📘 ফাহমুস সালাফ > 📄 সালাফদের ফাহম ও মানহাজ থেকে বিচ্যুতির কারণ

📄 সালাফদের ফাহম ও মানহাজ থেকে বিচ্যুতির কারণ


সালাফদের ফাহম ও মানহাজের ওপর নির্ভরশীলতার ব্যাপারে আধুনিক মুসলিমদের ভেতর উপেক্ষার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, এর পেছনে মৌলিক কিছু কারণ আছে। প্রবৃত্তির তাড়না, দুনিয়া ও অর্থের প্রতি অধিক টান, পদ ও পার্থিব শান্তির প্রতি ব্যাকুলতা, কারও প্রতি বিদ্বেষ ইত্যাদির কারণে ফাহমুস সালাফকে প্রত্যাখ্যান করার প্রবণতা সৃষ্টি হয়। কারণ নুসুসে শরিয়াহকে সালাফদের ফাহমের আলোকে বুঝতে গেলে এই পথগুলোতে বাধা সৃষ্টি হয়। পক্ষান্তরে নিজের মতো করে বুঝতে চাইলে এই বাধাগুলো এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয় নুসুসকে তার মূল অর্থ থেকে সরিয়ে ফেলার কারণে। তবে এর মৌলিক কিছু কারণ আছে, আমরা কেবল সেগুলো এখানে উল্লেখ করতে চাচ্ছি।
১. পাশ্চাত্য মূল্যবোধের কাছে মানসিক পরাজয়। যার দরুন যখন পশ্চিমা বিশ্ব তাদের কিছু মৌলিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে ইসলামের কিছু বিধানের ওপর আপত্তি উত্থাপন করে, তখন তাদের আপত্তি থেকে বাঁচার জন্য কিংবা ইসলামকে তাদের সামনে গুড (ভালো) হিসেবে উপস্থাপন করার জন্য উক্ত বিধানগুলোর নতুন ব্যাখ্যা তৈরির প্রয়োজন দেখা দেয়। আর এই নতুন ব্যাখ্যার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো 'সালাফদের ফাহম ও মানহাজ'। তখন তারা পশ্চিমা মূল্যবোধ ও মানদণ্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ করার পরিবর্তে ইসলামের মুতাওয়ারিস বিধানেই পরিবর্তন ও বিকৃতি সাধনের পথ খোঁজে।
বিশেষত রাষ্ট্রনীতি, হুদুদ, জিহাদ, নারী সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আমরা সালাফদের ফাহম ও মানহাজকে বেশি উপেক্ষিত হতে দেখতে পাই। কারণ এই বিষয়গুলো সুস্পষ্টভাবে পশ্চিমা মূল্যবোধের সাথে সাংঘর্ষিক। ইসলামের নতুন ব্যাখ্যার প্রচেষ্টা জ্ঞানগত জায়গা থেকে তৈরি হয়নি। এই প্রবণতার মূল আকর্ষণই হলো, বর্তমান বিজয়ী সভ্যতার সাথে ইসলামকে খাপ খাওয়ানো। আর আধুনিক অনেক মুসলিম তো নিজেদের এই মনোবাসনার কথা অকপটেই বলে বেড়ায়।
প্রত্যেক যুগেই মুসলিমদের ভেতর এমন কিছু লোক থাকত, যারা যুগের চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে নুসুসে শরিয়াহর নতুন ব্যাখ্যা আবিষ্কার করার জন্য প্রয়াস চালাত। অতীতে যখন মুসলিম বিশ্বে গ্রিক দর্শনের সয়লাব হয়েছিল, তখন একদল লোক শরিয়াহর বিভিন্ন নুসুসকে গ্রিক দর্শন অনুযায়ী ব্যাখ্যা করতে নিয়োজিত