📄 গুজব রটাবেন না
মুসলমানদের যবান এবং কলম এমন কথা প্রচার করা থেকে হিফাযত করা জরুরি, যাতে কোনো উপকার নেই। অথবা তাতে নিজের বা অন্য কারো ক্ষতি আছে। সত্যাসত্য যাচাই না করে এসব গুজব ছড়ানো মুনাফিকদের কাজ। তারা মানুষকে ভয়ভীতি দেখানোর জন্য এসব করে থাকে।
আল্লাহ তায়ালা মুনাফিকদের ব্যাপারে বলেন :
لَوْ خَرَجُوا فِيكُمْ مَّا زَادُوكُمْ إِلَّا خَبَالًا وَلَا أَوْضَعُوا خِللَكُمْ يَبْغُونَكُمُ الْفِتْنَةَ وَ فِيكُمْ سَمْعُوْنَ لَهُمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِالظَّلِمِينَ
যদি তারা তোমাদের সাথে বের হত, তবে তোমাদের মধ্যে ফাসাদই বৃদ্ধি করত এবং তোমাদের মাঝে ছুটোছুটি করত, তোমাদের মধ্যে ফিতনা সৃষ্টির জন্য। আর তোমাদের মধ্যে রয়েছে তাদের কথা অধিক শ্রবণকারী, আর আল্লাহ যালিমদের সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞাত।¹
হে মুমিনগণ! যদি এসব মুনাফিকরা, যাদের জিহাদে না যাবার অনুমতি দেয়া হয়েছে, তারা তোমাদের সঙ্গে গেলে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে গণ্ডগোল সৃষ্টি করত। কাজে বিশৃংখলা তৈরি করত। হীনমন্যতা ছড়িয়ে দিতো মুজাহিদদের মাঝে। ব্যবস্থাপনায় ফেসাদ করত। কুৎসা রটাতো তোমাদের মাঝে। ছড়িয়ে দিতো বিচ্ছিন্নতার বিষবাষ্প। পরিশেষে তোমাদের সন্দিহান, হতোদ্যম এবং ভীত করে ছাড়ত। তোমাদের মধ্যে কিছু লোক আছে, যাদের ঈমান দুর্বল। যাদের নেই দৃঢ় সঙ্কল্প। বিবেকবুদ্ধিও যাদের কম। তারা মুনাফিকদের কথাই বেশি শোনে। কেননা মনের সন্দেহ তাদের ওদিকেই ঠেলে দেয়।²
সিদ্ধান্তহীন মানুষ মুজাহিদ বাহিনীর ভেতর দুর্বলতা ও অপারগতার মনোভাব সৃষ্টি করে। আর বিশ্বাসঘাতক বাহিনীর জন্য বিপজ্জনক। সুতরাং ফেইসবুক পেইজগুলোতে যেসব মেম্বারদের চিত্ত দুর্বল, তাদের কী অবস্থা?! আল্লাহ হিফাযত করুন।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
إِنَّ الْعَبْدَ لَيَتَكَلَّمُ بِالْكَلِمَةِ ، مَا يَتَبَيَّنُ فِيْهَا ، يَزِلُّ بِهَا فِي النَّارِ أَبْعَدَ مِمَّا بَيْنَ الْمَشْرِقِ.
নিশ্চয় বান্দা পরিণাম চিন্তা ছাড়াই এমন কথা বলে যে কথার কারণে সে প্রবেশ করবে জাহান্নামের এমন গভীরে যার দূরত্ব পূর্ব (পশ্চিম) এর দূরত্বের চেয়েও বেশি।¹
কোনো সংবাদ যদি এমন হয়, যাতে مسلمانوں জন্য ঝুঁকি আছে বা যে বিষয়ে مسلمانوں প্রতিকার প্রয়োজন, সেক্ষেত্রে ফেইসবুক পোস্ট করে প্রতিকারের কোনো ক্ষমতা রাখে না এমন মানুষদের মাঝে সংবাদটি ছড়িয়ে দেয়া, এটা প্রতিকারের পদ্ধতি হতে পারে না। এক্ষেত্রে উলামা অথবা দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গের শরণাপন্ন হতে হবে। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেছেন :
وَإِذَا جَاءَهُمْ أَمْرٌ مِّنَ الْأَمْنِ أَوِ الْخَوْفِ أَذَاعُوا بِهِ وَلَوْ رَدُّوهُ إِلَى الرَّسُوْلِ وَإِلَى أُولِي الْأَمْرِ مِنْهُمْ لَعَلِمَهُ الَّذِينَ يَسْتَنبِطُوْنَهُ مِنْهُمْ .....
