📄 কুরআন থেকে দলিল
১. মহান আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَالسّٰبِقُوْنَ الْاَوَّلُوْنَ مِنَ الْمُهٰجِرِيْنَ وَالْاَنْصَارِ وَالَّذِيْنَ اتَّبَعُوْهُمْ بِإِحْسَانٍ رَّضِيَ اللهُ عَنْهُمْ وَرَضُوْا عَنْهُ وَاَعَدَّ لَهُمْ جَنّٰتٍ تَجْرِيْ تَحْتَهَا الْاَنْهٰرُ خٰلِدِيْنَ فِيْهَا اَبَدًا ﺫٰلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيْمُ.
'মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথমে ঈমান এনেছে এবং যারা নিষ্ঠার সাথে তাদের অনুসরণ করেছে, আল্লাহ তাদের সকলের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। আল্লাহ তাদের জন্য এমন উদ্যানরাজি তৈরি করে রেখেছেন, যার তলদেশে নহর বহমান। তাতে তারা সর্বদা থাকবে। এটাই মহাসাফল্য।’৮৬
এই আয়াতে সুস্পষ্টভাবে তাদের প্রশংসা করা হয়েছে, যারা প্রথম সারির মুহাজির ও আনসার সাহাবিদের অনুসরণ করে। আর তারাই হচ্ছে সালাফে সালেহিনের ইমাম। এই প্রশংসা প্রমাণ করে, তাদের বুঝ সঠিক এবং পরবর্তীদের জন্য সে বুঝ অনুসরণ করা প্রশংসনীয় বিষয়। বিপরীত দিক থেকে উক্ত প্রশংসা এটাও প্রমাণ করে যে, দীনের ফাহমের ক্ষেত্রে যাদের বুঝ তাদের বুঝের সাথে সাংঘর্ষিক হবে তা বাতিল এবং তার অনুসরণ করা নিন্দনীয়।
২. অন্যত্র আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
فَإِنْ آمَنُوا بِمِثْلِ مَا آمَنْتُمْ بِهِ فَقَدِ اهْتَدَوْا وَإِنْ تَوَلَّوْا فَإِنَّمَا هُمْ فِي شِقَاقٍ فَسَيَكْفِيكَهُمُ اللَّهُ ۚ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ.
'অতঃপর তারাও যদি সে রকম ঈমান আনে, যেমন তোমরা ঈমান এনেছ, তবে তারা সঠিক পথ পেয়ে যাবে। আর তারা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে তারা মূলত শত্রুতায় লিপ্ত হয়ে পড়েছে। সুতরাং শীঘ্রই আল্লাহ তোমাদের সাহায্যার্থে তাদের দেখে নেবেন এবং তিনি সকল কথা শোনেন ও সবকিছু জানেন। '৮৭
এই আয়াতে হেদায়াতকে সাহাবিদের ঈমানের সাথে শর্তযুক্ত করে দেওয়া হয়েছে এবং উম্মতের জন্য তাদের ঈমানকে মানদণ্ড হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, বিশুদ্ধ ঈমান আল্লাহপ্রদত্ত ওহীর সঠিক ইলম ও বুঝেরই ফসল। সালাফদের পরে যারা আসবে, তারা যেমন ঈমানের জায়গায় তাদের সমপর্যায়ে পৌঁছতে পারবে না, ঠিক তেমনিভাবে পরবর্তীরা শরয়ি নুসুসকে বোঝার ক্ষেত্রেও তাদেরকে ছাপিয়ে যেতে পারবে না। কেউ যদি এমন দাবি করে, তবে হয়তো সে ভুল বলছে নতুবা ভ্রান্ত হয়ে মিথ্যা বলছে।
৩. আল্লাহ আরও বলেন,
وَ مَنْ يُشَاقِقِ الرَّسُوْلَ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَى وَ يَتَّبِعُ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِّهِ مَا تَوَلَّى وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا.