ছিল। তখনকার সকল উলামায়ে কেরাম তাদের বিরুদ্ধে ভ্রান্তির অভিযোগ তোলেন এবং মুসলিম উম্মাহকে তাদের ব্যাপারে সতর্ক করেন। ইলমে শরিয়াহ সংরক্ষণের ব্যাপারে মহান আল্লাহ তাআলার ওয়াদা এবং সালাফদের অনুসারী আইম্মায়ে কেরামের মেহনতের ফলে গ্রিক দর্শন দ্বারা প্রভাবিত সেই ধারা ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বে স্বীকৃতি লাভ করতে পারেনি; বরং তারা ভ্রান্ত ফিরকা হিসেবে মুসলিম-সমাজে পরিচিতি লাভ করে।
আজও আমরা দেখতে পাই, ইউরোপীয় সভ্যতা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে একদল লোক নানা অজুহাতে ফিকহি ভাণ্ডারের স্বীকৃত ও মীমাংসিত বিষয়কে প্রত্যাখ্যান করছে, শুধুমাত্র ইউরোপীয় সভ্যতার সাথে সেগুলো সাংঘর্ষিক হওয়ার কারণে। আল্লাহ তাআলার ওয়াদা এখনো বহাল আছে। কালের পরিক্রমায় এ ধরনের লোকগুলোর বিচ্ছিন্ন ও মুতাওয়ারিস ফিকহের বিরোধী মতামত ভ্রান্ত ফিরকার তুরাসে স্থান লাভ করবে। ইসলামের মৌলিক ও মুতাওয়ারিস জ্ঞানতত্ত্বে এসব মতামত কোনো গ্রহণযোগ্যতা লাভ করবে না। যা কিয়ামত পর্যন্ত মহান আল্লাহ তাআলার হুকুমে বহাল থাকবে।
২. ইসলামি শরিয়াহ প্রায়োগিকভাবে প্রতিষ্ঠিত না থাকা। সালাফদের ফাহম ও মানহাজকে উপেক্ষা করার এটাও একটি অন্যতম কারণ। কারণ যখন কেউ লক্ষ করে, সালাফদের থেকে তাওয়ারুস সূত্রে নুসুসে শরিয়াহর যে বুঝ আমরা লাভ করেছি সেটার কোনো বাস্তবিক প্রয়োগক্ষেত্র আমাদের সামনে নেই, তখন তার কাছে সালাফদের ফাহমকে নির্দিষ্ট একটা সময়ের জন্য প্রযোজ্য এবং বর্তমান সময়ের জন্য অকেজো মনে হয়। কিংবা ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠিত না থাকার কারণে সালাফদের ফাহম মানতে গেলে দেখা যায় অনেক বাধা ও সমস্যার শিকার হতে হয়। তাই ঝামেলা এড়ানো অথবা ইসলামকে বর্তমানের সাথে মিলিয়ে উপস্থাপনের জন্য নুসুসে শরিয়াহকে নতুন করে ব্যাখ্যার দিকে ঝুঁকে যায়। আর এই ঝোঁক থেকে বিভিন্ন ফাঁকফোকর দিয়ে সালাফদের ফাহম ও মানহাজকে প্রত্যাখ্যান করার চেষ্টা করা হয়।
৩. ইসলাম সম্পর্কে অমুসলিম প্রাচ্যবিদদের লেখা বইপত্র, প্রবন্ধ ইত্যাদি পড়া।
মুসলিম কিংবা অমুসলিম দেশের সেকুলার মডেলের প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ইসলাম ও ইসলামের নির্দিষ্ট কোনো সাবজেক্টে পড়াশোনা করা।
অথবা অমুসলিম থেকে মুসলিম হওয়া ব্যক্তিদের লেখাপত্রকেই দীন বোঝার একমাত্র উপাদান বানিয়ে নেওয়া।
