📘 ফাহমুস সালাফ > 📄 ফাহমুস সালাফ দ্বারা উদ্দেশ্য

📄 ফাহমুস সালাফ দ্বারা উদ্দেশ্য


আমরা ইতঃপূর্বে ফাহম ও সালাফ এই দুই শব্দের সংজ্ঞা ও উদ্দেশ্য পৃথকভাবে জেনে এসেছি। এই দুটি শব্দের সংজ্ঞা থেকেই আমাদের সামনে ফাহমুস সালাফ শব্দের উদ্দেশ্য পরিষ্কার হয়ে যায়। ফাহমুস সালাফ দ্বারা আমাদের উদ্দেশ্য হলো রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষার মাধ্যমে সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ি ও তাবে-তাবেয়িরা নুসুসে শরিয়াহ থেকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের উদ্দেশ্য হিসেবে যা বুঝেছেন এবং উন্মোচন করেছেন। এই সংজ্ঞায় কোনে নসের ফাহমের ওপর তাদের ইজমা বা জমহুরের অবস্থান অন্তর্ভুক্ত। পাশাপাশি এককভাবে সেই ফাহমও অন্তর্ভুক্ত, যা প্রচার ও বিস্তার লাভ করা সত্ত্বেও সালাফদের কারও বিরোধিতা কিংবা সে ব্যাপারে তাদের কারও বিরোধী বক্তব্য পাওয়া যায় না। এজন্যই ইবনুল কায়্যিম রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'সাহাবায়ে কেরام, তাবেয়ি ও তাবে-তাবেয়িরা কুরআন ও সুন্নাহ থেকে যা বুঝেছেন, পরবর্তীদের বুঝের দিকে ফেরার চেয়ে তার দিকেই ফেরা উত্তম।
পাশাপাশি সালাফে সালেহিনের মৌলিক এই বুঝকে ভিত্তি করে খালাফরা (পরবর্তীরা) তাওয়ারুস (পরম্পরা) সূত্রে যে ফিকহি তুরাস (ঐতিহ্য) গড়ে তুলেছেন, মানহাজগতভাবে সেটিও আমাদের আলোচনার অন্তর্ভুক্ত।
সুতরাং ফাহমুস সালাফ ও এর প্রামাণিকতার ভেতর আমরা দুটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে পারি।
এক. দীনি বিষয়ে সালাফদের ইলমি ও আমলি মাসায়েল। যেগুলো সালাফরা নুসুসে শরিয়াহ থেকে বুঝেছেন, আমল করেছেন এবং স্বীকৃতি দিয়েছেন।
দুই. সালাফদের ইলম শেখার মানহাজ, দলিল প্রদানের উসলুব (পদ্ধতি) এবং ইজতিহাদি ও ইখতিলাফি বিষয়ে তাদের আচরণবিধি।
প্রথমটা ফাহমুস সালাফের প্রায়োগিক রূপ, আর দ্বিতীয়টা তাদের মানহাজগত রূপ। সাধারণ ফিকহ, তাফসির ও হাদিসের ব্যাখ্যাগ্রন্থগুলোর মাধ্যমে আমরা প্রথম প্রকারের সাথে পরিচিত হতে পারব। উসুলে ফিকহ, উসুলে তাফসির ও উসুলে হাদিসের কিতাবাদির মাধ্যমে আমরা দ্বিতীয় প্রকারের সাথে পরিচিত হতে পারব। এই বইয়ে আমরা ফাহমুস সালাফ দ্বারা এই উভয় প্রকারই উদ্দেশ্য নিয়েছি।

টিকাঃ
৪৪. ইলামুল মুয়াক্কিয়িন, ৪/১১৮

📘 ফাহমুস সালাফ > 📄 সালাফদের বুঝকে লিপিবদ্ধ ও সংরক্ষণ করার ক্ষেত্রে যুগে যুগে আলেমদের যত্নশীলতা