'আর যে ব্যক্তি তার সামনে হিদায়াত স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পরও রাসুলের বিরুদ্ধাচরণ করবে ও মুমিনদের পথ ছাড়া অন্য কোনো পথ অনুসরণ করবে, আমি তাকে সেই পথেই ছেড়ে দেব, যা সে অবলম্বন করেছে। এরপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব, আর তা অতি মন্দ ঠিকানা।'৮৮
এই আয়াতে মুমিনদের পথের মর্মের ভেতর সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ি ও তাবে-তাবেয়ি সকলেই অন্তর্ভুক্ত। আয়াতটিতে একই সাথে মহান আল্লাহ তাআলা সালাফে সালেহিনের দীন পালন ও বোঝার মানহাজকে স্বীকৃতি দিচ্ছেন এবং যারা তাদের পথ ছেড়ে ভিন্ন কোনো পথ অনুসরণ করতে চায়, তাদেরকে সতর্কবার্তা প্রদান করছেন।'৮৯
এই আয়াতের ভিত্তিতে ফুকাহায়ে কেরাম সালাফদের ইজমাকে অকাট্য দলিল এবং ভুল থেকে মুক্ত হিসেবে গণ্য করেছেন। এজন্য সালাফরা যেভাবে নুসুসে শরিয়াহ বুঝেছেন, তার বিরোধিতা করা মূলত ইজমার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া বলে গণ্য হবে। এর মাধ্যমে একজন ব্যক্তি মুমিনদের পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়। এই আয়াতে মহান আল্লাহ তাআলা সালাফদের বিরোধিতা আর রাসুলের বিরোধিতা করাকে সমতুল্য হিসেবে ঘোষণা করেছেন। সুতরাং যারা নুসুসে শরিয়াহ বোঝা ও তার ওপর আমল করার ক্ষেত্রে সালাফদের বিপরীতে অবস্থান নেবে, তারা প্রকৃতপক্ষে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামেরই অবাধ্যতায় লিপ্ত হবে। আর রাসুলের অবাধ্যতার অর্থ হলো আল্লাহ তাআলারও অবাধ্য হওয়া।১৯০
ইসলামি শরিয়াহর সঠিক বিশ্বাস ও আমল নির্ভর করে নুসুসে শরিয়াহ ভালো করে বোঝার ওপর। এজন্য আমাদের বিশ্বাস ও আমলকে সালাফদের অনুগামি বানাতে হলে সর্বপ্রথম নুসুসে শরিয়াহ বোঝার ক্ষেত্রে তাদের দ্বারস্থ হতে হবে। আর যে নুসুসে শরিয়াহর ফাহমের ক্ষেত্রে তাদের বিরোধিতা করবে, সে বিশ্বাস ও আমলের ক্ষেত্রেও তাদের বিরোধী হবে এবং আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে যাবে।১
৪. মহান আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ ٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ وَكُونُوا۟ مَعَ ٱلصَّٰدِقِينَ .
‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকো।’৯২
ইবনুল কায়্যিম রহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, সাহাবায়ে কেরামই হলেন সত্যবাদীদের সরদার। এমনকি তাদের পরে প্রত্যেকের সত্যবাদিতাই সাহাবায়ে কেরামের মাধ্যমে পূর্ণতা লাভ করবে; বরং তার সত্যবাদিতার মূল রহস্যই হলো সাহাবিদের অনুসরণ করা এবং তাদের সাথে থাকা।’৯৩
সুতরাং কেউ যখন নুসুসে শরিয়াহ বোঝার ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরামের বিরুদ্ধে যায়, তখন বুঝতে হবে সে সাহাবিদের সাথে নেই।
৫. আল্লাহ তাআলা অন্যত্র ইরশাদ করেন,
هُوَ ٱلَّذِى بَعَثَ فِى ٱلْأُمِّيِّـۧنَ رَسُولًا مِّنْهُمْ يَتْلُوا۟ عَلَيْهِمْ ءَايَٰتِهِۦ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ ٱلْكِتَٰبَ وَٱلْحِكْمَةَ وَإِن كَانُوا۟ مِن قَبْلُ لَفِى ضَلَٰلٍ مُّبِينٍ .
