📘 ফাহমুস সালাফ > 📄 সালাফ শব্দের শাব্দিক অর্থ

📄 সালাফ শব্দের শাব্দিক অর্থ


শাব্দিক অর্থের সাথে সংশ্লিষ্টতা রেখেই প্রতিটি পরিভাষা তৈরি হয়। সালাফ-এর শাব্দিক অর্থের সাথে পারিভাষিক অর্থের একটি সম্পর্ক আছে। এজন্য আমরা আগে সালাফ-এর শাব্দিক অর্থ জেনে নেব।
সালাফ-এর শাব্দিক অর্থ গত হওয়া।১৩ একই শব্দ যখন ইসমুল ফায়েল তথা কর্তা অর্থে ব্যবহার হয় তখন এর দ্বারা উদ্দেশ্য হয়-বাপদাদা ও আত্মীয়স্বজনদের ভেতর থেকে যারা গত হয়েছেন এবং যারা বয়স ও সম্মানে আমাদের থেকে অগ্রগামী। অর্থাৎ যারা আমাদের থেকে বয়সে ও জমানার দিক থেকে ওপরে, তাদের প্রত্যেকেই শাব্দিকভাবে আমাদের জন্য সালিফ বা সালাফ।১৪
মোটকথা, সালাফ শব্দের যতগুলো ব্যবহার আছে, প্রায় সবগুলোর মাঝেই অতীত ও বিগত সময়, কিংবা পূর্ববর্তী প্রজন্ম-এ জাতীয় অর্থ পাওয়া যায়। পবিত্র কুরআনেও এ অর্থে সালাফ শব্দটি এসেছে। যেমন :
• গত হওয়া
قُلْ لِلَّذِينَ كَفَرُوا إِنْ يَنْتَهُوا يُغْفَرْ لَهُمْ مَّا قَدْ سَلَفَ ، وَإِنْ يَعُودُوا فَقَدْ مَضَتْ سُنَّتُ الْأَوَّلِينَ.
'(হে নবি!) যারা কুফর অবলম্বন করেছে, তাদেরকে বলে দাও, তারা যদি নিবৃত্ত হয়, তবে অতীতে যা-কিছু হয়েছে তা ক্ষমা করে দেওয়া হবে। কিন্তু তারা যদি পুনরায় সে কাজই করে, তবে পূর্ববর্তী লোকদের সাথে যে আচরণ করা হয়েছে, তা তো (তাদের সামনে) রয়েছেই। ১৫
• অতীত সম্প্রদায়
فَجَعَلْتُهُمْ سَلَفًا وَ مَثَلًا لِلْآخِرِينَ.
'আর তাদেরকে আমি এক বিগত জাতি এবং অন্যদের জন্য দৃষ্টান্ত বানিয়ে দিলাম।'১৬
অনুরূপ হাদিস শরিফেও সালাফ শব্দের ব্যবহার এসেছে। যেমন এক হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের মৃত্যু ঘনিয়ে আসার সংবাদ হজরত ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে শোনাতে গিয়ে বলেন,
نِعْمَ السَّلَفُ أَنا لَكِ.
'আমিই তোমার জন্য সর্বোত্তম অগ্রগমনকারী।'১৭

টিকাঃ
১৩. মুজামু মাকায়িসিল লুগাহ লি ইবনি ফারিস, ৩/৯৫
১৪. লিসানুল আরব, ৯/১৫৯
১৫. সুরা আনফাল, আয়াত ৩৮
১৬. সুরা জুখরুফ, আয়াত ৫৬
১৭. সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৬২৮৫

📘 ফাহমুস সালাফ > 📄 পারিভাষিক অর্থ

📄 পারিভাষিক অর্থ


পারিভাষিকভাবে সালাফ শব্দের দুটি প্রয়োগক্ষেত্র আমরা তুলে ধরতে পারি।
এক. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যু-পরবর্তী (শ্রেষ্ঠ তিন প্রজন্মের) নির্দিষ্ট সময়ের ওপর সালাফ শব্দের প্রয়োগ। এটিই সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ও ব্যবহৃত প্রয়োগ। এ ক্ষেত্রে ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয় উত্তম জমানাকেন্দ্রিক রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি হাদিস। তিনি বলেন,
خَيْرُ الْقُرُونِ قَرْنِي ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ
'তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম হলো আমার প্রজন্ম, অতঃপর তাদের পরবর্তী প্রজন্ম, এরপর তাদের পরবর্তী প্রজন্ম।'১৮
