছে, তারাই আল্লাহর ব্যাপারে মিথ্যা বলেছে, আল্লাহর আয়াতের এমন ব্যাখ্যা আবিষ্কার করেছে, যা শরিয়াতের বিরুদ্ধে যায় এবং তারাই আল্লাহর কালামের বিকৃতি ঘটিয়েছে। আর তারাই ইলহাদ ও যানদাকার (দীন ত্যাগ ও ঈমান বিধ্বংসী বিকৃতির) দরজা উন্মোচন করেছে।১৫৬
তৃতীয়ত, সালাফরা যে ফাহমের ওপর একমত পোষণ করেছেন এবং যে ফাহমের ক্ষেত্রে তাদের মতভিন্নতা দেখা যায় না, সে ফাহমকে অবশ্যই আঁকড়ে ধরতে হবে। আর যে ফাহমের ক্ষেত্রে তাদের ভেতর মতবিরোধ হয়েছে এবং সে মতবিরোধ বর্ণিত হয়ে এসেছে, সেখানে খালাফের যোগ্য ব্যক্তিদের অবকাশ আছে চিন্তাভাবনা ও পর্যালোচনা করে সবচেয়ে সঠিক ফাহমটি গ্রহণ করার।
চতুর্থত, আমাদের তাদাব্বর ও ইসতিমবাত শুদ্ধ হওয়ার জন্য সালাফদের ফাহম আকড়ে ধরা প্রধান শর্ত। সুতরাং তাদাব্বুরের জন্য সবস্থ শরিয়াহর মৌলিক ও শুদ্ধ মর্ম জেনে নেওয়া। আর এই ক্ষেত্রে সালাফদের ফাহমই মৌলিকত্ব ও বিশুদ্ধতার দাবি রাখে। এজন্য উলামায়ে কেরাম তাদাব্বরের জন্য কিছু নিয়ম ও শর্তাবলি বেঁধে দিয়েছেন। যেগুলো লক্ষ না রাখলে তাদাব্বর ভুল পথে পরিচালিত হবে এবং ব্যক্তিকে চরম ভ্রষ্টতার দিকে নিয়ে যাবে। আমরা এখানে মৌলিক কিছু শর্ত তুলে ধরছি-
১. উদঘাটিত অর্থ বা মর্ম সালাফের ফাহমের বিরোধী হতে পারবে না। কারণ এতে করে সকল সালাফের ওপর দীন না বোঝার মতো মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হয়। তারা ভ্রান্তি ও মুর্খতার ওপর একমত হয়েছেন-এ ধরনের জঘন্য দাবি করা হয়। আর এ ধরনের দাবি সুস্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যাত।
তাদাব্বুর ও ইসতিমবাত যেহেতু আয়াতের সঠিক অর্থ জানার ওপর নির্ভরশীল, এজন্য উদঘাটিত মর্মও সালাফের মৌলিক ও শুদ্ধ ফাহমের সাথে বিরোধহীন হতে হবে। পাশাপাশি সালাফের ফাহম ও উদঘাটিত নতুন ফাহমের মাঝে পরস্পর সম্পর্ক বা যোগসূত্র থাকতে হবে। ইমাম কুরতুবি রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'তাফসির করতে গেলে প্রাথমিকভাবে নসের সাধারণ ও বাহ্যিক যে ফাহম রয়েছে, সেটা নিয়ে আসতে হবে। এর জন্য নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সালাফের কোনো বর্ণনা অবলম্বন করতে হবে। পাশাপাশি কোনো উসতাজ বা শায়খ থেকেও এ ব্যাপারে শোনার আশ্রয় নিতে হবে। এতে করে আশা করা যায়, সে প্রথমেই ভুলের ময়দান থেকে বেঁচে থাকতে পারবে। অতঃপর এর ওপর ভিত্তি করে তাফসিরের গভীরে প্রবেশ করতে পারবে। নিজস্ব ফাহম ও ইসতিমবাত আরও প্রশস্ত করতে পারবে। সুতরাং বাহ্যিক তাফসির জানার পূর্বে গভীর মর্মে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।'১৫৭
কারণ যে ব্যক্তি দাবি করে যে, মৌলিক তাফসির জানার আগেই সে কুরআনের গভীর রহস্যে পৌঁছে গেছে, সে মূলত ওই ব্যক্তির মতো, যে দরজায় প্রবেশের আগেই ঘরের ভেতরে চলে যাওয়ার দাবি করে। ১৫৮ আর নুসুসে শরিয়াহর মৌলিক, বাহ্যিক ও বিশুদ্ধ তাফসির সেটিই, যা সালাফরা বুঝেছেন।
