📄 লেখায় ইনসাফ করুন
আল্লাহ তায়ালা বলেন:
وَلْيَكْتُبْ بَيْنَكُمْ كَاتِبٌ بِالْعَدْلِ
তোমাদের মধ্যে একজন লেখক যেন ইনসাফের সাথে লিখে রাখে।¹
فَلْيُمْلِكُ وَلِيُّهُ بِالْعَدْلِ
তাহলে যেন তার অভিভাবক ন্যায়ের সাথে লেখার বিষয়বস্তু বলে দেয়।²
এ দুই আয়াতের ব্যাপকতা থেকে লেখাজোখার ক্ষেত্রে ইনসাফ, সততা ও ভারসাম্য বজায় রাখা আবশ্যক হওয়ার বিষয়টি বুঝে আসে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন :
فَوَيْلٌ لِلَّذِينَ يَكْتُبُونَ الْكِتَبَ بِأَيْدِيهِمْ ثُمَّ يَقُولُونَ هَذَا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ
সুতরাং ধ্বংস তাদের জন্য যারা নিজ হাতে কিতাব লিখে। তারপর বলে, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে।³
আল্লামা সা'দী রাহিমাহুল্লাহ তার তাফসীরে লিখেছেন: এ আয়াত প্রত্যেক ওই ব্যক্তিকে শামিল করবে, যে ইসলাম বিরোধী কিছু লিখলো, যেমন বই ইত্যাদি, তারপর সেটিকে ইসলামি শরিয়ত বলে চালিয়ে দিল। আবার সেটিকে ইসলামের পূর্ববর্তী মণীষীদের মতাদর্শ বলে আখ্যা দিল। মানুষ যাতে বিশ্বাস করে।⁴
আমি বলব, ফেইসবুকে তো এসব কাজ অহরহ হচ্ছে। সকাল-সন্ধ্যা এমন হাজারো কথা ভেসে বেড়াচ্ছে ফেইসবুক পাতায়। তাছাড়া কিছু মূর্খ লোক, ফেইসবুকে যাদের রয়েছে সরব পদচারণা, তারা ইমাম এবং উলামায়ে কেরামের মতাদর্শকে খাটো করে উপস্থাপন করতে সামান্যতম কুণ্ঠাবোধ করে না। ফুকাহাগণকে অপবাদ দেয় যে, তারা আল্লাহ ও রাসুলের সঠিক উদ্দেশ্য বুঝতে সক্ষম হননি। অথচ তাদের ইলমের সাথে ন্যূনতম সম্পর্ক নেই। তবে তারা যে বিষয়গুলো ভাল পারে তা হচ্ছে মিথ্যা রটানো, অপবাদ দেয়া। মানুষকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য ও অবজ্ঞা করা। এরা দ্বীনকে বিকৃত করার জন্য এবং যে বিষয়টি তারা বুঝে না সে বিষয়ে কথা বলার জন্য ফেইসবুক পেইজগুলোকে একেকটি বিস্তৃত ময়দান হিসেবে বেছে নিয়েছে।
কুরতুবী রাহিমাহুল্লাহ বলেন: এ আয়াতে শরিয়তে পরিবর্তন- পরিবর্ধন এবং কমবেশ করার বিষয়ে সাবধান করা হয়েছে। সুতরাং যে ব্যক্তি পরিবর্তন-পরিবর্ধন করবে, অথবা ইসলামে নতুন কিছু সংযোজন করবে যা ইসলামের অন্তর্গত নয় এবং যা ইসলামে জায়েয নেই তার জন্য রয়েছে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ হতে এই হুশিয়ারী এবং ভয়ানক শাস্তি।¹
এই সাবধানবাণী দুটি বিষয়কে শামিল করে। এক, মানুষকে পথভ্রষ্ট করার লক্ষ্যে কোন ভ্রান্ত বিষয় রচনা করা। দুই, কোন লেখাকে আল্লাহর পক্ষ হতে প্রেরিত বলে চালিয়ে দেয়া। এ উভয়টিই জঘন্যতম অপরাধ।²
টিকাঃ
1. সূরা বাকারা, আয়াত: ২৮২।
2. সূরা বাকারা, আয়াত: ২৮২।
3. সূরা বাকারা, আয়াত: ৭৯।
4. তাফসীরুল কারীমির রাহমান পৃ: ৫৬।
1. আল জামি' লি আহকামিল কুরআন, কুরতুবী: ২/৯।
2. আল লুবাব ফি উলূমিল কিতাব, ইবনু আদিল হাম্বলি : ২/২১০।
📄 সত্য বলুন
আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّدِقِينَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সাথে থাক।¹
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
إِنَّ الصِّدْقَ يَهْدِي إِلَى الْبِرِّ، وَإِنَّ الْبِرَّ يَهْدِي إِلَى الْجَنَّةِ، وَإِنَّ الرَّجُلَ لَيَصْدُقُ حَتَّى يُكْتَبَ صِدِّيقًا، وَإِنَّ الْكَذِبَ يَهْدِي إِلَى الْفُجُوْرِ، وَإِنَّ الْفُجُوْرَ يَهْدِي إِلَى النَّارِ ، وَإِنَّ الرَّجُلَ لَيَكْذِبُ حَتَّى يُكْتَبَ كَذَّابًا.