এই হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের যুগ ও পরবর্তী দুই যুগকে পর্যায়ক্রমে শ্রেষ্ঠ যুগ বা প্রজন্ম হিসেবে ঘোষণা করেছেন। ফলে জমহুর উলামায়ে কেরাম সাহাবি, তাবেয়ি ও তাবে-তাবেয়ি—এই তিন প্রজন্মকে হাদিসে বর্ণিত শ্রেষ্ঠত্বের অন্তর্ভুক্ত করে থাকেন। তবে কেউ কেউ মনে করেন, খাইরুল কুরুনের সময়টি তাবেয়িদের পর্যন্তই নির্দিষ্ট। আবার কেউ কেউ একটু পিছিয়ে খাইরুল কুরুনকে কেবল সাহাবিদের যুগ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ করেন। অন্যদিকে পাঁচশ হিজরির পূর্ব পর্যন্ত খাইরুল কুরুন সম্প্রসারিত করার ব্যাপারেও কারও কারও মত পাওয়া যায়। এগুলো হলো কিছু আলেমের অভিমত। কিন্তু যুগ যুগ ধরে অধিকাংশ উলামায়ে কেরাম গ্রহণযোগ্য মতানুসারে হাদিসে বর্ণিত বিন্যাস অনুযায়ী সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ি ও তাবে-তাবেয়িদের প্রজন্মকে শ্রেষ্ঠ প্রজন্ম হিসেবে বিবেচনা করে আসছেন।
প্রকৃতপক্ষে খাইরুল কুরুনের সময়ের ব্যাপ্তি জানার জন্য আমাদেরকে হাদিসে বর্ণিত ‘করনুন’ (قرن) শব্দটির ব্যাখ্যা জানতে হবে। করনুন এর শাব্দিক অর্থ হলো, জমানার নির্দিষ্ট সময়। ১৯ আর ইবনুল আসির রহিমাহুল্লাহর মতে করনুন মানে হলো, প্রত্যেক জমানার অধিবাসীরা। ২০
পারিভাষিক অর্থে করনুন শব্দ নিয়ে মৌলিকভাবে দুটি অভিমত রয়েছে।
১. প্রথম অভিমতের পক্ষের ভাষাবিদদের মতে করনুন বলতে একটি নির্দিষ্ট সময়-কালকে বোঝায়। তাদের মধ্যে করনুন-এর সময়ের ব্যাপ্তি নিয়ে ১০ বছর থেকে ১২০ বছর পর্যন্ত বিভিন্ন মতামত রয়েছে। সবচেয়ে প্রসিদ্ধ মত হলো, ১০০ বছরে এক করনুন হয়। এই মতের পক্ষে হাদিসেরও দলিল আছে। সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে বুসর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার মাথায় তার হাত রেখে বললেন, “এই ছেলে এক করনুন সময় বেঁচে থাকবে।” পরে দেখা গেছে তিনি ১০০ বছর জীবিত ছিলেন।'
২. দ্বিতীয় মত তাদের, যারা করনুন এর জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময়-কাল নির্ধারণ করেন না; বরং তারা করনুন বলতে প্রত্যেক জমানার লোকদের গড় আয়ু বা তাদের জীবিত থাকার একটি মধ্যবর্তী বয়সসীমার যে সময়-কাল, সেটিকে বোঝান। ইবনে হাজার আসকালানি রহিমাহুল্লাহ এই অভিমতকেই সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বিষয়টিকে এভাবে ব্যক্ত করেন, 'করনুন কোনো একটি জমানার কাছাকাছি বয়সের মানুষদের বোঝায়। যারা নির্দিষ্ট বিষয়ে পরস্পরে সম্পৃক্ত।' এর ভিত্তিতে তিনি বলেন, 'সুতরাং করনুন এর সময়সীমা প্রত্যেক জমানার বাসিন্দাদের বয়সসীমা অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্নও হতে পারে।'
আবার আল্লামা হারবি রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'করনুন বলা হয় প্রত্যেক যুগের নিঃশেষ হওয়া জাতিকে, যাদের আর কোনো সদস্য অবশিষ্ট বা জীবিত নেই।'
মূলত এই সব অভিমতের ভেতর বড় ধরনের কোনো বিরোধ নেই। যতটুকু বিরোধ আমাদের সামনে দৃশ্যমান, এর মধ্য থেকে আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানি রহিমাহুল্লাহর অভিমতকে প্রাধান্য দিয়ে আমরা একটি ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারি।
আর তা এই জন্য যে, হাদিসে এসেছে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমার উম্মতের স্বাভাবিক বয়স ষাট হতে সত্তর বছরের মাঝে হবে এবং তাদের কম সংখ্যকই এই বয়সসীমা পার করবে। বাস্তবেও বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। ইবনে হাজার আসকালানি রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'ঐতিহাসিকরা একমত যে, সর্বশেষ তাবে-তাবেয়ি মৃত্যুবরণ করেন ২২০ হিজরিতে। এরপর থেকেই বিদআতের প্রকাশ ঘটতে থাকে, মুতাজিলাদের ভয়াবহ জবান চলতে শুরু করে, দার্শনিকরা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে, আহলে ইলমরা খলকে কুরআনের মাসআল নিয়ে পরীক্ষার শিকার হন এবং যুগের অবস্থা অনেক পরিবর্তন হয়ে যায়।
