📄 লেখকের কথা
ইউরোপে সেকুলারিজমের উৎপত্তির পর সেখানকার সমাজে বেশ কিছু পরিবর্তন ঘটে। এর মধ্যে গির্জাকেন্দ্রিক এমন দুটি পরিবর্তন ঘটেছিল, যা সমাজ থেকে খ্রিষ্টধর্মের প্রভাবকে একেবারে বিলুপ্ত করে দেয়। প্রথম পরিবর্তনটি হলো ধর্ম ও রাষ্ট্রের বিভাজন, অর্থাৎ রাষ্ট্রের সাথে ধর্মের কোনো সম্পর্ক থাকবে না। ধর্ম যে যার ব্যক্তিগত পরিসরে পালন করবে। এই বিভাজনের ফলে মানুষের সামাজিক ও সামষ্টিক জীবন থেকে ধর্মের প্রভাব বিলুপ্ত হতে থাকে। এই পরিবর্তনটি ছিল গির্জার সাথে সংশ্লিষ্ট, তবে গির্জার বাইরের বিষয়। এটাকেই ইউরোপের ইতিহাসে রেনেসাঁ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
দ্বিতীয় পরিবর্তনটি ঘটে গির্জার একেবারে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে। সেই পরিবর্তনটা ছিল ধর্মীয় টেক্সট ব্যাখ্যা অথরিটিকে অবাধকরণ। পোপদের অসততার সুযোগে মার্টিন লুথারের মাধ্যমে খ্রিষ্টধর্মের ভেতর রিফরমেশন আন্দোলন শুরু হয়।" এই আন্দোলন আপাত পোপতন্ত্রের বিরুদ্ধে হলেও এটির ফলাফল ছিল ভয়াবহ।
এই আন্দোলনের ফলে খ্রিষ্টানদের ভেতর বিভাজন হয়ে প্রোটেস্টান্ট ধারার সূচনা হয়। এই আন্দোলন একদিকে খ্রিষ্টান ধর্মকে নতুন করে বিকৃত করে (যদিও আগ থেকেই খ্রিষ্টধর্ম বিকৃত হয়ে আসছিল) তার বিদ্যমান মূল কাঠামো ও প্রভাবকে ধ্বংস করে দেয়। অন্যদিকে ধর্মীয় টেক্সট, বিধান ইত্যাদিকে ব্যাখ্যা ও পরিবর্তন করার ক্ষমতা সাধারণ থেকে বিশেষ—সবার জন্য অবাধ করে দেয়।
আমরা যদি উপরোক্ত দুটি বাস্তবতাকে মিলিয়ে আরও স্পষ্ট করে বলি, তবে বলতে হবে, ধর্মকে ব্যাখ্যা করা এবং বেঁধে দেওয়ার ক্ষমতা চলে আসে এমন রাজনৈতিক কর্তৃত্বের হাতে, যারা ধর্মকে তার বিধিবদ্ধতা ও যথাযথ মর্যাদাসহ গ্রহণ করতে আন্তরিক নয়। অল্প কথায়, একে সেকুলার অথরিটি বলা যায়। এখন সেই অথরিটি ব্যক্তি কিংবা রাষ্ট্র যে-কেউ হতে পারে। মোটকথা রিলিজিয়াস টেক্সটের ব্যাখ্যাপ্রণালি তার নিজ কাঠামো থেকে বেরিয়ে এসে সেকুলার মূল্যবোধের কাছে জিম্মি হয়ে যায়। এর ফলে ইউরোপে যেটা হয়, তা হলো, সেকুলার রাষ্ট্র কিংবা ব্যক্তি নিয়মিত খ্রিষ্টধর্মের বিধান ও আইনি কাঠামোকে পরিবর্তন করতে থাকে এবং কোনটা ধর্ম ও কোনটা ধর্ম না সেটাও তারা ঠিক করে দিতে থাকে।
এখান থেকে আমাদের সামনে এটাও স্পষ্ট হয় যে, সেকুলারিজম ঐতিহাসিক ও উৎপত্তিগতভাবে যে কাজটা আজ অবধি করে আসছে, সেটা তার প্রচলিত সংজ্ঞার সাথে মেলে না। সেকুলারিজম সব ধর্মকে স্বাধীনতা দেওয়ার কথা বলে ধর্মগুলোকে আসলে তার নিজের তৈরি একটি বাক্সের মধ্যে বন্দি করে দিচ্ছে এবং সে-ই ঠিক করে দিচ্ছে কোনটা ধর্ম আর কোনটা ধর্ম না, কোনটা ধর্মের সঠিক ব্যাখ্যা আর কোনটা সঠিক ব্যাখ্যা না, কোন জায়গায় ধর্ম চলবে আর কোন জায়গায় চলবে না। যাই হোক সেকুলারিজম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা এখানে আমার উদ্দেশ্য না। ধর্মকে মনমতো ব্যাখ্যা কিংবা রিফরমেশন করার যে ধারা ইউরোপে জন্ম হয়েছিল, আমি এখানে তার মৌলিক রূপটা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।