সাধারণত এই তিন শ্রেণির মানুষের ভেতর সালাফদের ফাহম ও মানহাজ প্রত্যাখ্যান করার মানসিকতাটা একটু বেশি দেখা যায়। এর কারণ হচ্ছে, এই তিনটা ধারাতেই মূলত দীনি ইলম অর্জনের মুতাওয়ারিস ও নিরাপদ পদ্ধতি অবলম্বন করা হয় না। এই ক্ষেত্রগুলোতে ইসলামকে আল্লাহর মনোনীত দীন বা অনুসরণীয় পদ্ধতি হিসেবে পাঠ করা হয় না। ইসলামকে কেবল একটি মতবাদ ও ঐতিহাসিক বাস্তবতা হিসেবে পাঠ করা হয়।
৪. অজ্ঞতা। কারণ হিসেবে অজ্ঞতার ব্যাপারটি এখানে ব্যাপকভাবে বলা হয়েছে। সালাফদের জীবন, তাদের জ্ঞানসাধনা, ঈমান, তাকওয়া ও আমল ইত্যাদি সম্পর্কে কারও অজ্ঞতা থাকতে পারে। যার দরুন সে সালাফদের ব্যাপারে এমন বিশ্বাস স্থাপন করে রাখে, যেটা আসলে বাস্তব না। আবার কারও ইসলামি জ্ঞানশাস্ত্রগুলোর সৌন্দর্য ও যথার্থতার ব্যাপারে অজ্ঞতা থাকতে পারে। যার দরুন সে এসব জ্ঞানশাস্ত্রের উসুল ও ফুরু তথা মূল ও শাখা উভয় জায়গাতেই পরিবর্তন সাধনের দাবির দিকে ঝুঁকে পড়ে।
এগুলো একদম মৌলিক কিছু কারণ। সালাফদের ফাহম ও মানহাজের ব্যাপারে সংশয়গ্রস্ত বা উপেক্ষা প্রদর্শনকারী প্রত্যেকের ভেতর উল্লিখিত সবগুলো কারণের প্রভাব থাকবে এটা জরুরি না; বরং ভিন্ন ভিন্ন একক কারণেও কারও ভেতর এই প্রবণতা সৃষ্টি হতে পারে। আবার কারও মাঝে উল্লিখিত প্রবণতা সৃষ্টি হওয়ার পেছনে ভিন্ন কোনো কারণও থাকতে পারে, যা এখানে উল্লেখ নেই। আল্লাহু আলাম!

📘 ফাহমুস সালাফ > 📄 উপসংহার

📄 উপসংহার


মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘আমি এই কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই একে সংরক্ষণ করব।’ ২২৭ এই আয়াতে মহান আল্লাহ তাআলা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর প্রেরিত দীনকে কিয়ামত পর্যন্ত সংরক্ষণ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সার্বিকভাবে দীনে ইসলামকে তাহরিফ (বিকৃতি) ও তাবদিল (পরিবর্তন) থেকে নিরাপদ রাখার জন্য তিনি যে মাধ্যমটি ব্যবহার করেছেন সেটি হলো, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে নিয়ে কিয়ামত পর্যন্ত এই দীন বহনকারী ন্যায়পরায়ণদের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। আল্লাহ তাআলা ইতঃপূর্বে প্রেরিত অন্য কোনো শরিয়াহ ও দীনি গ্রন্থের সংরক্ষণ করার এত সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেননি। যার দরুন দেখা গেছে, নির্দিষ্ট একটা সময় পার হওয়ার পর সেসব শরিয়াহ ও দীনি গ্রন্থ তার অনুসারীদের হাতে পরিবর্তন ও বিকৃতির শিকার হয়েছে। আর এই পরিবর্তন ও বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা করে দীনি গ্রন্থ ও শরিয়াহকে মূল অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য কোনো প্রচেষ্টা এবং ধারাও তাদের ভেতর দেখা যায়নি।
