📄 সংক্ষিপ্তভাবে নিন্দা জানান
আপনার কোনো বন্ধুর এমন কোনো ভুল যদি দৃষ্টিগোচর হয়, যা কিনা নিন্দনীয়, সেক্ষেত্রে তার সে কাজের নিন্দা করার সময় কথা দীর্ঘ করবেন না। বরং সংক্ষিপ্ত করুন। কেননা সংক্ষিপ্তরূপে নিন্দা জানানো আম্বিয়া আলাইহিস সালামদের রীতি ছিল। আল্লাহ তায়ালা ইউসুফ আলাইহিস সালামের ঘটনা বর্ণনায় বলেন :
قَالَ هَلْ عَلِمْتُمْ مَّا فَعَلْتُمْ بِيُوسُفَ وَأَخِيهِ ...
সে বলল, তোমাদের জানা আছে কি, ইউসুফ ও তার ভাইয়ের সঙ্গে তোমরা কিরূপ আচরণ করেছিলে...?³
কুরতুবি রাহিমাহুল্লাহ বলেন: আয়াতে এ জিজ্ঞাসার উদ্দেশ্য হচ্ছে স্মরণ করিয়ে দেওয়া এবং তিরস্কার করা।¹
যামাখশারী রাহিমাহুল্লাহ বলেন: ইউসুফ আলাইহিস সালাম তাদের সম্মুখে দ্বীনী জযবা নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন সহনশীল, আল্লাহ তায়ালার পক্ষ হতে বিশেষভাবে তাওফিক প্রাপ্ত। ফলে তাদেরকে তিনি কথাটি জিজ্ঞেস করেছেন তাদের অতীত কর্মের কদর্যতা তাদের সামনে স্পষ্ট করে তোলার জন্যে। যে বিষয়টি একজন অনুতপ্ত মানুষের জন্য লক্ষ করা খুব জরুরি। তাই তিনি বলেছেন, তোমরা কি জান, ইউসুফ ও তার ভাইয়ের সাথে কৃত তোমাদের সে কাজের কদর্যতা সম্পর্কে? যখন তোমরা ছিলে অজ্ঞ। জানতে না তোমাদের সে কর্মের জঘন্যতা সম্পর্কে।²
শরফুদ্দীন তীবি রাহিমাহুল্লাহ বলেন: 'যখন তোমরা অজ্ঞ ছিলে' এ কথাটি তাদের প্রতি ইউসুফ আলাইহিস সালামের দয়ার বহিঃপ্রকাশ। যেন নিজের থেকেই তাদের ওযর তুলে ধরলেন। কেননা না জেনে কোনো মন্দকাজ করে ফেলার অপরাধটা জেনেশুনে করার অপরাধের চেয়ে ছোট।³
আল্লাহ তায়ালা আমাদের নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে বলেন:
وَإِذْ أَسَرَّ النَّبِيُّ إِلَى بَعْضِ أَزْوَاجِهِ حَدِيثًا فَلَمَّا نَبَّأَتْ بِهِ وَأَظْهَرَهُ اللَّهُ عَلَيْهِ عَرَّفَ بَعْضَةً وَأَعْرَضَ عَنْ بَعْضٍ
আর যখন নবি তার একজন স্ত্রীকে গোপনে কথা বলেছিলেন, অতঃপর যখন সে স্ত্রী অন্যকে তা জানিয়ে দিল এবং আল্লাহ তার (নবির) কাছে এটি প্রকাশ করে দিলেন, তখন নবি কিছুটা তার স্ত্রীকে অবহিত করল আর কিছু এড়িয়ে গেল।¹
অর্থাৎ, নবিজি তাঁর স্ত্রী হাফসা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে গোপনে একটি কথা বলেছিলেন। তিনি সেটি আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বলে ফেলেন। ফলে আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবিকে তাঁর কথা ফাঁস করে দেওয়ার বিষয়টি অবগত করলেন। তখন নবিজি এর কিছু অংশ জানালেন আর কিছু অংশ তার পক্ষ হতে দয়া স্বরূপ গোপন রাখলেন।