ইউরোপ যখন মুসলিম দেশগুলোতে ‘উপনিবেশবাদ’ প্রতিষ্ঠা করে, তখন সে তার সভ্যতার সকল মতাদর্শ মুসলিমদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে যায়; কিংবা চুপিসারে অনুপ্রবেশ করিয়ে দিয়ে যায়। ফলে মুসলিম-সমাজের ভেতর সেকুলারিজম তার উল্লিখিত সকল বৈশিষ্ট্য নিয়ে প্রবেশ করে এবং মুসলিম-সমাজের ওপর জেঁকে বসে। আর তখনই নতুন করে শরয়ি নুসুস বা টেক্সটকে নিজের মনমতো ব্যাখ্যা করা এবং নিজের মতো করে বোঝার নানা মাত্রিক প্রবণতা শুরু হয়। নানা মাত্রিক বলার কারণ হলো, কুরআন-সুন্নাহর নুসুসকে নিজের মতো করে বোঝা ও ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে যেসব প্রবণতার প্রাদুর্ভাব ঘটেছে, সেগুলোর অবস্থা একরকম নয়। প্রতিটি প্রবণতার খুঁটিনাটি নিয়ে আলোচনা না করে আমরা এমন একটি মৌলিক পয়েন্ট নিয়ে আলোচনা করতে চাচ্ছি, যা মূলত সবগুলো প্রবণতার মধ্যেই রয়েছে। তা হলো, শরয়ি নুসুস বোঝার ক্ষেত্রে সালাফদের ফাহম (বুঝ) ও মানহাজ (পদ্ধতি) উপেক্ষা করা। তথা সালাফরা যেভাবে কুরআন-সুন্নাহ বুঝেছেন এবং যে পদ্ধতি অনুসারে তা ব্যাখ্যা করেছেন, সে বুঝ ও ব্যাখ্যার পদ্ধতি থেকে সরে যাওয়া এবং তা উপেক্ষা করা।
কেউ কেউ সাধারণভাবে সালাফদের ফাহম ও মানহাজকে প্রত্যাখ্যান করে, আবার কেউ কেউ বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে তা উপেক্ষা করে থাকে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম এবং পরবর্তী সময়ে সালাফদের যুগ হয়ে প্রজন্ম পরম্পরায় শরয়ি নুসুসের (কুরআন ও হাদিসের) ধারাবাহিক যে জ্ঞান ও বুঝ আমরা লাভ করেছি, তাকে বলা হয় ‘ইলমে মুতাওয়ারিস’ ও ‘ফাহমে মুতাওয়ারিস’। যুগে যুগে ইসলামকে বিভিন্ন ভ্রান্ত ধ্যানধারণা ও বিকৃতি থেকে রক্ষা করেছে এই মুতাওয়ারিস ধারার নিরবচ্ছিন্ন ধারা। এই মুতাওয়ারিস ফাহমের ধারা মহান আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মুসলিম উম্মাহর জন্য এক বিশেষ রহমত। মহান আল্লাহ এই মজবুত নেটওয়ার্কের মাধ্যমেই তাঁর দীনকে সংরক্ষণ করে আসছেন। যেমনটি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
يَحْمِلُ هَذَا الْعِلْمَ مِنْ كُلِّ خَلَفٍ عُدُولُه ، يَنْفُوْنَ عَنْهُ تَحْرِيفَ الْغَالِيْنَ وَانْتِحَالَ الْمُبْطِلِيْنَ وَ تَأْوِيلَ الْجَاهِلِينَ.
'এই উম্মতের প্রত্যেক প্রজন্মের নিষ্ঠাবান শ্রেণি দীনের এই ইলমকে বহন করবে। তারা দীনের ইলমকে সীমালঙ্ঘনকারীদের বিকৃতি, বাতিলপন্থিদের মিথ্যাচার ও মূর্খদের অপব্যাখ্যা থেকে মুক্ত রাখবে।'
সুতরাং এই নেটওয়ার্ক ইসলামের একটি বৈশিষ্ট্যও বটে, যা অন্য কোনো ধর্মের নেই। এই কারণে ইসলাম ছাড়া বাকি সব ধর্ম খুব সহজেই বিকৃত হয়ে গেছে। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমেই মহান আল্লাহ তাআলা ইসলামকে কিয়ামত পর্যন্ত সংরক্ষিত রাখবেন।
ইসলামের ইতিহাসে যত ভ্রান্ত চিন্তা ও ফিরকার জন্ম হয়েছে, সবগুলোর মূল সমস্যা ছিল এই জায়গাটিতে। দীনের মুতাওয়ারিস ইলম ও ফাহম থেকে বেরিয়ে যারাই কোনো নতুনত্বকে বরণ করতে চাইবে, তাদের জন্য সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হওয়া এক সুনিশ্চিত বিষয়। বর্তমানেও দীনি অঙ্গনে যত নৈরাজ্যের সৃষ্টি হয়েছে, যত ফিকরি ইনহিতাতের (চিন্তাগত অধঃপতন) প্রাদুর্ভাব ঘটেছে, দেখা যাবে সবগুলোর মূল সংকট এখানেই।
ইসলামকে বিকৃত করে পশ্চিমা সভ্যতা ও মতাদর্শগুলোর সাথে সামঞ্জস্যশীল করার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো, সালাফে সালেহিনের মুতাওয়ারিস ফাহম। এজন্য পশ্চিমের প্রাচ্যবাদী বিভিন্ন সংস্থাও সালাফে সালেহিনের ফাহমের তিরস্কার করেছে। দীনের এই মুতাওয়ারিস ফাহম ও ইলমকে জড়, আবদ্ধ, পুরোনো, কট্টর ইত্যাদি শব্দে আখ্যায়িত করেছে। এমনকি তারা মডার্নিস্ট মুসলিমদেরকে এর বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত তৈরির জন্যও আহবান করেছে। এজন্য আমরা দেখব, সমস্ত ভ্রান্ত ফিরকাসহ পশ্চিমা সভ্যতা দ্বারা প্রভাবিত মডার্নিস্ট স্কলার ও মুসলিম দীনের মুতাওয়ারিস ফাহম ও মানহাজের তোয়াক্কা করে না; বরং তারা বিভিন্ন স্লোগান ও ভ্রান্ত যুক্তির আড়ালে মুতাওয়ারিস এই ধারাকে প্রশ্নবিদ্ধ ও গুরুত্বহীন করার অপপ্রয়াস করছে।
