📄 শরিয়াতের নুসুস বোঝার ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত বিশুদ্ধতা এবং যেকোনো অস্পষ্টতা স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সমাধা করিয়ে নেওয়া
মহান আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে যা অবতীর্ণ হয়েছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা যথাযথভাবে উম্মতের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। এমন কোনো কল্যাণ নেই, যার সন্ধান তিনি উম্মতকে দিয়ে যাননি এবং এমন কোনো অকল্যাণ নেই, যার ব্যাপারে তিনি উম্মতকে সতর্ক করেননি। হাদিস শরিফে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'পূর্ববর্তী সকল নবিদেরই দায়িত্ব ছিল স্বীয় উম্মতকে তার জানা সকল কল্যাণের ব্যাপারে অবহিত করা এবং সকল অকল্যাণের ব্যাপারে সাবধান করা।'৫০
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দায়িত্ব পূর্ণাঙ্গতার সাথে পালন করেছেন। আবু জর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে এমন অবস্থায় রেখে গেছেন যে, আসমানে একটি পাখির ডানা নাড়ানোর সংবাদ পর্যন্ত তিনি আমাদের জানিয়ে গেছেন।” (এখানে কথাটি রূপক অর্থে বলা হয়েছে। পাখির ডানা নাড়ানোর দ্বারা বোঝানো হয়েছে, তিনি জীবন পরিচালনার জন্য পূর্ণাঙ্গ একটি দীন আমাদের দিয়ে গেছেন, যেখানে কোনো শূন্যতা ও অপূর্ণতা নেই।)
হজরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আমাদের মাঝে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়ালেন। অতঃপর সৃষ্টির সূচনা থেকে জান্নাতিদের জান্নাতে প্রবেশ এবং জাহান্নামিদের জাহান্নামে প্রবেশ পর্যন্ত সবকিছু আমাদের কাছে বর্ণনা করলেন। (এসব বিষয়) যারা সংরক্ষণ করার, তারা সংরক্ষণ করে নিল। আর যারা ভোলার, তারা ভুলে গেল।৫২
এভাবেই সাহাবায়ে কেরাম রাসুলের কাছ থেকে দীন আহরণ করেছেন, নিজেদের বুঝকে বিশুদ্ধ করে নিয়েছেন। যখনই কোনো বিষয়ে অস্পষ্টতা তৈরি হতো, তখনই তারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কিংবা যে জানত তাকে জিজ্ঞেস করে পরিষ্কার করে নিতেন। কুরআন-সুন্নাহ বোঝার প্রতি তাদের মতো আগ্রহী কেউ ছিল না। এই আগ্রহের ফলে আল্লাহর রাসুলের রেখে যাওয়া এমন কোনো ইলম ছিল না, যা তারা আয়ত্ত ও সংরক্ষণ করেননি।
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'সেই সত্তার শপথ যিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই! আল্লাহর কিতাবে যে সুরাই অবতীর্ণ হয়েছে, আমি জানি সেটা কোথায় এবং কোন বিষয়ে অবতীর্ণ হয়েছে। যদি আমি জানতে পারি আল্লাহর কিতাবের ব্যাপারে আমার থেকেও বেশি ইলমসম্পন্ন ব্যক্তি আছেন, যার কাছে উটে চড়ে বহুদূর পথ পাড়ি দিয়ে যেতে হবে, তবে আমি তার কাছেও যাব।৫৩
ইবনু আবি মুলাইকাহ হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা এর ব্যাপারে বলেন, যদি তিনি এমন কিছু শুনতেন যা জানতেন না, তাহলে সে বিষয়টি না জানা পর্যন্ত তিনি পুনরাবৃত্তি করতেই থাকতেন। অর্থাৎ যে জানত তার কাছে জিজ্ঞেস করতেই থাকতেন। '৫৪
ইমাম মালেক স্বীয় মুআত্তায় বর্ণনা করেন যে, 'আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহ আনহুমা আট বছর সময় লাগিয়ে কেবল সুরা বাকারা শিখেছেন। '৫৫