কুরতুবী রাহিমাহুল্লাহ বলেন: 'নবি কিছুটা তার স্ত্রীকে অবহিত করল আর কিছু এড়িয়ে গেল' এর অর্থ হচ্ছে, তাঁর কাছে ওয়াহী মারফত যে বার্তা এসেছে এর কিছু তিনি হাফসাকে জানালেন, আর কিছু তাঁর উদারতার ফলে তিনি এড়িয়ে গেলেন। সুদ্দী রাহিমাহুল্লাহ এ ব্যাখ্যা করেছেন। আর হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, উদার মনের ব্যক্তি কখনো এসব বিষয় অনুসন্ধান এবং খতিয়ে দেখতে যান না।²
টিকাঃ
3. সূরা ইউসূফ, আয়াত: ৮৯।
1. আল জামি' লি আহকামিল কুরআন, কুরতুবি: ৯/২৫৫।
2. আল কাশশাফ, সংযুক্ত ব্যাখ্যাগ্রন্থ ফুতুহুল গাইব ফিল কাশফি আন কানাইর রাইব সহ, যামাখশারী: ২/৫০০।
3. ফুতুহুল গাইব ফিল কাশফি আন কানাইর রাইব, শরফুদ্দীন তীবি: ২/৫০০।
1. সূরা তাহরীম, আয়াত: ৩।
2. আল জামি' লি আহকামিল কুরআন, কুরতুবি: ১৮/১৮৭।
📄 মানুষের ওযর মেনে নিন
ওযর স্বীকার ও গ্রহণ মানুষের প্রতি অনুগ্রহ স্বরূপ। এতে তাদের বুদ্ধিমত্তা বাড়বে। তারা দ্বীনের প্রতি উদ্বুদ্ধ হবে।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
لا شَخْصَ أَحَبُّ إِلَيْهِ الْعُذْرُ مِنَ اللَّهِ
আল্লাহর চাইতে অধিকতর ওযর (স্থাপন) পছন্দকারী কেউ নেই।³ অর্থাৎ, আল্লাহ তায়ালা অপেক্ষা আর কারো নিকট ওযর গ্রহণ বেশি প্রিয় নয়। ওযর গ্রহণের অর্থ হচ্ছে অভিযোগ থেকে অব্যহতি দেওয়া, ক্ষমা করে দেওয়া এবং শাস্তি দেওয়ার পূর্বে সতর্ক করা। এ জন্যই আল্লাহ তায়ালা রাসুলদের প্রেরণ করেছেন।¹
টিকাঃ
3. সহীহ বুখারী: ৭৪১৬, সহীহ মুসলিম: ১৪৯৯।
1. তা'লীকুশ শাইখ মুহাম্মাদ ফুআদ আবদুল বাকী আলা সহীহ মুসলিম: ২/১১৩৬।
📄 মানুষের কাছে কৈফিয়ত দেওয়া এবং তাদের ওযর গ্রহণ
হারুন আলাইহিস সালাম তার ভাই মূসা আলাইহিস সালামের কাছে কৈফিয়তের ঘটনার বর্ণনায় আল্লাহ তায়ালা বলেন :
قَالَ ابْنَ أُمَّ إِنَّ الْقَوْمَ اسْتَضْعَفُونِي وَكَادُوا يَقْتُلُونَنِي فَلَا تُشْمِتْ بِي الْأَعْدَاءَ وَلَا تَجْعَلْنِي مَعَ الْقَوْمِ الظَّلِمِينَ
সে বলল, হে আমার মায়ের পুত্র, এ জাতি আমাকে দুর্বল মনে করেছে এবং আমাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছে, তাই তুমি আমার ব্যাপারে শত্রুদের আনন্দিত করো না এবং আমাকে যালিম কওমের অন্তর্ভুক্ত করো না।²
অর্থাৎ, হে আমার মায়ের পুত্র, আমাকে তিরস্কার, ভর্ৎসনা এবং আমার প্রতি দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগ উত্থাপনে তাড়াহুড়া করো না। কেননা আমি তাদের বিরোধিতা করেছি। তাদের বুঝিয়েছি। কিন্তু জাতি আমাকে একা পেয়ে দুর্বল মনে করেছে। আমার কথার প্রতি তারা কোনো ভ্রূক্ষেপই করেনি। বরং তারা আমাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছে। হে আমার ভাই, আমার সঙ্গে এমন কোনো আচরণ করো না যাতে শত্রুদের আশা-আকাংখাই বাস্তবায়িত হয়। আমি লাঞ্ছিত ও অপমানিত হই-তারা তো এটিই চায়।
ভাই তাঁর কাছে ওযর পেশ এবং শান্ত হওয়ার আহ্বান করলে মূসা আলাইহিস সালাম তাঁর ওযর মেনে নিলেন। আর বললেন:
رَبِّ اغْفِرْ لِي وَلِأَخِي وَأَدْخِلْنَا فِي رَحْمَتِكَ وَأَنْتَ أَرْحَمُ الرَّحِيمِينَ