ফলে আধুনিক সময়ে সালাফে সালেহিন থেকে প্রাপ্ত মুতাওয়ারিস ফাহম ও মানহাজের ওপর যত প্রকার আঘাত আসছে এবং বিষয়টিকে কেন্দ্র করে যত প্রকার নৈরাজ্য চালানো হচ্ছে, সেগুলোকে দমন করার জন্য বিষয়টি উম্মাহর সামনে সঠিকভাবে উপস্থাপন করা জরুরি। সে লক্ষ্যেই আমরা এই বইটিতে সালাফদের পরিচয়, তাদের ফাহমের গুরুত্ব, প্রামাণিকতা এবং এর ওপর আপত্তিসমূহের নিরসন তুলে ধরার চেষ্টা করব। এ ক্ষেত্রে আমরা নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির দিকে দৃষ্টিপাত করব না; বরং সামগ্রিকভাবে সাধারণত যেসব আপত্তি আসে এবং আমরা সচরাচর যেসব আপত্তির সম্মুখীন হই, সেগুলো উল্লেখপূর্বক নিরসন করার চেষ্টা করব।
বইয়ের মূল পাঠে যাওয়ার পূর্বে পাঠককে একটি বিষয়টি জানিয়ে রাখা সমীচিন মনে করছি। বইটির বিষয়বস্তু কিছুটা কঠিন। কারণ এটি একটি উসুলি তথা মূলনীতিধর্মী গ্রন্থ। বিষয়বস্তুর মূলভাব রক্ষা করে আমি সাধ্য অনুযায়ী সহজ করার চেষ্টা করেছি। তবে বিষয়টি যেহেতু চিন্তার, তাই পাঠককে একটু মনোযোগ ও চিন্তার সাথেই পড়তে হবে। সামান্য চিন্তা করে আমরা যদি দীনের এই কষ্টিপাথরকে ভারসাম্যপূর্ণভাবে বুঝে নিতে পারি, তাহলে আমাদের চিন্তার জগতে একটি দুর্গ প্রতিষ্ঠা হবে বলে আশা করি। যে দুর্গ থেকে আমরা চিন্তার ময়দানের সকল আক্রমণকে প্রতিহত করতে পারব এবং নিজেদের চিন্তাকাঠামোকে ভ্রান্তির আঘাত থেকে রক্ষা করতে পারব।
বইটি লেখার ক্ষেত্রে আমি বিভিন্ন গ্রন্থ ও প্রবন্ধ থেকে উপকৃত হয়েছি। এর মধ্যে হাকিমুল উম্মত হজরত মাওলানা আশরাফ আলি থানবি রহিমাহুল্লাহর আল ইন্তিবাহাতুল মুফিদাহ, আল্লামা তাকি উসমানি হাফিজাহুল্লার ইসলাম আওর জিদ্দাত পছন্দি ও বিভিন্ন প্রবন্ধ এবং শায়খ ফাহাদ বিন সালেহ আল আজলান হাফিজাহুল্লাহর বিভিন্ন প্রবন্ধ সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। বইটির মৌলিক কাঠামো গ্রহণ করেছি ফাহমুস সালাফ লিন নুসুসিশ শরইয়্যাহ ওয়ার রদ্দু আলাশ শুবহাতি হাওলাহু নামক গ্রন্থ থেকে। এই গ্রন্থের বেশ কিছু আলোচনার সাথে আমি একমত নই এবং বইটিতে সামগ্রিকভাবে কিছু বিষয়ের শূন্যতাও অনুভব করি। যার দরুন গ্রন্থটির হুবহু অনুবাদ করার পরিবর্তে আমি তা সামনে রেখে উপযুক্ত সংযোজন ও বিয়োজনের প্রয়োজন বোধ করি এবং সেই বোধ থেকে বক্ষ্যমাণ গ্রন্থটি প্রস্তুত করি।
মানুষ হিসেবে কখনোই বইটির কোনো আলোচনাকে আমি ভুলের ঊর্ধ্বে মনে করি না। বিজ্ঞ পাঠকের চোখে যৌক্তিক কোনো ভুল প্রকাশ পেলে অবশ্যই লেখক কিংবা প্রকাশনীকে অবগত করার অনুরোধ থাকবে। আমরা দালিলিক ও যৌক্তিক আপত্তি পেলে অবশ্যই সেই ভুল সংশোধন করে নেব, ইনশাআল্লাহ।
মুহতারাম মাওলানা আফসারুদ্দীন হাফিজাহুল্লাহ, মাওলানা মুহাম্মাদ মাসরুর, মাওলানা ইমরান রাইহান, মাওলানা সাজ্জাদ হুসাইন, মাওলানা কায়েস শরীফ, মাওলানা হুসাইন আহমাদ—সম্মানিত এই মানুষগুলোর প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।
সম্পাদনা, নজরে সানি, প্রুফ দেখাসহ প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়ে বইটিকে প্রকাশযোগ্য করে তুলতে তাদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। মহান আল্লাহ তাআলার কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন বইটির সাথে সংশ্লিষ্ট সকলের খেদমত কবুল করে নেন এবং বইটির মাধ্যমে উম্মাহর ভেতর স্বর্ণযুগের চিন্তাচেতনা ও আদর্শ পুনরুজ্জীবিত করে দেন। আমিন।
