📄 ফেইসবুকে মুসলমানদের যেসব পোস্ট করা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক
ফেইসবুকে যেসব পোস্ট করা থেকে অবশ্যই বিরত থাকবেন
📄 জ্ঞানী হওয়ার দাবি বা ভান করবেন না
বড় আফসোস লাগে, আজকাল ফেইসবুক পেইজগুলোতে এসব কী হচ্ছে! প্রাতিষ্ঠানিক বা সিলেবাস ভিত্তিক কোনো শিক্ষা ছাড়াই একেকজন ফেইসবুকে ফতোয়া দিতে শুরু করেছে। মনে হয় শরয়ি ইলমের ছাত্রদের নিয়তে জং পড়ে গেছে। সুনাম-সুখ্যাতির আসক্তি জেকে বসেছে তাদের হৃদয়ে। লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।
ইবনু হাযাম রাহিমাহুল্লাহ বলেন: জ্ঞান এবং জ্ঞানীদের জন্য জ্ঞানের পরিমণ্ডলে অনুপ্রবেশকারীদের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর আর কিছু নেই। কেননা এরা হয় মূর্খ। অথচ নিজেদেরকে জ্ঞানী মনে করে। ফলে বিশৃংখলা ছড়ায়। আর মনে মনে ভাবে, তারা সংশোধনের পথে হাঁটছে।¹
আল্লাহ তায়ালার ব্যাপারে আজগুবি কথাবার্তা প্রচার করা অনেক ফেইসবুক ব্যবহারকারীদের নিকট বেশ আনন্দের একটি বিষয় হয়ে উঠেছে। কেননা ফেইসবুক এখন জ্ঞানপাপীদের ভিড়ে জমজমাট। অথচ আল্লাহ তায়ালা তাঁর সম্পর্কে না জেনে কিছু বলাকে শিরকের মতো জঘন্য অপরাধ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَالْإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَأَنْ تُشْرِكُوا بِاللَّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلُ بِهِ سُلْطَنَا وَ أَنْ تَقُوْلُوْا عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ
বল, আমার রব তো হারাম করেছেন অশ্লীল কাজ, যা প্রকাশ পায় এবং যা গোপন থাকে, আর পাপ ও অন্যায়ভাবে সীমালংঘন এবং আল্লাহর সাথে তোমাদের শরীক করা, যে ব্যাপারে আল্লাহ কোনো প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি এবং আল্লাহ সম্পর্কে এমন কিছু বলা, যা তোমরা জান না।²
অর্থাৎ, শুদ্ধতা যাচাই ব্যতীত, প্রমাণ ছাড়া ইবাদাত, হালাল-হারাম সংক্রান্ত কোনো বিষয়ে কিছু বলা তিনি তোমাদের জন্য হারাম করেছেন।¹
আল্লাহ তায়ালার ব্যাপারে না জেনে কিছু বলার ক্ষেত্রে এটি ব্যাপক। অর্থাৎ, কুরআন এবং হাদিসের দলিল ছাড়া দ্বীনের মৌলিক বা শাখাগত কোনো বিষয়ে কথা বলা।
আল্লামা মুহাম্মাদ রাশীদ রিদা রাহিমাহুল্লাহ বলেন: যে ব্যক্তি এ আয়াতটি নিয়ে খুব ভালোকরে চিন্তা-ফিকির করবে, সে আল্লাহ ও রাসুলের পক্ষ হতে সুস্পষ্ট বক্তব্য ব্যতীত মানুষের জন্য কোনো কিছু হারাম বা হালাল সাব্যস্ত করা থেকে বিরত থাকবে। বরং সুস্পষ্ট প্রমাণ ছাড়া এ কথা বলা থেকেও বেঁচে থাকবে যে, এটা মুস্তাহাব, এটা মাকরূহ। শরিয়তের বিষয়ে দুঃসাহস প্রদর্শনের হারও কমে যাবে বহুলাংশে।²
ইলম ছাড়া হালাল-হারাম বিষয়ে কথা বলার অপরাধ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন:
وَلَا تَقُولُوا لِمَا تَصِفُ الْسِنَتُكُمُ الْكَذِبَ هَذَا حَلَلٌ وَ هُذَا حَرَامٌ لِتَفْتَرُوا عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ إِنَّ الَّذِينَ يَفْتَرُونَ عَلَى اللهِ الْكَذِبَ لَا يُفْلِحُوْنَ مَتَاعٌ قَلِيلٌ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
আর তোমাদের জিহ্বা দ্বারা বানানো মিথ্যার উপর নির্ভর করে বলো না যে, এটা হালাল এবং এটা হারাম, আল্লাহর উপর মিথ্যা রটানোর জন্য। নিশ্চয় যারা আল্লাহর উপর মিথ্যা রটায়, তারা সফল হবে না। সামান্য ভোগ এবং তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব।³
টিকাঃ
1. আল আখলাক্ব ওয়াস সিয়ার ফি মুদাওয়াতিন নুফুস, ইবনু হাযাম পৃ: ২৩।
2. সূরা আ'রাফ, আয়াত: ৩৩।
1. আত তাফসীরুল কুরআনিল কারীম, তানতাবী: ৫/২৬৭।
2. তাফসীরুল মানার: ৮/৩৫৫।
3. সূরা নাহল, আয়াত: ১১৬-১১৭।
📄 কৃত্রিমতা পরিহার করুন
এ বিষয়টিও ফেইসবুকের নীল আকাশে ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। ফলে দেখা যায়, অনেক ফেইসবুক ব্যবহারকারীরা বন্ধুদের কাছে এমন অনেক কিছু জাহির করছে, যা আসলে তাদের মাঝে নেই। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
المُتَشَبِّعُ بِمَا لَمْ يُعْطَ كَلَابِسِ ثَوْبَيْ زُوْرٍ.