‘তিনি উম্মিদের মধ্যে তাদেরই একজনকে রাসুল করে পাঠিয়েছেন, যে তাদের সামনে তাঁর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করবে, তাদেরকে পরিশুদ্ধ করবে এবং তাদেরকে কিতাব ও হেকমতের শিক্ষা দেবে, যদিও তারা এর আগে সুস্পষ্ট গোমরাহিতে নিপতিত ছিল।’৯৪
ইবনুল কায়্যিম রহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পথপ্রদর্শক ও শিক্ষক হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। এটি রিসালাত ও নবুওয়াতের মহান উদ্দেশ্যের অন্তর্ভুক্ত। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের প্রজন্মকে ইলম শিখিয়েছেন। আর তাদের পরবর্তীরা সাহাবিদের কাছ থেকে ইলম গ্রহণ করেছেন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে অর্থ, মর্ম ও কায়দা- পদ্ধতিসহ শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি তাদেরকে সুন্নাহও শিখিয়েছেন পরিপূর্ণ ও যথার্থভাবে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে ইলম হাসিলের ক্ষেত্রে তাদের মাঝে কোনো কিছুর ব্যবধান ছিল না। এই বৈশিষ্ট্যের কারণে অন্যরা ইলম ও ফাহমের ক্ষেত্রে তাদের সমতুল্য হবে না। কারণ যিনি সরাসরি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে তার হাতে ইলম অর্জন করেছেন আর যিনি অন্য কারও মাধ্যম হয়ে ইলম লাভ করেছেন, তারা দুজন কখনোই সমান হবে না। শিক্ষা প্রদান ও বর্ণনার ক্ষেত্রে রাসুলের ধারে কাছেও কেউ পৌঁছতে পারবে না। ১৯৫
যেহেতু সাহাবায়ে কেরام রাসুলের কাছ থেকে সরাসরি শিক্ষা লাভ করেছেন, এজন্য নুসুসে শরিয়াহর ফাহমের ক্ষেত্রে তারাই সত্যের সবচেয়ে নিকটবর্তী। আর সাহাবায়ে কেরাম থেকে তাবেয়িরা ইলম অর্জন করেছেন, তাদের থেকে ইলম করেছেন তাবে-তাবেয়িরা। এই দুই প্রজন্ম নিজেদের বুঝকে সাহাবায়ে কেরামের সাথে মিলিয়ে নিতেন। আবার রাসুলের পক্ষ থেকে তাদের ব্যাপারে শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণাও রয়েছে। ফলে নুসুসে শরিয়াহর ফাহমের ক্ষেত্রে তারাও আমাদের থেকে সত্যের বেশি নিকটবর্তী।
টিকাঃ
৮৬. সুরা তাওবা, আয়াত ১০০
৮৭. সুরা বাকারা, আয়াত ১৩৭
৮৮. সুরা নিসা, আয়াত ১১৫
৮৯. মাজমুউল ফাতাওয়া, ৪/২
৯০. প্রাগুক্ত, ১৯/১৯৩-১৯৪
৯১. তাজকিরুল খালাফ বি ওজুবি ইতিমাদি ফাহমিস সালাফ, পৃষ্ঠা ০৮
৯২. সুরা তাওবা আয়াত ১১৯
৯৩. ইলামুল মুয়াক্কিয়িন এর সূত্রে শুবুহাতুন আসরানিয়্যাতুন মাআ আজওয়িবাতিহা গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত, ১৭
৯৪. সুরা জুমুআ, আয়াত ০২
৯৫. ইলামুল মুয়াক্বিয়িন এর সূত্রে শুবুহাতুন আসরানিয়্যাতুন মাআ আজওয়িবাতিহা গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত, পৃষ্ঠা ৩৩
📄 সুন্নাহ থেকে দলিল
১. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
إِنَّهُ مَن يَعِشْ مِنْكُمْ بَعْدِي فَسَيَرَى اخْتِلَافًا كَثِيرًا، فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِيْنَ الْمَهْدِيِّينَ، عَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِدِ، وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الْأُمُوْرِ فَإِنَّ كُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ.
আমার মৃত্যুর পরে তোমরা অনেক মতবিরোধ দেখতে পাবে। ওই সময় তোমাদের জন্য আবশ্যক হলো, আমার সুন্নাহ এবং আমার হেদায়াতপ্রাপ্ত পথপ্রদর্শনকারী খলিফাদের সুন্নাহর ওপর অটল থাকা এবং সেটাকে দাঁত দিয়ে আঁকড়ে ধরা। তোমরা ওই সময় নব্য আবিষ্কৃত বিষয় থেকে বিরত থাকবে। কারণ নব্য আবিষ্কৃত প্রত্যেক বিষয়ই হলো বিদআত। আর প্রত্যেক বিদআতই ভ্রষ্টতা।১৬