ইফতেখার সিফাত
১৬ জুমাদাল আখিরাহ ১৪৪৩
টিকাঃ
৫. ১৬ শতকে গির্জাকেন্দ্রিক নানা সমস্যা থেকে খ্রিষ্টধর্মে প্রতিবাদপন্থি সংস্কার আন্দোলনের সূচনা হয়। এই আন্দোলনকেই রিফরমেশন আন্দোলন বলা হয়। এর মধ্য দিয়ে খ্রিষ্টধর্মে একদমই নতুন একটি ধারা সৃষ্টি হয়। যাদেরকে 'প্রোটেস্টান্ট' নামে ডাকা হয়। এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে লেখকের অনূদিত রুতামা পাবলিকেশন থেকে প্রকাশিত ইতিহাসের আয়নায় বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা বইটি পড়া যেতে পারে।
৬. ক্যাথলিক গির্জার একচ্ছত্র নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বকে 'পোপতন্ত্র' বলা হয়। এই কর্তৃত্বের ভিত্তিতে গির্জার পোপরা খ্রিষ্টধর্ম শেখা, বোঝা ও পোপ হওয়ার অধিকারকে তাদের বিশেষ বংশ ও শ্রেণির মাঝে কুক্ষিগত করে রাখত। আধুনিক শিক্ষায় প্রভাবিত কোনো কোনো মুসলিম পোপতন্ত্রের সাথে ইসলামি ইলম অর্জনের সিলসিলাকে তুলনা করে থাকে। এটি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত একটি তুলনা। বইটির সংশয় নিরসন অংশে আমরা বিষয়টি পরিষ্কারভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।
৭. উপনিবেশবাদ বলা হয়, একটি দেশ কর্তৃক অন্য দেশে সার্বিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। ১৭শ এবং ১৮শ এর দশকে ইউরোপ মুসলিম বিশ্বসহ পৃথিবীর আরও বেশ কিছু অঞ্চলে উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা করে। আমরা এখানে সে উপনিবেশের কথাই বলছি।
৮. নুসুসের সে ব্যাখ্যা ও বুঝ, যা সাহাবিগণ রাদিয়াল্লাহু আনহুম থেকে আমাদের কাছে ধারাবাহিকভাবে এসে পৌঁছেছে একটি বিশ্বস্ত মাধ্যম হয়ে।
৯. মুসনাদুশ শামিয়িন, তাবারানি, হাদিস নং ৫৯৯; সুনানে কুবরা, বায়হাকি, হাদিস নং ২০৯১১, সনদ সহিহ।
📄 ফাহমুস সালাফ দ্বারা উদ্দেশ্য
আমরা ইতঃপূর্বে ফাহম ও সালাফ এই দুই শব্দের সংজ্ঞা ও উদ্দেশ্য পৃথকভাবে জেনে এসেছি। এই দুটি শব্দের সংজ্ঞা থেকেই আমাদের সামনে ফাহমুস সালাফ শব্দের উদ্দেশ্য পরিষ্কার হয়ে যায়। ফাহমুস সালাফ দ্বারা আমাদের উদ্দেশ্য হলো রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষার মাধ্যমে সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ি ও তাবে-তাবেয়িরা নুসুসে শরিয়াহ থেকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের উদ্দেশ্য হিসেবে যা বুঝেছেন এবং উন্মোচন করেছেন। এই সংজ্ঞায় কোনে নসের ফাহমের ওপর তাদের ইজমা বা জমহুরের অবস্থান অন্তর্ভুক্ত। পাশাপাশি এককভাবে সেই ফাহমও অন্তর্ভুক্ত, যা প্রচার ও বিস্তার লাভ করা সত্ত্বেও সালাফদের কারও বিরোধিতা কিংবা সে ব্যাপারে তাদের কারও বিরোধী বক্তব্য পাওয়া যায় না। এজন্যই ইবনুল কায়্যিম রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'সাহাবায়ে কেরام, তাবেয়ি ও তাবে-তাবেয়িরা কুরআন ও সুন্নাহ থেকে যা বুঝেছেন, পরবর্তীদের বুঝের দিকে ফেরার চেয়ে তার দিকেই ফেরা উত্তম।
পাশাপাশি সালাফে সালেহিনের মৌলিক এই বুঝকে ভিত্তি করে খালাফরা (পরবর্তীরা) তাওয়ারুস (পরম্পরা) সূত্রে যে ফিকহি তুরাস (ঐতিহ্য) গড়ে তুলেছেন, মানহাজগতভাবে সেটিও আমাদের আলোচনার অন্তর্ভুক্ত।
সুতরাং ফাহমুস সালাফ ও এর প্রামাণিকতার ভেতর আমরা দুটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে পারি।
এক. দীনি বিষয়ে সালাফদের ইলমি ও আমলি মাসায়েল। যেগুলো সালাফরা নুসুসে শরিয়াহ থেকে বুঝেছেন, আমল করেছেন এবং স্বীকৃতি দিয়েছেন।