যা তোমাকে দেয়া হয়নি, তা দেয়া হয়েছে বলা ঐরূপ প্রতারকের কাজ, যে প্রতারণার জন্য দুপ্রস্থ মিথ্যার পোশাক পরিধান করল।¹
কোনো নিয়ামত না পেয়েই পাওয়ার ভান করা প্রতারণার শামিল। মিথ্যা বাহাদুরি। আর মালিকানাধীন কিছু নিয়ে বাহাদুরি ও অহংকার করাই যেখানে নিষিদ্ধ, সেখানে মিথ্যা ঠাটবাট দেখানোর বিষয়ে আপনার কী অভিমত?!
টিকাঃ
1. সহীহ বুখারী: ৫২১৯।
📄 মুমিনদের অসম্মান করা এবং তাঁদের দোষ প্রচার করা থেকে বিরত থাকুন
আল্লাহ তায়ালা বলেন:
إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّونَ أَنْ تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِينَ آمَنُوا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ
নিশ্চয় যারা এটা পছন্দ করে যে, মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ুক, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব। আর আল্লাহ জানেন এবং তোমরা জান না।²
অর্থৎ, যারা মুমিনদের মাঝে মন্দ কথাবার্তা ছড়িয়ে দিতে এবং তাঁদের ওপর কলঙ্ক লেপন করতে পছন্দ করে, যাতে তাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।¹
কুশাইরি রাহিমাহুল্লাহ বলেন: এ ধরণের স্বভাবের লোকেরা সর্বাধিক নিন্দার উপযুক্ত। সবচে নিকৃষ্ট। এদের পাপের বোঝা হবে সবচেয়ে ভারি। কারণ তারা মুসলিম সমাজকে হেয় প্রতিপন্ন করে আত্মার প্রশান্তি খোঁজে বেড়াত। অথচ মুসলমানদের সমর্থন দেয়া, সহযোগিতা করা, দ্বীনের রাহবারদের সহায়তা করা এবং সমগ্র মুসলিম জাতির জন্য কল্যাণকামনা করা দ্বীনের রুকনসমূহের মধ্যে পড়ে। সুতরাং যারা মুসলমানদের মাঝে ফিতনা সৃষ্টির প্রয়াস চালায়, তারা নিকৃষ্ট প্রাণী। আল্লাহ তায়ালা তাদের ওপর কখনো সন্তুষ্ট নন। তাওহিদের অমিয় সুধা পানে আল্লাহ তায়ালা তাদের কখনো তাওফিক দেবেন না।²
কারো যদি কোনো মুসলিম ভাইয়ের দোষ-ত্রুটি দৃষ্টিগোচর হয়, তবে তার ওপর সেটি আড়াল করে রাখা আবশ্যক। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
مَنْ سَتَرَ مُسْلِماً سَتَرَهُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ.
যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের দোষ ঢেকে রাখবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার দোষ ঢেকে রাখবে।³
তিনি আরো বলেন:
لَا يَسْتُرُ عَبْدٌ عَبْدًا فِي الدُّنْيَا، إِلَّا سَتَرَهُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ.
১ কোন বান্দা যদি অপরের ত্রুটি-বিচ্যুতি দুনিয়াতে আড়াল করে রাখে আল্লাহ তায়ালা তার ত্রুটি-বিচ্যুতি কিয়ামত দিবসে আড়াল করে ২ রাখবেন।
টিকাঃ
2. সূরা নূর, আয়াত: ১৯।
1. আত তাফসীরুল ওয়াসীত, মুহাম্মাদ সাইয়্যিদ তানতাবী: ১০/১০০।
2. লাতাইফুল ইশারাত, আবদুল কারীম কুশাইরি: ২/৬০০।
3. সহীহ বুখারী: ২৪৪২।
4. সহীহ মুসলিম: ৬৪৮৯।