এই হাদিসে সুস্পষ্টভাবে কুরআন-সুন্নাহ নিয়ে বিভিন্ন মতের সময় খুলাফায়ে রাশেদিনের পদ্ধতির ওপর অটল থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং এই নির্দেশনা একই রকমভাবে সকল সাহাবায়ে কেরামের ব্যাপারেও প্রযোজ্য হবে। আল্লামা শাতেবি রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুলাফায়ে রাশেদিনের সুন্নাহকে নিজের সুন্নাহর সাথে সম্পৃক্ত করেছেন। এতে বোঝা যায়, খুলাফায়ে রাশেদিনের সুন্নাহর অনুসরণ করা মূলত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহরই অনুসরণ। আর সাহাবীদের আদর্শের বিপরীত তথা (তাদের সুন্নাহর বিরোধী) নব্য আবিষ্কৃত বিষয় রাসুলের সুন্নাহরও বিপরীত। দীনের মাঝে এগুলোর কোনো অস্তিত্ব নেই। কারণ সাহাবায়ে কেরাম যে পথেই চলেছেন, তাতে হয়তো সরাসরি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতের অনুসরণ করেছেন, নতুবা তারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত থেকে সামগ্রিকভাবে যা বুঝেছেন, তার ভিত্তিতে চলেছেন। এখন বিষয়টা তাদের ছাড়া অন্যদের কাছে অস্পষ্ট হতে পারে। কিন্তু এটার অর্থ কখনোই এমন নয় যে, তারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহর ওপর কোনো কিছু বৃদ্ধি করেছেন। '৯৭
২. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'সর্বোত্তম যুগ হলো আমার যুগ, এরপর তার পরবর্তীদের যুগ, এরপর তার পরবর্তীদের যুগ।
এই হাদিস ১৫ জন সাহাবি বর্ণনা করেছেন। বিশেষজ্ঞ উলামায়ে কেরাম এই হাদিসকে মুতাওয়াতির হাদিসের পর্যায়ভুক্ত করেছেন। এই হাদিস প্রমাণ করে যে, উক্ত তিন যুগের সালাফে সালেহিন হলেন এই উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ অংশ। ইবনুল কায়্যিম রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'এই হাদিসের দাবি হলো, কল্যাণের (দীনের) সকল ক্ষেত্রে তাদেরকে প্রাধান্য দেওয়া। যদি তারা নির্দিষ্ট কোনো ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ হতেন, তবে তাদেরকে সাধারণভাবে শ্রেষ্ঠ যুগের মানুষ বলা হতো না। '৯৯
সুতরাং সালাফে সালেহিন সঠিক ইলম, দীনের বিশুদ্ধ বুঝ, গভীর পাণ্ডিত্য ও এসবরে উত্তম বাস্তবায়ন সব ক্ষেত্রেই এই উম্মতের শ্রেষ্ঠ অংশ ছিলেন। সুতরাং এমন কোনো মাসআলা নেই, যার সঠিকতা ও সত্যতা তারা খুঁজে পাননি। এমনও হয়নি যে, কোনো বিষয়ে তারা সকলেই কিংবা অধিকাংশ ভুল করেছেন! আবার এমনও হয়নি, কেউ কোনো মাসআলায় ভুল করেছেন আর সালাফগণ তাকে সতর্ক না করে চুপ করে থেকেছেন!
সুতরাং এটা হতে পারে না যে, আমাদের বর্তমান সময়ে এসে কথিত কোনো স্কলার সালাফদের কোনো ভুল চিহ্নিত করবে! এটাও সম্ভব নয় যে, কোনো মাসআলায় সালাফগণ সঠিকটা খুঁজে পাননি; কিন্তু এই যুগের কেউ এসে সঠিকটা উম্মাহর সামনে পেশ করছেন! একমাত্র নির্বোধ কিংবা অজ্ঞ ব্যক্তিরাই এমনটা ভাবতে পারে। কেউ যদি কোনো মাসআলায় সালাফদের ব্যাপারে অশুদ্ধতার দাবি করে, তবে সে যেন উম্মাহর এই শ্রেষ্ঠ অংশের ওপর অপবাদ আরোপ করল।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'পরবর্তীদের অনুসরণ করার থেকে সালাফে সালেহিনের অনুসরণ করাই সর্বোত্তম। কারণ তাদের ইজমা বা ঐকমত্য ত্রুটি থেকে মুক্ত। এমনকি যখন কোনো মাসআলায় তাদের ভেতর মতবিরোধ হয়, তখনো হক তাদের ভেতরই সীমাবদ্ধ থাকে।'১০০
