📘 ফেইসবুক ক্ষতি নয় কল্যাণ বয়ে আনুক > 📄 মাসআলা : ফেইসবুক ও অন্যান্য যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে সুখনদুখ প্রকাশক স্টিকার ব্যবহারের বিধান কি? এগুলোতে চিত্রাংকন বলে ধরা হবে?

📄 মাসআলা : ফেইসবুক ও অন্যান্য যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে সুখনদুখ প্রকাশক স্টিকার ব্যবহারের বিধান কি? এগুলোতে চিত্রাংকন বলে ধরা হবে?


এসব স্টিকার দুপ্রকার:

প্রথম প্রকার : স্টিকারটি একটি পূর্ণাঙ্গ ছবি। যা কোনো একটি প্রাণীর সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। যেমন মানুষ, পাখি বা অন্যকোনো প্রাণী। এগুলো একদম বৈধ নেই।

দ্বিতীয় প্রকার : স্টিকারটি পূর্ণাঙ্গ ছবি নয়। যেমন শুধু মাথা বা অন্যকোনো অঙ্গ। অথবা একাধিক অঙ্গের ছবি। আলেমগণের মধ্যে অনেকের মতামত হচ্ছে, যে অঙ্গ ব্যতীত প্রাণী বেঁচে থাকতে পারে না এমন কোনো অঙ্গ যদি চিত্রের ভেতর না থাকে, তবে সে চিত্র ব্যবহারে অসুবিধে নেই। যেমন মাথাহিন চিত্র বা প্রাণীর অর্ধেক চিত্র, ইত্যাদি।

সুতরাং কোনো প্রাণীর ছবি যদি এমন হয়, যার নকশাটি পূর্ণাঙ্গ নয়, এমনকি সেটিকে বাস্তব মানুষ বা কোনো প্রাণী বলা যায় না; তাঁদের মতানুযায়ী এটিকে নিষিদ্ধ ছবির মধ্যে গণ্য করা হবে না।

আল্লামা আবু আবদুল্লাহ আল খারাশি রাহিমাহুল্লাহ শরহু মুখতাসারি খলিল গ্রন্থে ছবি নিষিদ্ধ হওয়ার আলোচনা শেষ করে বলেন, এটি হচ্ছে পূর্ণাঙ্গ ছবির ক্ষেত্রে। বাহ্যিক এমন কোনো অঙ্গ যদি না থাকে (যে অঙ্গ ছাড়া প্রাণী বাঁচে না,) সেক্ষেত্রে তা দেখা বৈধ।