📄 সালাফদের বুঝকে লিপিবদ্ধ ও সংরক্ষণ করার ক্ষেত্রে যুগে যুগে আলেমদের যত্নশীলতা


দীনকে সঠিকভাবে বোঝার ক্ষেত্রে সালাফে সালেহিনের ফাহমের গুরুত্ব অপরিসীম হওয়ার কারণে উলামায়ে কেরাম যুগে যুগে প্রজন্ম পরম্পরায় তাদের ফাহমকে লিপিবদ্ধ ও সংরক্ষণ করেছেন। এর ভিত্তিতেই তারা নিজেদের বুঝকে মেপে দেখেছেন ও প্রসারিত করেছেন। সুন্নাতে রাসুলের মত গুরুত্ব দিয়েই যুগ পরম্পরায় সালাফদের ফাহম সংরক্ষিত হয়ে আসছে। তাবেয়ী সালেহ বিন কায়সান রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'আমি এবং যুহরি ইলম অন্বেষণের জন্য একত্রিত হলাম। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম সুন্নাতসমূহকে লিপিবদ্ধ করব। তারপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে যা কিছু বর্ণিত হয়েছে আমরা সেগুলো লিপিবদ্ধ করলাম। অতঃপর যুহরি বলল, সাহাবিদের বক্তব্যও আমরা লিবদ্ধ করব। কারণ সেগুলোও সুন্নাহর মতো গুরুত্বপূর্ণ। তখন আমি বললাম, না, এগুলো সুন্নাহ নয়। তাই আমি এগুলো লিপিবদ্ধ করব না। বর্ণনাকারী তাবেয়ী বলেন, 'এরপর যুহরি সাহাবিদের বক্তব্য লিপিবদ্ধ করল, কিন্তু আমি করিনি ফলে সে সফল হয়েছে আর আমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি।’৭৯
এজন্য সাহাবিদের কর্মের ওপরও সুন্নাহ শব্দের প্রয়োগ দেখা যায়, চাই সে কর্ম কুরআন-সুন্নাহতে পাওয়া যাক কিংবা না যাক। কারণ হয়তো সেই আমল এমন কোনো হাদিসের ভিত্তিতে তারা পালন করেছেন, যা তাদের কাছে প্রমাণিত, কিন্তু আমাদের কাছে পৌঁছেনি। অথবা ইজতিহাদের ভিত্তিতে কাজটির ওপর তাদের বা তাদের খুলাফাদের ইজমা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
আমরা যদি যুগে যুগে উলামায়ে কেরামের বিভিন্ন রচনার দিকে দৃষ্টিপাত করি, তাহলেই আমরা দেখতে পাব যে, তারা কতটা গুরুত্বের সাথে সালাফে সালেহিনের আমল ও বক্তব্যকে লিপিবদ্ধ করেছেন। যেমন-
১. সমস্ত সিহাহ, সুনান ও মুসনাদ গ্রন্থগুলোতে গ্রন্থকাররা সাহাবি ও তাবেয়িদের অসংখ্য আমল ও বক্তব্যকে লিপিবদ্ধ করেছেন। ইমাম বুখারি, ইমাম তিরমিজিসহ সকল মুহাদ্দিসের গ্রন্থে সালাফে সালেহিনের আমল ও বক্তব্যের ভাণ্ডার আপনি দেখতে পাবেন।