দুই. সালাফদের ইলম শেখার মানহাজ, দলিল প্রদানের উসলুব (পদ্ধতি) এবং ইজতিহাদি ও ইখতিলাফি বিষয়ে তাদের আচরণবিধি।
প্রথমটা ফাহমুস সালাফের প্রায়োগিক রূপ, আর দ্বিতীয়টা তাদের মানহাজগত রূপ। সাধারণ ফিকহ, তাফসির ও হাদিসের ব্যাখ্যাগ্রন্থগুলোর মাধ্যমে আমরা প্রথম প্রকারের সাথে পরিচিত হতে পারব। উসুলে ফিকহ, উসুলে তাফসির ও উসুলে হাদিসের কিতাবাদির মাধ্যমে আমরা দ্বিতীয় প্রকারের সাথে পরিচিত হতে পারব। এই বইয়ে আমরা ফাহমুস সালাফ দ্বারা এই উভয় প্রকারই উদ্দেশ্য নিয়েছি।
টিকাঃ
৪৪. ইলামুল মুয়াক্কিয়িন, ৪/১১৮
📄 সালাফদের বুঝকে লিপিবদ্ধ ও সংরক্ষণ করার ক্ষেত্রে যুগে যুগে আলেমদের যত্নশীলতা
দীনকে সঠিকভাবে বোঝার ক্ষেত্রে সালাফে সালেহিনের ফাহমের গুরুত্ব অপরিসীম হওয়ার কারণে উলামায়ে কেরাম যুগে যুগে প্রজন্ম পরম্পরায় তাদের ফাহমকে লিপিবদ্ধ ও সংরক্ষণ করেছেন। এর ভিত্তিতেই তারা নিজেদের বুঝকে মেপে দেখেছেন ও প্রসারিত করেছেন। সুন্নাতে রাসুলের মত গুরুত্ব দিয়েই যুগ পরম্পরায় সালাফদের ফাহম সংরক্ষিত হয়ে আসছে। তাবেয়ী সালেহ বিন কায়সান রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'আমি এবং যুহরি ইলম অন্বেষণের জন্য একত্রিত হলাম। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম সুন্নাতসমূহকে লিপিবদ্ধ করব। তারপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে যা কিছু বর্ণিত হয়েছে আমরা সেগুলো লিপিবদ্ধ করলাম। অতঃপর যুহরি বলল, সাহাবিদের বক্তব্যও আমরা লিবদ্ধ করব। কারণ সেগুলোও সুন্নাহর মতো গুরুত্বপূর্ণ। তখন আমি বললাম, না, এগুলো সুন্নাহ নয়। তাই আমি এগুলো লিপিবদ্ধ করব না। বর্ণনাকারী তাবেয়ী বলেন, 'এরপর যুহরি সাহাবিদের বক্তব্য লিপিবদ্ধ করল, কিন্তু আমি করিনি ফলে সে সফল হয়েছে আর আমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি।’৭৯
এজন্য সাহাবিদের কর্মের ওপরও সুন্নাহ শব্দের প্রয়োগ দেখা যায়, চাই সে কর্ম কুরআন-সুন্নাহতে পাওয়া যাক কিংবা না যাক। কারণ হয়তো সেই আমল এমন কোনো হাদিসের ভিত্তিতে তারা পালন করেছেন, যা তাদের কাছে প্রমাণিত, কিন্তু আমাদের কাছে পৌঁছেনি। অথবা ইজতিহাদের ভিত্তিতে কাজটির ওপর তাদের বা তাদের খুলাফাদের ইজমা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
আমরা যদি যুগে যুগে উলামায়ে কেরামের বিভিন্ন রচনার দিকে দৃষ্টিপাত করি, তাহলেই আমরা দেখতে পাব যে, তারা কতটা গুরুত্বের সাথে সালাফে সালেহিনের আমল ও বক্তব্যকে লিপিবদ্ধ করেছেন। যেমন-
১. সমস্ত সিহাহ, সুনান ও মুসনাদ গ্রন্থগুলোতে গ্রন্থকাররা সাহাবি ও তাবেয়িদের অসংখ্য আমল ও বক্তব্যকে লিপিবদ্ধ করেছেন। ইমাম বুখারি, ইমাম তিরমিজিসহ সকল মুহাদ্দিসের গ্রন্থে সালাফে সালেহিনের আমল ও বক্তব্যের ভাণ্ডার আপনি দেখতে পাবেন।
২. মুসান্নাফ ও মুজাম গ্রন্থগুলো তো মুসলিম উম্মাহর এই তুরাসকে খুব যত্নের সাথে লিপিবদ্ধ করেছে। প্রতিটি মুসান্নাফ ও মুজাম কিতাব সালাফে সালেহিনের আমল ও কর্মের সোনালি খাজানা। যেমন আবদুর রাজ্জাক ও ইবনে আবি শাইবার মুসান্নাফ। আবদুর রাজ্জাক রহিমাহুল্লাহ তার মুসান্নাফে ২১ হাজারেরও বেশি হাদিস ও আসার (সাহাবিদের বক্তব্য) সংকলন করেছেন। যার মধ্যে অধিকাংশই হলো সালাফদের বক্তব্য। অনুরূপ ইবনে আবি শাইবাহ তার মুসান্নাফে ১৯ হাজারের মতো হাদিস ও আসার একত্রিত করেছেন। সেগুলোর অধিকাংশই হলো সালাফে সালেহিনের বক্তব্য।
৩. প্রতিটি তাফসিরগ্রন্থ সালাফদের বর্ণনার একেকটি খাজানা। এমন কোনো তাফসিরগ্রন্থ নেই, যেখানে সালাফদের ফাহমকে লিপিবদ্ধ করা হয়নি।
