📄 সত্য প্রকাশের জন্য তর্কবিতর্ক করা
এক্ষেত্রে শর্ত হচ্ছে জেনেশুনে তর্কে যেতে হবে। যে বিষয়ে বিতর্ক করবে ওই বিষয়ে পূর্ণ জ্ঞান থাকা জরুরি। সুতরাং বিতর্ক যদি ইলম ও পূর্ণ ব্যুৎপত্তি সহকারে হয়, তাহলে সেটি প্রশংসা যোগ্য। আর যদি নিজের অজ্ঞতা নিয়েই কেউ তর্কে জড়িয়ে পড়ে, অর্থাৎ ধর্মীয় যে বিষয়টি নিয়ে সে অপরের সাথে তর্ক করছে নিজেই বিষয়টি ভালোভাবে জানে না, একাজটি অত্যন্ত নিন্দাজনক।
আল্লাহ তায়ালা নূহ আলাইহিস সালাম সম্পর্কে বলেন :
قَالُوا يُنُوحُ قَدْ جَدَلْتَنَا فَأَكْثَرْتَ جِدَا لَنَا ....
তারা বলল, হে নূহ, তুমি আমাদের সাথে বাদানুবাদ করছ এবং আমাদের সাথে অতি মাত্রায় বিবাদ করছ....³
রাযি রাহিমাহুল্লাহ বলেন : এ আয়াত থেকে বুঝা যায়, তিনি তাদের সাথে খুব তর্কবিতর্ক করেছিলেন। যা প্রমাণ করে, হকের দলিল সুদৃঢ় করা এবং সন্দেহ-সংশয় দূর করা নবিদের মিশন ছিল।¹
কুরতুবি রাহিমাহুল্লাহ বলেন : فَأَكْثَرْتَ جِدَا لَنَا এটিকে ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু পড়েছেন فَأَكْثَرْتَ جَدَ لَنَا । নাহহাস উল্লেখ করেছেন, দ্বীনের জন্য বিতর্ক করা প্রশংসনীয়। একারণেই নূহ আলাইহিস সালাম এবং অন্যান্য নবিগণ তাঁদের আপন আপন কওমের সঙ্গে তর্কবিতর্ক করেছেন। যাবত না সত্যের বিজয় হয়েছে। ফলে যে ব্যক্তি সত্যকে কবুল করে নিয়েছে সে সফল এবং কামিয়াব হয়েছে। যে সত্যকে প্রত্যাখ্যান করেছে, সে হয়েছে ব্যর্থ এবং বিফল। আর মিথ্যাকে বিজয়ী করার জন্য যে তর্কে জড়ায়, নিঃসন্দেহে সে নিন্দিত। ইহকাল এবং পরকাল উভয় জগতেই সে তিরস্কারের পাত্র।²
ফেইসবুকের এ বিতর্ক অবশ্যই কুরআনের নির্দেশনা মোতাবেক হওয়া উচিত।
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন :
أدْعُ إِلى سَبِيْلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ
তুমি তোমার রবের পথে হিকমত ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে আহ্বান কর এবং সুন্দরতম پন্থায় তাদের সাথে বিতর্ক কর।³
কেননা এ বিতর্কের উদ্দেশ্য হচ্ছে ব্যক্তিকে সত্য এবং কল্যাণের পথ খুঁজে নিতে সহায়তা করা। তাই একাজ যেন ইখলাসের সাথে হয়, একান্তই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হয়, সেদিকে লক্ষ রাখা জরুরি।
'সুন্দরতম পন্থায় তাদের সাথে বিতর্ক কর' আয়াতের এ অংশের ব্যাখ্যায় চারটি পন্থার কথা আলোচনা করা হয়:
এক, ক্ষমার পন্থা অবলম্বন করা।
দুই, মানুষের সঙ্গে হৃদয়ের ভাষায় কথা বলা, কাউকে বোকা বানানোর চেষ্টা না করা।
তিন, মানুষকে সরল পথ প্রদর্শন করা, পূর্ববর্তীদের গালমন্দ করা থেকে বিরত থাকা।
চার, মানুষের ধারণ ক্ষমতা বুঝে কথা বলা।¹
ফেইসবুকে বিতর্ক করার ক্ষেত্রে এ বিষয়গুলোর প্রতি খেয়াল রাখুন, বরং নিজের ওপর আবশ্যক করে নিন। আল্লাহ তায়ালা আপনার প্রতি রহম করুন।
টিকাঃ
3. সূরা নূহ, আয়াত: ৩২।
1. মাফাতীহুল গাইব. রাযী: ১৭/৩৪১।
2. আল জামি' লি আহকামিল কুরআন: ৯/২৮।
3. সূরা নাহল, আয়াত: ১২৫।
1. আন নুকাত ওয়াল উয়ূন, মাওয়ারদী: ৩/২২০।
📄 বিরোধিতার ক্ষেত্রে রাগ প্রকাশ করা