২. উদঘাটিত মর্ম আরবি ভাষার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। কারণ আরবি ভাষা শরিয়াতের প্রধান ও মৌলিক ভাষা। ইমাম শাতেবি রহিমাহুল্লাহ এটাকে প্রথম শর্তের স্থানে রেখেছেন। তিনি বলেন, 'কুরআন থেকে উদঘাটিত যে মর্ম আরবি ভাষার প্রচলনে নেই, উলুমে কুরআনে এর কোনো স্থান নাই। সেটা এমন কোনো বিষয় হিসেবে গৃহীত হবে না, যার মাধ্যমে উপকার লাভ করা যায়, কিংবা কাউকে উপকৃত করা যায়। যে এটাকে গ্রহণযোগ্য হিসেবে দাবি করবে, সে তার দাবিতে মিথ্যাবাদী হবে।'১৫৯
৩. নতুন উদঘাটিত মর্মের পক্ষে কুরআন ও সুন্নাহর সমর্থন থাকতে হবে। এটা ইমাম শাতেবি রহিমাহুল্লাহর কাছে দ্বিতীয় শর্ত।
ওপরের শর্তসমূহের ভিত্তিতে বলা যায়, নুসুসে শরিয়াহর এমন নতুন মর্ম আবিষ্কার করা যায়, যা সালাফদের থেকে বর্ণিত নয়। তবে এই ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে-
১. যদি উদ্দেশ্য হয়ে থাকে যে সালাফদের ফাহমের সাথে বিরোধহীন মর্ম উদঘাটন, যার মাধ্যমে পূর্ববর্তীদের ওপর দীন না বোঝার অপবাদ আরোপিত হয় না, তাহলে এতে কোনো সমস্যা নেই। কারণ এই কুরআনের রহস্য শেষ হবার নয়।
অনুরূপ আমাদের রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেও মহান আল্লাহ তাআলা জামিউল কালিম দান করেছেন। কিয়ামত পর্যন্ত মুসলিমরা নুসুসে শরিয়াহ থেকে নিত্য নতুন রহস্য ও গভীর মর্ম উদঘাটন করতে থাকবে। এটি মহান আল্লাহ তাআলার বিশেষ অনুগ্রহ, যাকে ইচ্ছা তাকে দান করে থাকেন। পবিত্র কুরআন হলো প্রবাহমান নদীর মতো। এই নদী থেকে আল্লাহর নির্ধারিত অংশ অনুযায়ী প্রত্যেকেই মনিমুক্তা আহরণ করতে থাকবে।
২. আর যদি এর দ্বারা সালাফদের ফাহমের বিরোধী কোনো মর্ম উদঘাটনের দাবি করা হয়, তবে সে মর্ম গ্রহণযোগ্য হবে না; বরং প্রত্যাখ্যাত হবে। কারণ এর মাধ্যমে শ্রেষ্ঠ যুগের মানুষ সালাফদের ওপর ভ্রান্তি ও অজ্ঞতার মিথ্যা অভিযোগ আরোপ করা হয়। অথচ দীনের বুঝ, ফিকহ, আমল সবক্ষেত্রে তারা শ্রেষ্ঠত্বের সার্টিফিকেট অর্জনকারী প্রজন্ম। আবার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'আমার উম্মত ভ্রান্তির ওপর একমত হবে না।' সুতরাং সালাফদের বিরুদ্ধে গিয়ে নতুন মর্ম আবিষ্কার করতে গেলে এর অর্থ দাঁড়ায়, তারা সকলেই ভুলের ওপর একমত ছিলেন।
ওপরের আলোচনার ভিত্তিতে আমরা তাদাব্বুরের মাজালগুলো (ক্ষেত্র) চিহ্নিত করতে পারি-
১. নুসুস থেকে বিধান সংশ্লিষ্ট নয় এমন মর্ম উদঘাটন করা, যা সালাফদের ফাহমের বিরুদ্ধে যায় না।
২. আপতিত নতুন পরিস্থিতিতে ও নতুন বিষয়ে নুসুসে শরিয়াহ থেকে বিধান উদঘাটন করা।
৩. সালাফদের মাঝে মতবিরোধপূর্ণ ফাহমসমূহ থেকে তাদাব্বুর ও পর্যালোচনার মাধ্যমে সবচেয়ে যথার্থ মর্মকে উদঘাটন করা। তবে তাদাব্বুরের এই মাজাল বা ক্ষেত্র ইলমের শাস্ত্রীয় ব্যক্তিবর্গ ছাড়া আর কারও জন্য নয়।