আর যখন তাদের কাছে শান্তি কিংবা ভীতিজনক কোন বিষয় আসে, তখন তারা তা প্রচার করে। আর যদি তারা সেটি রাসুলের কাছে এবং তাদের কর্তৃত্বের অধিকারীদের কাছে পৌঁছে দিত, তাহলে অবশ্যই তাদের মধ্যে যারা তা উদ্ভাবন করে তারা তা জানত।
আল্লামা মুহাম্মাদ রাশীদ রিদা রাহিমাহুল্লাহ বলেন: এ আয়াতটি মুনাফিকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। তারা মুসলমানদের আশা অথবা ভীতির কোনো সংবাদ, যা দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গকে জানানো উচিত, সেগুলো প্রচার করে বেড়াতো।¹
রাশীদ রিদা রাহিমাহুল্লাহ অন্য এক জায়গায় বলেন: সুতরাং স্পষ্ট হয়ে গেল যে, আম বিষয়াশয়গুলো দেখভাল করবেন দায়িত্বশীল ব্যক্তিগণ। যেমন জাতীয় নিরাপত্তা এবং সঙ্কটের বিষয়। এ বিষয়গুলোতে সাধারণ মানুষের নাক গলানো কাম্য নয়। বরং তাদের দায়িত্ব হল এ বিষয়গুলো রাসুলের নিকট বা দায়িত্বশীলদের নিকট সোপর্দ করে দেওয়া। কারণ দায়িত্বশীলদের মধ্যে কেউ হয়তো মুজতাহিদ হবেন এবং অন্যদের সে বিষয়টি বোঝাতে সক্ষম হবেন।*
এ বিষয়ে রাশীদ রিদা রাহিমাহুল্লাহ এর আরেকটি সুন্দর আলোচনা আছে, আলোচনাটি এখানে উল্লেখ করছি। আল্লাহ তায়ালা হয়ত এর দ্বারা আমাদের উপকৃত করবেন। তিনি বলেন, আর যে ব্যক্তি মানুষের অবস্থা সম্পর্কে জ্ঞান রাখে সে জানে, জাতীয় নিরাপত্তা এবং সঙ্কটের বিষয় প্রচার করা শুধুমাত্র মুনাফিকদের অভ্যাস নয়, বরং এ কাজে অধিকাংশ মানুষ জড়িয়ে পড়ে। তবে তাদের নিয়তের ভিন্নতা থাকে। মুনাফিকরা এ কাজ করে মুসলমানদের ক্ষতি করার লক্ষ্যে। আর যাদের ঈমান দুর্বল, তারা এ কাজ করে সন্দেহের ভিত্তিতে। তাদের ধারণা সঠিক কিনা, যাচাই করার জন্য। এ দুই শ্রেণি ছাড়া বাকিদের মধ্যে অধিকাংশ লোক একাজ করে অতি উৎসাহের বশবর্তী হয়ে। ওই সংবাদটির গূঢ় রহস্য সম্পর্কে জানার আগ্রহ থেকে। অথবা অচিরেই তারা কিসের সম্মুখীন হতে যাচ্ছে, সে ঔৎসুক্য থেকে।
তাই রাজনীতি, যুদ্ধ-সন্ধি, নিরাপত্তা ও সঙ্কট ইত্যাদি বিষয়ে সাধারণ লোকদের জড়ানো অত্যন্ত ক্ষতিকর, যখন এসবে জড়ানোর ফলে তারা নির্লিপ্ত ও নিরুৎসাহী হয়ে পড়ে। আরো বেশি ক্ষতির কারণ হবে যদি তারা রাষ্ট্রের গোপন তথ্য জেনে ফাঁস করে দেয়। এসব মানুষ তাদের জানা বিষয়গুলো গোপন রাখতে পারে না। তারা যা বলে ফিরছে, তার ক্ষতি সম্পর্কে কোনো জ্ঞানই নেই তাদের।¹
টিকাঃ
1. সূরা তাওবা, আয়াত: ৪৭।
2. তাফসীরুল মানার: ১০/৪০৮।