২. মুসান্নাফ ও মুজাম গ্রন্থগুলো তো মুসলিম উম্মাহর এই তুরাসকে খুব যত্নের সাথে লিপিবদ্ধ করেছে। প্রতিটি মুসান্নাফ ও মুজাম কিতাব সালাফে সালেহিনের আমল ও কর্মের সোনালি খাজানা। যেমন আবদুর রাজ্জাক ও ইবনে আবি শাইবার মুসান্নাফ। আবদুর রাজ্জাক রহিমাহুল্লাহ তার মুসান্নাফে ২১ হাজারেরও বেশি হাদিস ও আসার (সাহাবিদের বক্তব্য) সংকলন করেছেন। যার মধ্যে অধিকাংশই হলো সালাফদের বক্তব্য। অনুরূপ ইবনে আবি শাইবাহ তার মুসান্নাফে ১৯ হাজারের মতো হাদিস ও আসার একত্রিত করেছেন। সেগুলোর অধিকাংশই হলো সালাফে সালেহিনের বক্তব্য।
৩. প্রতিটি তাফসিরগ্রন্থ সালাফদের বর্ণনার একেকটি খাজানা। এমন কোনো তাফসিরগ্রন্থ নেই, যেখানে সালাফদের ফাহমকে লিপিবদ্ধ করা হয়নি।
৪. হাদিসের ব্যাখ্যাগ্রন্থগুলোতেও আমরা দেখতে পাব যে, ব্যাখ্যাকাররা হাদিসগুলোর ব্যাখ্যা পেশ করতে গিয়ে প্রধানত সালাফদের ফাহমেরই দ্বারস্থ হয়েছেন। যার দরুন তারা সালাফদের বিভিন্ন বক্তব্য ও আমলকে উল্লেখপূর্বক তার ভিত্তিতে নিজেদের বুঝ প্রসারিত করেছেন।
৫. চার মাজহাবের ফিকহি গ্রন্থগুলোকেও সালাফে সালেহিনের আমল ও বক্তব্যের ভাণ্ডার বলা যায়। তাদের প্র্যাকটিক্যাল আমল ও বক্তব্যের ভিত্তিতেই প্রতিটি মাজহাব গড়ে উঠেছে। যুগ পরম্পরায় তাদের ফাহমের ভিত্তিতেই ইসলামি জ্ঞানশাস্ত্র বিস্তৃত হয়েছে। এর দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয় যে, সালাফদের বুঝের ওপর নির্ভরতা মানে কখনোই ইসলামের গতিশীলতাকে থামিয়ে দেওয়া নয়; বরং এই নির্ভরতার কারণে ইসলামের গতিশীলতা নিরাপদ প্রবাহে প্রবাহিত হয়। পাশাপাশি এতে ইসলামের চিরন্তনতা ও স্থিতিশীলতাও বজায় থাকে।
ওপরে উল্লেখিত প্রতিটি পয়েন্ট থেকে সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায়, প্রত্যেক যুগে উলামায়ে কেরাম সালাফে সালেহিনের ফাহম, ইলম ও ফিকহকে কতটা গুরুত্বের সাথে সংরক্ষণ করেছেন। এবং তারা কেবল সেগুলো বর্ণনাই করেননি; বরং সেগুলোর বিশুদ্ধতাকে সুদৃঢ় করেছেন এবং নিজেরা তার ওপর আমল করেছেন।