৪. পাঠক বা মুতাদাব্বিরের নিজস্ব অবস্থা বিবেচনায় এই অনুসন্ধান চালানো যে, অমুক আয়াতের ব্যাপারে আমি কোন অবস্থানে আছি, আমার কোথায় থাকা উচিত ছিল এবং আমি কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। সামগ্রিকভাবে সকলের জন্য এবং বিশেষভাবে সাধারণ মানুষ ও তালেবুল ইলমের জন্য এটাই তাদাব্বুরের প্রধান মাজাল বা ক্ষেত্র।
সুতরাং সালাফের ফাহম আঁকড়ে ধরা কখনোই আল্লাহর নির্দেশিত তাদাব্বুরে কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক কোনো বিষয় নয়; বরং সালাফদের ফাহম ছাড়া আমাদের তাদাব্বুর সঠিক ও নিরাপদ পথে পরিচালিত হতে পারবে না। সালাফের ফাহম আমাদের তাদাব্বরকে সুশৃঙ্খল, নিরাপদ ও অধিক শক্তিশালী করে।
টিকাঃ
১৫১. সুরা সাদ, আয়াত ২৯
১৫২. সুরা মুহাম্মাদ, আয়াত ২৪
১৫৩. সুরা বাকারা, আয়াত ৭৮
১৫৪. সুমামা লাবদুর রাজ্জাক, হাদিস নং ২০৯৭; আযযুহদ, ইবনুল মুবারাক, ৮০৮
১৫৫. মাআলিমুত তানযিল, ২/২৫৫
১৫৬. মাজমুউল ফাতাওয়া, ১৩/২৪৩
১৫৭. আল জামিউ লি আহকামিল কুরআন, ১/৫৯
১৫৮. আল ইতকান লিস সুয়তি, ২/২৬৭
১৫৯. আল মুওয়াফাকাত, দারু ইবনে আফফান ০১১.০
📄 পঞ্চম সংশয় : আকল ও ফাহমুস সালাফ
সালাফদের ফাহম আঁকড়ে ধরলে মানুষের আকলকে অকেজো করে রাখা হয় এবং আকলের অবমূল্যায়ন করা হয়। অথচ শরিয়াহর দলিল-আদিল্লার ক্ষেত্রে আকলই হলো মূল; বরং আকলই হলো শরিয়াহর মূল উৎস।
আবার কোনো কোনো বুদ্ধিজীবী বলে থাকেন, এর চেয়ে বড় চিন্তাগত সংকট আর কী হতে পারে যে, উম্মতের আকলকে অকেজো করে মৃত মানুষদের কাছ থেকে জীবিত মানুষদের জন্য সমাধা গ্রহণ করা লাগবে?
তাদের কারও কারও মতে, বর্তমান মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় সংকট হলো—নিজেদের আকলের ওপর পূর্ববর্তী মৃতদের নকল (বর্ণিত মতামত)-কে প্রাধান্য দেওয়া।
নিরসন :
এই ধরনের আপত্তির ধারা নতুন কিছু নয়। অনেক পুরাতন। বর্তমান মডার্নিস্টরা এই আপত্তি সামনে আনলেও পূর্বে আহলুস সুন্নাহ থেকে বহির্ভূত মুতাজিলারাও এই আপত্তি তুলেছিল। তখন তাদের আপত্তির উৎস ছিল সে সময়ের গ্রিক দর্শন। আর বর্তমানে এই আপত্তির উৎস হলো পশ্চিমা দর্শন 'হিউম্যানিটি'।
ইসলাম কখনো আকলকে অবমূল্যায়ন করেনি। ইসলামি শরিয়ায় আকলের গুরুত্ব একটি স্বীকৃত বিষয়। পবিত্র কুরআনে প্রায় ৪৯ বার আকল শব্দটি কয়েকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। ১৬০ আল্লাহকে চেনার জন্য, সত্যকে বোঝার জন্য এবং ইসলামকে গ্রহণ করার জন্য কুরআনের অসংখ্য জায়গায় মহান আল্লাহ তাআলা মানুষকে আকল ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
قُلْ إِنَّمَا اَعِظُكُمْ بِوَاحِدَةٍ أَنْ تَقُومُوا لِلَّهِ مَثْنَى وَفُرَادَى ثُمَّ تَتَفَكَّرُوا.