এখানে সুরা বাকারা শেখার দ্বারা উদ্দেশ্য তিলাওয়াত শেখা কিংবা শব্দ মুখস্থ করা নয়; বরং প্রতিটি আয়াতের মর্ম, বুঝ, ফিকহ ইত্যাদি আয়ত্ত করা। এজন্যই ইবনে তাইমিয়া রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'সাহাবায়ে কেরাম কুরআনের শব্দ যেভাবে সংরক্ষণ করেছেন, তার থেকে বেশি গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেছেন কুরআনের বুঝ। এরপর তারা কুরআনের শব্দাবলির মতো কুরআনের স্বচ্ছ বুঝকেও তাবেয়িদের কাছে পূর্ণাঙ্গরূপে পৌঁছে দিয়েছেন। '৫৬
এই অবস্থা কেবল সাহাবিদের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং উম্মাহর শ্রেষ্ঠযুগের তাবেয়ি ও তাবে-তাবেয়িগণের অবস্থাও এমন ছিল। মুজাহিদ রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'আমি পবিত্র কুরআনকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তিন বার ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমার কাছে উপস্থাপন করেছি। প্রতিবারই প্রত্যেকটি আয়াতের শেষে আমি থেমেছি এবং তার কাছে এর মর্ম ও ব্যাখ্যা জিজ্ঞেস করে নিয়েছি।
টিকাঃ
৫০. সহিহ মুসলিম, কিতাবুল ইমারাহ, হাদিস নং ১৮৪৪
৫১. মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ২১৩৬১, শায়খ আরনাউত বর্ণনাটিকে হাসান বলেছেন。
৫২. সহিহ বুখারি, কিতাবু বাদইল খালক, হাদিস নং ৩১৯২; সহিহ মুসলিম, কিতাবুল ফিতান, হাদিস নং ২৮৯২
৫৩. সহিহ বুখারি, ফাজায়িলুল কুরআন, হাদিস নং ৫০০২; সহিহ মুসলিম, ফাজায়িলুস সাহাবাহ, হাদিস নং ২৪৬২
৫৪. সহিহ বুখারি, কিতাবুল ইলম, হাদিস নং ১০৩
৫৫. মুআত্তা মালিক, কিতাবুল কুরআন, হাদিস নং ৪৭৯
৫৬. মাজমুউল ফাতাওয়া, ১৭/৩৫৩
৫৭. তাফসিরে তাবারি, ২/৫২৪
📄 অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত যেকোনো ভ্রান্ত বিশ্বাস ও প্রবণতা থেকে তাদের ফিতরাতের পবিত্রতা
ইসলামি নুসুস বোঝার ক্ষেত্রে ফিতরাত” অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পাপ ও কুফরের পরিবেশে থাকতে থাকতে বর্তমানে অধিকাংশ মুসলিমের ফিতরাত নষ্ট হয়ে গেছে। সাহাবিদের বুঝ অধিকতর বিশুদ্ধ হওয়ার একটি কারণ তাদের ফিতরাতের পবিত্রতা। ফিতরাতকে নষ্ট করতে পারে এমন যেকোনো প্রকার পরিবেশ ও উপাদান থেকে তারা নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতেন। ফলে শরয়ি নুসুসই ছিল তাদের চিন্তাচেতনায় একমাত্র প্রভাব বিস্তারকারী এবং তাদের কর্মের একমাত্র বিচারক।
সালাফে সালেহিনের জমানায় দীনে ইসলাম ছিল বিজয়ী সভ্যতা। মুসলিম সমাজে মৌলিকভাবে আহকামে শরিয়াহ প্রতিষ্ঠিত ও প্রচলিত ছিল। ইসলামের বিজয়ধারা ছিল অব্যাহত। ইসলাম ও মুসলিমদের ওপর ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করার ক্ষমতা বহিরাগত কোনো সভ্যতার ছিল না। ইখলাস ও তাকওয়ার উচ্চ আসনে থাকার পাশাপাশি দীনের বুঝ লাভ ও বিধান উদঘাটনের ক্ষেত্রে তারা ছিলেন মানসিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপ ও প্রভাবমুক্ত। তাদের এই স্বচ্ছ ও শুভ্র অবস্থান পরবর্তীদের জন্য এক বিরল বিষয়। বিশেষত বর্তমান মুসলিমদের ক্ষেত্রে এটি কল্পনাতীত বিষয়। সর্বত্র আজ ইউরোপীয় সভ্যতার জয়ধ্বনি শোনা যাচ্ছে। মুসলিমদের মানসিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রগুলো আজ ভিন্ন সভ্যতার উপনিবেশে পরিণত হয়ে আছে। যা দীনের সঠিক বুঝ লাভের ক্ষেত্রে অন্যতম একটি বাধা।