সুতরাং রাসুল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগ হলো সাহাবায়ে কেরামের যুগ, সাহাবিদের যুগ হলো তাবেয়িদের, আর তাবেয়িদের যুগ হলো তাবে-তাবেয়িদের। অর্থাৎ হাদিসে বর্ণিত প্রথম করনুন হলো যারা রাসুল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পেয়েছেন। দ্বিতীয় করনুন হলো যারা সাহাবিদের পেয়েছেন। আর তৃতীয় করনুন হলো যারা তাবেয়িদের পেয়েছেন। যার ফলাফল দাঁড়ায়-সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ি ও তাবে-তাবেয়িরা হলেন হাদিসে বর্ণিত শ্রেষ্ঠ তিন প্রজন্মের মানুষ। এর স্বপক্ষে অনেক হাদিসও পাওয়া যায়।
সাহাবায়ে কেরামের শ্রেষ্ঠত্ব রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সান্নিধ্য পাওয়ার কারণে, তাবেয়িদের শ্রেষ্ঠত্ব সাহাবিদের সান্নিধ্য ও তাদের থেকে ইলমে দীন লাভ করার কারণে, আর তাবে-তাবিয়েদের শ্রেষ্ঠত্ব সাহাবিদের সান্নিধ্য যারা পেয়েছেন তাদেরকে দেখার জন্য।
আবু সাইদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করে বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'লোকেদের ওপর এমন একসময় আসবে, যখন তাদের বিরাট সৈন্যবাহিনী জিহাদের জন্য বের হবে। তখন তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে, তোমাদের মধ্যে এমন কেউ আছেন কি, যিনি আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহচর্য লাভ করেছেন? তাঁরা বলবেন, হ্যাঁ আছেন। তখন তাদেরকে জয়ী করা হবে। অতঃপর মানুষের ওপর পুনরায় এমন একসময় আসবে, যখন তাদের বিরাট বাহিনী যুদ্ধে লিপ্ত থাকবে। তখন তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে, তোমাদের মধ্যে এমন কেউ আছেন কি, যিনি আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহচর্যপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তির সাহচর্য লাভ করেছেন? তারা বলবেন, হ্যাঁ আছেন। তখন তাদেরকে জয়ী করা হবে। অতঃপর লোকদের ওপর এমন একসময় আসবে, যখন তাদের বিরাট বাহিনী জিহাদে অংশগ্রহণ করবে। তখন তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে, তোমাদের মধ্যে এমন কেউ আছেন কি, যিনি আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবিগণের সাহচর্যপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তির সাহচর্য লাভ করেছেন? বলা হবে, হ্যাঁ আছেন। তখন তাদেরকে জয়ী করা হবে।'২৭
ওয়াসিলাহ ইবনুল আসকা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে আরেক বর্ণনায় এসেছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'তোমাদের মাঝে যতক্ষণ পর্যন্ত আমার দর্শন লাভ করা ও সাহচর্যপ্রাপ্ত কেউ থাকবে, ততক্ষণ তোমরা কল্যাণের সাথেই থাকবে। আল্লাহর শপথ! ততক্ষণ তোমরা কল্যাণের সাথেই থাকবে, যতক্ষণ তোমাদের মধ্যে আমার সাহাবির দর্শন ও সাহচর্যপ্রাপ্ত ব্যক্তি থাকবে।'২৮
ইমাম নববি রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'এই হাদিসে রাসুলের মুজিযা, সাহাবি, তাবেয়ি ও তাবে-তাবেয়িদের মর্যাদার কথা বর্ণিত হয়েছে।’২৯
আরেক বর্ণনায় হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হলো, মানুষের মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ? তিনি বললেন, “আমি এবং আমার সাহাবিরা, এরপর যারা আমার সাহাবিদের পরে আসবে, এরপর যারা তাদের পরে আসবে।”'৩০