সততা সৎকর্মের দিকে পথপ্রদর্শন করে আর সৎকর্ম জান্নাতের পথপ্রদর্শন করে। নিশ্চয়ই কোন মানুষ সত্য কথা বলায় সত্যবাদী হিসেবে (তার নাম) লিপিবদ্ধ হয়। আর অসত্য পাপের পথপ্রদর্শন করে এবং পাপ জাহান্নামের দিকে পথপ্রদর্শন করে। নিশ্চয়ই কোন ব্যক্তি মিথ্যা বলতে অভ্যস্ত হয়ে গেলে পরিশেষে মিথ্যাবাদী হিসেবেই (তার নাম) লিপিবদ্ধ করা হয়।²
ফেইসবুক ব্যবহারকারীদের বড় একটি অংশ বিভিন্ন উদ্দেশ্যে ফেইসবুকে মিথ্যা বলে থাকে। লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ্-গুনাহ হতে বাঁচার এবং নেক কাজ করার কোন শক্তি নেই আল্লাহর তাওফীক ব্যতীত।
উল্লেখিত মিথ্যার মাঝে ফেইসবুকের ওসব পোস্টকৃত বিষয়াবলীও শামিল হবে, যেগুলোতে থাকে ঠাট্টা-বিদ্রুপ, মিথ্যা কৌতুক ও রসিকতা। অথবা অবাস্তব কোন কিছু। কেননা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
وَيْلٌ لِلَّذِي يُحَدِّثُ بِالْحَدِيْثِ لِيُضْحِكَ بِهِ الْقَوْمُ فَيَكْذِبُ، وَيْلٌ لَهُ وَيْلٌ لَهُ.
মানুষকে হাসানোর জন্য যে ব্যক্তি মিথ্যা বলে তার জন্য ধ্বংস, তার জন্য ধ্বংস, তার জন্য ধ্বংস।¹
মানুষ কি মহা ভ্রান্তির মাঝেই না জীবন কাটিয়ে দিচ্ছে, ক্রীড়া কৌতুককে গ্রহণ করছে পেশা হিসেবে। দিন-রাত এসব নিয়েই পড়ে থাকছে। নবিজির এ কথাটি একটু চিন্তা করে দেখুন 'তার জন্য ধ্বংস, তার জন্য ধ্বংস' একই কথা তিনি পুনরাবৃত্তি করেছেন। এটা করেছেন তার সুনিশ্চিত ধ্বংস বোঝাতে। সুতরাং এসবের সাথে যখন হাসানোর কসরতও যুক্ত হয়, যা অন্তরকে মৃতপ্রায় করে ফেলে, বিস্মৃতির রোগ সৃষ্টি করে এবং মানুষকে করে তোলে অস্থিরচিত্ত ও অমনোযোগী। এগুলোর মধ্যে প্রত্যেকটিই মনুষ্যত্বের পূর্ণাঙ্গ বিকাশের জন্য অন্তরায়।
টিকাঃ
¹. সূরা তাওবা, আয়াত: ১১৯।
². সহীহ মুসলিম: ৬৫৩১।
1. সুনানে আবু দাউদ: ৪৯৯০।
📄 কল্যাণের পথ নির্দেশ করুন
এটা আপনি করতে পারেন কোনো বই, উপকারী শিক্ষামূলক কোনো বিষয় ফেইসবুকে পোস্ট করার মাধ্যমে। গবেষক এবং শিক্ষানবিশদের সহায়তার মধ্য দিয়ে। হতে পারে আপনার এ সহযোগিতাটুকু কোনো গবেষকের জন্য সফলতার কারণ হবে, অথবা তার সামনে নতুন কোন দ্বার উন্মোচিত হয়ে যাবে। এতে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ হতে আপনিও পাবেন অফুরন্ত কল্যাণ।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
مَنْ دَعَا إِلَى هُدًى كَانَ لَهُ مِنَ الأَجْرِ مِثْلُ أُجُوْرِ مَنْ تَبِعَهُ ، لَا يَنْقُصُ ذَلِكَ مِنْ أُجُوْرِهِمْ شَيْئًا.