টিকাঃ
৫৮. মানুষ যে সহজাত যোগ্যতা, শক্তি ও গুণাবলি নিয়ে জন্মগ্রহণ করে, তাকেই ফিতরাত বলা হয়। প্রত্যেক মানুষই আল্লাহকে চেনার, সত্য গ্রহণের এবং সঠিক দীন উপলদ্ধি করার যোগ্যতা ও মানসিকতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। তারপর সে যে পরিবেশে বেড়ে ওঠে এবং আশপাশ থেকে যে শিক্ষাদীক্ষা পায়, সে অনুযায়ীই তার চিন্তাভাবনা গড়ে ওঠে।
📄 ইলম অনুযায়ী আমল করার প্রতি তাদের প্রবল আগ্রহ
ইলমের প্রধান মাকসাদই হলো ইলম অনুযায়ী আমল করা। আর শরয়ি নুসুসের বুঝ ছাড়া আমল করা যায় না। ইলম অনুযায়ী আমল শরিয়াতের বুঝকে আরও শক্তিশালী ও জীবন্ত করে। সাহাবিদের আমলের সাক্ষ্য স্বয়ং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দিয়েছেন। তিনি বলেন, 'আমার পূর্বে আল্লাহ যত নবি পাঠিয়েছেন, তাদের সকলেরই নিজ উম্মতের ভেতর থেকে কিছু ঘনিষ্ঠ সহচর ছিল, যারা সেই নবির সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরত এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ তার নির্দেশ পালন করত। এরপর তাদের এমন কিছু উত্তরসূরির আগমন ঘটত, যারা যা বলত তা করত না। আর যা করত তার ব্যাপারে তারা নির্দেশিত ছিল না।’৫৯
আবু আবদুর রহমান আস সুলামি থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, 'যারা আমাদের কুরআন শিক্ষা দিতেন, যেমন উসমান বিন আফফান, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহুমা প্রমুখরা যখন ১০টি আয়াত শিখতেন, তখন সেই ১০ আয়াতের ব্যাপারে ইলম অর্জন ও সে অনুযায়ী আমল করা ছাড়া সামনে অগ্রসর হতেন না। ফলে তারা বলতেন, “আমরা কুরআনের আয়াত, ইলম ও আমল সবকিছু একসাথে শিখেছি।”৬০
ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আমাদের ভেতর কেউ ১০ আয়াত শেখার পর তার মর্ম জানা এবং সেই অনুযায়ী আমল করা ছাড়া সামনে অগ্রসর হতো না।'৬১
এজন্যই সাহাবিদের আমল আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের নিকট শরয়ি দলিল। নুসুস বোঝার ক্ষেত্রে মতভিন্নতা দেখা দিলে সাহাবিদের আমল মতভিন্নতা দূরকারী হিসেবে স্বীকৃত বিষয়। আবু দাউদ রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'কোনো হাদিসের ব্যাপারে মতানৈক্য দেখা দিলে সাহাবিদের আমলের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে।'২ কারণ, হয়তো তাদের আমল তিনটি বিষয়ের কোনো একটি হবে।
এক. তারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এমনটি শুনেছেন।
দুই. নতুবা যে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শুনেছে, তার থেকে শুনেছেন।
তিন. অথবা তারা নস থেকে এমনটি বুঝেছেন। আর তাদের বুঝই সত্যের সবচেয়ে নিকটবর্তী ও বিশুদ্ধ।
ওপরের কথা থেকে বোঝা যায় যে, কোনো নসের বুঝ ও ব্যাখ্যা হিসেবে সাহাবিদের থেকে আকিদা ইত্যাদি বিষয়ক যেসব বক্তব্য আমাদের কাছে এসেছে, সেগুলো সুন্নাহর মর্যাদা রাখে। এগুলো সাহাবিদের ইজতিহাদি সিদ্ধান্ত নয়। এজন্য মুহাদ্দিসিনে কেরাম সাহাবিদের এই প্রকার আকওয়াল (বক্তব্য) ও আসারের (বর্ণনা) ওপর মারফু হাদিসের হুকুম দিয়ে থাকেন。
