📘 ফেইসবুক ক্ষতি নয় কল্যাণ বয়ে আনুক 📄 যেসব পেজ অথবা গ্রুপ বিয়ের উদ্দেশ্যে ছেলেমেয়েদের মাঝে পরিচয় করিয়ে দেয়, সেগুলোর বিধান

📄 যেসব পেজ অথবা গ্রুপ বিয়ের উদ্দেশ্যে ছেলেমেয়েদের মাঝে পরিচয় করিয়ে দেয়, সেগুলোর বিধান


ফেইসবুকে বিভিন্ন শিরোনামে এমন পেইজ ও গ্রুপ লক্ষ করা যায়, যেগুলো বিয়ের উদ্দেশ্যে ছেলেমেয়েদের পরস্পর পরিচিত হতে আহ্বান করে।

আমার নসিহত হল, এ বিষয়ে ইন্টারনেটের আশ্রয় নেয়া থেকে প্রত্যেক মুসলমান নারী-পুরুষের দূরে থাকা উচিত। এ ব্যাপারে খোঁজখবর নেয়া উচিত প্রত্যক্ষভাবে। এ বিষয়ে অনেক দলিল পাওয়া যায়। সাহাবায়ে কেরামদের অনেকে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর যুগে এমনটি করেছেন, নবিজি তাতে অস্বীকৃতি জানাননি।

হযরত সাহল ইবন সা'দ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, একদা এক মহিলা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসুল! আমি আমার জীবনকে আপনার জন্য দান করতে এসেছি। এরপর নবিজি তার দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করলেন। মহিলাটি যখন দেখল যে, নবিজি কোনো ফায়সালা দিচ্ছেন না, তখন সে বসে পড়ল। এমন সময় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাহাবিদের একজন বললেন, যদি আপনার কোনো প্রয়োজন না থাকে তবে ওই মহিলাটির সঙ্গে আমার শাদী দিয়ে দিন। তিনি বললেন :
هَلْ عِنْدَكَ مِنْ شَيْءٍ؟
তোমার কাছে কি কিছু আছে?
সে বলল, হে আল্লার রাসুল! আল্লাহর কসম, কিছুই নেই।
তিনি বললেন :
اذْهَبْ إِلَى أَهْلِكَ فَانظُرْ هَلْ تَجِدُ شَيْئًا ؟
তুমি তোমার পরিজনের কাছে ফিরে যাও এবং দেখ কিছু পাও কি-না?
এরপর লোকটি চলে গেল এবং ফিরে এসে বলল, আল্লাহর কসম, কিছু পেলাম না।
নবিজি বললেন :
انْظُرُ وَلَوْ خَاتَمَا مِنْ حَدِيدٍ.
দেখ, একটি লোহার আংটি হলেও!
এরপর লোকটি চলে গেল এবং ফিরে এসে বলল, একটি লোহার আংটিও পেলাম না; কিন্তু এই যে আমার তহবন্দ আছে।
সাহল রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, তার কোন চাদর ছিল না। অথচ সে বলল, আমার তহবন্দের অর্ধেক দিতে পারি।
একথা শুনে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন :
مَا تَصْنَعُ بِإِزَارِكَ ، إِنْ لَبِسْتَهُ لَمْ يَكُنْ عَلَيْهَا مِنْهُ شَيْءٌ، وَإِنْ لَبِسَتْهُ لَمْ يَكُنْ عَلَيْكَ شَيْءٌ.
এ তহবন্দ দিয়ে কী হবে? যদি তুমি পরিধান কর, তাহলে মহিলাটির কোন আবরণ থাকবে না। আর যদি সে পরিধান করে, তোমার কোন আবরণ থাকবে না।
লোকটি বসে পড়ল। অনেকক্ষণ বসে থকল। এরপর সে ওঠে দাঁড়াল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকটিকে ফিরে যেতে দেখে তাকে ডেকে আনলেন। যখন সে ফিরে আসল, নবিজি তাকে জিজ্ঞেস করলেন:
مَاذَا مَعَكَ مِنَ الْقُرْآنِ؟
তোমার কুরআনের কতটুকু মুখস্ত আছে?
সে উত্তরে বলল, অমুক অমুক সূরা মুখস্থ আছে। সে এমনিভাবে একে একে উল্লেখ করতে থাকল। তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন :
أَتَقْرَأَهُنَّ عَنْ ظَهْرِ قَلْبِكَ؟
তুমি কি এ সকল সূরা মুখস্ত তিলাওয়াত করতে পার?
সে উত্তর করল, হ্যাঁ।
তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন :
اذْهَبْ فَقَدْ مَلَّكْتُكَهَا بِمَا مَعَكَ مِنَ الْقُرْآنِ.
যাও, তুমি যে পরিমাণ কুরআন মুখস্থ রেখেছ, তার বিনিময়ে তোমার সঙ্গে এ মহিলাটির বিবাহ দিলাম।¹
হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু তার মেয়ে হাফসার স্বামী ইন্তেকালের পর তার জন্য উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে প্রস্তাব দেন। উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু ওজর পেশ করেন। এরপর আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে প্রস্তাব দিলে চুপ থাকেন তিনি। ফলে বিষয়টি তিনি নবিজির কাছে খুলে বলেন। নবিজি তাঁকে বলেন:
فَخَيْرٌ مِنْ ذَلِكَ، أَتَزَوَّجُ أَنَا حَفْصَةَ، وَأَتَزَوَّجُ عُثْمَانَ أُمَّ كُلْثُومٍ.
তার চেয়ে ভালো, হাফসাকে আমিই বিয়ে করি আর উসমানের কাছে বিয়ে দিয়ে দিই উম্মে কুলসুমকে।
ফলে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাফসা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বিয়ে করলেন। আর উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে বিয়ে দিলেন নবিজির নিজ কন্যা উম্মে কুলসুমকে।²
এ দুই হাদিস থেকে ইসলামে বিবাহের প্রস্তাব পদ্ধতি সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ছবি ফুটে ওঠে।
ফেইসবুক ও অন্যান্য মাধ্যমে প্রস্তাব প্রেরণ যদি প্রথাগত কোনো ওজর বা বয়স সম্পর্কিত কোনো জটিলতা নিরসনের জন্য হয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখতে হবে :
ওসব গ্রুপ বা পেইজ যদি আহলে ইলম উলামাদের তত্ত্বাবধানে খোলা হয়, তারা এডমিন থাকেন, অথবা ওগুলোকে যদি কোন সরকারি সংস্থা তত্ত্বাবধান করে, তাদের উদ্দেশ্যে হয় দুপক্ষের মাঝে পরিচয় করিয়ে দেয়া, সাথে নারী-পুরুষের বার্তা আদান প্রদানের ব্যাপারে থাকে শরয়ি নীতিমালা, তাছাড়া শরয়িভাবে নিষিদ্ধ কার্যকলাপ থেকে বেঁচে থাকা যদি সম্ভব হয়, সেক্ষেত্রে উভয় পক্ষ থেকে প্রস্তাব আদান প্রদান করা, তাদের মাঝে পরিচয় করিয়ে দেয়া জায়েয। তবে এক্ষেত্রে কেবল ছেলেমেয়ের সাধারণ গুণাবলী প্রচারের ওপরই ক্ষান্ত হবে। যাতে কোনো ফিতনা না হয়। যেমন, নাম, ঠিকানা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, গায়ের রঙ ও উচ্চতা, ইত্যাদি। যেহেতু বিবাহের প্রস্তাবকারী পুরুষ মহিলাকে দেখতে পারে, সেক্ষেত্রে গুণাবলী বর্ণনা করা বৈধ হবে বৈকি। তবে আভ্যন্তরীন কোনো বিষয় বর্ণনা করা থেকে বিরত থাকতে হবে। উল্লেখিত সব শর্ত মেনে যদি কেনো গ্রুপ অথবা পেইজ পরিচালনা করা সম্ভব হয়, তাহলে তাতে কোনো ক্ষতি নেই। বরং এটি কল্যাণ ও তাকওয়ার কাজে সহায়তা বলে গণ্য হবে। কিন্তু জেনে রাখা উচিত, ছেলেমেয়ে উভয়ের সম্মতি হলেই যথেষ্ট হবে না, বরং অভিভাবকের সম্মতি জরুরি। সম্বন্ধ তাদের মনপুত হলে মেনে নেবেন, আর না হয় না করে দেবেন।