কেউ যদি হিদায়াতের পথে আহ্বান করে, তাহলে সে তার অনুসারীর সমপরিমাণ সাওয়াব পাবে, তবে অনুসরণকারীদের সাওয়াব থেকে মোটেও কম করা হবে না।²
নবিজি আরো বলেছেন:
مَنْ دَلَّ عَلَى خَيْرٍ فَلَهُ مِثْلُ أَجْرِ فَاعِلِهِ.
যে ব্যক্তি কোন ভাল কাজের পথপ্রদর্শন করে, তার জন্য সে কাজ সম্পাদনকারীর সমান সাওয়াব রয়েছে।¹
ইমাম নববি রাহিমাহুল্লাহ বলেন: এ হাদিসে কল্যাণের পথ নির্দেশ এবং সহায়তার ফযিলত বর্ণিত হয়েছে। তুলে ধরা হয়েছে শিক্ষক এবং যারা বিভিন্ন ইবাদত পালনের ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেন তাদের শ্রেষ্ঠত্বের কথা। আর 'কাজ সম্পাদনকারীর সমান সাওয়াব' দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, যে ব্যক্তি কোনো ভাল কাজের জন্য মানুষকে পথপ্রদর্শন করবে, মানুষ সে কাজটি করার ফলে সেও ওই কাজের একটি প্রতিদান পাবে, যেমন সে কাজের কর্তার জন্য প্রতিদান বরাদ্দ রয়েছে।²
জেনে রাখুন, আপনি মানুষকে যে কাজের পথনির্দেশ করছেন, পথ দেখাচ্ছেন, সে কাজটি যতটা মর্যাদাপূর্ণ, আপনার এই রাহনুমায়ী ও পথপ্রদর্শনের কাজটিও ঠিক তদ্রুপ মর্যাদার দাবীদার। সুতরাং শ্রেষ্ঠ কোনো বিষয়ে মানুষকে রাহনুমায়ী করা শ্রেষ্ঠতম কাজের অন্তর্ভুক্ত, এতে সন্দেহ কিসে! তেমনি জ্ঞানের পথনির্দেশ জ্ঞানের সমমর্যাদার হবে, এটিই তো স্বাভাবিক! তাই প্রিয় মুসলিম, আপনি ফেইসবুক পেইজের সাহায্যে আলোর দিশারী হোন। লুফে নিন শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট।
টিকাঃ
2. সহীহ মুসলিম: ২৬৭৪।
1. সহীহ মুসলিম: ৪৭৯৩।
2. আল মিনহাজ শরহু সহীহ মুসলিম বিন আল হাজ্জাজ : ১৩/৩৯।
📄 ভাল কাজের আদেশ এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করুন
উলামা এবং তলাবাদের মধ্য হতে একটি দলের ফেইসবুকে সরব পদচারণা প্রয়োজন। যারা মানুষকে কল্যাণের পথে আহ্বান করবে। ভাল কাজে উৎসাহ দেবে। গর্হিত কাজ হতে মানুষকে বিরত রাখবে। এ কাজগুলো ফেইসবুকে খুব বেশি বেশি করা প্রয়োজন। তাছাড়া বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে শরিয়তের সঠিক শিক্ষা, আদব ও শিষ্টাচারগুলো জোরালোভাবে জনসম্মুখে উপস্থাপন করা দরকার।
আল্লাহ তায়ালা বলেন:
وَلْتَكُنْ مِنْكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُوْنَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوْفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
আর যেন তোমাদের মধ্য থেকে এমন একটি দল হয়, যারা কল্যাণের প্রতি আহ্বান করবে, ভাল কাজের আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করবে। আর তারাই সফলকাম।¹
কুরতুবি রাহিমাহুল্লাহ এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন: এতে এই উম্মতের প্রশংসা করা হয়েছে এবং সাথে সাথে তাদের কর্তব্যের প্রতিও ইঙ্গিত করা হয়েছে। সুতরাং উম্মত যখন সংস্কারের পথ পরিহার করবে এবং অন্যায়ের সাথে আপোষ করবে, তখন তারা আর প্রশংসার যোগ্য বলে বিবেচিত হবে না। তাদের কপালে নিন্দার কালো দাগ পড়ে যাবে। আর সেটিই হবে তাদের ধ্বংসের কারণ।²
টিকাঃ
1. সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১০৪।
2. আল জামি' লি আহকামিল কুরআন, কুরতুবী: ৪/১৭৩।