কিন্তু ইসলামি শরিয়াহর ক্ষেত্রে পুরো ব্যাপারটিই ভিন্ন। মহান আল্লাহ তাআলা এই শরিয়াহকে সংরক্ষিত রাখার ওয়াদা করেছেন এবং এ ওয়াদা বাস্তবায়নের জন্য প্রত্যেক যুগ ও প্রজন্মে অবিচ্ছিন্ন ও ধারাবাহিক একটি নেটওয়ার্ক সৃষ্টি করে দিয়েছেন। ফলে আজ পর্যন্ত কেউ ইসলামকে চিরতরে বিকৃত ও পরিবর্তন করতে পারেনি। কেউ কোনোভাবে দীনে ইসলামের এই মুতাওয়ারিস ধারায় ফাটল সৃষ্টি করতে চাইলে মুসলিম-সমাজে সে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, ভ্রান্ত ব্যক্তি বা দল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। আল্লাহপ্রদত্ত মুতাওয়ারিস এই ধারা দীনে ইসলামের একটি মুজিযা ও অনন্য বৈশিষ্ট্য। পুরো মুসলিম উম্মাহর জন্য এটি মহান এক নেয়ামত। মুসলিমদের জন্য এটি গর্বের বিষয়, হীনম্মন্যতার নয়। মুসলিম জাতি যদি পবিত্র এই ধারার প্রতি নিবেদিত থেকে ও আত্মবিশ্বাস রেখে দীনের কাজে নিয়োজিত হয়, তাহলে পৃথিবীর কোনো শক্তি তাদেরকে বিচ্যুত করতে পারবে না। পৃথিবীর কোনো পরিস্থিতি তাদেরকে আদর্শিকভাবে পরাজিত করতে পারবে না। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আমার উম্মতের একটি দল সর্বদাই সত্যের ওপর অটল থাকবে। যারা তাদেরকে সাহায্য করা ছেড়ে দেবে, তারা এই দলের কিছুই করতে পারবে না। এমনকি এভাবে আল্লাহর আদেশ তথা কিয়ামত এসে যাবে আর তারা যেমনটি ছিল তেমনটিই থাকবে, অর্থাৎ অনুরূপ (সত্যের ওপর অটল) থাকবে।'২২৮
পরিতাপের বিষয় হলো, পরাজিত ও প্রভাবিত মানসিকতা নিয়ে একদল মুসলিম নিজেদের এই ধারার প্রতি অনাস্থাবোধ করছে। যুগের সাথে তাল মিলানোর জন্য তারা ইসলামের স্বীকৃত বিধানকে বিনষ্ট করে দীনের নব্য ব্যাখ্যা আবিষ্কার করছে।
হাদিসশাস্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইসনাদ বা সনদ। সনদ বা ইসনাদ বলা হয়, কোনো বক্তব্য বা মতের উৎসমূল পর্যন্ত ধারাবাহিক সূত্রধারাকে। এই ইসনাদ ইসলামের প্রতিটি জ্ঞানশাস্ত্রের প্রধান শর্ত। সালাফদের থেকে খালাফদের কাছে তাহরিফ ও তাবদিল মুক্ত সুরক্ষিত দীন ইসনাদের মাধ্যমেই পৌঁছেছে। ইসনাদ এমনই এক বৈশিষ্ট্য, যেটি এই উম্মতকে ছাড়া অন্য কোনো উম্মতকে দেওয়া হয়নি। দীনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসনাদ ও তাওয়ারুসের গুরুত্ব অপরিসীম। শরিয়াহর ইলম ও ফাহম উভয় ক্ষেত্রেই আমাদের ইসনাদ ও তাওয়ারুসের প্রতি সর্বোচ্চ লক্ষ রাখতে হবে। নতুবা এই দীন সীমালঙ্ঘনকারীদের বিকৃতি, বাতিলপন্থিদের মিথ্যাচার ও মূর্খদের অপব্যাখ্যায় জর্জরিত হবে। এজন্যই আমাদের সালাফরা ইসনাদ ও পরম্পরা-সূত্রকে দীনের অন্তর্ভুক্ত মনে করতেন। আবদুল্লাহ ইবনে মোবারক রহিমাহুল্লাহ বালোন, 'স্বীলান্যাস হলো দীনের আন্তর্ভুক্ত। হাদি ইসহাক নাঃ থাকত, তবে জীনে যে-কেউ যা ইচ্ছা বালে ফেলান্তর ২৪