ইমাম ও ফকিহ ইবনু কুদামা রাহিমাহুল্লাহ বলেন : ছবি যদি মাথা ছাড়া হয় বা শরীর ছাড়া মাথা থাকে, অথবা শুধু মাথা বানানোর পর বাকি পুরো শরীর যদি প্রাণী ব্যতীত অন্য কিছুর হয়, তবে সেটি নিষিদ্ধের আওতার ভেতর পড়বে না। কেননা সেটি কোনো প্রাণীর ছবি নয়।¹
তাঁদের দলিল হচ্ছে আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা কর্তৃক ছবিযুক্ত কাপড় টুকরো টুকরো করে ফেলার ঘটনা। তিনি বলেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফর থেকে ফিরলেন। আমার কাছে ছবিযুক্ত একটি কাপড় ছিল। সেটি আমি বাড়ির আঙ্গিনার দরজামুখে টানিয়ে দেই। তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেটি হাতে ধরলেন। তাতে নবিজির দৃষ্টি আকৃষ্টি হল। তিনি বললেন:
أَتَسْتُرِيْنَ الْجِدَارَ ؟
তুমি দেয়ালকে পোশাক পরিধান করিয়েছ?
ফলে আমি সেটি দিয়ে দুটি বালিশ বানিয়ে ফেললাম। তারপর দেখলাম নবিজি সেগুলোতে হেলান দিচ্ছেন।¹ এক্ষেত্রে মুসলিম শরিফে ব্যবহৃত শব্দ হচ্ছে এই :
إِنَّ اللَّهَ لَمْ يَأْمُرْنَا أَنْ نَكْسُوا الْحِجَارَةَ وَالطَّيْنَ.
আল্লাহ তায়ালা আমাদের পাথর অথবা মাটিকে বস্ত্র পরানোর নির্দেশ দেননি।
আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, আমরা চাদরটি কেটে দুটি বালিশ তৈরি করলাম এবং সে দুটির অভ্যন্তরে খেজুর বৃক্ষের আঁশ ঢুকিয়ে দিলাম। তাতে তিনি আমাকে আর দোষারোপ করলেন না।²
হাফিয ইবনু হাজার রাহিমাহুল্লাহ বলেন: পর্দা কেটে ফেলার মাধ্যমে ছবিটিকে যখন দুটুকরো করে ফেলা হল, তখন সেটি ছবির হুকুম থেকে বের হয়ে গেছে।³
আমির সানআনি রাহিমাহুল্লাহ বলেন: পর্দা টুকরো করে ফেলার পর ছবির অস্তিত্বই আর থাকেনি।⁴
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন :
أَتَانِي جِبْرِيلُ عَلَيْهِ السَّلامُ ، فَقَالَ لِيْ : أَتَيْتُكَ الْبَارِحَةَ فَلَمْ يَمْنَعْنِي أَنْ أَكُوْنَ دَخَلْتُ إِلا أَنَّهُ كَانَ عَلَى الْبَابِ تَمَاثِيْلُ ، وَكَانَ فِي الْبَيْتِ قِرَامُ سِتْرٍ فِيْهِ تَمَاثِيلُ، وَكَانَ فِي الْبَيْتِ كَلْبٌ ، فَمُرْ بِرَأْسِ التِّمْثَالِ الَّذِي فِي الْبَيْتِ يُقْطَعُ ، فَيَصِيرُ كَهَيْئَةِ الشَّجَرَةِ ، وَمُرْ بِالسِّتْرِ فَلْيُقْطَعْ، فَلْيُجْعَلْ مِنْهُ وِسَادَتَيْنِ مَنْبُوْذَيْنِ تُوْطَانِ ، وَمُرْ بِالْكَلْبِ فَلْيُخْرَجُ.
জিবরীল আলাইহিস সালাম আমার নিকট এসে বলেন, গত রাতে আমি আপনার নিকট এসেছিলাম, কিন্তু আমি প্রবেশ করিনি। কারণ ঘরের দরজায় ছবি ছিল, ঘরের মধ্যে ছিল ছবিযুক্ত পর্দা এবং ঘরের ভেতর ছিল কুকুর। সুতরাং আপনি ঘরে ঝুলানো ছবির মাথা কেটে দেয়ার আদেশ করুন, তাহলে তা গাছের আকৃতিতে পরিণত হবে। পর্দাটি কেটে দুটি বালিশ বানাতে আদেশ করুন, যেগুলোকে সাধারণ বালিশের মতো ব্যবহার করা হবে এবং কুকুরটিকে বের করে দেয়ার হুকুম দিন।'
এ হাদিসের আলোকেও বুঝা যায়, অপূর্ণাঙ্গ ছবির বিধান পূর্ণাঙ্গ ছবির বিধানের মতো নয়।
কেউ যদি প্রশ্ন করে, সুখদুঃখ এবং অন্যান্য ভাব প্রকাশের জন্য যেসব স্টিকার ব্যবহার করা হয়, সবগুলোতেই মাথা আছে। আর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
الصُّوْرَةُ الرَّأْسُ، فَإِذَا قُطِعَ الرَّأْسُ فَلَا صُوْرَةَ.
মাথাটিই ছবি। সুতরাং যখন মাথা কেটে ফেলা হবে, তখন আর সেটি ছবি থাকবে না।'
এ হাদিস থেকে বুঝা যায়, মাথাটিই মূলত ছবির ক্ষেত্রে হারাম।