1. সহীহ বুখারী: ৬৪৭৭।
1. তাফসীরুল মানার: ১০/৪০৮।
* তাফসীরুল মানার: ৫/১৫৬।
1. তাফসীরুল মানার: ৫/২৪২।
📄 বৈধ পোস্ট সম্পর্কে কিছু সতর্কবার্তা
ফেইসবুকে অনেকে এমন কিছু পোস্ট করেন, যেগুলো জায়েয, কিন্তু সেগুলোর ব্যাপারেও কিছু সতর্কতা অবলম্বন জরুরি :
📄 দূআ সম্বলিত পোস্ট
এ ব্যাপারে দুটি কথা। প্রথম কথা হল, পোস্টদাতা দুআকে কখনো ইচ্ছার সাথে সম্পর্কিত করবে না। সুতরাং এভাবে বলবে না যে, আল্লাহ যদি চান তাকে ক্ষমা করে দিন, অথবা আল্লাহ চাইলে তাকে তাওফিক দান করুন। এমন পোস্ট ফেইসবুকে অহরহ চোখে পড়ে। অথচ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
إِذَا دَعَا أَحَدُكُمْ فَلَا يَقُلْ : اللَّهُمَّ اغْفِرْلِيْ إِنْ شِئْتَ، وَلَكِنْ لِيَعْزِمَ الْمَسْئَلَةَ وَلْيُعَظْمِ الرَّغْبَةَ ، فَإِنَّ اللَّهَ لَا يَتَعَاظَمَهُ شَيْءٌ أَعْطَاهُ.
তোমাদের কেউ যখন দুআ করে, সে যেন এ কথা না বলে, হে আল্লাহ! আপনি যদি চান আমাকে মাফ করুন। কিন্তু সে যেন দৃঢ়তার সাথে দুআ করে। সে যেন আগ্রহ নিয়ে দুআ করে। কেননা আল্লাহ তায়ালা তাকে যা দান করেন তা আল্লাহ তায়ালার কাছে তেমন কোন বিশাল জিনিস নয়।²
দ্বিতীয় কথা, যদি কারো জন্য সুস্থতা কিংবা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে দুআ করতে হয়, সেক্ষেত্রে চুপিসারে এবং বিনীতভাবে দুআ করাই বাঞ্ছনীয়। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
ادْعُوا رَبَّكُمْ تَضَرُّعًا وَخُفْيَةً إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ
তোমরা তোমাদের রবকে ডাক অনুনয় বিনয় করে ও চুপিসারে। নিশ্চয় তিনি পছন্দ করেন না সীমালংঘনকারীদেরকে।¹
'চুপিসারে' -এর অর্থ হচ্ছে মনে মনে। লৌকিকতা থেকে মুক্ত থাকার লক্ষ্যে। একারণেই আল্লাহ তায়ালা যাকারিয়া আলাইহিস সালামের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে তাঁর প্রশংসা করে বলেছেন:
إِذْ نَادَى رَبَّهُ نِدَاءً خَفِيَّان
যখন সে তার রবকে গোপনে ডেকেছিল।²
শরিয়তেও এ বিষয়টি স্বীকৃত, যে নেক আমল ফরয নয় তা যদি গোপনে করা হয়, তাতে অধিক প্রতিদান হাসিল করা যায়।³
হে আল্লাহর বান্দা! এখন কথা হচ্ছে, অভিযোগ তো জানাতে হবে তাঁর কাছে, যিনি গোপন কথাও শুনতে পান। যেমন আল্লাহ তায়ালা ইয়াকুব আলাহিস সালামের কথা উদ্ধৃত করে বলেছেন:
قَالَ إِنَّمَا أَشْكُوا بَثْى وَ حُزْنِي إِلَى اللَّهِ ....