সুতরাং সালাফে সালেহিনের ফাহম ও মানহাজের ওপর অন্য কারও মানহাজকে প্রাধান্য দেওয়া মূলত সেই সমস্ত নসকে প্রত্যাখ্যান করার নামান্তর, যেগুলো তাদের শ্রেষ্ঠত্বের ব্যাপারে বর্ণিত হয়েছে। কারণ তারা যদি'এই দীন বোঝার ক্ষেত্রে বিশুদ্ধ মানহাজের অনুসারী না হয়ে থাকেন, তাহলে তারা কীভাবে অন্যদের ওপর শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী হবেন। কেউ কেউ বলে থাকেন, সালাফদের এই শ্রেষ্ঠত্ব আমলের ক্ষেত্রে। দীনের বুঝের ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে কেউ কেউ তাদেরকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে! সাহাবি, তাবেয়ি ও তাবে তাবেয়িদের সাধারণ শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করে যে হাদিস বর্ণিত হয়েছে, এই দাবি তার সাথে পরিপূর্ণ সাংঘর্ষিক।
৩. আবু ওয়াকেদ আল লাইসি রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন বলেন, 'নিশ্চয় ভবিষ্যতে অনেক ফিতনা আসবে। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! তখন আমাদের কী হবে, আর আমরা কী-ই বা করব? তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা তোমাদের পূর্বের প্রথম সারির লোকদের পথে ফিরে যাবে।১০১ অর্থাৎ নিরাপত্তা পেতে হলে তাদেরকে সালাফদের পথে ফিরে যেতে হবে। এখানে সালাফদের পথে ফিরে যাওয়া দীনের বুঝ ও সেই অনুযায়ী আমল সবকিছুকেই শামিল করে।
এই হাদিসে সর্বপ্রথম সাহাবায়ে কেরامকে সম্বোধন করা হয়েছে। রাসুলের মৃত্যুর পর সাহাবিদের জীবদ্দশাতেই মতবিরোধ সৃষ্টি হওয়ার ইঙ্গিতও আছে এই হাদিসে। সে সময় সাহাবায়ে কেরام যেন তাদের প্রথম জমানার অবস্থার দিকে ফিরে যান, উল্লিখিত হাদিস থেকে এটা ছিল সাহাবায়ে কেরামের শিক্ষা। পুরো উম্মতের জন্য হাদিসটির নির্দেশনা হলো, সালাফরা যে পথে ছিলেন এবং যেভাবে কুরআনকে বুঝেছেন, সেটাই হলো উম্মতের জন্য নিরাপদ পন্থা। উম্মতকে সে পথের আলোকেই নিজেদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে হবে। যদি তারা এ পথের বাইরে সালাফদের ফাহম ও মানহাজ-বিরোধী কোনো মত ও পথের আবিষ্কার করে, তবে নিশ্চিত তারা বিভ্রান্ত হবে। নিজেরাও দীনের ব্যাপারে ফিতনায় পতিত হবে এবং উম্মতকেও ফিতনায় নিমজ্জিত করবে। ১০২
টিকাঃ
৯৬. সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৪৬০৭; জামে তিরমিজি, হাদিস নং ২৬৭৬, শায়খ আলবানি সহিহ বলেছেন, সিলসিলাতুল আহাদিসিস সহিহাহ, হাদিস নং ২৭৩৫
৯৭. আল ইতিসাম, ১/৮৮, ১/১৮৭
৯৮. সহিহ বুখারি, হাদিস নং ২৬৫১; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২৫৩৫
৯৯. ইলামুল মুওয়াক্কিয়িন, ৪/১৩৬
১০০. মাজমুউল ফাতাওয়া, ১৩/২৪
১০১. আল মুজামুল কাবির লিত তাবারানি, হাদিস নং ৩৩০৭; মাজমাউয যাওয়াইদ, হাদিস নং ১২৩৩৭। শায়খ আলবানি হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন, সিলসিলাতুল আহাদিসিস সহিহাহ, হাদিস নং ৩১৬৫.
১০২, ইবনুল কায়্যিম রহিমাহুল্লাহ তার ইলামুল মুয়াক্কিয়িন গ্রন্থে সালাফে সালেহিনের ফাহম ও মানহাজকে আঁকড়ে ধরার প্রয়োজনীয়তা ও কারণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। ৪/১১৮-১৫৬
📄 সাহাবায়ে কেরাম ও ইমামদের বক্তব্য
নুসুসে শরিয়াহ বোঝার ক্ষেত্রে সালাফদের ওপর নির্ভরশীলতার ব্যাপারে সাহাবায়ে কেরাম থেকে নিয়ে প্রত্যেক জমানার ইমামদের বক্তব্য রয়েছে। এ ব্যাপারে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের কোনো ইমাম দ্বিমত পোষণ করেননি। তারা সকলেই একমত পোষণ করেছেন যে, নুসুসে শরিয়াহ বোঝার ক্ষেত্রে আমাদেরকে সালাফদের ফাহম ও মানহাজের আলোকেই অগ্রসর হতে হবে। সালাফদের এই ফাহম ও মানহাজের ওপর নির্ভর করে যুগে যুগে ইসলামি শরিয়াহর যে ফিকহি ভাণ্ডার গড়ে উঠেছে, সেখানকার কোনো স্বীকৃত ও সমাধানকৃত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যাওয়া কোনো অজুহাতেই পরবর্তীদের জন্য বৈধ নয়।