'(হে রাসুল!) তাদেরকে বলো, আমি তোমাদেরকে কেবল একটি বিষয়ে উপদেশ দিচ্ছি। তা এই যে, তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে দু-দুজন অথবা এক-একজন করে দাঁড়িয়ে যাও, তারপর ইনসাফের সাথে চিন্তা করো। ১৬১ অন্যত্র তিনি বলেন,
الَّذِينَ يَذْكُرُونَ اللَّهَ قِيمًا وَقُعُودًا وَ عَلَى جُنُوبِهِمْ وَ يَتَفَكَّرُونَ فِي خَلْقِ السَّمَاتِ وَالْأَرْضِ رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هُذَا بَاطِلًا سُبْحْنَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ.
'যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শুয়ে (সর্বাবস্থায়) আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা করে (এবং তা লক্ষ্য করে বলে ওঠে), হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি এসব উদ্দেশ্যহীনভাবে সৃষ্টি করেননি। আপনি এমন (অনর্থক) কাজ থেকে পবিত্র। সুতরাং আপনি আমাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন।১৬২
قُلِ انْظُرُوا مَا ذَا فِي السَّمَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا تُغْنِي الْأَيْتُ وَالنُّذُرُ عَنْ قَوْمٍ لَّا يُؤْمِنُونَ.
'(হে নবি!) তাদেরকে বলো, একটু লক্ষ করে দেখো আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীতে কী কী জিনিস আছে? কিন্তু যেসব লোক ঈমান আনার নয়, (আসমান ও জমিনে বিরাজমান) নিদর্শনাবলি ও সতর্ককারী (নবি)- গণ তাদের কোনো কাজে আসে না।'১৬৩
যারা আকল থেকে উপকৃত হয় না, পবিত্র কুরআনে তাদের নিন্দা করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
صُمٌّ بُكُمْ عُمْيٌ فَهُمْ لَا يَعْقِلُونَ.
'তারা বধির, মূক, অন্ধ। সুতরাং তারা কিছুই বোঝে না।'১৬৪
بَلْ أَكْثَرُهُمْ لَا يَعْقِلُونَ .
'কিন্তু তাদের অধিকাংশই বুদ্ধিকে কাজে লাগায় না।'১৬৫
وَقَالُوا لَوْ كُنَّا نَسْمَعُ أَوْ نَعْقِلُ مَا كُنَّا فِي أَصْحُبِ السَّعِيرِ.
'তারা আরও বলবে, যদি আমরা শুনতাম অথবা বুদ্ধি খাটাতাম, তবে আমরা জাহান্নামবাসীদের মধ্যে থাকতাম না।'১৬৬
শুধু তাই নয়, আকল হলো বান্দার ওপর শরিয়াতের বিধান কার্যকর হওয়ার পূর্বশর্ত। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'তিন ব্যক্তি থেকে হিসাবের কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে—ঘুমন্ত ব্যক্তি থেকে জাগ্রত না হওয়া পর্যন্ত, ছোট বাচ্চা থেকে প্রাপ্তবয়স্ক (বালেগ) না হওয়া পর্যন্ত এবং পাগল থেকে বুঝ ও জ্ঞান না ফেরা পর্যন্ত।'১৬৭
কিন্তু মানুষের আকল স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। এই আকল বিভিন্ন কিছু দ্বারা প্রভাবিত হয়। নিজের অভিজ্ঞতা, আবেগ অনুভূতি, প্রবৃত্তি, চারপাশের পরিবেশসহ আরও অনেক প্রবণতা মানুষের আকলে প্রভাব ফেলে। এটা সে অনুধাবন করুক কিংবা না করুক। এজন্য দেখা যায়, কোনো কোনো বিষয়ে মানুষ একবারেই তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ফেলে। কারণ তার আকল বহিরাগত বিভিন্ন প্রবণতা থেকে প্রভাবিত হয়।