টিকাঃ
৭৯. মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক, হাদিস নং ২০৪৮৮
৮০. আলমুওয়াফাকাত, ৪/৪
৮১. সহিহ : যেসব হাদিসগ্রন্থে জয়িফ হাদিস বর্জন করে শুধুমাত্র সহিহ ও সহিহভুক্ত (যেমন, হাসান) হাদিস সংকলন করা হয়, তাকে 'সহিহ' বলা হয়। যেমন, সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম।
৮২. সুনান : হাদিসের যেসব গ্রন্থ ফিকহি অধ্যায় অনুসারে সংকলন করা হয়, তাকে 'সুনান' বলা হয়। এমন হাদিসগ্রন্থের সংখ্যা প্রচুর। যেমন: ১. আস সুনান লিল ইমামি আবি দাউদ (২৭৫ হি.)। ২. আস সুনান লিল ইমামি আন-নাসায়ি (৩০৩ হি.)।
৮৩. মুসনাদ : হাদিসের যেসব গ্রন্থ সাহাবায়ে কেরামের নামের তারতিব অনুযায়ী সাজানো হয়, তাকে 'মুসনাদ' বলা হয়। এই তারতিব কখনও আরবি বর্ণমালার বিন্যাস অনুযায়ী হয়, কখনও সাহাবিদের মর্যাদার তারতম্য অনুসারে হয়। এরূপ গ্রন্থের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। যেমন: ১. আল মুসনাদ লিল ইমামি আহমাদ (২৪১ হি.)। ২. আল মুসনাদ লিল ইমাম আবি ইয়ালা (৩০৭ হি.)।
৮৪. মুসান্নাফ : যেসব হাদিসগ্রন্থে মারফু হাদিসের সাথে সাথে মাওকুফ, মাকতু হাদিসও উল্লেখ করা হয়, এমন হাদিসের গ্রন্থকে 'মুসান্নাফ' বলা হয়। যেমন: ১. আল মুসান্নাফ লিল ইমাম আব্দির রাজ্জাক (২১১ হি.)। ২. আল মুসান্নাফ ফিল আহাদিসি ওয়াল আসার, লিল ইমামি আবি বকর ইবনে আবি শাইবা (২৩৫ হি.)।
৮৫. মুজাম: হাদিসের যেসব গ্রন্থে সাহাবি, শায়খ বা শহরের নামের তারতিব অনুসারে হাদিস সংকলন করা হয়, তাকে 'আল মুজাম' বলা হয়। তবে মুজাম জাতীয় গ্রন্থাবলির বিন্যাস অধিকাংশ ক্ষেত্রে আরবি বর্ণমালা অনুসারেই হয়ে থাকে। যেমন, ইমাম তাবারানি রহিমাহুল্লাহ (৩৬০ হি.) রচিত- ১. আল মুজামুল কাবির। ২. আল মুজামুল আওসাত। ৩. আল মুজামুস সগির।