সে বলল, আমি আল্লাহর কাছেই আমার দুঃখ বেদনার অভিযোগ জানাচ্ছি।⁴
সুতরাং মুসলমানদের সবরে জামীলের পন্থাকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরতে হবে। যাতে দুনিয়ার কারো প্রতি অভিযোগ অনুযোগ থাকবে না। আল্লাহর ফায়সালা ও বিচারের প্রতিই সন্তুষ্ট থাকবে। একমাত্র আল্লাহর কাছেই করবে সমস্ত অভিযোগ। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন:
قَدْ سَمِعَ اللهُ قَوْلَ الَّتِي تُجَادِلُكَ فِي زَوْجِهَا وَتَشْتَكِي إِلَى اللَّهِ وَاللَّهُ يَسْمَعُ تَحَاوُرَكُمَا إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ بَصِيرٌ
আল্লাহ অবশ্যই সে রমণীর কথা শুনছেন যে তার স্বামীর ব্যাপারে তোমার সাথে বাদানুবাদ করছিল আর আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করছিল। আল্লাহ তোমাদের কথোপকথন শোনেন। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।¹
কারণ সে রমণী যখন তার অভিযোগ একমাত্র আল্লাহর কাছেই উত্থাপন করেছে এবং তার দুঃখ-দুর্দশার ব্যাপারে আল্লাহ ছাড়া অন্য সবার থেকে নিরাশ হয়ে গিয়েছে, তখন আল্লাহ তায়ালা নাজিল করেছেন, আল্লাহ অবশ্যই সে রমণীর কথা শুনছেন...?²
টিকাঃ
2. সহীহ মুসলিম: ৬৭০৫।
1. সূরা আ'রাফ, আয়াত: ৫৫।
2. সূরা মারইয়াম, আয়াত: ৩।
3. * তাফসীরুল কুরতুবী: ৭/২২৩। এর কারণ ফরয আমল প্রকাশ্যে আদায় করা হচ্ছে মূল। আর নফল আমলের ক্ষেত্রে মূল হচ্ছে গোপনে আদায় করা। কেননা নফলের মধ্যে লৌকিকতা, দুনিয়ার মানুষের মাঝে প্রচারের মনোভাব তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। থাকে সঙ্গীদের - ওপর এ আমল নিয়ে গর্ববোধ করার আশংকা। আর স্বভাবতই নেককারদের প্রতি মানুষের হৃদয় আকৃষ্ট হয়ে থাকে। দেখুন, আহকামুল কুরআন, ইবনুল আরাবী মালিকী: ২/৩১৪।
4. সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৮৬।
1. সূরা মুজাদালা, আয়াত: ১।
2. লাতাইফুল ইশারাত: ৩/৫৪৮।
📄 অনির্ধারিত নিন্দা সম্বলিত পোস্ট
অনেক মানুষ, বিশেষ করে যুবকরা এমন কিছু পোস্ট করে যেগুলোতে নাম উল্লেখ না করে অনির্ধারিতভাবে অনেকের নিন্দা করা হয়। শরয়ি দৃষ্টিকোন থেকে এটি হারাম নয়। কারণ এখানে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হচ্ছে না। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে উম্মে যারআ এর প্রসিদ্ধ সে কথাগুলো শ্রবণ করে ছিলেন। তাতে কোনো কোনো মহিলার স্বামীদের নিন্দা করা হয়ে ছিলো।³
কিন্তু প্রয়োজন ছাড়া এসব বিষয় বর্জন করে দ্বীন ও দুনিয়ার জন্য মঙ্গলজনক কাজে মগ্ন হওয়াই শ্রেয়। কারণ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে উম্মে যারআর কথাগুলো শোনে নবিজির কেবল আয়িশার মন রক্ষাই উদ্দেশ্য ছিল। না হয় এ ধরণের কথাবার্তা নবিজির শ্রবণের কোনো প্রয়োজনই ছিল না। এটি নবিজির উত্তম সাহচর্যের মধ্যে পড়ে।¹
টিকাঃ
3. সহীহ বুখারী: ৫১৮৯, সহীহ মুসলিম: ২৪৪৮।
1. শাজারাতুল মাআরিফ ওয়াল আহওয়াল, ইয বিন আবদুস সালাম পৃ: ৩০৪।