কোনো মন্দ পোস্টের বিরোধিতার ক্ষেত্রে কখনো ক্রুদ্ধ হওয়া মুস্তাহাব। এতে প্রকারান্তরে যার ওপর রাগ করা হয়, তার ওপর ইহসান ও অনুগ্রহ করা হয়ে থাকে। কেননা এর মাধ্যমে তাকে গর্হিত কাজ থেকে নিবৃত্ত করা হয়। তাকে অন্ধকার থেকে বের করে আনার চেষ্টা করা হয়।
একবার একজন আনসারি সাহাবি এক ইহুদীকে বলতে শুনলেন, 'না, সে সত্তার কসম, যে মূসা আলাইহিস সালামকে মানব জাতির উপর মর্যাদা দান করেছেন...।' এ কথা শুনে তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন। তার মুখের উপর এক চড় বসিয়ে দিলেন। আর বললেন, তুমি বলছ, সেই সত্তার কসম, যিনি মূসাকে মানব জাতির উপর মর্যাদা দান করেছেন, অথচ নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মাঝে অবস্থান করছেন। তখন সে ইহুদী লোকটি নবিজির কাছে গেল এবং বলল, হে আবুল কাসিম! নিশ্চয়ই আমার জন্য নিরাপত্তা এবং অঙ্গীকার রয়েছে, আর্থাৎ আমি একজন যিম্মী। অমুক ব্যক্তি কী করণে আমার মুখের উপর চড় মারল? তখন নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন :
لِمَ لَطَمْتَ وَجْهَهُ ؟
কেন তুমি তাঁর মুখে চড় মারলে?
আনসারি লোকটি ঘটনা বর্ণনা করল। তখন নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাগান্বিত হলেন। এমনকি তাঁর চেহারায় তা দেখা গেল। অতঃপর তিনি বললেন :
لا تُفَضِّلُوا بَيْنَ أَنْبِيَاءِ اللَّهِ.
আল্লাহর নবিগণের মধ্যে কাউকে কারো উপর মর্যাদা দান করো না...।¹
ইবনু বাত্তাল রাহিমাহুল্লাহ বলেন : আল্লাহর হুকুমের ব্যাপারে কারো প্রতি ক্রুদ্ধ হওয়া এবং কঠোরতা করা সৎকাজের আদেশ অসৎকাজ থেকে বারণ করার মধ্যে গণ্য। তুমি কি লক্ষ কর না নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ক্রোধান্বিত হয়েছেন এবং তাঁর চেহারার রং পাল্টে গিয়েছে!²
টিকাঃ
¹. সহীহ বুখারী: ৩৪১৪, সহীহ মুসলিম: ২৩৭৩।
². শরহু সহীহ বুখারী, ইবনু বাত্তাল: ৯/২৯৪।
📄 বিরোধীদের গালমন্দ করা
প্রতিটি প্রেক্ষাপটের উপযুক্ত কিছু কথাবার্তা থাকে। সত্য পথের আহ্বায়ক এবং অন্যায় প্রতিরোধকারী ব্যক্তি দ্বীনের সম্মান রক্ষা, প্রতিপক্ষকে হেয় করা বা যেকোনো কল্যাণ চিন্তায় এসব বাক্য ব্যবহার করতে পারেন।
এক ব্যক্তি বলল, আমেরের আমল নিষ্ফল হয়েছে। একথা শুনে নбиজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, একথা যে বলেছে সে মিথ্যা বলেছে।*
উরওয়া ইবনু মাসউদ যখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে বলল, মানুষের মধ্যে আমি এক যুবককে দেখছি, সে যোগ্য লোক বটে, কিন্তু সে পালিয়ে যাচ্ছে এবং আবু বকর তোমাকেও সে সাথে নিয়ে যাচ্ছে। একথা শুনে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে বললেন, তুমি গিয়ে লাতের ভগাঙ্কুর চোষ।
হাফিয ইবনু হাজার রাহিমাহুল্লাহ বলেন: এ ঘটনা থেকে বুঝা যায়, শাসানোর উদ্দেশ্যে বিশ্রী কোনো শব্দ প্রয়োগ করা বৈধ। ওই ব্যক্তির ক্ষেত্রে, যার থেকে এমন কিছু প্রকাশ পেয়েছে যেকারণে সে তারই উপযুক্ত।' (যেমন কুকুর তেমন মুগুর!)¹
এসব কঠোরতা কেবল ভর্ৎসনা, ধমকি ও প্রতিরোধের জন্য। যেগুলোর ব্যবহার লাভ ক্ষতির হিসেব করেই করতে হবে। তবে এগুলো মুখলিস নাসিহ ও উপদেশদাতাদের স্বভাবে পরিণত হওয়া কিছুতেই কাম্য নয়।
টিকাঃ
*. সহীহ বুখারী: ৪১৯৬, সহীহ মুসলিম: ১৮০২।
1. ফাতহুল বারী: ৫/৩৪০।