৪. হাদিসের ব্যাখ্যাগ্রন্থগুলোতেও আমরা দেখতে পাব যে, ব্যাখ্যাকাররা হাদিসগুলোর ব্যাখ্যা পেশ করতে গিয়ে প্রধানত সালাফদের ফাহমেরই দ্বারস্থ হয়েছেন। যার দরুন তারা সালাফদের বিভিন্ন বক্তব্য ও আমলকে উল্লেখপূর্বক তার ভিত্তিতে নিজেদের বুঝ প্রসারিত করেছেন।
৫. চার মাজহাবের ফিকহি গ্রন্থগুলোকেও সালাফে সালেহিনের আমল ও বক্তব্যের ভাণ্ডার বলা যায়। তাদের প্র্যাকটিক্যাল আমল ও বক্তব্যের ভিত্তিতেই প্রতিটি মাজহাব গড়ে উঠেছে। যুগ পরম্পরায় তাদের ফাহমের ভিত্তিতেই ইসলামি জ্ঞানশাস্ত্র বিস্তৃত হয়েছে। এর দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয় যে, সালাফদের বুঝের ওপর নির্ভরতা মানে কখনোই ইসলামের গতিশীলতাকে থামিয়ে দেওয়া নয়; বরং এই নির্ভরতার কারণে ইসলামের গতিশীলতা নিরাপদ প্রবাহে প্রবাহিত হয়। পাশাপাশি এতে ইসলামের চিরন্তনতা ও স্থিতিশীলতাও বজায় থাকে।
ওপরে উল্লেখিত প্রতিটি পয়েন্ট থেকে সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায়, প্রত্যেক যুগে উলামায়ে কেরাম সালাফে সালেহিনের ফাহম, ইলম ও ফিকহকে কতটা গুরুত্বের সাথে সংরক্ষণ করেছেন। এবং তারা কেবল সেগুলো বর্ণনাই করেননি; বরং সেগুলোর বিশুদ্ধতাকে সুদৃঢ় করেছেন এবং নিজেরা তার ওপর আমল করেছেন।
টিকাঃ
৭৯. মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক, হাদিস নং ২০৪৮৮
৮০. আলমুওয়াফাকাত, ৪/৪
৮১. সহিহ : যেসব হাদিসগ্রন্থে জয়িফ হাদিস বর্জন করে শুধুমাত্র সহিহ ও সহিহভুক্ত (যেমন, হাসান) হাদিস সংকলন করা হয়, তাকে 'সহিহ' বলা হয়। যেমন, সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম।
৮২. সুনান : হাদিসের যেসব গ্রন্থ ফিকহি অধ্যায় অনুসারে সংকলন করা হয়, তাকে 'সুনান' বলা হয়। এমন হাদিসগ্রন্থের সংখ্যা প্রচুর। যেমন: ১. আস সুনান লিল ইমামি আবি দাউদ (২৭৫ হি.)। ২. আস সুনান লিল ইমামি আন-নাসায়ি (৩০৩ হি.)।
৮৩. মুসনাদ : হাদিসের যেসব গ্রন্থ সাহাবায়ে কেরামের নামের তারতিব অনুযায়ী সাজানো হয়, তাকে 'মুসনাদ' বলা হয়। এই তারতিব কখনও আরবি বর্ণমালার বিন্যাস অনুযায়ী হয়, কখনও সাহাবিদের মর্যাদার তারতম্য অনুসারে হয়। এরূপ গ্রন্থের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। যেমন: ১. আল মুসনাদ লিল ইমামি আহমাদ (২৪১ হি.)। ২. আল মুসনাদ লিল ইমাম আবি ইয়ালা (৩০৭ হি.)।
৮৪. মুসান্নাফ : যেসব হাদিসগ্রন্থে মারফু হাদিসের সাথে সাথে মাওকুফ, মাকতু হাদিসও উল্লেখ করা হয়, এমন হাদিসের গ্রন্থকে 'মুসান্নাফ' বলা হয়। যেমন: ১. আল মুসান্নাফ লিল ইমাম আব্দির রাজ্জাক (২১১ হি.)। ২. আল মুসান্নাফ ফিল আহাদিসি ওয়াল আসার, লিল ইমামি আবি বকর ইবনে আবি শাইবা (২৩৫ হি.)।
৮৫. মুজাম: হাদিসের যেসব গ্রন্থে সাহাবি, শায়খ বা শহরের নামের তারতিব অনুসারে হাদিস সংকলন করা হয়, তাকে 'আল মুজাম' বলা হয়। তবে মুজাম জাতীয় গ্রন্থাবলির বিন্যাস অধিকাংশ ক্ষেত্রে আরবি বর্ণমালা অনুসারেই হয়ে থাকে। যেমন, ইমাম তাবারানি রহিমাহুল্লাহ (৩৬০ হি.) রচিত- ১. আল মুজামুল কাবির। ২. আল মুজামুল আওসাত। ৩. আল মুজামুস সগির।
📄 ফাহমুস সালাফ আঁকড়ে ধরার শুভ পরিণাম
নুসুসে শরিয়াহ বোঝার ক্ষেত্রে সালাফদের ফাহম আমাদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় ও দুর্গ। এই দুর্গ আমাদের আকিদা, ফিকির, ইলম, আমলকে সব ধরনের আক্রমণ থেকে রক্ষা করে। বিজাতীয় সভ্যতার দাপট, প্রবৃত্তির তাড়না ও বিবেকের স্বেচ্ছাচারিতা থেকে ফাহমুস সালাফ আমাদের চিন্তাকে নিরাপদ রাখবে। সালাফদের ফাহম ও মানহাজের ওপর নির্ভরশীলতা আমাদের ইলমি ও ফিকরি জীবনে বেশ কিছু উপকারিতা নিয়ে আসবে। যথা-
১. আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বাণীর প্রকৃত মর্ম বুঝতে পারা। মানব জীবনে এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের সৃষ্টি করেছেন তার ইবাদত করার জন্য। তারপর ওহি দিয়ে রাসুল পাঠিয়েছেন আমাদেরকে তার দাসত্ব বাস্তবায়নের গাইডলাইন দেওয়ার জন্য। এটা মানব জীবনের প্রধান ও একমাত্র উদ্দেশ্য। এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন পরিপূর্ণ নির্ভর করছে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বাণীর মর্ম বোঝার ওপর। আর বিশুদ্ধভাবে নুসুসে শরিয়াহর মর্ম জানার ও আয়ত্ত করার একমাত্র মাধ্যম হলো সালাফে সালেহিনের ফাহম ও মানহাজ।
২. উল্লেখিত প্রথম উপকারিতা ব্যক্তিগত অবস্থান থেকে প্রাপ্ত। আর দ্বিতীয় উপকারিতা হচ্ছে, দীনের মাঝে তাবদিল (পরিবর্তন), তাহরিফ (বিকৃতি) ও বিদআত আবিষ্কারের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া। কারণ তাবদিল, তাহরিফ ও বিদআতের প্রধানেই আছে নুসুসে শরিয়াহ বোঝার ক্ষেত্রে সালাফদের ফাহম ও মানহাজকে প্রত্যাখ্যান করা। নিজের মনমতো কিংবা বিজয়ী কালচারের সাথে মিলানোর জন্য নুসুসে শরিয়াহর ভ্রান্ত ব্যাখ্যা তৈরি করা। সালাফদের ফাহমের মাধ্যমেই আমরা বর্তমানে দীনের মাঝে তাহরিফ চিহ্নিত করতে পারব। তাদের ফাহম ও মানহাজ উম্মাহর জন্য সঠিক ও বেঠিকের মাপকাঠি। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَإِنْ آمَنُوا بِمِثْلِ مَا آمَنْتُمْ بِهِ فَقَدِ اهْتَدَوْا وَإِنْ تَوَلَّوْا فَإِنَّمَا هُمْ فِي شِقَاقٍ فَسَيَكْفِيْكَهُمُ اللَّهُ وَ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ.
'অতঃপর তারাও যদি সে রকম ঈমান আনে যেমন তোমরা ঈমান এনেছ, তবে তারা সঠিক পথ পেয়ে যাবে। আর তারা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে তারা মূলত শত্রুতায় লিপ্ত হয়ে পড়েছে। সুতরাং শীঘ্রই আল্লাহ তোমাদের সাহায্যার্থে তাদের দেখে নেবেন এবং তিনি সকল কথা শোনেন ও সবকিছু জানেন। '১২২
৩. অবৈধ মতবিরোধ ও বিচ্ছিন্নতা থেকে বেঁচে থাকা যায়। হজরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমাকে বলেন, 'এই উম্মত কীভাবে পরস্পরে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে, অথচ তাদের নবি এক, কিবলা এক?' তখন ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, 'হে আমিরুল মুমিনিন! কুরআন আমাদের সামনে অবতীর্ণ হয়েছে। আমরা এই কুরআন পড়েছি এবং অবগত হয়েছি কোন ক্ষেত্রে তা নাজিল হয়েছে। আমাদের পরে এমন কিছু সম্প্রদায় আসবে, যারা কুরআন তিলাওয়াত করবে, কিন্তু কী ব্যাপারে তা অবতীর্ণ হয়েছে, তা জানবে না। ফলে তারা তাদের নিজস্ব মত তৈরি করবে। আর যখন তাদের নিজস্ব মত তৈরি হবে, তখন তারা পরস্পরে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হবে। এবং লড়াই করবে।'১২৩
এই আসারে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেছেন যে, সাহাবায়ে কেরামের সামনে নুসুসে শরিয়াহ অবতীর্ণ হয়েছে। ফলে নুসুসে শরিয়াহর মর্মের ব্যাপারে তারাই ভালো অবগত। এজন্য নুসুসে শরিয়াহ বোঝার ক্ষেত্রে তাদের বুঝের প্রতি লক্ষ রাখতে হবে। কিন্তু উম্মাহর ভেতর এমন কিছু লোক আসবে, যারা নুসুসে শরিয়াহ অধ্যয়নের ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরামের বুঝের তোয়াক্কা করবে না। সেগুলো জানবে না কিংবা সেগুলো জানলেও বিবেচনায় নেবে না; বরং তারা নিজস্ব প্রবৃত্তি অনুযায়ী নুসুসে শরিয়াহ বোঝার চেষ্টা করবে। তখনই তারা মুসলিমদের ভেতর ভ্রান্তি ও বিভেদ সৃষ্টি করবে।