ইবনে তাইমিয়া রহিমাহল্লাহ বলেন, 'আমরা জানি সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ি ও তাবে-তাবেয়িরা এই কুরআনকে গভীরভাবে পাঠ করেছেন। কুরআনের তাফসির ও মর্মের ব্যাপারে তারাই সবচেয়ে বেশি অবগত। অনুরূপ আল্লাহ তাআলা তার রাসুলকে যে সত্য দিয়ে প্রেরণ করেছেন, সে সত্যের ব্যাপারেও তারা উম্মতের সবার থেকে বেশি ইলম রাখেন। সুতরাং যে তাদের সাথে সাংঘর্ষিক বক্তব্য দেবে, তাদের তাফসিরের খেলাফ তাফসির প্রদান করবে, নিশ্চিতভাবে সে দলিল ও মাদলুল (যার ওপর বা যে ব্যাপারে দলিল প্রদান করা হয়) উভয় ক্ষেত্রেই ভুল করবে।'৬৪
শরয়ি নুসুসের বিশুদ্ধ ফাহমের ক্ষেত্রে সালাফদের বুঝ হলো মানদণ্ড, বিশেষ করে মাসায়েলের ক্ষেত্রে। শরিয়াতের নুসুসের ক্ষেত্রে বর্তমানের সকলের ফাহমকেই সালাফদের বুঝের সামনে উপস্থাপন করতে হবে। যদি তা সালাফদের ফাহমের সাথে সংগতিপূর্ণ হয়, তাহলে সেই বুঝ গ্রহণযোগ্য। আর যদি সালাফদের ফাহমের বিরোধী হয়, তাহলে সেই বুঝ ভ্রান্ত ও পরিত্যাজ্য। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
فَإِنْ آمَنُوا بِمِثْلِ مَا آمَنْتُمْ بِهِ فَقَدِ اهْتَدَوْا وَإِنْ تَوَلَّوْا فَإِنَّمَا هُمْ فِي شِقَاقٍ فَسَيَكْفِيكَهُمُ اللَّهُ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ.
'অতঃপর তারাও যদি সে রকম ঈমান আনে যেমন তোমরা ঈমান এনেছ, তবে তারা সঠিক পথ পেয়ে যাবে। আর তারা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে তারা মূলত শত্রুতায় লিপ্ত হয়ে পড়েছে। সুতরাং শীঘ্রই আল্লাহ তোমাদের সাহায্যার্থে তাদের দেখে নেবেন এবং তিনি সকল কথা শোনেন ও সবকিছু জানেন।'৬৫
যে ব্যক্তি সালাফদের কোনো প্রজন্মের মাঝে ছিদ্রান্বেষণ করে, ইসলাম বোঝার আদর্শ হওয়ার ক্ষেত্রে তাদের যোগ্যতা ও অবস্থার ব্যাপারে সংশয় সৃষ্টি করে, সে প্রকৃতপক্ষে ইসলামের ব্যাপারেই সন্দেহ সৃষ্টি করছে এবং রাসুলের দীন পৌঁছানোর দায়িত্বে ছিদ্রান্বেষণ করছে। এমনকি সালাফদের শ্রেষ্ঠত্বের ব্যাপারে আল্লাহ ও তার রাসুল যে সার্টিফিকেট প্রদান করেছেন, সে সার্টিফিকেটকে সে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। মোটকথা সে জেনে কিংবা না জেনে ইসলামি শরিয়াহ ফাউন্ডেশনকেই আঘাত করছে। আল্লাহ আমাদেরকে এই জঘন্য কাজ থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
টিকাঃ
৫৯. সহিহ মুসলিম, কিতাবুল ঈমান, হাদিস নং ৫০
৬০. মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহ, হাদিস নং ৯৯৭৮; তাফসিরে তাবারি, ১/৮০
৬১. তাফসিরে তাবারি, ১/৪৪
৬২. সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৭২০
৬৩. তাদরিবুর রাবি, ইমাম সুয়ুতি, ১/১৯০-১৯৩
৬৪. মুকাদ্দিমাতুন ফি উসুলিত তাফসির লি ইবনি তাইমিয়া, পৃষ্ঠা ৯১
৬৫. সুরা বাকারা, আয়াত ১৩৭
📄 সাহাবায়ে কেরাম কর্তৃক ওহির অবতরণ এবং তার প্রেক্ষাপটকে সরাসরি প্রত্যক্ষ করা
এই বিষয়টি শরয়ি নুসুসের ক্ষেত্রে তাদের বুঝকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে এবং এই বিষয়টির ক্ষেত্রে অন্য কোনো জমানার লোক তাদের অংশীদার হওয়াও সম্ভব নয়। আর সাহাবায়ে কেরাম থেকে এই বুঝ অর্জন করেছেন তাদের ছাত্র তাবেয়িরা ও তাবেয়িদের থেকে তাদের ছাত্র তাবে-তাবেয়িরা। এই তিন যুগকে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিমদের স্বর্ণযুগ হিসেবে আখ্যায়িত করে গেছেন।