কিন্তু যখন এসব গ্রুপ রসিকতার জন্য হবে, এডমিন হবে কোনো মূর্খ ব্যক্তি, সচরাচর যেমন 'পরিচিতি ভূবন' বা 'জীবন সঙ্গিনী সন্ধান' ইত্যাদি নামে অনেক গ্রুপ দেখা যায়, ওসব মূলত বাজারী ছেলেমেয়েদের আড্ডাখানা। যাদের একমাত্র উদ্দেশ্য কাঁদাপানি থেকে শিকার সন্ধান। অসতর্ক ও বেখেয়াল ছেলেমেয়েদের পথভ্রষ্ট করা। তাদের চিন্তার জগতটি নিয়ে ছেলেখেলা করা। ধ্বংসের তলানিতে নিক্ষেপ করা তাদের। সুতরাং যাদের ধর্মীয় মূল্যবোধ ও আত্মমর্যাদা আছে, তাদের ওসব গ্রুপে জয়ন করা সমীচীন নয়। এসব বাজে কাজে কোনো প্রকার সহযোগিতা হয়, এমন বিষয় থেকেও বিরত থাকা কাম্য। কারণ, এখানে যে বার্তাগুলো আদান প্রদান হয়, সেগুলো ভুলও হতে পারে। দেখা গেছে, ছেলে প্রকৃতপক্ষেই বিয়ে করতে চাচ্ছে, কিন্তু মেয়ে করছে ছলচাতুরি। অথবা মেয়ে আন্তরিকভাবে বিয়েতে আগ্রহী, কিন্তু ছেলে প্রতারণা করছে। ইত্যাদি।

জেনে রাখুন, এমন অনেক মন্দ প্রকৃতির লোক আছে, যারা ইন্টারনেট ও ফেইসবুকের মাধ্যমে প্রেমময় মেসেজ লিখে এবং ছবি আদান-প্রদান করে যৌন পিপাসা নিবারণ করে থাকে। অথচ তাদের ভাষায়, তারা জীবনসঙ্গিনী খোঁজছে। তাই এসব কোনক্রমেই বৈধতা পেতে পারে না। যা কিনা এক মহা অনিষ্টের রাজপথ। এমন ফটক, যা দিয়ে বিপথগামী নারী-পুরুষ অন্ধকার রাজ্যে প্রবেশ করে।

টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী: ৫০৩০।
২. মুসতাদরাক, হাকিম: ৬৭৫১।

ফন্ট সাইজ
15px
17px