এই সমস্ত হাদিস থেকে সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায়, সাহাবায়ে কেরام, তাবেয়ি ও তাবে-তাবেয়িরা হলেন এই উম্মাহর শ্রেষ্ঠ প্রজন্ম। পারিভাষিকভাবে এই তিন প্রজন্মকেই সালাফ বলে। ইমাম যাহাবি রহিমাহুল্লাহ ৩০শ হিজরির শেষ পর্যন্ত সালাফদের জমানার সীমা নির্ধারণ করেছেন। ৩০শ তম হিজরিকে তিনি সালাফ ও খালাফের মধ্যবর্তী ফাসেলা (বিভাজক) হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।৩১
সালাফ শব্দের আপেক্ষিক একটি ব্যবহারও আছে। যেমন তাবেয়িরা সাহাবিদের ক্ষেত্রে সালাফ শব্দ ব্যবহার করতেন। অনুরূপ তাবে-তাবেয়িরা তাবেয়িদের ক্ষেত্রে সালাফ শব্দের ব্যবহার করতেন। অর্থাৎ প্রত্যেক পরবর্তীদের জন্য তাদের পূর্ববর্তীরা হলেন সালাফ। শাব্দিক অর্থে আপেক্ষিকভাবে সালাফ শব্দের এমন ব্যবহারও করা যায়। কিন্তু পারিভাষিকভাবে সালাফ বলতে প্রথম তিন জমানাকেই বোঝানো হয়।
আরেকটা ব্যাপার হলো, উল্লিখিত হাদিস থেকে মনে হতে পারে, প্রথম তিন যুগের পর মুসলিমদের ভেতর কোনো কল্যাণ নেই, তারা বিজয় লাভ করবে না, মুসলিম জাতি পরিপূর্ণ অধঃপতিত হয়ে যাবে ইত্যাদি নেতিবাচক বিষয় মাথায় আসতে পারে। মূলত হাদিসের উদ্দেশ্য এমনটা নয়। হাদিসে সালাফদের শ্রেষ্ঠত্ব বোঝাতে গিয়ে এমন উপস্থাপনা করা হয়েছে। পাশাপাশি আমাদেরকে এই দীক্ষা প্রদান করা হয়েছে যে, কল্যাণ ও সফলতা লাভের জন্য পরবর্তীদেরকে সালাফদের পথেই চলতে হবে। এই ব্যাপারটা সালাফ শব্দের দ্বিতীয় প্রয়োগক্ষেত্র থেকে আরও স্পষ্ট হবে ইনশাআল্লাহ।
দুই. সালাফ শব্দের আরেকটি প্রয়োগ হলো আদর্শ বা পদ্ধতিগত। অর্থাৎ ইসলামের যাবতীয় বিষয়ে শ্রেষ্ঠ প্রজন্মের পূর্বসূরিদের থেকে যে মত-পন্থা ও আদর্শ পরম্পরাসূত্রে এসেছে, সেটির ওপরও সালাফ শব্দের প্রয়োগ করা হয়। তবে মনে রাখা দরকার যে, কেবল পূর্ববর্তী জমানায় আগমন করাই অনুসরণীয় সালাফ হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।
এর দুটি কারণ আছে।
প্রথমত, প্রথম তিন প্রজন্মের জমানাতেও ভ্রান্ত চিন্তার লোক ছিল। যেমন উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু এর জমানায় আবদুল্লাহ বিন সাবা ফিতনা ছড়িয়েছিল। আবার হজরত আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু এর জমানাতেই খারেজিদের ফিতনা প্রকাশ পায়। সাহাবিদের জমানার শেষ দিকে ৮০ হিজরিতে মাবাদ জুহানির হাতে 'কাদিরিয়া' ফিতনার সূচনা হয়। অনুরূপ ১০৫ হিজরিতে গাইলান আদ দিমাশকির হাতে 'ইরজা'র ফিতনা, ওয়াসেল বিন আতার মাধ্যমে ১৩১ হিজরিতে 'ইতিজালে'র ফিতনার প্রাদুর্ভাব ঘটে। তবে এরা ছিল সমাজের বিচ্ছিন্ন ও বিরল শ্রেণি। এজন্য প্রথম তিন জমানার হলেই কেউ আমাদের জন্য অনুসরণীয় সালাফ হয়ে যাবে না। তাই অনুসরণীয় সালাফদের কাতার থেকে ভ্রান্ত, বাতিল ও বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিদের বের করার জন্য সালাফদের একটি আদর্শ বা পদ্ধতিগত পরিচয় আমাদের জানা থাকা দরকার।
দ্বিতীয়ত, সালাফদের ফাহম ও মানহাজ আমাদের জন্য নুসুসে শরিয়াহ বোঝার ক্ষেত্রে অনুসরণীয় বিষয়। তবে আমরা সালাফ পর্যন্ত লাফ দিয়েই পৌঁছতে পারব না; বরং তাদের পরবর্তী খালাফদের সিলসিলার মাধ্যমেই সালাফদের পর্যন্ত যেতে হবে। আর এই ক্ষেত্রে খালাফদের থেকে অনুসরণীয় ব্যক্তি বা মতকে পরখ করার জন্য সালাফদের আদর্শ বা পদ্ধতিগত প্রয়োগ জানাটাও আমাদের জন্য জরুরি হয়ে দাঁড়ায়।