ইমাম আওমামি বহিমাহুল্লায় বালোন, 'ইলম্যান সালে গোলে ইলাহও গলে যাবো হাফেজ ইয়াজিদ দিন সূরাই বৃষ্টিমান্বল্লাহ বলেন, 'প্রাত্যজ বীমোহাই একপর ঘোড়সওয়ার থাকে। এই চীনের ঘোড়সওয়ার ছালেন আসহাবুল জাপানিদে (পানাদের অধিকারীগাণ)
বর্তমান দীনি ও ইলমি অঙ্গনে আমরা যত ফিকরি বিশৃঙ্খলা ও প্রজামা লেখাতে পাই, তার মূল সূত্র খুঁজতে গেলে আমরা দেখব দীনের ইলম ও বুঝের তাওয়াক্কেল ও সনদের অবহেলার কারণেই এই সমস্যা তৈরি হচ্ছে। যারা আজকে উম্মাহর স্বীকৃত মাজহাবকে শিরক ও বিদআত বলে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে, তারাও পালংয়ে সালেহিনের ফাহম ও মানহাজকে উপেক্ষা করছে। হিজবুত তাওহিদের মতো দল যখন দাবি করে, দীর্ঘ তেরোশ বছর ইসলামের সঠিক বুঝ গোটা মুসলিম জগতে ছিল না, তাদের মাধ্যমে চৌদ্দশ পর আবার ইসলামের সঠিক ব্যাখ্যা ফিরে এসেছে, তখনো কিন্তু তারা মূল সমস্যাটির এই তাওযাক ও সনদেই করছে। দীনের প্রজন্ম পরস্পরার চেইনকে (ধারা) তারা অস্বীকার করছে। আজকে মডার্নিস্টরা যখন পশ্চিমা সভ্যতার সাথে তাল মিলিয়ে ইসলামি শরিয়াত্তর বিভিন্ন আহকামের যুগোপযোগী ব্যাখ্যা আবিষ্কার করার প্রয়াস চালাচ্ছে, তখনো কিন্তু তারা সালাফদের থেকে প্রাপ্ত দীনের মুতাওয়ারিস ফাহমকে প্রত্যাখ্যান করাছে। যারা রাসুলের হাদিসের সুরক্ষা, প্রামাণ্যতা ও শরয়ি ক্ষমতাকে অস্বীকার করছে, তারাও সালাফদের মুতাওয়ারিস মানহাজকে প্রত্যাখ্যান করছে।
যে কাদিয়ানিরা ইসা আলাইহিস সালাম ও খলিফা মাহদিকে একই সারা দাবি করছে, ইসা আলাইহিস সালামকে জীবিত উঠিয়ে নেওয়ার ঘটনাকে অস্বীকার করছে এবং সবশেষে মিজা গোলাম আহমাদ কাদিয়ানিকে ইস্যা ও মাহদি পর্যন্ত দাবি করে বসছে, তাদের সমস্যাও দীনের মুতাওয়ারিস ফাহম ও আদর্শকে প্রত্যাখ্যান করার কারণেই তৈরি হয়েছে। নিজেদের এই দাবির পেছনে তারা কুরআন-সুন্নাহর কিছু নসের এমন ব্যাখ্যাকে দলিল হিসেবে উপস্থাপন করছে, যা সালাফে সালেহিন থেকে প্রমাণিত নয়। অনুরূপ শিয়াদের দিকে লক্ষ করলেও দেখা যাবে, তারা সালাফদের মুতাওয়ারিস ফাহম ও মানহাজকে অস্বীকার করছে। এমনকি স্বয়ং সালাফদের অনেক বড় বড় ব্যক্তিত্বদের কাফের বলছে, তাদের ওপর নোংরা অপবাদ দিচ্ছে, অকথ্য ভাষায় তাদের গালিগালাজ করছে। সুতরাং বলা যায়, এটি আধুনিক সময়ে মুসলিম উম্মাহর জ্ঞানতাত্ত্বিক মৌলিক একটি সমস্যা।