পূর্বে ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু এর বক্তব্য বর্ণনা করা হয়েছে যে, তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেছেন, 'প্রত্যেক আয়াত কেন এবং কোথায় অবতীর্ণ হয়েছে তিনি তা জানেন।' একইভাবে হজরত আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'তোমরা আমাকে আল্লাহর কিতাবের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করো। আমি আল্লাহর কিতাবের প্রতিটি আয়াত সম্পর্কে জানি— তা কি রাতে অবতীর্ণ হয়েছে না দিনে, সমুদ্র-তীরে অবতীর্ণ হয়েছে না পাহাড়ে।'৬৬
ইবনে তাইমিয়া রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'নুসুসে কুরআনের ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরামের এমন অনন্য ফাহম অর্জিত আছে, যা পরবর্তীদের জন্য অর্জন করা সম্ভব ছিল না। এমনিভাবে রাসুলের সুনান ও আহওয়ালের (অবস্থা) ব্যাপারে তাদের এমন ইলম আছে, যা পরবর্তী অধিকাংশের কাছে জানা সম্ভব ছিল না। কারণ তারা সরাসরি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়াসাল্লাম ও ওহীর অবতরণকে দেখেছেন। সর্বক্ষণ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিজেদের দৃষ্টির সামনে রেখেছেন এবং তাঁর কথা, কাজ, অবস্থাকে কাছ থেকে জেনেছেন। যার ভিত্তিতে সাহাবায়ে কেরام নিজেদের ফাহমের ওপর দলিল প্রতিষ্ঠা করেছেন। আর এই বিষয়গুলো পরবর্তীদের জন্য সরাসরি জানা সম্ভব না। ফলে তারা সাহাবিদের ইজমা অথবা কিয়াসের ভিত্তিতে বিধান গ্রহণ করেছেন।’৬৭
আল্লামা শাতেবি রহিমাহুল্লাহ সাহাবিদের বুঝের ওপর নির্ভরতার গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, দ্বিতীয়ত সাহাবায়ে কেরام ওহি তথা কুরআন-সুন্নাহর অবতরণ এবং তার বাস্তব প্রেক্ষাপট সম্পর্কে অবগত ছিলেন। তারা ওহির পারিপার্শ্বিক অবস্থা বোঝার ক্ষেত্রে সবচেয়ে অভিজ্ঞ এবং শানে নুযুলের ব্যাপারে সবচেয়ে ভালো অবগত। এজন্য তারা এমন কিছু বুঝতে সক্ষম, যা অন্য কারও পক্ষে সম্ভব না। তা ছাড়া উপস্থিত ব্যক্তি যা দেখে, অনুপস্থিত ব্যক্তি তা দেখে না। সুতরাং যখন সাহাবায়ে কেরام থেকে কোনো মুতলাককে (সাধারণ বিধান) তাকয়িদ (শর্তযুক্ত) করার কিংবা কোনো আম্ম বর্ণনাকে খাস করার বিবরণ পাওয়া যাবে, তখন এর ওপর আমল করাই সঠিক। আর এই কথা তখন প্রযোজ্য হবে, যখন এর বিরোধী কোনো বক্তব্য তাদের থেকে না পাওয়া যাবে। যদি কোনো সাহাবি উক্ত বর্ণনার বিরোধিতা করেন, তাহলে সেটি তার ইজতিহাদি বিষয় বলে গণ্য হবে。
সুতরাং উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যটি শরয়ি টেক্সট বোঝার ক্ষেত্রে তাদের ওপর নির্ভরতাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। কারণ এটি এমনই এক বৈশিষ্ট্য, যা সাহাবায়ে কেরام ছাড়া অন্য কারও নেই। নিম্নে দুটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হলো। যার থেকে সাহাবায়ে কেরামের ফাহমের গুরুত্ব পরিষ্কার হয়ে উঠবে।
এক. কুসতানতিনিয়ার যুদ্ধে যখন মুসলিমরা জিহাদে ঝাঁপিয়ে পড়ে শাহাদাত বরণ করছিল, তখন এক লোক বলে উঠল, এই লোকেরা কী করছে! নিজেদের জীবনকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অথচ মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَأَنْفِقُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ وَأَحْسِنُوا ۚ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ.