ইমাম সাফফারিনি রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'সালাফদের মানহাজ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, সাহাবায়ে কেরাম, তাদের অনুসরণকারী তাবেয়ি ও তাবে-তাবেয়িগণ এবং স্বীকৃত আইম্মায়ে কেরাম যে বিষয়ের ওপর ছিলেন। দীনের ব্যাপারে যাদের মর্যাদা ও ইমামাত স্বীকৃত, যাদের কথা খালাফরা সালাফ হিসেবে গ্রহণ করেছেন, যাদেরকে বিদআতে অভিযুক্ত করা হয়নি, কিংবা খারেজি, রাফেজি, মুতাজিলা, কাদরিয়া ৩৬, মুরজিয়া, জাহমিয়া, জাবরিয়া৩৭ ও কাররামিয়ার মতো বাতিল উপাধিতে যারা প্রসিদ্ধি লাভ করেননি।’৩৯
সুতরাং যারা বিদআত বা উল্লিখিত কোনো বাতিল গোষ্ঠীর সাথে সম্পৃক্ততার ব্যাপারে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে, তারা আমাদের জন্য অনুসরণীয় সালাফ নন। এজন্য উলামায়ে কেরাম এসব বাতিল গোষ্ঠীর সাথে সম্পর্কহীনতা বোঝাতে সালাফ শব্দের সাথে 'সালেহিন' শব্দটি যুক্ত করার কথা বলেছেন। সালাফে সালেহিন তথা উম্মাহর মহান নেককার পূর্বসূরি। কারণ এসব বাতিল গোষ্ঠী যুগ বা সময়ের বিচারে সালাফের সংজ্ঞায় ঢুকে এলেও আদর্শের বিচারে তারা সালাফদের দলভুক্ত হতে পারেনি। সালাফ শব্দের মর্ম কেবল জমানার ভেতরই সীমাবদ্ধ নয়। একটি প্রতিষ্ঠিত মানহাজ এই সালাফ শব্দের গভীরে অবস্থান করে। যার ফলে অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান আক্ষরিক অর্থে সালাফ হওয়ার পরেও তারা সালাফে সালেহিন নয়।
হাদিস শরিফে এসেছে, মুসলিম উম্মাহর ভেতর বিভিন্ন ভ্রান্ত ফিরকার আবির্ভাব হবে। এই ভ্রান্ত ফিরকাগুলোর মধ্য থেকে হকপন্থিদের পৃথক করার জন্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি মানদণ্ড দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, 'আমার ও আমার সাহাবিদের পথে যারা চলবে, তারাই মুক্তিপ্রাপ্ত দল।'৪০
খেলাফতকে অস্বীকার (রাফজ) করার কারণে এদেরকে রাফেজি বলা হয়। কারণ আরবিতে এর শাব্দিক অর্থ অস্বীকারকারী।
এই হাদিস থেকেও আমরা সালাফে সালেহিনের একটি আদর্শগত সংজ্ঞা লাভ করতে পারি। আর এতে কোনো সন্দেহ নেই, তাবেয়ি ও তাবে-তাবেয়িগণ সাহাবিদের কাছাকাছি পর্যায়েই আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বাণীর মর্মের ইলম অর্জন করেছেন। কারণ তারা সাহাবায়ে কেরামের ছাত্র। সাহাবিদের হাতেই তাদের ইলমের ভিত্তি গড়ে উঠেছে। তারা সকলেই সাহাবিদের মতামতের অনুসরণ করা, তাদের বক্তব্য গ্রহণ করা এবং তাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ফতোয়া প্রদানের ব্যাপারে একমত ছিলেন। এ ব্যাপারে তাদের কারও দ্বিমত বা অস্বীকৃতি ছিল না।”
ইমাম শাতেবি রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'তাবেয়িরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সাহাবিদের পুরো জীবনযাপনকে কর্তব্যরূপে গ্রহণ করেছেন। যার ফলে তারা দীনের গভীর বুঝ লাভ করেছেন এবং উলুমে শরিয়ায় পূর্ণতার সর্বোচ্চ স্তরে আরোহণ করেছেন। '৪২