আমার রব! ক্ষমা করুন আমাকে ও আমার ভাইকে এবং আপনার রহমতে আমাদের প্রবেশ করান। আর আপনিই রহমকারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ।
অর্থাৎ মূসা আলাইহিস সালাম বলেছেন, হে আমার রব! কথা ও কাজে ভাইয়ের প্রতি আমার যে কঠোর ও রূঢ় আচরণ প্রকাশ পেয়েছে তা ক্ষমা করে দিন। আর আমার স্থলাভিষিক্ত অবস্থায় আমার ভাইয়ের থেকে যে ত্রুটি হয়ে গেছে তাও মাফ করে দিন।¹
সুতরাং যদি ফেইসবুকে কারো সাথে অসংযত কিছু হয়ে যায়, তার কাছে ওযর পেশ করুন। আর যার নিকট ওযর পেশ করা হয় তারও উচিত ওযর গ্রহণ করে নেওয়া।
টিকাঃ
2. সূরা আ'রাফ, আয়াত: ১৫০।
1. আত তাফসীরুল মুনীর, যুহাইলী; ৯/১০২।
📄 অনিষ্টকারীর রূঢ়তা ক্ষমা করে দিন
আল্লাহ তায়ালা বলেন :
وَ لَمَنْ صَبَرَ وَ غَفَرَ إِنَّ ذَلِكَ لَمِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ
আর যে ধৈর্যধারণ করে এবং ক্ষমা করে, তা নিশ্চয় দৃঢ়সংকল্পেরই কাজ।²
এ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলছেন, যার প্রতি অসদাচার সত্বেও ধৈর্য ধারণ করল, অপরাধীকে ক্ষমা করে দিল এবং প্রতিশোধ নেওয়ার শক্তি থাকা সত্বেও আল্লাহর সন্তুষ্টি ও মহা প্রতিদানের আশায় প্রতিশোধ নেওয়া থেকে বিরত থাকল, তার এ সবর ও ক্ষমা দৃঢ়সংকল্পের কাজ। যে দৃঢ়সংকল্পের দিকে আল্লাহর প্রিয় বান্দারা অগ্রসর হয়। যে কাজের জন্য তারা শপথ গ্রহণ করে।*
এক ব্যক্তি নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে পাওনার জন্য তাগাদা দিতে এসে রূঢ় ভাষায় কথা বলতে লাগল। এতে সাহাবিগণ তাকে শায়েস্তা করতে উদ্যত হলেন। তখন আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন :
دَعُوهُ فَإِنَّ لِصَاحِبِ الْحَقِّ مَقَالًا
তাকে ছেড়ে দাও। কেননা পাওনাদারদের কড়া কথা বলার অধিকার রয়েছে।¹
তারপর তিনি বললেন:
أَعْطُوْهُ سِنَّا مِثْلَ سِنَّهِ .
তার উটের সমবয়সী একটি উট তাকে দিয়ে দাও।
তাঁরা বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! এমন উট নেই। এর চেয়ে উত্তম উট রয়েছে। তিনি বললেন:
أَعْطُوْهُ، فَإِنَّ مِنْ خَيْرِكُمْ أَحْسَنَكُمْ قَضَاءٌ.
তাই দিয়ে দাও। তোমাদের মাঝে সেই সর্বোৎকৃষ্ট, যে ঋণ পরিশোধের বেলায় উত্তম।¹
ক্বাসতাল্লানী রাহিমাহুল্লাহ বলেন: এটি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উত্তম চরিত্র এবং দয়ার বহিঃপ্রকাশ। রূঢ় আচরণকারীদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহন করার শক্তি থাকা সত্ত্বেও সবর করার অপার ক্ষমতার উদাহরণ।²
টিকাঃ
2. সূরা শূরা, আয়াত: ৪৩।
* জামিউল বায়ান ফি তাওয়ীলিল কুরআন, তবারী: ২১/১০২।
1. সহীহ বুখারী: ২৩০৬, সহীহ মুসলিম: ১৬০১।
2. ইরশাদুস সারী লি শারহি সহীহিল বুখারী, ক্লাসতাল্লানী : ৪/১৫৯।