ফলে আকলের এমন কিছু সূত্র দরকার, যার আলোকে আকল পরিচালিত হলে এগুলো তাকে বিভিন্ন প্রবণতা থেকে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় রেখে সঠিক দিকে নিয়ে যাবে। মৌলিকভাবে সে সূত্র হলো ‘ওহি’। এজন্য আকল স্বয়ংসম্পূর্ণ কিছু নয়; বরং আকলের শক্তি চোখের দৃষ্টিশক্তির মতো। চোখের সাথে সূর্য ও অন্য কিছুর আলো মিলিত হলে যেমন দৃষ্টিশক্তি সঠিকভাবে কাজ করে, তেমনিভাবে আকলের সাথে যখন ঈমান ও কুরআন-সুন্নাহর আলো মিলিত হবে, তখন তা সঠিকভাবে কাজ করবে।১৬৮
এই বিষয়টি আমরা পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে দেখতে পাব। যেমন মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
فَإِنْ لَّمْ يَسْتَجِيبُوا لَكَ فَاعْلَمُ أَنَّمَا يَتَّبِعُوْنَ أَهْوَاءَهُمْ وَ مَنْ أَضَلُّ مِمَّنِ اتَّبَعَ هَوْنَهُ بِغَيْرِ هُدًى مِّنَ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّلِمِينَ.
‘তারা যদি তোমার ফরমায়েশ মতো কাজ না করে, তবে বুঝবে, তারা মূলত তাদের খেয়াল-খুশিরই অনুসরণ করে। যে ব্যক্তি আল্লাহর পক্ষ হতে আগত হেদায়াত ছাড়া কেবল নিজ খেয়াল-খুশির অনুসরণ করে, তার চেয়ে বেশি পথভ্রষ্ট আর কে হতে পারে? নিশ্চয়ই আল্লাহ জালেম সম্প্রদায়কে হেদায়াত দান করেন না।’
অন্যত্র বলেছেন,
وَ أَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَبَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ الْكِتٰبِ وَ مُهَيْمِنًا عَلَيْهِ فَاحْكُمْ بَيْنَهُمْ بِمَا اَنْزَلَ اللَّهُ وَلَا تَتَّبِعُ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ لِكُلِّ جَعَلْنَا مِنْكُمْ شِرْعَةً وَ مِنْهَاجًا.
‘এবং (হে রাসুল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমি তোমার প্রতিও সত্য সংবলিত কিতাব নাজিল করেছি, তার পূর্বের কিতাবসমূহের সমর্থক ও সংরক্ষকরূপে। সুতরাং তাদের মধ্যে সে বিধান অনুসারেই বিচার করো, যা আল্লাহ নাজিল করেছেন। আর তোমার নিকট যে সত্য এসেছে, তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করো না।’
আল্লামা শাতেবি রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'যে বিষয় প্রাধান্য পাওয়ার উপযুক্ত, তাকে প্রাধান্য দেওয়া আবশ্যক। সে জিনিসটা হলো শরিয়াহ। আর যে জিনিস প্রাধান্য না পাওয়ার উপযুক্ত, সেটাকে প্রাধান্য না দেওয়াই আবশ্যক। সে জিনিসটা হলো আকল। সুতরাং অপূর্ণাঙ্গ ও মুখাপেক্ষী বিষয়কে পূর্ণাঙ্গ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ বিষয়ের ওপর বিচারক মানা মোটেও শুদ্ধ নয়। এটি যুক্তি ও দলিল উভয়টিরই পরিপন্থি।'১৭১
সুতরাং ওহির সূত্র ছাড়া মানুষ যখন আকল ব্যবহার করে, তখন মূলত সেটা আকলে সালিম থাকে না; বরং সেটি প্রবৃত্তি বা বহিরাগত কোনো প্রবণতায় প্রভাবিত আকলে ফাসেদ বা অসুস্থ বিবেক হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে বাহ্যিকভাবে মনে হতে পারে, ব্যক্তি খুবই যৌক্তিক ও জ্ঞানসম্পন্ন দলিল পেশ করছে। অথচ প্রকৃতপক্ষে তা প্রবৃত্তি ছাড়া কিছুই না।