আমরা যদি উম্মাহর ভেতর ক্যান্সারের মতো ছড়িয়ে পড়া মৌলিক এই সমস্যাটিকে কমিয়ে আনতে পারি, আশা করি আমাদের ফিকরি ও ইলমি অনেক হাঙ্গামাই কমে যাবে। সাথে সাথে আমাদের মাঝে বৈধ ইখতিলাফের ব্যাপারে সহনশীলতা তৈরি হবে। আর হ্রাস পেতে থাকবে ইফতিরাক তথা অবৈধ মতবিরোধের মাত্রা। আমরা উপহার পাব বৈচিত্রময় ও ঐক্যবদ্ধ এক মুসলিম কমিউনিটি।
আমাদের মনে রাখতে হবে, ইসলামের পুরো জ্ঞান-কাঠামোর এক সক্রিয় ও শক্তিশালী সিলসিলা (সনদ) আছে। যার মাধ্যমে মহান আল্লাহ তাআলা এই দীনকে পরিচ্ছন্নভাবে আমাদের পর্যন্ত নিয়ে এসেছেন এবং কিয়ামত পর্যন্ত নিয়ে যাবেন। এই সিলসিলা মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের হেদায়াতের জন্য তৈরি করে রেখেছেন। যেন যুগে যুগে মানুষ সত্যের সন্ধান পায় কোনো প্রকার পরিবর্তন ও বিকৃতি ছাড়াই। এখন আমরা যদি এই সিলসিলাকে সঠিকভাবে আঁকড়ে ধরি এবং এটিকে অক্ষুণ্ণ রেখে সমৃদ্ধ করতে থাকি, তবে একই সাথে আমরা সত্য পথেও থাকতে পারব, আবার আগামী প্রজন্ম পর্যন্ত এই সিলসিলা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে একজন সৌভাগ্যবান সেবকও হতে পারব। আর যদি এই সিলসিলা প্রত্যাখ্যান করি, সেটা আংশিকভাবেই হোক কিংবা পূর্ণাঙ্গরূপে, নিশ্চিতভাবেই আমরা সঠিক ও হেদায়াতের পথ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাব এবং পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব। দীন বোঝার ক্ষেত্রে ফাহমুস সালাফ হচ্ছে আমাদের জন্য কষ্টিপাথরস্বরূপ। আমাদের বুঝ যদি এই কষ্টিপাথরের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয়, তবে আমরা এই বুঝ নিয়ে নিশ্চিন্তে থাকতে পারব। সেই বুঝ পশ্চিমা চেতনার দৃষ্টিতে যতই কঠিন ও অযৌক্তিক মনে হোক।
মহান আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সালাফে সালেহিন থেকে আসা মুতাওয়ারিস ইলমি ধারায় প্রতিষ্ঠিত রাখুন এবং সালাফে সালেহিনের মতো পবিত্র জীবন দান করুন। আমিন।

টিকাঃ
২২৭. সুরা হিজর, আয়াত ৯
২২৮. সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৪৮৪৪
২২৯. আম ইসনাদু মিলাদ দীন, পৃষ্ঠা ১৭
২৩০. আস ইন্স্যন্যাদু মিলাদ দীন, পৃষ্ঠা ২০
২৩১. প্রাগুক্ত।

📘 ফাহমুস সালাফ > 📄 বইয়ে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ শব্দের অর্থ

📄 বইয়ে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ শব্দের অর্থ


নুসুস : কুরআন ও হাদিসের শাব্দিক বর্ণনা।
করনুন : শতাব্দি।