‘আর আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয় করো এবং নিজ হাতে নিজেদেরকে ধ্বংসের দিকে নিক্ষেপ করো না। এবং সৎকর্ম অবলম্বন করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ ৭১
সাহাবি আবু আইয়ুব আনসারি রাদিয়াল্লাহু আনহু তার এই কথা শুনে বললেন, এই আয়াত আমাদের মাঝে অবতীর্ণ হয়েছে, আমি এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত আছি। আয়াতে নিজের জীবনকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়ার উদ্দেশ্য হলো, জিহাদ ছেড়ে দিয়ে সম্পদ বৃদ্ধিতে মগ্ন হয়ে যাওয়া। ৭২
দুই. এরকম আরও একটি উদাহরণ হলো, হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা কর্তৃক উরওয়া রহিমাহুল্লাহ এর বুঝকে সংশোধন করে দেওয়া। উরওয়া রহিমাহুল্লাহ সুরা বাকারার ১৫৮ নং আয়াত থেকে বুঝেছিলেন যে, সাফা মারওয়া তাওয়াফ না করলে কোনো সমস্যা নেই। হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা তার এই বুঝকে সংশোধন করে দিয়ে বলেন, ‘এই আয়াত সেসব আনসারদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে, যারা সাফা মারওয়া তাওয়াফ করাকে সমস্যা মনে করত। কারণ জাহেলি যুগে তারা তাদের দেবতাকে তাওয়াফ করত। ফলে তারা এই ব্যাপারে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করে। তখন আল্লাহ তাআলা উক্ত আয়াত অবতীর্ণ করেন।’
এ ধরনের আরও অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে, যেগুলোতে সাহাবায়ে কেরামের ফাহমের বিশুদ্ধতা ও গুরুত্ব ফুটে ওঠে।
টিকাঃ
৬৬. তারিখে দিমাশক, ৪২/৩৯৮; তবাকাতু ইবনে সাদ, ২/৩৩৮
৬৭. মাজমুউল ফাতাওয়া, ১৯/২০০
৬৮. আম -এর শাব্দিক অর্থ ব্যাপক। পারিভাষিকভাবে আম বলা হয়, যে শব্দটি কোনো প্রকার সংখ্যা, ধরন ও অবস্থার সীমাবদ্ধতা ছাড়াই অনেক সংখ্যক সদস্যকে শামিল করে নেয়。
৬৯. খাস -এর শাব্দিক অর্থ নির্দিষ্ট। পারিভাষিকভাবে খাস বলা হয়, যে শব্দটি এককভাবে নির্দিষ্ট ধরন, নির্দিষ্ট অবস্থা ও নির্দিষ্ট সংখ্যক সদস্যকে বুঝিয়ে থাকে।
৭০. আল মুওয়াফাকাত, ৪/১২৮
৭১. সুরা বাকারা, আয়াত ১৯৫
৭২. আস সুনানুল কুবরা লিল বাইহাকি, হাদিস নং ১৮৬৫৯