📘 ফাহমুস সালাফ > 📄 ফাহমুস সালাফ আঁকড়ে ধরার শুভ পরিণাম

📄 ফাহমুস সালাফ আঁকড়ে ধরার শুভ পরিণাম


নুসুসে শরিয়াহ বোঝার ক্ষেত্রে সালাফদের ফাহম আমাদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় ও দুর্গ। এই দুর্গ আমাদের আকিদা, ফিকির, ইলম, আমলকে সব ধরনের আক্রমণ থেকে রক্ষা করে। বিজাতীয় সভ্যতার দাপট, প্রবৃত্তির তাড়না ও বিবেকের স্বেচ্ছাচারিতা থেকে ফাহমুস সালাফ আমাদের চিন্তাকে নিরাপদ রাখবে। সালাফদের ফাহম ও মানহাজের ওপর নির্ভরশীলতা আমাদের ইলমি ও ফিকরি জীবনে বেশ কিছু উপকারিতা নিয়ে আসবে। যথা-
১. আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বাণীর প্রকৃত মর্ম বুঝতে পারা। মানব জীবনে এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের সৃষ্টি করেছেন তার ইবাদত করার জন্য। তারপর ওহি দিয়ে রাসুল পাঠিয়েছেন আমাদেরকে তার দাসত্ব বাস্তবায়নের গাইডলাইন দেওয়ার জন্য। এটা মানব জীবনের প্রধান ও একমাত্র উদ্দেশ্য। এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন পরিপূর্ণ নির্ভর করছে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বাণীর মর্ম বোঝার ওপর। আর বিশুদ্ধভাবে নুসুসে শরিয়াহর মর্ম জানার ও আয়ত্ত করার একমাত্র মাধ্যম হলো সালাফে সালেহিনের ফাহম ও মানহাজ।
২. উল্লেখিত প্রথম উপকারিতা ব্যক্তিগত অবস্থান থেকে প্রাপ্ত। আর দ্বিতীয় উপকারিতা হচ্ছে, দীনের মাঝে তাবদিল (পরিবর্তন), তাহরিফ (বিকৃতি) ও বিদআত আবিষ্কারের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া। কারণ তাবদিল, তাহরিফ ও বিদআতের প্রধানেই আছে নুসুসে শরিয়াহ বোঝার ক্ষেত্রে সালাফদের ফাহম ও মানহাজকে প্রত্যাখ্যান করা। নিজের মনমতো কিংবা বিজয়ী কালচারের সাথে মিলানোর জন্য নুসুসে শরিয়াহর ভ্রান্ত ব্যাখ্যা তৈরি করা। সালাফদের ফাহমের মাধ্যমেই আমরা বর্তমানে দীনের মাঝে তাহরিফ চিহ্নিত করতে পারব। তাদের ফাহম ও মানহাজ উম্মাহর জন্য সঠিক ও বেঠিকের মাপকাঠি। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَإِنْ آمَنُوا بِمِثْلِ مَا آمَنْتُمْ بِهِ فَقَدِ اهْتَدَوْا وَإِنْ تَوَلَّوْا فَإِنَّمَا هُمْ فِي شِقَاقٍ فَسَيَكْفِيْكَهُمُ اللَّهُ وَ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ.
'অতঃপর তারাও যদি সে রকম ঈমান আনে যেমন তোমরা ঈমান এনেছ, তবে তারা সঠিক পথ পেয়ে যাবে। আর তারা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে তারা মূলত শত্রুতায় লিপ্ত হয়ে পড়েছে। সুতরাং শীঘ্রই আল্লাহ তোমাদের সাহায্যার্থে তাদের দেখে নেবেন এবং তিনি সকল কথা শোনেন ও সবকিছু জানেন। '১২২
৩. অবৈধ মতবিরোধ ও বিচ্ছিন্নতা থেকে বেঁচে থাকা যায়। হজরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমাকে বলেন, 'এই উম্মত কীভাবে পরস্পরে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে, অথচ তাদের নবি এক, কিবলা এক?' তখন ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, 'হে আমিরুল মুমিনিন! কুরআন আমাদের সামনে অবতীর্ণ হয়েছে। আমরা এই কুরআন পড়েছি এবং অবগত হয়েছি কোন ক্ষেত্রে তা নাজিল হয়েছে। আমাদের পরে এমন কিছু সম্প্রদায় আসবে, যারা কুরআন তিলাওয়াত করবে, কিন্তু কী ব্যাপারে তা অবতীর্ণ হয়েছে, তা জানবে না। ফলে তারা তাদের নিজস্ব মত তৈরি করবে। আর যখন তাদের নিজস্ব মত তৈরি হবে, তখন তারা পরস্পরে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হবে। এবং লড়াই করবে।'১২৩