সুতরাং সাহাবায়ে কেরام ও তাদের পথের অনুসারী তাবেয়ি ও তাবে-তাবেয়িরা হলেন কিয়ামত পর্যন্ত আগত সকল মুসলিমদের জন্য সালাফ। আবার এই তিন প্রজন্মের অনুসরণকারী প্রত্যেক পূর্ববর্তী আলেমে দীন তার পরবর্তীদের জন্য সালাফ। আমরা যদি এই মৌলিক বিষয়টি ভালো করে বুঝতে পারি, তাহলে দীনে ইসলামের জ্ঞানতাত্ত্বিক যে সিলসিলা বা ক্রমধারাটা আছে, তা সহজেই আয়ত্ত করতে পারব। সাথে সাথে বুঝতে পারব এই ক্রমধারার গুরুত্ব ও যথার্থতা।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমরা কখনোই আমাদের খালাফদের সিলসিলা ছাড়া সালাফ পর্যন্ত পৌঁছতে পারবো না। খালাফরা সালাফদের সাথে আমাদের আদর্শিক সম্পর্ক স্থাপনের মধ্যস্থতাকারী। সালাফ পর্যন্ত পৌঁছতে তারা আমাদের সিঁড়ি। এজন্য সালাফদের অনুসরণের নামে খালাফদের প্রতি বেপরোয়া হলে, প্রকৃতপক্ষে আমরা সালাফদের আদর্শ ধারণ করতে পারব না। তাদের পরবর্তী খালাফদের সিলসিলাই আমাদের পর্যন্ত সালাফে সালেহিনের আদর্শকে অবিকৃতভাবে নিয়ে এসেছে। তবে এই ক্ষেত্রেও আমাদেরকে মানদণ্ড ঠিক রাখতে হবে। সালাফ-পরবর্তী খালাফদের সিলসিলায় প্রত্যেকেই আমাদের অনুসারী হিসেবে স্বীকৃত, তারাই আমাদের জন্য অনুসরণীয় খালাফ। অনুরূ জন্য অনুসরণীয় নন; বরং এই সিলসিলায় যারা সালাফে সালেহিনের মানহাজের নির্দিষ্ট কোনো খালাফের সকল সিদ্ধান্ত বা মতই আমাদের জন্য সালাফের ফাহম ও রায় বোঝার সিঁড়ি নয়; বরং হতে পারে খালাফের কেউ নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে সালাফদের ফাহম ও মানহাজ থেকে বিচ্যুত হয়েছেন। তখন নির্দিষ্ট ওই বিষয়ে তিনি আমাদের জন্য সালাফ এবং আমাদের মাঝে ফাহম ও আদর্শের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বিবেচিত হবেন না।
উল্লিখিত আলোচনার মাধ্যমে আমরা সালাফ শব্দের জমানাগত ও আদর্শগত মর্ম বুঝতে পেরেছি। এই দুই মর্মের সমন্বয়ে আমরা সালাফে সালেহিনের আদর্শের প্রায়োগিক বা মাজহাবগত একটি মর্ম বের করতে পারি। সালাফে সালেহিন কুরআন, সুন্নাহ এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবিদের থেকে প্রাপ্ত ইলমের মাধ্যমে বিধানসমষ্টির যে কয়টি কাঠামো ও পথ তৈরি করেছেন সেগুলো সালাফদের ফাহম ও মানহাজের প্রায়োগিক ও বাস্তবিক রূপ। যা ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বে মাজহাব নামে পরিচিত। এজন্য আমরা দেখতে পাই-চার মাজহাবের ইমামগণ তাবেয়ি ও তাবে-তাবেয়িদের জমানার অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
ইসলামি জ্ঞানশাস্ত্রে মাজহাবগুলো নিছক ইমামদের মতামতের ভিত্তিতে গড়ে ওঠেনি; বরং ইমামরা তাবেয়ি কিংবা তাবে-তাবেয়ি হওয়ার সূত্রে সাহাবায়ে কেরাম থেকে কুরআন-সুন্নাহর যে ইলম ও ফাহম লাভ করেছেন, তার ভিত্তিতেই কুরআন-সুন্নাহর আহকাম ও মাসায়েল মুসলিমদের সামনে উন্মোচন করেছেন আর এর মাধ্যমে তারা একদিকে হেফাজতে দীনের খোদাপ্রদত্ত ইজাজি (অলৌকিক) ইসনাদের অংশ হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছেন, অন্যদিকে কিয়ামত পর্যন্ত ইসলামি শরিয়াতের গতিশীলতার জন্য নিরাপদ প্রবাহ তৈরি করে দিয়েছেন। মহান আল্লাহ তাআলা তাদেরকে পুরো মুসলিম উম্মাহর পক্ষ থেকে উত্তম বিনিময় দান করুন। আমিন।
বর্তমানে যারা মাজহাবসমূহকে কুরআন-সুন্নাহর বিরুদ্ধে দাঁড় করাচ্ছে, এমনকি কেউ কেউ সাহাবায়ে কেরামের স্বীকৃত আমলও কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী হিসেবে প্রচার করছে, তারা যে নামই ধারণ করুক না কেন, নিঃসন্দেহে তারা সালাফে সালেহিনের ফাহম ও মানহাজ থেকে বিচ্যুত। নিশ্চয় ইসলামি শরিয়াহর প্রধান উৎস কুরআন ও সুন্নাহ। মৌলিকভাবে আমরা কুরআন-সুন্নাহ অনুসরণের জন্যই আদিষ্ট। কিন্তু কুরআন-সুন্নাহ কেবল লফজি বা শব্দগত বস্তু নয়; বরং এগুলোর মা'না (অর্থ) বা মাফহুম তথা মর্মগত ব্যাপার আছে। এখন নুসুসে শরিয়াহ থেকে মর্ম উদ্ধার করার ক্ষেত্রে মানুষের অবস্থান বিচিত্র হবে। কারণ একেকজনের মেধা একেক রকম। আবার একেকজন একেক বহিরাগত চিন্তা ও আদর্শ দ্বারা প্রভাবিত হতে পারেন। সে ক্ষেত্রে যদি নুসুসে শরিয়াহর ফাহমের মৌলিক একটি শাকল বা গঠন মানদণ্ড হিসেবে না থাকে, তাহলে কুরআন-সুন্নাহর মর্ম বিকৃত হতে হতে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের মর্ম বিলুপ্ত হয়ে যাবে। সালাফে সালেহিনের ফাহম ও মানহাজটাই হলো সেই মানদণ্ড ও কাঠামো।