সালাফদের কওলের খাজানা থেকে আমরা কিছু বক্তব্য এখানে প্রমাণস্বরূপ তুলে ধরছি-
১. হুযাইফা ইবনে ইয়ামান রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'হে কারি সমাজ! তোমরা পূর্ববর্তীদের পথকে আঁকড়ে ধরো। যদি তোমরা তাদের পথে অবিচল থাকো, তাহলে তোমরা অনেক দূরে এগিয়ে যাবে। আর যদি তাদেরকে পরিত্যাগ করে ডানে-বামে চলো, তাহলে তোমরা সঠিক পথ থেকে অনেক দূরে ছিটকে পড়বে।১০০
যারা কল্যাণ ও সত্যের সর্বদিকে অগ্রগামী, সঠিক বিষয় কখনো তাদের পথের বাইরে থাকতে পারে না। এটা অসম্ভব।১০৪ এজন্যই মুসাইয়াব ইবনে রাফে রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'যখন এমন কোনো বিষয় সামনে আসত, যে ব্যাপারে রাসুলের কোনো নির্দেশনা নেই, তখন সাহাবায়ে কেরাম একত্রিত হতেন এবং কোনো সিদ্ধান্তের ব্যাপারে একমত হতেন। সুতরাং তারা যে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন, হক তার ভেতরেই আছে। তারা যে মত পেশ করেছেন, হক তার মাঝেই বিদ্যমান।১১০৫
২. হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'তোমরা ইলম উঠিয়ে নেওয়ার আগে ইলম শিখে রাখো... এবং তোমরা প্রাচীন বিষয়কে আঁকড়ে ধরো।১০০ প্রাচীন বিষয় দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, সালাফে সালেহিনের পথ ও আদর্শ। সুতরাং এর ভেতর নুসুসে শরিয়াহ বোঝার ক্ষেত্রে তাদের ফাহম ও তাদের পদ্ধতি অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত।
৩. উসমান বিন হাজের রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'আমি ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমাকে বললাম, আমাকে নসিহত করুন। তখন তিনি বললেন, “তুমি সঠিক পথে অবিচল থাকো এবং প্রথম বিষয়ের অনুসরণ করো। কখনোই নতুন বিষয় আবিষ্কার করো না।”১০৭
প্রথম বিষয় দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, সালাফে সালেহিনের ফাহম ও মানহাজ। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু সালাফে সালেহিনের বুঝ ও পদ্ধতির ওপর অটল থাকতে বলেছেন। কারণ তা সঠিক ও নিরাপদ। আর সালাফদের ফাহম ও মানহাজের বিরুদ্ধে নতুন কোনো ফাহম ও মানহাজ আবিষ্কার করতে নিষেধ করেছেন। কারণ এতে ভ্রান্তি সুনিশ্চিত।
৪. ইমাম আওযায়ি রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'তুমি সুন্নাতের ওপর (অটল থাকতে) ধৈর্যধারণ করো। লোকেরা (সালাফরা) যেখানে থেমেছে, তোমরা সেখানে থেমে যাও। আর তারা যা বলেছে তাই বলো এবং যার থেকে তারা বিরত থেকেছে, তুমিও তার থেকে বিরত থাকো। সর্বোপরি সালাফে সালেহিনের পথেই চলে৷ এই পথই তোমাকে প্রশস্ততার দিকে নিয়ে যাবে, যেভাবে তাদেরকে নিয়ে গেছে।”১০৮ তিনি আরও বলেন, 'তুমি সালাফদের পদাঙ্ক অনুসরণ করো, যদিও মানুষ তোমাকে প্রত্যাখ্যান করে।'১০৯
৫. ইমাম মালেক রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'কোনো ব্যক্তির মতের মাধ্যমে সুন্নাহর বিরোধিতা করা যাবে না এবং কারও কিয়াস দিয়ে সুন্নাহকে প্রত্যাখ্যানও করা যাবে না। সালাফরা যে বিষয়ে ব্যাখ্যা করেছেন, আমরা সে বিষয়েই ব্যাখ্যা করব; যার ওপর তারা আমল করেছেন, তার ওপর আমল করব এবং যা তারা ছেড়ে দিয়েছেন, আমরাও তা ছেড়ে দেব। আমাদের জন্য আদর্শ হলো, তারা যা থেকে বিরত থেকেছেন আমরা তা থেকে বিরত থাকব, তারা যা বলে গেছেন তার আনুগত্য করব, নব্য পরিস্থিতিতে তারা যা গবেষণা করে বের করেছেন ও সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, তার অনুসরণ করব। তারা যে বিষয়ে মতবিরোধ করেছেন, সে বিষয়ে তাদের জামাত থেকে বের হব না। অর্থাৎ নতুন কোনো মত আবিষ্কার করব না।'১১০