বোঝা গেল, যেকোনো চিন্তা ও বিবেচনার ক্ষেত্রে মানুষের আকল স্বয়ংসম্পূর্ণ না। মানুষের আকল বহিরাগত নানান প্রবণতা দ্বারা প্রভাবিত হয়। ওহির বুঝের ক্ষেত্রেও সে এসব প্রবণতা থেকে মুক্ত নয়। তাই নুসুসে শরিয়াহ বোঝার ক্ষেত্রেও মানুষের আকলকে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেওয়া যাবে না। তা ছাড়া নুসুসে শরিয়াহর ক্ষেত্রে অন্যতম উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের উদ্দেশ্য পর্যন্ত পৌঁছা। আর যেহেতু মানুষের আকল নানান প্রবণতা দ্বারা প্রভাবিত হয়, ফলে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের মর্মে পৌঁছতে সে বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তার আকল তাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পরিবর্তে প্রবৃত্তি কিংবা তার অজান্তেই ভিন্ন কোনো স্বার্থের দিকে প্রবাহিত করতে পারে। তাই, নুসুসে শরিয়াহর মাধ্যমে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বুঝ পর্যন্ত পৌঁছতে আকলকে ব্যবহারের জন্য তার সামনে অবশ্যই কেন্দ্রীয় ও মানদণ্ডের মর্যাদা রাখে এমন ফাহমসমূহ বিদ্যমান থাকা জরুরি। আরও জরুরি যথার্থ কিছু মূলনীতির। সালাফদের ফাহম ও মানহাজ হলো সেই মানদণ্ড ও কেন্দ্র। সালাফদের ফাহম কখনোই আমাদের আকলকে জুমুদের (অচলাবস্থার) দিকে ঠেলে দেয় না, আকলকে অকেজো করে রাখে না; বরং তা আমাদের আকলের আলো সরবরাহ করে এবং বিভিন্ন প্রবণতা থেকে বাঁচিয়ে একে সঠিক পথে প্রবাহিত করে।
আবার বহিরাগত বিভিন্ন আঘাতে চোখের দৃষ্টিশক্তি যেমন ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, তেমনিভাবে আকলও বহিরাগত প্রভাবে ক্ষয় হতে পারে, হতে পারে অসুস্থ। এই এক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলেও আমাদের সালাফদের আকল বর্তমানের লোকদের চেয়ে শক্তিশালী, সুস্থ ও পরিচ্ছন্ন ছিল। তারা ছিলেন রাসুলের মুখে স্বীকৃত শ্রেষ্ঠ জমানার। সমাজে বিভিন্ন অপরাধের উপস্থিতি থাকলেও ইসলামি শরিয়াহ ছিল সার্বিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। আর বর্তমানে ইসলাম কোথাও প্রতিষ্ঠিত নেই। বহিরাগত বিভিন্ন সভ্যতা ও সংস্কৃতি মুসলিমদের ওপর রাজ করছে। কুফর, শিরক, পাপাচারের এত জয়জয়কার সালাফদের সময় ছিল কল্পনাতীত বিষয়।
সুতরাং সালাফদের ফাহম ও মানহাজের ওপর নির্ভরশীলতা মানে আকলকে অকেজো করে রাখা নয়; বরং মানুষের আকলকে সুস্থ ও নিরাপদ রাখতেই নুসুসে শরিয়াহ ও সালাফদের ফাহমকে সূত্র মানা হয় এবং এর মাধ্যমে আকলকে যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়, যে মূল্যায়নের সে উপযুক্ত। আকলকে অবাধ ছেড়ে দেওয়া কিংবা অকেজো করে রাখা উভয়টিই আকলকে অবমূল্যায়ন করার শামিল।
টিকাঃ
১৬০. কিমাতুল আকল ফিল ইসলাম, পৃষ্ঠা ১৩
১৬১. সুরা সাবা, আয়াত ৪৬
১৬২. সুরা আলে ইমরান, আয়াত ১৯১
১৬৩. সুরা ইউনুস, আয়াত ১০১
১৬৪. সুরা বাকারা, আয়াত ১৭১
১৬৫. সুরা আনকাবুত, আয়াত ৬৩
১৬৬. সুরা মুলক, আয়াত ১০
১৬৭. মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ২৪৬৯৪; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৪৪০০
১৬৮. মাজমুউল ফাতাওয়া, ৩/৩৩৯
জাসাস, আয়াত ৫০
Sharb, আয়াত ৪৮
১৭১. আল ইতিসাম, ৩/২২৮