এজন্য সালাফদের স্বীকৃত ও সামগ্রিক বুঝকে বাদ দিয়ে যে ব্যক্তি কুরআন-সুন্নাহ বোঝা ও আমল করার দাবি করবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, সে মানুষকে গোমরাহ করবে। তার হাত দ্বারা ইসলামি জ্ঞানশাস্ত্রে ও মুসলিম-সমাজে নৈরাজ্য সৃষ্টি হবে। মুসলিম উম্মাহর চৌদ্দশ বছরের ইলমি ও আমলি তুরাসকে পাশ কেটে এবং সালাফে সালেহিনের বুঝকে উড়িয়ে দিয়ে সরাসরি কুরআন-সুন্নাহর ওপর আমলের দাবি ইলমি মুগালাতাহ (জ্ঞানগত বিভ্রান্তি) ছাড়া কিছুই না। কারণ কুরআন ও সুন্নাহ সরাসরি আমাদের ওপর অবতীর্ণ হয়নি। সালাফে সালেহিনের প্রথম প্রজন্মের সামনে নুসুসে শরিয়াহ অবতীর্ণ হয়েছে। তারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে নুসুসে শরিয়াহ তার মর্মসহ শিখে নিয়েছেন। সাহাবিদের থেকে শরিয়াহর নুসুস ও ফাহম আয়ত্ত করেছেন তাবেয়িরা, তাদের থেকে তাবে-তাবেয়িরা, এভাবেই প্রত্যেক প্রজন্মের সত্যনিষ্ঠ আহলে ইলমরা শরিয়াহর নুসুস ও ফাহমকে অবিকৃতভাবে ও সঠিক পথে প্রবাহিত করে আমাদের নিকট পৌঁছিয়েছেন। যা মহান আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ইসলামি শরিয়াহ সংরক্ষণ রাখার ওয়াদার বাস্তবায়ন। আল্লাহ তাআলা বলেন, 'আমিই এই কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই এর রক্ষণাবেক্ষণকারী। '৪৩
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা কুরআন সংরক্ষণের মাধ্যমে সুন্নাহ ও এতদুভয়ের মর্মের রক্ষণাবেক্ষণেরও ওয়াদা করেছেন। তাই কিয়ামত পর্যন্ত ইসলামি জ্ঞানশাস্ত্রের এই সিলসিলা বহাল থাকবে। আর এই সিলসিলায় সালাফে সালেহিনের ফাহম ও মানহাজ বিচারিক ক্ষমতা ও মানদণ্ডের অবস্থান চির স্বীকৃতির সাথে সংরক্ষ করবে। যেন ইসলামি জ্ঞানশাস্ত্রে পবিত্র ও ইজাযি এই সিলসিলা ভুল ধারা প্রবাহিত না হয় এবং এতে বিকৃতি, মিথ্যাচার ও মূর্খতা স্থান না পায়। মহান এই সিলসিলাকেই আমরা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের পরিভাষা হিসেবে চিনি এবং ব্যক্ত করি।

টিকাঃ
১৮. সহিহ বুখারি, হাদিস নং ২৬৫১; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২৫৩৫
১৯. তাহযিবুল আসমা ওয়াল লুগাত, ৩/২৬৯
২০. আন নিহায়াহ, ৪/৫১
২১. মাজমাউয যাওয়ায়েদ, ৯/৪০৪; সিলসিলাতুল আহাদিসিস সহিহাহ, হাদিস নং ২৬৬০
২২. ফাতহুল বারি, ৭/৮
২৩. তাহজিবুল আসমা ওয়াল লুগাত, ৩/২৬৯
২৪. সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ২৩৩১, সনদ হাসান।
২৫. ফাতহুল বারি, ৭/৮
২৬. শরহুল মুসলিম লিন নববি, ১৬/৮৫
২৭. সহিহ বুখারি, হাদিস নং ২৬৪৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২৫৩২
২৮. মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহ, হাদিস নং ৩২৪০৭; আল মুজামুল কাবির লিত তাবারানি, হাদিস নং ২০৭, ইবনে হাজার আসকালানি রহিমাহুল্লাহ ফাতহুল বারিতে হাদিসটিকে হাসান বলেছেন, ৭/৫
২৯. শরহু মুসলিম, ১৬/২২
৩০. মুসনাদে আহমাদ, ০২/৩৪০, শায়খ শুআইব আরনাউত রহিমাহুল্লাহ হাদিসটিকে জায়্যিদ বলেছেন।
৩১. মিযানুল ইতিদাল, ০১/০৪