ইমাম মালেক রহিমাহুল্লাহর আরেকটি বিখ্যাত ও প্রসিদ্ধ মন্তব্য আছে। সেই মন্তব্যটি যুগের পর যুগ আহলে ইলমের জন্য একটি মূলনীতি ও মানহাজ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। তিনি বলেছেন, 'এই উম্মতের প্রথম জামাতকে যে পদ্ধতি সংশোধন করেছে, সে পদ্ধতি ছাড়া এর শেষ অংশও সংশোধন হবে না।'১১১ অর্থাৎ পরবর্তীদের জন্য মুক্তি, উন্নতি ও সংশোধন সালাফদের ফাহম ও মানহাজেই বিদ্যমান। সালাফদের ফাহম ও মানহাজকে অবজ্ঞা কিংবা উপেক্ষা করে যে সংস্কার ও সংশোধনের দাবি বর্তমান কিছু চিন্তাবিদ উত্থাপন করেন, সেটা কখনো উম্মতের সংস্কার ও সংশোধন করবে না; বরং এই উম্মতকে বিকৃত ও বিভ্রান্ত করবে। তাদেরকে দীনে ইসলামের অনুসরণ থেকে বের করে প্রবৃত্তি ও অমুসলিমদের পথের অনুসারী বানাবে।
৬. ইমাম যাহাবি রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'হে আল্লাহর বান্দা! যদি তুমি ইনসাফ করতে চাও, তাহলে কুরআন-সুন্নাহর নুসুসের ব্যাপারে জানো। তারপর দেখো সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ি ও আইম্মায়ে তাফসির এই আয়াতের ব্যাপারে কী বলেছেন এবং তারা সালাফদের কী কী মাজহাব বর্ণনা করেছেন। তারপর হয়তো তুমি ইলম সহকারে কথা বলো, নতুবা ইলম সহকারে চুপ থাকো।'১১২
৭. ইয়াহইয়া বিন ইয়ামার রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'বসরায় তাকদিরের ব্যাপারে সর্বপ্রথম ভ্রান্তিপূর্ণ কথা বলে মাবাদ আল জুহানি। তখন আমি এবং হুমাইদ বিন আবদুর রহমান আল হিময়ারি হজ বা উমরা করতে গেলাম। আমরা বললাম, যদি আমরা আল্লাহর রাসুলের কোনো সাহাবির দেখা পাই, তাহলে তাকে তাকদিরের ব্যাপারে এরা যা বলছে, সে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করব...।'১১৩
এই আসার থেকে বোঝা যায়, তাবেয়িরা সাহাবায়ে কেরামের বুঝকে শুদ্ধতা ও বিশুদ্ধতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে মানদণ্ড মানতেন। যার জন্য তারা মাবাদের বক্তব্যকে সাহাবির কাছে তুলে ধরার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। যদি সাহাবি মাবাদের কথাকে সমর্থন দিতেন, তাহলে তারা মাবাদের বক্তব্য মেনে নিতেন। আর যদি রাসুলের সাহাবি তার বক্তব্যকে প্রত্যাখ্যান করতেন, তাহলে তারাও এই বক্তব্যকে ছুড়ে ফেলতেন।
৮. ইমাম আবুল হাসান আশআরি রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'যে কথা আমরা বলি যে দীনকে আমরা আল্লাহর জন্য ধারণ করি তা হলো, আমাদের রবের কিতাব, আমাদের নবির সুন্নাত এবং সাহাবি, তাবেয়ি ও আইম্মায়ে হাদিস থেকে যা বর্ণিত হয়েছে সেগুলোকে আঁকড়ে ধরা। আমরা এগুলোর ওপরই অনড় থাকি।'১১৪
৯. ইমাম শাতেবি রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'শরয়ি দলিলের প্রতি দৃষ্টি দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রত্যেককেই লক্ষ রাখতে হবে সালাফরা নুসুস থেকে কী বুঝেছেন। তারা যার ওপর আমল করতেন সেটাই সবচেয়ে বিশুদ্ধ এবং ইলম ও আমলের ক্ষেত্রে মজবুত। ১১৫ তিনি আরও বলেন, 'যারাই (নুসুসে শরিয়াহ বোঝার ক্ষেত্রে) সালাফদের বিরোধিতা করে, সে ভুলের ওপর আছে।’১১৬