এই আসারে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেছেন যে, সাহাবায়ে কেরামের সামনে নুসুসে শরিয়াহ অবতীর্ণ হয়েছে। ফলে নুসুসে শরিয়াহর মর্মের ব্যাপারে তারাই ভালো অবগত। এজন্য নুসুসে শরিয়াহ বোঝার ক্ষেত্রে তাদের বুঝের প্রতি লক্ষ রাখতে হবে। কিন্তু উম্মাহর ভেতর এমন কিছু লোক আসবে, যারা নুসুসে শরিয়াহ অধ্যয়নের ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরামের বুঝের তোয়াক্কা করবে না। সেগুলো জানবে না কিংবা সেগুলো জানলেও বিবেচনায় নেবে না; বরং তারা নিজস্ব প্রবৃত্তি অনুযায়ী নুসুসে শরিয়াহ বোঝার চেষ্টা করবে। তখনই তারা মুসলিমদের ভেতর ভ্রান্তি ও বিভেদ সৃষ্টি করবে।
এক হাদিসে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'বনি ইসরাইল ৭২টি দলে বিভক্ত হয়েছিল। আর আমার উম্মত ৭৩টি দলে বিভক্ত হবে। তারা সকলেই জাহান্নামে যাবে একটা দল ছাড়া। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! সেটি কোন দল? তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যে দল আমার ও আমার সাহাবিদের পথের ওপর থাকবে।'১২৪
এই হাদিস থেকেও আমরা বুঝতে পারি, সালাফদের ফাহম ও মানহাজ পরিত্যাগ আমাদের বিভক্তির দিকে ঠেলে দেবে। হাদিসে বিভক্তির ক্ষেত্রে ইফতিরাক (বিভেদ) শব্দের ব্যবহার করা হয়েছে, ইখতিলাফ (মতভিন্নতা) নয়। কারণ মুসলিমদের ভেতর মতভিন্নতা থাকা স্বাভাবিক। স্বয়ং সাহাবায়ে কেরামের ভেতরও ইখতিলাফ বা মতভিন্নতা ছিল। এজন্য ইখতিলাফ বৈধ, কিন্তু ইফতিরাক তথা বিভেদ বৈধ নয়। সালাফদের ফাহম ও মানহাজ অনুযায়ী চললে আমরা ইফতিরাক ও বিভক্তি থেকে বাঁচতে পারব। তবে আমাদের ভেতর ইখতিলাফ বা মতভিন্নতা থাকবে। যেমন চার মাজহাবের ইমামগণের মধ্যে মতভিন্নতা রয়েছে। ফলে এখানে কেউ এই হাদিস দেখিয়ে ফিকহি স্কুল অফ থটগুলোকে ভ্রান্ত ফিরকার অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে না। কারণ সালাফদের ফাহম ও মানহাজের ভেতর থেকে উম্মাহর ভেতর মতভিন্নতা হলে সেটা স্বীকৃত বিষয়। এ মতভিন্নতার কারণে কোনো ধারা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ থেকে বহির্ভূত হয়ে বাতিল ফিরকায় রূপান্তরিত হবে না। উপরন্তু যে বিরোধ সালাফদের ফাহম ও মানহাজ বহির্ভূত কিংবা বিরোধী হবে, সে বিরোধই বাতিল হিসেবে গণ্য হবে। এখান থেকে আমরা সূক্ষ্ম একটি বিষয় বুঝতে পারি, তা হলো, বর্তমানে আমরা কিছু মানুষকে দেখি, তারা উম্মাহর দীর্ঘ বছরের স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত মতের বিরুদ্ধে গিয়ে, আরও সুস্পষ্ট করে বললে সালাফদের ফাহম ও মানহাজের বিপরীতে গিয়ে নতুন মত প্রকাশ করে এবং এটাকে ইখতিলাফ বা মতভিন্নতা বলে স্বাভাবিককরণের চেষ্টা করে। এটি সম্পূর্ণ ভুল প্রচেষ্টা। এ ধরনের ভিন্নমত বৈধ ইখতিলাফ বা মতভিন্নতা হিসেবে বিবেচিত হবে না। এ ধরনেরভিন্নমতকে আমরা তাহরিফ ও ইফতিরাক হিসেবে বিবেচনা করতে পারি। কারণ এই মতভিন্নতা কুরআন-সুন্নাহর মানদণ্ডের আওতায় থেকে হয়নি। বৈধ ইখতিলাফ হিসেবে সেই মতোই গণ্য হবে যেটা কুরআন-সুন্নাহর মানদণ্ডের আওতায় থেকে সৃষ্টি হবে।
৪. ফাহমুস সালাফ সামনে থাকলে চিন্তার প্রশান্তি ও ভারসাম্য লাভ হবে। কারণ সালাফদের ফাহম ও মানহাজকে কষ্টিপাথর হিসেবে বিবেচনায় রাখলে একজন ফকিহ ও তালেবুল ইলম তাদের চিন্তা ও গবেষণাকে যাচাই করে নিতে পারবে। যখন দেখবে তার চিন্তা ও গবেষণা সালাফদের ফাহম ও মানহাজের সাথে মিলে যাচ্ছে, তখন সে নিশ্চিন্ত থাকবে ও প্রশান্তি অনুভব করবে। কিন্তু পক্ষান্তরে নুসুসে শরিয়াহ বোঝার ক্ষেত্রে কারও চিন্তা ও গবেষণাকে পরখ করার যদি কোনো কষ্টিপাথর না থাকে, তবে নিশ্চিতভাবে তার ভেতর অস্থিরতা কাজ করবে। এটা তার চিন্তা ও গবেষণাকে অস্থির ও ভারসাম্যহীন করে ছাড়বে। তার চিন্তা ও গবেষণা সর্বদাই একটি আপেক্ষিক বিষয় হয়ে থাকবে। গ্রহণীয় হওয়ার মতো নিশ্চয়তা লাভ করবে না।