আমি এর জবাবে বলব, এ হাদিস শুধু মাথার ছবি নিষিদ্ধ হওয়া বুঝাচ্ছে না। বরং এ কথা বুঝাচ্ছে, মাথা সরিয়ে ফেলার দ্বারা ছবি বিলুপ্ত হয়ে যায়। আর ইতোপূর্বে আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহার হাদিস থেকে আমরা জেনেছি, তিনি পর্দাটিকে দুটুকরো করে দুটি বালিশ বানিয়েছিলেন। সেগুলোতে নবিজি হেলানও দিয়েছেন এবং নবিজি এ বিষয়ে তাঁকে আর তিরস্কার করেননি। এতে কোনো সন্দেহ নেই, দুটি বালিশের যেকোনো একটিতে অবশ্যই মাথার ছবি ছিল।
হাফিয ইবনু হাজার ও আল্লামা সানআনি রাহিমাহুমাল্লাহ এর বর্ণনা থেকেও এ বিষয়টি বুঝে আসে।
এ কারনেই শাইখ আলি রাহিমাহুল্লাহ, যিনি আযিযি নামে প্রসিদ্ধ, তিনি সিরাজুল মুনির শরহুল জামিয়িস সগির গ্রন্থে বলেন, 'মাথাটিই ছবি' অর্থাৎ, নিষিদ্ধ ছবি হচ্ছে যে ছবিটি মাথাসহ হয়।
'যখন মাথা কেটে ফেলা হবে, তখন আর সেটি ছবি থাকবে না।'
সুতরাং প্রাণীর ছবি হারাম। যখন সেটির মাথা কেটে ফেলা হবে বা এমন কিছু করা হবে যে অবস্থা নিয়ে প্রাণী বেঁচে থাকতে পারে না, তখন আর নিষিদ্ধ হবে না।
আমির সানআনি রাহিমাহুল্লাহ বলেন: 'যখন মাথা কেটে ফেলা হবে, তখন আর সেটি ছবি থাকবে না।' কেননা সেটি আর কোনো প্রাণীর ছবি থাকেনি। সুতরাং যখন কেউ নিষিদ্ধ কোনো ছবির মাথা কেটে ফেলবে, সেটি আর হারাম ছবি বলে গণ্য হবে না। কারণ হচ্ছে, মাথা ছাড়া ছবি বলা হয় না।¹
ইবনু কুদামা মাকদিসি রাহিমাহুল্লাহ বলেন: ছবি থেকে যদি এমন কোনো অঙ্গ কেটে ফেলা হয়, যা ব্যতীত প্রাণী বাঁচতে পারে না, যেমন বুক, পেট; অথবা ছবির মাথাটি আলাদা করে বানানো হল, তবে এ ছবি নিষিদ্ধ হবে না। কারণ এগুলো ছাড়া পূর্ণাঙ্গ ছবি হয় না। তাই এমন ছবির বিধান মাথা কাটা ছবির বিধানের মতো।¹
আল্লামা মানসুর বিন ইউনুস বাহুতি রাহিমাহুল্লাহ বলেন : ছবি থেকে যখন মাথা বা এমন কোনো অঙ্গ বাদ দেয়া হয় যে অঙ্গ ছাড়া প্রাণী বাঁচে না, এমন ছবি কোনো সমস্যা নেই।²
আল্লামা মানসুর বাহুতি আরো বলেন: ছবি থেকে এমন কিছু বাদ দেয়া হল যেটি ছাড়া প্রাণী বেঁচে থকতে পারে না, যেমন মাথা, বক্ষ, পেট ইত্যাদি। অথবা মাথা, বক্ষ বা পেট এগুলো ছাড়াই ছবি আঁকা হল। অথবা মাথাটি দেহ থেকে বিচ্ছিন্নভাবে আঁকা হল। অথবা দেহ ছাড়া শুধু মাথা আঁকা হল। এসব নিষিদ্ধ ছবির আওতায় পড়ে না।³
উপরোক্ত বক্তব্যগুলো থেকে আরো কিছু বিষয় বুঝে আসে :
১। ফেইসবুক স্টিকারগুলোতে বাস্তব চেহারার কোনো নিদর্শন নেই। যেমন দুচোখ, মুখ ও নাক নেই। নেই মাথা, দু কান। আলেমগণের মধ্যে অনেকে বলেছেন, ছবি যদি এমন ছোট হয় যে, গভীরভাবে লক্ষ না করলে দর্শকের চোখে পড়ে না, তবে কোনো সমস্যা নেই।⁴
২। যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে যেসব স্টিকার ব্যবহার করা হয়, এগুলো নিষিদ্ধ ছবির সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে না। তাছাড়া এগুলোকে খুব স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার করা হয়। (যাতে সম্মানের কোনো বিষয় যুক্ত নেই।) ছবির এ ধরণের ব্যবহার এবং দেখা মুবাহ, বৈধ।
৩। এসব স্টিকার অবাস্তব ও কাল্পনিক।

টিকাঃ
1. আল মুগনী শরহুল মুখতাসারিল খিরাকী, ইবনু কুদামা মাকদিসী: ৭/২৮২।
1. সহীহ ইবনে হিব্বান: ৫৮৪৩।
2. সহীহ মুসলিম: ৫৮৪৩।
3. ফাতহুল বারী: ১০/৩৯০।
4. আত তাহরীর লি ঈদহি মাআনিত তাইসীর, সানআনি: ৪/৬৫০।
1. আত তানবীর শরহুল জামিয়িস সগীর: ৭/৭৪।
1. আল মুগনী: ৭/২৮২।
2. শরহু মুনতাহাল ইরাদাত: ৩/৩৫।
3. কাশাফুল কানা' আন মাতনিল ইকনা': ৫/১৭১।
4. ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া, লাজনাতু মিন উলামাইল আহনাফ: ১/১০৭।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00