ইজতিহাদ : যে বিষয়ে কুরআন ও সুন্নাহতে সুস্পষ্ট কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায় না এবং যে বিষয়ে পূর্ববর্তী ইমাম ও ফকিহদের সুস্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায় না, সে বিষয়ে দীনি বিধান বের করার জন্য শরয়ি নীতিমালার আলোকে যোগ্য ব্যক্তির গবেষণাকে ইজতিহাদ বলা হয়।
তাকলিফ : মুসলিমদের ওপর সুস্থসবল ও উপযুক্ত বয়সে শরয়ি বিধান পালনের যে দায়বদ্ধতা থাকে, তাকেই তাকলিফ বলা হয়।
তাদাব্বুর : চিন্তাভাবনা।
মাকাসিদে শরিয়াহ : শরিয়াহর উদ্দেশ্যসমূহ।
মাসলাহাত : আরবি শব্দ। এর বহুবচন হচ্ছে মাসালিহ। অর্থ : কল্যাণ।
ফন : শাস্ত্র।
জুমুদ : জড়তা, স্থবিরতা।
নাওয়াজেল : নব্য আপতিত বিষয় ও পরিস্থিতি।
মুখতালাফ ফিহি : যে বিষয়ে মতভিন্নতা রয়েছে।
মানহাজ : পদ্ধতি।
সিলসিলা: ক্রমধারা।
ইসনাদ : কোনো বক্তব্যের উৎস পর্যন্ত পৌঁছার সূত্রধারাকে ইসনাদ বা সনদ বলা হয়।
মানসুস আলাইহি : যে বিষয়ের ওপর নসের সুস্পষ্ট বর্ণনা পাওয়া যায়, তাকে মানসুস আলাইহি বলে।
জাওয়াবেত : নিয়মাবলি।
ইসতিমবাত : গভীর অনুসন্ধানপূর্বক আবিষ্কার।
ইলহাদ : সত্য ও সঠিক পথ থেকে সরে যাওয়ার নাম ইলহাদ। এজন্য সমস্ত কুফর, শিরক ও দীনের বিকৃতি ইলহাদের অন্তর্ভুক্ত। বইটিতে ইলহাদ দ্বারা আমাদের মৌলিক উদ্দেশ্য হলো, দীনের এমন বিকৃতি, যা কুফরের সীমায় চলে যায়।
যানদাকা : যানদাকার কয়েকটি মর্ম আছে— ১. আল্লাহ ও আখিরাতে অবিশ্বাস করা। ২. ভেতরে কুফর গোপন রেখে বাহ্যিকভাবে ঈমান প্রকাশ করা তথা নিফাককেও যানদাকা বলা হয়।
আর এই ধরনের ব্যক্তিকে বলা হয় যিন্দিক।
মুতাজিলা : ইসলামি ইতিহাসের উমাইয়া আমলে জন্ম নেওয়া একটি ভ্রান্ত গোষ্ঠীর নাম। যারা ওহির ওপর আকলের মর্যাদা দেয়। তারা ঈমান ও কুফরের মাঝখানেও মানুষের আরেকটি অবস্থান দাবি করে। তারা মনে করে, বান্দার কর্ম বান্দার নিজেরই সৃষ্টি, এখানে আল্লাহর কোনো হস্তক্ষেপ নেই। তারা আল্লাহর সিফাতগুলো বাতিল সাব্যস্ত করে। তারা আরও মনে করে, কবিরা গুনাহকে আল্লাহ ক্ষমা করতে পারেন না। কবিরা গুনাহকারী নিশ্চিতভাবে জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করবে এবং সেখানে চিরস্থায়ী হবে। এই মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা ওয়াসিল বিন আতা হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহর শিক্ষা মজলিস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার কারণে এই ফিরকাটিকে মুতাজিলা (বিচ্ছিন্ন) হিসেবে নামকরণ করা হয়েছে।