১০. ইবনে তাইমিয়া রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'নুসুস বোঝার ক্ষেত্রে কোনো প্রকার ভ্রান্তি হতে বাঁচতে হলে লোকদের দুটি বিষয় আত্মস্থ করতে হবে। প্রথমত, কিতাব ও সুন্নাহর মাঝে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শব্দাবলি বোঝা এবং এই শব্দাবলির উদ্দেশ্য জানতে সাহাবায়ে কেরামের বক্তব্যের অনুসরণ করা। কেননা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সাহাবিদের কিতাব-সুন্নাহ দ্বারা সম্বোধন করতেন, তখন এর দ্বারা মূলত কী উদ্দেশ্য, সেটাও তাদের জানিয়ে দিতেন।'১১৭
এ ধরনের অসংখ্য বক্তব্য আছে। এই গ্রন্থে সকল বক্তব্য আমরা একত্রিত করব না। কারণ এটি দীর্ঘ আলোচনার কোনো গ্রন্থ নয়। আমরা চেষ্টা করেছি সংক্ষিপ্তভাবে সামগ্রিক একটি চিত্র পাঠকের সামনে স্পষ্ট করতে, যেন পাঠক ইসলামকে বিকৃত ও পরিবর্তন করার এই দ্বারকে সর্বদার জন্য বন্ধ করে রাখতে পারেন।
টিকাঃ
১০৩. সহিহ বুখারি, কিতাবুল ইতিসাম, হাদিস নং ৭২৮২
১০৪. ইলামুল মুয়াক্কিয়িন, ৪/১৩৯
১০৫. সুনানুদ দারেমি, হাদিস নং ১১৫
১০৬. সুনানুদ দারেমি, হাদিস নং ১৪৫
১০৭. আল ইবানাহ লি ইবনি বাত্তাহ, ১/৩১৯
১০৮. হিলইয়াতুল আওলিয়া, ৬/১৪৩
১০৯. আশ শরিয়াহ লিল আজুররি, ১/২৬২
১১০. ইজতিমাউল জুয়ুশিল ইসলামিয়্যাহ, ১৫৫
১১১. আশ শিফা, কাজি ইয়াজ রহ. ২/৭১
১১২. আল উলু লিল আলিয়্যিল গাফফার (الْعُلُو لِلْعَلَى الغَفَّار), পৃষ্ঠা ১৬
১১৩. ঘটনাটি সহিহ মুসলিমে বিস্তারিত এসেছে। সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ০৮
১১৪. আল ইবানাহ আন উসুলিদ দিয়ানাহ, পৃষ্ঠা ০৮
১১৫. আল মুওয়াফাকাত, ৩/২৮৯
১১৬. প্রাগুক্ত, ৩/২৮১
১১৭. মাজমুউল ফাতাওয়া, ১৭/৩০০-
📄 ইজমা
উপমহাদেশের অন্যতম গ্রহণযোগ্য একজন ইলমি বক্তিত্ব হলেন শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভি রহিমাহুল্লাহ। উপমহাদেশে প্রতিটি দীনি ধারা উনাকে নিজেদের ইলমি সিলসিলার সূত্র মনে করেন। সালাফদের ফাহম ও মানহাজ সম্পর্কে তিনি খুবই সংবেদনশীল ছিলেন। তার প্রতিটি গ্রন্থেই এর প্রমাণ বিদ্যমান। বিশেষত তার বিখ্যাত গ্রন্থ হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ এর ভূমিকা পড়লেই সালাফদের ইলমের প্রতি তার আস্থা ও সংবেদনশীলতার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। ভূমিকার এক জায়গায় তিনি বলেন, 'আমার থেকে প্রকাশিত প্রত্যেক এমন বক্তব্য যা আল্লাহর কিতাবের আয়াত, রাসুলের প্রতিষ্ঠিত সুন্নাহ, খাইরুল কুরুন তথা সালাফে সালেহিনের ইজমা এবং জমহুর মুজতাহিদিন ও অধিকাংশ মুসলিমদের বিরুদ্ধে যায়, আমি তার থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। যদি আমার থেকে এমন কিছু প্রকাশ পায়, তবে নিঃসন্দেহে তা ভুল। যারা আমাদেরকে তন্দ্রা থেকে জাগিয়েছেন, উদাসীনতা থেকে সতর্ক করেছেন, আল্লাহ তাদের ওপর রহম করুন! আমিন।'
যুগে যুগে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল ওয়াল জামাআতের অবস্থান এটাই ছিল। আহলুস সুন্নাহর সকল ইমাম কুরআন ও সুন্নাহকে সালাফদের ফাহম অনুযায়ী ধারণ করতেন। উম্মতকেও সালাফে সালেহিনের পথে অবিচল থাকতে উদ্বুদ্ধ করতেন। কারণ এই পথই নিরাপদ ও সত্যের অধিক নিকটতম। মুসলিম উম্মাহর দীর্ঘ চৌদ্দশ বছরের ইতিহাস এটাই প্রমাণ করে যে, যারাই সালাফদের ফাহম ও মানহাজ থেকে বেরিয়ে গেছে, তারা উম্মাহর ভেতর দীন বিকৃতি ও ভ্রান্ত ফিরকার আবির্ভাব ঘটিয়েছে। দিনশেষে তারা ইসলামের ইতিহাসে ভ্রান্ত হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে রয়েছে。
টিকাঃ
উদ্ধৃত, পৃষ্ঠা ৫৩; ইবনুল কায়্যিমিল জাওযিয়াহ রহিমাহুল্লাহ তার বিখ্যাত গ্রন্থ ইলামুল মুয়াক্কিয়িন গ্রন্থে ৪/১১৮-১৫৬ পৃষ্ঠা পর্যন্ত এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
১২১. হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ, পষ্ঠা ৩০