এক হাদিসে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'বনি ইসরাইল ৭২টি দলে বিভক্ত হয়েছিল। আর আমার উম্মত ৭৩টি দলে বিভক্ত হবে। তারা সকলেই জাহান্নামে যাবে একটা দল ছাড়া। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! সেটি কোন দল? তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যে দল আমার ও আমার সাহাবিদের পথের ওপর থাকবে।'১২৪
এই হাদিস থেকেও আমরা বুঝতে পারি, সালাফদের ফাহম ও মানহাজ পরিত্যাগ আমাদের বিভক্তির দিকে ঠেলে দেবে। হাদিসে বিভক্তির ক্ষেত্রে ইফতিরাক (বিভেদ) শব্দের ব্যবহার করা হয়েছে, ইখতিলাফ (মতভিন্নতা) নয়। কারণ মুসলিমদের ভেতর মতভিন্নতা থাকা স্বাভাবিক। স্বয়ং সাহাবায়ে কেরামের ভেতরও ইখতিলাফ বা মতভিন্নতা ছিল। এজন্য ইখতিলাফ বৈধ, কিন্তু ইফতিরাক তথা বিভেদ বৈধ নয়। সালাফদের ফাহম ও মানহাজ অনুযায়ী চললে আমরা ইফতিরাক ও বিভক্তি থেকে বাঁচতে পারব। তবে আমাদের ভেতর ইখতিলাফ বা মতভিন্নতা থাকবে। যেমন চার মাজহাবের ইমামগণের মধ্যে মতভিন্নতা রয়েছে। ফলে এখানে কেউ এই হাদিস দেখিয়ে ফিকহি স্কুল অফ থটগুলোকে ভ্রান্ত ফিরকার অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে না। কারণ সালাফদের ফাহম ও মানহাজের ভেতর থেকে উম্মাহর ভেতর মতভিন্নতা হলে সেটা স্বীকৃত বিষয়। এ মতভিন্নতার কারণে কোনো ধারা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ থেকে বহির্ভূত হয়ে বাতিল ফিরকায় রূপান্তরিত হবে না। উপরন্তু যে বিরোধ সালাফদের ফাহম ও মানহাজ বহির্ভূত কিংবা বিরোধী হবে, সে বিরোধই বাতিল হিসেবে গণ্য হবে। এখান থেকে আমরা সূক্ষ্ম একটি বিষয় বুঝতে পারি, তা হলো, বর্তমানে আমরা কিছু মানুষকে দেখি, তারা উম্মাহর দীর্ঘ বছরের স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত মতের বিরুদ্ধে গিয়ে, আরও সুস্পষ্ট করে বললে সালাফদের ফাহম ও মানহাজের বিপরীতে গিয়ে নতুন মত প্রকাশ করে এবং এটাকে ইখতিলাফ বা মতভিন্নতা বলে স্বাভাবিককরণের চেষ্টা করে। এটি সম্পূর্ণ ভুল প্রচেষ্টা। এ ধরনের ভিন্নমত বৈধ ইখতিলাফ বা মতভিন্নতা হিসেবে বিবেচিত হবে না। এ ধরনেরভিন্নমতকে আমরা তাহরিফ ও ইফতিরাক হিসেবে বিবেচনা করতে পারি। কারণ এই মতভিন্নতা কুরআন-সুন্নাহর মানদণ্ডের আওতায় থেকে হয়নি। বৈধ ইখতিলাফ হিসেবে সেই মতোই গণ্য হবে যেটা কুরআন-সুন্নাহর মানদণ্ডের আওতায় থেকে সৃষ্টি হবে।
৪. ফাহমুস সালাফ সামনে থাকলে চিন্তার প্রশান্তি ও ভারসাম্য লাভ হবে। কারণ সালাফদের ফাহম ও মানহাজকে কষ্টিপাথর হিসেবে বিবেচনায় রাখলে একজন ফকিহ ও তালেবুল ইলম তাদের চিন্তা ও গবেষণাকে যাচাই করে নিতে পারবে। যখন দেখবে তার চিন্তা ও গবেষণা সালাফদের ফাহম ও মানহাজের সাথে মিলে যাচ্ছে, তখন সে নিশ্চিন্ত থাকবে ও প্রশান্তি অনুভব করবে। কিন্তু পক্ষান্তরে নুসুসে শরিয়াহ বোঝার ক্ষেত্রে কারও চিন্তা ও গবেষণাকে পরখ করার যদি কোনো কষ্টিপাথর না থাকে, তবে নিশ্চিতভাবে তার ভেতর অস্থিরতা কাজ করবে। এটা তার চিন্তা ও গবেষণাকে অস্থির ও ভারসাম্যহীন করে ছাড়বে। তার চিন্তা ও গবেষণা সর্বদাই একটি আপেক্ষিক বিষয় হয়ে থাকবে। গ্রহণীয় হওয়ার মতো নিশ্চয়তা লাভ করবে না।
টিকাঃ
১২২. সুরা বাকারা, আয়াত ১৩৭
১২৩. শুআবুল ঈমান লিল বাযহি
১২৪. জামে তিরমিজি, হাদিস নং ২৬৪১, হাদিসটির সনদ হাসান। ইমাম তিরমিজি রহিমাহুল্লাহ এই হাদিসের সনদ সম্পর্কে বলেন, هذا حديث مفسر حسن غريب لا نعرف مثل هذا إلا من هذا الوجه.