৩২. ইরজায়ি চিন্তাধারা বলতে বোঝানো হয়, কেউ মুখে মুসলিম দাবি করার পর কোনো কর্ম বা বিশ্বাস তার ঈমানকে নাকচ করে না বলে ধারণা রাখা। এই চিন্তাধারার অধিকারী দলটি মুরজিয়া নামে পরিচিত। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের ঐকমত্যে, এটি একটি ভ্রান্ত দল।
৩৩. ইতিজালের ফিতনা বলতে মুতাজিলা ফিরকার ফিতনা উদ্দেশ্য। এর বিবরণ হলো, এটা ইসলামি ইতিহাসের উমাইয়া আমলে জন্ম নেওয়া একটি ভ্রান্ত গোষ্ঠীর নাম। এরা ওহির ওপর আক্কলের মর্যাদা দেয়। এরা ঈমান ও কুফরের মাঝখানে মানুষের আরও একটি অবস্থান দাবি করে। তারা মনে করে, বান্দার কর্ম বান্দার নিজেরই সৃষ্টি, এখানে আল্লাহর কোনো হস্তক্ষেপ নেই। তারা আল্লাহর সিফাতগুলো বাতিল সাব্যস্ত করে। তারা আরও মনে করে, কবিরা গুনাহ আল্লাহ ক্ষমা করতে পারেন না। কবিরা গুনাহকারী নিশ্চিতভাবে জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করবে এবং সেখানে চিরস্থায়ী হবে। এই মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা ওয়াসিল বিন আতা হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহর শিক্ষা মজলিস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার কারণে এই ফিরকাটিকে মুতাজিলা (বিচ্ছিন্ন) হিসেবে নামকরণ করা হয়েছে।
৩৪. ইসলামি ইতিহাসে ভ্রান্ত একটি গোষ্ঠীর নাম খারেজি। খারেজিদের মূল ভ্রান্তি হলো, তারা কবিরা গুনাহকারীকে কাফের মনে করে। হজরত আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুর জমানায় এই দলের উৎপত্তি হয়।
৩৫. রাফেজি শিয়াদেরই আরেক নাম। যারা হজরত আবু বকর ও উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমার খেলাফতকে অস্বীকার করে এবং আম্মাজান আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাসহ অধিকাংশ সাহাবিদের গালমন্দ করে ও কাফের বলে। তারা মনে করে, আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু ও তার বংশধররাই ছিলেন খেলাফতের একমাত্র হকদার ও উপযুক্ত। শায়খাইন তথা আবু বকর ও উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমার
৩৬. কাদরিয়া বলা হয়, যারা মূলত কদরকে অস্বীকার করে। অর্থাৎ তারা মনে করে মানুষের কাজকর্মে আল্লাহর কোনো হস্তক্ষেপ নেই। মানুষ নিজেই তার কাজের স্রষ্টা। এরা জাবরিয়া সম্প্রদায়ের বিপরীত গোষ্ঠী।
৩৭. জাবরিয়া ফিরকা বান্দার কর্মের স্বাধীনতাকে অস্বীকার করে। তারা দাবি করে, বান্দার সকল কর্ম যেহেতু আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত, তাই বান্দার সকল কর্মই আল্লাহর কর্ম। এজন্য তারা বিশ্বাস করে, বান্দা কুফর করুক কিংবা শিরক, সকল কাজের দায়ভার আল্লাহর। বান্দা কোনো কর্মের জন্য বিচারের সম্মুখীন হবে না।
৩৮. কাররামিয়া গোষ্ঠীকে মুশাব্বিহাও বলা হয়। এই দলের মূল ভ্রান্ত বিশ্বাস হলো, তারা আল্লাহর গুণাবলিকে মানুষের গুণাবলির সদৃশ বলে দাবি করে।
৩৯. লাওয়ামিউল আনওয়ার, ১/২০
৪০. সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ২৬৪১, হাদিসটির সনদ হাসান পর্যায়ের। ইমাম তিরমিজি রহিমাহুল্লাহ এই হাদিসের সনদ সম্পর্কে বলেন, هذا حديث مفسر حسن غريب لا نعرف مثل هذا إلا من هذا الوجه.
৪১. ইজমালুল ইসাবাহ ফি আকওয়ালিস সাহাবাহ, পৃষ্ঠা ৬৬, মুহাম্মাদ সুলাইমান আল আশকারের তাহকিককৃত নুসখা।
৪২. আল মুওয়াফাকাত, ১/৯৫
৪৩. সুরা হিজর, আয়াত ০৯

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00