জাবরিয়া : জাবরিয়া ফিরকা বান্দার কর্মের স্বাধীনতাকে অস্বীকার করে। তারা দাবি করে, বান্দার সকল কর্ম যেহেতু আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত, তাই বান্দার সকল কর্মই আল্লাহর কর্ম। এজন্য তারা বিশ্বাস করে, বান্দা কুফর করুক কিংবা শিরক, সকল কাজের দায়ভার আল্লাহর। বান্দা কোনো কর্মের জন্য বিচারের সম্মুখীন হবে না।
কাদরিয়া : কাদরিয়া বলা হয়, যারা মূলত কদরকে অস্বীকার করে। অর্থাৎ তারা মনে করে মানুষের কাজকর্মে আল্লাহর কোনো হস্তক্ষেপ নেই। মানুষ নিজেই তার কাজের স্রষ্টা। এরা জাবরিয়া সম্প্রদায়ের বিপরীত গোষ্ঠী।
খারেজি : খারেজি ইসলামি ইতিহাসে ভ্রান্ত একটি গোষ্ঠীর নাম। খারেজিদের মূল ভ্রান্তি হলো, তারা কবিরা গুনাহকারীকে কাফের মনে করে। হজরত আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুর জমানায় এই দলের উৎপত্তি হয়েছে।
রাফেজি : রাফেজি শিয়াদেরই আরেক নাম। যারা হজরত আবু বকর ও উমর রা.-এর খেলাফতকে অস্বীকার করে এবং আম্মাজান আয়েশা রা.-সহ অধিকাংশ সাহাবিদের গালমন্দ করে ও কাফের বলে। তারা মনে করে, আলি রা. ও তার বংশধররাই ছিলেন খেলাফতের একমাত্র হকদার ও উপযুক্ত। শায়খাইন তথা আবু বকর ও উমর রা.-এর খেলাফতকে অস্বীকার (রাফজ) করার কারণে এদেরকে রাফেজি বলা হয়। কারণ আরবিতে এর শাব্দিক অর্থ অস্বীকারকারী।
কাররামিয়া : কাররামিয়া গোষ্ঠীকে মুসাব্বিহাও বলা হয়। এই দলের মূল ভ্রান্ত বিশ্বাস হলো, তারা আল্লাহর গুণাবলিকে মানুষের গুণাবলির সদৃশ বলে দাবি করে।
জাহমিয়া : ইসলামি ইতিহাসে এরাও একটি ভ্রান্ত ফিরকা। এদের মূল ভ্রান্তি হলো, তারা মুসাব্বিহাদের বিপরীতে গিয়ে আল্লাহর সকল গুণাবলিকে অস্বীকার ও বাতিল করে দেয়।
ইখতিলাফ : গ্রহণযোগ্য দলিলের আলোকে ফুকাহায়ে কেরামের ভেতর শরিয়াতের শাখাগত বিষয় নিয়ে স্বীকৃত যে মতভিন্নতা তৈরি হয়, তাকেই ইখতিলাফ বলা হয়।
ইফতিরাক : যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য দলিল ব্যতিরেকে নিছক খায়েশাত, শত্রুতা কিংবা অন্য কোনো মন্দ প্রবণতায় যে বিরোধ তৈরি হয়, সেটাই হলো ইফতিরাক তথা মুসলিমদের ভেতর ফাটল সৃষ্টি।
আম : আম শব্দের শাব্দিক অর্থ ব্যাপক। পারিভাষিকভাবে আম বলা হয়, যে শব্দটি কোনো প্রকার সংখ্যা, ধরন ও অবস্থার সীমাবদ্ধতা ছাড়াই অনেক সংখ্যক সদস্যকে শামিল করে নেয়।
খাস : খাস শব্দের শাব্দিক অর্থ নির্দিষ্ট। পারিভাষিকভাবে খাস বলা হয়, যে শব্দটি এককভাবে নির্দিষ্ট ধরন, নির্দিষ্ট অবস্থা ও নির্দিষ্ট সংখ্যক সদস্যকে বুঝিয়ে থাকে।
মুতলাক : মুতলাক শব্দের শাব্দিক অর্থ মুক্ত, শর্তহীন। পারিভাষিকভাবে মুতলাক হলো, যা কোনো প্রকার শর্ত ছাড়াই সাধারণভাবে কোনো কিছুকে বোঝায়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00