টিকাঃ
১২২. সুরা বাকারা, আয়াত ১৩৭
১২৩. শুআবুল ঈমান লিল বাযহি
১২৪. জামে তিরমিজি, হাদিস নং ২৬৪১, হাদিসটির সনদ হাসান। ইমাম তিরমিজি রহিমাহুল্লাহ এই হাদিসের সনদ সম্পর্কে বলেন, هذا حديث مفسر حسن غريب لا نعرف مثل هذا إلا من هذا الوجه.

📘 ফাহমুস সালাফ > 📄 সালাফদের ফাহম ও মানহাজ থেকে বিচ্যুতির কারণ

📄 সালাফদের ফাহম ও মানহাজ থেকে বিচ্যুতির কারণ


সালাফদের ফাহম ও মানহাজের ওপর নির্ভরশীলতার ব্যাপারে আধুনিক মুসলিমদের ভেতর উপেক্ষার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, এর পেছনে মৌলিক কিছু কারণ আছে। প্রবৃত্তির তাড়না, দুনিয়া ও অর্থের প্রতি অধিক টান, পদ ও পার্থিব শান্তির প্রতি ব্যাকুলতা, কারও প্রতি বিদ্বেষ ইত্যাদির কারণে ফাহমুস সালাফকে প্রত্যাখ্যান করার প্রবণতা সৃষ্টি হয়। কারণ নুসুসে শরিয়াহকে সালাফদের ফাহমের আলোকে বুঝতে গেলে এই পথগুলোতে বাধা সৃষ্টি হয়। পক্ষান্তরে নিজের মতো করে বুঝতে চাইলে এই বাধাগুলো এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয় নুসুসকে তার মূল অর্থ থেকে সরিয়ে ফেলার কারণে। তবে এর মৌলিক কিছু কারণ আছে, আমরা কেবল সেগুলো এখানে উল্লেখ করতে চাচ্ছি।
১. পাশ্চাত্য মূল্যবোধের কাছে মানসিক পরাজয়। যার দরুন যখন পশ্চিমা বিশ্ব তাদের কিছু মৌলিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে ইসলামের কিছু বিধানের ওপর আপত্তি উত্থাপন করে, তখন তাদের আপত্তি থেকে বাঁচার জন্য কিংবা ইসলামকে তাদের সামনে গুড (ভালো) হিসেবে উপস্থাপন করার জন্য উক্ত বিধানগুলোর নতুন ব্যাখ্যা তৈরির প্রয়োজন দেখা দেয়। আর এই নতুন ব্যাখ্যার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো 'সালাফদের ফাহম ও মানহাজ'। তখন তারা পশ্চিমা মূল্যবোধ ও মানদণ্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ করার পরিবর্তে ইসলামের মুতাওয়ারিস বিধানেই পরিবর্তন ও বিকৃতি সাধনের পথ খোঁজে।
বিশেষত রাষ্ট্রনীতি, হুদুদ, জিহাদ, নারী সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আমরা সালাফদের ফাহম ও মানহাজকে বেশি উপেক্ষিত হতে দেখতে পাই। কারণ এই বিষয়গুলো সুস্পষ্টভাবে পশ্চিমা মূল্যবোধের সাথে সাংঘর্ষিক। ইসলামের নতুন ব্যাখ্যার প্রচেষ্টা জ্ঞানগত জায়গা থেকে তৈরি হয়নি। এই প্রবণতার মূল আকর্ষণই হলো, বর্তমান বিজয়ী সভ্যতার সাথে ইসলামকে খাপ খাওয়ানো। আর আধুনিক অনেক মুসলিম তো নিজেদের এই মনোবাসনার কথা অকপটেই বলে বেড়ায়।
প্রত্যেক যুগেই মুসলিমদের ভেতর এমন কিছু লোক থাকত, যারা যুগের চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে নুসুসে শরিয়াহর নতুন ব্যাখ্যা আবিষ্কার করার জন্য প্রয়াস চালাত। অতীতে যখন মুসলিম বিশ্বে গ্রিক দর্শনের সয়লাব হয়েছিল, তখন একদল লোক শরিয়াহর বিভিন্ন নুসুসকে গ্রিক দর্শন অনুযায়ী ব্যাখ্যা করতে নিয়োজিত ছিল। তখনকার সকল উলামায়ে কেরাম তাদের বিরুদ্ধে ভ্রান্তির অভিযোগ তোলেন এবং মুসলিম উম্মাহকে তাদের ব্যাপারে সতর্ক করেন। ইলমে শরিয়াহ সংরক্ষণের ব্যাপারে মহান আল্লাহ তাআলার ওয়াদা এবং সালাফদের অনুসারী আইম্মায়ে কেরামের মেহনতের ফলে গ্রিক দর্শন দ্বারা প্রভাবিত সেই ধারা ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বে স্বীকৃতি লাভ করতে পারেনি; বরং তারা ভ্রান্ত ফিরকা হিসেবে মুসলিম-সমাজে পরিচিতি লাভ করে।
আজও আমরা দেখতে পাই, ইউরোপীয় সভ্যতা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে একদল লোক নানা অজুহাতে ফিকহি ভাণ্ডারের স্বীকৃত ও মীমাংসিত বিষয়কে প্রত্যাখ্যান করছে, শুধুমাত্র ইউরোপীয় সভ্যতার সাথে সেগুলো সাংঘর্ষিক হওয়ার কারণে। আল্লাহ তাআলার ওয়াদা এখনো বহাল আছে। কালের পরিক্রমায় এ ধরনের লোকগুলোর বিচ্ছিন্ন ও মুতাওয়ারিস ফিকহের বিরোধী মতামত ভ্রান্ত ফিরকার তুরাসে স্থান লাভ করবে। ইসলামের মৌলিক ও মুতাওয়ারিস জ্ঞানতত্ত্বে এসব মতামত কোনো গ্রহণযোগ্যতা লাভ করবে না। যা কিয়ামত পর্যন্ত মহান আল্লাহ তাআলার হুকুমে বহাল থাকবে।
২. ইসলামি শরিয়াহ প্রায়োগিকভাবে প্রতিষ্ঠিত না থাকা। সালাফদের ফাহম ও মানহাজকে উপেক্ষা করার এটাও একটি অন্যতম কারণ। কারণ যখন কেউ লক্ষ করে, সালাফদের থেকে তাওয়ারুস সূত্রে নুসুসে শরিয়াহর যে বুঝ আমরা লাভ করেছি সেটার কোনো বাস্তবিক প্রয়োগক্ষেত্র আমাদের সামনে নেই, তখন তার কাছে সালাফদের ফাহমকে নির্দিষ্ট একটা সময়ের জন্য প্রযোজ্য এবং বর্তমান সময়ের জন্য অকেজো মনে হয়। কিংবা ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠিত না থাকার কারণে সালাফদের ফাহম মানতে গেলে দেখা যায় অনেক বাধা ও সমস্যার শিকার হতে হয়। তাই ঝামেলা এড়ানো অথবা ইসলামকে বর্তমানের সাথে মিলিয়ে উপস্থাপনের জন্য নুসুসে শরিয়াহকে নতুন করে ব্যাখ্যার দিকে ঝুঁকে যায়। আর এই ঝোঁক থেকে বিভিন্ন ফাঁকফোকর দিয়ে সালাফদের ফাহম ও মানহাজকে প্রত্যাখ্যান করার চেষ্টা করা হয়।
৩. ইসলাম সম্পর্কে অমুসলিম প্রাচ্যবিদদের লেখা বইপত্র, প্রবন্ধ ইত্যাদি পড়া।
মুসলিম কিংবা অমুসলিম দেশের সেকুলার মডেলের প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ইসলাম ও ইসলামের নির্দিষ্ট কোনো সাবজেক্টে পড়াশোনা করা।
অথবা অমুসলিম থেকে মুসলিম হওয়া ব্যক্তিদের লেখাপত্রকেই দীন বোঝার একমাত্র উপাদান বানিয়ে নেওয়া।
সাধারণত এই তিন শ্রেণির মানুষের ভেতর সালাফদের ফাহম ও মানহাজ প্রত্যাখ্যান করার মানসিকতাটা একটু বেশি দেখা যায়। এর কারণ হচ্ছে, এই তিনটা ধারাতেই মূলত দীনি ইলম অর্জনের মুতাওয়ারিস ও নিরাপদ পদ্ধতি অবলম্বন করা হয় না। এই ক্ষেত্রগুলোতে ইসলামকে আল্লাহর মনোনীত দীন বা অনুসরণীয় পদ্ধতি হিসেবে পাঠ করা হয় না। ইসলামকে কেবল একটি মতবাদ ও ঐতিহাসিক বাস্তবতা হিসেবে পাঠ করা হয়।
৪. অজ্ঞতা। কারণ হিসেবে অজ্ঞতার ব্যাপারটি এখানে ব্যাপকভাবে বলা হয়েছে। সালাফদের জীবন, তাদের জ্ঞানসাধনা, ঈমান, তাকওয়া ও আমল ইত্যাদি সম্পর্কে কারও অজ্ঞতা থাকতে পারে। যার দরুন সে সালাফদের ব্যাপারে এমন বিশ্বাস স্থাপন করে রাখে, যেটা আসলে বাস্তব না। আবার কারও ইসলামি জ্ঞানশাস্ত্রগুলোর সৌন্দর্য ও যথার্থতার ব্যাপারে অজ্ঞতা থাকতে পারে। যার দরুন সে এসব জ্ঞানশাস্ত্রের উসুল ও ফুরু তথা মূল ও শাখা উভয় জায়গাতেই পরিবর্তন সাধনের দাবির দিকে ঝুঁকে পড়ে।
এগুলো একদম মৌলিক কিছু কারণ। সালাফদের ফাহম ও মানহাজের ব্যাপারে সংশয়গ্রস্ত বা উপেক্ষা প্রদর্শনকারী প্রত্যেকের ভেতর উল্লিখিত সবগুলো কারণের প্রভাব থাকবে এটা জরুরি না; বরং ভিন্ন ভিন্ন একক কারণেও কারও ভেতর এই প্রবণতা সৃষ্টি হতে পারে। আবার কারও মাঝে উল্লিখিত প্রবণতা সৃষ্টি হওয়ার পেছনে ভিন্ন কোনো কারণও থাকতে পারে, যা এখানে উল্লেখ নেই। আল্লাহু আলাম!

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00